গোলচক্করে ঘুরপাক

  • লেখক: আইজ্যাক আসিমভ, অনুবাদ: রুদ্র দেব বর্মন
  • শিল্পী: প্রমিত নন্দী

গ্রেগরি পাওয়েল মাঝে মধ্যেই মনে রাখার মতো এক-একটা মন্তব্য করে থাকে। তার একটা হল, “লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না।” তাই মাইক ডোনোভান যখন সিঁড়ি ভেঙে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে এল, তখন ওর মাথার চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ঘামে নেতিয়ে থাকা লালচে চুলগুলোর দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে পাওয়েল জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? আঙুলের নখ উপড়ে ফেললে না কি?”

     উত্তেজিত ডোনাভান তখনও হাঁপাচ্ছে, “আরে না, তুমি এখানে এই নিচের তলায় সারাদিন ধরে করছ’টা কী?”

     কথাটা বলে বড় করে একটা শ্বাস নেয় ও, তারপর আসল বক্তব্য পেশ করে, “স্পিডি তো এখনও ফিরে  এল না!”

     পাওয়েল উঠে গিয়ে সবে সিঁড়িতে পা রেখেছিল। থেমে গেল। চোখ বড় বড় করে কয়েক  মুহূর্ত তাকিয়ে রইল ডোনাভানের দিকে। তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে আবার উপরে উঠতে শুরু করল। ধাপের শেষ মাথায় পৌঁছানোর আগে ও আর কিছু বলল না, তারপর শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল,

     “তুমি তো ওকে সেলেনিয়াম আনতে পাঠিয়েছিলে?”

     “হ্যাঁ।”

     “তো কতক্ষণ ধরে ওটা বাইরে রয়েছে?”

     “ঘণ্টাপাঁচেক পার হয়ে গিয়েছে।” বলে চুপ করে যায় ডোনাভান।

     হিরন্ময় নীরবতা! সিঁড়ির দু-মাথায়  কিছুক্ষণের জন্য দুজনেই চুপ।

     যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়! অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ! এখানে, এই বুধের বুকে, সবেমাত্র বারো ঘণ্টা হল ওরা এসে পৌঁছেছে— আর এর মধ্যেই নানারকম সব বিদঘুটে সমস্যার গভীরে গলা পর্যন্ত ডুবে গিয়েছে ওরা। বুধ এমনিতেই সৌরজগতের মধ্যে আলাদা এক অপয়া জগৎ বলে কুখ্যাত ছিল, এবার ব্যাপারটা দেখা যাচ্ছে বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ হয়ে গেছে। এমনকি বুধের মতো অপয়া একটা জায়গার পক্ষেও এটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের বাজে অবস্থা।

     পাওয়েল বলল, “কোনও ভ্যানত্যাড়া না করে, সোজাসাপটা একদম শুরু থেকে খুলে বলো।”

     ইতিমধ্যে ওরা রেডিয়ো রুমটার ভিতরে এসে ঢুকেছে। গাদাগুচ্ছের সব পুরোনো যন্ত্রপাতি ঘরটার মধ্যে ডাঁই করে রাখা— যেগুলো ওরা আসার দশ বছর আগে থেকে এখানে ওইভাবেই পড়ে আছে। দশ বছর একটা বিশাল লম্বা সময়। অন্তত প্রযুক্তির উন্নতির দিক দিয়ে দেখতে গেলে। আজকের এই স্পিডির সঙ্গে দু-হাজার পাঁচের কোনও রোবটের তুলনা করলেই ফারাকটা পরিষ্কার বোঝা যাবে। যদিও, এটাও মানতে হবে যে আজকের দিনের রোবটিক্সের অগ্রগতির হার তখনকার চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি।

     পাওয়েল আলতো করে যন্ত্রপাতিগুলোর ঝকঝকে ধাতবতল স্পর্শ করে। বহুদিনের অব‍্যবহৃত হাওয়া-বাতাস ঘরটার ভেতরে, বাইরে— গোটা স্টেশন জুড়ে থম মেরে জমে থেকে থেকে চারদিকে একটা হতাশাজনক আবহাওয়া তৈরি করে রেখেছে।

     ডোনাভানও নিশ্চিত এটা টের পাচ্ছিল। এবার ও তাড়াতাড়ি পাওয়েলকে পুরো ব্যাপারটা বলতে শুরু করে, “আমি রেডিয়ো মারফত ওটাকে খুঁজে বের করার অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেছি, কিন্তু লাভ কিছু হল না। বুধ গ্রহের এই সূর্য-মুখী অংশটায় বেতার তরঙ্গ ঠিকমতো কাজ করে না— মাইল দুয়েকের ওপাশে আর কিছুতেই পৌঁছোতে পারে না। যেটা প্রথম অভিযান ব্যর্থ হওয়ার একটা মোদ্দা কারণ ছিল। এদিকে আমাদের আল্ট্রাওয়েভ যন্ত্রপাতিগুলো আগামী কয়েক সপ্তাহের আগে আমরা কিছুতেই চালু করে উঠতে পারব না—”

     “বাদ দাও। আপাতত তুমি কী পেয়েছ সেটা আগে বলো?”

     “আমি সর্ট-ওয়েভ দিয়ে একটা কিছু উলটোপালটা নড়াচড়ার সিগন্যাল খুঁজে পেয়েছি। যদিও তা থেকে ওই নড়াচড়ার আপাত অবস্থানের বাইরে আর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমি গত দু-ঘণ্টা ধরে ওটার নড়াচড়ার উপর নজর রেখে ওই অবস্থান-বিন্দুগুলো একটা মানচিত্রে প্লট করেছি।”

     ডোনাভান প্যান্টের পকেট থেকে একটা হলদেটে চৌকো পার্চমেন্টের টুকরো বের করে টেবিলের ওপর ফেলে। আগের ব্যর্থ অভিযানের অবশিষ্টাংশই হবে মনে হল সেটাকে। দু-হাতের তালু দিয়ে চাপড়ে চাপড়ে পার্চমেন্টটাকে টানটান করে ছড়িয়ে দেয়। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দু-হাত বুকের সামনে জড়ো করে পাওয়েল পুরো ব্যাপারটা দেখে যাচ্ছিল।

     উত্তেজিত ডোনাভান পেন্সিলটা দিয়ে ইশারা করে দেখায়। “এই লাল গুন চিহ্নের জায়গাটা হচ্ছে সেই সেলেনিয়াম ঢিপিটা। তুমি নিজেই এই চিহ্নটা  দিয়েছিলে।”

     “এটা কোনটা?” পাওয়েল বাধা দিয়ে বলে, “ ম্যাকডুগল যাওয়ার আগে মোটমাট তিনটে ঢিপি আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে গিয়েছিল।”

     “স্বাভাবিকভাবেই আমি স্পিডিকে সবচেয়ে কাছেরটায় পাঠিয়েছি; যেটা মাত্র সতেরো মাইল দূরে। কিন্তু, কোনটায় পাঠিয়েছি তাতে কী এসে যায়?” ওর গলার আওয়াজে একটা উৎকণ্ঠা টের পাওয়া যায়। “পেন্সিল-এর এই বিন্দুগুলো যা বসিয়েছি সেটাই তো স্পিডির এখনকার অবস্থান বোঝাচ্ছে।”

     এতক্ষণ কষ্ট করে হলেও যে নকল আত্মবিশ্বাস পাওয়েল ধরে রেখেছিলো সেটা এই প্রথমবারের মতো দেখা গেল আর নেই। ওর হাতটা যেন নিজে নিজেই তড়িঘড়ি করে মানচিত্রটার দিকে এগিয়ে গেল।

     “তুমি সিরিয়াস তো? এ তো অসম্ভব।”

     “ওটা ওখানেই আছে এখনও,” ডোনাভান গজগজ করে বলে ওঠে।

     ছোট ছোট বিন্দুগুলো দিয়ে মানচিত্রে যে অবস্থান চিহ্নিত করা  রয়েছে সেগুলো ওই লাল গুন চিহ্ন দেওয়া সেলেনিয়ামের ঢিপিকে ঘিরে মোটামুটি একটা গোলাকার বৃত্ত তৈরি করেছে। পাওয়েলের আঙুলগুলো এবার দেখা গেল ওর বাদামি রঙের গোঁফের প্রান্তে পৌঁছে গেছে। গভীর উদ্বেগের এক অনবদ্য সংকেত।

     ডোনোভান আরও বলে, “গত দু-ঘণ্টা ধরে আমি স্পিডিকে নজরে রেখে যা দেখলাম, ওটা ওই ওঁদা ঢিপিটাকে চার চারবার ঘুরপাক খেলো। আমার তো মনে হচ্ছে যে ওটা এবার চিরকালের মতো গোল গোল ঘুরপাক খেতেই থাকবে। তুমি কি আন্দাজ করতে পারছো যে আমরা কী ঝামেলায় পড়েছি?”

     পাওয়েল কিছুক্ষণের জন্য উপরের দিকে তাকিয়ে রইল, একটাও শব্দ ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো না। ওহ, হ্যাঁ, ও ভালো করেই ওদের অবস্থাটা বুঝতে পারছে। এটা এখন স্বয়ংসিদ্ধ, অনুমানের আর কোন প্রয়োজন নেই। এই বুধ গ্রহের বুকে, তাঁদের আর তাঁদের সামনের ঐ জ্বলন্ত সূর্যের ভয়ংকর শক্তির মাঝখানে একমাত্র যে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই আলোককোষের স্তুপ এবার জাহান্নামে চলে যাবে।

     এখান থেকে একমাত্র যা তাদেরকে বাঁচাতে পারে, তা হল সেলেনিয়াম। আর এই সেলেনিয়াম একমাত্র যে জোগাড় করতে পারে, সে হল স্পিডি। যদি স্পিডি ফিরে না আসে, তো সেলেনিয়াম জোগাড় হবে না। আর সেলেনিয়াম জোগাড় না হলে, আলোককোষ স্তুপ টিকবে না। আর আলোককোষ স্তুপ না থাকলে – হুম্, ধীরে ধীরে ঝলসে সেদ্ধ-পোড়া হতে হতে মরে যাওয়াটা মনে হয় মৃত্যুর সবচেয়ে খারাপ রাস্তা।

     ডোনাভান ওর ঝাপড়া লাল চুলের গোছা অসভ্যের মতো খামচে টানতে টানতে বিরক্তি প্রকাশ করে। “আমরা সৌরজগতের সবার কাছে হাসির খোরাক হয়ে যাবো, গ্রেগ। কিভাবে এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ভুলভাল হয়ে যেতে পারে? ওরা পাওয়েল আর ডোনোভান নামের সেরা জুটিকে বুধ গ্রহে পাঠালো আধুনিক প্রযুক্তি আর রোবট দিয়ে, যাতে বুধের সূর্যের দিকের এই অংশে পড়ে থাকা এই বাতিল খনিজ কেন্দ্র পুনরায় চালু করার বিস্তারিত খতিয়ান তৈরি করা যায়, আর আমরা কিনা প্রথম দিনেই সবকিছু গুবলেট করে দিলাম! যেটা কিনা ছিল খুব সাধারন রুটিন মাফিক একটা কাজ। এভাবে আমাদের বদনাম আমরা কিছুতেই হতে দিতে পারি না।”

     “সেটা হয়তো আমাদের হতে দিতে হবে না,” পাওয়েল খুব শান্ত ভাবে উত্তর দেয়। “যদি খুব তাড়াতাড়ি কোনও রাস্তা খুঁজে না পাই তো বদনাম তো দূরের কথা – এমনকি প্রাণে বেঁচে থাকাটাও -সবই  ফুসস্‌ হয়ে যাবে।”

     “বোকার মতো কথা বলো না তো, গ্রেগ! এতে তুমি মজা পাচ্ছো কি করে জানি না, আমি তো পাচ্ছি না। শুধু একটা মাত্র রোবট দিয়ে এখানে, এই অপয়া বুধে, আমাদের পাঠানোটাই একটা অপরাধ। আর এটাও তোমারই ওই ঝকঝকে মাথা থেকে বেরিয়ে ছিলো যে আমরা নিজেরাই আলোককোষ স্তুপগুলোকে সামলাতে পারবো।”

     “এটা তোমার অন্যায় হচ্ছে। ওটা কিন্তু আমাদের মিলিত সিদ্ধান্ত ছিল আর সেটা তুমি ভালো করেই জানো। আমাদের তো শুধু দরকার ছিল কেজি খানেক সেলেনিয়াম, একটা স্টীলহেড ডাইইলেকট্রোড প্লেট আর ঘণ্টা তিনেক সময়, – আর বুধের সূর্যের দিকের এই এলাকায় বিশুদ্ধ সেলেনিয়ামের ঢিপি চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। ম্যাকডুগল ওর স্পেকট্রোরিফ্লেক্টর দিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমাদের জন্য তিন তিনটে ঢিপি খুঁজে পেয়েছিলো, তাই না? তো আর কিসের অপেক্ষা! আমাদের তো আর কোন বিশেষ শুভ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করার দরকার ছিল না।”

    “ঠিক আছে, এবার বলো তো আমরা এখন কী কী করতে পারি? পাওয়েল, একটা কিছু তুমি ভেবেছো নিশ্চই। সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত, নয়তো তুমি এত শান্ত থাকতে পারতে না। তুমি আমার সঙ্গে আর বেশি চালাকি না করে এবার খুল্লম খুল্লা বলে ফেলো তো চাঁদু।”

     “দ্যাখো মাইক, আমরা নিজেরা কিন্তু স্পিডির পিছনে ধাওয়া করতে পারি না, অন্তত এই সূর্যের দিকটাতে তো নয়ই। আমাদের এই নতুন ইনসোস্যুট-ও সূর্যের এই সোজাসুজি এসে পড়া আলো থেকে কুড়ি মিনিটের বেশি সময় আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। তবে তুমি তো অরণ্যের ঐ প্রাচীন প্রবাদটা জানোই, ‘রোবট ধরতে হলে রোবট পোষো’; দেখো, মাইক, হয়তো পরিস্থিতি যতটা দেখছো ততটা খারাপ নয়। আমাদের হাতে মাটির নীচের তলায় রাখা ছ-ছ’টা রোবট  আছে, ওগুলো যদি চালু করতে পারি তো মনে হয় আমরা ওদের কাজে লাগাতে পারবো। যদি অবশ্য ওগুলো কাজ করে।”

     ডোনাভানের চোখে আশার আলোর একটা হঠাৎ ঝলকানি দেখা গেল। “তুমি মনে হচ্ছে প্রথম অভিযানের সেই ছ’টা রোবটের বলতে চাইছো। তুমি ভেবে চিন্তে বলছো তো? ওগুলো তো মনে হয় সেই রোবট জমানার প্রথম দিকের যন্ত্র। দশটা বছর কিন্তু অনেক লম্বা সময় – অন্তত রোবটের রোবটত্বের কথা যদি ধরা যায়, তুমিও সেটা ভালো করেই জানো।”

     “আরে না, দিনের শেষে ওগুলো রোবটই। আমি ওদের সঙ্গে আজ সারাদিন কাটিয়েছি তাই আমি জানি। ওদেরও পজিট্রনিক বুদ্ধিমত্তা আছে, যদিও প্রাথমিক স্তরের, তবুও আছে।” ও এবার ডোনাভানের বানানো পার্চমেন্টের মানচিত্রটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। “চলো নিচে যাওয়া যাক।”

     

     রোবটগুলো রাখা রয়েছে সবচেয়ে নীচের তলায় – ছ-ছ’টা রোবটেরই  চারপাশে, ভগবান জানে কিসের না কিসের, বিশাল বিশাল প্যাকিং কেস রাখা রয়েছে। এই রোবটগুলো বেশ বড় আকারের, একটু বেশিই বড়, এতোটাই বড় যে এই মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসিয়ে রাখা অবস্থাতেও ওদের মাথাগুলো মেঝে থেকে অন্ততঃ সাত ফুট ওপরের হাওয়া খাচ্ছে।

     ডোনাভান শিস দিয়ে সিটি মারে। “এগুলোর সাইজ দেখতে পাচ্ছো, পাওয়েল? কাঁধ পর্যন্ত দশ ফুট তো হবেই।

     ”কেননা এগুলো ওরা সেই মান্ধাতার আমলের ম্যাকগাফি গিয়ার দিয়ে বানিয়ে তখন পাঠিয়ে ছিল। এগুলোর ভেতরের ব্যাপার-স্যাপার আমার দেখা আছে – যত রাজ্যের জবরজং ব্যাপার, তুমি ভাবতেও পারবে না। “

     ”তুমি কি এগুলো চালু করে দেখে নিয়েছো?

     “না। কোন দরকার নেই। আমার মনে হয় না এগুলোর কোন সমস্যা আছে। এমনকি ডায়াফ্রামও দেখলাম মোটামুটি ঠিকই আছে। এরা হয়তো কথাও বলতে পারবে।”

     কথা বলতে বলতে পাওয়েল সামনের রোবটটার বুকের ওপরের অংশ থেকে স্ক্রু খুলে একটা প্লেট সরিয়ে দু-ইঞ্চি ব্যাসের একটা গোলক ঢুকিয়ে দিলো, যেটা কিনা রোবটের জীয়নকাঠি – আনবিক শক্তির এক ছোটখাটো কারখানা। গোলোকটাকে ঢোকাতে প্রথমে একটু অসুবিধা হচ্ছিল, কিন্তু পাওয়েল ওটাকে ঠেলেঠুলে ঠিকই ঢুকিয়ে দিলো,  তারপর খুলে রাখা প্লেটটা, যথেষ্ট কষ্ট করেই অবশ্য, জায়গামত লাগিয়েও দিলো। আজকের মডেলগুলোর মতো রেডিয়ো নিয়ন্ত্রণ করার কথা দশ বছর আগে কেউ শোনেওনি। এরপর একে একে বাকি পাঁচটা রোবটের কাজও পাওয়েল একই রকম ভাবে শেষ করলো।

     ডোনাভান এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এবার উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, “একটাও তো  নড়াচড়া করছে না।”

     “হুকুম করিনি এখনও” ছোট্ট উত্তর পাওয়েলের। ও পেছন ঘুরে প্রথম রোবটটার সামনে গিয়ে ওটার বুকে একটা টোকা দিলো। “এই যে! আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?”

     যন্ত্রটার দৈত্যাকার মাথাটা আস্তে আস্তে নীচু হল আর তারপরে চোখ দুটো ঘুরে গিয়ে স্থির হল পাওয়েলের ওপর। এবার একটা খসখসে গলায় – যেন সেই মধ্যযুগের ফোনোগ্রাফ বাজছে, গমগমে স্বরে বলে উঠলো, “হ্যাঁ, প্রভু!”

     পাওয়েল ডোনাভানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। “বুঝলে কিছু? মনে পড়ছে? এই কথা-বলা রোবটের প্রথম দলটা যখন  বাজারে নামছে ঠিক তখনই এদের বিরুদ্ধে এমন একটা অপপ্রচার শুরু হয়েছিল যে এক সময় তো মনে হয়েছিল যে পৃথিবীতে বোধহয় রোবটের ব্যবহারটাই নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। নির্মাতারা তাই এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এই  যন্ত্রগুলোর বিশাল শরীরের ভেতর বেশ ভালো করেই দাস মনোবৃত্তি ঢুকিয়ে দিয়েছিল।”

     “তাতেও তো ওদের শেষ পর্যন্ত কোনও লাভ হয়নি,” ডোনাভান বিড়বিড় করে বলে।

     -”না, তা হয়নি, কিন্তু ওরা যথেষ্টই চেষ্টা করেছিলো।” বলে  এবার রোবটটার দিকে ঘুরে আদেশ করলো, “উঠে পড়ো!”

     রোবটটা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো আর ডোনোভান বকের মতো ঘাড় উঠিয়ে সেটা দেখতে দেখতে ঠোঁট সরু করে সিটি দিয়ে উঠলো।

     পাওয়েল জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি ওপরের সারফেসে যেতে পারবে? আলোতে?”

     রোবটটা উত্তর দিতে সময় নিলো। স্লথ মস্তিষ্ক ধীর গতিতে ভাবনা চিন্তা করছিল, সময় নিলো খানিক। তারপর বললো, “হ্যাঁ, প্রভু”।

     “ভালো। তুমি কি এক মাইল কতটা দূরত্ব সেটা জানো?

     আবার খানিকক্ষণ বিবেচনা, তারপর আরেকটা ধীর উত্তর। “হ্যাঁ, প্রভু।

     “আমরা এখন তোমাকে ওপরে নিয়ে যাবো আর ওখানে এক দিকের একটা জায়গা তোমাকে দেখিয়ে দেবো। ওই দিকে তোমাকে মোটামুটি সতেরো মাইলের মতো যেতে হবে। সেখানে পৌছে ঐ এলাকার কোথাও তুমি তোমার চেয়ে আকারে ছোট আরেকটা রোবটের দেখা পাবে। ঠিক আছে। এখনও পর্যন্ত যা বললাম বুঝতে পেরেছ?”

     “হ্যাঁ, প্রভু।”

     “তুমি ওই রোবটটাকে খুঁজে বের করে ওকে এখানে ফিরে আসার আদেশ দেবে। যদি ও ফিরতে না চায়, তাহলে তুমি ওকে  জোর করে ফিরিয়ে আনবে।”

     ডোনাভান বাধা দিয়ে পাওয়েলের হাত টেনে ধরে। “এটাকেই সোজাসুজি সেলেনিয়ামের জন্য পাঠাচ্ছো না কেন?”

     “কারণ আমি স্পিডিকে ফিরিয়ে আনতে চাই, ব্যাস্। আমাকে জানতেই হবে ওটার হয়েছেটা কি।” তারপর আবার রোবটটাকে বলে, “ঠিক আছে, তুমি এবার আমার সঙ্গে এসো।”

     রোবটটা কিন্তু ওর জায়গা থেকে একটুও নড়লো না, শুধু একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ করে বলে উঠলো, “প্রভু, ক্ষমা করবেন, এভাবে আমি পারবো না। প্রথমে আপনাকে কাঁধে চাপতে হবে।”  ওর মোটাসোটা দুটো হাতের ভোঁতা আঙুলগুলো পরষ্পরের সঙ্গে জড়ো করাতে ঠক্ করে একটা আওয়াজ হল।

     পাওয়েল সেই দিকে তাকিয়ে গোঁফের প্রান্ত মোঁচড়াতে শুরু করলো। “ওঃ… হো!”

     ডোনাভানের চোখ বড় বড় করে দেখছিল। বললো, “আমাদের ওর কাঁধে চাপতে হবে? ঘোড়ায় চড়ার মত?”

     “আমার মনে হয় এটাই উপায়। যদিও কেন তা  আমি জানি না। আমি তো – হ্যাঁ, মনে পড়েছে এবার। তোমাকে একটু আগে বলছিলাম না, যে ঐ সময়ে রোবট-নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক হাঙ্গামা চলেছিলো। মনে হয় রোবটেরা নিরাপদ এই ধারণা প্রচার করতে চেয়েছি তখন রোবটদের নিজস্ব চলাফেরা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাই মনে হয় এদের বানানো হয়েছিলো এমন ভাবে যাতে এরা কখোনই মাহুত ছাড়া চলাফেরা করতে না পারে। কিন্তু এবার তবে আমাদের কি করণীয়?”

     “আমিও তাই ভাবছি,” যেন স্বগোতক্তি করে ডোনাভান। “একদিকে আমরা রোবট ছাড়া বা রোবট নিয়ে – কোন ভাবেই উপরে অতটা সময় ধরে ঘুরতে পারবো না। আরেক দিকে, ওহ, জয় গুরু! -” বলতে বলতে ও চটাস্ চটাগ্ শব্দ করে দু আঙ্গুলে চুটকি মারে। ওর মুখে চোখে উত্তেজনা ফুটে বেরোয়। “তোমার পকেটে যে মানচিত্রটা রাখলে ওটা আমাকে একবার দাওতো। আমি দু ঘণ্টা ধরে ওটা নিয়ে এমনি এমনি বসে থাকিনি। এই দ্যাখো, আমাদের এই স্টেশনটা তো আসলে একটা খনি। তাই এর সুড়ঙ্গ গুলো ব্যবহার করতে তো আমাদের কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়?”

     হলদেটে হয়ে যাওয়া পার্লামেন্টের উপর বানানো মানচিত্রটাতে একটা কালো বৃত্ত দিয়ে খনিজ কেন্দ্রটাকে দেখানো রয়েছে, আর ওটাকে ঘিরে রয়েছে একগাদা সরু সরু বিন্দু-রেখা। যেগুলো দিয়ে দেখানো সুড়ঙ্গগুলো মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে গিয়েছে এই স্টেশনের চারদিকে।

     মানচিত্রের নিচে দেওয়া প্রতীকের তালিকাটা সময় নিয়ে দেখে ডোনাভান। তারপর বলে, “এই দেখো, এই ছোট কালো বিন্দুগুলো হচ্ছে সুড়ঙ্গের বাইরের দিকের খোলা মুখ, আর এই যে বিন্দুটা দেখছো এটা ঐ সেলেনিয়াম ঢিপি থেকে বড়জোর মাইল তিনেক দূর হবে। এখানে দেখো একটা নাম্বার-ও দেওয়া আছে – আরেকটু বড় করে লিখলে ভালো হতো – এই যে দেখো – ১৩এ। রোবটগুলো যদি এর আশেপাশের রাস্তাগুলো চিনতে পারে -”

     পাওয়েল সঙ্গে সঙ্গে রোবটটার থেকে জানতে চায় যে চিনতে পারবে কিনা। আবেগহীন ঘড়ঘড়ে আওয়াজে উত্তর আসে, “হ্যাঁ, প্রভু।”

     “তোমার ইনসোস্যুটটা এবার পড়ে নাও,” পাওয়েলকে এখন কিছুটা নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছে।

     ওদের দুজনেই এই প্রথম বারের জন্য ইনসোস্যুট পরছিল। গতকাল এখানে পৌঁছে যে কবার পরতে হবে বলে হিসেব করেছিলো এবারেরটা সেই হিসেবের বাইরে বাড়তি একটা ব্যাপার। আর পরার পরে হাত-পা নাড়াতে গিয়ে দুজনেই টের পেলো যে ইনসোস্যুটগুলো পরে থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাড়াচাড়া করে খুব সহজ কাজ হবে না।

     এই ইনসোস্যুট গুলো সাধারণ আবশ্যিক স্পেসস্যুটের থেকে যেমন অনেক জবরজং আর কদাকার; তেমনি পুরোপুরি অধাতব জিনিস দিয়ে বানানো বলে বেশ হালকাও। তাপ-প্রতিরোধী প্লাস্টিক আর রাসায়নিক মেশানো শোলার স্তর দিয়ে এগুলো বানানো, এছাড়াও এর ভেতরে রয়েছে একটা আর্দ্রতা-হীন শুকনো বাতাসের স্তর। যার জন্যে, এটা পরে নিলে পূর্ণ শক্তির সূর্যের তাপের প্রকোপ থেকে অন্তত কুড়ি মিনিটের জন্য এই বুধের বুকে বেঁচে থাকতে পারা যাবে। বাস্তবে এই ইনসোস্যুট, এটা পড়ে থাকা অবস্থায় আরো অন্তত পাঁচ থেকে দশ মিনিট বেশি বাঁচানোর ক্ষমতা রাখে।

     রোবটটা ইনসোস্যুট পড়া কিম্ভূতকিমাকার পাওয়েলকে দেখেও বিন্দুমাত্র আশ্চর্য হল না, বরং দুহাত দিয়ে রেকাবের মতো করে পাওয়েলকে কাঁধের উপর বসিয়ে নিলো।

     পাওয়েলের রেডিয়ো-মন্দ্রিত কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল: “তুমি কি আমাদের এক্সিট নাম্বার ১৩এ-তে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি?”

     “হ্যাঁ, প্রভু।”

     যাক, পাওয়েল একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয় যে এই রোবটগুলোর ভেতরে বেতার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলেও অন্তত বেতার সংকেত ধরার ব্যবস্থা রয়েছে। ও ডোনাভানকে বলে, “মাইক, তুমিও যে কোন একটার পিঠে উঠে পড়ো।”

     ডোনাভান একই ভাবে আরেক রোবটের দু হাতের আঙুল দিয়ে বানানো রেকাবের উপর পা রেখে এক লাফে কাঁধে উঠে পড়ে। উঠে দেখে বসবার জায়গাটা যথেষ্ট আরামদায়ক; পিঠের দিকে কুঁজের মতো যে জিনিসটা রয়েছে সেটা নিশ্চিত ভাবে বসার জন্যেই বানানো হয়েছে, এছাড়াও দুটো কাঁধের উপরে রয়েছে একটা করে খাঁজ কাটা অংশ, যেখানে ওর থাই দুটো এখন সুন্দর ভাবে রাখবার জায়গা পেয়ে গেল। একটু আগে রোবটের মাথাটার দুদিকে যে দুটো লম্বাটে গড়নের বড় বড় “কান” দেখে অবাক হয়েছিল – এখন বসে পড়ার পর সে গুলোর প্রয়োজনীয়তাটাও ভালো ভাবেই টের পেয়ে গেলো।

     পাওয়েল সেই কান দুটো পাকড়ে ধরে রোবটের মাথাটা খানিক ঘুরিয়ে দেয়। তার বাহনটা অমনি যান্ত্রিক ভঙ্গিতে দিক পরিবর্তন করে। ইয়ার্কি সুরে পাওয়েল বলে, “আগে বঢ়ো, ম্যাকডাফ।” যদিও এই মূহুর্তে ও নিজের ভেতরে লেশমাত্র কোনও মজার অনুভূতি খুঁজে পায় না।

     দৈত্যাকার রোবট দুটো এবার ধীরে ধীরে কিন্তু যান্ত্রিক নিখুঁততার সঙ্গে চলতে শুরু করেছে। প্রথম দরজা পার করার সময় ওরা প্রথম সমস্যার মুখোমুখি হল। রোবট গুলো এতটাই লম্বা যে ওদের মাথা আর কড়িকাঠের মধ্যে বড়জোর একফুটের মতো ফাঁকা জায়গা, তাড়াতাড়ি করে  মাথা ঝুঁকিয়ে ওরা নিজেদের মাথা বাঁচায়। দরজা পেরিয়ে এবার একটা সংকীর্ণ করিডোর বরাবর চলা। রোবট দুটোর ভারী পায়ের আস্তে ধীরে চলার ধুপ-ধাপ আওয়াজ খানিকক্ষণ একঘেয়ে ভাবে গমগম করে উঠতে থাকলো পুরো করিডোর বরাবর যতক্ষণ না ওরা সুড়ঙ্গের বায়ু-নিরোধী অংশটায় পৌঁছোলো।

     এখন ওদের সামনে পড়ে আছে বিস্তৃত একটা লম্বা, বায়ুহীন সুড়ঙ্গ যেটা বহুদূরে গিয়ে একটা বিন্দুতে মিশে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে পাওয়েল অনুভব করতে পারে কি বিশাল পরিমাণ কাজ  প্রথম অভিযানের সময় এই  শূন্য তাপদগ্ধ  বুধের বুকে করা হয়েছিল। তাও করা হয়েছিল এই রকম আধ-খ্যাচরা রোবটদের নিয়ে। তারা ব্যর্থ হয়তো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের সেই ব্যর্থতাই, গোটা ব্যাবস্থার আজকের যে উন্নতি, তার ভিত্তি এবং সোপান তৈরি করে দিয়েছে।

     রোবট দুটো এখনও একই অপরিবর্তিত গতি আর মাপা সমান পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে।

     পাওয়েল বলে ওঠে, “খেয়াল করেছো কি যে এই সুড়ঙ্গগুলো মধ্যে আলো যেমন জ্বলছে তেমনি এখানকার তাপমাত্রাও একদম পৃথিবীর মতো। সম্ভবত গত দশ বছর ধরেই এই খালি জায়গাটাকে এভাবেই রাখা আছে।”

     “কি ভাবে?”

     “সস্তার শক্তি দিয়ে। সৌরজগতের মধ্যে সবচেয়ে সস্তার অফুরন্ত শক্তি হচ্ছে সৌর শক্তি। আর বুধের এই দিকটাতে সৌর শক্তির যে অঢেল সরবরাহ কেমন তা তো তুমি ভালোই জানো। এই জন্যই তো এই স্টেশনটা কোনো পাহাড়ের আড়ালে না বানিয়ে খোলা আকাশে বানানো হয়েছিল। এখানে আছে একটা বিশাল এনার্জি কনভার্টার। তাপ থেকে বিদ্যুৎ, তাই দিয়ে আলো, যান্ত্রিক কাজকর্ম আর যা যা দরকার, সব, সব কিছু; আর সেই অফুরন্ত শক্তি সরবরাহ দিয়েই এই স্টেশনটাকে ঠান্ডা রাখা হয়েছে।”

     “ঠিক আছে,” ডোনাভান বাধা দেয়। বলে, “এসব  পুঁথিগত ব্যাপার ছেড়ে আসল কথাতে আসবে কি? তুমি যে অফুরান শক্তি আর তার  রূপান্তরের কথা  বলছ সেই মোদ্দা ব্যাপারটা হচ্ছে যে সেটা পুরোপুরি আলোককোষস্তুপের উপর নির্ভরশীল – আর সেটাই এই মুহূর্তে আমার ব্যাথার জায়গা।”

     পাওয়েল অস্ফুটে কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে ডোনাভান যখন আবার বলতে শুরু করল, দেখা গেল আলোচনার বিষয় এবার পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। “শোনো, গ্রেগ। এ সব যাই হোক, আসল কথা হল স্পিডির হয়েছেটা কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

     ইনসোস্যুট পড়ে থাকা অবস্থায় কাঁধ ঝাঁকানো সহজ নয়, কিন্তু পাওয়েল অভ্যাসের বসে তবুও চেষ্টা করলো। “আমি জানি না, মাইক। তুমি এটাতো ভালোই জানো যে ওকে বুধের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই করেই বানানো হয়েছে। বুধের তাপমাত্রা ওর কাছে নস্যি আর ওকে বানানোই হয়েছে এই কম মাধ্যাকর্ষণ আর এই এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে জমিতে চলাফেরা করার উপযোগী করেই। বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়েও ও নির্ভুল – অন্তত, সেরকমই ওর হওয়া উচিত।”

     দুজনেই এরপর চুপ করে গেলো। অনেকক্ষন কেউ আর কোনও কথা বললো না। এই নিস্তদ্ধতা বজায় রইলো অনেকক্ষণ।

     একসময় নীরবতা ভেঙ্গে রোবটটা বলে উঠলো, “প্রভু, আমরা পৌঁছে গিয়েছি।”

     “অ্যা?” পাওয়েল যেন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে। “ঠিক আছে, আমাদের এখান থেকে বের করো – ওপরের জমিতে নিয়ে চলো।”

     ওরা এখন যেখানে পৌঁছেছে সেটা এই সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তের একটা সাব-স্টেশন, একটা ছোট জায়গা, একদম খালি, বায়ু শূন্য, খানিকটা যেন ভাঙ্গাচোরা অবস্থা জায়গাটার। ডোনাভান পকেট থেকে একটা ফ্লাস-লাইট বের করে তার আলোয় চারদিকে নজর করে, উপরের দিকে একটা ভেঙ্গে পড়া জায়গার দিকে আলো ফেলে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে কিছুক্ষণ।

     “উল্কাপাত মনে হচ্ছে!, তোমার কি মনে হয়?” ডোনাভান জিজ্ঞেস করে।

     পাওয়েল কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়, “জাহান্নামে যেতে দাও। এসব এখন ছাড়ো তো, চলো আগে বের হই।”

     বেরিয়েই সামনে একটা কৃষ্ণ বর্ণ ব্যাসাল্ট পাথরের উঁচু পাহাড়। সূর্যের আলো সেখানে বাধা পাওয়াতে এদিকটায় তাদের ঘিরে গভীর রাতের নিবাত নিষ্কম্প অন্ধকার এক ছায়াময় দুনিয়া। আর ঠিক তার ওপাশে, ওদের সামনের অন্ধকার ছায়াঘেরা অংশটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে প্রথমে চকচকে ধারালো ছুরির ফলার ধারের মতো একটা ঝকঝকে দাগ, আর তারপর থেকে শুরু হয়ে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত পাথুরে জমিতে সাদা ফটফটে আলোর এক অসহ্য ঝলকানি, যেন অজস্র স্ফটিক ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে আর তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে সূর্যের আগুনে আলো।

     “ওরেব্বাস!” ডোনাভানের যেন দম আটকে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “এতো দেখছি মনে হচ্ছে বরফের দুনিয়া।” আর ঠিক সত্যিই সেরকম মনে হচ্ছিলো।

     পাওয়েল দুচোখ মেলে তাকিয়ে ছিল সামনের প্রসারিত ঝকঝকে উজ্জ্বল বুধের দিগন্তের  দিকে।

     “এই এলাকাটা কে একটু অস্বাভাবিক লাগছে,” ও  স্বগতোক্তি করে। তারপর বলে, “বুধের সাধারণ অ্যালবেডো ধ্রুবক কিন্তু কম যেহেতু পুরোটাই প্রায় ধূসর পিউমিস পাথর দিয়ে তৈরি। খানিকটা চাঁদের মতই, তুমিও ভালোই জানো। আলোর এতোটা প্রতিফলন হওয়ার কথা তো নয়। তবে দারুণ সুন্দর লাগছে, তাই না?”

     ভিজিপ্লেটের মধ্যে লাগানো আলোক শোধকটাকে ও মনে মনে ধন্যবাদ জানায়। দারুন সুন্দর লাগুক বা না লাগুক, সরাসরি ভিজিপ্লেটের কাঁচের মধ্যে দিয়ে ওরকম সূর্যের আলোর দিকে তাকাতে হলে আধ মিনিটও লাগতো না, তার আগেই ঐ আলোর ঝলক ওদের অন্ধ করে দিতো।

     ডোনাভান ওর কব্জিতে লাগানো স্প্রিং-থার্মোমিটারের দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠলো। “বাপরে বাপ, তাপমাত্রা তো আশি সেন্টিগ্রেড!”

     পাওয়েল ওর নিজেরটা দেখে নিয়ে বলে, “উঁহু-হু, আসলে আরেকটু বেশি। আবহাওয়ার প্রভাবটাও হিসেব করতে হবে, বুঝলে।”

     “আবহাওয়া – বুধে? তুমি কি পাগল হলে?”

     “বুধ কিন্তু পুরোপুরি বায়ুহীন নয়”, অন্যমনস্ক ভাবে পাওয়েল বলে ওঠে। ও তখন ওর ইনসোস্যুটের ভোঁতা ভোঁতা আঙুলগুলো দিয়ে ভিজিপ্লেটের দূরবীক্ষণ যন্ত্রপাতিগুলো ঠিকঠাক করে নিচ্ছিলো। “দেখবে একটা পাতলা বাতাসের চাদর যেন বুধের উপরে সেটে আছে। ঐ এখানকার বিভিন্ন মৌলিক আর যৌগিক পদার্থগুলোর মধ্যে যেগুলো বেশি উদ্বায়ী অথচ বেশি ভারী সেগুলোর বাষ্প বুধের মাধ্যাকর্ষণ কম হওয়া সত্বেও খানিকটা করে টিকে যায়। পুরোটা মহাশূন্যে হারিয়ে যায় না। সেই গুলো দিয়েই এই বাতাসের স্তরটা তৈরি হয়। বেশি থাকে সেলেনিয়াম, আয়োডিন, পারদ, গ্যালিয়াম, পটাশিয়াম,  বিসমাথ– এইগুলোর উদ্বায়ী অক্সাইড। এবার এই বাষ্প যখন এরকম কোনও ছায়া এলাকায় এসে ঘনীভূত হয় তখন পরিবেশে তাপ ছেড়ে দিয়ে পরিবেশের তাপমাত্রা দেয় বাড়িয়ে। পরিবেশ এখানে নিজেই একটা বড়ো পাতন যন্ত্রের মতো কাজ করছে। এখন যদি তুমি তোমার হাতের ফ্ল্যাশটা জ্বালিয়ে ওদিকে ঐ পাহাড় চূড়োর দিকে দেখো তো হয়তো ওটার চূড়োর দিকে সালফার বা পারদের ওস দেখলেও দেখতে পেতে পারো।”

     “এতে কিছু আসে যায় না। আমাদের এই স্যুট গুলো এরকম আশি ডিগ্রিতে আরামসে অনন্তকাল টিকিয়ে রাখতে পারবে।”

     পাওয়েল এর মধ্যে দূরবীক্ষণ যন্ত্রপাতি গুলো ঠিক ঠাক করে নিয়েছিল। ওর চোখের জায়গাটা দেখে ওকে এখন শামুকের মতো লাগছে।

     উদ্বিগ্ন ডোনাভান ওর দিকে  তাকিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করলো, “কিছু দেখতে পেলে?”

     পাওয়েলের দিক থেকে সঙ্গে সঙ্গে কোন উত্তর এলো না। একটু পরে যখন উত্তর এলো তখন ওর গলার স্বরে ওকে বেশ উদ্বিগ্ন আর  চিন্তিত বলে মনে হল। “দিগন্তের কাছে একটা অন্ধকার জায়গা নজরে আসছে যেটা সেলেনিয়ামের ঢিপিটা হতে পারে। কিন্ত স্পিডিকে আমি ধারে কাছে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।”

     আরও ভালো করে দেখার সহজাত প্রবৃত্তিতে খেয়াল না করেই পাওয়েল উঁচু হতে হতে প্রায় ওর বাহন-রোবটটার কাঁধে নড়বড় করতে করতে প্রায় দাঁড়িয়েই পড়লো। পা দুটো ফাঁক করে চোখ কুঁচকে বেশ খানিকক্ষন তাকিয়ে থাকার পর একসময় বলে উঠলো, “আমার মনে হচ্ছে … মনে হচ্ছে …  হ্যাঁ , ঐ তো, ওটাই হবে। ঐ তো এদিকেই আসছে।”

     ও যেদিকটা আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল ডোনাভান সেই দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর কাছে দূরবীন ছিল না, তবুও ঝকঝকে উজ্জ্বল  স্ফটিক প্রান্তরে একটা কালো বিন্দুর নড়াচড়া ওর খালি চোখেও ধরা পড়ে এবার।

     ও চীৎকার করে বলে ওঠে, “আমিও ওটাকে দেখতে পেয়েছি এবার, চলো এগোই!”

     পাওয়েল ততক্ষণে রোবটটার উপর আবার জায়গামতো বসে পড়েছিল। আর বসেই ইনসোস্যুট পরা জাবদা হাতটা দিয়ে দৈত্যাকার বাহনটার বিশাল বুকে একটা থাবড়া মেরে বলে উঠলো, “চলো! এগিয়ে চলো!”

     “হুড়ড়ড়ড় হুড়”, বলে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করে গোড়ালি দিয়ে অশ্বারোহীর কায়দায় ডোনাভান ওর বাহনটাকে ঠোকা মেরে এগিয়ে যেতে ইশারা করে।

     রোবটগুলো চলতে শুরু করে। ওদের পায়ের আওয়াজ এখন আর শোনা যাচ্ছে না, বায়ুহীন আবহাওয়া আর ইনসোস্যুটের অধাতব আবরনটা শব্দ পরিবহনে বাধা দেয়। যদিও শ্রবণ সীমানার ঠিক নিচে একটা ছন্দময় কম্পন অভিঘাত ঠিকই বোঝা যাচ্ছিলো।

     “জলদি চলো”, ডোনাভান তাড়া দেয়। রোবটরা কিন্ত ওদের গতিছন্দ পাল্টায় না।

     -”কোনও লাভ নেই”, গলা চড়িয়ে পাওয়েল ওপাশ থেকে বলে, “এদের গোদা কোমরের জবরজং গীয়ারগুলো একটাই মাত্র গতিতে ওদের চালাতে পারে। তুমি কি ভাবছো এদের মধ্যেও গীয়ার পাল্টানোর ব্যবস্থা আছে?”

     ততক্ষণে ওরা ছায়া ঢাকা অংশটার বাইরে এসে পড়েছে, আর আসতেই সূর্যের আলো ফুটন্ত গরম জলের সাদাটে বৃষ্টিধারার মতো নেমে এসে যেন ওদের ভাসিয়ে দিলো। প্রতিবর্তী-ক্রিয়ায় সঙ্গে সঙ্গে ডোনাভান ওর ঘাড়-মাথা নীচু করে নিজেকে যেন লুকোতে চায়। বলে,” ওরেব্বাস! সত্যি সত্যি এতো গরম না কি আমার মনের ভয়?”

     “সবে তো শুরু, এরপর আরও গরম লাগবে”, ভয় ধরানো জবাব আসে, “ওসব ছেড়ে বরং নজর চালিয়ে স্পিডিকে দেখো।”

     রোবট এস.পি.ডি.-১৩ এখন যেখানে রয়েছে তাতে ওকে এখান থেকে অনেকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দূরে, বুধের এই পাথুরে জমিতে, ও ওর নিজস্ব গতিতে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। আর সেই একই ছন্দে আলো ওর সুগঠিত ধাতব শরীর থেকে প্রতিফলিত হয়ে যেন ঝিলিক মেরে ওদের চোখে এসে পড়ছে।

     নামটা যদিও  দেওয়া হয়েছিল ওর ক্রমিক সংখ্যার ভিত্তিতে, তাহলেও ও সার্থকনামা, ইউএস রোবোট মেকানিক্যাল মেন কর্পোরেশনের তৈরি এস.পি.ডি মডেলের রোবটদের মধ্যে ও-ই হচ্ছে দ্রুততম।

     -”অ্যায়, স্পিডি”, পাগলের মতো হাত নাড়াতে নাড়াতে ডোনাভান চীৎকার করে।

     -”স্পিডি-ইইই!” পাওয়েল চীৎকার করে হাঁক পাড়ে, “এদিকে এসো।”

     মানুষ আর পাগলা-রোবটের মধ্যেকার দূরত্ব প্রতি মূহুর্তে কমে আসতে থাকে – ডোনাভান আর পাওয়েলের পঞ্চাশ বছর আগের প্রজন্মের বাহন-রোবট দুটোর শম্বুক গতির তুলনায় দূরত্ব কমানোতে স্পিডির দ্রুততার অবদানই বেশি অবশ্যই ছিল।

     দূরত্ব কমে আরেকটু কাছাকাছি হতেই ওরা স্পিডির চলনে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করে – কেমন যেন টলমল করে ঘুরপাক খেতে খেতে একবার এপাশে একবার ওপাশে কেতরে  গিয়ে চলছে। আর তারপরেই, ঠিক যে মূহুর্তে পাওয়েল হাত নাড়াতে নাড়াতে আরেকবার ডাকবার জন্যে  বেতার-প্রেরকটার মধ্যে হাকাড় মারতে যাবে, ঠিক তখনই স্পিডি সামনের দিকে  তাকাল আর ওদের দেখতে পেয়ে গেল।

     ওদের দেখেই স্পিডি যেন এক পলকের জন্য থেমে গিয়ে স্থির হল আর তারপরেই একটা পলকা খড়কুটো যেমন হালকা হাওয়ায় দুলতে থাকে, ঠিক তেমনি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকলো।

     পাওয়েল গলা উঁচিয়ে হাঁক দেয়, “স্পিডি, সব ঠিক আছে তো? এদিকে এবার চলে আসো, দোস্ত।”

     স্পিডি’র রোবট কণ্ঠস্বর পাওয়েলের শ্রবণ যন্ত্রে এরপরেই প্রথমবারের মত বেজে ওঠে। ওটা বলে চলে, “বোম্বা! , চলো খেলি। আমায় ধরো তুমি আর তোমায় ধরি আমি; কোথায় তেমন প্রেম আছে গো, অস্ত্র মোদের ভ্রষ্ট যাতেআমি যে ছোট্ট ঝুমকো লতা, ছোট্ট মধুর ঝুমকো লতাহুপুস!” বলেই গোড়ালির উপর ভর দিয়ে ঘুরে গেল আর যে দিক থেকে আসছিলো সেদিকেই আবার ছুট মারলো। সে ছোটার গতি আর উন্মত্ততায় বুধের জমির পোড়া পিউমিসের ধুলোর স্তর ছিটকে গেলো চারদিকে।

     আর দূরে মিলিয়ে যেতে যেতে ওর শেষ কথা বেতারে ভেসে আসে, “সেথায় ফোটে ছোট্ট সে ফুল, বুড়ো ওক গাছের তলে…”, আর তারপরেই একটা অস্বাভাবিক ধাতব টিং শব্দ।      যেটাকে রোবটদের হেঁচকি বলা যেতেই পারে।

     ডোনাভান কেমন যেন শুকিয়ে যাওয়া গলায় বলে, “ও কোথা থেকে গিলবার্ট আর সুলিভান কে যোগাড় করলো? হ্যাঁ… গ্রেগ, ইয়ে… ও মাতাল বা ঐরকম কিছু হয়ে যায় নি তো?”

     -“তুমি না বলে দিলে”, পাওয়েল তেতো মুখে উত্তর দেয়, “আমি তো বুঝতেই পারতাম না। এখন চলো আমরা পাহাড়ের আড়ালে ফিরে যাই। আমি তো প্রায় ঝলসেই গিয়েছি।”

     অনেকক্ষণ পর শেষমেশ পাওয়েলই আবার নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বলে উঠলো, “প্রথম কথা, স্পিডি মাতাল নয় – অন্তত মানুষ মাতালের হিসেবে – কারন ও হচ্ছে রোবট, আর রোবট কখনো মাতাল হয় না। তবে এটাও ঠিক যে ওর কিছু একটা গড়বড় তো হয়েছেই। সেটাকে তুমি রোবটের মাতলামি বলতেই পারো।”

     “আমার তো মনে হচ্ছে ও পুরো মাতাল হয়ে গিয়েছে,” ডোনোভান জোর দিয়ে বলে, “আর আমার এটাও মনে হচ্ছে যে ও ভাবছে আমরা  এখানে ওর সঙ্গে খেলতে এসেছি। যা সত্যি নয়।  এ আমাদের জীবন মরনের সমস্যা। ভয়াবহ মৃত্যুর মুখোমুখি আমরা।”

     “ঠিক আছে। আমাকে তাড়া দিও না। চুপচাপ শুনে যাও। একটা রোবট সবসময় শুধুই একটা রোবট, ঠিক আছে। একবার যদি আমরা জানতে পারি ওটার ঠিক কি সমস্যা হয়েছে, আমরা সেটা ঠিকঠাক করে নিতে অবশ্যই পারবো আর তারপর… ব্যাস।”

     “হ্যা, যদি একবার,” ডোনাভান বিরস মুখে বলে।

     পাওয়েল ওকে পাত্তা দেয় না। বলে, “বুধের সাধারণ আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই করেই স্পিডিকে তৈরি করা হয়েছে।  কিন্তু এই এলাকাটা,” দু হাত ছড়িয়ে দেখায় চারদিকটা, “কেমন যেন অস্বাভাবিক। এখানেই আমাদের সমাধান সূত্র আছে। যেমন ধরো, এই স্ফটিকগুলো কোথা থেকে এলো? নিশ্চয়ই কোনো না কোনো তরল পদার্থ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে এগুলো তৈরি করেছে; কিন্তু এমন কোন সে উষ্ণ তরল আছে যা বুধের এই তাপমাত্রাতেও ঠান্ডা হবে?”

     “আগ্নেয়গিরিগুলোর কান্ড হবে”, ডোনাভানের তৎক্ষণাৎ সমাধান, আর তা শুনেই পাওয়েলের শরীর টানটান হয়ে গেল, “দুধের বাচ্চাদের মতো কথা।”

     ছোট্ট অথচ ব্যাঙ্গাত্মক সুরে ও উত্তর দিয়েই চুপ করে গেলো।

     পাঁচ মিনিট চুপচাপ বসে থাকার পর বলে উঠলো, “আচ্ছা, মাইক, স্পিডিকে সেলেনিয়াম আনতে পাঠানোর সময় তুমি ওকে ঠিক কী বলেছিলে?”

     ডোনাভান অবাক হয়ে গেল। “ধ্যাৎতেরিকা, আমার পুরো মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে যে নিয়ে আসতে বলেছিলাম। “

     “হ্যাঁ, সে তো বুঝলাম, কিন্তু ঠিক কী কী বলেছিলে? ঠিক সেই সেই কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করো।”

     “আমি বলেছি… ইয়ে, মানে… আমি বলেছিলাম, স্পিডি, আমাদের কিছু সেলেনিয়াম লাগবে। তুমি ওটা এই এই জায়গায় পেয়ে যাবে। যাও গিয়ে নিয়ে এসো – ব্যাস। আর কী বলার দরকার ছিল বলে মনে করো?”

     “তুমি আলাদা করে সেলেনিয়াম আনার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব যোগ করোনি তোমার আদেশে, তাই তো?”

     “কিসের জন্য? এটা তো একটা সাধারন ব্যাপার।”

     পাওয়েল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। “যাক গে, তাতে এখন আর কিছুই আসবে যাবে না – তবে আমরা কিন্তু  একটা ভালো ঝামেলাতেই ফেঁসেছি।” ইতিমধ্যে ও ওর রোবটটা থেকে নেমে পাহাড়ের ঢালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়েছিল। ডোনাভানও এবার ওর পাশে গিয়ে বসে পড়ে। একটু দূরেই জ্বলন্ত সূর্যের প্রখর আলো বিড়াল যেমন ইঁদুর ধরার জন্যে চুপটি করে অপেক্ষা করে তেমনি অপেক্ষা করতে থাকে ওদের গিলে খাওয়ার জন্যে। আর ওদের ঠিক পাশেই, দৈত্যাকার রোবট দুটো সামনের পাহাড়ের অন্ধকার ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, ওদের ফোটো-ইলেকট্রিক ঢ্যাবঢ্যাবে লালচে চোখের নিষ্পলক, উদাস আর নির্বিকার দৃষ্টিটুকু ছাড়া ওদের বাকি শরীর অন্ধকার ছায়ায় যেন প্রায় অদৃশ্য।

     ওরা উদ্বেগহীন! বুধের এই ভয়াল বিষাক্ত পরিবেশে একটা ছোট্ট ভুল যে কতো বড়ো দূর্ভাগ্য ডেকে এনেছে মানুষ গুলোর জন্যে সেটা ওরা জানে না।

     “এখন, দ্যাখো, রোবটিক্সের প্রাথমিক তিনটে নিয়ম থেকে যদি শুরু করা যায়,” বেতারে ভেসে আসা পাওয়েলের গলার স্বরের উত্তেজনা টুকু ডোনোভান ভালোই বুঝতে পারে, “– সেই নিয়ম তিনটে, যেগুলোকে একটা রোবটের পজিট্রনিক মস্তিষ্কের মর্মের একদম গভীরে বসানো হবেই হবে – “, ও ওর গ্লাভস পরা আঙুল দিয়ে অন্ধকারে দাগ কেটে কেটে বলতে থাকে-

     “আমরা যেটা জানি : এক – একটা রোবট কখনো মানুষের ক্ষতি করবে না, অথবা ক্ষতি হতে পারে এমন অবস্থায়  কখনই  নিষ্ক্রিয় থাকবে না।”

     “ঠিক!”

     “দুই”, পাওয়েল বলে চলে, “একটা রোবটকে অবশ্যই মানুষের দেওয়া আদেশ মেনে চলতে হবে, যতক্ষণ না সেই আদেশ প্রথম সূত্রের বিরোধিতা করবে।”

     “একদম ঠিক।”

     “আর তিন – একটা রোবট ততক্ষণই তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করবে যতক্ষণ না তা প্রথম বা দ্বিতীয় সূত্রের বিরোধিতা করছে।”

     “এটাও ঠিক! তো এর মধ্যে আমরা এখন কোথায়?”

     “ঠিক এগুলোর ব্যাখ্যার ভেতরে। তিনটে সূত্রের নিজেদের মধ্যে যখন কোন সংঘাত তৈরি হয় তখন তার ফয়সালা হয় পজিট্রনিক মস্তিষ্কের ভিতরে বিভিন্ন সম্ভাবনার ঝাড়াই-বাছাই করে শ্রেষ্ঠতমের নির্বাচন করে। ধরো, একটা রোবট তোমার আদেশ পালন করতে গিয়ে বিপদের মুখোমুখি হল। তখন তৃতীয় সূত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওকে পিছিয়ে আসতে বলবে। এবার মনে করো, তুমি, বিপদ এলে বিপদের মুখোমুখি হতেই আদেশ করেছিলে, তো সেক্ষেত্রে তৃতীয় সূত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিলো এবার দ্বিতীয় সূত্র তার চেয়ে জোরালো একটা বিরুদ্ধ সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, যার তীব্রতার ফলে রোবট তার অস্তিত্বের ঝুঁকি নিয়েও তোমার আদেশ পালন করতে বিপদের মুখোমুখি হবে।”

     “ঠিক আছে, এসব আমি জানি। এবার কী?”

     “এবার স্পিডির কথা ধরো। স্পিডি সবচেয়ে আধুনিক সংস্করণের রোবটদের মধ্যে একটা, চূড়ান্ত স্তরের বিশেষজ্ঞ ধরনের, আর একটা যুদ্ধজাহাজের মতোই দামী। সহজে তো এটাকে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না।”

     “তাতে কী?”

     “তাই, তৃতীয় সূত্রের তীব্রতা এদের মধ্যে জোরালো করে দেওয়া হয়েছে – তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই যে এসপিডি সংস্করণ বেরোবার আগেই এটা বিশেষ ভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তো তার ফলে, বিপদের মুখোমুখি হলেই এদের মধ্যে অস্বাভাবিক জোরালো একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এদিকে তুমি যখন ওকে সেলেনিয়াম আনতে পাঠানোর সময় খুব সাধারণ ভাবে শুধু নিয়ে আসবার জন্যে আদেশ দিলে, আলাদা করে ওটা নিয়ে আসার ব্যাপারে কোনও বিশেষ গুরুত্ব না দিয়েই, তার ফলে কোনও বিপদ দেখার পর তৃতীয় সূত্রের তীব্রতার তুলনায় দ্বিতীয় সূত্র খুব দূর্বল একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো। এবার, দাঁড়াও একটু, আমি শুধুমাত্র ঘটনাগুলো বলছি। “

     “ঠিক আছে, বলে যাও। আমি মনে হয় ধরতে পেরে গিয়েছি।”

     “তুমি তো এটা কি ভাবে কাজ করে তা জানই, তাই না? সেলেনিয়ামের ঢিপিটার ওখানে ওর জন্যে কোনও একটা বিপদজনক ব্যাপার আছে। এটা যতো ও ঢিপিটার কাছাকাছি পৌঁছেছে তত বেড়ে গিয়েছে, তারপর একটা বিশেষ দূরত্বে ওর মধ্যে তৃতীয় সূত্র থেকে তৈরি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া, যেটা অস্বাভাবিক ভাবে বাড়িয়ে রাখা ছিল, সেটা সেই মূহুর্তে দ্বিতীয় সূত্র থেকে তৈরি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া, যেটা তুলনায় কম ছিল, একদম ঠিক ঠাক ভাবে একটা বিন্দুতে সমান সমান হয়ে যায়।”

     ডোনাভান উত্তেজনায় প্রায় দাঁড়িয়ে পড়ে, “আর একটা ভারসাম্য তৈরি করে ফেলে। ঠিক ধরেছি, ঐ অবস্থায় তৃতীয় সূত্র ওকে পিছিয়ে যেতে বলে আর দ্বিতীয় সূত্র ওকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় – “

     “তাই ও সেলেনিয়াম ঢিপির চারপাশে ঐ দুই সূত্রের আলাদা আলাদা তীব্রতার বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সম্ভাব্য ভারসাম্যের সবকটা অবস্থান ধরে একটা চক্রাকার পথ অনুসরণ করে চলতে থাকে। আর এখন, যদি বাইরে থেকে আমরা এই ব্যাপারে কিছু না করতে পারি, ও চিরকাল ওই বৃত্তাকার পথে চলতে থাকবে, আর আমরা ওর গোলচক্করে ঘুরপাক দেখতেই থাকবো।” তারপর, আরেকটু চিন্তা করে আবার বলে, “আর এই জন্যই, মনে হচ্ছে, তোমার ওকে মাতালের মতো লাগলো। ঐ সব সম্ভাব্য ভারসাম্য বিন্দুতে, দুটো সূত্রের বিভিন্ন তীব্রতার টানাটানিতে ওর পজিট্রনিক মস্তিষ্কের অর্ধেক ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল হয়ে গিয়েছে। আমি রোবট বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু এটাই হয়েছে বলে স্পষ্ট মনে হচ্ছে। সম্ভবত ও ওর মাথার সেই সব স্বতঃস্ফূর্ত কলকব্জাগুলোর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে যেগুলো মানুষ-মাতালেরা হারিয়ে থাকে। বাঃ, খুউউউব সুন্দর।”

     “তো আর ঝামেলা কিসের? আমরা যদি ওর সমস্যাটা ধরতে পেরে থাকি?”

     “তুমিই তো ধরলে। আগ্নেয়গিরির কান্ড! সেলেনিয়াম ঢিপির ঠিক ওখানেই কোথাও বুধের ভেতর থেকে নানারকম গ্যাস চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে। সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড  আর কার্বন মনো অক্সাইড। আর তা আসছে প্রচুর পরিমাণে এবং এই রকম ভয়ংকর তাপমাত্রায়।”

     ডোনাভান ঢোক গেলার মতো একটা আওয়াজ করে বলে, “কার্বন মনো অক্সাইড আর লোহার বিক্রিয়ায় তৈরি হয় উদ্বায়ী আয়রন কার্বোনিল।”

     পাওয়েল যোগ করে, “আর, একটা রোবট মূলতঃ লোহা।” তারপর বিষন্ন ভাবে বলে, “এখানে অনুমান করার মতো আর কিছু বাকি নেই। জলের মতো পরিষ্কার ব্যাপার। সমাধান বাদে সমস্যার ব্যাপারে আমরা সব কিছু জেনে ফেলেছি। আমরা নিজেরা গিয়ে সেলেনিয়াম আনতে পারবো না। সেটা অনেক দূরের ব্যাপার। এদিকে আমরা এই রোবট বাহনগুলোকেও পাঠাতে  পারব না, কারণ এরা নিজেরা একা চলতে পারবে না। আবার আমাদের বয়ে নিয়ে গেলেও মুশকিল। ততটা তাড়াতাড়ি এরা চলতেও পারে না, যতটা হলে ভাজা ভাজা হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের ফিরিয়ে আনতে পারবে। কোনও ভাবে যদি পৌঁছেও যাই, আমরা স্পিডিকে ধরতেও পারবো না, কেননা ও ব্যাটা ভাবছে আমরা খেলা করতে চাইছি, তাই ওর দিকে আমরা চার মাইল যাওয়ার আগেই ও দৌড়ে ষাট মাইল দূরে চলে যাবে।”

     “আমাদের মধ্যে কোনো একজন যদি যাই”, ডোনাভান অনিশ্চিত ভাবে শুরু করে, “আর গিয়ে ভাজা ভাজা হয়েও সেলেনিয়াম নিয়ে আসি, তো সেক্ষেত্রে একজন অন্তত বেঁচে যাবে।”

     “হ্যাঁ, অবশ্যই”, ব্যাঙ্গাত্মক উত্তর দেয় পাওয়েল, “তবে সেটা একটা ফালতু ত্যাগস্বীকার করাই শুধু হবে! কেননা সেই লোকটা ঐ ঢিপি পর্যন্ত যাওয়ার আগেই আর কোনও আদেশ  দেওয়ার অবস্থায় থাকবে না, আর আমার মনে হয় না যে এই রোবটগুলোকে ফেরত আসার আদেশ না দিলে ওরা কখোনো ঘুরে এই পাহাড়ের এদিকে ফিরে আসবে। ভেবে দ্যাখো, আমরা ঐ ঢিপি থেকে দু বা তিন মাইল দূরে আছি – ধরা যাক দু মাইল – এখন রোবট গুলো চলে চার মাইল প্রতি ঘণ্টা; আর আমরা এই ইনসোস্যুটে কুড়ি মিনিটের মতো টিকে থাকবো। মনে রেখো শুধু আগুনে গরমই কিন্তু নয়। ওপর থেকে বিষাক্ত অতিবেগুনী আর নীচের দিক থেকে সৌর বিকিরণও কিন্তু থাকবে।”

     ”হুমম…”, ডোনাভান চিন্তিত হয়, “দশ মিনিটের খামতি হচ্ছে।”

     ”ওটাই তখন অনন্তকাল বলে মনে হবে। আর আরেকটা ব্যাপার, তৃতীয় সূত্রের সম্ভাব্য যে অতিরিক্ত তীব্রতা স্পিডিকে ওখানে আটকেছে সেটার জন্যে অবশ্যই ওই জায়গার পরিবেশে ধাতব-বাষ্পের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ কার্বন মনোক্সাইড থাকবেই – আর সেটা থাকা মানেই তার ক্ষয়কারী ক্ষমতাও সেখানে যথেষ্ট পরিমাণে থাকবে। আর ও ওখানে আছে, ধরো, গত বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরেই – তো আমরা কি ভাবে জানবো যে আর কতক্ষণে – এই ধরো, ওর হাঁটুর জোড় ওর শরীরের কাঠামো থেকে খুলে গিয়ে ওকে চিৎপটাং করে ফেলবে। এখন আর এটা শুধু আলোচনার বিষয় নয় – আমাদের খুব তাড়াতাড়িই ভাবনা চিন্তা গুলো সেরে একটা সমাধানে আসতে হবে।”

     পাওয়েল চুপ করে। গভীর, গহন, সর্বব্যাপী, হতাশাজনক এক নীরবতা ছড়িয়ে পরে ওদের মধ্যে।

     শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভাঙ্গে ডোনাভান, আবেগ চেপে কথা বলার চেষ্টায় ওর গলা একটু কেঁপে ওঠে। বলে, “যদি দ্বিতীয় সূত্রের তীব্রতার সম্ভাব্যতা জোড়ালো করতে আমরা নতুন আদেশ দিতে না পারি, তো উল্টো কাজ করে দেখলে কেমন হয়? যদি বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তো তৃতীয় সূত্রের তীব্রতার সম্ভাব্যতা বেড়ে গিয়ে ও পিছিয়ে আমাদের কাছে আসতে বাধ্য হবে।”

     কোনও প্রশ্ন না করে পাওয়েল ওর দিকে ভিসিপ্লেট ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইল।

     “ভেবে দ্যাখো,” ডোনাভান ধীরে সুস্থে ব্যাখ্যা করে, “ওটাকে ওর চক্রাকার পথ থেকে সরিয়ে এদিকে আনার জন্য ওপাশের দিকে বিপদের মাত্রা আমাদের বাড়াতে হবে। সেটার সবচেয়ে সহজ উপায় ওদিকে কার্বন মনোক্সাইডের ঘনত্ব বাড়ানো। আর হ্যা, তোমার মনে থাকা উচিত যে আমাদের স্টেশনে রয়েছে একটা সম্পূর্ন অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবরেটারী।”

     “স্বাভাবিক, থাকারই কথা,” মেনে নিয়ে পাওয়েল বলে, “এটা একটা খনিজ কেন্দ্র।”

     ”সেটাই তো কথা। তাই এখানে অবশ্যই ক্যালসিয়াম অধঃক্ষেপণের জন্য পাউন্ড পাউন্ড অক্সালিক অ্যাসিড থাকবে।”

     ”জয় গুরু! মাইক, তুমি তো জিনিয়াস হে।”

     ”ঐ আর কী”, বিনয়ের সঙ্গে ডোনাভান মেনে নেয়। “এটা আর কিছুই না, ঐ মনে পড়ে গেল যে অক্সালিক অ্যাসিড কে গরম করলে ওটা ভেঙ্গে গিয়ে তৈরি করে কার্বন ডাই অক্সাইড, জল, আর সেই কার্বন মনোক্সাইড। এ তো কলেজের রসায়ন বিজ্ঞান, তুমিও পড়েছিলে।”

     পাওয়েল প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর যেন দৈত্যাকার রোবটদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে একটার থাইয়ের উপর হালকা করে থাবড়া দেয়।

     “ওহে”, চীৎকার করে জানতে চায়, “তুমি ছুঁড়তে পারো?”

     “প্রভু?”

     “ও আচ্ছা, ঠিক আছে।” পাওয়েল রোবটগুলোর ভোঁতা বুদ্ধির তুষ্টিনাশ করতে করতে নিজেই খুঁজে পেতে একটা আধলা ইটের সাইজের পাথর হাতে তুলে নেয়। তারপর রোবটটাকে বলে, “এটা ধরো। আর ঐ যে আঁকাবাঁকা ফাটলটা দেখতে পাচ্ছো, ওটার পাশে ঐ যে নীলচে স্ফটিকটা দেখছো, ওটাকে মারো। তুমি স্ফটিকটা দেখতে পেয়েছো?”

     ডোনাভান ঘাড় উঁচিয়ে স্ফটিকটাকে দেখে নিয়ে বলে, “গ্রেগ, ওটা তো অনেক দূরে। প্রায় আধা মাইল তো হবেই।”

     “ধীরে, বৎস ধীরে। এটা বুধের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আর রোবটের ইস্পাত-বাহুর খেলা। দেখতে থাকো খেলাটা, কেমন?”

     রোবটটা ওর যান্ত্রিক স্টিরিওস্কোপি চোখ দিয়ে দূরত্ব নিখুঁততার সঙ্গে মেপে নেয়। ওর ইস্পাত-বাহুতে ধরে রাখা ক্ষেপণাস্ত্রর ওজন পরিমাপ করে নিজেকে সেই হিসেবে বিন্যস্ত করে নিয়ে একটু পিছিয়ে যায়। অন্ধকারে রোবটটার নড়াচড়া ভালো করে বোঝা গেল না বটে তবে হঠাৎ একটা ‘থাপ্’ শব্দ অন্ধকারে জেগে উঠে জানিয়ে দেয় রোবটটা পা নাড়িয়ে ভরকেন্দ্র পাল্টে নিল, আর  মুহূর্ত পরে পাথরের টুকরোটা ঝকঝকে সূর্যালোকের মধ্যে দিয়ে একটা কালো বিন্দুর মতো উড়ে গেলো। ওটার গতিকে বাধা দেওয়ার জন্য হাওয়ার কোনো বাধা সেখানে ছিল না। ছিলো না কোনো বাতাসের বেগ যা ওটার দিক পরিবর্তন করতে পারে – আর তাই যখন ওটা লক্ষ্যে গিয়ে আঘাত করলো, তখন সেই ‘নীলচে স্ফটিক’–টার কেন্দ্রবিন্দু থেকে টুকরো টুকরো স্ফটিক ভেঙ্গে গিয়ে ছিটকে উড়ে গেলো।

     আনন্দে আত্মহারা পাওয়েল চীৎকার করে ওঠে, “ওয়াও! চলো মাইক, এবার অক্সালিক অ্যাসিড নিয়ে আসি।”

     সুড়ঙ্গ পথে ঢোকার জন্যে ওরা যখন সেই ভেঙ্গে পড়া সাব-স্টেশনের মধ্যে ঢুকছে, ডোনাভান বিষন্ন স্বরে বলে, “আমরা যখন স্পিডিকে ধরতে গিয়েছিলাম তখন ও সেলেনিয়াম ঢিপির এপাশেই ঘোরাঘুরি করছিলো। ওকে খেয়াল করে দেখেছিলে?”

     “হ্যাঁ”।

     ”আমার মনে হয় ও খেলতে চাইছিলো। ঠিক আছে, চলো, খেলা হোক!”

কয়েক ঘণ্টা পর ওরা আবার ফিরে এলো, এবার সঙ্গে নিয়ে এলো নতুন তিনটে এক লিটারের সাদাটে রাসায়নিকের জার আর পুরনো এক জোড়া তোম্বামুখো। ইতিমধ্যে আলোককোষ স্তুপগুলো ওরা যা ভেবেছিল তার চেয়ে অনেক দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওরা ওদের রোবট বাহন দুটোকে সূর্যালোকে উদ্ভাসিত তপ্ত প্রান্তরের যেদিকে স্পিডি রয়েছে সেদিকে চালিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে। এবার কেউ কারও সঙ্গে কোন কথা বলছে না। সামনে পড়ে থাকা ভয়াবহ কঠিন  লক্ষ্যের দিকে ওরা নীরবে চলতে থাকে।

     এবারও স্পিডি ওদের দেখতে পেয়েই লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে আসে। এই তো আবার আমরা এক জায়গায় হুইইই! ছোট্ট এক তালিকা আমার বানানো, যারা যারা সব বাজায় পিয়ানো; আর যারা সব পুদিনা খোর, খেয়ে ফুঁকবে তোমার মুখের ওপর!”

          ডোনাভান বিড়বিড় করে বলে, “আমরাই তোর মুখে ফুঁকবোরে হতচ্ছারা, দাঁড়া একটু।”

     ”গ্রেগ, ও তো খোঁড়াতে শুরু করে দিয়েছে!”

     ”দেখেছি”, নীচু আর চিন্তিত সুরে উত্তর ভেসে আসে, “আমরা যদি তাড়াতাড়ি কিছু না করতে পারি তো ঐ শালার মনোক্সাইড ওটাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হচ্ছে পেড়ে ফেলবে।”

     এবার ওরা সাবধানে, যতটা সম্ভব প্রায় ঘষটে ঘষটে এগোয়, যাতে এই পাগলা রোবট কিছুতেই কোনও গড়বড় আছে আন্দাজ করে পালাতে না শুরু করে। যদিও তখনও নিশ্চিত করে কিছু বলার পক্ষে ওরা বেশ কিছুটা দূরেই, তাও পাওয়েল দিব্যি গেলে বলতে পারে ওই ছিটিয়াল স্পিডি ব্যাটা পালাবার জন্যে ঘোড়ার রশি চেপেই রেখেছে।

     আর দেরি করা যাবে না।  দম আটকে রোবট গুলোকে আদেশ করে, “এবার ছুড়ে দাও! এক – দুই – “

     দু দুটো ইস্পাত-বাহু একসঙ্গে একবার পেছনে গেলো আর তারপরেই সামনের দিকে ছিটকে এলো আর সেই সঙ্গে দুটো কাঁচের জার পাক খেতে খেতে ধনুকের মতো বাঁকা কিন্তু সমান্তরাল দুটো বৃত্তচাপ অনুসরণ করে অসহ্য সেই সূর্যের আলোয়, যেন এক জোড়া উজ্জ্বল হীরক খন্ড, সামনের দিকে উড়ে গেলো। আর তারপরেই স্পিডির ঠিক পেছনের জমি স্পর্শ করে অক্সালিক অ্যাসিড এর জার দুটো ফেটে পড়তেই শব্দহীন দুটো ফুৎকার দিয়ে ধুলোর একটা আস্তরণ চারদিকে ছড়িয়ে পরলো।

     পাওয়েল নিশ্চিত জানে বুধের পূর্ণ সূর্যের তাপে এর মধ্যেই ঐ ছড়িয়ে পড়া অক্সালিক অ্যাসিড সোডা ওয়াটারের মতো বুজকুড়ি কাটতে শুরু করে দিয়েছে। কাজেই কার্বন মনোক্সাইড ওখানে ছড়িয়ে পড়তে বেশিক্ষণ আর লাগবে না।

     স্পিডি শুরুতেই ঘুরে গিয়ে নজর রেখেছিলো, এবার প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর ক্রমশঃ ওর গতি বাড়িয়ে পেছনের দিকে সরে যেতে থাকে। কিন্তু পনেরো সেকেন্ডও লাগলো না, অস্থির ভাবে লাফাতে লাফাতে ও সরাসরি দুই মানবসন্তানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। স্পিডি তখনও কিছু একটা বলছিলো, পাওয়েল ঠিক ঠাক বুঝতে না পারলেও ওর মনে হল ও যেন বলছে, “পেশাদার প্রেমিক হেসিয়ানসে বলছে কথা।”

     পাত্তা না দিয়ে ও ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, “মাইক, জলদি পাহাড়ের আড়ালে চলো। এটার ঘোর খানিক কমেছে, এখন এ আমাদের কথা শুনবে। চলো ফিরি, আমি সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছি।”

     দলটা এবার পাহাড়ের ছায়ার দিকে ফিরে চললো। ফেরার পথেও রোবট-বাহনদের সেই একঘেয়ে বিরক্তিকর মাপা পদক্ষেপ। শারীরিক সক্ষমতার শেষ প্রান্তে ওরা পৌঁছে গিয়েছে। একটু যে পেছনের দিকে নজর রাখবে সে ক্ষমতাও ওদের ছিল না আর। ছায়াতে পৌঁছে যাওয়ার পর শরীর যখন ওদের একটু ঠান্ডা হল তখন ডোনাভান-ই শেষ পর্যন্ত পেছন ফিরে তাকালো। আর তাকিয়েই চীৎকার করে উঠলো।

     “গ্রেগ!”

     পাওয়েল সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকিয়েই আঁতকে উঠলো।

     স্পিডি তখনও হেঁটে চলেছে ধীর গতিতে, অত্যন্ত ধীর গতিতে – আর হেঁটে চলে যাচ্ছে ভুল দিকে – ওদের উল্টো দিকে – ওদের থেকে দূরে। হাঁটছে তো না যেন ভেসে যাচ্ছে; ভেসে যাচ্ছে আবার সেই আগের মতোই কিসের এক ঘোরে; ক্রমশঃ ওর চলার বেগ বেড়ে যাচ্ছে। ভিজিপ্লেটের দূরবীনের মধ্যে দিয়ে ওকে দেখা যাচ্ছে কি ভয়ানক কাছে অথচ ততোধিক ভয়াবহ ভাবে আসলেই ওদের থেকে অনেক, অনেক দূরে।

     ডোনাভান পাগলের মতো চীৎকার করে ওঠে, “ধরো ওকে, ধরো!” আর তারপরেই ওর বাহন রোবটটাকে চাপড়ে গতি বাড়াতে চায়, কিন্তু পাওয়েল ওকে পেছন থেকে আটকায়।

     ”ওকে ধরতে পারবেনা, মাইক। কোনও লাভ নেই।”  হতাশায় রোবটটার পিঠে অস্থির হয়ে অক্ষম রাগে নিজের হাত মুঠো করে ঝাঁকিয়ে ওঠে ও। আর বলে, “শালা সব সময়, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পাঁচ সেকেন্ড পরে এসব আমার চোখে পড়ে, কেন? মাইক, আমরা সময়টা পুরো বরবাদ করলাম!”

     “আরও অক্সালিক অ্যাসিড আনতে হবে,” ডোনাভান শান্ত ভাবে ওর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়, “মনোক্সাইডের ঘনত্বটা যথেষ্ট ছিল না।”

     “সাত টন যোগাড় করলেও যথেষ্ট হবে না – আর আমাদের হাতে অত সময়ও নেই এসব করার, তাছাড়া যদি আমরা করিও তাতে যা সময় লাগবে ততক্ষণে ঐ কার্বন মনোক্সাইড ওটাকে খেয়ে ফেলবে। তুমি মনে হয় আসল জিনিসটা এখনও ধরতে পারো নি, তাই না মাইক?”

     ডোনাভান অবাক হয়ে বললো, “না, সেটা কী!”

     “আসলে আমরা শুধুই নতুন নতুন ভারসাম্য তৈরি করছি। যখনই আমরা সেলেনিয়ামের ঢিপিটার দিকে মনোক্সাইডের পরিমাণ বাড়াচ্ছি, তৃতীয় সূত্রের তীব্রতা ঐ দিকে বেড়ে যাচ্ছে যার জন্যে ও পিছিয়ে আসছে – তবে ও ততটাই পিছনে আসছে যেখানে এলে নতুন করে আবার তৃতীয় আর দ্বিতীয় সূত্রের নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, তাই খানিক পরে যেই মাত্র ঢিপিরদিকের মনোক্সাইডের মাত্রা কিছুটা কমে যাচ্ছে, ও আবার ঢিপির দিকের নতুন ভারসাম্য বিন্দুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। “

     পাওয়েলের গলার আওয়াজ ভাঙ্গা ভাঙ্গা মনে হচ্ছে এখন। “এ সেই গোল গোল চক্কর কাটার পুরোনো কাহিনি। আমরা তৃতীয় সূত্রের তীব্রতা বাড়িয়ে ঠেলা দিতে পারি আবার দ্বিতীয় সূত্রের তীব্রতা বাড়িয়েও ঠেলা দিতে পারি, কিন্তু তাতে কোন লাভ হবে না – আমরা এসব করে শুধু ভারসাম্য বিন্দুর তাৎক্ষণিক অবস্থানটা পাল্টে দিতে পারি। আমাদের এই দুটো সূত্রের বাইরে কিছু একটা খুঁজতে হবে।” বলতে বলতে ওর বাহনটাকে ঠেলে ডোনাভানেরটার ঠিক পাশে নিয়ে আসে, এখন ওরা ঠিক পাশাপাশি বসে আছে, ছায়াময় এক অন্ধকার ঢেকে রেখেছে ওদের দুজনকেই, ও ফিসফিস করে ডাকে,” মাইক! “

     “ব্যাস, এই তা হলে শেষ! তাই তো?” – বিষন্ন দেখায় ডোনাভানকে। “তো, আমি বলি কি, চলো আমরা ঘাঁটিতে ফিরে যাই, অপেক্ষা করি আলোককোষ স্তুপের ফুরিয়ে যাওয়ার, তারপর দুজনে হাত ধরাধরি করে সায়ানাইড পিল মুখে ঢুকিয়ে ভদ্রলোকের মতো জাহান্নামের দিকে রওয়ানা দিই।” বলে হালকা করে হাসে ডোনাভান। বিষন্ন হাসি।

     “মাইক”, পাওয়েল নরম সুরে আবার বলে, “স্পিডিকে আমাদের ধরতেই হবে।”

          “জানি তো।”

          “মাইক”, পাওয়েল বলতে গিয়ে ইতস্তত করে থেমে যায়, তারপর আবার বলে,“প্রথম সূত্র কিন্তু আমাদের হাতে এখনও রয়েছে। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে – আগেই এসেছিলো – তবে এটা একটু মরিয়া ব্যাপার হবে।”

     ডোনাভান চোখ তুলে তাকায়, ওকে এবার একটু যেন চনমনে লাগে। “আমরা তো মরিয়া হয়েই আছি। তুমি বলো।”

     “ঠিক আছে। মন দিয়ে শোনো। প্রথম সূত্রের দুটো ভাগ – দ্বিতীয় ভাগের হিসেবে কোনো রোবট তার নিস্ক্রিয়তার জন্যে কোনো মানুষের ক্ষতি হতে দিতে পারে না। আর এর বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনও ক্ষমতাই দ্বিতীয় বা তৃতীয় সূত্রের নেই। মাইক, ওটা ওরা পারে না।”

     “এমনকি যখন রোবট আধ পাগ-, ঠিক আছে ওটা না হয় মাতাল। দুটোর মধ্যে কোনও একটা তো তোমাকে মানতেই হবে।”

     “সে যাই হোক, এটাই একমাত্র সুযোগ আমাদের হাতে। “

     “মানে? আসল কথায় এসো। কী করতে চাইছো তুমি?”

     “আমি এখন ওখানে যাবো, দেখা যাক প্রথম সূত্র কতোটা কি করতে পারে। যদি এতেও ঐ ভারসাম্য ভাঙ্গতে না পারি, তো বেশি আর কত খারাপ হবে – যা হওয়ার তা এক্ষুনি আর নয়তো তিন-চার দিন পর তো হবেই।”

     “দাঁড়াও গ্রেগ, দাঁড়াও। মানবিক আচার-আচরণেরও তো একটা নিয়ম-কানুন আছে, না কি? তুমি ঠিক করলে, আর অমনি ওখানে চলে গেলে, এটা তো হতে পারে না! লটারি হয়ে যাক, আমাকেও একটা সুযোগ দাও।”

     “ঠিক আছে। হয়ে যাক – বলো, কে আগে চোদ্দোর ঘনফল বলতে পারে।” প্রশ্ন শেষ করেই ও আবার সঙ্গে সঙ্গে চীৎকার করে উঠলো, “দু’হাজার – সাতশো – চুয়াল্লিশ।”

     আর এর ঠিক পরের মূহুর্তেই ডোনাভান টের পায় পাওয়েলের রোবটটার একটা হঠাৎ ধাক্কার চোটে ওর  রোবটটা হুমড়ি খেয়ে নড়বড় করছে। সেই ধাক্কা কোনরকমে সামলে উঠে তাকিয়ে দেখে ইতিমধ্যেই পাওয়েল ওর বাহনটাকে নিয়ে দুলকি চালে ছায়া পেরিয়ে সূর্যের উজ্জ্বল আলোর দিকে রওনা দিয়ে দিয়েছে। ডোনাভান চীৎকার করে ওঠার জন্য মুখ খোলে, আর তারপরে কি ভেবে সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে নেয়। পাঁঠাটা অবশ্যই আগে থেকে চোদ্দোর ঘনফল হিসাব করে নিয়ে তারপর এই জোচ্চুরিটা করলো, আর জেনে বুঝেই করলো। পাঁঠাটা একদম ওরই মতো রামপাঁঠা।

     সূর্য এখানে এখন যেন আরও বেশি গরম আর পাওয়েল এবার সেই সঙ্গে পিঠেও একটা পাগল করা চুলকানি টের পাচ্ছে। সম্ভবত মানসিক। ও ভাববার চেষ্টা করে। তা হলেই ভালো, আর তা না হলে তো খুবই খারাপ খবর। এর মানে এতক্ষণে বুধের তীব্র বিকিরণ এবার ইনসোস্যুটের আস্তরণ পার করে নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছে।

     সামনে থেকে স্পিডি ওর দিকে তাকিয়ে ওকে দেখছিল, তবে কে জানে কেন, গিলবার্ট বা সুলিভানের কোনো কাব্য-নাটক আউড়ে এবার আর তেমন কোন সম্ভাষণ জানালো না স্পিডি। ওপরওয়ালাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ! কিন্তু ও ঠিক করে নিলো যে স্পিডির খুব বেশি কাছে এগোনোর সাহস করাও উচিত হবে না।

     তাতেও ও যখন আর তিনশো গজের মতো দূরত্বে তখন স্পিডি পেছোতে শুরু করলো। যদিও এক পা এক পা করে, আর্ যেন খুউব সাবধানে। পাওয়েল দেখেই সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লো। তারপর এক লাফে রোবটটার কাঁধের ওপর থেকে ও নেমে পড়লো। আর নামলো স্ফটিক আবৃত পাথুরে জমিতে। থপ্ করে একটা মৃদু শব্দ উঠলো, যা ওর কান পর্যন্ত এসে  পৌঁছল না। তবে দেখতে পেলো বেশ কিছু স্ফটিক কণা ছিটকে ছড়িয়ে  গেল চারপাশে ।

     পায়ে হেঁটেই এগোয় ও এবার। পায়ের নীচের জমি ছোট ছোট স্ফটিকের নুড়ি-পাথরের টুকরোয় ভর্তি আর চলতে গিয়ে পিছলে যাচ্ছে ওর পা। বুধের কম মাধ্যাকর্ষণও ওর চলার অসুবিধা তৈরি করতে থাকে। জমি থেকে উঠে আসা গরমে পায়ের তলা সুড়সুড় করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে আঁধারে ঢাকা পাহাড়তলির দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নেয় আর টের পায় ও এখন অনেক দূরে এসে গিয়েছে। নিজে নিজে বা ওর এই প্রাগৈতিহাসিক রোবটের কাঁধে চেপে জীবিত ফিরে যাওয়া আর সম্ভব হবে না। তাই এবার হয় স্পিডি আর নয়তো – ব্যাস, আর কিছুই না। আর এটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে ও নিজেকে শক্ত করে নেয়।

     আর না, যথেষ্ট হয়েছে!  ও এবার দাঁড়িয়ে পড়ে।

     “স্পিডি”, ও ডাক দেয়। “স্পিডিইই!”

     মসৃণ আধুনিক রোবটটা ওর ডাক শুনে এবার খানিক ইতস্তত করে। পিছিয়ে যাওয়াটা একটু সময়ের জন্যে থামায়-ও বটে, তবে তারপরেই আবার পিছোতে শুরু করে দেয়।

     পাওয়েল এবার চেষ্টা করে ওর গলার স্বরে খানিক কাকুতি-মিনতির সুর লাগাতে, তবে লাগাতে গিয়ে দেখে যে ওকে আসলেই কোনও অভিনয় করতে হচ্ছে না। “স্পিডি, আমাকে তাড়াতাড়ি পাহাড়ের ছায়াতে ফিরতে হবে, নইলে এই সূর্যের তাপে আমি মরে যাবো। এ আমার মরণ বাঁচন সমস্যা, স্পিডি। আর তুমিই শুধু পারো আমাকে বাঁচাতে।”

     স্পিডি একপা সামনে এগোয়, আবার দাঁড়িয়ে পড়ে। বলতে শুরু করে, “প্রচন্ড মাথা ব্যাথায় যখন তুমি শুয়েও জেগে থাকো আর বিশ্রাম করা তোমার ঘুচে যায় –” কিন্তু ততক্ষণে পাওয়েলের গলা দিয়ে একটা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোতে শুরু করেছে, সম্ভবত সে জন্যে,  ঐ টুকু বলেই স্পিডি চুপ মেরে যায়, আর পাওয়েল, কথা জড়িয়ে গিয়েছে ততক্ষণে, বিড়বিড় করে বলে, “খুব-গ*ম-লা*ছে-পার*-না

     মারাত্মক গরমে প্রায় জ্বলে যাচ্ছে ওর শরীর ! ও কোনও রকমে চোখ খোলে আর খুলেই এক কোণে একটা নড়াচড়া দেখতে পায়, ওর মাথা ঘুরে যায়, চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়, ওর সেই দৈত্যাকার বাহন-রোবটটা, যার পিঠে চড়ে ও এসেছে এখানে – ওর দিকে এগিয়ে আসছে, আর আসছে কোন মাহুত ছাড়াই।

     আর ওর যান্ত্রিক স্বর বলে চলেছে, “প্রভু, ক্ষমা করবেন। আমি জানি প্রভু, আপনারা কেউ ঘাড়ে না চাপলে আমার একলা চলার অধিকার নেই, কিন্ত প্রভু, আপনি এখন      বিপদগ্রস্থ।”

     অবশ্যই, পাওয়েল ভালোই জানে, প্রথম সূত্রের অধিকার সবচেয়ে আগে। কিন্তু ও তো এখন এই প্রাচীন জবরজংটাকে চাইছে না; চাইছে স্পিডিকে। রাগের চোটে শরীরে শেষ ক্ষমতাটুকু দিয়ে ও কোনও রকমে অন্যদিকে সরে যেতে যেতে চীৎকার করতে থাকে,” আমি তোমাকে আদেশ করছি, তুমি দূরে থাকো। আমি তোমাকে আবার আদেশ করছি, তুমি দাঁড়িয়ে পড়ো, আর এক পাও এগোবে না।”

     এসবই বৃথা চেষ্টা, পুরোপুরি অর্থহীন। প্রথম সূত্রের গুরুত্ব কেউ কিছুতেই কমাতে পারবে না। রোবটটা বোকার মত তারপরেও বলেই চললো, “প্রভু, আপনি বিপদগ্রস্থ। প্রভু, আপনি বিপদগ্রস্থ।”

     পাওয়েল ওর দিকে মরিয়ার মতো তাকিয়ে রইলো। এখন আর পরিষ্কার করে কিছুই দেখতেও পাচ্ছে না। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে গরম হাওয়ার একটা ঝড়; নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে আগুনের হলকা, আর চারপাশের সবকিছু যেন ঢাকা পড়েছে ঝকঝকে কোনো আলোর পর্দায়।

     মরিয়া হয়ে ও শেষ বারের মতো চেষ্টা করে, “স্পিডি, আমি মরে যাচ্ছি। তুমি কোথায়? তোমাকে আমার দরকার স্পিডি।”

     তখনও ও মান্ধাতার রোবট দৈত্যটাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অন্ধের মতো টলমল করে পিছিয়ে যাচ্ছিলো, একে এখন তার চাই না, ঠিক তখনই ও ওর হাতে টের পায় ধাতব আঙ্গুলের একটা কর্কশ স্পর্শ আর কানে আসে একটা ধাতব কন্ঠের উদ্বিগ্ন অনুনয়।

     -আরেব্বাপ, বস্; আপনি এখানে কী করছেন? আর আমিই বা কী করছি – আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে -”

          -”ওসব ছাড়ো”, পাওয়েল কোনোরকমে বিড়বিড় করে বলতে পারে, “আমাকে ঐ পাহাড়ের ছায়াতে নিয়ে চলো – জলদি!” এরপর যেটুকু ও টের পেলো তা হল কেউ যেন ওকে কাঁধে তুলে নিলো আর ও যেন জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে দিয়ে দ্রুত গতিতে ভেসে চলেছে, ঠিক তারপরেই ও জ্ঞান হারালো।

জেগে উঠেই চোখে পড়ল ডোনাভান ওর উপর ঝুঁকে রয়েছে আর উদ্বিগ্ন ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে। “এখন কেমন লাগছে, গ্রেগ?”

     “ভালো”, উত্তর দেয় ও, “স্পিডি কোথায়?”

     -”এখানেই। আমি ওকে অন্য একটা সেলেনিয়ামের ঢিপিতে পাঠিয়ে ছিলাম – এবার একদম আলাদা করে আদেশ দিয়ে, যে ভাবে হোক সেলেনিয়াম নিয়ে আসবার জন্যে।  ও ফিরে আসে ঠিক বিয়াল্লিস মিনিট আর তিন সেকেন্ডের মধ্যে। আমি সময় মেপে নিয়ে ছিলাম। আমাদের গোল গোল চক্কর কাটানোর জন্যে ক্ষমা চাওয়া এখনও শেষ হয়নি ওর। তুমি কী বলবে ভেবে ও তোমার সামনে আসতে ভয় পাচ্ছে।”

     “ওকে পাকড়ে নিয়ে এসো।” পাওয়েল হুকুম জারি করে। “ওর তো কোনো দোষ ছিল না।” ও হাত বাড়িয়ে স্পিডির ধাতব পাঞ্জাটা আঁকড়ে ধরে। “তুমি খুব ভালো, স্পিডি।”

তারপর ডোনাভানকে বলে, “জানো মাইক, আমি ভাবছিলাম কি -”

     “বলো!”

     বাতাসে এখন একটু বেশিই আরামদায়ক ঠান্ডা আমেজ, পাওয়েল দু হাতে মুখ চোখ রগড়ে নেয় একবার, বলে, “ইয়ে, মানে, তুমি জানো তো যে, আমরা যখন এখানকার সমস্ত ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক করে ফেলবো আর স্পিডির সবরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা যাচাই-পরখ ইত্যাদি শেষ হয়ে যাবে, তখন কতৃপক্ষ আমাদের পরের স্পেস স্টেশনে পাঠাবে -”

     “না-আ!”

      “হ্যাঁ- এ! অন্তত সেই কেলভিন বুড়ি আমাকে সেটাই জানিয়ে ছিল আমাদের যাত্রা শুরুর ঠিক আগে। তবে আমি অবশ্য তখন এই নিয়ে একটা কথাও বলিনি, কারন এ ব্যাপারে ওদের সঙ্গে আমার ভালো রকম লড়াই করার ইচ্ছে ছিলো।”

     “লড়াই করতে তুমি? ডোনাভান চীৎকার করে ওঠে। “কিন্তু -”

     “সে আমি জানি। তবে এখন এ বিষয়ে আমার আর কোনও অসুবিধেই নেই।  শূন্যের দু’শো তিয়াত্তর ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড নীচে, – আহা! দারুণ মজার হবে, তাই না?”

     “স্পেস স্টেশন”, হুংকার দিয়ে ওঠে ডোনাভান, “আমি আসছি ।”

 

মূল কাহিনি: রানঅ্যারাউন্ড (Runaround)

Tags: অনুবাদ উপন্যাস, আইজ্যাক আসিমভ, প্রমিত নন্দী, রুদ্র দেব বর্মন, ষষ্ঠ বর্ষ প্রথম সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!