স্পন্দন

  • লেখক: সন্দীপ চৌধুরী
  • শিল্পী: প্রমিত নন্দী

এক

একটা সরু গলির মধ্যে আচমকাই দোকানটা খুঁজে পেয়ে গেল রবিন। ছোট্ট একটা পানের দোকানের সাইজের খোপের মধ্যে কয়েকটা সস্তা চশমা সাজানো রয়েছে। কাউন্টারের পেছনে প্রচণ্ড রোগা, দাঁতে পানের ছোপওয়ালা এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। বয়স আনুমানিক ষাট থেকে সত্তরের মধ্যে।

ভদ্রলোকের সামনে চোখের ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বাড়িয়ে দিল রবিন। কাগজটা তুলে চোখের একেবারে কাছে নিয়ে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড পরে সেটা নামিয়ে রাখলেন ভদ্রলোক।

‘কবে চাই?’ সামান্য কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কত পড়বে সেটা যদি জানা যেত…’

‘সেটা ফ্রেমের ওপর নির্ভর করছে। তবে লেন্সের দাম শ’তিনেক ধরে রাখুন।’

শেষ অব্দি পাঁচশো টাকার একটা ফ্রেম পছন্দ হয়ে গেল রবিনের। দুই দিন পর এই সময় অর্থাৎ সন্ধে ছটার পর ডেলিভারি। ডেলিভারিতে দেরি হবে না কারণ চশমাটা নাকি ভদ্রলোক নিজের হাতে তৈরি করবেন

একটু শঙ্কিত হল রবিন। ভদ্রলোকের নিজের চোখের অবস্থা যে ভালো নয় তার প্রমাণ সে একটু আগেই পেয়েছে। চোখের চশমার পাওয়ারও বেশ ভালোই। উনি নিজে যে চশমাটা পরে রয়েছেন সেটার অবস্থাও খুব একটা সুবিধের নয়। চশমার দোকানদারেরা কি নিজের চশমা নিজেরাই তৈরি করে? ব্যাপারটা অন্তত নিজের চুল কাটার মতো অসম্ভব নয়

মাত্র আটশো টাকার তো ব্যাপার, নিজেকে বোঝাল রবিন। তা ছাড়া ওর চোখের পাওয়ার সামান্যই।

দিনকয়েক আগে মাথার যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। প্রথমে পাত্তা দেয়নি রবিন। কিন্তু শেষে দেখা গেল কম্পিউটারে কিছুক্ষণ কাজ করলেই যন্ত্রণাটা হানা দিচ্ছে। অফিসের জেনারেল ফিজিশিয়ানের পরামর্শে চোখের ডাক্তারের কাছে আই টেস্ট করিয়েছে রবিন। আর তারই ফলস্বরুপ এই চশমা

কোনো অ্যাডভান্স নিলেন না ভদ্রলোক। চশমা ডেলিভারি নেওয়ার সময় টাকা দিলেই চলবে। রবিন যা আশা করেছিল তার চেয়ে সস্তাতেই চশমাটা হয়ে যাচ্ছে। এখন এটা পরে মাথা ধরাটা বন্ধ হলে হয়

এই মুহূর্তে রবিনের হাতে তিনটে কেস। সব কটাই সেনসিটিভ। অভিস থেকে বেরোতে প্রায় রোজই রাত ন-টা হচ্ছে আজকাল। তাতে অবশ্য ওর বিশেষ অসুবিধে নেই। একা একটা এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে থাকে রবিন। ব্রেকফাস্ট ছাতু, চিঁড়ে আর পাউরুটি মধ্যে অদল-বদল করে খেয়ে নেয়। দুপুরের লাঞ্চ অফিসে। আর ডিনারের জন্যে একটা যে-কোনো সবজি বা ডাল বানিয়ে নেয় নিজেই। বাড়ি ফেরার পথে রুটি কিনে নেয়।

কাজের লোক রাখাই যায় তবে তার পেছনে সমস্যা দুটি। এক, তারা খুব একটা রিলায়েবল হয় না। আসার সময়ের ঠিক নেই। প্রচুর কামাই। আর দ্বিতীয় সমস্যাটা হচ্ছে যে-কোনো কাজের লোক রাখার আগে তার ডিপার্টমেন্টের ক্লিয়ারেন্স লাগবে। প্রক্রিয়াটা খুব একটা সরল নয়। তার চেয়ে আত্মনির্ভরতাই বেটার। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধে হলেও এখন অভ্যেস হয়ে যাওয়ায় নিজের স্বাধীনতা সে হারাতে রাজি নয়

এরপর দুই দিন কেটে গেছে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যে চশমার কথাটা ভুলেই গেছিল রবিন। সেদিন দুপুরে চশমার দোকান থেকে ফোন করে ওকে জানাল যে ওর চশমা রেডি হয়ে গেছে। আজকে রাত্রি ন-টার মধ্যে যে-কোনো সময় গিয়ে সে ওটা নিয়ে আসতে পারে।

দোকানে গিয়ে সেই বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখতে পেল না রবিন। তার জায়গায় আজকে একটা কম বয়সি ছোকরা রয়েছে। সেই ভদ্রলোকের ছেলে কি?

চশমা পরে নিজেকে আয়নায় দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল রবিন। প্রায় চেনাই যাচ্ছে না। আর ফ্রেমটা পছন্দ করার সময় সাদামাটা মনে হলেও এখন বেশ স্টাইলিশ দেখাচ্ছে। মাত্র আটশো টাকার পক্ষে বেশ ভালো হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে জিনিসটা। শুধু আশপাশের জিনিস সামান্য একটু ছোটো দেখাচ্ছে। দোকানের ছেলেটা জানাল সেটা দিন দুই-তিনেকের মধ্যেই চোখের সঙ্গে ‘সেট’ হয়ে গেলে আর সমস্যা হবে না। টাকা মিটিয়ে বেশ খোশমেজাজেই অফিসে ফিরল রবিন।

‘কত পড়ল?’ রবিনের পাশের টেবিলের অনাদিদা জিজ্ঞেস করল। চশমাটা এখনও পরেনি রবিন কিন্তু ওটা নিতে যাওয়ার আগে অনাদিদাকে বলে গেছিল। তা ছাড়া রবিনের হাতে চশমার দোকানের দেওয়া একটা ছোট্ট ঝোলা রয়েছে

‘তিন হাজারের মতো।’ মজা করার জন্যে বেশ কিছুটা বাড়িয়ে বলল রবিন। আসলে চশমাটার জন্যে তার নিজেরও এই বাজেটই ছিল।

চশমাটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষন ধরে খুঁটিয়ে দেখলেন অনাদিদা। তারপর সেটা রবিনকে ফেরত দিয়ে বললেন, ‘খারাপ বানায়নি।’

অথচ এতদিন অনাদিদাকে বিচক্ষণ মানুষ বলেই জানত রবিন। চশমাটার সত্যি দাম বলতে গিয়েও সে আর সেটা বলল না। কে জানে ভদ্রলোক কী মনে করবেন প্রথমে সে ঠিক দাম বলেনি বলে।

 

দুই

দিন চারেক পরের ঘটনা। সেদিন বেশ সকাল সকাল জাভেদ সাহেবের ঘরে ডাক পড়ল রবিনের। একটু চিন্তায় পড়ে গেল রবিন। কোন কেসের বিষয়ে আলোচনা করতে চান জাভেদ সাহেব? শেষে ড্রাগ ডিলারের কেসের ফাইলটা নিয়ে জাভেদ সাহেবের কামরার দিকে রওনা দিল রবিন। এটায় কয়েকজন ক্ষমতাবান রাজনেতা আর ফিল্মের লাইনের লোক জড়িয়ে রয়েছে। ওপরের মহল থেকে চাপ আসার সম্ভবনা এটাতেই বেশি। এটায় কাজও বেশ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।

জাভেদ সাহেবের কামরার কাছে গেলে ওঁর ব্যাক্তিগত আর্দালি পান্ডেজি জানালেন জাভেদ সাহেব একটা কলে রয়েছেন। কিছুক্ষণ বসতে হবে।

জাভেদ সাহেবের কামরার সামনে অতিথিদের জন্যে সাজানো সোফায় গিয়ে বসল রবিন। অপেক্ষা করতে করতে জাভেদ সাহেবের কেবিনের দরজার ওপর লাগানো নেমপ্লেটটার ওপর চোখ পড়ল। কালো রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর সোনালি অক্ষর ঝলমল করছে। জাভেদ সাহেবের পুরো নাম কামার জাভেদ। উত্তরপ্রদেশের লোক কিন্তু চমৎকার বাংলা বলেন। কথাবার্তা খুব মেপে মেপে বলেন জাভেদ সাহেব। ওঁর সঙ্গে কথা বলার সময়ে অধস্তন অফিসারদেরও সাবধানে কথা বলতে হয়। এমনিতে ভদ্রলোক চট করে রাগেন না কিন্তু যদি বুঝতে পারেন যে কেউ ওঁকে মিসগাইড করছে কোনো ব্যাপারে তখন ব্যাপারটা সিরিয়াস হয়ে দাঁড়ায়। তবে রবিনের ক্ষেত্রে সেরকম পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। যদিও উনি সরাসরি কোনোদিন কিছু বলেননি কিন্তু ওর মনে হয় জাভেদ সাহেব মোটের ওপর ওকে পছন্দই করেন।

নতুন চশমাটা গত তিনদিন ধরে ও পরছে। কিন্তু এখনও তার মাথা সামান্য ধরে রয়েছে। তবে এই ধরাটা আগের চেয়ে একটু যেন অন্যরকম। নতুন চশমার সঙ্গে ধাতস্থ হতে আরও কয়েকদিন হয়তো লাগবে, নিজেকে বুঝিয়েছে রবিন। তবে এখন আর আগের মতো আশপাশের জিনিস ছোটো দেখায় না।

রবিনের মূল সমস্যা চোখে নয়, কানে। বেশ ছোটোবেলা থেকেই একটু উঁচু করে না বললে সে ঠিকমতো শুনতে পেত না। রবিনের বাবা রেলে চাকরি করতেন। যেখানে তার ছোটোবেলা কেটেছে সেখানের কোয়ার্টারের পাশেই রেললাইন ছিল। তার কানের সমস্যার সূত্রপাত সম্ভবত সেখান থেকেই। নিজের কান দেখাতে ছয় মাস পর পর ডাক্তারের কাছে যেতেও হয় ওকে। তবে সমস্যাটা এখনও হিয়ারিং এড নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। তবু দুশ্চিন্তায় রয়েছে রবিন।

এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল রবিনের ঠোঁটে। নিজের কান খাটোর কথা মাথায় এলেই ওর সামনে প্রফেসর ক্যালকুলাসের চেহারা ভেসে ওঠে। এবং সেই সঙ্গে ওঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু মজার ঘটনার খণ্ডচিত্র।

টিং টং! টিং টং!

এই অফিসে একমাত্র জাভেদ সাহেবের ঘরেই বেল রয়েছে। অর্থাৎ ওঁর ফোন শেষ হয়েছে, সে ভেতরে যেতে পারে। উঠে পড়ে জাভেদ সাহেবের কেবিনের দিকে এগোল রবিন। পান্ডেজি চোখের ইশারায় ওকে ভেতরে ঢোকার ক্লিয়ারেন্স দিলেন।

‘বোসো।’ সামনের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করলেন জাভেদ সাহেব।

রবিনের ধারণাই ঠিক। সেই ড্রাগ ডিলারের কেসের ব্যাপারেই ওকে ডেকে পাঠিয়েছেন জাভেদ সাহেব। কিছু নতুন তথ্য জানা গেছে যাতে পুলিসের সুবিধে হবে কেসটা সাজাতে। কিন্তু এখনও সন্তুষ্ট নন জাভেদ সাহেব। অন্য পক্ষের কাছে টাকা আর ক্ষমতা দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। সুতরাং এটা ধরেই নেওয়া যায় যে দেশের সবচেয়ে দুঁদে উকিলদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে পুলিসকে। একটু ফাঁক থাকলেই তার মধ্যে দিয়ে অভিযুক্তদের বের করে নিয়ে চলে যাবে।

এই ধরনের সমস্যায় গল্প-উপন্যাসের কোনো বিখ্যাত গোয়েন্দাকে পড়তে দেখেনি রবিন। কোনোরকমে যুক্তি ধরে অপরাধীকে খুঁজে বের করেই তাদের কাজ শেষ। অথচ সেই যুক্তি দিয়ে কোর্টে অপরাধীকে দোষী সব্যস্ত করা প্রায় অসম্ভব। একজন মোটামুটি চলনসই উকিলও হোমস বা প্রদোষ সি মিটারকে কোর্টের মধ্যে নাকানি চোবানি খাইয়ে ছাড়বে।

‘বাইরে যেতে হতে পারে দিন কয়েকের জন্যে। এনি প্রবলেম?’ ফাইলের কয়েকটা কাগজ খুঁটিয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন জাভেদ সাহেব।

প্রবলেম? রবিন বাইরে যাওয়ার জন্যে মুখিয়ে রয়েছে। অফিসে বসে বসে ফাইল ঘেঁটে তদন্ত হয় নাকি? তবে সঙ্গে কেউ একজন সিনিয়র থাকলে ভালো হয়। এখনও একা বাইরে যেতে একটু ইতস্তত বোধ করে রবিন। আরও একটা সমস্যা হচ্ছে কেস নিয়ে ফোনে কারো সঙ্গে আলোচনাও করা যায় না। কিন্তু কোথায় যেতে হবে সেই সম্বন্ধে কোনো ইঙ্গিত দেননি জাভেদ সাহেব।

নিজের উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে রবিন জানালো তার কোনো অসুবিধে নেই।

‘গুড! আর কোন কোন কেস তোমার হাতে আছে এখন?’

কেসগুলোর নাম শুনে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন জাভেদ সাহেব। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে। ধানবাদের কেসটা আমি অন্য কাউকে এলট করে দেব। আর পিল্লাইয়েরটায় খুব একটা তাড়া নেই। ওটায় একটু ধীরেসুস্থে এগোলেও চলবে। তুমি ফিরে গিয়ে মি. চন্দ্রাকে পাঠিয়ে দিও।’

বাইরে বেরিয়ে হাঁফ ছাড়ল রবিন। আজ কোনো কথা বুঝতে তার অসুবিধে হয়নি। এই একটা ব্যাপারে খুব টেনশনে থাকে রবিন। সব কথা ঠিকমতো শুনতে সে পায়নি আজকেও কিন্তু জাভেদ সাহেবের লিপ রিড করে সব কথা ঠিকঠাক বুঝতে পেরে গেছে। এই অভ্যেস তার স্কুলের দিন থেকেই আছে। তখন শিক্ষকদের লিপ রিড করত, এখন অফিসের কলিগদের। ভাগ্যিস চাকরির ক্ষেত্রে কানের পরীক্ষা হয়নি।

মি. চন্দ্রাকে জাভেদ সাহেবের কাছে যাওয়ার কথাটা বলে নিজের সিটে ফিরে গেল রবিন। বেচারি চন্দ্রা সাহেব বেশ ঘাবড়ে গেছেন। এমনিতেই ভদ্রলোক বেশ নার্ভাস প্রকৃতির তার ওপর এখন এমন একটা কেস পেয়েছেন যাতে খোদ পি এম ও’র অফিস থেকে নজরদারি হচ্ছে। ভদ্রলোকের মুখ চোখ দেখলে মনে হয় রাত্রে আজকাল ঠিকমতো ঘুম হয় না।

কিন্তু তার নিজের মাথার ঝিমঝিম ভাবটা কিছুতেই যাচ্ছে না।

 

তিন

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে তারপর। রবিনের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারটা আপাতত স্থগিত রয়েছে তবে যে কোনোদিন হুট করে যেতে হতে পারে। ড্রাগ ডিলারের কেসটাতে একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে— একজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষী আচমকা নিজের বিবৃতি পালটে ফেলেছে।

তবে এটা আজকাল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তবু ভালো যে কেসটা কোর্টে ওঠার আগেই লোকটা পালটি মেরেছে নইলে কোর্টের সামনে তো হেনস্থা হতে হতোই, প্রেসও ছিঁড়ে খেত তাদের পুরো ডিপার্টমেন্টকে।

এর মধ্যেই একটা ছোট্ট ঘটনা, বা বলা ভালো, পরপর একই ধরনের দুই-তিনটি ঘটনা একটু ভাবিয়ে তুলেছে রবিনকে। এমনিতে ঘটনাগুলি খুবই সাধারণ কিন্তু তদন্ত করতে করতে রবিনের মস্তিষ্ক আজকাল একটু অস্বাভাবিক কিছু ঘটতে দেখলেই সেটার গ্রহণযোগ্য কারন খুঁজে বের করতে না পারলে শান্তি পায় না। এই ঘটনাগুলোও সেই জাতীয়।

প্রথম ঘটনাটা ঘটল যেদিন নিজের রোজকার ব্রেকফাস্টের রুটিন একটু বদলে ম্যাগি খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল রবিন। ওর কাছে এ বস্তু হামেশাই মজুত থাকে। কোনোদিন অফিস থেকে ফিরতে বেশি রাত হলে বা রান্না করতে ইচ্ছে না হলে দেড় প্যাকেট ম্যাগি ফুটিয়ে খেয়ে ও শুয়ে পড়ে।

যাই হোক, গ্যাস স্টোভে ম্যাগি চাপিয়ে রবিন খেয়াল করল যে সে নিজে একটা গান গুনগুন করে গাইছে। বেশ পুরোনো গান। গানটার সব কথাও সে ঠিকমতো জানে না। সেই জায়গাগুলো সে ‘লা-লা, হু- হু’ করে ভরতি করে দিচ্ছিল। কিন্তু এই গান তার মাথায় আচমকা এল কোথা থেকে?

একটু পরে সে বুঝতে পারল সম্ভবত তাদের বিল্ডিঙের ওপরের তলায় কেউ গানটা বাজিয়ে শুনছে। কিন্তু সেই শব্দ এতই মৃদু যে খুব মন দিয়ে শুনলেও গানটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। অন্তত রবিনের পক্ষে।

এমনিতে খুব সাধারণ ঘটনা। অনেক সময়ই আমাদের অবচেতন মন অনেক কিছু বুঝে ফেলে আমাদের সচেতন মনের সাহায্য ছাড়াই। কিন্তু রবিনের খটকা লেগেছিল কারণ তার কান এত মৃদু শব্দের প্রতি সংবেদনশীল নয়। এত মৃদু শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে কীভাবে?

এই সে হয়তো ঘটনাটা ভুলেই যেত যদি না তার পরের দিনই অফিসে আরও একটা অনুরূপ ঘটনা ঘটত।

অনাদিদার বসার জায়গা থেকে রবিনের টেবিলের দূরত্ব প্রায় ফুট দশেকের। সেদিন দুপুরের দিকে নিজের মোবাইল থেকে একটা ফোন করল অনাদিদা। খুব বেশি হলে মিনিট খানেক কথা বলল অনাদিদা। এখানে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে শুধু যে অনাদিদার বলা প্রত্যেকটি কথা রবিন শুনতে পেয়েছিল তাই নয়, মোবাইলের অপর দিকের লোকটির কথাও সে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। এদিক ওদিক চেয়ে দেখেছিল রবিন। কিন্তু আর কারও হাবভাব দেখে মনে হয়নি যে তারা অস্বাভাবিক কিছু শুনতে পাচ্ছে।

সেদিনই অফিস থেকে ফেরার পথে আরও একটা ঘটনা ঘটল। নিজের ফ্ল্যাটে ফেরার সময় মেট্রো থেকে নেমে বেশ কিছুটা পথ হাঁটে রবিন। মোট কিলোমিটার দেড়েকের পথ। তার মধ্যে প্রায় আধ কিলোমিটার রাস্তা একটা মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। রাত্রি সাড়ে আটটা-নটার সময় স্বাভাবিক কারণেই মাঠটা একদম শুনশান থাকে। হয়তো ওরই মতো দু-একজন লোক সেই সময় যাওয়া আসা করে সেই পথ ধরে। আর হয়তো কয়েকটা নেড়ি কুকুর থাকে।

সেদিন মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথে আচমকাই খুব মৃদু মিউজিকের শব্দ কানে এল রবিনের। হাঁটার স্পিড কমিয়ে শব্দটার দিকে মনোযোগ দিল রবিন। না, একটা মিউজিক যে সে শুনছে তাতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু চারপাশে এমন কোনো বাড়ি-ঘর নেই যেখান থেকে মিউজিক ভেসে আসতে পারে। এমনকী আশপাশে কোনো মানুষও চোখে পড়ল না।

মিউজিকটা চেনা নয় রবিনের। খুব সম্ভবত বিদেশি মিউজিক। কিন্তু শব্দটা আসছে কোথা থেকে?

একটু পরেই নিজে থেকেই শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল।

সেদিন রাত্রে উত্তেজনায় ঘুম আসতে বেশ দেরি হল রবিনের। সে কি তার শ্রবণশক্তি ফিরে পাচ্ছে? কিন্তু আজ সকালেও সে মোবাইলের এলার্ম শুনতে পায়নি। তার ওপর অনাদিদার মোবাইলে কথা বলার সময় লাইনের ওপাশের মানুষের কথা শুনতে পাওয়াটাও স্বাভাবিক নয়। আর সবশেষে আজকে মাঠের ঘটনাটা। এখানে তো সে শব্দ কোথা থেকে আসছে সেটাই বুঝতে পারল না।

সবচেয়ে বড়ো কথা এখনও পর্যন্ত তার কানের ডাক্তার তাকে তার শ্রবণশক্তি ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে কোনোরকম আশ্বাস দেননি। ওঁর চিকিৎসার মেন ফোকাস হচ্ছে রবিনের অবস্থা যাতে আরও খারাপের দিকে টার্ন না নেয় সেটা নিশ্চিত করা। অবশ্য এটা হতেই পারে যে সে ওঁর চিকিৎসায় আশাতীত ফল পাচ্ছে।

খুঁতখুঁতুনির ভাবটা পুরোপুরি গেল না রবিনের। দু-একদিনের মধ্যে আবার তার কানের ডাক্তারের কাছে যাওয়া মনস্থ করল রবিন।

 

চার

অবশেষে স্টেশনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেল রবিন। সিকিমের ছোট্ট একটা গ্রাম তুংলা। এইখানে গত দুই বছরে বার তিনেক এসেছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদেব সিং। কেন এসেছিলেন সেটা জানাই রবিনের মূল উদ্দেশ্য। এমনিতে রামদেব সিং-এর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো প্রমাণ এখনও তাদের কাছে নেই কিন্তু এই কেসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার জায়গায় ওঁর উপস্থিতি একটু অস্বাভাবিক ঠেকছে তাদের কাছে। হলেনই বা প্রাক্তন, কিন্তু যেহেতু কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সে জন্যেই নিশ্চিত না হয়ে ওঁর বিরুদ্ধে কোনো স্টেপ নেওয়া যাচ্ছে না। তদন্তে স্থানীয় পুলিসের সাহায্য নেওয়াও বারণ।

তুংলায় বড়ো কেন কোনো ছোটো হোটেলও নেই। খানতিনেক হোম স্টে আছে কিন্তু সেগুলোর অবস্থাও অত হাই প্রোফাইল মানুষের পক্ষে মানানসই নয়। রবিন নিজেই সেই তিনটের মধ্যে একটা হোম স্টেতে উঠেছে। স্বামী-স্ত্রী আর তাদের দুই মেয়ের একটা ছোটো সংসারের সঙ্গে সে থাকছে। থাকার জায়গাটার সুবিধে খুবই সাদামাটা কিন্তু মানুষগুলোর আন্তরিকতায় কোনো খাদ নেই।

বাড়ির মালিকের নাম বিলাস তামাং। লোকটার মুখে হাসি লেগেই আছে। কিন্তু খুব একটা চালাক চতুর নয় বিলাস। নিজের পরিবার নিয়েই থাকতে ভালোবাসে, বাইরের মানুষের সঙ্গে তার লেনদেন খুব বেশি নয়। তার কাছ থেকে তেমন খবরও এখনও পর্যন্ত পায়নি রবিন। তবে এর একটা সুবিধেও আছে। রবিনের এখানে থাকার খবরও পাঁচ কান হওয়ার সম্ভাবনা কম বিলাসের মাধ্যমে।

গ্রামে অবস্থাপন্ন বাড়ি দুটো। দু-জনেরই পাকা বাড়ি এবং গাড়ি দুইই আছে কিন্তু রামদেব সিং যে তাদের কাছে উঠেছিলেন এমন কোনো খবর রবিন এখনও পায়নি। আরও একটা মুশকিল হচ্ছে রবিন এখানে ট্যুরিস্ট হিসেবে এসেছে। খুব বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করলে মানুষ সন্দেহ করবে।

এখানে আসার সময় সিকিমের পাখিদের বিষয় একটা ছবিওয়ালা বই কিনেছিল রবিন। যতদিন সে এখানে থাকবে সেটা হাতে নিয়ে গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে নিজের ট্যুরিস্ট পরিচয়টাকে পোক্ত করার জন্যে রোজই মর্নিং ওয়াকে বেরোবে। জায়গাটায় বেশ ঠান্ডা কিন্তু জোর করে বিছানা ছেড়ে একবার বেরিয়ে পড়লে আশপাশের দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে নতুন নতুন পাখির প্রজাতির সঙ্গেও তার পরিচয় হচ্ছে। তার মধ্যে কয়েকটার ছবি সে তার বইয়েও খুঁজে পায়নি।

তবে তার অভিনয়ে যে তেমন কাজ হচ্ছে না তার প্রমান রবিন পেল তুংলায় আসার তৃতীয় দিন মর্নিং ওয়াক করার সময়। পাহাড়ি গ্রামের পথ একটু পরপরই বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় পাহাড়ের বিভিন্ন খাঁজে। সেরকমই একটা বাঁকের পেছন থেকে আচমকা তিরবেগে রবিনের দিকে একটা বড়োসড়ো গাড়ি ধেয়ে এল। রবিন যতটা সম্ভব একপাশে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করার আগেই সে নিজের পথ থেকে একটু টাল খেয়ে প্রায় রবিনের ঘাড়ের ওপর চলে এল।

রবিন জানে তার পেছনে অতলস্পর্শী খাদ। নিজের ব্যালান্স রক্ষা করার একমাত্র উপায় উবু হয়ে মাটিতে বসে পড়া। কিন্তু তারও সে সময় পেল না। ওর সঙ্গে ধাক্কা লাগার ঠিক আগের মুহূর্তে গাড়িটা আবার নিজের পথে ফিরে গিয়ে যেমন এসেছিল ঠিক তেমনি উধাও হয়ে গেল। শুধু যাওয়ার পথে গাড়িটার ডানদিকের হেডলাইটের পাশের অংশটা রবিনের ডান হাতের কনুইয়ে আঘাত করে বেরিয়ে গেল।

পড়ে যেতে যেতে নিজেকে কোনোরকমে সামলে নিল রবিন। বাঁ পাশে আরও ফুট চারেক পরই খাদ। সেই খাদে পড়ে গেলে তার কী হত সেই চিন্তা না করাই ভালো।

গাড়িটা মাহিন্দ্রা বোলেরো। তবে নাম্বার দেখার অবকাশ সে পায়নি। পেলেও খুব একটা সুবিধে কিছু হত না কারণ এই ধরনের কাজ করার আগে নাম্বার নিশ্চই বদলে ফেলা হয়েছে।

ওকে মারার বা গুরুতর জখম করার অভিপ্রায় গাড়ি চালকের ছিল না। থাকলে শেষ মুহূর্তে গাড়ি তার দিক পরিবর্তন করত না। এটা রবিনকে সাবধান করে দেওয়া। এক ধরনের হুমকিও বলা যায়।

রবিন যে ভয় পায়নি সেটা বলা ঠিক হবে না। সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গায় সে একেবারেই একা। সবচেয়ে কাছের পুলিশ স্টেশন এখান থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে। সবচেয়ে কাছের হাসপাতালের অবস্থান তার জানা নেই। এখন মনে হচ্ছে সেটাও জেনে রাখা ভালো।

তবে তার হাতের আঘাত গুরুতর নয় বলেই মনে হচ্ছে। বার কয়েক নিজের ডান হাতকে কনুই থেকে মুড়ে দেখল রবিন। যন্ত্রণা আছে তবে খুব বেশি নয়। বাইরের দিকের হাড়ের ওপরটা সামান্য লাল হয়ে রয়েছে।

শহরে থাকলে হয়তো একটা এক্স রে করিয়ে নিত কিন্তু এই জায়গায় ওসব করতে যাওয়া মানে একগাদা ফালতু ঝামেলা। প্রয়োজন হলে বরং চায়ের সঙ্গে ব্যথার ট্যাবলেট খেয়ে নেবে একটা।

আজ আর বেশিক্ষণ হাঁটল না রবিন। ধীরে ধীরে মনের ভয়টা কমে আসছে। ওকে গুরুতর জখম না করার পেছনে এটাও সম্ভবত একটা কারণ যে ওরা পুলিসের নজর এই জায়গায় টেনে আনতে চাইছে না। সে ক্ষেত্রে ওর ওপর খুব তাড়াতাড়ি আবার এটাক হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু এই ভরসায় এখানে বেশিদিন থাকা চলবে না রবিনের। আগামি দু-তিন দিনের মধ্যে যতটা সম্ভব খবর জোগাড় করে ফেলতে হবে।

আচমকাই একটা নতুন আইডিয়া খেলেছে রবিনের মাথায়। সে যখন আঘাতের পর নিজেকে সামলে এগিয়ে যাওয়া গাড়িটার দিকে চেয়ে ছিল ঠিক তখনই কথাটা প্রথম তার মাথায় এসেছে। এক দিক দিয়ে ভাবতে গেলে ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের মাথায় জীবনের অন্যান্য সমস্যার সমাধানের চিন্তা আসার কথা নয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। হয়তো ওই গাড়িটাই ট্রিগার।

রামদেব সিং-এর এখানে আসার সঠিক দিনগুলো জানে রবিন। সেই দিনগুলিতে এখানে বাইরে থেকে কোন কোন গাড়ি এসেছে তার খবর পাওয়া গেলে তার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। পিক সিজনেও খুব বেশি পর্যটক আসে না তুংলাতে।

পথে একটা টোল পেয়েছিল রবিনের গাড়ি। ড্রাইভার নেমে গিয়ে অফিসে নিজের কাগজপত্র দেখিয়ে এসেছিল। ওরা কি প্রত্যেকটা গাড়ির নাম্বার টুকে রাখে সেই টোল গেটে?

নিজের রুমে গিয়ে কাগজপত্রের ব্যাগটা খুলে বসল রবিন। সে যে গাড়িতে এসেছে তার বিল ওপরেই রাখা ছিল। সঙ্গে টোলের কাগজও। একশো দশ টাকার টোল ফি লেগেছে তার গাড়ির এখানে ঢোকার সময়। কিন্তু সেখানকার কোনো টেলিফোন নাম্বার নেই। অর্থাৎ ফোনে কাজ হবে না, নিজেকেই যেতে হবে।

আরও একটা চিন্তা মাঝে মাঝেই রবিনের মাথায় উঁকি দিচ্ছে। সেই গাড়িটা ওকে মারতে চায়নি সেই কথা সত্যি, কিন্তু সেই সঙ্গে তার এটাও মনে হচ্ছে যে গাড়িটা তার দৃষ্টিপথে আসার কয়েক মুহূর্ত আগেই সে তার বিপদের সম্ভাবনার কথা টের পেয়ে গেছিল।

কিন্তু কীভাবে? গাড়িটার ছুটে আসার শব্দ? নাকি কিছু একটা দেখেছিল রবিন?

হয়তো বা দুটোর কোনোটাই নয়। সম্ভবত একেই সিক্সথ সেন্স বলে। কিন্তু সেটাই বা কী? কোনো কিছুকে একটা নাম দিয়ে দেওয়া মানেই তো আর তার ব্যাখ্যা নয়।

 

পাঁচ

দিন ছয়েক সিকিমে কাটিয়ে ফিরে এসেছে রবিন। সেখানে তার কাজকর্মে ওপরের কর্তারা সন্তুষ্ট বলেই তার মনে হচ্ছে। একটা ড্রাগ চক্রের ছবি পরিষ্কার হচ্ছে তদন্তকারীদের কাছে। রামদেব সিং এই চক্রের কেন্দ্রে না থাকলেও জড়িয়ে যে রয়েছেন তাতে এখন আর সন্দেহ নেই। প্রথমে যা মনে হয়েছিল তার চেয়ে এর শেকড় অনেক বেশি গভীরে। এবং এর সঙ্গে আরও বেশ কিছু মারাত্মক অপরাধ জড়িয়ে রয়েছে। যেমন বেয়াইনি অস্ত্র সরবরাহ। শিশু পাচার। নকল ওষুধ তৈরি। আরও আছে।

সিকিম থেকে ফিরে এসে কানের ডাক্তারের কাছে গেছিল রবিন। সব পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু জানিয়েছেন যে তার শোনার ক্ষমতা মোটামুটি আগের জায়গাতেই আছে। সেটাই লক্ষ্য ছিল। নিজের কয়েকটা অভিজ্ঞতার কথা বলার চেষ্টা করেছিল রবিন। চুপ করে শুনলেন ডাক্তার কৈলাস গোয়েল কিন্তু খুব একটা আমল দিলেন বলে মনে হোল না। সেটাই স্বাভাবিক কারণ ঘটনাগুলো বলার সময় তার নিজেরই মনে হচ্ছিল যে কয়েকটা স্বাভাবিক ঘটনাকে সে জোর করে অতিপ্রাকৃত করে ফেলছে।

তবে এই ধরনের ঘটনা আরও ঘটেছে এর মধ্যে। প্রায়ই দুপুরের দিকে সে মিউজিক শুনতে পায়। খুব মৃদু শব্দ কিন্তু সে যে শুনতে পাচ্ছে তাতে কোনো ভুল নেই। সেই সঙ্গে অন্যদের হাবভাব দেখে সে এটাও বুঝতে পারে যে তারা কিছুই অস্বাভাবিক শুনতে পাচ্ছে না। এখন সমস্যাটা যদি তার কান সম্পর্কিত না হয়, তাহলে কি মস্তিষ্কের সঙ্গে এর কোনো যোগাযোগ আছে? ব্যাপারটা নিয়ে বেশি এগোতেও ভরসা হচ্ছে না রবিনের কারণ সে কোনো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেলে খবরটা কিছুতেই চাপা থাকবে না তাদের দফতরে। সে ক্ষেত্রে তার চাকরি না গেলেও নির্ঘাত কোনো গুরুত্বহীন ডিপার্টমেন্টে ট্রান্সফার হয়ে যাবে।

এ ছাড়া ডা. গোয়েল যাই বলুন, তার শোনার ক্ষমতায় যে আগের চেয়ে অনেকটাই উন্নতি হয়েছে সে বিষয়ে রবিন নিঃসন্দেহ। তবে সমস্যা হচ্ছে এই ক্ষমতা তার সবসময় একরকম থাকে না। বিশেষ করে সে শুয়ে থাকলে আগের মতোই তার এখনও শব্দ শুনতে সমস্যা হয়।

বারকয়েক অনাদিদার সঙ্গে সে সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করার মনস্থ করেও শেষে পিছিয়ে এসেছে। অনাদিদার চেয়ে বিশ্বস্ত মানুষের কথা সে চিন্তাও করতে পারে না, কিন্তু ডিপার্টমেন্টের প্রতি দায়িত্বজ্ঞান হয়তো তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে রবিনও খুব একটা স্বস্তিতে নেই।

কয়েকদিন আগে আরও একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। সেদিন রাত্রে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিল রবিন, কারণ পরদিন ভোর পাঁচটা থেকে তার প্রিয় টেনিস প্লেয়ার জকোভিচের ম্যাচ ছিল। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে শুয়েছিল রবিন। ভোরে উঠে তৈরি হয়ে টিভির সামনে সবে বসতে যাবে এমন সময় তার মনে হল তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। ব্যালকনিতে কিছু জামাকাপড় থাকতে পারে এই চিন্তা করে বেরিয়ে দেখল, কোথায় কি? তারা ঝলমল করছে আকাশে। এমনও নয় যে জোরে বাতাস বইছে যার শব্দ শুনে তার ওরকম মনে হয়েছে। বেশ শান্ত আবহাওয়া।

আবার বাড়ির ভেতরে ঢুকে টিভি চালিয়ে বসল রবিন। আর তারপরই বুঝতে পারল যে এখানে নয়, অস্ট্রেলিয়ায় তুমুল বৃষ্টির জন্যে ম্যাচ দেরিতে আরম্ভ হবে। বেশ অবাক হয়েছিল রবিন। তারপর নিজেকে বুঝিয়েছিল ঘটনাটা নেহাতই কাকতালীয়— তার ভ্রমের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ঘটনাক্রমে ম্যাচ করে গেছে।

তবে এরপরও বেশ কয়েকবার এমন ঘটেছে যে সকালে ঝকঝকে রোদ্দুর দেওয়া সত্বেও তার মনে হয়েছে আজ বৃষ্টি হবে আর শেষ পর্যন্ত তা হয়েছেও। আরও একদিন অফিসের উদ্দেশ্যে বেরনোর আগে কী যেন মনে করে সে ছাদ থেকে জামাকাপড় এবং ব্যালকনির রেলিঙের ওপর থেকে ফুলগাছের টব নীচে নাবিয়ে এসেছিল। আর সেদিনই দুপুরে বলা নেই কওয়া নেই তুমুল ঝড়। অথচ সে কেন এরকম করেছিল তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা তার নিজের কাছেও নেই। তবে পরে তার মনে হয়েছিল যে সে মনে মনে ঝড়ের আশংকা করেছিল। এই মনে হওয়ারও কোনো যুক্তি নেই।

অবশ্য পৃথিবীতে সব কিছু কি আর যুক্তি মেনে চলে?

বিকেলের দিকে জাভেদ সাহেবের কামরায় ডাক পড়ল রবিনের। কোনোরকম ভনিতা না করে সোজা পয়েন্টে এলেন জাভেদ সাহেব, ‘রবিন, তোমাকে কম্পাউন্ডের ভেতর শিফট করতে হবে। এখন থেকে যতদিন না অর্ডার হচ্ছে তুমি এখানেই থাকবে। এখান থেকে বাইরে গেলে সিকিউরিটি তোমার সঙ্গে থাকবে। চব্বিশ ঘণ্টা। ড্রাগ ডিলারের কেসটায় একটা বড়ো ব্রেক-থ্রু হয়েছে গতকাল রাত্রে। তুমি জান যে যাদের বিরুদ্ধে আমরা এগোচ্ছি তাদের বিশাল ক্ষমতা। সুতরাং এবার হয়তো তারা আর নিছক ভয় দেখাবে না।’

একটা বড়ো শ্বাস নিল রবিন। এরকম হতে পারে তার আঁচ সে গত কয়েকদিন ধরেই পাচ্ছিল।

‘ড্রাইভার সুভাষকে তোমার ঘরের চাবি দিয়ে জরুরি সব জিনিস আনিয়ে নাও। বিশেষ করে এই কেস সম্পর্কিত একটা কাগজের টুকরোও যেন আর তোমার ঘরে না থাকে। তুমি যে ল্যাপটপ নিয়ে অফিসে আসো তা ছাড়া বাড়িতে অন্য কোনো ল্যাপটপ আছে? মোবাইল বা অন্য কোনও গ্যাজেট? নো? গুড! আগামীকাল সন্ধেতে আইরন ভল্টে একটা মিটিং হবে এই কেসটা সম্বন্ধে। আজ রাত্রের মধ্যে তুমি তোমার প্রগ্রেসের একটা ব্রিফ সিনোপ্সিস তৈরি করে আগামীকাল সকাল ন-টায় আমাকে দেখাবে। শার্প এট নাইন! গট ইট?’

মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল রবিন। সে অনুভব করছিল তার হার্ট বিটের স্পিড বেড়ে গেছে। আইরন ভল্ট এই ডিপার্টমেন্টের হার্ট এন্ড ব্রেন— টপ সিক্রেট বিষয় আলোচনার জায়গা। সেই সঙ্গে জটিল কেসের কৌশল ঠিক হয় এই রুমে। এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র বাইরে থেকে এই বিল্ডিঙের তিন তলায় অবস্থিত ভল্টটা দেখেছে রবিন। অনাদিদা এখনও পর্যন্ত একবার মাত্র সেই রুমে ঢোকার ছাড়পত্র পেয়েছে। অথচ অনাদিদা ওর চেয়ে ষোলো বছরের সিনিয়র। পদমর্যাদায় দুই স্টেপ ওপরে।

রাজ্যের বাইরে থেকেও দু-তিনজন উঁচু পদের অফিসার আসছে আগামীকাল সকালে। অর্থাৎ কালকের মিটিঙে সে সবচেয়ে জুনিয়র অফিসার। তার ওপর খুব বেশি দায়িত্ব দিচ্ছেন জাভেদ সাহেব— ব্যাপারটা একদিক দিয়ে যেমন চাপের, তেমনি অন্য দিক দিয়ে সম্মানেরও।

‘এই ব্যাপারে আর কারও সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন নেই। কাউকে অবিশ্বাস করার প্রশ্ন নেই কিন্তু এই কেসে অন্য কাউকে জড়ানো মানেই তাকে অহেতুক বিপদের মুখে ফেলা। আর, বি কেয়ারফুল। কোনো অচেনা জায়গায় যাবে না। আর যেখানেই যাবে, সঙ্গে যেন গার্ড থাকে।’

জাভেদ সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের সিটে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল রবিন। তারপর একটা প্যাড টেনে নিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসের লিস্ট তৈরি করতে বসল। এটা তবু ভালো। কিছুক্ষণের জন্যে অহেতুক চিন্তা থেকে মস্তিষ্ক বিশ্রাম পেল। তবে বেশিক্ষণের জন্যে নয়। একটু পরেই কেসটার সিনোপ্সিস তৈরি করার কাজে লেগে পড়তে হবে।

একটু পরেই এইচ আরের ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে তলব এল। লিস্টটা তৈরিই ছিল, সেটা পকেটে নিয়েই উঠে গেল রবিন।

ওকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন এইচ আরের ম্যানেজার গৌরব ধর সাহেব।

‘চলুন আপনার রুম দেখিয়ে দিই। জিনিস আনতে পাঠিয়ে দিয়েছেন?’

রবিন এখনও জিনিসের জন্যে কাউকে পাঠায়নি জেনে উত্তেজিত হয়ে পড়লেন ধর সাহেব।

‘কেন, সুভাষ যায়নি আপনার কাছে? দাঁড়ান, ডাকছি।’

সুভাষকে খুঁজে পেতে মিনিট দশেক লাগল। সে কিছুই জানে না। ওর ওপর বেশ খানিকক্ষণ হম্বি-তম্বি করলেন ধর সাহেব। দরকারের সময় সে কোথায় উধাও হয়ে গেছিল? গতকালই বা তার আসতে দেরি হয়েছিল কেন? এভাবে চললে…

বেগতিক দেখে ওনাকে থামিয়ে সুভাষের দিকে লিস্ট আর বাড়ির চাবি এগিয়ে দিল রবিন, ‘সিকিউরিটি বাধা দিলে আমাকে ফোন কোরো। আলমারির একদম নীচের তাকে ঠোঙার ভেতরে কিছু ওষুধ রাখা রয়েছে। সেটা অবশ্যই আনবে। বাকি জিনিসগুলি খুঁজে পেতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। তবুও দরকার হলে ফোন কোরো।’

ধর সাহেবের ওপর গজগজ করতে করতে সুভাষ চলে গেল লিস্ট আর চাবি নিয়ে। রবিন এগোল নিজের থাকার রুম দেখতে ধর সাহেবের সঙ্গে। সন্ধে হয়ে এসেছে। ওর হাতে বেশি সময় নেই।

 

ছয়

প্রায় রাত্রি আটটা নাগাদ ইন্টারকমে ফোন করে চা অর্ডার দিল রবিন। এখন সে অনেকটাই রিলিভড। মোটামুটি একটা খসড়া সে তৈরি করে ফেলেছে কেসটা সম্বন্ধে। এবার প্রয়োজন মতো ডিটেলিং করতে হবে প্রত্যেকটি পয়েন্টের। কতটা ডিটেলে সে যাবে? এই ব্যাপারে জাভেদ সাহেবের সঙ্গে একবার আলোচনা করলে ভালো হত। কিন্তু তার উপায় নেই। উনি প্রয়োজন পড়লে রবিনকে ফোন করতে পারেন কিন্তু ওঁকে ফোন করা যাবে না। অন্তত যদি না খুব এমারজেন্সি প্রয়োজন হয়। এটা সেই ক্যাটাগরিতে পড়ে না।

চা নিয়ে রবিন সবে চেয়ারে বসেছে তখন সে গলাটা শুনতে পেল। মহিলার গলা।

‘মি. সেন, আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?’

পরিষ্কার বাংলায় কথা বললেও অবাঙ্গালি টান আছে বলার ধরনে। কিন্তু শব্দটা আসছে কোথা থেকে? চারিদিকে তাকাল রবিন। চা নিয়ে নির্দেশমতো সে তার রুমের দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়েছিল। জানালাও বন্ধ। মোবাইলটা বিছানার ওপর রাখা। ওটার স্ক্রিন অন্ধকার।

‘আপনি আমার গলার শব্দ শুনে বিচলিত হবেন না। আপনি মৃদু স্বরে আমার সঙ্গে কথা বললে আমি শুনতে পেয়ে যাব।’

রবিন ভীতু নয় কিন্তু তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। মহিলার গলার স্বর কোথা থেকে আসছে সে একেবারেই বুঝতে পারছে না। ইয়ারফোন কানে নিয়ে মিউজিক শোনার সময় অনেকটা এইরকম অনুভূতি হয়। কিছুক্ষন পরে সে বলল, ‘আপনি কোথা থেকে কথা বলছেন?’

‘আপনার কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকে নয়। প্লিজ শান্ত হয়ে এক জায়গায় বসুন। আমি এই মুহূর্তে সরাসরি আপনার মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। এর মধ্যে আপনার কানের কোনো ভূমিকা নেই। গত কয়েকদিন ধরে আপনি একইভাবে মিউজিক শুনতে পেয়েছেন।’

আবার চারিদিকে চাইল রবিন। ঘটনাটা সত্যি ঘটছে নাকি সে স্বপ্ন দেখছে? কিন্তু আশপাশের সব কিছুই স্বাভাবিক। তার সামনে রাখা চায়ের খালি কাপ, টেবিলের ওপর তার ডায়েরি আর ল্যাপটপ। একটু দূরে বিছানা।

‘গত কয়েকদিন ধরে আপনার ওপর কিছু পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সেই পরীক্ষার ডিটেল এই মুহূর্তে বলছি না। কিন্তু যেহেতু আগামীকাল রাত্রে আপনি একটা অত্যন্ত গোপনীয় মিটিঙে অংশগ্রহণ করতে চলেছেন আমরা এই পরীক্ষা থামিয়ে দিতে চাইছি। এছাড়া আরও কারণ আছে। কিন্তু তার আগে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হওয়া দরকার। আগামীকাল বেলা বারোটা নাগাদ একটা নির্দিষ্ট জায়গায় মিট করব আমরা।’

‘কালকে সম্ভব নয়। প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে থাকব।’ রবিন বিড়বিড় করে বলল।

‘আপনার ব্যস্ততার কারণ আমি জানি কিন্তু আমাদের হাতে সময় নেই। আপনি সকালে মি. জাভেদের সঙ্গে মিটিঙের সময় ওঁকে জানাবেন আপনার ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট রয়েছে। বলবেন, চোখের সমস্যার জন্যে ডাক্তার দেখাতে হবে। ডাক্তারের বুকিং কনফার্ম করে একটা ম্যাসেজ আপনার ফোনে একটু পরেই পাবেন। সেই হাসপাতালেই আমি আপনার জন্যে অপেক্ষা করব।’

সমস্ত চিন্তা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে রবিনের। ভদ্রমহিলা মনে হচ্ছে তার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ ট্র্যাক করছেন। তার কেস সম্বন্ধে সমস্ত গোপন তথ্যও সম্ভবত এঁর কাছে রয়েছে। কিন্তু এঁর কথামতো কাজ করার রিস্ক খুব বেশি। রবিনের ডিপার্টমেন্ট ব্যাপারটা জানতে পারলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এখন কী করা উচিৎ তার? জাভেদ সাহেবকে ফোন করে সব জানাবে?

‘প্লিজ মি. সেন, আমার এই কলের কথা এক্ষুনি কাউকে জানাবেন না। আমাদের দেখা হওয়ার পর সেই অপশন তো আপনার কাছে থাকবেই। আমাদের মোটিভ অন্যরকম হলে আগামীকাল মিটিং শেষ হওয়া অব্দি আমরা অপেক্ষা করতাম। কিন্তু সেই মিটিঙের ডিটেল আমরা জানতে চাই না বলেই আজকে আপনার সঙ্গে আমি কথা বলছি। বিশ্বাস করুন, আমার নির্দেশ অনুসরণ করলে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।’

রবিন কি জাভেদ সাহেবকে ফোন করার কথা ভুল করে বলে ফেলেছে? তা না হলে তার মনের কথা কীভাবে জানতে পারেন ভদ্রমহিলা? নাকি তার মস্তিষ্কে কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে?

‘আগামীকাল বেলা বারোটার সময় আমাদের দেখা হচ্ছে। এখন আপনি কাজ করুন। প্লিজ কোনোরকম দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার সঙ্গের দেহরক্ষীকে নিয়ে নির্দ্বিধায় হাসপাতালে আসতে পারেন। এমন কিছুই ঘটবে না যাতে সরকার আপনাকে সন্দেহ করবে। বরং আমাদের এই আলোচনার কথা অন্য কেউ বিশ্বাস করবে না। সে ক্ষেত্রে আপনার মানসিক সমস্যা রয়েছে বলে সন্দেহ করা হবে আপনার ডিপার্টমেন্টের তরফ থেকে। শুভরাত্রি! আগামীকাল বেলা বারোটায় আমরা মিট করছি।’

মস্তিষ্কের মধ্যে খুব আস্তে একটা ‘ক্লিক’ জাতীয় শব্দ শুনতে পেল রবিন। তারপর আবার সব কিছু স্বাভাবিক।

টেবিলের ওপর ঝুঁকে, দুই হাতে নিজের মাথা ধরে কয়েক মিনিট বসে রইল রবিন। সে নিশ্চিতভাবে নিজের মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। এক্ষুনি যেটা ঘটল সেটা শুধু অস্বাভাবিক নয়, অসম্ভব। এখন কী করা উচিৎ তার?

কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে টেবিলের ওপর ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে চোখ গেল রবিনের। অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। তার কাজ এখনও অনেকটাই বাকি।

আপাতত হাতের কাজটাই মিটিয়ে ফেলা যাক। সকালে সময় পেলে জাভেদ সাহেবকে সব কিছু খুলে বলবে রবিন। সে ক্ষেত্রে তিনি হয়তো তাকে এই কেস থেকে সরিয়ে দেবেন। শুধু এই কেস থেকে? আর চিন্তা না করে নিজেকে কাজে ডুবিয়ে দিল রবিন। কিছুক্ষণ পর তার মোবাইল বেজে উঠল। ম্যাসেজ ঢুকল মোবাইলে।

উঠে গিয়ে মোবাইলটা হাতে নিল রবিন। আগামীকাল বারোটার সময় পার্ল হসপিটালে তার ডক্টর মালবিকা মৈত্রর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট কনফার্ম করা হয়েছে। হাসপাতালের পাঁচ তলায় চোখের চিকিৎসার ডিপার্টমেন্টে রিপোর্ট করতে হবে তাকে।

ফুঁ দিয়ে বুকের ভেতরে জমা বাতাস বের করল রবিন। ক্লান্ত লাগছে। তার ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু মনে হয় না সেটা আজ রাত্রে আসবে।

 

সাত

সতেন্দর সিংকে হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে ঢুকে রিসেপসনের দিকে এগিয়ে গেল রবিন। পাঁচ তলায় যেতে হবে সেটা জানা থাকলেও রিসেপসনে বসে থাকা চারজন ভদ্রমহিলার মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করে সে কনফার্ম হয়ে নিল। কম্পিউটার দেখে তিনি রবিনের ডক্টর মালবিকা মৈত্রর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট কনফার্ম করে লিফটের পথ দেখিয়ে দিলেন। যেহেতু ডক্টর মৈত্র এই হাসপাতালের ভিজিটিং ডাক্তার, ওঁর ফিজ সরাসরি ওঁকেই দিতে হবে।

গতরাত্রের ঘটনাটা নিয়ে এখনও দুশ্চিন্তায় রয়েছে রবিন। তবে কম হলেও রাত্রে কিছুটা ঘুম হয়েছে। আরও একটা কথা স্বস্তির— ওর কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাভেদ সাহেব। ওর ডাক্তার দেখাবার কথা শুনে শুধু একবার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছেন ব্যাপারটা পোস্টপোন করা যায় কিনা। তারপর রবিন উত্তর দেওয়ার আগেই ওকে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে বলেছেন সে যেন চারটের মধ্যে অবশ্যই ফিরে আসে।

অফিস থেকে হাসপাতালে পৌঁছতে মিনিট পঁয়তাল্লিশ লাগল রবিনের। এখানে খুব বেশি হলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগবে। সব মিলিয়ে আড়াইটের মধ্যে সে ফিরে যেতে পারবে।

ডাক্তারের চেম্বারের সামনে রবিন যখন পৌঁছল তখন বারোটা বাজতে সাত মিনিট বাকি। চেম্বারের বাইরে বসে থাকা নার্সকে নিজের নাম বলতেই ওকে সামনের একটা চেয়ারে বসতে বলে তিনি উঠে চলে গেলেন।

পার্ল এই অঞ্চলের বেশ বড়ো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। তবে এই সময় খুব বেশি ডাক্তার বসে না বলে ভিড় একটু কম। বসার জায়গা, লবি, চেম্বার সবকিছু ঝকঝক করছে। হাসপাতালের ভেতরটা বেশ চুপচাপ। আশপাশের মানুষজন নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে কথা বলছে।

‘এক্সকিউজ মি স্যার! ম্যাডাম এসে গেছেন।’ নার্সের গলার শব্দে সামান্য চমকে উঠল রবিন। তারপর এগিয়ে গেল চেম্বারের দিকে। ওর সঙ্গে সঙ্গে নার্সও ঢুকল।

‘আসুন মি. সেন।’ নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওকে আপ্যায়ন করলেন ডাক্তার, ‘প্লিজ টেক ইওর সিট। সারা, আমি বেল না বাজানো অব্দি কেও যেন চেম্বারে না ঢোকে। ক্লিয়ার?’

‘ইয়েস ম্যাম!’ বলে দরজা টেনে নার্স বেরিয়ে গেল।

ডক্টর মালবিকা মৈত্রকে ভালোভাবে দেখল রবিন। বেশ চোখে পড়ার মতো লম্বা। শরীরে একফোঁটা মেদ নেই। বয়স সম্ভবত চল্লিশের আশেপাশে। মুখে হালকা মেক আপের চিহ্ন। গতরাত্রে এর গলাই কি সে শুনেছিল?

দু-জনেই নিজের নিজের চেয়ারে বসলে রবিনের দিকে চেয়ে অল্প হাসলেন ডক্টর মৈত্র।

‘আমি জানি আপনার মনে অনেক প্রশ্ন জমে রয়েছে। সেই সম্বন্ধে আলোচনার আগে আমার একটা অ্যাসিওরেন্স চাই। আপনার সঙ্গে আশা করি কোনো রেকর্ড করার বা কথা ট্রান্সমিট করার যন্ত্র নেই?’

একটু অবাক হল রবিন। এই সাবধানতা তো তার নেওয়ার কথা। সে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।

টেবিলের ওপর রাখা নিজের মোবাইলটার দিকে নির্দেশ করে ডক্টর মৈত্র বললেন, ‘মোবাইলটা সুইচ অফ করা রয়েছে। এটা ছাড়া এই রুমে কোনো ক্যামেরা বা অন্য গ্যাজেট নেই। আপনিও নিজের মোবাইল সুইচ অফ করে টেবিলের ওপর রাখুন।’

টেবিলের ওপর নিজের মোবাইল সুইচ অফ করে নামিয়ে রাখল রবিন।

‘আপনার কান এখন কেমন কাজ করছে? শুনতে কোনরকম অসুবিধে হচ্ছে?’

ইনি তো চোখের ডাক্তার, হঠাৎ রবিনের কান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন কেন? আর বেশি চিন্তা করতে পারছে না রবিন। দেখাই যাক ঘটনা কোনদিকে এগোয়।

‘এখন ঠিক আছে। মানে, আগের চেয়ে বেটার। তবে মাঝে মাঝে সামান্য অসুবিধে হয় এখনও।’

মাথা নাড়লেন ভদ্রমহিলা, ‘অসুবিধের সময়টা খেয়াল করে দেখেছেন?’

কিছুক্ষণ চিন্তা করল রবিন। তারপর বলল, ‘রাত্রের দিকে। আর ভোরবেলায়, ঘুম থেকে ওঠার ঠিক পরেই।’

মাথা নেড়ে সামান্য হাসলেন ডক্টর মৈত্র, ‘এর থেকে কিছু বুঝতে পারছেন? ওই দুটো সময় বাদ দিয়ে কেন আপনার শ্রবণশক্তি শুধু নর্মালই নয়, অনেক সময় নর্মালের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে?’

‘তখন আমার মস্তিষ্ক ক্লান্ত থাকে বলে?’ কথাটা বলেই রবিন রিয়ালাইজ করল সে ঠিক বলেনি। রাত্রে হয়তো তার ব্রেন একটু ক্লান্ত থাকতে পারে, কিন্তু ভোরবেলায় তো ফ্রেস থাকার কথা। তাহলে?

‘আপনার চশমাটা একটু আমাকে দিন, প্লিজ।’ সহজ গলায় বললেন ডক্টর মৈত্র। ওঁর কথামতো সে নিজের চশমা খুলে এগিয়ে দিল ডাক্তারের দিকে। চশমাটা হাতে নিয়ে কিছু একটা বললেন ডক্টর মৈত্র কিন্তু ভদ্রমহিলার ঠোঁট নড়তে দেখলেও তার গলার শব্দ শুনতে পেল না রবিন। এবার আর গলার শব্দ নয়, তার লিপ রিড করার চেষ্টা করল রবিন। এবার সে বুঝতে পারল তিনি জিজ্ঞেস করছেন সে এখন তার কথা শুনতে পাচ্ছে কিনা।

‘না।’ মাথা নেড়ে উত্তর দিল রবিন।

‘ঠিক আছে, এবার চশমাটা পরে ফেলুন।’ বলে চশমাটা ওর হাতে তুলে দিলেন ডক্টর মৈত্র।

চশমাটা পরার আগে সেটাকে চোখের কাছে তুলে ধরে খুব মনোযোগ দিয়ে আপাদমস্তক কয়েক সেকেন্ড ধরে পরীক্ষা করল রবিন। কোনোকিছু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

‘এতক্ণন আমি আপনার সঙ্গে প্রায় ফিসফিস করে কথা বলছিলাম, মিঃ সেন। এখনও তাই বলছি। তবুও আমার কথা শুনতে আপনার কোনো অসুবিধে হয়নি এই চশমাটা পরে ছিলেন বলে। যখন ওটা পরে থাকেন না, তখন আপনার কানের সমস্যা আবার চাড়া দিয়ে ওঠে। আপনাকে এই চশমা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য আপনার চোখ নয়, কান। আর আজকে আপনাকে এখানে ডেকে পাঠানোর কারণও আপনার এই চশমা।’

কোনো কথা বেরোল না রবিনের মুখ থেকে। শুধু মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে সে যে-কোনো মুহূর্তে জেগে উঠবে ঘুম ভেঙে। কিন্তু স্বপ্ন কি এত ডিটেলড হয়?

 

আট

‘প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আমেরিকার মনোবিজ্ঞানী পল ব্যাক ই রিতা প্রথম ইন্দ্রিয়ের অনুভবের প্রতিস্থাপনার বিষয় কাজ আরম্ভ করেন। প্রতিস্থাপনা অর্থাৎ এক ইন্দিয়ের কাজ অন্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে করা। উনি দেখান যে আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে এমন নমনীয়তা রয়েছে যার ফলে একটা ইন্দ্রিয় অকেজো হয়ে পড়লে তার জায়গায় অন্য ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা সম্ভব।

ই রিতা প্রধানত যারা দৃষ্টি হারিয়েছেন তাদের নিয়ে কাজ আরম্ভ করেন। আমাদের সামনের দৃশ্যকে যদি ভাইব্রেশানের মাধ্যমে ত্বকের ওপর অনুভব করা হয়, কিছুদিনের মধ্যেই দেখা যাবে যে একজন অন্ধ ব্যাক্তি সেই ভাইব্রেশানের ওপর নির্ভর করে ‘দেখতে’ সফল হচ্ছেন। এই কাজ শুরুতে মাথার ওপর বেশ বড়ো ক্যামেরা ব্যবহার করে করা হত। টেকনোলজির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আজ সেটা চশমার ওপর ছোটো সেন্সরের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। মানুষের জিব বা চোখের পাতার ওপরের চামড়ার সংবেদনশীলতা খুব বেশি বলে এই ভাইব্রেশান শরীরের এই দুটো জায়গার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কে পাঠানো হয়। আজ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার মানুষ নিজের দৃষ্টি খুঁজে পেয়েছে।’

এখানে মজার কথা হল, ই রিতার এই আবিষ্কারের অনেক আগেই কিন্তু আমরা দেখতে পেয়েছিলাম যে বেশ কিছু অন্ধ মানুষ নিজেদের কথা বা পায়ের শব্দের প্রতিধ্বনি নিজের ত্বকে অনুভব করে সামনে রাখা জিনিসপত্র সম্বন্ধে অনুমান করতে পারে। অনেকটা বাদুড়ের মতো।

তবে আধুনিক দেখার যন্ত্র, যা ‘ব্রেনপোর্ট’ নামের একটা কোম্পানি সবচেয়ে সফলভাবে মার্কেটে এনেছে, অনেক বেশি সংবেদনশীল। এই যন্ত্র ব্যবহার করে অনেকেই প্রায় প্রাকৃতিক দেখার মতোই তাদের আশপাশের জগৎ অনুভব করছে।’

এতটা বলে একটু থামলেন ডক্টর মৈত্র। সম্ভবত রবিনের প্রতিক্রিয়া বা প্রশ্নের অপেক্ষা করছেন। রবিনের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে তিনি আবার বলতে আরম্ভ করলেন।

‘ই রিতার একটা বিখ্যাত উক্তি হল, আমরা চোখ নয়, মস্তিষ্কের সাহায্যে দেখি। রেটিনা দৃশ্যকে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গে পরিবর্তিত করে মস্তিষ্কের সেই অংশে পাঠিয়ে দেয় যা আমাদের দেখার ডেটা প্রসেস করে। অন্ধ মানুষের ক্ষেত্রে চোখ নষ্ট হলেও, মস্তিষ্কের সেই অংশ আগের মতোই সুস্থ থাকে। সুতরাং অন্য কোনো ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেও, যেমন ত্বক বা কান, যদি আমরা সেই তরঙ্গ মস্তিষ্কের দেখার জন্যে নির্দিষ্ট অংশে পাঠাতে সক্ষম হই, তাহলে আমাদের মস্তিষ্কে দেখার অনুভুতি সৃষ্টি হবে। ঠিক একইভাবে আজ বধিরকেও আমরা শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হচ্ছি।

আপনার ক্ষেত্রে আপনার চশমা শব্দকে কম্পনে পরিবর্তন করে তার ডাঁটির পেছনের অংশের মাধ্যমে সেই কম্পন আপনার কানের ওপরের ত্বকে পাঠিয়ে দেয়। সেই কম্পনের অনুভুতি আপনার মস্তিষ্কের শোনার জন্যে নির্দিষ্ট অংশে পৌঁছলে আপনি শুনতে পান। এই কম্পন অনুভবের সংবেদনশীলতা আপনার এই চশমার ক্ষেত্রে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রেই সেই সংবেদনশীলতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বাড়িয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। তার ফলে আপনি কখনও কখনও এমন কিছু শব্দ শুনতেন যা সাধারন মানুষের কান শুনতে পায় না। একটু আগে আমার ফিসফিস করে বলা কথা সেজন্যেই আপনি শুনতে পাচ্ছিলেন।’

আবার রবিনকে কিছটা সময় দিলেন ডক্টর মৈত্র। অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে রবিন প্রশ্ন করল, ‘কিছুটা বুঝলাম। কিন্তু এটা তো আমাকে জানিয়েও করা যেত। কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করার আগে সেটার সম্বন্ধে সব কিছু জানার অধিকার আমার রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনারা যেটা করেছেন সেটা বে-আইনি। সব কিছু আমাকে জানিয়ে করলে এমনিতে হয়তো আমি কোনো আপত্তি করতাম না কিন্তু আমি যে ধরনের চাকরি করি তাতে…’

রবিন তার কথা শেষ করার আগেই ডক্টর মালবিকা মৈত্র বলে উঠলেন, ‘এখানেই প্রবলেম হয়েছে। আপনার কাজের বিষয়ে আমরা জানতাম না। আপনাদের অফিস দেখে বাইরে থেকে বোঝা অসম্ভব ওখানে সরকারের গোপনীয় কাজকর্ম হয়। আপনার আইডেন্টিটি কার্ডেও আপনার সঠিক পেশা উল্লেখ করা নেই। তবুও আমাদের আরও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ ছিল। তবে শুধুমাত্র আপনার কানের চিকিৎসার জন্যে চশমাটা দেওয়া হয়নি আপনাকে। এ ছাড়াও আপনার ওপর আরও কিছু পরীক্ষা চালানো হয়েছে। যদিও কথাটা আমাদের টিমের অনেকেই জানত না এতদিন। এমনকী আমি নিজেও জানতাম না।’

এক আলাদা ধরনের উত্তেজনা অনুভব করছিল রবিন। এখন আর তার নিজেকে নিছক গিনিপিগ বলে মনে হচ্ছে না। বরং আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তার ছোট্ট অবদান থাকবে সেটা চিন্তা করে ভালো লাগছে।

‘প্রথম, আপনার চশমায় মাইক্রোট্রান্সমিটার লাগানো রয়েছে যার মাধ্যমে শুধু আপনিই নন, আমরাও আপনার আশপাশের সব শব্দ, সব কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিলাম। তবে এটায় অসাধারণত্বের কিছু নেই। এছাড়া আপনার মস্তিষ্ককে নিয়ে কিছু পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

‘আপনি নিশ্চই জানেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে পশু-পাখিরা অস্বাভাবিক ব্যাবহার আরম্ভ করে। পরিযায়ী পাখি প্রত্যেক বছর হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ অন্তত কিছু পশু-পাখিদের মধ্যে এমন কিছু অনুভব করার ক্ষমতা রয়েছে যা মানুষের নেই। আমরা আজ বিজ্ঞানের সাহায্যে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ করতে সক্ষম। তেমনই পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র অনুসরণ করে মানুষ আজ অনায়াসে নিজের গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের ক্ষমতা কি আমাদের মস্তিষ্ক লাভ করতে পারে? যাতে কোনো যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়াই সে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ করতে বা অচেনা জায়গায় সঠিকভাবে নিজের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাবে?

‘একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, এটা না পারার কারণ নেই। আমরা যদি ত্বক, চোখ বা কানের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাষ বা পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের তরঙ্গ আপনার মস্তিষ্কে পৌঁছে দিতে সক্ষম হই, তাহলে আপনিও আবহাওয়ার পূর্বাভাষ করতে সক্ষম হবেন বা চৌম্বকীয়ক্ষেত্র অনুসরণ করে নির্ভুল গন্তব্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম হবেন। অর্থাৎ এইভাবে আমরা মানুষের মধ্যে নতুন অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারব। এই উপায়ে সেন্স অরগ্যানের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হবে মানুষ।’

এতটা বলে থামলেন ডক্টর মৈত্র। ওঁর দৃষ্টি রবিনের চোখের দিকে। তার নিজের দৃষ্টিতে কৌতুকের ছাপ। রবিন কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে থামিয়ে নিল। তার মনে এখন এতগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে ঠেলা মারছে যে নিজের কথা ঠিকমতো গুছিয়ে উঠতে পারছে না।

‘এখন আপনার মস্তিষ্কে যদি অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার তথ্য পাঠানো হয়, তাহলে এখানে বসেই আপনি সেখানকার আবহাওয়া অনুভব করতে সক্ষম হবেন। এই অনুভব তো আপনার অলরেডি আছে।’ এবার শুধু চোখেই নয়, কৌতুকের ছাপ ডক্টর মৈত্রর গলার স্বরেও।

অল্প একটু মাথা নেড়ে নিজের সম্মতি ব্যক্ত করা ছাড়া আর কোনো কথা জোগাল না রবিনের। সব কিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। একটা করে প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তবীজের মতো আরও অসংখ্য প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে তার মনে।

আবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে নিজের বক্তব্য আরম্ভ করলেন ভদ্রমহিলা, ‘এতটা পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু এর পরের পরীক্ষাগুলো বেশ বিতর্কিত। বেশ কিছুদিন আগে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে ঘুমন্ত মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে সে কী স্বপ্ন দেখছে সেটা বুঝে ফেলা সম্ভব। সেই আরম্ভ। তারপর বেশ কয়েক দশক কেটে গেছে। কন্ট্রোলড পরিবেশে আরও হাজার হাজার পরীক্ষা করে এখন জেগে থাকা মানুষের চিন্তাও তার মস্তিষ্কের তরঙ্গ অ্যানালিসিস করে বের করে ফেলা যায়।’

কয়েক মুহূর্তের জন্যে থামলেন ডক্টর মৈত্র। শেষের কথাগুলির গুরুত্ব যাতে রবিন উপলব্ধি করতে পারে সেই জন্যেই এই সময় দেওয়া। নিঃশব্দে কয়েক মুহূর্ত কাটল।

রবিনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা গেল। চশমার মাধ্যমে কি তাহলে তার মস্তিষ্কের তরঙ্গও পৌঁছে গেছে এদের কাছে? তার মানে তার সমস্ত চিন্তা-ভাবনার হদিস রয়েছে এই ভদ্রমহিলার কাছে? তার কাজকর্মের সম্পর্কিত গোপন তথ্য তো আছেই, সেই সঙ্গে তার ব্যক্তিগত অনুভূতি— ইচ্ছে, লোভ, রাগ, ভালোবাসা— কোনোকিছুই আর গোপন নেই?

যেন তার মনের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে মাথা নাড়লেন ডক্টর মৈত্র, ‘কিন্তু এখানেই শেষ নয়, মি. সেন। আমাদের পরের পদক্ষেপ হয়তো আপনাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলবে। দূর থেকে মানুষের চিন্তা-ভাবনা টের পেয়ে যাওয়ার পরের পদক্ষেপ হচ্ছে তরঙ্গের মাধ্যমে সেই চিন্তা-ভাবনা নিয়ন্ত্রিত করা। ধরুন একটা ‘গাড়ি’ দেখে আপনার মস্তিস্কের যে অংশে একটা বিশেষ তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে, আমরা যদি সেই অংশে সেই একই তরঙ্গ পাঠাই, তাহলে আপনি চোখের সামনে গাড়ি না থাকলেও গাড়ি অনুভব করবেন। ঠিক এই পথ ধরেই হয়তো কিছু মানুষ দূর থেকে অন্য মানুষদের চিন্তা-ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হবেন। কোন অভিজ্ঞতা বাস্তবে ঘটছে আর কোনটা আপনার মস্তিষ্কে প্ল্যান্ট করা হয়েছে সেটার মধ্যে কোনো তফাৎ করতে পারবেন না আপনি।’

এটাও কি সম্ভব? কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল রবিন। টেবিলের ওপর রাখা নিজের চশমাটার দিকে তাকাল। তারপর সেটাকে হাতে তুলে নিয়ে চোখের সামনে নিয়ে এল। তার হাত কাঁপছে। ভয়ে না উত্তেজনায়? ঠিক বুঝতে পারছে না রবিন। কিন্তু সে এটুকু বুঝেছে যে কিছু মানুষ বিজ্ঞানের হাত ধরে অসীম ক্ষমতা করায়ত্ব করে ফেলেছে। বা অদূর ভবিষ্যতে করে ফেলতে চলেছে।

‘এবার একটু নিজের হয়ে কৈফিয়ত দিয়ে রাখি, মি. সেন। আমি এতদিন জানতাম আপনার ওপর শুধুমাত্র অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রণালীর পরীক্ষা হচ্ছে। সেই সঙ্গে আপনার মস্তিষ্কে বিভিন্ন জায়গার আবহাওয়ার ইনপুট দেওয়া হত। বাকিটা আমি জাস্ট দিন দুয়েক আগেই ঘটনাক্রমে জানতে পেরেছি। আর তার ফলেই এই পরীক্ষা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি আজকের পর থেকে। আপনাকেও এই চশমা থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে আপনাকে এখানে ডাকা। তবে আপনার কাছে খারাপ খবর হচ্ছে যে এই চশমা ব্যবহার না করলে আপনার শোনার ক্ষমতা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তবে এমন ডাক্তারের খোঁজ দিতে পারব যে একই মেথডে আপনার শ্রবণশক্তি ফিরে পেতে সাহায্য করবে।’

টেবিলের ওপর আবার চশমাটা নাবিয়ে রেখে ডক্টর মৈত্রকে জিজ্ঞেস করল রবিন, ‘এই পরীক্ষা কারা করছে? আপনার মনে হ য়না সেটা থামানোর প্রয়োজন আছে?’

‘আমার – আপনার মনে হওয়ায় কিছু এসে যায় না, মি. সেন। বিজ্ঞানের হাতে যখন একটা প্রযুক্তি চলে আসে, তখন সেটার ব্যবহার রোধ করা প্রায় অসম্ভব। খুব বেশি হলে, আইন এনে তা কয়েক বছর পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আজকে হয়তো এই চশমার প্রয়োজন পড়ছে, কালকে হয়তো দূর থেকেই আপনার মস্তিষ্ক স্ক্যান করে আপনার চিন্তা-ভাবনা পড়ে ফেলা সম্ভব হবে। বা শুধুমাত্র আপনার মস্তিষ্ক লক্ষ্য করে তরঙ্গ পাঠিয়ে আপনার চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ করে ফেলা যাবে। আবার সেই সঙ্গে প্রযুক্তিরই মাধ্যমে এটার প্রতিরোধও সম্ভব। হয়তো ভবিষ্যতে নিজের চিন্তা-ভাবনা সুরক্ষিত করার জন্যে সবসময় আমাদের হেলমেট পরে থাকতে হবে। এমন হেলমেট যা আমাদের মস্তিষ্ককে বাইরের তরঙ্গের প্রভাব থেকে রক্ষা করবে। তবে আপাতত কিছুদিনের জন্যে এই পরীক্ষা থেমে যাবে কারণ আমি ছাড়াও বেশ কয়েকজন ডাক্তার এবং বিজ্ঞানী, যারা এতদিন এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য জানতেন না, তারা দল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।’

আর তারপর? কিছুদিন পর কী হবে? যে বা যারা এতদূর এগিয়েছে তারা কি এত সহজে হার মানবে? মালবিকা মৈত্র আর অন্যান্য ডাক্তার বা বিজ্ঞানী, যারা আর তাদের সমর্থন করছেন না কিন্তু এই পরীক্ষার বিষয়ে জেনে গেছেন, তাদের কোনো বিপদের সম্ভবানা নেই?

‘আছে। কিন্তু সেই নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত নই। আর কিছু না পারি, এই বিপদ সম্বন্ধে জনসাধারণকে সচেতন করতে পারব আমরা। আর বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে উঠলে বিভিন্ন দেশের সরকার এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল রবিন। তারপর ডক্টর মৈত্রকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার কেসগুলো সম্বন্ধে তথ্য কি আপনাদের কাছে রয়ে গেল? আর কথাবার্তার রেকর্ডিং?’

রবিনকে আশ্বস্ত করলেন ডক্টর মৈত্র। রবিন এবং অন্যান্য মানুষ যাদের ওপর এই ধরনের পরীক্ষা হচ্ছিল তাদের সম্পর্কিত সব তথ্য অলরেডি ডেস্ট্রয় করে ফেলা হয়েছে।

‘এবার আপনার চশমার পালা।’ বলে ডান হাত বাড়িয়ে নিজের মোবাইল ফোন তুলে নিলেন ডক্টর মৈত্র। রবিন বুঝতে পারল তিনি পাসওয়ার্ড দিয়ে তার মধ্যে কোনো এক মেনুতে ঢুকলেন। তারপর আড়চোখে টেবিলের ওপর রাখা চশমাটার দিকে একবার তাকিয়ে ডান হাতের আঙুল দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে একটা আলতো টোকা দিলেন।

খুব মৃদু শব্দ বেরিয়ে এল চশমাটার মধ্যে থেকে। সেই সঙ্গে ছোটো স্ফুলিঙ্গ দেখা গেল চশমার ফ্রেমের ভেতর। সামান্য চমকে নিজের চেয়ারের পেছেনের সাপোর্টে হেলান দিল রবিন।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডক্টর মালবিকা মৈত্র। তারপর রবিনের দিকে চেয়ে ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘ডান।’

Tags: kalpabiswa y7n1, science fiction, কল্পবিজ্ঞান গল্প, প্রমিত নন্দী, সন্দীপ চৌধুরী

One thought on “স্পন্দন

  • July 6, 2022 at 11:07 am
    Permalink

    Very nice story, technological aspect and it’s pros and cons are nicely described with details. Enjoyed it fully.

    Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!