ঘুম-ঘর

  • লেখক: রণেন ঘোষ
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

 

এই কাহিনি ভাবীকালের। এ ভাবীকাল আমাদের জীবনে কেন আমাদের ভাবী কয়েক পুরুষের জীবনেও হয়তো আসবে কিনা সন্দেহ।

তবে ভারতের শ্বাশত বাণী— ‘চরৈবেতি’। এগিয়ে যাও। এগিয়ে যাও। মানব সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে। বিশ্বাস করি ধীরে ধীরে এক সময়ে আমাদের এই সভ্যতা ছড়িয়ে পড়বে গ্রহে গ্রহে, নক্ষত্রে নক্ষত্রে। মানুষের পদধ্বনি শোনা যাবে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে। সমস্ত ব্ৰহ্মাণ্ড একই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হবে। আমাদের ভাবী বংশধরদের এই বিপুল সাফল্যে গর্বে ভরে উঠছে আমাদের বুক। মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি আমাদের বংশধররা সমস্ত ব্ৰহ্মাণ্ডকে ডাক দিয়ে বলছে— শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ। যত পরেই হোক না কেন এমন একদিন আসবেই আসবে। আর সেই বিশ্বাসে আমাদের ভাবী বংশধরদের হাজির করলাম আপনাদের সামনে।

***

সমুদ্রের মধ্যে এখানে ওখানে ছিটানো কয়েকটা পামগাছ। বালির হলদের বুকে সবুজের ফোঁটা। মসৃণ সবুজ পাতার ওপর সূর্যের সোনাগলা আলো চিক চিক করে হেসে উঠছে। সমুদ্রের একটানা হাওয়ায় পাতার মধ্যে আনন্দের হিল্লোল পড়ে গেছে।

সামনে একটা পাম গাছের নিচে বহ্নি দাঁড়িয়ে। ঠিক যেন পাথরের মূর্তি। হরিণ হরিণ চোখগুলো সামনের সমুদ্রের দিকে প্রসারিত। সমুদ্রের নীল রংয়ের বুঝি ছোঁয়াচ লেগেছে চোখে।

দেখতে দেখতে দেখতে সমুদ্রের বুকে একটা কালো বিন্দু ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। শক্তিচালিত একখানা ছোট মাছধরা নৌকো হেলেদুলে ভেসে আসছে। নৌকোর এক ধারে রজত দাঁড়িয়ে। তীরের গাছপালার মধ্যে কী যেন খুঁজছে রজত।

“বহ্নি, বহ্নি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?” বহ্নির হাতে বাঁধা রেডিয়ো-ব্রেসলেট মুখর হয়ে উঠল। রজতই বহ্নিকে এই রেডিয়ো-ব্রেসলেট উপহার দিয়েছে প্রেমের নিদর্শনস্বরূপ।

“তাড়াতাড়ি চলে এস, বহ্নি— প্রচুর মাছ ধরেছি।” হ্যাঁ, এতক্ষণে বোঝা গেল তাড়াতাড়ি আসতে বলার কারণ। মাছগুলো নাবাতে হবে। কাজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। বহ্নি তাই যাবে না ঠিক করল। বেশ কয়েকবার শোনা গেল রজতের গলা। অনেক কাকুতি মিনতির পর দুষ্টুমী হাসিতে ভরে উঠল বহ্নির মুখ। বেশ জব্দ হয়েছে রজত। কিন্তু তবুও বহ্নি কোনও কথা বলল না রেডিয়ো-ব্রেসলেট মারফত। শুধু আস্তে আস্তে গাছের আড়াল থেকে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে গেল বহ্নি।

রজতের নৌকো তীরে এসে লাগল। বহ্নিকে আসতে দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল রজত। আদরে আদরে অস্থির হয়ে উঠল বহ্নি।

“বলো বলো— আর রাগ করবে না। কোনওদিনও ছেড়ে যাবে না বলো আমাকে।”

দুজনে মিলে নৌকা থেকে মাছগুলো নাবিয়ে ফেলল। মাছের আঁশটে গন্ধে ভোরের বাতাস ম ম করে উঠল। বহ্নি রুমাল চাপা দিল নাকে।

সত্যি অনেক মাছ। বিয়ের পর বহ্নির কোনও অভাবই থাকবে না। সুখে থাকবে রজতের ঘরে।

নতুন গ্রহের এই জীবগুলো ঠিক মাছের পর্যায়ে পড়ে না। বহু লক্ষ বছর আগে এদের দেহে আঁশের আবির্ভাব ঘটেছিল। এখন সারা গায়ে শক্ত খোলার আবরণে ঢাকা। কিন্তু খুব সুস্বাদু এদের মাংস। এই গ্রহের প্রথম মানুষেরা এদের নামকরণ করেছে পৃথিবীর রীতি অনুযায়ী। পৃথিবীর কথা মনে হতে বহ্নির মনটা কেমন যেন হু হু করে উঠল। কোনওদিনও সে দেখতে পাবে না মাটির পৃথিবীকে।

“কত মাছ ধরেছি বলো তো? জালটা তবুও ছেঁড়া ছিল, আজকে সারাতে হবে জালটা।” —বেশ গর্বের সঙ্গে বলল রজত।

কয়েক পা এগিয়ে ছোট্ট একটা গাড়িতে উঠে পড়ল বহ্নি। বালির সমুদ্রে এই গাড়িগুলো বিশেষ উপকারী। রজত একে একে মাছগুলো তুলল গাড়িতে। তারপর গাড়িটাকে সজোরে সামনের দিকে ঠেলে লাফিয়ে উঠে পড়ল। বালিয়াড়ির মধ্যে সজোরে ছুটে চলল গাড়ি। কিন্তু কিছুদূর আসতেই থামতে হল ওদের।

নীল আকাশের গায়ে সাদা মতো কী যেন ফুটে উঠল। অবাক হয়ে দুজনে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সাদা বস্তুটার পেছন থেকে ধোঁয়ার মতো কী যেন দেখা যাচ্ছে।

এবার একটা ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। ক্রমশ বেশ জোর হচ্ছে। ওদের কয়েক পুরুষ এই অদ্ভুত শব্দ শোনেনি। অজানা আতঙ্কে বহ্নি শক্ত করে চেপে ধরল রজতের হাত। আকাশের অদ্ভুত বস্তুটা বেশ ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে এখন। তীক্ষ্ণ কর্কশ শব্দে আকাশ বাতাস ভরে উঠছে। অকস্মাৎ দিগন্তের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল বস্তুটা। চমক ভেঙে ওরা পরস্পরের দিকে তাকাল। বিচিত্র এক আনন্দের হাসি ফুটে উঠল ওদের মুখে। মনে মনে একটা কথাই ধ্বনিত হল— পৃথিবী থেকে আসছে।

প্রায় তিনশো বছর পরে মাটির পৃথিবীর কি মনে পড়ল নন্দনকে! তিনশো বছর আগে মানুষের প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল নন্দনে! আবার কে জানে কী বার্তা এনেছে মাটির পৃথিবী?

বহুক্ষণ ধরে এই কথাগুলো মনে হল বহ্নির। কেন! আবার কী আসবে পৃথিবী? এই জলমগ্ন নন্দনে তো আর বসবাসের উপযোগী জমি নেই। এ কথা তো পৃথিবীর অজানা নয়। তবে?

পাঁচশো বছর আগে মহাকাশ থেকে নন্দন গ্রহকে জরীপ করেছিল রোবট স্পেশশিপ। নক্ষত্রলোক ভ্রমণে পৃথিবীর তখন হাতে খড়ি। মানুষের আগমনের আগেই ইলেকট্রনিক রোবট স্পেশশিপ বহুবার পাক খেয়েছে অজানা সূর্যের চারপাশে। বহু গবেষণা করতে হয়েছে মানুষকে। মৌমাছির মতো একটি-একটি করে বহু তথ্য অজানা গ্রহ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিল রোবট স্পেশশিপ। আর তার ফলেই সম্ভব হয়েছে অজানা নক্ষত্রলোকে মানুষের অভিযান।

সেই রকম একটি রোবট স্পেশশিপের আবিষ্কার এই গ্রহ। পৃথিবীর লোক নাম দিয়েছিল নন্দন। নন্দন কানন। জলরাশিবেষ্টিত একখণ্ড জমি নিয়ে এই নন্দন। বহুদিন পরে হয়তো এই বিপুল জলরাশির মধ্যে মাথা ঠেলে উঠবে আরও অনেক দ্বীপ। কিন্তু অনেক দেরি আছে সেই অনাগত দিনের।

নন্দনকে জরীপ করতে প্রায় ১০০ বছর লেগেছিল রোবট স্পেশশিপের। আর তার পর আরও ১০০ বছর লেগেছে রোবট আনিত তথ্যের বিশ্লেষণ করতে। অবশ্য প্রথমে নন্দন মানুষ বসবাসের উপযোগী বলে বিবেচিত হয়নি। কারণ নন্দনের দশ ভাগের নয় ভাগ জল। এরচেয়ে আরও অনেক ভালো গ্রহের সন্ধান পেয়েছিল পৃথিবী। এখান থেকে মাইল দশেক দূরে প্রথম অভিযাত্রী দল পদার্পণ করেছিল। তারাই বহ্নিদের পূর্বপুরুষ। তারাই নন্দনকে মনুষ্য বাসের উপযোগী করে তুলেছে। বহু কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছিল তাদের। তারা এদের নমস্য।

নন্দনের জমি খুব উর্বর। প্রচুর মাছ পাওয়া যায় এখানকার সমুদ্রে। এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। বেশ শহর কলকারখানাও গড়ে উঠেছে এখানে। নন্দনের অধিবাসীরা বেশ সুখী। নতুন নতুন উন্নতির প্রয়াস বোধহয় প্রথম দু-পুরুষ পর্যন্ত ছিল। তারপর আস্তে আস্তে বিনিময়ে এসেছে ওদের উৎসাহ। তবে এখনও পৃথিবী সম্বন্ধে অসীম কৌতূহল এদের।

রজতের পৌঁছানোর আগেই অনেক জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে গেছে। এইমাত্র খবর এল উত্তর সীমান্তে স্পেশশিপটা খুব নিচু দিয়ে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে। খুব সম্ভব নামবার উপযুক্ত জায়গা খুঁজছে।

“ওদের বোধহয় পুরোনো মানচিত্রটাই আছে। তা নাহলে উত্তর সীমান্তে নামবার চেষ্টা করবে কেন?” মন্তব্য করল একজন।

ইতিমধ্যে শহরের সমস্ত যানবাহন উত্তর দিকে চলতে আরম্ভ করেছে। বহ্নির বাবা শ্রী অগ্নিশ্বর রায় এই শহরের মেয়র। তিনি নিজে মোটর হাঁকিয়ে চললেন উত্তর দিকে। বহ্নিও বাবার সঙ্গে চলল।

নানান ধরনের যানবাহনের এক বিরাট মিছিল। বিচিত্র অপরূপ দেখতে লাগছে। সামনে পথের একপাশে একটা বিরাট পাথরের ফলক মাথা উঁচু করে রয়েছে।

~নন্দনে প্রথম অভিযাত্রী দলের অবতরণ ক্ষেত্ৰ~

১ জানুয়ারী, ‘০’ বছর

(২৮ মে ২৬২৬ খ্রিস্টাব্দ)

বহ্নি মনে মনে উচ্চারণ করল এই লেখাগুলো। সকলে মনে করেছিল এই প্রথমই শেষ। দ্বিতীয় অভিযান আর হবে না। কিন্তু…

হঠাৎ মাথা উঁচু করে অবাক হয়ে গেল ওরা সবাই। স্পেশশিপটা খুব নিচে নেমে এসেছে। কিন্তু কোনও শব্দ নেই। শুকনো পাতার মধ্যে হাওয়া যাওয়ার মতো কেবল একটানা সরসর শব্দ উঠছে। সাদা বিরাট একটা ডিমের মতো দেখতে লাগছে ওটাকে। বহ্নির মনে হল ডিম ফুটে হঠাৎ একটা বাচ্চা বেরিয়ে আসবে। বহ্নির সমস্ত কল্পনাই অদ্ভুত।

“কত ছোট স্পেশশিপটা,” —ফিসফিস করে বহ্নিকে বলল একজন। “এটা করে নিশ্চয় পৃথিবী থেকে আসা যায় না।”

“নিশ্চয় না।” গভীর প্রত্যয়ে পাশ থেকে উত্তর দিল অন্য মত।

“এটা একটা ছোট লাইফ বোট। আসল স্পেশশিপটা অনেক ওপরে আকাশের মধ্যে আছে। প্রথম অভিযাত্রী দলের কথা ভুলে গেলে নাকি?”

“আস্তে আস্তে! ওরা নেবে আসছে!”

গভীর উত্তেজনায় সবাই অধীর হয়ে উঠল। ওই ডিম্বাকৃতি বস্তুটার মসৃণ গা থেকে ছোট একটা দরজা খুলে গেল। কিন্তু তবুও কাউকে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল না। বহ্নির চোখের পাতা পড়ছে না। অনেক কথা মনে ভিড় করে আসছে। এরা কারা? যদি পৃথিবীর লোক না হয়?

কিছুক্ষণের মধ্যে আগন্তুকেরা একে একে বাইরে বেরিয়ে এল। অজানা সূর্যের তীব্র আলোকে ওদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। কয়েকজন হাত চাপা দিল চোখে। বহ্নি গুনে দেখল সংখ্যায় ওরা সাতজন। না, অতি মানবতার কোনও চিহ্ন নেই ওদের মধ্যে। বহ্নি বেশ মনঃক্ষুণ্ণ হল। মনে মনে অনেক কল্পনা করেছিল সে।

আগন্তুকেরা নন্দনবাসীদের চেয়ে মাথায় বেশ উঁচু। নাক চোখ মুখ খুব কাটা কাটা তীক্ষ্ণ। গায়ের রং ফরসা। পেশিবহুল ছিমছাম ওদের হাবভাব দেখে খুব হাসি পেল বহ্নির। অহেতুক ওরা ভীত সচকিত হয়ে উঠেছে।

মেয়র শ্রী অগ্নিশ্বর রায় সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। অভ্যর্থনার কথাগুলো সারা পথ মুখস্থ করতে করতে এসেছেন। উত্তেজনায় হাত পা বেশ কাঁপছে। একটা বিষয়ে মেয়র এখনও চিন্তা করছেন। যদি এরা পৃথিবীর লোক না হয়?

“নন্দনের পক্ষ থেকে আপনাদের সাদর আমন্ত্রণ জানাই। আশা করি আপনারা নিশ্চয় পৃথিবী থেকে আসছেন।”

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ, ওরা কি পৃথিবীর লোক? নন্দনের ভাষা কি ওরা বুঝতে পারবে? কিন্তু সকল উদ্বেগের সমাধান করে আগন্তুকরা পৃথিবীর ভাষাতেই উত্তর দিল। আর তখুনি বহ্নির দৃষ্টি পড়ল নিলয়ের ওপর।

এক মুহূর্তে বহ্নির যেন সমস্ত কিছু ওলটপালট হয়ে গেল। এ এক বিচিত্র অনুভূতি। এর আগে কোনওদিন অনুভব করেনি বহ্নি। সমস্ত মনটা হঠাৎ ভয়ে উত্তেজনায় রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। কি অনাস্বাদিত পুলক লাগছে সমস্ত শরীরে।

নিলয় সঙ্গীদের মতো লম্বা। পেশিবহুল সুগঠিত দেহ। বড় বড় কালো চোখ। জোড়া ভ্রূর নিচে যেন নিথর কালো শত দিঘি। কী যেন এক মোহময় আকর্ষণ আছে নিলয়ের চোখ দুটিতে। মধুর এক অজানা আকর্ষণ অনুভব করছে বহ্নি। বহ্নির সমস্থ দেহমন স্থান কাল পরিবেশের বাধা কাটিয়ে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ হল।

আলাপ পরিচয়ের পালা সাঙ্গ হতে হতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। সারা শরীর ক্লান্তিতে অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু নিলয়ের দু-চোখে ঘুমের রেশমাত্র নেই। অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারল না নিলয়। কয়েক সপ্তা আগের কথা মনে পড়ল। স্বয়ংক্রিয় বিপদজ্ঞাপক ঘণ্টাধ্বনিতে ঘুম ভেঙে যায় নিলয়ের। আর তারপর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মহাকাশ যান রক্ষার কী অসম্ভব চেষ্টা করেছে ওরা, নন্দনের মতো নিরাপদ জায়গায় অবতরণ করা যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। উঃ কি সাংঘাতিক বিপদ গেছে। কে জানত যে এত কাছে একটা সুন্দর গ্রহ আছে। এখন অন্তত একটা বিষয়ে ওরা নিশ্চিন্ত যে মহাকাশ যান সারানো না গেলেও বাকি জীবনটা নন্দনে ভালোভাবে কাটাতে পারা যাবে। নাই-বা হল তিন শতাব্দীর অভিযান সফল করা। তবু তো মহাশূন্যে দমবন্ধ হয়ে মারা পড়তে হবে না। জাহাজডুবি নাবিকদের এ ছাড়া কাম্য আর কোনও কিছু নেই। শুধুমাত্র বেঁচে থাকার আশ্বাস!

নন্দনের বুকে এই প্রথম রাত্রি। বড় অদ্ভুত লাগছে নিলয়ের। বাইরে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সারা আকাশ জুড়ে অজানা গ্রহ-নক্ষত্রের মেলা। পৃথিবী থেকে এত দূরেও মানুষের বসবাস রয়েছে। রিগেল নক্ষত্রের আলো কি এখান থেকেও দেখতে পাওয়া যায়। রিগেল এখনও বহু আলোকবর্ষ দূরে। নিলয়দের গন্তব্যস্থল ওই রিগেল নক্ষত্রে। অনেক এলোমেলো চিন্তা ভীড় করে এল নিলয়ের মাথায়।

জোর করে এসব চিন্তা মন থেকে তাড়াবার চেষ্টা করল। মনে মনে অনেক কথাই বলল নিলয়। সুদূর নক্ষত্রের কথা ভুলে যাও। অনেক সময় পাবে ওদের কথা ভাববার। তোমার চারদিকে তাকিয়ে দেখ। পৃথিবী আর রিগেলের মধ্যে নন্দনের অস্তিত্ব হয়তো নগণ্য। কিন্তু একে তো দ্বিতীয়বার আর দেখতে পাবে না। কিছুদিনের মধ্যে তোমাকে যাত্রা করতে হবে সুদূর নক্ষত্রলোকে। দুশো বছরের মধ্যে হয়তো তোমাকে আর থামতেও হবে না…

সঙ্গীরা সবাই ঘুমে অঘোর। আস্তে আস্তে উঠে পড়ল নিলয়। বাইরে ঠান্ডা হাওয়ায় ঘুরে আসলে হয়তো ঘুম আসতে পারে। ইতিমধ্যে রাতের নন্দনকেও দেখা যাবে। ‘নন্দন’ নামটাও কী সুন্দর। কী মিষ্টি! নন্দন! নন্দন!

ঘর ছেড়ে রাস্তায় পা দিল নিলয়। চারিদিক নিস্তব্ধ নিথর। কোনও প্রাণের স্পর্শ নেই কোনওখানে। দু-পাশের ঘুমন্ত বাড়িগুলো প্রহরীর মতো পাহারা দিচ্ছে। ছোট্ট শিশুর মতো আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠল নিলয়।

সারি সারি মাছধরা নৌকোগুলো দেখা যাচ্ছে। নৌকোগুলোর সামনে জলের সীমারেখা চিক্ চিক্ করছে। আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে গেল নিলয়।

নৌকোগুলো দেখে উৎসুক হয়ে উঠল নিলয়। কারিগরীবিদ্যার কিছুটা পরিচয় পাওয়া যাবে এ থেকে। দেখতে পাওয়া যাবে কেমন করে ওরা বশ করেছে অশ্রান্ত সমুদ্রকে।

নৌকোগুলির বহিরাবরণ শক্ত অভঙ্গুর প্লাস্টিকের তৈরি। দু-পাশে বিদ্যুৎচালিত মাছ ধরার জাল রয়েছে। বেতার যোগাযোগের জন্যে একটি করে অ্যান্টেনা আছে। নৌকোর ঠিক সামনের রয়েছে স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎচালিত মোটর। এদের কারিগরী বিদ্যা বর্তমান পৃথিবী থেকে অনেক পেছিয়ে আছে ভাবল নিলয়। জটিল যন্ত্রপাতি সমন্বিত নিউক্লিয়ার জাহাজ এখন পৃথিবী সমুদ্রসম্পদ আহরণ করে। পৃথিবীতে এখন সমুদ্র তলদেশও পতিত থাকছে না। পৃথিবীর শাকসবজি ফলমূলের প্রধান ঘাঁটি সমুদ্রের তলদেশ। সে তুলনায় এদের এই প্রয়াস হাস্যকর। কিন্তু তবুও তো নন্দনবাসীরা সুখে আছে। হঠাৎ তার মনে হল এখানে চিরজীবনের মতো থেকে গেলে ক্ষতি কি! এই শান্ত জীবন তো সকলেরই কাম্য। কী হবে সুদূর নক্ষত্রলোকে অভিযান করে? অজান্তে এক সুগভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল নিলয়। এ হবার নয়। হতে পারে না।

পায়ের সামনে জলের সীমারেখা। বড় বড় ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে পায়ের সামনে। প্রচণ্ড আক্রোশে ফুলে ফুলে উঠছে আদিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। বারে বারে সে ঝাঁপিয়ে পড়ছে শক্ত বেলাভূমির ওপর। পায়ের নিচে নানান আকারে শামুক ছড়ানো। বিবর্তনবাদের অনেক ধাপ পেছিয়ে আছে নন্দন। পৃথিবীর বুক থেকে অনেককাল আগেই লুপ্ত হয়ে গেছে এই ধরনের শামুক। প্রতি গ্রহে একই জীবন লীলায় মত্ত প্রকৃতি। আরও কত গ্রহে জীবনের বিকাশ হয়েছে কে জানে! এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে কত গ্রহ আছে?

হলদে মিষ্টি আলোয় ভরে উঠল নন্দনের রাতের আকাশ। নন্দনের আকাশে ১নং চাঁদ সেলেনা বড় হয়ে উঠছে। সমুদ্রবক্ষে নিমগ্ন দিগন্ত রেখা থেকে অস্বাভাবিক গতিতে উঠে এল সেলেনা। সমস্ত সমুদ্র তীর আবছা আলোয় ভরে উঠল।

আর এই আলোয় নিলয় দেখল সে একা নয়। অল্প দূরে নৌকোর ওপর একটি মেয়ে বসে আছে। নিলয় মেয়েটির পেছনে আছে বলে এখনও দেখতে পায়নি মেয়েটি। কি রকম অস্বস্তি বোধ করল নিলয়। এখানকার আদবকায়দা সে কিছু জানে না। সুতরাং মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়াটা বোধহয় উচিত হবে না। এই নিরিবিলি নির্জন সমুদ্র তীর… না, ঘরে ফিরে যাওয়াই ভালো ভাবল নিলয়।

অকস্মাৎ মেয়েটি ঘাড় ফেরাতেই ধরা পড়ে গেল নিলয়। নিলয় বুঝল এখন পালিয়ে যাওয়া নিরর্থক।

বহ্নি মনে মনে যেন নিলয়কেই কামনা করছিল। নিলয় নিশ্চয় আসবে এখানে। এরকম চিন্তা করা অস্বাভাবিক। কিন্তু কেন জানি বহ্নি এবিষয়ে স্থির নিশ্চয় ছিল। বিছানায় শুয়েও ঘুমোতে পারেনি বহ্নি। কী এক অস্বস্তিতে ছটফট করেছে। সারাদিন চোখের সামনে ভেসে উঠেছে নিলয়ের ছবি। আর ইতিমধ্যে বহ্নি নিলয় সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনেছে।

নিলয়দের বিশ্রামাগার আর বহ্নির বাড়ি প্রায় সামনাসামনি। মাঝখান দিয়ে কেবল রাস্তা চলে গিয়েছে। নিলয়কে দেখার জন্যে সারাক্ষণ জানলায় বসে ছিল সে। আর সেই নিলয় এখন তার মুখোমুখি। মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ দিল ভগবানকে।

নিলয়ের মুখটাই যেন হাসি হাসি। ভাবল বহ্নি। পাণ্ডুর চাঁদের আলোয় সেই হাসি এক অপূর্ব মাদকতার সঞ্চার করল।

“আপনাকে এখানে দেখতে পাব বলে ভাবিনি। আশা করি আপনাকে অসুবিধায় ফেলিনি নিশ্চয়ই।”

“না না, এরকম, এরকম কথা বলছেন কেন?” সপ্রতিভভাবে উত্তর দিল বহ্নি।

“আমি পৃথিবীর মানুষ। নন্দনের আদব কায়দা কিছুই জানি না। তাই…।” একটু হেসে বলল নিলয়।

বহ্নি কোনও কিছু বলার আগেই চকিতের মত সবকিছু মনে পড়ল নিলয়ের। এই মেয়েটিকে তো সে আগে দেখেছে। এই মেয়েটিই তো অবাক হয়ে চেয়েছিল তার দিকে। সারা পথ বারে বারে মেয়েটি চেয়ে দেখছিল তাকে।

তবে কী?

দুজনে নির্বাক। কোনও কথা না বলে মুখ নিচু করে পায়ের আঙুল দিয়ে একমনে বালি খুঁড়ে চলেছে বহ্নি। চাঁদের আলোয় মুক্তার মতো দু-একটা বালির কণা চিকচিক করছে। নিলয় যেন সমস্ত কথা হারিয়ে ফেলেছে। অপরিচিতের গণ্ডী যেন আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী আর নন্দন যেন খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। অন্যমনস্কভাবে ওরা দুজনে সামনের নৌকোটার ওপর বসে পড়ল। মনের গভীরে কত কথাই না অনুরণিত হচ্ছে। নির্বাক মনের বোবা ভাষাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুজনের সামনে।

বোধহয় অন্যায় হচ্ছে এভাবে বসে থাকা— ভাবল নিলয়। কী দরকার এখানে বসে থাকার! কী অধিকারে নন্দনের শান্ত জীবনে ঝড় ডেকে আনবে নিলয়। কিছু সময় তারা নন্দনের বুকে আশ্রয় নিয়েছে এইমাত্র। বরং ক্ষমা চেয়ে চলে যাওয়াই ভালো। নির্জন সমুদ্রতীরে এভাবে দেখা হওয়াটাই বোধহয় ঠিক নয়।

এত ভেবেও কিন্তু উঠে চলে যেতে পারল না। সামনে সমুদ্র বক্ষে সেলেনার সম্পূর্ণ ছবি ভেসে উঠেছে। হলদে আলোয় সোনার মুকুট পরে ঢেউগুলো উঠছে আর পড়ছে। বাতাসে জলজ গন্ধ ভেসে আসছে। এই নির্জন ঘুমন্ত নন্দনে কি এক চিরন্তন জিজ্ঞাসায় বসে আছে ওরা দুজনে।

“আপনার নাম কী?”

গলার স্বরে চমকে উঠল বহ্নি। একটু পরে বলল— “বহ্নি। বহ্নিশিখা রায়।” উচ্চারণে কেমন একটা অদ্ভুত টান আছে। নন্দনের বৈশিষ্ট্য এটা। বেশ মিষ্টি লাগে শুনতে।

“আর আমার নাম নিলয় রায়। ওই তারার জাহাজ দেবযানের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রপালসন ইঞ্জিনীয়ার।” —অল্প হেসে নিজের পরিচয় দিল নিলয়।

“নন্দনকে কেমন লাগছে আপনার?”

“এত তাড়াতাড়ি কি বলা সম্ভব? কিছুদিন থাকলে বলতে পারা যাবে।”

“আপনি মানে আপনারা কি অনেকদিন থাকবেন এখানে?” একটু থেমে থেমে বলল বহ্নি।

এবার নিলয়ের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল বহ্নির মনোভাব। এই আশঙ্কা সে করছিল।

“ঠিক বলতে পারছি না। তবে দেবযান সারানো পর্যন্ত তো থাকতে হবে।” সত্যি কথাই বলে ফেলল নিলয়।

“কী খারাপ হয়েছে দেবযানের?”

“ওহো সেটাই তো বলতে ভুলে গেছি। দেবযানের Meteor স্ক্রিনটা বড় একটা উল্কা লেগে গেছে। সুতরাং নতুন একটা Meteor স্ক্রিন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত থাকতে হবে এখানে।”

“এখানে কি তৈরি করা সম্ভব হবে?”

“সম্ভব হবে বলে তো আশা করি। দেবযানের কাছে মহাকাশে কয়েক লক্ষ টন জল তোলাই এখন বড় সমস্যা।”

“জল! জল কী হবে? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।”

“বুঝতে পারছেন না? আচ্ছা তাহলে প্রথম থেকেই বলছি। আপনি নিশ্চয় জানেন যে তারার জাহাজ (স্টারশিপ) প্রায় আলোর গতিতে চলে। কিন্তু এই গতিবেগ থাকা সত্ত্বেও এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে যেতে বেশ কয়েক বছর লাগে। যেমন আমাদের লাগছে। আর এত সময় তো বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং যাত্রাপথের বেশির ভাগ সময় খুব ঠান্ডায় ঘুমিয়ে থাকতে হয়। ঠান্ডায় ঘুমিয়ে থাকার সময় কিন্তু বয়সের কোনও তারতম্য হয় না। এই সময় জাহাজ চালাবার ভার থাকে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ওপর।”

বহ্নি মাথা নাড়ল। “নিশ্চয় জানি এসব। আমাদের পূর্বপুরুষরা তো এভাবেই এসেছিল এখানে।”

“যাক, তাহলে জানেন দেখছি।” হাসিমুখে বলল নিলয়। “এবার আসল কথায় আসি। মহাকাশ যদি সত্যি শূন্য হত তবে এত গতিবেগ কোনও সমস্যার সৃষ্টি করত না। কিন্তু মহাকাশ তো শূন্য নয়। একটি তারার জাহাজের যাত্রাপথে প্রতি সেকেন্ডে নানান আকারে বস্তুর সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য। আর জাহাজের প্রবল গতিবেগের জন্য এই সমস্ত সংঘাতও হয় প্রচণ্ড জোরে। সুতরাং এই সংঘাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যে প্রত্যেক তারার জাহাজের মাইল খানেক আগে একটি করে শীল্ড রাখা হয়। সমস্ত মহাজাগতিক পদার্থগুলো এই শীল্ডের সংস্পর্শে এসে নিজেরাই ভস্মীভূত হয়ে যায়। আর এই শীল্ডকেই বলা হয় মেটিয়র স্ক্রিন বা উল্কাচাদর। আচ্ছা, আপনাদের এখানে নিশ্চয় ছাতার ব্যবহার আছে?”

“থাকবে না কেন? নিশ্চয় আছে।” —বেশ জোর দিয়ে বলল বহ্নি।

“তাহলে তো আরও ভালো করে বুঝতে পারবেন। মাথার ওপর ছাতা মেলে যেভাবে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, ঠিক এই শীল্ডগুলো ছাতার মতো রক্ষা করে এই তারার জাহাজগুলোকে। আর সেই রক্ষাকারী ছাতাই আমাদের ভেঙে গেছে।”

“শীল্ডগুলো কি জল দিয়ে তৈরি হয় নাকি?” —একরাশ বিস্ময় ঝড়ে পড়ল বহ্নির স্বরে।

“হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন আপনি। আমাদের সৌরজগতে জলই সবচেয়ে সহজলভ্য। জলকে বরফ করে শীল্ডের কাজ চালান হয়। ছাতার মতো এই শীল্ডই একমাইল আগে আগে চলে তারার জাহাজের সঙ্গে।”

বহ্নি চুপ করে বসে রইল। অনেকক্ষণ পরে আস্তে আস্তে বলল— “তাহলে ১০০ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে এসেছেন আপনি!”

“না, ১০৪ বছর। কিন্তু মনে হচ্ছে কয়েক সপ্তাহ মাত্র। কারণ কি জানেন মিস রায়, ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে ঠান্ডা ঘরের গভীর ঘুম থেকে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রচালক ডেকে তোলে আমাদের। বাকি সব যাত্রীরা এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এখানকার কোনও ঘটনাই তারা জানবে না।”

“আচ্ছা, এখানে কাজ শেষ হলে রিগেল নক্ষত্রে না পৌঁছান পর্যন্ত আপনিও ঠান্ডা ঘরে ঘুমিয়ে থাকবেন তো?” —এক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল বহ্নি।

অশ্রান্ত সমুদ্র নিরবচ্ছিন্ন গর্জন করে চলেছে। নিস্তব্ধ রাত্রে এই অশান্ত গর্জন কেমন যেন উদাস করে তোলে মনকে। নিঃসঙ্গ একাকী মনে হয় নিজেকে। অব্যক্ত ব্যথা যেন গুমরে গুমরে মনের মধ্যে আছাড়ি পিছাড়ি খায়।

নিলয় ওর দিকে না তাকিয়ে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, তা যা বলেছেন। আর কোনও বিপদ না ঘটলে আগামী দুশো বছর ঠান্ডা ঘরে ঘুমিয়ে থাকতে হবে।”

“দেবযানের আপনার ঘুমন্ত সঙ্গীদের জন্যে দুঃখ হয়। নন্দনের কোনও কিছু জানতেও পারল না তারা।”

“ঠিক কথা বলেছেন আপনি। আমরা এই পঞ্চাশজনই দেখতে পেলাম নন্দনকে— আপনাদের। আর সকলের কাছে নন্দনের অস্তিত্ব খুবই নগণ্য। শুধু লগ বুকে লেখা থাকবে যে যাত্রার ঠিক ১০০ বছরের মাথায় দেবযান একবার নেমেছিল নন্দনে।”

নিলয় বহ্নির দিকে তাকাল। চাঁদের আলো এসে পড়েছে মুখে। অবাধ্য হাওয়া দু-একটা চূর্ণকুন্তল নিয়ে খেলা করছে। কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়। এই কি মোহ, ভালোবাসা, ভাবল নিলয়। কিন্তু বহ্নির চোখে মুখে কেমন যেন একটা বিষাদের ছায়া।

“আমাদের কথা ভেবেই কি আপনি কষ্ট পাচ্ছেন মিস রায়?” —অকস্মাৎ প্রশ্ন করল নিলয়।

কোনও কথা বলল না বহ্নি। কেমন করে নিজের মনের অবস্থা বোঝাবে নিলয়কে, সময়ের এই অসীমত্বে হয়তো কোনও দাম নেই মানুষের আশাআকাঙ্ক্ষার। তিনশো বছরের অভিযানের মধ্যে মাত্র ১০০ বছর শেষ হয়েছে। আরও দুশো বছর এখনও বাকি। ভাবতেও বুকের মধ্যে শির শির করে ওঠে। কিন্তু হৃদয়ের কি কোনও দাম নেই সময়ের কাছে?

হঠাৎ বহ্নির মনে হল রাত্রিটা বেশ ঠান্ডা। মনে পড়ল বাড়ির কথা, মা বাবা ভাই বোনদের কথা। বাড়ির কথা ভাবতেও যেন আনন্দ হয়। নন্দনে তার জন্ম। নন্দনের মতো আপন আর কেউ নয়। দীর্ঘ তিনশো বছরের কথা শুনে বেশ ভয় লাগে। না না, তার জীবনের সঙ্গে এই অভিযানের কোনও সংস্পর্শ নেই। এক্ষুনি বাড়ি ফিরতে হবে।

বহ্নি উঠে দাঁড়াল। নৌকোর দিকে দৃষ্টি পড়তেই অবাক হয়ে গেল সে। কি আশ্চর্য, ওরা এতক্ষণ রজতের নৌকার ওপর বসেছিল। রজতের কথা মনে হতেই কেমন যেন নিজেকে অপরাধী মনে হল। রজতের সঙ্গে সে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। এতদিন তো সে রজত ছাড়া কাউকে ভাবতে পারেনি। কিন্তু এখন। নিজের মনকে সে কী করে বোঝাবে যে এটা অন্যায়, অসঙ্গত। আস্তে আস্তে নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে সে।

“কি হল? ঠান্ডা লাগছে নাকি?” —প্রশ্ন করল নিলয়। হাত দিয়ে স্পর্শ করল বহ্নিকে। বহ্নির সর্বাঙ্গে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল। থর থর করে কেঁপে উঠল। এক অজানা উত্তেজনায় মুখর হয়ে উঠল প্রতিটি রোমকূপ। কিন্তু পরক্ষণেই শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিল বহ্নি।

জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিল সে।

“না না, কিছু হয়নি আমার। কিছু হয়নি” —উত্তেজনায় কথাগুলো জড়িয়ে গেল বহ্নির! “নমস্কার। অনেক দেরি হয়ে গেছে। এবার বাড়ি ফিরতে হবে।”

আকস্মিকতায় বিহ্বল হয়ে গেল নিলয়। স্পর্শ করার মধ্যে অন্যায় কোথায়? তবে…।

ইতিমধ্যে বহ্নি অনেক দূর চলে গেছে। নিলয়ও দ্রুত কয়েক পা এগিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল— “আবার কি দেখা পাব?”

বাতাসের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ছাড়া আর কোন কিছু শুনতে পেল না নিলয়। বহ্নি উত্তর দিয়ে থাকলেও বাতাস শত্রুতা করল নিলয়ের সঙ্গে। আস্তে আস্তে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল বহ্নি। নারী রহস্যময়ী। Frailty, thy name is woman এই কথাই বারে বারে মনে হল নিলয়ের।

অনেক দূরে মহাকাশে অবস্থিত দেবযান এখন নন্দনের সমস্ত অধিবাসীদের আলোচ্য বস্তু। নন্দনের আকাশ দেবযানই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। নন্দনের আকাশে দুটো চাঁদ ছাড়া রাতের বেলা সবচেয়ে উজ্জ্বল দেবযান।

নিলয়রা ছোট ছোট দলে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। Antigravity স্কুটারও এদিক সেদিক যাতায়াত করছে। মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে নিঃশব্দে চলাফেরা করছে স্কুটারগুলো। নিলয়রা যেন ঠিক ভালোভাবে মিশতে পারছে না। কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব। নন্দনের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কোনও অনুষ্ঠানেই যোগ দেয়নি ওরা। ওরা অবশ্য নিজেদের অক্ষমতার কারণ বিবৃত করেছে। বলেছে শীল্ড তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কোনও বিশ্রাম নেই ওদের।

কয়েক দিনের মধ্যে অনেক যন্ত্রপাতি দেবযান থেকে নাবিয়ে এনেছে ওরা। কয়েকটা জমিও জরীপ করা হয়ে গেছে। এখানে সেখানে ড্রিল করে নন্দনের ভূস্তর পরীক্ষা করা হচ্ছে। আরও কত যে পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে ওদের তার ইয়ত্তা নেই। এখানকার বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও পরামর্শ করে ওরা।

প্রথম সাক্ষাতের ঠিক দু-দিন পরে বহ্নি আর নিলয়ের আবার দেখা হল। বহ্নি অবশ্য নিলয়কে পেটমোটা ফোলিও ব্যাগ হাতে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। কিন্তু মৃদু সম্ভাষণ ছাড়া আর কোনও কথা হয়নি ওদের। একটু চাওয়া, একটু হাসিতে বহ্নি অধীর হয়ে উঠেছে। মনের গোপন কোণে এক অবদমিত কামনা ধীরে ধীরে মুকুলিত হয়ে হয়ে উঠেছে। রজত যেন এক অচেনা লোক বলে মনে হয় এখন। রজত যেন এখন দূরের মানুষ।

কিন্তু অতীতকে ভুলতে পারেনি বহ্নি; অনেকবার ঝগড়া হয়েছে রজত আর বহ্নির মধ্যে। ঠিক করেছে আর কোনদিন দেখা করবে না ওরা। কিন্তু তবুও ঠিক সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ওদের দেখা হয়েছে। ওরা জানত আর যাই হোক ছাড়াছাড়ি হবে না ওদের কোনদিনও। কিন্তু এখন? এখন বহ্নি তো জোর করে বলতে পারে না যে রজত ছাড়া আর কাউকে চায় না সে। বরং…

অনেক কথাই মনে হয়। মনে হয় সেকি দ্বিচারিণী হয়ে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, না দ্বিচারিণী একটা বিশ্রী কথা মাত্র। বহ্নির কোনও যোগ নেই এর সঙ্গে। বিয়ের পরিণাম যদি কুৎসিত মনোমালিন্য হয় তবে সে বিয়ে নিশ্চয় কারুর কাম্য নয়। বহ্নি বিশ্বাস করে বাজারের তরিতরকারীর মতো অপছন্দ হলে বিয়েটা ফেরত পাঠান যায় না। বিয়ের আগে যদি একজনের মনেও সামান্যতম সন্দেহ বা দ্বিধা আসে তবে সমস্ত বিষয়টা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে দেখা দরকার। বর্তমানের ছোট্ট বীজ ভবিষ্যতে উপযুক্ত পরিবেশে মহীরুহ আকার ধারণ করতে বেশি সময় লাগে না। সুতরাং…

ভাবনার যেন শেষ নেই। কয়েক দিনের মাত্র আলাপ নিলয়ের সঙ্গে। নিলয়ের আচার ব্যবহারের সঙ্গে কোনও মিল নেই বহ্নির। এখানকার কাজ শেষ হলেই সুদূর নক্ষত্র লোকে যাত্রা করবে নিলয়। কীসের জন্যে এত ভালো লাগে নিলয়কে? মার্জিত ভাষায়, চাকচিক্যের জন্য বা…। হয়তো কিছুটা সত্যি আছে এর মধ্যে। কিন্তু এটাই সব নয়। কেননা আরও তো অনেক সঙ্গী আছে নিলয়ের। তাদের কয়েকজনকে তো নিলয়ের চেয়েও দেখতে সুন্দর। কিন্তু তবুও নিলয়কেই ভালো লাগল কেন? শুধু নিলয়কে দেখামাত্র কেন মনে হয়েছে এই একমাত্র পুরুষ তার জীবনে। কেন? কেন?

মা-বাবার কাছে মনোভাব গোপন করতে পারেনি বহ্নি। একে একে সবাই জেনেছে রজতকে বোধহয় বিয়ে করবে না বহ্নি। বহ্নি নিজেই মনের কথা বলেছে বন্ধুদের। মনের এই অবস্থা কি চেপে রাখা সম্ভব?

সকালবেলা বহ্নি বৈঠকখানায় বসে তার বাবার কাগজপত্র টাইপ করে দিচ্ছিল। এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ হল। আগের চেয়ে এখন অনেক লোকের যাতায়াত বেড়ে গেছে। সুতরাং বহ্নি পেছন ফিরে দেখল না কে এল। বহ্নির ছোট বোন সাদর অভ্যর্থনা জানাল অতিথিকে। কিন্তু পরক্ষণেই বহ্নি চমকে উঠল নিলয়ের গলার স্বরে। টাইপ করা কাগজগুলো একে এক ঝাপসা হয়ে উঠতে লাগল। উত্তেজনায় মুখ চোখ লাল হয়ে উঠল। নিজের অজান্তে হাতের কাজ গেল থেমে।

“দয়া করে মেয়রকে ডেকে দেবেন একবার?”

“নিশ্চয় দেব মিস্টার…।”

“নিলয় রায়; অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নিলয় রায়।”

“আপনি বলুন নিলয়বাবু। বাবাকে ডেকে আনছি আমি।”

সামনের ডিভানে বসে পড়ল নিলয়। ঘরের চারিদিকে দেখতে দেখতে হঠাৎ নিলয়ের চোখ পড়ল বহ্নির ওপর। আর তৎক্ষণাৎ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সারা মুখ।

“কি আশ্চর্য! আপনি এখানে কাজ করেন নাকি?”

“কাজ করি না। এটাই আমার বাড়ি। আমার বাবাই এখানকার মেয়র।” —বেশ গর্বের সঙ্গে বলল বহ্নি।

নিলয় বহ্নির টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। টেবিল ওপর রাখা একটা মোটা মত বই তুলে নিল নিলয়। “পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস— সভ্যতার ক্রমবিকাশ থেকে আন্তঃনক্ষত্র যাত্রা পর্যন্ত” —বেশ জোরে উচ্চারণ করল নিলয়।

“মাত্র ১০০০ পাতায় সব লেখা হয়ে গেল। কিন্তু মিস রায় এই ইতিহাস তো তিনশো’ বছর পুরোনো হয়ে গেছে। আর ইতিমধ্যে অনেক এগিয়ে গেছে পৃথিবী।”

“আমরা তো আর কোনও খবর পাইনি। যদি পেতাম…”

বহ্নির কথায় বাধা দিয়ে বলে উঠল নিলয়— “বহু বহু উন্নতি হয়েছে। সে সমস্ত লিখলে ৫০টা লাইব্রেরি ভর্তি হয়ে যাবে। তবে আমাদের কাছেও অনেক সংবাদ আছে। কিন্তু তাতেও ১০০ বছর পিছিয়ে থাকবে নন্দনের ইতিহাস।”

অনেক কথা দুজনের মনে ভিড় করে এল। বহ্নির মনে তোলপাড় করছে একটি মাত্র কথা। “আবার কবে দেখা হবে?” কিন্তু একথা কি মুখ ফুটে বলা যায়!

কিছুক্ষণের মধ্যে মেয়র শ্ৰী অগ্নিশ্বর রায় ঘরে ঢুকলেন।

“আপনাকে এতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্যে আমি দুঃখিত নিলয়বাবু। আমি এইমাত্র প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বললাম। উনি বিকেলে এখানে আসছেন। যাক, কী দরকার বলুন তো আপনি?”

বহ্নি আবার কাজের মধ্যে ডুবে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু সাদা কাগজের বুকে একই কথা বারংবার ছাপা হতে লাগলো। মনপ্রাণ উন্মুখ হয়ে উঠল নিলয়ের কথা শোনার জন্যে।

নিলয় ক্যাপ্টেনের বক্তব্য পেশ করল। যন্ত্রপাতি সম্পর্কীয় জটিল কথাবার্তার অনেক কিছুই বুঝল না বহ্নি। তবে একটা বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বুঝল বহ্নি যে দেবযানের লোকেরা এখান থেকে মাইল খানেক দূরে কোন কিছু করতে চায়। আর তারই অনুমতি নিতে এসেছে নিলয়।

“নিশ্চয়ই!” বললেন অগ্নিশ্বর রায়। গলার স্বরে বিনয়ের আভাস। “যেখানে প্রয়োজন সেইখানেই তৈরি করতে পারেন আপনারা। কিন্তু কী করতে চান বলুন তো?”

“ওখানে গ্র্যাভিটি ইনভার্টার বসাবো আমরা। আর সেই জন্যে জেনারেটারগুলো মাটির নিচে শক্ত পাথরের ওপর বসাতে হবে। বেশ জোর শব্দ হয় মেসিন থেকে। কিন্তু এতদূরে মনে হয় কোনও ব্যাঘাত ঘটাবে না।”

“ঠিক আছে। সমস্ত রকম সাহায্য করতে প্রস্তুত আমরা। আচ্ছা, আপনি ক্যাপ্টেন বোসকে বলবেন যে প্রেসিডেন্ট আজ বিকালে এখানে আসবেন। আমি অবশ্য গাড়ি পাঠাব ক্যাপ্টেনের জন্যে।”

ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল নিলয়। অগ্নিশ্বর রায় মেয়ের কাছে এসে দাঁড়ালেন। টাইপ করা কাগজটা চোখের সামনে তুলে ধরতেই সমস্ত পরিষ্কার হয়ে গেল। ভুল টাইপে ভরা সমস্ত কাগজটা।

“খুব সুন্দর ছেলেটি, না? কিন্তু অতিরিক্ত কোনও কিছু ভালো নয়।”

“আমি, আমি তো তোমার কথা বুঝতে পারছি না বাপী?”

“শোন বহ্নি, আমি তোমার বাবা বলেই এ বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকতে পারি না।”

“না না, তুমি যা ভাবছ সব মিথ্যে। মিথ্যে।”

“সত্যি করে বলতো মা, ওকে কি তোর ভালো লেগেছে।”

“জানি না, জানি না, জানি না।” ঘাড় নিচু করে বসে রইল বহ্নি। সমস্ত শরীরটা থেকে থেকে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল।

সাংঘাতিক এক সমস্যায় পড়ে গেছে রজত। রজত কেন, সকলেই জানে বহ্নি রজতকে ভালোবাসে। ওদের বিয়ের সব কিছু পাকাপাকি হয়ে আছে। নিলয় নন্দনের বাসিন্দা হলে এত ভাবত না রজত। এ সমস্ত লোকদের উচিত শিক্ষা দিতে জানে সে। একে নিলয় পৃথিবী থেকে আসছে তারপর সে নন্দনের মাননীয় অতিথি। সুতরাং কেমন করে নিলয়কে বলা যাবে যে বহ্নি আমার? তোমার দৃষ্টি দিও না ওর ওপর। কিন্তু কি করা যায় এখন?

গভীর সমুদ্রে নৌকোয় একা থাকলেই এইসব চিন্তা মাথায় ঘোরে রজতের। কিন্তু আইনত কোনও জোর নেই রজতের। বহ্নির ওপর তার দাবী তো অতীতের স্মৃতিচারণায়, মনের দিক দিয়ে। এখন বহ্নি যদি বলে, না, তোমার চিন্তা মিথ্যা। আমি তোমায় ভালোবাসি না। তবে? কী অধিকারে সে দাবী করবে বহ্নিকে? ইদানীং নিলয়ের সঙ্গে খুব ঘোরাফেরা করে বহ্নি। অন্ধ আক্রোশে জ্বলতে লাগল রজত।

সেদিনকার সভার সমস্ত কিছু জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠছে চোখের সামনে। আর সেই সভার পর থেকে মরীয়া হয়ে উঠেছে রজত।

নাচগানে রজতের দক্ষতার কথা এখানকার সবাই জানে। রজত কিন্তু সে রাত্রে কোনও সুযোগ পেল না। নিলয় সারাক্ষণ পৃথিবীর আধুনিকতম নাচগান বিশ্লেষণে ব্যস্ত রইল। নিলয়ের কাছে আধুনিকতম হলেও বর্তমান পৃথিবীর চোখে ১০০ বছরের পুরোনো এই নিদর্শনগুলো। রজতের কিন্তু একদম ভালো লাগেনি। মনে হয়েছে নাচ তো নয় যতসব বিকৃত অঙ্গভঙ্গি। বহ্নি কিন্তু খুব মনোযোগের সঙ্গে রপ্ত করল এই নাচগুলো। এই দেখে আরও জ্বলে উঠল রজত।

সভারম্ভে ক্যাপ্টেন বোস বললেন— “বন্ধুগণ, আপনাদের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। কোনদিনও আমরা আপনাদের ভুলতে পারব না। নন্দনে বেশিদিন থাকতে পারব না বলে খুব দুঃখ হচ্ছে আমার।

“দুর্ঘটনার জন্যে আর কোন দুঃখ নেই আমাদের। কারণ দুর্ঘটনা না ঘটলে এখানে আসা হত না। আর না আসলে নন্দনের সুন্দর অভিজ্ঞতাও হত না আমাদের। আপনাদের দেখে আরও উৎসাহিত হচ্ছি আমরা। অনেক কিছু শিখলাম আপনাদের কাছ থেকে। আর এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে এখানকার অভিজ্ঞতা অনেক সাহায্য করবে আমাদের। নন্দনের মতো আর এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলব আমরা।

“চলে যাওয়ার আগে আর এক কর্তব্য আছে আমাদের। আমাদের মাইক্রোটেপে পৃথিবীর প্রচুর জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংবাদ আছে। সেগুলো দিয়ে যেতে চাই আপনাদের। যার ফলে নন্দন আরও তিনশো বছর এগিয়ে যাবে জ্ঞানে বিজ্ঞানে সভ্যতায়। নন্দনের সমস্ত জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের আগামীকাল দেবযানে আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমাদের মাইক্রোটেপ থেকে যত খুশি কপি করে নিয়ে আসতে পারবেন।

“আজকে আর জ্ঞানবিজ্ঞানের কথা নয়। পৃথিবীর আরও আধুনিকতম সম্পদ আছে। পৃথিবী এ বিষয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। আপনাদের পূর্বপুরুষদের এই ঐতিহ্যের নমুনা কিছু শুনুন। শুনুন মানব সভ্যতার অগ্রগতির গান।”

সভাগৃহের সমস্ত আলো কমে এল আস্তে আস্তে। সুরু হল যন্ত্রসঙ্গীত। নন্দনে অভূতপূর্ব এই মূহূর্ত। সঙ্গীতের সুরমূর্ছনায় তন্ময় হয়ে গেল বহ্নি। অসীম মহাকাশে গতিহীন সময় যেন ঝুলে রইল নির্দেশ অপেক্ষায় পারিপার্শ্বিকতার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেল বহ্নি। নিজের অজান্তে নিলয়ের একটা হাত বহ্নি তুলে নিল নিজের হাতে।

তুলনাহীন এ সঙ্গীত। এর কোন খোঁজ আগে পায়নি বহ্নি। এ সঙ্গীত কেবল একান্ত পৃথিবীর সম্পদ! মৃদু ঘণ্টাধ্বনি যেন ধীরে ধীরে কুণ্ডলী পাকিয়ে ক্রমেই উঠছে ঊর্ধ্বপানে। যন্ত্রসঙ্গীতের পার্থিব সমস্ত কিছু যেন রূপ পরিগ্রহ করছে। সৈন্যরা মার্চ করে যাচ্ছে। কুল কুল ধ্বনি নদীতে নৌকা ভেসে চলেছে অজানার পানে। আবার কোনও সময় মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ বেদনা যেন গুমরে গুমরে কেঁদে উঠছে। পরক্ষণেই শোনা গেল অশ্রান্ত সমুদ্রের গান। নক্ষত্র লোকে তারার জাহাজের শব্দ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হল। পাথরের মূর্তির মতো নীরবে শুনল বহ্নি। এ সঙ্গীত নন্দনের নয়। এ সঙ্গীত দূরের পৃথিবীর। লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের মাটির পৃথিবী যেন মূর্ত হয়ে উঠল সবাকার মনে। বহু দূরের পৃথিবীর সঙ্গীতে মুখর হয়ে উঠল আকাশ মাটি জলস্থল সর্বত্র। সঙ্গীতময় হল নন্দন।

ধীরে ধীরে থেমে এল সঙ্গীত। নিঃশব্দে সভাভঙ্গ হল। স্তব্ধ বাক্যহারা সবাই। বহ্নি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ফিরে যেতে পারল না। সঙ্গীতের সুর মূর্ছনায় মোহিত হয়ে গেছে তার অন্তর। রাত্রি গভীর হয়ে এল। দূরের বনের গাছপালার এক অপার্থিব শব্দ ভেসে আসছে। নিলয়ের হাত বহ্নির কটি বেষ্টন করে রয়েছে। নিলয়ের বুকে মাথা রাখল বহ্নি। দুই দেহের অস্তিত্ব এক হয়ে মিশে গেল। মোহময় রাত্রি বহ্নিকে তার বহু আকাঙ্খিত মুহূর্ত এনে দিল। দুষ্ট মেয়ের মতো দূর আকাশে ছোটবড় নক্ষত্র মিটমিট করছে। বহ্নির সমস্ত অনুভূতি একে একে লোপ পেল। মনের আকাশ এখন নির্মেঘ। কোন দ্বিধা দ্বন্দ্বের স্পর্শ নেই সেখানে। মনের অসীম আকাশে একমাত্র সূর্য নিলয়। সেই প্রখর সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় রজতের অস্তিত্ব একেবারে মুছে গেল।

নিলয়ের কাছে এই প্রেমের গভীর কোনও মূল্য নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় রিগেল নক্ষত্রে পৌঁছে নন্দনকে বোধহয় স্বপ্ন বলে মনে হবে। সে তো ভালোবাসতে চায়নি। বহ্নিই তাকে এক অদম্য বল্গাহীন ভালোবাসার জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। নিলয় শুধু ভেসে চলেছে স্রোতের টানে। বাধা দেবার সমস্ত ক্ষমতা যেন লোপ পেয়েছে একেবারে।

আজকাল কাজ থেকে ছুটি পাওয়া মাত্র নিলয় আর বহ্নি দূরে বেড়াতে যায়। মানুষের যাতায়াত খুব কম সেখানে। শুধু রোবট চাষিরা নিঃশব্দে জমি চাষ করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বহ্নি পৃথিবী সম্বন্ধে নানান প্রশ্ন করে। কিন্তু দেবযানের গন্তব্যস্থল সম্বন্ধে একেবারে নির্লিপ্ত থাকে বহ্নি। নিলয় বলে পৃথিবীর কথা। বহ্নি অবাক বিস্ময়ে তন্ময় হয়ে শোনে ওর পূর্বপুরুষদের প্রিয় জন্মভূমির কথা।

পৃথিবীতে শহরের অস্তিত্ব লোপ পেয়েছে শুনে খুব মনোক্ষুণ্ণ হল বহ্নি। পৃথিবীর বিকেন্দ্রীয় সভ্যতার কথা সবিস্তারে বলল নিলয়। সুমেরু থেকে কুমেরু পর্যন্ত বিস্তৃত এখন মানব সভ্যতা। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, দিল্লী, কলকাতা, চণ্ডীগড়ের কথা অনেক বইতে পড়েছে বহ্নি। মানসচক্ষে ভাসছে শহরগুলোর ছবি। বহ্নি বিশ্বাস করতে পারে না যে এই শহরগুলোর এখন আর কোনও অস্তিত্ব নেই। আর সেই সঙ্গে আমূল পরিবর্তন হয়েছে জীবনধারণ পদ্ধতির।

“আমরা যখন পৃথিবী ছেড়ে আসি,” বলল নিলয়, “তখন সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা ছিল বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে। যেমন অক্সফোর্ড, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি। এদের মধ্যে কোনও কোনওটার জনসংখ্যা ছাত্র অধ্যাপক প্রভৃতি মিলিয়ে ৫০ হাজারের ওপর ছিল। এর অর্ধেক জনসংখ্যাও তখন কোনও শহরে দেখা যেত না।”

“কিন্তু কেন— কেমন করে এসব হল?” বহ্নির স্বরে অকৃত্রিম বিস্ময় ঝরে পড়ল।

“না, কোনও একটা নির্দিষ্ট কারণকে এর জন্য দায়ী করা যায় না। তবে পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি, সংবাদ আদানপ্রদানের অকল্পনীয় অগ্রগতিকেই প্রধান কারণ বলা যায়। একটা বোতাম টিপেই যখন সুদূর প্রান্তরের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হল তখন একসঙ্গে জড়ো হয়ে থাকার প্রয়োজনও লোপ পেল। শহরের অপমৃত্যুও ঘটল সঙ্গে সঙ্গে। আবার মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে জয় করার ফলে পরিবহণ সমস্যার স্থায়ী এবং সহজ সমাধান হল। আসবাবপত্ৰ মায় বড় বড় বাড়িঘর প্রভৃতি সমস্ত কিছু অনায়াসে স্থানান্তরিত করা সম্ভব হল। ভৌগোলিক বাধা এখন আর কোনও বাধাই নয়। “দূরত্ব” কথাটা শুধু নক্ষত্রলোকে সীমাবদ্ধ রইল। সুতরাং এবার বুঝতে পারছ যে পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে গেল মানুষের কাছে। মানুষ ইচ্ছামতো স্থানে বাস করতে শুরু করল। আর এর ফলে শহরের প্রয়োজন গেল ফুরিয়ে।”

বহ্নি চুপ করে রইল। একটা মৌমাছি ওদের আশপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। এই মৌমাছির পূর্বপুরুষও হয়তো বহ্নিদের মতো পৃথিবী থেকে এসেছে। বহ্নি নিঃশব্দে মৌমাছির দিকে চেয়ে রইল। কয়েকটা বুনো ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে ব্যস্ত মৌমাছিটা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মধু সংগ্রহের ব্যর্থতায় দূরে উড়ে গেল।

“আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় আলোর চেয়েও দ্রুত গতিবেগ আমরা আয়ত্ত করতে পারব?” খাপছাড়া এক প্রশ্ন করল বহ্নি।

হেসে ফেলল বহ্নি। বহ্নির মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল। আলোর গতিকে জয় করতে পারলে পৃথিবী আর নন্দনের মধ্যে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারা যেত। এ আশা শুধু বহ্নির নয়, সমস্ত নন্দন বাসীর। সমস্ত মানবজাতি প্রকৃতিকে জয় করতে ব্যস্ত। প্রকৃতির অনেক কিছুই এখনও অপরাজিত আলোর গতিবেগ এখনও অনায়ত্ত।

“হ্যাঁ, বহ্নি। আমি বিশ্বাস করি আলোর গতিবেগ জয় করার কৌশলে আবিষ্কার হবেই হবে। ইতিমধ্যে হয়তো কেউ এই অসাধ্য সাধন করে ফেলতেও পারে।”

“উঃ কি মজা হত তাহলে! যখন-তখন পৃথিবীতে যাতায়াত করা যেত। কত নতুন নতুন খবর জানতে পারা যেত।” —আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল বহ্নি।

নিলয় মাথা নাড়ল। “খুব ভালো কথা বলেছ, বহ্নি। কিন্তু পৃথিবীর খবর তো তোমাদের পাওয়া উচিত। কেন যে পাওনি সেটাই তো আশ্চর্য লাগছে। প্রত্যেক উপনিবেশেই তো আমরা রোবট পাঠিয়েছি। রোবটের মধ্যে থাকে পৃথিবীর আধুনিক খবরাখবর। কাজ শেষে এই রোবটগুলোই উপনিবেশের সংবাদ নিয়ে ফেরে পৃথিবীতে। রোবট পৃথিবীতে পৌঁছানমাত্ৰ উপনিবেশের সমস্ত অভাব অভিযোগের সমাধান করা হয়। এইরকম করে আন্তঃনক্ষত্রের মধ্যে যোগাযোগ রাখি আমরা। পৃথিবী এখন প্রধান সংবাদ আদানপ্রদান কেন্দ্র মাত্র। নন্দনের রোবট সংবাদদাতা যদি পথের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে থাকে তবে ইতিমধ্যে আরও একটা রোবট নিশ্চয় নন্দন অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে। শুধু ২৫/৩০ বছর ব্যবধান হবে দুটো রোবটের মধ্যে।”

বহ্নি অবাক হয়ে শুনল রোবট সংবাদদাতার কাজ। তাঁতের মাকুর মতো পৃথিবী আর গ্রহগুলির মধ্যে যাতায়াত করে এই রোবটগুলো কিন্তু নন্দনের ভাগ্য খারাপ। নয়তো নন্দনের রোবট হারিয়ে যাবে কেন। বর্তমানে নিলয়রা এই রোবটের কাজ করল। ভাবনার সূত্রগুলো যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী আর নক্ষত্রের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মাইল দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে। একদিন আসবে যখন…

তিন সপ্তাহের মধ্যে নিলয়রা শক্ত ধাতুর এক উঁচু পিরামিডের মতো ঘর তৈরি করল। ঘরের মধ্যে রইল বিশাল বিশাল জটিল যন্ত্রপাতি।

অন্যান্যদের সঙ্গে বহ্নিও গভীর আগ্রহে লক্ষ করতে লাগল নিলয়দের। পিরামিডের এক মাইলের মধ্যে কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই নিষেধই বহ্নিদের কৌতূহলী করে তুলেছে।

নিলয় আর কয়েকজন এখনও পিরামিডের মধ্যে রয়েছে। বহ্নির ভীষণ ভয় যদি নিলয়ের কোন ক্ষতি হয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে নিলয়রা বেরিয়ে এল। তারপর এক রকম দৌড়ে কাছের একটা পাহাড়ের ওপর উঠে পড়ল।

মুহূর্তের মধ্যে মাইলখানেক দূরে সমুদ্রের মধ্যে কী যেন হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য এক প্রচণ্ড ঝড় যেন বয়ে গেল সেখানে। কিন্তু কী আশ্চর্য! শুধু মাত্র কয়েকশো গজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল সেই ঝড়। পাহাড়ের মতো বড় বড় ঢেউগুলো উঠছে আর পড়ছে। ঢেউয়ের সংঘর্ষে লক্ষ লক্ষ জলকণা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বহ্নির মনে হল যেন এক বিরাট অদৃশ্য হাত সমুদ্রের তলায় প্রচণ্ড বেগে নাড়া দিচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে সমস্ত দৃশ্য পালটে গেল। বিরাট গোলাকারে ঢেউগুলো ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করল। অকস্মাৎ তার মধ্য থেকে এক বিশাল জলস্তম্ভ আকাশের দিকে উঠতে আরম্ভ করল। জলস্তম্ভের শীর্ষভাগ ক্রমশ সরু হচ্ছে। চারিদিকে জলরাশি প্রচণ্ড গর্জনে ফুঁসে ফুঁসে উঠতে লাগল।

এই দৃশ্যে সকলের মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল। কেউ কেউ ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। কেউ বা কানে হাত চাপা দিল। নির্ভয়ে বহ্নি তাকিয়ে রইল সমুদ্রের দিকে।

ক্রমে জলস্তম্ভের তীক্ষ্ণ শীর্ষভাগ নীল আকাশের বুক স্পর্শ করল। মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল শীর্ষভাগ। আকাশ থেকে সহস্র ধারায় বৃষ্টিপাত শুরু হল। অস্বাভাবিক বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো।

সমস্ত কৌতূহলের অবসান হল। পৃথিবীর লোকেরা সফল হয়েছে তাদের পরীক্ষায়। আস্তে আস্তে ভীড় ফাঁকা হয়ে গেল। হাজার বছরের চেষ্টায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে জয় করেছে মানুষ। চোখের সামনে যা ঘটে গেল সত্যি তা বিস্ময়কর। বিস্ময় শব্দটার অর্থ অনেক প্রসারিত হয়েছে। নক্ষত্রলোকে যাত্রা অবিশ্বাস্য ছিল এককালে। কিন্তু এখন! প্রচণ্ডগতিতে তারার জাহাজ ছুটে চলেছে নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে।

নন্দনের সমুদ্ৰজল এতক্ষণে দেবযানের কাছে পৌঁছে গেছে। সেখানে হয়তো আর এক প্রচণ্ড শক্তিতে জল জমিয়ে বরফের শীল্ড তৈরি হচ্ছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে শীল্ড তৈরি হয়ে যাবে। দৈবযান আবার যাত্রা শুরু করবে নির্দিষ্ট নক্ষত্রলোকে।

বহ্নি খুব হতাশ হল। মনে মনে কামনা করত নিলয়রা যেন বিফল হয় পরীক্ষায়। সফল হওয়ার একটা মাত্র অর্থ আছে বহ্নির কাছে। এবার ছেড়ে দিতে হবে নিলয়কে।

মনের সমস্ত ভাবনা চিন্তা গোপন রেখে সামনের দিকে এগিয়ে গেল বহ্নি। ওকে আসতে দেখে নিলয়ও দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল। সাফল্যের আনন্দে নিয়ের চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু বহ্নির দিকে তাকাতে সমস্ত উৎসাহ নিভে গেল নিলয়ের।

“শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি আমরা,” —থেমে থেমে বলল নিলয়।

“হ্যাঁ তাতো দেখলাম আর কতদিন আছ তোমরা?”

নিলয় মাথা নিচু করে একমনে পা দিয়ে বালি খুঁড়তে লাগল। কী বলবে বহ্নিকে? জানা কথা বলার মধ্যে যে এত সমস্যা থাকতে পারে সে কথা কে ভেবেছিল আগে?

“চার-পাঁচ দিন মাত্র বাকি আছে।”

কথাগুলো নিজের মনে মনে উচ্চারণ করল বহ্নি। এ তো নতুন সংবাদ নয় তার কাছে। এটাই তো স্বাভাবিক। আকাশ কুসুম রচনা করেছিল বহ্নি। কিন্তু আকাশকুসুম যে আকাশকুসুম— বাস্তবে যে তার কোনও অস্তিত্ব নেই একথাটাই ভুলে গিয়েছিল সে।

“না না, তুমি যেতে পারবে না। তুমি চলে যেও না নিলয়। চলে যেও না” -স্থান কাল পাত্র ভুলে চীৎকার করে উঠল বহ্নি।

বহ্নির একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিল নিলয়। তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল— “তা হয় না, বহ্নি। নন্দন আমার পৃথিবী নয়। এখানে আমি খাপ খাওয়াতে পারব না নিজেকে। নতুনত্বের অভাবে হয়তো মাসখানেকের মধ্যে বিষময় হয়ে উঠবে আমার জীবন।”

“তাহলে আমিও যাব তোমার সঙ্গে।”

“কী বলছ তুমি, বহ্নি?”

“ঠিক বলছি আমি। অবাক হবার কিছু নেই। আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

“তুমি এখনও স্বপ্নের মধ্যে রয়েছ। তুমি একথাটা কেন বুঝতে পারছ না যে আমি যেমন এখানে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারব না, ঠিক তেমনি অবস্থা হবে তোমার।”

“সব শিখে নেব আমি। অনেক কাজ করতে পারব আমি। আমাকে তুমি এইখানে থাকতে বলো না, নিলয়।” অবরুদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়ল বহ্নি।

নিলয়ের দু-হাত সজোরে জড়িয়ে ধরল। জলভরা চোখ দুটো নীরব অনুনয়ে তাকিয়ে রইল নিলয়ের দিকে। বাক্যহারা হয়ে গেল নিলয়। দুজনের নীরব দৃষ্টিতে ফুটে উঠল অব্যক্ত বেদনার ছাপ। নিলয় অনুভব করল বহ্নির অবস্থা। আর ঠিক সেই সময়ে তার বিবেক বাধা দিল প্রচণ্ডভাবে। ক্ষণিকের মোহে এত বড় ভুল কর না, নিলয়।

কিন্তু নিলয় তো বহ্নিকে আঘাত করতে চায়নি। সে সত্যি ভালোবাসে বহ্নিকে। বহ্নিকে কোনওদিনও ভুলতে পারবে না সে। সারাজীবন সে বহ্নির মঙ্গল কামনা করবে। কিন্তু ভালোবাসা আর সমস্ত জীবন এক সঙ্গে কাটানোর মধ্যে বুঝি পার্থক্য অনেক। না, না, এ হবার নয়। এ হতে পারে না!

আর এগোনো উচিত নয়। শেষ করে দিতে হবে সমস্ত কিছু। প্রচণ্ড আঘাত পাবে বহ্নি। কিন্তু এছাড়া আর পথ কী?

“তোমার অনেক কিছু দেখার বাকি আছে এখনও। আমার সঙ্গে এস তুমি।” —বেশ কিছুক্ষণ পরে বলল নিলয়।

নিঃশব্দে বহ্নি নিলয়কে অনুসরণ করল। এখানে সেখানে নানা যন্ত্রপাতি ছড়ানো। কয়েকজন বড় বড় যন্ত্র প্যাক করার কাজে ব্যস্ত। অনেক যত্ন ওরা নিয়ে যাবে না। নন্দনের উন্নতির জন্য দিয়ে যাবে ওগুলোকে। সামনের পাম গাছের নিচে কয়েকটা অ্যান্টিগ্র্যাভিটি স্কুটার দাঁড়িয়ে আছে। মেশিন বন্ধ অবস্থায় স্কুটারগুলো মাটি থেকে কয়েক ফুট ওপরে ভাসছে।

নিলয় কিন্তু ওগুলোর কাছে গেল না। একটু দূরে ডিম্বাকৃতি স্পেশশিপের কাছে গিয়ে দাঁড়াল ওরা।

“এস, বহ্নি। আমরা এবার দেবযানে যাব!” স্পেশশিপের ওপর হাত ধরে টেনে তুলল নিলয়।

এক অদ্ভুত অচেনা জগতের মধ্যে এসে পড়ল বহ্নি। এরকম জটিল যন্ত্রপাতির মধ্যে নন্দনের বড় বড় বৈজ্ঞানিকরাও বোধহয় দিশেহারা হয়ে পড়বে।

বহ্নির একবার নন্দনের শাসনকর্তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেটা আর কিছুই নয়। বিরাট জটিল এক ইলেকট্রোনিক কম্পিউটার মাত্র। কম্পিউটারের যন্ত্রপাতি দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু এর কাছে কম্পিউটার যেন নেহাৎ ছেলেমানুষ।

নিলয় কন্ট্রোল বোর্ডের সামনে বসে পড়ল। হাত দিয়ে বোর্ডের দুটো বোতাম টিপে দিল।

স্বচ্ছ দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে নন্দনকে দূরে সরে যেতে দেখল বহ্নি। ভেতরে কোনও শব্দ বা ঝাঁকুনি নেই। নন্দন ছাড়িয়ে অনেক দূর উঠে এসেছে ওরা। নন্দনের চেপটা দিগবলয় রেখা দেখা যাচ্ছে।

সমুদ্রকে কালো চাদরের আস্তরণ বলে মনে হয়। প্রতি সেকেন্ডে নন্দন ক্রমশ ক্ষুদ্রাকারে পরিণত হচ্ছে।

আকাশের দিকে তাকাল বহ্নি। তারার জাহাজ দেবযানকে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। খুব ছোট দেখাচ্ছে দেবযানকে। দেবযানের দু-পাশে অনেকগুলো পোর্ট হোলের মতো গর্ত দেখা যাচ্ছে।

পরমুহূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পারল বহ্নি। ওগুলো পোর্ট হোল নয়। ফেরির মতো যে সব স্পেশশিপগুলো নন্দনে যাতায়াত করছে সেইগুলো ওই গর্ত দিয়ে ঢুকছে তারার জাহাজের মধ্যে। ওদের স্পেশশিপটাও দেবযানের ভেতরে ঢুকে পড়ল। নিলয়ের সঙ্গে স্পেশশিপের বাইরে বেরিয়ে এল বহ্নি। বায়ুনিরোধক দরজা খুলে যেতেই ওরা দেবযানের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

বহ্নি অবাক হয়ে দেখল এক বিরাট গোলাকার নলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। যতদূর দৃষ্টি যায় সোজা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ওরা যার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল সেটাই আস্তে আস্তে চলতে আরম্ভ করল। ক্রমে গতিবেগ দ্রুত থেকে দ্রুততর হল। বহ্নি কিন্তু কোনও ঝাঁকুনি বা অসুবিধে বোধ করল না। কনভেয়র বেল্ট ওদের নিয়ে চলল দেবযানের অভ্যন্তরে!

দেবযানের অভ্যন্তরে মাইলখানেক চলে এল নিলয় আর বহ্নি। তবে এতটা পথ একভাবে আসেনি। কিছুটা কনভেয়র বেল্ট, করিডোর আবার কিছু পথ মাধ্যাকর্ষণ শক্তিবিহীন লম্বা টিউবের মধ্যে দিয়ে আসতে হয়েছে ওদের। দেবযানের বিশালত্ব সম্বন্ধে, এখন কিছুটা আঁচ করতে পারল বহ্নি। ছোটখাটো এক কৃত্রিম জগৎ যেন। এই কৃত্রিম জগৎই সভ্যতার বীজ নিয়ে যাচ্ছে অজানা নক্ষত্রে।

ইঞ্জিন রুমটা প্রায় আধ মাইল লম্বা। অনেকগুলো বৃহদাকার যন্ত্র স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। সামনের ব্যালকনির উপর বহ্নিকে দাঁড়াতে বলল নিলয়। নিচে অনেকগুলো নানান আকারের যন্ত্রের দিকে হাত দেখিয়ে বলল— “এ সমস্ত আমাকে দেখাশোনা করতে হয়।” বহ্নি কোনও কথা না বলে একবার তাকাল ওর দিকে।”

নিলয় বহ্নিকে দেবযানের আরও অভ্যন্তরে নিয়ে চলল। অসংখ্য যন্ত্র সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মেশিন, গুদামজাত নানান প্রয়োজনীয় জিনিষে ঠাসা দেবযান। নতুন নক্ষত্রে মানব সভ্যতার বিকাশে এগুলোর প্রয়োজন সর্বাগ্রে। এখানে ওরা নন্দনের একদল বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎ পেল।

তাদের পূর্বপুরুষরাও কি এত সাজসরঞ্জাম এনেছিল নন্দনে? ভাবল বহ্নি। না, এত তারা আনতে পারেনি। অনেক ছোট ছিল ওদের তারার জাহাজ। কিন্তু এখনও! এই কয়েক শতাব্দীর মধ্যে আন্তঃনক্ষত্র উপনিবেশ স্থাপনের কলাকৌশলের অনেক উন্নতি হয়েছে। তাই এখন এক ক্ষুদ্র জগৎ বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে।

একটা তুষারশুভ্র সাদা বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল নিলয়। দরজাটা আপনা আপনি যেন খুলে গেল ওদের সামনে। ভেতরে লম্বা লম্বা কয়েকটা ধাপ দেখা যাচ্ছে। ভেতরে ঢুকে বহ্নি বুঝতে পারল যে এটা একটা ক্লোকরুম ছাড়া আর কিছু নয়। সামনে অস্বচ্ছ স্ফটিকের দেওয়াল। নিলয়ের অভিপ্রায় এখনও বুঝতে পারল না বহ্নি। এবার আর কী দেখাতে চায় ওকে? অকস্মাৎ নিলয়ের গম্ভীর স্বরে চমকে উঠল বহ্নি।

“এবার আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে দেবযানের কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণশক্তির রেশমাত্র নেই। তাই আমার খুব কাছে থাকতে হবে তোমাকে।”

ভোজবাজির মতো সামনের স্ফটিকের দেওয়ালটা ওপর দিকে উঠে গেল। এক ঝলক বরফ হাওয়া ঝাপটা মারল বহ্নিকে। উঃ কী প্রচন্ড ঠান্ডা! বহ্নির আশপাশে তুষার জমতে শুরু করল। নিজেদের নিশ্বাস প্রশ্বাসগুলো চোখের সামনে জমাট বেঁধে নৃত্য শুরু করে দিল।

“এবার এর মধ্যে নীচে নামতে হবে নাকি?” নিলয়কে প্রশ্ন করল বহ্নি।

বহ্নির হাতটা পরম স্নেহে নিজের হাতের মধ্যে টেনে নিল নিলয়। বলল— “ভয়ের কিছু নেই, বহ্নি। কয়েক সেকেন্ড পরে আর ঠান্ডা লাগবে না। আমি তো তোমার সঙ্গে আছি।”

বহ্নি কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে নিচে নাবার জন্যে পা বাড়াল। কিন্তু নীচে নামতে পারল না। ‘নীচে’ কথাটার কোনও অর্থ নেই এখানে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাবে উপর নীচ বলে কোনও কিছু নেই এই ঘরের মধ্যে। সুতরাং বহ্নি আর নিলয় এই তুষারশুভ্র হিমশীতল কক্ষে ভারশূন্য অবস্থায় ভেসে বেড়াতে লাগল।

অবাধ বিস্ময়ে চারিদিকে দেখতে লাগলো বহ্নি। চারিদিকে ছ-কোণা কাচের কয়েক শো ছোট ছোট কেবিন। ঠিক যেন এক বিরাট মৌচাক। কেবিনগুলো পরস্পরের সঙ্গে সরু পাইপ আর অজস্র তার দিয়ে জোড়া।

বহ্নি অবাক হয়ে দেখল যে প্রত্যেক ঘরে এক-একজন করে মানুষ শুয়ে আছে। চারপাশে ঘুমন্ত মানুষের মেলা। এরাই বহ্নির বহু আকাঙ্খিত পৃথিবীর বাসিন্দা। সুদূর নক্ষত্রে এরাই এক নতুন সভ্যতার ইতিহাস লিখবে। যাত্রা শেষে ঘুম থেকে উঠে পৃথিবীর কথাই মনে হবে তাদের। তিন শতাব্দীর ঘুমে কী স্বপ্ন দেখবে এরা? মহাকাশের অসীমত্ব কী ধরা পড়বে এদের স্বপ্নে?

প্রতিটি কেবিনে একটি করে হ্যান্ডেল লাগান আছে। নিলয় হ্যান্ডেল ধরে কয়েকটি কেবিনকে পেছনের দিকে ঠেলে দিল। আর এই ঠেলার সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে গেল ওরা।

নিলয় এবার একটি কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। পাশেই আর একটা কেবিন খালি রয়েছে। অন্যান্য কেবিনের সঙ্গে এর কোন তফাৎ নেই। কিন্তু নিলয়ের মুখের দিকে তাকাতে সমস্ত পরিষ্কার হয়ে গেল বহ্নির কাছে। এক নিমেষে নিঃস্ব হয়ে গেল বহ্নি। হৃৎপিণ্ডটা মনে হল অব্যক্ত বেদনায় ফেটে যাচ্ছে।

স্বচ্ছ স্ফটিকের কেবিনের মধ্যে একটি মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। অপরূপ সুন্দরী নয়। কিন্তু চোখে মুখে বুদ্ধিমত্তার ছাপ সুপরিস্ফুট। শতাব্দীর ঘুমের মধ্যেও কোনও পরিবর্তন হয়নি ওর। এই মেয়েটি যাত্রাশেষে নিলয়ের পাশে দাঁড়াবে। শক্তি, সাহস, উৎসাহ জোগাবে নিলয়কে। আর এদের যৌথ প্রচেষ্টায় মানব সভ্যতার বিজয় কেতন উড়বে নক্ষত্রলোকে।

বহুক্ষণ ধরে নিশ্চল অবস্থায় ভেসে রইল বহ্নি। অপলক দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করল তার ঘুমন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে। ঘুমন্ত মেয়েটি বহ্নির উপস্থিতি বুঝতে পারল না। সে জানল না যে সে বহ্নিকে হারিয়ে দিয়েছে। বহ্নি নিঃস্ব হয়ে গেছে এই ঘুমন্ত সাধারণ মেয়েটির কাছে। শীতের রংবেরঙের মৌসুমী ফুলগুলি যেন এক ঝলক সোনালি মিষ্টি স্বপ্ন নিয়ে ঝরে পড়ল রুক্ষ মাটির বুকে।

অবশেষে বহ্নিই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল।

“ইনি তোমার স্ত্রী, তাই না নিলয়।”

নিলয় শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল বহ্নির দিকে। চোখের ভাষাই বাঙ্ময় হয়ে উঠল বহ্নির কাছে।

“তোমার জন্যে সত্যি আমি দুঃখিত, বহ্নি। সম্পূর্ণ দোষ আমার আমি স্বীকার করছি।”

বহ্নি কোনও কথা বলল না। আরও ঝুঁকে দেখতে লাগল ওর প্রতিদ্বন্দ্বীকে।

“তোমার ছেলে মেয়ে নেই?”

“বর্তমানে নেই বলা যেতে পারে। তবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছনোর ঠিক তিন মাস পরে জন্ম নেবে আমাদের প্রথম সন্তান।”

এত দুঃখের মধ্যেও বহ্নি অবাক হয়ে গেল নিলয়ের কথা শুনে। এ কী সম্ভব? তিনশো বছর নয় মাস পরে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে?

কিন্তু… না, কিন্তু কোনও স্থান নেই এখানে। সব অসম্ভবকে সম্ভব করেছে এরা।

এই ঘরের কথা কোন দিনও ভুলতে পারবে না বহ্নি। হৃদয়ের রক্তাক্ত অক্ষরে লেখা থাকবে আজকে সমস্ত ঘটনা।

আস্তে আস্তে ওরা বেরিয়ে এল হিমঘর থেকে। পেছনের স্ফটিকের দেওয়ালটা নিঃশব্দে নেবে এল। গরম হাওয়ার এক বিচিত্র শিহরণ লাগল সর্বাঙ্গে। কিন্তু বহ্নির হৃদয়ের হিমশীতলতা কোনওদিনও মোছবার নয়।

আচ্ছন্ন অবস্থায় বহ্নি আবার ফিরে এল স্পেশশিপে। নিলয় কন্ট্রোল বোর্ডের কয়েকটা বোতাম টিপে দিল।

“এবার আমাকে বিদায় দাও, বহ্নি। তোমাকে কোনওদিনও ভুলব না আমি।” নিজের হাতের মধ্যে বহ্নি অসাড় হাত তুলে নিল নিলয়। শেষ মুহূর্তে কী বলবে বহ্নি! কথার চেয়ে এই সরব নিস্তব্ধ অনেক শ্রেয়। বহ্নির কাজল কাল চোখ জলে ঝাপসা হয়ে উঠল। নিলয় আবছা গেল বহ্নির সামনে।

বহ্নিকে দু-হাত দিয়ে সজোরে জড়িয়ে ধরল নিলয়। বহ্নির নিস্পন্দ ঠোঁটে উত্তপ্ত প্রেমের অজস্র স্বাক্ষর এঁকে দিল নিলয়। অসহ্য আবেগে থর থর করে কেঁপে উঠল বহ্নি। মহাশূন্যে এই ব্যর্থ প্রেমের সাক্ষী রইল কেবল দূরের আকাশের তারাগুলো।

সম্বিত ফিরতেই বহ্নি চেয়ে দেখল স্পেশশিপ শূন্য। নিলয়ের কোনও চিহ্ন নেই কোনওখানে।

কতক্ষণ কেটে গেল জানে না বহ্নি। অকস্মাৎ যান্ত্রিক স্বরে ঘোষিত হল—

“স্পেশশিপ ভূমি স্পর্শ করেছে। অনুগ্রহ করে বায়ুনিরোধক দরজা খুলে বাইরে যান।” সামনের ছোট দরজা খুলে গেল। যন্ত্রের মতো বাইরে এসে দাঁড়াল বহ্নি।

ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে স্পেশশিপের চারদিকে। উত্তেজনায় থমথম করছে সকলে। কোনও কিছু বোঝার আগেই রজতের ক্রুদ্ধ চীৎকারে চমকে উঠল বহ্নি।

“কোথায়? কোথায় নিলয়? আর সহ্য করব না আমরা!!”

একদৌড়ে স্পেশশিপে উঠে এল রজত। সজোরে হাত চেপে ধরল বহ্নির।

“সাহস থাকে তো বেরিয়ে আসতে বলো ওকে।”

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল বহ্নি।

“সে এখানে নেই। সে আর কোনদিনও আসবে না এখানে। আমি নিলয়কে…”

অব্যক্ত ব্যথায় সজোরে রজতকে জড়িয়ে ধরল বহ্নি। রজতের বুকে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আবার সে ফিরে এসেছে রজতের কাছে।

৫০ ঘণ্টা ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে জলস্তম্ভ উঠতে লাগল মহাকাশে দেবযানের কাছে। সমুদ্র পারে এ কয় ঘণ্টা ভিড় জমে রইল সর্বক্ষণ অনেকে টেলিভিশন ক্যামেরা দিয়ে জল দিয়ে বরফের শীল্ডের ছবি তুলতে লাগল। শক্তিশালী ইলেকট্রনিক দূরবীণ দিয়ে বহ্নি নিজেও প্রত্যক্ষ করল এই অসাধ্য সাধন।

বন্দরের কাল হল শেষ। আগামী কাল সূর্যাস্তের পরে আবার নক্ষত্রলোকে পাড়ি জমাবে দেবযান।

সমস্ত নন্দনবাসী গভীর দুঃখে অভিভূত হল। পৃথিবীর মানুষদের বিদায় দিল তারা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে। কামনা করল নিরঙ্কুশ হোক ওদের যাত্রাপথ।

সেদিনের রাত্রির নিস্তব্ধতা তীক্ষ্ণ শব্দে বিদীর্ণ হয়ে গেল। অকস্মাৎ উজ্জ্বল আলোয় ভেসে গেল নন্দনের মসীময় অন্ধকার। আকাশের গায়ে স্থির উজ্জ্বল নক্ষত্রটা হঠাৎ দ্রুতগতিতে উধাও হল মহাশূন্যের বুকে।

অপলক দৃষ্টিতে বহ্নি নিলয়দের বিজয় অভিযান দেখল। বহ্নির হৃদয়ের একাংশ যেন জোর করে ছিড়ে নিয়ে গেল দেবযান। চোখের জল জোর করে বন্ধ করল বহ্নি। চোখের জল ফেলার তো অনেক সময় পড়ে রইল। চোখের জলে অমঙ্গল করবে না নিলয়ের যাত্রাপথ।

নিলয় কি ঘুমিয়ে পড়েছে? সে কী এখনও তাকিয়ে আছে। ওর দিকে? বহ্নির কথা কি ভাবছে নিলয়?

রজতের আলিঙ্গনে বাস্তবে ফিরে এল বহ্নি। রজত তার আশ্রয়স্থল। এই তার যথার্থ স্থান। আর সে রজতকে ছেড়ে যাবে না! সুদূর নক্ষত্রলোকে তুমি স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সুখী হও। মানব সভ্যতার পত্তন কর সেখানে। কিন্তু আমার কথা কি মনে পড়বে না? তুমি কি ভুলে যাবে যাত্রাপথের দুশো বছরের আগের বহ্নিকে?

আকাশের দিকে তাকাল বহ্নি! আকাশ খালি। কোনও চিহ্ন নেই উজ্জ্বল নক্ষত্রের। অসংখ্য ছোট ছোট তারা ভরা আকাশ নিস্তব্ধ নিথর। কোনও কোনও তারা মিটমিট করছে আবার কোনওটা বা স্থির অচঞ্চল। আকাশ যেন হাজার চোখ মেলে তাকিয়ে আছে বহ্নির দিকে। বোবা তারার চোখে ও কি জল পড়ে? স্তব্ধ আকাশ কি লাখো প্রদীপ জ্বালিয়েছে বহ্নির মনের আঁধার দূর করার জন্যে? সমবেদনায় কি মুখর হয়ে উঠেছে নীরব আকাশ!

মনের আকাশে নিলয়কে কোনওদিনও মুছে ফেলতে পারবে না বহ্নি। এই ভালো। নিলয় ভালোই করেছে। বহ্নির স্থান নেই সেখানে। নিলয় তার সঙ্গীদের নিয়ে পাহাড় পর্বত সমতল করবে। সমুদ্র শাসন করবে। মানব সভ্যতার নতুন ইতিহাস লিখবে ওরা। সেখানে বহ্নির স্থান কোথায়? নন্দনের এই শান্ত সুন্দর পামগাছ ভরা বালির চড়াই অনেক আপন, অনেক ভালো তবুও আমৃত্যু বহ্নি নিলয়ের স্বপ্ন দেখবে।

নিলয়, তুমি শুধু মনে রেখো আমাকে। আর কিছু চাই না আমি। শুধু তোমার একটু স্বীকৃতি। তোমার হৃদয়ের সামান্যতম একটু স্থান যেন থাকে আমার জন্যে। তোমার বহ্নিকে তুমি ভুলে যেও না নিলয়। নিলয়! নিলয়!

Tags: উপন্যাস, কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস, রণেন ঘোষ, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!