ধোঁয়া

  • লেখক: অর্ণব গোস্বামী
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

 

প্রাক-কথন

 

“স্যার, কাজটা আমাদের এখানেই আটকাতে হবে, নাহলে যে সর্বনাশ হবে!”- বিখ্যাত বিজ্ঞানী সুদর্শন বোসের দিকে তাকিয়ে জানাল অরিন্দম।

“আচ্ছা অরিন্দম – সবসময় কি কম্পিউটার সিমুলেশন পুরোপুরি একিউরেট হয় বলে তোমার মনে হয়?” প্রখ্যাত বিজ্ঞানীর তীক্ষ্ণ চোখে সন্দেহ।

“তা হয়তো নয়। তবু আমাদের এই কাজের বেশিরভাগই তো সিমুলেশনের ওপর বেস করেই ফাইনাল করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে এত হাই-এন্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁর প্রেডিকশন ভুল হবার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুদর্শন, তারপর বললেন, “তা বললে তো চলেনা অরিন্দম, এতটা এগিয়ে গিয়েছি আমরা, সেখান থেকে পেছতে চাইলে বিরাট টাকার লস হয়ে যাবে। সমস্ত সেটআপ রেডি। আমাদের এয়ার ক্র্যাফটের ফাইনাল টেস্টিং পর্যন্ত শেষ। আমি বলি কি, যা মনে হচ্ছে সেটা আপাতত চেপে যাও। তুমি বলছ ডিস্যাস্টার হলেও আমাদের হাতে কয়েকবছর সময় আছে। তাঁর মধ্যে আমরা ঠিক কিছু একটা সলিউশন পেয়ে যাব। একটু বস, চা খাও, আমি একটু আসছি।”

সুদর্শন ল্যাবের দিকে এগিয়ে যান। এটি তাঁর একেবারে নিজস্ব রিসার্চ ল্যাব। তাঁর অনুমতি ছাড়া কারোর সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। অরিন্দম অবশ্য আসতে পারে, তাঁর সহকারী হিসেবে। তারা দুজন যে জায়গাটায় বসে এখন কথা বলছেন, সেটা ল্যাবের বাইরে একটা ছোট অফিস। চায়ে একটা হাল্কা চুমুক দিল অরিন্দম। বিস্বাদ লাগলো। তার মাথা এখন শুধু কিভাবে সুদর্শনকে থামানো যায় সেই চিন্তায় মশগুল। তাঁর মতন অর্থলোলুপ মানুষ যে ডেলিভারি ডেট মিস করার ফলে আর্থিক ক্ষতি সহজে মানবেন না, সে কথা জানে অরিন্দম। একটু বাদেই ফিরে এলেন সুদর্শন। বললেন, “একটা এক্সপেরিমেন্ট চলছে ভিতরে। সেটার একটু স্ট্যাটাস চেক করে এলাম। তা কি যেন বলছিলে? কয়েক বছরের মধ্যে সমস্যাটা তৈরী হবে তাই তো?”

“কয়েক বছর নয়, স্যার। সিমুলেশন সিস্টেম বলছে ম্যাক্সিমাম বছর পাঁচেক। আমরা যদি এতটাই শিওর যে আমরা একটা সমাধান পাব, তাহলে আমরা কেন ওদের জানাচ্ছিনা? তারপর সমস্যাটা মিটিয়ে আমরা নতুন করে প্ল্যান করব। সেটআপ যখন রেডি, তখন প্ল্যান করাটাও তো কোন ব্যাপার না। আমি বুঝতে পারছি, আপনি ইন্টেলম্যাক্সের সি ই ও, কিন্তু এমপ্লয়ী হিসেবে আমার নিজেরও কিছু দায়বদ্ধতা আছে। পাশাপাশি বিজ্ঞানী হিসেবেও তো আমরা এথিক্স জলাঞ্জলি দিতে পারিনা। জিওইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই গ্লোবাল ওয়ার্মিং আটকানোর, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমরা যদি, দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে ফেলি, তাহলে লাভ কি?”

“সে কথা তোমাকে ভাবতে হবেনা। আমায় এথিক্স শিখিয়ো না অরিন্দম। তুমি একজন এমপ্লয়ি হিসেবে তোমার কর্তব্য করবে। বাকিটা আমার ওপর ছাড়লেই আমি খুশি হব। এরকম চলতে থাকলে, আমার বোধহয় তোমাকে এ চাকরিতে রাখা সম্ভব হবেনা।”

অরিন্দমের কপালে একটু ভাঁজ দেখা গেলো। চাহনিটা একটু শক্ত। ওর ভিতরে যে একটা বিরক্তি দানা বেঁধেছে, তার খবর দিচ্ছে ওর প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। দু হাত কচলাতে কচলাতে সে বলল, “স্যার আমি ভেবেছিলাম আপনি আপনার সামাজিক দায়বদ্ধতা ভোলেন নি। কিন্তু এখন দেখছি আমার ধারণা ভুল। আমারও আর এ চাকরিতে মন নেই। আমি এমন কাজে নিজেকে ইনভল্ভ করতে চাইনা যা উপকারের নামে পৃথিবীর মানুষের বিরাট ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরী করছে। আমি আজই রেজিগ্নেশন সাবমিট করব স্যার।”

ফোনটা ছেড়ে দুহাতে মাথা চেপে বসে পড়লেন স্বনামধন্য বিজ্ঞানী সুদর্শন বোস। কিছুক্ষণ ওভাবে থাকার পর ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালেন তাঁর সহকারী সুগতর দিকে, বললেন, “তৈরি হয়ে নাও। আজ রাতের ফ্লাইট। জরুরি তলব। ক্যালিফোর্নিয়া পৌঁছাতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কয়েকটা শপিং করতে হবে। আমি তোমায় শপিং লিস্ট শেয়ার করে দেব কিছুক্ষণের মধ্যেই। আর দেরী না করে বেরিয়ে পড়। আর হ্যাঁ, সময় নষ্ট না করে, ড্রাইভ থ্রুতে যেও।”

দু-একবার আমতা আমতা করে সুগত বলে উঠলো, “কিন্তু স্যার এত তাড়াতাড়ি … মানে ফ্লাইটের টিকিট বুক করতে হবে তো।”

“সেসব নিয়ে তোমার মাথা ব্যাথা নেই। ওদের প্রাইভেট জেট আমাদের নিয়ে রওনা দেবে।”

“কি হয়েছে জানতে পারি কি স্যার?”

বিরক্ত হলেন সুদর্শন। তবুও মেজাজ সামলে একটা সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করলেন। হাতটা বোধহয় একটু কাঁপছিল, তাই সিগারেটে অগ্নিসংযোগটা করতে পারলেন না। বিরক্তিতে হাতের সোলার লাইটারটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। সুগত সেটা লুফে নিয়ে ধরিয়ে দিল সিগারেটটা। সুদর্শন একটা লম্বা টানে বুক ভরে ফেললেন। তারপর ধীরে ধীরে অনেকটা ধোঁয়া ছাড়লেন। এবার নিজেকে কিছুটা সামলে নেবার ভাব করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, “বললে কি তুমি বুঝবে পুরোপুরি? যেটুকু জানার, নিশ্চয়ই সময় মতন জানতে পারবে। এখন দেরী কোরোনা। হাতে ঘণ্টা ছয়েক সময় আছে। আমি ঠিক সন্ধ্যে ছটা নাগাদ তোমায় পিকআপ করছি। জিনিসগুলো সব ঠিকঠাক নিয়ে নিও বুঝেছ? আমি ড্রাইভারকে জানিয়ে দিচ্ছি।”

সুগত বুঝতে পারে তাকে চিন্তামুক্ত করার মত তথ্য এখন দেবেননা সুদর্শন। তাছাড়া সমস্ত তথ্য জানলে চিন্তামুক্তির চেয়ে আশঙ্কার মেঘ জমতে পারে কপাল জুড়ে। তাই আর সময় নষ্ট না করে মাথা নেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে।

একটি বিরাট গবেষণা সনহস্থার কর্ণধার সুদর্শন। কম্পানির নাম ইন্টেলম্যাক্স সায়েন্টিফিক ক্রনিকল। পাঁচ বছর আগে একটি কোটি-কোটি ডলার মূল্যের প্রোজেক্ট সফলভাবে ডেলিভার করার পর ইন্টেলম্যাক্স- এর খ্যাতি এখন বিশ্বজোড়া। তবু এই নতুন বিপত্তি তার ঘাড়েই এসে চাপছে। কাজেই যদি এটা প্রমাণ হয়ে যায়, যে এই নতুন উদয় হওয়া সমস্যার জন্ম সেই প্রজেক্টে,তাহলে সব সুনাম মাটিতে মিশে যেতে বিন্দুমাত্রও সময় লাগবেনা। কাজেই তার উদ্দেশ্য এই মুহূর্তে নিজেকে এই সমস্যার দায় থেকে মুক্ত করা।

এই গবেষণাগারটি তার নিজস্ব গবেষণার জন্য। এখানে তার অনুমতি ব্যাতিরেকে,সহকারী সুগত ছাড়া অন্য কারোর প্রবেশাধিকার নেই। সুদর্শনের দুটো গাড়ি তার এই বিরাট ব্যক্তিগত গবেষণাগারে সবসময় থাকে। একটি গাড়ি আপদকালীন ব্যবহারের জন্য। সেটি ড্রাইভার চালায়। যে গাড়ির সাহায্যে সুগত এখন প্রয়োজনীয় কাজগুলো মেটাবে। আর অন্যটি একটি বিলাস বহুল লিমোজিন, তার একান্ত নিজস্ব ব্যবহারের জন্য, ড্রাইভ করেন তিনি নিজেই। ড্রাইভারকে ফোন করে কর্তব্য বুঝিয়ে দিয়ে গুগল হোমে শপিং লিস্ট অ্যাড করে শেয়ার করে দেন সুগতকে। গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতে মানুষের উপস্থিতি বুঝে চালু হয় ফেস স্ক্যানার। গাড়ির দরজা খুলে যায়। গাড়িতে উঠতে বন্ধ হয় দরজা। তারপর সেলফ ড্রাইভ অন করেন তিনি। ড্রাইভ করতে ইচ্ছে করছে না আজ। গাড়ির মাইন্ড রিডার তার কাছে অনুমতি চায় একটা স্ট্রেস রিলিফ মেডিসিন ডিসপেন্স করবার। এই মাইন্ড রিডারের আবিষ্কর্তাও তিনি, ২০৩০ সালে, তাও বছর দুয়েক হয়ে গেলো। মানুষের মস্তিষ্কে তৈরী ইলেক্ট্রিক্যাল সিগ্ন্যাল ট্র্যাক করে মেশিনের কোয়ান্টাম চিপ ইনটেলিজেন্ট প্রেডিকশন জেনারেট করে। তারপর এপ্রুভ্যাল দিলে সেই কাজটি করে ফেলে গাড়িতে থাকা ছোট্ট রোবট। একবার ভেবে নিলেন, তারপর তিনি এপ্রুভাল দিলেন। গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে একটা ছোট ওষুধ বেড়িয়ে এলো। সেটা দু আঙ্গুলে তুলে নিয়ে একটু জল দিয়ে গিলে নিলেন তিনি।

 

বিয়ারের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে সুগতর দিকে তাকালেন সুদর্শন। বিয়ারটা ঢালতে গিয়ে একটু ফেনা হয়ে গেছে, মাথাটা আসলে শান্ত নেই, তাই কাজে কর্মে ভুল হচ্ছে। সুগতও একটু তফাতে নিজের সিটে বসে একটা স্কচে চুমুক দিল। অনেকখানি জার্নি। সাধারনত পুরো পথ অতিক্রম করতে যেকোনো বিমানের ১২ ঘণ্টা লাগলেও এই অত্যাধুনিক প্লেনটিতে সেই পথ অতিক্রান্ত হবে মাত্র ৭ ঘণ্টায়। কি দ্রুত যে এগিয়েছে টেকনোলজি গত কয়েক বছরে, ভাবতে অবাক লাগে। ২০১৯ সালে যখন প্রথম এই প্রজেক্টের শুরুর সময়ে ক্যালিফোর্নিয়া যান, ১৬ ঘণ্টা লেগেছিল দিল্লি থেকে এই পুরো পথটা অতিক্রম করতে। তার ওপর ছিল জেটল্যাগ। এখন অবশ্য জেটল্যাগ কথাটা প্রায় অচল হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে হিউম্যান বডি ক্লকের ভারসাম্য রাখার মেডিকেল থেরাপটিক যন্ত্র, জেটল্যাগ এলিমিনেটর এয়ার ক্র্যাফট সিটে যোগ হওয়ার ফলে।

সুগত এখনও পর্যন্ত কোন প্রশ্ন করেনি। ওর এই বিশেষ স্বভাবটা ভালো লাগে বলেই এতদিন ধরে সুদর্শনের কাছে টিকে গেছে সুগত। ছেলেটি বিজ্ঞানের ছাত্র বলে অল্প স্বল্প কাজ কর্ম বোঝে, সুদর্শনকে সাহায্য করার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট। আগে অবশ্য ধারণা ছিল তার কাজে সাহায্যের জন্য অত্যন্ত কোয়ালিফায়েড এবং অত্যন্ত প্রতিভাবান কাউকে প্রয়োজন। তাই বিজ্ঞানের মেধাবি ছাত্র অরিন্দমকে নিয়েছিলেন সেই বিরাট কাজে সাহায্য করার জন্য, মোটা টাকা মাইনে দিয়ে। কিন্তু ওই যে, অতি চালাকের গলায় দড়ি। নিজের বুদ্ধির জাহির করতে গিয়ে অমন মাইনের চাকরিটা ছাড়তে হল তো? ছেলেটার ওপর ঈর্ষা একটু হত সুদর্শনের। তাই, ভেবে চিনতেই ঠিক করেছিলেন ওকে তাড়াবেন। একদিন সে নিজেই পথ পরিষ্কার করে দিল। আজ অবশ্য তার কথা যে একটু মনে হচ্ছেনা তা নয়। আজকের এ ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল বটে ছেলেটা। কিন্তু তা যে এই তিন বছরের মধ্যেই মিলে যাবে, সে কথা স্বপ্নেও ভাবেননি সুদর্শন। সিমুলেশনের কথামতন পাঁচ বছর পরে ঘটনাটা ঘটলে কোন সমস্যাই হতনা আর। নিজেকেই আনমনে একটা ধমক দিলেন এবার। এসব কি ভাবছেন তিনি? কিছুতেই তার কাজের ফল হতে পারেনা আজকের এই সংকট। আমেরিকায় তার পার্টনার ফার্ম তাকে ফাঁসানোর চেষ্টাতেই নির্ঘাত এটা করছে। টাকা পয়সা নিয়ে একটা ঝঞ্ঝাট তো শুরু থেকেই ছিল। এখন আর ওদের সাথে কাজ করেননা তিনি। কিন্তু ওই প্রজেক্টের কনট্র্যাক্ট অনুযায়ী, এখনো তিনি ওদের সাহায্য করতে চুক্তিবদ্ধ।

ঘণ্টা খানেক পর সুগতর দিকে তাকিয়ে ওর নাম ধরে ডাকলেন সুদর্শন, তারপর নিজের কাছে বসতে বললেন। ধীরে ধীরে কিছু কথা আসলে ওকে বলে রাখা প্রয়োজন। তিনি বললেন,

“ক্যালিফোর্নিয়ার একটা অংশের আকাশ জুড়ে কালো ধোঁয়া ভরে গেছে। যদি এস এফ ও সিটি থেকে শুরু কর হাইওয়ে ইউ এস ওয়ান ধরে এগিয়ে যাও, প্রশান্ত মহাসাগরের একেবারে নৈসর্গিক ভিউ পাবে। সেখানে একটা অংশে শহর থেকে অনেকটা দূরে কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে জমতে শুরু করেছে ঘন কালো মেঘ। সেই মেঘের পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। এরপর যে তা দ্রুত শহরে ছড়িয়ে পড়বেনা তা হলফ করে বলা যায়না। দু একটা বোটে করে একটা টিম তার কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করেছে বটে। কিন্তু এতটাই অন্ধকারের সৃষ্টি হয়েছে যে তার সামনে পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাছাড়া যে জায়গায় মেঘটা দেখা গেছে, তার আশে পাশের জল ফেনায় ভরে উঠেছে। তার ওপর ভেসে উঠেছে অসংখ্য মরা সামুদ্রিক প্রাণী। সেই কারণেই এই জরুরি তলব।”

“ওদের কি ধারণা আপনার কাজের জন্যই হয়েছে এটা?”

“সেরকম একটা কথাই উঠেছে। কারণ, যে জায়গায় অপারেশনটা চালানো হয়েছিল আজকের ঘটনার সূত্রপাত তার আশে পাশের অঞ্চলেই। তবে আমার মনে হয় আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে কেউ।”

“তবু আমরা কি কিছু করতে পারব এরকম হুট করে?”

“জানা নেই। গিয়ে আগে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হবে। আর আমেরিকা ওরকম সুযোগ পেলেই অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে ব্যস্ত। কি থেকে কি হয়েছে তার নেই ঠিক।”

“আপনার অপারেশনের থেকে কি এমনটা হবার কথা?”

“আমার তো মনে হয়না। আমার একার তো ডিসিশন ছিলনা এটা? ওরা অনেক দেখে শুনে রাজি হয়েছে বলেই না আমি এ কাজের ভার নিয়েছিলাম। এরা যেহেতু টাকা দিয়েছে, ভাবছে মাথা কিনে নিয়েছে। এখানে কোন একটা ষড়যন্ত্রও থাকতে পারে। আর পাঁচদিন বাদে আমাদের কম্পানির দেওয়া ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষ হবার কথা। আর আজকেই এই বিপত্তি কি খুব স্বাভাবিক ঘটনা মনে হয়? আমি আমাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের মধ্যে থেকে দুজনকে আর অন্য দুজন জুনিওর সায়েন্টিস্টকে রওনা দিতে বলেছি। ওরা আগামীকাল পৌঁছাবে ক্যাথে প্যাসিফিকের ফ্লাইটে। মিটিংয়ে তুমি খালি শুনবে আর নোট করে রাখবে। কিছু বলার থাকলে বা প্রশ্ন করার থাকলে আমায় পরে জিজ্ঞাসা কোরো।”

“কিন্তু স্যার আপনার অপারেশনটা কি ছিল সেটা যদি একবার বুঝিয়ে বলতেন, বা আজকের ঘটনার সাথেই বা কিভাবে সেটা জড়িত? মানে যদি কোন সাহায্য করতে পারি আর কি।”

“হুম সঙ্গে এসেছ যখন কিছুটা তোমায় বলা দরকার। দেখি চেষ্টা করে সহজ কথায় যদি বোঝাতে পারি।”

 

ক্যালিফোর্নিয়া পৌঁছে চতুর্দিকের মানুষকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সুদর্শন হঠাৎ পৌঁছে গিয়েছেন দু হাজার কুড়ি সালে। সে বছর কোভিড ১৯ নামক এক অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসের প্রকোপ থেকে বাঁচতে মুখে মাস্ক পরতে হত সকলকে। আজ যেন ঠিক সেরকম কিছু ঘটেছে। এয়ারপোর্টে ক্রমাগত এনাউন্স করা হচ্ছে যে, সেখান থেকে ১৫০ মাইল দূরে কোন এক বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি দেখা গেছে আকাশ জুড়ে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এই মুহূর্তে তেমন কোন রিস্ক স্যান ফ্র্যান্সিস্কো শহরে না থাকলেও মানুষকে কিছু প্রিকশন নিতে বলা হচ্ছে। তার মধ্যে একটি হল মুখে মাস্ক পরা, যাতে নাক, মুখ ঢাকা থাকে। ওদিকের রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছ। হাইওয়ে ইউ এস ওয়ান এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ। একান্ত এমারজেন্সি যাদের রয়েছে তাদের বলা হচ্ছে অন্য রুট ব্যবহার করতে। ওখানকার ১০০ মাইল পরিধির মধ্যে থাকা সমস্ত লোকজনকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

স্যান ফ্র্যান্সিস্কো সুদর্শনের চিরকালই খুব পছন্দের একটা শহর। আজ অবশ্য শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে ঢোকবার প্রয়োজন হবেনা। এই অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়ি শহরটার একটা তীব্র আকর্ষণ আছে, যার টানে বারে বারে এখানে ফিরে আসতে চান তিনি, এয়ারপোর্টে নামলেই মন হয়ে ওঠে উৎফুল্ল। কিন্তু আজকের দিনটা ঠিক সেরকম নয়, মুখে যতই বলুন না কেন মন থেকে বিশ্বাসটা এখনও জন্মাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোথাও একটা গোলমাল হয়ে রয়েছে, আর তাকে তার মাশুল দিতে হবে। তাছাড়া এমনটা যে হতেই পারে সেকথা তো বলেইছিল অরিন্দম। এয়ারপোর্টের গেটের সামনে তার নাম লেখা একটা ট্যাগ দেখে একটা লোকের দিকে এগিয়ে গেলো সুদর্শন। আলাপ পর্ব সারা হল। দুজন একসাথে এসেছে ওদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাবার জন্যে। একজনের নাম জেমস এবং অন্যজন ত্রেভর। একটা বি এম ডব্লিউর বিলাস বহুল গাড়িতে ওদের যাত্রা শুরু হল। গাড়িতে খুব একটা কথাবার্তা হচ্ছেনা। সবাই চুপ চাপ। আমেরিকান দুজন সামনে বসেছেন। সুদর্শন আর সুগত পেছনে। ওদের থেকে জানা গেলো ওরা দুজনেই সুদর্শনের পার্টনার কোম্পানি কসমস টেকনোলজির চাকুরে। এয়ারপোর্ট থেকে বেরনোর চল্লিশ মিনিট পরে ওদের গাড়ীটা গোল্ডেন গেট ব্রিজে উঠল। স্যান ফ্র্যান্সিস্কো বে-এর ওপর দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। সুদর্শনের অন্যতম প্রিয় এই শহর, এই ব্রিজ। কিন্তু আজ যেন সেই মুগ্ধতা যেটা সে বার বার টের পায়, বহুবার দেখবার পরেও, প্রাণে ফিরে ফিরে আসে একটা রোমাঞ্চ, তা আজ যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। বরং সেই ধোঁয়ার চেহারাটা দেখার অপেক্ষায় যেন মন বেশি আকূল। যতই টের পাওয়া যাচ্ছে একটা ঝামেলা ঘটেছে, মন যেন সান্ত্বনা খুঁজছে এই বলে যে, নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে।

সুগতর অবস্থা ঠিক উল্টো। তার প্রথমবার আমেরিকার মাটিতে পা। ভাগ্যিস ভিসাটা করানো ছিল, অন্য একটা কাজে সামনের মাসে নিউ ইয়র্ক যাবার কথা ছিল বলে। এয়ারপোর্ট নেমে থেকে যা যা চতুর্দিক ভরিয়ে রেখেছে সবই যেন তার মন ভরিয়ে দিচ্ছে। কতগুলো স্বপ্নপুরণ। তার মতন ছাপোষা একটা ছেলে এমন একটা প্রাইভেট জেটে চড়ে, বি এম ডব্লিউ চেপে তার স্বপ্নের শহরে। দুপাশে দেখা যাচ্ছে কতগুলো উঁচু উঁচু বাড়ি। তবে এখানে নিউ ইয়র্কের মতন অমন উঁচু বাড়ি বানানো হয়না ভুমিকম্পের ভয়ে। গোল্ডেন গেট ব্রিজটা শুধু ছবিতেই দেখেছে সে। ব্রিজের ওপর দিকটা কেমন যেন মেঘে ঢাকা। সে শুনেছে এটাই নাকি এই ব্রিজটার বৈশিষ্ট। তার মন এখন কোথায় কি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে তা ভাবতেই পারছে না। শুধু দুপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে ইচ্ছে করছে। ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছে করছে অঞ্জনা ম্যাডাম, মানে সুদর্শন স্যারের স্ত্রীকে। উনি না থাকলে এর কিছুই সম্ভব হত না। সুগতর কলেজে গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে লেকচার দিতে আসতেন তিনি। সুগতকে খুব পছন্দ করতেন ওর মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহের জন্য। উনিই এই চাকরিটার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শুধু বলেছিলেন এই চাকরিতে টিকে থাকার উপায় বোকা সেজে থাকা। সেই কারণেই সুগতর সব বুঝে, সব জেনেও বোকা সেজে থাকে। তারপর অবশ্য স্যার আর ম্যাডামের সেপারেশন হয়ে গেলো। আলাদা থাকলেও ওরা ডিভোর্স নেননি। সুগত ভালোই জানে সুদর্শন স্যারের সাথে ওনার স্ত্রী কেন, কোন মানুষেরই থাকা সম্ভব নয়। এত ইগো খুব কম মানুষেরই দেখেছে সুগত। তবে কিনা চোখ কান খোলা রাখলে অনেক কিছুই শেখা যায় ওই ল্যাবরেটরিতে। মনে মনে একটু হাসল সুগত। অমন বুদ্ধিমান লোকটাও তার নাটক আজ অবধি টের পেলেন না, তার বোধহয় অভিনয় লাইনেই উন্নতি বাধা ছিল। উনি ভাবছেন সুগত কিছু জানেনা আজকের ঘটনা নিয়ে। ম্যাডামের সাথে যে নিয়মিত আলোচনা চলে এবং আসার আগেই এই আলোচনাটা সুগত সেরে নিয়েছে সে নিয়ে স্যারের কোনদিনই সন্দেহ হলনা।

পাহাড়ে উঠছে গাড়ীটা। এটাই তাহলে হাইওয়ে ইউ এস ওয়ান। ইন্টারনেট যে ছবি দেখিয়েছে তার সাথে একেবারে মিলে যাচ্ছে যে। একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে তার বিরাট ব্যাপ্তি নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর। পার্থক্য শুধু জলের রঙটা আজ নীলের বদলে একটু কালচে। আকাশে কালো মেঘের জন্য, নাকি যে ধোঁয়ার কথা শোনা যাচ্ছে তার প্রকোপটাও প্রকট হয়ে উঠেছে?

বেশ খানিক্ষণ এই সিনিক রাস্তা ধরে চলতে চলতে বেশ বিভোর হয়ে উঠেছিল সুগত। যতটা সম্ভব উপভোগ করার চেষ্টা করছিল দুপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য। ওর ঘোর ভেঙ্গে দিয়ে, হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসা জেমস, “হোয়াট দা হেল!” নিমেষে সুদর্শন আর সুগতর চোখ অনুসরণ করল জেমসের চোখকে। ত্রেভর গাড়িটাকে সাথে সাথে পার্ক করে দিল। এই রাস্তায় যেখানে সেখানে পার্ক করা না গেলেও এখান থেকে ভালো ভিউ পাওয়া যায় বলে একটা পারকিংয়ের জায়গা করা আছে। ওদের সবার চোখেই বিস্ময়। ওরা এগিয়ে গিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকাল। রাস্তা থেকে সমুদ্রের দিকে একটা রেলিং লাগানো রয়েছে। সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের বিস্তৃত জলরাশি। সাগরতীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বোল্ডার ঠেলে আছড়ে পড়ছে দানবীয় জলোচ্ছ্বাস। আর তার সামনে চকচকে গায়ে যেন শুয়ে রয়েছে কয়েকটা প্রাণী। পর পর, সংখ্যায় কয়েকশো। কিন্তু তারা সবাই মৃত। জেমসের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এলো, “অল দিজ সি লায়ন্স আর ডেড।”

থরে থরে বোল্ডারের ওপর সি লায়নের মৃতদেহ যে কোন অভিশাপের বার্তা বহন করে আনছে বুঝতে পারেনা সুগত। ত্রেভর জানায়, সকাল থেকে সি লায়ন ছাড়াও অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃতদেহ ভেসে উঠছে এই রাস্তার ধার জুড়ে, সমুদ্রের পারে পারে। হঠাৎ বিষাক্ত হয়ে ওঠা সমুদ্রের জলে তাদের বাসস্থান বিপন্ন। তাই তারা এগিয়ে আসছে পারের দিকে, জীবন রক্ষার তাগিদে। তবু হচ্ছেনা শেষ রক্ষা, ভয়ঙ্কর মৃত্যু সঙ্গী হচ্ছে তাদের। তার থেকেও আতঙ্কগ্রস্ত করেছে ওদের অন্য আরেকটা সম্ভাবনা। তা হল, সেই বিষ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে শহরের দিকে। দু ঘণ্টা আগে যেখানে সি লায়নের মৃতদেহ ভেসে উঠতে দেখা গেছিল, তা হল এখান থেকে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে। কিন্তু এই কিছুটা সময়ের মধ্যেই যেরকম দ্রুত গতিতে তা শহরের পথে ধাবিত হচ্ছে, তাতে কতক্ষণ আর এই বিভীষিকা শহরবাসীর থেকে দূরে থাকবে? সে সম্পর্কে মোটেই খুব আশাবাদী নয় ত্রেভর আর জেমস।

ওরা আবার চলতে থাকে। প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরে সান্তাক্রুজ শহরের কাছাকাছি ওরা যখন পৌঁছায় তখন কালো ধোঁয়ার আড়ালে ঢেকে গেছে এই বিচ সিটি। যে জায়গাটা অন্য সময় ছবির মতন সুন্দর, এখন তার দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। ওদের সবার মুখেই ফেস শিল্ড। এখানে পরিস্থিতি একবার দেখে নিয়ে ওদের ফিরে যাবার কথা এস এফ ও তে, কসমস এর অফিসে। সেখানে পরিস্থিতির মোকাবিলায় বসেছে বিশেষ বোর্ড। সুদর্শন আর সুগত সেখানেই গিয়ে পৌঁছাবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সান্তাক্রুজ ছেড়ে বেড়িয়ে যাবার নির্দেশ। যতটা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়েও খানিকটা দ্রুত এগোচ্ছে কালো ধোঁয়া। তার মধ্যে যে ভয়ঙ্কর খবরটা এসেছে তা হল, এই কালো ধোঁয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড শুধু আছে তা নয়। এর সাথে মিশে রয়েছে বিপুল পরিমাণে কার্বন মনোক্সাইড। এমনকি কিছু মৃত সামুদ্রিক প্রাণীকে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। ফল বলছে, কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গিয়ে অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু তাদের হয়নি। বরং শরীরে অনেকখানি কার্বন মনোক্সাইডের বিষক্রিয়াই তাদের এই অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী।

 

হোটেলের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটে একটা টান দিল সুগত। একটু আগে ম্যাডামের ফোনটা এসেছিল। তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়াতে। একথা কেবলমাত্র সুগতই জানে। ম্যাডামের সাথে কথা বলার জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে তার কাছে। সুগতর চশমাটা যে সাধারণ চশমা নয়, তা স্যারের জানা নেই। এর মধ্যে যে সেন্সর আছে তা একমাত্র পঞ্চাশ ফুট দূরত্বের মধ্যে কেউ না থাকলেই এম্বেডেড ফোন সিস্টেমটাকে অন করে। আরেকটা উপায় অবশ্য নিজে থেকে অন করা। যেমন সে এখন করেছে বদ্ধ ঘরে। তবে সেক্ষেত্রেও দশ ফুটের মধ্যে কেউ চলে এলে আবার সে আপনা আপনি অফ হয়ে যায়। তার এই চরবৃত্তি সম্পর্কে স্যারের জানবার কোন উপায় নেই। অবশ্য ম্যাডাম যে ঠিক কি করতে চাইছেন, বা ক্যালিফোর্নিয়া এসে এই শহরের বদলে লস এঞ্জেলেসে কেন রয়েছেন সে প্রশ্নের উত্তর সুগতরও অজানা। অনধিকার চর্চা হবে বলে সে জিজ্ঞাসা না করলেও ম্যাডাম বলে রেখেছেন সময় মতন সে সবই জানতে পারবে।

জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ সুগত। এখান থেকে শহরটা দেখা যায়। সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে গোল্ডেন গেট ব্রিজ। এখন সন্ধ্যে নেমেছে বলে ব্রিজের ওপর জ্বলছে আলো। আশেপাশে বাড়িগুলোও আলো ঝলমলে একটা স্কাইলাইন তৈরি করেছে। সামনে আরেকটা ব্রিজ ঠিক এই হোটেলের দিকে মুখ করে। তার ওপর একদিকে হলুদ আর অন্যদিকে লালের সরল রেখা এক অনন্য সাধারণ দৃশ্য তৈরি করেছে। গাড়িগুলো লেন ধরে চলছে বলেই সামনের দিকে মুখ করা গাড়ির হলুদ আলো আর পিছন দিকে মুখ করা গাড়িগুলোর লাল আলো এমন সাজানো গোছান হয়ে উঠেছে। মানুষ সাধারণত যে সৌন্দর্য দেখে বা দেখতে চায় তার বাইরেও যে কত কি থাকে তার ইয়েত্তা নেই। এই যেমন এ দেশে এসে থেকে রাস্তা দেখে তার বারবার মনে হচ্ছে এত সুন্দর রাস্তার জন্যেই যেন সৌন্দর্যগুলো আরো উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। হুইস্কিতে একটা চুমুক দিল সুগত। হুইস্কি যত মাথায় ঝিম ভাব তৈরি করছে, ওর চোখে এই শহর ততই যেন নৈসর্গিক হয়ে ধরা দিচ্ছে।

আজ কসমসের অফিসে তার কাজ ছিল কেবল নোট করে যাওয়া। ওরা স্যারের ওপর ঘটনার দায় চাপিয়ে সলিউশনের দাবি করছে। বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড সরানোর চেষ্টা চললেও তার উৎপত্তি বন্ধ করতে না পারলে কি হবে কেউ বলতে পারেনা। নতুন করে কোস্টাল এরিয়াতে মরা মাছ আর সি লাওনের মৃতদেহের মেলা দেখা গেছে। কালো ধোঁয়া আর শহরের দিকে না এগোলেও আগামি দু একদিনে অনেক কিছুই হতে পারে। ম্যাডামের কাছে কিছুটা আর স্যারের কাছে কিছুটা শুনে পুরো ঘটনাটার একটা আঁচ এতক্ষণে পেয়েছে সুগত।

ঘটনার বীজ নিহিত ২০১৫ সালে হওয়া প্যারিসের গ্লোবাল মিট, যেখানে পৃথিবী জুড়ে বেড়ে চলা কার্বন ফুট প্রিন্ট কমানোর জন্য গ্রহণ করা কর্মসূচীর অন্যতম ছিল জিওইঞ্জিনিয়ারিং। প্রথমেই এই কর্মসূচীতে যে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা শুরু হয় তা হল কিভাবে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কমানো যায়। পৃথিবীর মানুষের কার্বন ব্যবহারের মাত্রা বহুবছর চেষ্টা করেও যে বিরাট কিছু কমিয়ে ফেলা গেছে তা নয়। তাছাড়া এই মুহূর্তে টেকনোলজি যে উচ্চতায় পৌঁছেছে সেই অবস্থা থেকে তার গতি রুদ্ধ করার কোন পথ নেই। অতএব ভাবা হতে লাগল অন্য রাস্তা। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকেই যদি ফেরত পাঠানো যায় তবে কেমন হয়? তাহলে তো আর নতুন করে সে বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করতে পারবেনা। তাতে কি কোন লাভ হবেনা? ঠিক এমনি করেই তো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর ঠাণ্ডা হয় সেই অঞ্চলের বায়ুমণ্ডল। আর সেই শৈত্যের জন্য দায়ী ভল্কানিক এশ -এ থাকা সালফার। অতএব ভাবা হল কৃত্রিম উপায়ে একটা বেলুনের সাহায্যে অথবা এয়ার ক্র্যাফটের সাহায্যে পৃথিবী সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলের স্তরে ইঞ্জেক্ট করে দেওয়া হবে সালফার ডাই অক্সাইড। তৈরি হল কম্পিউটার সিমুলেশন। এত বড় ঘটনা ঘটানোর আগে ভরসা করা হল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যুক্ত কম্পিউটার মডেলের ওপর। বাধ সাধল এক বৈজ্ঞানিক গোষ্ঠী। তারা অন্য এক সিমুলেশন চালিয়ে দেখিয়ে দিলেন, এর ফলে পৃথিবীর আবহাওয়ার স্বাভাবিক গতিবিধি ব্যাহত হবে। যদি উত্তর গোলার্ধে করা হয় এ কাজ তাহলে উত্তর আটলান্টিকে হয়তো ঝড় ঝাপটা কমবে। সেটা যেমন আমেরিকা মহাদেশের জন্য ভালো হবে, তেমনি ক্ষতিকারক হবে আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য। সেই দেশগুলো হয়তো বিপুল খরার কবলে পড়বে। তাছাড়া এমন কৃত্রিম উপায় আর চলতে পারেই বা কতদিন। একদিন হঠাৎ করে যেদিন সালফার ডাই অক্সাইড বাতাসে ছড়ান বন্ধ হয়ে যাবে, তখন আবার হুট করে পৃথিবীর তাপমাত্রা এক ধাক্কায় হয়তো বেড়ে যাবে অনেকখানি। আর তার কি ফল হতে পারে তাই বা কে জানে? অতএব এইভাবে সূর্যের তাপ যতই আমরা আটকে দিইনা কেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা কমানো হচ্ছে আখেরে লাভ হবেনা কোনই। অতএব সেখানে অন্য কোন সমাধান সূত্র খোঁজা প্রয়োজন। আর ঠিক এই ব্যাপারেই কাজ করেছেন সুদর্শন স্যার তার কোম্পানি মারফত।

সমুদ্রের তলদেশে থাকে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা একধরণের অতি ক্ষুদ্র গাছ ; সেগুলো খেয়ে বেঁচে থাকে অনেক সামুদ্রিক প্রাণী। এই গাছগুলোর কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা প্রচণ্ড। তাই এই ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন – এর মাত্রা যদি অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয় তাহলে কার্বন ডাই অক্সাইডের শোষণ মাত্রাও বেড়ে যাবে বিপুল পরিমাণে। এইভাবে বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু কিভাবে বাড়ানো সম্ভব এদের সংখ্যা? গবেষণায় দেখা গেলো সমুদ্রের তলদেশে যদি কৃত্রিম উপায়ে আয়রনের মাত্রা বাড়ানো যায়, তাহলে তা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন – এর বংশবৃদ্ধি ঘটাবে। অতএব সেটার জন্য শুরু হল প্রস্তুতি। আর ঠিক এখানেই কসমস কম্পানির সাথে একত্র হয়ে বাধ সাধলেন সুদর্শন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন যে, এই প্ল্যাঙ্কটনরা সারাজীবন বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করলেও সমস্ত শোষিত গ্যাস অক্সিজেন তৈরী করে শেষ হয়ে যায়না। তাই এদের মৃত্যুর পর খানিকটা ফিরে আসে পরিবেশেই। তাই প্ল্যাঙ্কটনের মাত্রা বাড়লে তাদের দেহাবশেষে ক্ষতিকারক গ্যাসের পরিমাণও বাড়বে। তাছাড়া অতিরিক্ত আয়রন সমুদ্রের জলে কৃত্রিম উপায়ে মেশালে সামুদ্রিক প্রানীর ক্ষতির সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায়না। তবে কিনা সমস্যা যেমন তিনি তৈরী করেছিলেন, তার সমাধানও বাতলে দিয়েছিলেন তিনি। তার তত্ত্বাবধানে আয়রনের বদলে তৈরি হয় সমগুণ সম্পন্ন আরেক রকমের উপাদান, তার সাথে সাথে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে প্ল্যাঙ্কটনের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে তৈরি হল এক নতুন ধরনের প্ল্যাঙ্কটন। আর সুদর্শন স্মল স্কেল পরীক্ষায় তার এই তত্ত্ব প্রমাণ করে ছাড়পত্র পেয়ে গেলেন প্রশান্ত মহাদেশের তলদেশে তার তৈরী প্ল্যাঙ্কটন তাদের বংশবৃদ্ধির ওষুধ সহ এক স্পেস্যাল সাবমেরিনের সাহায্যে ছড়িয়ে দেওয়ার। তবে আজ যে ঘটনা ঘটল তার আঁচ আগে পাওয়া যায়নি বলাটা ভুল হবে। অরিন্দম পেয়েছিল সেই আঁচ আর ঠিক সেই কথা বলতে গিয়েই তাকে চাকরি খোয়াতে হয়। অরিন্দমের বানানো এক সিমুলেশনে দেখা গেছিলো পাঁচ বছর পর এই প্ল্যাঙ্কটনগুলো আবার নতুন করে তৈরী করবে কার্বন ডাই অক্সাইড। শুধু তাই নয়, এরা হয়তো তৈরী করবে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস, যা আসবে তাদের জীনগত পরিবর্তনের ফলস্বরুপ। সেকথা সে জানায় সুদর্শনকে, বাধা দেয় কাজে। তবে সুদর্শন মানতে চান না। তাঁর দাবী ছিল, অতদিন পর যে ঘটনা ঘটবে সে কথা ভেবে বর্তমানে গ্রীন হাউস গ্যাস কমানোর চেষ্টা না করা বোকামি। অরিন্দম এটাও নাকি বলেছিল, যদি সিমুলেশনের ভবিষ্যৎবাণী যে সময়ের কথা বলছে, তার আগেই যদি ঘটে যায় সেই ঘটনা? মানেন নি সুদর্শন। অরিন্দম তাঁকে লুকিয়ে এ কথা জানিয়েছিল কসমসকে। কিন্তু তারাও ওকে পাত্তা দেয়নি। এইসব কথা ম্যাডামের থেকেই শুনেছে সুগত।

আজ কসমসের অফিসে অবশ্য সুদর্শন কিছুতেই মানতে চাননি যে তার অপারেশনের ফলস্বরূপ কার্বন ডাই অক্সাইড আর কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা এভাবে হঠাৎ বেড়ে গেছে প্রশান্ত মহাসাগরের ওই অংশে। যদিও যে জায়গায় প্ল্যাঙ্কটনের মাত্রা বাড়ানো হয়েছিল সেই অংশেই ঘটনা ঘটায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন তিনি। তবে তার বক্তব্য কেউ নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র করে এ কাজ করেছে তাকে ফাঁসাতে।

এমনিভাবেই নানা কথা ভাবছিল সুগত জানলা দিয়ে স্বপ্নের শহরের সৌন্দর্য দু চোখ ভরে উপভোগ করতে করতে। এমন সময়, তার দৃষ্টি কাড়ল অন্য কিছু। আকাশের রঙটা হুট করে কেমন যেন পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। তার কি একটু বেশি নেশা হয়ে গেছে? তাই সে ভুল দেখছে? সে একবার চোখ বুজে আরেকবার খুলল। না চোখের সামনে যা দেখছে তা ইলিউশন বলে মনে হচ্ছেনা। শহরের ওপর দানা বাঁধছে যেন একটা ধোঁয়াশা। প্রথমে তার মনে হল শহরকে গ্রাস করতে শুরু করেছে সেই বিষাক্ত ধোঁয়া। কিন্তু এই ধোঁয়ার রঙটা যেন একটু অন্য রকম। ঠিক ওরকম কালো নয়। একটু যেন উজ্জ্বল। যদিও আকাশ অন্ধকার, তবে এই নতুন তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা ছুঁয়েছে শহরের উঁচু বাড়িগুলোর মাথা। আর সেই আলোয় একটা লালচে রঙ কি ফুটে উঠছেনা? তাহলে এই নতুন ধোঁয়ার উৎস কোথায়? তাহলে কি স্যারের কথার একটু হলেও সত্যতা আছে? অন্য কোন একটা অভিসন্ধির আঁচ পাওয়া যাচ্ছে? মূল ঘটনার আর কিছু অজানা আছে এখনও? ঠিক তখনি ধোঁয়া ঠেলে বেড়িয়ে এলো একটা তীব্র আলো। আর সেই আলো ভেদ করে তীব্র গতিতে বেড়িয়ে আসছে কিছু একটা। ঠিক প্লেন নয়। বেশ বড় দেখাচ্ছে জিনিসটাকে। কি ওটা? এত নিচ দিয়ে আকাশ বেয়ে উড়ে চলেছে? এমন জিনিস সামনে দেখেনি সুগত এর আগে। কিন্তু আকারটা যেন কেমন চেনা ঠেকছে? অকস্মাৎ নিজের অজান্তে কেঁপে উঠল সুগতর ঠোঁটদুটো, আর তার নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বেড়িয়ে এলো একটা শব্দ অস্ফুটে – “ইউ এফ ও।” সেই মুহূর্তে তীব্র গতিতে তার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো বস্তুটা।

 

আগের রাতে আকাশে ওর চোখের সামনে ঘটা ঘটনাগুলো দেখতে দেখতেই ক্লান্ত শরীর কখন যেন নরম বিছানায় এলিয়ে দিয়েছিল সুগত। পরদিন সকাল সকাল দরজা কেউ নক করায় ঘুম ভেঙ্গেছিল তার। চোখ মেলতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল, আগের দিন রাতের অতিরিক্ত পানীয়র ধকলের যত ভার বোধহয় চোখদুটোর ওপরেই ন্যাস্ত হয়েছে। কোনরকমে উঠে দরজাটা খুলল সে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সুদর্শন। তাঁর চোখে মুখে উত্তেজনার প্রকাশ। সুগত বলল, “ঘরে আসুন স্যার।”

“না ঘরে আসবনা। ফোন তুলছ না কেন? বেরোতে হবে এখুনি। সান্তাক্রুজ যেতে হবে আবার। কাল রাতে শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে ধোঁয়া। আজ সকাল থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সেই ধোঁয়ার রঙ লাল। তাছাড়া এই মাত্র সান্তাক্রুজ থেকে খবর এসেছে হঠাৎ- ই সেখানের কালো ধোঁয়া উধাও হয়ে গিয়েছে এক রাতের মধ্যে। কিন্তু সারা আকাশ জুড়ে ছেয়ে রয়েছে লাল রঙের ধোঁয়া। শুধু কি তাই? সমুদ্রের জল নাকি রক্তের মতন লাল হয়ে গেছে। এই নতুন ধোঁয়া আপাতভাবে বিষাক্ত বলে মনে হচ্ছেনা। তবে কিনা পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে এঁর আসল রূপটা কি। রেডি হয়ে নাও। আর ফোনটা ওরকমভাবে ফেলে রেখোনা। দরকারের সময় না পেলে আমার মেজাজ ঠিক থাকে না। আমরা ঠিক আধ ঘণ্টার মধ্যে রওনা দেব। আমি তোমায় আগেই বলেছিলাম না এ অন্য কোন ষড়যন্ত্র? “

সুগতকে এই কথা বলে পিছন ফিরলেন তিনি। কোন উত্তর পাবার প্রত্যাশা নেই তাঁর। হঠাৎ আবার সুগতর দিকে ফিরলেন সুদর্শন। মুখে হাসি। সুগত কলকাতা থেকে এই পর্যন্ত, দু দিনে এই প্রথমবার হাসতে দেখলেন সুদর্শনকে। সুদর্শন তেমন হাসি মুখেই কৌতুকের ভঙ্গিতে বললেন, “আর বল কেন? আমেরিকানদের এলিয়েন রোগ আর কাটবেনা কোনোদিন। জীবনটাকে এরা সিনেমা ভাবে বুঝলে? এই সঙ্কটের মধ্যে কিছু লোক দাবি করে বসেছে কাল রাতে নাকি তারা এখানে ইউ এফ ও দেখেছে। আর তাই সবার ধারণা এটা কোন এলিয়েন এটাক। যাক আমি যে কিছু করিনি, এটা বুঝেছে এই অনেক।”

সুদর্শনের কৌতুকে হাল্কা হেসেছিল বটে সুগত। কিন্তু নিজের মনে ব্যাপারটাকে শুধু গুজব বলে মানা যে তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে তো অবিশ্বাস করতে হয় নিজের চোখকে। সে আর অতকিছু না ভেবে তৈরি হয়ে নিল। মিনিট কুড়ি লাগল তার তৈরি হতে। সে অপেক্ষা করতে লাগল কখন ডাক আসে। আরও প্রায় পনেরো মিনিট পর বেজে উঠল ফোনটা। এবারে দুটো রিং হতেই হাতে নিল সে ফোনটা। তারপর সুদর্শনের নাম দেখতে পেয়েই একসেপ্ট বাটন টাচ করল। অন্য প্রান্ত থেকে সুদর্শনের গলা ভেসে এলো, “সুগত তোমায় আর যেতে হবেনা। লাল ধোঁয়াটা কোন ক্ষতিকারক কিছু নয়। ওর মধ্যে একটা এমন কোনো কম্পাউন্ডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে যা এখনো অচেনা। তবে কিনা তাতে আয়রনের আধিক্য থাকায় এর রং এমন লাল। আর সেই পদার্থই এখন পাওয়া গেছে সমুদ্রের জলে। তার চেয়েও যেটা অদ্ভুত তা হলো বাতাসে আর সেই কার্বন ডাই অক্সাইড বা কার্বন মনোক্সাইডের আধিক্য পাওয়া যাচ্ছেনা। এমনকি সমুদ্রের জলেও নয়। অর্থাৎ এ জিনিস যেখান থেকেই ছড়ানো হয়ে থাকুক না কেন কেউ আমাদের উপকারই হয়তো করেছে। তবে এদের ধারণা উপকারী এলিয়েনের উৎপত্তি হয়েছে যারা নাকি পৃথিবীকে বাঁচাতে চায়। যাক ছেড়ে দাও সেসব গুজবের কথা। এখনো অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা বাকি। এখনই পুরোপুরি কোনো নতুন অঘটনের সম্ভাবনা কে উড়িয়ে দেবার মতন ইম্প্র্যাক্টিকাল নই আমি। আমাকে কসমসের ল্যাবে যেতে হবে। ওখানে এই নতুন জলের স্যাম্পল পরীক্ষা হবে। আমি তোমায় নিয়ে যেতেই চাইছিলাম, কিন্তু এরা আর কোনো লোককে সেখানে এন্ট্রি দিতে চায়না। তুমি বরং শহরটা ঘুরে ফিরে দেখে নাও। গাড়ি চালাতে কম্ফোর্টেবল হলে একটা রেন্ট করে নিতে পারো। হোটেলের পাশেই কার রেন্টাল আছে। আমি না হয় রিইমবার্স করে দেব।”

সুদর্শন ফোনটা কেটে দিতেই ল্যাপটপটা নিয়ে বসে পড়ল সুগত। শহরটা একটু ঘুরে দেখে নিলে মন্দ কি? আর আপাতত বিপদ যখন কেটেই গেছে। তবে ড্রাইভ করতে সে খুব একটা ভরসা পাচ্ছেনা। একে বিদেশ, তার ওপর এখানে আবার গাড়ি চালানোর ব্যাবস্থা তার স্বদেশের ঠিক উল্টো। তাছাড়া এখানে সবকিছুতেই নিয়মের যে কড়াকড়ি? সে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এর খোঁজ খবর জোগাড় করতে লাগল। ক্যাব নেওয়াই যায়। তবে এদেশের বাস ট্রেন গুলো একটু চড়ে নিতেও ইচ্ছে করছে।

হোটেলের ক্যাব সারভিস আছে। ওরা সামনের ট্রেন স্টেশন অবধি ছেড়ে দেবে। তাই সেই পন্থা অবলম্বন করেই রওনা দেবে ঠিক করে শাটল -এর টাইম জানতে হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে ফোন করবে ভাবছে, এমন সময় আবার বেজে উঠলো ফোন। ম্যাডামের নাম্বার ভেসে উঠতে ফোন ধরে হ্যালো বলল সুগত। চেনা গলা ভেসে এলো ফোনের অপরদিক থেকে, “কি, স্যার তো মিটিঙে চলে গেলেন, তা তুমি একটু শহরটা ঘুরবে তো নাকি? এই শহরে এসেছো যখন একবার পিয়ার থার্টি নাইনটা দেখে নাও বরং। তুমি রেডি থাকো আমি গিয়ে পিকআপ করছি তোমায়।”

“আপনি যে বললেন আপনি লস এঞ্জেলেস-এ?”

“চিরকাল ওখানেই থাকবো নাকি? কাল রাতেই চলে এসেছি এস এফ ও। সাক্ষাতে কথা হবে।”

 

পিয়ার থার্টি নাইনটা সত্যি খুব সুন্দর। সমুদ্রের পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য সাজানো গোছানো নানা কিসিমের দোকান পাট। আর রয়েছে কতগুলো পাব। সামনের দিকটাতে সমুদ্রের পাশে দাঁড়ালে দেখতে পাওয়া যায় অসংখ্য সি লায়ন। ওদের দেখে বড় খারাপ লেগেছিল সুগতর। আহা বেচারারা হয়ত কত আপন জনকে হারিয়েছে শেষ দুদিনে। ভারি দুষ্টু এরা। একটা উঁচু জায়গায় থরে থরে শুয়ে বসে রয়েছে। অনেক জায়গা খালি থাকা সত্বেও একজন আরেকজনকে ঠেলে জলে ফেলে দিয়ে এদের যেন দারুণ মজা হচ্ছে। সি লায়ন দেখার একটা অসুবিধাও আছে, বিকট আঁশটে গন্ধে প্রায় নাক বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় হয়। ওরা এসে বসল একটা ছোট পাবে। তিনজনে তিনটে বিয়ার নিলো। এই তৃতীয় ব্যক্তিটির সাথে এই পাবে ঢুকেই প্রথম আলাপ সুগতর। এসেই ম্যাডাম আলাপ করিয়ে দিলেন দীর্ঘ দেহী অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত মুখের অরিন্দমের সাথে। এর শুধু নামই শুনেছে এতদিন। আজ জানতে পারা গেলো কত বড় একটা ঘটনা ঘটিয়েছেন ভদ্রলোক।

“কি সুগত, ঘাবড়ে গেলে নাকি?”

ঘাবড়ে যে সে গিয়েছে সে কথা আর ম্যাডামকে কি করে এত সহজে বলা যায়? সে একটু আমতা আমতা করতে লাগল। ম্যাডাম সেটা আঁচ করেই হয়তো বললেন, “চিন্তা নেই। বিয়ারটা আমেজ করে খাও আর যতটা পারো স্যান ফ্রান্সিস্কোকে দেখ। তোমাকে সব বলব। অরিন্দমের নাম তো তুমি শুনেছ। কিন্তু যা ওর সম্পর্কে শুনেছ, এই সমস্ত ঘটনায় ওর ভূমিকা তার চেয়ে অনেক বেশি। যখন তোমার স্যার, মানে সুদর্শন ওর জিও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টটা ডেলিভারি করে, সে কাজে কিন্তু বাধা দেয়নি অরিন্দম। ও শুধু বলেছিল যে এই ঘটনার একটা সুদুর প্রসারী খারাপ প্রভাব থাকতে পারে। আর তাই সেটার জন্য ব্যবস্থা নিয়েই একমাত্র ওই কাজে হাত দেওয়া দরকার। কিন্তু শোনেনি সুদর্শন। কারণ অরিন্দমের সিমুলেশন বলেছিল আজকের এই ঘটনা ঘটার আগে হয়তো কনট্র্যাক্ট-এঁর সময় পেরিয়ে যাবে। কিন্তু এটা বোঝা দরকার যে, সেটা একটা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মডেল, একটা প্রেডিকশন। তার ওপর পুরোপুরি ভরসা করা মানে নিজেদের ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া বই কিছু নয়। কিন্তু বুঝতে চায়নি সুদর্শন। কারণ তার কাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল টাকা, সেটা হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ করে থাকে। তাতে পুরোপুরি দোষ নেই। কিন্তু প্রফেশনাল এথিক্স বাদ দিয়ে দিলে মুস্কিল, অন্তত যেখানে অনেক জীবন বিপন্ন হতে পারে। সুদর্শন আসলে ভেবেছিল অনেকটা সময় হাতে আছে, ঠিক সামলে নেওয়া যাবে। আমরা বুঝতে পারি যে সুদর্শনকে বুঝিয়ে কোন লাভ নেই। তাই অরিন্দম কাজ শুরু করে আলাদাভাবে। এবার নিশ্চয়ই তোমার মনে প্রশ্ন আসছে, রিসার্চটা ঠিক কি? সেই গবেষণার ফান্ড এলো কোথা থেকে? তাহলে বলি শোন। তোমার স্যারের কম্পানির ফিফটি পারসেন্ট শেয়ার আমার। আর তাছাড়া আমি ইউ এস সিটিজেন। এ দেশে জন্ম আমার, লস এঞ্জেলাস এ। এখানে আমার নামে একটা স্টার্ট আপ চালু করলাম। আর সেই কম্পানি থেকে স্পেসাল স্কিলে অন্য আরেকটা রিসার্চের জন্য ভিসা স্পন্সর করালাম অরিন্দমের। আলাদা করে চলতে থাকল আমাদের রিসার্চ। লোকে যেটাকে ইউ এফ ও ভাবছে …।”

এবার বাধা দিল সুগত। বলল, “সত্যি বলতে ওই ইউ এফ ও আমি নিজেও দেখেছি কাল রাতে।”

অরিন্দম এবার হাসল। তারপর বলতে শুরু করল, “যাক তাহলে তো চুকেই গেলো। যেটা আপনি দেখেছেন তা ইউ এফ ও, টিউ এফ ও কিছু না। ওটা জাস্ট একটা বেলুন। সেটা সেলফ ডেস্ট্রাক্টিভ। তার কাজ মিটে গেলে নিজের অস্তিত্ব সে নিজেই ধ্বংস করে ফেলে। ম্যাডামের অসম্ভব সাহায্যের জন্যই আজ আমার এই কাজ সম্ভব হয়েছে। আমি ক্রমাগত আমার রিসার্চ চালিয়ে গেছি এই নিয়ে যে কিভাবে প্ল্যাঙ্কটন থেকে তৈরী হওয়া বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাসকে পরিবেশ থেকে দূর করা যাবে। পৃথিবীতে থাকা কোনো পদার্থই আমার এ কাজে সাহায্য করতে পারেনি। তাই আমি ধীরে ধীরে তৈরী করলাম এক নতুন অরগ্যানিক কম্পাউন্ড যা কিনা নিমেষে বাতাস এবং সমুদ্রের জল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড আর কার্বন মনোক্সাইড দূর করতে সক্ষম। আর তার সাথে মিশেল ঘটালাম কিছু আয়রন কম্পাউন্ডের। এখন সেটা সমুদ্রের জলে আর বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন প্ল্যাঙ্কটন সারাজীবন ধরে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে বাতাসে গ্রিন হাউস গ্যাসের এফেক্ট কমাবে, তেমনি কমে যাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা। প্ল্যাংটনের মৃত্যুর পর জলে মিশে যাওয়া কার্বন ডাই অক্সাইডকে নিমেষে শোষণ করে নিয়ে আবার বানিয়ে ফেলবে অক্সিজেন। তবে বাতাসে আয়রন সহ এই নতুন পদার্থের সাথে আমার তৈরী বেলুন ইনজেক্ট করেছে এক ধরণের উদ্ভিদ। ব্ল্যু এল্গির ক্ষমতা আছে বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে তাপমাত্রা কমানোর। আমি তাদেরই জীনের পরিবর্তন ঘটিয়ে বানিয়েছি এক নতুন ধরণের পরিবেশের বন্ধু এল্গি। তার সাথে ছড়িয়েছি আয়রন সমৃদ্ধ আরেকটা কেমিক্যাল। এই কেমিক্যাল তৈরি করবে অসংখ্য এলগি যারা কিনা বায়ু মণ্ডলে অদৃশ্য হয়ে বাঁচতে পারবে অন্তত আগামী হাজার বছর। আমার রিসার্চ চলছে, যাতে কিনা এদের বংশ বৃদ্ধি করে বাড়িয়ে তুলতে পারি এই অদৃশ্য শৈবালের সংখ্যা। এবারের বড় কাজ হল, গোটা পৃথিবীতে এর এপ্লিকেশন। তার জন্য দরকার অনেক ইনভেস্টমেন্ট। আজকের সাফল্য সে কাজে ম্যাডাম কে হেল্প করবে।”

মুখ খুললেন ম্যাডাম, “সে কাজের দায়িত্ব আমার। তুমি শুধু এই পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাও অরিন্দম। তোমার মতন বিজ্ঞানী দরকার আমাদের।”

সুগতর কাছে এই মুহূর্তে হঠাৎ যেন বিয়ারটা অনেক বেশি সুস্বাদু হয়ে উঠেছে। পৃথিবীটা এখনও অনেক বছর বাঁচবে এ কথা ভাবতেও তার রোমাঞ্চ হচ্ছে। নাই বা সে বেঁচে থাকল অনেকদিন, তবু তার অঙ্গীকার থাক এ পৃথিবীকে ভবিষ্যতের শিশুদের বাসযোগ্য করে যাবার।

Tags: অর্ণব গোস্বামী, বড় গল্প, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!