খুলি

  • লেখক: ফিলিপ কে. ডিক, অনুবাদ: রুদ্র দেব বর্মন
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

দাচেন কেলস্যাঙ্গ একজন হত্যা-বিশারদ। সে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল আগে কখনো না দেখা একজন অচেনা অজানা মানুষকে হত্যা করার জন্য। এমনিতে এই ধরনের কাজ তার জন্য কঠিন কিছু নয়। আর এক্ষেত্রে তো ভুলের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কারণ খুনটা করতে সে বেরিয়েছিল সেই অপরিচিত মানুষটার মাথার খুলিটা হাতে নিয়েই…

 

কারাগারটা শুধু পাহাড় আর জঙ্গলের অনেকটা ভেতরেই নয়, কাছাকাছির মধ্যে সবচেয়ে বড়ো শহর ইম্ফল ওখান থেকে অন্তত পৌনে দুশো কিলোমিটার দূরে। খাড়াই পাহাড়ের গা জুড়ে বিভিন্ন উচ্চতায় চক্রাকার চার-চারটে বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষামূলক পাঁচিল। তার মধ্যে তিনটে ছিল অপ্রাকৃতিক— উচ্চ বিভবের বিদ্যুৎ, প্লাজমা আর্ক আর লেজার। চতুর্থ এবং শেষ বাধাটা ছিল প্রাকৃতিক— হিংস্র নেকড়েবাহিনী। পাকদন্ডীর মতো ঘুরপাক খেয়ে উঠে যাওয়া কংক্রিটের তৈরি পথ চার-চারটে এআই রোবট প্রহরাধীন সুরক্ষিত তোরণ পার করে তারপর গিয়ে পৌঁছেছে কারাগারের প্রধান দরজার সামনে। সেখানেও দু-মানুষ সমান উচ্চতার ধাতব পাঁচিল। তার ওপরে আবার প্লাজমা আর্কের অদৃশ্য বেড়া। চব্বিশ ঘণ্টা চালু রাখা রয়েছে বৈদ্যুতিক প্রবাহ। আর এই সব নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে প্রাচীন কালের অভেদ্য দূর্গের মতো সুরক্ষিত এই কারাগার। যেটা কিনা এই মুহূর্তে পৃথিবীতে থাকা আন্তর্গ্রহ সুরক্ষাবাহিনী আর ইন্টারপোলের পরিচালনাধীন দূর্ভেদ্যতম কারাগারগুলোর অন্যতম প্রধান কারাগার।

এর আগে তিনবার তিনটে কারাগারের সুরক্ষা বলয়ের পিন্ডি চটকে পালিয়ে যাওয়ার রেকর্ড অবশ্য কেলস্যাঙ্গের আছে। যদিও সেই তিনটে কারাগার এটার কাছে বলা চলে বাচ্চাদের খেলাঘর। কেলস্যাঙ্গ অবশ্য লক্ষ্যে অবিচল। প্রতিদিন যতটুকু সময় বাইরে থাকার সুযোগ পেয়ে থাকে তার পুরোটাই কাজে লাগিয়ে নিবিষ্ট মনে চারপাশের অবস্থা মনের সিপিইউ-তে তুলে নেওয়া শুরু করে দিয়েছে এর মধ্যেই। এবং সে স্থির নিশ্চিত এবারেও তাকে আটকে রাখা অসম্ভব হবে। ঝামেলা ঝঞ্জাট হুজ্জোতি সবই থাকবে। কিন্তু হয়ে যাবে।

ঘটনা হল যে দরকার পড়ল না সেসব কোনো কিছুরই। দিনের শুরুটা অন্যান্য দিনের মতো থাকলেও সেদিন মধ্যাহ্ন ভোজনের পরে হঠাৎই তাকে সরকারি পাহাড়ায় কালো রঙের বদ্ধ একটা গাড়িতে করে সশস্ত্র রক্ষীদল পাহাড়ের নীচের এই প্রাচীন প্রাসাদের মতো বাড়িটাতে নিয়ে এসেছে। যেখানে এই মুহূর্তে তাকে একটা প্রস্তাব ছুড়ে দেওয়া হয়েছে।

“তাতে আমার কী লাভ হবে?” প্রতিপ্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে কেলস্যাঙ্গ এতক্ষণে মুখ তুলে প্রথম বারের মতো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বক্তারা দিকে তাকায়। আরো একটু ব্যাখ্যা করে। “মোদ্দা কথাগুলো খুলে বলুন। এমনিতে শুনে তো ভালোই লাগছে।”

গোটা ঘরটা তখন যেন হিম-নিস্তব্ধ। ভেতরে থাকা সব ক-টা মানুষের নজর কেলস্যাঙ্গের দিকে স্থির নিবদ্ধ। কেলস্যাঙ্গের শরীরে এখনো জেলের পোশাক। যিনি কথা শুরু করেছিলেন তিনি এবার ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে নিজের মুখটা কেলস্যাঙ্গের মুখের কাছাকাছি নিয়ে গেলেন। লোকটার পড়নে পুরোদস্তুর সামরিক সাজ। সঙ্গীদেরও একই রকম সাজসজ্জা। শুধু কাঁধের ওপরে লাগানো রঙিন পাট্টার রকমফের দেখে বোঝা যাচ্ছে এই লোকটা বাকিদের তুলনায় অবশ্যই যথেষ্ট উঁচু পদের কেউ। জেনারেল লেভেলের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাকিরা একটু নিম্নস্তরের হলেও কেউই যে সাধারণ রক্ষী নয় তা সেটাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কেলস্যাঙ্গ পিআরসি-র বিভিন্ন র‌্যাঙ্ক সম্পর্কে অতটা ওয়াকিবহাল নয়। তবে সামনে এগিয়ে আসা মানুষটা যে অন্ততপক্ষে জেনারেল স্তরের সেটা ভালোই বুঝতে পারছে।

কথাগুলো চাপা হিসহিসে স্বরে বলা হলেও স্পষ্টই তাতে দাঁত কড়কড়ানির একটা আভাস ছিল। মুখের এত কাছে এসে বলতে শুরু করায় লোকটার নিশ্বাসের গরম ভাপ আর থুথুর ছিটে কেলস্যাঙ্গ ভালোই টের পায়। তবু নিজের মুখের একটাও পেশি না নড়িয়ে পুরো কথাটা কেলস্যাঙ্গ নিঃশব্দে শুনতে থাকে।।

“জেলে যাওয়ার আগে আপনার সমস্ত ব্যাবসা-ট্যাবসা তো ভালোই চলছিল। সবগুলোই অবশ্য বেআইনি এবং রীতিমত লাভজনক… ছিল… যদিও সেসব এখন সবই অতীত। এই মুহূর্তে আপনার সামনে জেলের কোনো একটা অন্ধকার কুঠুরিতে আরো ছ-বছরের দিনগত পাপক্ষয় ছাড়া তো আর কিছুই নেই।”

এ সব কিছুই জানা কথা। এবং এসব কথার যদিও কোনো মানে হয় না। কেলস্যাঙ্গ এটাও বুঝতে পারছে যে এগুলো কোনো আসল কথা নয়। ভূমিকা করছে মালটা। এসব ওর ঠিক পছন্দ নয়। টের পায় কপালের রগ বেয়ে রাগ মাথার ব্রহ্মতালুর দিকে এগোচ্ছে। চোখ মুখ কুঁচকে দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা হজম করতে চেষ্টা করে। সরাসরি বক্তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে ও। কোনো উত্তর অবশ্য দেয় না।

“দেখুন রাগের কোনো কথা নেই এখানে। আমি আপনার পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করলাম শুধু। যাতে আপনার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। আমাদের পরিস্থিতিটাও আপনাকে জানাবো। কেননা চুক্তি যদি করতেই হয় প্রস্তাব আর তার গ্রহণ-যোগ্যতা দুটোই আইনি পদ্ধতিতেই হওয়া দরকার। তাই না?”

কেলস্যাঙ্গ এবারও কোনো উত্তর দেয় না। বেশি কথা বলা ঠিক ওর পছন্দ নয়। সে আসলে কাজের ভক্ত। তা ছাড়া গত কুড়ি বাইশ বছর ধরে একা একাই কাজ করে যাওয়ায় ওর কথা বলার অভ্যাসটাও অনেকটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ও তাই চুপ করে রইল।

বক্তা আরো দু-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে। কেলস্যাঙ্গকে দেখছিল চোখ পাকিয়ে। যখন বুঝল যে কেলস্যাঙ্গ এই মুহূর্তে কোনো রা কাড়বে না, তখন আবার বলতে শুরু করল।

“একটা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে আপনার মতো একজন স্বনামধন্য মানুষ, কী কী যেন? হ্যাঁ, স্বনামধন্য হত্যা বিশারদ, আন্তর্গ্রহ ভাড়াটে খুনি, কর্ণিকা গ্রহের খনিজ পাচারকারী, মহাশুন্যের স্মাগলার, মঙ্গলের ম্যামথ শিকারী, ইত্যাদি ইত্যাদি, সে যাই হোক, আপনি আমাদের গ্রেটার চায়না গভর্নমেন্টের কাছে এই মুহূর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

কেন? নিঃশব্দ চাউনি কেলস্যাঙ্গের।

“আমাদের তথ্য-ভান্ডারের বিশ্লেষণ মোতাবেক আপনার মধ্যে একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। আরো তিন জনের নাম অবশ্য আছে আমাদের তালিকায়, বুঝলেন? তবে এই চার জনের মধ্যে যেহেতু আপনিই একমাত্র এই মুহূর্তে আমাদের নাগালের মধ্যে আছেন, তাই গভর্নমেন্ট প্রথম সুযোগটা আপনাকেই দিচ্ছে।”

দাচেন কেলস্যাঙ্গ এরপরেও চুপ করে থাকে। ও জানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কলকব্জার সামনে মুখ খুলতে নেই। বিশেষ করে দ্য গ্রেট পিআরসি-র উচ্চ-স্তরীয় কলকব্জার সামনে তো কদাচ নয়। দরকার মতো যতটুকু এরা জানাবে তার চেয়ে বেশি জানবার কোনো উপায় থাকে না। অন্তত খালি হাতে থাকলে তো একদমই কোনো উপায় থাকে না। এবার যেদিন ও ধরা পড়ে, সেদিন কর্ণিকা থেকে জাহাজ ভরা মালপত্র নিয়ে ও প্রায় বেরিয়ে পড়েই ছিল, শুধু মহাকাশ টহলদার বাহিনীর প্রশ্নের উত্তরে চরিত্র বিরোধী একটু বেশি মুখ খুলতে গিয়েই ঝামেলা হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে ও আরো বেশি সাবধানে থাকতে চেষ্টা করে চলেছে। মনে মনে পুরো পরিস্থিতি ও আরেকবার হিসেব করে নেয়।

যা বোঝা যাচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন মনে হচ্ছে মারাত্মক রকমের বেশি। যন্ত্রের কলকব্জারা তাই এখনও হাসি মুখে এত কিছু বলে যাচ্ছে।

“আমরা জানি সৌরজগতের যে কোনো কোণ থেকে যে কোনো মানুষকে খুঁজে বের করে উধাও করে দেওয়ার একটা বিশেষ ক্ষমতা আপনার আছে! একটা বিশেষ কাজে আপনার এই অদ্ভুত দক্ষতার প্রয়োজন আমাদের হয়ে পড়েছে। তবে কাজটাও এমন যে সেটা আপনার একদম মনের মতো হবেই। অন্তত সেরকমই আমাদের বিশ্বাস। আর সফল হলে, যা আপনি হবেন বলেই আমরা মনে করি, তখন আপনার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ আছে সব তুলে নেওয়া তো হবেই, এমনকি আপনি চাইলে আপনার পছন্দের কোনো সরকারি কাজে আপনার দক্ষতা ব্যবহার করার পরিকল্পনাও আমাদের আছে—”

কেলস্যাঙ্গ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখের প্রত্যেকটা পেশি শক্ত হয়ে রয়েছে। “ঠিক আছে,” এতক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে ছিল, এবার কালচে ঠোঁট দুটো অল্প একটু ফাঁক করে বলল, “ছাড়ুন এসব গৌরচন্দ্রিকা। আসল কথায় আসুন। কাকে খুন করতে হবে?”

নিপ্পোন-কোকুতে ছাড়া গোটা এশিয়া মহাদেশ যে রাষ্ট্রশক্তির দখলে সেই প্রবল পরাক্রমশালী দ্য গ্রেটার পিআরসি গভর্নমেন্ট কেন যে কাউকে খুন করার জন্য ভাড়াটে খুনি খুঁজে বেড়াচ্ছে সেটা কৃষ্ণ গহ্বরের অন্দরমহলের মতো রহস্যময় ব্যপার। নইলে প্রয়োজনে রাষ্ট্র তো যখন খুশি যাকে খুশি খতম করেই থাকে। এবং তার জন্য সামরিক আর অসামরিক সব ধরনের ব্যবস্থাপনা তাদের হাতেই থাকে। তাই এত ভ্যানতাড়া ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি আসল কথা জানা যায় ততই ভালো।

কিন্তু সব ভালো তো “সরকারি” ভালো না-ও হতে পারে! এক্ষেত্রেও হল না।

উর্দীধারি বক্তা ঠোঁট চেপে হাসলেন। ওইরকম শক্তপোক্ত পেশিবহুল চেহারা থেকে যে এমন একটা নরম গলার স্বর বেরিয়ে আসতে পারে তা চট করে কারও মাথায় আসতেই পারে না। “আরে! এত তাড়াহুড়ো কীসের? এক্ষুনি না, তবে সময় মতো সবই জানতে পারবেন।”

***

রাতের আঁধার নেমে এসেছে পৃথিবীর এই প্রান্তে। গাড়িটা নেমে যেখানে এসে থামল, সেখানে আশপাশে কোথাও আলো এখন দেখা যাচ্ছে না। যথেষ্ট অস্বাভাবিক ব্যাপার! গাড়ির ছোট্ট জানলার মধ্যে দিয়ে কেলস্যাঙ্গ বাইরেটা দেখার চেষ্টা করে। “আমরা কোথায়? এই জায়গাটা কি?”

একজন রক্ষী কেলস্যাঙ্গের হাতটা ধরে নেয়। “আসুন। এই দরজা দিয়ে।”

কেলস্যাঙ্গ বাইরে পা দেয়। একটা স্যাঁতসেঁতে ফুটপাত। প্রচণ্ড কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছে। রক্ষী দ্রুত তার পেছনে নেমে আসে। রক্ষীর পেছনেই নেমে এলেন বক্তা। ঠান্ডা বাতাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড়ো করে একটা শ্বাস নেয় কেলস্যাঙ্গ। সামনেই একটা প্রাচীন মঠ। এদিকে মনে হচ্ছে ঘণ্টা কয়েক আগেই বৃষ্টি হয়েছে। চারদিকে দেখে মনে হচ্ছে পশ্চিম দিকের পর্বতমালার একটি শাখা এদিকে শহরের ভেতরে এসে গেছে। বহু দূরে শহরের শেষ প্রান্তে একটা জোঙ দেখা যাচ্ছে। ওদিকটা আলোয় ঝকঝক করছে। এখানে তার ডান দিকে খানিকটা অন্ধকার বন-জঙ্গল। আর তারপরেই আলোয় ঝলমলে আকাশচুম্বী সব অট্টালিকায় ভর্তি শহরের প্রধান বাজারটা। শুরু হয়েছে পাহাড়ের ঢালের ডান-দিক থেকে আর শেষ হয়েছে বায়ে ঘুরে সামনের মঠটার প্রাচীরের গায়ে। গ্যোভ লিং-ছোক-প! পাশের রাস্তায় মন্ত্র খোদাই করা এক বিরাট প্রাচীর। আর তার ওদিকে লোকালয় আর খেত-খামার পাশাপাশি রয়েছে। বৃষ্টির জলে কংক্রিট আর অ্যাসফল্টের রাস্তাঘাট এখনো ভেজা ভেজা। উলটোদিকে গম আর বার্লির ছোটো একটা খেত জমি। মনে হচ্ছে ওটা মঠের দেবোত্তর খামার হবে। ওটা যেখানে শেষ হয়েছে তার পাশেই একটা রাস্তার ওদিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পাটকিলে রঙের একখানা বিশাল বাড়ি। বৃটিশ দূতাবাস। পুরো এলাকাটার ছবি মুহূর্তের মধ্যে মাথায় ঢুকিয়ে নেয় কেলস্যাঙ্গ। বহুদিনের অভ্যাস। প্রতি মুহূর্তে যাকে জীবন-মৃত্যুর সীমানা ঘেঁষে চলাফেরা করতে হয় তার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটা কাজ এটা।

“আমি এই জায়গাটা চিনি। আগেও দেখেছি।” চকচক করছে কেলস্যাঙ্গের চোখ। ইতিমধ্যে তার চোখ আলো-আঁধারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ যেন সতর্ক হয়ে গিয়েছে কেলস্যাঙ্গ। “এ তো মনে—”

“হ্যাঁ। তাশি গংবা মঠ। আগে এখানে একটা অন্য মঠ ছিল। লোকে সেটাকে দি-কি-টো-মো”র মঠ বলত। সেটা অবশ্য গত শতকের কোনো এক সময়ে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।” বক্তা এবার মঠের প্রবেশ দরজার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। “আসুন। সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

“আমাদের জন্য? এখানে?”

“হ্যাঁ,” বক্তা ততক্ষণে সিঁড়ি চড়তে শুরু করেছেন। দু-তিন ধাপ চড়ে বললেন, “আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন যে ওদের মঠে ওরা আমাদের ঢুকতে দিতে চায় না। আর বন্দুক হাতে ঢোকার অনুমতি তো কখনোই দেয় না!”

কেলস্যাঙ্গ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। ওর হাসি পাচ্ছে। খলবল করা হাসি। ভেতরে ভেতরে হাসছে সে। তবে মুখের চামড়া তাতে এতটুকুও কুঁচকোয় না। অনুমতি! মান্দারের বাচ্চাগুলো অনুমতি নিয়ে কাজ করে নাকি? চারশো বছর আগে সেই ১৯৫১-র ২৩ মে-র পর থেকেই এরকম ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গিয়েছে। গত চারশো বছরের ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে তো কেউ কখনো শোনে নাই। শ-দুয়েক বছর আগে তাও ছুটকো-ছাটকা দু-একটা প্রতিবাদ প্রতিরোধের ঘটনা ঘটত। আর ২১৪৮ সালে শেষ ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর থেকে তিব্বত তো দূরের কথা, হিমাদ্রির দক্ষিণের মানুষেরাও মনে হয় না কখনো এমন কিছু করার কথা স্বপ্নেও ভেবেছে!

ইতিমধ্যে ওরা সিঁড়ির ধাপগুলো উঠে ওপরের চাতালে এসে দাঁড়িয়েছে।

মৃদু হেসে কেলস্যাঙ্গের দিকে তাকিয়ে বক্তা বলে ওঠেন, “আপনি অনেক কিছুই জানেন না। শুধু আপনি কেন, সেন্সরশিপের জন্যে বাইরের মানুষ বহু কিছু জানতে পারে না। আমরা জানি। তেমন—”

ওপরের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন বক্তা।

দু-জন সশস্ত্র সৈন্য সামনের প্রশস্ত অঙ্গনের দু-দিক থেকে এগিয়ে এল।

“সব ঠিক আছে?” বক্তা সৈনিকদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন। রোবটের মতো মাথা নাড়ে সৈনিক দু-জন। মঠের দরজা খোলাই ছিল। কেলস্যাঙ্গ দরজার মধ্যে দিয়ে ভিতরে অন্যান্য আরো বেশ কয়েকজন সৈন্যদের দেখতে পাচ্ছিল। বৃত্তাকার একটা বড়ো হলঘর। সৈন্যরা সব চারপাশে গোল হয়ে তিন দিকে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনের দেওয়ালের সামনে মাঝামাঝি জায়গায় একটা উঁচু বেদী। বেদীটা খালি। চারদিকে দেওয়ালের গায়ে বুদ্ধদেবের বিভিন্ন ভঙ্গিমার মূর্তি। বড়ো বড়ো চোখ করে সেই সব তরুণ সৈন্যরা সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।

এগিয়ে আসা রক্ষীদের দিকে তাকিয়ে বক্তা বললেন, “ঠিক আছে। আমি দেখছি।”

সদলবলে বক্তা কেলস্যাঙ্গকে নিয়ে চাতাল পেরিয়ে দরজার সামনে যখন পৌঁছে গেছেন, তখন হঠাৎ কেলস্যাঙ্গ দাঁড়িয়ে পড়ল। এতক্ষণ পরে তার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে।

“এখানে কেন এসেছি? আপনি তো জানেনই যে আমি জন্মগতভাবে একজন তিব্বতী।”

বক্তা বলেন, “দরকার আছে বলেই আসতে হয়েছে। কাজটা এখান থেকেই শুরু করতে হবে। তাই আসতে হল। নইলে আপনি তো জানেনই যে বৌদ্ধদের মঠ-টঠগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো দিনই ভালো ছিল না। শুধু বৌদ্ধ কেন, কোনো ধর্মের সঙ্গেই ছিল না। তবে ত্রয়োদশ দলাই লামার একগুঁয়েমির জন্য সম্পর্কটা বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই চূড়ান্তভাবে খারাপ হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু কী আর করা যাবে!”

“তার সঙ্গে এই মঠে আমাকে নিয়ে আসবার কী সম্পর্ক?”

“অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যে কাজটার জন্য আপনাকে নির্বাচন করা হয়েছে সেটা এই মঠ থেকেই শুরু করা সম্ভব। কাজেই এই মঠে আসাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষা করুন, আপনি একটু পরেই দেখতে পাবেন।”

***

তারা এবার বৃত্তাকার হলঘরটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এটা মঠের প্রধান প্রার্থনা-গৃহ। পেছনের দেওয়ালের ঠিক সামনে সেই খালি বেদীটা। বেদীর সামনের মেঝেতে অদ্ভুত রকমের চিত্র-বিচিত্র ছবি। লাল রঙের একটা বৃত্ত। তাকে ঘিরে পাপড়ির মতো করে আঁকা আছে ছোটো ছোটো ১০৮-টা অর্ধবৃত্ত। প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা রঙের। তবে বেনীআসহকলা-র সাতটা রং দেখা যাচ্ছে নির্দিষ্ট ক্রমান্বয়ে ফিরে ফিরে এসেছে। পনেরো বারের পুনরাবৃত্তির পর একটা লাল আর একটা বেগুনি অর্ধবৃত্তের মধ্যে তিনটে কালো অর্ধবৃত্ত। এগুলোর ঠিক সামনে লাল বৃত্তটায় এক জোড়া পায়ের ছাপ। পাশাপাশি এবং হলুদ রঙের। হলঘরটার দু-দিকের দেওয়ালে বিশাল বিশাল কারুকাজ করা একগাদা দরজা। সব মিলিয়ে চার-চার আটটা দরজা। সবগুলোই ভেজানো রয়েছে। পেছনের দেওয়ালে বেদীর হালকা ঠিক দু-পাশে আবার দুটো খর্বাকায় দরজা। এ দুটোর কারুকাজ করা কাঠের পাল্লায় আবার ধাতুর মোটিফ লাগানো আছে। ডান দিকের দরজাটা দুটো পাল্লাই হাট করে খোলা। যদিও বাঁ দিকেরটার একটা পাল্লা ভেজানো রয়েছে। ডান দিকের দরজার খোলা পাল্লা মধ্যে দিয়ে হালকা আলোর একটা আভাস আসছে।

হলঘরটা আড়াআড়ি পার করে দলটা বেদীর পাশ দিয়ে বাঁ দিকের আধ-ভেজানো দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কেলস্যাঙ্গ লক্ষ করল বেদীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বক্তা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে নজর অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। দরজার কাছে গিয়ে বক্তা আধ-ভেজানো পাল্লাটা ঠেলে খুলে দিয়ে কেলস্যাঙ্গকে ভেতরে ঢুকতে ইশারা করলেন।

“এদিক দিয়ে আসুন। আমাদের একটু তাড়াহুড়ো করতে হবে। ভক্তদের দল এতক্ষণে নিশ্চয়ই আমাদের এখানে আসার খবর পেয়ে গিয়েছে। যে কোনো সময়ে এখানে ভিড় জমা হয়ে যেতে পারে। এই মুহূর্তে আমরা কোনো উত্তেজনা তৈরি করতে চাই না।”

কেলস্যাঙ্গ বক্তার পেছন পেছন ঢুকে পড়ল। ঢুকেই একটা চৌকো ছোটো নীচু ঘরের মতো জায়গা। দুটো সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে। একটা ওপরে উঠে গেছে। অন্যটা নেমে গেছে নীচের দিকে।

আলো খুব কম। চোখ পিট্ পিট্ করে সইয়ে নিয়ে বক্তার পেছন পেছন কেলস্যাঙ্গ নীচে যাওয়ার সিঁড়িতে পা দিল।

নীচে আরেকটা হলঘর। এটা ওপরেরটার চেয়ে অনেক ছোটো। তবে অতগুলো দরজা নেই। এছাড়া গঠনশৈলি একদম এক রকম। সেই একটা বেদী। সামনে সেই রঙিন বৃত্ত আর অর্ধবৃত্তের চিত্রকর্ম। সবই ছোটো মাপের। সেই লাল বৃত্তে হলুদ রঙের জোড়া পায়ের ছাপ। তবে এখানে পায়ের ছাপ দুটো একটি নীল পদ্মফুলের মধ্যে আর পদ্মফুলের ঠিক ওপরে একটা ষড়কোণ বা স্টার অফ ডেভিড। আর বেদীর পেছনে এখানে একটা মাত্র দরজা। এটা সম্ভবত মঠের উচ্চ পদস্থ লামাদের নিজস্ব প্রার্থনা গৃহ ছিল।

দলটা বেদীর পেছনের ছোটো দরজাটা খুলে ঢুকে এল আরেকটা ঘরে। এটা আরো ছোটো। আর এটায় এই প্রবেশ দরজা ছাড়া আর অন্য কোনো দরজা নেই। ছাদটা নীচু। চারদিকের দেওয়ালে কাঠের প্যানেল আর পাল্লা দেওয়া তাকের সারি। একটা অদ্ভুত গন্ধ ঘরটার মধ্যে। যেন বহুকালের পুরোনো ধূপ-ধুনোর ধোঁয়া এখনো আবদ্ধ হয়ে রয়েছে ঘরটার মধ্যে। তার সঙ্গে রয়েছে আরো এক ধরনের অচেনা অদ্ভুত গন্ধ।

কেলস্যাঙ্গ নাক কুঁচকোয়। শোঁ শোঁ আওয়াজ করে গন্ধ শোঁকে। “এ কীসের গন্ধ?”

“দেওয়ালের তাকগুলো নানারকম বাক্স আর কলসিতে ভর্তি। ওগুলো থেকেই আসছে মনে হচ্ছে। ঠিক কীসের গন্ধ আমি জানি না।” বলতে বলতে বক্তা একদম পেছনের দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলেন। চলার আর বলার ভঙ্গিতে অধৈর্য্যতা পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। “আমাদের তথ্য অনুযায়ী, জিনিসগুলো এখানেই লুকোনো আছে—”

কেলস্যাঙ্গের চোখ দুটো চারদিকে ঘুরছিল। মেঝেতে চারপাশে ডজন খানেক তামার বর্গাকার পিঁড়ি। পিঁড়ির উপরে থাক দিয়ে সাজানো অসংখ্য পুঁথি আর গোটানো পার্চমেন্টের বেলন। এছাড়াও প্রচুর কাগজপত্র চারদিকে ডাঁই করে রাখা। ডান দিকে দেওয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা আছে চারটে সিন্দুক। প্রত্যেকটার সামনে পবিত্র চিহ্ন আর ছবি। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে কেলস্যাঙ্গের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা অদ্ভুত শিরশিরানি ওকে কাঁপিয়ে দিয়ে নেমে গেল।

“আমার কাজটা কি মঠের সঙ্গে জড়িত কারও ব্যাপারে? যদি সেটা হয়—”

বক্তা দূরের দেওয়ালের তাকের পাল্লাগুলো খুঁটিয়ে দেখেছিলেন। চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ালেন। ওঁকে একটু যেন হতভম্ব মনে হচ্ছিল। “আপনি কি বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী? এটা কীভাবে সম্ভব? একজন খুনী বা শিকারী কীভাবে—”

“না। অবশ্যই না। কোনো ধর্মেরই কোনো ধার আমি ধারি না। তা ছাড়া ওদের ধর্মে বলে অহিংসা পরম ধর্ম। আর আমার জীবন হিংসাময়। মারো অথবা মরো। এই সৌরজগতের প্রত্যেকটা কোণায় আমি রক্ত ঝরিয়েছি। আমার জীবন আর জীবিকা—”

“তবে এ কথা উঠছে কেন?”

“গুরুর আদেশ। আমাকে এই রকমই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কখনো যেন কোনো সন্ন্যাসী, লামা বা তান্ত্রিকদের সঙ্গে ঝামেলার মধ্যে না যাই। তাদের অদ্ভুত সব অপার্থিব ক্ষমতা আছে। পার্থিব শক্তি নিয়ে লড়াই করে আপনি তাদের সঙ্গে কখনোই জিততে পারবেন না।”

বক্তা কয়েক মুহূর্ত নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলেন। যেন কেলস্যাঙ্গের মস্তিষ্কের প্রত্যেকটা নিউরনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুৎ তরঙ্গের পর্যালোচনা করছেন। তারপর যেন স্থির নিশ্চিত হয়ে কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, “আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তেমন অপার্থিব শক্তিধর এখানে কেউ নেই। শুধুমাত্র এখানে কেন, গত চারশো বছরের ইতিহাসে এমন কাউকে গোটা এশিয়াতে কাউকে পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্র যখন যাকে বিপজ্জনক বলে মনে করেছে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মুছে দিয়েছে। তাদের মেরে ফেলতে কখনো কোনো অসুবিধা হয়নি। যদিও আমাদের কোয়ান্টাম গনক যন্ত্রের বর্তমান বিশ্লেষণ অনুযায়ী হত্যা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং হত্যা করা হলে নাকি তাদের ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।”

“তাহলে এখানে এলাম কেন? চলুন চলে যাই।”

“না। আমরা এখানে এসেছি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য। গোটা পরিকল্পনাটাই এবারে কোয়ান্টাম গনক যন্ত্রের মাধ্যমে করা হয়েছে। একদম নিখুঁত পরিকল্পনা। শুধু এবার কাজটা করতে হবে। সেজন্যই আপনাকে খুঁজে বের করা হয়েছে। কিন্তু মানুষটাকে শনাক্ত করার জন্য আপনার কিছু জিনিসের প্রয়োজন হবে। সেগুলো ছাড়া আপনি তাকে খুঁজে পাবেন না।” বক্তার মুখে এতক্ষণ পরে একটা চওড়া হাসির রেখা ফুটে উঠল। “আমরা চাই না আপনি ভুল ব্যক্তিকে হত্যা করুন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

“এক মিনিট… আপনারা যখন বুঝেই গিয়েছেন যে ব্যক্তিকে হত্যা করে কোনো লাভ নেই, উলটে তাতে তার অনুগামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তবে কেন আবার কাউকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছেন?”

“আমাদের ভুল হতেই পারে। কিন্তু কোয়ান্টাম গনক যন্ত্রের কখনো কোনো ভুল হয় না। শুনুন দাচেন কেলস্যাঙ্গ, ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী তার মতাদর্শ। তার বক্তব্য। ব্যক্তিকে হত্যা করলেও তার সেই মতাদর্শ, সেই বক্তব্য মুছে দেওয়া যায় না। কাজেই খতম যদি করতে হয়, সেটা করতে হবে তার মতাদর্শ বা বক্তব্য প্রচারের আগেই। সেই জন্যই আজ আমরা এখন এখানে এসেছি। যাতে এবার আর কোনো ভুল না হয়।”

এতদিনের অর্জিত অভিজ্ঞতার গর্বে আঘাত লাগে কেলস্যাঙ্গের। শরীরটা শক্ত হয়ে ওঠে। বুক ফুলিয়ে কেলস্যাঙ্গ বলে ওঠে, “শুনুন মিস্টার… কী নাম আপনার আমি জানি না। আমি আপনাদের কোয়ান্টাম গনক যন্ত্র কতটা নির্ভুল তা-ও জানি না। কিন্তু আমি দাচেন কেলস্যাঙ্গ। আমার কাজে আমি কোনো ভুল করি না।”

বক্তা হাসলেন। নিঃশব্দ হাসি। চোখ কুঁচকে, ঠোঁট ছড়িয়ে হাসি। বললেন, “জানি তো। আর সেজন্যই আপনি নির্বাচিত হয়েছেন। আর হ্যাঁ, আমি জেনারেল চেন জিয়াং, পিআরসি, দক্ষিণ এশিয়া।” কেলস্যাঙ্গের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিলেন জেনারেল। মুখের ভাবে কোনো পরিবর্তন দেখতে পেলেন না। একটু অপেক্ষা করে আবার বললেন, “যে কাজটার জন্য আপনাকে নির্বাচন করা হয়েছে সেটা আসলে একটা অস্বাভাবিক কাজ। যাকে আপনাকে খুন করতে হবে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আপনি তাকে খুঁজে বের করতে পারবেন না। তাকে খোঁজার জন্য আপনার কিছু বিশেষ বস্তুর দরকার পড়বে। আর সেগুলো শুধুমাত্র এখানেই পাওয়া যাবে। এই জিনিসগুলোই সেই মানুষটাকে খুঁজে চিনে নেওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি। এগুলো ছাড়া—”

“সেগুলো কী?” কেলস্যাঙ্গ বেশি কথা বলা পছন্দ করে না। সে সোজা জেনারেল জিয়াং-এর সামনে এগিয়ে যায়। পেছনের রক্ষীরা বাধা দিতে গিয়েও জেনারেলের ইশারায় থেমে যায়।

জেনারেল জিয়াং একপাশে সরে গিয়ে কেলস্যাঙ্গকে জায়গা করে দিলেন।

“নিজেই দেখে নিন।”

বলে দেওয়ালের একটা জায়গা দু-হাতে চেপে ধরে এক পাশে ঠেলে দিলেন।

দেওয়াল সরে যেতেই ওখানে বেরিয়ে পড়ল একটা অন্ধকার বর্গাকার গর্ত।

কেলস্যাঙ্গ উবু হয়ে বসে গর্তটার ভেতরে নজর দেয়। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতেই ওর ভ্রু কুঁচকে যায়। “এ কী! একটা খুলি! নরকঙ্কাল!”

“আপনি যাকে খুন করার দায়িত্ব পেয়েছেন সে দুই শতাব্দী আগেই মারা গিয়েছে,” জেনারেল চেন জিয়াং আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখালেন, “এই হচ্ছে তার অবশেষ। একমাত্র নিদর্শন যা দিয়ে আপনাকে তাকে খুঁজে বের করে খুন করতে হবে।”

বেশ অনেকক্ষণ কেলস্যাঙ্গের মুখ থেকে একটাও কথা বেরোল না। নিঃশব্দে ও তাকিয়েই রইল দুই শতাব্দী প্রাচীন হাড়গোড়গুলোর দিকে। দেওয়ালের ফোকরের ভেতরে আবছা আলোয় ওগুলো অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। কয়েক শতাব্দী আগেই মৃত একজন মানুষকে কীভাবে আবার হত্যা করা সম্ভব? কীভাবে ও ধাওয়া করবে মানুষটাকে? কীভাবেই বা খুন করবে?

কেলস্যাঙ্গ তুখোড় শিকারী, নির্দয় ঠান্ডা মাথার একজন খুনী। জীবিকার জন্য কর্ণিকা গ্রহ থেকে চোরাই খনিজ চালান করেছে, মঙ্গলের শীতলতম অন্ধকার রাতে লাল মরুর গহন জঙ্গলে তাড়া করে শিকার করেছে ম্যামথ। ভাড়াটে খুনি হিসেবে ঘুরে বেরিয়েছে সৌরজগতের আনাচে কানাচে। নিজের জাহাজে চোরাই খনিজ নিয়ে আন্তর্গ্রহ শুল্ক বিভাগকে টুপি পরিয়ে দূর্লভ আর মূল্যবান সব খনিজ এনে বেচে দিয়েছে বিভিন্ন বেআইনি কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে। কৈশোরে সরকারি এতিমখানা থেকে পালানোর পর থেকেই ঘরছাড়া। যেখানে যখন পেরেছে সেখানে থেকেছে। তবে জীবন কাটিয়েছে নিজের শর্তে। কখনো কোনো কাজের দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতেও পিছপা হয়নি। এখন দেওয়ালের ফোকরে পড়ে থাকা ঝুল-কালি মাখা শতাব্দী প্রাচীন হাড়গোড়গুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর ভাবছে হাতে নেওয়া কাজটা সম্পর্কে। তার আগামী চ্যালেঞ্জের কথা।

জেনারেল সেই মুহূর্তে তখন তার কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। একজন সৈনিককে ইশারায় ডেকে আদেশ করলেন, “এগুলো সব তুলে নিয়ে গাড়িতে ওঠান। দেখবেন একটা টুকরোও যেন না হারায়।”

সৈনিকটি দেওয়ালের ফোকরের মধ্যে ঢুকে সাবধানে উবু হয়ে গোড়ালির উপরে ভর দিয়ে বসল।

কাজ শুরু করিয়ে দিয়ে জেনারেল এবার কেলস্যাঙ্গের দিকে মনোযোগ দিলেন। গলার স্বর এখন অনেক মোলায়েম।

“কেলস্যাঙ্গ, আমি আশা রাখি যে এই কাজটার মাধ্যমে আপনি রাষ্ট্রের প্রতি আপনার আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পারবেন। অনুগত নাগরিকদের উপর রাষ্ট্র সব সময়ই সদয়। এমনকি বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও আত্মসমর্পণ করে আনুগত্য প্রকাশ করলে রাষ্ট্র তাদেরকেও নাগরিক সমাজের অংশ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমি মনে করি এটা আপনার জন্য একটা সুবর্ণ সুযোগ। আমি স্থির নিশ্চিত এই সুযোগে আপনি নিজের ভবিষ্যতটা ভালোই গুছিয়ে নিতে পারবেন।”

এই মুহূর্তে কয়েক শতাব্দী প্রাচীন মঠটার ছোট্ট আলো-আঁধারি ঘরটার মধ্যে দু-জন মানুষ পরস্পরের মুখোমুখি চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে। নাতিদীর্ঘ পেশল অথচ হালকা চেহারার এখনো জেলের পোশাক পরিহিত দাচেন কেলস্যাঙ্গ আর দীর্ঘকায় বলিষ্ঠ ভারীক্কি চেহারার সামরিক উর্দী পরিহিত জেনারেল চেন জিয়াং।

কয়েকটা নিঃশব্দ মুহূর্ত পেরিয়ে গেল। জীবনের ইতিহাস এবং ভূগোলের দিক থেকে সম্পূর্ণ দুই প্রান্তের দুটি মানুষ যেন নিজেদের মানসিক স্থৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।

তারপর কেলস্যাঙ্গ ঘুরে দাঁড়াল। “বুঝলাম। অন্তত আমার পাওনা গন্ডার ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। কিন্তু কাজটা? কীভাবে দু-দুটো শতাব্দী আগে মরে ভূত হয়ে যাওয়া কাউকে আমি—”

কেলস্যাঙ্গকে থামিয়ে দিলেন জেনারেল। “কোনো ব্যাপার না। আমি আপনাকে পরে বুঝিয়ে বলছি। কিন্তু এখন আমাদের একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে।”

ইতিমধ্যে সেই হাড়গুলো সাবধানে একটা কম্বলে জড়িয়ে নিয়ে সৈনিকরা বেরিয়ে গিয়েছে। জেনারেল হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। “চলে আসুন। এরই মধ্যে ভক্তদের দল খবর পেয়ে গিয়েছে যে আমরা এখানে ঢুকেছি। যে কোনো মুহূর্তে দলে দলে এখানে এসে পড়বে।”

আর দেরি না করে সৈনিকদের পুরো দলটা সহ ওরা দ্রুত বড়ো হলঘরটা পেরিয়ে স্যাঁতসেঁতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে অপেক্ষায় থাকা গাড়িগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। তারপর এক সেকেন্ড পরেই দেখা গেল গাড়িগুলো সোজা বাতাসে ভেসে মঠ আর আশপাশের বাড়িঘরগুলোর ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে বাঁক নিয়ে উড়ে গেল।

***

গাড়ির ভিতরে জেনারেল প্রথমে ভালো করে গুছিয়ে বসে নিলেন। তারপর বললেন, “গ্যাংচি-র এই মঠের ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। আমাদের হিসেবে আপনি এই মঠটার সমন্ধে ভালো করেই জানেন। আমি এটার সম্পর্কে অন্য কয়েকটা বিষয় আপনাকে জানাবো। আপনার কাজের জন্য ইতিহাসের কিছুটা প্রয়োজনীয় অংশ আপনার ভালো করে জানা দরকার।”

পেছন থেকে একজন রক্ষী একটা ফ্লাস্ক বাড়িয়ে ধরল। জেনারেল ফ্লাস্কটা হাতে নিয়ে চোঁ চোঁ করে কোনো তরল পানীয় পান করে ফ্লাস্কটা রক্ষীর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে হাতের উলটো দিক দিয়ে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা তরল পানীয়ের অংশ মুছে নিলেন।

“তিব্বত ঠিক কবে থেকে আমাদের দখলে আসে আপনার মনে আছে?”

স্কুলের স্মৃতি কেলস্যাঙ্গের মস্তিষ্কে বহুদিন হল ফিকে হয়ে গিয়েছে। পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক সেই কোন কিশোরবেলায় বিচ্ছিন্ন হয়েছিল সেটাও আর ঠিকঠাক মনে পড়ে না। শুধু মনে আছে চারদিকে তখন ডামাডোল চলছে, খাবারের অভাবে বেশির ভাগ দিন কখনো ডাস্টবিন কুড়িয়ে তো কখনো হাত পেতে দিন পেরোচ্ছিল। ঠিক সেই সময়ে গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ না হলে হয়তো আজ ও বেঁচে থাকত কিনা সন্দেহ। তারপর তো অন্ধকারের জগৎ। চলার পথে অবশ্য পরে অনেক কিছু শিখে নিয়েছে। কিছু কিছু তো এতটাই শিখে নিয়েছে যে আজ অনেকের কান কেটে নিতে পারে। কিন্তু ইতিহাস আর তেমন জানা হল কই? অবরে-সবরে এদিক ওদিক থেকে এই অল্প কিছু যা কানে এসেছে! আজ কী তবে ওকে জেনারেলের কাছে ইতিহাস শিখতে হবে?

এসব প্রশ্নোত্তরের খেলা কেলস্যাঙ্গের ভালো লাগে না। কিন্তু জেনারেলকে থামানো দরকার। ওর বোঝা উচিত কেলস্যাঙ্গ কোনো হেজিপেজি ক্রিমিনাল না।

“১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে। তিব্বতী বিদ্রোহের পর… চতুর্দশ দলাই লামা যবে ভারতে চলে গেলেন তখন থেকে…”

ঠোঁট চেপে হাসছিলেন জেনারেল। “বাঃ, আপনি তো অনেক খবরই রাখেন দেখছি। যাক্, আমাদের নির্বাচন যে একদম সঠিক তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহই রইল না। সে যাকগে, নেট ঘাঁটলে আরো বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যাবেন। ধরে নিতে পারেন যে মোটামুটি বছর দশেক সময় লেগেছিল এই ছোট্ট দেশটা কব্জা করতে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর জেনারেল ঝাং গুয়োহুয়ার চামদো দখল দিয়ে শুরু, পরের বছরে ২৩ মে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আর সবশেষে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে চতুর্দশ দলাই লামা-র পলায়ন। আর গ্যাংচি-র এই মঠটা তৈরি হয়েছিল ওই ঘটনার প্রায় দুশো বছর পরে— সালটা হচ্ছে ২১৪৬ খ্রিস্টাব্দ। উদ্বোধনের তারিখটা ছিল দোসরা অক্টোবর। এই তারিখটা একটু মনে রাখবেন। আপনার কাজটার সঙ্গে এই তারিখের একটা সম্পর্ক আছে।”

দু-চোখে প্রশ্নের ভ্রুকুটি নিয়ে কেলস্যাঙ্গ জেনারেলের দিকে মুখ তুলে তাকায়।

অন্ধকার আকাশে চারটে উড়ুক্কু যান বাতাস কেটে আরো দক্ষিণে সবেগে উড়ে চলেছে।

জেনারেল জিয়াং গাড়ির স্বচ্ছ জানালা দিয়ে বাইরেটা একবার দেখে নিয়ে পিঠ হেলান দিয়ে গুছিয়ে ভালো করে বসে নিয়ে তারপর বললেন, “আপনার প্রশ্নের উত্তরে পরে আসছি। আগে প্রেক্ষাপটটা ভালো করে বুঝে নিন। নইলে যাকে আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে তার কাছে পৌঁছতে ঝামেলায় পড়ে যাবেন। জানলা দিয়ে নীচে একবার দেখে নিন।”

জেনারেল হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে ফেলায় কেলস্যাঙ্গ চমকে ওঠে। নীচে অন্ধকারে ফ্যাকাশে সাদা বরফাচ্ছন্ন পর্বতমালার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কারণটা। যৌক্তিক কোনো কারণ ওর মাথায় আসে না। ঘাড় উঠিয়ে জেনারেলের দিকে তাকিয়ে দেখে ভদ্রলোক মুচকি হাসি হাসছেন। ও কোনো কথা না বলে নিজের আসনে হেলান দিয়ে গাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

“একটু পরেই আমরা হিমাদ্রি পেরিয়ে ভারতীয় সমতলে ঢুকে পড়ব। তবে আপনার চিন্তা নেই— আমরা ইম্ফলের দিকে যাচ্ছি না,” বলে সঙ্গী রক্ষীদের দিকে ঘাড় হেলিয়ে হো হো করে হেসে ওঠেন জেনারেল। যেন কোনো প্রচণ্ড হাসির কথা বলে ফেলেছেন। রক্ষীদের কেউ অবশ্য হাসে না। কিংবা হাসি পেলেও চেপে যায়। ওপরওয়ালার সামনে হাসবার মতো আদিম প্রথা নিশ্চিত গ্রেটার পিআরসি-র সামরিক বাহিনীর মধ্যে নেই। আর কেলস্যাঙ্গের তো হাসার কথাই নয়। ইম্ফলের ইঙ্গিতে যে কারাগারের সংকেত দেওয়া হয়েছে তা সে ভালোই ধরতে পেরেছে, কিন্তু এতে হাসির কী আছে তা তার মাথায় এলো না। এতক্ষণে অবশ্য ভালোই বুঝে গিয়েছে যে খুব বড়ো ধরনের কোনো ব্যথা না থাকলে এরা ওকে নিয়ে এতক্ষণ ঘোরাঘুরি করত না। তাই চুপচাপ বসে থাকে সে। দেখা যাক। এমনিতেও তো ওকে জেলেই থাকতে হত। বরং এখন পালানোর একটা সুযোগ তৈরি হলেও হতে পারে।

জেনারেল জিয়াং কেলস্যাঙ্গের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছিলেন। প্রতিক্রিয়াহীন মুখের হাবভাব দেখে কিছু একটা ভাবছিলেন। যদিও ওঁর চোখেমুখেও সেই সব ভাবনার কোনো ছাপ ফুটে উঠতে দেখা গেল না।

একটু পরে হঠাৎ করেই যেন বলে উঠলেন, “কেলস্যাঙ্গ, গত পাঁচশো বছরের এশিয়ার ইতিহাস আমরা যেভাবে লিখেছি, আজ যদি আপনি ব্যর্থ হন তো সব গোলমাল হয়ে যাবে।” জেনারেলের গলার স্বর এখন অনেক নরম।

গাড়িটা এখন এঁকেবেঁকে দু-দিকের উঁচু উঁচু পর্বতের ঢালের মধ্যে দিয়ে সাঁ সাঁ করে এগিয়ে চলেছে। সামনের উইন্ডস্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে অন্ধকারে আলোর বিম দুটো দ্রুতগতিতে সরে সরে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে জেনারেল বলে চলেন—

“শিৎসাং আর জাংনান আমাদের দুটো মাথাব্যথার জায়গা সেই ঐতিহাসিক কাল থেকেই। শিৎসাং অর্থাৎ তিব্বত আমাদের হাতে আসে সেই পাঁচশো বছর আগেই। তবে জাংনান নিয়ে ঝামেলা অনেকদিন চলে। ভারত কিছুতেই জাংনান অর্থাৎ অরুণাচল প্রদেশের দখল ছাড়তে চায়নি। ২০৭২ খ্রিস্টাব্দের প্রথম ইন্দো-চিন যুদ্ধের ফলাফল আমাদের জন্য খুব খারাপ ছিল। আমাদেরকে জাংনান দখলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরেকটা শতাব্দীর, আরো তিন তিনটে যুদ্ধের। তারপর স্টার্ক-২১৪২ ভাইরাসের ঢেউয়ে আমেরিকা আর ইউরোপ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে ২১৪৮ খ্রিস্টাব্দের শেষ ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর মাত্র তিরিশ বছরের মধ্যে শুধু জাংনান না, পূর্ব দিকে নিপ্পন বাদে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ সহ সম্পূর্ণ এশিয়া আমাদের দখলে এসে যায়। আহা! সে সব ছিল যুদ্ধের দিন। একটার পর একটা যুদ্ধ। তবে ২১৭৫ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে শুধুই শান্তি! গত দুশো পঁচাত্তর বছরে এই শানসি সাম্রাজ্যের দিকে কেউ আর মাথা ওঠানোর সাহস পায়নি।”

একটানা এতগুলো কথা বলে জেনারেল এবার একটা লম্বা শ্বাস ফেলে তাকালেন কেলস্যাঙ্গের দিকে। তারপর বললেন, “দেখুন ছোটোখাটো বিদ্রোহ, বিপ্লব— এগুলো তো থাকবেই। এত বড়ো সাম্রাজ্য। তবে তাতে খুব কিছু এসে যায় না।”

এতক্ষণ পরে কেলস্যাঙ্গ মুখ খোলে। “জানি তো। আপনাদের প্রযুক্তি আর অস্ত্রের শক্তির সামনে সেসব কিছুই না।”

নীরবে হাসেন জেনারেল জিয়াং।

কেলস্যাঙ্গ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, “তো হঠাৎ কী এমন হল যে দুশো বছর আগে মরে ভূত হয়ে যাওয়া একটা লোকের পেছনে ধাওয়া করতে চাইছেন? ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করতে হচ্ছে?”

“হঠাৎ করে না। এর শুরুটা যদি দেখেন তো দেখতে পাবেন আসলে শুরু হয়েছিল সেই ত্রয়োবিংশ শতাব্দীতে। মন দিয়ে শুনুন। আমি এখন যা বলব সেটা যাতে ঠিকঠাক বুঝতে পারেন সেই জন্যই আগে মোটা দাগের ইতিহাস আপনাকে জানানো হল। শুনুন তাহলে— ঘটনার উৎস তো বললাম সেই ত্রয়োবিংশ শতাব্দীতে। সেই যখন একটার পর একটা যুদ্ধ চলেই চলেছে। তখনই এই আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল। শুরু হতে না হতেই আন্দোলনটা দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করেছিল— আণবিক বিস্ফোরণের ঠিক পরে তরঙ্গ ঝড় যেভাবে তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়ে— ঠিক সেভাবেই যেন ওই আন্দোলনটা ছড়িয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের নিরর্থকতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে একটা বোধ জেগে উঠতে শুরু করে। আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল যুদ্ধ বিরোধিতা। একটা সময় মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল যে যুদ্ধ শুধু নিরর্থকই নয়, প্রত্যেকটা যুদ্ধ আরো বড়ো বৃহত্তর যুদ্ধের জন্ম দিচ্ছে আর এই বিষচক্রের কোনো শেষ নেই। যুদ্ধবিরোধী সেই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতির ব্যাঘাত ঘটানো। যেহেতু অস্ত্র-ছাড়া কোনো যুদ্ধ হতে পারে না আর যন্ত্রপাতি এবং জটিল বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ছাড়া কোনো আধুনিক মারণাস্ত্র তৈরি হতে পারে না, আন্দোলনকারীরা তাই আঘাত হানতে শুরু করেছিল সেই সব জায়গায়। ততদিনে শুধুমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রের যা সম্ভার তাতেই পৃথিবীটাকে অন্তত বার দশেক ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে। সেই নিয়ে সমাজের প্রত্যেকটা স্তরে তখন তুমুল আলোড়ন। আন্দোলন বাড়তে বাড়তে এমন দাঁড়াল যে কলকারখানা অফিস কাছাড়ি সব বন্ধের মুখে। মানুষ জেনে গেছে যে আরো কয়েকটা যুদ্ধ… আর ব্যাস, পৃথিবীর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”

বাধা দেয় কেলস্যাঙ্গ। বলে, “রাষ্ট্রের হাতে যা ক্ষমতা তাতে এসব বন্ধ করা কি কোনো বিশাল ব্যাপার? আপনারা কী করলেন?”

জেনারেলকে এবার একটু আনন্দিত মনে হচ্ছে। সেটা কি কেলস্যাঙ্গকে আলোচনায় শেষ পর্যন্ত টেনে আনতে পারার জন্য? বললেন, “কী করা হয়েছিল সেটা বড়ো কথা নয়। জনতাকে শায়েস্তা করা রাষ্ট্রের কাছে কিছুই না। রাষ্ট্র শুধু সময় নিচ্ছিল উৎসের সন্ধানের জন্য। বিদ্রোহ বা বিপ্লব হচ্ছে রক্তবীজের ঝাড়। গোড়া না কাটতে পারলে শেষ করা যাবে না। তাই উৎস অর্থাৎ পালের গোদাটাকে খুঁজে বের করাটা ছিল জরুরি।”

“পাওয়া গিয়েছিল?”

“না পাওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। সময় লেগেছিল। কিন্তু ওই সব ভালো যার শেষ ভালো!”

“কে ছিল সেই মানুষটা?”

বেশ কয়েক মুহূর্ত জেনারেল চুপচাপ কেলস্যাঙ্গের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর থেমে থেমে ধীরে ধীরে বললেন, “এর মধ্যে একটা ধোঁয়াশা এখনো আছে। সাধারণত কোন বিদ্রোহ বা বিপ্লবের নেতৃত্ব হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠে না। এর একটা পদ্ধতি আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়…, সে যাকগে, আমাদের মহাফেজখানার থেকে পাওয়া তথ্য মোতাবেক মানুষটার আগে পিছের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। এমনকি নামটাও আমরা জানতে পারিনি। সব কিছুই কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া। শুধু এটুকু জানা যায় যে মানুষটা জন্মগতভাবে ছিল তিব্বতী আর সেটা জেনেটিক ডিকোডিং করে পরে নিশ্চিত করাও হয়েছিল। সেদিনও পুরো ব্যাপারটা রহস্যময় ছিল। আজও তাই আছে। আমরা শুধু জানি যে হঠাৎই একদিন লোকটা ভুঁইফোড়ের মতোই গ্যাংচিতে আবির্ভূত হয়েছিল, ঠিক যেন স্বয়ম্ভু…”

“গ্যাংচিতে? মানে আমরা যেখান থেকে আসছি?”

“হ্যাঁ…”

“কী করেছিল ওখানে লোকটা?”

“ডিটেইলস তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। তবে আনুষঙ্গিক ঘটনাপঞ্জী থেকে জানা যায় যে— লোকটা হঠাৎই একদিন গ্যাংচিতে আবির্ভূত হয়। তারপর অহিংসা, অসহযোগ আন্দোলন আর যুদ্ধ বিরোধী মতবাদ প্রচার শুরু করে। মোদ্দা কথা ছিল কোনো যুদ্ধ করা চলবে না, অস্ত্রের জন্য লাগু করা ট্যাক্স জনগণ দেবে না, চিকিৎসাবিদ্যা ছাড়া অন্য কোনো গবেষণা কেউ করতে পারবে না! ভাবুন একবার! সম্মা দিট্ঠি, সম্মা সংকপ্প, সম্মা বাঁচা, সম্মা কম্ম, সম্মা অজিব, সম্মা বয়ম, সম্মা সতি আর সম্মা সমাধি— এই আটটা নীতি পালন করলেই নাকি মানব সভ্যতা তার উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে যাবে! দয়া আর দান নাকি পরম ধর্ম, অন্তত প্রকাশ্যে জনগনের উদ্দেশে যা বলেছিল তা থেকে এই সব কিছুই যা মহাফেজখানায় নথিভুক্ত করা আছে।”

“কয়েক হাজার বছর আগের কোনো এক ধর্মগুরু এই রকমই কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন না?”

“হুম! ওর ভক্তেরা তো সেই রকমই বলে। তিন হাজার বছর পরে মানব সভ্যতা রক্ষার জন্য তিনিই নাকি আবার ফিরে এসেছিলেন! এক মিনিট…”

জানলা দিয়ে বাইরে নীচে এখন আলো ঝলমলে সব শহরের দৃশ্য চোখে পড়ছে। জেনারেল পাইলটকে কিছু একটা বললেন। পাইলট মাথা-টাথা নেড়ে তার উত্তর দিল। কেলস্যাঙ্গ খেয়াল করে না। ও এখন বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। এখানেই কোথাও মুঙ্গের নামের শহরে শেষবার ও ধরা পড়েছিল। গাড়িটার গতি এখন আরো বেড়ে গিয়েছে। কাঁধে টোকা পড়তে ও জেনারেলের দিকে ঘুরে তাকায়।

জেনারেল ওর দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমরা আরো দক্ষিণে যাব। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, এ দেশের মানুষের ধর্ম বিশ্বাসে অবতার বলে একটা ব্যাপার আছে। ওদের ভগবান নাকি যুগে যুগে ধর্ম আর সভ্যতা রক্ষার জন্যে ফিরে আসেন। তো ওই কল্কি নামে কোনো এক অবতারের পৃথিবীতে আসবার কথা ছিলই। আর সেই ভুঁইফোড়ের মতো হঠাৎ আসা মানুষটা নাকি সেই কল্কি অবতার। তো সেই লোকটা কল্কি হোক বা ভেলকি— মোটমাট তার যুদ্ধবিরোধী মতবাদ সেই বিশেষ দিনে গ্যাংচি শহরে প্রথম বারের মতো প্রচারিত হয়। দিনটা ছিল ২২৫০ খ্রিস্টাব্দের দোসরা অক্টোবর। আপনি দিনটা নোট করে রাখুন কেলস্যাঙ্গ। তারিখটা আপনার জন্য প্রয়োজনীয়। মহাফেজখানার তথ্য ভান্ডারে এই তারিখটাই পাওয়া গেছে। তবে সঠিক দিনটা দু-চার দিন আগে পিছে হতেই পারে। সে যাই হোক না কেন মানুষটা যেদিন তার প্রথম আর শেষ বক্তৃতাটা গ্যাংচি শহরের বুকে দেয় তার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সোশাল সাইটগুলোর মাধ্যমে ঝোড়ো আগুনের মতো সেগুলো গোটা এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কল্কি অবতারের আবির্ভাবের সেই খবর চারদিকে মানুষের মধ্যে যেন আগুন জ্বালিয়ে দেয়।”

“জিপিআরসি তখন কী করছিল?”

“স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য লোকটাকে সেদিনই তুলে নিয়েছিল। তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। তাকে হত্যা করা হয়েছিল, এবং তার দেহ গোপনে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। মনে করা হচ্ছিল যে মানুষকে বোঝানো গিয়েছে যে ধর্ম শেষ হয়ে গেছে। … পরে অবশ্য বোঝা গিয়েছিল যে শুধু স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাজের ওপরে ভরসা করে নিশ্চিত থাকাটা ভুল হয়ে ছিল। রাষ্ট্র এরপর যতদিনে সারা দেশে অ্যাকশন নেওয়া শুরু করে ততদিনে কল্কি ভক্তদের দল সংগঠিত হয়ে গিয়েছিল। ওই গ্যাংচির যে মঠে আমরা গিয়েছিলাম সেই মঠটা তখন সবে তৈরি হয়েছে। ওটাই পরে কল্কি ভক্তদের গোপন কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের হিসেবে কাজ শুরু করে।”

“আপনারা জানতেন না?”

“জানব না কেন? খবর তো ছিলই। রক্তের নদী বয়ে গিয়েছে বহুবার। কিন্তু ওই যে বললাম রক্তবীজের ঝাড়!”

“কিন্তু ওই নরকঙ্কাল যদি ওই লোকটার হয়ে থাকে তো সেটা ওই মঠে গেল কী করে?”

“এটা আজও একটা রহস্য। সেই গোপন কবর থেকে যে দেহাবশেষ কবে তোলা হয়েছে, কীভাবে সেই জায়গাটা ভক্তেরা খুঁজে বের করেছে, সে সব না জানলেও প্রায় বছর চল্লিশ আগেই আমরা জানতে পেরেছি যে ভক্তেরা দেহাবশেষ সরিয়ে নিয়েছিল। তবে ওই মঠের মধ্যে রাখার খবরটা এই মাস কয়েক আগে আমরা জানতে পারি।”

পাইলটের গলা শোনা যায় এই সময়ে, “আমরা পুনে এসে গিয়েছি।”

জেনারেল তাকে ইশারা করেন। গাড়িটা বার তিনেক চক্কর কেটে নীচে কোনো একটা বাড়ির ছাদে নেমে পড়ে।

“কিন্তু একটা লোক, সে কল্কি অবতার হোক বা যে কেউ, সে একদিন কোথাও একটা কিছু বলল আর দুশো বছর ধরে ভক্তরা তার সেই কথা অনুসরণ করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে, এটা কীভাবে সম্ভব?” কেলস্যাঙ্গ মাথা নাড়াতে থাকে।

জেনারেল হাসলেন। এবার হাসিটা যেন একটু বিষন্ন মনে হচ্ছে। “দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর কিছু শিষ্য তাঁর মৃত্যুর তারিখের পরেও তাঁকে দেখেছে বলে জানিয়েছে। ফলে একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অবতারত্ব আরো বেশি করে জাকিয়ে বসে। সবাই বলতে শুরু করে যে তিনি মৃত্যুকে জয় করেছেন। তিনি কল্কি অবতার। তিনি আজও আছেন। দুশো বছর ধরে এই প্রচার বেড়েই চলেছে। আর তাই আজ আমরা এখানে। একটা লোক, একটা মঠ আর একটা বিশ্বাস সমস্ত সামাজিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে, সমাজকে ধ্বংস করে চলেছে, নৈরাজ্যের বীজ বপন করে চলেছে, এটা আমাদের আটকাতেই হবে। তাই আপনাকে খুঁজে বের করা হয়েছে। আপনিই হবেন আমাদের নির্বাচিত কল্কি! হেঃ হেঃ…” এবার জেনারেলের হাসি যেন আর থামতে চাইছে না।

গাড়িটা থেমে পড়েছে।

রক্ষীরা নেমে দরজা খুলে দিয়েছে। একটা বিশাল দূর্গের মতো ছড়িয়ে থাকা আকাশ চুম্বি একটা ইমারতের ছাদে নেমেছে গাড়িগুলো।

গাড়ির খোলা দরজার দিকে পা বাড়িয়ে কেলস্যাঙ্গ জিজ্ঞেস করে, “আর যুদ্ধ? সেসবের কী হল?”

গাড়ি থেকে নেমে জেনারেল কেলস্যাঙ্গের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, “যুদ্ধ? ঠিক আছে, কোনো তেমন বড়ো যুদ্ধ তারপর আর হয়নি। এটা স্বীকার করতেই হবে যে সাধারণ অর্থে তেমন যুদ্ধ আর না হওয়ার একটা বড়ো কারণ ছিল গোটা দেশব্যাপী অহিংসার অনুশীলন আর যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু আপনি যদি গভীরে গিয়ে ভাবতে পারেন তো বুঝতে পারবেন যে যুদ্ধ একটা অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয় কর্ম। এতে খারাপের কী আছে? উলটে যুদ্ধের মধ্যে যোগ্যতম বাছাইয়ের একটা দূর্দান্ত সুযোগ আছে। যেটা কিনা ডারউইন, মেন্ডেল ছাড়াও আরো অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত চিন্তাবিদদের মতবাদের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। যোগ্যতমের উদবর্তন। যুদ্ধ না হওয়ার মানে হল অকেজো, অক্ষম মানবজাতির একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ, যাদের শারীরিক সক্ষমতা আর মানসিক বুদ্ধিমত্তা কম, তাদেরকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে আর প্রসারিত হতে দেওয়া। যার পরোক্ষ চাপ তো আসবে রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপরেই, না কি? যুদ্ধ তাদের সংখ্যা কমাতে কাজ করে। সুনামি, ভূমিকম্প আর খরার মতো যুদ্ধও হচ্ছে অযোগ্যদের নির্মূল করার একটা প্রাকৃতিক উপায়। যুদ্ধ ছাড়া নতুন পৃথিবী তৈরি কিছুতেই সম্ভব না। জৈব রাসায়নিক পদ্ধতিতে একবিংশ আর দ্বাবিংশ শতকে কিছু কর্পোরেট সংস্থা এটা চেষ্টা করে দেখেছিল— সেই কোভিড আর স্টার্ক ভাইরাসের কথা কখনো শুনেছেন? খুব একটা লাভ হয়েছে কী? হবে না! আসলে প্রয়োজন একটা বড়োসড়ো যুদ্ধের। তবেই নতুন পৃথিবীর— নিও ওয়ার্ল্ড অর্ডার তৈরি করা সম্ভব।”

“এসব কিছু না করেও তো সবাইকে নিয়ে বাঁচা যায়, তাই না?”

অবাক হন জেনারেল জিয়াং। একজন মার্কা মারা খুনি আর স্মাগলারের মুখে এ ধরনের কথা শুনে।

“না। যায় না। সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষী আছে। এপস্ থেকে স্যাপিয়েন্স হওয়ার পথে মানুষের বহু ভাই-বেরাদার মুছে গিয়েছে। কেননা প্রকৃতির নিয়মে যারা যোগ্য হবে তারাই শুধু টিকবে। ঘটনা হচ্ছে প্রকৃতির এই ছাকনি খুব ধীর লয়ে কাজ করে। অত সময় দেওয়া সম্ভব নয়। ভর আর শক্তির মতো প্রাণেরও একটা নিত্যতা সূত্র আছে। আজ মানবজাতির মধ্যে অযোগ্যদের সংখ্যাধিক্য। দুশো বছর ধরে তেমন কোনো যুদ্ধ না হওয়ায় অযোগ্য মানুষের দল বেড়েই চলেছে। এরা সংখ্যালঘু যোগ্যদের জন্য একটা হুমকি। সক্ষম, বুদ্ধিমান আর জ্ঞানী মানুষ যারা সমাজ আর সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে, আজ অযোগ্যদের ভিড়ে তারা গুরুত্ব পাচ্ছে না। সমস্ত রকমের গবেষণা এদের আন্দোলনের চাপে প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই অযোগ্যের দল যুক্তি মানে না, বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক সমাজের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই, অথচ এই অষ্ট-মার্গীয় আন্দোলন কিনা তাদেরই বাঁচিয়ে রাখতে চায়! বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানীদের নিয়ন্ত্রণে সমাজকে না আনতে পারলে…” হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে জেনারেল বললেন, “আসুন, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাবে—”

***

বিশাল লম্বা ছাদটার সামনের দিকে ইংরেজি এফ আকৃতির মতো দুটো ছোটো বড়ো ডানা বেরিয়ে আছে। ছাদ পেরিয়ে দলটা দূরের বড়ো ডানাটার দিকে যাচ্ছিল।

জেনারেল জিয়াং হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন, “আমি নিশ্চিত যে আপনি এতক্ষণে বুঝতে পেরে গিয়েছেন যে মঠ থেকে নিয়ে আসা হাড়গুলোর মালিক কে? কাকে আমরা খুঁজে বের করতে চাইছি… এ হচ্ছে মাত্র দুশো বছর আগে মারা যাওয়া গ্যাংচির সেই অপরিচিত লোকটা— যাকে ভক্তরা বলে কল্কি অবতার! যার নামে আজকের এই অষ্টমার্গী ধর্ম এশিয়া ছাড়িয়ে গোটা পৃথিবী— এমনকি সৌরজগতের সমস্ত উপনিবেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ছড়িয়ে পড়া না, প্রত্যেকটা রাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

“হুম্, মানুষ দেখছি তাহলে কখনো কখনো রাষ্ট্রের চেয়েও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে পারে!” কেলস্যাঙ্গ মন্তব্য করে।

ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন জেনারেল। “কচু! মানুষ সেই অর্থে কিছুই না! শুধু একটা মাত্র গুলির খদ্দের! আসল কথা হল আপনার “বাণী”! “নীতি”! “বক্তব্য”! এই লোকটাকেও তো প্রথম দিনেই উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ট্র্যাজেডি হল তৎকালীন কর্তৃপক্ষ একদিকে কাজ শুরু করেছিল অনেক দেরিতে, তাও সে সব খুবই ধীরে ধীরে। ফলে লোকটা রীতিমতো সুযোগ পেয়ে যায় তার কথাগুলো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। এমনকি লোকটাকে অনুমতি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল তার ধর্ম প্রচারের জন্য। ভেবে দেখুন একবার বোকামির বহরটা! আর জানেনই তো যে একবার এই রকম কিছু শুরু হয়ে গেলে সেটা বন্ধ করার আর কোনো উপায় থাকে না। এর ফল কী হল? না, এই দুশো বছর ধরে আমরা এখনো ভুগে যাচ্ছি।”

“যদি কোনো উপায় না থাকে তো এই মরা মানুষটার হাড়গোড় নিয়ে আমরা কী করতে চাইছি?”

“কেলস্যাঙ্গ, আপনি খেয়াল করেননি, আমি বলেছি যে একবার শুরু হয়ে গেলে আর কিছুই করার থাকে না। কিন্তু ধরুন, যদি লোকটা তার মতবাদ প্রচার করার আগেই মারা যেত? যদি তার কোনো মতবাদই কখনো উচ্চারিত না হত? আমরা জানি লোকটার কথাগুলো উচ্চারণ করতে বোধহয় মাত্র দু-দশ মিনিট সময় লেগেছিল। আমাদের তথ্য ভান্ডার বলছে যে লোকটা শুধু একবার, মাত্র একবার কথা বলেছিল। তারপরেই নাকি কর্তৃপক্ষ এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। লোকটা কোনো প্রতিরোধের চেষ্টাও করেনি। তৎকালীন কর্তৃপক্ষের মতে পুরো ব্যাপারটা ছিল একটা খুবই ছোটো আর মামুলি ঘটনা।”

ছাদটা লম্বালম্বি পেরিয়ে এলিভেটরের মুখটায় এসে পৌঁছেছে সবাই। জেনারেল জিয়াং সামনে ছিলেন। ঘুরে কেলস্যাঙ্গের দিকে ফিরলেন। বললেন, “হতে পারে ছোটো, কিন্তু আমরা আজও তার ফল ভোগ করে চলেছি।”

এলিভেটরটা ঠিক ক-তলা নামল কেলস্যাঙ্গ হিসেব রাখতে পারল না। বেরিয়ে এসে দলটা লম্বা চওড়া কয়েকটা করিডোর ধরে ডান দিক বাঁ-দিক করে একটা সাদা ধপধপে ল্যাবরেটরির মতো ঘরে এসে ঢুকল। সৈনিকেরা ইতিমধ্যে একটা চকচকে ক্রোম স্টিলের লম্বা টেবিলে হাড়গুলো সাজিয়ে ফেলেছে। সাদা আর নীল অ্যাপ্রন পরিহিত জনা তিনেক ডাক্তার বোধহয় আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। সাজানোটা বেশ ভালোই হয়েছে। পুরো নরকঙ্কালটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আনুভূমিকভাবে শোয়ানো সত্বেও বোঝা যাচ্ছে মানুষটা মাঝারি আকৃতির ছিল। খাড়া করে দাঁড় করালে সম্ভবত কেলস্যাঙ্গের মতোই উচ্চতা হবে বলে মনে হচ্ছে। কয়েকটা হাড় মনে হচ্ছে খোয়া গিয়েছে। সেই জায়গাগুলো অদ্ভুত ফাঁকা দেখাচ্ছে। সৈনিকেরা টেবিলের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ভাবলেশহীন তরুণ মুখগুলোতে চরম কৌতুহলের ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

সৈনিকদের ঠেলে সরিয়ে কেলস্যাঙ্গ টেবিলের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নীচু হয়ে টেবিলে হাতের ভর রেখে কঙ্কালটার খুলি থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলে উঠল, “এই তবে সেই মানুষটার দেহাবশেষ… কল্কি অবতার! অষ্টমার্গী ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা! ভক্তেরা দুশো বছর ধরে এগুলোকে লুকিয়ে পুজো করে চলেছে।”

“একদম ঠিক,” জেনারেল ঠিক পাশেই এসে দাঁড়িয়েছেন। “তবে এই মুহূর্তে সব কিছুই আমাদের কব্জায়। আসুন, এদিকে আমার সঙ্গে।”

জেনারেলের পেছন পেছন কেলস্যাঙ্গ ল্যাবরেটরির অন্য প্রান্তে একটা বন্ধ ধাতব দরজার সামনে গিয়ে পৌঁছল। দরজার কড়িকাঠের জায়গায় একটা ফলকে চকচকে ধাতুর অক্ষর দিয়ে লেখা “প্রজেক্ট টি. টি.”। একপাশে একটা কন্ট্রোল প্যাড। জেনারেল প্যাডটার রেটিনা স্ক্যানারের সামনে মাথাটা এগিয়ে দিয়ে পাশের কি-প্যাডে কয়েকটা সংখ্যা টিপে দিলেন। নিঃশব্দে ধাতব দরজাটা দু-ভাগ হয়ে দু-দিকের দেওয়ালের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ওদের জন্য ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিল। ভেতরে বেশ কয়েকজন টেকনিসিয়ান কাজ করছিল। সবাই এখন ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। কেলস্যাঙ্গ ওদের দিকে নজর না দিয়ে ঘরটার মধ্যে থাকা যন্ত্রপাতিগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে শুরু করল। বেশ কিছু যন্ত্র বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ করে পাক খাচ্ছে। নানান ধরনের ঘর্ঘর শব্দ। চারদিকের দেওয়াল জুড়ে টেবিল, র‌্যাক আর ওয়ার্ক বেঞ্চ। র‌্যাক ভর্তি নানান আকারের জার ভরে বিভিন্ন রাসায়নিক। টেবিলময় সারিসারি কম্পিউটারের প্যানেল আর মনিটর। আর ঘরের ঠিক মাঝখানে স্ফটিক এর তৈরি ওপরে-নীচে চাপা কমলালেবুর মতো গোলাকার একটা খাঁচা ঝকঝক করছে।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একজন সৈনিক এগিয়ে এসে একটা অদ্ভুত দর্শন বন্দুক জেনারেলের হাতে তুলে দিল। জেনারেল বন্দুকটা নেড়েচেড়ে দেখে নিলেন। ওর চোখে মুখের ভাব ভঙ্গিতে একটা বেশ প্রশংসার আভাস দেখা গেল। এই ওয়াইজে-৯০২ বন্দুকটা আকারে ছোটো হলেও মাঝারি পাল্লা ব্যবহারের জন্য মারাত্মক কর্মক্ষম। জেনারেল বন্দুকটা তুলে দিলেন কেলস্যাঙ্গের হাতে। বললেন, “এটা আত্মরক্ষা আর আক্রমণ— দুটো কাজেই পারদর্শী। আর শিকারের জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু হয় না। কিন্তু দেখবেন লোকটার মাথার খুলিটা যেন গোটাগুটি থাকে। ওটা আপনাকে ফিরিয়ে আনতেই হবে— ওটাই হবে আপনার কাজের সফলতার প্রমাণ। আমরা ডিএনএ পরীক্ষা করে মিলিয়ে নেব। কাজেই আপনার টার্গেট শরীরের নীচের নীচের দিকে রাখবেন— সবচেয়ে ভালো হবে বুকের দিকে রাখলে, একদম হৃৎপিণ্ডে!”

কেলস্যাঙ্গ মাথা নেড়ে বন্দুকটা হাতে নিয়ে ওজনটা বোঝার চেষ্টা করে। বর্তুলাকার বাঁটের দিকটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরে মাজল্-টা পরখ করে নেয়। “এটা দারুণ জিনিস,” কেলস্যাঙ্গ বলে ওঠে, “আমি এটা ভালোই চিনি— মানে আগেই দেখেছি, যদিও কখনো ব্যবহার করিনি।”

জেনারেল জিয়াং মাথা নাড়লেন। “চিন্তার কিছু নেই। আপনাকে বন্দুক আর খাঁচা— দুটোরই ব্যবহার শিখিয়ে দেওয়া হবে। কখন আর কোথায় আপনাকে পৌঁছতে হবে সেটাও সমস্ত তথ্য আপনাকে এক্ষুনিই দিয়ে দেওয়া হবে। তবে সমস্ত তথ্য যেহেতু মহাফেজখানায় রাখা দুশো বছরের পুরোনো, তাই দশ-বিশ পার্সেন্ট এদিকে ওদিকে হতে পারে। সেটা আপনাকে মাথায় রাখতে হবে। সংক্ষেপে জায়গাটা হচ্ছে বারখো রলুং। ২২৫০ খ্রিস্টাব্দে জায়গাটা তখন একটা বড়োসড়ো গ্রাম। এখন গ্যাংচি শহরের মধ্যে পড়ে গিয়েছে। অবস্থান গ্যাংচির ঠিক বাইরে— লাসা যাওয়ার পথে। আর হ্যাঁ, ভুলবেন না যেন— মাথার খুলির সঙ্গে তুলনা করেই আপনাকে সনাক্ত করতে হবে লোকটাকে। যদিও লোকটার ওপরের পাটির সামনের দুটো দাঁতের গঠন— বিশেষ করে বাঁ দিকের কৃন্তক দাঁতটা একটু অন্যরকম, কিন্তু অমনটা আবার অনেকরই হয়ে থাকে। আপনার নিজেরও তো প্রায় সেই রকমই। কাজেই ওটা দেখতে গেলে মনে হয় না খুব একটা লাভ—”

জেনারেল বলে যাচ্ছেন কিন্তু কেলস্যাঙ্গ আর শুনছিল না। একটু আগেই ওর সম্পূর্ণ মনোযোগ চলে গেছে নীল-সাদা অ্যাপ্রন পরা দু-জন মানুষের দিকে। দু-জনে তখন খুব সাবধানে গ্যাংচির মঠ থেকে নিয়ে আসা নরকঙ্কালের মাথার খুলিটা বাবল র‌্যাপার আর থার্মোকল দিয়ে মুড়িয়ে একটা সিন্থেটিক ব্যাগে ঢোকাচ্ছিল। কেলস্যাঙ্গ দেখতে পাচ্ছে জোড়া নীল-সাদা অ্যাপ্রন খুলি ভর্তি ব্যাগটা এখন স্ফটিকের খাঁচাটার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জেনারেল চুপ করে গিয়েছেন দেখে ও এবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বলে, “আর আমার যদি লোক চিনতে ভুল হয়?”

“ভুল? মানে অন্য কোনো লোককে? তাতে কী? আবার লেগে পড়বেন। সোজা কথায়, সেই অবতারটিকে বাগে না পাওয়া পর্যন্ত আপনার কাজ শেষ হচ্ছে না। আর হ্যাঁ, লোকটাকে কিন্তু বক্তৃতা-বাজি করতে দিলে চলবে না! ওটা আটকাতেই হবে। আপনাকে তার আগেই কাজ শেষ করতে হবে। খুঁজে বের করুন, সুযোগ নিন, কিন্তু খুঁজে পেলেই যত তাড়াতাড়ি পারেন গুলি করে দিন। খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। লোকটা ওখানকার বাসিন্দা যেহেতু নয়, তাই হংস মধ্যে বক যথা হবে বলেই মনে হচ্ছে। ওখানকার লোকজনের অপরিচিত হওয়ার কথা, কাজেই খুব সহজে অড্ ম্যান আউট করতে পারবেন।”

কেলস্যাঙ্গ শুনতে শুনতে অধৈর্য্য হয়ে উঠেছে। চেষ্টা করেও হাবেভাবে সেটার ফুটে ওঠা আটকানো গেল না। “ধরা পড়ার সময় আমার সঙ্গে কিছু জিনিস ছিল। বাজেয়াপ্ত করা সেই জিনিসগুলো আমার চাই। ওগুলো আনিয়ে দিন।”

জেনারেল শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন “সে সমস্ত সব ক্যাপসুলে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কথা সেটা নয়। কথা হচ্ছে যে আপনার কী মনে হয় পুরো ব্যাপারটা আপনি ঠিকঠাক বুঝতে পেরে গিয়েছেন?”

“মনে তো হচ্ছে…” বলতে বলতে কেলস্যাঙ্গ এবার এগিয়ে গিয়ে স্ফটিকের খাঁচায় ঢুকে পড়ে। খাঁচাটার ভেতরে সামনের দিকে একটা অর্ধবৃত্তাকার কন্ট্রোল প্যানেল। একগাদা ডায়াল, নব আর স্যুইচের মধ্যমনি হয়ে তাতে আবার একটা মোটর গাড়ির মতো স্টিয়ারীং হুইল। হুইলের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে একটা ডিসপ্লে ইউনিটের সঙ্গে একটা নাম্বার প্যাড। নাম্বার প্যাডের ডিজাইনটা ঠিক একটা ক্যালেন্ডারের মতো। সাল, মাস আর দিন— শূন্য থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার আটটা সারি— সংখ্যা বাড়িয়ে কমিয়ে যে কোনো একটা দিনের তারিখ তৈরি করা যাবে।

কেলস্যাঙ্গ ঢুকে হুইলে হাত রেখে সামনের চেয়ারে বসে পড়ে। বলে, “মনে তো হচ্ছে যে বুঝে গিয়েছি।”

খাঁচার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জেনারেল মাথা নেড়ে হাসেন। বলেন, “জুঁ নি হাঁও ইঁয়ো। শুভেচ্ছা রইল।”

জনা দুয়েক উর্দি পরা সৈনিক কয়েকটা ছোটো বড়ো প্যাকেট আর বাক্স নিয়ে এসে খাঁচার পেছনের দিকের ক্যাবিনেটের মধ্যে রাখছিল। কেলস্যাঙ্গ ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নিয়ে আবার জেনারেলের দিকে তাকায়। জেনারেল ততক্ষণে ঢুকে এসেছেন। হুইলের ডান দিকে প্যানেলের ওপরে একটা ছোটো থিংক প্যাডের মতো কম্পিউটার। জেনারেল পাশওয়ার্ড টাইপ করে একটা প্রোগ্রাম চালু করলেন। একটা গ্লোবের মতো ত্রিমাত্রিক পৃথিবীর ছবি মনিটরে ফুটে উঠল। মনিটরের ওপরের ডান দিকের কোনে অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশের সংখ্যা লেখার পাশাপাশি দুটো শূন্য খোপে কার্সার দপদপ করছে। জেনারেল একটা ফাইল থেকে দেখে কয়েকটা সংখ্যা তাতে টাইপ করে সেভ বাটনটা টিপে দিলেন। তারপর দ্রুতগতিতে হুইলের কন্ট্রোল প্যাডের সংখ্যাগুলো একটার পর একটা টিপতে থাকলেন। নির্দিষ্ট তারিখটা ডিসপ্লে ইউনিটে ফুটে ওঠার পর ঘুরে কেলস্যাঙ্গের দিকে তাকালেন। কেলস্যাঙ্গ তখনও দপদপ করতে থাকা তারিখ আর অবস্থানের ডিসপ্লে ইউনিট দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে।

জেনারেল জিয়াং কেলস্যাঙ্গের কাঁধে হাত রাখলেন। “এটা অতীত ভ্রমণের জন্য পরীক্ষিত আর যথেষ্ট ভরসা যোগ্য। সময় আর অবস্থান বিষয়ে এক-দুই পার্সেন্ট ভুলচুক হলেও হতে পারে। তেমন হলে দরকার মতো বাস্তব অবস্থান থেকে বিচ্যুতি হিসেব করে আপনাকে সামান্য পরিবর্তন করতে হতে পারে। তবে অসুবিধা খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। আশা করি সামলে নিতে পারবেন।”

শেষ কথাটার মধ্যে একটা প্রশ্নের আভাস কেলস্যাঙ্গ টের পায়। কিন্তু মুখে উত্তর না দিয়ে মাথা নেড়ে সায় দেয় শুধু।

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ থেকে জেনারেল জিয়াং বলেন, “আমরা সবাই আপনার অভিযানের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করব। এই অভিযানের সাফল্যের উপরে গোটা পৃথিবী আর আমাদের যাবতীয় আন্তর্গ্রহ উপনিবেশগুলোর ভবিষ্যত কোনদিকে যাবে তা নির্ভর করছে। তা ছাড়া এই অভিযান সমাজ বিজ্ঞানের আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করবে। বেশির ভাগ সমাজ-বিজ্ঞানীদের মতে অতীতকে পরিবর্তন করা অসম্ভব। আর আপনি কিন্তু যাচ্ছেন ঠিক সেই অসম্ভব কাজটাই করে দেখাতে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এটা সম্ভব। তাই আমি চাই আপনার অভিযান চিরকালের জন্য এই প্রশ্ন নিয়ে ওঠা যাবতীয় তর্ক-বিতর্কের নিষ্পত্তি করে ফেলুক।”

কেলস্যাঙ্গের আঙুল এখন হুইলের কন্ট্রোল প্যানেলে।

“আরেকটা কথা,” জেনারেল বলে ওঠেন, “আপনাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার প্রয়োজনের বাইরে এই স্ফটিক যানের খাঁচা কিন্তু কোনো কারণেই ব্যবহার করবেন না। আমাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে সারাক্ষণ এর রেডিয়েশন ট্রেসিং করা হবে। আর চাইলে যে কোনো মুহূর্তে আমরা এটাকে আমদের সময় রেখায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারব। আপনাকে সহ অথবা আপনাকে ব্যতীত। ঠিক আছে? বঁ ভয়েজ।”

কেলস্যাঙ্গ কোনো উত্তর দেয় না। খাঁচাটা বন্ধ হয়ে গেল। আঙুল দিয়ে হুইলের কন্ট্রোলে চাপ দিল কেলস্যাঙ্গ। তারপর খুব সাবধানে হুইলটা ঘুরিয়ে দিল যতক্ষণ না স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

বন্ধ হতেই যতক্ষণে ও পাশের টেবিলে ট্রের ওপরে রাখা সেই প্লাস্টিকের ব্যাগটার দিকে তাকিয়েছে ততক্ষণে স্ফটিকের খাঁচার বাইরের সব কিছু ধীরে ধীরে আবছা হতে শুরু করে দিয়েছে। আবছা হতে হতে এক সময় বাইরের যাবতীয় দৃশ্য পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল। চারপাশ ঘিরে রইল শুধু ধূসর পান্ডুবর্ণের এক নিস্তরঙ্গ সমুদ্র। চরাচর যেন ডুবে গিয়েছে সেই পান্ডুবর্ণ সমুদ্রে।

অনেকক্ষণ তারপর আর কিছুই রইল না। মানে স্ফটিকের জালের মতো খাঁচাটার বাইরে অনেকক্ষণ আর কিছুই রইল না। সব কিছু যেন ঘষা কাচের ভেতর থেকে দেখার মতো মনে হচ্ছে। ধূসর রং ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কিছুই নেই। হিজিবিজি নানান চিন্তা কেলস্যাঙ্গের মনের মধ্যে আসছে আর যাচ্ছে। লোকটাকে চিনবে কী করে? কীভাবে আগাম নিশ্চিত হবে? ঠিক কেমন দেখতে লোকটি? তার নাম কি? ঠিক কী বলেছিল সেদিন? বলার আগে কোথায় ছিল? কী করছিল? লোকটা কি আশপাশের কোনো সাধারণ মানুষ? নাকি কোনো অদ্ভুত বিদেশি ভবঘুরে? নাকি লোকটা সত্যিই কল্কি অবতার?

মাথাটা দু-তিন বার ঝাঁকিয়ে নিয়ে আলতু ফালতু চিন্তা ভাবনা তাড়ানোর চেষ্টা করে কেলস্যাঙ্গ। ওয়াইজে-৯০২ বন্দুকটা তুলে মাজলটা গালের পাশে চেপে ধরে। বরফ-শীতল ধাতুর পেলব নলটা ওর শরীরে একটা ঠান্ডা শিরশিরানি ছড়িয়ে দেয়। বর্তুলাকার বাঁটটা শক্ত করে ধরে কয়েকবার নলের মাছি বরাবর চোখ রেখে লক্ষ্য স্থির করার অভ্যাস করে কেলস্যাঙ্গ। দারুণ দূর্দান্ত একটা কেজো বন্দুক এটা। তেমন দৃষ্টিনন্দন নয়। তবে এমন একটা বন্দুকের প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছে করছে কেলস্যাঙ্গের। আহা! মঙ্গলে মরুভূমির বুকে উপুর হয়ে শুয়ে লম্বা লম্বা হিম শীতল রাতগুলোতে নিকষ কালো অন্ধকারে চলন্ত প্রাণীগুলোর জন্য যখন দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করত তখন যদি ওর হাতে এমন একটা জিনিস থাকত! আহা আহা!

আবার সেই উলটোপালটা ভাবনা চিন্তা! বন্দুকটা নামিয়ে রেখে দেয় কেলস্যাঙ্গ। প্যানেলের ডায়ালগুলোর দিকে তাকায়। প্রতি মুহূর্তে ডিসপ্লে ইউনিটে ফুটে ওঠা সংখ্যাগুলোর মান ক্রমশ কমে আসছে। কমে আসা সংখ্যাগুলোর দিকে কেলস্যাঙ্গ তাকিয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। একটু পরেই বাইরের সর্পিল কুয়াশা ঘনীভূত হতে শুরু করে। ডিসপ্লে ইউনিটে সংখ্যাগুলো এখন স্থির হয়ে আসছে। হঠাৎ করে যেন চারপাশের সবকিছু জেগে উঠতে শুরু করেছে। একটা দুলুনি টের পায়। কানে আসে মৃদু কিছু শব্দের গুঞ্জন।

আর একটু পরেই স্ফটিকের জালের বাইরে উদ্ভাসিত হয় রং, গুঞ্জরিত হয় শব্দ, জেগে ওঠে চরাচর। কন্ট্রোল প্যানেলের স্যুইচ বন্ধ করে, হুইলটা লক করে দেয় কেলস্যাঙ্গ। তারপর উঠে দাঁড়ায়।

***

সে এখন দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোটো পাহাড়ের নীচের দিকের ঢালের গায়ে একটা নাতিপ্রশস্থ সমতল পাথরের চাতালের ওপরে। সূর্য প্রায় মাথার ওপরে। এখন দুপুর। তা সত্ত্বেও হিম শীতল বাতাস শনশন করে বইছে। রোদ আছে, তাতে তাপ সম্ভবত নেই। নীচে দূরে একটা রাস্তা অজগরের মত শীতল রোদে গা এলিয়ে পড়ে রয়েছে। পরপর কয়েকটা মোটর গাড়ি চলে গেল। গাড়িগুলোর মডেল কেলস্যাঙ্গের অচেনা। আকার আকৃতিতে অনেক পুরোনো দিনের মনে হচ্ছে। যখন গাড়ি শুধুমাত্র রাস্তায় চলত তখনকার। পাহাড়ের ঢালটা ধাপে ধাপে নেমে তুষারাবৃত একটা সমতল এলাকা পেরিয়ে রাস্তাটায় গিয়ে উঠেছে। তারপর রাস্তার ওদিকে উঁচু নীচু পাথরের এলাকা। বরফে সাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একসারি গাছপালা। রাস্তাটা বহু দূরে আবার একটা পাহাড়ের পায়ের সামনে গিয়ে একটা জঙ্গলে ঢুকে গেছে। সে খাঁচার দরজা খুলে এখন বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ঠান্ডা যতটা ভেবেছিল ততটা নেই। সে বাতাসের গন্ধ শুঁকে দেখে। বুক ভরে বড়ো বড়ো শ্বাস নেয়। এখন বেশ ভালো লাগছে। বহুদিন যেন কোনো মানসিক চাপের মধ্যে ছিল। এখন নিজেকে হালকা লাগছে। আরো একটু সময় দাঁড়িয়ে থেকে চারদিক ভালো করে বুঝে নিয়ে সে খাঁচার দিকে ফেরে। তৈরি হয়ে নিতে হবে।

স্ফটিকের খাঁচার ভেতরে শেলফের উপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রতিবিম্বে ফুটে ওঠা মানুষটার চেহারার বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করছে। সে তার দাড়ি সমানভাবে ছেঁটে নিয়েছে। বহুদিন হল সে দাড়ি কাটেনি। তাকে তারা সেটা কাটতে দেয়নি। মাথায় চুল ছোটো করে ছাঁটা আর সুন্দর করে আঁচড়ান হয়েছে। তার পরনের পোশাক পুরোনো ধাঁচের এবং ত্রয়োবিংশ শতকের মানানসই। পকেটে সেই সময়ের টাকা-পয়সা। এটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সেই সময়ে কাগজের টাকার প্রচলন খুব কমে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষ সাধারণত ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড কিংবা বিভিন্ন ই-ওয়ালেট ব্যবহার করত। শুধু খুচরো হাতবদলের জন্য বা নীচু শ্রেণির মানুষেরা সরাসরি কাগজের নোট ব্যবহার করত। কিন্তু ওর জন্যে এই সময়ের কোনো কার্ড বা ওয়ালেটের ব্যবস্থা করা যায়নি। সে এখন জানে যে এটা সম্ভবত একটা চোখে পড়ার মতো ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে। আপাতত কিছু করার নেই।

কিছু করার প্রয়োজনও নেই। এইসব আনুষঙ্গিক ব্যাপারের ওপরে সে কখনোই ভরসা করে থাকেনি। জীবন যুদ্ধের শুরু থেকেই তার কাছে তেমন কিছুই ছিল না। তার ভরসার জায়গা তার বুদ্ধিমত্তা। একমাত্র যে জিনিসটা জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে তার সঙ্গে সবসময়ই থেকেছে। কিন্তু এর আগে কখনো এই রকম পরিস্থিতিতে তার ব্যবহার কখনো তাকে করতে হয়নি।

এই মহাজগতে জীবন এক মহান এবং অমূল্য জিনিস। প্রাণের একমাত্র লক্ষ্য নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। সেই লক্ষ্যে যে কোনো লড়াই সাদরে স্বাগত। যারা পিছিয়ে যায় তারা আসলে ভবিষ্যৎ আর বর্তমানের মধ্যে পার্থক্য দেখতে পায় না। এই মহাজগতে এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান সময় জানে না।

স্থির লক্ষ্যে এবার সে নেমে আসে রাস্তায়। হাঁটতে থাকে শহরের দিকে।

শহরটা খুব বড়ো নয়। আবার গ্রাম বলেও মনে হচ্ছে না। বরং সব রকমের সুবিধা সম্বলিত একটা মফস্বল বলাই সঙ্গত হবে। জনবসতির ঘনত্ব কিছু জায়গায় খুব বেশি। আবার কিছু জায়গা ফাঁকা এবং নির্জন। শহরে ঢোকার মুখে মোটর গাড়ির ফিলিং স্টেশন। হাইড্রোজেন ফিলিং আর ব্যাটারি চার্জিং দুয়েরই ব্যবস্থা রয়েছে দেখা যাচ্ছে। ম্যাগলভ গাড়ির ব্যবস্থাপনা দেখা গেল না। এখনো বোধহয় এখানে চালু হয়নি। একটা গ্যারেজ, কয়েকটা মোটেল। পথে দু-তিনটে শপিং মল পেরিয়ে এল। এখন পথের দু-পাশে সাধারণ ঘরবাড়ির ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। এবার একটা বাজার এলাকা। ম্যাগাজিন স্ট্যান্ডের দিকে নজর দেয় সে। আজকের তারিখটা মিলিয়ে দেখা জরুরি সবার আগে। ৫ ফেব্রুয়ারি, ২২৫১। বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছে সে। ঘটনাটা ২ অক্টোবর ২২৫০ খ্রিস্টাব্দের। তাকে তার আগে পৌঁছতে হবে। এবার আগে জায়গাটা বুঝে নেওয়া দরকার।

কয়েক মিনিট পরে সে একটা মঠের সামনে পৌঁছল। মন্দির গঠনের মঠ। সামনে অনেকটা খোলা জায়গা। ডানদিকে একটা ছোটো পাবলিক লাইব্রেরি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সে ঢুকে পড়ে। ভেতরটা বেশ গরম।

সৌম্যকান্তি লাইব্রেরিয়ান ভদ্রমহিলার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। পরনে হাতাবিহীন চুপার ওপরে মোটা পশমী চাদরের মতো কিছু জড়ানো। মাথায় ফিরোজা আর মুগার কাজ করা একটা কাঠের ধনুকাকৃতি টঙ্গী। বলীরেখাময় সুন্দর চকচকে মুখে একগাল হাসি। সরু চৌকো ফ্রেমের রিডিং গ্লাসটা নাকের ওপরে নামিয়ে রাখা। কেলস্যাঙ্গের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন, “শুভ অপরাহ্ন।”

উত্তরে সে শুধু হাসি মুখে অভিবাদন জানায়। মুখ খোলা উচিত হবে না। এদের উচ্চারণ তার কাছে যেমন অদ্ভুত মনে হচ্ছে, তারটাও এদের কাছে সেরকমই মনে হবে। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে সে একটা টেবিলে গিয়ে বসে। টেবিলের ওপরে এক সারি রিডিং প্যানেল। প্যানেলের মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকার আইকন জ্বলজ্বল করছে। আঙুলের ছোঁয়ায় দু-একটা পত্রিকা খুলে পাতা উলটেপালটে দেখে নিয়ে উঠে পড়ে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু খোঁজে। ঘরটার অপর প্রান্তে একটা দেওয়ালের সামনে পৌঁছে ওর বুকটা ধক্ করে ওঠে। যাক্, কাগজে ছাপা সংবাদপত্র তাহলে এখনো পর্যন্ত চলেছে! থাক থাক সংবাদপত্র ডাঁই করে রাখা। দেখে মনে হচ্ছে না যে ইদানিং কালের মধ্যে কেউ এগুলো ছুঁয়ে দেখেছে।

কেলস্যাঙ্গ ঘাড় ঘুরিয়ে একবার লাইব্রেরিয়ান ভদ্রমহিলার ডেস্কের দিকে তাকায়। প্রৌঢ়া চশমার ফাঁক দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। সে লক্ষ করে ভদ্রমহিলা হাসি মুখে মাথা হেলিয়ে তাকে ইশারায় দেখার জন্য সম্মতি দিচ্ছেন। সে এক পাঁজা সংবাদপত্র উঠিয়ে একটা টেবিলে গিয়ে বসে। দ্রুত চোখ বুলিয়ে চলে পাতা উলটে উলটে। ছাপা আর অক্ষর সব একটু যেন অদ্ভুত। কিছু কিছু শব্দ তার অপরিচিত। ভাষার ভঙ্গিতে একটা পুরোনো দিনের ছাপ। ইংরেজি আর চিনা শব্দের ব্যবহার খুব কম। ভোটিয়া শব্দের ব্যবহারের আধিক্য দেখা যাচ্ছে।

দেখা শেষ করে উঠে আরেক পাঁজা নিয়ে এসে বসে সে। এগুলো আরো কিছুদিন আগের। দ্রুত সন্ধানী চোখে পাতা উলটে যেতে থাকে। অবশেষে তৃতীয় বারের প্রচেষ্টার পরে সে যেটা খুঁজে পেতে চাইছিল সেটা পেয়ে গেল। ডেগে কাউন্টি ডেইলি গেজেট-এ পাওয়া গেল সেই বিশেষ খবরটা। একদম প্রথম পাতায় বাম দিকে ওপরে বড়ো বড়ো অক্ষরে ছাপা হয়েছে খবরটা—

“জেলে আত্মহত্যা অপরিচিত বন্দির”

স্টাফ রিপোর্টার: রাষ্ট্র বিরোধী প্রচার এবং উদ্দেশ্যমূলক অপরাধে গ্রেফতার অজ্ঞাত পরিচিত এক ব্যক্তিকে আজ সকালে কাউন্টি শেরিফের অফিসে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বিশ্বস্তসূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী কোনোরকম জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃত এই বিচারাধীন আসামী সম্ভবত গত রাত্রে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। যদিও তার মৃতদেহ আজ সকালে আবিষ্কৃত হয়, যখন…”

সে দ্রুত গতিতে পুরো খবরটা পড়ে ফেলে। কিন্তু স্টাফ রিপোর্টারের দেওয়া বিশ্বস্তসূত্রে পাওয়া ওই খবরটা একদমই অস্পষ্ট এবং তাতে প্রয়োজনীয় তথ্যের বড়োই অভাব। তার দরকার আরো তথ্য। সমস্ত সংবাদপত্রের গাদা উঠিয়ে সে জায়গা মতো রেখে দেয়। আশপাশের অন্যান্য তাকে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে আর কী কী পাওয়া যেতে পারে দেখে নেয়। তারপর তেমন কিছু খুঁজে না পেয়ে খানিকটা দ্বিধার সঙ্গে লাইব্রেরিয়ানের ডেস্কের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।

প্রৌঢ়া মুখে হাসি আর চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। সে তখনও দ্বিধায় ভুগছে যে মুখ খোলাটা ঠিক হবে কিনা। অথচ আরো তথ্য জানতে না পারলে তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না।

সে ছোটো ছোটো কাটা কাটা বাক্যে জিজ্ঞেস করে, “আর আছে? আরেকটু পুরোনো?”

প্রৌঢ়ার চোখে ভ্রুকুটি। “কত পুরোনো? কোন কাগজ?”

“গত মাসের… ইয়ে, গত মাস ছয়েকের।”

“আমাদের লাইব্রেরিতে মাস খানেকের বেশি পুরোনো কাগজ থাকে না। এখন তো আর বেশি লোক কাগজ পড়ে না। সরকারি লাইব্রেরি বলে এখনো এটুকু রয়েছে। কিছু দিন পর এও আর থাকবে না! সবাই তো আজকাল ডিজিটাল এডিশন পড়ে। ওই তো ওদিকে কম্পিউটার রয়েছে। লগ ইন করে দেখতে পারেন। সমস্ত পুরোনো এডিশন পেয়ে যাবেন।”

সে টের পায় বিপদ এবার যে কোনো সময়ে লাফিয়ে পড়তে পারে।

তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, “না, না। ধন্যবাদ। তেমন কিছু জরুরি নয়।”

“আহা! তাতে কী! আপনি ঠিক কী খুঁজছেন আমাকে বলতে পারেন। হয়তো আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”

সে চুপ করে থাকে।

“আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি যদি ডেগে কাউন্টি-র ডেইলি গেজেটের পেপার এডিশন পুরোনো কপি পেতে চান তো এক কাজ করে দেখতে পারেন। সামনে একটা বাজার পাবেন। তার আগের চৌমাথাতেই ওদের একটা অফিস আছে। ওখানে দেখতে পারেন। পুরোনো বিক্রি না হওয়া কাগজ ওরা জলের দরে বেচে দেয়। কপালে থাকলে হয়তো পেয়ে যাবেন,” স্মিত হাসেন প্রৌঢ়া লাইব্রেরিয়ান। এই বয়সেও যে সৌন্দর্য ভদ্রমহিলার চোখে মুখে লেগে আছে তাতে আগন্তুক নিশ্চিত বয়স কালে ইনি অবশ্যই এই জনপদের সুন্দরী শ্রেষ্ঠা না হলেও অন্যতমা ছিলেন।

সে কয়েক মুহূর্ত সৌন্দর্যময়ীর স্মিতহাস্য মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বাও করে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে পথে নেমে পড়ে। সংবাদপত্রের স্থানীয় অফিসটা তাকে দ্রুত খুঁজে পেতে হবে।

সে এখন রাস্তাটা ধরে যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে ফিরে যাচ্ছে। আসবার পথে বাজারটা পেরিয়েই এদিকে এসেছিল। এদিকের ফুটপাথ একটু বেশি ভাঙ্গাচোরা। পথের দিকে নজর রেখে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কথাটা তার মাথায় এল। জেনারেল এতরকম ব্যবস্থা করলেন, একটা রেসিডেন্ট আইডেন্টিটি কার্ড বানিয়ে দিলে এই ঝামেলাটা পোহাতে হত না! এখন কোনো কারণে সন্দেহবশত তাকে আটক করলে সেও তো ভবঘুরে অজ্ঞাতপরিচয় একটা মানুষ হিসেবেই থেকে যাবে!

সংবাদপত্রের স্থানীয় অফিসটা ছিল প্রধান সড়কের থেকে বেরোনো একটা অপ্রশস্থ পথের পাশে। সামনের গাড়ি পার্কিং-এর জায়গাটা যেমন ভাঙ্গাচোরা আর তার ওদিকে ভেতরে ঢোকার দরজাটাও যেন তেমনি কয়েক দশকের পুরোনো আর রং-চটা। বোঝা যাচ্ছে সংবাদপত্রের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন সুবিধের নয়। সে ভেতরে ঢুকে পড়ে। প্রথমেই একটা মাঝারি আকারের অফিস ঘর। একদিকে একটা ইলেকট্রিক হিটার জ্বলছে। ঘরটার উষ্ণতা বাইরের থেকে সামান্য বেশি। একটা খালি কাউন্টার। সে গিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করল। এক কোণে একটা সোফার ওপরে আধশোয়া হয়ে থাকা একজন মধ্যবয়স্ক ভারী শরীরের মোটা কাচের বাইফোকাল চশমা পড়া লোক। তাকে দেখে যেন উঠতে খুব কষ্ট হচ্ছে এমনভাবে উঠে ধীরে ধীরে কাউন্টারের দিকে লোকটা এগিয়ে এলো। মুখে একটা বিরক্তর ভাব। তার সঙ্গে গালের বেশ ক-দিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি।

একটা মিহি খসখসে গলার স্বর। ওই ভারী শরীরের সঙ্গে মোটেও মানানসই নয়। আওয়াজটা অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে উচ্চারণ করল, “এখানে আপনার কী চাই, মশাই?” লোকটা তিব্বতী লাসায় কথা বলছিল। কিন্তু ভোটিয়া জংখার একটা টান তাতে ভালোই বোঝা যাচ্ছে।

সে সিদ্ধান্ত নেয় জংখাতেই উত্তর দেবে। ওদিকে বেশ কিছুদিন কাজের সূত্রে সে ছিল। বলে, “আপনাদের কিছু পুরোনো কাগজ। গত ছয় মাসের পেলে ভালো হয়।”

সিদ্ধান্তটা মনে হচ্ছে কাজে লেগে গেল। লোকটা মোটা কাচের চশমার মধ্যে দিয়ে চোখ কুঁচকে তাকে দেখল। তারপর মাথাটা পেন্ডুলামের মতো দোলাতে দোলাতে বলল, “কিনতে হবে। আপনি কি ওগুলো কিনে নিতে চান?”

“হ্যাঁ,” বলে সে পশুর চামরার তৈরি কোটটার ভেতরের পকেট থেকে এক থোকা নোট বের করে দেখায়।

লোকটার চোখ দুটো কাচের ওপাশে চকচকে করে ওঠে।

“ঠিক আছে। একটু অপেক্ষা করুন। আমি নিয়ে আসছি,” বলে ভারী শরীরটা টেনে থপথপ করে ভেতরের একটা দরজা খুলে ঢুকে গেল। একটু পরে যখন সে ফিরে এল তখন তার দু-হাতে ধরা প্রায় এক পাহাড় কাগজের থাক। ওজনের চাপে শরীরের উপরের অংশ প্রায় কুঁজো হয়ে বেঁকে গিয়েছে। মুখ চোখ লাল এবং সে হাঁফাচ্ছে। খসখসে মিহি আওয়াজটা আবার বেজে ওঠে। “এই যে এখানে অনেক আছে। অন্তত বছর খানেকের। আপনি যদি আরো চান—”

যথেষ্ট। সে সময় নষ্ট করে না। কাগজের বিশাল বান্ডিলটা নিয়ে বেরিয়ে আসে। অফিসটা পেরিয়ে একটা ছোট্ট পার্কের মতো। গাছ-গাছালি। ফুল আর ঝরনা। কয়েকটা বসবার পাথরের বেঞ্চ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চারদিক। কোথাও তুষার জমা নেই। অর্থাৎ দেখভাল করার লোক আছে। সে বসে পড়ে একটা পাথরের বেঞ্চে। তারপর কাগজগুলো নিয়ে কাজে লেগে পড়ে।

***

সে যা খুঁজছিল শেষ পর্যন্ত সেটা পাওয়া গেল মাস চারেক আগে, অক্টোবরের তিন তারিখের কাগজে। খুব ছোট্ট করে ছাপা খবর। ভেতরের পাঁচের পাতায় নীচের দিকে। এতটাই ছোটো খবর যে আরেকটু হলেই চোখ এড়িয়ে যেত। এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা আছে যেগুলো সে তার জীবন কালে কখনো শোনেনি। পকেট অভিধান একটা সঙ্গে ছিল। শেষে সেটাও ব্যবহার করতে হল লেখাটা পুরোপুরি বোঝার জন্য। সে সাধারণত উত্তেজিত হয় না। তবে এবার তার হাত কাঁপছিল যখন সে খবরটা সম্পূর্ণ পড়ে ফেলল।

“অনুমতিহীন বিক্ষোভ প্রদর্শনের কারণে গ্রেফতার”

নিজস্ব সংবাদদাতা: গ্যাংচী – ৩ অক্টোবর – শেরিফ অফিস থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী গতকাল স্পেশাল অ্যাকশন ফোর্সের একটা দল বারখো রলুং-এর পার্শ্ববর্তী দি-কি-টো-মো-র ময়দান থেকে একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠনের অভিযোগে গ্রেফতার করেছে। নিজস্ব সংবাদদাতার প্রশ্নের উত্তরে শেরিফ আলি হামাদা জানিয়েছেন যে আসামী তার পরিচয় দিতে এখনো পর্যন্ত অস্বীকার করে চলেছে। শেরিফ আরো জানিয়েছেন যে লোকটিকে খুব সম্প্রতি এই এলাকায় দেখা গিয়েছিল এবং তখন থেকেই শেরিফ অফিসের এজেন্টরা তার ওপর নজর রেখে আসছে। বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী সিসিপি-র উচ্চ স্তরের নেতৃত্ব এবং পিআরসি-র অন্তত জেনারেল পদাধিকারী স্তরের নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই তদন্তের উদ্দেশ্যে ল্যাংডাউজিয়াং রিবাশে আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টার থেকে রওনা হয়েছেন। যদিও শেরিফ আলি হামাদা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। আরো জানা গিয়েছে—

গ্যাংচী। বারখো রলুং। দি-কি-টো-মো-র ময়দান। অক্টোবর ২২৫০। সে এবার নড়েচড়ে বসে। উত্তেজনায় তার শরীরের রক্ত সঞ্চালনের বেগ বেড়ে গেছে। শ্বাসপ্রশ্বাসের হার দ্রুত থেকে দ্রুততর। অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণের পরিমাণ যথেষ্ট বর্ধিত। এইটুকুই তার জানার দরকার ছিল। সে এবার উঠে পড়ে। গা-হাতপা ঝেড়ে নেয়। ঠান্ডা লাগছে। পায়ের নীচে জমি থেকেও ঠান্ডা উঠে আসছে। আকাশ পথে আজকের মতো পরিক্রমা শেষ করে সূর্য এখন প্রায় পর্বতশ্রেণির কিনারায় পৌঁছে গিয়েছে। দিন শেষ। সূর্য অস্ত যাবেন। তবে ইতিমধ্যেই সে উদ্দিষ্ট স্থান আর কাল নির্দিষ্ট করে ফেলতে পেরেছে। এটা একটা বিরাট সাফল্য। এবার তাকে শুধু ফিরে যেতে হবে, সম্ভবত কোয়ার্টেম্বরের শেষের দিকে, বারখো রলুং-তে—

সে এখন ফিরে চলেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র পার করে, বাজার পেরিয়ে, দোকানপাট আর ঘরবাড়ি পেরিয়ে সে ফিরে যাচ্ছে। আর কোনো ঝামেলা নেই। আর সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কঠিন কাজটা সে শেষ করে ফেলেছে। এবার শুধু জায়গামতো পৌঁছে যেতে হবে, একটা সরাইখানা বা হোটেল-মোটেল খুঁজে নেবে, কিংবা পরিচয়পত্রের ঝামেলা এড়াতে কোনো ধর্মশালা বা কোনো হোম-স্টে, একটা থাকার জায়গা আর খাবারের ব্যবস্থা… ব্যাস, তারপর তৈরি হয়ে শুধু অপেক্ষা কখন সেই মানুষটা এসে পৌঁছচ্ছে।

সবেমাত্র সে বাজার এলাকা পেরিয়ে শপিংমলগুলোর কাছাকাছি, যেখানে ডান হাতে একটা রাস্তা ল্যাংডাউজিয়াং-লাসা হাইওয়ের দিকে চলে গিয়েছে, সেই মোড়ের মাথায় এসে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই একজন মধ্যবয়স্ক মোটাসোটা মহিলা হাতে তিন-চারটে ব্যাগ বোঝাই জিনিসপত্র নিয়ে একটা মলের দরজা থেকে বেরিয়ে তিন-চার ধাপের সিঁড়ি ভেঙে রাস্তার ওপরে হুড়মুড় করে নেমে এলেন। আরেকটু হলেই ধাক্কাটা জবরদস্ত হত। হল না কারণ সে ব্যাপারটা খেয়াল করতে পেরে শেষ মুহূর্তে এক পাশে সরে গেল। ভদ্রমহিলা হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। পরনে পশমী গাউন আর উলের চুপা। পায়ে শোম্পা। কোমরের নীচে সামনের দিকে অ্যাপ্রন জাতীয় একটা কাপড়। মাথায় একটা নেউলের চামড়ার স্কার্ফ। মৃদু হেসে সে বাও করতে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে হঠাৎ দেখা গেল ভদ্রমহিলার মুখ সাদা হয়ে গিয়েছে। সে খেয়াল করে যে ভদ্রমহিলার চোখ বিস্ফারিত, মুখ হাঁ। তাকিয়ে আছেন তারই দিকে।

সে টের পায় কোথাও একটা কিছু গড়বড় হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি এগিয়ে যায় সে। খানিকটা গিয়ে একবার ফিরে তাকায় পেছনে। বোঝার চেষ্টা করে গড়বড়টা কী হতে পারে। সে কী কোনো ভুল করে ফেলেছে? দেখতে পায় ভদ্রমহিলা তখনও তাকিয়ে আছেন। তার শরীরের ভঙ্গিমায় একটা হতভম্ব ভাব তখনও। হাতের ব্যাগ ব্যাগেজ সব মাটিতে পড়ে আছে। সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। পথ পরিবর্তন করে পাশের একটা গলি পথে ঢুকে পড়ে। খানিকটা গিয়ে গলিপথটা যেখানে বাঁক নিচ্ছে সেখানে পৌঁছে যখন সে আরেকবার পেছনে তাকায় তখন আশ্চর্য হয়ে দেখে সেই মহিলা ততক্ষণে গলির মুখে এসে পড়েছেন। তার সঙ্গে এখন আরেকজন লোক। দু-জনেই এখন গলির ভেতরে চলে এসেছে। দু-জনেই ছুটে আসছেন তারই দিকে।

কারণ যাই হোক, ঘটনা যেদিকে গড়াচ্ছে সেটা তার জন্য সুবিধাজনক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাড়া খাওয়া শিকারের মতো শিকারী আজ নিজেকে আড়াল করতে চাইছে! পথ অচেনা। কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আর সারা জীবনের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সে শহরের এ গলি, ও রাস্তা, দ্রুত একটার পর একটা বাঁক ঘুরে একসময় শহরের প্রান্তে পৌঁছে গেল। পেছনে ভিড়টা আর এখন দৌড়ে আসছে না। বড়ো রাস্তায় উঠতে গিয়েও সে নেমে পড়ল পাশের মেঠো পাথুরে জমিতে। রাস্তায় এখন গাড়ির ভিড় বেড়ে গেছে। হেডলাইট জ্বেলে গাড়িগুলো সবেগে যাতায়াত করছে। সে ভাঙ্গাচোরা আঁধারে ঢাকা পাথুরে জমির পথে চলতে থাকল। পাহাড়ের কাছে এসে ঢালটা বেয়ে পোড় খাওয়া পর্বতারোহী মতো দ্রুত উঠে গেল সে চাতালটার ওপরে। স্ফটিকের খাঁচার কাছে পৌঁছে তারপর সে দাঁড়াল দম নেওয়ার জন্য। মাথার মধ্যে তার অসংখ্য প্রশ্নের স্রোত। ধাক্কাটা লাগতে পারত, কিন্তু সেটা তো লাগেনি শেষ পর্যন্ত। কী ব্যাপারটা হল তাহলে? তার পোশাক পরিচ্ছদ? তাহলে লাইব্রেরিতে কিংবা গেজেটের অফিসে কোনো সমস্যা হল না কেন?

শহরের আলোকোজ্জ্বল দৃশ্যপটের দিকে তাকিয়ে খাঁচার সামনের চাতালে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় তখনও সেই চিন্তাভাবনা। তারপর অন্ধকার আরো ঘনিয়ে এলে, শীতল বাতাসে তুষার কণা যখন হাড় কাঁপিয়ে দিতে শুরু করল, তখন সে খাঁচায় ঢুকে পড়ল।

সোজা গিয়ে সে বসে পড়ল কন্ট্রোল প্যানেলের হুইলের সামনে। কিছুক্ষণের জন্য সে অপেক্ষা করল। আলতো করে হাত দুটো রাখা রইল হুইলের ওপরে। সে আরো কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে চাইছিল। সেই ফাঁকে সে কিছু হিসেব নিকেশ করে নিল। তারপর কিছু সংখ্যার যোগ বিয়োগ আর কয়েকটি বোতাম টিপে দেওয়া। তারপরেই সে হুইলটা ঘুরিয়ে দিল। খুব সাবধানে এবং আলতো করে। নজর ছিল মনিটরের ডিসপ্লে ইউনিটের সংখ্যাগুলোর পরিবর্তনের দিকে।

ধীরে ধীরে চারপাশের আলো আর অন্ধকার মিশে যাচ্ছিল ধূসর পান্ডুবর্ণের সমুদ্রে। একসময় সে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে গেল সেই স্থির সমুদ্রের গভীরে। এখন তার চারপাশে শুধুই ধূসরতা আর ধূসরতা।

তবে খুব বেশিক্ষণের জন্য এই অবস্থা রইল না।

***

ভদ্রলোক তাকে দেখছিলেন এমনভাবে যেন চোখে সিটি স্ক্যানার লাগিয়ে রেখেছেন। যেন তার শরীরের হাড়গোড়সহ প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খুঁটিয়ে দেখে তবেই থাকতে দেবেন কিনা তার সিদ্ধান্ত নেবেন। সে বুঝতে পারছে না পরিচয়পত্রের ঝামেলা এড়াতে হোটেলে মোটেলে না গিয়ে হোমস্টের সন্ধানে আসাটা তার সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা!

বারখো রলুং জায়গাটা পুরোপুরি এখন শহর হয়ে ওঠেনি। গঞ্জ মতো এখনো। জনবসতি ঘন, তবে শহরের সব ধরনের সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি। একটাই বাজার, তবে শপিংমল-টল খুব বেশি নেই। একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্স আছে। তবে ঘিঞ্জি বাজারটার পেছনে তিন-চারটে হোটেল ছিল। কিন্তু সে বাজারে খোঁজ খবর করে এই হোমস্টের দিকে চলে এসেছে। এখন বোঝা যাচ্ছে না এই মালিক ভদ্রলোক কী খেলা দেখাবেন।

“আপনি ভিতরে এসে কথা বললে ভালো করবেন,” ভদ্রলোক বলেন, “বাইরে যা প্রচণ্ড ঠান্ডা। বরং ভেতরে আসুন।”

বাইরে ক্রমাগত তুষারপাত হয়েই চলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় ১৬০০ ফুট উঁচু এই পর্বতময় জায়গাটায় মাস চারেক ছাড়া প্রায় সারা বছরই শীতকাল। এই সেপ্টেম্বরে খেত থেকে ফসল কাটা শেষ হয়ে গিয়েছে। পাহাড়গুলো সব বরফে ঢেকে যেতে শুরু করেছে। শরৎকাল আসছে। চারদিক সাদা ফটফট করছে।

“ধন্যবাদ।” সে কৃতজ্ঞচিত্তে খোলা দরজা দিয়ে বসার ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঘরটার এক কোণে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে। ঘরের ভিতরটা বেশ আরামদায়ক। ভেতর থেকে একটা দরজা দিয়ে একজন মধ্যবয়স্ক ভারিক্কী চেহারার মহিলা বেরিয়ে এলেন। পরনে পুরো হাতা সূতীর চোপা, তার ওপরে একটা ঢোলা পশমী গাউন। পায়ে শোম্পা। কোমরের নীচে সামনের দিকে অ্যাপ্রন জাতীয় একটা কাপড়। মাথার চুল উঁচু চূড়া করে বাঁধা। অ্যাপ্রনে হাত মুছতে মুছতে এলেন। সম্ভবত রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। মনে হল নিজেদের মধ্যে দু-জনে চোখে চোখে কোনো কথা বলে নিলেন। সে বুঝতে পারে যে দু-জনেই তাকে এখনো খুঁটিয়ে দেখে যাচ্ছেন। এত সাবধানতার কারণটা সে বুঝে উঠতে পারে না। সাধারণত হোমস্টের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার কথা না।

তবে একটু পরেই তার উদ্বেগ দূর হয়ে গেল। যখন ভদ্রমহিলা মিষ্টি হেসে তাকে বললেন, “আপনি ভালো জায়গায় এসেছেন। আমাদের ব্যবস্থাপনা আপনার ভালো লাগবে। আপনি কি ঘর পরীক্ষা করবেন?”

“না, না। দরকার নেই। আমার প্রয়োজন সামান্যই। মনে হচ্ছে কোনো অসুবিধা হবে না।”

“ওই সিঁড়ি বেয়ে ওপরের বাঁ দিকের দ্বিতীয় ঘরটায় আপনি থাকতে পারেন, ওটা খুব ভালো ঘর, আপনার কোনো অসুবিধা হবে না,” ভদ্রমহিলা বললেন। “আমি দোলমা রাবতেন। আর উনি আমার স্বামী সাংগমু। সাংগমু রাবতেন। আমাদের রাবতেন হোমস্টের প্রত্যেকটা ঘরেই কিন্তু ঘর গরমের ব্যবস্থা আছে। বছরের এই সময়টায় যেটা আপনার খুব কাজে লাগবে।”

“হ্যাঁ, ঠিক আছে।” সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, তারপর চারপাশে তাকায়।

“আপনি আমাদের সঙ্গে খাবার খাবেন তো?” দোলমা জানতে চাইলেন।

“কি?” সে প্রশ্নটা খেয়াল করেনি ঠিক করে।

“আপনি আমাদের সঙ্গে খাবেন তো?” ভদ্রলোক এবার মুখ খোলেন। তার ভ্রু কুঁচকে আছে। মনে হচ্ছে কিছু ভাবছেন। “মশাই, আপনাকে ঠিক পুরোপুরি বিদেশি বলে তো মনে হচ্ছে না, আপনি কি এখানকারই?”

এই সেই প্রশ্ন। এটার উত্তর হাসিমুখেই দিতে হবে। সে হাসে।

“না।” হাসিটা ধরে রাখে সে। “আমি এই দেশেই জন্মেছি। যদিও বেশ পশ্চিমে।”

“লংগনাও?” সাংগমু জিজ্ঞাসু হয়ে ওঠেন।

“না।” সে একটু ইতস্তত করে। “জিনলং।”

“জিনলং? কেমন জায়গাটা?” দোলমা কৌতুহলী হয়ে ওঠেন, “শুনেছি ওখানে প্রচুর গাছপালা আছে। এই বারখো রলুং-তো একটা নেড়া জায়গা। আমি বড়ো হয়েছি লাসায়। শহরের ভিড়-ভারাক্কা আমার একদম আর ভালো লাগে না।”

সাংগমু স্ত্রীকে থামিয়ে দেন। তার ভ্রু এখনো কুঁচকে আছে। “আপনি তো তাহলে এ দেশেরই মানুষ।

“জিনলং বিদেশ কেন হতে যাবে?”, সে হাসি মুখে ব্যাখ্যা করে, “ওই পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলো যেমন হয় আর কি! খুব কম লোকই নাম শুনেছে। ছোটো জায়গা। একটা প্রাচীন গুম্ফা ছাড়া আর কিছুই নেই। বেশির ভাগ মানুষ এক কালে শুধুই পশু চরাতো। এখন দুটো সরকারি খামার আর একটা চামড়ার কারখানা হয়েছে। কোনো হাইওয়ে নেই ধারে কাছে। আর জলের খুব অভাব . . .”

সে খেয়াল করে সাংগমু তার পরনের পোশাকের দিকে তাকিয়ে আছেন।

“আপনার এই স্যুটটা কিন্তু দারুণ। আমাদের এদিকে এরকম ডিজাইন পাওয়া যায় না। এটা কোথায় কিনেছেন?”

ধক্ করে ওঠে তার বুকের ভিতরে। মনে হল এক-দুটো হৃৎস্পন্দন যেন হারিয়ে গেল। অস্বস্তি ঢাকতে একবার নড়াচড়া করে নেয়। কিন্তু চুপ করে থাকাটা আরো সমস্যা তৈরি করতে পারে। প্রথমে ভাবটা এমন দেখায় যেন এটা কোনো মজার কথা। “আরে, এটা তো খুব সাধারণ একটা স্যুট, আমি আসলে দেশি পোশাক তেমন নিয়েই আসিনি!” তারপর যেন হঠাৎ বুঝতে পেরেছে এমন ভাবে বলে ওঠে, “আপনার যদি খারাপ লাগে তো আমি না হয় অন্য কোথাও চলে যাচ্ছি।”

উঠে দাঁড়ায় সে। হাত দুটো ঝেড়ে নেয় একবার। যেন বেরিয়ে পড়বে এক্ষুনি।

কায়দাটা কাজে লাগে। স্বামী-স্ত্রী দু-জনেই একসঙ্গে প্রায় রে রে করে ওঠেন। “আরে না, না। আমরা তাই বলেছি নাকি! বসুন, বসুন আপনি।”

নিরুপায় ভাব করে সে আবার বসে পড়ে।

দোলমার গোলগাল মুখের হাসিটা খুব মিষ্টি। হাসির মধ্যে একটা মা মা ভাব আছে। হাসি মুখে দোলমা আমতা আমতা করে করে বললেন, “আসলে আজকাল স্যাফ আর শেরিফের এজেন্টরা মাঝে মধ্যেই এসে ঝামেলা করছে। সংঘের লোকজন কোথায় আসছে যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে কী কথা হচ্ছে, হ্যানা-ত্যানা। এই আর কি! আপনি জানেন, সরকার সবসময় আমাদেরকে তাদের সম্পর্কে সতর্ক করছে!”

“কাদের সম্পর্কে?

“ওই যে বললাম, সংঘের লোকজন সম্পর্কে।”

“সংঘের লোকজন? মানে, তারা কারা?”

দোলমা উঠে গিয়ে দরজার বাইরে একবার উঁকি মেরে এলেন। ফিরে এসে আসনটা টেনে সামনে নিয়ে এসে ভালো করে বসে অ্যাপ্রনটা দিয়ে মুখ মুছে বললেন, “আপনি জানেন না? কিছু শোনেননি? চারদিকে মানুষেরা আবার সংঘের শরণ নিতে শুরু করেছে? দেশের যত মঠ আর গুম্ফা আছে, এমনকি যেখানে যেখানে বহু বহু দিন কোনো মানুষ প্রার্থনা করতেও যায়নি, আজকে প্রায় প্রতিদিন সেখানে প্রার্থনা করতে মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে?”

“তাতে কী? প্রার্থনা করা তো বেআইনি নয়?”

দোলমা তাকালেন সাংগমুর দিকে। সাংগমুর তাকে হাত তুলে থামতে ইশারা করে বললেন, “দ্যাখো দিকি, একটু চা হবে নাকি?”

দোলমা উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। সাংগমুর বললেন, “দেখুন, পঁচিশ বছর আগে মঠে প্রার্থনা করার ওপরে বাধা নিষেধ তুলে নিলেও দেড়শো বছরের অনভ্যাসে মানুষ সে সব ভুলেই গিয়েছিল। নতুন নতুন কলকারখানা। কত কত নতুন টেকনোলজি। আজ মানুষ চাঁদে যাচ্ছে তো কাল মঙ্গলে তাঁবু ফেলছে। শুনছি তো এবার নাকি ইউরোপায় ঘাঁটি তৈরি করবে। এদিকে শুধু তো যুদ্ধ আর যুদ্ধ। মানুষ খেতে পাচ্ছে কিনা ঠিক নেই, তবে গোলা-বারুদের অভাব কোথাও নেই। মানুষ ইদানিং আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। মঠে গুম্ফায় শ্রমণেরা আবার পুঁথিপত্র খুলে বের করেছেন। মানুষ যাচ্ছে। সংঘের শরণে যতটুকু যা মানসিক শান্তি পাওয়া যায়… নিন চা পান করুন। আজ ঠান্ডা আরো বেড়েছে মনে হচ্ছে।”

দোলমা চা নিয়ে এসেছেন। নুন আর মাখন দিয়ে তৈরি গেলাস ভর্তি গরম ধোঁয়া ওঠা চা, সঙ্গে কাঠের ট্রেতে শুকনো মাংসের টুকরো আর কাচের জারে ছঙ।

সে মাংসের একটা টুকরো মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। দোলমা চায়ে চুমুক দিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন, “আর এত যুদ্ধ ভালো লাগে না! রোজকার খবরে শুধু মানুষের মৃত্যুর খবর পেতে পেতে কেমন যেন মনে হয় আমরাও হয়তো মরেই গিয়েছি। আমাদের প্রাণহীন দেহগুলো শুধু খাচ্ছে দাচ্ছে আর ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

ঘরের পরিবেশটা কেমন যেন বিষাদগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বলে না। তিন জন নীরবে চা পান করতে থাকে। মাঝে মাঝে শুধু মাংস চিবোনোর আওয়াজ জানিয়ে দেয় যে সবাই জেগেই আছে।

একটু পরে দোলমাই আবার শুরু করেন। “আমরা নিঃসন্তান তাই, নইলে দেশে এমন একটা ঘর পাবেন না যাদের কোনো না কোনো সন্তান যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করছে। কে যে ফিরবে আর কে যে ফিরবে না, তা কেউ জানে না। যবে থেকে ওই দেশ সেবক বাহিনীর নামে কুড়ি বছরের বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যাওয়ার নিয়ম হয়েছে, গোটা দেশে একটাও পরিবার খুঁজে পাবেন না যারা শান্তিতে আছে। স্যাফের ভয়ে কেউ মুখ খোলে না সেটা অন্য কথা। খুললেই তো তাকলামাকানের বন্দি শিবির। আর পারা যাচ্ছে না!” দোলমা স্কার্ফটা টেনেটুনে গলা মাথা আরেকটু ভালো করে ঢেকেঢুকে নিলেন।

সাংগমু বললেন, “সে জন্যই তো মানুষ আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। তবে স্যাফ মনে হচ্ছে কিছু আন্দাজ করেছে। চারদিকে খোঁজখবর আর ধরপাকড় পুরো দমে চলছে।”

সে জিজ্ঞেস করে বসে, “স্যাফ মানে?” জিজ্ঞেস করেই যদিও নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে যায়।

সাংগমু সেটা খেয়াল করলেন কিনা বোঝা গেল না। “ওই তো স্পেশাল অ্যাকশন ফোর্স— লাল কোটের দল। ওদের দূর থেকে দেখলেই চেনা যায়। তবে চিনতে পেরেও লাভ কিছু নেই। ওরা সেই সিন্দবাদের দৈত্যের মতো। একবার বাগে পেলে আর ছাড়ান নেই।”

সে উদাসীনভাবে বলে, “তাতে আমাদের কী! আমরা সাধারণ মানুষ, সাতেও নেই, পাঁচেও নেই!”

“আছেন, আছেন। না থেকে কোনো উপায় নেই। আপনাকে বাধ্য করা হবে থাকতে। জানেন নিশ্চয়ই যে সরকারের তরফে রীতিমত প্রচার চলছে যে রাষ্ট্রদ্রোহীদের দল আমাদের চারপাশেই আছে… যে কোনো অদ্ভুত বা অস্বাভাবিক কিছু দেখলে বা জানলে আমাদের সেটা রিপোর্ট করার কথা। বিশেষ করে ওই অপরিচিত বা অজ্ঞাত কেউ যার আচরণ স্বাভাবিক বলে মনে হবে না।”

“আমার মতো?”

সরাসরি করা প্রশ্নের মুখে দম্পতিকে বিব্রত দেখাচ্ছিল। স্বামী ভদ্রলোক যেন জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললেন। “আরে না, না। আপনি মোটেও কোনো চীবরধারী নন। আর আপনাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেও আমাদের মনে হচ্ছে না।”

“চীবরধারী?”

“মানে ওই মঠের শ্রমণদের আজকাল ওরা ওইভাবেই উল্লেখ করছে। ওদের ওপরেই সবথেকে বেশি খাপ্পা। মানুষ দলবদ্ধ ভাবে প্রত্যেকটা মঠ আর গুম্ফার সামনে অহিংস প্রতিরোধ না করলে এতদিনে অনেক কিছু হয়ে যেত বোধহয়!”

দোলমা বললেন, “তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। দ্য ডেগে ট্রিবিউন বলছে যে আগামী দিনে জনগণের মধ্যে থেকেও বিদ্রোহের নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে। সরকার কড়া নজর রেখে চলেছে। সাধারণ মানুষকেও সরকারের তরফ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে যে—”

চা আর মাংস ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিন জনের হাতেই এখন ছঙে-র গেলাস। দোলমা বকবক করে চলেছেন। সাংগমু মাঝে মাঝে মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন।

সে কিন্তু আর ঠিক পুরোপুরি মন দিয়ে শুনছে না। এখন তার সামনে পুরো ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। এটাও বুঝতে পারছে যে যতটা ভেবেছিল কাজটা তার চেয়ে অনেক সহজে হয়ে যাবে। কল্কি অবতারই হোক বা কোনো চীবরধারী শ্রমণ কিংবা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহী সাধারণ মানুষ, লোকটা এই বারখো রলুং-এ হাজির হলেই সে জানতে পেরে যাবে। এই দোলমা বা সাংগমুর মতো মানুষেরাই লোকটার উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু করে দেবে। বাজারে ফিসফাস গুঞ্জন শুরু হয়ে যাবে আর সেই গল্প তার কানে আসবেই। তাকে শুধু চোখ আর কান খোলা রাখতে হবে। একটু হাটেবাজারে পথেঘাটে ঘোরাঘুরি করতে হবে। তার যা জীবিকা তাতে সেটা তার চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা রাখার অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছে। আর কপাল ভালো হলে এখানে এই হোমস্টে-তে বসে রাবতেন দম্পতির কাছেই হয়তো সেই খবরটা পেয়ে যাওয়া যাবে।

ছঙে-র গেলাসে শেষ চুমুকটা দিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায় সে।

“আমি কি ঘরটা দেখতে পারি?”

“অবশ্যই,” দোলমা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলেন। “আসুন। দেখার পর আপনার পছন্দ হবেই হবে। আমি একদম নিশ্চিত।”

দু-জনে সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসে ওপরে। ঘরটা ছোটো এবং কেজো। তবে অতিথির প্রয়োজনীয় আসবাব রাখা আছে। তবে যতটা বলেছিল ঘরটা তেমন গরম নয়। ঠান্ডা আছে। যথেষ্টই। তবে মঙ্গলের মরুর বুকে খোলা আকাশের নীচে যে রাতের পর রাত শিকারের অপেক্ষায় কাটিয়েছে, তার জন্যে এই ঠান্ডা কিছুই নয়। বরং গরম বলা যেতে পারে। রাত কাটানোর জন্য এই ঘরটা পেয়ে যাওয়ায় সে কৃতজ্ঞ। বার বার বাও করে সে ধন্যবাদ জানায় দোলমাকে।

***

শহরের মধ্যে এটা একটা বসতি এলাকা। সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি। দোকানপাট। সব পুরোনো দিনের মতো। বেড়ে ওঠার সময়, ছোটোবেলায় সে এ ধরনের ঘরবাড়ি, দোকানপাট শুধু বইয়ের পাতায় দেখেছিল। আর মঙ্গলে তো পুরোই অন্যরকম। তবে ভালো লাগছিল। এই যে মানুষ এত কাছাকাছি থাকছে, পরস্পর পরস্পরের সুখ দুঃখের ভাগীদার হচ্ছে, এ জিনিস সে ছোটো থেকে কখনো দেখেনি।

হাঁটতে হাঁটতে যেখানে এসে পৌঁছেছে সেখানে পাশাপাশি বেশ কিছু দোকান বাজার। সে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। বড়ো বড়ো কাচের পাল্লা ওয়ালা বিশাল বিশাল রেফ্রিজারেটরের ভেতরে নানান আকারের আর রঙের সব্জি, মাছ আর মাংসের ক্যান আর প্যাকেটে ভর্তি হয়ে আছে। সামনের কাউন্টারের ওপরে খোলা অবস্থায় ঢেলে রাখা আছে নানান কাঁচা সব্জি আর টুকটাক নানান জিনিস। মানুষজন দেখছে, দরদাম করছে, তারপর কেনাকাটা শেষ করে চলে যাচ্ছে। একটা জিনিস শুধু তাঁকে অবাক করল যে বেশির ভাগ মানুষই কাগজের নোটের বিনিময়ে জিনিস কেনাকাটা করছে। সে তো জানত দ্বাবিংশ শতাব্দীতে কাগজের নোটের বদলে সবাই ই-ওয়ালেট দিয়েই সব কাজ চালাত। ইউটিপি বা ইউনিভার্সাল ট্রেডিং পয়েন্ট চালু হয়েছিল অবশ্য আরো অনেক পরে।

টি-জয়েন্টটা চোখে পড়ল। যথেষ্ট লোকজন ভেতরে। সে এগিয়ে গিয়ে ভেতরে ঢোকে। কাউন্টারের ওপাশে ইনস্ট্যান্ট চা-কফির মেশিন, রোস্টেড গ্রাইন্ডেড কফির আলাদা মেশিন। তার সঙ্গে ইলেকট্রিকাল উনোনে ক্লাসিক্যাল তিব্বতী চায়ের ব্যবস্থা। বড়ো একটা ডেকচিতে চা ফুটছে। প্রথমে জল গরম করে চা পাতা আর তার সঙ্গে নুন ও কিছুটা সোডা দিয়ে ফোটানো হয়, তারপর সেই ফুটন্ত জলে কিছুটা মাখন ফেলে দিয়ে কাঠের মহুনী দিয়ে খুব করে মন্থন করে এই চা তৈরি করা হয়। সে ঠিক করল এখানে চা পান করবে। মানুষজনের কথাবার্তা শুনলে অনেক খবর এমনিতেই পেয়ে যাওয়া যাবে।

নতুন লোক দেখলে ওয়াংগমো খুশি হয়। অতিথি তথাগত। তা ছাড়া একজন খদ্দের তৃপ্ত হওয়ার অর্থ হল রোজকার বিক্রি-বাটার আরো একটু বৃদ্ধি। নতুন লোকটা ভেতরে ঢুকতেই ওয়াংগমো ফুন্টশোক তার দিকে এগিয়ে যায়। লোকটাকে তার কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। একে তো পোশাকটা যেন কেমন অদ্ভুত, তার সঙ্গে আবার উলু ঝুলু দাড়ি রেখেছে। ওয়াংগমো হাসি আটকাতে পারে না। বলে, “আসুন, স্যার। বলুন কী চাই?”

ওয়াংগমোকে হাসতে দেখে সে-ও হাসে। বলে, “কিছু না। এই চারদিকটা একটু ঘুরে দেখছি। একটু বসলে অসুবিধা নেই তো?”

“না, না। আপনি বসুন,” ওয়াংগমো পিছনের কাউন্টারের দিকে ফিরে গেল। মিসেস ওয়াংগমো একটা চাকা লাগানো ট্রলি ঠেলে বাইরের কাউন্টারের দিকে যাচ্ছিল। স্বামীকে ফিরে আসতে দেখে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কে লোকটা? আগে তো কখনো দেখিনি এদিকে!”

“আমি জানি না।”

মিসেস ওয়াংগমো তীক্ষ্ণ চোখে নতুন লোকটাকে দেখতে দেখতে ট্রলি থেকে কয়েকটা প্যাকেট বাইরের কাউন্টারের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা দ্রোনের বাক্সে ঢুকিয়ে পাশের মনিটরে কয়েকটা বোতাম টিপে দিতেই দ্রোনটা উঠে বেরিয়ে গেল।

মিসেস ওয়াংগমো ফিরে এসে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে, “আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে। লোকটা এরকম অদ্ভুত দাড়ি কেন রেখেছে? এরকম তো আজকাল আর কেউ রাখে না! কিছু একটা রহস্যময় ব্যাপার তো আছেই।”

ওয়াংগমো ফুন্টশোক স্যালাড কাটছিল। মাথা নীচু করে কাটতে কাটতে উত্তর দেয়, “আরে, হয়তো লোকটা দাড়ি রাখতে পছন্দ করে। আমার এক কাকা-ও দাড়ি রাখতেন, মনে নেই তোমার—”

“সে তো কায়দার দাড়ি। ফ্রেঞ্চ না কী একটা বলতো না? এক মিনিট, দাঁড়াও, মনে পড়েছে— এটা হচ্ছে ঠিক সেই রকম… ওইযে, তার নাম কী ছিল? সেই যে গো, লাল— অনেক দিন আগের কথা। সেই লোকটার তো দাড়ি ছিল, তাই না? হ্যাঁ, মার্ক্স। কার্ল— তার তো দাড়ি ছিল।”

ওয়াংগমো হেসে উঠল। “এই লোকটা কার্ল মার্কস না। মার্কস এখানে কোথা থেকে আসবেন? এখন খোদ চিন রাশিয়াতেও ওর নাম কেউ নেয় না। শুধু স্কুলের বাচ্চাদের ইতিহাস বইতে এসব এখন পাওয়া যায়। আমি সেই ছোটোবেলায় শুধু একবার তার একটা ছবি দেখেছিলাম।”

মিসেস ওয়াংগমো তার স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। “লোকটা বলেছিল সবার সমান অধিকার থাকবে।”

“সে তো অনেকেই বলেছিল। তাতে কী হয়েছে?”

“না। সে আমাদের কথা বলেছিল। শুধু সমান অধিকার না— সবকিছু সমান হওয়ার কথা বলেছিল। নারী-পুরুষ, গরীব-বড়োলোক সবার সবকিছু সমান থাকবে…”

“ভুল বলেছিল। সেটা বাস্তবে হতে পারে না। সরকার কখনো চাইবে তার আর মানুষের অধিকার কখনো সমান হোক? তাহলে তো সরকার যুদ্ধ চাইলেও আমরা কেউই বোধহয় আমাদের বাচ্চাদের যুদ্ধে পাঠাতাম না!” বলতে বলতে গলা ধরে আসে ওয়াংগমো। সে এখন তাকিয়ে আছে ক্যাশ কাউন্টারের ওপরে রাখা তাদের ছেলের ছবির দিকে।

মিসেস ওয়াংগমো তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। “আমার কথাটা একটু শুনবে?”

“অবশ্যই।” সে নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিল। “কী ব্যাপার বলো?”

“দি-কি-টো-মো— গ্রামের মঠে আজকাল অনেকেই যাচ্ছে প্রার্থনা করতে। শ্রমনেরা তথাগত আর পদ্মসম্ভবের বাণী পড়ে শোনাচ্ছে রোজ। চলো না আমরাও যাই। আমাদের এই দুঃখ-দুর্দশার কারণ খুঁজে বের করা হয়তো সম্ভব হবে। তথাগত তো বলেছেন সমস্ত রকম দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি সম্ভব। …আর আমি এই লোকটার সম্পর্কে আরো জানতে চাই, আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে এ কোনো সাধারণ মানুষ নয়। হয়তো… হয়তো, ইনি এমন কেউ যাকে তথাগত পাঠিয়েছেন আমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে… তুমি ছোটোবেলায় জাতকের গল্প তো পড়েছিলে নিশ্চয়ই।”

“সেদিন পাবে নোরবু এই রকমই কিছু একটা বলছিল। ভারতে নাকি সবাই বলছে যে সময় হয়েছে এবার ভগবান আবার নতুন অবতারে অবতীর্ণ হবেন। কী যেন একটা শ্লোক আর একটা নাম-ও বলেছিল— হ্যাঁ, ওই সম্ভবামি যুগে যুগে… ইয়ে, আরো অনেক কিছু, আর একটা নাম— কল্কি অবতার।”

সে চুপচাপ শুনছিল। এবার উঠে পড়ে। সে নিশ্চিত হয়। হ্যাঁ, এবার সময় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। সেই লোকটা যে কোনো দিন এসে পড়বে।

সে উঠে পড়ে।

***

পথটা এঁকে বেঁকে এগিয়ে গিয়েছে লাসার দিকে। দু-পাশে একদিকে কখনো পাহাড়ি বাঁক, অন্য দিকে বার্লি খেত তো কখনো একদিকে গভীর খাদ আর অন্যদিকে পাহাড়ের ঢাল খাড়া উঠে গিয়েছে। পাহাড়ের চুড়োয় আর পথের ধারে হালকা তুষার জমে আছে। হাওয়ার তেজ এখন তেমন নেই। মাঝে মধ্যে এক-আধটা গাড়ি হুশ হাশ করে এদিক থেকে ওদিকে চলে যাচ্ছে।

কেলস্যাঙ্গ হেঁটে চলেছে। উদ্দেশ্যহীন হাঁটা ঠিক নয়। প্রাথমিক উদ্দেশ্য এলাকার সবগুলো পথ ঘাট চিনে রাখা। কোন পথে কীভাবে তার শিকার এখানে আসবে সেটা তো জানা নেই। তাই চারদিক চেনা থাকলে ডি-ডে-র দিন সুবিধা হবে। তবে এই মুহূর্তে হাঁটতে হাঁটতে সে খানিকটা বেখেয়াল হয়ে পড়েছিল।

“আরে, মশাই! আত্মহত্যা করতে চান নাকি?” একটা তীব্র চীৎকারের মত ধমক আর ঠিক তার আগেই একটা গাড়ির প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষার আওয়াজ। তারপরেই ঝাঁঝালো গলার ওই চীৎকার।

কেলস্যাঙ্গ প্রায় ঝাঁপিয়ে পাশের দিকে সরে এসেছিল। বেখেয়ালে হাঁটতে হাঁটতে সে প্রায় মাঝরাস্তায় পৌঁছে গিয়েছিল। বহুদিন এমনভাবে রাস্তায় তার হাঁটার অভ্যাস নেই। সরে আসতে আসতেই তার হাত দ্রুত কোমরের বেল্টে পৌঁছে গেছে। আত্মরক্ষার প্রবণতা তার সহজাত। গাড়িটার দিকে তাকিয়ে তারপর সে হাঁফ ছাড়ে। গাড়িতে দু-জন অল্পবয়েসি তরুণ তরুণী। সে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসে। “দুঃখিত, একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। অনেক ধন্যবাদ প্রাণ বাঁচানোর জন্য।”

“কোথায় যাচ্ছেন?” খোলা জানলা দিয়ে তরুণী তার মুখটা বের করে জিজ্ঞেস করে। মেয়েটার গলা অসম্ভব রিনরিনে আর সুরেলা।

“কোথাও না। এমনিই ঘুরে বেড়াচ্ছি। যতদূর যেতে পারি যাওয়ার ইচ্ছে আছে।”

“ঘুরতে বেরিয়েছেন? আসবেন আমাদের সঙ্গে? আমরাও এমনিই ঘুরতে বেড়িয়েছি।”

“একসঙ্গে? অবশ্যই, আপনাদের অসুবিধা না হলে নিশ্চয়ই।”

চালক তরুণটিকে দেখা গেল না। গাড়ির পেছনের দরজা খুলে যেতে কেলস্যাঙ্গ উঠে পড়ে। দরজা টেনে বন্ধ করে দেয়।

তরুণী ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের পরিচয় দেয়, “আমি গুল্যাঙ্গ, গুল্যাঙ্গ কর্মা আর এ হচ্ছে আমার বন্ধু জিগমে জোন্তেন।”

জিগমে তাকায় না। উইন্ডস্ক্রিনের ভেতর দিয়ে সামনে চোখ রেখে বসে আছে। মনে হচ্ছে খুশি নয়। হওয়ার কথাও নয়। বান্ধবীকে নিয়ে হাওয়া খেতে বেরিয়ে কে-ই বা কাবাবে হাড্ডি পছন্দ করে! গাড়িটা হঠাৎ গতি বাড়িয়ে নিঃশব্দে চলতে শুরু করেছে।

“আমার এ ধরনের একটা গাড়িতে চড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। আপনাদের জন্য এ যাত্রায় সেটাও হয়ে গেল। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ,” কেলস্যাঙ্গ খুব সাবধানে কথাটা বলে। সে চায় না এই ছেলেমেয়ে দুটো তার কথাটার প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করুক। “আমি শহরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছিলাম, কিন্তু এটা যে এভাবে হয়ে যাবে সেটা আমার চিন্তার বাইরে ছিল।”

“আপনি কোথা থেকে আসছেন?” গুল্যাঙ্গ কর্মা জিজ্ঞেস করল। তার চেহারাটা ছোটোখাটো হলেও হলুদ সোয়েটার আর ছুপার ওপরে নীল লং স্কার্টে তাকে খুব সুন্দর আর মিষ্টি লাগছে।

“বারখো রলুং থেকে।”

“বারখো রলুং?” চালকের আসন থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নেয় জিগমে জোন্তেন। “এ তো আশ্চর্য ব্যাপার। আপনাকে আগে কখনো ওখানে দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না!”

“আপনিও ওখান থেকেই আসছেন?”

“আমার জন্ম-কর্ম সব ওখানেই। আমি ওখানকার সবাইকে চিনি।”

“আমি জিনলং-এর মানুষ। কয়েক দিন হল এখানে এসেছি।”

“জিনলং থেকে? আমি জানতাম না জিনলং-এর মানুষের কথার টান এরকম।”

কেলস্যাঙ্গ মুচকি হাসি হেসে জিজ্ঞেস করে “আমার কথার টান আছে?”

“আপনি যেভাবে বলছেন সেটা একটু কেমন যেন! যেন মজা করে টেনে টেনে শব্দগুলো উচ্চারণ করছেন।”

“সে আমি ঠিক বলতে পারব না। কিন্তু একটা অদ্ভুত সুর আছে। তাই না, গুল্যাঙ্গ?”

“আপনি একটু জড়িয়ে আর টেনে টেনে কথা বলছেন,” কথাটা বলে গুল্যাঙ্গ হাসে। তার মুক্তোর মতো দাঁতগুলো দেখা গেল। “আরো কিছু কথা বলুন। বিভিন্ন জায়গার উপভাষা আর উচ্চারণ নিয়ে আমার প্রচুর আগ্রহ।”

গুল্যাঙ্গ তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে হাসি। সরল নিষ্পাপ সুন্দর মুখ। মুক্তোর মতো সাদা দাঁত। চোখের মনিতে সবুজাভা। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মঙ্গলের শিকারী কেলস্যাঙ্গ টের পায় তার বুকের গভীরে কোথাও যেন একটা ড্রাম বাজতে শুরু করেছে। সে কোনোরকমে সামলে নিয়ে বলে, “আমার আসলে একটু জিভের সমস্যা আছে।”

“তাই!” গুল্যাঙ্গ চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায়। “আমি দুঃখিত।”

গাড়ি নিঃশব্দে ফাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই বলে জিগমে এখন গাড়িটা চালাচ্ছে ধীরে সুস্থে। দু-জনেই এখন মাঝে মাঝে পেছনে তাকিয়ে অপরিচিত লোকটাকে দেখে নিচ্ছে। একজন কৌতুহলের বশবর্তী, তো অন্যজনের মনে সন্দেহ।

পেছনের সিটে গা এলিয়ে আরাম করে বসা কেলস্যাঙ্গ আবার অন্য চিন্তায় চিন্তিত। শিকারের সম্ভাব্য খোঁজখবরের উদ্দেশ্যে এই তরুণ তরুণীকে তার কিছু প্রশ্ন করার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু সেটা কীভাবে পেশ করলে নতুন করে কোনো সন্দেহ তাদের মনে জাগ্রত হবে না সেটা নিয়ে সে নিজের মধ্যেই দ্বিধাগ্রস্ত।

নানান চিন্তা ভাবনা করে সে দু-জনের উদ্দেশ্যেই বলে ওঠে, “আমার ধারণা বাইরের লোকজন এখানে খুব একটা আসে না।” এক মুহূর্তের বিরতি দিয়ে আবার বলে, “মানে, বলতে চাইছি অপরিচিত কেউ। তাই না?”

“না।” জিগমে মাথা নাড়ল। “খুবই কম লোক আসে।”

এবার সে হাসে। পরিবেশটি একটু হালকা করে নিতে চায়। “বাজি ধরতে রাজি আছি যে আমিই সেই লোক যে কিনা বিগত বেশ কিছু বছরের মধ্যে বাইরে থেকে এখানে এসেছি।”

“আমারও সেরকমই মনে হচ্ছে।”

উত্তরটা কেলস্যাঙ্গকে যথেষ্ট শান্তি দিল। তাহলে শিকার এখনো পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি। আর অপেক্ষা করার অভ্যাস তার ভালোই আছে। কর্ণিকায় একবার টানা বাহাত্তর ঘণ্টা তাকে পাহাড়ের গভীর এক ফাটলে প্রায় ঝুলন্ত অবস্থায় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। শুধু রক্ষীবাহিনীর হাতে ধরা না পড়ার জন্য। এখানে তো তেমন কিছু ঝামেলাও এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি।

একটু ইতস্তত করে সে আরেকটা টোপ ফেলে। এটা নিশ্চিত করতে পারলে শিকরকে খুঁজে বের করার ব্যাপারটার খানিক হিল্লে হয়ে যাবে।

“আমার এক বন্ধু— বন্ধু মানে এই পরিচিত একজন, লাসায় যাওয়ার জন্যে এই পথেই আসবে বলে বলেছিল। বিশ্রাম নিতে হয়তো এখানে থামতেও পারে। আপনাদের মতে কীভাবে আমি তার খোঁজ—” থেমে গিয়ে সে ওদের মুখের হাবভাব বোঝার চেষ্টা করে। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে আবার বলে, “মানে এখানে এমন কেউ আছে যার কাছে এখানে যে-ই আসুক না কেন তার খবর পাওয়া যাবে? তাহলে আমি তাকে বলে রাখতে চাই যাতে এলেই আমি খবরটা পাই। সে ক্ষেত্রে আমি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হারাবো না। আছে কেউ?”

“আপনারা সেল ফোন ব্যবহার করেন না?”

“না, না। করি তো। তবে সে শুধু অফিসিয়াল আর পারিবারিক কাজে। কর্পোরেট আর সরকারের খবরদারির হাত থেকে বাঁচতে ছুটিতে থাকলে প্রাইভেসি রাখতে ওসব আর সঙ্গে রাখি না। আমার বন্ধুটি আবার আমার চেয়েও এক কাঠি বাড়া এসব ব্যাপারে!”

“ও!” জিগমে আর গুল্যাঙ্গ নিজেদের মধ্যে চোখের ইশারায় কথা বলে নেয়। তারপর মাথা নেড়ে গুল্যাঙ্গ বলে ওঠে, “সেরকম তো কেউ নেই। যদি না সে কোনো আইন ভাঙ্গে। সেক্ষেত্রে শেরিফ অফিস থেকেই সব জানতে পারবেন। শুধু আপনার চোখ কান খোলা রাখুন, তাহলেই হবে। বারখো রলুং এমন কিছু বড়ো জায়গা নয়।”

“হ্যাঁ। সে অবশ্য ঠিক কথা।”

চুপ করে যায় কেলস্যাঙ্গ। লেবু বেশি কচলানো ঠিক হবে না। ইতিমধ্যেই সেলফোনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। যা হোক করে সেটা সামলানো গিয়েছে। কে জানে কতটা বিশ্বাস করেছে যুক্তিটা। তবে বারখো রলুং-এও মোটামুটি দেখা গেছে বয়স্করা তেমন সেলফোন নিয়ে কেউ খুব একটা ঘোরাফেরা করে না। কাজেই তার দেওয়া যুক্তিটা বিশ্বাসযোগ্য হলেও হতে পারে।

এখন আর কেউ কথা বলছে না। জিগমের হাতে নিঃশব্দ গাড়িটা মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলেছে। সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথটা পাহাড়ের গা বেয়ে এগিয়ে গিয়েছে। পাক খেতে খেতে কোথাও ওপরে উঠেছে তো কোথাও নীচে নেমেছে। বরফ আর তুষার আর পাথরের মাঝেমধ্যে সবুজের ছিটে জায়গায় জায়গায়। কেলস্যাঙ্গ সবুজের দিকে, বরফের দিকে তাকিয়ে থাকে। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় মঙ্গলে কাটিয়ে দেওয়া কেলস্যাঙ্গের চোখে তুষারের শুভ্রতা আর সবুজের পেলবতা একটা ঘোর তৈরি করে ফেলেছে। কয়েকটা মাত্র জায়গায় যেখানে টেরাফর্মিং করে সবুজাভা দেখা যায় সেখানে জীবন কাটিয়ে দেওয়া যে কোনো মানুষের কাছেই এই সব দৃশ্য অকল্পনীয় আর মনোমুগ্ধকর। কিন্তু কেলস্যাঙ্গকে শুধু বাইরের প্রকৃতির দিকে দেখলে চলবে না। গাড়ির ভেতরেও প্রকৃতির উপস্থিতি আছে। লক্ষ্য তাকে সেদিকেও রাখতে হচ্ছে। একসময় পেছনের সিটে বসে সামনে চালকের পাশের সিটে বসা প্রকৃতির রূপরেখা অধ্যয়ন করার চেষ্টা শুরু করে। আকৃতিতে ছোটোখাটো আর রোগাটে গড়ন হলেও মেয়েটি সুন্দরী। মুগার কাজ করা স্কার্ফের নীচে খোলা জানালা দিয়ে আসা হাওয়ায় উড়তে থাকা চুলগুলো রুক্ষ হলেও মুখটা বেশ মিষ্টি। সব মিলিয়ে সৌন্দর্যের একটা বাহার আছে। প্রকৃতির পাশে বসা পুরুষটি বয়সে তরুণ হলেও হাবেভাবে যথেষ্ট বয়স্ক মনে হচ্ছে। শরীরে পেশির বাহুল্য নেই, কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে জিম করা চেহারা। চোখ মুখ কুঁচকে বাইরে তাকিয়ে আছে। মুখে একটা বিরক্তির ছাপ। সম্ভবত তরুণীর তাকে ডেকে গাড়িতে তুলে নেওয়াটা তার ঠিক পছন্দ হয়নি। না হওয়াটাই স্বাভাবিক। চালকের আসনে সে নিজে থাকলে সে-ও নিশ্চিত ভাবেই এটা অবশ্যই পছন্দ করত না। মেয়েটা সম্ভবত ছেলেটার প্রেমিকা। লিভ ইন পার্টনার-ও হতে পারে। তবে স্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে। এমনিতে কেলস্যাঙ্গের কোনো কিছুতেই কিছু এসে যাওয়ার কথা নয়। শ-দুয়েক বছর আগের কোন মেয়ে কার সঙ্গে কী সম্পর্ক তৈরি করেছে তাতে তার কী? কাজটা শেষ হলেই তাকে ফিরে যেতে হবে। কোনোভাবেই এখানে থেকে গিয়ে সময় রেখার ওলটপালট করাটা জেনারেল জিয়াং নিশ্চিত মেনে নেবে না। স্ফটিকের খাঁচাটার মতো তার নিয়ন্ত্রণটাও হয়তো জেনারেল জিয়াং হাতে নিয়েই বসে আছে।

কিন্তু কৌতুহল অতি মারাত্মক জিনিস। কেলস্যাঙ্গ ঠিক করে সে মেয়েটাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে। অবশ্য যদি পরে কোথাও দেখা হয়।

***

পরের দিন কেলস্যাঙ্গ শহরের উলটো দিকে অন্য একটা পথে হাঁটছিল। এদিকটায় ঘন জনবসতি। ঘরবাড়ি আর মানুষের ভিড়। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো বাজার। জেনারেল স্টোর, ফুয়েল স্টেশন, কয়েকটা অফিস বিল্ডিং। একটা বড়ো শপিং মল। অনেকক্ষণ হাঁটার পর মনে হল এবার মানুষের সঙ্গে কথা বলা যাক। তাকে খোঁজখবর নেওয়া চালিয়েই যেতে হবে। একটা স্থানীয় পাব দেখে কেলস্যাঙ্গ ঠিক করল যে ঢুকে পড়বে। দরজার সামনে কেলস্যাঙ্গ পৌঁছতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা দু-পাশে সরে গিয়ে খুলে গেল। ভেতর থেকে উষ্ণ বাতাসের দমকা এসে তাকে উষ্ণ অভিবাদন জানায়।

ভেতরে মাঝ বরাবর একটা ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দু-ধারে সার সার টেবিলের চারদিকে চেয়ার সাজানো। এখন এই সময়ে প্রায় বেশির ভাগই খালি। গুটিকয়েক টেবিলে কয়েকজন নারী-পুরুষ বসে নীচু গলায় কথা বলতে বলতে পান-ভোজন করছে। মাঝখানে ফাঁকা জায়গাটা সোজা পৌঁছে গেছে উপবৃত্তাকার কাউন্টারের সামনে। সেখানে উঁচু উঁচু বেশ কয়েকটা টুল রাখা। ওখানেই বার টেন্ডারের সামনে একটা উঁচু টুলে গুল্যাংঙ্গ বসে আছে। হাত দুটো কাউন্টারের ওপরে আলতো করে রাখা। একটা বড়ো জাগ ভর্তি বিয়ার সামনে রাখা। কথা বলছে কাউন্টারের উলটো দিকে অ্যাপ্রন পড়া মধ্যবয়স্কা বার টেন্ডারের সঙ্গে। মাঝে মাঝে খিলখিল করে হাত-পা নেড়ে হেসে উঠছে। উচ্ছল জলতরঙ্গের মতো সে হাসি। কেলস্যাঙ্গ গিয়ে পাশের খালি টুলটার ওপরে বসে পড়তেই গুল্যাংগ তার দিকে অবাক হয়ে তাকাল।

সংকোচের সঙ্গে কেলস্যাঙ্গ বলল, “এখানে বসে কোনো ভুল করলাম না তো?”

“না, না।” গুল্যাংগ মাথা নাড়ে। এতটাই অবাক হয়েছে যে তার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গিয়েছে। “একেবারেই না।” কেলস্যাঙ্গ কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে গভীর চোখ দুটোর দিকে। তারপর চোখ নামিয়ে নেয়।

বার টেন্ডার এগিয়ে আসে। “আপনি কী নেবেন?”

কেলস্যাঙ্গ গুল্যাংগের বীয়ারের গ্লাসটা দেখিয়ে বলে, “ওটাই দিন।”

গুল্যাংগ কেলস্যাঙ্গের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিল। কাউন্টারের উপরে কনুইয়ে ভর দিয়ে ঝুঁকে বসে আছে। পরনে ঢিলে ঢালা হাতা বিহীন ছুপা আর ছুপার নীচে থাকা পুরো-হাতার সুতির জামা। ঝুঁকে থাকায় বুকের গোপন সৌন্দর্য অনেকখানি উদ্ভাসিত। না চাইলেও কেলস্যাঙ্গের চোখ বারবার চলে যাচ্ছে সেদিকে। চোখে পড়তে গুল্যাংগ ঠোঁট টিপে হাসে। ধরা পড়ে গিয়ে কেলস্যাঙ্গ বোকাবোকা হেসে চোখ সরিয়ে বার টেন্ডারের দিকে হাত বাড়ায়। “কই হে, গ্লাসটা বাড়াও!”

নীরবে গ্লাসে ছোটো ছোটো চুমুক দেয় কেলস্যাঙ্গ। চোখ দুটো নিবদ্ধ গ্লাসের দিকে। যেন ওটাই এখন দেখার কথা। আরো কয়েকটা নীরব মুহূর্ত পার হয়ে যায়।

নীরবতা ভেঙে গুল্যাংগ হঠাৎ বলে ওঠে, “আপনার নামটা কী যেন? সেদিন তো আর জিজ্ঞেস করাই হল না!”

“কেলস্যাঙ্গ।”

“কেলস্যাঙ্গ? এটা তো আপনার উপাধি, তাই না? নাকি নাম?”

“উপাধি। দাচেন কেলস্যাঙ্গ আমার পুরো নাম।”

“দাচেন?” গুল্যাংগ হাসে। “পরম সৌভাগ্য? বাবাঃ! তারপরও কেলস্যাঙ্গ— অর্থাৎ চূড়ান্ত সৌভাগ্য! আপনার সঙ্গে পরিচয় হওয়াই তো সৌভাগ্যের ব্যাপার, ইয়ে, আপনাকে দাচেন বলে ডাকতে পারি?”

“নিশ্চয়ই। আমার সৌভাগ্য! আপনি তো গুল্যাংগ— মাতৃশক্তি! আপনার ছত্রচ্ছায়ায় আসতে পেরেছি এটাই তো আমার সৌভাগ্য!”

পরিবেশ এবার অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। নানান বিষয়ে কথা চলতে থাকে। গুল্যাংগের আগ্রহ গ্যাংচীর বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে। কেলস্যাঙ্গ বুঝে নিতে চায় এই বারখো রলুং-এর মানুষগুলোর সম্পর্কে।

গুল্যাংগের ঝলমলে, অকপট ও অনর্গল বাক্যধারা

কেলস্যাঙ্গের যাবতীয় আড়ষ্টতাকে ভাসিয়ে নিয়ে

যাচ্ছিল দূরে কোথাও। কেলস্যাঙ্গ বলতে চাইল, “গুল্যাংগ, তুমি সত্যিই দারুণ একটা মেয়ে। তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমি নিজেকে এতদিনে সত্যিই ভাগ্যবান মনে করছি।”

কিন্তু কিছুই না বলে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। গুল্যাংগ কিছু বলে যাচ্ছে। সে শুনতে পাচ্ছে না।

গুল্যাংগ খেয়াল করতেই থেমে যায়। লোকটা প্রায় হা করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সে লজ্জা পেয়ে যায়। তার মুখটা রাঙা হয়ে ওঠে। ঢোক গিলে সে কেলস্যাঙ্গের কাঁধে টোকা মেরে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কী করেন? আপনি কী কোনো মঠের সঙ্গে যুক্ত?” স্পষ্টতই সে প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাইছে।

“মঠ? ইয়ে, হ্যাঁ।” কেলস্যাঙ্গকে বিভ্রান্ত মনে হয়। বিয়ারের গ্লাসটা তুলে পর পর চুমুক দিতে থাকে। গুল্যাংগ তখনও তাকে দেখছিল। সে যেন আশ্চর্য হয়ে গেছে।

“আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে যে আপনি কোনো সাধারণ মানুষ নন। একজন বিশেষ কেউ… কেন বলুন তো?”

চমকে ওঠে কেলস্যাঙ্গ। আবার সজাগ হয়ে ওঠে শিকারী। তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, “না, না। আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ।”

“উঁহু। অসাধারণ না হলেও আপনি একজন অন্যরকম, বিশেষ কোনো মানুষ। জিগমের আপনাকে ভালো লাগেনি সেটা আলাদা ব্যাপার। সে তো একটু অন্যরকম হলেই ওর আর কাউকেই তেমন পছন্দ হয় না। কেমন যেন যন্ত্রের মতো হয়ে গিয়েছে! আপনি কি মনে করেন না যে একজন মানুষ যেমন যেমন বেড়ে ওঠে তেমন তেমন তার দৃষ্টিভঙ্গিও উদার হয়ে যাওয়া উচিত?

কেলস্যাঙ্গ মাথা নেড়ে সায় দেয়।

“কিছু ব্যাপারে ও একদম গোঁয়ার। ওর বক্তব্য রাষ্ট্র যেমন চাইবে মানুষকে ঠিক তেমনটাই হয়ে উঠতে হবে। সেই জন্যই ও চায় না বিদেশিরা এখানে আসুক। কিন্তু আপনি তো বিদেশি নন। এ দেশেরই মানুষ। হতে পারে আপনার ভাষা, আপনার পোশাক-আশাক অন্যরকম। তাতে কি-ই বা এসে যায়, বলুন?”

কেলস্যাঙ্গ মুখে উত্তর না দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।

এই সময় দরজাটা খুলে জিগমে ভেতরে ঢুকল। একেই বোধহয় বলে যে যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়।

জিগমে ঢুকেই তাদের দু-জনের দিকে তাকিয়ে রইল। “আচ্ছা, তো এই হচ্ছে ব্যাপার!”

কেলস্যাঙ্গ জিগমেকে দেখেই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বাও করে। “সুপ্রভাত, জিগমে।”

প্রত্যুত্তরে জিগমে মাথা নেড়ে শুধু বলে, “হুম্।” তারপর কাউন্টারের সামনে এসে একটা টুল টেনে কেলস্যাঙ্গের পাশে বসে পড়ে। কাউন্টারের উপরে ঝুঁকে কেলস্যাঙ্গকে পেরিয়ে সরাসরি তাকায় গুল্যাংগের দিকে। “হ্যাল্লো, গুল্যাংগ।” উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে না। মনোযোগ দিয়ে পালিশ করা কাঠের কাউন্টারের উপরে দশটা আঙুল দিয়ে কিছুক্ষণ ড্রামের বোল তোলে। তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে কেলস্যাঙ্গের চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন সুরে বলে ওঠে, “আপনাকে এখানেও দেখতে পাব আশা করিনি। ব্যাপারটা কী আপনার?”

কেলস্যাঙ্গ বিব্রত বোধ করে। একটু দুশ্চিন্তাও হয়। খুচরো ঝামেলা করার ইচ্ছে নেই তার। তবে ছেলেটার রেগে যাওয়ার কারণটা যে যৌক্তিক সে বিষয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। একটু হাসিও পায় তার। ছেলেটার ভাগ্য ভালো যে সে দু-আড়াইশো বছর পরে জন্মেছে। মুখে একটা কাঁচুমাচু ভাব বজায় রাখে। “কিছু কী ভুল করে ফেলেছি আমি?”

জিগমে প্রথমে ক্রুদ্ধ চোখে তাকায়। তারপর কেলস্যাঙ্গের কাঁচুমাচু গোবেচারা হাবভাব দেখে একটু যেন শান্ত হয়ে যায়। বার টেন্ডার মহিলা মনে হল জিগমেকে ভালোই চেনে। পানীয়ের গ্লাস বাড়িয়ে দিতেই জিগমে সেটা তুলে নিয়ে পর পর বেশ কয়েকটা বড়ো বড়ো চুমুক দেয়। তারপর কেলস্যাঙ্গের দিকে আবার তাকায়। “ঠিক আছে। ছাড়ুন এসব। নিজের কাজ করুন গিয়ে।”

তারপর আবার কিছুক্ষণ নীরবে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক আর তারপরেই হঠাৎ উঠে পড়ে গুল্যাংগের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। “চলো আমরা যাই…”

“যাব?” গুল্যাংগ অবাক। “কোথায়? কেন?”

“আরে, চলো এখান থেকে!” জিগমে তার হাত ধরে টানে। “চলো! গাড়ি বাইরে।”

“কেন, জিগমে? তুমি এমন কেন করছ?” গুল্যাংগ বসে থাকে। হাত ছাড়িয়ে নেয়। বলে, “তুমি মাথা ঠান্ডা করে আগে বসো তো!”

“এই লোকটা কে?” জিগমের গলায় ঝাঁঝ। “তুমি কি এর সম্পর্কে কিছু জানো? দেখতে পাচ্ছ না, লোকটা বিদেশি… দাড়ি রেখেছে—”

ভ্রু কুঁচকে তাকায় গুল্যাংগ। “তাতে কি? আর বিদেশি-ই বা কেন বলছো? গ্যংচীতে থাকে না বলে, না সরকারি চাকরি করে না বলে?”

জিগমে উত্তর দেয় না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। পানীয়ের গ্লাসটা ঠক করে নামিয়ে রাখল কাউন্টারের ওপরে।

কেলস্যাঙ্গ ছেলেটাকে মেপে নিচ্ছে। পেশিবহুল না হলেও বড়োসড়ো শক্তপোক্ত জিম করা চেহারা। সম্ভবত আরক্ষাবাহিনী বা সামরিক বাহিনীর কোনো দায়িত্বশীল পদে আছে।

“দুঃখিত,” কেলস্যাঙ্গ উঠে পড়ে। “আমি চলে যাচ্ছি।”

“গ্যংচীতে আপনি কেন এসেছেন?” জিগমে ছাড়ার পাত্র নয়। “এই বারখো রলুং-এ আপনি কী করছেন? কেনই বা গুল্যাংগের পেছনে লেগেছেন?”

কেলস্যাঙ্গ দাঁড়িয়ে পড়েছিল। একবার গুল্যাংগের দিকে দেখে নিয়ে জিগমের চোখে চোখ রেখে অবজ্ঞার সুরে বলল, “প্রথম দুটো প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে কোনো বিশেষ কারণ নেই। আর শেষেরটা আপনার ভুল ধারণা। যাই হোক, আমি চলে যাচ্ছি। পরে দেখা হবে।”

চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও আবার দাঁড়িয়ে পড়তে হল। জিগমে তার জ্যাকেটের কলারটা ধরে টান দিয়েছে। কাজেই আবার ঘুরতে হল। এখন শরীরের প্রত্যেকটা পেশি শক্ত হয়ে উঠেছে। চোখ দুটো লাল। জিগমে কিছু একটা আন্দাজ করে কলার ছেড়ে দিয়ে সরে গেল। ততক্ষণে কেলস্যাঙ্গের আঙুল তার কোমরের বেল্টে। বিড়বিড় করে নিজেকে সাবধান করতে থাকে সে। অর্ধেক চাপ, ব্যাস, আর না, শুধু অর্ধেক চাপ।

বলতে বলতে চাপ দিয়ে দেয় কোমরের বেল্টে।

ঘরটার ভেতরে তাকে বাদ দিয়ে তার চারপাশটা যেন লাফিয়ে উঠল।

অপরিবাহী একটা আস্তরণ পোষাকের নীচে পড়ে থাকায় সে নিজে সুরক্ষিত থাকলেও ইএমপি মেডুসার স্পন্দন ঘরের বাকিদের অবস্থা কাহিল করে দিল।

সবচেয়ে কাছে ছিল জিগমে। হাত বাড়লে ছোঁয়া যাবে দূরত্বে। একটা “আঁক” করে শব্দ এল সেখান থেকে। তারপরেই ধপ্। অস্ত্রটি এমনিতে প্রাণঘাতী নয়। তারপর সে অর্ধেকের চেয়েও কম শক্তি ব্যবহার করেছে। কাজেই একটু পরেই সবার মতোই জিগমেও উঠে দাঁড়াবে। যদিও হিসেব মতো তারপরেও আরো কিছুক্ষণ এর প্রতিক্রিয়া থাকবে। তবে ক্ষতি কিছু হবে না। গুল্যাংগ ছিল একটু দূরে। কাউন্টারে ভর দিয়ে। “ওহ্ গড্” বলে কাঁপতে কাঁপতে ওখানেই কাউন্টারে শুয়ে পড়ল। এটা অনাকাঙ্খিত ছিল। এই টুকুও। গুল্যাংগের প্রতি অন্যায় হল। কিন্তু কী করা যাবে! কোল্যাটারাল ড্যামেজ! বাকিরা ছিল বেশ কিছু দূরে দূরে। তাদের ওপরে খুব হালকা প্রভাব পড়বে। খানিক ঝনঝনানি আর অবশ ভাব। বড়ো জোর উঠতে গিয়ে পড়ে যাওয়া। তবে মারাত্মক ঘাবড়ে যাবে সবাই। এটার দরকার ছিল।

সে কোনো আঘাত কাউকে করেনি। কাউকে ছোঁয়নি পর্যন্ত। বাকি যা হয়েছে সেটা নিয়ে সবাই ভাবুক। সম্ভ্রম তৈরি হোক তার প্রতি। এই জিগমের মতো কেউ আর কিছু করার আগে ভাববে পাঁচ বার। হাতের কাজটা সারতে তাতে সুবিধা হওয়ার কথা।

সে বেরিয়ে আসে পাবের দরজা খুলে। পেছনে আর তাকিয়ে দেখে না। ইচ্ছে ছিল গুল্যাংগের কাছে থাকার। অন্তত সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত। হবে না। সমস্যা আরো বাড়বে। অন্য আর কোনো অস্ত্র ব্যবহার করার ইচ্ছে নেই।

খানিকটা গিয়ে একবার পেছনে ঘোরে। ঠিক বাঁকটা ঘুরে পাশের রাস্তায় ওঠার আগে। পাবের দরজার বাইরে তখন জিগমের বেরিয়ে এসেছে। দেওয়াল ধরে প্রায় মাতালের মতো টলমল করে চলার চেষ্টা করছে। তাকাচ্ছে এদিকে ওদিকে। বোধহয় তাকেই খুঁজে পেতে চাইছে।

বাঁকটা ঘুরে চলার গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যায় কেলস্যাঙ্গ।

***

বারখো রলুং-এর রাত্রির রূপ একদম অন্যরকম। কেলস্যাঙ্গ আজ হিমেল ঠান্ডার মধ্যে রাতের বারখো রলুং দেখতে বেরিয়েছে। শহরের যেখানে যেখানে মানুষের বসতি সেখানটা আলোয় ঝলমল করলেও আশপাশের এলাকাগুলো আলো-আঁধারে ঢাকা। একটু বাইরের দিকে কিছু কিছু জায়গায় আবার অন্ধকার এমন গভীর যেন কয়েক শো বছর আগের তিব্বত। দিনের ব্যস্ত পথঘাট হাটবাজার এখন প্রায় জনমানবহীন। গাড়ি ঘোড়া, মানুষ সবই চলাচল করছে, কিন্তু সেসবই মাঝেমধ্যে। ক্রমাগত তুষারপাত চলছে। খুব হালকা পেঁজা তুলোর সুতোর মতো তুষার নেমে আসছে।

কেলস্যাঙ্গ হাঁটছে। এদিকে অন্ধকার একটু বেশি। মেজাজটাও ভালো নেই। তারপর আর গুল্যাংগের সঙ্গে দেখা হয়নি। সেই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। হল না। মনটা অস্থির লাগছে। এখনো শিকারের কোনো নির্দিষ্ট খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেটা একটা দুশ্চিন্তার ব্যাপার হয়ে উঠেছে। আর ভালো লাগছে না। এখানে, এই সময়ে, এই স্থানে তার আসলেই কোনো অধিকার নেই। গুল্যাংগ আসলে অতীত। এর চেয়ে নিজের সময়ে ফিরে গিয়ে জেলে থাকলেও বোধহয় বেশি ভালো লাগবে। কেলস্যাঙ্গ হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠে।

হঠাৎ সামনে অন্ধকারে একটা বাঁকের কাছে পৌঁছোতেই একটা মানুষের ছায়া ছায়া অবয়ব তার সামনে যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়াল। কেলস্যাঙ্গ সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাতের মুঠো শক্ত, নিশ্বাস বন্ধ।

“কে?” বাজখাই পুরুষালি গলায় সামনের অবয়বটা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। কেলস্যাঙ্গ উত্তর না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নিতে থাকে।

প্রশ্নটা আবার আসে। “কে?” তার সঙ্গে সঙ্গেই কানে এল একটা শব্দ। “ক্লিক”। একটা আলো জ্বলে উঠল। কেলস্যাঙ্গ আলোর দিক থেকে মুখটা সরিয়ে নেয়।

“এই যে, আমি।”

“আমি কে”?”

“কেলস্যাঙ্গ আমার নাম। আমি রাবতেনদের ওখানে উঠেছি। আপনি কে?”

প্রতিপ্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অবয়বটা ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলো। এখন অনেকটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একজন মধ্যবয়স্ক গাট্টাগোট্টা চেহারার মাঝারি উচ্চতার মানুষ। পরনে আধা সামরিক উর্দী। উর্ধাঙ্গে চামড়ার জ্যাকেট। কোমরে একদিকে বন্দুক আর অন্যদিকে একটা লেজার স্টিক। মাথার গোলাকার টুপি আর জ্যাকেটের কাঁধে লাগানো পেতলের ব্যাজগুলো থেকে ধারণা করা যেতেই পারে যে লোকটা প্রাক্তন সেনা এবং বর্তমানে আরক্ষাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কেউ হবে। কপালের মাঝ বরাবর আড়াআড়ি একটা কাটা দাগ, চওড়া নাতিউচ্চ নাকের নীচে ছোটো করে ছাটা গোঁফ আর চৌকো চিবুকের রং-করা দাড়ি ইত্যাদি নিয়ে লোকটার মধ্যে ক্রুরতা যেন খলবল করছে।

একদম মুখের সামনে এসে লোকটা দাঁড়াল। হাতের আলোটা এখনো কেলস্যাঙ্গের মুখে তাক করা। বোঝা যাচ্ছে এ সহজ লোক হবে না। অসম্ভব আত্মবিশ্বাস লোকটার। নইলে অচেনা সন্দেহজনক কারো এত সামনে চলে আসতো না। এটাই হয়তো একটা মাত্র সুযোগ। যখন লোকটা শেষ পর্যন্ত তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য মুখ খুলল, তখন বাঁ হাতটা তুলে চোখের সামনে রেখে লোকটার শরীরের সক্ষমতা মাপছিল কেলস্যাঙ্গ।

“আমি আলি হামাদা। গ্যংচীর শেরিফ। আমার মনে হয় আপনি সেই ব্যক্তি যার সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই। আপনি আজ কানাকায় ছিলেন, এই তিনটে নাগাদ?”

“কানাকা?”

“বারখো রলুং-এর যে পাবে ঢুকেছিলেন। যেখানে এখানকার বাচ্চারা সব আড্ডা মারতে যায়।” বলতে বলতে আলি হামাদা আরো এগিয়ে আসেন। হাতের আলোটা সোজা তাগ করে ধরেন কেলস্যাঙ্গের মুখের উপর। কেলস্যাঙ্গ অবশ্য চোখ বন্ধ করে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। “মশাই, আলোটা সরান আগে চোখের ওপর থেকে।”

কয়েক মুহূর্তের মানসিক যুদ্ধ। তারপর সেই বাজখাই গলাটা একটু নরম হল। “ঠিক আছে।”

আলোর রেখা এবার পথের উপরে। “আপনি ওখানে গিয়েছিলেন। ঠিক?”

“পাবের নামটা মনে নেই। তবে গলা ভেজাতে একটা পাবে ঢুকেছিলাম। সেটা ঠিক।”

“সেখানে আপনার আর জিগমে জোন্তেন বলে একজনের মধ্যে কিছু ঝামেলা হয়েছে। এটাও কি ঠিক? সেখানে আপনি ওঁর ভাবি স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করতে চেষ্টা—”

“অভিযোগটা কে দায়ের করেছে?”

“যেই করুক, আপনি শ্লীলতাহানি করতে চেষ্টা করেছিলেন, সেটা একটা গুরুতর অভিযোগ। আপনি কী আপনার দোষ স্বীকার করছেন?”

“আমাদের একটা আলোচনা ছিল, সেটা শেষ হতেই আমি ওখান থেকে চলে এসেছিলাম,” কেলস্যাঙ্গ খুব সাবধানে ভেবে চিন্তে উত্তর দেয়।

“ব্যাস? বেরিয়ে চলে এলেন? আর কিছু করেননি বেরোনোর সময়?”

“না তো! ওই ভদ্রলোক হঠাৎ আমার ওপরে ক্ষেপে উঠেছিলেন। ঝামেলা এড়াতে আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি।”

“উঁহু, শুধু বেরিয়ে পড়েননি। কিছু একটা হয়েছে সেই সময়। আপনি জানেন না?”

“না তো! আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন?”

“এমনই জিজ্ঞেস করছি না। কারণ আছে। সবাই বলছে যে আপনি কিছু করেছেন।”

“কিছু করেছি? কী করেছি?”

“আমি জানি না। সেটাই জানতে চাইছি। একটা ঝিলিক, হাওয়ার একটা ধাক্কা! সবাই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। কেউ নড়াচড়া করতে পারেনি বেশ কিছুক্ষণ।”

“তাই? এখন কেমন আছে সবাই?”

“এখন সবাই ঠিক আছে।”

কেলস্যাঙ্গ চুপ করে থাকে। আলি হামাদা নীরবে তাকে বেশ কিছুক্ষণ মেপে নিলেন। তারপর তীক্ষ্ণ নজরে কেলস্যাঙ্গের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তো? কী ছিল ওটা? বোমা?”

“বোমা?” কেলস্যাঙ্গ হো হো করে জোর গলায় হেসে ওঠে। “আরে, না, না। একটাই ব্যাপার হতে পারে। যতদূর মনে পড়ছে বেরোনোর সময়ে সিগারেট ধরাতে লাইটার জ্বালিয়ে ছিলাম। আমার লাইটারটা আবার ইদানিং একটু গড়বড় করছে। মাঝে মাঝে আগুনের শিখা ফস করে লাফিয়ে উঠছে। হয়তো তেমন কিছু হয়েছিল তখন। আর সেটাই হয়তো কেউ দেখে থাকবে।”

“তাহলে সবাই কেন তখন স্থবির হয়ে গিয়েছিল?”

“সেটা তো বলতে পারব না!”

আবার নীরবতা। নিঃশব্দে তুষার ঝরছে। আলি হামাদা কিছু ভাবছেন বলে মনে হচ্ছে। কাঁধের আর মাথার ওপর থেকে তুষার ঝেড়ে কেলস্যাঙ্গ একটু নড়েচড়ে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করছে শেরিফের প্রতিক্রিয়ার জন্য। নড়াচড়ার মধ্যেই খুব ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো কোমরের বেল্টের দিকে চলে গেল। শেরিফ তখন নীচের দিকে তাকিয়ে আছেন। একটু পরে গলা খাকারি দিয়ে সোজা হয়ে কেলস্যাঙ্গের দিকে চাইলেন। “যদি সেরকমই হয়ে থাকে… আপনার বক্তব্য অনুযায়ী… ঠিক আছে। যাইহোক, তেমন কোনো ক্ষতি যখন কারো হয়নি…” তিনি কেলস্যাঙ্গের মুখের সামনে থেকে সরে দাঁড়ালেন। তারপর একটু থেমে আবার বললেন, “অবশ্য ওই জিগমেটাও একটা নচ্ছার ছেলে…”

“শুভ রাত্রি, তাহলে,” কেলস্যাঙ্গ বলল। আর দাঁড়ায় না সে। শেরিফ আলি হামাদা পাশ কাটিয়ে এগোতে শুরু করে।

কয়েক পা মাত্র এগিয়েছে কি এগোয়নি, পেছন থেকে আওয়াজ আসে, “আর একটা কথা, মিস্টার কেলস্যাঙ্গ। কিছু মনে করবেন না। চাকরির খাতিরে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে। যাওয়ার আগে আপনার পরিচয়পত্রটা যদি একবার দেখান… আপনি কিছু মনে করছেন না তো?”

“না, না। এতে মনে করার কী আছে! এটা তো আপনি আপনার কর্তব্য করছেন।” কেলস্যাঙ্গ এগিয়ে আসে আবার। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনে মানিব্যাগটা। শেরিফ টর্চলাইট জ্বালিয়ে আলো দেখাচ্ছেন। মানিব্যাগে কয়েকটা নোট ছাড়া আর কিছুই নেই। কেলস্যাঙ্গ এ পকেট ও পকেট সব হাতড়ে খুঁজতে থাকে। মুখে চোখে একটা উদ্বিগ্ন ভাব। হামাদা তীক্ষ্ণ নজরে কেলস্যাঙ্গের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।

“কী হল? খুঁজে পাচ্ছেন না? নেই?”

কাচুমাচু অসহায় মুখে কেলস্যাঙ্গ তাকায় হামাদার মুখের দিকে। “মনে হচ্ছে ঘরে ছেড়ে এসেছি। কাল সকালে আপনার অফিসে গিয়ে দেখিয়ে এলে চলবে?”

“আপনি টাকাপয়সা নিয়ে বেরোতে ভুললেন না। শুধু ভুলে গেলেন সঙ্গে পরিচয়পত্র নিয়ে আসতে?”

শরীরটা শক্ত হয়ে ওঠে কেলস্যাঙ্গের। তবে মুখের অসহায় ভাবটা বজায় রাখে। “আসলে অনেকদিন পর আজ স্নানের জন্য কিছু জলের জোগাড় হয়ে গিয়েছিল। তাই পোশাক পালটে নিয়েছিলাম। তখনই বোধহয় পকেটের জিনিস এদিক ওদিক হয়ে গিয়েছিল। তবে চিন্তা করবেন না, আমি কাল সকালেই সব কিছু নিয়ে আপনার অফিসে পৌঁছে যাব।”

“হুম্। আপনি কোথায় থাকেন যেন?” আলি হামাদাকে একটু অন্যমনস্ক মনে হয়।

“আমি? ওই রাবতানদের হোমস্টে-তে উঠেছি।” প্রসঙ্গ পালটে যেতে দেখে কেলস্যাঙ্গ নিশ্চিত হয়। সম্ভবত আজ রাতটুকুর সময় পাওয়া যাবে।

“না, আমি জানতে চাইছি আপনি ঠিক কোথাকার বাসিন্দা?”

মুখস্থ করে রাখা তথ্যের মতো রাবতানদের বলা উত্তরটাই আবার দেয় কেলস্যাঙ্গ।

“স্যার, আমার আদি বাড়ি জিনলং-এ। পরিবার পরিজন আর কেউ বেঁচে না থাকায় ওখানে আর ভালো লাগছিল না। তাই লাসায় চলে যেতে চাইছি। ওখানে কোনো কাজকর্ম জুটিয়ে নিয়ে বাকি জীবনটা কোনোভাবে কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে আছে।”

“ও! পরিবার পরিজন কেউ নেই? তাই কি মেয়েটাকে পটানোর চেষ্টা করছিলেন? ওসব ভুলে যান। কাল সকালে কাগজপত্র সব দেখিয়ে বারখো রলুং ছেড়ে চলে যাবেন। ঠিক আছে? পরশু আপনাকে এদিকে কোথাও দেখলে সোজা জেলে ঢুকিয়ে দেব! বুঝতে পারছেন, আমি কী বলছি?”

“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই স্যার। আমি কালকেই আপনাকে কাগজপত্র সব দেখিয়ে এখান থেকে চলে যাব।”

“মনে থাকে যেন!” আলি হামাদা ঘুরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হোভারক্র্যাফ্টটার দিকে রওনা দিতেই কেলস্যাঙ্গ উলটো দিকে হাঁটা দিয়ে দেয়। পরিচয়পত্রটা নিয়ে ঝামেলা একটা হতে পারে বলে মনে হচ্ছিলই, কিন্তু সেটা যে এত তাড়াতাড়ি হবে সেটার আন্দাজ ছিল না। এদিকে এখনো শিকারের দেখা নেই। কখন কোনদিকে দিয়ে আসবেন তিনি সেটাও ঠিকঠাক বোঝা যাচ্ছে না। কাজেই নতুন কোনো ব্যবস্থা খুব তাড়াতাড়ি করে ফেলতেই হবে। এক্ষুনি এক্ষুনি যদি বারখো রলুং ছেড়ে চলে যেতে হয় তবে কাজটা শেষ করতে সমস্যা তৈরি হয়ে যাবে। ভাবতে হবে।

রাবতানদের হোমস্টে-তে কেলস্যাঙ্গ যখন পৌঁছল তখন রাবতান দম্পতি কোনো সোপ অপেরা দেখছেন। প্রোজেক্টরের আলো একটা দেওয়ালে ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। সম্ভবত কোনো ইতিহাসভিত্তিক চ্যানেল চলছে। প্রতিফলিত আলোর ছটা দম্পতির মুখ-চোখে নরম মায়াবতী আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।

কেলস্যাঙ্গের ফিরে আসাটা প্রৌঢ় দম্পতি খেয়াল করেন না। সে দরজার মুখে স্থির হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর গলা খাকারি দিয়ে উপস্থিতি ঘোষণা করে। দু-জনেই ঘুরে তাকিয়েছেন। দোলমা বললেন, “ঘোরা হয়ে গেল? বসুন, খুব সুন্দর একটা প্রোগ্রাম হচ্ছে। একটু পরেই খাবার দিচ্ছি। আসুন।”

কেলস্যাঙ্গ প্রৌঢ়ার পাশের সোফায় গিয়ে বসে পড়ে। মিনিট দু-তিন আলোর পর্দার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর একটু ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা করেই ফেলে।

“আমি কি এখন আপনাদের একটা প্রশ্ন করতে পারি?”

দোলমা ঘুরে বসলেন। কেলস্যাঙ্গের দিকে তাকিয়ে আছেন।

কেলস্যাঙ্গ তার দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্নটা রাখে। “আমি জানতে চাই— আজকে কত তারিখ?”

“তারিখ?” দোলমার মুখে একগাল হাসি। একটু যেন অবাকও। কেলস্যাঙ্গকে ভালো করে দেখে নিতে নিতে বললেন, “কেন, জানেন না? আজ তো পয়লা অক্টোবর।”

“পয়লা অক্টোবর! কেন, এখনো তো কোয়ার্টেম্বর চলছে!”

স্বামী স্ত্রী দু-জনেই তার দিকে অবাক তাকিয়ে আছে। দৃশ্যতই একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ। কেলস্যাঙ্গ নিজেও অবাক। ঝড়ের গতিতে চিন্তা ভাবনা চলছে তার মাথায়। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল। তাই তো! বাইশশো শতক পর্যন্ত তো বারো মাসে এক বছরের হিসাব হত। কোনো মাসে তিরিশ তো কোনো মাসে একত্রিশ দিন। ফেব্রুয়ারি আবার পর পর তিন বছর আঠাশ দিনের আর চতুর্থ বছরে ঊনত্রিশ দিনের। তখন সরাসরি সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস আসত। মাঝখানে কোয়ার্টেম্বর মাস তো তখনও চালুই হয়নি! এ তো শুরুই হয়েছিল ত্রয়োবিংশ শতকে। বারোটা মাস চার সপ্তাহ করে আঠাশ দিনের। সব মিলিয়ে তিনশো ছত্রিশ দিন। বাকি ঊনত্রিশ দিন বা লিপইয়ারে তিরিশ নিয়ে সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরের মধ্যে একটা নতুন মাস। কোয়ার্টেম্বর মাস। এবার বোঝা যাচ্ছে গণ্ডগোলটা সে কোথায় করছিল! বড়ো করে একটা হাঁফ ছাড়ে সে। তাহলে কালকেই আসছে সেই দিনটা! দোসরা অক্টোবর! কালকেই!

অস্বস্তি ঢাকতে খুব মিষ্টি করে একটা হাসি হাসে সে।

“ধন্যবাদ, একদম ভুলে গিয়েছিলাম। যাকগে, খিদে পেয়েছে খুব, তৈরি হয়ে আসি।”

তখনও রাবতেন দম্পতি তাকিয়ে আছেন। অস্বস্তি ঢাকতে একেক বারে দু-তিনটে করে সিঁড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে ওপর তলায় নিজের ঘরটার দিকে রওনা দেয়। কী মারাত্মক একটা বোকামিই না সে করতে যাচ্ছিল! সংবাদপত্রে ছাপা খবর হিসেবে, সেই অবতারকে বন্দি করা হয়েছিল অক্টোবরের দু-তারিখে। খবরটা ছাপা হয়েছিল তিন তারিখের সংস্করণে। আজ হচ্ছে পয়লা অক্টোবর। ইতিমধ্যে রাত হয়ে গিয়েছে। তার মানে আগামীকাল, আর মাত্র ঘণ্টা বারো পরেই, অবতারের আবির্ভাব হবে। তিনি মানুষের সামনে উপস্থিত হবেন। জনসমক্ষে তার শেষ বক্তব্য রাখবেন। আর তারপরেই তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বন্দি করা হবে!

***

আজকের দিনটা বেশ ঝকঝকে। তুষারপাত প্রায় বন্ধই বলা চলে। আকাশে সূর্য ভালোই তাপ ছড়াচ্ছে। কেলস্যাঙ্গ বারখো রলুং ছেড়ে ভোর রাতে বেরিয়ে পড়েছিল। এখন অনেকটা পথ পেরিয়ে গ্যাংচী শহরের প্রায় সীমান্তে পৌঁছে গিয়েছে।

এদিকে রাস্তাঘাট বলে আর কিছু নেই। বারখো রলুং-এর সীমানার ধার ঘেঁষে উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত একটা হাইওয়ে। হাইওয়ের দু-পাশে বড়ো বড়ো গাছপালা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তুষারে ডালপালা সব সাদা হয়ে আছে। কেলস্যাঙ্গ হাইওয়ে পার করে এদিকের গাছপালার জঙ্গল সব পেরিয়ে এসেছে। বহুদূরে, হাইওয়ে বরাবর উত্তরে একটা ছোটো গ্রামের মতো, কিছু ঘরবাড়ি আর একটা মঠ দেখা যাচ্ছে। দি-কি-টো-মো-র মঠ তাহলে ওটাই হবে। আর এদিকে হাইওয়ে পেরিয়ে পূর্বদিকে এখন নুড়ি পাথরের জমি। মাঝে মধ্যে বড়ো বড়ো পাথর। সব হালকা তুষারের স্তরে ঢাকা। কেলস্যাঙ্গ ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়েছে। জুতো জোড়া তুষার আর কাদায় মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। এই জায়গাটা একটা ময়দানের মতো আর বেশ বিস্তৃত সমতল জায়গা। শুধু উত্তরে দি-কি-টো-মো-র মঠের দিকে একটা ছোটো টিলা পাহাড়। এটাই সেই দি-কি-টো-মো-র ময়দান। আর পূর্বদিকে ময়দান পেরিয়ে প্রায় তিন মাইল দূরে কয়েকটা ছোটো ছোটো পাহাড়ের সারি।

রাবতেনদের ওখান থেকে সে বেরিয়ে পড়েছিল অনেক সকালে। তখনও আলো ভালো করে ফোটেনি। সূর্য দিগন্তের উপর উঠে এলেও তখনও দূরের পাহাড়ের আড়ালেই ছিল। আকাশ ছিল ঘন নীল। হালকা তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে যখন পথে নেমে এসেছিল তখন মনটা একটু খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে রাবতেন দম্পতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসা হল না। হয়তো আর কোনো দিন দেখা হবে না। তবু…

সমতল জায়গাটা পেরিয়ে পাহাড়টার সামনে এসে পৌঁছেছে কেলস্যাঙ্গ। ঠিক করে ফেলে আপাতত ওটার উপরেই আশ্রয় নেবে। জায়গাটা শহর থেকে খুব দূরে নয়। আবার খানিকটা লোকচক্ষুর আড়ালে। ওঠাটা সহজ হল না। প্রথমে প্রায় দেড়শো ফুট পাথরের খাড়াই দেওয়াল। তবে পাথরের চাঁইগুলো এমন ধাপে ধাপে সাজানো যে মঙ্গলের শিকারী খুব সহজেই দু-হাত আর পায়ের সাহায্যে উঠে পড়ল। এখানে থেকে একটা পাকদন্ডীর শুরু। তার মুখে এসে দাঁড়াল কেলস্যাঙ্গ। একটা বিশাল পাথরের পাশ দিয়ে বাঁক ঘুরেই একটুকরো সমতল চাতাল। জায়গাটা পছন্দ হল কেলস্যাঙ্গের।

খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চারদিক সরেজমিনে পরীক্ষা করে নিল সে। উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করেছে সে। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে পৃথিবী যেন থেমে গিয়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ। আশপাশে জনপ্রাণীর দেখা নেই। অথচ পাথরের চাঁইটার ওদিকে গিয়ে তাকালেই দেখা যাবে সেই সমতল ময়দানের মতো জায়গাটা। দি-কি-টো-মো-র ময়দান। এখান দিয়ে আসা যে কোনো আক্রমণকারীকে সহজেই সনাক্ত করা যাবে। ফাঁকা ময়দানের শেষ প্রান্তে হাইওয়ে দিকে তাকালেই দেখা যাবে গাড়ি ঘোড়া চলছে। আর ঠিক তার ওপাশে, তুষারে সাদা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালার ঠিক পেছনেই শহরটার শুরু। দরকার পড়লে খুব কম সময়ের মধ্যেই ঢুকে যাওয়া যাবে।

কেলস্যাঙ্গ এবার জুতো আর পোষাকে জমে ওঠা তুষার ঝেড়ে নিল। তারপর কোমর থেকে একটা পাতলা রড বের করে এনে তার হাতলটা ঘুরিয়ে দিল। ক্ষণিকের জন্য কিছুই হল না। তারপর বাতাসে একটা শিহরণ দেখা গেল।

মুহূর্তের মধ্যে হাওয়ায় একটু একটু করে ফুটে উঠল স্ফটিকের খাঁচাটা। তারপর ধীরে ধীরে সেটা নেমে এল নীচে। কেলস্যাঙ্গ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খাঁচাটাকে আবার দেখতে পেয়ে কেলস্যাঙ্গ শান্তি পেল। হাজার হোক, শেষ পর্যন্ত এটাই তার ফিরে যাওয়ার সবেধন নীলমনি। ফেরার পথ খোলা না থাকলে কী ভয়ংকর বিপদ যে হতে পারে তার হাতে গরম অভিজ্ঞতা কিছুদিন আগেই তার হয়েছে। সেবার থ্রাস্টার রকেটগুলো সব একসঙ্গে জবাব না দিয়ে বসলে গ্রহরক্ষী দলের কোনো ক্ষমতাই হত না তাকে কর্ণিকা থেকে বমাল বন্দি করার। আর সেদিন তেমন কিছু না হলে আজ তাকে এখানে এই দুশো বছর পিছিয়ে এসে দি-কি-টো-মো-র মাঠে কোনো এক অবতারের আবির্ভাবের অপেক্ষা করতেও হত না।

এবার কাজটার দিকে মন দেওয়া যাক। শুভ মুহূর্ত প্রায় সমাসন্ন। সে পাথরের চাতালে খানিক পায়চারি করে নেয়। মনে মনে গুছিয়ে নিতে চাইছে আশু কর্তব্য কর্মগুলো। পায়চারি করতে করতে একসময় এসে দাঁড়ায় পাকদন্ডীর শুরুর মুখটায়। পরিকল্পনা ততক্ষণে সাজানো হয়ে গিয়েছে। তাই খানিকটা তৃপ্তি নিয়ে সে চারদিকে তাকাল। কোমরের পেছনে হাত দুটো জড়ো করে রেখে খাড়াইয়ের একদম কিনারা ঘেঁষে সে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে প্রসারিত দি-কি-টো-মো-র মাঠ। মাঠ পেরিয়ে হাইওয়ে। হাইওয়ের ওপাশে পূর্ব দিকে বারখো রলুং। আর দূরে উত্তরে দি-কি-টো-মো-র গ্রাম আর তার মঠ। সামনের মাঠটা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। শুধু তুষারের একটি পাতলা স্তর দিয়ে আচ্ছাদিত।

এখানেই অবতারের আবির্ভূত হওয়ার কথা। তিনি এখানে আসবেন। এখানেই তিনি জনগণের সঙ্গে কথা বলবেন। তাদের উদ্দেশে তার বক্তব্য রাখবেন। কী সেই বক্তব্য তা সে জানে না। শুধু আন্দাজ করতে পারে যে সেসব নিশ্চয়ই এমন কিছু যার জন্য দুশো বছরের ওপার থেকে জেনারেল চেন জিয়াং খুঁজে পেতে জেল থেকে বের করে এনে তাকে এখানে পাঠাতে হয়েছে। কাজেই অবশ্যম্ভাবী সেই বক্তব্য কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক এবং অবশ্যই সুদূরপ্রসারী। সেই বিপজ্জনক এবং সুদূরপ্রসারী বক্তব্য, তিনি অবতার, এখানেই রাখবেন, এবং কর্তৃপক্ষ তাকে এখান থেকেই ধরে নিয়ে যাবে।

তবে এই সব কিছুই হয়েছিল দুশো বছর আগে। ঘটনাচক্রে এই সব ঘটে যাওয়া ঘটনা এই মুহূর্তে এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে। এখন সেই লগ্ন-মুহূর্তের ঠিক আগের সময় এবং অকুস্থলে দুশো বছর ভবিষ্যৎ থেকে হাজির সে স্বয়ং, মঙ্গলের স্বনামধন্য শিকারী দাচেন কেলস্যাঙ্গ।

কাজেই দুশো বছর আগে এই দি-কি-টো-মো-র মাঠে ঘটে যাওয়া সেই সব ঘটনাগুলো ঘটবে না। অবতার অবতীর্ণ হবেন ঠিকই, কিন্তু তিনি কোনো বক্তব্য রাখবেন না, তাকে রাষ্ট্রীয় রক্ষীদল বন্দি করার করার কোনো সুযোগই পাবে না। কথা বলার আগেই সে মারা যাবে। তারা আসার আগেই সে মারা যাবে। দুশো বছর পরে কোনো জেনারেল চেন জিয়াং-কে কোনো জেল থেকে কোনো দাচেন কেলস্যাঙ্গকে ছাড়িয়ে এনে দুশো বছর অতীতে পাঠাতে হবে না!

শুধু একটাই দুঃখের ব্যাপার, সেক্ষেত্রে দুশো বছর পরে জন্মানো কোনো দাচেন কেলস্যাঙ্গের সঙ্গে কোনো গুল্যাংগ কর্মার দেখা হবে না! এক মুহূর্তের জন্য কেলস্যাঙ্গের খুব ইচ্ছে হয় সব কিছু ফেলে গুল্যাংগকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে যাওয়ার। কী এসে যাবে তাতে এই দুনিয়ার! এখানে যা যা ঘটবার সে সব তো একবার ঘটেই গিয়েছে! তারপরেই মনে হল এ হয় না, হতে পারে না। জেনারেল চেন জিয়াং ছেড়ে কথা বলবেন না! সবচেয়ে বড়ো কথা এই স্ফটিক গোলোকের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত যেহেতু জেনারেলের হাতেই থাকছে, তাই পালানোর উপায় এই মুহূর্তে তার হাতে নেই! শুধু শুধু মেয়েটার জীবনটাই মাঝখান থেকে বরবাদ হয়ে যাবে। জীবনে এই প্রথম নিজেকে অসহায় বোধ করে কেলস্যাঙ্গ। উদগত ক্ষোভ উগরে দিতে দু-হাত মুঠো করে আকাশের দিকে তুলে ধরে তীব্র এক হাহাকার ভরা চীৎকার করে ওঠে। নির্জন প্রান্তরে, পাহাড়ে, আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে গিয়ে সেই চীৎকার যেন রেণু রেণু হয়ে তুষারের সঙ্গে পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়তে থাকে।

মাথা নেড়ে বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলতে ফেলতে কেলস্যাঙ্গ ফিরে আসে গোলোকটার কাছে। আশপাশে তুষার কণা জমে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে স্ফটিক খাঁচার শরীরে এক কণাও তুষার জমা হয়নি।

খাঁচাটার দরজা যেন কেলস্যাঙ্গকে চিনতে পেরে ও সামনে পৌঁছোতেই নিজে নিজে খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। ভেতরটা একই রকম রয়ে গেছে। ভেতর থেকে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে না। যেন সেই অনামী পাহাড়, দি-কি-টো-মো-র মাঠ, গ্রাম আর তার মঠ, বারখো রলুং-এর ঘরবাড়ি, গ্যাংচী শহরটা, ক্রমাগত হয়ে চলা তুষারপাত— সব, সব কিছু আছে অন্য আরেকটা পৃথিবীতে। এখানে নয়। অন্য কোথা, অন্য কোনো খানে।

কেলস্যাঙ্গ সেই দেরাজে রাখা ওয়াইজে-৯০২ বন্দুকটা তুলে নেয়। গোটা শরীরটা যেন ঝনঝন করে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে। মঙ্গলের শিকারী দাচেন যেন ফিরে আসছে আবার। মাজলটা গালের পাশে চেপে ধরে বরফ-শীতল ধাতুর পেলব নলটার স্পর্শ পেতে চায় ওর শরীরটা। নলের মাছি বরাবর চোখ রেখে বাইরের দিকে লক্ষ্য স্থির করার একবার মহড়া দিয়ে নিয়ে মাজলটা আনলক করে। টিক করে একটা আওয়াজ ওঠে। এবার এটা তৈরি। অগ্নি-বর্ষানোর জন্য প্রস্তুত। বন্দুকটা নামিয়ে রেখে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। ভাবছে কিছু। কোনটা উচিত হবে? সে কি এখানেই অপেক্ষা করবে অবতারের অবতীর্ণ হওয়ার? নাকি এক্ষুনি এটা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে দি-কি-টো-মো-র মাঠের উদ্দেশ্যে?

না। আবির্ভাব এক্ষুনি হতে পারে, আবার কয়েক ঘণ্টা পরেও হতে পারে, আর তার মধ্যে কেউ যদি তার খোঁজে মাঠের দিকে চলে আসে? আর তাকে বন্দুক হাতে অপেক্ষা করতে দেখে ফেলে? তার চেয়ে বন্দুকটা এখানেই থাক। সে বরং খালি হাতে এখন মাঠে অপেক্ষা করবে। যখন অবতারকে মাঠের দিকে আসতে দেখা যাবে, তখন না হয় সে এক দৌড়ে বন্দুকটা নিয়ে আসবে।

গোলোকের সীমিত জায়গার মধ্যেই কেলস্যাঙ্গ পায়চারি করতে শুরু করে। যেন খাঁচার মধ্যে পশুরাজ পায়চারি করে চলেছে। যে কোনো মুহূর্তে সিংহনাদে চারদিকে ভূমিকম্প শুরু হবে। হঠাৎ তার চোখ গেল সেই টেবিলের নীচের দেরাজে প্লাস্টিকের প্যাকেটটার দিকে। দু-হাতে সাবধানে তুলে নেয় প্যাকেটটা। তারপর টেবিলের ওপরে রেখে ধীরে সুস্থে খুলে ফেলল মোড়কটা।

ভেতরে রাখা রয়েছে সেই মাথার খুলিটা। দু-হাতে ধরে কেলস্যাঙ্গ সেটা তুলে আনলো চোখের সামনে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে সে খুলিটা। দুশো বছর আগে মৃত এক মানুষের মাথার খুলি। দেখতে দেখতে একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছিল তার সমস্ত শরীর জুড়ে। এটাই সেই মানুষটার খুলি, যাকে কেউ বলে রাষ্ট্রদ্রোহী, কেউ বলে অবতার, তারই মাথার খুলি এখন তার দু-হাতের মধ্যে, যে কিনা আসলে এখনো জীবিত, একটু পরেই যে আজ এখানে আসবে, একটু পরেই যে মাত্র দেড়শো দুশো ফুট দূরের ওই মাঠে দাঁড়িয়ে থাকবে…

কী হবে, যদি সে এই হলদে হয়ে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া, তার নিজের মাথার খুলি কোনোভাবে দেখতে পেয়ে যায়? দু-দুশো বছরের পুরোনো তার নিজের মাথার খুলি। তারপরেও কি সে তার বক্তব্য রাখবে? রাখতে পারবে? যদি সে দেখতে পায়, দু-দুশো বছরের ওপার থেকে তার নিজের মাথার প্রত্ন-খুলি তারই দিকে তাকিয়ে বত্রিশ পাটি বের করে হাসছে? তারপরও ওই ময়দানে দাঁড়িয়ে জনগণের উদ্দেশ্যে তার কথা বলার মতো কী অবস্থা থাকবে? দেওয়ার মতো কোনো বক্তব্য কি তারপরেও তার কাছে থাকবে?

নিজের ক্ষয়িত পাণ্ডুর প্রত্ন-খুলি দেখে ফেলার পর একজন মানুষ ঠিক কী-ই বা আর ভাবতে বা বলতে পারে? যখন তার সম্যক হৃদয়ঙ্গম হয় যে মানুষ সততই মরণশীল এবং জীবন ক্ষণস্থায়ী! সম্ভবত সে বিষাদগ্রস্ত হবে। হয়তো মৃত্যুকে জয় করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়ে উঠবে। কিংবা বলবে যে জীবন যেহেতু অস্থায়ী, তাই জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অবশিষ্ট জীবন উপভোগ করা!

কিন্তু, যে মানুষটা নিজের মাথার খুলি নিজের হাতে ধরার সুযোগ পায়, সে অবশ্যই একজন বিশেষ মানুষ। হতেই পারে তার জীবনের যাবতীয় ঘটনাক্রমের কোনো না কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। হয়তো তার সংস্কৃতি, আদর্শ আর বিশ্বাস অন্যরকম। হয়তো সে সম্পূর্ণ অন্যরকম কোনো বক্তব্য রাখবে—

বাইরে কোথাও একটা আওয়াজ হল। কেলস্যাঙ্গ তড়াক করে সজাগ হয়ে ওঠে। চট করে মাথার খুলিটা আবার টেবিলের নীচের দেরাজে ঢুকিয়ে দিয়েই বন্দুকটা হাতে তুলে নেয়। বাইরে একটা কিছুর নড়াচড়ার আভাস। দ্রুত খাঁচার দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় সে। তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। তবে কী সে-ই এসে পড়েছে? সেই অবতার? কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহী? তবে কি এই তুষার বৃষ্টির মধ্যে এদিকে ওদিকে ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত এখানেই এসে পড়েছে? বক্তব্য প্রচারের উপযুক্ত জায়গার খোঁজ করতে করতে ভুল করে এখানে এসে পড়েছে? নাকি এসে পড়েছে ভাবের ঘোরে পথ চলতে চলতে?

এভাবে কী তার আসা উচিত? কী হত যদি কেলস্যাঙ্গ এতক্ষণ যে জিনিসটা হাতে নিয়ে দেখছিল সেটা তার চোখে কোনোভাবে পড়ে যেত!

কেলস্যাঙ্গ এক ঝটকায় দরজাটা ঠেলে খুলে দিয়েই বন্দুকটা তুলে ধরল।

গুল্যাংগ!

হতবাক কেলস্যাঙ্গ তার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তার পরনে পোশাকের ওপরে একটা শ্বেতশুভ্র উলের জ্যাকেট আর হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা লাল একটা বুট। হাত দুটো জ্যাকেটের পকেটে ঢোকানো। মুখ আর নাক থেকে সাদা ধোঁয়ার মতো ভাঁপ বেরিয়ে আসছে। হাঁফাচ্ছে সে। সুগঠিত উন্নত বুক দুটো হাপরের মতো ওঠানামা করছে।

বিস্ময়ের ঘোর অপসৃত হতে সময় লাগল। অবশেষে বিহ্বলতা সরিয়ে কেলস্যাঙ্গ অস্ফুটে বলে ওঠে, “গুল্যাংগ!”

নীরবে দু-জনে দু-জনের দিকে তাকিয়ে থাকে আরো কয়েক মুহূর্ত। তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে গুল্যাংগ চোখ নামিয়ে নিতেই কেলস্যাঙ্গের হুঁশ ফিরল। তাড়াতাড়ি সে তখনও উঁচিয়ে রাখা বন্দুকটা নামিয়ে নিল।

বিস্ময়াহত হয়ে মেয়েটা আরো এগিয়ে আসে। সেই আশ্চর্য নীলাভ চোখ তুলে সে বলে ওঠে, “এসব কি? আপনি এখানে এভাবে কী করছেন? জানেন কী হয়েছে?”

এক সঙ্গে অনেক গুলো প্রশ্ন। একটার পর একটা। তখনও হাঁফাচ্ছে মেয়েটা। প্রচণ্ড উত্তেজিত মনে হচ্ছে তাকে।

কেলস্যাঙ্গ একটা প্রশ্নেরও উত্তর না দিয়ে উলটে ইশারায় আর হাতের ভঙ্গিমায় তাকে শান্ত করতে চায়। মনের মধ্যে তখন ঝড় চলছে। মেয়েটাকে ঠিক কতটা কী বলা যেতে পারে। অবশেষে সে মুখ খোলে। কিন্তু উত্তরের বদলে এখন সেখানে প্রশ্ন। এবং প্রসঙ্গান্তরের প্রচেষ্টা। যদিও সে যে সত্যি সত্যিই অবাক সেটা তার গলার স্বর এবং সুর, দুটোতেই ধরা যাচ্ছিল। “আপনি, আপনি এখানে কীভাবে চলে এলেন?

মেয়েটা এতক্ষণে একটু স্থির হয়েছে। শ্বাস প্রশ্বাসের গতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। “আপনাকেই খুঁজতে বেরিয়েছি। সকাল থেকেই বারখো রলুং-এ তুমুল হৈ চৈ। আমি একা নই। অনেকেই আপনাকে খুঁজছে। ভাগ্যক্রমে দু-একজন চেনা মর্নিং ওয়াকারের কাছে আমি খবর পেলাম হাইওয়ে ধরে দি-কি-টো-মা-র মাঠের দিকে তারা কোনো একজন পথিককে যেতে দেখেছে। আমি দুই আর দুইয়ে চার করে ভাবলাম হয়তো আপনার সেই বন্ধুর খোঁজে আপনি এদিকে চলে এসেছেন। তারপর মাঠ পেরিয়ে এদিকটা দেখে টেখে যখন ফিরে যাচ্ছি তখনই হঠাৎ কানে এল এই পাহাড়ের উপর থেকে কারো যেন আর্ত চীৎকার ভেসে আসছে। ভয় হল আপনি হয়তো এখানে এসে কোনো কারণে বিপদে পড়েছেন। তাই চলে এলাম।”

“চলে এলেন? কী করে! এই খাড়াই পাহাড়ের উপরে উঠলেন কী করে?”

লাজুক হাসি হাসে গুল্যাংগ। হাসলে তার গালে যে একটা মিষ্টি টোল পড়ে সেটা দেখে কেলস্যাঙ্গ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। গুল্যাংগ হাসতে হাসতে বলে, “আমি না পারলে গোটা গ্যাংচীর আর কে পারবে? আমি সাত বছর বয়সে অক্সিজেন ছাড়াই চোমোলাংমা জয় করেছিলাম। বুঝলেন মশাই! এই থ-ছন্‌পে কেউ এখনো সেই রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। আর এটা উঠতে পারব না? তারপর এখানে এসে দেখি এই ব্যাপার। এবার বলুন, আপনি এখানে কী করছেন? কেনই বা শেরিফের কুকুরের দল সকাল থেকে আপনাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে?”

এখনই? এত তাড়াতাড়ি? আলি হামাদা আরেকটু ধৈর্য্য দেখাতে পারল না? এখনো তো অবতারের টিকি-ও দেখা গেল না! তবে কী সে ব্যর্থ হবে? মঙ্গলের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিকারী, সৌরজগতের কালান্তক ভাড়াটে খুনি আজ দুশো বছর আগের নির্বোধ মানুষগুলোর কাছে হার মানবে?

মনের মধ্যে ঝড়ের মতো চিন্তা স্রোত। কেলস্যাঙ্গের চোখে মুখে তার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। অস্ফুটে শুধু বলল, “তাই?”

“শুধু তাই? রাবতেনদের উপর রীতিমতো অত্যাচার করেছে। এই জন্য যে তারা আপনাকে থাকতে তো দিয়েছিল, তার ওপর আপনি কোথায় পালিয়েছেন সেটাও তারা বলতে পারেনি”

মুহূর্তের জন্য দু-চোখে এক ঝলক আগুন দেখা গেল। তারপরেই আবার নিজেকে গুটিয়ে নেয় কেলস্যাঙ্গ। যেন উদাস একজন মানুষ। সে তাকিয়ে আছে দুরে হাইওয়ের দিকে। এক জায়গায় চোখে পড়ে দু-তিনটে গাড়ি যেন দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশে বেশ কয়েকজন মানুষের নড়াচড়া। তাদের থেকে অনেকটা দূরে হাইওয়ের অন্যদিকে ওপাশে তুষারাবৃত গাছ-গাছালির শুভ্রতার মধ্যে যেন দেখা যাচ্ছে আবছা আরো কিছু মানুষের অবয়ব এদিকেই এগিয়ে আসছে।

একটা মৃদু হাসি ফুটে ওঠে কেলস্যাঙ্গের মুখে। সে আঙুল দিয়ে দেখায় সেদিকে। জিজ্ঞেস করে, “কী হচ্ছে ওদিকে?”

গুল্যাংগ ঘুরে তাকায় সেদিকে। তার কথা আটকে যায়। কোনো রকমে অস্ফুটে উচ্চারণ করে, “ওরা বোধহয় আসছে!”

“কারা? শেরিফের দলবল?”

“মনে হচ্ছে। শুধু শেরিফের রক্ষীদল না। শুনলাম ভোর রাতে রিপাবলিক ফোর্সের দল নাকি এসেছে। গোটা গ্যাংচী শহর ঘিরে রেখেছে যাতে মাছিও না গলতে পারে। সকাল থেকে বারখো রলুং-এ রক্ষীবাহিনী সবকটা রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চলছে। ওদিকে শোনা যাচ্ছে দি-কি-টো-মো-র মঠেও নাকি বাইরে থেকে কয়েক হাজার শ্রমণ এসে হাজির হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই নাকি প্রস্তুতি চলছে কিছু একটার। আমি জানি না। জিগমে ক-দিন আগে একবার বলেছিল থ-ছন্‌পে জুড়ে নাকি কোনো রাষ্ট্রদ্রোহী দল গোপনে কিছু একটা করতে চাইছে…” থেমে গেল সে, উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে।

“কী করতে চাইছে?”

“জানি না। তবে বারখো রলুং-এর লোকেরা দেখলাম প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ। সকালবেলাতেই রাবতেনদের সঙ্গে হওয়া ঘটনার পরেই দলে দলে মানুষ বেরিয়ে পড়েছে। সম্ভবত তারাও এদিকে আসছে!”

অবাক হয়ে গিয়েছে কেলস্যাঙ্গ। অবতারের আবির্ভাব এখনো হল না। এদিকে ঘটনা যেন ক্রমশ অন্যরকম হয়ে উঠছে। সবকিছুই কেমন যেন গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে। “আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“আমিও না। তবে শুনলাম সরকারের তরফে জানানো হয়েছে যে…” আর বলতে পারে না গুল্যাংগ। তার মুখ শুকিয়ে গিয়েছে।

“কী?”

“তারা বলছে যে রাষ্ট্রদ্রোহীদের কোনো বড়ো নেতা এদিকে এসেছে। আর তুমিই নাকি সেই নেতা। জিগমে বলছিল—”

“আপনার বন্ধু? কী বলেছে সে?”

“বলছিল আলি হামাদা তাকে বলেছে যে আপনি নাকি শ্রমনদের এককাট্টা করে বিদ্রোহ সংগঠিত করতে এখানে এসেছেন!”

হেসে ফেলে কেলস্যাঙ্গ। বড্ড বেশি মর্যাদা তাকে দিয়ে দিচ্ছে তো এরা! “তাই নাকি? আশ্চর্য ব্যাপার তো! আর আমি নিজেই জানি না যে আমি এত কিছু করছি!”

“আমিও বিশ্বাস করি না। আমি জানি আপনি এরকম কিছু করতেই পারেন না। তাই না?”

***

ঘটনা পরম্পরা এখন অনেকটাই পরিষ্কার। যদিও কারণ কী হতে পারে তার আন্দাজ করা যাচ্ছে না। এমনকি অস্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। সে যে দুশো বছর অতীতে, ঠিক এখানে এই সময়ে এসে হাজির হবে তা এখানকার এই সময়ের মানুষের জানার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। জেনারেল জিয়াং-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দুশো বছর আগে সেই অবতার বা রাষ্ট্রদ্রোহী, যে-ই হোক না কেন, তার আসবার আগে, তার বক্তব্য প্রচারের আগেই রাষ্ট্রের কাছে সেই খবরটা ছিল, বা সে আসছে বলে খবর ছিল, তেমনটা তো মনে হচ্ছে না! তাহলে আলি হামাদা আর তার দলবল এভাবে এক্ষুনি তেড়ে আসছে কেন? তার জন্য? তাহলে তো সময় ভ্রমণের সেই সমস্যাটা সত্যি সত্যিই চিরন্তন সত্য! অতীত বা ভবিষ্যতের যেখানেই যাও না কেন, সময়রেখা তুমি পালটাতে পারবে না! ঠাকুর্দাকে বিয়ের আগেই মেরে ফেলা কিছুতেই সম্ভব নয়! অর্থাৎ অবতার অবতীর্ণ হবেই আর তার বক্তব্য সে মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেই!

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে গুল্যাংগকে এত কিছু জানানো যাবে না। তবে মেয়েটা না জেনে এই মুহূর্তে বিপদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাকে আগে বাঁচাতে হবে। তার কোনো ক্ষতি হতে দিতে সে পারে না। কাজেই সবার আগে মেয়েটাকে ফেরত পাঠানো দরকার। একই সঙ্গে তার উপর যে বিশ্বাস মেয়েটার মধ্যে তৈরি হয়েছে সেটা ভেঙে দিয়ে তাকে কিছুতেই দুঃখ দেওয়া তার উচিত হবে না।

“ধন্যবাদ। আমার উপর বিশ্বাস রাখার জন্য। আমি যাই হই না কেন, কোনো রাষ্ট্রদ্রোহী নই। শুধু একটা কথা বলুন, শেরিফের এত তৎপরতার আর অন্য কোনো কারণ সম্পর্কে কিছু জানেন?”

“আমি এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।”

“ঠিক আছে। আপনি একা এসেছেন?”

“না। তাশি আমাকে তার ট্রাকে করে নিয়ে এসেছে। শহর থেকে।”

“তাশি? কে সে?”

“তাশি দেলেক। মঠের ওদিকে ওঁর খামার বাড়ি। আমার বাবার বন্ধু।”

“ট্রাকটা এখন কোথায়?”

আঙুল দিয়ে দুরে দি-কি-টো-মো-র মঠের দিকটা দেখায় গুল্যাংগ। এখান থেকে অবশ্য কোনো ট্রাক চোখে পড়ল না।

“ওই যে, ওই টিলাটার আড়ালে।”

সামনের তুষারাবৃত ফাঁকা উঁচুনীচু নুড়ি আর বিভিন্ন আকারের পাথরে ভরা ময়দানটার মধ্যে দুরে একটা সাদা তুষারে ঢাকা বেশ বড়োসড়ো একটা টিলা দেখা যাচ্ছে। ট্রাকটা তার মানে ওটারই আড়ালে আছে। ভালোই হল।

দ্রুত কয়েকটা সিদ্ধান্ত কেলস্যাঙ্গ নিয়ে নিল। তারপর গুল্যাংগকে দাঁড় করিয়ে রেখে ফিরে গেল স্ফটিকের খাঁচায়। বন্দুকটা নামিয়ে রাখল টেবিলের উপরে। মিনিট খানেক সময় গেল ঝটপট তৈরি হয়ে নিতে। তৈরি হয়েই একলাফে নেমে এল খাঁচার বাইরে। দরজাটা বন্ধ করে গুল্যাংগের সামনে এসে দাঁড়িয়ে লাজুক একটা হাসি হেসে বলল, “হাতে সময় খুব কম। খাড়াই বেয়ে নেমে ট্রাকটা পর্যন্ত যেতে অনেক সময় লাগবে। যদি অনুমতি করেন, আমি অন্য উপায়ে আপনাকে নিয়ে ওখানে যেতে পারি।”

হেসে ফেলে গুল্যাংগ। “কীভাবে? উড়ে উড়ে যাবেন না কি?”

“ওই রকমই কিছু। আমার কিছু বিশেষ ক্ষমতা আছে। আমি কি আপনাকে কোলে তুলে নিতে পারি?”

চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে গুল্যাংগের। তার সঙ্গে দু-চোখেই অবিশ্বাস, অথচ মুখে হাসি। দু-হাত বাড়িয়ে গুল্যাংগ বলে, “নিন। এই অভিজ্ঞতাটাও হয়ে যাক!”

পাঁজাকোলা করে গুল্যাংগকে তুলে নেয় কেলস্যাঙ্গ। মেয়েটার ওজন খুব বেশি কিছু না। অন্তত কেলস্যাঙ্গের জন্য। কোমরের বেল্টে এক জায়গায় চাপ দিতেই ওই অবস্থায় দু-জনেই একসঙ্গে বাতাসে ভেসে উঠল। কেলস্যাঙ্গ কাঁধ আর পায়ের সাহায্যে দিক ঠিক করে নেয়। বাতাস কেটে ভাসতে ভাসতে ওরা এগিয়ে যেতে থাকে সেই টিলাটার দিকে।

মনে মনে কেলস্যাঙ্গ ধন্যবাদ দেয় মঙ্গলবাসী সেই মানুষটাকে। এই অ্যান্টি গ্র্যাভিটি জেটটা হাতানোর সময় মানুষটাকে শেষ পর্যন্ত খুন করতে হলেও তখন সে জানত না যে একদিন এটা এইভাবে তাকে সাহায্য করবে।

সূর্য মধ্য দিগন্ত পেরিয়ে খানিক আগেই পশ্চিমে যাত্রা শুরু করেছে। হাওয়ায় ঠান্ডার তীব্রতা এখন মারাত্মক। তবে পেলব মসৃণ গতিতে ভেসে যাওয়া মানুষ-মানুষীর চোখে মুখে সেই হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া ঠান্ডার লেশ মাত্র দেখা যাচ্ছে না। গুল্যাংগ দু-হাত দিয়ে কেলস্যাঙ্গের গলা জড়িয়ে আছে। দু-জোড়া চোখ এখন শুধু তাকিয়ে আছে পরস্পরের দিকে। কেলস্যাঙ্গ ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি বোধ করে। তুষার ঝরা এই পৃথিবীর নীল আকাশের নীচে যেন ফিরে এল মঙ্গলের দিনের মতো উষ্ণতা। মেয়েটার শরীরের উত্তাপ আচমকা তাকে উদ্বেলিত করে তুলল। সে চেয়ে রইল নিমেষহীন। আকাশ থেকে নেমে আসা তুষার কণা ঝরে পড়ছে কখনো গুল্যাংগের নাকের ডগায়, কখনো চোখের পাতায় ছড়িয়ে দিচ্ছে শুভ্রতার রেণু। মুগ্ধ, বিমোহিত, আড়ষ্ট কেলস্যাঙ্গের ভেতরের নির্মম মানুষটার কী যেন হয়ে গেল সেই দি-কো-টো-মো-র পরিবেশে। সে কিছুতেই ভেবে পেল না, কেন তার এমন হচ্ছে। এখন যেন পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ নেই। কোনো সমস্যা নেই। শুধু আছে আকাশ আর বাতাস। আর এই ভেসে যাওয়া। শুধু যদি এই যাত্রা অনন্তকাল ধরে চলত!

কিন্তু মাঠটা ততটা বড়ো কিছু ছিল না। ছোটো মালবাহী ট্রাকটা দাঁড়িয়ে ছিল টিলাটার আড়ালে। তাশি দেলেক একজন মোটা ওটা মধ্যবয়সী মানুষ। পোশাক-আশাক দেখলেই বোঝা যায় যে লোকটা মাটির কাছের মানুষ। চালকের আসনে বসে একটা পাইপ থেকে ধূমপান করছিল। ট্রাকের পেছন থেকে ওদের দু-জনকে হঠাৎ উদয় হতে দেখে রীতিমতো চমকে গেল। তারপরেই গুল্যাংগের দিকে তাকিয়ে যে হাসিটা হাসল তাতে স্পষ্ট বোঝা গেল লোকটা সরল আর স্নেহপ্রবণ। ওদের দু-জনকে নিজের দিকে আসতে দেখে সে তড়িঘড়ি লাফিয়ে নেমে এল।

কেলস্যাঙ্গ নীচু হয়ে অভিবাদন জানাতেই তাশি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তরে অন্তত বার চারেক অভিবাদন জানায়। মুখে একটা অদ্ভুত সুন্দর হাসি। যেন কেলস্যাঙ্গের দেখা পাওয়ায় সে ধন্য হয়ে গিয়েছে।

“তুমিই তাহলে সেই মানুষ?” তাশির প্রশ্নে কেলস্যাঙ্গ অবাক হয়ে যায়। সে জিজ্ঞেস করে, “কেন বলুন তো?”

“না, মানে মঠের আলোচনায় শুনে ছিলাম আপনি আসছেন। মাস ছয়েক ধরে মঠের শ্রমণেরা আপনার অপেক্ষায় আছে। প্রতিদিন কেউ না কেউ দলে দলে এসে ওখানে জমা হচ্ছে। আপনি আসবেন। আমাদের পথ দেখাবেন। এত যুদ্ধ, এত মৃত্যু আর আমাদের ভালো লাগছে না। আমাদের আশা আপনি আমাদের মুক্তির পথ দেখাবেন। আমরা বেশি তো কিছু চাই না। শুধু একটু শান্তিতে জীবন কাটাতে চাই।”

“অবশ্যই তাই করবেন। কিন্তু আমি তো মুক্তির পথ দেখাতে আসিনি! আমি তো নিজেই মুক্তির খোঁজ করে যাচ্ছি!”

“ভন্তে! আমাদের কাছে আপনার লুকোনোর কিছু নেই। আমরা সব জানি। যুগান্ত পেরিয়ে আপনি আসবেন আমাদের পথ দেখাতে। আমরা তৈরি হয়েই আছি। প্রাণ দিতে হলে দেব, কিন্তু শয়তানের দলকে আমরা আপনাকে ছুঁতে পর্যন্ত দেব না। গুল্যাংগের কাছে খবর পেয়েই আমরা তৈরি হয়ে নিয়েছি। ওরা আর কজন? ওই দেখুন মঠের দিক থেকে আমাদের ভাইয়েরা দলে দলে এদিকে আসছে।”

তাশি যেদিকে দেখাল সত্যিই সেদিকে দেখা গেল ভিড়ের একটা অবয়ব ক্রমশ এদিকে এগিয়ে আসছে। গুল্যাংগ এখন চুপচাপ তাশির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ কেলস্যাঙ্গের দিকে স্থির নিবদ্ধ।

কেলস্যাঙ্গ কিন্তু তখন অন্য কিছু নিয়ে ভাবছে। তাশি সরল মানুষ। সে যা শুনেছে তাই বলছে। আর তার মানে হল সেই অবতার সত্যিই আজ আসছে। এত মানুষ তারই জন্যে অপেক্ষায় আছে। সে আসবে। সে কিছু বলবে। ওদিকে রাষ্ট্র শক্তিও অপেক্ষায় আছে। অর্থাৎ একটা ঝামেলা তৈরি হতেই পারে। এর মধ্যেই তাকে তার কাজটা সেরে ফেলতে হবে। আর সেটা সে গুল্যাংগের চোখের সামনে সারতে পারে না। তা ছাড়া ভিড়ের মধ্যে গোলাগুলি চলতে শুরু করলে যে কোনো সময়ে দূর্ঘটনা ঘটতেই পারে। মেয়েটার এখানে থাকাটা ঠিক হবে না।

সে গুল্যাংগের দিকে তাকিয়ে বলে, “গুল্যাংগ, আপনি এখন ফিরে যান। এখানে এই গোলমালের মধ্যে আপনার থাকাটা ঠিক হবে না। যে কোনো সময়ে বিপদ হতে পারে। চিন্তা করবেন না। আবার পরে দেখা হবে।”

গুল্যাংগ রাজি নয় এই প্রস্তাবে। জোরের সঙ্গে মাথা নেড়ে সে প্রতিবাদ জানায়। “না, আপনাদের সবাইকে বিপদের মুখে ছেড়ে এই অবস্থায় আমি চলে যেতে পারিনা। আমি এখানেই থাকবো। তা ছাড়া ওই দেখুন বারখো রলুং-এর মানুষেরাও দলে দলে আসতে শুরু করেছে। রক্ষীবাহিনীর সাহস হবে না এই এত মানুষের মধ্যে কিছু করার।”

কেলস্যাঙ্গ তাকালো গুল্যাংগ যেদিকে আঙুল দেখাচ্ছে। সত্যি সত্যিই যেদিকে রক্ষীবাহিনীর গাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে তার ওদিকে সাদা সাদা হয়ে থাকা গাছপালার মধ্যে দেখা যাচ্ছে কালো কালো মানুষের অবয়বের ভিড় বাড়ছে।

সমস্যা আরো বেড়ে যাচ্ছে। ভিড় নিজেই একটা সমস্যা। অস্ত্র লক্ষ্য চেনে, ভিড় চেনে না। তার চেয়েও বড়ো কথা লক্ষ্য প্রায়শই ভ্রষ্ট হয়ে থাকে। কেলস্যাঙ্গ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না। তাশির কাঁধে হাত দিয়ে কাছে ডেকে নেয়। “আপনি গুল্যাংগকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে মঠে চলে যান। ওখানে বলুন আমার জন্য অপেক্ষা করতে। আমার কিছু জিনিস ওই পাহাড়ে আছে। ওগুলো নিয়ে আমিও ওখানেই আসছি।”

গুল্যাংগ এগিয়ে এসে কিছু বলতে যায়, তার আগেই কেলস্যাঙ্গ তাকে বলে, “চিন্তা করবেন না। আপনি আমার সামর্থ্যের পরিচয় ইতিমধ্যেই পেয়েছেন। আমার ক্ষতি করার ক্ষমতা এদের নেই। কিছু দেরি হতে পারে, কিন্তু যখনই হোক আমি ফিরে আসব।”

আর দেরি না করে আবার বেল্টের জায়গা মতো চাপ দিয়ে হাওয়ায় ভেসে উপরে উঠে পড়ে কেলস্যাঙ্গ। এই মুহূর্তে বেশি কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না!

পাহাড়ের দিকে ফিরে যাচ্ছিল কেলস্যাঙ্গ। তবে খেয়াল রেখেছিল টিলার দিকে কী ঘটছে। বারবার ভেতর থেকে কেউ যেন ওকে বলছে, ভুলে যাও কেলস্যাঙ্গ, জেনারেল জিয়াং এখনো আছে দুশো বছর ভবিষ্যতে। এখনো সময় আছে, ফিরে চলো টিলাটার কাছে। বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল গুল্যাংগের টলটলে স্বচ্ছ চোখ দুটো, ভেজা ভেজা চোখের পাতা, সামান্য ভোঁতা নাকের ডগাতে জমে ওঠা দু-এক বিন্দু ঘামের দানা, বিষণ্ণ, মন খারাপ করা ঠোঁট; ঘন কালো কোঁকরানো এক ঢাল চুলের মধ্যে হাসি ভরা মুখ খানা। শুধু মনে হচ্ছিল যে গুল্যাংগ বোধহয় ফিরে না যাওয়ার জেদ করে দাঁড়িয়েই থাকবে ওখানে। তবে তেমন কিছু ঘটল না। বেশ খানিকক্ষণ পরে কেলস্যাঙ্গ দেখতে পেল গুল্যাংগ ট্রাকে উঠে বসেছে। ট্রাকটা চালু করে তাশি তাকে নিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে মঠের দিকে। পেছনে উড়ে যাচ্ছে চাকার ঘূর্ণনে ছিটকে ওঠা তুষার। কেলস্যাঙ্গের মুখে ফুটে উঠল বিষণ্ণ একটা হাসি। বড়ো করে একটা শ্বাস ফেলে সে ঘুরে গেল গন্তব্যের দিকে। পাহাড়টা আর খুব বেশি দূরে নেই। এখন আর তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো ভাবাবেশের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সে সামনে হাইওয়ের দিকে তাকাল।

দূরে, বারখো রলুং-এর দিক থেকে যে ভিড়টা হাইওয়ের দিকে আসছিল, সেটা এখন প্রায় পৌঁছে গেছে। অবয়ব গুলো এখন হাইওয়ের আরো কাছে। তাদের আকার এখন আরো বড়ো বড়ো। কিন্তু সেটা একটা ভিড় মাত্র। এত দূর থেকে আলাদা করে কাউকে বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো ওই ভিড়ের মধ্যেই আছে সাংগমু রাবতেন, ওয়াংগমো-রা স্বামী স্ত্রী দু-জনেই, দোলমা-ও থাকতে পারে, এমনকি জিগমে যে নেই তাই বা কে জানে! ভিড়ের কেউ কেউ হয়তো আসছে তাদের অবতারের বক্তব্য শুনতে, কেউ আসছে শুধুই কৌতুহল মেটাতে, জিগমের মতো কেউ কেউ হয়তো দেখতে আসছে রক্ষীদল তার কী হাল করে তার সাক্ষী থাকতে!

কেলস্যাঙ্গের মুখের হাসি আরো প্রসারিত হয়। ভিড়টা জানে না, সে চাইলেই সবার চোখের আড়ালে এক্ষুনি পৌঁছে যেতে পারে তাদের পেছনে। মিশে যেতে পারে ভিড়ের মধ্যেই। কেউ তাকে চিনতে পারবে না। জনতার একজন হয়ে জনতার ভিড়ের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে থাকবে। অপেক্ষায় থাকবে সেই মুহূর্তের যখন অবতার অবতীর্ণ হবে, মাঠে নামবে। বক্তব্য রাখবে। সেই বক্তব্য যা জনতাকে আগামী কয়েক শতকের জন্য প্রতিদিন অনুপ্রাণিত করতে থাকবে। দুশো বছর পরের কোনো রাষ্ট্রশক্তির মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠবে। কোনো এক জেনারেল কোনো এক হত্যা বিশারদকে সময় নদীর উজানে ঠেলে পাঠাবে এই আজকের দিনটাতে। শুধু এই দিনে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ যাতে কিছুতেই উচ্চারিত না হতে পারে।

কেলস্যাঙ্গের মুখের প্রসারিত হাসি যেন উচ্চকিত হয়ে উঠতে চায়। হাঃ হাঃ। কী হবে যদি সেই শব্দেরা উচ্চারিত হয়েই যায়? আলি হামাদা তার শিকার খুঁজে পেয়ে যাবে। সময় নদী তার নিজের গতিতে বইতে থাকবে। এখানে জড়ো হওয়া মানুষেরা, তাদের থেকে জেনে যাওয়া মানুষেরা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই শব্দগুচ্ছের প্রভাবে অনুপ্রাণিত হতে থাকবে। আর সে সুযোগ পেয়ে যাবে এই ছোট্ট ছবির মতো শহরটার মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার। আর হয়তো গুল্যাংগ কর্মা নাম্নী একজন নারী . . .

কিন্তু না! চুক্তিবদ্ধ কেলস্যাঙ্গ এরকম কিছু হতে দিতে পারে না। গুরুর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সে। চুক্তির মূল্য তাকে দিতেই হবে।

জোর করে মনটা শক্ত করে কেলস্যাঙ্গ নেমে আসে পাহাড়ের চাতালটায়।

***

চাতালটা এখনো একই রকম পড়ে রয়েছে। দুশো বছর পরেও সম্ভবত এরকমই থাকবে। যদি না মানুষ পালটে দেয়। মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজের দরকার পড়লেই সব কিছু উলটেপালটে দিতে চায়। প্রকৃতির বারোটা তো সে কবে থেকেই বাজাতে শুরু করে দিয়েছে। শুধু পৃথিবীর কেন, এখন তো সে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পৃথিবীর বাইরেও। মঙ্গল থেকে, বৃহস্পতির ইউরোপা থেকে, কর্ণিয়া থেকে শুরু করে আরো কত যে জায়গায়! কেলস্যাঙ্গ সবটা জানেও না। অতীতের পৃথিবীটাই ভালো ছিল। তবে আর বোধহয় বেশিদিন থাকবে না। মানুষ এবার তো আরো ভয়ানক কারবার শুরু করে দিয়েছে! সময় রেখার পরিবর্তন! সে নিজেই দুশো বছর পিছিয়ে এসেছে সেই জন্য! চাতালটায় দাঁড়িয়ে কেলস্যাঙ্গ ক্রমাগত হয়ে চলা সামনে তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে প্রসারিত দি-কি-টো-মো-র ময়দান, ময়দান পেরিয়ে বারখো রলুং-এর ঘরবাড়ির ছায়া ছায়া অবয়বগুলোর দিকে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

তারপর ঘুরে ফিরে চলল পাথরের আড়ালে থাকা স্ফটিক গোলকটার দিকে। মাথায় বিভিন্ন চিন্তাভাবনা ঘোট পাকিয়ে আছে। সেই অবতারের এখনো দেখা নেই। অথচ অপেক্ষায় থাকা মানুষের ভিড় থিকথিক করছে। শুধু সাধারণ মানুষ না, একই সঙ্গে অপেক্ষমানদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রশক্তি। তারা আবার সম্ভবত তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর সে নিজেও খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই বিশেষ একজনকে, অবতারকে।

পাকদন্ডীর মুখটা পেরিয়ে সে এখন পৌঁছে গেছে খাঁচাটার সামনে। বায়োমেট্রিক্স পাশ কোড দিয়ে দরজা খোলার ঠিক আগে তার মাথায় এল যে এখনো সামনে দুটো পথই খোলা আছে। এক হচ্ছে সে অস্ত্র হাতে তৈরি হয়ে চুক্তিমাফিক কাজ সারতে নেমে পড়তে পারে। দ্বিতীয় যেটা, সেটা হচ্ছে সবচেয়ে সহজটা। এত কিছু ঝামেলা ঝঞ্ঝাটের মধ্যে না থেকে পালিয়ে যাওয়া। দরজা খুলে যেতেই কেলস্যাঙ্গ ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই প্রথমে চোখ গেল নিয়ন্ত্রণ হুইলটার দিকে। দু-নম্বর পথে যেতে চাইলে এক্ষুনি হুইলটাকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সে তো একটা কাজ নিয়ে এসেছে। কাজটা কতটা কি গুরুত্বপূর্ণ সে জানে না, জানার প্রয়োজন যে আছে সেটাই সে মনে করে না। জানার চেয়ে তার কাছে চুক্তিটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গুরুর আদেশ সেই রকমই। তাই তাকে এখানে, এই জায়গায়, এই সময়ে থাকতে হবে। দেরাজ থেকে ওয়াইজে-৯০২ বন্দুকটা তুলে নিল সে। পঞ্চবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম আবিষ্কার। একদিকে গণহত্যার চরমতম অস্ত্র। কয়েকটা মিনিট সময়ের মধ্যেই ওই ময়দানে জমায়েত প্রত্যেকটা মানুষকেই শেষ শয্যায় শুইয়ে দেবে। অন্যদিকে খুঁজে বেছে মারতে হলে তাতেও পারদর্শী। চার-পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে এর টেলিস্কোপিক লেন্স আর লেজার দিয়ে একবার শুধু লক্ষ্য স্থির করা! সঙ্গে সঙ্গে শিকারের ডিএনএ বিশ্লেষিত হয়ে সেই তথ্য ঢুকে যাবে বুলেটের মস্তিষ্কে। আর তারপর গুলি ছুটে যাবে সেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে— শিকারের আর পালাবার পথ নেই। যত্ন করে সে বন্দুকটার কলকব্জা কষে নেয়। গুলি ভর্তি ম্যাগাজিন লক করে বন্দুকটা এখন সম্পূর্ণ তৈরি। বাকি রইল লক্ষ্য স্থির করা আর ট্রিগারটা চেপে ধরা। অবতারের মৃত্যু সুনিশ্চিত। বাকি থাকবে শুধু শিকারের মাথাটা কেটে খুলিটা বের করে নেওয়া… আরে, কোথায় সেই খুলিটা?

নীচু হয়ে টেবিলের নীচের দেরাজে তাকাতেই চোখে পড়ল সেই খুলিটা।

এটা দেখেই তো চিনে নিতে হবে সেই আগন্তুককে। কারও কাছে যে অবতার, কারও কাছে রাষ্ট্রদ্রোহী বিপ্লবী। তার কাছে তার শিকার। কিন্তু একটা খুলি দেখে কীভাবে সে চিনে নেবে জীবিত একটা মানুষকে?

হাতের বন্দুকটা নামিয়ে রাখল টেবিলের উপরে। নীচু হয়ে তুলে দু-হাতে নিল মাথার খুলিটা। চোখের সামনে রেখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খুলিটা নজর করছিল কেলস্যাঙ্গ। ওটার আকারে আর গড়নে খুঁজে পেতে চাইছিল এমন কিছু বিশেষ চিহ্ন, যা কোনো জীবিত মানুষের মুখে মাথায় দেখে তাকে চিনে নেওয়া যাবে। একসময় নজর গেল খুলিটা দাঁতের দিকে। নজর হয়ে উঠল তীক্ষ্ণ। উঠে পড়ে কেলস্যাঙ্গ। এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। মাথার খুলিটা তুলে ধরে আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর মাথার খুলিটা চেপে ধরল নিজের গালে। এখন আয়নার মধ্যে তার নিজের মুখের পাশে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে দাঁত বের করা মাথার খুলিটা। আয়নার ভেতর থেকে বত্রিশ পাটি বের করে বিদ্রুপের হাসি হাসতে হাসতে কালো গর্তের মতো এক জোড়া অদৃশ্য চোখে তাকিয়ে আছে পাশাপাশি থাকা তার নিজের মাথার জ্যান্ত চামড়া আর মাংসে ঢাকা খুলিটার দিকে।

কেলস্যাঙ্গ এবার মুখ খুলে তার নিজের দাঁতের বত্রিশ পাটি বের করে আয়নার দিকে তাকাল। আর সঙ্গে সঙ্গে চরম সত্যটা সে হৃদয়ঙ্গম করল।

তার হাতে ধরা খুলিটা তার নিজের!

সেই মানুষটা আসলে সে নিজেই, যে কিনা আজ যে কোনো সময় মরবে। যাকে হত্যা করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে সে দুশো বছরের উজান ঠেলে এখানে এসেছে। অপেক্ষমান উদগ্রীব জনতার আকাঙ্খিত অবতার আসলে সে নিজেই।

একটু পরে সে মাথার খুলিটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখল টেবিলের উপরে। অনির্দিষ্টভাবে এগিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল নিয়ন্ত্রণ হুইলটার সামনে। অজান্তেই হাতের আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করছিল হুইল আর আশপাশের বিভিন্ন কি-প্যাড আর সুইচগুলো। মাথাটা কেমন মনে হচ্ছে যেন হালকা হয়ে গিয়েছে। কর্তব্য, কর্ম, দায়িত্ব, জীবন আর ভবিষ্যৎ সব কিছু যেন এক অপার্থিব জটিল ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পড়ে গিয়ে জট পাকিয়ে গিয়েছে। সে কী ফিরে যাবে? লাভ কী? জেনারেল চেন জিয়াং সেখানে অপেক্ষা করছেন। তার কানে এল বহুদূর থেকে যেন গাড়ির এগিয়ে আসার আওয়াজ ভেসে আসছে। গাড়ির আওয়াজ? নাকি জন-নির্ঘোষ? এখানে এই পৃথিবী অপেক্ষা করছে তার জন্য। এমন একজনের জন্য যে মানুষকে পথ দেখাবে। যুগে যুগে যেমনটা হয়ে এসেছে। কী করবে সে? ভবিতব্যের মুখোমুখি হবে? নাকি পালিয়ে যাবে? পালিয়ে কোথায় যাবে?

ঘুরে দাঁড়িয়ে টেবিলে রাখা খুলিটার মুখোমুখি হল সে। ওই তো ওখানে তার নিজের মাথার খুলি। পুরোনো, হলদেটে হয়ে গিয়েছে। কোথায় যাবে সে পালিয়ে? যেখানে একটু আগে নিজেরই হাতে সে ধরে রেখেছিল নিজেরই মাথার খুলি! কতদিন পালিয়ে থাকবে? এক মাস, এক বছর, দশ বছর, এমনকি পঞ্চাশ বছর হলেও তাতে প্রকৃত অর্থে কী আসে যায়? সময় এক বহতা নদী মাত্র! এই তো কিছু সময় আগেই সে তার চেয়ে দুশো বছর আগে জন্মানো একটা মেয়ের সঙ্গে পাবে বসে পান করছিল! তাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে বাতাসে ভেসে যাচ্ছিল। কত দিনের জন্যে সে পালাতে পারবে? অনন্ত বিশ্বে অনন্ত সময়ের সাপেক্ষে সে তো নগন্য সময়! ভবিতব্যের হাত থেকে তো সে পালাতে পারবে না! ওই তো তার মাথার খুলি ওখানে রাখা আছে। কেউই আজ পর্যন্ত নিজের ভবিতব্যের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে পারেনি। কেউ কখনো পারবেও না।

সাধারণ মানুষ তো না জেনেই ভবিতব্যের দিকে এগিয়ে যায়। একমাত্র সে-ই নিজের ভবিতব্যকে হাতে তুলে পরখ করে দেখতে পেয়েছে। তার নিজের কঙ্কাল, তার নিজের মৃত মাথার খুলি!

আজ পর্যন্ত আর কেউ এই সুযোগ পায়নি। কেউ না।

চলো তবে, ভবিতব্যের মুখোমুখি হওয়া যাক।

খাঁচা থেকে খালি হাতেই বেরিয়ে পড়ল কেলস্যাঙ্গ। দরজাটা বন্ধ করে দিল। এবার যখন খুশি জেনারেল এটাকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন। এটার প্রয়োজন কেলস্যাঙ্গের আর পড়বে না।

পাকদন্ডী ঘুরে খাড়াই পর্বতের চাতাল থেকে পাখির মতো ভাসতে ভাসতে নেমে পড়ে কোমরের বেল্টের যাবতীয় গ্যাজেট আর যন্ত্র সব নষ্ট করে ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিল পাহাড়ের বিভিন্ন দিকে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে সে এগিয়ে চলল ময়দানের ভেতরের দিকে।

ভিড়টা এখন ময়দানের মাঝ বরাবর এসে জমাট বেঁধেছে। একটু আগেও যেখানে শুধু সাদা আর কালোর ছোপছোপ অবয়ব ছিল, এখন সেখানে লাল আর গৈরিকের ছোঁয়া লেগেছে। সম্ভবত মঠের চীবরধারি শ্রমণের দল ওখানে এসে পৌঁছেছে। প্রচুর মানুষ। সাধারণ মানুষ আর শ্রমণের দল একসঙ্গে দঙ্গল পাকিয়ে রয়েছে। আগে পিছে ব্যারিকেড বানিয়ে রক্ষীবাহিনী আটকে রাখার চেষ্টা করছে উত্তেজিত জনতাকে। কাজটা কঠিন। ইতিমধ্যেই তাদের কারও কারও চোখে পড়েছে আকাশ থেকে কেউ নেমে এসেছে। ইতিমধ্যেই মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে সেই আবির্ভাবের গল্প। এটা একটা স্মরণীয় ঘটনা। আগামী কয়েক প্রজন্মের মধ্যে বাহিত হবে এই আবির্ভাবের কাহিনি। এখন সে এগিয়ে আসছে তাদেরই দিকে। ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি ক্রমশ বেড়ে উঠতে শুরু করল। সেই সঙ্গে বাড়ছিল চীৎকার চেঁচামেচি।

ভিড়ের সামনে রক্ষীবাহিনীর একদল সান্ত্রী সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে একটা ব্যারিকেড তৈরি করে ফেলেছে। কাউকে আর এগিয়ে আসতে দিচ্ছে না। রক্ষীবাহিনীর প্রত্যেকের হাতে স্বয়ংক্রিয় সব অস্ত্রশস্ত্র। কেলস্যাঙ্গ দাঁড়িয়ে গেল। ভিড়ের থেকে তিরিশ-চল্লিশ হাত দূরে। রক্ষীবাহিনী অস্ত্র তুলে তাক করে আছে।

কেলস্যাঙ্গ দু-হাত সোজা উপরে তুলে ধরে। সে যে নিরস্ত্র আর খালি হাতে আছে সেটা প্রথমেই সে দেখিয়ে দিল।

সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে থেকে টুং টাং করে ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেতে শুরু করল। প্রথমে একটা দুটো করে ধীরে ধীরে অসংখ্য ঘণ্টা ধ্বনি। বাজছে একটা নির্দিষ্ট তাল আর সুরে। ভনভন করে ভিড়ের মধ্যে একটা গুঞ্জন সেই সুর আর তালে ক্রমশ ধীর লয় থেকে উচ্চ নাদের দিকে উঠতে শুরু করল।

ধম্মং শরণং গচ্ছামি।। সংঘং শরণং গচ্ছামি।। শান্তিপাদানাম্ শরণং গচ্ছামি।।

***

এক সময় মন্ত্রোচ্চারণ আর ঘণ্টাধ্বনি থেমে গিয়ে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল চারদিকে। জনতার ভিড়টাও এখন প্রস্তরীভূত। সবাই অপেক্ষা করছে। অবতার অবতীর্ণ হয়েছেন। সবাই তার মুখ নিসৃত বাণীর জন্য অপেক্ষার।

সে এবার ধীরে ধীরে উপরে তুলে ধরা হাত দুটো নামিয়ে আনে। মুখে উদ্ভাসিত হাসি। হাত দুটো কোমরের দু-পাশে রাখা।

আলি হামাদা এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়ায়। দু-পাশের দুই রক্ষীর হাতে উদ্যত অস্ত্র।

“কোনো চালাকি চলবে না কেলস্যাঙ্গ, ওটাই যদি তোমার আসল নাম হয়ে থাকে। আর অস্ত্রশস্ত্র যা আছে বের করে দাও।”

“আমি দুঃখিত,” সে হেসে ফেলে। “আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই। আপনি ভুল করছেন। আর ওটাই আমার নাম।”

“বিশ্বাস করি না।”

“করতে পারতেন। কারণ আমার কাছে যা অস্ত্র ছিল, আমি চাইলে আপনার পুরো দলবল এক মুহূর্তের মধ্যে মুছে দিতে পারতাম। যদি আপনাদের এই ক-জনকে মুছে দিলেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।”

ভিড়টা ব্যারিকেডের পেছনে নড়াচড়া করতে শুরু করে। একটা কণ্ঠস্বর চীৎকার করে ওঠে “ভন্তে! এদেরকে শেষ করে দিন!”

আলি হামাদা আর তার দুই সঙ্গী সান্ত্রীকে প্রায় উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে হাত দুটো উপরে তুলে ভিড়ের আরো কাছে এগিয়ে যায় সে। এখন মানুষগুলোর মুখ অনেকটাই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

“আমি এদের এই ক-জনকে শেষ করে দিতেই পারতাম। কিন্তু তাতে খুব কিছু লাভ হত কী? তখন আরো আরো অসংখ্য সেনা, আরো আরো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে এরা। এই রাষ্ট্রযন্ত্র। আপনারা এই ক-জন আর আমি— আমরা নিমেষে মুছে যাব, জগতের আপামর মানুষের তাতে কোনো প্রকৃত উন্নতি হবে না।”

জনতার মধ্যে একটা বিভ্রান্ত ভাব।

“কীসে তবে প্রকৃত উন্নতি হবে?” ব্যারিকেডের ওপাশে প্রথম সারির দিক থেকে প্রশ্নটা ছুটে আসে। একজন বয়স্কা মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে। মাথায় ফিরোজা আর মুগার কাজ করা একটা কাঠের ধনুকাকৃতি টঙ্গী। বলীরেখাময় সুন্দর চকচকে মুখে একগাল হাসি। চোখে সরু চৌকো ফ্রেমের চশমা। সেটা নাকের ওপরে নেমে এসেছে।

চমকে ওঠে সে। কেমন যেন পরিচিত মনে হয়। সে অবশ্যই তাকে আগে কোথাও দেখেছে। কোথায়?

তার মনে পড়ে গেল। এখানে এসে সেই প্রথম দিনেই… সেই লাইব্রেরিতে… মনে পড়ছে ভদ্রমহিলা তাকে দেখে যেন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আজকের তারিখ হিসেবে সেই দিনটা অবশ্য এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে। কেন অবাক হচ্ছেন মহিলা, তখন সে বুঝতে পারেনি। এখন বুঝতে পেরে সে মনে মনে হেসে ওঠে। কিছুদিন পরেই লাইব্রেরিতে তাকে দেখে ইনি তো অবাক হবেনই।

কেলস্যাঙ্গ তাই হেসে ফেলে। আজ যদি আলি হামাদার দল তাকে মেরেও ফেলে তবুও সে আবার বেঁচে উঠবে। বারখো রলুং-এর পথে যারা তাকে দেখে চমকে উঠেছিল, তার পিছনে ধাওয়া করেছিল সেই একদিন, কেলস্যাঙ্গ এখন নিশ্চিত যে তারাও এখানে এই জমায়েতের মধ্যে ভিড়ের মধ্যে কোথাও না কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। তার দিকেই তাকিয়ে আছে। হয়তো তারাও আজ তার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী হবে। তারপর ক-দিন পরেই আবার তাকে এই বারখো রলুং-এর রাস্তার মোড়ে শপিংমলের সামনে দেখতে পাবে। এদের সবার কাছে সে আবার বেঁচে উঠবে। মৃত্যুর পরেও তার বেঁচে ওঠার, ফিরে আসার গল্প এক মুখ থেকে অন্য মুখে ছড়িয়ে যাবে। ছড়িয়ে যেতে থাকবে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। সেই গল্প স্থায়ী হয়ে শতাব্দী পেরিয়ে কোনো এক জেনারেলের কাছেও পৌঁছে যাবে। এই দিনে বারখো রলুং-এ দি-কি-টো-মো-র ময়দানে আবির্ভূত এক অবতারের গল্প। যে মৃত্যুকে জয় করেছিল। আড়াই হাজার বছর আগে মধ্য প্রাচ্যের একজন মানুষ হয়তো এই ভাবেই একদিন ঈশ্বর পুত্রের অভিধা লাভ করেছিল। সে হৃদয়ঙ্গম করে যে সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। তার কাছে অস্ত্র ছিল, সে এই রক্ষীদল এর প্রত্যেককেই হেলায় হত্যা করতে পারত। স্ফটিকের খাঁচায় চড়ে ফিরে যেতে পারত। কিন্তু অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পারত না। ফিরে গেলেও আজ হোক বা কাল, একদিন তাকে মরতেই হত। আজ সে যখন স্বেচ্ছায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে, তখন বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত মোচড়ে সে আবার বেঁচে উঠে হাজির হবে। হাজির হবে সশরীরে, মাত্র কয়েক মাস পরেই। অথচ ততদিনে এখানেই কোনো এক অজানা জেলের মেঝেতে তার মৃত শরীরের হাড়গুলো পুঁতে ফেলা হয়েছে।

আর এই ভাবে সে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠবে। লোকমুখে অবতারের এই আবির্ভাব শতাব্দী পার করে পৃথিবীর বুকে গল্পকথা হয়ে বেঁচে থাকবে। তাকে এখানে ওখানে মানুষে দেখতে পাবে। তার বলা কথা মন্ত্রের স্থায়িত্ব নিয়ে এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে।

তুষারঝরা আজকের ক্ষণস্থায়ী এই বিকেল বেলায় যারা তাকে দেখছে, তার কথা শুনছে, তাদের অনেকেই তাকে আবার দেখবে। জানবে সে মরে নাই, সে বেঁচে আছে।

আর তারপর, অবশেষে, সে আরো একবার আবির্ভূত হবে, দুশো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরে। দুই শতাব্দী পরে।

সে আবার জন্মগ্রহণ করবে, এই মাটিতে, অনাথ হবে, একদিন গুরুর হাত ধরে অন্ধকার পথে পা বাড়বে। মঙ্গল গ্রহে শিকার করবে, কর্ণীয়া থেকে খনিজ স্মাগল করবে, সৌরজগতের একজন প্রধান হত্যাবিশারদ হিসেবে বিখ্যাত হবে। তারপর একদিন চেন জিয়াং বলে কোনো একজন জেনারেল তাকে খুঁজে বের করে হাতে একটা পুরোনো খুলি তুলে দিয়ে সময়ের উজানে ফেরত পাঠাবে, এইখানে, এই মাঠে অবতীর্ণ হওয়া কোনো এক অবতারকে হত্যা করার—

হাইওয়ের ওপরে আরো কয়েকটা সৈন্যবাহী গাড়ি এসে থামল। থামতেই জমাট বাঁধা ভিড়টা নড়েচড়ে উঠল। একটা উত্তেজনা। একটা গুঞ্জন। পেছন থেকে আরো দু-তিন জন রক্ষী এসে আলি হামাদার পাশে দাঁড়িয়েছে। আলি হামাদাকে এগিয়ে আসতে দেখে কেলস্যাঙ্গ হাত তুলে ধরে।

“আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে,” আলি হামাদা কথাটা বলতেই একজন রক্ষী একটা হাতকড়া নিয়ে এগিয়ে আসে।

“এক মিনিট,” বলে সে জনতার ভিড়ের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।

জনতা ঘণ্টাধ্বনি করে। সে হাত নেড়ে তাদের শান্ত হতে ইশারা করে।

“আমাকে এখন যেতে হবে। যাওয়ার আগে আমি আপনাদের দু-চারটে কথা বলে যেতে চাই। চাইলে আমি একাই এখানে উপস্থিত রক্ষীবাহিনীর সব্বাইকে হত্যা করতে পারি। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। এরপর যখন হাজার হাজার হিংস্র রক্ষীবাহিনী নামিয়ে রাষ্ট্রশক্তি গোটা গ্যাংচীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে তখন আমি একা বা আমরা সবাই মিলেও তাদের আটকাতে পারব না। আমি চাই না আমার জন্য আপনারা সবাই বিপদের মুখে পড়ুন। জানবেন, এরা যাই করুক না কেন, আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমি আপনাদের কাছে ফিরে আসব। আজ না হলেও ভবিষ্যতে কোনো একদিন আমরা সবাই মিলে এই রাষ্ট্রশক্তিকে পরাজিত করে শান্তির পৃথিবী গড়ে তুলতে পারব। শুধু এই কয়েকটা কথা আপনাদের মনে রাখতে হবে… এক— মানুষ একা কিছু করতে পারে না। যূথবদ্ধতাই শক্তি। সংঘম শরণং গচ্ছামি! দুই— অস্ত্র শুধু হত্যা করতে পারে। অহিংসা পরম ধম্ম! সম্যক দৃষ্টি আর সংকল্প প্রয়োজন জীবনের জন্য। তিন— দুঃখ, জরা আর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। জীবন ক্ষণস্থায়ী— তাই সম্যক বচন, কর্ম আর জীবিকা পালন করুন, উন্নতি অবশ্যম্ভাবী। চার— মনে রাখবেন যারা প্রাণ নেয় তারা নিজেরাই একদিন নিজেদের হারাবে। যারা হত্যা করবে তারাও মরবে। কিন্তু যারা নিজের জীবন মানুষের জন্য বিলিয়ে দেবে তারাই আবার বেঁচে উঠবে!”

ভিড়ের মধ্যে জনতা উদ্বেলিত হয়ে উঠল। ঘণ্টাধ্বনি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। জনতার মন্ত্রোচ্চারণ গুঞ্জন থেকে ক্রমশ উচ্চনাদে পরিণত হতে শুরু করেছে। আলি হামাদা আর তার রক্ষীদল তৎপর হয়ে উঠল। উদ্বেলিত জনতার ভিড়টাকে ঠেলে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আলি হামাদা জনা দুয়েক রক্ষীসহ তার সামনে এগিয়ে এল।

তার মুখে ততক্ষণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছে। রহস্যময় সে হাসি। সে হাসতে পারছে, কারণ সে কিছু বলতে চেয়েছিল আর আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে যে সে সত্যি সত্যিই বলতে পেরেছে। এমন কিছু বলতে পেরেছে যা সে সারাজীবনেও কখনো বলবে বলে ভাবেনি, অথচ আজ যখন তার বলাটা পূর্ব-নির্ধারিত ছিল তখন সে অনায়াসেই সে সব বলতে পেরেছে। সে এমন কিছু বলেছে যা জনতা শুনতে চেয়েছিল। তারা খুশি হয়েছে। তারা এগুলো মনে রাখবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে যাবে তার আজকের বক্তব্য। ভবিষ্যতের পৃথিবী জানবে আজকের এই দিনে, এই নির্দিষ্ট স্থানে, অবতার অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং মানুষের উদ্দেশ্যে তার দেওয়া বক্তব্য প্রচারিত হতে থাকবে যুগ থেকে যুগান্তরে।

রহস্যময় হাসি মুখে নিয়ে কেলস্যাঙ্গ তার পূর্বনির্ধারিত মৃত্যুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।

 

মূল গল্প: The Skull by Philip K. Dick
Tags: অনুবাদ উপন্যাস, ফিলিপ কে. ডিক, রুদ্র দেব বর্মন, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

2 thoughts on “খুলি

  • November 9, 2022 at 10:12 am
    Permalink

    খুব ভালো লাগলো রুদ্র দেব বর্মনের অনুবাদ।গল্প টা পড়া ছিল কিন্তু সেজন্য অনুবাদ পড়ার সময় আগ্রহের অভাব হয়নি।ধন্যবাদ লেখক কে।

    Reply
    • November 9, 2022 at 10:28 am
      Permalink

      ধন্যবাদ আপনাকে আপনার ভালো লাগা শেয়ার করার জন্য।

      Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!