চাঁদের পাথর দিয়ে

  • লেখক: বামাচরণ ভট্টাচার্য
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

“তুমি কী এইগুলো দেখেছ, রমেশ?”

“না তো। এই ছবিগুলো কবে এল? জুম কর। আর প্রিন্টও বের কর”।

“কালকে পাঠিয়েছে। তুমি তো কাল আসনি— কেন? সব ঠিকঠাক তো?”

“হ্যাঁ, একটু বাড়ির কাজ পড়ে গেছিল। ছবিগুলি মেইল করেছে?”

“হ্যাঁ। লুনার অবজারভেটরি সেন্টার পাঠিয়েছে। বলছে ওদের যে লেটেস্ট চন্দ্রযানটা পাঠিয়েছে সেটাই নাকি এই ছবিগুলো পাঠিয়েছে।

ছবিগুলোর অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ দেখে বোঝা যাচ্ছে চাঁদের মেরুপ্রদেশের ছবি। হেজি, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, কেন বল তো?

আমার মনে হয় গতিতে তোলার সময় স্যাটারটা কেঁপে গেছিল অথবা ধুলোর একটা আস্তরণ ছবিটাকে হেজি করেছে”।

“হতে পারে। কিন্তু এটা কী? কীসের মতো দেখাচ্ছে?”

“আরে, সেই জন্যই পাঠিয়েছে। ওরা তো জানে আমরা দুইজনে এতবার চাঁদে গিয়েছি যে এই রহস্যের সমাধান আমাদের ছাড়া আর কারও দ্বারা সম্ভব হবে না। একবার মেইলটা পড় তাহলেই বুঝবে। ওরা আমাদের উপর কতটা ডিপেন্ডেন্ট”।

“সে তো ঠিক আছে, দেবল। কিন্তু এটা কী?”

“এক কাজ করলে হয় না…”

“কী?”

“চন্দ্রযানটার এখন অবস্থান কী, সেটা জানতে চেয়ে একবার মেইল করি। আরো স্পষ্ট কিছু ছবি আর ভিডিয়ো যদি ওরা আমাদের পাঠায় তাহলে এগুলো স্টাডি করতে আরো সুবিধা হয়”।

“করতে পার, কিন্তু আমার মনে হয় ওদের কাছে ভালো ছবি নেই। থাকলে এমন কাঁচা কাজ ওরা করত না”।

দেবল আর রমেশ দু-জনেই আজ দশ বছর ধরে চাঁদের বিভিন্ন অংশ নিয়ে গবেষণা করছে। তাদের কিছু সাফল্যের উপর নির্ভর করে বেশ কয়েকটি দেশ ওখানে বসতি স্থাপনে আগ্রহী হয়েছে। রোবোটিক জাজমেন্ট কয়েকমাস ধরেই চলছে। মাধ্যাকর্ষণ, আবহাওয়া সব নিয়ে ভীষণ রকমের পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। বেশ কিছুদিন ওরা স্পেস স্টেশনে আর চাঁদে ছিল। মাস খানেক আগেই ওরা ফিরেছে পৃথিবীতে। এই নিয়ে ওরা মোট ২৯ বার চাঁদের মাটি স্পর্শ করল। আর স্পেস ষ্টেশনে তো তাদের বছরের অর্ধেক দিন কেটে যায়। এবারে ফিরে এসে তারা একটা কোম্পানিকে বোঝাতে ব্যস্ত। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এরাই চাঁদে প্রথম বসতি স্থাপন করবে। কীভাবে, কোন পদ্ধতি মেনে সেখানে বসতি স্থাপন করতে হবে তার রূপরেখাই আলোচনার মুখ্য বিষয়। এর মধ্যেই এই ঘটনাটি নিয়ে মেইল। ঘটনাটি সত্যি হলে বসতি স্থাপনের পদক্ষেপ অনেক সহজ হয়ে যাবে একথা অস্বীকার করা যায় না।

ছবিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে টেবিলের উপরে পরপর সাজিয়ে রাখল দেবল। ঝুঁকে পড়ে, একটা আতস কাচ নিয়ে সে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ছবিগুলোকে দেখছিল। সাদা-কালো ছবি। ছবিগুলো পাশাপাশি রাখার ফলে বোঝা যাচ্ছে পদার্থটির স্থান পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থাৎ বস্তুটি সচল। আর সচল মানেই প্রাণ।

“তাহলে কী জয়ন্ত বাগচীর কথা ঠিক? — চাঁদে প্রাণ আছে?”

“তোমার কি মাথাটা গেছে?”

“না, কিন্তু ভেবে দেখ লোকটাকে আমরা ভুল প্রমাণ করেছি। কিন্তু এই ছবিগুলো কি সেই ভাবনাকে একেবারে বাতিল করে দিতে পারছে?”

“অন্য কোনো কিছুও তো হতে পারে”।

“কিন্তু কী? আচ্ছা আমরা কি কখনো চাঁদের মেরুতে গেছি? যাইনি। চাঁদের ওই অংশটা কিন্তু আমাদের এখনও অজানা। এই ছবিগুলো কিন্তু সেইখানের তাই অত সহজে আর আজকের দিনে জয়ন্ত বাগচীর কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না”।

“সেই জয়ন্ত বাগচী?”

“হ্যাঁ, জয়ন্ত বাগচী তার ‘চাঁদ থেকে ফিরে’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, চাঁদে প্রাণ আছে। কিছু জায়গার ছবি দিয়ে চাঁদে প্রাণের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। কিছু অদ্ভুত যুক্তিজাল বইটিতে ছিল। বইটি বেস্টসেলারও হয়েছিল। কিন্তু আমরা বারবার গিয়েও তার স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ পাইনি। তাই বিপক্ষ যুক্তি দিয়ে জয়ন্ত বাবুর মত খন্ডন করেছিলাম। আজ তিনি আর নেই। কিন্তু এই ছবিগুলো…”

“আমি তাঁর বইটি তাহলে আরো একবার পড়ে দেখি”।

বিপুল স্বপ্ন দেখে সে একদিন বড়ো বিজ্ঞানী হবে, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবে। একটা বড়ো কালো মতন গাড়ি থাকবে। খুব মৃদু আওয়াজে চলবে। ভিতরে শোয়া বসার জায়গা থাকবে। হালকা মিউজিক চলবে। আর সে গান শুনতে শুনতে এদেশ থেকে অন্যদেশ চলে যাবে। দেশ কেন? মহাকাশে ঘুরবে সে। একটা নক্ষত্র থেকে আর একটাতে। ছায়াপথের মাঝ বরাবর গাড়ি চালাবে। এই সব অদ্ভুত কথাবার্তা যখন সে মাকে বলে, তখন মা বলেন, “পাগল একটা!”

“বিপুল খেলতে যাবি না?”

“দাঁড়া আসছি”।

বিপুলেরা খেলে একটা মাঠে। মাঠটার পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। সবুজে ঢাকা তার চারিধার। নৌকা চলে নদীতে। পারাপার হয়। ওপাড়ে অন্য একটা গ্রাম। কতলোক পার হয়ে এপাড়ে আসে, কতজন যায় ওপাড়ে। যাওয়া আসা সারাদিন ধরেই চলে।

এপাড়ে নদীটার পাশ ধরে দক্ষিণ ধারে পাঁচশো মিটার এগোলেই একটা পোড়ো বাড়ি। লোকে বলে ভুতের বাড়ি। বাড়িটা সম্পূর্ণ পাথরের। বড়ো বড়ো পাথরের। বয়স? কয়েকশো বছর কেন, হাজার হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। মনে হয় প্রাগৈতাহাসিক সময় থেকে বাড়িটা বিরাজমান। কিন্তু এই জায়গায় এমন পাথরের বাড়ি— সত্যিই আশ্চর্য্যের। এই চত্বরে এমন পাথর কী করে এল সেটাও বিস্ময়ের। আশপাশে পাহাড়ের কোনো চিহ্ন নেই। নদীমাতৃক এলাকা— পলি মাটি আর দোঁয়াশ ছাড়া এখানে আর কোনো মাটিও দেখা যায় না।

লোকজন পারতপক্ষে এই বাড়িটা এড়িয়ে চলে। ব্রিটিশ আমলে কৌতুহলী কয়েকজন পাথরের বৈশিষ্ট্য খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে এমন বৈশিষ্ট্যের পাথর আছে তা জানার অনেক চেষ্টা একসময় হয়েছে। কিন্তু কেউ এই পাথরের বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাননি। যেসব ধাতব পদার্থ এই পাথরে থাকার কথা তাঁর থেকে অনেকগুন বেশি এতে রয়েছে। বেশ কিছু নামী বদমাশ চোর ছ্যাঁচোড় পাথরগুলো খোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কীভাবে যেন তারা হারিয়ে গেছিল। তাদের আর এই অঞ্চলে দেখা যায়নি। সেই থেকে একটা গুজবও রটে গেছে- পাথরবাড়িতে একবার গেলে আর ফিরে আসা যায় না। তারপর থেকে লোকজন পাথরবাড়িটাকে এড়িয়ে চলে।

কালের নিয়মে ধীরে ধীরে পাথরবাড়ি গুরুত্ব হারিয়েছে। বিপুলের খুব ইচ্ছে একবার ওই বাড়িটা দেখে আসার। কিন্তু জানাজানি হবার ভয়ে পারে না। সন্তুটা যা পেট পাতলা ওদিকে গেলেই সবাইকে বলে দেবে। আর বাড়িতে জানলেই তার খেলতে আসা বন্ধ হয়ে যাবে।

পরীক্ষা হয়ে গেছে। যতজন ছেলে এসেছে তাদের দুটো টিমে ভাগ করে খেলা হচ্ছে। ব্যাট করছে বিপুল। জিততে গেলে বেশ ভালো রানই দরকার। বাইরে থেকে সন্তু চেঁচাচ্ছে, রানা চেঁচাচ্ছে, “মার বিপুল, মার”।

আরো একটা বল ফসকে গেল। বল কমছে, রানের চাপ বাড়ছে। বলটা ব্যাটের একটু কোনা খেয়ে গেলেও চার হয়ে যেত। স্লিপে কেউ নেই, থার্ডম্যানও ফাঁকা। কিন্তু বলটাতে ব্যাটটা ট্যাচই হল না। ধুরছাই। এ কি ভালো লাগে?

“কী কানার মতো খেলছিস? স্টেপ আউট কর”।

কানটা ঝাঁ ঝাঁ করছে। অন্যদিন বোলার রণেন্দুকে পিটিয়ে শেষ করে দেয়; আর আজ?

“একটা রান নিয়ে অমলকে দে”।

পারল না বিপুল। পুরো ওভারটা মেডেন। বিপুলের মনে হচ্ছে, ধরণী দ্বিধা হও… অমল ভালোই খেলল পরের ওভারটা। শেষ বলে রানও নিয়ে নিল। যাক বিপুলকে আর ব্যাট করতে হবে না। খেলা শেষ হয়ে যখন বাড়ি এল সন্ধ্যাতারাটা বেশ জ্বল জ্বল করছে। আকাশের এই একটি তারাকেই বিপুল ভালো করে চেনে। বাকি সব তারাকে একইরকম মনে হয় তার। একদৃষ্টে তাকিয়ে সে আকাশের দিকে। হঠাৎই একটি উল্কা খসে পড়ল নদীর বুকে। সে সায়েন্স ম্যাগাজিনটা উলটে দেখতে থাকল কীভাবে তারা চেনা যায়!

আজ ৩রা শ্রাবণ। এমন দিনেই তপেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি। কত বছর হল। রমেনের বয়স বেড়েছে কিন্তু স্মৃতিকোঠায় থাকা তপেন? সে বাড়েনি। রমেনের মস্তিষ্কে সে এখনও একই রকম। সে এখনও যুবক। সেই ড্যাবা ড্যাবা চোখ, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল এখনও রমেনের চোখা ভাসে। কোথায় গেছে, কী করছে সেই জানে আর জানেন ভগবান। রমেন আকাশের দিকে তাকায়। বেশ ভালোই বৃষ্টি হচ্ছে। দৃষ্টিটা বৃষ্টিতে ঝাপসা লাগে। তপেনও এখন ঝাপসার পথে। আজ তার বয়স আশি। এই বয়সে স্মৃতি ঝাপসা হওয়ায় স্বাভাবিক। সে নদীর দিকে তাকাল। নদীটা বেশ ছাপিয়ে উঠবে আর ক-দিনেই। কত কিছু মনে পড়ে। আজকের মতো সেদিনও ফিরছিল রমেন। সঙ্গে তপেনও ছিল। তারা যমজ। লোকজন তাদের আলাদা করতে পারত না। রমেনকে বলত তপেন আর তপেনকে বলত রমেন। মা ঠিক চিনতে পারতেন। বলতেন, রমেনের চেয়ে তপেনের চোখটা ছোটো।

“এই নদীটা পেরতে পারবি, রমেন?”

“কেন?”

“এমনিই। পারবি?”

“বর্ষাকাল। খরস্রোত। তপেন পাকামি করিস না। বাড়ি চল। মা চিন্তা করবে, সেই সকালে বের হয়েছি…”

“ধুর দাঁড়া আমি একটু সাঁতার কেটে আসি”।

রমেনকে আজ সুযোগ দেয়নি তপেন। জামাটা খুলেই ঝপাং করে লাফিয়ে পড়ে জলে। স্রোতের টানে ভেসে চলে। অনেকটা চওড়া নদী। বর্ষাতে প্রস্থে বাড়ে। জায়গায় জায়গায় ঘূর্ণি। ধীরে ধীরে তাকে ছোটো দেখায়। রমেন চেঁচিয়ে বলে, সাবধান।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! ওপাড়ে যেখানে পাড় পেল তপেন সেটা তার এপাড়ের সাঁতার কাটার জায়গা থেকে অন্তত একশো হাত দূরে। ওপাড় থেকে সে হাত উঁচিয়ে চিৎকার করছে, শোনা যায় না। কিন্তু বুঝতে পারে— বলছে, “চলে আয় রমেন। ভয় কিসের?”

রমেন যায়নি। সে প্রতীক্ষা করেছে— ঘণ্টা ধরে। একটু জিরিয়ে তপেন আবার ঝাঁপিয়েছে। উজানে সাঁতরে আসা আরো কঠিন। আড়াআড়িভাবে সাঁতার কেটে তপেন এগিয়ে আসছে। রমেনের বুক দুরু দুরু। এই তপেন যদি আর না ফেরে। যদি ডুবে যায়। লোকে বলে, সাঁতার জানা লোকেরা কখনো ডোবে না। তাদের ডুবতে গেলে গলায় কলসী বাঁধতে হয়। তবুও রমেনের ভয় করে। সে চেঁচায়। তপেন এপাড়ের কাছে আসতে থাকে। রমেন যে জায়াগায় দাঁড়িয়ে থাকে সেখান অনেকটা দূরে। পাথরের বাড়িটার কাছাকাছি। হঠাৎ তাকে আর দেখা যায় না। কিছুক্ষণ পরে বাড়িটার পাশ দিয়ে তপেন উঠে আসে। উঠে এসে বলে, বাড়িটা সত্যি করেই ভূতের— জানিস রমেন।

রমেন অবাক হয়। তপেনের মতো ডাকাবুকো ছেলে বলছে ভূতের কথাটা মানে… সে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার বল তো?

খুলে রাখা জামাতে গা-টা মুছে সে জবাব দেয়, পরে বলব— এখন বাড়ি চল।

কথাগুলো মনে পড়ে। সেদিন আজ বিস্মৃতির তলে। তবু তপেনকে সে যে ভুলতে পারে না। ভুত থাকা পাথরবাড়িতেই সে কি হারিয়ে গেল?

দেবল জয়ন্ত বাগচীর ‘চাঁদ থেকে ফিরে’ বইটি পড়ছে। ২৪৮ পৃষ্ঠার বই। ভদ্রলোকের লেখার প্রতি মাধুর্য আছে। সায়েন্স না হোক, সাহিত্য তো বটে। লেখায় একটা টান আছে। একটানা কবে এমন বই পড়েছে দেবলের মনে পড়ে না। সারাক্ষণ বইটায় ডুবে আছে।

একটা জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘আজ দশটা দিন চাঁদে ঘুরছি। রোভারটা বিকল হয়ে পড়ে আছে। পৃথিবী থেকে ইঞ্জিনীয়ার আসবে, তারপর ঠিক হবে। তবে সে যন্ত্র নড়বে। সে এখন অনেকদিন। আমি এই ব্যাপারে একদম অজ্ঞ। কীভাবে যে যন্ত্রকে বিজ্ঞানীরা নড়াচড়া করান তাতে হতবাক হতে হয়। পদে থাকলে আমি সব যন্ত্র বিজ্ঞানীদেরই নোবেল দিয়ে দিতাম। সে যাই হোক মেকানিক আসতে অনেকটা দেরি, তা আমি এই ক-দিন কি বসে থাকব? নিশ্চয় নয়। তাই এই ক-দিন চাঁদের আবহাওয়াতে একটু নিজের মতো ঘুরব ফিরব বলে মনস্থির করেছি’।

আবার কিছুদূর পড়ার পরে দেবলের চোখে পড়ল,

‘জায়গাটা ১১০ দক্ষিণ। খুব ঠান্ডা, সূর্যের আলো কমে এসেছে— তবুও বেশ লাগছে চাঁদের মাটিতে ঘুরতে। একটা আলাদা উত্তেজনাবোধ করছি। জীববিজ্ঞানী হিসাবে এসেছি, অথচ প্রাণের দেখা নেই। কিন্তু ঘুরছি। একটু পা বাড়ালেই অনেকটা পা চলে যাচ্ছে। একখানি প্রমাণ সাইজের গর্ত পেরোনোর জন্য কোনোরকম কসরত করতেই হচ্ছে না। বেশ মজা লাগছে।

রোভারটা এখন দৃষ্টিপথের বাইরে। কেউ নেই। আমি একা। হারিয়ে গেলাম কি? হিসেব বলছে এই অঞ্চলের উষ্ণতা আরো কমে যাবে তাড়াতাড়ি। অন্ধকারে ছেয়ে যাবে এই অঞ্চল। অর্থাৎ খুব শীঘ্রই আমাকে এখান থেকে পাততাড়ি গুটাতে হবে। এই এক বিষম জ্বালা।

আমি চাইছি আরো কিছুদিন এখানে থাকতে। বেশ কিছু নমুনা এখান থেকে নেওয়ার আছে। মন কী যেন বলতে চাইছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। হিসেব বলছে এই জায়গায় আজই শেষ সূর্যোদয়। কাল থেকে…

বেশি কিছু নিতে পারব না। একটু আগে কী যেন দেখলাম। মনের ভুল? হতে পারে। বেশ কিছুদিন যাবৎ ঘর ছাড়া। হোম সিকনেস কাজ করছে? এমন হোম সিকনেসে হ্যালুসিনেশন হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবুও এতটা ভুল করব? যাইহোক পিছিয়ে আসতে থাকলাম। আজকের মধ্যেই আমাকে রোভারের কাছে যেতে হবে। সেইখানে দুই সঙ্গী আছে। তারা বার্তা পাঠাচ্ছে। আমি ভ্রুক্ষেপ করছিলাম না। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, মনে হয় না… দেখা যাক কী হয়!

দিকভ্রষ্ট হয়েছি, চারিদিকে জমাট বাঁধা অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। এবারে আমি নিশ্চিত হারিয়ে গেছি। তারাও বোধহয় আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। এতদিনে রোভার ঠিক হয়ে গেছে এবং নিশ্চয় তাঁরা চলে গেছেন। কনকনে ঠান্ডা। টের পাচ্ছি থার্মোমিটারে। মহাকাশের স্যুট পরে আছি।

এগিয়ে চলেছি সোজা নাক বরাবর। একে চলা না বলে লাফানো বলাই ভালো। থমকে দাঁড়ালাম। সামনেই কিছু একটা আলো। জমাট বাঁধা অন্ধকারে গোল বলের মতো কিছু। কিছুক্ষণ পর পর বাউন্স করছে। তাকে লক্ষ করেই এগোতে থাকলাম। দু-তিন বার পড়ে যেতেই দেহটা পিং পং বলের মত লাফাতে থাকল— তবু চোখ থেকে আলোটা সরতে দিলাম না। ওটাই মনে হচ্ছে আমার বাঁচার শেষ ভরসা।

আলোটা আর মাত্র ফুট দশেক দূরে। ক্যামেরাটা দিয়ে খচাখচ কয়েকটা ছবি তুললাম। আনমনে সেই দেখে চলতে গিয়ে আবার পড়ে গেলাম। এবারে পড়ছি তো পড়ছিই— পড়ার আর শেষ নেই’।

পড়া থামিয়ে দেবল ছবিগুলো বেশ ভালো করে দেখতে থাকল। একটা প্রাণী যার সারা দেহে সজারুর কাঁটা। আর মনে হচ্ছে কাঁটাগুলোর আগায় যেন এলইডি লাগানো আছে। ছবিগুলো খুব স্পষ্ট নয় কিন্তু বোঝা যাচ্ছে। আবার ছবিগুলোর উপর থেকে চোখ সরিয়ে পড়াতে মনোযোগ দিল দেবল।

‘ক্যামেরাটা একটু ডিস্টার্ব আছে। মায়া পড়ে গেছে, তাই পালটাইনি। কিন্তু পৃথিবী থেকে আসার সময় একে পালটানো একান্তই দরকার ছিল। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রার স্মারককে শুধুমাত্র ভালো ক্যামেরা না থাকার কারণে নিয়ে যেতে পারব না। এটা জীবনের এক বড়ো আক্ষেপ। কিন্তু লিখে যাব- যা চোখ দিয়ে দেখছি। ব্যস আবার অন্ধকার। প্রাণীটা হাপিস। গর্তে পড়ার পরে এটা বেশ ভালো লাগল— জীববিজ্ঞানী হিসেবে এখানে আসা সার্থক হল’।

বাইরের দিকে তাকাল দেবল। সন্ধে নেমে এসেছে। একটানা পড়ার জন্য চোখটা টনটন করছে। পেজ মার্ক দিয়ে বইটা বন্ধ করে সে উঠে গেল।

বাড়িটার দিকে এগোতে থাকল, বিপুল। একটা সান্ধ্য বাতাস শিরশির করে বইছিল। আনমনা ভাবটা কেটে গেল যখন একটা কালো বিড়াল বিপুলের সামনে মিউমিউ করে উঠল। কালো বিড়ালকে সে একটু ভয়ই করে। মনে মনে একবার বলে নিল, ভুত আমার পুত…

ইস, কালুটা যদি সঙ্গে থাকত…। কালু একটা কালো কুকুর। বিপুলের খুব ন্যাওটা। গলা ছেড়ে বিপুল ডাকল, “কালুউউউউউ…”

কোথা থেকে কে জানে, দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে কালু হাজির।

পাথর বাড়ির সদর দরজাটা বিশাল। খোলা। পাথরের উপরে খোদাই আছে। বাঁ পা বাড়াতে গিয়ে সরিয়ে নিয়ে ডান পা বাড়াল, বিপুল। সারা বছরের জল থাকা নদীটা ঠিক বাড়িটার পিছনে। শান্ত, নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে নদীর কুলকুল বয়ে যাওয়ার ধ্বনি শুনতে পাওয়া যচ্ছিল। বাড়ির মধ্যেই ঢুকেই পড়ল সে, পাশে কুকুরটা। বাড়ির ভিতরে কোথায় যেন জলের আছাড়ে পড়ার আওয়াজ। ভালো করে কান পেতে শুনল। হ্যাঁ, চিত্রকূটের জলপ্রপাতে জলের আছাড় খাওয়ার এমন আওয়াজ সে শুনেছে।

বেশ সুন্দর বাড়িটা। গোল গোল কারুকার্য করা স্তম্ভ। বারান্দাতে ওঠার জন্য সিঁড়ি। দরজা থেকে বারান্দা পর্যন্ত পাথরের বাঁধানো রাস্তা। আশপাশে না কাটা ঘাস জঙ্গলের সৃষ্টি করেছে। তাতে আবার লাল, নীল, সাদা বুনো ফুল ফুটে রয়েছে। খরগোশের মতো, একটা লম্বা লেজওয়ালা প্রাণী ছুটে চলে গেল। নতুন ধরনের পাখি সেখানে বসে। এমন ধরনের পাখি সে আগে দেখেনি। সামনে এগোলে যদি উড়ে পালায় সেইজন্য বিপুল দরজার পাশে থাকা ঢিবির মতো একটা জায়গায় বসে পড়ল। আর তখনই সশব্দে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। সে এত বড়ো দরজা এত দ্রুত বন্ধ হয়ে যেতে পারে তা কল্পনা করেনি। পিছনে ঘুরতেই না ঘুরতেই দরজাটা পুরো বন্ধ।

বুক ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসতে থাকল তার। এত বড়ো বাড়ি। কেউ কোথাও নেই, সঙ্গে শুধু কুকুরটা। ঢোকা মাত্রই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। এত বড়ো দরজা যে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে সেটা ধারণা করা অসম্ভব। বিপুলের কান্না আর বাঁধ মানল না, সে তারস্বরে চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকল— “মা, আমি তোমাকে না বলে আর কখনো আসব না”। কুকুরটাও ঘেউ ঘেউ করে কাঁদতে থাকল, কিন্তু পাথরের দেওয়ালে সেগুলো নীরব ঝঙ্কার তুলে বারবার ফিরে আসতে থাকল ভিতরে।

ঘণ্টা খানেক কসরতের পরেও যখন দরজা খুলল না, সে এগিয়ে গেল আরো ভিতরে। বাড়িটাকে এত কাছ থেকে দেখা হয়নি কোনোদিনই। গোল স্তম্ভগুলো পাথর কেটে করা। একটার উপর একটা পাথর খিলানের মাধ্যমে জোড়া। সিমেন্ট তো দূরঅস্ত, কোথাও চুনসুরকির ব্যবহার নেই। একটার উপর একটা পাথর চেপে বসে আছে।

কিছুটা অবাক চোখে সে দেখছিল। দেখার চেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছিল বাড়ি ফেরার। সে বাড়ির ভিতরের দিকে না এগিয়ে জলের আওয়াজ শুনে একটু বাঁ দিকে বেঁকে গেল। এবারে জল পড়ার আওয়াজটা আরো স্পষ্ট। সে আওয়াজ বরাবর এগিয়ে যেতে থাকল। মনকে শক্ত করে ভাবল, একটা দরজা বন্ধ হয়েছে তো কী হল- অন্য কি দরজা থাকবে না?

তাকে খুঁজে দেখতে হবেই।

“আর কিছু ছবি পাঠায়নি, অবজারভেটরি?”

“হ্যাঁ, পাঠিয়েছে, তো”।

“চাঁদের মেরু অঞ্চলের সূর্যোদয়ের প্রথম ছবি”।

“তাই নাকি”?

“হ্যাঁ। তার সঙ্গে এক অবাক ব্যাপারও রয়েছে”।

কী?

“চাঁদে মানুষ। এবং সে মানুষের এক পোষ্যও আছে। উভয়েই কিন্তু সাধারণ পোশাকে, মানুষ পৃথিবীর পোশাকে আর কুকুর কুকুরের মত”।

“ধুর, সকালবেলায় কী সব বল?”

“হ্যাঁ, দেখ”।

“হ্যাঁ তাই তো বটে। আমি জয়ন্ত বাগচীর বইটা পড়ছিলাম সেখানেও ব্যাপারটা লেখা আছে, বিশ্বাস হয়নি। আমি পেজ মার্কার দিয়ে রেখেছি। দেখবে?”

দেবল বইটা খুলল। দুশো পৃষ্ঠা। হাইলাইটার দিয়ে মার্ক করে রেখেছে সে লাইনগুলো। তিনি লিখেছেন, ‘ অবাক ব্যাপার। আজ বেশ কয়েকমাস আমি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কোনোভাবেই কিছু করে আমি এই কাল অন্ধকার কাটিয়ে চাঁদের আলোতে ফিরতে পারিনি। অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে। সময়ের হিসেব আমার কাছে এখন অনর্থক। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি অন্ধ। পৃথিবীতে অমাবস্যা দেখেছি, কিন্তু এই রকম জমাট বাঁধা অন্ধকার? আমি দেখিনি।

আমার খিদে-তৃষ্ণা মেটাচ্ছে পকেটে থাকা পিল। একটা পিল মোটামুটিভাবে দুইমাস খিদে-তৃষ্ণা আটকে রাখে। আমার সেই হিসেবে আমি প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রম করেছি কারণ তিনটে পিল আমি খেয়ে ফেলেছি, খিদে এখনও লাগেনি। মাঝে মাঝে মহাকাশের স্যুটের ভিতর জমে থাকা দেহের আবর্জনাকে একটা সুইচের মাধ্যমে পরিষ্কার করে নিই। ভাগ্যিস চাঁদে বায়ু নেই নাহলে নিজের গন্ধে নিজেই টিকতে পারতাম না।

হারিয়ে যাওয়ার দুইদিন পর থেকে আমি কত পা ফেলছি, তার হিসেব মাথার মধ্যে করে যাচ্ছি। এটাই আমার এখন একমাত্র বেঁচে থাকার রসদ। আমার হিসেব অনুযায়ী তিন হাজার সাতশো আটাশ পা ফেলেছি। চলতে চলতে পড়ে গেলাম এক খাদে। তারপর…

সামনে একটা আলোর বিন্দু এখন আমি দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ, আমি অন্ধ হইনি। হনুমানের মতো লাফ দিয়ে এগিয়ে চলেছি। বিন্দু উৎস ধীরে ধীরে বিস্তৃতে পরিণত হচ্ছে। আমার বিশ্বাস বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। একটা রাস্তা আমি দেখতে পারছি। এটা শুধু আমাকেই নয়, সমগ্র জগৎকে নতুন আলোর সন্ধান দেবে।

এখন আমি আলোক উৎসের খুব কাছে। এবং চিন্তান্বিত। আমি সাধারণ মানের ক্যামেরার দ্বারা এই উৎসের ছবি তোলা সম্ভব নয়। এগিয়ে গেলাম।

জায়গা সমতল ধরনের। একবার উপরের দিকে তাকালাম। জমাট বাঁধা অন্ধকার। কিন্তু এখানে আলো। এ যেন উলটো পুরাণ। আমরা শুনে এনেছি প্রদীপের নীচে অন্ধকার, কিন্তু…

রহস্যময় জায়গাটাতে আমি সরু একটা পথের রেখা বরাবর এগোতে থাকলাম। দেখতে পেলাম পদচিহ্ন। বেশ অবাক লাগছিল। আরো অবাকের ব্যাপার, সেখানে একজনের সঙ্গে দেখা হল। সাধারণ পোশাকে। পৃথিবীর মতো।

কথায় কথায় জানলাম, নাম তাঁর তপেন। ঋষিতুল্য লোক। তাঁর কথাতেই মহাকাশের স্যুট খুলে ফেললাম। স্যুটের কটু গন্ধে বমি পেলেও বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়ার আনন্দই আলাদা। ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই তপেনবাবু বললেন, পুনরায় পৃথিবীতে স্বাগতম। ম্যাজিকের মতো লাগলেও সত্যি, আমি পৃথিবীতে ফিরে এসেছি, তাও পায়ে হেঁটে কোনোরকম মহাকাশযান ছাড়াই। অবিশ্বাস্য। পাথর বাড়ি থেকে বেরিয়ে চোখটা কচলিয়ে দেখলাম পাশ দিয়েই বয়ে চলা এক নদী, আর আমার সবুজে ভরা পৃথিবী’।

“তাহলে কী করা যায়, দেবল?”

“রমেশ তাহলে আর একবার চাঁদে যাওয়া যাক, কী বল?”

“যাওয়া যেতেই পারে, কিন্তু এবারের গন্তব্য মেরুতেই হতে হবে”।

“অবশ্যই”।

“জয়ন্ত বাগচীর কথা যদি সত্যি হয় তাহলে রাস্তাটাকে আমাদের খুঁজে পেতে হবেই”।

“তার আগে একটা খবর নিলে হয় না?”

“কী?”

“জয়ন্ত বাগচীর পাথরবাড়িটা কোথায়?”

“সে খোঁজ কি আমি নিইনি, ভেবেছ? কিন্তু কোথাও কেউ ওই ধরনের জায়গার নাম শোনেনি। বলতেও পারে না কেউ। গুগলও হদিশ দেয় না। আমার মনে হয় ইচ্ছাকৃত জায়গাটা গোপন করা হয়েছে অথবা জায়গাটার কোনো অস্তিত্ব নেই”।

“হতে পারে”।

সামনেই একটা ঘর, সে ঘরে ঢুকেই গেল বিপুল। আওয়াজটা এবার খুবই জোরে। কিন্তু ঘরটা বেশ বড়ো। কিছু দূর যাওয়ার পরে একটা সিঁড়ি— সেটা নীচের দিকে নেমে গেছে। বিপুল সিঁড়ির দিকে তাকাল— বেশ গভীর, কিছুদূর পরে থেকে আর দেখা যায় না। পিছন ফিরে সে হাঁকল, “কি রে কালু, নামবি নাকি?”

কালু ক্যুঁ ক্যুঁ করতে করতে জবাব দিল। বিপুল আবার বলল, “চল তাহলে নামি। এসে যখন পড়েছি, দেখিই এর শেষ কোথায়?”

সে নেমে গেল। নামছে তো নামছে। আলো কমতে কমতে এখন জায়গাটা আলো আঁধারি। আর কিছুদূর নেমে গেলেই উপরের দিকটা বিন্দুর মতো দেখাবে। হঠাৎই তার খেয়াল পড়ল, সে এসেছে ঘণ্টা তিনেকের উপর হয়ে গেল কিন্তু ক্ষুধা তৃষ্ণা কিছুই বোধ করেনি। এমনকি তার প্রসাবের কথাও খেয়াল পড়েনি।

“কি রে কালু তোর খিদে পেয়েছে নাকি?”

কালু, আদরে-আহ্লাদে আবার ক্যুঁ, ক্যুঁ করে উঠল। এবারে জায়গাটা বেশ জমাট বাঁধা অন্ধকার। পশুর চোখই একমাত্র এই অন্ধকারে চলতে পারে। বিপুলের চোখে আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। সে আর বুঝে উঠতে পারছে না— এগোবে না পিছোবে? সামনে কি এই পাথর বাড়ি থেকে বের হবার রাস্তা আছে? পিছনের দরজা তো বন্ধ। কিন্তু এ কোন পথ? মনে হচ্ছে পাতালে প্রবেশ করছে সে। তবুও সে পথ ছাড়াল না। এগিয়ে চলতে থাকল— অনির্দিষ্টের পথে।

জমাট বাঁধা অন্ধকারে আরো কিছুটা পথ এগেনোর পরে চোখটা যেন অন্ধকারকে সয়ে গেল। এখন আর নামার অনুভূতি হচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন সমতলে হেঁটে চলেছে। কুকুর তার পাশেই চলছে। এবারে মনে হচ্ছে একটু যেন বসলে ভালো হয়।

“কালু দাঁড়া”।

সে দাঁড়াল না। শুঁকে শুঁকে এগোতে থাকল। পশুরা আগে থেকে অনেক কিছু টের পায়। বিপুল কালুর পিছু পিছু ছুটতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে বিস্ময়। একটা ঝরনা। উপরের বয়ে চলা নদীটা তীব্র বেগে নীচে পড়ছে। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে নাম না জানা ফল। অজানা পাখিদের কলরব। বিপুল বসে পড়ল। আহ্‌, কী শান্তি! ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে। বিপুল নরম ঘাসের গদিতে গা এলিয়ে দেয়। এত ঘুম আসতে পারে সেটা সে ধারণাও করতে পারেনি। যখন উঠল সেখানে দিন না রাত, সময় কতটা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। আলো আছে। তীব্র আলোও নয়, আবার মৃদুও নয়। তবে সময় যে অনেকটা গড়িয়ে গেছে সেটা বুঝতে পারল। ফোঁপানি দিয়ে সে আবার কাঁদতে শুরু করল। তার কান্নাতে কালুও তার সুরে কাঁদার আওয়াজ করতে থাকল। বেশ কিছুক্ষণ পরে শুধু স্পর্শ পেল, সে স্পর্শ তার সঙ্গী কালুর নয় তা ভালোই বোঝা গেল, যখন বিপুল শুনতে পেল, “বৎস তুমি কে? এই পথে কী করে?”

“তাহলে অবশেষে আবার চাঁদে?”

“হ্যাঁ দেবল, আবার চাঁদে”।

“তোমার যন্ত্রে দেখে নাও ল্যান্ডিং ঠিকঠাক হল কি না?”

“রমেশ এই ব্যাপারে কি আমার কখনো ভুল হয়েছে?”

“না তা হয়নি। তাহলেও একবার জেনে নিলাম। রোভার দাঁড়িয়ে থাকবে?”

“সেই রকমই তো কথা আছে। টিমের বাকিরা আমাদের চন্দ্রাযানে ফিরে যাবে”।

“তুমি কি আমাদের উদ্দেশ্য লুনার অবজারভেটরিকে জানিয়েছ?”

“না পুরোটা জানাইনি, আবার গোপনও করিনি। ওই তোমার অশ্বথমা হত ইতি গজর মতো”।

“ওরা মেনে নিল?”

“না মেনে উপায় ছিল? আমেরিকান কোম্পানি। ব্যাবসার স্বার্থ ওরা ভালোই বোঝে। তা ছাড়া কলোনি স্থাপনের বিষয়ে আমাদের উপরে অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে। আমাদের উপরেই ভরসা করেই পাঁচ-পাঁচটা কোম্পানি তাদের কলোনি স্থাপনে আগ্রহী। এমতাবস্থায় আমাদের সামান্য দাবী কি ওরা মানবে না?”

“সুযোগের সদব্যবহার করছ?”

“হ্যাঁ তা বলতে পার। তারা কোটি কোটি টাকা কামাবে আর আমরা জনস্বার্থে সামান্য রাস্তা খোঁজার জন্য আসতে পারব না?”

“তা বেশ। এবারে চাঁদে আসি”।

“সেই ভালো। ঝপাং ঝপাং করে হাঁটতে হাঁটতে রোভার থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছি। টিম যোগাযোগ রেখেই চলেছে”।

“মেরুতে চলেছি। ভারতীয় স্যাটেলাইট প্রথম এখানে বরফের কথা বলেছিল। মহাকাশ স্যুটের পকেট থেকে একটা পতাকা বের করে এখানে রেখে দিই?”

“দাও। ত্রিরঙা পতাকা এখানেও অন্তত শুয়ে থাকুক”।

“থাকুক। তবে একটা কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে কাল দুপুরের পর থেকেই আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে চাঁদের মেরু”।

“তো?”

“কিছুতেই আমাদের বিচ্ছিন্ন হলে চলবে না। যেভাবে হনুমানের মতো আমরা লাফ দিয়ে চলছি তাতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই অন্ধকার নেমে গেলেই আমাদের সাবধানে পা ফেলতে হবে। একবার হারিয়ে গেলে বুঝতে পারছ কতটা চাপের হবে ব্যাপারটা”।

“তাই হবে বস। কিন্তু একটা কথা…”

“কী?”

“আমরা অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছি, শেষ পর্যন্ত কী সফল হব?”

“তুমি কি গীতা পড়নি?”

“না”।

“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন। কাজ করে যাও ফলের আশা করো না”।

“বাহ। এই সাবজেক্টটা ঠিকমতো শিখলাম না। অথচ কত কিছু এই বিষয়ে লুকিয়ে আছে। কত যুগ আছে বৈদিক ঋষিরা কত কথা বলে গেছেন। আমরা তার বিন্দু বিসর্গ ও জানি না, বুঝি না”।

“সত্যিই তো। এই নিউটনের মাধ্যকর্ষণ শক্তি নিয়ে কথাটি ভাস্করাচার্য তাঁর সিদ্ধান্ত শিরোমণিতে কত শতাব্দী আগে বলে গেছেন, ভাবলে অবাক হতে হয়। শুনবে?”

“বল, একটু জ্ঞান নিই”।

“আকৃষ্টিশক্তিশ্চ মহীতয়া যৎ স্বস্থং গুরুং স্বাভিমুখং স্বশক্ত্যা।

  
আকৃষ্যতে তৎ পততীব ভাতি সমে সমন্তাৎ পতিত্বিয়ং খে”।

“তা বললে যখন অর্থটাও একটু ব্যাখ্যা কর”।

“যে সকল বস্তু পতনশীল তারা কেউই স্বেচ্ছায় পড়ে না, পৃথিবী তার আকর্ষণী শক্তি দ্বারা নিজের দিকে তাদের আকর্ষণ করছে। শুনলে তো, এবারে সামনে তাকাও— একটা খাদ। কী করবে? খাদটা পার হবে না এর নীচে নামবে?”

খেলাধূলা করে ঠিক বাড়ি চলে আসে বিপুল। কিন্তু এবারে? সত্যিই মাথায় এত চিন্তায় চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে, বিপুলের বাবার। বিপুলের মা কেঁদে কেঁদে অস্থির।

“আজ তিনদিন হয়ে গেল, কোথায় গেল ছেলেটা?”

“কী করে বলি বলতো? আমি কি চেষ্টার ত্রুটি রাখছি? থানা পুলিশ সব জায়গাতেই জানিয়েছি। সবাই খোঁজাখুঁজি করছে”।

“ওর বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলে?”

“সব্বাইকে জনে জনে জিজ্ঞেস করেছি। একমাত্র সন্তু বলল, ভূতের বাড়িটার কাছে বুধবার দেখেছে”।

“তাহলে সবাই মিলে একবার ওই বাড়িতে খুঁজে দেখ”।

“তুমি কী মনে করছ, যাইনি? গেছিলাম। ওই বাড়ির দরজা বন্ধ। আমরা জনা দশেক লোক ঠেলে ঠুলেও ওটা খুলতে পারিনি। তাহলে বিপুল কী করে ওর মধ্যে ঢুকবে? না না ওখানে সে নিশ্চয় যাবে না”।

“কী হল আমাদের ছেলেটার? কোথায় গেল সে? কিছু হয়নি তো ছেলেটার?”

“ভগবানে ভরসা রাখো, ঠিক ফিরে আসবে”।

১০

“আমি প্রথম যখন এই পথে আসি তখন তোমার মতো। একটু অবাক হই, ভয় লাগে। তবে তুমি যেমন এই পথে হারিয়ে গেছ— আমি হারাইনি”।

“তাহলে কী হয়েছিল?”

“দরজা বন্ধ এবং খোলার একটা পদ্ধতি আছে। যাইহোক, তোমার নামটা জানা হয়নি”।

“আমি বিপুল”।

“আচ্ছা, কোনো ভয় নেই। আমি বের করে নিয়ে যাব এখান থেকে। কান্নাকাটি করো না। আমাকে বল তো, তুমি বাড়িটাতে ঢুকে কোন ঢিবির মত অংশে বসেছিলে?”

“হ্যাঁ, বসেছিলাম তো। একটা সুন্দর মত পাখি দেখার জন্য বসলাম”।

“ওটাই হল দরজা বন্ধ হওয়ার খিলান। ওখানে বসলে বন্ধ হয়, আবার বসলে খুলে যায়”।

“তাহলে ফিরে যাই। আপনাকে আমি কী বলে ডাকব?”

“তুমি আমার নাতির মতন, আমাকে তপেন দাদুই বল”।

“দাদু আমি বাড়ি যাব”।

“যাবে তো। আমিই দিয়ে আসব। তাঁর আগে একটা নতুন জায়গা দেখাই, চল। জেনে রাখ, এখানে আসার আর একটি পথও আছে— সেটা আরো ভয়ঙ্কর। আমি যখন ছোটো ছিলাম সেই পথে পড়েছিলাম। নদীর পথ সেটা। এই পাথরবাড়ির পিছনে যে নদী আছে সেই নদীর একটা তীব্র স্রোত এই পাথরবাড়ির মধ্যে ঢুকছে— যা ওই জলপ্রপাত হয়ে এখানে পড়ছে। আমি সেই স্রোতেই পড়েছিলাম। কপাল জোরে সেবার বের হয়েছিলাম। কিন্তু পরের বার ইচ্ছে করে আমি এই বাড়িতে এসেছি, ইচ্ছে করে হারালে আর খুঁজে পাওয়া যায় না”।

এবারে বিপুল তাঁকে ভালো করে দেখল। তাঁকে দেখে ভয়ঙ্কর কিছু বোধ হল না। একদমই তার বাবা কাকার মতোই দেখতে। বাড়তি বলতে তার না কামানো দীর্ঘদিনের দাড়ি, চুল। জটা পড়ে গেছে। মনে সাহস এল বিপুলের। তবে বাড়ির জন্য মনখারাপ হল। এতক্ষণে নিশ্চয় হুলস্থূল কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে।

তারা এগিয়ে গেল। জায়গাটা বেশ। জলপ্রপাতের পরের নদীটার তেজ কমে গেছে। শান্ত হয়ে বয়ে চলেছে। তার তীরে নতুন ধরনের গাছপালা। বিপুল দেখেনি এসব গাছেদের। নতুন কিছু প্রাণীদের দেখা যাচ্ছে। কিছু প্রাণী সজারুর মতো, কিন্তু গায়ে আলো আছে। বিপুলের বেশ রোমাঞ্চ হচ্ছে। সে শরীরে একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছে। এখন আর কান্নাভাবটা আর আসছে না।

লোকটি আবার বলতে শুরু করল, “আমি তপেন। বেশ কিছুকাল এখানেই বাস করছি। এই জায়গার নাম দিয়েছি চন্দ্রপথ। বয়সও বেশ হল। আশি ছুঁয়ে ফেলেছি”।

“কিন্তু আপনার চুল দাড়ি যে পাকা নয়। আমাদের গ্রামের আপনার বয়সী সব দাদুর চুল পাকা”।

“পাকতে দেয়নি এই চন্দ্রপথ। এই পথে সময় বাড়ে না। কাল যেন থমকে আছে। বা বাড়লেও অনেক ধীরে। এখন এগিয়ে চল। আচ্ছা তুমি রমেনকে চেন?”

“আপনার মতো দেখতে? ফর্সা করে, সাদা দাড়ি, চুল?”

তপেনের মত রমেনও খুব ফর্সা ছিল বটে কিন্তু সাদা চুল দাড়ি? সে আর বিপুলের কথার জবাব দিতে পারল না। হাঁটতে থাকল।

আধ ঘণ্টাখানেক পথ হেঁটে থমকে দাঁড়াল তপেন। বলল, “এটা সীমানা”।

“কীসের?”

“চাঁদ আর পৃথিবীর”।

“মানে?”

“আমরা এবারে চাঁদে প্রবেশ করব। একবার লাফ দাও তাহলেও বুঝবে”।

বিপুল সত্যি করেই একটা লাফ দিল। এমন লাফ সে কোনোকালেই দেয়নি। ওদের যে জাম্পে ফার্স্ট হয়, সুজন— তার থেকে অনেক অনেক বেশি। একটু দৌড়ে এসে লাফ দিলে মনে হয় সে সাগরও ডিঙিয়ে দেবে।

“এবারে দেখ”।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল বিপুল। চাঁদের মতো কিন্তু নীল, মধ্যে সাদা সাদা দাগ। তপেন বলল, “ওটা আমাদের পৃথিবী”।

“তাই আবার হয়?”

“এখনও বিশ্বাস হল না? তুমি বিজ্ঞান বই পড়নি— চাঁদে অভিকর্ষজ ত্বরণ পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ। সেইজন্যই তো অতটা লাফ মারলে?”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ তো”।

“কিন্তু চাঁদে কি মানুষ থাকে?”

“না তো। তবে এই পথে নতুন কিছু প্রাণীরা থাকে, যেগুলো এখনও আবিষ্কার হয়নি। তবে চন্দ্রপথে আমার মতো কিছু মানুষ থাকে বৈকি। তবে তাঁরা তো সচরাচর এদিকে আসেন না। তাঁরা বহুযুগ আগে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। এখন গভীর সাধনাতে মত্ত”।

“তাহলে ওরা কে?”

ওরা দু-জনেই তাকিয়ে থাকল সামনের দিক থেকে আসা লোক দুটির দিকে। স্পেসস্যুট পড়া লোকদুটিকে যেন বিপুল দেখেছে ছবিতে। চাঁদে যেতে গেলে অমন পোশাক পড়তে হয়। বিশ্বাস না হওয়া তপেনের কথাটা এবারে একটু একটু বিশ্বাস হতে লাগল বিপুলের। তখনই তপেন বলল, ওরা তোমাদের পৃথিবীর মানুষ। চল নিয়ে আসি। ওঁরা নিশ্চয় পথ হারিয়েছেন।

১১

তপেনদের বাড়িটা এখনও সেই একই রকম আছে। গেটের দুইধার দিয়ে দুটো মাধবীলতা গাছ যথেষ্ট ফুল ফুটিয়ে রেখেছে। গোঁড়াটাও বেশ মোটা হয়েছে। গাছটার বয়স যে বেশ হয়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজ কত বছর পরে এখানে এল সে। তবে একা নয়। সঙ্গে এসেছে আরো তিনজন।

“রমেন, রমেন”।

“কে?”

বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধ বের হয়ে এল। মুখ সহ সমস্ত দেহের চামড়ায় কুঁচকে গেছে। ত্বকের সেই জৌলুস আর নেই। তবে মুখের শ্বেত শুভ্র দাড়িতে তাকে বেশ ঋষি সুলভ লাগে। সেই বেরিয়ে এসে অবাক চোখে বলল, আমিই রমেন।

“তুই?”

হতচকিত রমেন বিশ্বাস করতে পারছিল না এ তাকে তুই বলছে। এই গ্রামের এখন বোধহয় সবথেকে বয়স্ক মানুষ সে। যুগ ধর্ম কি সংস্কারকেও খেয়ে ফেলল? এত ছোটো একজন আমার মতো এক অশতীপর বৃদ্ধকেও তুই তোকারি করছে অথচ পাশে থাকা, মানুষদুটো নির্বিকার। পাশের ছোটো ছেলেটা কী শিক্ষা পাবে? একটু বিরক্ত হয়ে সে বলল, “কী চাই?”

“চাইব তো পরে, আগে বল চিনতে পারিস কি না?”

“চশমাটা খুলে আবার পড়ল রমেন। তারপরে বলল, চেনা লাগছে। একসময় তপেন তোমার মতো দেখতে ছিল। তুমি কি তপেনের ছেলে? সে আমার আপন ভাই— কোথায় যে চলে গেল!”

“ছেলে কেন হতে যাব? আমিই তপেন। এই দেখ কাদের এনেছি। জানিস, এঁরা কারা?”

“বাবা, এই বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কি তোমার ইয়ার্কি মারা ঠিক হচ্ছে?”

“ধুর ইয়ার্কি মারব কেন, আমিই তপেন। শোন কানে কানে কয়েকটা কথা বলি তাহলেই বুঝবি…”

“তপেন রমেনের কানে কানে বলল, যৌবনের কয়েকটা গোপন কথা”।

“কি এবারে বিশ্বাস হল? এই কথাগুলো আমি আর তুই ছাড়া কেউ কি জানত?”

“তা বটে, ঘটনাটি আমি আর তুই ছাড়া কেউ তো জানত না”।

“তাহলে…”

“আয় বাড়ির ভিতরে। তারপরে বিপুলের দিকে চেয়ে বলল, কোথায় ছিলি? সবাই চিন্তায় আছে। সারা গ্রাম তোলপাড়”।

বিপুল বলল, “ভূতের বাড়িতে হারিয়ে গেছিলাম”। তারপর বাড়ির ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বিপুল কালুকে বলল, “তুই এখন যা”। বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল, “আমিও যাই?”

তপেন উত্তর দিল, “হ্যাঁ তুমিও বাড়ি যাও। বাবা মাকে বোলো আমার কথা। তবে যে পথ তুমি জানলে সেটা আর কাউকে বোলো না”। তারপর দেবল আর রমেশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনারা আসুন আমার বাড়ি দেখে যান”।

বিপুল উত্তর দিল, “আচ্ছা। আমি মাঝে মাঝে যেতে পারি তো?”

“হ্যাঁ, তা পার”।

বিপুল টা টা দিয়ে বাড়ির পথ ধরল। এবারে রমেন বলল, “এই ভদ্রলোকেদের কোথায় পেলি?”

“সে অনেক কথা। বলব, আগে একটু জল খাওয়া”।

ঢক ঢক করে জলটা গলায় ঢেলে তপেন আরম্ভ করল…

“পাথরবাড়ি একটা সুড়ঙ্গ। তবে এই সুড়ঙ্গ মাটির তলার মতো নয়। তবে এই পথ দিয়ে চাঁদে যাতায়াত করা যায়। এই ভদ্রলোকেরা চাঁদে হারিয়ে গেছিলেন। আর বিপুল বলে ছেলেটা পাথরবাড়িতে কৌতুহলে ঢুকে ফেঁসে গেছিল। বের হতে পারেনি। এছাড়াও অন্য এক পথেও হারানো যায়। সেই সাঁতার কেটে ফেরার পরে আমি কী বলেছিলাম, খেয়াল আছে?”

“হ্যাঁ, তুই বলেছিলি ওটা ভূতের বাড়ি”।

“আসলে একটা তীব্র স্রোত ওই বাড়ির মধ্যে ঢুকছে আর আমি ওই স্রোতেই পড়েছিলাম। তাই তখন বলেছিলাম”।

“তারপর?…”

“তারপর বড়ো হলাম। বৈরাগ্য এল। ইচ্ছে হল হারিয়ে যেতে। কৌতুহল ছিল পাথরবাড়ির প্রতি। ঢুকে পড়লাম। বন্ধ হল দরজা। আর বের হলাম না। চাইওনি বের হতে। তুই হারিয়ে যাওয়া জানতিস রমেন, কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেছি সেটা জানতিস না। বের হতে না পেরে ওই সুড়ঙ্গ হয়ে উঠল আমার ডেরা। দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে আমি সেখান থেকে বের হবার পথও আবিষ্কার করলাম। মানতেই হবে পাথরবাড়ির সৃষ্টিকর্তা অতিব বুদ্ধিমান। কিন্তু বের হয়ে আর এলাম না। খেতে লাগে না, পড়তে হয় না, চিন্তা নেই, ভাবনা নেই। বেশ ছিলাম। ঋষিতুল্য বেশ কয়েকজন আছেন, তাদের সঙ্গেই থাকি। আমিই সর্বকনিষ্ঠ। তবে মাঝখানে আর একজনকে ওই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে বের করে এনেছিলাম”।

দেবল বলল, “জয়ন্ত বাগচী?”

“হ্যাঁ, বোধহয়। তুমি কী করে জানলে?”

“তিনি তাঁর লেখা বইয়ে এই পথের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অবস্থান জানাননি। সেই পথ খোঁজের জন্যই আমাদের চন্দ্রাভিযান। তবে তাঁর কথা কেউ তেমন বিশ্বাস করেনি। বেশ ইন্টারেস্টিং বই হিসাবে কাটতি হয়েছে কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য কাহিনি হয়ে উঠতে পারেনি। আপনার খোঁজ না পেলে আমরাও বিশ্বাস করতাম না”।

“এখন কী বিশ্বাস করলে?”

ওপাশ থেকে রমেশ বলল, “অবশ্যই। এই পথের আবিষ্কর্তা আপনিই। সমগ্র বিশ্বকে আমরা তা গর্বের সঙ্গে জানাব”।

“বিশ্বকে জানিও না। মানুষের লোভ তাহলে ওই অঞ্চলটাকে ধ্বংস করে দেবে। দিনরাত ট্যুরিষ্টের ভিড় লেগেই থাকবে। শান্তি চলে যাবে”।

“হ্যাঁ, তা ঠিক”।

“তাই বলছি, জানিও না। এই পথের রহস্য ছাড়াও আমি আরো একটা জিনিসের আবিষ্কারের কথাও বলব। তাঁর আগে আমার বয়সের রহস্যটাও একটু বলে দাও”।

“আমাদের মনে হয়েছে, এটা একটা ইন্টারস্পেসিয়াল হোল। এই হোলটার একটা নিজস্ব গতি আছে। গতিটা প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি। সেই গতিই আপনার বয়স বাড়তে দেয়নি। একেই বলে সময়ের দীর্ঘসূত্রতা”।

“তাহলে সেই গতি আমরা বুঝতে পারি না কেন?”

“ট্রেনে ভ্রমণ করলে কি ট্রেনের গতি বুঝতে পারেন?”

“তা পারি না”।

“এখানেও ব্যাপারটা একই রকম”।

“বাহ, ভালো জিনিস জানালে ভাই। এবারে শোন এই পাথরবাড়ির কথা। এই ধরনের পাথরের বৈশিষ্ট্য কোথায় দেখেছ বলতে পারবে?”

“দেবল বলল, মনে হচ্ছে চাঁদের পাহাড়ের পাথর। পাথরের দাগগুলো অমনই। আমরা যে অঞ্চল থেকে উদ্ধার পেলাম সেই অঞ্চলের পাথরগুলো একদম ওইরকম। আমি ভালো করে দেখেছি কারণ অমন পাথর আমাদের পৃথিবীতে নেই”।

“ঠিকই বলেছ। এই বাড়ির সৃষ্টি কবে আমরা জানি না। আমাদের দাদুরাও তাদের দাদুদের কাছে এই বাড়ির কথা শুনেছেন। তবে এই জায়গার প্রাচীন লোকেদের কাছে অজানা ছিল না। আমার মনে হয়েছে পরিকল্পনামাফিক তাঁরা পথদুটিকে আড়াল করেন। পাথরবাড়িটায় সেই আড়াল। আর বাড়ি তৈরির পাথর এসেছে চাঁদে থেকে। চাঁদের পাহাড় কেটে কেটে এই বাড়ির পাথর আনা হয়েছে। আমি লক্ষ করেছি পাথরগুলি সব একই বৈশিষ্ট্যের। পার্থক্য একটাই পৃথিবীতে আসার পরেই পরস্পরের প্রতি আকর্ষিত হয়। পরস্পরের এই আকর্ষণ পাথরবাড়িকে এতদিন টিকিয়ে রেখেছে”।

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ”।

“তাহলে ওটাও তো একটা গবেষণার বিষয়”।

“অবশ্যই। তবে আমার কথাটা খেয়াল রেখ। বিশ্বকে জানিও না”।

তাই হবে। আপনার কথা শিরোধার্য।

“শুভমস্তু, শুভমস্তু, শুভমস্তু”।

“এইবারে আমাদের বাড়ি ফেরার অনুমতি দিন তাহলে”।

“যাবে তো বটেই। তবে আমাদের বাড়ি থেকে কোনো অতিথি কি না খেয়ে ফিরতে পারে?”

“ওদিক থেকে রমেন বলে, একদিন আরো বাড়ি ফিরতে দেরি হলে ক্ষতি কি? আজকের এমন শুভদিনের আমাদের বাড়ির অতিথি হয়ে থেকেই যাও”।

দেবল আর রমেশ এই দুই বৃদ্ধের কাতর অনুরোধ ফেলতে পারল না। ঘরের ছেলের ঘরে ফেরার আনন্দের সাক্ষী হয়ে তারা সেখানে সেইদিনটা থেকেই গেল।

Tags: বড় গল্প, বামাচরণ ভট্টাচার্য, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

8 thoughts on “চাঁদের পাথর দিয়ে

  • October 18, 2022 at 11:33 pm
    Permalink

    দারুণ লাগলো গল্পটা।

    Reply
    • October 19, 2022 at 9:38 am
      Permalink

      ধন্যবাদ দিদি।

      Reply
    • October 20, 2022 at 4:23 pm
      Permalink

      চমৎকার গল্প, বেশ অন্য রকম। চমৎকার গতিময় লেখা! আরও লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

      Reply
      • October 20, 2022 at 5:19 pm
        Permalink

        অনেক ধন্যবাদ।

        Reply
  • October 19, 2022 at 12:24 pm
    Permalink

    দারুণ লাগল গল্প টা পড়ে । খুব ভালো হয়েছে ।

    Reply
  • October 25, 2022 at 9:25 am
    Permalink

    Interesting and awesome. The imagination power of the writer is outstanding.

    Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!