দ্য ট্রিনিটি

  • লেখক: জাবির ফেরদৌস
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

ভয়াবহ নিস্তব্ধ পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে উচ্চ স্বরে গান বাজছে মিহিরদের সাউন্ড সিস্টেম থেকে। জনমানবহীন পরিবেশের পুরো ফায়দা লুটছে ওরা। গায়কের মুখ থেকে দ্রুতগতিতে বের হওয়া শব্দগুলোর মানে কেউ বোঝা দূরে থাক, কারও কানে ঢুকছে কি না তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।

এই মুহূর্তে ওরা পার্টির আয়োজন করছে আর্জেন্টিনায়। চোখ জুড়ানো সবুজ পরিবেশের মাঝে ঘন ঘাসে ঢাকা একটা প্রান্তর পেয়ে গেছে তারা। গজ ত্রিশেক এগোলেই ঢালু পাহাড়।

সবুজ ঘাসের উপরে কাপড় বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মিহির আর জিমি এখন আগুনে মাংস ঝলসাতে ব্যস্ত। অতি উত্তেজনায় ওরা আগুন জ্বালানোর সরঞ্জাম নিয়ে আসেনি। মাথায় ভুত চেপেছিল, আদিম পরিবেশে আদিম মানুষের মতো পাথর ঠুকে আগুন ধরাবে ধনীর দুলালেরা। পারেনি, তাদের আড়াই ঘণ্টার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

পার্টি ফেলে চলে যাওয়ার আগেই অবশ্য সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে মেরি। সে ভালো করেই জানতো তার প্রেমিক কতটা অকম্মা! কাজেই পকেটে করে লাইটার এনেছিল সে।

মেরিকে কাজে সাহায্য করছে এলিজাবেথ। গ্লাসে মদ ঢালা আর বাস্কেট থেকে খাবার বের করে সাজিয়ে রাখছে ওরা।

“দুই অলস পাথর ঠুকে জ্বালাবে আগুন! বাপরে! আমার তো এখনো হাসি পাচ্ছে!” মেরি বলল

“এই সপ্তাহের সেরা জোক ছিল এটা!” এলিজাবেথ বলল, তাকে এলি বলেই ডাকে সবাই।

“হ্যাঁ। তবে থিওরির ভুল ধরতে আর সলিউশান বের করতে মিহিরের জুড়ি নেই, তা সে যতই অলস হোক না কেন!

সামনের বছর সম্ভবত সে নোবেল প্রাইজ পাচ্ছে! এই 23 বছর বয়েসেই!” গর্বের সঙ্গে বলল মেরি। এদিকে নিজের প্রেমিক জিমি সম্পর্কে কিছু বলতে না পেরে জ্বলে যাচ্ছিলো এলি। জিমির বাবা বিজ্ঞানী আর মস্ত ধনকুবের আর জিমি বাপের হোটেলে খায়।

মাংস ঝলসানো শেষ। ঘাসের উপরে বিছানো কাপড়ে বসে পড়লো দুই বন্ধু। ঘেমে নেয়ে একাকার। সঙ্গে সঙ্গেই চার্জার ফ্যানটা চালু করে দিলো মেরি।

মিহিরের হাতে ওয়াইনের গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে এলি বলল,” তোমার টাইম মেশিনের গল্প শোনাও মিহির। কী করে করলে এই অসাধ্য সাধন! যেখানে স্বয়ং স্টিফেন হকিং বলেছেন যে অতীতে টাইম ট্রাভেল সম্ভব নয়! সেখানে আমরা পঁচাত্তর মিলিয়ন বছর অতীতে চলে এসেছি!” চোখ বড় বড় করে বলল এলি, একসঙ্গে একগাদা কথা বলা তার স্বভাব।

“আসলে এটা তো বাবার দীর্ঘদিনের গবেষণার ফলাফল। উনি শুধু একটা জায়গায় আটকে গেছিলেন। আমি সাহায্য করেছি। তাতেই সবাই আমাকে হিরো ভাবছে!” বিনয় দেখিয়ে বলল মিহির।

“তুমি সামান্যই সাহায্য করেছো বটে, কিন্তু ওই সামান্য টুকুর জন্যই শত শত বছর ধরে আটকে ছিলেন বিজ্ঞানীরা!” বলল মেরি। প্রেমিকের গুণগাণ করতে ওস্তাদ সে!

“আচ্ছা আচ্ছা। অনেক কিছু করেছি। আসলে পুরো ব্যাপারটা সহজ হয়েছে ক্যাসিমির এফেক্ট ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারায়। ওখানেই খেল দেখিয়েছি আরকি!” মৃদু হেসে বলল মিহির।

“থাক থাক। এখন আর ক্যাসিমির এফেক্ট ব্যখ্যা করতে হবে না তোকে। আমরা কেউ বিজ্ঞানের ছাত্র ছাত্রী নই!” পড়াশোনা থেকে শত হস্তে দূরে থাকা জিমি বলল।

“নিশ্বাস বন্ধ করে থাকবো?” দুষ্টু হাসি হেসে বলল মিহির।

“না-আ-আ-আ- !” চেঁচিয়ে উঠলো মেরি। “তুমি মরে গেলে আমি কার সঙ্গে আজে বাজে বকবক করতে পারবো!” হাসছে সে। সবাই এক দফা হেসে নিলো।

“তোর বাপ তো এই সুযোগে ভালোই নাম কামিয়ে নিলেন!” বলল মিহির।

“হু। ইতিহাসের প্রথম ওয়ার্মহোলের আবিষ্কারক বলে কথা! কামাবেই তো!” চোখ টিপে বলল জিমি।

“তো আংকেল জমি নিলেন না কেন আটলান্টিসে?” গ্রিলে কামড় দিয়ে বলল মিহির।

মঙ্গল গ্রহে জমি বেচাকেনা বেশ জমজমাট হয়েছিল। ধনকুবেরদের পাশাপাশি পয়সাওয়ালা সাধারণ মানুষও জমি কিনছিলো মুড়ি মুড়কির মতো।

একদিন মঙ্গলে যাওয়ার পথে ভুল করে একটা ওয়ার্মহোলে ঢুকে পড়ে একদল যাত্রীসহ একখানা রকেট, যেটা ভবিষ্যতবাণী আগেই করেছিলেন জিমির বাবা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী স্যার স্টিভ ম্যাডিসন। ওয়ার্মহোল দিয়ে গিয়ে পাওয়া গেল পৃথিবীর মতোই বাসযোগ্য এক গ্রহ, নাম দেয়া হলো আটলান্টিস। মানুষ এবারে আর অত সহজে জমি কিনলো না। যদিও গ্রহটা দূষণে আক্রান্ত পৃথিবীর থেকে বেশিই বাসযোগ্য। তবুও মঙ্গলে জমি কিনেই তারা সন্তুষ্ট। ওয়ার্মহোল দিয়ে অন্য দুনিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকিতে কেউ রাজি নয়।

“কাজ না থাকলে বাবা কখনো আমেরিকার বাইরেই যেতেন না, আর তুমি অন্য গ্রহে জমি কেনার কথা বলো!”

“ওহ আচ্ছা! আংকেল তো আবার তোর মতো এক্সট্রোভার্ট নন!” খোচা মেরে বলল মিহির। দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পারলে তেইশ ঘণ্টায়ই বাইরে কাটাতে চায় জিমি।

“তবে জমির বিনিময়ে বাবা গডস ক্লাবের কাছে থেকে বেশ মোটা অংকের শেয়ার নিয়েছেন!” খোঁচা গায়ে না মেখে বলল জিমি।

“গডস ক্লাব না থাকলে আমরা টাইমমেশিন আবিষ্কার করতে পারতাম না। ক্যাসিমির এফেক্টরের জন্য যেই সংকর ধাতু লাগতো সেটার উৎপাদন খরচ অনেক। গডস ক্লাব পুরো টাকাটা দিয়েছে।” বলল মিহির।

পাঁচ সাত মিনিটের নিরবতা নামলো হুট করে। বলার মতো কথা পাচ্ছে না কেউ। এলির স্বভাব হলো অনেক কথা বলা। বাকিরা যখন দূষণহীন অসম্ভব সবুজ শান্ত প্রকৃতি উপভোগ করতে ব্যস্ত তখন সে বলার মতো কথা খুজছে। পেয়েও গেলো।

“আচ্ছা মিহির, আমরা যে এখানে এতসব কিছু করছি, আগুন লাগাচ্ছি, গাছ কাটছি, দুই একটা প্রানীও মারলাম, যা ইচ্ছা করলাম; এগুলোর কোনো প্রভাব পড়বে না বর্তমান দুনিয়াতে? বাটারফ্লাই এফেক্ট না কী যেন বলে?” বিজ্ঞানের ছাত্রী না হলেও সায়েন্স ফিকশন মুভি দেখে আর আল্ট্রানেট ঘেটে হালকা জ্ঞান আহরণ করেছে এলি।

“না। ওরা সব হিসাব নিকাশ করেই জায়গাটা নির্ধারণ করেছে আমাদের জন্য। আমাদের কর্মকান্ড কোনো প্রভাবই ফেলবে না বর্তমান দুনিয়ায়।“ বলল মিহির।

টাইমমেশিন আবিষ্কারের পুরষ্কার হিসেবে মিহিরকে অতীতে ভ্রমণের বিরল অনুমতি দিয়েছে সায়েন্স কাউন্সিল। সেটার উদযাপন উপলক্ষে বন্ধুদের নিয়ে সাড়ে সাত কোটি বছর আগের আর্জেন্টিনায় এসেছে মিহির।

“হুট করে ডাইনোসর এসে পড়বে নাকি রে?” ঠাট্টা করে বলল জিমি।

” সেই সম্ভাবনা এক দশমিক ছয় নয় শতাংশ। আসতেও পারে, বলা যায় না। আর আসলেই বা কি! বাইরে লেজার মিসাইল নিয়ে বসে আছে গার্ডরা!” মিহির বলল।

“আসবে না। আমি জানি।” মিহিরের ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল মেরি।

“এবারে তোরা বিয়ে করে নে। মিহির তো এখন ফ্রি মানুষ।” বলল জিমি। খানিকটা হাসি ঠাট্টা করার ইচ্ছা ছিল ওর। পারলো না। হঠাত ওরা শুনতে পেল ডাইনোসরের গর্জন। ভ্যালিপ্টোসরাস! সাইজে সিংহের সমান কিন্তু হিংস্রতায় টিরানোসরাস রেক্সের মতোই! গর্জন শুনে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল মিহিরের। এক্ষুনি না পালালে আর কখনোই পালাতে পারবে না।

ওরা যে সমতল প্রান্তরে বসেছিল সেখান থেকে টাইমমেশিনের টাইমহোল বড়জোর পঞ্চাশ গজ দূরে। ওদের পিছনে আর ডানে ঢালু পাহাড় উঠে গেছে বেশ অনেকদূর। একমাত্র বাম দিকটাই ফাঁকা ছিল। বিপদ আসলো ওইদিক থেকেই।

দ্রুত গতিতে চলে এলো একদল ভ্যালিপ্টোসরাস। মিহিররা যেই মাংস পুড়িয়েছে, সম্ভবত সেটার গন্ধেই এসেছে ওরা।

নার্ভাস হয়ে সময় নষ্ট করছে ওরা। এগিয়ে আসছে ডাইনোসরের দল। সবকিছু গোছগাছ করছে এলি আর মেরি। দেরি হচ্ছে দেখে তাগাদা দিলো মিহির, হাত লাগিয়েছে সে নিজেও। একমাত্র চুপচাপ আছে জিমি। ওর হাতে একটা শটগান!

চেচিয়ে উঠলো জিমি। “এসব রাখো। বেঁচে থাকলে অনেক কিনতে পারবে!”

এলির এক হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো জিমি। টাইমহোলের উল্টোদিকে!

মিহির চেঁচিয়ে থামাতে চাইলো ওকে। জিমি থামলো না। এলির হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে উঠছে পাহাড়ে।

বিষয়টা বুঝতে দুমিনিট ব্যয় করলো মিহির। তারপর মেরিকে নিয়ে সেও উঠে গেল পাহাড়ে।

পিছনের পাহাড় ত্রিশগজ দূরে আর টাইমহোল পঞ্চাশ গজ। এই দুরত্ব পেরোতে গেলে ডাইনোসরের হামলায় পড়বে ওরা। তার থেকে পাহাড়ে ওঠাই ভালো। বন্ধুর ত্বরিত সিদ্ধান্তে খুশি হলো মিহির। অলস মস্তিষ্ক তাহলে সবসময় শয়তানের কারখানা নয়।

দেরি করে ফেলেছিল মিহির। পিছনে এসে গেছে একদল ডাইনোসর। ঢালু পাহাড় বেয়ে উঠতে মানুষের থেকে দক্ষ তারা।

একশো ফুট উঠেই হাঁপিয়ে গেলো মিহির। এদিকে তরতর করে উঠে গেছে বাকিরা। তারা উঠলো একটা গাছের উপরে। মিহির তখনো ওঠার চেষ্টা করছে পাহাড় বেয়ে।

অলস মিহির দুই সেকেন্ড থেমেছিল প্রশ্বাস নেয়ার জন্য, তাতেই ওর উপরে লাফিয়ে পড়লো একটা ডাইনোসর। এলি সময়মতো না চেঁচালে ওর পিঠের উপরে চড়ে বসতো হিংস্র জন্তুটা।

মাটিতে পড়ে গেছিলো মিহির, উঠেই দৌড় লাগিয়েছে সে। পিছনের ডাইনোসরটাকে পরপর দুটো গুলি মেরে শুইয়ে দিলো জিমি। মিহির উঠলো গাছের ডালে।

অবাক হয়ে গেলো ওরা, একটা বাদে আর কোনো ডাইনোসর ওদের পিছু নেয়নি। বরং সবাই ছুটছে টাইমহোলটা লক্ষ্য করে! আগের ডাইনোসরদের পিছনে এখন আরো অসংখ্য ডাইনোসর হাজির হয়েছে। তারা সবাই পিলপিল করে এগিয়ে যাচ্ছে টাইমহোলের দিকে। ছাগল আকৃতির ডাইনোসর থেকে শুরু করে বিরাটাকৃতির টিরানোসরাস রেক্স এমনকি সাইজে সবথেকে বড় ডাইনোসর আর্জেন্টিনোসরাসও শামিল হয়েছে বর্তমান অভিমুখী যাত্রায়। তারা সংখ্যায় অনেক। কেউ মন্থর বেগে, কেউ বা ক্ষিপ্র বেগে এগোচ্ছে। যেন লঙ্গরখানায় খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে!

মিহিররা গাছ থেকে নামলো। অবাক হয়ে গেছে তারা। সবুজ আলোর বর্ডারের টাইমহোলের আকৃতি ছিলো ফুটবলের গোলবারের মতো। সেটাই এখন বড় হতে এত বড় হয়ে গেছে যে সাইজে সবথেকে বড় মিসাইল টাইটান-101ও অনায়াসে লম্বালম্বি বা সমান্তরালে ঢুকে যাবে। এইমাত্র যেমন একটা আর্জেন্টিনোসরাস অনায়াসে ঢুকে গেল টাইমহোল দিয়ে বর্তমান পৃথিবীতে।

সবচেয়ে বেশি অবাক হলো মিহির। দুটো প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে না।

সায়েন্স কাউন্সিলের হিসাবমতে ওদের অবস্থান থেকে ডাইনোসরদের সবথেকে কাছের আবাস ছিলো আড়াইশো কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে এতদূরে তারা আসলো কী করে! তাও একসঙ্গে এত ডাইনোসর!

টাইমহোলটা বন্ধ হওয়ার বদলে বড় হয়ে গেল কেন?

মিহিরের ভাবনা শেষ হতেই ডাইনোসরদের শেষ দলটাও ঢুকে গেল ভিতরে। বর্তমান পৃথিবীর শহরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে তাদের অর্ধেকই যথেষ্ট!

মিহির ও তার বন্ধুরা আতংকিত হয়ে দেখল টাইমহোলটা বন্ধ হয়ে গেল নিমিষেই। বর্তমান পৃথিবীতে তাদের ফেরার রাস্তাটাও বন্ধ হয়ে গেলো সেই সঙ্গে!

 

 

“দুটো বছর পেরিয়ে গেল, আপনারা তো কচুর স্বাদও দিতে পারলেন না! ” বিজ্ঞানী দলের সঙ্গে সেন্ট্রাল কমিটির মিটিংয়ে বিরক্ত গলায় বললেন লুইস এক্স, তার পুরো নামটা কেউ জানে না। বাপের দেয়া নামটা তিনিও ভুলে গেছেন বোধহয়!

“দেখুন মিস্টার লুইস, কেন পারছি না আমরা সেটা আপনারাও জানেন। যথাযথ স্যাম্পল সরবরাহ করেননি আপনারা। ” বিজ্ঞানী দলের হেড পিটার উইলিয়ামস জবাবটা ঠিক দৃঢ় স্বরে দিতে পারলেন না।

“যথাযথ স্যাম্পল সরবরাহ করতে গেলে পুরো বাক্সটা বাচ্চারা যেভাবে ভাঙে সেভাবে ভেঙে তারপর ভাঙা টুকরোগুলো থেকে স্যাম্পল সরবরাহ করতে হতো আপনাদের, যেটা আসলে সম্ভব নয়।” লুইস এক্স বললেন।

“সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয় মিস্টার লুইস।” পিটার উইলিয়ামসের জবাবটা এবারে দৃঢ় হলো।

” আপনাদের দেখার বিষয় এটা যে বিশের কাঠায় পা দেয়া এক ছোকরা যেটা আবিষ্কার করলো সেটা আপনারা পারলেন না, নোবেল প্রাইজ পাওয়া একদল বিজ্ঞানী! দেড় বিলিয়ন ডলার আপনারা খরচ করেছেন দুই বছরে,সামান্য এক সংকর ধাতু তৈরিতে!” বেশ ক্ষ্যাপা গলায় বললেন লুইস। বলার সময়ে থুতু বের হলো তার মুখ থেকে।

পিটার উইলিয়ামস আটকে গেলেন। তাদের যোগ্যতায় নাকি আনুগত্যে আঘাত করেছেন লুইস সেটা বুঝলেন না। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তবে তাকে জবাব দেওয়া থেকে বাঁচালেন জন মারফি।

“এক মিনিট মিস্টার লুইস। আমাকে পুরোটা শুনতে দিন ওদের মুখ থেকে। তারপর দেখা যাক তাদের জন্য কী ব্যবস্থা করা যায়। নিন বিজ্ঞানী শুরু করুন, টাইম মেশিনের বিষয়টা সংক্ষেপে ব্যখ্যা করুন।” জন মারফি,বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও নভোচারী। গডস ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট। পৃথিবী থেকে মঙ্গল আর সেখান থেকে আটলান্টিসে যাওয়ার কারিগরি দিকটা তিনিই দেখছেন। গডস ক্লাবের মিটিংয়ে যোগ দিলেন দেড় বছর পর। কড়া আর নিষ্ঠুর স্বভাবের মানুষ হিসেবে কুখ্যাতি আছে।

” প্রথমেই বলি, টাইমমেশিন একক কোনো যন্ত্র নয়। কিছু যন্ত্রের একটা সেট। টাইমহোল তৈরিকারী ক্যাসিমির এএফেক্টর, সেটাকে শক্তির যোগান দেয়া পোর্টেবল নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর আর টাইমহোল ধারণ করা বাক্স।

এখন অতীতে সময়ভ্রমণ করতে পারে এমন একটা স্পেসশিপ প্রয়োজন যেটা আলোর বেগ অতিক্রম করতে সক্ষম। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে আইন্সটাইন দেখিয়েছেন যে আলোর থেকে বেশি বেগে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।

কাজেই অতীতে ভ্রমণের জন্য স্থানকালকে বাঁকানো প্রয়োজন। আর স্থানকালকে বাঁকানোর জন্য প্রয়োজন ঋণাত্মক ভর ও ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব।

ঋণাত্মক শক্তি মানে হলো গচ্ছিত শক্তির থেকে বেশি শক্তি প্রয়োগ করা। ক্লাসিকাল পদার্থবিজ্ঞান এটা সমর্থন করে না।

কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব এটা মেনে নেয় যে কিছু ক্ষেত্রে শক্তি ঘনত্ব ঋণাত্মকও হতে পারে। অর্থাৎ আপনি গচ্ছিত শক্তির থেকে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে পারবেন। সেটা করার একমাত্র উপায় ক্যাসিমির এফেক্ট ব্যবহার করে ক্যাসিমির এফেক্টর থেকে ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব পাওয়া।” পানির গ্লাসে চুমুক দেয়ার জন্য থামলেন পিটার উইলিয়ামস। এই সুযোগে জন মারফি বললেন” এসব আমি জানি বিজ্ঞানী। ক্যাসিমির এএফেক্ট কী সেটাও জানি। ম্যানসুর মেহমুড কীভাবে টাইম মেশিন বানিয়েছেন সেটা জানতে চাইছি এবং আপনারা কেন মিস্টার লুইসের আশা পূরণে ব্যর্থ সেটাও জানতে চাইছি।”

পিটার উইলিয়ামস বোধহয় ভাবলেন জন মারফিকে আজ জ্ঞান দেবেন, তাই গোঁয়ারের মতো বলেই চললেন,

“ক্যাসিমির এফেক্ট হলো, আপনার কাছে দুটো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ধাতব পাত আছে। পাতগুলো প্রতিকণার জন্য আয়নার মতো কাজ করে। এরা নির্দিষ্ট কম্পাংকের আলোকতরঙ্গ চলাচল করতে দেয় তাদের মধ্যে দিয়ে।

বাইরে থেকে শক্তি দিলে এই বিশেষ পাতগুলোর বাইরের চেয়ে মাঝের এলাকায় কিছু প্রতিকণা ও ভার্চুয়াল কণা দেখা দেবে।

পাত দুটোর মাঝের তুলনায় বাইরে কণা বেশি থাকার কারণে পাতগুলোয় অল্প বল প্রয়োগে তারা পরস্পরের দিকে সরে আসে, ফলে পাতগুলোর মাঝে সৃষ্টি হয় নিম্নশক্তি ঘনত্ব।

এভাবে ক্যাসিমির এফেক্ট ব্যবহার করে ক্যাসিমির এফেক্টর দিয়ে ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব সৃষ্টি করা হয় যেটা স্থানকালকে এমনভাবে বাঁকিয়ে ফেলতে পারে যাতে অতীতে ভ্রমণ করা সম্ভব হয়।” আরেক দফা পানি খেলেন পিটার উইলিয়ামস। তাকিয়ে দেখলেন তার দিকে রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে আছেন জন মারফি।

“এখন সমস্যা হলো ওই ধাতব পাতগুলো হতে হবে সংকর। নয়তো সেগুলো দিয়ে বাইরের অনাকাঙ্ক্ষিত (যেমন তাপ ও আলো) শক্তি ভিতরে প্রবেশ করে পাতের দুইপাশের শক্তির ঘনত্ব সমান করে ফেলবে।

সংকর ধাতুর গঠন সুষম হতে হবে। কোন ধাতুর পরিমাণ কত হবে সেটা আমরা এখনো জানতে পারিনি, জানে কেবল মানসুর মাহমুদ আর তার ছেলে মিহির। আমরা পারিনি কারণ মিস্টার লুইস আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ স্যাম্পল সরবরাহ করেননি।

তাই বলে আমরা বসে নেই। সংকর ধাতু তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

“তো বুড়োর কাছে শুনে নিলেই তো হয়!” জন মারফি হাই তুলে বললেন।

লুইস এমনভাবে মারফির দিকে তাকালেন যেন মনসুর মাহমুদ আইন্সটাইন আর মারফি এনরিকো ফার্মি সেজে তার কাছে এসেছেন পারমানবিক বোমার সূত্র চাইতে!

“বুড়ো বললে কি আর দুই বছরে দেড় বিলিয়ন ডলার খরচ করি!” খানিকটা খেঁকিয়ে উঠলেন লুইস এক্স।

“অহ তাই তো! তাহলে আরও ডলার খরচ করতে থাকো!” হাই তুলে বললেন মারফি। “ভালো কথা, তোমরা যেন কোথায় টাইমহোল ওপেন করে কীসব আকাম কুকাম করছো। আমি আজ যেতে চাই সেখানে।”

আফ্রিকার দেশ চাদ। আফ্রিকা মহাদেশের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করছে দেশটা। দূর্নীতি, কুশাসন আর অর্থনৈতিক মন্দায় দেশটার অগ্রগতি স্থবির হয়ে আছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ দূর্বল।

আরেকটা টাইমহোল খোলার জন্য এই নির্জন দেশটাকেই বেছে নিয়েছে গডসক্লাব। আরেকটা টাইমহোল খুলে অতীত থেকে আরও ডাইনোসর এনে আফ্রিকা মহাদেশের বারোটা বাজিয়ে বাকি বিশ্বের মানুষকে পৃথিবীর বাইরে জমি কিনতে বাধ্য করতে চায় তারা।

দুম করে খেয়াল হলো আর টাইমহোল খোলার জায়গাটা বেছে নেওয়া হল এমন সহজ নয় বিষয়টি। অনেক গবেষণা করে, সিমুলেশন তৈরি করে সারা দুনিয়ায় এই মুহূর্তে টাইমহোল খোলার মতো পাঁচটা জায়গা পেয়েছিল তারা। অর্থাৎ, দুনিয়ার এই পাঁচটা জায়গায় টাইমহোল খুললে সেখান দিয়ে ডাইনোসর পৃথিবীতে আসার সুযোগ পাবে। তারা তো আর ভেড়ার দল নয় যে দুম করে যেখানে সেখানে সারাদিন টাইমহোল খুলে বসে থাকলে টুক করে ডাইনোসর চলে আসবে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ডাইনোসরদের মাস মাইগ্রেশনের পথে অতর্কিতে খুলতে হবে টাইমহোল। তাই  গবেষণা করে বের করা ওই পাঁচ জায়গা
। তারমধ্য এই চাঁদ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গা।

তারপরও অবশ্য সাবধানের মার নেই ভেবে এক কোম্পানি সৈন্য, বেশুমার সাঁজোয়া যান, পার্সোনাল আর্মি ট্যাঙ্ক, আর্মাড হাফট্রাক ইত্যাদি ইত্যাদি যুদ্ধের সরঞ্জাম নিয়ে আসা হয়েছে।

টাইমহোল খোলাটা অবশ্য সায়েন্স ফিকশন মুভির মতো ছেলের হাতের মোয়া নয়। খুব জটিল আর টাকা পয়সার ব্যাপার আছে এতে। একেকবার খুলতে প্রায় বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

সংকর ধাতুর তৈরি একটা ফোল্ডিং চারকোনা বাক্স আসল কাজটা করে। বাক্সটা এমনভাবে তৈরি যেন রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে সেটাকে একটা নির্দিষ্ট সাইজ পর্যন্ত বড় করা যায়। (ধরুন দেড়শো ফুট লম্বা একটা ডাইনোসর ঢোকার মতো বড়!)

বড় করার পরে সেটার গায়ের নির্দিষ্ট ছিদ্রের মধ্যে একটা টিউব ঢুকানো হবে,সেই টিউবটা আবার একটা যন্ত্রের সঙ্গে লাগানো। যন্ত্রটার নাম ক্যাসিমির এফেক্টর। সাইজে ওয়াশিং মেশিনের সমান। গায়ে হরেক রকম বোতাম আর স্ক্রিন লাগানো নেই, একটাই মাত্র বোতাম সেটায় আর বোতামটা চাপ দিলেই যন্ত্রটা ভানুমতির খেল দেখাতে শুরু করে।

ফোল্ডিং বাক্সটার বিপরীত পাশেও আরেকটা ক্যাসিমির এফেক্টর লাগানো হবে। দুইপাশে দুইটা আর সামন-পিছনে দরজা। এই দুই দরজা খুলে দিলেই পাওয়া যাবে টাইমহোল বা সময়মুখ। যেটার মধ্যে দিয়ে অতীতে ভ্রমণ করা যায় বা অতীত থেকে বর্তমানে আসা যায়।

ক্যাসিমির এফেক্টর দিয়ে বাক্সের মধ্যে ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব সৃষ্টি করা হবে। এই এফেক্টর চালাতে প্রচুর শক্তি দরকার হয়। যেই শক্তি নিউক্লিয়ার রিয়াকশন ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। বহনযোগ্য নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর বানানোও সহজ কথা নয়। প্রচুর টাকা আর কারিগরি সূক্ষ্মতার প্রয়োজন রয়েছে। তবুও বানিয়ে ফেলেছে গডসক্লাবের কারিগররা। যেটা শক্তি দিচ্ছে ক্যাসিমির এফেক্টর কে।

চারকোনা ওই বাক্সটা সুষম সংকর ধাতুর তৈরি যাতে ভিতরের শক্তি বাইরে আসতে বা বাইরের শক্তি ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে।

একটা নির্দিষ্ট সময় পর ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব এত বেশি হয় যে কিছুক্ষণের জন্য বাইরের শক্তি এর উপরে আর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। যত বেশি শক্তি প্রয়োগ করবে ক্যাসিমির এফেক্টর তত বেশি ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব সৃষ্টি হবে আর তত বেশি অতীতে ভ্রমণ করা সম্ভব হবে।

শক্তি ঘনত্ব পরিবেশের প্রভাবের বাইরে গেলে চারকোনা বাক্সের দুই মাথা খুলে দেয়া হয় আর সেখানে তৈরি হয় টাইমহলো বা সময় মুখ।

আর বাক্সের দুইমাথা খুলতে দরকার কোড। বাক্সের গায়ে লাগানো আরেকটা তার সোজা গিয়ে যুক্ত হয় একটা কম্পিউটারের সঙ্গে। সেখানে কোড লিখতে হয় কয়েক ধাপে। কোনো একটা ধাপ ভুল হলেই লক হয়ে যাবে বাক্সের মুখ। সেটা কিভাবে খুলতে হবে তা মনসুর মাহমুদ বা মিহির ছাড়া কেউ জানে না।

কোড বসানো হয়ে গেলে খুলে যাবে বাক্সের দুই মুখ। দুইপাশে সৃষ্টি হবে টাইমহোল। টাইমহোল খোলার পর অবশ্য সব যন্ত্রপাতি খুলে নিলেও সমস্যা নেই। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাইমহোল কার্যকর থাকে।

সব যন্ত্রপাতি আসলে খুলেও নেয়া হয়। নয়তো ডাইনোসর বেরিয়ে এসে সব ধ্বংস করে দেবে।

“সব রেডি, বুঝলে! এখন শুধু ক্যাসিমির এফেক্টরে কোড বসানো বাকি। কোড ছাড়া ওটা চালু বা বন্ধ করা যায় না।” বেশ বিজ্ঞের মতো বললেন লুইস। নিজেই বিজ্ঞানী বনে গেছেন জন মারফিকে বোঝাতে গিয়ে।

কোড বসানোর আগেই হইচই শুরু হলো। চিৎকার চেচামেচি একটু পর বিশৃঙ্খলায় পরিণত হলো। হইহই রইরই রব শুনে মনে হচ্ছে যুদ্ধে হেরে পালানোর চেষ্টা করছে কোনো এক পক্ষ।

একের পর এক রকেট প্রপেল্ড গ্রেনেডের আঘাতে উড়ে যাচ্ছে সৈন্যদের সাঁজোয়া যান গুলো। পুরোনো দিনের অটোমেটিক রাইফেলের গোলাগুলিতে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল বাকি সৈন্যরা। প্রতিরোধের বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা দেখা গেল না অত্যাধুনিক লেজারগানধারী সৈন্যদের মাঝে! আসলে তারা জানে প্রতিরোধের চেষ্টা করে লাভও নেই। বাপের দেয়া প্রাণটা বাঁচানোর একমাত্র উপায় পালানো।

কোনোদিকে না তাকিয়ে লুইস এক্স গিয়ে ঢুকলেন নিজের আর্মার্ড লিমোজিনে,পাশে জন মারফি।

একদল টেকনিশিয়ান একটা ট্রাকের উপরে বসানো নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর নিয়ে চম্পট দিলো। আরেকদল ক্যাসিমির এফেক্টর দুটো ট্রাকে তুলে চারপাশে লোহার পুরু পাতের তৈরি পাল্লাগুলো টেনে এনে বাক্সবন্দী করে চম্পট দিলো।

প্রচন্ড গোলাগুলি আর গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাঝেই কয়েকটা ট্যাংকের পাহারায় পালিয়ে যেতে পারলো লুইস এক্স সহ বিজ্ঞানীদের দলটা আর টাইমমেশিন সেট।

মেগানের হামলার ধরনটা ঠিক এমনই। দলগত হামলা চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে তারপর একাই নামবে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে। আজ অবশ্য সেই সুযোগ পেল না সে। তার আগেই পালিয়েছে সবাই। অতীত থেকে শিক্ষা নিলো আরকি।

গডসক্লাবের সৈন্যরা অবশ্য অত সাহসী নয় যে তারা মেগানের মোকাবিলা করবে। দলগত হামলার থেকেও মেগানের একক লড়াই তাদের কাছে বেশি ভয়ংকর। তাই মেগান আসার আগেই পালিয়ে যায় তারা।

ঠিক এবারেও হাত গুটিয়েই বসে থাকলো মেগান। এমনকি বাইক থেকেও নামেনি। বাইকে বসেই কাকে যেন মেইল পাঠাল, ” এবারেও আমরা সফল মার্টিন।” (এসব মামুলি মেসেজ পাঠানোর জন্য প্রচলিত মেইল সার্ভিসই ব্যবহার করে মেগান।)

“লুইস, তুমি না বলেছিলে চাদের এই জায়গাটা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বাছাই করা হয়েছিল এবং আসার আগে কেউ জানবে না কোথায় ফিট করা হবে টাইমমেশিন! তবে হামলা হলো কী করে?” গাড়িতে বসেই জানতে চাইলেন জন মারফি।

“সরষের মধ্যেই ভূত আছে হে।” হতাশার সুরে বললেন লুইস।

“কারা ওরা? এত সাহস পায় কী রে? আর তোমার সৈন্যরাই বা পালালো কেন?” জন মারফি বিস্মিত।

“মেগান!” লুইস এক্সের ছোট্ট জবাব।

“মেগান? সে তো আমাদেরই লোক জানতাম!”

“ছিল।”

“ছিল মানে? এখন নেই কেন?”

“জানি না। আমাদের সবচাইতে দক্ষ এজেন্ট ছিল সে।”

“হুঁ। ভালো কথা লুইস, তোমার বাকি সুপার এজেন্টরা কোথায়? ওদের একজন থাকলেও তো মেগানকে কাঁচকলা দেখাতে পারতো।”

“ওদের এগারোজনকে মেরেছে মেগান, আর বাকি কয়েকজন মেগানকে খুঁজছে।” কথাটা বলায় বোঝা গেল হতাশার চুড়ান্ত স্তরে নিমজ্জিত হয়েছেন লুইস এক্স। ” এবারে বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই কেন আমরা সংকর ধাতুর পিছনে লেগেছি। আমাদের আরও কয়েকটা টাইমমেশিন সেট থাকলে কয়েকটা জায়গায় টাইমহোল চালু করে মেগানকে কাঁচকলা দেখাতে পারতাম।“ কণ্ঠে হতাশা এনে বললেন লুইস।

একে টাইমহোল খুলতে প্রচুর টাকার দরকার তার উপর মেগানের ভয়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে গিয়ে আরও টাকা খসছে। লুইসের হতাশা তাই অস্বাভাবিক নয়।

“হু। বুড়ো যেহেতু মুখ খুলছে না তাই তোমাদের আরও ভালো কিছুর দরকার।“ বললেন জন মারফি।

“কী সেটা?” আশাবাদী কন্ঠে বললেন লুইস।

“তার আগে বুড়োর সঙ্গে আমার কথা বলিয়ে দাও।”

 

 

“কী ব্যাপার স্কট? কিছু বলবে নাকি? আজ এত তাড়াতাড়ি চলে আসলে কেন?” ঘাড় না ঘুড়িয়েই বলল মেগান। অর্ধেক ধ্বসে যাওয়া একটা দশতলা বিল্ডিংয়ের ছাদের উপরে দাঁড়িয়ে ড্রোন উড়িয়ে বুয়েন্স এইরেস শহরটা দেখছিল সে। স্ক্রিনে চোখ, তাই ঘাড় ঘুরাতে পারলো না।

“যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো অনেক মানুষ রয়ে গেছে!” বলল স্কট নামের মেগানের সহকারি। ত্রাণ নিয়ে এসেছিল মেগান আর তার দল। আঠার চাকার বড় বড় আধডজন ট্রাকে করে খাবার, পানি, ওষুধ, কাপড় নিয়ে এসেছিল ওরা। দুই ঘণ্টায় সব শেষ।

আগে খুজে খুজে বিল্ডিংয়ের নিচে থেকে মানুষদের বের করে সাহায্য দিতে হতো।

কিন্তু মানুষ এখন মেগানের নাম জেনে গেছে। ট্রাক ঢুকতে দেখলেই তারা সুশৃঙ্খল ভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। কারণ তারা জানে বিশৃঙ্খলা করলেই আর সেদিন ত্রাণ পাবে না তারা।

পুরো লাতিন আমেরিকাতেই ত্রাণ দিচ্ছে ওরা। যে শহর বেশি বিধ্বস্ত সেখানে সাহায্যের পরিমাণ বেশি।

বুয়েন্স এইরেস শহর থেকেই ধবংসের শুরু। স্বাভাবিকভাবেই সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত শহরও বটে। এখানেই তাই মেগানের দানের হাত বেশি প্রসারিত। পাঁচ পাঁচবার এসেছে এখানেই। তাই লোকেরা চেনে তাকে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্কটের দিকে তাকাল মেগান। “ডাইনোসর আসার পরে আমরা আবার আদিম পরিবেশে ফিরে গেছি। তাই না স্কট? যেখানে কি না বেঁচে থাকার জন্য খাবার আর থাকার জায়গা ছাড়া কোনো মাথাব্যাথা নেই। এমনকি কাপড়ের চিন্তাও নেই তাদের! এরপর থেকে আর কাপড় আনবো না। যাও এখন, সব গুছিয়ে ফেলো। চলে যাই।”

ডাইনোসরের মতো একটা দানবীয় প্রাণী যেখানে পা দেবে সেখানে সব তছনছ করে দেবে এটাই স্বাভাবিক।

সেটা দেড় দুইশ টনের নিরীহ আর্জেন্টিনোসরাস হোক বা তুলনামূলক কম ওজনের হিংস্র টিরানোসরাস রেক্সই হোক। গরুর সাইজের ডাইনোসর ভ্যালিপ্টোসরাসও বেশ ভালো রকমের ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে প্রাণীসমাজ তথা মানবসমাজে, তার অতি “কী খাই কী খাই” স্বভাবের কারণে আর দ্রুত বংশবৃদ্ধির জন্যে।

আরজেন্টিনোসরাস ঘাসপাতা যাই খাক না কেন তার অতিরিক্ত ওজনের জন্য যেকোনো স্থাপনা সহজেই গুঁড়িয়ে যাবে। টি রেক্স তো আরেক কাঠি সরেস। বিল্ডিং ভেঙে মানুষ খাওয়া তার স্বভাব। ভ্যালিপ্টোসরাস হলো সবথেকে নির্লজ্জ খাদক। রাস্তা থেকে ধরে মানুষ খায়। উড়ন্ত ডাইনোসর আর্কিওপটেরিক্সও অবশ্য নির্লজ্জ খাদকের তালিকায় আছে।

সেখানে বড় একদল ডাইনোসর কীরকম ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে সেটা অনুমান করতে বেগ পেতে হবে না।

আদিম উন্মুক্ত পরিবেশে ইচ্ছামতো দাপাদাপি করে বেড়ানো ডাইনোসর জনসংখ্যার বিস্ফোরণ হওয়া, চাপাচাপি করে বানানো বিল্ডিংয়ে ঠাসা, হাটার জায়গা না থাকা (এটা কথার কথা। দুনিয়া যে মানুষ আর তাদের বাড়িঘরে ভরে গেছে সেটা বোঝানোর জন্যই ওটা বলা।) পৃথিবীকে তাদের প্লেগ্রাউন্ড করে মনে করে মনের আনন্দে ধেই ধেই করে নাচতে থাকায় বারোটা বেজে গেছে প্রথমে আর্জেন্টিনার, পরে গোটা লাতিন আমেরিকার।

টাইমহোল দিয়ে ডাইনোসর ঢোকার পর ত্বড়িৎ গতিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা সরকার। তাতে একটু একটু করে পুরো আর্জেন্টিনায় ছড়িয়ে পড়ে ডাইনোসরের দল।

ব্যবস্থা নেয়ার পরে একটা সময়ে তারা বুঝতে পারে আসলে ডাইনোসরকে থামাতে পারবে না। সম্মিলিত সাহায্য দরকার।

আর্জেন্টিনা সরকার সাহায্য চেয়ে দফায় দফায় দূত পাঠায় লাতিন দেশগুলোতে। দেশগুলোকে বোঝাতে থাকে এই সমস্যা সামাল না দিলে পুরো লাতিন আমেরিকা আক্রান্ত হবে।

আর্জেন্টিনা সরকার শুধু আফসোসই করতে পেরেছে। সাহায্যের হাত বাড়ায়নি কোনো দেশ। এটাকে তারা আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবেই বিবেচনা করে।

ফলে আস্তে আস্তে আর্জেন্টিনার বাইরে ছড়াতে থাকে ডাইনোসর। আর্জেন্টিনা চিলি উরুগুয়ে প্যারাগুয়ে হয়ে তাদের অগ্রযাত্রা চলে ব্রাজিল পর্যন্ত।

দেশগুলো যে ব্যবস্থা নেয়নি তা নয়। যখন যেই দেশে ডাইনোসর গেছে তখন তারা ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু ভুলেও পাশের দেশকে সাহায্য করেনি কেউ। আর ব্যর্থ হয়েছে আর্জেন্টিনার মতো।

কয়েকমাস পরে তারা বুঝতে পারে ডাইনোসর সামলানোর মতো সক্ষমতা নেই তাদের। দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এবং ডাইনোসর থামানোর মতো প্রয়োজনীয় মারণাস্ত্র নেই তাদের। অবশ্য কথাটা মাথায় আসার আগেই ভেঙ্গে গুড়োগুড়ো হয়ে গেছে পুরো লাতিন আমেরিকা, চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বসে গেছে, মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে, আর ব্যর্থ সরকারগুলো টিকে আছে কোনোমতে।

কাজেই তারা সাহায্য চায় বিশ্বদরবারে।সেনা পাঠায় আমেরিকা।

ভারি অস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন বাহিনী ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করে। তেইশ দিনের যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের পরাজয় হয়েছিল তাদের কাছে। সেই অতীতের অহংকারে তেইশ ঘণ্টায় সমগ্র লাতিন আমেরিকা ডাইনোসর মুক্ত করার শপথ নিয়ে যেন ময়দানে নেমেছিল তারা!

বিমানবাহিনীর সাহায্যে ভারি অস্ত্রে সজ্জিত আর্টিলারি ফোর্স গোলার পর গোলা ছুঁড়ে মারতে থাকে ডাইনোসর। ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে মার্কিন ফাইটার জেটগুলো। ড্রোনের সাহায্যে ধাওয়া করে মারা হয় আর্কিওপটেরিক্স।

বেসামরিক জানমালের কোনো চিন্তাই নেই তাদের। ডাইনোসরের সঙ্গে সঙ্গে মরতে তাকে সাধারণ মানুষ। ধ্বংস হয় তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, কলকারখানা ইত্যাদি। সবথেকে বড় বিপর্যয় ঘটে যখন হাসপাতালগুলো ধ্বংস হতে থাকে।

ভান্ডারে থাকা প্রায় সব ধরনের অপারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার শেষে মার্কিন বাহিনী পারমানবিক বোমা ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

লাতিন শহরগুলো ডাইনোসরদের হাত থেকে মুক্ত করতে না পারলেও এবার তাদের নজর পড়ে আমাজনের দিকে। ডাইনোসরদের বড় একটা অংশ পালিয়ে আশ্রয় নেয় আমাজান জঙ্গলে। পদাতিক বাহিনী, বিমানবাহিনী কয়েকবার সেখানে হামলা চালিয়ে ডাইনোসরদের শায়েস্তা করতে ব্যর্থ হয়।

তাদের ভান্ডারে সবথেকে শক্তিশালী অপারমানবিক বোমা “ডেইজি কার্টার” এবং অপারমানবিক ক্ষেপণাস্ত্র “টমাহক ক্রুজ” ব্যবহার করেও যখন কার্যকর কিছু হচ্ছে না তখন তারা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চায়। ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অবশ্য মার্কিন সেনেট সেটার অনুমোদন দেয়নি।

তবে ধারণা করা হয় যে তারা রাসায়নিক হামলা চালিয়েছিল। কারণ কয়েকমাসের মধ্যেই আমাজনের জীবকূলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়।

তেইশ দু গুণে ছাপ্পান্ন দিনের যুদ্ধের পর দেখা গেল মার্কিন বাহিনীর সাফল্যের থেকে ব্যর্থতা বেশি। বিপুল পরিমাণ ডাইনোসর তখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন শহর জুড়ে।

তারা মানুষের বাড়িঘর ভাঙ্গছে। যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি করছে। হাসপাতালে ঢুকে পড়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার বারটা বাজাচ্ছে। ফসলের ক্ষেত নষ্ট করছে। কলকারখানায় ঢুকে পড়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে। হিংস্র ভ্যালিপ্টোসরাস এখানে সেখানে ঘুরে মানুষের প্রাণ সংহার করছে।

সবথেকে ভয়ংকর কথা হলো কখন কার বাড়িতে ঢুকে পড়বে সেটা কেউ জানে না। আপনি হয়তো বারো তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন, আর তখনই দেখলেন একটা টি-রেক্স আপনার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আপনি পালাবেন ভাবছেন, তার আগেই টি-রেক্স টা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো আপনার এপার্টমেন্টে!

হয়তো বাড়ির গ্যারেজে গিয়ে দেখলেন আপনাকে খাওয়ার জন্যই ঘাপটি মেরে বসে আছে একদল ভ্যালিপ্টোসরাস!

কিংবা ব্যাগভর্তি বাজার আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে কেবল গাড়ি থেকে নেমেছেন, ঠিক তখনই একটা আর্কিওপটেরিক্স উড়ে এসে ধরে নিয়ে গেলো আপনাকে! কোনো গ্যারান্টি নেই আপনার জীবনের!

এরকম কিছু মানুষ হয়তো নিজ বাড়িতেই বিপদের মুখে আছে। কিন্তু যাদের মাথার উপরে ছাদ নেই তাদের অবস্থা করুণ। হুট করে ডাইনোসরের আক্রমণ হলে প্রতিরোধ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই তাদের। বেঘোরে প্রাণ হারাতে হয়। ডাইনোসরের হাতে।

বিধ্বস্ত বিল্ডিংয়ের গ্যারেজে কিংবা গাড়ি পার্কিংয়ের আন্ডারগ্রাউন্ডে কোনোরকমে দিন গুজরান করছে বিক্ষিপ্তভাবে ছুটে বেড়ানো মানুষ। তাদের কাছে খাবার নেই। পানি নেই। কাপড় কিংবা অষুধ কোনোটাই নেই। তাদের কাছে টাকা নেই। আদিম পরিবেশের মতোই থাকা খাওয়ার চিন্তা ছাড়া আর কোনো মাথাব্যাথা নেই।

যাদের টাকা আছে তারাও খুব সুখে নেই। কারণ দোকানপাট কোনোকিছুই অবশিষ্ট নেই। কলকারখানায় উৎপাদন নেই। গোডাউনে সংরক্ষিত নেই খাদ্যশস্য।

যুদ্ধে বিধ্বস্ত কোনো অঞ্চলের যেই অবস্থা হয় সেই অবস্থাই হয়েছে তাদের। ডাইনোসরের হামলার থেকে মার্কিন বাহিনীর হামলাই তাদের ক্ষতি করেছে বেশি। দুর্ভিক্ষ যেন সময়ের ব্যাপার। তারা স্রেফ টিকে আছে মেগানের ত্রাণের জন্য।

দেশান্তরী হয়েছে অসংখ্য মানুষ। যখন যেই দেশে ডাইনোসর ছড়িয়েছে তখন সেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে মানুষ। গেছে পাশের দেশে। এইক্ষেত্রে অবশ্য দেশগুলো কিছুটা মানবতা দেখিয়েছে। শরণার্থী শিবির চালু করে মানুষকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

তবে বেশীদিনের জন্য পারেনি। যখন তাদের দেশে হামলা হয়েছে তখন তাদের নিজেদেরকেই পালাতে হয়েছে দেশ ছেড়ে।

ডাইনোসরদের হামলায় সবার আগে মরেছে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো। তাদের জন্য না ছিল নিরাপত্তা, না ছিল আশ্রয় নেয়ার মতো অবকাঠামো।

হামলায় সাধারণ জনগনের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও অবিশ্বাস্য ভাবে বেঁচে গেছে ব্যাংক, জায়ান্ট করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিল্ডিং, ধনীদের বাড়িঘর।

একসময় মার্কিন বাহিনী বুঝতে তারা কখনোই ডাইনোসরদের পুরোপুরি উৎখাত করতে পারবে না। কাজেই ধনীদের জানমাল পাহারা দেয়াই তাদের একমাত্র কর্তব্য এখন। ফলে সাধারণ জনগনের উপরেই নির্মম তান্ডব চালাতে থাকে ডাইনোসরের দল।

অনেকদিন ধরে মঙ্গল গ্রহে জমি বেচা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সক্রিয় হয় এসময়ে। মঙ্গলের থেকে তারা এবারে নতুন আবিষ্কৃত গ্রহ আটলান্টিসে জমি বেচতে বেশি আগ্রহী।

পয়সাওয়ালা সাধারণ মানুষ সেখানে জমি কিনে দ্রুত গ্রহান্তরী হয়ে যায়। যারা টাকার অভাবে যেতে পারেনি তারা কাটাচ্ছে অনন্ত কষ্টের জীবন।

 

দুনিয়াজুড়ে কমপক্ষে শতকোটি ডলারের মালিকদের সংগঠন বিলিয়নিয়রস ক্লাব। দুনিয়াজুড়ে জনহিতকর কাজে দান করে তাদের খ্যাতি আকাশচুম্বী।

বিনামূল্যে টিকা দান, খাদ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে, অনুদান জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি কমানো, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি ইত্যাদি আরও সাতাশ রকমের কাজে তারা টাকা ঢালতো এবং এখনো ঢালে।

তবে গত একদশক ধরে তারা নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারেও টাকা ঢালছে।

আন্তগ্রহ যাত্রা সহজ করা, পৃথিবীর বাইরে আবাস গড়া, মহাকাশে ওয়ার্মহোল আবিষ্কার করা ইত্যাদি দূরহ কাজে তাদের টাকা ঢালার পরিমাণ একটু বেশিই।

মঙ্গলে জমি কেনাবেচা একটু বেশিই লাভজনক অবশ্য। কারণ পৃথিবীতে কেনাবেচার মতো জমি আর অবশিষ্ট নেই।

শুরুতে সৌখিন ধনকুবেররাই জমি কিনতো। তারপর একসময় পসয়াওয়ালা মানুষও জমি কিনতে শুরু করে।

তারপর একদিন স্টিভ ম্যাডিসন দুম করে মঙ্গলের আশেপাশে ওয়ার্মহোলের অস্তিত্বের কথা ঘোষণা দেন।

একদল নভোচারী একদিন সত্যি সত্যি

আবিষ্কার করে ফেলেন সেই ওয়ার্মহোল। সাড়াবিশ্বে হইচই পড়ে যায়। ওয়ার্মহোল দিয়ে অতীত ভবিষ্যতে ভ্রমণ করা যায়; এসব মানুষ সায়েন্স ফিকশন মুভি দেখেই জেনে গেছে। ফলে তারা অপেক্ষা করতে থাকে নতুন নতুন চমকদার খবরের জন্য।

ওয়ার্মহোল আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত হন না সেই নভোচারী দল। ওয়ার্মহোল দিয়ে রকেট ছোটান তারা। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই সূর্যের মতো আরেকটা নক্ষত্র আবিষ্কার করেন তারা, যেটার চারপাশে ঘুরছে আটটা গ্রহ। তাদের একটা আবার হুবহু পৃথিবীর মতো।

প্রথমে ওটাকে প্যারালাল ইউনিভার্সের পৃথিবী বলে ভুল করেন তারা। কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে গ্রহটায় নামার সিদ্ধান্ত নেন দলের নেতা জন মারফি।

গ্রহটায় নেমে অবাক হয়ে যান মারফি সহ বাকিরা। হুবহু পৃথিবীর মতো গ্রহটায় মানুষ বাদে সব ধরনের প্রানীর বিকাশ সম্পন্ন হয়েছে।

ঠিক তখনই মারফির মাথায় আসে গ্রহটায় জমি কেনাবচার কথা। মঙ্গলের থেকে একশো গুণ ভালো এই গ্রহ।

গ্রহটার নাম আটলান্টিস দিয়ে ফিরে আসেন মারফি। এসেই কথা বলেন এই ওয়ার্মহোল প্রজেক্টের স্পন্সর বিলিয়নিয়রস ক্লাবের চেয়ারম্যান লুইস এক্সের সঙ্গে।

খবরটা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ মঙ্গলের জমি ফেরত দিতে শুরু করলো তা নয়। এরজন্য ব্যাপক প্রচার করতে থাকে বিলিয়নিয়র্স ক্লাব। ডিসকাউন্টও দেয়া শুরু করে। কিন্তু পৃথিবী থেকে আবাস আটলান্টিসে নিয়ে যেতে বিপুল খরচ হবে বলে মানুষ জমি কিনতে আগ্রহ দেখায় না সেভাবে।

তবে একটু একটু করে মানুষ উৎসাহ দেখাতে শুরু করে আটলান্টিসে জমি কিনতে। লাভবান হতে থাকে বিলিয়নিয়রস ক্লাব।

তবে তাদের ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। যারা মঙ্গলের জমি ফেরত দিয়ে টাকা নিচ্ছে তাদের টাকা দিতেই বিলিয়নিয়রস পকেট থেকে খসছে বিপুল পরিমাণ টাকা। কাজেই তাদের দরকার আটলান্টিসে বিপুল পরিমাণ জমি বেচা।

কিন্তু মানুষ তো আর তাদের হাতের পুতুল নয় যে তারা বললেই জমি কিনবে! মানুষকে বাধ্য করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন করে পৃথিবীর বারোটা বাজিয়ে মানুষকে গ্রহান্তরি হতে বাধ্য করতে বহু সময় লেগে যাবে। কাজেই তাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে।

নতুন চাল চালে বিলিয়নিয়ারস ক্লাব, প্রকটরূপে আত্নপ্রকাশ করে শত শত বছর ধরে গোপনে বিশ্ব শাসন করা গুপ্ত সংস্থাটি। নতুন নাম নেয় তারা, গডস ক্লাব। এমন নাম নেয়ার কারণ হলো ঈশ্বর যেমন অবিশ্বাস্য ক্ষমতার অধিকারী তেমন তারাও দুনিয়ায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার অধিকারী।

স্বরুপে হাজির হয়েছে তারা। দুনিয়ার সবদেশে এতদিন নিজেদের দখলে থাকা সেক্টর গুলো এবার প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। অবশ্য সেনাবাহিনী আর গোয়েন্দা সংস্থা বহু আগে থেকেই তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আছে।

গডস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতারা হলেন মাল্টি বিলিয়ন ডলারের মালিক বিজনেস ম্যাগনেটরা। ক্ষমতা এখন তাদের হাতে। নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবসায়ীক সুবিধা আদায় করছে তারা।

ক্ষমতা সংহত করে এবারে তারা মনোযোগ দেয় দুনিয়ার বারোটা বাজাতে।

টাইম মেশিন আবিষ্কার করে ফেলেছেন বিজ্ঞানী মনসুর মাহমুদ।

টাইম মেশিন দিয়ে অতীতে গিয়ে কিছু একটা ওলট পালট করে দিয়ে বিপর্যয় ঘটানোর চিন্তা ভাবনা করেছিল বিলিয়নিয়রস ক্লাব। কিন্তু তাদের পরামর্শক দল জানিয়ে দিলো ওসব করতে গেলে বাটারফ্লাই এফেক্টের ফলে চরম বিপর্যয় ঘটে যাবে, যাতে হুমকির মুখে পড়বে তাদেরও অস্তিত্ব।

কাজেই এই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তারা বর্তমান দুনিয়াতে ডাইনোসর আমদানির পরিকল্পনা করে এবং নিয়েও আসে। সেই সব ডায়নোসরদেরই আনা হয় যারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে শীঘ্রই ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের হাতের পুতুল সরকার গুলো কাজ বাস্তবায়নে সাহায্য করে তাদেরকে।

তারা ইচ্ছা করেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া থেকে বিরত থাকে যাতে ডাইনোসর ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো লাতিন আমেরিকায়।

তারপর তারা ডাইনোসর থামানোর অভিনয় করে, ব্যর্থ হওয়ার ভান করে, যাতে করে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন বাহিনী লাতিন আমেরিকায় প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

তাদের ব্যর্থ হওয়াটা পুরোটাই ভাওতাবাজি। দুনিয়ার সব দেশেই অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র রয়েছে। সেগুলো অনেক পরের ব্যাপার। একটা কিশোরও জানে যে ফিফটি ক্যালিবার একটা বুলেট ঠিক জায়গায় ফায়ার করতে পারলে একটা ব্রন্টিওসরাসও (আর্জেন্টিনোসরাসের মতো দানবীয় আকারের ডাইনোর) মারা সম্ভব!

আসলে তাদের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন বাহিনীকে লাতিন আমেরিকায় নিয়ে আসা, কারণ ধ্বংসযজ্ঞে তারা তুলনাহীন।

এবং তারা সেই কাজে যথেষ্ট দক্ষতাও দেখিয়েছে। তারা কিছু ডাইনোসর মেরেছে বটে, তবে তার আড়ালে ধ্বংস করেছে মানুষের বাড়িঘর। একটা ডাইনোসর মারতে গিয়ে ভেঙ্গেছে আট দশটা বাড়ি!

তারা যেই কাজে এসেছিল তাতে তারা সফল। ছাপ্পান্ন দিনের যুদ্ধে পুরো লাতিন আমেরিকা তছনছ করেছে তারা।

দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ দিয়ে শুরু করে গডসক্লাব পুরো দুনিয়াতেই ডাইনোসর আমদানি করতে চায়। পুরো দুনিয়াতেই তারা অনুসরণ করতে চেয়েছিল লাতিন মডেল। পারেনি।

তাদের প্রচেষ্টায় বারবার বাধা দেয় একটা দল, যাদের অগ্রভাগে মেগান স্টার্লিং নামে এক সুপার কিলার।

বিশ্বের অন্যান্য মহাদেশে ডাইনোসর আমদানি করতে না পেরে তারা দেশে দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে দুর্নীতি।

এমনভাবে দুর্নীতি চেপে বসেছে যে সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মারাত্মকভাবে  জড়িয়ে গেছে দুর্নীতিতে। কি ইউরোপ কি ইংল্যান্ড আমেরিকা-সব দেশেই একই অবস্থা। দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। রাষ্ট্র স্বয়ং প্রশ্রয় দিচ্ছে দুর্নীতি। মাফিয়ারা প্রচুর ট্যাক্স দিচ্ছে বটে তবে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র।

তাদের উদ্দেশ্য আটলান্টিসে জমি কিনতে মানুষকে বাধ্য করা। দুনিয়াকে নরক বানিয়ে আটলান্টিসে জমি কিনতে, আবাস গড়তে মানুষকে বাধ্য করতেই তারা অপরাধ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়াগুলো সবথেকে আগ্রাসী। আগে হয়তো গোপনে মানুষের তথ্য বেচতো তারা। এখন প্রকাশ্যেই বেঁচে। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছু নেই। নজরদারির আওতায় দুনিয়ার প্রতিটা মানুষ। ডিভাইস গুলোও এখন সেভাবেই তৈরি। মালিকের অনুমতি ছাড়াই ছাড়াই ব্যবহৃত হচ্ছে ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন। রেকর্ড করা হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য। সেগুলো ব্যবহার করা দমন নিপীড়নে।

দুনিয়া এখন ধনকুবেরদের দখলে। সবচেয়ে চাপে আছে জনগণ। “ল এন্ড অর্ডার” বলে কিছু নেই। মাদক ছড়িয়ে দিতে আইনের কর্তৃত্ব তুলে দেয়া হয়েছে স্থানীয় মাফিয়া আর মাদক সম্রাটদের হাতে। আর তারা করছে ইচ্ছামতো অপরাধ। হাতে হাতে তারা তুলে দিয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। মানুষ খুন হচ্ছে পাখির মতো। রেগে গেলে এখন আর কেউ চড় থাপ্পড় ঘুষি মারে না। গুলি করে দেয়।

মাদক হলো সকল অপকর্মের জননী। মাদক কেনাবেচা নিয়ে দ্বন্দে প্রাণ দেয় মাদক কারবারিরা। মাদক কিনতে টাকা প্রয়োজন। টাকার জন্য ছিনতাই করছে, চুরি ডাকাতি করছে মাদকসেবিরা। ফলে বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে সমাজব্যবস্থা।

এছাড়াও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে অর্গানাইজড প্রস্টিটিউন। দুনিয়ার এমন কোনো শহরে কোনো পাড়া মহল্লা বাকি নেই যেখানে পতিতালয় নেই! পতিতাবৃত্তিতে নাম লেখাতে বাধ্য হচ্ছে তরুণীরা, প্রাণ বাঁচাতে। যারা এই পেশায় আসছে না, তারা ধর্ষিত হচ্ছে!

চরম সংকটে আছে রাজনীতিবিদরাও। শুরুর দিকে তারা প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই দমন নিপীড়ন শুরু হওয়ায়, গুম খুন শুরু হওয়ায় তারা আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন।

পুলিশ নিজেই অপরাধ করছে না বটে। কিন্তু যেভাবে তারা ঘুষ খেয়ে অপরাধীদের ছাড় দিচ্ছে সেটাকে দুর্নীতির বাইরে রাখা যায় না।

খুন ধর্ষণ ডাকাতি ছিনতাই গুম কিডন্যাপিং এসব সাধারণ ব্যাপার। বেঁচে থাকতে গেলেই এখন ট্যাক্স দিতে হয় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের। সংবিধান স্থগিত করা হয়েছে দেশে দেশে। ফলে মৌলিক মানবাধিকার বলে কোনো কথা নেই কোথাও।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বলে কিছুই নেই। জোর যার মুল্লুক তার মতো অবস্থা।

সবাই যে খুব খুশি মনে, করতে মন চায় তাই করতেছে, সেটা নয় ব্যাপারটা। নিজের পশ্চাৎ বাঁচাতেই সবাই করছে এমনটা।

বাজারে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সংকট। বাজারভর্তি ব্যাগ ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। যে বা যারা ছিনতাই করছে, তারাও বাধ্য হয়েই করছে। কারণ বাঁচতে হবে, আর বাঁচার জন্য যথেষ্ট খাবার নেই বাজারে।

রাস্তায় বেরিয়ে প্রাণ নিয়ে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। বাজার করতে বেরিয়ে, বাজারভর্তি ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে ফেরার নিশ্চয়তা নেই, ফিরতে হবে নিঃস্ব হয়ে, যদি না হাতে একটা লেজার পিস্তল থাকে।

লাতিন আমেরিকায় ধ্বংস আর বাকি মহাদেশগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে গডস ক্লাব।

দুনিয়ার এক অংশে মানুষের নিরাপত্তা নেই ডাইনোসরের কারণে, অবশিষ্ট অংশে নিরাপত্তা নেই ডাইনোসরের থেকেও ভয়ংকর অপরাধ-করতে-বাধ্য-হওয়া মানুষের জন্য!

মানুষ যখন বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছে, নিজেদের সবকিছু বেঁচে আটলান্টিসে জমি কেনার চিন্তা করছে, ঠিক তখনই দুনিয়াজুড়ে মানুষকে আরেকবার বাঁচার আশা দেখালো টিম মাসীহা, যারা আবির্ভূত হয়েছে অ্যান্টি গডস ক্লাব হিসেবে।

 

টাইমহোলটা বন্ধ হওয়ার পর খানিকক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো সবাই। কিছুই বুঝছে না কেউ। কারও মাথায় আসছে না কিছুই! কেন হলো এসব? কারা করলো? কী উদ্দেশ্য তাদের?

একটু পর আতংক গ্রাস করলো ওদের।

পরিবারের মানুষদের কথা ভেবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো মেরি আর এলি। তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টাও করলো না জিমি। দেবে কী করে, সে নিজেও তো শোকে পাথর! আত্নীয়স্বজনহীন এই বিরান প্রান্তরেই জীবনের শেষ ক’টা দিন কাটাতে হবে ভেবেই শোকে পাথর হয়ে গেল জিমি।

কিছুক্ষণ পরেই, পরিবারের শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই বেঁচে থাকার চিন্তা গ্রাস করলো ওদের।

পান্ডববর্জিত এই আদিম পরিবেশে কী করে বেঁচে থাকবে তারা! মাত্র এক বেলার খাবার নিয়ে এসেছিল। সেটাও শেষ। নিরাপদ পানিও শেষের পথে। ছোট্ট একখানা সিগারেট ধরানোর লাইটার দিয়ে কতক্ষণ চলবে কে জানে! এক ফাঁকে নিচে গিয়ে দেখে এসেছে জিমি, ডাইনোসরের পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে গেছে তাদের সব রসদ। পানির কন্টেইনারটাই অক্ষত আছে শুধু।

সবথেকে বড় কথা, ডাইনোসর মোকাবিলা করার মতো হাতিয়ার নেই তাদের কাছে! একটু আগের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কী করবে তারা জানে না। তাদের ভাগ্য ভালো যে ডাইনোসরের দল তাদের দিকে আসেনি! নিজের শটগানটার জন্য কয়েকটা মাত্র বুলেট আছে জিমির কাছে।

একমাত্র ভাবান্তর নেই মিহিরের। মনের গহীনে ডুব দিয়েছে সে। সেখান থেকে ওকে বের করার সাধ্য নেই কারও। এক ফাঁকে স্মার্টফোন বের করে বোকার মতো বাপকে কল দেয়ার চেষ্টা করেছিল মিহির। সংযোগ পায়নি। নেটওয়ার্ক নেই এই আদিম পরিবেশে!

আসলে গভীর ভাবনায় জিমিও। এই পরিস্থিতি থেকে বন্ধুদের একমাত্র সেইই বের করতে পারে। তাই নিজেকে শান্ত রেখেছে সে।

কারা কী উদ্দেশ্যে এটা ঘটিয়েছে সেইসব প্রশ্ন ছাপিয়ে মিহিরের মাথায় খেলছে একটাই প্রশ্ন; এটা হলো কী করে?

ওদের এই অতীত ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছেন স্বয়ং ওর বাবা। তিনি নিজে সবকিছু যাচাই করে দেখেছেন, এমনকি মিহিরও যাচাই করেছে ডাইনোসরদের বিষয়টা। তাহলে ভুল হলো কোথায়!

তার চেয়েও বড় কথা, টাইমহোলের নিয়ন্ত্রণ ওর বাবার হাতে। তবে টাইমহোল হঠাৎ বড় হয়ে গেল কী করে? আবার সেটা বন্ধই বা হলো কী করে?

বাপ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলো কেন? তবে কী মনসুর মাহমুদের নিজের ছেলে নয় সে!

“ধুত্তেরি! কীসব ভাবছি?” নিজেকেই কষে গাল দিলো মিহির।

“কী ভাবছিস?” জিমি বলল

“ভাবছিলাম বাংলাদেশে গিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়া হলো না মরার আগে!” বলেই খিক খিক হাসতে লাগলো মিহির।

মিহিরের বাবা বাঙালি। যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন বছরে কয়েকবার করে মিহিরকে নিয়ে বাংলাদেশে আসতেন তিনি। থাকতেন বেশ কয়েকদিন। আর এই সময়টায় দিনে তিনবেলা করে কাচ্চি বিরিয়ানি খেত মিহির। আমেরিকায়ও ওসব পাওয়া যায়, তবে ওসবের স্বাদ বাংলাদেশের কাচ্চির মতো হয় না বলে মিহির বাংলাদেশ সফর হাতছাড়া করে না কখনো।

“শুনেছো ছেলের কথা! পেটে দানাপানি দেয়ারও উপায় নেই আর উনি কাচ্চি নিয়ে লেগেছেন!” মেকি রাগ দেখিয়ে বলল জিমি। অবশ্য সবাই জানে কঠিন সংকটের সময়েও হাসতে পারে মিহির। আর ওর হাসির মানে হলো, সংকট মোচনের দাওয়াই পেয়ে গেছে সে।

“ওকে গাইজ। এরকম প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে হলে একজনকে নেতা মানতে হবে জানো নিশ্চয়ই সবাই? সারভাইভাল শো গুলোতে নিশ্চয়ই শুনেছো এটা! তাছাড়া যুদ্ধের ময়দানে নেতার কথা না মানলে কী হয় সেটাও জানো সবাই। কাজেই…!” কথা শেষ না করেই থেমে গেল মিহির।

“মানে এখন তোমাকে নেতা মানতে হবে তাই তো?” মুখ ভেঙচে বলল জিমি

“যে বেশি জানে, বোঝে সেই নেতা হয় সাধারণত। সেটা আমি কেন, যে কেউ হতে পারে!” মুখে ভালো মানুষের হাসি এনে বলল মিহির।

“হ্যাঁ হ্যাঁ জানি। নিজের কথাই বলছিস। যাকগে। এত নাটকের দরকার নেই। তোকেই নেতা মানা হল!” জিমি বলল।

“ঠিক আছে। আমরা আর নিচে নামছি না। এখানেই একটা গুহা খুঁজে বের করতে হবে। ফলো মি।” সবার আগে হাটা শুরু করলো মিহির। এই আদিম পরিবেশে আসার আগে পুরো এলাকাটা নিয়ে বেশ ভালো রকম গবেষণা করেছে বিজ্ঞানীদল। মিহিরও ছিল তাদের সঙ্গে। কাজেই এলাকাটা সম্পর্কে ধারণা আছে তার।

আপাতত দুটো মাঝারি সাইজের কিচেন নাইফ, এক ফালি কাপড় আর এক কন্টেইনার পানি ছাড়া আর কিছুই নেই ওদের কাছে।

সন্ধ্যে হয়ে আসছে। রাত নামার আগেই গুহা খুঁজে বের করতে হবে ওদের। মিহির ভালো করেই জানে, সবথেকে কাছের গুহাটাও দুই কিলোমিটার দূরে!

অবশ্য আড়াই কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার কষ্ট ভুলিয়ে দিল চমৎকার একটা গুহা।

গুহার মুখটা সরু, একজন মানুষ ঢোকার মতো। কিন্তু ভিতরে অনেক জায়গা। গুহার মুখে একটা মাঝারি সাইজের পাথর বসিয়ে দিলে কোনো জন্তু আর ঢুকতে পারবে না।

জিমি ভিতরে ঢুকে দেখে এসেছে, জন্তু জানোয়ার সাপ খোপ কিচ্ছু নেই সেখানে। পরিষ্কার জায়গা।

ওদের ভাগ্য ভালো, গুহার সামনেই পেয়ে গেছে একটা ফলের গাছ। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় ফল “পিটায়া” বা ড্রাগন ফল। গাছে উঠে ইচ্ছামতো ওগুলো পেড়েছে জিমি। আজ রাতের ডিনার ওগুলো।

রাতের অন্ধকার নামতেই গুহায় ঢুকে গুহার মুখে মাঝারি একটা পাথার চাপিয়ে দিয়েছে জিমি। কাঠে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে গুহার মুখের কাছেই।

দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে মেয়ে দুটোকে সান্ত্বনা দিতে বসেছে জিমি। রাত নামতেই কান্না শুরু করেছে ওরা।

আরেক পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে মনের গহীনে ডুব দিয়েছে মিহির। বাবা থাকতেও কী করে সর্বনাশ হয়ে গেলো সেটা ভাবছে সে। কী উদ্দেশ্যে ওদের আটকে ফেলা হয়েছে সেটাও এক রহস্য বটে। দুনিয়াতে কারও সঙ্গে ওর বাবার শত্রুতা ছিল বলে মনে পড়ে না।

গডস ক্লাবের দেয়া ডোনেশনের প্রতিটা ডলারের খরচ বুঝিয়ে দিয়েছে ওর বাবা। না দিলেই বা কী! টাইম মেশিন আবিষ্কার করে দিয়েছে, বুঝিয়ে দিয়েছে প্রতিটা মেকানিজম। গোপন করেননি কোনো কিছু। তবে?

ঝট করে একটা কথা মাথায় আসলো মিহিরের। সিগারেটটা ফেলে দিল। জিমি চলে এসেছে ওর কাছে, মেয়ে দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে।

“কী রে! কী মনে হয়? আংকেল থাকতেও এরকম একটা ঘটনা কী করে ঘটল?” জিজ্ঞাসা করলো জিমি।

“জানি না রে। তবে এটা জানি, ওরা আমাদের কাছে ফিরে আসবেই। আমাদের নিয়ে যেতে ওরা আসবেই।” বলেই শুয়ে পড়লো মিহির, জিমিকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না।

খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো সামান্য একটু আশা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো মিহির।

পরদিন ভোর হতেই উঠল সে। একটা কিচেন নাইফ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

গুহা থেকে নামতে অসুবিধা হল না তেমন। ঢালু পাহাড়। ঘাস গুল্মে ঢাকা।

ঘন ঘাসে ঢাকা সমতল ভূমির এখানে সেখানে গজিয়েছে গুল্মলতা। মিহির ভাবছে কেন মানুষ আটলান্টিসে জমি না কিনে এখনো দূষণে স্থবির পৃথিবীতে পড়ে আছে!

মাথার উপরে একটা কর্কশ শব্দ শুনেই একটা গাছের আড়ালে চলে গেল মিহির। আকাশে তাকিয়ে যা ভেবেছিল সেটাই দেখল। একটা আর্কিওপটেরিক্স উড়ে যাচ্ছে! নিখুঁত দৃষ্টিশক্তি তাদের। একবার শিকার পেয়ে গেলে ঝপ করে নিচে নামে, ধারালো নখর দিয়ে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় শিকার।

ওটা চলে যাওয়ার পরে সাবধানে বের হলো মিহির। নজর দূরে প্রসারিত করে হাটতে লাগলো।

দশ মিনিটের মধ্যেই পেয়ে গেলো একটা পাহাড়ি নদী, ঝর্ণা থেকে নিচে নেমে এসেছে। নদীর পানি স্বচ্ছ, প্রায় স্থির। মাছ দেখা যাচ্ছে।

কাপড় খুলে নদীতে নেমে পড়লো মিহির। বাংলাদেশে বর্শা দিয়ে মাছ ধরা শিখেছে সে। সেটাই করবে এখানেও।

গাছের ডাল কেটে নিয়ে সেটার ডগাটা ধারালো করেছে কিচেন নাইফটা দিয়ে। ওটাই ব্যবহার করবে বর্শার মতো।

আধঘণ্টা পর চারটে মাঝারি সাইজের মাছ নিয়ে ফিরে আসলো মিহির। ঘুম থেকে তুলল সবাইকে। আগুন জ্বালিয়ে মাছগুলো ঝলসাল। ভরপেট খেয়ে শিকারে বের হল সবাইকে নিয়ে। আধঘণ্টার মধ্যে পেয়ে গেলো একটা পিক্যারি (peccary), মাঝারি সাইজের আদিম শূকর। ওটা দিয়ে আগামী কয়েকদিন ওরা ভরপেট খেতে পারবে।

সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আদিম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেলো ওরা। এখন ওরা শিখে গেছে কী করে পাথরে পাথর ঠুকে আগুন জ্বালাতে হয়। খুব দরকার না হলে মহামূল্যবান লাইটারটার ব্যবহার করে না ওরা। অলস একদল ছেলেমেয়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে হয়ে গেছে কঠিন পরিশ্রমী।

মাছ আর ফল তাদের নিয়মিত খাবার। কখনো পশু শিকার করতে পারে কখনো পারে না। তাই ফলের গাছগুলো চিনে রেখেছে ওরা।

নিজেদের অনির্দিষ্টকালের আবাস গুহাটাকে ওরা সাজিয়ে নিয়েছে নিজেদের মতো করে।

সূর্য ওঠে আর অস্ত যায়। একেকটা দিন পার হয়। আদিম নির্মল বাতাসে শরীর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকে ওরা।

নিজেদেরকে ওরা ভাবে আদিম মানুষ। সকল মানুষের পিতা মাতা ভেবে নিয়েছে তারা নিজেদেরকে। যেন ওদের থেকেই সৃষ্টি হবে ভবিষ্যত প্রজন্ম।

কখনো কখনো তারা নিজেদের রবিনসন ক্রুসোর উত্তরসূরী ভাবে। ভাবে ক্রুসো এবারে পরিবার নিয়ে আটকা নিয়ে পড়েছেন।

এভাবে ভাবলে তারা এই দুনিয়া থেকে বের হতে পারবে না বটে। তবে এভাবে ভাবার সুবিধা হলো বেঁচে থাকার জন্য মানসিক শক্তি পায় ওরা।

রাতে এখন আর মেয়ে দুটো কাঁদে না। মিহির ওদেরকে টাইম মেশিনের এটা সেটা বোঝায়। মহাবিশ্বের এটা সেটা বোঝায়। বিগব্যাঙ, ডার্ক ম্যাটার কিংবা ব্ল্যাকহোলের মতো ইন্টারেস্টিং বিষয়গুলো সহজভাবে ব্যাখা করে ওদের কাছে।

মিহির কখনো তাদেরকে শোনায় অপরূপ সৌন্দর্য্যের বাংলাদেশের কথা। বলে, “যেই নির্মল সবুজ পরিবেশ সাড়ে সাতকোটি বছর আগে ছিল আর্জেন্টিনায়, সেই পরিবেশ এখনো আছে বাংলাদেশে! ভাবা যায়!”

ওরা মুগ্ধ হয়ে শোনে বাংলাদেশের কথা। শোনে সেখানে গেলে কী কী করে মিহির।

একদিন জিমি প্রশ্ন করলো ওয়ার্মহোল নিয়ে। জিনিসটা আবিষ্কার করেছে ওর নিজের বাপ আর সে নিজেই জানে না। অগত্যা মিহিরকে ব্যাখা করতে হলো।

“ওয়ারমহোল হলো মহাবিশ্বের দুটি স্থানের মধ্যকার সংক্ষিপ্ত রাস্তা। মহাবিশ্বে স্থান কাল কোথাও কোথাও বেঁকে গিয়ে এমন সংক্ষিপ্ত রাস্তা তৈরি করে যার ফলে আলো বহদূরের পথ এই বিকল্প রাস্তা দিয়ে তুলনামূলক কম সময়ে অতিক্রম করতে পারে।

উদাহরণ দিই। ধর, বড় একটা লেক আছে কোনো মাঠের মাঝে। তুই লেকের অপরপাশে যেতে চাইলে তোকে লেকের সীমানা ধরে হাটতে হবে। লেকটা যেহেতু বড় তাই তোর সময় লাগবে বেশি। কিন্তু লেকের মাঝে যদি একটা ব্রিজ থাকে তবে তুই তুলনামূলক কম সময়ে লেকের অপরপাশে যেতে পারবি। ওয়ার্মহোলও ঠিক একই ভাবে সাহায্য করে সংক্ষিপ্ত বিকল্প পথ বানিয়ে।

মজার ব্যপার হলো, শুধু যে রাস্তা অতিক্রম করা যায়, সেটাই নয়। ওয়ার্মহোল দিয়ে অতীত ভবিষ্যতেও ভ্রমণ করা যায়!”

কথা শেষ করে মিহির দেখে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে! নিজের উপরেই হাসে সে। এত্ত বাজে লেকচার দেয় সে! অথচ দুনিয়ার সেরা পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয় ওকে লেকচারার হিসেবে পেতে চায়।

একদিন ভোরে ওর আগেই জেগে উঠলো জিমি। জাগালো ওকে। মাছ ধরতে বের হতেই জিমি জিজ্ঞাসা করল,“সেদিন তুই বলেছিলি ওরা আমাদের ফেরত নিতে আসবে! কেন বলেছিলি মিহির?”

ওর দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকাল মিহির। সেই চোখে অবশ্য আশার আলোই দেখতে পেল জিমি।

 

 

গডস ক্লাবের নৈরাজ্য থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে টিম মাসীহা।

পৃথিবী ধ্বংসের আগে আগে যেমন একজন মাসীহা বা ত্রাণকর্তা আসবেন পৃথিবীর মানুষদের বাঁচাতে, ঠিক সেভাবে আবির্ভূত হয়েছে টিম মাসীহা। একজন নয়, একদল। তাই নাম নিয়েছে “টিম মাসীহা”

দুনিয়ার মানুষকে অপরাধীদের হাত থেকে বাঁচাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তারা। মানুষকে তারা আশার আলো দেখাচ্ছে। দুনিয়ার বেশ কিছু শহরে সাধারণ জনগণের আশাতীত সাড়া পেয়েছে ওরা। দুর্নীতি রোধ করতে মানুষকে তারা কাউন্সেলিং করছে।

এখন পর্যন্ত গোপনেই চলছে তাদের কার্যক্রম। কোথায় থাকে তারা কেউ জানে না। কোথায় তাদের হেডকোয়ার্টার আর কোথায় থেকে তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে কেউ জানে না।

তাদের নেতা সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে মাঝে মাঝে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়। পরিচয় প্রকাশ না করলেও দিলনেতা নিজেকে পরিচয় দিয়েছে মাসীহা মার্টিন নামে। নামটা সম্ভবত ষোড়শ শতকের সাধু মার্টিন লুথার কিংয়ের নাম থেকে নেয়া।

তারা প্রচন্ড মেধাবী এবং দক্ষ। একদল সুশিক্ষিত মেধাবী বুদ্ধিমান মানুষ তাদের সেন্ট্রাল কমান্ডে রয়েছে বোঝাই যায়। এখন পর্যন্ত গডস ক্লাব তাদের কারও আস্তানা চিহ্নিত করতে পারেনি। তারা যেই ডিভাইসগুলো ব্যবহার করে সেগুলোও ট্র্যাক করা সম্ভব হয়নি।

গডস ক্লাবের কর্মকান্ডে দুনিয়াজুড়ে মানুষ ছিল অতীষ্ট। তাদের হয়ে যারা কাজ করতো তারাও হয়ে উঠছিল অতিষ্ঠ।

এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে মার্টিন। গডস ক্লাবের প্রশাসনে কাজ করা লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বুঝিয়েছে পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে কী করতে হবে, মানুষের মুক্তির জন্য কী করতে হবে, গডস ক্লাবের নাগপাশ থেকে দুনিয়ার মানুষকে বাঁচানোর জন্য কী করতে হবে সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছে ভালো করে।

শুরুতে তাদের বেশিরভাগই মার্টিনকে সাহায্য করতে রাজি হয়নি, ভয়ে। কেউ কেউ দোটানায় পড়ে গেছে; সাহায্য করবে নাকি করবে না!

মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ জীবনের ঝুকি নিয়ে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে মার্টিনকে। বলাই বাহুল্য, প্রথম দুই শ্রেণীর মানুষ প্রাণ দিয়েছে টিম মাসীহার কাছে!

আস্তে আস্তে দুনিয়াজুড়ে এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছে মার্টিন। কারণ মানুষ বুঝে গেছে অশুভ এক ঈশ্বরের খপ্পরে পড়েছে তারা। তাদের বাঁচার একমাত্র উপায় টিম মাসীহাকে সাহায্য করা।

সেনাবাহিনীতেও লোক আছে তার। মজুদ করে রাখা অস্ত্রের মোটা একটা অংশ পায় মার্টিনের দল। আর আছে অর্থলোভী অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। টাকা দিলেই জাহাজ বোঝাই করে অস্ত্র দিয়ে যায় তারা। ফলে সম্মুখযুদ্ধ করারও সামর্থ্য আছে মার্টিনের দলের।

গোয়েন্দা সংস্থায়ও লোক আছে তার। ফলে গডস ক্লাবের কর্মকান্ড আগেই জেনে যায় মার্টিন।

মার্টিন ঘুরে বেড়ায় দুনিয়াজুড়ে, গোপনে। টিম মাসীহাকে ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী। একেকদিন একেক দেশে যায়। গোপনে বৈঠক করে। কখনো কখনো মাসের পর মাস থেকে যায় একই শহরে। ছদ্মবেশে। মিশে যায় জনসাধারণের ভিড়ে। বাজারে দামাদামি করার সময় দোকানি হয়তো ঠাহর করতে পারে না যে এই লোকই মাসীহা মার্টিন! কারণ ওর টিম আবিষ্কার করে ফেলেছে দুনিয়ার সব কয়টা প্রধান ভাষায় কথা বলার মতো ট্রান্সলেটর। তাই কেউই বুঝতে পারে না মার্টিন কোন দেশী! এমনকি টিম মাসীহার সেন্ট্রাল কমান্ডের বেশিরভাগ লোকও চেনে না তার আসল চেহারা।

এভাবে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষজনকে উদ্বুদ্ধ করে আইনের শাসন কায়েম করছে সে। তবে বেশিরভাগ জায়গায় তার টিমকে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে মাফিয়াদের সঙ্গে। এমনকি পুলিশ মেরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে মার্টিন; এমন নজিরও কম নয়!

তারা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতেই কাল ঘাম ছুটে গেছে গডস ক্লাবের। যেই কয় জায়গায় ফেস টু ফেস লড়াই হয়েছে তাতে নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে টিম মাসীহা।

মার্টিনকে ধরতে তাই বিশ্বব্যাপী সুপার স্পাই নিয়োগ দিয়েছে গডস ক্লাব। সুপার স্পাই কথাটা বুঝতে অসুবিধা হলো?

বছরের পর বছর গবেষণা করে আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ক্রিসপার ক্যাস-৯। মানুষের ডিএনএ বদলে দেয়া সম্ভব মুহূর্তেই। মুহূর্তেই মানুষকে বানিয়ে দেয়া সম্ভব সুপারম্যানে। বহু টাকা খরচ করে গডস ক্লাব তাই বানিয়েছে অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতার সুপার স্পাই। ভুতুড়ে স্পাই বললেও ভুল হয় না।

এরকমই একদল সুপার স্পাই দুনিয়াজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মার্টিনকে ধরতে। এখন পর্যন্ত খুঁজে পায়নি। তার টিকিরও খোঁজ পায় না কেউ।

তবে টিম মাসীহার কার্যক্রম অণুসরণ করে কিছু কিছু এলাকায় পুলিশ ধরপাকড় চালিয়েছে। আসল লোককে হয়তো ধরতে পারেনি। মারা পড়েছে সাধারণ কেউ। যেখানেই মার্টিনের অনুরূপ কাউকে পাওয়া যাচ্ছে, তাকে সেখানেই মেরে ফেলা হচ্ছে।

দুনিয়াজুড়ে এরকম অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের মধ্যে একটা হত্যাকান্ডের গল্প বলছে মাসীহা মার্টিন, সেখানকারই এক পুলিশ অফিসারের অফিসে বসে!

“একটা গল্প শুনুন এসপি সাহেব। এলাকাটা আপনি চেনেন। ইনফ্যাক্ট জায়গাটা আপানার এরিয়ার মধ্যেই পড়ে। গল্প শুনুন, ঠিক বুঝতে পারবেন কার কথা বলছি।

এলাকাটা সুনাম ধরে রেখেছে সীমাহীন অরাজকতার মধ্যেও। অপরাধীরা নিষ্ক্রিয় এখানে। তাই পুলিশ প্রশাসনও তাদের ভেটকিয়ে কিছু করতে পারেনি।

এলাকাটার সুনাম মূলত খেলাধুলা আর ভালো কাজের জন্য। বেশ কয়েকটা একাডেমি আছে এলাকাটায়। পুলিশ, মিলিটারি বা কোচিং একাডেমি নয়, খেলাধুলার জন্য। ক্রিকেট ফুটবল তো আছেই, হকির পাশাপাশি একটা শ্যুটিং একাডেমিও আছে। ওরা আবার রাশিয়া থেকে শ্যুটিং কোচও এনেছে। টাকার জোর আছে সবারই।

এলাকার নামজাদা ব্যবসায়ীরা প্রতি মাসে বড় ডোনেশন দেয় একাডেমিগুলোকে। নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারলে ডোনেশন দেবে নাই বা কেন!

ভালো কাজগুলো অবশ্য হাতির মাথা টাইপ কিছু না। অন্যান্য এলাকায় যেখানে চুরি ডাকাতি ছিনতাই ধর্ষণ খুব গুম দেহব্যবসা মাদকের ছড়াছড়ি চলছে সেখানে এলাকাটা এসব থেকে মুক্ত। একদল খুনের আসামীর পাশে একজন চুরির মামলার আসামীকে যেমন নিরীহ মনে হয়, এলাকাটার খ্যাতিও তেমন।

কারণ আছে। এলাকাটায় সামাজিক অপরাধ না হওয়ার কারণ আছে। সমাজে যারা অপরাধ করে সেই কিশোর যুবকেরা লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় ব্যস্ত। তাদের অপরাধ করার সময় কোথায়?

অপরাধীরা মূলত দরিদ্র হয়। টাকার কারণেই বেশিরভাগ ক্রাইম হয়। এক্ষেত্রে এলাকাবাসী, ব্যবসায়ীরা, এবং স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশংসার দাবি রাখে। নিম্নবিত্ত পরিবারের কিশোরদের পড়াশোনার ব্যবস্থা আর যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে তারা।

ফলে যাদের অপরাধী হওয়ার সম্ভবনা ছিল তারাই এখন সুনামের কারণ হয়েছে। এই ছেলেরা নিজেরা তো অপরাধ করে না বরং কাউকে অপরাধ করতে দেখেলে থামায়।

আর এসব সম্ভব হয়েছে মেহেদির কারণে। মেহেদি এলাকারই ছেলে। মাদ্রাসা থেকে পড়াশুনা করে এখন ডাক্তারি পড়ছে একটা সরকারি মেডিকেল কলেজে।

এলাকার ছেলেদের উপর যথেষ্ট প্রভাব রাখে সে। এলাকার লোকজনও তার কথায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। সমাজের কর্তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে সে-ই এসব করেছে।বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাপ মা কে বুঝিয়ে ছেলেদের স্কুলে এনেছে, মাঠে এনেছে। অনেককে বুঝিয়ে ক্রাইম থেকে দূরে সরিয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের অবশ্য বুঝিয়ে কাজ হয়নি। বলপ্রয়োগে বের করতে হয়েছে।

কথিত আছে, মেহেদি টিম মাসীহার স্থানীয় কর্তা। কথাটা যদিও গুজব তবুও একটা প্রবাদ আছে “যাহা রটে, তাহা হালকা হলেও ঘটে”। গুজবটা ছড়ানোর কারণ হলো মেহেদি মাঝে মাঝেই হারিয়ে যায় দুই একদিনের জন্য। এই সময়টায় সে কোথায় থাকে কেউ জানে না। আবার মাদক ব্যবসায়ীদের উপর সশস্ত্র হামলা করে বের করে দেয়ার ঘটনাও সাধারণ কিছু নয়। তাই অনেকের ধারনা সে টিম মাসীহার সঙ্গে যুক্ত।

পুলিশের ধারনা মেহেদি স্বয়ং মাসীহা মার্টিন। অন্তত দশবার ওর উপর হামলা হয়েছে। প্রতিবারই অক্ষত ছিল সে। এখন পর্যন্ত তার কোনো কার্যকলাপ পুলিশ ট্র্যাক করতে পারেনি। তার ডিভাইসও হ্যাক করতে পারেনি পুলিশ। এদেশের মানুষের কাজই অবশ্য তিলকে তরমুজ বানানো।

এলাকার অনেকেই মেহেদিকে ভালোবেসে ইমাম মেহেদি বলে সম্বোধন করে। মেহেদি অবশ্য বিনয়ের সঙ্গে সেসব অস্বীকার করে।

মেহেদিকে মারার আগের দিনের গল্প শুনুন।

মেহেদিকে সেদিন দেখা যাচ্ছিলো বাংলাদেশের দলের জার্সি গায়ে, কাঁধে ক্রিকেট কিটব্যাগ নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। খানিকক্ষণ প্রাকটিস করা উদ্দেশ্য।

অন্যান্য দিনের সঙ্গে সেদিনের পার্থক্য হলো মেহেদি অন্যমনস্ক হয়ে হাটছে। কোথায় যেন মনোযোগ! ভাবছে কিছু একটা। আশেপাশের মানুষের কথাগুলো ওর কানে যাচ্ছে না। যেমন পানের দোকানি সাত্তার চাচার বলা কথাগুলো ওর কানে যায়নি।“মেহেদি আব্বাজান, কাইলকা রাইতে তুমি ছয়মতো না আইবার পারলে তোমার চাচি আম্মারে বাঁচাইবার পারতাম না”

ধর্ষণ হয়েছে একটা! খুনও!

মেহেদি কাজ শুরু করার পরপরই যে অপরাধ কমেছে সেটা নয়। আস্তে ধীরে কমেছে। তবে গত এক বছরের মধ্যে এইপ্রথম অপরাধ হলো ওদের এলাকায়।

ধর্ষিত হয়েছে একটা মেয়ে। খুনও হয়েছে।

মেহেদি মাঠে যাচ্ছে সমস্যাটার সমাধান করতে। মাঠে যেয়ে যেখানে থাকার কথা সেখানেই পেল সবাইকে। ভিড়টার কাছে যেতেই প্রথমে যেটা হলো, রাকিব নামে এক ছেলে ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। ওর বোনকেই ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে।

“কাঁদিস না। আমি আর আব্বা তো দেখছি বিষয়টা।” মেহেদি শান্তনা দেয় ছেলেটাকে।

মেয়েটার লাশ পাওয়া গেছে গতকাল। লাশটার পোস্টমর্টেম যেহেতু মেহেদির মেডিকেলে করা হয়েছে তাই মেহেদি জানে মৃত্যুর আগে কতবার পাশবিক নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে মেয়েটাকে!

বাকিদের দিকে ফিরলো মেহেদি। এদের কেউ কেউ একসময় অপরাধ করতো। কাজেই ধর্ষক এদের মধ্যে থাকাটাও বিরল নয়।

“রেশমিকে কবে যেন কিডন্যাপ করা হয়েছিল?” মেহেদি জানতে চায়।

“তিন দিন আগে ভাই।”

“এক্সপোর্ট করা খুব দামী একটা গাড়িতে করে এসেছিল ওরা, ভাই।” প্রত্যক্ষদর্শী একজন বলল। বোঝা গেল লোগো দেখেই গাড়ি চেনার দক্ষতা আছে তার।

“হুমম” মেহেদি কেবল নিজের স্টাইলে ইন্টারোগেশন শুরু করেছিল। তখনই বাগড়া দিলো এক ভদ্রলোক। এগিয়ে আসছে ওরদিকেই। মুখে আমুদে হাসি।

“শ্যুটিং ক্লাবের রাশিয়ান কোচ, ফেলিক্স।” কে যেন বলে দিলো মেহেদিকে। এর আগে লোকটাকে দেখেনি মেহেদি।

হাই হ্যালো শেষে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন সবাই গোমড়া মুখে বসে আছে কেন! এলাকাটাকে তো উনি শান্তির এলাকা বলেই চেনেন।

দুই এক কথায় বিষয়টা বলল মেহেদি। খেয়াল করলো লোকটার ইংরেজিতে কড়া রাশিয়ান টান আছে। কোথায় যেন রাশান দাবাড়ু গ্যারি কাসপারভের সাক্ষাৎকার শুনেছিল মেহেদি। সেখান থেকেই টানটা ধরতে পারলো।

মুখ দিয়ে খানিকটা চুক চুক করে সহানুভূতি জানাল খানিকটা ফেলিক্স। মেহেদিকে প্রস্তাব দিলো ক্রিকেট খেলার!

প্রস্তাবটা শুনে অনেক কষ্টে মেজাজ ধরে রাখলো মেহেদি। একে একটা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে, সেই সময় কিনা খেলার প্রস্তাব দিচ্ছে!

তবুও ভদ্রতার খাতিরে দুই একটা বল খেলতে রাজি হলো সে।

ব্যাট হাতে দাঁড়াল মেহেদি। বড় রানআপ নেবে বোধয় ফেলিক্স। বেশ খানিকটা দূরে দাড়াল তাই।

স্প্রিন্ট দিলো ফেলিক্স! উসাইন বোল্টও হার মানবে, এরকম দৌড় দিলো সে! বোলিং অ্যাকশনটা একদম অপরিচিত মনে হলো মেহেদির!

হাত থেকে বল বেরোলো ফেলিক্সের। দুর্ধর্ষ দৃষ্টিশক্তির কারণেই বোধয় বলটার অস্তিত্ব অনুভব করলো মেহেদি। এইমাত্র জীবনের সবথেকে দ্রুতগতির বলটার সামনে পড়লো সে! বাজি ধরে বলতে পারবে কখনোই এত দ্রুতগতির বল খেলেনি সে! ব্যাটের মাঝ ব্লেডে ঠেকিয়ে দিলো বলটা কোনোমতে।

দ্বিতীয় বলটা ফেলিক্স করলো গুড লেংথে, ডাউন দ্য উইকেটে এসে ব্যাট চালালো মেহেদি! বলটা গ্যালারিতে গেছে সবাই নিশ্চিত!

অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার ঘটে গেলো! মাঝ উইকেটে দাঁড়িয়েই বলটা ধরে ফেলল ফেলিক্স! মেহেদি অবাক! বাকি সবাই হতবাক! বলটা ছয় না হলেও ৩০গজ পার হতো নিঃসন্দেহে! আর সেই বলটাই মাঝ উইকেট পার হলো না কেন বুঝলো না কেউ!

পরের বলটা আরও ভুতুড়ে! তিনটা স্ট্যাম্পই পড়ে গেছে! ভূত দেখলেও এতটা চমকাত না মেহেদি!

অবাক চোখে ফেলিক্সকের দিকে তাকাল মেহেদি। মৃদু হেসে ওর দিকেই আসছে লোকটা। মেহেদিকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ওকে একদিন শ্যুটিং ক্লাবে আমন্ত্রণ জানাল!

“শ্যুটিং ক্লাবে তো বটেই, তোমার বেডরুমেরও ঢোকা দরকার!” বিড়বিড় করলো মেহদি। লোকটার মধ্যে অশুভ কি যেন একটা আছে!

পরের দিনই শ্যুটিং ক্লাবে গেল মেহেদি!

চমৎকার একটা বিল্ডিংয়ে ক্লাবটা। সামনে জায়াগাও আছে খানিকটা। গাড়ি পার্ক করার জন্য। সেখানেই একটা জাগুয়ার স্পোর্টস কার দেখলো। ফেলিক্সের বোধয়। পাশে আরও কয়েকটা বিদেশী গাড়ি দেখে খানিকটা বরং খুশিই হলো মেহেদি। বেশ উন্নতি করেছে ক্লাবটা।

ক্লাবে ঢুকতেই সবাই হই হই করে ছুটে এলো। স্বয়ং মেহেদি ভাই পা দিয়েছেন ওদের গরীবখানায়, ভাবা যায়! ভাবলোও সবাই। এবং খুশিও হলো।

দুই একজন অতি উৎসাহী হয়ে ওকে শ্যুটিংয়ের ক খ শেখাতে লাগলো। মেহেদি ওসবে এক চোখ রেখে, আরেক চোখে খুঁজলো ফেলিক্সকে। লোকটাকে বাজিয়ে দেখতে চায় ও! শ্যুটিং ক্লাবের কোচের বাইরেও লোকটার যে অন্য ধান্দা আছে সেটা তিনটা স্ট্যাম্প না পড়লেও বুঝতো মেহেদি!

ছেলেরা ওকে দশ মিটার এয়ার রাইফেল, এয়ার পিস্তল, পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ, বুলস আই এসব শেখাচ্ছে।

শ্যুটিংয়ের সময় একটা চোখ খোলা রাখলে সুবিধা কোথায়, না রাখলেই বা অসুবিধা কোথায় সেসব মেহেদি মুখস্থ করার আগেই ফেলিক্স হাজির হলো অবশ্য। ওর চশমার বাম চোখের উপরে আবার কালো একটা আবরণ। শ্যুটিংয়ের সময় এক চোখ বন্ধ রাখার ঝামেলা থেকে বাঁচার প্রাগৈতিহাসিক টেকনিক আরকি!

ওকে দেখে একগাল হাসলো ফেলিক্স। মেহেদিও পাল্টা হাসলো। ভাবলো ফেলিক্সের শ্যুটিং দক্ষতা দেখবে। উল্টো ফেলিক্সই ওর হাতে রাইফেল তুলে দিল। আনাড়ি মেহেদি দুই তিনটা শটে যাচ্ছেতাই করলো। লজ্জা পেয়ে রেখে দিলো রাইফেল।

ফেলিক্স ওকে নিজের চেম্বারে নিয়ে গেল। বিলাসবহুল একটা কামরা। এয়ারকন্ডিশনড। দামি সোফা। চেয়ার টেবিল। দেয়ালে লাগানো এলইডি টিভি। ফেলিক্সের টেবিলে দামি একটা ল্যাপটপ।

আলমারি খুলে ভদকার বোতল বের করলো ফেলিক্স। দামি গ্লাসে ঢালতে ঢালতে বলল,” রাশিয়ায় টানা ছয়শো ছেষট্টিটা বুলস আইয়ের রেকর্ড আছে আমার।”

“শিগগিরই ভারতকে আমরা যুদ্ধে হারাব।” মদের বদলে পানির গ্লাস তুলে নিলো মেহেদি। “ক্রিকেট যুদ্ধে”।

“তোমার মতো সংগঠক আমাদের দরকার মেহেদি। রাশিয়ায় চলো। স্বর্গ বানিয়ে দেব তোমাকে।”

“দুনিয়াতেই স্বর্গ বানাবো আমি। পাপের সাগরে ডুবে থাকা দুনিয়াকে আগের অবস্থায় নিয়ে যাব। না, ভুল বললাম। আগের থেকেও ভালো অবস্থায় নিয়ে যাব। আমার এলাকার সুখ শান্তি তো নিজের চোখেই দেখলে।”

“হুঁ। খুব ভালো কাজ করেছ তোমরা। আমি প্রশংসা করি এসবের।”

“ধন্যবাদ। ধারনা করছি এমন প্রস্তাব আরও অনেককেই দিয়েছ?” মেহেদি উঠে দাড়িয়েছে।

“আরেকবার ভেবে দেখো প্রস্তাবটা!” মৃদু হেসে বলল ফেলিক্স। মেহেদি কিছু বলল না। ওর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে হাসছে ফেলিক্স। মেহেদিকে চেনা হয়ে গেছে ওর।

পরদিন।

গলির মাথায় আটকা পড়লো মেহেদি। সামনে আততায়ী। পিছনে বিল্ডিং। প্রাকটিস করে বাসায় ফিরছিল। পিছন থেকে ডাক দিল কেউ। ঘুরে তাকালো সে।

আততায়ী ফেলিক্স। শ্যুটিং ক্লাবের রাশিয়ান কোচ। হাত দুটো পেছনে কেন কে জানে! ওর দুই পাশে দুইজন করে চারজন পুলিশ দেখা যাচ্ছে। তাদের হাতে ধরা আদ্যিকালের থ্রি নট থ্রি।

“ওরা নাকি তোকে ইমাম মেহেদি বলে ডাকে, মেহেদি?” কড়া রাশিয়ান টানের ইংরেজির বদলে পরিষ্কার বাংলা শোনা গেলো ফেলিক্সের মুখ থেকে!

চমকে গেলো মেহেদি। নাহ! লোকটা ফেলিক্সই তো। বাংলায় কথা বললেও কন্ঠটা ঠিকই আছে। ওই তো বাম চোখের চশমার গ্লাসটায় কালো একটা আবরণ, শ্যুটিং করার সময় এক চোখ বন্ধ রাখার ঝামেলা থেকে বাঁচায় যেটা! হাইট টাও ঠিকই আছে। ছয় ফুটের কম নয়। গড়পড়তা বাঙালি এমন হয় না। কোঁকড়া চুলও আছে। লোকটা ফেলিক্সই! তাহলে মুখে বাংলা আসলো কী করে!

“ছোহ! সামান্য কয়েকটা মিল দেখেই ওরা তোকে ইমাম বানিয়ে দিলো? নেতা হওয়ার কি যোগ্যতা আছে তোর?

হ্যাঁ তুই মাসীহা ইমাম মেহেদির মতো বিনয়ী আর ভদ্রলোক বটে, কিছু ছেলেপুলেতোকে নেতাও মানে বটে, এলাকায় ভালো কাজ করিস তুই, কিন্তু তার মানে এই না যে তুই-ই সেই মাসীহা!” পরিষ্কার বাংলাতে বলল ফেলিক্স।

“মাসীহার আবির্ভাব কোথায় হবে সেটা কে বলতে পারে ফেলিক্স! হয়তো এই মুহূর্তে রাশিয়ায় মিশন চালাচ্ছে সে! অথবা বাংলাদেশেই কোথাও ঘাপটি মেরে আছে!”

“থাক আর বকিস না। তোর মাসীহাগিরির মূল্যায়ন হবে আজকে।” বলল ফেলিক্স।

“সামলা এটা” বলেই বাঁহাতে থাকা একটা ক্রিকেট বল, লাল টেস্ট বল, মেহেদির দিকে ছুঁড়লো ফেলিক্স, বেসবল যেভাবে ছোঁড়ে সেভাবেই।

 বিপদ বুঝে আগেই ব্যাগ থেকে ব্যাট বের করে নিয়েছে মেহেদি। প্রস্তুতই ছিল সে। ব্যাট ঘুরিয়ে বলটা ঠেকিয়ে দিলো। আর ঠেকিয়েই বুঝলো বিপদে পড়েছে সে। বলটা আসলে আইওয়াশ ছিল!

গুলি ছুড়েছে চার পুলিশের একজন বা চারজনই, কারণ মেহেদি শব্দ শুনলো একবারই!

আবারও ব্যাট ঘোরালো সে। জানতো পাগলামি। ব্যাট দিয়ে বুলেট ঠেকানো অসম্ভব! তবুও জান বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা হিসেবে ব্যাট চালালো সে।

তিনটা বুলেট ঠেকিয়ে দিলো ওর ব্যাট। আর চার নাম্বারটা? ওটা ওর বাম বাহুতে চুমু দিয়ে বেরিয়ে গেলো। ফ্লেশউন্ড। এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে গেছে।

চোখ ঘুরিয়ে সামনে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল মেহেদি। সামনে ফেলিক্স নেই! চার পুলিশও হতভম্বের মতো দাড়িয়ে আছে!

মেহেদির কানের খুব কাছে কে যেন বলে উঠলো, “হাই মেহেদি!”

আরেকবার চমকালো মেহেদি। পিছনে তাকানোর জন্য ঘুরতেই চোখের কোনা দিয়ে দেখলো ওটা ফেলিক্সই! কখন যেন ওর পিছনে চলে এসেছে! টেরই পায়নি!

ধাক্কাটা খেলো তখনই। ফেলিক্সের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যাওয়া মেহেদি বিশ্বাসই করতে পারছে না ফেলিক্স এত দ্রুত কি করে ওর পিছনে চলে আসলো!

ওর থেকে ফুট ছয়েক দূরে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে, মাথা উপরে তুলে শরীর ঝাঁকিয়ে বেদম হাসি হাসছে ফেলিক্স। “মাসীহা মার্টিনের অবস্থা দেখো না সবাই! এ নাকি লড়বে গডস ক্লাবের সঙ্গে! হা হা হা!”

গুলি লাগা জায়গাটা আগুনের মতো জ্বললেও মাথাটা এখনো ঠান্ডা মেহেদির। মাটিতে পড়ে থেকেও এখনো বাঁচার প্ল্যান কষছে সে। চট করে একবার পুলিশ চারজনের দিকে তাকালো ও। বন্দুক চারটা ওর দিকে তাক করা বটে কিন্তু সম্ভবত ফেলিক্সের ইশারা না পেলে গুলি ছুড়বে না। গুড! ফেলিক্সকেই কোতল করতে হবে আগে। ডানে ঘুরতেই বলটা পেয়ে গেল। পেয়েই ছুঁড়লো ফেলিক্সের মুখ বরাবর!

কিন্তু ফেলিক্স বোধয় যে সে কেউ নয়! বাম হাতটা কোমরে রেখে ডান হাতেই বলটা ধরে ফেলল সে! হাসিমুখেই তাকাল মেহেদির দিকে। তারপর বলটা উপরে ছুড়লো।

হতভম্ব মেহেদি বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়েই থাকতো পারলো শুধু! কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছয়ফুট দুরত্ব চোখের পলকেই অতিক্রম করে ছোঁ মেরে মেহেদির পাশ থেকে ব্যাটটা তুলে নিয়েই আবারও নিজের জায়গায় ফিরলো ফেলিক্স। বলটা মাটিতে পড়ার আগেই সেটায় আঘাত করলো ব্যাটটা দিয়ে।

বুলটের গতি ছাড়িয়ে প্রায় গামা রশ্মির বেগে বলটা ছুটে গেল মেহেদির দিকে। আত্মরক্ষার জন্য মেহেদি কেবল ডান হাতটা ওঠাতে পেরেছিল। পারলো না। বলটা আটকাতে পারলো না। উপরের ঠোঁটে আঘাত করে ওর দুটো দাঁত খসিয়ে দিলো বলটা!

রক্তাক্ত, প্রায় অজ্ঞান মেহেদির এটা ভাবার সময় হল না যে, বলটা মাটিতে পড়ার আগেই কী করে ফেলিক্স ছয় ছয় বার ফুট দুরত্ব অতিক্রম করে ফেলল! কী করেই বা বিদ্যুৎবেগের থেকেও বেশি বেগে বলটা ওর দিকে ছুটে আসলো!

ভাবতে পারল না কারণ তার আগেই ভূমিশয্যা ত্যাগ করে আকাশে উড়ে গেছে মেহেদি! ওর দুই বগলের নিচে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ঝটকা মেরে আকাশে তুলে দিয়েছে ফেলিক্স!

জোড়া পায়ে লাফিয়ে উঠলো সে, মেহেদি মাটিতে পড়ার আগেই ওর তলপেটে বিরাশি শিক্কার একটা বাইসাইকেল কিক বসিয়ে দিল! ছিটকে বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে পড়ল মেহেদি, ময়লা পানির উপর। ড্রেনে।

“শালা এটাও মাসীহা মার্টিন নয়!” ইত্যাদি ইত্যাদি অকথ্য খিস্তি ঝাড়তে ঝাড়তে উল্টোদিকে হাঁটা দিলো ফেলিক্স। মাদার রাশার দুর্ধর্ষ সুপার স্পাই সে। এসেছিল মেহেদিকে মার্টিন মনে করে নিকেশ করতে।

পুলিশ চারজনকে নির্দেশ দিলো মেহেদির আহত শরীরটার উপর ইচ্ছামতো গুলি বর্ষণ করতে।

আরও একটা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটে গেল এসপি সাহেব। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। দুনিয়ার সব দেশেই চলছে। সব সরকারই আপদ দূর করতে চাইছে। যার সঙ্গেই মাসীহা মার্টিনের সামান্য মিল পাওয়া যাচ্ছে তাকেই কতল করছে গডস ক্লাব!

কি লাভ বলুন তো! এভাবে তাদের জন্য ময়দান ফাঁকা করা সম্ভব? নাকি এভাবে মার্টিনকে আটকানো সম্ভব! দেখুন মার্টিনের হদিস আপনারা পাবেন না। দুনিয়াজুড়ে যেভাবে মানুষ সাড়া দিচ্ছে ওর প্রতি তাতে গণঅভ্যুত্থান হলে আপনারা আটকাতে পারবেন তো?

আপনি আমার কথা শুনছেন তো এসপি সাহেব? শুনবেন কি করে! তখন থেকেই যে দাবার বোর্ডের উপর পেন্সিল দিয়ে গডস ক্লাবের লোগো আঁকার চেষ্টা করছেন, সেটা নাহয় মেনেই নিলাম কিন্তু…

হাত উপরে তুলতে বললেন নাকি? আচ্ছা তুললাম।

কিন্তু আপনি এইমাত্র আমার দিকে যেই পিস্তলটা তাক করলেন সেটার গায়েও যেই লোগো খোদাই করা, সেটা কী করে মেনে নেই বলুন তো? এসপি সাহেব বাংলাদেশে থাকা শেষ সৎ পুলিশ অফিসার ছিলেন আপনি! সেই আপনিও ওদের দলে নাম লেখালেন!”

দুম! দুম! (দুবার গুলি বের হওয়ার শব্দ শোনা গেলো)

“দেখুন মাসীহা মার্টিন কোন দেশে কখন উদয় হবেন আর কে হবেন সেটা সে ছাড়া কেউ জানে না। এই ধরুন আমিই যে মাসীহা মার্টিন নই তার কি গ্যারান্টি?

আপনি শুনছেন তো এসপি সাহেব? শুনবেন কী করে? আপনার পাপী ঘিলু তো এইমাত্র উড়িয়ে দিলাম আপনারই পিস্তল দিয়ে!”

পুলিশ স্টেশনটা উড়িয়ে দিলো মার্টিন। এলাকাটা এখন টিম মাসীহার নিয়ন্ত্রণে। ঢাকা শহরের বড় একটা এলাকায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করলো তারা।

এভাবে দুনিয়ার বেশ কিছু শহরে পুলিশ মেরে কিংবা মাফিয়াদের মেরে আইনের শাসন কায়েম করেছে মার্টিন।

একইভাবে বহু শহরে বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ দিয়েছে তাদের সঙ্গে মার্টিনের কিছু বিষয়ে মিল থাকায়।

গন্ধ শুকে শুঁকে ঠিকই মার্টিনকে প্রায় ধরে ফেলেছিল ফেলিক্স। ব্যর্থ হল ভুল লোকের উপরে হামলা করে। মেহেদি না মরলে মার্টিন সাবধান হতো না হয়তো। ধরা পড়তো।

অবশ্য ধরা পড়তে পারতো সে অসংখ্যবার। পড়েওছিল একবার।

দুনিয়াজুড়ে অসংখ্য স্পাই আর একডজন সুপার স্পাই খুজে বেড়াচ্ছে ওকে।

গডস ক্লাবের অনন্য আবিষ্কার সুপার স্পাই। তাদের একজন ধরে ফেলেছিল মার্টিনকে। মেগান স্টারলিং।

 

একটা বাইক। রয়্যাল এনফিল্ড ব্রান্ডের। বেশ দামি সিঙ্গেল সিটেড বাইক। নান্দনিক চেহারা। বাইকারও নান্দনিক। বাইকারদের মতো কালো পোশাক গায়ে। সাদা হেলমেটের পিছন দিয়ে কালো চুলের গোড়া দেখা যাচ্ছে। পায়ে পায়ে স্টাইলিশ থার্সডে বুট। বুটের সামনের বিটের দিকটায় লোহার পাত বসিয়ে নেয়া, এক লাথিতেই লড়াই থেকে ছিটকে দেয়াই ওটার উদ্দেশ্য।

মেয়েটার নাম মেগান স্টার্লিং।

বাইকের মোটরের ভোঁ ভোঁ শব্দের ফাঁকে ফাঁকে গানের একটা দুটো লাইন শোনা যাচ্ছে। “রাইডারস অন দ্য স্টর্ম…”

যেন ধুঁ ধুঁ মরুভূমির মাঝে এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে মেগান। অনন্ত অসীমে চলে যাওয়া এক রাস্তা। রাস্তার দুপাশে ভাঙাচোরা বিল্ডিংয়ের ধ্বংসাবশেষ আর জঞ্জালগুলো আধশোয়া হয়ে মাটির সঙ্গে লেগে আছে ইতিহাসের অক্ষয় সাক্ষী হিসেবে।

একেবারেই ফাঁকা নয় ওগুলো। ওগুলোর ভিতরে খুপরি বানিয়ে আশ্র‍য় নিয়েছে অন্য কোথাও ঠাঁই না পাওয়া গৃহহীন মানুষ। মেগানের বন্ধুদের ঘাপটি মেরে থাকাও বিরল নয়।

বাইকের গতি কমছে। কমতে কমতে থেমেই গেল বাইকটা। থামার ঠিক আগেই গানের লাইন শোনা গেল একটা। “দেয়ার’স আ কিলার অন দ্য রোড…”

বাইক থেকে নামল সে। থাই হোলস্টারে দেখা যাচ্ছে রিভলবার। হেলমেট খোলায় সুন্দর মুখখানা দেখা গেলো। একটুখানি হাসলো, টুকটুকে দুই ঠোঁটের ফাঁকে ঝকঝকে দাতের সারি দেখা গেল এক ঝলক।

হেঁটে গেল সামনের চায়ের দোকান পর্যন্ত। টিনের চালার চায়ের দোকান। একটা ভাঙা বিল্ডিংয়ের দেয়ালের সামনে টিন লাগিয়ে দোকানটা বানানো বানিয়েছে দোকানি। দোকানের সামনের দিকটায় হটডগ বার্গার পিজ্জা স্যান্ডউইচ দেখা যাচ্ছে।

এসব জায়গায় চা খেয়ে অভ্যস্ত নয় মেগান। তবুও থামল, কারণ গত দশ মাইলের মধ্যে এটাই একমাত্র দোকান। এবং যতদূর চোখ যায় জনমানবহীন প্রান্তরের বুক চিরে চলে যাওয়া রাস্তার আশেপাশে আর কোনো অক্ষত স্থাপনা দেখতে পাচ্ছে না সে। চায়ের তেষ্টা এখানেই মেটাতে হবে।

চাওয়ালা চা দিলো ফ্লাস্ক থেকে। চা গরম নয় তেমন। সর্বশেষ কখন গরম করেছে সেটা দোকানি নিজেও জানে কি না সন্দেহ হচ্ছে মেগানের। বা আজকে আগুন জ্বালানোর মতো জ্বালানি দোকানির কাছে আছে কি না সেটা নিয়েও সন্দেহ হচ্ছে ওর।

তিন চুমুকে চা শেষ করে উঠে দাড়ালো মেগান। দাম না দিতে গিয়েও না দিয়ে চলে যাচ্ছিল। দোকানদার ধমকে উঠল।

ঘুরে দাঁড়াল মেগান, বলল, “অ্যাঞ্জেল অফ ডেথ মেগান, নাম তো শুনেছই!”

দোকানির ক্যাশবাক্সের কাছে লেজার গানের ম্যাগাজিনের চেহারা দেখেছে সে। সেটা দেখেই দামটা দিল না।

সাধারণ কেউ হলে নাম শুনেই মেগানকে চিনতো। দুনিয়ার কোণে কোণে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে মেগানের দল। নামটা তাই অপরিচিত নয়।

দোকানদার কাঁপতে লাগলো থরথর করে, চোয়াল ঝুলে পড়ল। খোলা মুখে মাছি ঢুকে পড়বে এমন অবস্থা।

যা বোঝার বুঝে নিয়েছে মেগান। থাই হোলস্টার থেকে হাতে চলে আসল রিভলবার, পুরোনো দিনের সিসার বুলেটের। একবার গর্জেও উঠলো সেটা।

বাইক ছোটালো মেগান। আরও দুশো কিলো ভ্রমণ করতে হবে ওকে। গান না শুনে অতদূর যাওয়া বিরক্তিকর। তাই আবারও গান ছাড়লো সে।

“দেয়ারস আ কিলার অন দ্য রোড, হিজ ব্রেইন ইজ স্ক্রুইমিং লাইক আ টোড…”

গানটার লাইনের সঙ্গে মেগানকে মেলাতে গেলে ছোট্ট একটা পরিবর্তন করতে হবে সেটায়। “হিজ” এর জায়গায় “হার” দিলেই হলো।

হ্যাঁ, মেগান একজন কিলার বটে। টিম মাসীহার ফিমেল কন্ট্র‍্যাক্ট কিলার সে। এককালে গডস ক্লাবের সুপার স্পাই ছিল। দুর্দান্ত মারামারির ট্রেনিং ওখানেই পেয়েছিল। এখন পরশুরাম হয়ে এসে ধ্বংস করতে নেমেছে গডস ক্লাবকেই!

দুনিয়াজুড়ে অসংখ্য অদ্ভুত, মনগড়া, অলীক আখ্যা পাওয়া আবিষ্কারের পিছনে প্রচুর টাকা ঢেলেছে গডস ক্লাব (তৎকালীন বিলিয়নিয়রস ক্লাব)। তার মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় হলো মানুষের ডিএনএ বদলে দিয়ে তাকে ইচ্ছামতো রুপান্তর করা।

প্রক্রিয়াটা হলো ক্রিসপার ক্যাস-9। বহু আগেই আবিষ্কার হয়েছিল এটা। বিভিন্ন প্রাণীর উপরে প্রয়োগ করে আশানুরূপ সাফল্যও পাওয়া গেছে। এমনকি মানুষের বিভিন্ন জিনগত রোগও সারিয়ে তোলা গেছে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

গডস ক্লাব এসব মামুলি কারণে টাকা ঢালেনি বোঝাই যাচ্ছে। তারা চাইছিল মানবজাতির হৃদয়ে লালন করা বহুদিনের খায়েশ, সুপারম্যান!

সুপারম্যানের মতো তো আর উড়াউড়ি তো আর সম্ভব নয়, কাজেই সেটা বাদ দিয়েই বিজ্ঞানীদের চাহিদাপত্র দিলো গডস ক্লাব।

অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতার সুপার স্পাই চাই তাদের!

সারা দুনিয়ার সবকটা দেশ থেকে বাছাই করে কয়েক ডজন কমব্যাট স্পেশালিষ্ট নিলো তারা, আর্মি-নেভি-এয়ারফোর্স -কমান্ডো ; এমনকি এসপিওনাজ এজেন্টও।

গবেষণার গিনিপিগ হলো তারা। তাদের উপরে প্রয়োগ করা হলো ক্রিসপার -ক্যাস9 নামের ডিএনএ বদলে দেয়ার প্রযুক্তি।

এই প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের ডিএনএ তে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত অংশ কেটে ফেলে যেমন মিউটাজিনিক (জিনের পরিবর্তন ঘটিত রোগ) রোগ থেকে বাঁচা যায় তেমনি কোনো অংশ পরিবর্তন করে দেহের পরিবর্তন ঘটানো যায়।

মানুষের শারীরিক সক্ষমতা নির্ভর করে পেশি আর হাড়ের গঠনের উপর। এই দুটোর জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়।

মানবদেহের পেশি মূলত গঠিত অ্যাক্টিন ও মিয়োসিন নামের প্রোটিন দিয়ে। এই দুটোর গঠনের উপরে তাই পেশির শক্তি নির্ভর করে।

কাজেই জেনেটিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দৃঢ়তা বৃদ্ধি করতে পারলে পেশির শক্তি বাড়বে।

মানবদেহে সকল কাজের নিয়ন্ত্রক হলো জিন তথা ডিএনএ। বলাই বাহুল্য, প্রোটিনের উৎপাদন কিংবা দৃঢ়তা নির্ভর করে জিনের উপরে। প্রোটিন উৎপাদনের সীমা নিয়ন্ত্রণ করে জিন। আবার জিন দুর্বল হলে প্রোটিনের উৎপাদন কম হবে বা প্রোটিন কম দৃঢ় হবে।

কাজেই ক্রিসপার-ক্যাস9 প্রযুক্তির মাধ্যমে অ্যাক্টিন ও মিয়োসিন প্রোটিন উৎপাদনকারী দুর্বল জিন কেটে ফেলে কিংবা পরিবর্তন করে অথবা প্রোটিন উৎপাদনের সীমা বৃদ্ধি করে বা প্রোটিনের গুণগত মান বাড়িয়ে পেশির দৃঢ়তা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

অপরদিকে হাড়ের দৃঢ়তা নির্ভর করে এর ম্যাট্রিক্সের উপরে। ম্যাট্রিক্স যত দৃঢ় হবে হাড় তত মজবুত হবে। ক্রিস্পার-ক্যাস9 প্রযুক্তির সাহায্যে ম্যাট্রিক্সের দৃঢ়তা বৃদ্ধি করা হলো ওইসব লোকদের।

হাড় আর পেশির সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে সুপার স্পাইরা পেল অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতা। তাদের একেকটা ঘুষিতে কয়েকশো পাউন্ডের শক্তি! এক লাথিতে একটা ঘোড়া পর্যন্ত মেরে ফেলতে পারে তারা!

শখানেক বছর আগের দুনিয়ার দ্রুততম মানব উসাইন বোল্টও তাদের কাছে নস্যি। বোল্টের রেকর্ড ভেঙ্গেছে সুপার স্পাই মেগান স্টারলিং। 4.87 সেকেন্ড সময় নিয়ে শেষ করেছে একশো মিটার স্প্রিন্ট!

শুধু তাই নয়! চোখ নাক কান ব্রেইন ত্বক; বদলে দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই তাদের বানানো হয়েছে সুপারম্যান!

তবে সবাই-ই যে এই গবেষণায় উৎরে গেছে তা নয়। কয়েক ডজনের মধ্যে বেঁচে গেছিলো কেবল দেড় ডজন মানুষ! বাকিরা হয় মরেছে নয়তো পঙ্গু হয়ে গেছিলো বলে গোপনে তাদের মেরে ফেলেছে গডস ক্লাব!

কারও চোখ এত বড় হয়ে গেছিলো যে অক্ষিকোটরের ভিতরে বাকিসব অঙ্গগুলোকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল। কেউ কানে একদমই শুনতে পায়নি। আবার কারও হাত পা ফুলে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছিলো। তিনজনের কিডনি আর লিভার ফেটে গেছিলো। দুইজনের ব্লাড প্রেশার এত্ত বেশি হয়েছিল যে তার শরীরের সব কয়টা রক্তনালী ফেটে গিয়েছিল! একজনের তো বিশেষ অঙ্গের পেশি বেঢপ সাইজের বড় হয়েছিল!

আসলে ক্রিসপার-ক্যাস9 নিজেই একটা প্রোটিন। এটা এমনভাবে তৈরি করা যে তা ডিএনএর নির্দিষ্ট ক্রমকে বেছে নিয়ে কেটে ফেলতে বা পরপর কয়েক জায়গায় কেটে ফেলে নির্দিষ্ট ক্রমে সাজাতে পারে।

সমস্যা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটার সূক্ষ্মতা কম! মাত্র 33 পারসেন্ট! কাজেই বেশিরভাগ লোকের জীবনে ঘটে গেছে বিশাল সর্বনাশ!

এসব লোকেদের সারাজীবন ধরে পুষতে পারবে না গডস ক্লাব। তাই তাদের মেরে ফেলা হলো গোপনে।

(এতত মহান একটা আবিষ্কার এই কয়টা মানুষের প্রাণের থেকে অনেক অনেক মূল্যবান; ভাষণে বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট লুইস!)

বিজ্ঞানীরা সাবধানবাণী দিয়েছলেন, সুপারম্যান বিগড়ালেই সব শেষ। আটকানোর আর কোনো উপায় থাকবে না। কারণ গডস ক্লাব যেভাবে ফরমায়েশ দিয়েছে, তাতে অপ্রতিরোধ্য “সুপার স্পাই”ই বানিয়েছেন তারা।

তাদের সাবধানবাণী দৈববাণীর মতো ফলে গেছে। মেগান বিগড়ে গেছে।

মার্টিনকে ধরতে দুনিজুড়ে একডজন সুপার স্পাই নিয়োগ করেছিল গডস ক্লাব, প্রতি মহাদেশে দুইজন করে। তারমধ্যে মেগানের ক্যারিরার সবথেকে বর্ণাঢ্য। শুরু থেকেই তার শরীরে ক্রিসপারের প্রোটিনগুলো খাপ খেতে থাকে, কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখানো ছাড়াই!

ঠিক ঠিক জায়গায় ডিএনএ সিকোয়েন্স কেটে ফেলতে পারছিল ক্রিসপারের প্রোটিনগুলো। নতুন, একদম বিজ্ঞানীদের চাহিদা মতো ডিএনএ ক্রম সাজছিল মেগানের শরীরে! সূক্ষ্মতার হার নব্বই শতাংশের বেশি!

এগুলো ভাগ্যবান বাকি লোকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে মেগানকে আলাদা করেছে, তার শরীর ক্রিসপারকে সঠিকভাবে গ্রহণ করে নেয়ার বিষয়টায়।

বাকিদের ক্ষেত্রে যেখানে সূক্ষ্মতার হার নব্বই শতাংশের মতো, সেখানে মেগানের সূক্ষ্মতার হার পচানব্বই শতাংশেরও বেশি! ফলে বাকিদের থেকে বেশ খানিকটা এগিয়ে যায় সে!

বারোজনের মধ্যে একমাত্র তারই এসপিওনাজ এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। সাফল্য পেয়েছিল একমাত্র সেইই। আর সেটাই কাল হলো গডস ক্লাবের জন্য।

অত্যন্ত চতুর মার্টিনের হেডকোয়ার্টার ছিল এন্টার্কটিকায়। যেখানে সুপার স্পাই নিয়োগ করেনি গডস ক্লাব।

মেগানসহ বাকিরা জানতো, মার্টিন যেখানে থাকবে সেখানেই সবথেকে বেশি বিপাকে পড়বে গডস ক্লাব। টিম মাসীহার কার্যক্রম সেখানেই সবথেকে বেশি হবে। আর মানুষ সেখানেই বেশি সুখে থাকবে।

তিন মাস তন্ন তন্ন করে খুজেও মার্টিনের অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ কোনো ক্লু পায়নি মেগান। তারপর অনেকটা অনুমানের উপর ভিত্তি করে এন্টার্কটিকায় অভিযানের অনুমোদন নেয় গডস ক্লাবের থেকে।

মেগান জানতো, এন্টার্কটিকার সঙ্গে বাকি বিশ্বের যোগাযোগ দুর্বল, আল্ট্রানেট তো দুর্বল বটেই। (সেখানে গবেষণারত বিজ্ঞানীরা বিশেষ দরকারে আটলান্টিক মহাসাগরে আর্জেন্টিনা উপকূলে অবস্থিত যোগাযোগ কেন্দ্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করে)।

কাজেই মার্টিন এন্টার্কটিকায় থাকলে তার সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে প্রস্তরযুগের পত্রবাহকের মাধ্যমে! তাকেই ধরতে চায় মেগান। তার মাধ্যমেই ধরবে মার্টিনকে।

নিম্নতাপমাত্রায় গবেষণা করতে হয়, এন্টার্কটিকার এরকম কিছু প্রজেক্টে টাকা ঢালছে গডস ক্লাব। আর গবেষণা উপকরণ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীদের থাকা খাওয়ার জিনিসপত্র; সবই একটা মাত্র জাহাজে করে যায় এন্টার্কটিকায়।

সেটাতেই চেপে বসল মেগান।

ছদ্মবেশে উঠেছে সে। মার্টিনের চরেরা ভালো করেই চেনে মেগানকে। কাজেই তাকে দেখে ফেললে সাবধান হয়ে যাবে মার্টিন। ফসকে যাবে এবারেও। তাই সতর্ক মেগান।

ক্যাপ্টেনের কাছে থেকে যাত্রীদের লিস্ট নিয়ে শুরুর দিনই গবেষণা শুরু করে দিলো মেগান। আর্জেন্টিনা উপকূল থেকে এন্টার্কটিকার নির্দিষ্ট ওই জায়গায় যেতে সময় লাগবে পাক্কা চারদিন। মেগান বসে থাকতে চায় না। মার্টিনের চরকে ধরার একটাই উপায়, এন্টার্কটিকায় থাকা সকলের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করা। আর তাদের ভিতরে মিশে যাওয়া।

দিনে যাত্রীদের সঙ্গে মিশে যায় মেগান। তাদের সঙ্গে বসে খায়, গল্প করে, আড্ডা দেয়। তাদের পরিবারের কথা জানতে চায়।

মেগান খুব ভালো করেই জানে মাসীহার চরদের বেশিরভাগের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা মার্টিনের পক্ষে কাজ করছে ক্ষোভ থেকে। কাজেই তাদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে পরিবার নিয়ে কিছু বললে বা গডস ক্লাব নিয়ে কথা বললেই তাদের ভিতরে থাকা আগুনটা উসকে ওঠে।

মেগান ঠিক সেটাই করল। জাহাজ থেকে নামার আগেই দুইজনকে মার্টিনের চর বলে সন্দেহ করল সে। তবে আগেই পাকড়াও করল না তাদের। ওর সন্দেহ ঠিক না হলে মার্টিন সতর্ক হয়ে যাবে।

জাহাজ থেকে নেমে সোজা প্রজেক্টের হেডকোয়ার্টারে গেল মেগান। পুরো এন্টার্কটিকা জুড়ে ছোট আর মাঝারি আকারের কিছু গবেষণা স্থাপনা আছে গডসক্লাবের। আর আছে সামরিক স্থাপনা। আগে একটা মাত্র সেনা ছাউনি ছিল। মার্টিন মারামারি শুরুর পর প্রতিটা স্থাপনার সঙ্গেই একটা করে সেনা ছাউনি বসিয়েছে গডসক্লাব। সবগুলোর নেতৃত্ব একজনই, প্রজেক্টের ডিরেক্টর।

প্রজেক্টের ডিরেক্টর ভিক্টর গোভোরোভ জাতিতে রাশান। রাশা থেকে চারজন সুপারস্পাই পেয়েছে গডসক্লাব, এই কারণে দুনিয়াজুড়ে রাশিয়ানরা একটু দাপট দেখাচ্ছে।

ভিক্টর গোভোরোভ মেগানকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন নতুন গবেষক হিসেবে, ছদ্মবেশেই সেখানকার বিজ্ঞানী গবেষকদের সঙ্গে পরিচিত হলো মেগান।

গবেষকদের লিস্ট মেগান পেয়েছে গোভোরোভের সঙ্গে দেখা করেই। এবারে আস্তে আস্তে মেগান মিশে গেলো গবেষকদের সঙ্গে। এদের সঙ্গে মার্টিনের চর ধরার কৌশল প্রয়োগ করে লাভ নেই। কারণ এরা পরিবারসহই থাকে এন্টার্কটিকায়। অন্য কৌশল ধরতে হলো তাই।

মেগান জানে মার্টিন চায় না দুনিয়াজুড়ে আর কোথাও গডসক্লাবের কোনো প্রজেক্ট সফল হোক। এন্টার্কটিকায়ও একই উদ্দেশ্য তার। মেগান তাই বসলো গবেষকদের গবেষণাপত্র আর এন্টার্কটিকার এই প্রজেক্টের অর্থ ব্যয়ের হিসাবের খাতা নিয়ে। প্রজেক্টটা ব্যর্থ করতে কেউ কোনো সূক্ষ্ম গন্ডগোল করেছে কি না সেটা খতিয়ে দেখলো মেগান।

পাক্কা সাতদিন খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার পর দুই জায়গায় গরমিল পেল সে। দুইজন ফাকি দিয়েছে, খুব সামান্য। কিন্তু মেগানের সুপারম্যানীয় মস্তিষ্ক সেটা ধরে ফেলল।

কাজেই ওর লিস্টে আগের দুজনের সঙ্গে এখন আরও দুজন যোগ হলো। সর্বমোট দুজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, একজন অ্যাকাউন্ট অফিসার। আর অবশিষ্ট একজন গবেষক।

একাউন্ট অফিসারকেই বেশি সন্দেহ মেগানের। ভিক্টর গোভোরোভকে তাই জানাল এই লোককেই ফলো করতে চায় সে।

লোকটা প্রায় প্রতিদিন বের হয় গাড়ি নিয়ে, সবকয়টা স্থাপনায় নিজেই যায় হিসাব নিতে। মেগান চায় গোপনে তাকে ফলো করতে, হয়তো চুপিচুপি করে মার্টিনের কাছে খবর নিয়ে যায় সে।

লোকটা গাড়ি নিয়ে বের হতেই মেগানও বের হলো একটা পোলারবাইক নিয়ে, এটা বরফের উপরে চলার জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি।

উচু নিচু এবড়োখেবড়ো বরফের উপর দিয়ে গাড়ি ছোটাচ্ছে লোকটা। গডসক্লাব একটা রাস্তা বানিয়েছিল বটে, কিন্তু নিত্যদিনের তুষারপাত রাস্তার বেহাল অবস্থা করেছে।

মেগানও নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করছে লোকটাকে। লোকটার সন্দেহ হলেই ধরা পড়বে সে। সে প্রার্থনা করছে যেন লোকটা মিররে না তাকায়। জনশূন্য রাস্তায় মেগানকে সহজেই ধরে ফেলবে লোকটা। সঙ্গে সঙ্গেই সতর্ক হয়ে যাবে সে।

একটা মোড় পার হলো লোকটা। বরফের বিশাল দুটো স্তম্ভের মাঝে মোড়টা। সেটা পার হয়েই দুম করে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলো লোকটা। মেগান আসছিল শ্লথের গতিতে,লোকটা গতি বাড়াতেই খেই হারিয়ে ফেলল প্রথমে। তারপর নিজেও গতি বাড়িয়ে ধাওয়া করলো লোকটাকে।

চল্লিশ পঞ্চাশ ষাট সত্তর… মেগানের পোলারবাইক এখন এবড়োখেবড়ো রাস্তার উপর দিয়ে একশো কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় ছুটছে। পোলারবাইকের পিছন দিয়ে বরফ ছুটছে যেন স্প্রে করছে কেউ! সাঁ সাঁ করে বাতাস ছুটছে, চুল উড়ছে মেগানের, কানে কিছুই শুনছে না সে। শুনলে বুঝতে পারতো গাড়িটা গতি বাড়ানোর সময়েই আরেকটা পোলারবাইক ফলো করছে ওকে।

সেটা এখন ওর ঠিক পিছনে, দশ সেকেন্ডের মধ্যেই চলে এলো ওর পাশে, আর মেগান মাথা ঘুরাতেই বাইকটা এসে লাগলো ওর বাইকের সঙ্গে।

ধাক্কাটা সামলাতে পারলো না মেগান। ছিটকে গেলো বাইক থেকে, বাইকটাও উড়ে গেলো একপাশে।

বরফের উপরে পড়েই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো মেগান, দাঁড়িয়ে গেলো কমব্যাটের ভঙ্গিতে। দেখলো ওর থেকে গজদশেক দূরে বাইক থামিয়েছে আরেক বাইকার। বাম পা-টা নিচে নামানো, দুইহাতে ধরা বাইকের হ্যান্ডেল। হেলমেট পড়েনি। দুইকান জোড়া হাসিটা তাই বোঝা যাচ্ছে।

মার্টিন!

এখন পর্যন্ত পাওয়া মার্টিনের সাতেরটা ছদ্মবেশের একটা ছদ্মবেশের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বাইকারের চেহারা।

কথাটা বোঝার দুই সেকেন্ডের মধ্যেই দৌড় লাগালো মেগান, দৌড়েই ধরবে বাইকারকে।

পাগল নয় মেগান, 100 মিটার স্প্রিন্টের বিশ্বরেকর্ডধারী সে।

বাইক ছুটিয়েছে মার্টিন। রাস্তা ছেড়ে এখানে ওখানে বাইক চালাচ্ছে। বরফের ঢিপি গুলো পার হচ্ছে অনায়াসেই। মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে বড় বড় ঢিপির আড়ালে। মেগান খেই হারিয়ে ফেলছে একটু পর পর। চতুর মার্টিন ক্লান্ত করতে চায় তাকে সেটা মেগান সুপারস্পাই না হলেও বুঝতো।

বিশাল একটা বরফ স্তম্ভের আড়ালে যেতেই দেখলো মার্টিন ছিটকে গেছে বাইক থেকে। কোনোমতে হাচড়ে পাঁচড়ে উঠেই ছুট দিয়েছে সে।

এবারে তো মেগানের পোয়াবারো। দৌড়ে কেউ হারাতে পারবে না তাকে।

ধাওয়া করলো মার্টিনকে, হাতে আগেই বের করে নিয়েছে রিভলবার।

মার্টিন প্রাণভয়ে এঁকেবেঁকে ছুটছে দেখে হেসে ফেলল মেগান। একশো মিটার দূর থেকেও ছয়টা বুলেট একই জায়গায় শ্যুট করতে পারে সে, আর এখান থেকে তো মার্টিন বড়জোর বিশ মিটার দূরে, গুলি করলে মরবেই।

মেগান মারতে চায় না ওকে, অক্ষত অবস্থায় মার্টিনকে চেয়েছে গডসক্লাব। কারণ মার্টিন যে আন্দোলন শুরু করেছে সেটা সে ছাড়া কেউ থামাতে পারবে না। মার্টিনকে মাইন্ড অল্টারিং ড্রাগ দিয়ে পাল্টা ভাষণ দিয়ে কাজে লাগাতে চায় তারা।

হাসতে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড ব্যয় করলো মেগান। ততক্ষণে একটা ইগলুর ভিতরে ঢুকে পড়েছে মার্টিন। মেগানও গিয়ে ঢুকলো সেখানে।

ঢোকার সঙ্গেই পরপর দুবার গুলির আওয়াজ পাওয়া গেল।

এরপরের কাহিনী ইতিহাস। ইগলু থেকে বেরিয়ে মেগান সোজা গিয়ে ঢুকেছে প্রজেক্টের হেডকোয়ার্টারে। তারপর একে একে ডেকেছে তার বাকি এগারো সঙ্গীকে। মার্টিনকে ধরতে বাকিদের সাহায্য চেয়েছে সে। একজন করে এসেছে আর মেগানের হাতে মরেছে। এগারোজনকে মেরে এন্টার্কটিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে মেগান।

বেরিয়ে এসে হয়ে গেছে পরশুরাম। নেমেছে গডসক্লাবের বিরুদ্ধে, সাহায্য করছে টিম মাসীহাকে। একে একে প্রচুর ডাইনোসর মেরেছে মেগান একাই। পৃথিবীর কোণে কোণে ত্রাণ পৌছে দিয়েছে সে। আর গডসক্লাব কোথাও টাইমমেশিন দিয়ে অতীতে যাওয়ার চেষ্টা করলেই বাগড়া দিয়েছে সে। এক মেগান যেন পুরো গডসক্লাবকে থমকে দিয়েছে।

সে বিগড়ে গেল কেন সেটা জানে না গডসক্লাব। সেদিন ইগলুর ভিতরে কী হয়েছিল সেটা ঈশ্বর, মেগান আর মার্টিন ছাড়া আর কেউ জানে না!

 

সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া বলা হয় যেটাকে, সেরকম জন্মই হয়েছিল মনসুর মাহমুদের।

বাবা ছিলেন কলেজের শিক্ষক। বিপুল সম্পত্তি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। অভাব কাকে বলে সেটা বাপ ছেলে কেউই জানতেন না।

মনসুর মাহমুদ ছোটবেলা থেকেই পড়েছেন ভালো স্কুল আর কলেজে। মেধাবী ছিলেন, করতে পারতেন টানা পরিশ্রম। ইন্টারমেডিয়েট পাসের পরে প্রচন্ড পরিশ্রমের জোরে চান্স পেলেন দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফিজিক্স নিয়ে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুর্দান্ত রেজাল্ট। আবেদন করলেন বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। স্কলারশিপ পেলেন সবকয়টা ভার্সিটির।

প্রিয় বিজ্ঞানী ছিলেন আইন্সটাইন। তাই স্কলারশিপ নিলেন আইন্সটাইনের ভার্সিটি বলে খ্যাত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের। তারপর পিএইচডিও শেষ করলেন দ্রুত।

দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন, ফিরলেন না গবেষণার সুযোগ সুবিধার অভাবে।

ততদিনে টাইম ট্রাভেল নিয়ে জোরেশোরে গবেষণা শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে। আমেরিকায় একটু বেশিই।

টাকা কোনো সমস্যাই না। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণা খাতে বিপুল টাকা দিচ্ছে ধনীদের সংগঠন “বিলিয়নিয়রস ক্লাব” (পরবর্তী কালের গডস ক্লাব)।

মনসুর মাহমুদও টাইম ট্রাভেল নিয়ে গবেষণা করা একটা দলের সদস্য। তার পিএইচডির বিষয় ছিল ক্যাসিমির এফেক্ট। সেটায় দক্ষতা তাকে দ্রুতই বানিয়ে দিলো গবেষণা দলের প্রধাণ। তখন তার বয়স পয়তাল্লিশ পেরোয়নি।

তার গবেষণা দল ছিল সবথেকে এগিয়ে। তাই সেখানেই সবথেকে বেশি বিনিয়োগ করেছিল বিলিয়নিয়রস ক্লাব। নিয়মিত তারা খোঁজ রাখতো গবেষণার। বলা ভালো নজরদারি চলতো।

বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন ক্লাবের সদস্যরা।

সেটার প্রেসিডেন্ট লুইস এক্স তো মনসুর মাহমুদকে ভাই বানিয়ে ফেলেছিলেন!

মনসুর মাহমুদ বিয়ে করেছিলেন এক প্রবাসী বাংলাদেশিকে যিনি জন্ম দিয়েছেন মনসুর মাহমুদের থেকেও মেধাবী এক সন্তানের। দূর্ভাগ্য ভদ্রমহিলার, মিহিরের সাফল্য দেখার আগেই মারা গেলেন তিনি।

মিহির মাহমুদ ফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা করলো প্রিন্সটনেই। মাস্টার্স কমপ্লিট করে পিএইচডি শুরু করলো বাপের অধীনেই।

বহু বছর ধরে টাইম মেশিন আবিষ্কারের পথে বিজ্ঞানীদের একমাত্র বাধা ছিলো ক্যাসিমির এফেক্টর তৈরিতে ব্যবহৃত সংকর ধাতু। কিছুতেই সঠিক অনুপাতের সুষম মিশেলের সংকর ধাতু তৈরি করা যাচ্ছিলো না।

প্রচন্ড মেধাবী আর দুর্দান্ত একাডেমিক রেজাল্টের কারণে ওই বিষয়টা নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব পেল মিহির।

দুম করে একদিন বিশ্ব কাপিয়ে কাঙ্ক্ষিত সংকর ধাতু আবিষ্কার করলো সে!

এর মাসছয়েক পরেই মনসুর মাহমুদের গবেষণা দল আবিষ্কার করে দুনিয়ার প্রথম টাইম মেশিন।

টাইম মেশিনের খুটিনাটি সায়েন্স কাউন্সিলে জমা দিলেও দুটো জিনিস মনসুর মাহমুদ দলের অন্য কাউকেই বলেননি। জানতেন কেবল তিনি আর মিহির।

এক, সংকর ধাতুতে বিদ্যমান বিভিন্ন ধাতুর সঠিক পরিমাণের হিসাব।

দুই, ক্যাসিমির এফেক্টর চালু বা বন্ধ করার কোড।

মনসুর মাহমুদ জানতেন টাইম মেশিন অবশ্যই ব্যবাসায়িক কাজে লাগাবে বিলিয়নিয়রস ক্লাব। কাজেই দুটোর একটাও তিনি কাউকে বলেননি।

অবশ্য কোড ফাঁস হয়ে গেছে। তাকে চাপ দিয়ে কোড আদায় করে নিয়েছে গডসক্লাব। মিহির আর তার বন্ধুদের আটকে ফেলেছে অতীতের পৃথিবীতে।

এখন তার কাছে এসেছে সংকর ধাতুর হিসাব চাইতে। তিনি সাফ বলে দিয়েছেন দেবেন না। তিনি মরে গেলেও না, এমনকি প্রাণের সন্তান মিহির মরে গেলেও না। তিনি ভালো করেই জানেন মিহিরও এই বিষয়ে দৃঢ়। বাপ ব্যাটা ভালো করেই জানেন টাইম মেশিনের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে কীরকম সর্বনাশ ঘটতে পারে!

বিলিয়নিরস ক্লাব নাম বদলে গডস ক্লাব নাম ধারণ করেছে। কাজের পদ্ধতিও বদলে গেছে।

জাদরেল বিজ্ঞানী মনসুর মাহমুদ এখন তাদের কয়েদখানায় আটক। দিন গুনছেন মৃত্যুর। ছেলে মিহিরের ফিরে আসার আশা রেখেছেন এখনো। তিনি জানেন সংকর ধাতুর রহস্য জানার জন্যে ওরা মিহিরকে ফিরিয়ে আনতে যাবেই, আর দুনিয়াতে ফিরতে পারলে মিহির যেভাবেই হোক লড়াই করবে ওদের সঙ্গে।

ওদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য একটা দল অবশ্য দাঁড়িয়ে গেছে এরমধ্যেই।

নরম গদীর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে চাইছিলেন মনসুর মাহমুদ। পারলেন না। গরাদ খুলে তার ঘরে ঢুকলেন কেউ।

মনসুর মাহমুদের ঘরটা একজনের জন্য আরামদায়ক। কয়েদ করে রাখলেও তাকে কষ্টে রাখেনি গডস ক্লাব।

নরম গদীর একটা খাট। বিশাল দুটো জানালা।সুন্দর আর পরিষ্কার বাথরুম। ফ্রিজ ভর্তি খাবার। আলমারি ভর্তি দামী কাপড়। টিভি। চমৎকার ইন্টারনেট কানেকশন। তিন তিনটে পত্রিকা। বিলাসী জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট। শুধু ঘরটা থেকে বের হতে পারেন না। সমস্যা বলতে এটাই।

তার ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে নিলেন জন মারফি। বিখ্যাত এই নভোচারীকে ভালো করেই চেনেন মনসুর মাহমুদ। কাজের ক্ষেত্রে চরম পেশাদারি, নিষ্ঠুর তো বটেই।

“কেমন আছেন প্রফেসর?” মৃদু হেসে বললেন মারফি।

“উপহাস করছেন নাকি?” পাল্টা না হেসেই বললেন মনসুর মাহমুদ।

” আহা হা হা! সিরিয়াস হচ্ছেন কেন আপনি? সামনের বছরেই নোবেল প্রাইজ পেতে যাওয়া একজন প্রফেসর কি মজাও বোঝেন না?”

“নোবেল দিয়ে আমাকে খুশি করার দরকার নেই মিস্টার মারফি। আমি আপনাদের সহযোগিতা করছি না।”

“এই দেখুন! আপনি নিজেই দুম করে কাজের কথায় চলে এলেন। হ্যাঁ আমি চরম পেশাদার বটে তবে খানিকটা খোশগল্প না করেই কাজের কথায় যাওয়ার মতো বেরসিক নই আমি।”

“খোশগল্প করলেই কি আর না করলেই কি, আমি আপনাদেরকে সহযোগিতা করছি না।” খানিকটা থেমে মনসুর মাহমুদ আবারও বললেন,” নাকি আপনি ভেবেছেন বাকিদের মতো হুমকির সুরে না বলে খোশগলায় বললে আমি রাজি হব?”

“এই দেখুন কান্ড! এখানে ভাবাভাবির কী হলো? আমার ভাবি নেই। বাপের একমাত্র ছেলে আমি।” বলে নিজেই খুব খানিকটা হাসলেন জন মারফি। মনসুর মাহমুদ হাসলেন না দেখে দেড় মিনিট পর হাসি থামালেন তিনি। খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন, ঘাড় চুলকালেন একবার। তারপর গলা খাকড়ানি দিয়ে বলতে শুরু করলেন।

” দেখুন প্রফেসর, পৃথিবীর মানুষ খুব কঠিন সময় পার করছে এখন। আপনার সহযোগিতাই পারে তাদের বাঁচাতে। এই মুহূর্তে গডস ক্লাব আর আপনি ছাড়া দুনিয়াকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। আমাদের পরস্পরের কাজের মধ্যেই দুনিয়ার কল্যান নিহিত। প্লিজ প্রফেসর, আমাদের সহযোগিতা করুন।” গলায় করুণ সুর আনার চেষ্টা করলেন মারফি।

“তো আপনার মতে সংকর ধাতুর হিসাব আপনাদের হাতে তুলে দেই আমি যাতে আপনারা দুনিয়াকে বাঁচাতে পারেন?”

” জি প্রফেসর এটাই, একদম এটাই।”

“আমাকে বলদ ভেবেছেন আপনি? আপনাদের হিসাব দিয়ে দেই আর আপনারা আরও সর্বনাশ ঘটান পৃথিবীর! বাহ! খাসা প্ল্যান! এরমধ্যেই তো দুনিয়ার মানুষের কাছে আমাকে ভিলেন বানিয়ে দিয়েছেন। আর কত নিচে নামাবেন আমাকে?”

“দেখুন প্রফেসর দুনিয়ার মানুষ জানে আপনাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা আপনাকে বাচিয়ে রেখেছি। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমাদের সহযোগিতা করা উচিত আপনার।”

“আপনাদের সহযোগিতা করলে দুনিয়া বাঁচবে; এই কথাটা বোঝাতে আসবেন না আমাকে। আপনাদের মতো করপোরেট পাগলদের চিনি আমি।”

“লুইস যে আপনার উপর এখনো অত্যাচার করেনি সেটা আপনার সম্মানে। এমনকি ট্রুথ সেরামও প্রয়োগ করেনি স্রেফ আপনাকে সম্মান করে বলে। আপনাকে বাচিয়ে রেখেছে কারণ আপনার মেধা থেকে পৃথিবীকে বঞ্চিত করতে চায় না সে।”

কথা বললেন না মনসুর মাহমুদ। মুখ খুলে জিহ্বা তুলে দেখালেন কী যেন। সেটা দেখে মুখটা পান্ডুর মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

“হাইড্রোজেন সায়ানাইডের অ্যাম্পুল। পটাশিয়াম সায়ানাইডের থেকে আড়াই লক্ষ গুণ বেশি বিষাক্ত। দাতের নিচে ফেলে চাপ দিয়ে ভেঙ্গে ফেললে অ্যাম্পুল থেকে সবটুকু বিষ বের হতে যতক্ষণ লাগবে তার আগেই মরে যাব আমি। এতটাই ভয়ংকর এই বিষ।

মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুত আমি, টর্চার শুরুর আগেই মরে যাব আমি। আর আমাকে মৃত্যু ভয় দেখাস তুই? আমি খুব ভালো করেই জানি ঠিক কারণে আমাকে বাচিয়ে রেখেছিস তোরা। এখন ভাগ আমার ঘর থেকে।” বলেই বিছানায় শুয়ে পড়লেন মনসুর মাহমুদ।

বেশ অপমানিত বোধ করলেন জন মারফি। খানিকক্ষণ মনসুর মাহমুদের দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো কথা না বলে গটগট করে হেটে বেরিয়ে গেলেন তিনি। সোজা লুইস এক্সের ঘরে গিয়ে বললেন,

” তোমাকে একটা কাজ করতে হবে!”

 

দুই বছর হয়ে দুইদিন পার হলো। মিহির আর তার বন্ধুরা আটকে আছে আদিম পৃথিবীতে।

দিন যায়, রাত আসে। আদিম পৃথিবীর একেকটা আদি প্রাণের কারও হয়তো জীবনের বিকাশ শুরু হয়, কারও বা বিবর্তনের একটা পার হয়, কেউবা সম্পন্ন করে বিবর্তন।

প্রতিদিন সকালে মাছ ধরতে বা ফল আনতে বের হয় মিহির বা জিমি। ওগুলো দিয়ে ভরপেট নাস্তা করে একসঙ্গে ওরা বের হয় শিকার করতে।

প্রায় প্রতিদিনই ডাইনোসর দেখে ওরা। একটা বা দুটো। সঙ্গে সঙ্গেই লুকিয়ে পড়ে ওরা। কোনোদিন হয়তো একটা ব্রাকিওসরাস এসে ওদের সামনেই আস্ত একটা গাছ শেষ করে খেয়ে। হয়তো একটা টি রেক্স এসে আক্রমণ করে বসে ব্রাকিওসরাসটাকে। হয়তো আরেকদিন আর্কিওপটেরিক্স উড়ে এসে ধরে নিয়ে যায় ওরা যেই পিক্যারিটক মারতে চেয়েছিল সেটাকেই!

একই মাছ আর ফল খেতে খেতে ওদের মুখের রুচি শেষ হয়ে যায়।

আদি প্রাণের বিবর্তন শেষ হয়।

বিজ্ঞানীদলের গবেষণা মতে ওই এলাকার আশেপাশে খুব বেশি ডাইনোসর থাকার কথা নয়। তবে টাইমহোল দিয়ে হাজার হাজার ডাইনোসর কী করে প্রবেশ করলো পৃথিবীতে; মিহিরের এই ভাবনাও একদিন শেষ হয়।

কিন্তু দুনিয়াতে ফেরার জন্য ওদের অপেক্ষা শেষ হয় না।

মিহির বাদে বাকি সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছে ফিরে যাওয়ার, এমনকি মিহির আশা দেখানোর পরেও!

কট্টর আশাবাদী জিমিও আশা ছেড়ে দিয়েছে। মেয়েগুলো আবারও প্রতি রাতেই কাঁদে। এরমধ্যেই একদিন এলি সুইসাইড করতে গেছিলো। জিমি হুমকি দিয়েছে, এলি সুইসাইড করলে সেও করবে। তারপর থেকে বেচারি শান্ত। চুপচাপ কাঁদে শুধু।

জিমি নিজেও লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। সেদিন মিহির ওকে বলেছিল কেন তারা আসবে ওদের ফিরিয়ে নিতে।

“বাবা ওদের কাছে সবটাই ব্যখা করেছিলেন, শুধু একটা বাদে।

ক্যাসিমির এফেক্টর তৈরিতে বিশেষ একটা সংকর ধাতু প্রয়োজন হয়। উপাদানে একটু গরমিল হলেই আর কাজ করবে না।

এখানেই বাজিমাত করেছিলাম আমি। আমিই উদ্ভাবন করেছিলাম ওই সংকর ধাতু। যার ফলে ক্যাসিমির এফেক্টর ঠিকঠাক কাজ করতে পারে।

বাবা পুরো মেকানিজম ওদের কাছে খোলাসা করলেও সংকর ধাতুর উপাদানে গোজামিল দিয়েছেন। এটা খালি চোখে ওদের বোঝার কথা নয়। ওরা তখনি এটা বুঝতে পারবে যখন ওই সংকর ধাতু উৎপাদন করতে যাবে।

বাবা কখনোই চাননি গডস ক্লাব একের পর এক টাইম মেশিন আবিষ্কার করুক কিংবা টাইম মেশিন নিয়ে অস্ত্রের মতো বাণিজ্য করুক। তাই বাবা ওদেরকে সংকর ধাতুর সঠিক হিসাব দেননি।

আমি নিশ্চিত ওরা টাইম মেশিন বানাতে গিয়ে আটকে গেছে। তাই আমাদেরকে আদিম দুনিয়াতে পাঠিয়ে, আটকে রেখে বাবার কাছে মুক্তিপণ হিসেবে চাইবে সঠিক হিসাব। কিন্তু আমি নিশ্চিত বাবা মরে গেলেও ওই হিসাব দেবেন না।”

“কিন্তু ওটা না দিলে তো আমরা চিরকাল আটকে থাকবো এখানে!” ব্যাকুল হয়ে বলেছিল জিমি।

“আরে পাগল! বাবা ওদের হিসাব দিলেও আমরা আটকে থাকবো এখানে। ওরা কখনোই চাইবে না যে আমি ফিরে আসি পৃথিবীতে।” মিহির বলল।

“তবে তুই যে বললি ওরা ফেরত আসবে?”

“হুঁ, বলেছি। কারণ সঠিক হিসাবের জন্য হলেও আমাকে দরকার ওদের।”

“হিসাব নিয়েই তো মেরে ফেলবে তোকে!”

“না চাঁদু। অত সহজে নয়। আমি ওদের হিসাব কখনোই দেব না। হ্যাঁ ওদের সংকর ধাতু উৎপাদন করে দেব কিন্তু সঠিক হিসাব কখনোই দেব না। এটাই হবে আমার লাইফ ইনশিওরেন্স।” বলেছিল মিহির।

কথাগুলো শুনে কয়েকদিন দারুণ উত্তেজিত ছিল জিমি। এক ফাঁকে সে মেয়ে দুটোকেও বলেছে ফিরে যাওয়ার কথা। কয়েকদিন, কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস পেরিয়ে দুই বছর হয়ে গেলো। কিন্তু কেউ আসে না। মেয়েদুটোও আর ফিরে যাওয়ার আশা দেখে না। জিমিও না। আত্নীয় স্বজনহীন অবস্থায় মরে যাওয়ার আশায় দিন গুনছে তারা।

দুপুরে কেবল লাঞ্চের এন্তেজাম করেছে মিহির গ্যাং, ঠিক তখনই মিহির শুনতে পেল পরিচিত একটা যান্ত্রিক শব্দ। শব্দটা মৃদু, কিন্তু মিহিরের শিকারী কান ঠিকই বুঝে গেল যে ওটা টাইমহোলটা খোলার শব্দ।

সঙ্গে সঙ্গেই বাকিদের নিয়ে দৌড় লাগালো মিহির। আড়াই কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা এক দৌড়ে শেষ করলো ওরা। এর মাঝেই অবশ্য অসংখ্যবার হোচঁট খেয়ে পড়ে গেছে ওরা, হাত পা কেটে গেছে কিন্তু দৌড় থামায়নি!

উদ্দেশ্যহীন দৌড় নয়। মিহির খুব ভালো করেই জানতো কোথায় আসবে তারা। ঠিক আগেরবার ওরা যেখানে টাইমহোল খুলেছিল, ঠিক সেখানেই খুলবে আবারও।

মিহিররা থামলো পাহাড়ের উপরে। নিচের সবুজ প্রান্তরটায় নামলো না। পাহাড়ে দাঁড়িয়েই দেখছে টাইমহোলটা খুলছে।

সবুজ আলোর একটা চতুর্ভুজ তৈরি হলো প্রথমে। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলো ওটা। প্রথমেগেলবারের সমান হলেও বড় হতে হতে প্রকাণ্ড আকার ধারণ করলো টাইমহোলটা। দিনের প্রখর আলোতেও সবুজ আলোর সীমানা দেখা যাচ্ছে।

একটার পর একটা গাড়ি ঢুকছে টাইমহোল দিয়ে। সঙ্গে মিলিটারি কনভয়। সাজোয়া যান, পার্সোনাল আর্মি ট্যাংক, এমনকি মিসাইল বহনকারী গাড়ি। যেন ডাইনোসর আসলে মিসাইল মেরে কাবু করা যায়।

দুটো গাড়ি এসে থামলো পাহাড়ের নিচে। একটা থেকে একদল সৈন্য নেমে দুই সারিতে দাঁড়িয়ে গেলো। তাদের হাতে লেজার গান। মিহির চেনে ওগুলো। ব্যবহারও করেছে কয়েকবার।

অপর গাড়িটা থেকে নামলেন লুইস এক্স, গডস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, যার নামের বাকি অংশ কেউ জানে না।

লোকটার পরণে হাফহাতা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। হাতে একটা আপেল। ওটায় কামড় দিচ্ছেন আর কথা বলছেন। মিহিররা ততক্ষণে নিচে নেমেছে।

“জেন্টেলমেন! হোয়াই আর উই হিয়ার? উই আর হিয়ার ইন দ্য নেম অফ দ্য আর্থ। মাই ডিয়ার মিহির, দুনিয়ার সত্যিই তোমাকে প্রয়োজন। ডাইনোসর ঢুকে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য করে ফেলেছে। আরেক দুনিয়ায় চলে যাব আমরা। তোমার সাহায্য দরকার আমার। করবে না?”

“অবশ্যই করবো আংকেল। চলুন যাওয়া যাক। অনেকদিন বর্তমান পৃথিবীর খাবার খাইনি। আছে তো সঙ্গে নাকি?” বলল মিহির। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে উঠে পড়লো গাড়িতে।

অনেক কথা জানবার আছে, অনেক প্রশ্ন আছে, অনেক কৈফিয়ত চাওয়ার আছে। কিন্তু মিহির আগে দুনিয়াতে ফিরতে চায়।

একে একে সবকয়টা গাড়ি পার হলো টাইমহোল দিয়ে, চলে আসলো বর্তমানে। এই মুহূর্তে ওরা আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স এইরেসে।

শহরটায় কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। সবকয়টা বিল্ডিংয়ের কাঠামো মাটির সঙ্গে মিশে আছে যেন। অবশ্য নজর প্রসারিত করলে কয়েকটা মাত্র বিল্ডিং অক্ষত অবস্থায় দেখতে পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অত দেখার সময় নেই মিহিরের।

ভাঙা বিল্ডিংয়ের নিচেই এখানে সেখানে তাবু টাঙিয়ে বাস করছে মানুষ। গাড়ির বহর দেখতে পেয়ে হুড়মুড় করে ভাঙ্গা বিল্ডিংয়ের নিচে চলে গেলো রাস্তায় থাকা কয়েকজন মানুষ। উৎসুক কিছু মানুষ উঁকি দিয়ে দেখলো কারা যাচ্ছে।

এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটা মেরামত করে নিয়েছেন লুইস। নয়তো তাদের বহর সাঁ সাঁ করে দেড় দুইশো কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারতো না।

“অত তাড়া কিসের আংকেল! বাপের দান করা প্রাণটা রাস্তাতেই হারাতে চাই না আমি।” মিহির বলেই ফেলল।

“তুমি ওই শয়তানগুলো সম্পর্কে জানো না মিহির। ভয়ংকর বিচ্ছু ওরা। যেকোনো সময় হামলা করে বসবে। দ্রুত ভাগতে চাই আমি।”

“কী বলছেন আংকেল! আপনি না দুনিয়ার ঈশ্বর! আপনাকেও চ্যালেঞ্জ করে তারা? কারা ওরা?”

“জানবে সব জানবে। আগে প্লেনে উঠি। সেখানে তোমাদের জন্য গরম খাবার আছে। খাস বাংলাদেশ থেকে শেফ আনিয়েছি তোমার প্রিয় কাচ্চি বিরিয়ানি পাকাতে।” চোখ টিপে তোষামুদে গলায় বললেন লুইস।

“হুঁ। তো কোথায় যাচ্ছি এখন?”

লুইস উত্তর দেয়ার সময় পেলেন না। গোলমালের শব্দে চুপ করে গেলেন। কাউকে জিজ্ঞাসাও করলেন না যে কী কারণে থেমে গেছে বহরের গাড়িগুলো।

হামলা হয়েছে তাদের বহরে! মিহির ভেবে পেল না এত সাহস কাদের! এরকম হাইলি ডেকোরেটেড একটা মিলিটারি বহরে হামলা করা যা তা কথা নয়!

আর মাত্র শ দুয়েক মিটার পার হলেই এয়ারপোর্টে ঢুকতে পারতো বহরটা। পারল না।

ধ্বসে যাওয়া বিল্ডিংয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আততায়ীরা হামলা করেছে বহর লক্ষ্য করে। তাদের হাতে পুরোনো দিনের সিসার বুলেটের কার্যকর অস্ত্র। লেজার গান নয়।

রাস্তায় বিক্ষোভের সময়ে উত্তেজিত জনতা যেভাবে ইট পাটকেল ছোড়ে, ওভাবেই উড়ে আসছে গোলা আর গ্রেনেড।

একটার পর একটা গোলার আঘাতে উড়ে যেতে লাগলো গাড়ি গুলো। আরপিজি দেগেছে অজ্ঞাত শত্রু। রকেট প্রপেল্ড গ্রেনেড লঞ্চারগুলো থেকে গ্রেনেড বেরিয়ে গাড়িগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। এই মাত্র দুটো পারসোনাল আর্মি ট্যাংক উড়ে গেলো। কোথায় থেকে হামলা হচ্ছে সেটা বুঝতেই পারছে না লুইসের সৈন্যরা।

ততক্ষণে সাজোয়া যান থেকে তারা বেরিয়ে এসে লুইসের গাড়িটার চারপাশে সার বেধে দাঁড়িয়ে গেলো। সাঁজোয়া যান গুলো আড়াল করে রেখেছে গাড়িটাকে। গাড়িটায় মিহিরের দলবল আর লুইস নিজে। যানগুলোর ফাঁকে ফাঁকে পজিশন নিলো সৈন্যরা।

দুম করে শুরু হওয়া হামলার মতো দুম করেই থেমে গেলো রকেট হামলা। ময়দানে এখন পিনপতন নীরবতা।কেউ কথা বলা দূরে থাক, নিশ্বাসও নিচ্ছে না জোরে।

একটু পর মোটরসাইকেলের আওয়াজ পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গেই লুইস  গাল দিলেন। “আবার এসেছে বান্দির বাচ্চা!”

“কে এসেছে আংকেল? আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন?” মিহির বলল।

“মেগান স্টারলিং। ভয়ংকর বিচ্ছু। বেঁচে থাকলে ওর অ্যাকশন অনেক দেখতে পারবে। আগে বাঁচি এই যাত্রায়!”

দুম করে হামলা থেমে যাওয়ার মতো দুম করে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। তাতে সাঁজোয়া যানের মেশিনগানাররাই ঘায়েল হলো আগে। ভয়ে গুটিশুটি মেরে চুপ করে থাকলো বাকি সৈন্যরা। পুরোনো দিনের রাইফেল দিয়ে ফায়ার করছে আততায়ী। কেউ জায়গা থেকে নড়লো না। কারণ তারা জানে একটু পর কী হতে যাচ্ছে।

মাথার উপর দিয়ে উড়ে এসে সাঁজোয়া যানের বলয়ের ভিতরে পড়লো একঝাক স্মোক গ্রেনেড! সঙ্গে সঙ্গেই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো পুরো জায়গাটা।

“যিশু মেরি আর যোসেফ! বাঁচাও আমাদের!” প্রমাদ গুনলেন লুইস।”

তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই যেন আকাশ ভেঙে পড়ল সাঁজোয়া যানের বলয়ের ভিতরে।

দৌড়ে এসে একটা সাজোয়া যানের উপরে উঠলো মেগান, ঢুকে পড়লো বলয়ের ভিতরে। হাতে একটা আর্মি নাইফ।

ক্ষিপ্রগতিতে নাইফ চালাচ্ছে মেগান। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকা সৈন্যরা প্রথমে দেখতে পাচ্ছে না মেগানকে, আর কাছে চলে আসায় যখন দেখছে তখন মেগানের ছুরি তাদের গলা এঁফোড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে!

দুম করে ধোঁয়া কেটে গেল। নাহ, এমনি এমনি কেটে যায়নি। মেগানের অ্যাকশনের সঙ্গে পরিচিত লুইসের সৈন্যরা। তাদের মধ্যে কেউ একজন ফ্যান চালু করে দিয়েছে, তাতেই ধোঁয়া কেটে গিয়ে ছুরি হাতে মেগানকে দেখা যাচ্ছে পরিষ্কারভাবে।

দুই মিনিটের ঝড়ে একডজন সৈন্যের অর্ধেক সাবাড়। বাকিদের লড়াইয়ের মানসিকতা নেই। ওরা জানে লড়াই বিফলে যাবে।

ওকে দেখেও রাইফেল তাক করার সুযোগ পাচ্ছে না সৈন্যরা। একজন তাক করেছিল, তার দিকে আর্মি নাইফটা ছুড়ে দিয়েছে মেগান। বামপাশ থেকে ঘুষি বাগিয়ে দৌড়ে এসেছিল একজন, তার মুখে কষে একটা ঘুষি মেরে, ডানের জনের পেটে বিরাশি সিক্কার একটা লাথি মারলো সে।

রাইফেল পড়ে গেছে দুজনের হাত থেকেই। একটা কুড়িয়ে নিয়ে তলোয়ারের মতো কোপ বসাতে লাগলো মেগান।

দেড় মিনিটের মধ্যেই সবাই মাটিতে। ওঠার চেষ্টা করছিলো কেউ কেউ। তার আগেই বোমা ফাটলো যেন!

“হ্যান্ডস আপ এভরিবডি।” মেগানের দলের লোকেরা ঘিরে ফেলেছে পুরো এলাকা।

মেগান সোজা গিয়ে লুইসের গাড়ির দরজা খুলল। বেরিয়ে আসতে বলল সবাইকে। মিহির বেরিয়ে আসতেই হাত বাড়িয়ে দিলো মেগান,”হ্যাল্লো মিহির। আমি মেগান। নাম তো শুনেছোই!”

“একটু আগেই লুইস আংকেল বললেন তোমার কথা। কী খেল দেখালে মাইরি! অনেকদিন অ্যাকশন মুভি দেখি না। দেখানোর জন্য ধন্যবাদ। ” মিহির বলল খোশ মেজাজে।

“হা হা ওয়েলকাম। এবারে তোমাকেও অ্যাকশন মুভিতে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে চাঁদু।” বলেই মিহিরের তলপেটে একটা পিস্তল তাক করলো মেগান। কাউকে কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলো মিহিরকে। ওর বন্ধুরা করুণ চোখে শুধু ওর চলে যাওয়াই দেখতে পেল।

চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলা হলো মিহিরকে। হাতদুটো খোলা, পাশে বসেছে মেগান।

সোজা রাস্তায় দুদ্দার গতিতে চলল গাড়িগুলো। রাস্তার বাকগুলোতেও গতি কমালো না ড্রাইভার। যেন খুব তাড়া আছে!

গাড়ি থেকে নামার পর চোখ খুলে দেয়া হলো। মাঝের যাত্রার সময়টায় মিহিরের মনে হলো খুব এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে তুমুল বেগে গাড়ি ছোটানো হয়েছিল।

একটা ভাঙা বিল্ডিংয়ের আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হলো মিহিরকে। বিল্ডিংয়ের সামনে কিছুই নেই, বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ বিল্ডিং। কিন্তু কেউ উকি দিলেই বুঝবে মেশিনগানের নল উকি মারছে তার দিকেও।

আন্ডারগ্রাউন্ডে ঢুকে মিহির অবাক।

ভেবে পেল না ভাঙা ধ্বসে যাওয়া একটা বিল্ডিংয়ের নিচে এমন সুসজ্জিত অত্যাধুনিক স্থাপনা কী করে হলো!

মিহিরের সামনের ঘরটায় অসংখ্য মানুষ, সকলেই সশস্ত্র। প্রচুর কাঠের বাক্স, আর্মার্ড কার আর সাজোয়া যান দেখতে পেল সে। এগুলো ওখানে ঢুকলো কী করে আর বের হয় কী করে ভেবে পেল না সে।

এর মাঝেই ডেস্ক বসিয়ে কম্পিউটারে কাজ করছে মানুষ। চারপাশের দেয়ালে বসানো স্ক্রিনে ভেসে যাচ্ছে হাজার হাজার তথ্য। ওগুলোর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝলো না মিহির।

একটা অটোমেটিক দরজা পার হয়ে আরেকটা ঘরে ঢুকলো ওরা। এখানেও সশস্ত্র প্রহরা দেখতে পেল মিহির, তবে সংখ্যায় কম।

ঘরটার একপাশের দেয়ালে সারি সারি রাইফেল পিস্তল সাজিয়ে রাখা। নিচের দিকটায় অসংখ্য ড্রয়ার। সম্ভবত বুলেট আর গ্রেনেডের বিশাল মজুদ আছে পুরো ঘরটা জুড়ে। রাইফেলের অপর পাশের দেয়ালে লেজারপ্রুফ ভেস্ট, হেলমেট সাজিয়ে রাখা। এই ঘরটাও পেরিয়ে গেলো ওরা।

“এটা তোমাদের হেডকোয়ার্টার নাকি?” মিহির জিজ্ঞাসা করলো।

“আমাদের কোনো হেডকোয়ার্টার নেই। আমি যখন যেখানে থাকি সেটাই আমাদের হেডকোয়ার্টার।” বলল মেগান।

“তারমানে এমন সুসজ্জিত ঘাঁটি আরও আছে তোমাদের?” অবাক হয়ে বলল মিহির।

“হ্যাঁ। এখানে তোমাকে বেশ কয়েকদিন থাকতে হবে। আমাদের সম্পর্কে তোমাকে সব জানাব প্রিয় মিহির।” বলল মেগান।

ঘরটা থেকে বেরিয়ে একটা সুসজ্জিত অফিস পেরিয়ে মিহিররা যেখানে এসে থামলো সেটা দেখে ভয়ংকর হতাশ হয়ে গেলো মিহির।

ওর সামনে গরাদ। সত্যিকারের জেলখানা যেমন হয় সেরকম অসংখ্য সেল পুরোটা জায়গা জুড়ে। এক জেলখানা থেকে বেরিয়ে আরেক জেলখানায় ঢুকলো মিহির।

সেদিনই রাত ঠিক তিনটায় ওর জেলখানার সামনে এলো মেগান। একা। তালা খুলে ঢুকে পড়লো ভিতরে। মিহির জেগেই ছিল। মেগান বসলো ওর ঠিক পাশেই।

মিহিরকে মামাবাড়ি নিয়ে যাবার কথা বলে প্রথমে কয়েদখানা তারপর আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বের করে নিয়ে আসলো দুইজন ষন্ডামার্কা লোক। মিহির অবশ্য জানে কোথায় যাবে, তবুও শান্ত হয়ে ছিল। একবারও পালানোর চেষ্টা করলো না।

একটা আর্মাড কার দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। সামনের সিটের দরজা খুলে মেগান দাঁড়িয়ে আছে। ইশারা করলো গাড়িতে উঠতে।

লোক দুটো মিহিরকে গাড়িতে তুলে দিলো, পিছনের সিটে। ওর হাতে হাতকড়া নেই। মেগান উঠে বসলো গাড়িতে। আশেপাশে সামনে পিছনে তাকিয়ে মিহির বুঝলো যাত্রী ওরাই দুজন।

শান্ত ধীর স্থির হয়ে বসে রইলো মিহির। জানে কোথায় যাবে। তবুও ওর মধ্যে কোনো উত্তেজনা নেই। যদিও বুকে ঝড় চলছে।

সামনে তাকিয়ে দেখলো আস্তে আস্তে গতি বাড়াচ্ছে মেগান। এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে ঝাকি তুলতে তুলতে এগোচ্ছে গাড়ি। রাস্তার দুইপাশের ভাঙ্গাচোরা বিল্ডিংগুলোর দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে বুঝলো কংক্রিটের ভাঙ্গা খন্ডের আড়ালে লুকিয়ে আছে মেশিনগানের নল।

আরও দেখলো গাড়ি চালাতে চালাতেই বার বার পিছনে ওরদিকে তাকাচ্ছে মেগান। এবারে মুখ খুলল।

“তুমি বড্ড বেরসিক হে!”

“আমি আবার কী করলাম?”

“কোনো উত্তেজনা নেই তোমার মধ্যে! কোনো কথা বলছো না কেন?”

“যেখানে নিয়ে যাচ্ছো সেখানেও তো বন্দিই থাকতে হবে। আর বেফালতু কথা বলি না আমি। কাজের কথা বলি, দরকারি আর গুরুত্বপূর্ণ। “

“তোমার ভালোর জন্যই নিয়ে যাচ্ছি হে। আমাকেও পালিয়ে বেড়াতে হয়। আজ এখানে কাল ওখানে। যাকগে, প্রেম করো?”

“করি?”

“তারমানে তুমি যে বাজে কথা বলো না এটা একদম সত্যি নয়।”

“প্রেম করলেই মানুষ বাজে কথা বলে এটা কে বলেছে?”

“প্রেম কাজটাই অকাজের। সেই কাজের কথাও অকাজেরই হবেই!” হাসছে মেগান

“তুমি প্রেম করো?”

“করতাম!”

“তারপর কী হলো?”

“মরে গেলো। কাজেই তোমারও এখানে থাকা ঠিক নয় মিহির। মরতে পারো তুমিও। যেকোনো সময়!”

“বুঝলাম। কতদূর যাচ্ছি?”

“জানি না। মার্টিন ছাড়া কেউ জানে না।”

“তবে সারাজীবন এভাবেই চলবে নাকি?”

“নাহ। মার্টিন একটা নির্দিষ্ট লোকেশন দিয়েছে আমাকে। সেখানে গেলে আরেকটা লোকেশন দেবে। এভাবে কয়েক ধাপে আসল জায়গায় যাবো।”

“বুঝলুম।” বলল মিহির। “আচ্ছা আমার হাত খুলে রেখেছো কেন? পালাই যদি?”

“পালিয়ে দেখাও। পায়ে হেঁটে যাবে কতদূর?” অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল মেগান।

“অহ তাই তো!” বলল মিহির

ওর দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। দেখলো কালো রংয়ের চারটে গাড়ি আসছে সামনে থেকে। বাতাসের প্রতিসরণে ওগুলোর অবয়ব কাপছে একটু একটু করে।

রাস্তাটা সোজা চলে গেছে অনেকদূর। গাড়িগুলোকে মনে হচ্ছে স্থির হয়ে আছে।

তারপর দুম করে বোধহয় গতি বাড়লো গাড়ি চারটের। সহসাই এগিয়ে আসতে লাগলো ওগুলো। কাছে আসলো জলদিই। সবার সামনের গাড়িটা চিনতে পারলো মিহির। লুইস এক্সের।

আর ঠিক তখনই হামলা হলো পিছন দিক থেকে। হামলা হলো এমন জায়গায় এসে, যেখানে মেগানের লোকেরা আর সাহায্য করতে পারবে না তাকে।

বিশাল সাইজের একটা ট্যাঙ্ক পিছন থেকে ধাক্কা মেরেছে ওদের আর্মাড কারটাকে, তাতে কেতরে একদিকে চলে গেল গাড়িটা।

ধাক্কা সামলে গতি বাড়াল মেগান, গতি বাড়াল ট্যাঙ্কটাও। আবার ধাক্কা দিলো গাড়িটাকে।

এবারে এক্সেলেটর মেঝেতে দাবিয়ে ধরলো মেগান, পিছনের ট্যাঙ্কটা থেকে বাঁচতে হবে আগে। সামনের গাড়িগুলোকে পরোয়া করছে না সে।

পিছন থেকে আবার হামলা হলো। ট্যাঙ্কে লাগানো পুরোনো দিনের 7.62 মিলিমিটারের মেশিনগান দিয়ে ফায়ার করছে ঘাতকদল। গাড়িটা আর্মার্ড হলেও বুলেট-বৃষ্টির মধ্যে আর্মার কতক্ষণ টিকে থাকবে সেটা এক প্রশ্ন বটে। তাছাড়া টায়ার ফেসে গেলে সব শেষ। গতি বাড়িয়ে গাড়িটাকে তাই একে বেকে চালাচ্ছে মেগান।

দুইপাশে তাকালো সে। বিল্ডিংয়ের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই নেই। মানে রাস্তার পাশে গাড়ি নামিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুই কিলো দূরে একটা গলি আছে, যেটায় ট্যাঙ্ক ঢুকবে না,মেগানের ইচ্ছা সেখানে যাওয়ার। তবে আপাতত যা করার সামনেই করতে হবে।

দুম করে বুলেট-বৃষ্টি শুরু হয়ে দুম করেই থেমে গেলো।

এক্সেলেরেটর দাবিয়ে রাখায় বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে ওরা। সামনের চারটে গাড়ির সঙ্গে দূরত্ব এখন দশ মিটার। এক্সেলেরেটর দাবিয়ে রেখে, স্টিয়ারিং হুইল শক্ত করে ধরে দাতে দাত চেপে সিটে বসে থাকলো মেগান। গাড়ি গুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ হলো বলে! আর মাত্র দুই মিটার বাকি। তারপর যেকোনো একটা গাড়ি উড়ে যাবে!

উড়লো না। শেষ পর্যন্ত মেগানকে সাইড দিলো লুইস এক্সের গাড়িটা! সংঘর্ষ এড়ালো তারাও।

হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে পারলো না মেগান। পিছনের ট্যাঙ্ক পিছু ছাড়েনি।

মিররে আগেই একটা চোখ রেখেছিল সে। অনুমানে করেছিল কী হতে পারে। শক্ত হাতে ধরা স্টিয়ারিংটা মোচড় দিলো বামপাশে!

পিছন থেকে পুরোনো দিনের রকেট প্রপেল্ড গ্রেনেড, সংক্ষেপে আরপিজি দেগেছে ঘাতকদল। সময়মতো বামপাশে গাড়ি ঘুরানোয় বেঁচে গেলো ওদের গাড়িটা।

মেগান জানে একটার পর একটা গোলা এখন আসতেই থাকবে। মিরর থেকে তাই চোখ সরালো না।

বামে চেপে যাওয়া গাড়িটা সোজা করতেই পিছন থেকে আরেকটা গোলা আসলো। ডানে চাপলো মেগান, সাঁই করে গোলাটা চলে গেলো সামনে।

একবার ডানে আরেকবার বামে চাপছে মেগান, মিহিরও গাড়ির সঙ্গে একবার বাম, আরেকবার ডানে চলে যাচ্ছে। যেন ঝালমুড়িওয়ালার মুড়ি মাখানোর কৌটায় ঢুকে পড়েছে সে! বেচারা সিটবেল্ট বাধার সুযোগ পায়নি।

এবারে ঘোড়ার চাল চালল ঘাতকদল। তিনটে গোলা মেরেছে একসঙ্গে। ঠিক গাড়ির মাঝ বরাবর একটা, আর ডানে বাঁয়ে একটা করে। যেকোনো একদিকে গাড়ি ঘুরালেই যেন গোলা আঘাত করে মেগানের গাড়িকে! বাঁচার রাস্তা বন্ধ?

দুম করে ব্রেক কষলো মেগান! যে সে ব্রেক কষা নয়, একদম মরিয়া হয়ে কষেছে! গাড়ির সামনের দিকটা হঠাৎ থেমে যাওয়ায় পিছনের দিকটা উপরে উঠে এলো। গতি জড়তার কারণে মিহির ধুপ করে সামনের সিটের সঙ্গে ধাক্কা খেল!

আর গোলা তিনটা গাড়িটার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়লো রাস্তায়। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ এবড়োখেবড়ো রাস্তাটা আরও বেহাল বানিয়ে দিলো!

গোলা মাটিতে পড়তেই যতক্ষণ, আর তারপরেই ব্রেক ছেড়ে এক্সেলেরেটর মেঝে অবদি আবারও দাবিয়ে ধরলো মেগান। দুম করে গাড়ির গতি গেল বেড়ে, মিহির এবারে ধাক্কা খেলো পিছনে, স্থিতি জড়তার কারণে!

এবারে একটার পর একটা গোলা আসছেই প্রতি সেকেন্ডে। একসঙ্গে কয়েকজন গোলা ছুড়তে শুরু করেছে সম্ভবত।

সমানে ডানে বায়ে গাড়ি চাপাচ্ছে মেগান, তার আগেই সিটবেল্ট কোনোরকমে বেধে নিয়েছে মিহির। খেয়াল করলো গোলাগুলো যাচ্ছে সব মাথার উপর দিয়ে, পড়ছে রাস্তায়। গাড়ির ঠিক সামনে নয়, বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে পড়ছে। গোলায় ক্ষত হয়ে যাওয়া রাস্তা এড়িয়ে চলতে গিয়ে গতি কমাতে হচ্ছে মেগানকে।

“হে হে। নিশানা ভুল করছে পাগলের দল। একটাও যদি লাগাতে পারে! তোমার গতির কাছে খেই হারিয়েছে ওরা। শাব্বাস মেগান!” হাততালি দিয়ে বলল মিহির।

কথাটার জবাব দিলো না মেগান। সে ভালো করেই জানে ইচ্ছা করেই নিশানা ভুল করছে ওরা। আরপিজি মেরে রাস্তা ক্ষতবিক্ষত করে মেগানের গতি আটকে দিতে চায় ওরা। সামনের গলিতে যে সে ঢুকতে চায় সেটা ঘাতকদলও জানে সম্ভবত।

হঠাৎ ফুয়েল ইন্ডিকেটরে চোখ গেলো মেগানের! আর সামান্যই আছে জ্বালানি। মার্টিনের দেয়া লোকেশনে গেলে নতুন ফুয়েল পাওয়া যাবে! কিন্তু সেই লোকেশন বেশ আগেই ছেড়ে এসেছে সে! গাড়ি থেমে গেলেই বিপদ। সঙ্গে মিহির না থাকলে একাই ট্যাঙ্কের মোকাবিলা করতো সে। কিন্তু তাতে মিহিরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে ওরা!

নতুন ফুয়েল পাওয়া যাবে আরও এক জায়গায়। যেই গলিতে যাচ্ছে সেখানে! কিন্তু ঘাতকদল সম্ভবত ওকে ঢুকতে দেবে না। সামনে থেকে আরও একটা ট্যাঙ্কের উদয় হলো হঠাৎ!

ট্যাঙ্কের উদ্দেশ্য সহজ। গলির মুখটায় এসে দাঁড়াবে। ব্যস! মেগান আর ঢুকতে পারবে না গলিতে। বাধ্য হয়ে ওকে তখন বের হতে হবে গাড়ি থেকে আর ওরা খপ করে ধরে নিয়ে যাবে মিহিরকে।

এবারে নতুন বিপদ হাজির হলো। মেগানের দুরন্ত গতির সঙ্গে পেরে উঠছিল না ভারী ট্যাঙ্কটা। এবারে লেজুড় লাগিয়েছে তাই। একটা সুপারকার ধাওয়া করছিল মেগানকে। এইমাত্র সেটা চলে আসলো মেগানের গাড়ির বাম পাশে। উদ্দেশ্য, সামনে চলে গিয়ে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে গিয়ে মেগানকে থামতে বাধ্য করা বা মেগান যেন গাড়িটাকে ধাক্কা দিতে বাধ্য হয় এবং তাতে যেন মেগানের গতি একেবারে কমে আসে, সেটা নিশ্চিত করা।

সুপারম্যানীয় মস্তিষ্ক মেগানের।

ঘোড়ার চালটা ঠিক ধরে ফেলল। গতি বজায় রেখে এগোতে দিলো না গাড়িটাকে। তারপর ওটাকে আস্তে আস্তে ঠেলতে শুরু করলো বামপাশে। ওপাশের আরোহীও কম নয়।সেও পাল্টা ঠেলতে শুরু করলো আর এটাই চাচ্ছিলো মেগান।

হঠাৎ করে ব্রেক কষলো সে গাড়ির, তাতে ওর গাড়ির পিছনটা উপরে উঠলো আর বামের গাড়িটা কেতরে চলে গেল সামনে ডানে!

বেকায়দা অবস্থায় পড়া গাড়িটার দিকে একটা গ্রনেড ছুড়ে দিলো মেগান! বুম!

হঠাৎ সামনে তাকাতেই বুকটা হিম হয়ে গেলো মেগানের। গলির মাথা থেকে ট্যাঙ্কটা আর মাত্র বিশ মিটার আর সে একশো মিটার! ফুয়েলও শেষের দিকে!

অতশত না ভেবে গতি বাড়াল মেগান, এক্সেলেরেটর দাবিয়ে ধরলো মেঝে পর্যন্ত। দশ সেকেন্ডে চলে আসলো গলির মাথায়, গতি হালকা কমিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দিলো গলিতে। চলে গেলো বেশ কিছুদূর।

পাঁচ মিনিট পর গাড়ি থামাল। নেমে শিষ বাজাতেই ভাঙ্গাচোরা বিল্ডিংয়ের ফাঁকফোকড় দিয়ে বেরিয়ে এলো সাঙ্গপাঙ্গরা। ইশারা করতেই গাড়িতে ফুয়েল ভরতে শুরু করলো ওরা।

ঠিক তখনই দেখা দিলো নতুন বিপদ। অ্যাটাক হেলিকপ্টার চলে এসেছে। এবারে এয়ারস্ট্রাইক করতে চায় ঘাতকদল!

প্রথমবারের মতো আতঙ্কিত দেখা গেল মেগানকে। খোলা রাস্তায় ট্যাঙ্কের গান পয়েন্টের সামনেও ভয় পায়নি সে। এবারে ভয় পেত হলো ওকে।

একটা আল্ট্রা অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ঘুরছে ওদের মাথার উপরে। ওটার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ নেই মেগানের। মিনিটে ত্রিশটারও বেশি “হেলফায়ার মিসাইল” ফায়ার করতে পারে আল্ট্রা অ্যাপাচি, যেগুলো সত্যিকার অর্থেই নরকগুলজার করতে পারে। পারে আস্ত একটা ট্যাঙ্ক গুড়িয়ে দিতে, সেখানে মেগানের আর্মার্ড কার কোনো ব্যাপারই না!

দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলো মেগান। এক্সেলেরেটর মেঝে পর্যন্ত দাবিয়ে ধরার সুযোগ পেল না এবারে, গলির রাস্তাটা খুব সরু না হলেও একেবারে হাইওয়ে নয়।

অ্যাটাক শুরু হয়েছে হেলিকপ্টার থেকে! বুলেট-বৃষ্টি হচ্ছে মেগানের কারের উপরে!

হেলিকপ্টারের রোটর, মেশিনগানের যান্ত্রিক আওয়াজ আর বুলেটবৃষ্টির ফলে মেগানের আর্মার্ড কারে সৃষ্টি হওয়া ঠুংঠাং শব্দ এলাকাটার শান্তি নষ্ট করলো মুহূর্তের মধ্যেই!

অবাক হয়ে গেছে মেগান! নাহ এ তো মেশিনগান নয়! হেলফায়ার মিসাইল অনেক পরের ব্যাপার, আল্ট্রা অ্যাপাচির মেশিনগান থেকে ফায়ার করলেও ছাতু হয়ে যাবে ওর কার! বরং হেলিকপ্টার থেকে এলএমজি দিয়ে ফায়ার করছে কেউ!

চট করে একটা কথা খেলে গেলো মেগানের মাথায়। মারতে চাইলে ঘাতকদল অনেক আগেই মেরে ফেলতে পারতো ওদেরকে।

ট্যাঙ্কের গান পয়েন্টের মুখে থাকা অবস্থায়ও কোনো শেল ফায়ার করেনি তারা, সুযোগ থাকার পরও গাড়ি নিশানা করে আরপিজি মারেনি, মেরেছে এলোমেলোভাবে। আর এখন একদম হাতের নাগালে থাকার পরও হেলফায়ার মিসাইল ফায়ার করেনি ঘাতকদল।

তার মানে মেগানকে জীবিত ধরতে চায়।মেগানকে ধরলেই পাওয়া যাবে মিহিরকেও।

কথাতা ভাবতেই মেগানের বুকের উপর থেকে আধমণি পাথর যেন সরে গেলো। কিন্তু মরার চিন্তা চলে যেতেই ধরা পড়ার চিন্তা গ্রাস করলো ওকে!

ওকে ধরতে ঘাতকদলের পরবর্তী চাল কী হতে পারে? ট্যাঙ্ক আর আল্ট্রা অ্যাপাচির পর আর কোন চাল চালবে তারা? মেগান যেটা ভাবছে সেটা হলে সবথেকে ভয়ংকর কাজটাই করবে ঘাতকদল। পাঠাতে পারে অ্যাটাক ড্রোন!

কথাটা ভাবতেই মেগানের উপরে যেন আবারও চেপে বসলো আধমণি পাথর। ড্রোন জিনিসটাই এমন। ভয়ের শীতলস্রোত নামিয়ে দেয় শিড়দাঁড়া বেয়ে। একটুও বুঝতে না দিয়ে ঠিক কানের কাছে এসে হামলা করার সামর্থ্য রাখে অ্যাটাক ড্রোন।

মেগানের কানের কাছে হামলা করবে না বটে তবে ঠিক পেছন থেকে ফায়ার করে টায়ার ফাঁসিয়ে দিলেই কেল্লাফতে। এতক্ষণের লড়াইয়ে হার মানতে হবে ওকে।

“সেটা পরের ব্যাপার। আগে হেলিকপ্টারের সৎকার করি।” নিজেকে বোঝাল মেগান।

এলএমজির একটানা ফায়ার হয়তো সহ্য করতে পারবে না গাড়ির আর্মার। হয়তো বা ফেসে যাবে টায়ার। পরিস্থিতি দাবি করছে হেলিকপ্টারটাকে খতম করতে।

ড্রোনের কথা ভাবতে ভাবতে গলি পেরিয়ে একটা খোলা জায়গায় চলে এসেছে ওরা। জায়গাটা একসময় সুন্দর একটা পার্ক ছিল, এখন তেপান্তরের মাঠ হয়ে গেছে। সেখানেই গাড়ি ঢোকাল মেগান।

পিছনে ফিরে মিহিরকে বলল,” ড্রাইভ করতে পারো?”

“পারি।”

“দ্রুত স্টিয়ারিং ধরো।” বলেই এক ঝটকায় মিহিরকে সামনে নিয়ে এলো মেগান আর নিজে গেলো পিছনে।

দ্রুত হাতে সিটবেল্ট বেধে নিয়ে ছাদের কাছে লাগানো একটা বোতাম চাপলো সে। ছাদ থেকে নেমে এলো একটা টাচস্ক্রিন।

স্ক্রিনের “ওপেন” লেখার উপরে ট্যাপ করতেই গাড়ির পিছন থেকে বেরিয়ে এলো একটা অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান।

স্ক্রিনে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে হেলিকপ্টারটাকে। “রোটেট” লেখাটার উপরে আঙুল ঘুরিয়ে গানটার মুখ ঘোরালো মেগান। তাক করলো ঠিক পাইলটের দিকে।

“শক্ত করে স্টিয়ারিং ধরো মিহির” বলেই ফায়ার করলো। একটা ঝাকি খেলো গাড়িটা আর অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানটা ফায়ার করলো বিশ মিলিমিটারের বুলেট!

“ইয়েসসস!” বুলস আই করেছে মেগানের বুলেট। হেলিকপ্টারের ড্রাইভারকে কোতল করতে পেরেছে সম্ভবত, কারণ ফড়িংয়ের মতো তিড়িংতিড়িং করে মাঝ আকাশে লাফাচ্ছে ওটা।

দুই মিনিট পরেই নাচানাচি থামাল ওটা। সম্ভবত অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কিন্তু আগেরমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না কারণ পাইলটকে কোতল করার আগে বেশ কিছু যন্ত্র উড়িয়ে দিয়েছে বুলেটটা।

এবারে মেগান তাক করলো ফুয়েল ট্যাঙ্ক বরাবর! আরেকবার মিহিরকে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরতে বলল সে, আরেকবার ঝাঁকি খেলো গাড়িটা আর আরেকটা বুলেট ফায়ার করলো অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান।

এবারেও বুলস আই করেছে মেগানের নিশানা। ঠিক গিয়ে লাগলো হেলিকপ্টারের ফুয়েল ট্যাঙ্কে! সঙ্গে সঙ্গেই আগুন লেগে গেলো আল্ট্রা অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টারটায়! মাঝ আকাশে আগুনের ফুল্কি, হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে, খানিকক্ষণ দাপাদাপি করে ওটার স্টিলের কাঠামোটা পড়ে গেলো মাটিতে।

গাড়িটা থামিয়ে সিট আবারও সিট অদলবদল করে পার্ক থেকে বেরিয়ে আসলো ওরা।

“খুব ভালো চালিয়েছো মিহির। প্রাউড অফ ইউ।” মিষ্টি হেসে বলল মেগান।

“ধন্যবাদ। কিন্তু তোমার এই প্রাইড কাকে দেখাবে বলো তো?” বলল মিহির।

“কাকে আবার দেখাব? কাউকে না। হুহ!” মেকি রাগ দেখিয়ে বলল মেগান।

“আচ্ছা আচ্ছা। কাউকে দেখাতে হবে না। যা খেল দেখালে বাব্বা!” হাসতে হাসতে বলল মিহির

“থ্যাঙ্কিউ। “

“ওয়েলকাম ইউ।“ 

দুই পাটি দাঁত বের করে বলল মিহির।

“হেহ! ভালোই তো মজা করে কথা বলতে পারো!”

“হে হে। প্রেম করি তো তাই। ওরে বাবা! এসব আবার কোথেকে আসছে!” সামনে তাকিয়ে বলল মিহির।

পার্ক থেকে বের হয়ে হাইওয়েতে উঠেছে ওরা। এই রাস্তাটা আলাদা। রাস্তার পাশে আগেও কোনো বিল্ডিং ছিল না, এখনও তাই কোনো বিল্ডিংয়ের ধ্বংসাবশেষ নেই। দুইপাশে ফাকা জায়গা। নেভাডা শহর ছেড়ে বেরিয়ে নেভাডা মরুভূমির মাঝ দিয়ে চলছে ওরা। রুক্ষ খটখটে মরুভূমির বুকে রাস্তা বসিয়েছে সরকার।

মিহির মেগান দেখলো আশেপাশে থেকে কয়েকডজন গাড়ি ধেয়ে আসছে ওদের দিকে। গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে আর্মার্ড হাফট্রাক (মিনি ট্যাঙ্ক বলা চলে), পারসোনাল আর্মি ট্যাঙ্ক, সাজোয়া যান; কী নেই তাদের সঙ্গে! পুরোপুরি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে গডসক্লাবের পাঠানো ঘাতকদল। এমনকি স্মোক গ্রেনেডের ধোঁয়া

কাটাতে পোর্টেবল ফ্যানও নিয়ে এসেছে তারা (মেগানের ফাইটিং সম্পর্কে তাদের ধারণা আছে তো তাই)।

গাড়ি থামিয়েছে মেগান। তাছাড়া উপায়ও নেই। চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে গেছে।

“এখন কী করবে মেগান?” ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল মিহির।

” আমি ওদের দেখছি।”

“একা লড়বে ওদের সঙ্গে? পাগল!”

“এমন লড়াই বহুবার লড়েছি আমি। আর দেখতেই পাচ্ছো বেঁচে আছি। তুমি সঙ্গে না থাকলে এতক্ষণে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতাম ওদের।” বলল মেগান। পাশের সিটটা সরিয়ে দুটো রিভলবার বের করে নিলো, গুঁজলো কোমরে। ছাদ থেকে বের করে নিল একটা অটোমেটিক রাইফেল।

“যে কোনো পরিস্থিতিতে গাড়ি থেকে বের হবে না মিহির। দরকার পড়লে গাড়ি নিয়েই পালাবে, যেদিক দিয়ে এসেছি যাবে সেদিকেই। আমার জন্য চিন্তা করতে হবে না।” বলে গাড়ি থেকে নেমে গেল মেগান। শুরু করলো এক অসম লড়াই।

এদিকে গাড়িতে বসেই লুইস এক্সের গাড়িটা দেখেছে মিহির। পালানোর এক মহা সুযোগ ওর সামনে উপস্থিত। একবার মেগানের দিকে তাকালো। শত্রুপক্ষের ব্যূহের ভিতরে ঢুকে পড়েছে সে। চাইলেও আর মিহিরকে আটকাতে পারবে না।

গাড়ি থেকে নেমে তেড়ে দৌড় দিলো মিহির। নিরাপদ দূরত্বে গাড়ি দাড় করিয়ে লড়াই দেখছিল লুইস এক্স।মিহির গেল তার কাছেই। জানালায় নক করতেই চমকে গেলেন লুইস এক্স। ভাবতেও পারেননি এত সহজেই ফিরে পাবেন মিহিরকে।

মিহিরকে গাড়িতে তুলেই তাই ওয়্যারলেসে নির্দেশ দিলেন “ওহে তোমরা ভাগো। কাজ হয়ে গেছে।”

গডসক্লাবের হেডকোয়ার্টারের দিকে চলছে লুইস এক্সের গাড়ি। সেখানে মিহিরের জন্য অপেক্ষা করছে নতুন চ্যালেঞ্জ।

 

১০

 

হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে যথাযথ অভ্যর্থনাই পেয়েছে মিহির। একজন ইয়াং সেনসেশনের যতটুকু মর্যাদা পাওয়ার কথা, পেয়েছে তার থেকে বেশি।

হেডকোয়ার্টারে ঢোকামাত্র ওর দিকে পঙ্গপালের মতো ছুটে এসেছে লোকজন। সবাই চায় ওর সঙ্গে হাত মেলাতে। এই মুহূর্তে মিহির দুনিয়ার সবথেকে বড় সুপারস্টার।

সাংবাদিকরা সব ছুটে আসছে ওর ছবি তোলার জন্য। সবাই ঠেলাঠেলি করছে মাইক হাতে। তাদের আগ্রহ দেখে মনে হচ্ছে মিহিরের কাশির শব্দ শুনলেও তারা ধন্য হবে।

মিহিরদের ফিরিয়ে আনার ঘোষণা সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে আগেই দিয়েছিলেন লুইস এক্স। কিন্তু তখন মিহিরকে দেখাতে পারেননি মিডিয়ার সামনে। এখন যেহেতু দেখালেন তাই সবাই কথা বলতে চায় ওর সঙ্গে।

চাইবেই তো। ওর থেকে কম বয়সে আর কেউ নোবেল পাবে না বিজ্ঞানে। (ওর নোবেল প্রাইজ পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।) শত শত বছরের পরম আরাধ্য আবিষ্কার টাইমমেশিন এসেছে ওর হাত ধরে। কাজেই এতটুকু অভ্যর্থনা সে পেতেই পারে।

মিহির অবশ্য ওসব গায়ে লাগায় না। টাইমমেশিন আবিষ্কারের পর থেকেই এমন হৈচৈ ওকে নিয়ে। এসবে অভ্যস্ত সে। ওর মনোযোগ বরং ওর বন্ধুদের দিকে।

ভীড়ের মধ্যে এক ফাঁকে লুইস এক্সকে ডেকে নিয়ে বলল,” মিস্টার লুইস, শিগগিরই আমার বন্ধুদের দেখতে চাই। তার ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে হাইকমান্ড আর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিটিং চাই। দয়া করে ব্যবস্থা করুন।” ‘আংকেল’ থেকে লুইস এক্সকে এখন সরাসরি নাম ধরে ডাকছে মিহির। নির্দেশের সুরেই কথাগুলো বলছিল সে। কারণ বুঝে গেছে, এই মুহূর্তে ওর কথায় উঠবে বসবে গডসক্লাব।

ভীড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব শিগগিরই দেখা হচ্ছে আপনাদের সঙ্গে বন্ধুরা।” তারপর সেলিব্রেটিদের মতো হাত নাড়তে নাড়তে আর কয়েকটা ফ্লাইং কিস দিয়ে চলে আসলো।

সোজা চলে গেল বন্ধুদের ঘরে। তিনজন তার বন্ধু, একজন তার প্রেমিকা। সবার সঙ্গেই প্রাণের সম্পর্ক, গত দুই বছর একসঙ্গে থেকে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়েছে।

সবাইকে একটা রুমেই পেল মিহির। ঢুকতেই ওর বুকের উপর ঝাঁপ দিলো প্রেমিকা মেরি, শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে। ফুঁপিয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গেই। মিহির কোনো কথা বলতে পারলো না।

এলিজাবেথ চিৎকার করে উঠলো, “মিহির! তোমাকে আবার দেখবো ভাবতেও পারিনি! ও মাই গড! ইউ আর এলাইভ! কোথায় ছিলে এতক্ষণ শুনি? খুব মারপিট করে এলে বুঝি? তা মাথার মতো তোমার হাতও যে ভালোই চলে সেটা তো আগে জানতাম না!” বাচ্চাদের মতো হাততালি দিতে দিতে বলল মেয়েটা। একসঙ্গে একগাদা কথা বলল।

কেবল জিমিই কোনো কথা বলল না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মিহিরের দিকে।

মেরিকে ছাড়িয়ে নিয়ে জিমির দিকে গেলো মিহির। খোশ গলায় বলল, “কিরে বাল, মুখখানা অমন করে রেখেছিস কেন? গলা ভেজানোর জন্য কিছু দেয়নি লুইস শালা?”

“মিহির, একটা কথা বলবার ছিল তোকে। একটু পাশের ঘরে আসবি?” থমথমে গলায় বলল জিমি

“আমি জানি কী বলবি। ওসব থাক এখন। কিছু দরকারি কথা বলি। যে যার জায়গায় বসে পড়।” বলল মিহির

“অনেকদিন বন্দী ছিলাম আমরা। অত্যাধুনিক দূরে থাক স্বাভাবিকভাবে বাঁচার জন্যও তেমন কোনো সুযোগ সুবিধা পাইনি।

কিন্তু এখন আমরা মুক্ত। একটু নয়, অনেকখানি মৌজ ফূর্তি করা দরকার।

কাজেই আজকে তোরা বাইরে যাবি। সিনেমা দেখবি, খাওয়া দাওয়া করবি প্রাণভরে। আর পারলে লং ড্রাইভে যাবি।” বলল মিহির

“কিন্তু মিহির, ওরা তো আমাদের একরকম বন্দী করেই রেখেছে। ঘর থেকেই বের হতে দিচ্ছে না। সেখানে আমরা ঘুরতে যাব কী করে?” এলিজাবেথ জিজ্ঞাসা করলো।

“সমস্যা নেই। আমি বলে দেব ওদেরকে।” মিহির বলল।

“কী বললি? আরেকবার বল? তুই ওদেরকে বললে ওরা আমাদেরকে বের হতে দেবে?” জিমির কণ্ঠে বিস্ময় ।

“জিমি ধরে এই মুহূর্তে আমিই গডসক্লাবের প্রেসিডেন্ট। আমার মুখের কথাই হুকুম।” মিহিরের কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যার কারণে ওর কথাটা বিশ্বাস করলো সবাই। “রেডি হয়ে নে সবাই। তোদের জন্য একটা গাড়ি রেডি থাকবে নিচে।”

“তুই যাচ্ছিস না আমাদের সঙ্গে?” জিমির কণ্ঠে স্পষ্ট বিস্ময়।

“না রে। আমার একটা মিটিং আছে। তোদের সঙ্গে যেতে পারছি না। এখন থেকে আধঘণ্টা পর বের হবি তোরা।” প্রায় কর্তৃত্বের সুরে বলল মিহির।

হঠাৎ করেই মিহিরের মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখতে পেল ওর বন্ধুরা। নরম দিলখোলা মানুষ মিহির হঠাৎ কর্তৃত্ববাদী হয়ে গেছে। যেন পিতার মৃত্যুর পরে যুবরাজ রাজা হয়ে হঠাৎ অনেকখানি ক্ষমতা পেয়ে দিশেহারা হয়ে গেছে।

“হে ঈশ্বর! অহংকার যেন ওর পতনের মূল না হয়। রক্ষা করো ওকে!” বিড়বিড় করে বলল জিমি।

“মেরি মাই ডিয়ার খুব শিগগিরই আবারও দেখা হবে। এলি প্রাণভরে শপিং কোরো। জিমি, টাকাপয়সার চিন্তা করিস না, ইচ্ছামতো আনন্দ কর। ‘দেয়ার ইজ নো স্পুন’ বললেই যে কোনো দোকান থেকে ইচ্ছামতো কেনাকাটার সুযোগ পাবি (গডসক্লাব তাদের পরিবারের লোকেদের কেনাকাটার সুবিধার জন্য দুনিয়াব্যাপি এই সিস্টেম চালু করেছে। এইমাত্র মিহির সেটা ব্যবহার করার কর্তৃত্ব পেয়েছে)। আচ্ছা যাই আমি।” বলেই গট গট করে হেটে চলে গেল জিমি। স্তব্ধ হয়ে রইলো ঘরের সবাই।

মিটিং রুমে যাওয়ার আগে ঘড়ি দেখলো মিহির। পনেরো মিনিট আছে এখনো হাতে। সোজা গিয়ে ঢুকলো লুইস এক্সের খাস কামরায়। ভদ্রলোক তখন সুন্দরী পার্সোনাল এসিস্ট্যান্টের সঙ্গে দশ বিশ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। জিমি ঢুকলো নক না করেই।

গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,” লেটস হ্যাভ আ কাপ অফ টি মিস্টার লুইস।”

চায়ে চুমুক দিতে দিতে লুইস এক্সকে কী বলল মিহির কেউ জানে না কিন্তু ভদ্রলোক এসির নিচেও ঘামলেন।

“চলুন এবারে যাওয়া যাক।” ঘড়ি দেখে বলল মিহির।

মিটিং রুমে গিয়ে যাদের যাদের আশা করেছিল তাদের সবাইকেই পেল। গডসক্লাবের সেন্ট্রাল কমান্ড, সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চীফ অব স্টাফের প্রধাণ, বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধাণ, গডসক্লাবের অপারেশনস কমিটির চেয়ারম্যান আর বিজ্ঞানীদল।

অতিরিক্ত কোনো কথা না বলে শুরুতেই টাইমহোল খোলা নিয়ে লুইস এক্সের কাছে যা শুনেছে সেটা বলে দিলো মিহির। তারপর একে একে সকলের কাছে শুনলো কিভাবে তাদের উপরে রাজত্ব করেছে টিম মাসীহা। এরপরে শুরু করলো শব্দবর্ষণ।

“ওয়েল, বলার দরকার নেই তবুও বলি, আপনারা আসলে চরমভাবে পরাজিত হয়েছেন একটা সন্ত্রাসী সংগঠনের কাছে। নিজেদের উচ্চতম মেধার কারণেই হাইকমান্ডে জায়গা হয়েছে আপনাদের সন্দেহ নেই।

কিন্তু একটা টিম হিসেবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন আপনারা। পাঁচগুণ বেশি সৈন্য থাকার পরেও দারিয়ূসের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়েছে আলেকজান্ডারের কাছে শুধুমাত্র শৃঙ্খলার অভাবে। আপনাদের মধ্যে শৃঙ্খলা নেই ন্যূনতম। বিশেষ করে এসপিওনাজ ডিপার্টমেন্টের ব্যর্থতা আপনাদের পরাজিত হওয়ার মূল কারণ। “

এমআইসিক্সের ডিরেক্টর গর্জে উঠতেন আরেকটু হলেই। লুইস এক্সের দিকে চোখ পড়তেই থেমে গেলেন। সেটা অবশ্য মিহিরের নজর এড়ালো না।আবারও বলতে শুরু করলো সে।

“মিস্টার লুইস আমাকে কথা দিয়েছেন আরেকটা টাইমহোল খোলার ব্যাপারে সম্পূর্ণ সাহায্য আমাকে করবেন উনি। আপনাদের কাছেও একই জিনিস আশা করছি আমি। এটাও আশা করছি যে বলামাত্রই আমার নির্দেশ পালিত হবে।” একটু থামলো মিহির। সবার দিকে চোখ বুলিয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিলো।

“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটা ঘটনা বলি।

ফ্রান্সের ডানকার্ক বন্দর থেকে মিত্রবাহিনীর সৈন্য অপসারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবথেকে রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলোর একটা। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল উদ্ধারকারী সৈন্যদের বলেছিলেন, ‘আপনারা আমাকে কমপক্ষে ত্রিশ হাজার সৈন্য উদ্ধার করে দিন।’ লাখ লাখ সৈন্য আটকা পড়েছে আর চার্চিল কিনা চাইলেন মাত্র ত্রিশ হাজার সৈন্য!

কাজটা যে মোটেও সহজ ছিল না সেটা চার্চিলের মন্তব্য শুনেই বুঝতে পারছিলেন। একে প্রতিকূল আবহাওয়ায় পাড়ি দিতে হবে সাড়ে পাঁচশো কিলোমিটার দীর্ঘ ইংলিশ চ্যানেল, তার উপর জার্মান জঙ্গিবিমানগুলো স্বস্তি দিচ্ছে না একদন্ড।

পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে পশ্চিম দিকে অগ্রগামী জার্মান সৈন্যদের মোকাবিলার থেকে আটকে পড়া সৈন্যদের উদ্ধার করাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিলো মিত্রবাহিনী। উইন্সটন চার্চিল এটাও বলেছিলেন,’ শুধুমাত্র ঈশ্বরই পারেন ওদের উদ্ধার করতে।’

তারপর বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে তিন লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার সৈন্য উদ্ধার করলো উদ্ধারকারী সৈন্যরা!” পানিতে চুমুক দেয়ার জন্য থামলো মিহির। সেই ফাঁকে একজন সেনা কমান্ডার বললেন,” আমরা ইতিহাসের ক্লাস করছি না মিস্টার মিহির!”

“তা করছি না কিন্তু আপনাদের ইতিহাসের ক্লাস নিতে হচ্ছে আমাকে কারণ আপনারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেননি।

অতগুলো সৈন্য উদ্ধার হলো কী করে? জার্মানদের ধোঁকা দিতে পেরেছিলেন চার্চিল।

ডানকার্ক বন্দর থেকে পাঁচশ কিলো দূরে ঘাটি গাড়ার ভান করলো বৃটিশ সেনারা, যেটা পুরোটাই ছিল আই ওয়াশ ধোঁকা। তারা এমন ভাব করলো যেন সৈন্য উদ্ধারে কোনো উৎসাহই নেই তাদের। যেন তাদের সকল মনোযোগ জার্মান সৈন্যদের পিছন থেকে আক্রমণ করায়!

ধোঁকায় পা দিয়ে ঘাটি আক্রমণ করে বসলো জার্মান সেনারা। তারপরে বুঝলো পুরোটাই ছিল বোকা বানানোর খেলা। জার্মানরা যতক্ষণে আক্রমণ করেছে আর যতক্ষণে ফিরে এসেছে, ততক্ষণে ডানকার্ক বন্দর থেকে সৈন্যদের উদ্ধার করা হয়েছে।” আরেক ঢোক পানি খাওয়ার জন্য থামলো মিহির। লুইস এক্স কানে কানে বললেন, “ভাষণ সংক্ষিপ্ত করলে ভালো হয় মিহির।” মিহির শুধু মাথা নেড়ে আবার শুরু করলো বলতে।

“জেন্টেলমেন, আপনাদের আর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবো না। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি তা হলো টিম মাসীহাকে ধোঁকা দিতে পারলে আমরা আরেকটা টাইমহোল খুলতে পারবো। বিষয়টা খুবই সহজ।

দুইভাগে ভাগ হবে আমাদের টিম। একভাগে জন মারফির নেতৃত্বে সেন্ট্রাল কমান্ডের সদস্যবৃন্দ, বিজ্ঞানী, কমান্ডো বাহিনী আর টেকনিশিয়ানদের একটা দল। আরেকটা দল হবে লুইস এক্সের নেতৃত্বে। দুটো দল যাবে দুনিয়ার দুটো প্রান্তে। আমি নিজে নেতৃত্ব দিতে চাই এবারে যাতে করে সবথেকে কম সময়ে কাজটা সম্পন্ন করা যায়।

টাইমমেশিন আর আমি কোন ভাগে থাকবো সেটা জানা যাবে রওনা হওয়ার ঠিক আগে। যেন কোনোভাবেই টিম মাসীহা জানতে না পারে ঠিক কোথায় খোলা হচ্ছে টাইমহোল।

আজ থেকে প্রস্তুতি নিন আপনারা। টাইমহোল খোলার সম্ভাব্য জায়গা দুটো সম্পর্কে আমাকে দ্রুতই জানাবেন। সাতদিন পর শুরু হবে আমাদের মিশন।” কথা শেষ করে উঠতে যাচ্ছিলো মিহির। একজন হাত তোলায় বসে পড়লো। বলল “এনি কোশ্চেন? ” লোকটা মাথা ঝাকাল। মিহির সঙ্গে সঙ্গেই বলল “নো কোশ্চেন নো কোশ্চেন!” বলেই মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল গটগট করে।

এদিকে যুদ্ধের সাজ সাজ রব শুরু হয়েছে টিম মাসীহা শিবিরেও। মার্টিনের কাছে শুনলো মেগান, দুটো দলে ভাগ হয়ে টাইমহোল খুলতে বের হবে গডসক্লাব। কোন দলে টাইমমেশিন থাকবে সেটা শুধু জানে মিহির নামের ছোকরাটা।

মেগান জানে এবারে কঠিন প্রস্তুতি নিয়েছে টিম মাসীহা। কোনো ছাড় দেবে না এবারে তারা। পূর্ণ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই আসবে তারা। মেগান আর এবারে একক কৃতিত্ব দেখাতে পারবে না। কাজেই তার দলকেও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে।

এইমাত্র দুটো ভালো খবর পেল মেগান। এক, গডসক্লাবের এক ঘাঁটি থেকে চারটে অ্যাটাক ড্রোন হাপিস করে দিয়েছে তার দলের লোকেরা।

দুই, হাওয়া খেতে বের হওয়া মিহিরের বন্ধুদের ধরে নিয়ে এসেছে ওর লোকেরা। একটুখানি হাসলো মেগান। এরাই তো তার লাইফ ইনশিওরেন্স!

 

১১

 

গত সাতদিন ধরে বেশ খাটাখাটুনি করেছে মিহির। টাইমমেশিন সেটের অনুরূপ একটা ভুয়া সেট বানিয়ে নিয়েছে। সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও যা যা লাগে টিম মাসীহাকে ধোঁকা দিতে সেগুলোর ব্যবস্থা করেছে।

তারপর বিজ্ঞানী, কমান্ডো বাহিনী আর টেকনিশিয়ানদের একটা দল পাঠিয়েছে মরোক্কোর কাসাব্লাঙ্কায়। দলটার নেতৃত্বে দিচ্ছেন জন মারফি, সঙ্গে আছে গডসক্লাবের সেন্ট্রাল কমান্ডের হর্তাকর্তারা।

মিহির নিজে থাকবে মূল দলের সঙ্গে। টাইমহোল খোলার জন্য কয়েক ধাপে ইনপুট করা কোডটা এক ধাপেই সে ইনপুট করতে পারবে; এই কথাটা সে লুইস এক্সকে বুঝিয়েছে। কাজেই টিম মাসীহা বাগড়া দেয়ার আগেই যে টাইমহোল খুলে আরেকদফা ডাইনোসর আমদানি করা যাবে সেটা বেশ ভালোভাবেই ঢুকেছে লুইস এক্সের মাথায়।

মিহিরের নেতৃত্বে দলটা যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে। অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করতে পুরো দলটা যাচ্ছে দ্রুতগামী এক নিউক্লিয়ার সাবমেরিনে করে।

সাবমেরিনের ভিতরে বিজ্ঞানী দলটার নেতা পিটার উইলিয়ামসের সঙ্গে পুরো বিষয়টা আগাগোড়া ঝালিয়ে নিচ্ছে মিহির।

মাঝে মাঝে লুইস এক্সের সঙ্গেও পরামর্শ করছে নিরাপত্তা নিয়ে। বেশি যোগাযোগ রাখছে কাসাব্লাঙ্কায় পাঠানো দলটার নেতা জন মারফির সঙ্গে। কারণ ওরাই আগে কাজটা শুরু করবে। হামলা আগে হলে ওদের উপরেই হোক। মিহির ওদের বলেছে তার ধারণা, একই সঙ্গে দুই জায়গায় হামলা করার সক্ষমতা নেই টিম মাসীহার।

“মিস্টার পিটার, এবারে পুরো কাজটা আমি নিজ হাতে করতে চাই। আপনি শুধু বসে দেখবেন পুরোটা। আপনার টিম তো আছেই, তারাই আমাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করবে। আপনি মিস্টার লুইসের সঙ্গে নিরাপদ জায়গায় বসে বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করুন।”

“মিস্টার লুইস, আপনি দয়া করে মিস্টার মারফির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবেন।”

” মিস্টার স্টিফেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে তোমার টিমের আশি শতাংশ লোককে আমি টাইমমেশিনের আশেপাশে চাই।”

“মিস্টার ডেভিড, আশা করবো তোমার টেকনিশিয়ানরা সর্বোচ্চ দ্রুততার সঙ্গে কাজ করবে আজ।”

সাবমেরিন থেকে নামার আগে সবাইকে শেষবারের মতো নির্দেশনা দিলো মিহির।

আটলান্টিক মহাসাগর দিয়ে দীর্ঘ যাত্রার পর সাবমেরিন থামলো ক্লিফটন বিচ থেকে আধকিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে ছোট ছোট জাহাজে করে বিচে নিয়ে আসা হলো টাইমমেশিন আর আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি আর লোকজনকে।

বিচে নেমেই একটা খারাপ খবর পেলেন লুইস এক্স। কাসাব্লাঙ্কায় হামলা হয়েছে জন মারফির দলের উপরে। ওদেরকে তছনছ করে টিম মাসীহা ছুটে আসছে কেপটাউনে। জন মারফি নাকি ভয়ের চোটে বলে দিয়েছে যে আরেকটা দল কোথায় যাচ্ছে!

সব থেকে ভয়ের ব্যাপার হল, জন মারফিসহ গডসক্লাবের সেন্ট্রাল কমান্ডকে ধরে নিয়ে গেছে তারা!

খবরটা শুনেই ভয়ে অস্থির হয়ে গেলেন লুইস এক্স। নখ কামড়ানো শুরু করলেন, তার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো, পোর্টেবল এসির নিচেও তিনি ঘামতে লাগলেন।

“মিস্টার লুইস, খবরটা গোপন রাখুন। এটা ছড়িয়ে পড়লে ভয়ে সবাই পালাবে। তার থেকে ভালো হয় যে আমরা দ্রুত কাজ শেষ করি।” বলল মিহির। তাগাদা দিলো সে সবাইকে। দ্রুত হাতে কাজ শুরু করে দিলো টেকনিশিয়ানরা।

সংকর ধাতুর চারকোনা ফোল্ডিং বাক্সটার একেক বাহুর দৈর্ঘ এক গজের মতো, সহজেই বহন করা যায় ব্যাগে করে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে।

মিহির রিমোট কন্ট্রোলের সুইচ চাপতেই আস্তে আস্তে বড় হতে শুরু করলো সেটা। বড় হতে হতে প্রায় দুইতলা বিল্ডিংয়ের সমান হয়ে গেলো।

মিহির নির্দেশ দিতেই কয়েকজন টেকনিশিয়ান গিয়ে বামপাশে ক্যাসিমির এফেক্টর লাগিয়ে দিলো। ওয়াশিং মেশিনের সাইজের যন্ত্রটাই আসল কাজ করবে। রিমোট দিয়ে ওটাকেও চালু করলো মিহির। অপরপাশেও আরেকটা ক্যাসিমির এফেক্টর লাগিয়ে দেয়া হলো। চালু হলো সেটাও।

এবারে অপেক্ষা। দুটো ক্যাসিমির এফেক্টরকে শক্তি দিচ্ছে দিচ্ছে বহনযোগ্য দুটো নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর। বহনযোগ্য বলা হলেও আদতে সেটা আঠার চাকার এক ট্রাকের উপরে সেট করা। অবশ্য ট্রাকের উপরে রাখার আরেকটা কারণ হলো, হামলা হলে যেন দ্রুত পালানো যায়। ক্যাসিমির এফেক্টরের মতো নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরও বেশ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র।

তো নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর থেকে শক্তি উৎপাদন হয়ে সেটা ক্যাসিমির এফেক্টরে যাবে। তারপর ক্যাসিমির এফেক্টর চারকোনা বাক্সের ভিতরে ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব সৃষ্টি করবে। শক্তির ঘনত্ব যত বেশি হবে তত বেশি অতীতে ভ্রমণ করা সম্ভব হবে।

ডাইনোসর যেহেতু শত বা হাজার বছর আগের নয়, এমনকি লাখ বছর পিছনে গেলেও পাওয়া যাবে না, যেতে হবে কোটি বছর পিছনে, তাই ঋণাত্মক শক্তি ঘনত্ব হতে হবে অনেক অনেক বেশি। আর সেটার জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট সময়।

“আপনি ঘাবড়াবেন না মিস্টার লুইস। আরেকদফা ডাইনোসর দুনিয়াতে আনতে পারলেই কেল্লাফতে। তখন ডাইনোসর সামলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে টিম মাসীহা। আমরা সেই সুযোগে জন মারফিসহ বাকিদের উদ্ধার করবো।” বলল মিহির।

“তা বটে। কিন্তু অতগুলো লোককে সাবড়ে দিয়ে ওদেরকে অপহরণ করা সহজ কাজ নয়। এখানে চলে আসলেও তো বিপদ। আমরা ওদের সামলাবো কী করে? আর তাছাড়া ওরা যখন কাসাব্লাঙ্কার খবর পেয়েছে তখন এই জায়গাও ওদের অজানা নয়। এখানেও তো ওদের আরেকটা দল থাকার কথা! আমি তো ভাবছি এখনো হামলা করছে না কেন?” লুইস এক্স বললেন। তার কণ্ঠে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ভয়।

“না মিস্টার লুইস। আপনি শুধু শুধুই ঘাবড়াচ্ছেন। এতক্ষণেও যখন হামলা করেনি তখন আর করতেও পারবে না। কারণ ওদেরকে আমরা কৌশলে হারিয়ে দিয়েছি। যদিও জন মারফি আমাদের খবর জানিয়ে দিয়েছেন তবুও আমি মনে করি ওরা হামলা করতে পারবে না। বা করলেও আমরা সেটা থামিয়ে দেব। কারণ আমি নিশ্চিত ওরা ওদের সর্বশক্তি কাসাব্লাঙ্কাতেই নিয়োগ করেছিল। কাজেই দুর্বল দল নিয়ে এবারে আমাদের উপরে ওরা হামলা করবে না, নিশ্চিন্ত থাকুন আপনি।” বলল মিহির।

“তাই যেন হয় বাছা আমার।” একটু থেমে বললেন লুইস এক্স। কান পেতেছিলেন কেন যেন।

“হবেও তাই। আপনি বরং উইটব্লিটসে চুমুক দিন।” লুইস এক্সের হাতের বোতলটা দেখিয়ে বলল মিহির। নিজেও একটু আগে দুই বোতল সাবড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এই জনপ্রিয় পানীয়।

থপাস করে একটা শব্দ হলো কাছেই কোথাও! পানিতে কোনোকিছু আছড়ে পড়ার শব্দ। ধীরে হওয়া শব্দ নয়। বেশ জোরেই হলো শব্দটা।

“কী হলো বলো তো?” লুইস এক্স জিজ্ঞাসা করলেন।

“বুঝলাম না আমিও। সাগরে কিছু পড়েছে নিশ্চিত। কোনো তিমি হয়তো লাফ দিয়েছে। ” বলল মিহির।

“দাঁড়াও খোঁজ নিচ্ছি…ওহে জেরেমি! সাগরে হলোটা কী?” ওয়্যারলেসে জাহাজে থাকা কাউকে জিজ্ঞাসা করলেন লুইস।

“একটা সুপারসনিক জেট এইমাত্র সাগরে ক্রাশ করলো মিস্টার লুইস!” ওপাশে থাকা জেরেমি জানালো।

“জিসাস! বলো কী হে! তাই তো বলি একটু আগে প্লেনের শব্দ পেয়েছিলাম কোথায়! ভেবেছিলাম ক্যাসিমিরের যন্ত্রের শব্দ ওটা!” প্রায় চিৎকার করে বললেল লুইস এক্স।

“ওহ শিট! আরও আগেই খোলা উচিত ছিল টাইমহোলটা। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমি গেলাম কোড বসাতে।” বলেই বাক্সটার কাছে ছুটে গেল মিহির। ওটার সঙ্গে লাগানো কম্পিউটারে বসলো কোড বসাতে। পাগলের মতো টাইপ করতে শুরু করলো কোড। কিবোর্ডের উপরে ওর আঙুলগুলো চলছে ঝড়ের বেগে আর স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একের এক দুর্বোধ্য কোড। যেটার মানে মিহির ছাড়া কেউ জানে না।

টাইপ করতে করতেই হঠাৎ থেমে গেলো মিহির। স্থিরচোখে তাকিয়ে রইলো স্ক্রিনের দিকে। একটু পর মাথায় হাত দিলো, তারপর আবারও কিবোর্ডে হাত দেয়ার চেষ্টা করলো। শেষমেশ উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে আসলো লুইস এক্সের দিকে।

“সর্বনাশ হয়ে গেছে মিস্টার লুইস! আমি কোড ভুল করেছি! লক হয়ে গেছে টাইমমেশিন! সেটা খুলতে গেলে পুরো প্রোগ্রামটার কোড আবার শুরু থেকে লিখতে হবে! অত সময় নেই! এখন কী হবে মিস্টার লুইস!” হাউমাউ করে কেঁদে একসঙ্গে বলে ফেলল মিহির!

“কী বলছো হে ছোকরা! এতবড় ভুল কী করে করলে! জানো কত টাকা খরচ হয়েছে ওর পেছনে!” পাক্কা সাতদিন পর স্বরূপে ফিরলেন লুইস এক্স। কর্কশ কণ্ঠে কথা বললেন মিহিরের সঙ্গে।

ঠিক তখনই কাছেই কোথাও ট্যাঙ্কের গোলা বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা গেল। ভারী মেশিনগানের আওয়াজ পাওয়া গেল। ধুমধাম করে গ্রেনেড বিস্ফোরণের আওয়াজও আসলো কাছে কোথাও থেকে।

মিহিরকে আরেকদফা গালিগালাজ করার আগেই জমে গেলেন লুইস সাহেব। হাতের ওয়্যারলেস ডিভাইসটা বেজে উঠলো। সেটা কানে লাগিয়ে আরেকটা দুঃসংবাদ শুনলেন তিনি। কেপটাউনের সমস্ত নিরাপত্তা ভেদ করে ক্লিফটন বিচের দিকে বিশাল বাহিনী নিয়ে ধেয়ে আসছে টিম মাসীহা! এবং তাদের অগ্রবর্তী দল হামলা শুরু করে দিয়েছে।

খবরটা শুনে আবারও চুপসে গেলেন লুইস এক্স। ওয়্যারলেস ডিভাইসটা পড়ে গেল তার হাত থেকে। মুখ হাঁ হয়ে আছে। হালকা কাঁপতে শুরু করেছেন।

কোনোমতে বলতে পারলেন,

” টিম মা-মা-মাসীহা এসে গেছে মিহির কী হবে এবারে?”

“কিচ্ছু হবে না। আপনি শান্ত হোন আগে। ওয়্যারলেসটা দিন দেখি…স্টিফেন,যেমনটা বলেছিলাম। তোমার আশি শতাংশ লোককে টাইমেমেশিনের আশেপাশে চাই। কুইক। ডেভিড, তোমার লোকদের তাড়াতাড়ি হাত চালাতে বলো…রিয়েক্টরের ট্রাকটা নিয়ে সোজা বিচে যাও…ক্যাসিমির এফেক্টর দুটো জলদি ট্রাকে তুলতে শুরু করো। কুইক হাত চালাও সবাই।” মিহির নির্দেশ দিলো সবাইকে। চারদিকে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে। হাত চালাচ্ছে সবাই। জাহাজ ভিড়তে শুরু করেছে বন্দরে। গোছগাছ শেষ হলেই সাবমেরিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে সবাই।

স্টিফেনের নেতৃত্বে কমান্ডোদের দলটা দুই সারিতে দাঁড়িয়ে গেলো। কেপটাউন শহর থেকে বিচে আসার দিকটা ঘিরে দাড়াল। সংখ্যায় তারা শদুয়েকের কম নয়।

লুইস এক্সসহ গডসক্লাবের বাকিদের জন্য পার্সোনাল আর্মি ট্যাঙ্ক, আর্মার্ড হাফট্রাক পর্যন্ত এসে গেছে! (পার্সোনাল আর্মি ট্যাঙ্ক জিনিসটা ট্যাঙ্ক টাইপের কিচ্ছু নয়। ভারী আর্মার প্লেটের তৈরি সিঙ্গেল সিটেড কার টাইপ। যেটার উপরে একটা ভারী মেশিনগান ফিট করা থাকে। আর চাকার জায়গায় ট্যাঙ্কের মতো কনভেয়ার বেল্ট থাকে বলে সেটাকে পার্সোনাল আর্মি ট্যাঙ্ক বলে)

কিন্তু তারপরও ভয় কমছে না লুইস এক্সের। “মিহির, এরকম টাইট ডিফেন্স তো কাসাব্লাঙ্কায়ও ছিল। তারপরও তো ধরা পড়েছে মারফি। আমরা বাঁচবো কী করে! কী হবে এখন?” বলে পায়চারি শুরু করে দিলেন লুইস এক্স।

“কী হবে! কী হবে! তাই না রে লুইস গর্দভ! মরবি তুই! তোর বুকের উপরে বসে তোর রক্ত খাবে মার্টিন! তোর একটা একটা করে পাই পয়সার হিসাব নেবে মার্টিন! আসছে সে। সময়ের অপেক্ষা মাত্র!” এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে ফেললেন পিটার উইলিয়ামস।

“কে কে কে তুই?” তোতলাতে তোতলাতে বললেন লুইস এক্স। ভয়ের চোটে ভুলেই গেলেন দীর্ঘদিনের অনুসারী পিটার উইলিয়ামসকে।

“তোর যম। হাত তুলে দাড়া শুয়োরের বাচ্চা!” বললেন পিটার উইলিয়ামস। হাতে উঠে এসেছে পুরোনো দিনের একটা রিভলবার। ওটা লুইস এক্সের দিকে তাক করে মুখ ঘুরালেন কমান্ডোদের দিকে। এদিকে কমান্ডোরা রাইফেল তাক করে প্রস্তুত।

“কেউ নড়বি না। নড়েছিস তো উড়িয়ে দেব সবাইকে।” চেচিয়ে উঠলেন পিটার। এক হাতে খুলে ফেললেন কোটের বোতাম। দেখিয়ে দিলেন বুকে পেটে জড়ানো সুইসাইড ভেস্ট! বোমার সুইচে হাত!

“এইচএমএক্সে ঠাসা! সুইচ টিপলে পুরো বিচ উড়ে যাবে। চুপচাপ পিছিয়ে যেতে থাক সবাই।” কমান্ডো দলটাকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে যেতে বাধ্য করলেন পিটার উইলিয়ামস।

গডসক্লাবের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যরা চলে গেছিলো পার্সোনাল আর্মি ট্যাঙ্কগুলোর কাছে। লুইস এক্সের মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে পিটার তাকে নিয়ে চলে গেলেন ঠিক ওদিকটাতেই। চেঁচিয়ে বললেন,”তোদের হিসাবও নেয়া হবে। অপেক্ষা কর চুপ করে দাঁড়িয়ে। নড়েছিস তো এখনই মরবি।”

মিহিরের সঙ্গে চোখে চোখে কথা হলো তার। মিহির চলে গেলো ক্যাসিমির এফেক্টরবাহী ছোট ট্র‍্যাকটার কাছে। আশেপাশের টেকনিশিয়ানদের বাধ্য করলো এফেক্টর দুটো ট্রাকে তুলতে।

তারপর অবশ্য কোমর থেকে ট্রাঙ্কুলাইজারগান বের করে টেকনিশিয়ানদের শুইয়ে দিতে ভুলল না।

তারপর রিমোট দিয়ে ছোট করলো ফোল্ডিং বাক্সটা। সেটাও তুলল ট্রাকে। নিজে উঠে বসলো ড্রাইভারের আসনে। তারপর ওয়্যারলেসে নির্দেশ দিলো কাউকে,”মেগান এখনই!”

সূর্য ডুবু ডুবু করছে ক্লিফটন বিচে। পশ্চিম আকাশে দিগন্ত ছুয়ে ফেলেছে সে। আর নামতে চাইছে না যেন। কমলা হলুদ আলো ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশ জুড়ে। খুব উপভোগ্য একটা দৃশ্য হতে পারতো গডসক্লাবের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যদের কাছে। হলো না।

খন্ড যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ক্লিফটন বিচে। এখানে ওখানে কমান্ডোদের মোকাবিলা করছে টিম মাসীহার ফাইটাররা। মেগান হয়তো শুরু করেছে একক লড়াই। কমান্ডোরা পারছে না লড়াইয়ে। কারণ তাদের বিশাল অংশকে একটা জায়গায় আটকে ফেলেছে মিহির! যুদ্ধের ময়দানে রূপ নিয়েছে ক্লিফটন বিচ, যেখানে একপক্ষ জয় ভুলে লড়াই করছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায়।

চিৎকার চেচামেচি মেশিনগান গ্রেনেড ট্যাঙ্কের আওয়াজ ছাড়িয়ে একটা যান্ত্রিক ভোঁ ভোঁ গোঁ গোঁ আওয়াজ ঠিকই কানে আসলো সবার। সন্ধ্যার আধো আলো আধো অন্ধকারে বিশাল সাইজের চারটা পাখির অবয়ব আর ওগুলোর পায়ের কাছে জ্বলতে থাকা লাল আলোই শুধু চোখে পড়লো সবার।

একসঙ্গে চারটে এমকিউ-নাইন রিপার ড্রোন হামলে পড়লো ওদের উপরে! ঈগল যেভাবে ঝাপিয়ে পড়ে শিকারের উপরে, সেভাবেই ঝাপাল ড্রোনগুলো। ঈগলের নখরের বদলে এয়ার টু সারফেস মিসাইল ছুড়লো কমান্ডোদের দিকে। ত্রিশ সেকেন্ডে আটটা মিসাইল ছুড়ে কমান্ডোদের দলটাকে মাটিতে মিশিয়ে দিলো ড্রোনের চালক।

একে একে উড়ে গেলো আর্মার্ড হাফট্রাক আর পার্সোনাল আর্মি ট্যাঙ্কগুলো।

কোথেকে যেন লাফিয়ে পড়লো মেগান। চেঁচিয়ে উঠলো একপাশে দাঁড়ানো গডসক্লাবের হর্তাকর্তাদের দেখে। “হ্যান্ডসআপ এভরিবডি। কেউ নড়বে না।”

মেগানের সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকেছে তার অনুসারীরা। কয়েকজন এসে হাত বেঁধে ফেলল লুইস এক্স আর তার সহকারীদের। তারপর বাচ্চারা যেভাবে পিটি করে সেভাবেই তাদের নিয়ে যাওয়া হলো বন্দী করে।

মিহিরের ট্রাকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ওরদিকে তাকালেন লুইস এক্স। “মিহির মাইবয়, তোমার বাবাকে আমি ভাই ভাবতাম। আর তুমি কি না আমাকেই ধরিয়ে দিলে?”

“আর সেই ভাইকেই মেরে ফেলেছিস তুই! তোর হিসেবে পরে নেব আমি। যা ভাগ এখন।” ক্ষ্যাপা ষাড়ের মতো বলল মিহির।

মেগান কাছে আসতেই অবশ্য ক্ষ্যাপা ষাঁড় থেকে ভালো ছেলে হয়ে গেল সে।

“আস্ত একটা সুপারসনিক জেট ডুবিয়ে কাজটা ভালো করলে না মেগান!” চোখ সরু করে মুখ বেকিয়ে বিরক্ত হওয়ার ভঙ্গি করে বলল মিহির।

“লা লা লা লা লা… সময় ছিল না একদমই। তার থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়ায় সময় বেঁচে গেল।” হেসে বলল মেগান।

“সময়? সময়? দুই ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে প্রায় সাড়ে এগারো হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছে জেটটা। প্রায় সাড়ে তিন মাক স্পিড! ভাবা যায়! আর সেটা তুমি ডুবিয়ে দিলে!” চোখ কপালে তুলে বলল মিহির।

“হা হা হা। ভাবা তো যায়ই। তোমার সামনেই তো ঘটলো। কেন ভাবা যাবে না?” হেসে বলল মেগান।

“হুঁহ। খুব হাসতে পারো। যাইহোক ধন্যবাদ মেগান। খুব সুন্দর কাজ করেছো তুমি আর তোমার টিম।”

“ওয়েলকাম। তুমিও খুব সুন্দর কাজ করেছো মিহির। তোমার জন্যই আমরা সফলতা পেয়েছি। তুমি ওদের দেরি করিয়ে দিয়েছো দেখেই ধরতে পেরেছি আমরা। আর কমান্ডোদের এক জায়গায় করার ব্যপারটা তো পুরোই মাস্টারপিস। এত্ত ট্যালেন্ট তোমার!”

“হে হে। কিসের আবার ট্যালেন্ট! তুমি না থাকলে এসব মাথাতেই আসতো না। তাই তোমার ক্রেডিট বেশি।” বিনয়ের সঙ্গে বলল মিহির।

“থাক থাক হয়েছে। থামো এবার। আর বলতে হবে না।” মেকি রাগ দেখিয়ে বলল মেগান।

“নিশ্বাস বন্ধ করে থাকবো?” অবাক হওয়ার ভান করে বলল মিহির। হেসে ফেলল মেগান। “গডসক্লাবের হেডকোয়ার্টারে তোমার অপেক্ষায় থাকবো মেগান। বাকিসব কিছু তোমার উপরেই ছেড়ে দিলাম। বিদায়।”

“টা টা।” হাত নেড়ে বিদায় দিলো মেগান।

যেতে যেতে ওয়্যারলেসে পিটার উইলিয়ামসকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললো না মিহির। “ধন্যবাদ আংকেল। আপনি সময়মতো অ্যাকশন না নিলে এসবের কিছুই হতো না।”

“এটা একটা নৈতিক দায়িত্ব ছিল মিহির। প্রায়শ্চিত্তও বলতে পারো। তোমার বাবার অনুসারী হয়েও এতদিন গোলামি করেছি গডসক্লাবের। কাজেই এটা একইসঙ্গে আমার পাপমুক্তি আর পুরষ্কার।

গডসক্লাবের হাত থেকে রক্ষা করে তুমি আমাকে এবং আমাদেরকে পুরস্কৃত করলে মিহির। ভালো থাকবে। বিদায়।”

“আপনিও ভালো থাকবেন আংকেল।” বলল মিহির।

 

১২

 

গডসক্লাবের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসার দিনই মিহিরকে সব বলে দিয়েছিল মেগান।

“পৃথিবীটা আর বসবাসের উপযোগী নেই মিহির। একেবারে শেষ করে দিয়েছে গডসক্লাব।

তোমাদেরকে আদিম দুনিয়ায় কয়েদ করে তোমার বাবাকে চাপ দিয়ে টাইমমেশিনের কোড জেনে নিয়েছে তারা।

কোড বললেও ফোল্ডিং বক্সের উপাদানের কম্পোজিশন বলেননি তোমার বাবা। ভেঙ্গেছেন কিন্তু মচকাননি।

এদিকে গডসক্লাব ভেবেছিল আর্জেন্টিনায় ডাইনোসরের তান্ডব দেখেই পড়িমড়ি করে সবাই আটলান্টিসে জমি কিনতে ছুটবে। কিন্তু ওদের ধারণা ঠিক হয়নি।

তাই ওরা আরও কয়েক জায়গায় ডাইনোসর আমদানির পরিকল্পনা করে। কিন্তু পারেনি মার্টিনের জন্য।

গডসক্লাব আত্নপ্রকাশ করার কিছুদিনের মধ্যেই গোপনে দল ভারী করতে থাকে মার্টিন। বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে ওর অনুসারী বাড়তে থাকে। প্রায় প্রতিটা সেক্টরেই ওর বিশ্বস্ত লোকেরা। এমনকি গডসক্লাবের নাকের ডগায়ও ওর লোক আছে।

কাজেই ওরা যখন ডাইনোসর আমদানি করলো, মার্টিনও তখন বাধ্য হয়ে আত্নপ্রকাশ করলো।

যেসব জায়গায় গডসক্লাব টাইমহোল খোলার চেষ্টা করতো মার্টিন সেখানে হামলা করতো।

মার্টিনকে ধরা তাই জরুরি হয়ে পড়লো তাদের জন্য। তারা তৈরি করলো সুপারস্পাই। সুপারস্পাইয়ের বিষয়টা তো জানোই তুমি।আমাদের নিয়োগ দিলো মার্টিনকে ধরতে।

খুঁজতে খুঁজতে এন্টার্কটিকায় পেয়ে গেলাম মার্টিনকে। আসলে সে নিজে থেকেই ধরা দিল আমার কাছে।

সেখানে এক ইগলুর ভিতরে দেখা হলো মার্টিনের সঙ্গে। আমাকে সব খুলে বলল সে।

আমি তো থাকতাম আন্ডারকভার মিশনে। দিন দুনিয়ার কিছুই জানতাম না। মার্টিনের কাছে শুনে বুঝলাম পৃথিবীর বারোটা বাজিয়েছে গডসক্লাব। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম সেদিন থেকে মার্টিনের পক্ষে কাজ করবো।

একদিকে মার্টিন টাইমহোল খুলতে বাধা দিচ্ছে, অপরদিকে আমার সুপারপাওয়ার দিয়ে ডাইনোসর সাবাড় করছি। গডসক্লাব তাই মরিয়া হয়ে শারীরিক নির্যাতন শুরু করলো।

মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে মুখে সায়ানাইডের অ্যাম্পুল রাখতেন তোমার বাবা। খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে অ্যাম্পুলটা বের করে নেয় ওরা, তাতে নির্যাতন করার সুযোগ পেল ওরা।

যদ্দূর জানি শরীরের সম্ভাব্য প্রতিটা জয়েন্ট ভেঙ্গেছে। জ্ঞান থাকা অবস্থায় তুলে নিয়েছে একটা একটা করে দাঁত! চাপ সামলাতে পারলেন না মনসুর মাহমুদ। মরেই গেলেন। তবু ওদের কাছে নতি স্বীকার করেননি।

তিনি জানতেন তোমাকে দুনিয়াতে আনবে ওরা। আর তুমি একবার দুনিয়াতে ফিরতে পারলেই প্রতিশোধ নেবে।

মিহির, দুনিয়ার ভবিষ্যৎ এখন তোমার হাতে। তুমিইই আমাদের শেষ ভরসা। সাহায্য করো আমাদের। দয়া করো দুনিয়ার মানুষদের।প্লিজ!” কথার শেষদিকে মিহিরের পা ধরেছিল মেগান।

শোকে স্তদ্ধ মিহির কিচ্ছু বলতে পারেনি সে রাতে। এক বাবাই ছিল আপনজন বলতে। তিনিও মরে গেলেন। উহু, মেরে ফেলা হয়েছে তাকে। তাও কি না কষ্ট দিয়ে!

পরের কয়েকদিন মেগানের সঙ্গে রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করলো মিহির। মিহিরকে কী কী করতে হবে আর মেগান কী কী করবে। একটা ফুলপ্রুফ প্ল্যান নিয়ে মেগানের কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে আসলো মিহির।

স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে আসলে সন্দেহ করতো গডসক্লাব। তাই মিহিরকে অন্য কোনো জায়গায় নিয়ে যাবার অভিনয় করতে হলো মেগানকে। সে জানতো মিহিরকে ছিনিয়ে নেবে ওরা, তাই কোনো নিরাপত্তা ছাড়া একাই চলল মিহিরকে নিয়ে।

তারপর মিহির ঢুকে গেলো গডসক্লাবের হেডকোয়ার্টারে। সেখানে গিয়ে মার্টিন মেগান যা যা শিখিয়েছে ওকে তার সব ঢুকিয়ে দিলো লুইস এক্সের মাথায়। আর সময়ে সময়ে তথ্য জানাতে লাগলো মেগানকে।

গডসক্লাবকে দুটো দলে ভাগ করার প্ল্যানটা মিহিরের। কারণ তাহলে তাদের সেন্ট্রাল কমিটির সব হর্তাকর্তাদের একসঙ্গে পাকড়াও করা যাবে।

মিহিরের সেরা চাল ছিল ক্লিফটন বিচে প্রায় সব কমান্ডোদের একসঙ্গে টাইমমেশিনের পাহারায় লাগিয়ে দেয়া, যাতে একসঙ্গে সবাইকে গ্রেপ্তার করা যায়। মেগান সবাইকে মারতে চেয়েছিল এবং মেরেছে। মিহির অবশ্য এতগুলো নির্দোষ লোককে মারার পক্ষে ছিল না তবে তাছাড়া আর উপায়ও ছিল না দেখে মেগানের নিষ্ঠুরতা মেনে নিলো।

আর মরোক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় যেই দলটা ছিল সেটার সঙ্গে তেমন কমান্ডোই পাঠায়নি, তাদের সঙ্গে টাইমমেশিন নেই; এই কারণ দেখিয়ে। ফলে সবাইকে গ্রেপ্তার করা গেছে সহজেই।

মিহির এখন ব্যস্ত গডসক্লাবের হেডকোয়ার্টারের দখল বুঝে নিতে। গ্রেপ্তার করার পরপরই লুইস এক্সকে দিয়ে বিবৃতি দিয়ে তার সাঙ্গপাঙ্গদের থামিয়ে হেডকোয়ার্টারের দখল নিয়েছে মার্টিনের অনুসারীরা। মিহির চেয়েছিল মার্টিন শাসন করুক হেডকোয়ার্টার।

কিন্ত মার্টিনের ভাষ্য, “দুনিয়া থেকে এখনো গডসক্লাব চলে যায়নি মিহির। তুমি কেবল ওদের হেডকোয়ার্টার দখলে নিয়েছো। কিন্তু দুনিয়ার কোণে কোণে ওদের শাসন অব্যাহত আছে। আমাকে সব’খানে যেতে হবে। সবাইকে বুঝিয়ে দুনিয়াতে মানুষের শাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। হেডকোয়ার্টারে বসে সেইকাজ করা সম্ভব নয়। তুমি বরং হেডকোয়ার্টারে বসে এটা নিশ্চিত করো যে আমি যখন যে সাহায্য চাইবো, সেটা তুমি দিতে পারবে।

বিদায় বন্ধু। প্রতিটা সেকেন্ডে আমাকে সঙ্গে পাবে তুমি। প্রত্যক্ষ পরোক্ষ দুইভাবেই।”

মার্টিনের কথা ফেলতে পারেনি মিহির। দায়িত্ব নিয়েছিল। আর ওকে সাহায্য করার জন্য টিম মাসীহার সুদক্ষ পরিচালনা পর্ষদকে রেখে গেছে মার্টিন।

মিহির প্রথমেই লুইস এক্সকে চাপ দিয়ে প্রচুর অর্থ বের করে নিয়েছে ব্যাংক থেকে। সেগুলো পাচ্ছে মেগান আর মার্টিন।

দুনিয়ার কোণে কোণে লড়াই অব্যাহত রেখেছে মার্টিন। একেকটা এলাকা দখল করে ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে জনপ্রতিনিধিদের হাতে।

আর ওর দখল করা এলাকাগুলো পুর্নগঠনের দায়িত্ব নিয়েছে মেগান। সেসব বাদেও দুনিয়াজুড়ে ত্রাণ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে সে।

মনসুর মাহমুদকে যেই ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, সেই ঘরেই লুইস এক্সকে আটকে রেখেছে মিহির। মাঝে মাঝে সেই ঘরে আসে সে, লুইস এক্সকে চাপ দিয়ে টাকা বের করে নেয় ব্যাংক থেকে।

ব্যাংকগুলো দখলে নিতে চেয়েছিল মিহির। মার্টিন বুঝিয়েছে, “সেই কাজ করলে তোমার সঙ্গে দুর্বৃত্ত গডসক্লাবের কোনো পার্থক্য থাকবে না।

ব্যাংকগুলো তাদের নিজের মতোই চলুক। তার থেকে উত্তম হয় তুমি পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নাও। তাহলে অন্তত একটা হাতিয়ার থাকবে তোমার কাছে।” সেটাই করেছে মিহির।

অসংখ্য ঈশ্বরের শাসন থেকে দুনিয়ার শাসনভার মানুষের হাতে তুলে দিতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে মার্টিন-মেগান-মিহির। দ্য ট্রিনিটি।

Tags: উপন্যাস, জাবির ফেরদৌস, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!