শুক্রগ্রহের সায়ক

  • লেখক: অমিতাভ মুখোপাধ্যায়
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

আমার বয়ঃক্রম পঞ্চবিংশ দিবস অর্ধ বৎসর— সামনে বসে থাকা ছেলেটি বলল আমাকে। ওর কথা অনুযায়ী আজ সকালেই শুক্র থেকে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে সে। ঠিক আধ ঘণ্টা আগে। এই সময়টুকু লেগেছে আমাকে খুঁজে বার করতে। আমার সঙ্গে দেখা করতেই ওর আসা। ফর্সা সুদেহী ঝকঝকে তরুণ। চুল ও চোখে কালোর অতলান্ত গভীরতা। চোখে প্রত্যাশার ছাপ।

এটা চব্বিশশো আশি সাল। সাড়ে তিনশো বছর আগে বিশ্ববিজ্ঞান সংস্থা অন্য গ্রহ-উপগ্রহে মানুষের বসতি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে হাত দেয়। একুশ শতকের শেষ দিকেই মহাকাশ অভিযান যেন দৈনন্দিন হয়ে উঠেছিল। চাঁদে মঙ্গলে শুক্রে আর শনির উপগ্রহ টাইটানে সভ্যতার প্রসারণের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বাধা ছিল অনেক। জল-হাওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি ছিল না। পুরো গ্রহ বা উপগ্রহের আবহাওয়া বদলানর কথা ভাবা হলেও কাজ শুরু হয়েছিল আরও পঞ্চাশ বছর পরে। ততদিনে বিশ্ববিজ্ঞান সংস্থা গড়ে উঠেছে। সব দেশের সেরা বিজ্ঞানীরা যোগ দিয়েছেন। সেখানে ডক্টর সুদেশ কৃষ্ণানের সুযোগ্য নেতৃত্বে চারটি টিম ওই চারটি গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে বহু বছর তাত্বিক গবেষণা করেছিলেন। প্রকৃত কাজ চলেছে আরও বহু বছর। তারই ফল মহাকাশে পৃথিবীর মানুষের চারটি উপনিবেশ। গ্যালাকটিক নিউজ ব্যুরোর সুপার কম্পিউটারে মানুষের ইতিহাসের জানা-অজানা সব তথ্য কয়েক হাজার ট্রিলিয়ন টেরাবাইটে ঠাসা আছে। আর সেই ব্যুরোর আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে সেসব আমার হাতের নাগালে। সে কারণেই এই ছেলেটি আমার কাছে এসেছে।

তোমার নাম কী যেন বলছিলে?

সায়ক, আমি সায়ক দীপ্র।

কী কারণে এসেছ আমার কাছে?

তাহা জ্ঞাপন করতে কিঞ্চিৎ ভূমিকা ও সময়ের প্রয়োজন। মহাশয় কি আমাকে কিঞ্চিৎ সময় প্রদানের অনুগ্রহ করিবেন?

ওর ভাষা বাংলা, কিন্তু অন্যরকম। সেকেলে এবং সংস্কৃতগন্ধী। এর কারণ আছে। এমনিতে ভাষাতাত্ত্বিকরা বলে থাকেন মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্বেই ভাষার রূপ বদল হতে থাকে। সাড়ে তিনশো বছর আগে যখন সব দেশ মিলে বিশ্বসঙ্ঘ গড়ে ওঠে, তখন সব উল্লেখযোগ্য ভাষাকেই সমান মর্যাদায় ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারতে ব্যবহৃত বাংলা গোবলয়ের প্রভাবে টাল খেতে খেতে ততদিনে আধা হিন্দিতে পরিণত হয়েছে। ওদিকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম ও অন্যান্য কারণে ইসলামি বাংলা ভাষা তৈরি হয়েছে। এখন যদিও সব ধর্মই অতীত, ভাষার কাঠামোটা ওইরকম রয়ে গেছে সেখানে। শুক্রগ্রহে পাঠান হয়েছিল ঊনিশ শতকের এক বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের প্রবর্তিত বাংলা ভাষা। সে সময়ে বাংলা সংস্কৃতির পরিচয় ছিল ওই ভাষা। আমার মতো অল্প কিছু পুরোনোগন্ধী মানুষ এখনও এ-ভাষা ব্যবহার করে থাকে। শুক্রগ্রহে এই ভাষা শুদ্ধ থাকার ইচ্ছে বুকে নিয়ে তৎসম শব্দের দিকে ভালোই ঝুঁকেছে। সায়কের মুখে শুনছি এই পরিবর্তনের নমুনা।

তুমি বলতে পার। আমার হাতে এখন কিছুটা সময় আছে। তবে তার আগে তোমার বয়সের হিসেবটা একটু ব্যাখ্যা করে দাও।

মৃদু হাসল সায়ক। প্রকৃতপক্ষে আমাদিগের গ্রহের স্বকীয় মেরুদণ্ডের চতুষ্পার্শ্বে একবার প্রদক্ষিণ করিতে পৃথিবীগ্রহের দ্বিশত ত্রিচত্বারিংশ দিবস সময় অতিবাহিত হয়। ইহা আহ্নিকগতি এবং ইহাই আমাদিগের একদিবস। অপরপক্ষে আমাদিগের গ্রহের বার্ষিকগতি পৃথিবীর হিসাবে প্রায় দ্বিশত পঞ্চবিংশ দিবস। ইহাই আমাদিগের এক বৎসর। আমাদিগের এক দিবস এক বৎসর অপেক্ষা দীর্ঘায়তন। সে কারণে আমরা দিবসের হিসাবে বয়ঃক্রম গণনা করিয়া থাকি।

বোঝা গেল। এবার বল কেন এসেছ?

মহাশয় নিশ্চয়ই অনুকৃতি উৎপাদন সম্পর্কে অবগত আছেন?

তুমি ক্লোনিঙের কথা বলছ?

অবশ্য।

যতদূর জানি, বিজ্ঞানী লেডারবার্গ ও হ্যালডেন বিশশতকের দ্বিতীয়ভাগে ক্লোনিঙের কথা বলেন। ডলি নামে একটি ভেড়া সৃষ্ট হয়েছিল ক্লোনিং করে, সেটা বিশ শতকের শেষ। ওই সময়েই মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণী মিলিয়ে ক্লোনিং করার চেষ্টা হয়।

বর্ণে বর্ণে সত্য। ওই গবেষণা অবশ্য অনুকৃতি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে নয়। নূতন প্রাণী সৃজনের প্রয়াসরূপে বর্ণনা করা যাইতে পারে।

আসলে গোরুর শরীরের একটি কোশ থেকে নিউক্লিয়াস কেটে বাদ দিয়ে সেখানে মানুষের কোষের নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করা হয়। ফল একটি সজীব ভ্রূণ সৃষ্টি। বারোদিন তার বৃদ্ধি দেখার পরে তাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এই জাতীয় গবেষণার সম্ভাব্য ক্ষতিকর ফলের কথা ভেবে বহু দেশ তখন মানুষ নিয়ে ক্লোনিং গবেষণা নিষিদ্ধ করে দেয়।

যথার্থ। তথাপি সত্যই কি তদৃশ গবেষণায় যবনিকাপাত হইয়াছিল?

না, তা হয়নি। অনেক দেশেই গোপনে কাজ চলছিল। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে চিনে ক্লোন করে দুটি বাঁদর সৃষ্টি করা গিয়েছিল। এটা মানুষের খুব কাছাকাছি।

পরবর্তী ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে মহাশয় নিশ্চয় অবগত?

আমি জানতাম পরে কী হয়েছিল। পৃথিবীতে মানুষ ক্লোনিং সর্বত্র অন্তত প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ হলেও নতুন উপনিবেশে পরীক্ষানিরীক্ষায় কোনো বাধা ছিল না। চাঁদে শুক্রে মঙ্গলে টাইটানে অজস্র ক্লোন পাঠান হয়। নানা পশুপাখির সঙ্গে মানুষেরও। সরাসরি ক্লোন ছাড়া হাইব্রিড ক্লোন ছিল অনেক। তার ফল সব সময়ে ভালো হয়নি। অবশেষে ওই সব উপনিবেশেও এমন লাগাম ছাড়া ক্লোনিং পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওখানেও এখন বাইরের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম সঙ্ঘ। তারা দূষণমুক্ত সমাজ গড়তে চায় বলে জানি।

এখন তো ক্লোনিং পুরোপুরি বন্ধ। আমি বললাম।

তাহা সত্য। কিন্তু পূর্বে কৃত অপকর্মের ফল আমাদের সমাজজীবনে আজও কন্টকের মতো পীড়া প্রদান করিতেছে। সেই উপলক্ষেই মহাশয়ের সকাশে আগমন করিয়াছি।

আমি কী করতে পারি? সবিস্ময়ে বললাম আমি।

শুক্র সার্বভৌম সরকারের মানবসম্পদ বিভাগে আমি কর্মরত। আমাদিগের সরকারের অভীপ্সা, পৃথিবী গ্রহ হইতে কিয়ৎসংখ্যক প্রকৃত মানবকে আমন্ত্রণপূর্বক শুক্রগ্রহে স্থানান্তরিত করা। তাহাদিগকে সর্বপ্রকার সুবিধা প্রদান করা হইবে। ভদ্র এই কর্মে ও নির্বাচনে অধীনকে কি সাহায্য করিবেন?

আমার মনে পড়ল, প্রাচীন ইতিহাসে পড়া রাজা আদিশূরের কথা। তিনি নাকি এগারো শতাব্দীতে উত্তরভারত থেকে পাঁচ ঘর ব্রাহ্মণ এনে বসিয়েছিলেন বাংলায়। উদ্দেশ্য, বাংলায় প্রকৃত ব্রাহ্মণের পরম্পরা রক্ষা করা। এরাও সেরকম কিছু করতে চাইছে?

আমাকে এই কাজের উপযুক্ত মনে হল কেন? জানতে চাইলাম।

আমাদিগের সরকার মহাশয়ের সহায়তা প্রার্থনা করিতেছে। সংবাদ বিভাগে মহাশয়ের কর্মের সুখ্যাতি বিষয়ে আমাদিগের সরকার অবগত। সমাজের সর্বস্তরে তদীয় যোগাযোগ অতুলনীয়। তদ্ব্যতীত মানবসংস্কৃতির শুদ্ধতা রক্ষায় তদীয় নিরন্তর কর্মপ্রয়াস, বিশেষত মহাশয়ের ধারাবাহিত ‘সমাজদর্পণ’ শীর্ষক রচনাসমূহ আমাদিগের গোচরে রহিয়াছে।

ভালো লাগল জেনে, আমার কাজকর্ম আর লেখার কথা এই গ্রহের পরিধি পেরিয়ে শুক্র পর্যন্ত পৌঁছেছে। তবু সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। কীভাবে খাঁটি মানুষ নির্বাচন করা হবে! আমার মনের কথা যেন পড়ে নিল সায়ক।

ভদ্র, আমাদিগের গ্রহে অনুকৃত এবং সংকরিত মানবের সংখ্যাধিক্য। অনুকৃত মানব আকারে পূর্বমানবের সদৃশ হইলেও প্রকারে অধিক ক্ষেত্রেই অতীব সাধারণ। অর্থাৎ বিজ্ঞানীর অনুকৃত মানব সাধারণ করণিক হওয়া অস্বাভাবিক নহে। অপরপক্ষে মনুষ্যেতর প্রাণীযোগে সংকরণে মানবে অঙ্গবিকৃতি বা পাশব প্রবৃত্তির আধিক্য অধিকক্ষেত্রে দৃশ্যমান।

এসবের প্রতিকারে কী করেছ তোমরা?

প্রথমত, সর্বপ্রকার অনুকৃতিসংক্রান্ত গবেষণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। সংকরিত মানবসমূহের গতিবিধি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। অনুকৃত মানবদের মধ্য হইতে প্রকৃত প্রতিভা চিহ্নিত করিয়া বিকাশের সর্বসুবিধা প্রদান করা হইয়াছে। তথাপি গ্রহপরিচালকমণ্ডলীর মতে নবশোণিতের প্রয়োজন। মানবিক দোষগুণসম্পন্ন কিয়ৎসংখ্যক সৎ পার্থিব মানব সেই নবশোণিত। তাহারা আমাদিগের সমাজের অগ্রগতির নির্ণায়ক হইতে পারে।

আমার কাছে ঠিক কী চাইছ তোমরা? আমিই বা কী করে জানব কারা তোমাদের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারে! তারপর নির্বাচিত মানুষেরা তোমার সঙ্গে যেতে রাজি হবে কিনা তা বলা কি সম্ভব?

ভদ্র, মদীয় সংগ্রহে একটি ক্ষুদ্র যন্ত্র রহিয়াছে, শুক্রের সুখ্যাত বিজ্ঞানসাধক ইব্রাহিম ফ্লোরেসের আবিষ্কার। ইব্রাহিম অনুকৃত নহেন, স্বাভাবিকজাত মনুষ্য। এই যন্ত্রটি সক্রিয় করিয়া কোনো পার্থিব মানবের সন্নিকটে আনয়ন করিলে ইহাতে একবিন্দু উজ্জ্বল আলোক দৃশ্যমান হইবে। উক্ত মানবের সততা ও গুণাগুণ অনুসারে আলোকের বর্ণ হইবে নীল পীত বা লোহিত। লোহিত বা রক্তবর্ণ আমাদের বিচারে সর্বপ্রকারে নিকৃষ্ট। পীতবর্ণ লোহিত অপেক্ষা শ্রেয়তর হইলেও বাঞ্ছনীয় নহে। নীলবর্ণ আমাদিগের কাঙ্খিত। নীল সংকেতবিশিষ্ট মানবমানবীসমূহ আমাদিগের আমন্ত্রণ পাইবে। আশা করি আমাদিগের প্রস্তাব সর্বতো প্রত্যাখ্যান পাইবে না।

আমিও জানি, তা পাবে না। ভাগ্যান্বেষী মানুষের অভাব কোনোকালেই ছিল না।

সায়ক পকেট থেকে ছোট্ট একটা চ্যাপটা কালোরঙের বাক্স বার করল। তিন ইঞ্চি বাই দেড় ইঞ্চি একটা ট্যাবলেটের মতো। মনে হল একটা ছোট্ট সুইচ টিপল। তারপর আমার দিকে সেটা তাক করতেই এক বিন্দু উজ্বল নীল আলো জ্বলে উঠল। মৃদু হেসে সায়ক সুইচ অফ করে যন্ত্রটা আবার পকেটে ভরে রাখল।

আশা করি মদীয় যন্ত্রের কার্যকারিতা এবং আপনাকে নির্বাচনের কারণ উভয়ত প্রমাণিত হইয়াছে?

ঘাড় নেড়ে মন্ত্রমুগ্ধ সায় দিলাম।

পরের দিন থেকে শুরু হল আমাদের যৌথ অভিযান। সাংবাদিকতার সূত্রে শ্মশানে রাজদ্বারে আমার অবাধ গতি। আমার দিনগত কাজে জুড়ে নিলাম সায়ককে। তাতে কারুর কাছে ওকে নিয়ে কৈফিয়ৎ দেওয়ার দায় থাকবে না। আমার সঙ্গে থাকা কোনো কনিষ্ঠ সাংবাদিক ভেবে নেবে লোকে। সকালে একক প্রধানের এক সাহায্যবিতরণ অনুষ্ঠান ছিল। গেলাম সেখানে।

সমাজে অসম বন্টনের অভিশাপ চারশো বছর আগে যেমন ছিল, আজও আছে। শুধু খোলসটা পালটেছে। সরকারের নানা প্রকল্পের মাধ্যমে অভাবী মানুষজনকে নানারকম সহায়তা দেওয়া হয়। এসব কাজ প্রশাসনই করতে সক্ষম এবং করে। বিশ্বসঙ্ঘে অনেক রাষ্ট্র। সুশাসনের স্বার্থে সব রাষ্ট্রেই অনেক একক, সুদূর অতীতে যেমন প্রদেশ ছিল। সব এককেই একজন প্রধান থাকেন। আমাদের এককের বর্তমান প্রধান ক্যামেরা পছন্দ করেন। অনুষ্ঠানের মঞ্চে এসে ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে সরকারের কাজগুলোকে আমি করলাম, আমি দিলাম বলতে ভালোবাসেন। আগেও এমন ছিল। সাংবাদিকদের কাজ বিশ্বস্তভাবে এই বচনামৃত প্রচার করা। একাজে আমি আসি না, জুনিয়ার কোন সাংবাদিক আসে। আজ সায়কের স্বার্থে আমার আসা।

মঞ্চ আলো করে প্রধান, সঙ্গে রয়েছেন আরও কিছু সহকারী, সরকারি কর্মচারী, পাঁচ টাকা দশ টাকা দামের রাজনীতিকেরা। সামনে প্রত্যাশী কিছু মানুষ। সায়কের হাতে একটা ক্যামেরা ধরিয়ে দিয়েছি। তাতে ওর মানুষচেনা যন্ত্র নিয়ে অবাধে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ঘণ্টা খানেক ছিলাম ওখানে। তারপর ফিরে এলাম অফিসে। সায়কের মুখ দেখেই বুঝলাম, ফল নিরেট শূন্য। নীল আলো একবারও জ্বলেনি। শুধুই লালের ঝলকানি। সান্ত্বনা দিলাম। বললাম, আজ না হলেও কাল নিশ্চয়ই ফল পাবে।

সেই কাল এল। একটা বিয়ে-উৎসবের তারিখ আজ। সুদূর অতীতকালে মানুষদের পারিবারিক তথা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান ছিল বিয়ে-উৎসব। তার সঙ্গে ধর্মের যোগ ছিল। আজকের পৃথিবীতে পুরোনো দিনের জাতবিচার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মের অনুশাসন আইনে নিষিদ্ধ না হলেও কার্যত অবলুপ্ত। নানারকম ধর্মীয় সন্ত্রাস বিস্মৃত হয়ে ইতিহাসে ঢুকে গেছে। এখন লিভ টুগেদার ছেয়ে গেছে ফেডারেশনের সর্বত্র। তবু যারা বিয়ে করতে চায়, তাদের জন্যে কেন্দ্রীয় পরিচালকমণ্ডলী বারোটা দিন বেঁধে দিয়েছে, বারো মাসে বারোটা দিন। সামাজিক কমিউনিটি হলগুলোতে একসঙ্গে অনেকগুলো বিয়ে হয়। তিন-চারশো বছর আগে এমন অনুষ্ঠানকে গণবিবাহ বলা হত। ধর্মীয় জাতের বদলে এখন আর্থিক জাতপাতে পক্ষপাত। হলগুলোতে কম-বেশি ফি দিতে হয়। বেশি ফিয়ের নামি হলে সম্পন্নদের আনাগোনা।

তেমনই একটা নামি হলে সায়ককে নিয়ে যাবো ঠিক করলাম। হলটা আমার বাসস্থান থেকে শ-দেড়েক কিলোমিটার দূরে। সর্বচর গাড়িটা বার করলাম। দুশো বছর ধরে এইধরনের গাড়িগুলো ব্যক্তিগত যানবাহনের বাজারটা একচেটিয়া দখল করেছে। জলে স্থলে এবং আকাশে এর স্বচ্ছন্দগতি। একুশ শতকের শেষ দিকে পেট্রোল যখন প্রায় অমিল হয়ে এল, তখন ইথানল, উদ্ভিজ্জ তেল ও হাইড্রোজেন নিয়ে শূন্যতা ভরানোর কাজ চলেছে একশো-দেড়শো বছর। তারপরে তেলের বদলে পাকাপাকিভাবে জলের ব্যবহার এসে গেল। গাড়ির ভেতরেই জলের ট্যাঙ্কে সোডিয়ামের সাহায্যে সস্তায় ইলেক্ট্রোলিসিস করা সম্ভব হতেই হাইড্রোজেন জ্বালানীর ব্যবহার সর্বজনীন হতে শুরু করল। মহাবিশ্বের মোট ভরের শতকরা প্রায় তিয়াত্তর ভাগ হাইড্রোজেন হওয়াতে এই জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য উপনিবেশগুলোতেও এখন এইরকম গাড়ি চলছে। গতি ভালো। তেমন জোরে না চালিয়েও আধ ঘণ্টাতে পৌঁছে গেলাম।

কমিউনিটি হলের রেজিস্টারে দেখলাম আজ এখানে তিনশো একচল্লিশটা বিয়ে হওয়ার কথা। এরা সকলেই সমাজের মাথায় থাকা মানুষজন। অতিথি অভ্যাগতরাও তাই। বিশিষ্ট সফল ব্যক্তিরা এবং তাঁদের পরিবার সব। পরিচিতদের মধ্যে নামি শিল্পপতি, রাজনীতিক, অধ্যাপকদের দেখা গেল। চলচ্চিত্রের কুশীলবদের কয়েকজনকে দেখলাম। সায়ককে বললাম, এখানে নিশ্চিত তুমি বেশ কিছু পছন্দের মানুষ খুঁজে পাবে। অনিশ্চিত হেসে সায়ক বলল, সময়ই ফলাফলের নির্ণায়ক।

সময়কে অনুকূলে আনার উদ্দেশ্যে কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা নিলাম আজ। সবটাই সায়কের ওপরে ছেড়ে না দিয়ে আজ ওকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরলাম। পরিচয় করিয়ে দিলাম অনেকের সঙ্গে। শুক্রের মানুষ শুনে আগ্রহের সঙ্গে আলাপ করল অনেকেই। ওর আসার উদ্দেশ্য অবশ্য প্রকাশ করিনি। তবু ঘণ্টা দেড়েক সময় বৃথা গেল। সায়কের হাত খালি থাকল।

তৃতীয় দিন। আমার আজকের নির্বাচন, ‘দিকনির্দেশ’, এক আধা-সরকারি পুরস্কার দেওয়ার মঞ্চ। বিগত প্রায় আধ শতাব্দী ধরে এই সংস্থা সমাজের নানা স্তরের কৃতী মানুষদের প্রতিবছর পুরস্কৃত করে আসছে। সমাজ ও সংস্কৃতির বহু বিভাগে এদের বিচরণ।

চল সায়ক, আজ মনে হয় তুমি আশাহত হবে না।

আমি যারপরনাই বিস্মিত হইয়াছি ভদ্র। পৃথিবী আমাদিগের মূল গ্রহ। পার্থিব মানব আমাদিগের অনুপ্রেরণা। ধরিত্রীর অভিজ্ঞতার আলোয় শুক্রবাসী সকল সমস্যার সমাধান অন্বেষণ করিতে অভ্যস্ত।

আমিও অবাক সায়ক। তোমাদের এমন যন্ত্র আমাদের কাছে নেই। থাকলে হয়তো—। যাহোক, আজ বহু বিভাগের সেরাদের পাওয়া যাবে এক ছাতের নীচে। তাদের মাঝে প্রকৃত মানুষ অবশ্যই বেশ কয়েকজনকে পাওয়া যাবে।

আমিও আশা রাখি ভদ্র।

আশা রাখাই সার হল। উন্নতি বলতে অনেক লাল আলো বিন্দুর সঙ্গে কিছু হলুদ আলোর দেখা পেলাম। আগের দু-দিনের সঙ্গে এটুকুই পার্থক্য। সব ক্ষেত্রের পুরস্কারজয়ীদের কাছে এগিয়ে গিয়েছি অভিনন্দন জানানোর অছিলায়। সায়ক সঙ্গে ছিল। অডিটোরিয়ামে বসার জায়গা বদলেছি মাঝে মাঝে। এভাবে মান্যগণ্যদের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করেছি। একবারও নীল আলো জ্বলেনি। এমন একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া গেল না, যার মানবিক মন আছে। ভাবছিলাম, শুধুই কি প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড় এজন্যে দায়ী! হাসিখুশি মুখোসের আড়ালে সর্বত্র সবাইকে হারানোর কী তীব্র আকাঙ্খা এই মানুষগুলোর মনে, সায়কের যন্ত্র আমাকে সেটাই দেখিয়ে চলেছে।

পরদিন অফিসে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সায়ককে বাড়িতে ডেকে নিয়েছি একসঙ্গে চা খাওয়ার অজুহাতে। আসলে ওকে সঠিক সাহায্য করতে না পারার কাঁটাটা খচখচ করছে মনে। বললামও ওকে সেকথা।

পরিস্থিতি যে এমন, আমি বুঝিনি সায়ক।

ভদ্র, ইহা আমাদিগেরও অনুধাবনের অতীত ছিল। তথাপি ব্যর্থতার অন্তরেও কিঞ্চিৎ শিক্ষালাভ করিয়াছি। তাহা ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে সহায়ক হইবে। অদ্য তদীয় সকাশ হইতে বিদায় লওয়া মনস্থ করিয়াছি। অবিলম্বে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনই শ্রেয়।

আমি ওকে আরও কয়েকটা দিন থেকে যাওয়া বা আর একটু ধৈর্য ধরার অনুরোধ করতে পারলাম না। আসলে মনে মনে আমিও কোনো আশার আলো দেখছিলাম না। ঠিক এই সময়ে ঘরে এল তাপু। ও আমার কম্বাইন্ড হ্যান্ড। ঘরোয়া কাজকর্মের জন্যে আমার একটি ষষ্ঠ প্রজন্মের রোবট আছে। তাপুকে রেখেছি তবু। হয়ত ওর প্রতি একটা টান অনুভব করি বলেই। অনেকদিন ধরে আছে আমার কাছে। জিজ্ঞেস করলাম, কীরে কিছু বলবি?

আজ্ঞে আজ আমাদের আলোর উৎসব। যাবেন নাকি আমাদের কোরকে একবার?

মনে পড়ল, তিন-চারশো বছর আগে দীপাবলী নামে একটা উৎসব ছিল, যেদিন আলোর বন্যায় ভেসে যেত দেশ। সন্ধে থেকে সারা রাত। লোকেরা বেশি করে আলো জ্বালাত। সব রকমের ধর্মীয় অনুশাসন অচল হয়ে যাওয়ার পরে দীপাবলী পালনের রেওয়াজ প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত অভিজাত সম্প্রদায়ের কাছে এখন দীপাবলী কথাটার কোনো অর্থ নেই। ঘরে-বাইরে রাতে আলোর পরিমাপ এখন যন্ত্রগণক মেপে দেয়, দরকার অনুসারে।

কিন্তু সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলস্তরে বেশ কিছু মানুষের মনে দীপাবলী আলোর উৎসব হয়ে আজও টিকে আছে। ওদের কোরক মানে যাকে অতীতকালে গ্রাম বলা হত। সব এককেই এরকম অনেক কোরক আছে। এখানকার বাসিন্দারা চাষবাস আর নানান হাতের কাজ করে। কেউ কেউ ঘরগেরস্থালিতে সাহায্য করে, যেমন তাপু। হাতে সময় থাকলে তাপুর অনুরোধে ওদের কোরকে গিয়েছি দুয়েকবার। মনে করার চেষ্টা করছিলাম, সায়ক চলে যাবার পরে আজ জরুরি কোনো কাজ আছে কিনা।

ভদ্র, আপনি অনুমতি করিলে অবশ্যই আমরা তথায় গমন করিতে পারি। সায়কের ব্যগ্র

কণ্ঠস্বরে অবাক হয়ে ওর দিকে ফিরে তাকালাম। দেখলাম ওর মুখ প্রত্যাশায় উৎকণ্ঠ। হাতে সেই কালো ট্যাবলেট যন্ত্রটি তাপুর দিকে তাক করে ধরে রাখা। তাতে ছোট্ট একটা নীল বিন্দু জ্বলজ্বল করছে। আমি তাপুকে বললাম, ঠিক আছে, যাব আজ সন্ধেবেলা। তুই এখন বাড়ি যা।

বহু বহু যুগ আগে মেধা মাপতে আই কিউ, ই কিউ ইত্যাদির ব্যবহার ছিল। এসব পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা আছে। তারপরে ক্লোনিং এল, যা এখন পূর্ণত নিষিদ্ধ। আধুনিক পৃথিবীতে মানবশিশু স্বাভাবিকভাবেই জন্মায়। তবে তাদের মেধা, কর্মক্ষমতা, সম্ভাবনা এই সবকিছু যন্ত্রগণকে মেপে নেওয়া হয় ভ্রূণ অবস্থাতেই। সেই অনুসারে তাদের শিক্ষার পরিসর বা সুযোগ। উচ্চশিক্ষা সকলের জন্যে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় অকারণ ভিড় না বাড়িয়ে স্কুলপর্যায় থেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী সব ছাত্রছাত্রীকে নানা দিকে চালিত করা হয়। উচ্চশিক্ষা যেমন আছে, তেমনই আছে কর্মশিক্ষা, কারিগরি, চাষবাস, হাতের কাজ। ঘরগেরস্থালির কাজ শেখে কেউ কেউ, যেমন আমার তাপু। এই ধরনের কাজ যারা করে তাদের অনেকেই কোরকে থাকে। কোরকের রীতিনীতি, গণমানসিকতা সবই কিছুটা আলাদা। তবে কোরক থেকে নতুন ছেলেমেয়েরা উঠে আসতে পারে মেধার যোগ্যতায়। যেতে পারে কর্মক্ষেত্রের যে কোনো স্তরে। কোরক তার পরেও আপন বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে অনেককাল।

সন্ধেবেলায় তাপুদের কোরকে যখন পা রাখলাম, সব কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল। আলোর পাখিরা ডানা মেলে দিয়েছে প্রতিটি ঘরে বাইরে আনাচেকানাচে। লেজার ডায়োড আলোর তুলিতে রং মেখেছে গোটা কোরক। প্রতিটি বাড়িঘর, রাস্তা, প্রান্তর। তাপু আমাদের দেখে এগিয়ে এল। তিন জনে হেতুহীন ঘুরে বাড়ালাম কোরকের পথেঘাটে। অপরিচিত মানুষজনের মুখে অনেক চেনা অমল হাসি। সায়কের হাতে কালো ট্যাবলেট মুহুর্মুহু নীল হাসি হাসছে। নীল ঢেকে দিচ্ছে লাল বা হলুদের ক্ষণিক ভেসে ওঠার প্রয়াস। ওর চোখে স্থির বিদ্যুৎ। স্বগতভাবে বলল, সর্বপ্রথমে এই স্থানে কেন পদার্পন করি নাই ভদ্র! আমি এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দরকার মনে করিনি। কারণ এটা প্রশ্ন ছিল না, ছিল নিছক বিস্ময়।

সায়ক দীপ্র তার সংগৃহীত বহু পরিবার দলটাকে নিয়ে শুক্রে ফিরে গেছে পাঁচ বছর আগে। একটি মানুষও অর্থলোভে সাড়া দেয়নি। কেউ গেছে সন্তানের জন্যে স্বপ্নের শিক্ষার আকর্ষণে, কেউ কোনো নিকট আত্মীয়ের আরও ভালো চিকিৎসাহেতু, আবার কেউ বা শুধুই নতুন দেশ দেখতে। সায়কের সঙ্গে দূরভাষে / মুঠোফোনে দূরেক্ষণে কথা হয় মাঝেসাঝে। ওরা সবাই ভালো আছে।

আমি ‘সমাজদর্পণ’ লেখা বন্ধ করে দিয়েছি।

Tags: অমিতাভ মুখোপাধ্যায়, গল্প, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

2 thoughts on “শুক্রগ্রহের সায়ক

  • October 24, 2022 at 7:00 pm
    Permalink

    Khub bhalo laglo apnar lekha ta pore. Kalpa biggan er lekha,akorshok kore tola sohoj noy, apni seta perechen.lehka ta, eto prasongik, je mone holo 2022 sudhu r o kichu bochor egiye gache, kintu prokiti ta ek rokom e ache. Avinandan

    Reply
  • October 25, 2022 at 6:21 pm
    Permalink

    অমিতাভ মুখোপাধ্যায় কে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবেই জানি। কিছু কাল আগেই তার “মালঞ্চের কাল” পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। যদিও তার বিষয় আলাদা, প্রেক্ষিত অন্য। সুদীর্ঘ, নিরলস ভালোবাসায় সেখানে তার অনায়াস বিচরণ। কিন্তু, সম্পূর্ণভাবে আলাদা বিষয়ে এই অসাধারণ লেখা তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। সাধুবাদ জানাই তাকে। ভবিষ্যতে আরও অনেক মণি-মুক্তোর আশা রাখি আপনার লেখনী থেকে। আপনার শুভ হোক। -প্রণব সরকার, ব্যারাকপুর।

    Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!