ধাত্রীদেবতা

  • লেখক: দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

“এসো অরুন্ধতী। এইখানে বোসো একটুক্ষণ।”

অকূল সমুদ্রের বুকে একচিলতে জমি। সেখানে জলের ওপরে ঝুঁকে থাকা একটা পাথরের চট্টানের ওপর বসে হাত বাড়িয়ে ডাকলেন বশিষ্ঠ। তিনি ক্লান্ত, কিন্তু তৃপ্ত আজ। অবশেষে দীর্ঘকালের সাধনার চুড়ান্ত সুফলটি এসেছে।

তাঁর সুঠাম পেশল শরীরে প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়েছে। সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন অরুন্ধতী। তাঁর স্বর্ণাভ কেশরাশিতেও ঝিলিক তুলেছে দিনের প্রথম আলো। এগিয়ে এসে প্রিয় শরীরটিকে আশ্রয় করে নিজেকে ছড়িয়ে দিলেন তিনি পাথরের চট্টানটির ওপর। বড়ো ক্লান্তি। বড়ো তৃপ্তি।

পূর্বে সূর্যোদয় হচ্ছিল। দৃশ্যটি বড়ো সুন্দর। আকাশ ঘন লাল থেকে ধীরে ধীরে কমলাবর্ণের সীমানা পেরিয়ে গভীর নীলের দিকে এগিয়ে চলেছে। সেদিকে তাকিয়ে বশিষ্ঠের চোখের বিশ্লেষক কোষের দল এই বর্ণপরিবর্তনের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে চলেছে তখন। আজ নিয়ে তৃতীয় দিন। নাঃ ভুল নেই কোনো আর। অবশেষে, হিসাব মিলে গিয়েছে…

মস্তিষ্কের গভীরে ব্রহ্মণ-এর নির্দেশটি লিপিবদ্ধ রয়েছে তাঁর। তাঁর অসীম, অনন্ত জ্ঞানভাণ্ডারের কণামাত্র তিনি পেয়েছেন নিজের স্মৃতিতে। সেখানে বজ্রাক্ষরে গাঁথা অনুশাসণগুলির সুচারু পালনই তাঁর দীর্ঘ সাধকজীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। সে অনুশাসণদের পালনের পথেই আজ অবশেষে এই সাফল্য এসেছে তাঁদের…

“বড়ো সুন্দর!” আকাশের বর্ণবিভঙ্গের দিকে চোখ রেখে প্রিয়সঙ্গী বশিষ্ঠের কথাটির প্রতিধ্বনি জেগে উঠল অরুন্ধতীর গলাতেও। তাঁর বিশ্লেষণও তবে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। কথাগুলিতে তৃপ্তির স্পর্শ ছিল। খানিক শ্লাঘাও ছিল কী?

শ্লাঘা! হ্যাঁ, তার কারণ আছে বইকি। কী রূপ ছিল এই গ্রহের! আর কী চেহারায় বদলে দিয়েছেন তাঁরা তাকে! কয়েক কল্প আগে, যেদিন এই গ্রহের বুকে প্রথম চেতনা পেয়ে উঠে বসেছিলেন তাঁরা দুজন, সেদিন এক ভয়াল প্রস্তরপিণ্ড বই আর কিছু ছিল না তা। তার ঘন আবহমণ্ডলে বিষাক্ত বায়ুর ঝড়। তার প্রাণহীন, জলহীন বুকে ঘন ঘন অগ্নিস্ফোট ঘটত, যেন সূর্যকে ঘিরে পাক খেয়ে চলা বস্তুপিন্ডটির বিক্ষুব্ধ অন্তরাত্মা আকাশকে উদ্দেশ্য করে তার জ্বলন্ত ক্ষোভকে উগড়ে দিচ্ছে। তার ধূসর আকাশে বিষাক্ত গ্যাসের মেঘপুঞ্জের করাল ভ্রূকুটি। তার বুকে ফুটন্ত হ্রদগুলিতে গলিত লাভার ঢেউ খেলে যায়।

সচেতন হয়ে উঠে বসে একে অন্যের দিকে ফিরে তাকিয়েছিলেন তাঁরা। সদ্যজাগ্রত চেতনায় তাঁদের, একে অন্যের পরিচয় আগে থেকেই মুদ্রিত হয়ে আছে। নারীটি অরুন্ধতী। পুরুষটি বশিষ্ঠ, অরুন্ধতীর কর্মসঙ্গী।

কয়েক মুহূর্ত বাদে, পায়ের নীচে বারংবার কেঁপে উঠতে থাকা গ্রহটির অস্থির দেহকে স্পর্শ করেছিলেন তাঁরা। আর, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিচিত্র অনুভূতি খেলে গিয়েছিল তাঁদের শরীরে। বস্তুপিণ্ডটি সচেতন। তাঁদের স্পর্শে সাড়া দিচ্ছে সে। স্পর্শ করবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ক্রুদ্ধ মহসর্পের মতই একটি অগ্নিস্রোত মাটি ফাটিয়ে উঠে এসে আছড়ে পড়েছিল তাঁদের অবিনশ্বর শরীরে। যেন অস্ফুট চেতনাযুক্ত গ্রহজীবটি কোনো বন্যজীবের মতই ভয় পেয়েছে অন্য কোনো চেতনার উপস্থিতি টের পেয়ে।

মৃদু হেসে সাবধানে ফের একবার গ্রহটির কুঞ্চিত পাথুরে বুকে আদরের ছোঁয়া দিয়েছিলেন অরুন্ধতী। সে ছোঁয়ায় স্নেহ ও ভরসার আভাস ছিল। ক্ষুব্ধ, ভীত গ্রহটি তার অর্ধচেতনার গভীরে কোথাও সেই স্নেহ ও ভরসাকে উপলব্ধি করেছিল কী? হয়তো তাই, কারণ এই দ্বিতীয় স্পর্শে সে কোনো বিক্ষোভ দেখায়নি আর। স্থির হয়ে নিজেকে ধরে রেখেছিল অরুন্ধতীর স্নেহময় হাতের নাগালে।

জড়চেতনা! বিচিত্র নামটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিধ্বনিত হয়েছিল তাঁদের দুজনের মস্তিষ্কেই। যেন কোনো অদৃশ্য দেবতা তাঁদের কানে কানে বলে দিয়েছেন, মহামতি ব্রহ্মণের ‘গ্রহজীব’ তত্ত্বের এই মূলসূত্রটি।

ব্রহ্মণ! বড়ো পরিচিত নাম। বড়ো পরিচিত একটি চেহারা। তাঁদের চেতনায় আবছায়াভাবে ভেসে এসেছিল একটি বিশাল ঘর, একজন দীর্ঘদেহ সুপুরুষ ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গী ও সঙ্গিনী… তাঁদের মাঝখানে দুটি নগ্ন মানব-মানবী… তাঁদের দিকে চোখ রেখে সুপুরুষটির মুখে একচিলতে তৃপ্তির হাসি, “চেতনার জগতে স্বাগত হে বশিষ্ঠ, হে অরুন্ধতী… আমি তোমাদের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মণ…”

পরমুহূর্তে স্মৃতির ছবিটি মিলিয়ে গিয়ে সেইখানে ভেসে উঠেছিল তাঁদের পূর্বনির্ধারিত কর্তব্যের কথা। গ্রহজীব! ব্রহ্মান্ডের অযুত নিযুত গ্রহের মধ্যে মাত্রই স্বল্প কিছু গ্রহ এই সৌভাগ্যের অধিকারী হয়। চেতনা! প্রকৃতির দুর্লভ, রহস্যময় দান। আবার, এহেন সৌভাগ্যবান গ্রহজীবদের মধ্যে কোটিকে গোটিক গ্রহ, উপযুক্ত ধাত্রীদেবতার সহায়োতা পেলে, সেই চেতনার আশীর্বাদকে বহুধাবিভক্ত করে অন্যতর প্রাণের সৃষ্টি করতে পারে নিজের বুকে। তেমনই এক সদ্যোজাত গ্রহজীবের ধাত্রীদেবতা হবার জন্য তাঁদের সৃষ্টি।

আকাশে দিকে মুখ তুলে দেখেছিলেন তাঁরা। ঘন তমিস্রার মধ্যে ঝুলে থাকা ঈষৎ পীতবর্ণ নক্ষত্রটির গ্রহমণ্ডলের তৃতীয় সদস্য এই গ্রহটি। তার বুকে সেই দুর্লভ ‘জড়চেতনা’র সন্ধান মিলেছে দেবতাদের যন্ত্রে। এবারে তার বুকে প্রাণস্পন্দন ছড়িয়ে দেবার পবিত্র কর্তব্যপালনের জন্য সৃষ্টি হয়েছে দুই ধাত্রীদেবতার। বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী।

ব্রহ্মণ-এর অসীম কৃপায় তাঁদের চেতনা এই গ্রহজীবের অস্ফুট চেতনার সঙ্গে এক সুরে বাঁধা। এর সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে পারেন তাঁরা। সেই ভাব বিনিময়ের শক্তিই এ-গ্রহে তাঁদের আরব্ধ কর্তব্যের চালিকাশক্তি। এই আরব্ধ কাজটি সহজ নয়। দীর্ঘ প্রশিক্ষণে ‘গো’ নামধারী এই গ্রহজীবের অর্ধস্ফূট চেতনাকে সুপরিস্ফূট করে তুলে, তার শরীরকে পুনর্নির্মাণ করে অন্যতর প্রাণের সৃষ্টির উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে তাঁদের। তারপর, সুজলা সুফলা হয়ে উঠে, ‘গো’ নামধারী এই পূণ্যবান গ্রহ একদিন অজস্র জীবের আবাস এক স্বর্গভূমি হয়ে উঠবে।

বড়ো আদরে তার প্রস্তরময় দেহে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন অরুন্ধতী ও বশিষ্ঠ। এই গ্রহজীব বড়ো সৌভাগ্যবান। প্রকৃতির লীলায় চেতনার সঞ্চার হয়েছে তার গভীরে। সৌভাগ্যবান তাঁরা দুজনেও। তা না হলে, একটি গ্রহজীবের আদিপিতা ও আদিমাতা হবার সৌভাগ্য কজনের হয়!

তারপর কত যুগ কেটে গেল। তার শুরুতে বড়ো যন্ত্রণার একটি পর্ব গিয়েছে। জীবসৃষ্টির পরিবেশ সৃজনের জন্য গ্রহটির ঘূর্ণনবেগকে সঠিক মাত্রায় বাঁধা ও তার অতিপ্রয়োজনীয় জলমণ্ডলের জন্য একটি উপযুক্ত আধারের প্রয়োজন ছিল প্রথমে। এর জন্য বড়ো ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা পেতে হয়েছিল ‘গো’মাতা সুরভিকে। সুরভি। হ্যাঁ, এই নামেই ডাকেন তাঁরা এই গ্রহকে। সন্তানস্নেহে রাখা নামটি ‘গো’ নিজেও মেনে নিয়েছে। ও নামে অরুন্ধতী তাকে ডাকলে তার আকাশ, বাতাস, জলমণ্ডল ও ভূমি তুমুল উচ্ছাসে সাড়া দেয়। তার অস্ফুট চেতনা হয়তো উন্নত জীবের মত স্পষ্টভাবে জানাতে পারে না, কিন্তু তবু বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর প্রতি তার আনুগত্য ও ভালোবাসাকে এই পথে সে নিজের মত করে প্রকাশ করে ঠিকই।

আর তাই, প্রথম যেদিন এই যন্ত্রণাদায়ক বদলটার প্রস্তাব তাকে দিলেন অরুন্ধতী, সে প্রস্তাবকে অস্বীকার করেনি সুরভি। তাঁদের দেয়া মাপজোকগুলিকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে এক ভয়ঙ্কর আভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণে দেহের একটা বড়ো অংশকে ছিন্ন করে মহাশূন্যে ভাসিয়ে দিয়েছিল সে। আর তারপর এক মহাযুগব্যপী বর্ষণে দেহের সেই ক্ষতকে ভরিয়ে তোলবার পর সেই জলমণ্ডলের বুকে প্রাণের প্রথম স্পর্শ দিয়েছিলেন বশিষ্ঠ। প্রথম জৈব প্রাণ! বায়ুশোধক এই জীবকণাগুলি অরুন্ধতীর স্বহস্তে সৃষ্ট। বায়ুমণ্ডল ও জলমণ্ডলে জৈব প্রাণের প্রসারের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম এই প্রাণকণারা যেকোনো গ্রহজীবের বুকে প্রাণপ্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হিসেবে স্বীকৃত।

এরপর, দীর্ঘ অপেক্ষার দিনগুলি তাঁদের কেটেছে, অতিকায় সেই সমুদ্রের তীরে তীরে প্রদক্ষিণ করে। হাতে হাত রেখে, জনহীন গ্রহের বুকে হেঁটে চলা দুই আদি ধাত্রীর সতর্ক চোখ দেখেছে আকাশে ভাসমান সুরভিপুত্র চন্দ্রের আকর্ষণে জলবক্ষা সমুদ্রের উচ্ছল উল্লাস, দেখেছে অরুন্ধতীর সৃষ্ট সেই আদি প্রাণকণাদের বিপুল প্রসার, দেখেছে তাদের ক্রিয়ায় সমুদ্রের ধূসর জল ও মাথার ওপরের ধূসর বাতাসের রং তিল তিল করে বদলে যাওয়া। তাঁদের সংবেদনশীল ঘ্রাণযন্ত্র নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে গিয়েছে বাতাসে ক্রমশ বেড়ে ওঠা প্রাণদায়ী উপাদানদের পরিমাণ। যুগ যুগ ধরে কত অজস্র পরিবর্তন, কত সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বদল ঘটিয়ে তিলে তিলে তাঁরা সাজিয়ে তুলেছেন সন্তানসম, অবুঝ এই গ্রহটিকে…

অবশেষে আজ… সূর্যোদয়ের পরের মুহূর্তগুলিতে, বাতাসে তার আলোর বর্ণবিক্ষেপের পরিবর্তনের ধাপগুলির নিখুঁত গণনা তাঁদের খবর দিয়েছে, সময় হয়েছে। এবার সুরভির আবহমণ্ডল উন্নততর, স্থলবাসী জীবমণ্ডলের জন্য প্রস্তুত।

পরস্পরের চোখে চোখ রেখে হাসলেন তাঁরা দুজন। ফের একবার সময় হয়েছে প্রিয় সুরভির সঙ্গে কথা বলবার। একটা শেষ পরিবর্তন। সেটাই ব্রহ্মণের নির্দেশ ছিল…

তবে সেজন্য জলবক্ষা সুরভির গভীরে নেমে যেতে হবে তাঁদের। সেখানে, তার বিস্তীর্ণ ভূপৃষ্ঠে হাত ছুঁইয়ে… তার ভাষায়… ফের একবার…

দেহ থেকে সযত্নে শৈত্য অপনোদক পোশাকগুলো খুলে রাখলেন দুই ধাত্রীদেবতা। তারপর তাঁদের পেশল অথচ কমনীয় নির্বস্ত্র শরীরদুটি পাথরের আশ্রয় ছেড়ে তিরের মত ধেয়ে গেল পায়ের নীচে ফুঁসে ওঠা সমুদ্রের ঢেউ চিরে তার গভীরে…

…এখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। তবে নিবিড় তমিস্রাও নয় ঠিক। আবছায়া কিছু আলো আছে। সমুদ্রতলের ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী। গ্রহজীবটির অমিত সৃজনশীলতা তাঁদের বিস্মিত করছিল বইকি। অরুন্ধতীর সৃষ্ট যে সামান্য কয়েকটি প্রজাতির বায়ুশোধক জীবকণা তার জলে মিশিয়েছিলেন বশিষ্ঠ, গত কয়েক কল্পকালে সেই কানাকড়িটুকু থেকে নানান পথে কত অগণিত জীবপ্রজাতির সৃষ্টি করেছে সে নিজের জলমণ্ডলে তার হিসাব নেই। এদের কিছু প্রজাতি জলের এত গভীরে দুঃসহ পরিবেশেও সচ্ছন্দে জীবন-ধারণ করে। তাদের শরীরে আলোকনিঃসারী গ্রন্থিরা তমিস্রাকে দূরে সরিয়ে মৃদু আলো জ্বালিয়ে রেখেছে এখানে।

“সুরভি…”

সমুদ্রতলের কর্দমাক্ত ভূমিতে বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর চারটি হাত গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। তার অঙ্গুলীস্পর্শ বেয়ে আদরের ডাকটি ছড়িয়ে যায় গ্রহজীবের চেতনায়। পরমুহূর্তে জলমণ্ডলের মৃদু অথচ সুস্পষ্ট কম্পন জানান দেয়, উত্তর দিচ্ছে গ্রহজীবের চেতনা।

সেই কম্পনের ভাষা পড়ে নিতে অসুবিধে হয় না ধাত্রীদেবতাদের। স্পর্শের ভাষায় তাঁরা অতিকায় পোষ্যটিকে জানিয়ে দেন তার পরবর্তী কর্তব্যের নির্দেশ… কেবল জলভূমি নয়, প্রাণময় জীবজগতকে পূর্ণতা দিতে গেলে স্থলভূমিরও প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণী, মালভূমি, সমতলভূমি, অজস্র জলধারার প্রবাহ ও বিপুল স্থলবাসী জীববৈচিত্র্যেরও। তবেই এই গ্রহ প্রকৃত স্বর্গ হবে। সেরকমই ব্রহ্মণের নির্দেশ। বিস্তীর্ণ একটি স্থলভাগ নির্মাণের প্রয়োজন হবে তার জন্য। সুরভি কি তার নির্মাণে সম্মতি দেবে?

জবাবে সুরভির ভূত্বকের গভীর থেকে একটা ক্রুদ্ধ গর্জন ভসে এল যেন। থরথর করে কেঁপে ওঠা ভূত্বকের আঘাতে উত্তাল জলমণ্ডলের বুক চিরে উর্ধ্বাকাশের দিকে ধেয়ে চলতে চলতেই ধাত্রীদেবতাদের চোখে পড়ে, ভূত্বক ভেদ করে, উত্তাল সমুদ্রের বুক চিরে ধেয়ে আসছে গলিত লাভার সুবিপুল স্রোত… শীতল জলের স্পর্শ পেয়ে মুহূর্তে কঠিন পাথুরে স্তর গড়ে চলেছে তারা সমুদ্রের বুকে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে… বিস্ফোরণ, অগ্নিস্রোত, গলিত প্রস্তরধারা… ক্রমাগত চলতে থাকা সেই প্রক্রিয়ায় সমুদ্রের বুকে মাথা তুলছে সুবিপুল প্রথম আদি মহাদেশ…

সেদিকে দেখতে দেখতে একে অন্যের হাত স্পর্শ করলেন বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী। এইবার একসময় ওই আগ্নেয় প্রস্তরভূমি শীতল হবে। আর দু-একটি কল্পকাল মাত্র। সেই সময়টুকুর মধ্যে, স্থলভূমিতে জীবজগতের প্রসারণের পাশাপাশি, সুরভির শরীরে কিছু নিয়ন্ত্রিত কম্পন, বিস্ফোরণ ও আবহমণ্ডলের কিছু সুক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে এই স্থলভাগের পর্বত, উপত্যকা, সমতলভূমি ও জলধারাগুলিকে সঠিকভাবে সাজিয়ে দিতে হবে তাঁদের। তারপর কর্তব্যের শেষ। তারপর… একটি প্রাণপরিপূর্ণ সচেতন গ্রহ, ও তার বুকে নিভৃত একটি কুটিরে তার আদিপিতা ও আদিমাতার একটি সুরম্য বাসস্থান… এর বেশি আর কী চাই!

একে অন্যের চোখে চোখ রেখে মৃদু একটা হাসি ছড়িয়ে গেল তাঁদের মুখে। আরব্ধ কাজটির অন্তে কী হবে তাঁদের নিয়তি, সে বিষয়ে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মণের কোনো নির্দেশ তাঁদের স্মৃতিতে নেই। বুদ্ধিমান চেতনাদুটি সেই নির্দেশের অভাবকে নিজেদের মতন করে বুঝে নিয়েছে। বুঝে নিয়েছে, এর পর তাদের মুক্তি। নিজেদের সৃষ্ট এই স্বর্গভূমিতে আজীবনকাল… এই প্রাণময় গ্রহের আদি পিতা ও আদি মাতা হয়ে…

একে অন্যকে দৃঢ় আলিঙ্গণে বেঁধে তারা ঘুমায়। আর সেই গভীর সুষুপ্তির আড়ালে, তাদের অজ্ঞাতে, মস্তিষ্কদুটিতে সযত্নে রক্ষিত দুটি যান্ত্রিক প্রত্যঙ্গ তখন সক্রিয় হয়ে উঠছিল। জেগে উঠে, সুতীব্র শক্তির একটি ঝলকে মহাকাশের গভীরে তা ছুঁড়ে দিচ্ছিল একটি পূর্বনির্ধারিত সঙ্কেত। ধাত্রীদেবতারা তা জানতেও পারেন না… তাঁরা জানেন না, এ-গ্রহ তাঁদের শান্তির নীড় হবার জন্য নির্মিত হয়নি। জানতে পারেন না তাঁরা কোনো বৃহত্তর প্রকল্পের রূপকার দুটি যন্ত্রপুত্তলিমাত্র। প্রকল্পের নির্মাণে তাদের অধিকার। ভোগে নয়।

***

 

“সময় হয়েছে।”

উপনিবেশ যান ‘গোলোক’এর নিয়ন্ত্রণকক্ষের গণকযন্ত্রটি তীব্র শিসের সুরে খবরটি ছড়িয়ে দিল তার একশো ক্লিক দীর্ঘ শরীরের প্রতিটি কোণে। প্রায় জাদুমন্ত্রেই যেন বা, শব্দটার ছোঁয়া পেয়ে গভীর মহাকাশে ঘুমিয়ে থাকা অতিকায় যানটা একটা দৈত্যনগরীর মতই জেগে উঠছিল। আজ বহু কল্পকাল বাদে ফের তার সারা দেহে অজস্র আলোকবিন্দু জেগে উঠেছে। তার দশ মিলিয়ন দখলদারের বিপুল বাহিনী তাদের সুদীর্ঘ অতিশীতল নিদ্রার আবেশ ছাড়িয়ে জেগে উঠছে একে একে। উগ্র কৌতূহলে ভরা সদ্যজাগ্রত চোখগুলি যানের অগণিত পর্দায় ভাসমান নীলকান্তমণির মত গ্রহটার দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে দেখে। বহুযুগ আগে, টেরাফর্মিং যন্ত্রদুটিকে একটা ভেলায় করে ‘গো’ নামের এই গ্রহটির উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেবার পর যখন তারা ঘুমোতে গিয়েছিল, তখন শেষবারের মত পর্দার বুকে এই গ্রহটাকে দেখেছিল তারা। একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড ছিল তা তখন। বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী একদিন একে তাদের সুরম্য বাসস্থানে বদলে দেবে এই আশ্বাস নিয়েই দীর্ঘ নিদ্রায় গিয়েছিল তারা। এইবার জেগে উঠে পর্দায় সেই গ্রহটির পরিবর্তিত মোহন রূপটি দেখে তারা টের পাচ্ছিল, অভিযানের নেতা ব্রহ্মণ মিথ্যা আশ্বাস দেননি তাঁদের। তাঁর সৃষ্ট ওই দুই ধাত্রীযন্ত্র ‘গো’-কে সত্যিই স্বর্গহেন বাসস্থানে বদলে দিয়েছে অবশেষে।

কোনো নির্দেশ দেবার প্রয়োজন ছিল না। সঙ্কেতটা এসে পৌঁছোবামাত্র যানের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তার বাসিন্দাদের জাগিয়ে তুলে তার সম্মুখগতি ইঞ্জিনদের সচল করে তুলেছে। একটা চকিত ঝলকে শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে যানটি ঝাঁপ দিল সামনের দিকে… তার লক্ষ্য ‘গো’ নামধারী সেই গ্রহটি… তাদের নতুন আশ্রয়, তাদের সভ্যতার অন্তিম গন্তব্য…

***

 

বড়ো সুন্দর আজকের সকালটি। হেমন্তঋতু চলেছে এখন। বাতাসে সামান্য কুয়াশার স্পর্শ। সূর্যোদয়ের কিছু আগেই নিদ্রাভঙ্গ হয় বশিষ্ঠের। কুয়াশার হালকা আবরণ গায়ে জড়িয়েই আশ্রমের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোটো জলধারাটিতে স্নানে যান তিনি। স্নান ও স্তব সারতে সারতে সূর্যোদয় হয়। নবোদিত সূর্যটিকে উদ্দেশ্য করে কিছু স্তব রচনা করেছেন তিনি। হয়তো সামান্য একটি জ্বলন্ত জড়পিণ্ড সে, কিন্তু ‘গো’ মাতা সুরভির সকল উষ্ণতা ও জীবন এই দুয়েরই উৎস ঐ নক্ষত্র। অতএব এই স্তোত্রগুলি তার প্রাপ্য বলেই বশিষ্ঠর বিশ্বাস। 

অরণ্যে এই সময়টি বড়ো সুন্দর। অরুন্ধতীর ফুল বড়ো প্রিয়। এই অরণ্যের উদার প্রকৃতি তার জন্য সেই প্রসাধনীটির অভাব রাখেননি। সকালের এই মনোরম সময়টি সে নিজের জন্য পুষ্পচয়নে বনের গভীরে যায়। আশ্রমটি নির্জন থাকে তাই এ-সময়। সেই নির্জন আশ্রমে ফিরে এসে সদ্যস্নাত বশিষ্ঠ প্রথম সূর্যের আলোয় শরীরটি ছড়িয়ে দেন। নিস্তরঙ্গ শরীরটি ঘিরে এই সময় হাজারো পাখি ও আশ্রমের প্রতিবেশি বন্যজীবের দল ভিড় করে আসে। চোখদুটি বুঁজে তাদের সঙ্গ, তার মধুর উষ্ণতাকে উপভোগ করতে করতে তিনি অদেখা ব্রহ্মণকে ধন্যবাদ দেন। ধন্যবাদ দেন তাঁর শরীরটিকে নিরাপদ আশ্রয় দেয়া ধরিত্রীমাতা সুরভিকে। এক অর্থে ‘গো’মাতা সুরভি বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর কন্যা। ব্রহ্মণের ইচ্ছায় তাঁদের হাতেই তো সুরভির প্রাণপ্রতিষ্ঠা! অন্যদিকে, তাকে মাতা সম্বোধন করতেও বড়ো সুখ। সত্যই তো, কত সামান্য উপকরণ কাজে লাগিয়ে কত গণনাতীত প্রাণের সৃজন করেছেন সুরভি, বশিষ্ঠ তার প্রতিটি ধাপের সাক্ষি। এরই পাশাপাশি মাতৃস্নেহে তাঁদের দুজনকে বক্ষে স্থান দিল যে, সে কন্যা হলেও তাকে মাতৃসম্বোধন করা যায় বইকি…

“বশিষ্ঠ!”

অরুন্ধতীর সামান্য উচ্চকিত গলার ডাক শুনে চোখ খুলে তাকালেন তিনি। মধুরস্বভাবা অরুন্ধতীর গলায় এহেন তীক্ষ্ণতা কিঞ্চিৎ দুর্লভ। কুটিরের দরজা দিয়ে দ্রুতপায়ে ঢুকে আসছিল অরুন্ধতী…

“অতিথি…”

এইবার উঠে বসলেন বশিষ্ঠ। অতিথি শব্দটি তাঁদের এই সুখের বাসস্থানে কোনো অর্থ বহন করে আনে না। এ গ্রহে এখনও দেবতাশ্রেণীর বুদ্ধিধর জীবের আবির্ভাব ঘটেনি।

“অসম্ভব অরুন্ধতী। এই বিজন গ্রহে…”

কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ হল না তাঁর। তার আগেই কুটিরের সামনে হঠাৎ করেই একজন দেবতা দেখা দিয়েছেন। অরণ্যের আড়াল ছেড়ে বের হয়ে বড়ো বড়ো পায়ে সটান কুটিরপ্রাঙ্গণে ঢুকে বশিষ্ঠর সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর পাশাপাশি দাঁড়ানো বিস্মিত বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললেন, “চমৎকার। আশাতীত সাফল্যের জন্য অভিনন্দন হে বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী।”

“আপনি…”

উত্তরে বয়স্ক দেবতাটি সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে হাতদুটি প্রসারিত করে বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর কর্ণমূলে আঙুল ছোঁয়ালেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সামনে আভূমি প্রণত হলেন আদি দম্পতি। ঈশ্বরের স্পর্শে স্মৃতির একটা বন্ধ দরজা যেন হঠাৎ করেই খুলে গিয়েছে তাঁদের।

“প্রণাম হে আদিদেব ব্রহ্মণ। প্রণাম পিতা। আপনার দর্শন পেয়ে ধন্য বোধ করছি আমরা। আপনার আশীর্বাদে আরব্ধ কাজটি আমরা সম্পূর্ণ সমাপ্ত করতে সক্ষম হয়েছি। এই জড়চেতনাসম্পন্ন গ্রহটিকে বশীভূত করে তাকে সুজলা সুফলা ও সপ্রাণ করে তুলেছি আমরা।”

“ধন্য হে মহামতি বশিষ্ঠ ও মহিয়সী অরুন্ধতী।”

ততক্ষণে অরুন্ধতী দ্রুতপায়ে কুটিরের পেছনের অরণ্যের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছেন। বহু অবরুদ্ধ স্মৃতির দরজাই খুলে গিয়েছে তাঁর এইমুহূর্তে। তিনি জানেন, ব্রহ্মণ, সুরভির বক্ষজাত সন্তানদের মতই জৈবদেহ সম্পন্ন। শক্তিসংগ্রহের জন্য এঁদের দেহযন্ত্রের আহার্যের প্রয়োজন হয়। অতএব খানিক বাদে, পত্রপুটে কিছু ফল ও একটি পুষ্ট মধুকোষের অংশ নিয়ে ফিরে এসে তিনি ব্রহ্মণের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, “দীনের কুটিরে সামান্য শক্তি সংগ্রহ করুন মহান ব্রহ্মণ।”

পত্রপুটের খাদ্যটুকুর দিকে তাকিয়ে মৃদু একটা হাসি খেলে গেল ব্রহ্মণের মুখ। প্রাকৃতিক খাদ্য। যন্ত্রজাত কৃত্রিম পুষ্টিতে বংশানুক্রমে বেঁচে থাকা ঔপনিবেশিকদের কাছে এ বস্তু ঐশ্বরিক ও স্বপ্নেরও অতীত। কিন্তু এভাবে একলা তা উপভোগ করা…”

পত্রপুটটি অরুন্ধতীর দিকে ফিরিয়ে ধরে তিনি বললেন, “তা হয় না অরুন্ধতী। আমার সঙ্গে নিযুতসংখ্যক সেনা রয়েছে। তাদের অভুক্ত রেখে এই দেবভোগ্য খাদ্য…”

একটা প্রশান্ত হাসি ছড়িয়ে গেল বশিষ্ঠর মুখে। মাথা নেড়ে বললেন, “ ‘গো’মাতা সুরভির কৃপায় তাঁর বক্ষে নিযুত তো তুচ্ছ শতকোটি সৈনিকের জন্যও এই দেবভোগ্য খাদ্যের সঞ্চয় রয়েছে ভগবন। আপনারা আমার অতিথি। ফলত আপনারা সুরভিরও অতিথি, তাদের আহ্বান করুন দেব। আমাদের ও আমাদের দুহিতা ও মাতা সুরভির আতিথ্য উপভোগ করুন আপনারা।”

“শতকোটি সৈনিকের আহার্য!” হালকা একটু বিদ্রুপের স্পর্শ ছিল যেন ব্রহ্মণের গলায়। “বেশ। তবে তার পরীক্ষা হোক… দেখি তোমার সুরভির বক্ষে কত আহার্যের সঞ্চয় আছে…”

তাঁর হাতে ধরা একটু ছোট্ট যন্ত্রের ইশারায় তখন সকালের সূর্যকে ঢেকে দিয়ে আকাশ অন্ধকার করে একটি সুবিশাল যান মাথার ওপরে এসে স্থির হয়েছে। সেখান থেকে নেমে আসা আলোর স্তম্ভগুলিতে ভেসে নেমে এসে মাটিতে পা দিতে থাকা অসংখ্য সশস্ত্র দেবতার স্রোতটার দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন অরুন্ধতী ও বশিষ্ঠ।

***

 

তিন তিনটি দিন! তিনতিনটি রাত্রি। সুরভির সুবিশাল স্থলভাগ জুড়ে নেমে আসা পঙ্গপালের ঝাঁকের মত ঐ দেবতার দলের হাতে প্রিয় গ্রহটির সকল সমৃদ্ধিকে বিধ্বস্ত হতে দেখেছেন বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী। ক্ষুধা মেটাতে যতটুকু প্রয়োজন তার চতুর্গুণ উদ্ভিদ ও প্রাণীকে হত্যা করে আনে এরা। এদের অতিকায় দাঁতালো যন্ত্রদের আঘাতে মুহূর্তে মাটিতে মুখ গুঁজড়ে পড়ে অসংখ্য মহীরূহ। সুরভির কোমল শরীরে অস্ত্রাঘাত করে সব গভীর ক্ষত থেকে এরা বের করে আনছে খাদ্যের অনুপযুক্ত ধাতু ও অধাতুর স্তূপও। দানবিক এই সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় জুটিয়ে আনা বস্তুসমষ্টির সামান্য অংশই আহার্যের কাজে লাগায় এরা। অবশিষ্ট বিপুল উদ্ব্বৃত্তগুলি থরে থরে পড়ে থাকে সুরভির বুক জুড়ে।

ব্রহ্মণ উপস্থিত তাঁর যানে ফিরে গিয়েছেন। তাঁর প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ কৌশিক এই মুহূর্তে এই ধ্বংসযজ্ঞের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুরভির বুকে। একেক বার বশিষ্ঠর ইচ্ছা হয়েছে কৌশিকের কাছে গিয়ে এর প্রতিবাদ করেন, গিয়ে তাঁকে বলেন, সুরভি একটি জীবন্ত অস্তিত্ব। অপ্রয়োজনে তার সন্তানদের হত্যা করা, অকারণে তার শরীরে অস্ত্রাঘাত করা দেবতার যোগ্য কাজ নয়। কিন্তু প্রতিবারই অরুন্ধতী তাঁকে বাধা দিয়েছেন। তাঁর একটাই কথা। এঁরা দেবতা। আমাদের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মণের আশ্রিত এঁরা। সর্বোপরি এঁরা অতিথি। কয়েকদিন আতিথ্য গ্রহণের পর ফিরে যাবেন নিজেদের দুনিয়ায়। এঁদের সামান্য আঘাতে বিচলিত হবে, তত দুর্বল নয় সুরভি।

কিন্তু চতুর্থদিন সে ভুল ভেঙে গেল বশিষ্ঠের। সেদিন শেষরাত্রের আকাশবাতাস হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল গম্ভীর ভ্রমরগুঞ্জনের শব্দে। একটা অদ্ভুত আলোর আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল অমাবস্যার অন্ধকার রাত্রি। কুটির থেকে বের হয়ে এসে বিমূঢ় চোখে বশিষ্ঠ দেখেছিলেন, আকাশে স্থির হয়ে ভাসমান যানটির শরীর থেকে শতাধিক অতিকায় আলোকভল্ল ভ্রমরগুঞ্জনের মত শব্দ তুলে নেমে আসছে সুরভির বুকে। তাদের আক্রমণে সুরভির শরীরের হরিত আবরণ শতাধিক জায়গায় ভস্ম হয়ে গিয়ে সেখানে গড়ে উঠছে এক-একটি অতলস্পর্শী সুড়ঙ্গ।

দ্রুতবেগে কাজ চলছিল এদের। সূর্য যতক্ষণে পূর্বদিগন্তে মুখ বাড়িয়েছে, ততক্ষণে যান থেকে নেমে আসা রাক্ষসী যন্ত্রদের নিপুণ দক্ষতায় সুড়ঙ্গগুলির বুকে দৃঢ়ভিত্তি গেড়ে আকাশের দিকে মাথা তুলেছে মেঘচুম্বী লৌহ অট্টালিকাদের ধূসর শরীর।

তাদের ঘিরে যোজন যোজন অরণ্যকে ছাই করে দিয়ে, অপরূপ অলঙ্কারের মত জলধারাগুলিকে অগ্নিফুৎকারে বাষ্পীভূত করে সেই শ্মশানভূমির বুকে গড়ে উঠছি; অজস্র দানবিক ধাতব আধার, তাদের দেয়ালের আড়াল থেকে ভেসে আসে অজস্র যন্ত্রের কর্কশ শব্দ, তাদের মাথায় ভেসে ওঠে দুর্গন্ধ ধোঁয়ার জাল।

এইবার অরুন্ধতীরও ধৈর্যচ্যূতি ঘটছিল। অতিথির অধিকার লঙ্ঘন করেছেন আগন্তুক দেবতারা। ‘গো’মাতা সুরভির বুকেই রাত্রির শয্যা পাতেন অরুন্ধতী। তার শরীরে শরীর মিশিয়েই নিদ্রা যান তিনি। সেই স্পর্শে আজ তিনি সুরভির গভীর যন্ত্রণাকে অনুভব করেছেন। অচেনা অস্ত্রের নিষ্ঠুর আঘাতে গুমরে গুমরে উঠছে শক্তিমান গ্রহজীব। তার গর্ভস্থ উত্তাপ ক্রোধাগ্নি হয়ে বের হয়ে আসতে চায় বারংবার। অপ্রত্যাশিত এই অত্যাচারের মুখে তাকে শান্ত রাখতে বড়ো বেগ পেতে হচ্ছিল অরুন্ধতীকে।

তবে প্রতিবাদ জানাবার জন্য বাইরে বের হতে হল না তাঁদের। সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ বাদে সৈন্যাধক্ষ কৌশিক নিজেই এসে উপস্থিত হলেন তাঁদের পর্ণকুটিরটিতে। উপস্থিত হলেন একটি আবেদন নিয়ে। দৈব ক্ষমতাবলে, সুরভির শাসণভার তাঁরা নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছেন এবারে। তার বুকে বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর কর্তব্য শেষে। তাঁদের কুটিরটির স্থলে একটি নতুন অট্টালিকা স্থাপিত হবে। দেবতাদের বাসস্থান হিসেবে তাকে ব্যবহার করা হবে। তাই কুটিরের আশ্রয় ছেড়ে দৈবযানের আশ্রয়ে ফিরে যাবার অনুরোধ জানাতে এসেছেন তিনি বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীকে। তবে অনুরোধ শব্দটি বাহুল্যই ছিল, কারণ, প্রায় একই নিশ্বাসে কৌশিক জানিয়েছেন ব্রহ্মণের তেমনই নির্দেশ। এই গ্রহটির ওপরে তিনি তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন ও দেবতাদের বাসভূমি হিসাবে একে গ্রহণ করেছেন।

স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ঋষিদম্পতি। জ্বলন্ত এই বস্তুগোলকের বুকে প্রথম যেদিন তাঁদের চেতনা এসেছিল, সেদিন তো এমন কথা ছিল না। বড়ো ভালোবাসায়, বড়ো যত্নে কয়েক কল্পকাল ধরে এই গ্রহজীবকে বশ মানিয়ে তার চেতনাকে বহুধাবিভক্ত করে যখন এর বুকে অজস্র প্রাণের সঞ্চার তাঁরা করেছিলেন, যখন তার বুকে অপার সৌন্দর্যের বয়ন করেছিলেন যুগযুগান্তের অধ্যবসায়ে, তখন তো এর এই ভয়াবহ অন্ধকার পরিণতির কোনো ইঙ্গিত তাঁদের দেননি ব্রহ্মণ! তবে? এ কোন বিচার!

তাঁদের এই প্রতিক্রিয়াটি বোধ হয় আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন কৌশিক। গ্রহনির্মাতা এই যন্ত্রজীবরা সচেতন। যেকোনো বুদ্ধিধর প্রাণীর মতই তাদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, অধিকারবোধ ও সৃজনশীলতা আছে। তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় লিখে দেয়া আছে, জড়চেতনার সঙ্গে কথোপকথনের অতিন্দ্রিয় ক্ষমতার সঙ্কেত। টেরাফর্মিং-এর সুদীর্ঘ ইতিহাসে, বাসগ্রহের সঙ্গে তার পালক যন্ত্রপুত্তলিদের এহেন আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠবার উদাহরণ কম নেই। অতএব, বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর স্তম্ভিত মুখদুটিতে ক্রোধের সঞ্চার হতে দেখেই তাঁর ইশারায় তাঁদের ঘিরে এগিয়ে এসেছিল একদল অস্ত্রধারী সৈনিক। তাদের হাতে ধরা অস্ত্রগুলির উদ্যত নল তাদের কেন্দ্রে দাঁড়ানো দম্পতির দিকে নিশানা করেছে।

সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি খেলে গেল বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর মুখে। দুচোখে অসীম কৌতুক নিয়ে কৌশিকের দিকে ফিরে দেখলেন তাঁরা। তারপর শান্ত কন্ঠে বশিষ্ঠ বললেন, “দুজন নিরস্ত্র জীবের বিরুদ্ধে এতগুলি অস্ত্র! আপনারা পরম বীর হে দেবতা কৌশিক। আপনাদের যন্ত্ররাক্ষসের আক্রমণ থেকে প্রিয় সুরভিকে রক্ষা করবার সাধ্য আমাদের নেই। তবে তার প্রয়োজনও নেই কোনো। সুরভি নিজেই নিজেকে রক্ষা করবে হে উদ্ধত দেবতা…”

কথাগুলি বলতে বলতেই মাটিতে উবু হয়ে আছড়ে পড়েছিলেন তাঁরা দুজন। ‘গো’মাতা সুরভিকে স্পর্শ করে সর্বাঙ্গ দিয়ে তার কাছে কাতর আবেদন পাঠাচ্ছিলেন তাঁরা
, “নিজেকে রক্ষা করো মা। আমাদের সাধ্য নেই…”

কয়েকটি মুহূর্ত মাত্র। তার পরেই, মাটির অনেক গভীরে একটা চাপা ক্রুদ্ধ গুঞ্জন যেন তাঁদের আকুল প্রার্থনার জবাবে সাড়া দিয়ে উঠল। থরথর করে কেঁপে উঠেছে সুরভির বুক। আর তারপর, চুড়ান্ত কম্পনের অভিঘাতে যেন শত শত মুখব্যাদান করে জেগে উঠল সে। অগণিত মুখ থেকে দুরন্ত গতিতে বের হয়ে আসা গলিত আগ্নেয়শিলার গগনস্পর্শী উচ্ছাস লেহন করে নিচ্ছিল, আক্রমণকারী দেবতাদের অতিকায় যন্ত্র, তাদের সেনাবহর ও তাদের সৃষ্ট কদাকার ধাতব সেই শহরকে…

মাত্রই কয়েকটি মুহূর্ত। তারপর চারপাশে খলখল করে বয়ে চলা অগ্নিসমুদ্রের মাঝখানে জেগে রইল কেবল বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতীর কুটিরটি ও সেখানে এসে আশ্রয় নেয়া সামান্য কিছু দেবসৈনিক।

সেদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে মৃদু হেসে বশিষ্ঠ বললেন, “ফিরে যান দেবতা কৌশিক। আপনাদের কুৎসিৎ গগনবিহারী আশ্রয়ে ফিরে গয়ে ব্রহ্মণকে জানাবেন, তাঁর শেষতম আদেশ পালনে অসম্মত হয়ছেন তাঁর সৃষ্ট বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী। এবং তাঁকে বলবেন, ‘গো’মাতা সুরভি স্বাধীন এক অস্তিত্ব। দেবতার কুৎসিত ভোগলালসা পূরণের জন্য তাকে এতকাল লালন করেনি বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী…”

***

 

“এবার?”

ফের একবার নৈঃশব্দ্য ফিরে এসেছে শ্মশানহেন জায়গাটিতে। গতকালও যেখানে তাঁদের অরণ্যে আচ্ছাদিত তপোবনটি দাঁড়িয়েছিল, আজ সেখানে কেবলই আগুন ও ভস্ম, তার বাতাসে ফুলের সুগন্ধের বদলে গন্ধকের তীব্র দুর্গন্ধ। শত্রুদমনের তাণ্ডবের পর সুরভি তার সেই আদিরূপে ফিরে গেছে যেন এখানে।

সেদিকে একনজর তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন বশিষ্ঠ। তিনি জানেন, সুরভির এই হিংস্র রূপ নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। মাত্রই কিছু বছরের অপেক্ষা। তারপর ফের এই শ্মশানে ফুল ফুটবে। হরিৎ তৃণগুল্মের লাবণ্য এসে ঢেকে দেবে লাভাপাথরের ধূসর শরীর। তিনি জানেন, এবারে আর কখনো কোনো দেবতা সুরভির ওপর অধিকার জারি করে তাকে ধর্ষণ করবার জন্য ফিরে আসবে না তার বুকে। এইবার, এই অখণ্ড অবসরে…

“অপেক্ষা অরুন্ধতী, সুরভি শান্ত হোক। দেবতারা সুরভির অধিকার চেয়েছিল। দেবতারাই সে অধিকার পাবে। তবে তার জন্য সুরভির বুকে, দেবতাদের আদলে, নতুন জৈব দেবতাদের জন্ম দেব আমরা। তারপর, তারা প্রস্তুত হলে, একদিন তাদের হাতে তুলে দিয়ে যাব সুরভির দায়িত্ব।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন অরুন্ধতী। তারপর যখন কথা বললেন, তখন তাঁর গলায় একটা অজানা আশঙ্কা কাজ করছিল, “কিন্তু… দেবতা… দেবতাই হয় বশিষ্ঠ। হয়তো তুমিই ঠিক, কিন্তু ভয় হয়, যে দেবতাদের আমরা সৃষ্টি করব সুরভির বুকে, একদিন যদি তারাও তাকে এভাবেই ছিঁড়েখুঁড়ে…”

আশা ও আশঙ্কায় দোদুল্যমান ধাত্রীদেবতাকে ঘিরে নীরবে বয়ে চললেন কালদেবতা। তিনি ভবিষ্যতকে জানেন। এ দ্বন্দ্বের উত্তরও তাঁর জানা। কিন্তু আদি পিতামাতার সে উত্তর জানবার সময় তখনও আসেনি।

Tags: গল্প, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

2 thoughts on “ধাত্রীদেবতা

  • October 16, 2022 at 5:50 pm
    Permalink

    চোখের সামনে সবটা ঘটতে দেখলাম যেন! কী বলব, দেবজ্যোতিদা; ভাষা-টাশা নাই স্টকে। প্রণাম নিয়েন।

    Reply
  • October 17, 2022 at 6:14 pm
    Permalink

    ফ্যান্টাস্টিক লিখেছেন। ‘প্রমিথিউস’ বা ‘থর’ নিয়ে যদি কল্পবিজ্ঞান/ফ্যান্টাসি হতে পারে, তবে বশিষ্ঠ-অরুন্ধতী-সুরভিকে নিয়েও এমন দারুণ সৃষ্টি করা যায়: আপনি প্রমাণ করে দিলেন।

    Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!