আমব্রা

  • লেখক: ঋজু গাঙ্গুলী
  • শিল্পী: প্রমিত নন্দী

গ্যানিমিড সেন্ট্রাল, রিপাবলিক নেভি হেডকোয়ার্টার্স

“দুটো তারার নিজস্ব মণ্ডলের মাঝামাঝি জায়গায়, একটা অদ্ভুত অবস্থানে রয়েছে এই গ্রহটা।”

সুং-কে রীতিমতো উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। পোলানস্কি চোখের ইশারায় তাঁকে শান্ত হতে বললেও প্রবীন বিজ্ঞানী সে-সবের তোয়াক্কা করলেন না। হাত-পা ছুড়ে তিনি পরের কথাগুলো বলে চললেন।

“এটা যদি সারকামবাইনারি হত— মানে দুটো তারাকেই প্রদক্ষিণ করত, তাহলে ব্যাপারটা বোঝা যেত। কিন্তু তার জন্য যে পরিমাণ ভর প্রয়োজন, এটার তা নেই। অথচ এও নিশ্চিত যে এটা ওই লাল দানব, বা বাদামি বামন— কোনোটাকেই প্রদক্ষিণ করছে না! বরং নিজের মতো করে, হাইড্রা ক্লাস্টারের কোনো একটা বিন্দুকে ঘিরে দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ একটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথে এটা ধেয়ে চলেছে মহাকাশের বুক চিরে। এটা কোনো ধূমকেতু নয়, মামুলি গ্রহাণুও নয়। নিজের কক্ষে ঘুরপাক খাওয়া একটা গ্রহ ছাড়া একে কিছুই বলা যায় না। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?”

সুং চুপ করে গেলেন। একাধিক বিজ্ঞানী উশখুশ করছিলেন কিছু বলার জন্য। হাত তুলে তাঁদের থামালেন গ্রেগরি। তারপর নিচু গলায় বললেন, “গ্রহটা আরও অদ্ভুত হয়ে উঠেছে অন্য কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্যও। সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল, আমাদের কোনো প্রোব ওটার সর্বাঙ্গে থাকা কুয়াশার আবরণ ভেদ করে তার নীচের কোনো দৃশ্য তুলে ধরতে পারেনি। আর…”

“আর?” লু-শাও ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন, “কিছু মনে করবেন না, ডক্টর সুং। একটা আন্তর্নাক্ষত্র পর্যবেক্ষণে আপনারা আমাদের কেন জড়াতে চাইছেন— সেটাই বুঝতে পারছি না আমি। এরপর যখন আমরা এগুলো সব ক্লাসিফায়েড বলে দাবি করব, তখন তো আপনারাই আপত্তি জানাবেন!”

“এটা আর সিভিলিয়ান ব্যাপার নেই।” পোলানস্কি বলে উঠলেন, “এই গ্রহের সম্বন্ধে আমরা কিছু না জানলেও একে নিয়ে যে কনফেডারেশন বিস্তর ভাবনা-চিন্তা করেছিল— তার প্রচুর প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে। দুই তারার পরিবারের মাঝে এই গ্রহটাকে বেস হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে ওরা আমাদের বিস্তর ক্ষতি করতে পারত। কিন্তু ওদের কোনো প্রোব ওখান থেকে ফিরে আসেনি! এমনকি ভন-নিউম্যান মেশিন পাঠিয়েও ওরা এই গ্রহের সম্বন্ধে তেমন কিচ্ছু জানতে পারেনি।”

“তা কীভাবে সম্ভব?”

শুধু রয় নয়, ঘরে থাকা আরও অনেকেই একসঙ্গে প্রশ্নটা করলেন। উত্তরে সুং কয়েকটা ইশারা করতেই সামনের ভিজরে মহাকাশের একটা অংশের ছবি ভেসে উঠল।

“এম.এ.ওয়াই.এ কোয়াড্র্যান্ট।” আগের চেয়ে শান্ত, তবে আরেকটু বেশি ধারালো গলায় বলতে শুরু করলেন সুং, “এবার আরেকটু কাছ থেকে দেখুন। দেখতে পাচ্ছেন? ওই যে গ্রহটা— আমব্রা!”

ঘরে থাকা প্রত্যেকেই বুঝতে পারলেন, গ্রহটি সার্থকনামা। ভিজরের কেন্দ্রে থাকলেও তার সর্বাঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরু মেঘ থেকে উজ্জ্বল প্রতিফলন বা রং দেখা যাচ্ছিল না। বরং একটা অদ্ভুত ছায়া যেন ঢেকে রেখেছিল তাকে।

“কনফেডারেশন ওই গ্রহে শেষ অবধি সৈন্য-বোঝাই একটা গানশিপ পাঠায়। সেটা ফিরে আসেনি। তার চেয়েও বড়ো কথা, সেটা এমন কিছু খবর পাঠিয়েছিল যে কনফেডারেশন ওই গ্রহটাকে মিসাইল দিয়ে ঝাঁঝরা করতে চেষ্টা করেছিল।”

“তাহলে তো হয়েই গেল। ওটা নিশ্চয় কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে ঠাসা। ভয়ংকর কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের উপস্থিতিও অসম্ভব নয়। আপনারা কি গ্রহটাকে অস্ত্র নিয়ে গবেষণার জন্য ব্যবহার করতে চাইছেন?” করিম এতক্ষণে নড়েচড়ে বসলেন।

লু-শাও বিরক্ত মুখে বললেন, “চুক্তি অনুযায়ী ওই কোয়াড্র্যান্ট এখন রিপাবলিকের হাতে এলেও সেখানে অস্ত্র নিয়ে গবেষণা চালানো যাবে না। তেমন বুঝলে ওটাকে কোয়ারেন্টাইন করে দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে দিন।”

সুং কোনো কথা না বলে হাত নাড়লেন। ভিজরে দেখা গেল গ্রহটার দিকে নামছে একটা প্রোব। সেটা মেঘের স্তরের মধ্যে ঢুকল। ডানদিকে লম্বালম্বি প্যানেলে ফুটে উঠল একরাশ সংখ্যা আর গ্রাফ। পরক্ষণেই ভিজর অন্ধকার হয়ে গেল।”

ঘরে সবাই চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণের জন্য। সুং একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমাদের সব ক-টা প্রোবের এই দশাই হয়েছে। অথচ কোনো মানুষের চোখ দিয়ে দেখলে একটা অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেজন্যই আমাদের রিপাবলিক প্রশাসনের অনুমোদন আর সাহায্য চাই।”

“মানুষের চোখ দিয়ে!” ধৃতিমান সোজা হয়ে বসলেন। ঘরে সবার নজর গেল তাঁর কৃশকায় শরীরটার দিকে। কেটে-কেটে ধৃতিমান বললেন, “আপনারা আমব্রা-তে মানুষ পাঠিয়েছিলেন তাহলে। কাকে?”

সুং আবার উত্তেজিত হয়ে উঠছিলেন। পোলানস্কি তাঁকে থামিয়ে বললেন, “পর্যবেক্ষণের জন্য আমব্রা-র চারপাশে ঘুরপাক খেতে পারে— এমন একটা স্পেস-স্টেশন আমরা ওখানে চালু করেছিলাম। হাতে গোণা ক’জন বিজ্ঞানী, টেকনিশিয়ান, আর সৈন্য ছাড়া সেখানে কাউকে রাখার ব্যবস্থা ছিল না। সেখানেই ইমরে বলে একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। নিজের শেষ মেডিকেল রিপোর্টটা তিনি আমাদের কাছে পাঠাননি। আমরা আগে জানতাম না যে তাঁর… যে-কোনো সময় কিছু একটা হয়ে যেতে পারত। একের পর এক প্রোবের ব্যর্থতার পর তিনি একটা অদ্ভুত রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন। সেটা আপনারাই দেখুন।”

লগ-সাইন ডক্টর ইমরে, আমব্রা অরবিট

আমাদের অধিকাংশ প্রোব একেবারে প্রাথমিক কিছু পর্যবেক্ষণ ছাড়া কিছুই পাঠাতে পারেনি। কিন্তু কয়েকটা প্রোব খুব দ্রুত অনেকটা নামতে পেরেছিল। তারা আরও কিছু তথ্য পাঠিয়েছে। সেটার বিশ্লেষণ করে আমি একটা অবিশ্বাস্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাচ্ছি। সেই নিয়ে কিছু বলার আগে আমার একটা স্বীকারোক্তি দেওয়ার আছে। সেটাই আগে লিখি।

এই মিশনে আসার আগে আমার মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে বোঝা গেছিল, আমার হাতে আর খুব বেশি সময় নেই। আমার মস্তিষ্কের যে অংশটা স্বাধীনভাবে চিন্তা, বিশেষত কিছু কল্পনা করার ক্ষমতার জন্য দায়ী, সেই নিওকর্টেক্সের ক্ষয় হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। বিশেষ কিছু কম্পাংকের বিকিরণ আর তার প্রতিফলন থেকে ওই অংশটার উপস্থিতি, এমনকি হাল-হকিকত বোঝা যায়। সেটা দিয়েই আমার… অবস্থা বোঝা গেছিল।

একলা, নির্বান্ধব মানুষ আমি। কাজ ছেড়ে ছোট্ট ঘরে বসে মৃত্যুর জন্য দিন গোণা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। তাই যেন-তেন-প্রকারেণ রিপোর্টটা চেপে দিয়ে এই অভিযানে যোগ দিয়েছিলাম। হ্যাঁ, কাজটা বে-আইনি ছিল। হ্যাঁ, আমি স্বার্থপর আচরণ করেছিলাম। তবে সব কাজের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত সেই বিশেষ কম্পাংকের মাধ্যমে নিজের মস্তিষ্কের স্ক্যান করাটা আমার কাছে একটা নেশার মতো হয়ে উঠেছিল এই ক’দিনে। বুদ্ধিমান, সক্ষম একজন মানুষ থেকে জরদ্গব হয়ে যাওয়ার পথে কতটা এগোলাম আমিএটা জানার ইচ্ছে হত সবসময়। হয়তো বুঝতে চাইতাম, কখন কাজ ছেড়ে চুপচাপ শুয়ে পড়া উচিত যাতে আমার একটা ভুলের মাশুল অন্যদের না দিতে হয়। আর সেইজন্যই ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিলাম।

যে-কোনো প্রোব ওই গ্রহের মেঘবলয়ে প্রবেশ করার সঙ্গে-সঙ্গে ওই বিশেষ কম্পাংকের বিকিরণের একটা ঢেউ তাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ওই গ্রহে কেউ আছে, যে বুঝতে চাইছে, আগন্তুক বুদ্ধিমান, স্বাধীন চিন্তায় সক্ষম কোনো প্রাণী কি না!

এটা একবার হয়নি। আমাদের যেক’টা প্রোব একটু গভীরে গিয়ে তথ্য পাঠানোর মতো সময় পেয়েছিল, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে এটা হয়েছে।

তাই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই স্টেশনে একটি পড আছে যা নিয়ে ওই গ্রহের দিকে এগোনো যায়। কতটা নীচে নামতে পারব, নীচে মাটি, লাভা, তরল গ্যাস না সমুদ্র আছে এ-সব নিয়ে ভাবছিই না। ধরে নিন, এটা একটা আত্মঘাতী মিশন। তবে আমার নিওকর্টেক্স এখনও কাজ করছে। তাই আমি দেখতে চাই, ওই বিকিরণ একটা ‘ঠিকঠাক’ সাড়া পেলে কী করে। আমি দেখাতেও চাই, আমব্রা থেকে কেউ আমাদের স্বাগত জানাতে চায়, নাকি এও একটা ফাঁদ।

আমার আর কিছু বলার নেই। পডের রিসিভার এবং ট্র্যান্সমিটার চালু থাকবে। আমি যা-কিছু দেখব, শুনব, অনুভব করব সব আপনারাও দেখবেন, শুনবেন, অনুভব করবেন। শুধু আমার কথা আর শুনতে পাবেন না।

সাইন-আউট।

 

“রেকর্ডিং-টা ইতিমধ্যেই ক্লাসিফায়েড হয়ে গেছে।” পোলানস্কি গম্ভীরভাবে বললেন, “তবে আপনাদের তো দেখতেই হবে।”

“কিন্তু ডক্টর ইমরে…”

রয়ের কথাটা মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন গ্রেগরি, “উনি ফিরে আসেননি। ওঁর পড যা-যা পাঠিয়েছে, তাই দেখাচ্ছি আমরা।”

ভিজরে এবার কাছ থেকে দেখা গেল মেঘের বলয়টাকে। একটু পরেই পডের চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল— যেন ঘন ছায়ার মধ্যে ঢুকেছে সেটা। সেটা নেমে চলল। একপাশে কুচকাওয়াজ করার মতো করে ভিজরের ডানদিকে মিছিল করে চলল সংখ্যা, চিহ্ন, নানা রঙের নকশা।

“এতটা নীচে কোনো প্রোব পৌঁছোতে পারেনি।” রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠলেন সুং, “ডক্টর ইমরে’র ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। ওই বিশেষ বিকিরণটা যে পডে ঢুকে ওঁর নিওকর্টেক্সের উপস্থিতি চিহ্নিত করেছিল— এটা নিশ্চিতভাবে বোঝা গেছে। আর ওই দেখুন!”

ভিজরে ঝলসে উঠল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। দেখা গেল, মেঘ সরে যাচ্ছে। নীচে দেখা যাচ্ছে মাটি, গাছপালা, সবুজ প্রান্তর আর নীল জল! অবাক বিস্ময়ে প্রত্যেকে সামনে ঝুঁকে পড়লেন।

সেই মুহূর্তেই স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল। অথচ তার ডানদিকের অংশে সংখ্যাদের দ্রুত-চলন অব্যাহত রইল।

“কী হল?” লু-শাও বলে উঠলেন, “পডটা কি…?”

“পড ঠিক ছিল।” গম্ভীরভাবে বললেন সুং, “ডানদিকের সংখ্যাগুলো দেখছেন? ওগুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে, ক্রমেই নীচে নামছে পড। বায়ুমণ্ডলের চাপ ক্রমেই বাড়ছে ওটার ওপর। যে-সব গ্যাস বা রাসায়নিকের উপস্থিতির চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে ওই সংখ্যাগুলো থেকে, তাতে আমরা যা দেখলাম তেমন কিছু ওই গ্রহে থাকা অসম্ভব! অথচ… যা দেখেছি তাকে অস্বীকার করি কী করে?”

“সংখ্যাগুলো এত দ্রুত বদলাচ্ছে কেন?” রয় জিজ্ঞেস করল।

“পড-টা আর নীচে নামছিল না তখন।” পোলানস্কি বললেন, “ওটাকে টেনে নামানো হচ্ছিল। সেজন্যই ওটার গতি অত বেড়ে গেছিল।”

“যাহ্‌!” লু-শাও অস্ফুটে বলে উঠলেন, “আর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি পডের যন্ত্রগুলো এই সময় বিগড়ে গেছিল?”

“তা ছাড়া কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব নয়।” পোলানস্কি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কিন্তু তাতেই প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ইমরে যা দেখেছিলেন, আর আমরাও যা দেখেছি— তা সত্যি হলে কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। পড তাঁকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নামতে পারত ওই গ্রহে। তা সত্বেও এ-ঘটনা ঘটেছে। এর থেকে দুটো জিনিস বোঝা যায়।

এক, ওই গ্রহে এমন কেউ বা কিছু আছে যা আমাদের হাত থেকে পডের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে পারে স্রেফ বিকিরণ আর ওই মেঘের মধ্যে উপস্থিত রাসায়নিককে কাজে লাগিয়ে।

দুই, স্বাধীন বুদ্ধিমত্তার সন্ধান পেলে সে তাকে নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে।

কিন্তু সে কী চায়? ওই অস্বাভাবিক গ্রহে ওইরকম মাটি, গাছ, জল— এ-সব কীভাবে এল? বিজ্ঞানের কোনো যুক্তিতেই তো এই জিনিস হতে পারে না।”

“সত্যিই কি ওগুলো ওই গ্রহে আছে?”

ঘরে গুঞ্জন জোরালো হয়ে উঠছিল। ধৃতিমানের ঈষৎ খ্যানখেনে গলা শুনে আবার সবাই চুপ করে গেলেন।

“মানে?” লু-শাও কিছুটা বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা সবাই তো দেখলাম…”

“ডক্টর ইমরে যে রোগে আক্রান্ত, তার সম্বন্ধে আমিও কিছুটা জানি।” অপ্রত্যাশিত রকমের নিচু গলায় বললেন ধৃতিমান, “এই ব্যাধিতে একটা স্তরের পর নিওকর্টেক্স বিশ্লেষণের ক্ষমতা হারাতে শুরু করে। তখন অদ্ভুত সব রং, নকশা, সংখ্যা— এ-সব দেখে রোগী। এমনিতে পডের ক্যামেরায় ওই কালো ছায়াই আসার কথা ছিল। কিন্তু আমার ধারণা, ইমরে পডের কম্পিউটারে নিজের মস্তিষ্ককে যুক্ত করে দিয়েছিলেন। আমব্রা-তে থাকা সেই ব্যক্তি, বস্তু বা সত্তাকে তিনি বোঝাতে চাইছিলেন যে পড-টাই সচেতন, বুদ্ধি-সম্পন্ন কোনো প্রাণী। সেজন্যই, তাঁর অসুস্থ মস্তিষ্ক মনের চোখে তাঁকে যা দেখিয়েছে, তিনিও আমাদের তাই দেখিয়েছেন।”

“আপনি ঠিকই ধরেছেন, প্রফেসর।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুং, “আমরাও তেমনই ভেবেছি। সব অন্ধকার হয়ে গেছিল, কারণ ইমরে অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। বা… আর কিছু দেখার অবস্থায় ছিলেন না।”

“তাহলে… ওগুলোর সবটাই বিভ্রম? ইল্যুশন?” লু-শাওয়ের গলাটা খুব তেতো শোনাল।

“তাই তো মনে হচ্ছে।” কিছুটা স্বাভাবিক গলায় বললেন ধৃতিমান, “তবে তাতেও আমব্রা-র রহস্যভেদ হল কই? কে সেই সত্তা? কীভাবে সে ওই গ্রহে বেঁচে আছে? কীভাবে সে আমাদের পড বা প্রোবকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে? ডক্টর ইমরে’র কী হয়েছিল শেষ অবধি?”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সবার নজর ঘুরে গেল শান্তভাবে বসে থাকা ছোটোখাটো মানুষটির দিকে। মাথা নেড়ে নোমুরা বললেন, “আমার প্রোগ্রাম তৈরিই আছে। গ্রেগরি যে প্রোবটা বানিয়েছেন, তাতে সেটা ব্যবহার করাও যাবে। কিন্তু মনে-মনে হলেও কে নামবে আমব্রা-তে?”

রয় উঠে দাঁড়াল।

“আপনি নিশ্চিত?” করিমের গলা ঈষৎ কেঁপে গেল, “এখানে কিন্তু কোনো জোরাজুরির ব্যাপার নেই। আপনার মস্তিষ্কের ম্যাপিং নোমুরা আর গ্রেগরি’র কাছে আছে ঠিকই। তবু, আপনি যদি না চান তাহলে আমরা অন্য কাউকে খুঁজব।”

উত্তর দিল না রয়। তার মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

অন্য কেউ না বুঝলেও একজন তার অর্থ বুঝলেন। কিন্তু তিনি সেই নিয়ে মুখ খোলেননি। বরং আমব্রা-র সবচেয়ে কাছে পৌঁছোনোর মতো লুপ খোলার অংকে ততক্ষণে ডুবে গেছিলেন ধৃতিমান।

এম.এ.ওয়াই.এ কোয়াড্র্যান্ট, আমব্রা থেকে এক লুপ দূরে, রিপাবলিক ফ্লিট

“কী ভাবছেন, প্রফেসর?”

সচরাচর গ্যানিমিড সেন্ট্রাল ছেড়ে নড়তে না চাইলেও এবারের অদ্ভুত গন্তব্যের কথা মাথায় রেখে বিজ্ঞানী নিজেই আমব্রা-র চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া স্পেস-স্টেশন অবধি আসতে চেয়েছিলেন। লু-শাও এবং করিম— দু’জনেই এই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কনফেডারেশন সরকারিভাবে পিছু হটলেও তাদের বহু কর্মী, এজেন্ট, গুপ্তচর এই কোয়াড্র্যান্টে এখনও সক্রিয়। স্পেস-টাইম লুপের প্রযুক্তি যাঁর মাথা থেকে বেরিয়েছে, সেই মানুষটিকে হাতের কাছে পেলে তারা কিছু করার চেষ্টা করতেই পারে।

কিন্তু কোনো যুক্তি দিয়েই ধৃতিমানকে ঠেকানো যায়নি। সুং, গ্রেগরি, নোমুরা— এঁদের তো রাখতেই হত। এরপর যখন লু-শাও নিজেও যেতে চাইলেন, তখন পোলানস্কি আর করিম একেবারে বেঁকে বসেছিলেন। শেষ অবধি একটা আস্ত বাহিনীকেই পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় রিপাবলিক প্রশাসন।

তারই কম্যান্ড পোস্টের একপাশে দাঁড়িয়ে ভাবনায় ডুবে গেছিলেন ধৃতিমান।

“হুঁ?” করিমের প্রশ্ন শুনে একটু চমকেই উঠলেন ধৃতিমান। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “একটা ব্যাপার আমাকে ভাবাচ্ছে, জেনারেল।”

“মাত্র একটা?” করিম হাসার চেষ্টা করলেন, “আমার তো খাওয়া-ঘুম উড়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে এই মিশন নিয়ে। এম.এ.ওয়াই.এ কোয়াড্র্যান্টের তিন দিকে কনফেডারেশনের এলাকা। বদমায়েশগুলো কিছু করলে সহজে পার পাবে না। কিন্তু এতজন হাই-প্রোফাইল লোক নিয়ে এই এলাকায় আসার পর থেকে আমাকে যে কী পরিমাণে নজরদারি করতে আর করাতে হচ্ছে, সে আপনি ভাবতে পারবেন না!”

“সেটাই তো আমাকে ভাবাচ্ছে।” ভিজরের পাশে থাকা স্টার-ম্যাপের বুকে ফ্লিটের চলনটা আঙুল তুলে দেখিয়ে ধৃতিমান বললেন, “এমন বিপদসঙ্কুল এলাকায় অভিযান চালাতে হলে বিপুল বন্দোবস্ত করতেই হয়। এদিকে সামান্য খোঁচা খেলেই ভয়ংকর প্রত্যাঘাত করার জন্য ফ্লিট একেবারে উশখুশ করছে। মাত্র একটা গ্রহের সূত্র ধরে আবার যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়ার এমন সুযোগ এর আগে বোধহয় কোনো পক্ষই পায়নি। এটা ফাঁদ নয় তো?”

“হতেই পারে।” লু-শাও-কে দেখে ধৃতিমানের মনে হল, ভদ্রমহিলা বোধহয় ক’দিন ঘুমোতে পারেননি। রিপাবলিকের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মন্ত্রী ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, “নেহাত সুং আর পোলানস্কি-কে আমরা ভীষণভাবে বিশ্বাস করি, তাই… ওঁদের এইসব কথা শুনতে রাজি হয়েছিলাম। তখন ব্যাপারটা মাথায় রাখা উচিত ছিল। আমব্রা-র অবস্থান খুবই অদ্ভুত। কনফেডারেশনের নিজস্ব এলাকায় লুপ না খুলে ওখানে প্রোব পাঠাতে হলে এই কোয়াড্র্যান্টে আসতেই হবে। দূরত্বটা প্রফেসরের আবিষ্কার দিয়ে সামলে নেওয়া যায়। কিন্তু এখানে এসেই আমরা, যাকে বলে, একেবারে শত্রু-বেষ্টিত হয়ে পড়েছি। ওদের মতি-গতি কী বুঝছেন, জেনারেল?”

“এমনিতে তো সব শান্তই।” চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন করিম, “আমাদের কাছে যা অস্ত্র আছে তাই দিয়ে এই তিনটে কোয়াড্র্যান্টকে ছারখার করে দেওয়াই যায়। তাই ওরা গোলমাল নাও করতে পারে। তবে এতজন বিজ্ঞানী, গোপন প্রযুক্তি, রয়ের মতো একজন সিভিলিয়ান, আপনার মতো একজন মন্ত্রী— এই নিয়ে এখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক মুহূর্তও থাকার ইচ্ছে নেই আমার।”

“রয়!” অস্ফুটে বললেন লু-শাও, “সবটা শেষ অবধি নির্ভর করবে ওঁরই ওপর। কিন্তু জেনারেল, এমন একটা মিশনের জন্য কি সেনাবাহিনীর কাউকে পাঠানো যেত না? হয়তো ওঁর জন্য কোনো প্রিয়জন অপেক্ষা করে আছেন গ্যানিমিডে। একজন সিভিলিয়ান জার্নালিস্ট এমনিতে বহু বিপদের সম্মুখীন হন— এ-কথা জানি। তবু, আমরা এই প্রোবে তাঁর সুরক্ষার জন্য যত ব্যবস্থাই রাখি না কেন, এইরকম একটা মিশন… এটা কি ঠিক হল?”

করিম কিছু একটা বলতে গেলেন। তারপর পাশে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে আড়চোখে চেয়ে চুপ করে গেলেন।

ধৃতিমান অবশ্য আর কিছু শুনছিলেন না। ভিজরের দিকে তাকিয়ে তিনি তখনও মেঘে ঢাকা ছোট্ট গ্রহটাকে খুঁজছিলেন— যেটা তাঁদের সবার জন্য অপেক্ষা করে আছে লুপের অন্য প্রান্তে।

আমব্রা-র চারপাশে, স্পেস-স্টেশন

“পুরোনো প্রোটোকল। চেনা রুটিন। তবু ব্যাপারগুলো মাথার রাখতে চেষ্টা কোরো।”

সামনের প্যানেল থেকে মুখ না তুলেই বললেন ধৃতিমান। চোখের পাতা ফেলে সায় দিল রয়। দেহের আর কোনো অঙ্গ নাড়ানোর উপায় নেই ওর। এমনকি চোখটাও এবার… হ্যাঁ, ওটাও এবার জুড়ে গেল প্রোবের সঙ্গে। ড্যাশবোর্ডের অসংখ্য আলোকবিন্দু মুহূর্তের জন্য ঝলসে উঠল ওর মাথার মধ্যে। তারপরেই সেন্সরের চোখ দিয়ে দেখা আমব্রা ছড়িয়ে পড়ল ওর সামনে।

তবু, কেন যেন আজ রুচিরা’র কথাই বড্ড বেশি করে মনে হচ্ছিল।

“প্রোবের প্রতিটি সেন্সর আপনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, রয়।” নোমুরা মিষ্টি হেসে বললেন, “মাথাটা ফাঁকা রাখতে চেষ্টা করুন। নইলে আপনার ভাবনাগুলো ওদের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করবে।”

“আপনি ভাববেন না, রয়।” লু-শাও রয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন, “কোনোরকম গোলমালের সম্ভাবনা দেখলেই আপনাকে ওই প্রোব থেকে আলাদা করে আনব। আমরা সবাই রইলাম আপনার পাশে।”

আর… সবসময়ের জন্য কার পাশে যেন থাকার কথা ছিল রয়ের?

“সবাই তৈরি?” করিম গ্রেগরি’র দিকে ঘুরে বললেন, “তাহলে এবার শুরু করা যাক।”

মহাকাশের বুকে নাচের মতো ভঙ্গিতে ঘুরপাক খেল স্টেশন। তার ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেখান থেকে ছিটকে গেল একটা প্রোব। পৃথিবীর সমুদ্রে এককালে ঘুরে বেড়ানো তিমি বা ডলফিনের চেহারার সঙ্গে তার আশ্চর্য মিল ছিল।

“ঠিক এই আকারটা কেন বেছেছিলেন আপনারা?” পোলানস্কি কৌতূহলী হলেন।

“মূল কাঠামোটা তৈরিই ছিল।” গ্রেগরি বললেন, “প্রফেসরের কথামতো ওটাকে এমন আকার দিয়েছিলাম যাতে বাইরে থেকে দেখতে ‘লং-ফিনড পাইলট হোয়েল’ নামে একধরনের তিমির মতো দেখায়। ওদের নিওকর্টিকাল স্নায়ুকোষের সংখ্যা নাকি সবচেয়ে বেশি।”

“আমব্রা-তে যে আছে, সে প্রোবটাকে ওই প্রাণী বলে ভাববে— এই আশাতেই এত কিছু।” গম্ভীর গলায় বললেন ধৃতিমান, “যতক্ষণ এই ভ্রমটা স্থায়ী হবে, তত গভীরে নামতে পারবে প্রোব। তত বেশি করে জায়গাটা সম্বন্ধে দেখতে, জানতে পারবে রয়।”

আমব্রা-র চারপাশে দ্রুত ঘুরপাক খেল প্রোব। চন্দ্রোদয়ের মতো করে দূর দিগন্ত থেকে লাফিয়ে উঠল তার ঝলমলে চেহারা। তারপরেই সেটা তির্যকভাবে ডুব দিল মেঘের গভীরে।

ঘন কালো মেঘ! চারপাশে, যতদূরে চোখ যায়, শুধু এটাই ধরা পড়ছিল ভিজরে। তবে তাদের দেখে পৃথিবীর আকাশে ঘুরে বেড়ানো সজল মেঘের কথা মনে পড়ে না। বরং আগুন থেকে লাফিয়ে ওঠা ক্রুদ্ধ ধোঁয়ার পুঞ্জের কথাই মনে করিয়ে দেয় তারা।

“মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সোডিয়াম…” এক মনে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছিলেন সুং, “জলীয় বাষ্প! তবে এর বাইরেও বেশ কিছু রাসায়নিক আছে এই বায়ুমণ্ডলে। নমুনা তুলে আনতে পারলে বিশ্লেষণ করা যেত।”

“এখনও ছবি পাচ্ছি আমরা।” রুদ্ধকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন পোলানস্কি, “তাহলে কি সেই বিকিরণটা ইতিমধ্যেই…”

একটা তীক্ষ্ণ শব্দ তুলল একটা অ্যালার্ম। ধৃতিমান সংক্ষেপে বললেন, “এল। এবার?”

ভিজর থেকে হঠাৎ সুড়ঙ্গ বানানোর মতো করে মেঘ সরে গেল দু’পাশে।

অনেক নীচে দেখা গেল একটা জনবসতির আভাস। তার লাগোয়া একটুকরো ঘন সবুজ বন। তার ওপাশে নীলচে জল— কোনো হ্রদ? প্রোব অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে নামতে শুরু করল সেইদিক লক্ষ্য করে।

হঠাৎ ঘন হয়ে ছায়ারা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রোবের ওপর। সবক’টা স্ক্রিন এবং ভিজর অন্ধকার হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ।

আমব্রা, রয়

এ কোথায় এসেছে সে?

অবাক বিস্ময়ে সামনে তাকিয়ে ছিল রয়। একটু-একটু করে, বিস্মৃতির চাদর সরিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছিল পুরোনো কথাগুলো।

ক্যাম্পাস! আজ এত বছর পর সে নিজের পুরোনো ক্যাম্পাসে এসে পড়েছে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হল? তাহলে কি… হ্যাঁ, সেটাই হবে।

ঠিকই তো। কোথায় যাবে সে? কেনই বা যাবে? রুচিরা, নিজের পড়া— সব ফেলে নিউজকর্পে চাকরি করার অদ্ভুত প্ল্যানটা যে কেন তার মাথায় এসেছিল! প্রফেসর ধৃতিমানের ওপর যতই রাগ বা অভিমান হোক না কেন, ওইরকম কিছু করা যায় নাকি?

কিন্তু কোথায় যেন গেছিল সে! মহাকাশ, কালো ধোঁয়া, ছায়াদের ঘন হয়ে ওঠা— এগুলো কি তাহলে স্বপ্নে দেখল রয়?

অবাক হয়ে মাথার ওপরে, পেছনে, এমনকি পায়ের নীচটা অবধি ভালোভাবে দেখে নিল রয়। নাহ্‌, কোত্থাও কোনো গোলমাল নেই। ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ। পেছনে লাইব্রেরি আর তার পাশেই জেনেটিক্স ল্যাবরেটরি— যেখানে ওরা রোজ আড্ডা মারে। পায়ের নীচে ঘাস আর মাটি। সামনে…

আরে! সে তো ক্যাম্পাসের শেষ মাথার জঙ্গলটার কাছেই এসে পড়েছে। এত তাড়াতাড়ি এতটা জায়গা সে পেরোল কী করে?

অবশ্য তাড়াতাড়িই বা কীভাবে বলা যায়? সূর্য তো এর মধ্যেই কমলা হয়ে গেছে। এইসময় ওপাশের হ্রদে ভারী সুন্দর আলোছায়ার ঝিলমিল চলে। রুচিরা মাঝেমধ্যেই ওখানে স্নানে যায়। রয়েরও খুব ইচ্ছে করে ওর সঙ্গে জলে নামতে। কিন্তু রুচিরা যদি কিছু মনে করে?

ওই তো জলে নেমেছে রুচিরা। কী অপূর্ব লাগছে ওকে!

একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে জলের দিকে তাকাল রয়।

কমলা আলোয় ভেসে যাচ্ছে আকাশ। তার একটা দিক এর মধ্যেই বেগুনি হয়ে উঠছে— যেন খুব তাড়াতাড়ি রাত নেমে আসছে।

কিচিরমিচির শব্দগুলো কীসের? ওহ! পাখিরা ঘরে ফিরছে।

বাতাসে একটা হালকা গরম ভাব এখনও রয়ে গেছে। রয় কি তাহলে স্নান করে নেবে… রুচিরা’র সঙ্গেই?

“রয়?”

রুচিরা তাকে দেখতে পেয়েছে! রয়ের কি এখান থেকে সরে যাওয়া উচিত?

“অ্যাই বোকা ছেলে! ওখানে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি না মেরে জলে নামতে পারছ না? এত ভয় কীসের? সাঁতার জান না বুঝি?”

সাঁতার! হ্যাঁ, জানে তো সে। খুব ভালোই সাঁতার কাঁটে রয়। কিন্তু রুচিরাই তো বরং… কী যেন বলেছিল ও? একসময় সাঁতার কাটতে ভালোবাসত, কিন্তু এখন আর পারে না।

কে বলেছে পারে না? ওই তো রুচিরা সাঁতার কাটছে!

“এসো!” জল থেকে শরীরের অনাবৃত ঊর্ধাঙ্গ তুলে হাত নাড়ল রুচিরা, “এরপর কিন্তু রাত হয়ে যাবে। তখন বাবা আমাদের এখানে দেখলে…”

খিলখিলিয়ে হেসে উঠল রুচিরা। সেই হাসি ওই পড়ন্ত কমলা রোদ আর জলের ঝিলমিলের মধ্যে মিশে গেল গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে। রয়ের মনে হল, একটা নিষিদ্ধ সুখের মধ্যে সে যেন একটু-একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে।

পরনের পোশাকটা খোলার জন্য হাত চালাল রয়।

আমব্রা-র চারপাশে, স্পেস-স্টেশন

“কী হল? কী হচ্ছে আমব্রা-তে?” লু-শাও প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।

পোলানস্কি অসহায়ভাবে বোঝালেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে বানানো প্রোব আর তাঁদের আজ্ঞাবহ নেই। তবে গ্রেগরি সেদিকে কর্ণপাত করেননি। তিনি আর নোমুরা তখন ক্রমাগত একের পর এক রুটিন দিয়ে অবাধ্য তিমিটিকে জালবন্দি করার চেষ্টা করছিলেন।

নিবাত নিষ্কম্প শিখার মতো একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ধৃতিমান। তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল রয়ের শারীরিক অবস্থার পরিচয় দিতে-থাকা মনিটরটির দিকে।

“প্রফেসর!” করিম উত্তেজিতভাবে বললেন, “রয়ের সঙ্গে কোনোভাবে কি যোগাযোগ করা সম্ভব?”

“আচ্ছা, ডক্টর সুং…” ক্লাস নেওয়ার মতো ধীরলয়ে ধৃতিমান জিজ্ঞেস করলেন, “ডক্টর ইমরে’র সম্বন্ধে আপনি কতটুকু জানেন?”

ঘরে সবাই থমকে গেল মুহূর্তের জন্য। সুং আর করিম একে অপরের দিকে তাকালেন। তারপর সুং বললেন, “ইমরে আমার সঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছে। তাই… ওর সম্বন্ধে অনেকটাই জানি।”

“ওঁর জীবনের অপূর্ণ আশা কী ছিল… বলতে পারবেন?”

কম্যান্ড রুমের প্রায় সবাই হাঁ করে এই বিচিত্র কথোপকথন শুনছিলেন। শুধু গ্রেগরি আর নোমুরা কন্সোল থেকে মাথা না তুলে প্রোবটার নাগাল পাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছিলেন।

“অপূর্ণ আশা?” অবাক হয়ে ধৃতিমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন সুং। তারপর, গভীর ঘুম থেকে ওঠার মতো করে তাঁর চোখের গভীরে ঝলসে উঠল একটা দুই আর দুই জুড়ে চার হওয়ার আভাস।

“ইমরে কনফেডারেশন ছেড়ে চলে এসেছিল বহু বছর আগে। ওদের গ্রহটা ওখানকার শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। যা জেনেছিলাম তাতে, ওই বিদ্রোহের শাস্তি হিসেবে গ্রহটাকে একেবারে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। খুব শান্ত, নির্জন, সুন্দর গ্রহ ছিল ওটা। তাকেই স্রেফ পোড়া কয়লার মতো করে দিয়েছিল কনফেডারেশন। তবু, সেখানেই ফিরে যাওয়ার কথা সবসময় ভাবত ইমরে।”

“তাহলে আমি ঠিকই ধরেছি।” দারুণ উত্তেজনায় ধৃতিমানের গলা কাঁপতে শুরু করল, “এক ঝলকের জন্য দেখলেও রয় যা দেখেছিল, তাকে আমি চিনতে পেরেছি। ওটা আমার পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। ওখানেই রয় আমার কাছে পড়তে এসেছিল। ও এখনও মনে-মনে ওখানে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। ওখানেই তো…”

“শুনছেন!”

সবাই চমকে তাকাল। রয়ের শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ডাক্তার চিৎকার করে বলে উঠলেন, “রয়ের শরীর একটু-একটু করে অসাড় হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, প্রোবের সঙ্গে যুক্ত ওঁর সবক’টা সেন্সরি রিসেপ্টর অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে ওঁর মস্তিষ্কের নিওকর্টেক্স ভীষণভাবে সক্রিয়। কিন্তু সেটাও বিপজ্জনক। যেকোনো মুহূর্তে ওঁর ব্রেন-স্ট্রোক হতে পারে।”

“রয়-কে প্রোব থেকে আলাদা করে দিন।” বলে উঠলেন লু-শাও। তারপর করিমের দিকে তাকিয়ে জুড়লেন, “পুরো দায়িত্ব আমার। এক্ষুনি ওকে ফিরিয়ে আনুন!”

“হ্যাঁ, ওকে ফিরিয়ে আনুন।” করিমও সায় দিলেন, “আমব্রা-র রহস্যের তুলনায় রয়ের জীবনের মূল্য অনেক বেশি।”

“কী করছেন আপনারা?” রয়ের শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন ধৃতিমান, “কয়েকটা ইলেকট্রোড শরীর থেকে সরাতে আর কতক্ষণ লাগবে?”

“আমরা… পারছি না, প্রফেসর!” অসহায়ভাবে বলে উঠলেন আরেকজন ডাক্তার, “রয়ের মস্তিষ্কের সঙ্গে প্রোবের যোগাযোগ ছিন্ন করার চেষ্টা করলেই কিছু চিহ্ন দেখছি আমরা। সেগুলো থেকে মনে হয়, জোর করে এই সংযোগ ছিন্ন করলে যেকোনো মুহূর্তে ওঁর এপিলেপটিক সিজার হতে পারে। সেক্ষেত্রে পক্ষাঘাত…”

“না!” আর্তনাদ করে উঠলেন ধৃতিমান। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি, “জোর করে সংযোগ ছিন্ন করা যাবে না— সে না হয় বুঝলাম। তাহলে কীভাবে ওকে এই তারের জাল থেকে বের করা সম্ভব?”

“রয়ের চেতনা এই মুহূর্তে প্রোবের সেন্সরের সঙ্গে যুক্ত, প্রফেসর।” নোমুরা থেমে-থেমে বললেন, “ওই সেন্সরে যা দেখানো, শোনানো বা বোঝানো হচ্ছে, তাতেই ডুবে আছে রয়। যদি সেখান থেকে রয়কে কোনোভাবে তার নিজের ভাবনা, তার নিজের বাস্তবে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলেই প্রোব থেকে তাকে আলাদা করে দেওয়া যাবে।”

“বুঝলাম।” সামনে রাখা চেয়ারের হাতলটা চেপে ধরে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন ধৃতিমান, “রয়ের শরীরের এমন কোনো অঙ্গ এখনও সক্রিয় আছে, যেখানে আমরা কোনো অনুভূতি জাগিয়ে তুললে তা ওর মস্তিষ্কে পৌঁছোতে পারবে?”

“আছে!” উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন গ্রেগরি, “আমব্রা-র বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণের শব্দে যাতে রয়ের কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য শব্দের রেকর্ডিং আলাদাভাবে হয়েছে। সরাসরি রয়ের মস্তিষ্কের সঙ্গে প্রোব থেকে অডিটরি ইনপুট আর আউটপুটের কোনো ব্যবস্থা রাখিনি আমরা। ওর ককলিয়া সক্রিয়। শব্দ শুনতে পাবে রয়!”

“রয়!” প্রায় একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন ঘরের সবক’জন মানুষ।

কিছুই হল না তাতে; বরং গ্রাফে ওঠানামা করা দাগটা দ্রুত সরলরৈখিক চেহারা নিতে শুরু করল।

“স্ট্রোক হতে চলেছে!” আর্তনাদ করে উঠলেন একজন ডাক্তার, “কিন্তু আমরা এই ইলেকট্রোডগুলো না সরিয়ে তো কিছু করতেও পারব না।”

“সরে দাঁড়ান আপনারা।” ধৃতিমানের গলা কাঁপছিল থরথর করে, তবু সেই আদেশ লঙ্ঘন করার ক্ষমতা কারও ছিল না। রয়ের পাশ থেকে সবাই সরে দাঁড়ালেন।

পকেট থেকে একটা ছোট্ট ঘণ্টার মতো চেহারার ইলেকট্রিক বেল বের করলেন ধৃতিমান। তারপর রয়ের কানের একদম কাছে নিয়ে গিয়ে ঘণ্টার নীচে ছোট্ট বোতামটা টিপলেন তিনি।

আমব্রা, রয়

“টিং-টিং-টিং-টিং-টিং…!”

মিষ্টি, কিন্তু তীক্ষ্ণ আওয়াজটা হয়েই চলছিল।

“আর কত দেরি করবে, শুনি?”

গলা অবধি জলের নীচে থাকলেও রুচিরা যে যুদ্ধং দেহি ভঙ্গিতে হাতদুটোকে বেঁকিয়ে কোমরে রেখে তার জন্য অপেক্ষা করছে— এটা বেশ বুঝতে পারছিল রয়। তবু তার রাগ হচ্ছিল না; খারাপ লাগছিল না। বরং একটা অদ্ভুত ভালো-লাগার আবেশে তার শরীর ভারী হয়ে আসছিল।

পোশাক খুলে ফেলেছিল সে। জলের দিকে হাঁটছিল সে। রুচিরা’র দুই বাহুর উষ্ণতা, নাকি জলের শীতল আলিঙ্গন— ঠিক কীসের কথা ভেবে তার সর্বাঙ্গে শিহরন জাগছিল, তা জানে না রয়। তবে এত আনন্দ, এত শান্তি সে কোনোদিন পায়নি।

শুধু যদি ওই অসহ্য আওয়াজটা না থাকত!

ছলাৎ।

জলে নামল রয়। রুচিরা কিছুটা দূর থেকেই তার মাথা-মুখ ভিজিয়ে দিল জল ছিটিয়ে। রোদের শেষ আলোটুকু ভেঙেচুরে গেল সেই জলকণার স্পর্শে।

“টিং-টিং-টিং-টিং-টিং…!”

আর থাকতে পারল না রয়। উত্তেজিতভাবে সে জিজ্ঞেস করল, “ওটা কীসের শব্দ, রুচিরা?”

“কোনটা?” অবাক চোখে তাকাল রুচিরা।

“শুনতে পাচ্ছ না? ওই যে ঘণ্টির মতো টিং-টিং করে যে আওয়াজটা হয়েই যাচ্ছে!”

“কই? এখানে তো আর কোনো আওয়াজ নেই! ও, বুঝেছি।”

রয়ের কাছে ভেসে এল রুচিরা। অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ আসছিল ওর শরীর থেকে। রয়ের চোখে চোখ রেখে রুচিরা বলল, “বাবা’র ল্যাবের অ্যালার্মটাকে তুমি এত ভয় পাও যে আমার পাশে থাকলেও সেটাই কানে আসে!”

খিলখিল করে হেসে উঠল রুচিরা। হাসল রয়ও। তবু… শব্দটা বন্ধ হল না।

আচ্ছা, এটা কি সত্যিই অ্যালার্মের শব্দ? কীসের অ্যালার্ম?

আর রুচিরা’র পাশে থাকার সময় অ্যালার্ম বাজবে কেন?

থমকে গেল রয়। জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটতে-কাটতে দূরে চলে যাচ্ছিল রুচিরা। সে অবাক হয়ে ঘুরে চিৎকার করল, “কী হল? আসবে না?”

রুচিরা… কী করে সাঁতার কাটছে?

মুহূর্তের জন্য রয়ের চোখের সামনে যেন একটা বিস্ফোরণ হল। সব রং, সব দৃশ্য গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে গিয়ে মুহূর্তের জন্য দেখা গেল ঘোর কালো আর লালে মেশানো একটা ভয়াবহ প্রান্তর। পরক্ষণেই আবার সবটা জোড়া লেগে ফিরে এল সেই হ্রদ, গাছ, কমলা থেকে বেগুনি হয়ে ওঠা আকাশ, আর রুচিরা।

“তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে, রয়?” দ্রুত তার দিকে সাঁতরে এগিয়ে আসছিল রুচিরা, “দাঁড়াও। আমি আসছি, ভয় পেও না। আমি তোমার পাশে সবসময় আছি।”

পাশে! রুচিরা তার পাশে… নাকি তাকে থাকতে হবে রুচিরার পাশে?

ওই ঘণ্টিটা বাজলে তাকে রুচিরার পাশে আসতেই হবে। না হলে… না হলে কী?

“এই!” রয়ের অসাড় শরীরটাকে জড়িয়ে ধরল রুচিরা। কিন্তু কোনো উষ্ণতা অনুভব করল না রয়। রুচিরা তখনও বলছিল, “এই তো আমি! কী হয়েছিল তোমার? ফিরে যাবে? আমাকে ধরো, তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। এসো, আমার সঙ্গে এসো।”

রুচিরা তাকে ধরবে? কীভাবে? তার তো শরীরের নীচের অংশটার পাশাপাশি এবার হাতগুলোও একটু-একটু করে অসাড় হয়ে পড়ছে। শুধু আঙুল দিয়ে ওই ঘণ্টিটা সে বাজাতে পারে— যেটাতে সাড়া দিতেই হয় দু’জন মানুষকে— শত কাজের মধ্যেও।

ওই ঘণ্টিটা… যার আওয়াজ সে শুনতে পাচ্ছিল… পাচ্ছে! তাহলে এ-সব কী?

কোথায় রয়েছে সে?

মনে পড়েছে! সে আমব্রা-তে নামছিল প্রোবের সঙ্গে— মনে-মনে। কিন্তু তাহলে…

আকাশ থেকে রং হারিয়ে যাচ্ছিল। গাছগুলো রেণু-রেণু হয়ে মিশে যাচ্ছিল বাতাসে। মুছে যাচ্ছিল জল, শব্দ, পাখি, আলো, গন্ধ।

“রয়?” অস্ফুটে কে যেন একবার ডাকল।

তারপর রয়ের সামনে রইল শুধু চাপ-চাপ অন্ধকার, আগুনরঙা ধোঁয়ার কুণ্ডলী, নীলচে বিদ্যুতের ঝলক আর শূন্যতা। ক্রমশ চেপে বসতে থাকা সেই অন্ধকারের মধ্যেও ভেসে আসছিল “টিং-টিং-টিং…” শব্দটা।

প্রফেসর ধৃতিমান! তাঁর কাছেই আছে ওইরকম একটা ঘণ্টি। কিন্তু কোথায় তিনি? মরিয়া হয়ে ছটফট করে উঠল রয়।

অন্ধকার কি একটু হালকা হল? হ্যাঁ, এভাবেই হবে। তাকে এখান থেকে বেরোতে হবে। বেরোতেই হবে, নইলে সে রুচিরা’র কাছে যাবে কী করে?

এম.এ.ওয়াই.এ কোয়াড্র্যান্ট, লুপ থেকে বেরোনোর পর

“এগুলো কি সবই আমব্রা-র বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিকের প্রভাব?”

ধৃতিমান আর রয়ের মুখ এই ক’দিনেও স্বাভাবিক রং ফিরে পায়নি। গ্যানিমিড সেন্ট্রালে রুচিরা’র সঙ্গে দু’জনেরই এই ক’দিন রোজ কথা হয়েছিল।

করিমের প্রশ্নের উত্তরে সুং, পোলানস্কি, গ্রেগরি, নোমুরা যা বলছিলেন— তার কিছুই এই দু’জনের কানে ঢুকছিল না। বরং দু’জনেরই দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল হাতে ধরা ছোট্ট ঘণ্টার মতো চেহারার বেলটার দিকে।

“প্রফেসর?” লু-শাওয়ের গলা শুনে মুখ তুললেন ধৃতিমান, “ওই গ্রহটা কি শুধু কোয়ারেন্টাইন করে দেওয়াই যথেষ্ট, নাকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত?”

“ওড়াতে পারবেন না।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ধৃতিমান, “মনে নেই, কনফেডারেশন ইতিমধ্যেই এই চেষ্টা করেছে? তাদের যাবতীয় মিসাইল, এমনকি প্ল্যানেট-কিলার হিসেবে পরিচিত অস্ত্রও ওই বায়ুমণ্ডলে ঢুকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এবারেও তাই হবে।”

“কিন্তু এ-সব কে করছে?” উত্তেজিতভাবে বললেন সুং, “ওই গ্রহে এমন কে আছে যে বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক আর বাতাসের বিদ্যুৎ কাজে লাগিয়ে এমন সাংঘাতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে প্রযুক্তি, এমনকি মানুষের ওপর?”

“আমব্রা।” নিচু গলায় থেমে-থেমে বলল রয়, “ওই গ্রহটা জীবন্ত, আর একা। ভীষণ একা! তাই একলা মানুষদের মনের হদিশ পেয়ে যায় সে। তারা যা চায়, সেটাকেই দেখিয়ে সে নিজের কাছে রেখে দিতে চায় তাদের। শুধু মানুষ কেন, কোটি-কোটি বছর ধরে কত রকমের বুদ্ধিমত্তা আর প্রাণের সন্ধান সে পেয়েছে, সেই জানে। তাদের সবার হদিশ নিজের কাছে রেখে দিয়েছে আমব্রা। সে কিন্তু কাউকে কষ্ট দেয় না; আমাকেও দেয়নি। বরং সে আমাকে এমন কিছু দিতে চেয়েছিল যা…”

রয়ের একটা হাত নিজের মুঠোর মধ্যে নিলেন ধৃতিমান। তাতে চাপ দিয়ে তিনি ঘরের সবার দিকে ঘুরে বললেন, “আমব্রা মানে কী, জানেন?”

“ছায়া।” পোলানস্কি বললেন। বাকিরাও মাথা নাড়িয়ে সমর্থন জানালেন।

“ঠিক, তবে…” ধৃতিমান হাসলেন, “আপনাদের একটা গল্প শোনাই?”

সবাই মাথা নেড়ে সায় দিলেন।

রয়ের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে রেখেই বলতে শুরু করলেন ধৃতিমান।

“একবার নারদ দ্বারকায় কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি কৃষ্ণের ভুবনমোহিনী মায়া-র স্বরূপ বুঝতে চান। নারদকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কৃষ্ণ। ক্রমে মরুভূমির মতো রুক্ষ এক প্রান্তরে পৌঁছোলেন তাঁরা। অসহ্য তাপে কাহিল হয়ে কৃষ্ণ নারদকে বললেন, তাঁর জন্য জল নিয়ে আসতে।

জলের সন্ধানে নারদ বহুদূর চলে এলেন। ততক্ষণে তিনি নিজেও শ্রান্ত। অবশেষে একটি গ্রামের দেখা মিলল। সেখানে একটি ছিমছাম বাড়ি দেখে জল চাইতে গেলেন তিনি। কিন্তু…

কিন্তু সেই বাড়ির অবিবাহিতা মেয়েটিকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেললেন নারদ। ব্রহ্মচারী দেবর্ষি সবকিছু ভুলে সেই মেয়েটিকে বিয়ে করলেন। ওই গ্রামেই গড়ে উঠল তাঁর সংসার। ক্রমে তাঁদের সন্তান-সন্ততি জন্মাল। এক সুখী সংসারের প্রধান হয়ে নারদ বৃদ্ধ হলেন। আর তারপর একদিন এল এক প্রলয়ঙ্কর বন্যা!

সব্বাই ভেসে গেল সেই বন্যায়। আপ্রাণ চেষ্টা করেও কাউকে বাঁচাতে পারলেন না নারদ। অহস্য কষ্টে আর একাকিত্বে হাহাকার করে উঠলেন নারদ। ঠিক তখনই তিনি শুনতে পেলেন, কে যেন বলে উঠল,

‘জলের সন্ধান পেলেন, দেবর্ষি?’

স্তম্ভিত বিস্ময়ে নিজের চারপাশে তাকিয়ে নারদ দেখলেন, কোথায় জল, কোথায় গ্রাম। তিনি তো সেই মরুভূমিতেই রয়েছেন! আর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসছেন।

‘এ কী হল প্রভু!’ চিৎকার করে উঠলেন নারদ, ‘আমি কাদের দেখলাম? কোথায় গেল আমার স্ত্রী-সন্তান-সংসার?’

কৃষ্ণ নারদকে বুঝিয়ে বললেন, সে-সবই ছিল বিভ্রম— ইল্যুশন। না-পাওয়া, অথচ ভীষণভাবে চাওয়া জিনিস, মানুষ, সম্পর্কের প্রতি এই টানই মায়া।”

উঠে দাঁড়িয়ে ভিজরের সামনে দাঁড়ালেন ধৃতিমান। সেখানে দেখা যাচ্ছিল স্পেস-স্টেশন থেকে দেখা ছায়াচ্ছন্ন গ্রহটিকে।

“আমব্রা শব্দের আরেকটা অর্থ হল বিভ্রম।” শক্ত গলায় বললেন ধৃতিমান, “ওই গ্রহ… ওই প্রাণীটি সঙ্গ খোঁজে। কিন্তু তার তৈরি করা বিভ্রম আমাদের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। ওটিকে কোয়ারেন্টাইন করে দেওয়াই এই মুহূর্তে নিরাপদ।”

“লুপে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য তৈরি হোন।” যান্ত্রিক ভঙ্গিতে বলে উঠল কেউ। দ্রুত চেয়ারে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নিলেন ধৃতিমান।

পেছনে হেলান দিয়ে, চোখ বন্ধ করে এম.এ.ওয়াই.এ কোয়াড্র্যান্ট ছাড়ার প্রস্তুতি নিল রয়-ও। আর এদিকে আসতে চাইবে না সে। লুপের ওপাশের দুনিয়াটা মলিন আর কষ্টকর হলেও বাস্তব। কিন্তু এদিকটা রঙিন হলেও আসলে বিভ্রম, মায়া…

বা আমব্রা!

 

লেখকের বক্তব্য: গল্পটি লেমের ‘সোলারিস’ তথা ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবেই লিখিত।

Tags: kalpabiswa y7n1, science fiction, ঋজু গাঙ্গুলী, কল্পবিজ্ঞান গল্প, প্রমিত নন্দী

6 thoughts on “আমব্রা

  • June 27, 2022 at 8:59 am
    Permalink

    দারুণ ভাল অনুবাদ। মুগ্ধ হয়ে পড়লাম।

    Reply
  • June 27, 2022 at 9:01 am
    Permalink

    এটা কি অনুবাদ নয়? তাহলে হাজার কুর্নিশ!

    Reply
    • June 27, 2022 at 1:49 pm
      Permalink

      না। অনুবাদ নয়। সোলারিস-এর উদ্দেশে আমার বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।

      Reply
  • June 27, 2022 at 11:48 pm
    Permalink

    দারুণ লাগল গল্পটা। লেমের প্রতি উজ্জ্বল শ্রদ্ধার্ঘ্য। রয়-ধৃতিমানের আরো গল্প চাই।

    Reply
  • June 28, 2022 at 8:31 pm
    Permalink

    দাদা, আমাদের পাঠকদের সত্যি সৌভাগ্য যে বাংলায় সাইফাই লেখক হিসেবে আপনাকে পেয়েছি। দারুন সুন্দর লেখা। অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা রইল।

    Reply
  • June 29, 2022 at 1:44 am
    Permalink

    দারুন! আপনার লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ গল্প একটি আকৃতি পায়। অনেকটা অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন পিক্সেল ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে পূর্নাঙ্গ ছবি তৈরি করার মতো ব্যাপার। শেষ চ্যাপ্টারে গিয়ে দারুন ফিনিশিং হয়। এই স্টাইলের লেখা আমার বিশেষ পছন্দ। এই গল্পটাও তেমনি চমৎকার একটা কল্পগল্প হিসাবে মনে স্থান করে নিলো।

    Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!