বাংলা কল্পবিজ্ঞান কোন পথে চলেছে?

  • লেখক: কল্পবিশ্ব গ্রুপ, সময় - শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯) সকাল ১০টা।
  • শিল্পী:

তারপর আস্তে আস্তে এক নতুন সময়ে এসে পৌঁছেছে বাংলা কল্পবিজ্ঞান। অভিজ্ঞদের পাশাপাশি তরুণ লেখকরাও তুলে নিচ্ছেন কলম। কিন্তু ভবিষ্যৎ কোন পথ দেখাচ্ছে? বাংলার আরও অনেক সাহিত্যরীতির মতো কল্পবিজ্ঞানও এসেছে বিদেশি সাহিত্যের হাত ধরে। কিন্তু কল্পবিজ্ঞানের আত্মীকরণ কি বিশ্বসাহিত্যের সাইফিকে আত্মস্থ করেই সম্পূর্ণ হবে নতুন পথে? নাকি বিগত কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়ে যাওয়া নিজস্ব কল্পবিজ্ঞানের ঘরানা, যার সঙ্গে সাইফির বেশ কিছুটা দার্শনিক ও তাত্ত্বিক বিভিন্নতা— তাতেই পৌঁছনো সম্ভব সোনালি আলোর প্রান্তে? কী মনে করছেন বাংলা ভাষায় এই মুহূর্তের উল্লেখযোগ্য তরুণ ও অভিজ্ঞ কল্পবিজ্ঞান লেখকরা?

শুরু হোক আলোচনা।

 

বিদেশী আত্মীকরণের পক্ষে –

১) ঋজু গাঙ্গুলী

২) সোহম গুহ

৩) কুনাল কর্মকার

 

বাংলার নিজস্ব ঘরানার পক্ষে-

১) দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

২) সুমিত বর্ধন

৩) সৌম্য সুন্দর মুখার্জী

 

এই আলোচনায় আপনার অংশগ্রহণও একান্ত কাম্য। মূল বক্তাদের আলোচনার শেষে সকলেই সুযোগ পাবেন নিজেদের মতামত জানানোর। কাজেই আসুন বন্ধুরা, এই শনিবারের সকাল হোক বাংলা কল্পবিজ্ঞানের নতুন দিন নিয়ে। অলমিতি বিস্তারেণ…

 

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য: ভবিষ্যত বিষয়ে নির্ভুল বলা মুশকিল কারণ হ্যারি সেলডেন এখনো জন্মাননি। তবে অতীত ও বর্তমান থেকে যা দেখছি তাতে যে কোনও সাহিত্যধারাই অন্য জাতিগোষ্ঠী যখন ধার নেয় তখন প্রাথমিক কিছুদিনের পরীক্ষানীরিক্ষার পর সেই ধারা নিশ্চিতভাবেই ঋণগ্রাহক জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে রি-ওরিয়েন্ট করে নেয়। কারণ তা না করলে, মুষ্টিমেয় নার্ড-এর বাইরে বৃহত্তর পাঠকবৃত্তে তার গ্রহণযোগ্যতা গড়ে ওঠে না। বাংলার কল্পবিজ্ঞান এখনও মূলত এই অনুকরণ, হনুকরণ ও পরীক্ষানীরিক্ষার স্তরে রয়েছে, ফলত বৃহত্তর জনমানস তাকে নেয় না (তারা ভূতকে নেয়)। হয় কল্পবিজ্ঞান ব্যাপকভাবে দেশিকৃত হবে ও জনপ্রিয় হবে, অথবা এখনকার মতো এনডেনজার্ড স্পিশিস হয়ে নার্ডদের চিড়িয়াখানায় ধুঁকবে।

 

বিশ্বদীপ দে: ঋজুবাবু, আপনার কাছে জানতে চাইব সত্যিই কি বাংলা কল্পবিজ্ঞান এখনও স্রেফ পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরেই রয়েছে? এই সময়ের একজন কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসেবে দেবজ্যোতিদার এহেন মতকে সম সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি কীভাবে দেখছেন?

 

ঋজু গাঙ্গুলী: আমার বক্তব্যকে তিনটি সূত্রের মাধ্যমে পেশ করব। এগুলোর প্রতিটিই ব্যক্তিগত অভিমত, এবং তর্কসাপেক্ষ – এ-কথা আগেই স্বীকার করা উচিত।

     ১. কল্পবিজ্ঞান মানে শুধুই বিষয় বা প্লট নয়, ভাষার ব্যবহার থেকে শুরু করে অন্যান্য ঘরানার আত্তীকরণও বটে। বাংলায় এমন প্রচেষ্টা এখনও শৈশবাবস্থায় আছে। সুমিত বর্ধন তাঁর লেখায় এই কাজটি করে চলেছেন, কিন্তু এই ধারার আরও অনুসারীরা না আসা অবধি ভাষাগত ও প্রকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আমাদের বিদেশি সাহিত্যের ওপর নির্ভর করতেই হচ্ছে।

     ২. বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের একটি সুদৃঢ় বাস্তব ভিত্তি একসময় এসেছিল। দিলীপ রায়চৌধুরী, সিদ্ধার্থ ঘোষ, এবং অতি অবশ্যই প্রেমেন্দ্র মিত্র যেভাবে তাঁদের লেখায় মানবচরিত্রের আলো-আঁধারির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও হার্ড সাইফির উপাদান আনতেন, তাকে বিশ্বমানের বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু তারপর তো একটা প্রকাণ্ড শূন্যতা এসে গেছে! নামকরা পত্রিকাগুলোয় এখনও কল্পবিজ্ঞান মানে রোবটের চোখে জল এবং অবিশ্বাস্য, অসম্ভাব্য গাঁজাখুরির চলন দেখে চলেছি আমরা। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যতিক্রম এই উৎকট অবস্থাটাই প্রকট করছে। তাই, যতদিন না আমরা আবার বাস্তবের ওপর দাঁড়িয়ে লিখিতে পারার মতো লেখক পাই, ততদিন বিদেশি সাহিত্যের আত্তীকরণ ছাড়া আমাদের গতি নেই।

     ৩. কল্পবিজ্ঞান মানে শুধু সম্ভাবনা আর আশঙ্কার আলোয় ভূয়োদর্শন নয়। ওই সাহিত্য পাঠককে জীবনের মূল স্রোতটিকে বুঝে নিতেও সাহায্য করে ট্রোপের আড়ালে। এই মুহূর্তে মানবজাতি তথা সভ্যতার বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রায় কোনও কম্পোনেন্টে বাঙালির কোনও উপস্থিতি ধরা পড়ে না। তাই দেশজ ভাবনায় কল্পবিজ্ঞান লিখতে গেলে প্রথমেই তো আমরা আটকে যাব। কিন্তু বিদেশি কল্পবিজ্ঞান অল্টারনেট ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিঙের যে ধারণা দেয় তাতে আলোয়-আলোয় মুক্তি পাওয়ার রাস্তা আছে আমাদের। সেই ধারায় আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি মার খাওয়া উপজাতির একটি মেয়ে হয়ে উঠতে পারে মানবজাতির রক্ষাকর্তা। ওইভাবে ভাবা হয়েছিল বলেই দাঙ্গা, দেশভাগ আর দারিদ্র‍্যে জর্জরিত এক জাতির এক খ্যাপাটে মানুষকে কেন্দ্রে রেখে অদ্রীশ বর্ধন তাঁর প্রনাবচ সিরিজটি তৈরি করতে পেরেছিলেন।

     তাই, আমাদের যদি কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে বিদেশি সাহিত্যের ভাষা, ভাব, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয় আত্তীকরণ করতেই হবে।

     অলমিতি।

 

দীপ ঘোষ: ঋজুবাবুর বক্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ। উঠে এল পাশ্চাত্যের হার্ড সায়েন্স আর কল্পবিজ্ঞানের ফ্যান্টাসি বেসড সায়েন্স ফিকশানের মধ্যে দ্বৈরথ। যে আলোচনা আগেও এসেছে বহুবার। যার সব থেকে সহজ উদাহরণ হল আমরা শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চারকে কল্পবিজ্ঞান বলব কি না। এবার আমি সুমিত বর্ধনকে অনুরোধ করব তাঁর মতামত জানাতে।

 

সুমিত বর্ধন: আমার মতামত অবশ্যই ব্যক্তিগত এবং তর্কসাপেক্ষ। তবে আমার এ ব্যাপারে যা মনে হয় বলি। যে কোনও শিল্পকলাকে যদি মানুষের কাছে পৌঁছতে হয় তাকে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে হয়, তাকে নতুন কিছুকে উপস্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে কোথাও একটা নাড়ির যোগ রাখতে হয়। এই প্রাসঙ্গিকতাটা না থাকলে এই আর্ট ফর্ম অনেক সময়ে এলিটের সম্পত্তি হয়ে পড়ে। সায়েন্স ফিকশনের থেকে সরে গিয়ে চিত্রকলার জগতের দিকে যদি একটা উদাহরণের দিকে তাকাই, দেখব রাজা রবিবর্মা তাঁর ছবিতে ভারতীয় কন্টেন্টকে ইউরোপীয় ফর্মে সাজিয়ে প্রস্তুত করার প্রয়াস করেছেন। অন্যদিকে যামিনী রায় তাঁর ফর্ম এবং কন্টেন্ট দুটোকেই লোকায়ত করার প্রয়াস করেছেন। কল্পবিজ্ঞান সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ কল্পবিজ্ঞানে শুধু কল্পলোকের গল্পকথা বললে কাজ শেষ হয় না, মানুষের আশাআকাঙ্খা, ভয়-দুঃখ ইত্যাদির প্রতিফলনও থাকাটা প্রয়োজন, তা না হলে সেটা পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে না। আর এই অনুভূতিগুলো একান্তভাবে দেশজ। বাঙালি যে চোখে পৃথিবীকে দেখে ঠিক সেইভাবে একজন আমেরিকান কি একজন ইংরেজ দেখে না। একটা অল্টারনেট দুনিয়া গেলেও সেই দৃষ্টি পাল্টাবে না। সুতরাং এই প্রাসঙ্গিকতা যদি না রাখা যায় তাহলে সেটা সাধারণের সম্পত্তি হয়ে উঠতে বাধার মুখে এসে পড়ে।

 

বিশ্বদীপ দে: সুমিতদার কথায় উঠে এল দেশজ সম্পদের কথা। তৃতীয় বিশ্বের নিজস্ব শোক-ভয়-ভালবাসার জলছবি ফুটে ওঠার কথা। কল্পবিজ্ঞানের তিন লেখকের পর এবার অনুরোধ করব কুনাল কর্মকারকে। কুনাল, পাঠক হিসেবে বাংলা কল্পবিজ্ঞান সম্পর্কে তুমি কী মনে করছ? বিদেশি কল্পবিজ্ঞানের থেকে সরে এসে নিজস্ব সংস্কৃতির পথে থাকতেই হবে? নাকি দুয়ের মিশ্রণেই উৎকৃষ্ট কল্পবিজ্ঞান জন্ম নেবে?

 

কুনাল কর্মকার: পাঠক হিসেবে খুব ছোটবেলায় অদ্রীশ বর্ধন এবং সত্যজিৎ রায়ের লেখা পড়ে আমার কল্পবিজ্ঞান যাত্রা শুরু। একটু বয়স বাড়তেই ইংরেজি কল্পবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল ক্লার্কের হাত ধরে। এরপর যখনই বাংলা কল্পবিজ্ঞান হাতে নিয়েছি মনে হয়েছে, আমরা এসব তো কোন ছোটবেলায় পড়ে এসেছি, এখনও সেই চর্বিতচর্বন। মানে আবার সেই ইংরেজিতে ফিরে যাওয়া। Military Sci fi, Steampunk, Hard SciFi, Creature feature পড়তাম আর ভাবতাম কবে নিজের ভাষায় পড়ব এমন লেখা?

     আজকের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হয়তো সেসব গল্প ভাষাজনিত কারণে পড়তেই পারবে না। তাদের ভরসা কিন্তু সেই সাতের দশকের কল্পবিজ্ঞানের অনুকরণের নতুন গল্প। স্বাভাবিকভাবেই boredom এসে পড়ে। অনুবাদ এই গ্যাপ পূরণ করতেই পারে কিন্তু সেখানে তো আর সেই নিজেদের সংস্কৃতির স্বাদ নেই, তাই আমি মনে করি, মৌলিক বাংলা ঘরানার পাশাপাশি পশ্চিমী ঘরানার আত্মিকৃত সাইফাই এরও বহুল প্রয়োজন আছে, নতুন নতুন দিগন্ত পাঠকের সামনে মেলে ধরার জন্য। নতুন লেখকরাও এগিয়ে আসতে পারবে সাহস করে, তবেই বাংলা সাইফাই এর স্বর্ণ যুগ ফিরবে।

 

বিশ্বদীপ দে: সৌম্য সুন্দর মুখার্জী, এবার আপনার কাছ থেকে জানতে চাইব এ বিষয়ে আপনার কী মত। অদ্রীশ-সত্যজিৎ তাঁদের সময়ের বিদেশি কল্পবিজ্ঞানের উপাদানকে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে অনেকাংশে মিশিয়ে ছিলেন একথা বলাই যায়। কিন্তু আজ বাংলা কল্পবিজ্ঞান কোন পথে চলেছে? কোন পথে আলোর হদিস?

     সৌম্যর মত আসার আগে একটা গল্পের কথা বলি। লীলা মজুমদারের ‘সিঁড়ি’। কচু, শামুক, নুন-লঙ্কা মিশিয়ে খাবার খেয়ে যাদের দিন কাটে, তারা কোন আর্থ-সামাজিক স্তরে রয়েছে তা স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়। সেই সব ছেলেমেয়েদের জন্য একদিন নেমে এল সিঁড়ি। গল্পের শেষে সেই গরিব-গুর্বো বাচ্চাগুলি উঠে বসে সিঁড়িতে। আসলে তা ভিনগ্রহীদের যান। যে সময়ে লেখা, তখন অন্য গ্রহের প্রাণীর পৃথিবীতে অবতরণ নিয়ে বহু লেখা হয়ে চলেছে। মহাকাশযাত্রার যুগ সেটা। সেই লেখায় লীলা মজুমদার মিশিয়েছিলেন তৃতীয় বিশ্বের ‌নিরন্ন মানুষের সঙ্কটকে। সেই গল্পের কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল। কল্পবিশ্বে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে এটির কথা উল্লিখিতও হয়েছে।

 

সৌম্য সুন্দর মুখার্জী: আলোর হদিস কিন্তু পাওয়া কঠিন নয় বলেই আমার মনে হয়। যে কোনও সাহিত্যকে জনমনোগ্রাহী হয়ে উঠতে লাগে তার মাস কানেকশন। বাংলা কল্পবিজ্ঞান যদি সেটা করতে পারে, তাহলেই কেল্লা ফতে। গ্রহণযোগ্যতা একটা বড় বিষয়। ইংরেজির অনুকরণ করলে সেটা মাইকেলের ক্যাপটিভ লেডির দশা হতে পারে, কারণ সে কাব্য না জনপ্রিয় হল বিদেশে, না এ দেশে। যদি তিনি মেঘনাদ বধ কাব্যে না আসতেন, তাহলে বাঙালি আদৌ কি তাঁকে মনে রাখত? সেই রকমই কল্পবিজ্ঞানের থিমকে হতে হবে এমন বিষয়, যার সঙ্গে বাংলাভাষী মানুষ রিলেট করতে পারবে। রিক রিয়র্ডান যদি গ্রিক গডস নিয়ে আস্ত সিরিজ নামাতে পারেন, আমরা পারব না? আর একটা ব্যাপার হল, কল্পবিজ্ঞানকে বার করে আনতে হবে শিশুপাঠ্যের ট্যাগ থেকে। বিদেশে ক্লার্ক্সওয়ার্ল্ড, এফএসএফ, বিনিথ সিজলেস স্কাইস এর মতো প্রচুর পত্রিকা আছে, যারা স্পেকুলেটিভ ফিকশনের প্রতি নিবেদিত। আমাদের এখানে তার সংখ্যা হাতে গোনা। কল্পবিজ্ঞানকে সিরিয়াস সাহিত্য মানতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির এখনও আঁতে লাগে। সেখানে বিদেশে এর চর্চা প্রচুর, ইনভেস্টমেন্ট প্রচুর; হুগো নেবুলা ব্রাম স্টোকার জাতীয় উচ্চমানের পুরস্কারেরও অভাব নেই। সাহিত্যিক তখনই বেশি করে লিখবেন যখন সেটা লিখে তার বেশি করে স্বীকৃতি পাবেন। লেখকের লক্ষ্মীলাভটাও এই সব বিদেশি পত্রিকায় মোটা মানের হয়। অতএব adult বা সিরিয়াস সাহিত্য হিসেবে একে গণ্য করা এবং পাঠকের কাছে বেশি করে পৌঁছে দেওয়াতেই সবার মঙ্গল, এই আমার অভিমত।

 

বিশ্বদীপ দে: সৌম্যর বক্তব্য থেকে আরও কয়েকটা জিনিস উঠে এল। যার অন্যতম কল্পবিজ্ঞানের গায়ে লেগে যাওয়া শিশুপাঠ্যের ট্যাগ। কত বছর আগে সিদ্ধার্থ ঘোষের ‘মহাকাশের মণিমুক্তো’ লেখা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবুও চারপাশে চোখ বুলোলে দেখা যায় সেই পাঁচ-ছয়-সাতের দশকের মতো ইউএফও, ভিনগ্রহী আর রোবটের চোখে জল। সাধারণ্যে ধারণাও তৈরি হয়ে রয়েছে, কল্পবিজ্ঞান নিছকই ছেলে ভুলনো গল্পগাছা। এবার সোহম গুহর কাছে জানতে চাইব তোমার মতটা। কোন পথে এগোচ্ছে বাংলা কল্পবিজ্ঞান? কোন পথে তার প্রকৃত সিদ্ধি?

 

সোহম গুহ: বাংলা কল্পবিজ্ঞানের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের আগে সম্ভবত আমাদের বোঝা উচিত বাঙালির কল্পবিজ্ঞান কি। কল্পবিজ্ঞান চর্চা এখানে, তা সে পড়াই হোক বা লেখা, ভীষণ পরিমাণে শহরকেন্দ্রিক। যেখানে সেই দেশের, সেই রাজ্যের প্রায় 60 শতাংশ মানুষ হলকর্ষণে নিযুক্ত। আশ্চর্যজনক ভাবে তাদের নিয়ে বাংলায় কোন লেখা আমি পড়িনি, সেই কারণেই কি কলকাতা পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক কল্পবিজ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে আর শিশুতোষ কল্পগল্পের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে? কারণ অধিকাংশ মেইনস্ট্রিম কল্পগল্পের নায়ক– হ্যাঁ, মূল চরিত্র নয়, নায়কই– হয় কোনও বৈজ্ঞানিক, নয়তো অধ্যাপক, নাহলে নিতান্ত বাড়িতে গবেষণাগার খুলে প্র্যাকটিস করছেন। এই চরিত্রায়ন কোনওভাবেই বাস্তবের মাটিকে সমর্থন করে না। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, গ্রাম আর কল্পবিজ্ঞান, আদিবাসী সমাজ এবং কল্পবিজ্ঞান কিভাবে একসঙ্গে যায়?

     এখানে বিন্তি – নান্দি অর্ফেকরের লেখা গল্পটির উদাহরণ দেওয়াটা জরুরি। গল্পটা স্পেস ট্রাভেল নিয়ে লেখা হলেও তার পরতে পরতে ফুটে আছে বিন্তির ট্রাইবাল শিকড়ের গন্ধ, এবং হয়তো এথনিক ক্লেনজিংএর গালে লেখাটা একটা বড় থাপ্পড়ও। সৌম্য বাবুর সাম্প্রতিক লেখাটি কল্পবিজ্ঞান না হলেও আমার এই মতের আরেকটি উদাহরণ।

     প্রসঙ্গত, বিদেশি আত্তিকরণ দুইভাবে হয়, এবং দুইয়েরই উদাহরণ নারায়ণ সান্যাল তাঁর কলমে রেখে গেছেন। এক হয় বিদেশি গল্পের ছায়ায় নিজের দেশের মাটিকে ফুটিয়ে তোলা, উদাহরণ নক্ষত্রলোকের দেবতাত্মা, (এবং জাফর ইকবালের উপন্যাসগুলি) এবং দ্বিতীয় বাংলা ভাষায় আদ্যন্ত বিদেশি প্রেক্ষাপটে একটি উপন্যাস বানানো, কারণ আমাদের কাস্ট স্ট্রাগল থাকলেও রেসিজম নেই আমেরিকার মত – উদাহরণ অবাক পৃথিবী।

     বিদেশে ক্যাম্বেলের মতো সম্পাদক, অথবা আমেজিং স্টোরিজ বা এসটাউন্ডিং এর মতো পত্রিকা না থাকলে এই রেনেসাঁসের সূচনা হত কিনা বলা মুশকিল। দুঃখের ব্যাপার, আমাদের মেইনস্ট্রিম পত্রিকার এই ব্যাপারে এখনও সেই মাপের উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

     সেই তখনকার বিজ্ঞানসর্বস্ব sf থেকে এখনকার sf এর আকাশ পাতাল অমিল। লেখা হয় না 2001 এর মতো গল্প, সেই জায়গা নিয়েছে সেমিওসিস এর মতো লেখা। এখন আমরা ভিনগ্রহীদের নিয়ে উৎসাহিত নই, উৎসাহিত তাদের সঙ্গে আমাদের সংস্কার, শিক্ষা এবং মৌলিক চিন্তনের আদানপ্রদান নিয়ে। বিদেশে কল্পবিজ্ঞান বহুদিন হল বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিকদের গল্প থেকে মানুষের গল্প হয়ে গেছে। সমাজতত্ত্ব, চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটমান দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে, জীবনের ওঠানামা সবকিছু এখন তাঁদের sf এর উপজীব্য বিষয়।

     আত্তিকরণের সমর্থন আমি করি না। কিন্তু শেখার যে অনেক কিছু আছে বাইরের থেকে। এই ক্ষেত্রে চীনা sf তাদের অর্থনীতির মতোই একটা টেমপ্লেট হিসেবে কাজ করুক আমাদের জন্য। বাঙালির সমাজ নিয়ে লেখা বহু আছে, এবং তারা ‘সামাজিক’ উপন্যাসের তকমায় বহুচর্চিত। উত্তম সুচিত্রার অগ্নিপরীক্ষা সিনেমাটি হিট করেছিল কারণ সেই সিনেমা একটা দ্বিখণ্ডিত, ভগ্নহৃদয় জাতিকে আবার ভালোবাসতে শিখিয়েছিল। বাঙালির সেটা উঠে দাঁড়ানোর, ধ্বংসস্তূপ থেকে সম্পদ পুনরুদ্ধারের সময়। এক দশক বাদে আশ্চর্যর উত্থান সেই কারণেই ভীষণ যুগোপযোগী। বাংলা কল্পবিজ্ঞানের সেই দৃষ্টিকোণটা জরুরি। আমরা বাঙালি, এবং বাঙালির জন্য কল্পবিজ্ঞান লিখতে হলে লেখককে বাঙালির ইতিহাসকে সামনে ফেলে ভবিষ্যত দর্শন করতে হবে। কাজটা কঠিন। কিন্তু অসম্ভব না। জাগরীর মতো উপন্যাস যদি লেখা যায়, তাহলে সেই একই ঘটনাকে ভবিষ্যতের আঙ্গিকে কেন লেখা সম্ভব না? কল্পবিজ্ঞান তো ইতিহাসের ফ্রেমে ভবিষ্যতের দর্পন।

     ধন্যবাদ।

 

বিশ্বদীপ দে: সকলের থেকে বেশি অপেক্ষা করিয়ে সকলের চেয়ে বড় একটা উত্তর দিয়েছে সোহম। বিশদে অনেকটা কথা বলে ও আমাদের কাছে অনেকগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তুলে ধরেছে। যে ছ’জনকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল সকলেই তাঁদের মত জানিয়েছেন। সকলকে অনেক অনেক ধন্যবাদ তাঁদের মূল্যবান মতামত এখানে শেয়ার করার জন্য। এবার আমি অনুরোধ করব গ্রুপের সদস্যদের। তাঁরা যদি তাঁদের মতো করে এবিষয়ে বক্তব্য পেশ করেন, তাহলে আলোচনা আরও খানিক এগোতে পারে। এই আলোচনা চলতে চলতে মনে পড়ল জাফর ইকবালের কথা। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই সাহিত্যিক হার্ড কল্পবিজ্ঞান লিখেছেন। আসিমভ ঘরানার কল্পবিজ্ঞান লিখেও এমন জনপ্রিয়তা তিনি কী করে পেলেন? বাংলাদেশ যদিও ভৌগোলিক ভাবে বিদেশ, কিন্তু ভাষাগত কারণে তা কি বাংলা কল্পবিজ্ঞান নয়? তাহলে তৃতীয় বিশ্বের পাঠকের কাছে তা কোন শর্তে এমন জনপ্রিয়তা পেল? বাংলা কল্পবিজ্ঞানের আগামী দিন কোন দিকনির্দেশ করছে? সকলকে অনুরোধ, তাঁদের মত এখানে জানাতে।

 

সৌমেন দে: সম্পূর্ণভাবে দেশজ কল্পবিজ্ঞান লিখতে হয়, তবে পাঠকের মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। সমাজের সর্বক্ষেত্রে আজ সিউডো সায়েন্সের রমরমা। অদ্ভুত যুক্তি খাড়া করা হচ্ছে তার সপক্ষে। বৈজ্ঞানিক বিষয়ে জনসাধারণের একটা ভীতি রয়েছে। প্রযুক্তির বিপ্লবে আমাদের দেশ তথা রাজ্য যে অনেক পিছিয়ে পড়েছে তা আর অস্বীকার করে লাভ নেই। চীন যে পরিমাণ প্রযুক্তিগত উন্নতি ঘটিয়েছে, তারই পরোক্ষ প্রভাবে ভবিষ্যতের দুনিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে কল্পবিজ্ঞান লেখক ও পাঠকের চিন্তাভাবনা। যেখানে দেশে ছড়িয়ে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস, সেই দেশে দেশজ কল্পবিজ্ঞান দিয়েই কল্পবিজ্ঞানের যাত্রা সম্পূর্ণ করা যাবে না। পাশাপাশি বিদেশি কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য থেকেও আত্তিকরণ করা দরকার বলে আমি মনে করি। দুই ধারাই পাশাপাশি চলুক। যাঁর যে ধারায় পছন্দ লিখতে থাকুন। ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে হবে এই দুই ধারার লেখাই। তারাই ঠিক করবে কোন ধারার লেখা তারা চায়।

 

রাকেশ কে দাস: কল্পবিশ্ব/কল্পবিজ্ঞান কে ধন্যবাদ এরকম একটা বিষয়ে বিশিষ্টজনদের মতামত প্রকাশ করার জন্য। বিদেশি এসএফ এর অনুসরণ এবং দেশজ এসএফ এই দুটোকেই জ্বালানি দিতে পারে বিখ্যাত ও সমসাময়িক বিদেশি রচনার প্রাণবন্ত অনুবাদ। পাঠক ও কাহিনীকার উভয়েই যদি যথেষ্ট অনুপ্রেরণা পায় তবেই মৌলিক সাহিত্য অগ্রগতি লাভ করবে। হয়তো অনেক নবীন লেখকও উঠে আসতে পারে। তবে আমার ধারণা যত মৌলিক এসএফ লেখা হবে সবেতেই বিদেশি ও দেশি উপাদান বিভিন্ন অনুপাতে বিরাজ করবে। তাই আজকের আলোচনার বিষয় একে অন্যের পরিপূরক বলে মনে হয় এবং প্রত্যেকজনের বক্তব্য যুক্তিগ্রাহ্য।

Tags: ঋজু গাঙ্গুলী, কল্পবিশ্ব ইভেন্ট, কুনাল কর্মকার, চতুর্থ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, দীপ ঘোষ, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, পূজাবার্ষিকী, বিশ্বদীপ দে, রাকেশ কে দাস, সুমিত বর্ধন, সোহম গুহ, সৌমেন দে, সৌম্য সুন্দর মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!