উড়ান প্রবাহ

  • লেখক: অন্বেষা রায়
  • শিল্পী: প্রমিত নন্দী

(১)

বিজ্ঞানী বিশ্ববসু (আই এন ডি ৪০৮৫ –বায়ো সায়েন্স /বি.বি ২০৮৫)

সাল: ৪১২৫

স্থান: দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া

রিমোট কন্ট্রোলের সবুজ বোতামটা টিপতেই চোখের সামনে থেকে গোলাপি আলোর পর্দাটা সরে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আড়াই হাজারতম রে ওয়ের ধারে তিনলক্ষতম বাসস্থানটি বিজ্ঞানী বিশ্ববসুর। বাসস্থান মানে হাওয়ায় ভাসমান কিছু আলোককুঠুরি। বাইরে থেকে দেখলে বোঝাই যাবে না যে এর ভেতরে মানুষ বাস করছে। পশুপাখি, এমনকী বিনা গামা ডি এক্স লেন্স পরিহিত মানুষের কাছেও জায়গাটা একটা বিরাট অরণ্যমাত্র। বিশ্ববসু নিজের আপার্টমেন্টের বাইরে এসে দেখলেন পৃথিবীর বুকে এখনও সকাল নামেনি। তিনি সূর্য ওঠার আগে উঠে পড়েছেন। সকলেই জানে বিজ্ঞানী বিশ্ববসু মোনার্ক প্রজাপতি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর এই গবেষণা মানব ইতিহাসে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে চলেছে। আগামী প্রজন্মের কাছে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বিজ্ঞানী বিশ্ববসুর… না না… বিজ্ঞানী আই এন ডি ৪০৮৫ –বায়ো সায়েন্স /বি.বি ২০৮৫ এর নাম। শুধুমাত্র অক্ষরসম্বলিত নাম আর বর্তমান পৃথিবীতে চলে না। ব্যক্তিগত নাম, পারিবারিক নামের প্রচলন বহু শতাব্দী আগেই মুছে গিয়েছে মানবসমাজ থেকে। এখন তো পরিবারের ধারণাও প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ মানুষের জন্মই হয় গবেষণাগারে। সংরক্ষিত ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর কৃত্রিম পদ্ধতিতে মিলনের মাধ্যমে। পৃথিবীতে ক্রমশ বাড়তে থাকা জনসংখ্যা একসময় মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের পথে মারাত্মক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেইসময় কঠোর হাতে জন্ম রোধ করা শুরু হয়। শুধু তাই নয়, সত্তর বছরের বেশি বয়স্ক মানুষদের প্রথমে ইচ্ছামৃত্যুর অনুমতি এবং তারপর পরিবারের সম্মতিতে মৃত্যুবরণের আজ্ঞা জারি করা হয়। অবশ্য এসবই বহু শতাব্দী আগেকার কথা। এই সময়েই দেখা যায় যে কিছু কিছু পরিবার প্রলোভন বা ভয় দেখানোর পরেও পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন না। সেই সময় থেকেই খুব পরিকল্পিতভাবে জনসাধারণের চিন্তাধারায় পরিবারবিরোধী ধারণাটা ঢুকিয়ে দিতে শুরু করে অধিকাংশ রাষ্ট্র। একটি পরিবার যে একজন ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বের পক্ষে কতটা ক্ষতিকারক তা যুক্তি দিয়ে সাজিয়ে, উদাহরণ দিয়ে পোক্ত করে শিক্ষিত যুবসমাজের মগজে সূক্ষ্ণভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়। ভালোবাসা যে আদতে একটা উপযোগিতাহীন আবেগ তা এখনকার প্রায় সকলেই বিশ্বাস করে। ফলস্বরূপ বিগত কয়েকশো বছরে ‘পরিবার’ প্রথা প্রায় নিঃশেষিত। প্রায় বলা হচ্ছে কারণ এখনও পৃথিবীতে দারিদ্র আছে। সেইসব দরিদ্র মানুষেরা, সিমেন্ট, বালি কংক্রিটের বাড়িতে বসবাস করা নরনারীরা এখনও পশুর মতো পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে সন্তান উৎপাদন করে। সামান্য খাবার, বাচ্চা বুড়ো একসঙ্গে খায়। ঘরের মধ্যে পুষে রাখে লোলচর্ম, জরাক্লিষ্ট বৃদ্ধবৃদ্ধাদের। যদিও প্রতিটি দেশের সরকার এ বিষয়ে তৎপর। তারা সাধ্যমতো বজায় রাখেন অপটিমাম পপুলেশন লেভেল। হিসেব করে গবেষণাগারে জন্ম দেন ঠিক সেই সংখ্যক শিশু যারা বড় এবং কর্মক্ষম হলে অর্থনীতির হাল সোজা থাকবে।

     বিশ্ববসুর নিজেও মাত্র চল্লিশ বছর আগে গবেষণাগারে সৃষ্ট হয়েছেন। নিজের ‘পিতা’ ‘মাতা’র সম্পর্কে জরুরি তথ্যগুলোই শুধু তাঁর সংগ্রহে আছে। তাঁদের কোনও ছবি বা ‘শুধুমাত্র অক্ষর’ সম্বলিত নাম হাতে নেই বিশ্ববসুর। এমনকি তাঁরা নিজেরাও পরস্পরের পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলেন। বিশ্ববসু শুধু জানেন তাঁরা দুজনেই ভারতীয়। বিশ্ববসু নামটা তিনি নিজেই নিজেকে দিয়েছেন। একসময় ইতিহাসে প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। সারাদিন পাগলের মতো রিডসেলস সংগ্রহ করতেন আর হাজার বছর আগেকার মানবসভ্যতা সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতেন। জেনে অবাক হতেন যে পৃথিবীতে কত লক্ষ লক্ষ রকমের ভাষা ছিল। এখন তো যে কোনও লিপি এনক্রিপশন মেশিনের নীচে ফেললেই তা সি ই বা কমন এনক্রিপশনে অনুদিত হয়ে যায়। যা সারা পৃথিবীর যে কোনও দেশের লেখাপড়া জানা মানুষ পড়তে পারে।

     রিমোটের লাল বোতাম টিপে বিশ্ববসু তাঁর কক্ষের সামনে গোলাপি পর্দা ফেলে দিলেন। কক্ষের ভেতর বহু মূল্যবান এবং গোপন তথ্য সমৃদ্ধ কসমিক রে কোষ বা সেলস আছে। কেউ দেখে ফেললে তিনি বিপদে পড়ে যাবেন। ওপরমহলে রিপোর্ট করে দিলে তাঁকে এখান থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে থেকে যেতে হবে বাগানবিহীন কংক্রিটের বাড়িতে। চিন্তাটা মাথায় আসতেই দমবন্ধ হয়ে আসে বিশ্ববসুর। যে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিয়ে তিনি এখানে এসেছেন তা প্রায় শেষের পথে। এখন তিনি না থাকলেও তাঁর টিম সুসম্পন্ন করে নিতে পারবে কাজটি। বিশ্ববসু তবু এই স্থান ছেড়ে, এই প্রজেক্ট ছেড়ে যেতে চান না, কারণ কেবলমাত্র তিনিই জানেন এখনও ছোট্ট একটা কর্তব্য বাকি রয়ে গেছে। যার কথা তাঁর সহকর্মীদের কেউ জানেন না। যে কাজের কথা আর কেউ টের পেলে কঠিনতর শাস্তি বহাল হতে পারে তাঁর জন্য। শুধু বহিষ্কার নয়, মৃত্যুদণ্ড হতে পারে তাঁর।

     রে ওয়ের স্বচ্ছ আলোক তরঙ্গ ধরে হাঁটতে থাকেন বিজ্ঞানী বিশ্ববসু। গাছের উপরিভাগ ভরিয়ে রেখেছে তরঙ্গপথের দুইধার। গাছেদের গুঁড়ি জড়িয়ে, পাখা বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে হাজার হাজার মোনার্ক প্রজাপতি। এই প্রজাপতির দলই বিশ্ববসুর গবেষণার বিষয় ছিল। পরিযায়ী এই প্রজাপতির আসার সময় বিশ্ববসু ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কোথাও যান না। কালো, কমলা সাদার কারুকার্য করা পাখাগুলো কী জাদুতে যে টেনে রাখে তাঁকে তা তিনি নিজেও জানেন না।

     বিশ্ববসু চাইলেই ফ্লোটবক্স ব্যবহার করতে পারেন অত উচ্চতা থেকে নীচে নামার জন্য। রিমোটের আকাশি বোতাম টিপলেই ফ্লোটবক্স এসে হাজির হবে তাঁর তিনলক্ষতম আলোককক্ষের সামনে। সেই ফ্লোটবক্সে ঢুকে হালকা বাদামি রঙের চাবিতে হাত রাখা মানেই তিনি পৃথিবীর মাটিতে নামতে চান। চার সেকেন্ডের মধ্যে ভূমিতে, একদম গাছেদের পায়ের কাছে এসে থামতেন। তিনি তা না করে, পায়ে হেঁটে নামাই পছন্দ করেন বেশি। রে ওয়েগুলো তো আর সিঁড়ির মতো ধাপ বিশিষ্ট নয় যে নামতে কষ্ট হবে। গাছেদের উপরিভাগের পাতায় হাত ছুঁইয়ে, মধ্যভাগের ডালে সেজে ওঠা পাখির বাসায় উঁকি দিতে দিতে মাটির কাছে পৌঁছতে অনেক বেশি শান্তি বোধ করেন তিনি। মাঝে মাঝে কোনও পক্ষীনীড়ের সামনে থেমে নমুনা সংগ্রহ করে নেন মা পাখি বা বাবা পাখির শরীর থেকে। এই নমুনা তাঁর গোপন গবেষণার উপাদান। ধীরে সুস্থে হাঁটলে পনেরো মিনিটের মধ্যে নীচে চলে আসেন তিনি। তারপর মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন গাছপালা, প্রজাপতি। তা ছাড়া আজ, এইমুহূর্তে ফ্লোটবক্সের রেকর্ডিং লেন্স এড়ানো খুব দরকার। যদিও রে ওয়েবের দুইধারে, গাছেদের পাতার ফাঁকে ফাঁকে একাধিক চলমান ক্যামেরা লুকিয়ে আছে অরণ্যব্যাপী, তাও বিশ্ববসু তাদের অবস্থান এবং গতিপথ সম্পর্কে সচেতন। তিনি হিসেব করে অনেক আগেই দেখে নিয়েছেন, কখন কোথা দিয়ে কীভাবে হাঁটলে কোনওরকম সন্দেহের উদ্রেক না করেই তিনি অরণ্যের সীমানায় পৌঁছতে পারবেন। দিনের আলো ফোটার আগেই সেখানে এসে দাঁড়াবেন এক ব্যক্তি। কথা বলার অবকাশ নেই, কৌনিক অবস্থানে থাকা রেকর্ডিং লেন্স তাদের দিকে ফিরে তাকানোর আগেই দ্রুত হাতে সেরে নিতে হবে কাজ।

     বিশ্ববসু জন্মানোর অনেক আগে থেকেই শিশুদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করে রাষ্ট্র। বিশ্ববসু ভেবেছিলেন ইতিহাস নিয়ে পড়বেন কিন্তু তাঁর মস্তিষ্কের গঠন, ডিএনএ-র পরিকাঠামো বিচার করে বিশেষজ্ঞরা তাঁকে বিজ্ঞানী হওয়ার উপদেশ দেন। এই বিশেষজ্ঞদের উপেক্ষা করার উপায় নেই। তাদের বহু পর্যায়ভিত্তিক পরীক্ষানিরীক্ষার ফল কখনও ভুল হয় না। তাই এই ফল সামনে আসার পরই শিশুর স্থায়ী নামকরণ হয়। যেমন বিশ্ববসুর ক্ষেত্রে বায়ো সায়েন্স জুড়েছে নামের আগে। এ ছাড়া আছে দেশের নাম, জন্মসাল আর ক্রমিকসংখ্যা। ওই বি বি থেকেই নিজের নাম বিশ্ববসু দিয়েছেন বিজ্ঞানী।

     হাতের তালু উলটে পামস্ক্রিনে সময় দেখলেন বিশ্ববসু। এতক্ষণে তাঁর অতিথি এসে গেছেন নিশ্চয়ই।

(২)

স্পেসশিপ বিহঙ্গম ৯০৮২

…………………………

সাল: (পৃথিবীর সূর্যপরিক্রমা হিসেবে) ৫৫৭৮

এলা (বিহঙ্গম ৫৫৫৩- আসট্রোনট /এন জি- ২৯৬)

লোলার্ক (বিহঙ্গম৫৫৪৯- আসট্রোনট/ পি সি-১২৭)

…………………………

স্লিপ চেম্বার থেকে বেরিয়ে সোজা ফিডিং ব্লকে চলে এল এলা আর লোলার্ক। পৃথিবীর সূর্য পরিক্রমার হিসেবে তাঁদের বয়স যথাক্রমে পঁচিশ এবং ঊনত্রিশ। এইমাত্র দীর্ঘ সাত বছরের ঘুম সেরে এক নতুন শরীর নিয়ে জেগে উঠেছে তারা। সাত বছর পর একে ওপরকে দেখে স্বভাব এবং নিয়মবিরুদ্ধভাবেই ওরা মিষ্টি করে হাসে।

     ওদের দুজনেরই জন্ম এই স্পেসশিপে। ওরা এও জানে যে ওদের মৃত্যুও নির্ধারিত হয়ে আছে এই মহাকাশযানের ভেতরেই। ওদের প্রপিতামহের প্রপিতামহও জন্মেছিলেন এইখানে এবং দেহত্যাগও করেছেন এখানেই। পৃথিবী নামক ধূসর যে গ্রহ থেকে একসময় যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁদের পূর্বপুরুষেরা সেই পৃথিবীর মাটিতে কোনওদিন পা রাখেনি এলা, লোলার্ক। শুধু স্ক্রিনের যান্ত্রিকতায় অবাক হয়ে দেখেছে মা গ্রহের বিবর্তন। কেমনভাবে ধীরে ধীরে মাত্র কয়েক হাজার বছরের মধ্যে নীল, সবুজ থেকে ধূসর এবং ধূসরতর হয়ে যাচ্ছে সূর্যের তৃতীয় সন্তান। পৃথিবীতে জল এতদিনে প্রায় নিঃশেষিত। কোটি কোটি মানুষের বসবাসের উপযোগী প্রকৃতিক সম্পদ তলানিতে এসে ঠেকেছে। এই অবস্থায় মনুষ্যপোযোগী বিকল্প একটি গ্রহের আবিষ্কার এক যুগান্তকারী ঘটনা। তবে ‘জেনাসওফাইভ’ গ্রহের ঠিকানা বিজ্ঞানীদের যতটা উত্তেজিত করেছিল, সেখানে পৌঁছানোর কথা ভেবে তাঁরা ততটাই দমে গিয়েছিলেন।

     পৃথিবী থেকে জেনাসওফাইভের দূরত্ব ৩.৩৩ আলোকবর্ষ। যদি এক আলোকবর্ষের দূরত্ব ৯৪৬১০০০০০০০০০ কিলোমিটার হয় তাহলে…

     এলা স্ক্রিনে পৃথিবী থেকে জেনাসওফাইভের দূরত্বটা দেখে নিল। তারা অনেকখানি পথ পেরিয়ে এসেছে। আরও অনেকটা পথ যাওয়া বাকি। এই যাত্রা সম্পূর্ণ করার জন্য প্রচুর প্রচুর মানব প্রজন্মব্যাপী যাত্রা জারি রাখতে হবে। তাই মিশন জেনাসওফাইভের জন্য অতি প্রয়োজনীয় দুটি উপকরণ হল তথ্য এবং ক্রমিক প্রজনন। মানুষ পাঠাবার আগে অবশ্য দ্রুততম মহাকাশযানে কিছু যন্ত্রমানব পাঠানো হয়েছিল জেনেসওফাইভে। সেটা যেতে সময় লেগেছিল একশো বছরের কিছু বেশি। তবে মানুষবাহী বিহঙ্গম ৯০৮২ আকারে অনেকখানি বড় বলে এর যেতে সময় লাগবে আরও অনেক বেশি।

     এলা, লোলার্ক দুজনেই জন্মের পর রোবোট দ্বারা পালিত হয়ে এতখানি বয়সে এসে উপস্থিত হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছরের সুপ্তির পর তারা আজ জেগে উঠেছে নতুন প্রজন্ম সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। ফুড ব্লক থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যগুণ সম্বলিত পানীয় এবং ট্যাবলেট সংগ্রহ করে তারা এসে বসল নিজের নিজের জায়গায়। এখন থেকে ঠিক সাড়ে দশ ঘণ্টা পর তাদের দেহ থেকে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু গৃহীত হবে। তারপর তা সংরক্ষিত হবে। কোথায়, কীভাবে সেসব দেখার দায়িত্ব বা ইচ্ছে কোনওটাই এলা বা লোলার্ক নেই। এমনকী কবে কাজটি সংগঠিত হবে সে বিষয়েও তারা বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়। তাদের মতো আরও বেশ কিছু মানব-মানবী উপস্থিত আছেন এই মহকাশযানে। তাদের সকলেরই অবদান থাকবে পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টিতে। আপাতত আমরা দেখছি লোলার্ক আর এলা নিঃশব্দে এসে বসেছে পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিনের সামনে। এখানে মানবসভ্যতার ইতিহাস একটু একটু করে পড়ানো হয়। সঙ্গে বিজ্ঞানের ক্লাস। সাত বছর আগে যা যা পড়েছিল তাদের পরিষ্কার মনে থাকলেও আরেকবার তথ্যে চোখ বুলিয়ে নেওয়াটা জরুরি। কিন্তু ওদের দুজনের আজ প্রায়ই চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে। কাজের প্রতি কাঙ্খিত টানটান ভাবটা যেন থেকেও নেই।

     “তুমি জানতে, (আই এন ডি ৪০৮৫–বায়ো সায়েন্স /বি.বি ২০৮৫) নিজের আলাদা নাম রেখেছিলেন। বিশ্ববসু।”

     লোলার্কের উদ্দেশ্য করে চাপাস্বরে বলে এলা। ঈষৎ চমকে লোলার্ক বলে, “কিন্তু সেই জন্য তাঁর শাস্তি আলাদা করে বৃদ্ধি পেয়েছিল কি?”

     এলাকে খানিকটা আনমনা দেখায়। সে বলে, “জাজমেন্ট রিপোর্টে তা লেখা নেই। তবে আমৃত্যু বাগানহীন কংক্রিটের বাড়িতে নির্বাসন আর শেষ বয়সে তিলে তিলে মৃত্যু দেওয়ার পেছনে এটাও কি একটা কারণ নয়?”

     লোলার্ক চুপ করে থাকে খানিক। তারপর বলে, “কী আশ্চর্য! মোনার্ক প্রজাপতিরা তো সেই কবে থেকেই প্রবল শীত এড়াতে উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিনের দিকে উড়ে আসত। পথেই তাদের মৃত্যু হত, পরবর্তী প্রজন্ম এগিয়ে নিয়ে যেত উড়ান। তাদেরও মৃত্যু হত পথমধ্যে আবার তার পরের প্রজন্ম এগিয়ে যেত। এ তো হাজার হাজার বছর ধরে ঘটে আসা ঘটনা। বিজ্ঞানী বিশ্ববসু ছাড়া আর কেউ তো ভাবল না যে প্রজাপতির জিনের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি মানুষের মধ্যে ইনপ্লান্ট করে দিতে পারলে পৃথিবী থেকে দূরতম গ্রহে পৌঁছানো আর অসম্ভব থাকবে না।”

     “শুধু কি ভাবা? করেও তো দেখালেন। আজ পৃথিবীর যা অবস্থা, বিহঙ্গমের সৃষ্টি না হলে মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যেত।”

     “ঠিক। শুনছি রিফ্রেশিং আর্থ প্রজেক্ট আস্তে আস্তে কাজ করছে। হয়তো আগামী কয়েকশো বছরের মধ্যে আবার একটু একটু করে অনেকটা সবুজ হয়ে উঠবে মাদার আর্থ।”

     কথা বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে এলার সামনে এসে দাঁড়ায় লোলার্ক। এলা বলে, “বিজ্ঞানী বিশ্ববসুর সঠিক অপরাধটা ঠিক কী ছিল জানো?”

     “পরিষ্কার কিছু লেখা নেই তবে শুনেছি ফার্স্ট লেভেল ডিএনএ কনস্ট্রাক্ট করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে এক কঠিন অসুখের বীজ তিনি সেখানে ইনপ্লান্ট করেছিলেন। কী অসুখ সেটা সামনে আনা হয়নি।”

     “কেন?”

     “কারণ অসুখটার লক্ষণ সেই প্রজন্মের কারোর মধ্যেই দেখা যায়নি। এমনকি আজ অবধি এই বিহঙ্গম যানের কেউ ওই অসুখে আক্রান্ত হয়েছে বলে রেকর্ড নেই।”

     “কী অসুখ?”

     লোলার্ক একটু চুপ থেকে বলে, “সঠিক জানি না, তবে পাখিদের থেকে সংক্রমিত। মানুষের মধ্যেও দেখা যেত আগে। ইনফ্যাক্ট মানুষ বা কুকুরের মধ্যে সংক্রমিত হলে অসুখের প্রাবল্য বেড়ে যায় বলে শুনেছি।”

     এলা জবাব দেয় না। এলা কুকুরের ছবি দেখেছে। নতুন গ্রহে কুকুর আছে কি? হয়তো না। তাদের বলা হয়েছে যে গ্রহের দিকে তাদের যাত্রা শুরু হয়েছে সেটি পৃথিবী নয়। মানুষের বাসযোগ্য অন্য একটি গ্রহ। মানবজাতির ধারা অব্যহত রাখতে তাদের এই যাত্রা। তারা এই যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম মাত্র। কয়েক বছর পর এই বিহঙ্গমেই তাদের মৃত্যু হবে। ঠিক তাদের জন্মদাতাদের যেমন হয়েছিল। আর তারপর যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যাবে তাদের সন্তানেরা। তাদের শরীরের অংশ থেকে সৃষ্ট মানব মানবীরা।

     এলা নিজের একটি নাম রেখেছে। শুধুমাত্র অক্ষর সম্বলিত নাম। তার অনুমান লোলার্কও রেখেছে। যদিও কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই তাও তার মনে হয়। বাকি সহকর্মীদের মতো যেন অতখানি যান্ত্রিক চালচলন এই তরুণ বিজ্ঞানীটির নেই। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে লোলার্কের চোখের দিকে। লোলার্ক স্মিত হাসে। চোখ সরাতে মন সায় দেয় না। মনে হয় আমৃত্যু এভাবেই পরস্পরের দিকে চেয়ে… আচমকাই তাদের একসঙ্গে মনে পড়ে যায় যে এমন আচরণ বিহঙ্গমে নিষিদ্ধ। দণ্ডনীয় অপরাধ। ধরা পড়লে দুজনকেই নির্মমভাবে ছুড়ে ফেলা হবে মহাকাশযানের বাইরে। যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যাবে ওদের সহকর্মীরা।

(৩)

বিজ্ঞানী বিশ্ববসু (আই এন ডি ৪০৮৫ –বায়ো সায়েন্স /বি.বি ২০৮৫)

সাল: ৪১২৫

স্থান: দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া

………………………………

জীববিদ্যায় তাঁর গবেষণার ফল নিয়ে মহাকাশবিদদের মধ্যে শোরগোল পড়ে যায় মাত্র আট বছর আগে। আর এখন তো তিনি সারা পৃথিবীর নায়ক। তাঁর আবিষ্কারের জোরেই আগামী এক বছরের মধ্যে জেনাসওফাইভের দিকে যাত্রা করবে বিশাল মহাকাশযান বিহঙ্গম ৯০৪২। প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। সমস্ত সংরক্ষিত ভ্রূণ, ডিম্বাণু, শুক্রাণুতে ইঞ্জেক্ট করা হয়েছে বিশ্ববসুর আবিষ্কার, ‘মোনার্ক মেমরি।’ শুধু একটা শেষ কাজ বাকি।

     এত খ্যাতি, এত নাম যশ তাঁকে সুখী করলেও মাঝেমাঝে সুদূর অতীত থেকে যেন ডাকে তাঁর অপূর্ণ স্বপ্নেরা। সেই ছোট্টবেলায়, ইতিহাসবিদ হওয়ার আকাঙ্খা। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ পরিবারবদ্ধ হয়ে থাকত। মা, বাবা, সন্তান, পরিচারক, পরিচারিকা কখনও কখনও বৃদ্ধ বৃদ্ধারাও। অনেক কঠিন ছিল জীবন তখন। নারীরা শরীরে বহন করতেন সন্তান। উপায় ছিল না বলেই বহন করতেন তা কিন্তু নয়। সেই বহন করা জুড়ে থাকত এক প্রবল মায়া আর ভালোবাসা। স্বাভাবিক উপায়ে না হলে চিকিৎসকের সাহায্য নিতেন, তাতেও না হলে দত্তক নিতেন। একটি ছোট্ট মানুষকে নিজের হাতে পালন করার মধ্যে কী সুখ পেতেন তাঁরা?

     নিজের আগ্রহে অনেক প্রাচীন বইয়ের সফট কপি গোপনে উদ্ধার করেছেন বিশ্ববসু। পড়ে জেনেছেন ভালোবাসা নামক এক জটিল হরমোনাল বিক্রিয়ার কথা।

     স্কুলে বিজ্ঞানের ক্লাসে তাঁর শিক্ষকের একটি কথা তাঁকে আজও অস্থির করে দেয়। একমাত্র মানুষ যিনি বালক বি বি ২০৮৫ কে আড়ালে বিশ্ববসু বলে ডাকতেন।

     “যতই আমরা বিজ্ঞানে উন্নতি করি বিশ্ববসু, ভালোবাসার মতো আশ্চর্য জিনিস আর সৃষ্টি করতে পারব না। ভালোবাসাকে নষ্ট করে ফেলা মানে পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলা। এ মানুষের এক অদ্ভুত গুণ। সহজাত ম্যাজিক বলতে পার।”

     বিজ্ঞানী বিশ্ববসু থামেন। গুরুর কথাটা তাঁর কানে গুঞ্জরিত হতে থাকে। ভালোবাসা মানুষের এক অদ্ভুত গুণ!

     তিনি দ্রুত নেমে আসেন অরণ্যের মাটিতে। গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে থরে থরে ঘুমিয়ে আছে হাজারে হাজারে মোনার্ক প্রজাপতি। কেন এভাবে গাছকে জড়িয়ে থাকে ওরা? এত গবেষণার পরেও জবাব পাননি বিশ্ববসু। সূর্যের প্রথম আলো ডানা ছোঁয়ামাত্র একে একে জেগে ওঠে সবাই, তারপর শুরু ওড়াউড়ি। আজ ঘুমন্ত প্রজাপতিদের পাশ কাটিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে এলেন বিশ্ববসু। সেখানে অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরিহিত দুই দরিদ্র তরুণতরুণী অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। ওদের এখানে থাকার কথা নয়। প্রাচীন মানুষের মতো ভালোবেসে একসঙ্গে থাকে ওরা। হয়তো তাই ওদের সন্তানেরা ভালোবাসতে শেখে। যেভাবে ওড়া শিখেছে। সহজাত প্রক্রিয়ায়। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের শরীর থেকে কিছুটা রক্ত নিয়ে নিতে হবে বিশ্ববসুকে। জেনেসওফাইভে মানুষ থাকবে অথচ ভালোবাসা থাকবে না?

(৪)

স্পেসশিপ বিহঙ্গম ৯০৮২

…………………………

সাল: (পৃথিবীর সূর্যপরিক্রমা হিসেবে) ৫৫৭৮

নীরা (বিহঙ্গম৫৫৫৪- আসট্রোনট/কিউ এ-১২৯)

জন (বিহঙ্গম ৫৫৫০- আসট্রোনট/ ডব্লিউ সি-১০৯)

………………………………………………………………………

শেষমেশ সকলের চোখ এড়িয়ে ল্যাবের ভেতর ঢুকতে সক্ষম হল নীরা আর জন। ভাগ্য সহায় প্রহরী দুই রোবট আগে থেকেই নিষ্ক্রিয় ছিল। এইসময় স্পেসশিপের অধিকাংশ সদস্য নিদ্রামগ্ন। তাদের এই অভিযান কারও গোচরে আসেনি।

     শব্দহীন পায়ে ঠান্ডা চেম্বারের কাছে সরে এল নীরা। ছোট ছোট কাচের শিশিতে সংরক্ষিত তাদের দুজনের দেহাংশ। দ্রুত হাতে নিজেরদের নম্বরের শিশি দুটি তুলে নেয় নীরা আর জন। আদিম মানুষের মতো, পাখির মতো মিলিত হওয়া সম্ভব না হলেও নিজেদের সন্তান সৃষ্টির আকাঙ্খা থাকা কি অন্যায়? ভালোবাসার এইটুকু দাবী তো থাকতেই পারে। পৃথিবী থেকে এত দূরে, গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায় সৃষ্ট হয়েও তাদের হৃদয়ে এত প্রেম, এত মায়া কোথা থেকে জাগরুক হল তার হদিশ পায় না নীরা আর জন।

     দ্রুত আরও দুটি শিশি তুলে নেয় নীরা লেভেল বদলাবদলি করতে হবে। কালই ফার্টিলাইজেশন। পেয়ারিং করা আছে। নীরার পার্টনার বিহঙ্গম৫৫৪৯-আসট্রোনট/ পি সি-১২৭। ফিসফিস করে নামটা পড়ে সে। শিশিটা কোথায় রাখবে বুঝে ওঠার আগেই জন নির্দেশ করে, চাপা গলায় বলে, “বিহঙ্গম ৫৫৫৩-আসট্রোনট /এন জি-২৯৬ এর সঙ্গে রেখে দাও। কার কী আসে যায়?”

     নিজেদের শিশিগুলো পাশাপাশি রেখে পরস্পরের দিকে আকুলভাবে তাকায় তারা। ল্যাবের মৃদু আলোয় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে চোখ ভিজে আসে। এসব কী? কেন হচ্ছে এমন? বিজ্ঞানী হয়েও কেন এত ভাবনা সন্তান নিয়ে? এত টান পরস্পরের প্রতি! যদি ধরা পড়ে তাহলে তো…

     দেওয়ালের সঙ্গে গা মিশিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল লোলার্ক আর এলা। তারা ছাড়াও যে অন্য কেউ ল্যাবে শিশি বদলাতে ঢুকতে পারে, ভেবে দেখেনি আগে। নীরার বলা নম্বরগুলো শুনে ধকধক করে উঠেছিল বুক। শিশি বদলাবদলি হওয়ার পরেও যেন নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না। খানিকবাদে, লোলার্কের বাহু খামচে নিজের দিকে টেনে আনে এলা। ফিসফিস করে বলে, “তুমি ঠিক জানো, বিশ্ববসুর ইঞ্জেকশন কাউকে সংক্রমিত করেনি এখনও?”

     লোলার্ক বিহ্বল চোখে তাকায় প্রেয়সীর দিকে। বুকের ভেতর উথাল পাথাল ঢেউয়ের উপস্থিতি টের পেতে পেতে আস্তে আস্তে নামিয়ে আনে মাথা।

     নিঃশব্দে ভালোবাসার বীজ নিয়ে পৃথিবী থেকে জেনেসওফাইভের দিকে এগিয়ে চলে বিহঙ্গম।

Tags: অন্বেষা রায়, গল্প, প্রমিত নন্দী, ষষ্ঠ বর্ষ প্রথম সংখ্যা

4 thoughts on “উড়ান প্রবাহ

  • May 5, 2021 at 10:07 am
    Permalink

    অসাধারণ ভাবনা!
    এরকম মানবিক ভাবনা সমৃদ্ধ কল্পগল্প পড়তে পাওয়া অনন্য একটা অভিজ্ঞতা।

    Reply
    • May 5, 2021 at 12:41 pm
      Permalink

      আন্তরিক ধন্যবাদ

      Reply
  • May 5, 2021 at 12:55 pm
    Permalink

    অনন্য। অন্য মাত্রার চিন্তা ভাবনা।সাই ফাই এর সঙ্গে মিশে আগে রোমান্স। আরও লেখ।

    Reply
  • May 5, 2021 at 1:09 pm
    Permalink

    খুউউউউউব খুশি হলাম।

    Reply

Leave a Reply to Silvia Ghosh Cancel reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!