চিত্রবিচিত্র মানুষ কথা

  • লেখক: সুমিত বর্ধন
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

রে ব্র্যাডবেরির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বই দ্য ইলাস্ট্রেটেড ম্যান। উপন্যাস নয়, বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের কাছাকাছি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত আঠেরোটি কাহিনিকে এই বইতে একত্রিত করা হয়েছে অন্য আর একটা গল্পের শুরু এবং শেষের মধ্যে তাদের বসিয়ে দিয়ে। সাহিত্য পরিভাষায়, এই আঠেরোটা গল্পকে ফ্রেমের মতো ঘিরে রাখা গল্পটাকে বলা চলে ফ্রেম স্টোরি বা ফ্রেম ন্যারেটিভ। সারা শরীর জুড়ে অদ্ভুত রঙিন উলকি আঁকা এক মানুষের এই ফ্রেম স্টোরি থেকেই এই বইয়ের নাম দ্য ইলাস্ট্রেটেড ম্যান বা চিত্রবিচিত্র মানুষ।

মানুষের অস্বাভাবিক শারীরিক অবয়ব, আয়তন বা বিকৃতি মেলায় বা জনসমাগমে প্রদর্শিত করে অর্থ উপার্জন করার রেওয়াজটা অনেককালের। আমেরিকায় এই ধরণের প্রদর্শনীকে বলা হত ফ্রিক শো। পায়ে হেঁটে আমেরিকার উইস্কনসিন প্রদেশ ঘুরতে বেরেনো এ পর্যটকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় এমনই এক ফ্রিক শোতে কাজ করা মানুষের। তার শরীর জোড়া রঙিন উল্কি তাকে যেন করে তুলেছে এক সাক্ষাৎ ছবির গ্যালারি। রাত পড়লে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে সে ছবিগুলো, বলতে আরম্ভ করে একের পর এক গল্প। এইভাবেই সূত্রপাত হয় দ্য ইলাস্ট্রেটেড ম্যান বইটির ।

বইটির গল্পগুলিতে কল্পবিজ্ঞানের প্রচলিত গতানুগতিক থিমের বেশির ভাগই অনুপস্থিত। এখানে অ্যাডভেঞ্চার গল্পের প্লটের চড়াই উৎরাই নেই, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রযুক্তির অবাক করে দেওয়া উপস্থাপনা নেই, বিজ্ঞানের জটিল সূত্রকে সহজ করে ব্যাখা করার চেষ্টা নেই। পরিবর্তে আছে মানুষের কথা। ঘরে বাইরের দোটানায় পড়ে দ্বিধাবিভক্ত মানুষ, সন্তানের স্নেহসিক্ত মানুষ, প্রকৃতির বজ্রমুষ্টিতে বদ্ধ বিপন্ন মানুষ, সামাজিক পেষণের হাত থেকে পালাতে চাওয়া মানুষ। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কথা নিয়ে গল্প। আর সে গল্পও অধিকাংশ সময়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়নি কোনো সমাপ্তির অন্তিম বিন্দুতে। সে সব গল্পে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘নাহি বর্ণনার ছটা / ঘটনার ঘনঘটা, / নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ। অন্তরে অতৃপ্তি রবে/ সাঙ্গ করি’ মনে হবে / শেষ হয়ে হইল না শেষ।’

কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে প্রকাশিত এই গল্পগুলিকে ব্র্যাডবেরি এই যে একত্রে গ্রন্থিত করলেন তা কি তাদের মধ্যে কোনো বিশেষ সম্পর্কের সূত্র ধরে? উত্তরটা বইয়ের ভূমিকায় ব্র্যাডবেরিই দিয়ে রেখেছেন নিজেই। সে সম্পর্কসূত্রের নাম ‘যদি’। কোনো বিশেষ ঘটনা ‘যদি’ ঘটে, তার পটভূমিতে কী হতে পারে, তাই নিয়েই গড়ে উঠেছে এই গল্পগুলো। একটা রকেট ‘যদি’ মহাশূন্যে ফেটে গিয়ে তার নভোযাত্রীদের ছিটকে ছুঁরে দেয় চারপাশে, কেমন হবে সেই সমস্ত মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের ব্যবহার? এই নিয়েই গল্প ‘ক্যালাইডোস্কোপ।’ ‘যদি’ বিরামহীন বৃষ্টি হয় এমন এক গ্রহে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে জঙ্গলে পথ হারিয়ে আশ্রয় খোঁজে একদল মানুষ, কেমন হবে তাদের সেই প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই? এই প্রশ্নকে আশ্রয় করে ব্র্যাডবেরি লিখেছেন ‘দ্য রেন।’ অথবা বর্ণবৈষ্যমের শিকার কৃষ্ণাঙ্গরা ‘যদি’ মঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে উপনিবেশ গড়ে, আর কয়েক দশক বাদে শ্বেতাঙ্গরা তাদেরই দরজায় গিয়ে হাজির হয় আশ্রয়ভিক্ষা করতে, সেখানকার মানুষকে কি ঘৃণার বদলে ঘৃণাই ফেরত দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর ব্র্যাডবেরি খুঁজেছেন ‘দ্য আদার ফুট’ গল্পে।

ব্র্যাডবেরিকে বাংলায় নিয়ে আসার কাজটা খুব একটা সহজে হয়নি। অনুবাদ করতে গিয়ে বারবার ধাক্কা খেতে হয়েছে যথাযথ প্রতিশব্দ খুঁজে পেতে। বহু ইংরেজি শব্দেরই বাংলা প্রতিশব্দ অনায়াসলভ্য নয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভাও ‘প্রতিশব্দ’ নামক একটি প্রবন্ধ লিখেই ক্ষান্ত হননি, ‘বেজি’ কবিতায় ঠাট্টাছলে লিখেছেন, ‘খাতাখানি আছে খোলা।– / আধঘণ্টা ভেবে মরি, / প্যান্থীজ্‌ম্‌ শব্দটাকে বাংলায় কী করি।’ অতএব আমার মতো কানাকড়ি মূল্যের লেখককে ব্র্যাডবেরি অনুবাদ করতে গিয়ে কী পরিমাণ নাকানি চোবানি খেতে হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। এর পাশাপাশি ছিল অপ্রচলিত বাগধারা, শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ আর আলঙ্কারিক অর্থ নিয়ে দোটানা, আর ব্র্যাডবেরির গদ্যের কাব্যিক প্রয়োগ। ‘Brass band’ -এর বাংলা প্রতিশব্দ কী? ব্র্যাডবেরি যখন লেখেন ‘thistle filter’, তখন তার অর্থ কি থিসল ফুলের আকারের ফিল্টার, নাকি থিসল ফুলের মতো উঁচিয়ে থাকা ফিল্টার, নাকি আরো অন্য কিছু? অনেক ক্ষেত্রে একটা আক্ষরিক অনুবাদ দিয়ে কোনোভাবে কাজ চালানো যায় বটে, কিন্তু তাতে যদি লেখার প্রাঞ্জলতার হানি হয়, কিম্বা পাঠবেগ ব্যহত হয়, তাহলে কাজের বদলে সেটা অকাজ হয়ে দাঁড়ায়। ‘Brass band’-এর মানে ‘পেতলের ঐকতান’ লিখলে তাকে খায় না মাথায় দেয় পাঠকের পক্ষে বোঝা একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ে। অতএব পা ফেলতে হয়েছে মেপেজুপে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্র্যাডবেরি শব্দের আভিধানিক অর্থের তোয়াক্কা না করে শব্দের ধ্বনি বা ওজনের জন্যেই তাকে গদ্যে বসিয়েছেন। ‘দ্য জিরো হাওয়ার’ গল্পে একটা ছোটো মেয়ের ইয়ো-ইয়ো নাচানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখছেন, ‘dibbling her finger’। Dibble বলতে বাগানোর মাটি খোঁচানোর একরকমে যন্ত্রকে বোঝায়। এই বিশেষ্যটিকে ক্রিয়াপদে রূপান্তরিত কেনই বা তিনি করেছেন, আর তার সঙ্গে আঙুলেরই বা কি সম্পর্ক তা বোঝা একরকম অসম্ভব। অতএব এখানে একমাত্র সহায় হয়েছে ভাবানুবাদই।

ব্র্যাডবেরি লিখেছেন বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের এক অন্য সমাজের, অন্য আর এক সংস্কৃতির জন্যে। এও ছিল এক সমস্যা। কারণ কিছু কিছু উপমা, অলঙ্কার সেই সমাজের কাছে সেই সময়ে বোধগম্য হলেও এই কালখণ্ডে দাঁড়িয়ে তার পাঠোদ্ধার দুষ্কর হয়ে পড়ে। এর মধ্যে কিছু কিছুর মানে কাঠখড় পুড়িয়ে নিজেই উদ্ধার করতে পারলেও, কিছু কিছুর জন্যে দ্বারস্থ হতে হয়েছিল ফেসবুকের ব্র্যাডবেরি ফ্যানক্লাব গ্রুপের মার্কিন সদস্যদের কাছে। একটা উদাহরণ দিই। ‘দ্য কংক্রিট মিক্সার’ গল্প অনুবাদ করতে গিয়ে ধাক্কা খেতে হল এই লাইনটাতে এসে— ‘There is no Rick or Mick or Jick or Bannon – those lever fellows who save the worlds’। এখানে lever কোথা থেকে এলো? নাকি এটা ছাপার ভুল, lever নয়, ওটা clever হবে। ব্র্যাডবেরি ফ্যানক্লাব গ্রুপের এক সদস্য জানালেন আসলে ওটা বলা হয়েছে সে যুগের ক্লিশে হয়ে যাওয়া সায়েন্স ফিকশনের গল্প বা কমিকসকে কটাক্ষ করে। যে গল্পের শেষে নায়ক একটা lever বা সুইচ টেনে ভিনগ্রহের আক্রমণকারীদের বিষ্ফোরণে উড়িয়ে দেয়, কিম্বা প্ল্যান বানচাল করে দেয়।

তবে এই সমস্ত চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি, মাঝে মধ্যে বুঁদ হয়ে গিয়েছি ব্র্যাডবেরির শব্দের জাদুতে। ‘ক্যালাইডোস্কোপ’ গল্পে মহাকাশযান ভেঙে চতুর্দিকে ছিটকে গিয়ে নিজেদের গতিরোধে অসমর্থ মানুষদের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লেখেন ‘তারা উল্কা, তারা স্বেচ্ছাশক্তিহীন, তারা প্রত্যেকে তাদের স্বতন্ত্র অমোঘ অদৃষ্টের পথযাত্রী’। ‘দ্য ফক্স এন্ড দ্য ফরেস্ট’ গল্পে সেনা শাসনের ভয়াবহতা বোঝাতে লেখেন ‘কুচকাওয়াজি কদমের নাছোড়বান্দা দুরমুশ শব্দ, লক্ষ ঐকতানের বাজানো লক্ষ ফৌজী সুর।’

যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি ব্র্যাডবেরির এই শব্দের কাব্যকেও বাংলাতেও নিয়ে আসতে।

লেখার বাইরে ব্র্যাডবেরি অনুবাদ উপলক্ষ্যে আরো দুটি প্রাপ্তি ঘটেছে। তার প্রথমটা হল প্রজেক্টের বাকি দুই শ্রদ্ধেয় লেখকদের সঙ্গে একটানা আদানপ্রদানের সুযোগ। অনুবাদকে কেন্দ্র করে ফ্যারেনহাইট ৪৫১ উপন্যাসের অনুবাদক শ্রী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য এবং মার্শিয়ান ক্রনিকলস বইয়ের অনুবাদক শ্রীমতি যশোধরা রায়চৌধুরীর সঙ্গে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা, তাঁদের পরামর্শ তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কটাকে আরো গভীর করেছে। আর দ্বিতীয় প্রাপ্তি অবশ্যই ব্র্যাডবেরি। এই অনুবাদের সুযোগ না পেলে ব্র্যাডবেরিকে হয়তো এত কাছ থেকে চেনা হত না, গদ্য শৈলী থেকে গল্প নির্মাণ, তাঁর থেকে এত কিছু শেখারও সুযোগ পেতাম না।

Tags: বিশেষ আকর্ষণ, সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সুমিত বর্ধন

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!