মোক্সনের নিয়ন্তা

  • লেখক: অ্যাম্ব্রোস বিয়ার্স, অনুবাদ-সুপ্রিয় দাস
  • শিল্পী: Team Kalpabiswa

‘তুমি কি রসিকতা করছ? নাকি সত্যিই বলতে চাইছ যে একটা যন্ত্রও ভাবনাচিন্তা করতে পারে?’

আমার এই প্রশ্নের জবাব দেবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে মোক্সন একাগ্র চিত্তে একটা লোহার শলাকা হাতে ফায়ার প্লেসের ঝিমিয়ে পড়া জ্বলন্ত কাঠকয়লার টুকরোগুলোর পরিচর্যা করতে লাগল। সেগুলোও বেশ গনগনে হয়ে উঠে তার পরিচর্যার প্রতিদান দিলো। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই তার মধ্যে এই পরিবর্তনটা লক্ষ করছি; খুব সাধারণ প্রশ্নেরও উত্তর দিতে এই অকারণ গড়িমসি ক্রমশ তার স্বভাবে পরিণত হচ্ছে। দেখে যদিও মনে হবে যে আসলে সে কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজে খুব ব্যস্ত ও উত্তর দিতে এই বিলম্ব সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত, কিন্তু একটু লক্ষ করলে সহজেই বোঝা যাবে যে তার মগজে কিছু একটা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে।

 

তবে আপাতত সে আমার প্রশ্নের উত্তরে বেশ গম্ভীর গলায় বলল, ‘“যন্ত্র” কাকে বলে? এই বিষয়ে নানা বিজ্ঞ ব্যক্তি নানা সময়ে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন। কিন্তু বাজার চলতি অভিধান খুলে দেখলে দেখবে তাতে লেখা আছে “এমন কোনও শস্ত্র বা সংস্থা যার মাধ্যমে বল প্রয়োগ দ্বারা কিছু চালনা করা বা কোনও কার্য সম্পন্ন করা সম্ভব।” কিন্তু এই সংজ্ঞা অনুসারে মানুষও কি যন্ত্র নয়? আর এটা নিশ্চই অস্বীকার করবে না যে মানুষ চিন্তা করে বা মানুষ মনে করে যে সে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তাভাবনা করবার ক্ষমতা তার আছে ?’

 

‘যদি আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ইচ্ছে না-ই থাকে সেটা স্পষ্ট ভাষায় বলো না কেন?’ ঈষৎ শুকনো গলায়ই বললাম আমি। ‘তুমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলে। তুমি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছ যে যন্ত্র বলতে আমি মানুষের কথা বলতে চাইছি না। বরং মানুষে যা বানিয়েছে ও মানুষের হুকুম যা চালনা করছে তার কথাই বলছি।’

 

‘অর্থাৎ যখন “ইহা” “তাঁহাকে” নিয়ন্ত্রণ করছে না’ বলে সে কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই উঠে দাঁড়িয়ে জানলার বাইরে কী যেন দেখতে লাগল; যদিও বাইরে ঝড় জলের রাতের অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাওয়া সম্ভব না। কিন্তু এইভাবে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সে আমার দিকে ফিরে মুখে একটা হাসির রেখা টেনে বলল ‘আমাকে মাফ করো; তোমার প্রশ্ন আমি এড়িয়ে যেতে চাইনি। আমার মনে হয়েছিল অভিধান রচয়িতার ব্যাখ্যা এই আলোচনায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আমি তোমার প্রশ্নের স্পষ্ট ও সহজ উত্তর দিচ্ছি। আমি সত্যিই মনে করি যে একটা যন্ত্র যে কাজে নিযুক্ত হয়, সেই কাজটা নিয়ে তা সেই মুহূর্তে চিন্তা করে থাকে।’

 

নিশ্চিতভাবেই তার এই জবাব যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল। কিন্তু আমাকে তার এই জবাব বেশ অস্বস্তিতেই ফেলে দিল, কারণ মোক্সনের এই বক্তব্য এই মুহূর্তে আমার মনের সন্দেহকেই আরও বদ্ধমূল করে তুলছে। না সন্দেহ বলা ভুল, বরং বলা যেতে পারে আশঙ্কা; আমার প্রবল আশঙ্কা যে দিন রাত নাওয়া-খাওয়া-ঘুম ভুলে মোক্সনের যন্ত্রাগারে সময় কাটানো ও একগাদা জটিল থেকে জটিলতর যন্ত্র নিয়ে পড়াশুনা ও ঘাঁটাঘাঁটি করাটা তার পক্ষে মোটেও ভালো হচ্ছে না। অনিদ্রা রোগ তার আগেই ছিল, আর সেটা কোনও সাধারণ ব্যধি নয়। কিন্তু এবার কি ওর মধ্যে মানসিক বিকারও উদয় হল? আমার প্রশ্নের যে উত্তর সে এইমাত্র দিল তাতে তো অন্যথা মনে হওয়ার কোনও কারণ নেই। আমার মনে বেশ রোখ চেপে বসছে তা নিজেও টের পাচ্ছি। তার এই পাগলামির শেষ আজ আমাকে দেখতে হবে। নিজের মনের অবিশ্বাস গোপন করবার কোনও রকম চেষ্টা না করেই প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা, তা ওগুলো এই চিন্তা ভাবনাটা করে কী দিয়ে? মস্তিষ্ক বলে ত নিশ্চয়ই কিছু নেই এদের?’

 

মোক্সন তার স্বভাবগত কালক্ষয় বাদ দিয়েই এবার উত্তর দিল। তবে এবারে আর উত্তর নয়, বরং একটা পালটা প্রশ্ন।

‘গাছ কীভাবে চিন্তা করে? গাছের কি মস্তিষ্ক আছে?’ এটা মোক্সনের আর একটা স্বভাব। প্রশ্নের বদলে প্রতিপ্রশ্ন।

 

‘আচ্ছা, তাহলে গাছেদের মধ্যেও দার্শনিক শ্রেণী রয়েছেন? তো তাঁদের কিছু সুচিন্তিত তত্ত্বকথা আমাকেও শোনাও শুনি। তবে ভূমিকা বা মুখবন্ধ বাদ দিতে পারো। অতটা শোনা আমার ধৈর্যে কুলোবে না।’

 

‘হয়তো আছে,’ প্রশ্নের ছলে তার প্রতি ছুড়ে দেওয়া খোঁচাটা আমল না দিয়েই বলে উঠল মোক্সন। ‘ওদের কাজ কারবার সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে তুমিও বুঝবে হে ভায়া। না। আমি তোমাকে বহু ব্যবহৃত লজ্জাবতী লতার গুটিয়ে যাওয়া, পোকা খেকো ফুল-পাতা অথবা যে সব ফুল পরাগ-কেশর ঝাঁকিয়ে মধুপান করতে বসা মৌমাছির সারা গায়ে ফুলের রেণু ছড়িয়ে দেয় দূরবর্তী কোনও গাছের সঙ্গে মিলনের সংকল্পে, সেসব কোনও উদাহরণ দেব না।  আমার বাগানের অন্য গাছপালা থেকে বেশ দূরে খোলা জমিতে একটা লতানো ফুলগাছের বীজ পুঁতেছিলাম। সেই বীজের অঙ্কুর মাটি ফুঁড়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ওটার হাতখানেক দূরত্বে একটা কাঠের খুঁটি পুঁতে দিই। লতাটা কাল বিলম্ব না করে ওই খুঁটি লক্ষ্য করে বাড়তে শুরু করল। কয়েকদিন বাদে যখন সেটা আমার খুঁটিটাকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে, আমি ওটা তুলে আরও কয়েক হাত দূরে পুঁতে দিলাম। লতাটাও খুঁটি লক্ষ্য করে একটা বাঁক নিয়ে আবার সেটার দিকেই বাড়তে শুরু করল। এইভাবে বেশ কয়েকবার যখনই লতাটা প্রায় আমার খুঁটিটা ধরে ফেলবে ফেলবে করছে, আমি সেটার অবস্থান পালটে লতাটাকে বাধ্য করলাম বাঁক নিয়ে নিজের বাইবার পথ বদল করতে। কিন্তু তার পরেই ঘটল একটা আশ্চর্য ঘটনা। শেষ পর্যন্ত লতাটা কিছুটা যেন নিরাশ হয়েই খুঁটিটাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে এগোতে লাগল বেশ কিছুটা দূরে থাকা একটা মাঝারি গাছের দিকে। ও শেষ পর্যন্ত অনেকটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেও সেটা সেই গাছ বেয়েই উঠতে লাগল। আমার খুঁটির দিকে আর যেন ফিরেও তাকাল না।

ইউক্যালিপটাসের শিকড় ভেজা মাটি বা জলের সন্ধানে অবিশ্বাস্য রকমের দৈর্ঘ্যে পৌঁছতে পারে তা জানো? একজন প্রখ্যাত উদ্ভিদবীদের লেখাতে উল্লেখ আছে যে একটা ইউক্যালিপটাস গাছের শিকড় একবার একটা পুরোনো ভূগর্ভস্থ নর্দমার পাইপে ঢুকে সেটা বেয়ে বাড়তে শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে সেই পরিত্যক্ত নর্দমাটা বন্ধ করা ছিল। শহরের একটা পাথরের দেওয়াল ওই নর্দমার আড়াআড়ি গিয়েছিল। সেটা তৈরি করার সময়ে নর্দমার পাইপের ওই অংশটা পাথরের দেওয়ালের গাঁথনি দিয়ে সম্পূর্ণভাবে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই শিকড়টি পাইপের মধ্যে বাধা পেয়ে সেই পাথরের দেওয়াল বরাবর আড়াআড়ি বাড়তে থাকে যতক্ষণ না সে সেই দেওয়ালে কোনও ফাঁক খুঁজে না পাচ্ছে। কিছু দূরে গিয়ে সেটা তা পেয়েও যায়। দেওয়ালের একটা পাথর ঠিকমতো গাথা না থাকায় খসে পড়েছিল , শিকড়টা সেই খসে যাওয়া পাথরের ফোকর দিয়ে দেওয়ালের অপর পারে পৌঁছে দেওয়াল বরাবর বেড়ে ফিরে এসে ঠিক সেই ফেলে আসা নর্দমার দেওয়ালের ওপারে অংশ খুঁজে নিয়ে তার ভেতর দিয়ে তার পরবর্তী যাত্রাপথের সন্ধান করে নিয়েছিল। এরকম আরও অনেক আছে। কিন্তু এর তাৎপর্য নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না? এগুলো গাছের চিন্তাশক্তির প্রমাণ। গাছেরাও ভাবনাচিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’

 

‘তা না হয় পারে। কিন্তু তাতে কী? আমরা তো গাছ নিয়ে চিন্তিত নই। আমরা আলোচনা করছিলাম যন্ত্র নিয়ে। হয়তো তাদের কিছু কিছু অংশ কাঠের তৈরি, কিন্তু সেই কাঠ তো প্রাণহীন। আর অনেক যন্ত্র তো সম্পূর্ণ ধাতব। খনি থেকে তুলে আনা আকর পুড়িয়ে পরিশুদ্ধ করে উৎপন্ন হয়েছে সে ধাতু । এবার কি তাহলে বলবে যে খনিজ পদার্থের মধ্যেও চিন্তাশক্তি রয়েছে?’

 

‘না থাকলে খনিজ পদার্থের স্ফটিকে রূপান্তর কীভাবে সম্ভব বলতে পারো?’

 

‘আমি বলতে চাই না।’

 

‘বলতে চাও না কারণ তোমার নিজেরই যুক্তিকে নস্যাৎ না করে খনিজের এই আশ্চর্য অবস্থার ব্যাখ্যা তোমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে খনিজের অণুগুলোর এই যে সংগঠিত আচরণ, তা কি তাদের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তির প্রমাণ নয়? সেনাবাহিনীর সেপাইরা যখন সরলরেখায় সারিবদ্ধ হয়, বা নিখুঁত বর্গাকারে বুহ্য রচনা করে, তখন তা তাঁদের চিন্তা শক্তির প্রমাণ, আকাশে পরিযায়ী বন্য রাজহাঁসের দল যখন একটি নিখুঁত ইংরেজি ভি অক্ষরের আকার নিয়ে উড়ে চলে, তা তাঁদের মস্তিষ্কের বিবর্তন-লব্ধ প্রবৃত্তি, আর যখন দ্রবীভূত খনিজের অবিন্যস্ত ভাবে ছুটে চলা অণুপরমাণুগুলো নিখুঁত জ্যামিতিক আকৃতি ধারণ করে বা বাতাসে মিশে থাকা জলকণাগুলো ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে মনুষ্য জাতির শ্রেষ্ঠ শিল্পীকেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মতো অসংখ্য অসামান্য সুন্দর ও সুসঙ্গত নক্সার তুষার কণা সৃষ্টি করে চলে, তা নিয়ে তোমার যুক্তি একটা কথাও বলে না। তোমার এই দাম্ভিক ঠুনকো যুক্তির সামনে আমি অন্তত মাথা নত করতে পারলাম না বন্ধু! আমাকে ক্ষমা কর।’

 

মোক্সনের গলার স্বরে ও ব্যবহারে এইরকম উত্তেজনা বা ব্যগ্রতার প্রকাশ আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন। তার এই যুক্তির বন্যায় আমি একটু থমকে গেলাম। মনে মনে এর পালটা জবাব খাড়া করছি, এমন সময়ে, পাশের ঘর থেকে একটা রহস্যময় শব্দ কানে এল। খুব ভারী একটা হাত যদি কাঠের টেবিলে জোরে একটা চাপড় মারে তাহলে যেরকম শব্দ হয়, পাশের ঘরের শব্দটাও অবিকল সেইরকম। ওই ঘরটাই মোক্সনের সেই “যন্ত্রাগার”। সে ঘরে স্বয়ং মোক্সন ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। শব্দটা মোক্সনের কানেও অবশ্যই গিয়েছিল আর তা শুনেই সে হঠাৎ শশব্যস্ত হয়ে শব্দটার উৎস লক্ষ করে এক ছুটে পাশের ঘরে অন্তর্হিত হল। মোক্সন অকৃতদার একা মানুষ, কাজেই পাশের ঘরে সেই সময়ে অন্য কারও উপস্থিতি খুবই অপ্রত্যাশিত। উৎকণ্ঠা ও তার চেয়েও অনেক বেশি অনুসন্ধিৎসা সংবরণ করে আমি অনেক কষ্টে চাবির ফুটো দিয়ে যন্ত্রঘরের বন্ধ দরজার ওপারে উঁকি মারা থেকে নিজেকে সংযত করে রাখলাম। কিন্তু আমার কান খাড়া হয়ে রইল। নানারকম অদ্ভুত শব্দ পাশের ঘর থেকে এসে আমার কানে প্রবেশ করতে লাগল, প্রথমে হালকা ধস্তাধস্তি, তার পর ভারী কোনও একটা বস্তুর পতনে ঘরের মেঝে বেয়ে ভেসে আসা মৃদু কম্পন। এর সঙ্গে খুব মৃদু দ্রুত ও গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ও মোক্সনের কণ্ঠে অস্ফুট উচ্চারণে বলা একটা শব্দ ‘হতভাগা!’ যখন এই সব কিছু জুড়ে কিছু একটা অর্থ খাড়া করবার চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই দরজা খুলে পাশের ঘর থেকে মোক্সনের আবির্ভাব ঘটল। মুখে একটা সামান্য লজ্জিত হাসির রেখা টেনে সে বলল ‘তোমাকে একা ফেলে রেখে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার জন্য কিছু মনে করো না। আসলে ও-ঘরে আমার একটা যন্ত্রের মেজাজ কিছুটা বিগড়ে সেটা কিছুটা অবাধ্য হয়ে পড়েছিল।’

 

তার বাঁ গালে চারটে সমান্তরাল ছোট আঁচড়ের চিহ্ন বেয়ে সামান্য রক্তের রেখা ফুটে উঠেছে। সেইদিকে চেয়ে আমি বললাম ‘তা ওটার হাতের নখগুলো কাটবার বন্দোবস্ত কিছু করে এলে কি?’ কিন্তু বৃথাই বলা। আমার কথাটাকে কোনওরকম গুরুত্ব না দিয়ে সে আবার নিজের চেয়ারে বসে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে নির্বিকারভাবে তার অপ্রত্যাশিতভাবে বিঘ্নিত বক্তৃতার খেই ধরে আবার তার বক্তব্য শুরু করল:

‘আজ অবধি যাঁরা দাবী করে এসেছেন যে এই বিশ্বে সকল বস্তুই সচেতন, প্রতিটি পরমাণু এক-একটা জীবন্ত, সংবেদনশীল আত্মসচেতন জীব, তাদের মতবাদ যে তুমি বিশ্বাস কর না তা তো জলের মতোই পরিষ্কার। আমি কিন্তু বিশ্বাস করি। এই জগতে মৃত, জড় বলে কিছু হয় না, সব বস্তুই সজীব, শক্তিতে পূর্ণ, তা গতিশক্তি হোক বা বিভব; সকলেই প্রকৃতির প্রভাবে সমানভাবে সংবেদনশীল। সকলেই তার তুলনায় উচ্চতর ও সূক্ষ্ম জীবের দ্বারা সমানভাবে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত, ঠিক যেমন মানুষ তথাকথিত যন্ত্রকে তার আজ্ঞার দাসত্বে বেঁধে রেখেছে। কিন্তু যেহেতু যন্ত্র চিন্তাশীল, সে তার স্রষ্টা ও নিয়ন্তার বুদ্ধিমত্তা ও উদ্দেশ্যের কিছুটা নিজের মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম। এবং তার এই ধরে রাখবার ক্ষমতা কতটা হবে তা যন্ত্রের জটিলতা ও তার কাজের ধরনের ওপর নির্ভর করে।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক হারবার্ট স্পেন্সারের “প্রাণ”-এর সংজ্ঞা নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে? আমি আজ থেকে তিরিশ বছর আগে প্রথম সেই সংজ্ঞা পড়েছিলাম। পরে উনি নিজেই হয়তো বিভিন্ন সময়ে তাতে একাধিকবার পরিবর্তন করে থাকবেন। কিন্তু আমি গত তিরিশ বছর ধরে ভেবেও ওই আদি সংজ্ঞার একটা শব্দও এমন কোনও পরিবর্তন করতে পারিনি যার ফলে ওটা আরও উন্নত হতে পারে। আমার কাছে ওই সংজ্ঞা শুধু শ্রেষ্ঠই নয়, তা একেবমদ্বিতিয়ম। ওঁর ব্যখ্যা অনুযায়ী “বাহ্যিক সহাবস্থান ও পারম্পর্যের সাযুজ্যে, একাধারে যুগপৎ ও ক্রমাগত, নানাধর্মী পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট সমন্বয়ই হল প্রাণ।” ’

 

‘সে আমিও পড়েছি। কিন্তু এ তো মাত্র প্রাণের অস্তিত্বের বিবরণ। কিন্তু এতে প্রাণের অস্তিত্বের কারণ সম্পর্কে কিছুই বলা নেই।’

 

‘যে কোনও সংজ্ঞায় সেটুকুই থাকে। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল এই বিষয়ে শেষ কথা বলে গেছেন। আমরা কোনও ঘটনারই কারণ হিসেবে তার পূর্ববর্তী একটি ঘটনা ছাড়া আর কিছুই জানতে পারি না। এবং কোনও ঘটনার ফল হিসেবেও তার পরবর্তী একটি ঘটনা ছাড়া আর কিছু জানার ক্ষমতাও আমাদের নেই। কাজেই যদি আমরা কোনও দুটি পৃথক ঘটনা সব সময়ে পরপর ঘটতে দেখি, তাহলে আমাদের সিদ্ধান্তে পূর্ববর্তী ঘটনা হয়ে ওঠে কারণ ও পরবর্তী ঘটনা হয়ে ওঠে তার ফল। মনে কর কোনও মানুষ যদি বার বার একটা কুকুরকে একটি খরগোশের পিছনে ধাওয়া করতে দেখে, এবং সে যদি সেই দৃশ্যের বাইরে জীবনে কোনও দিন কুকুর বা খরগোশ না দেখে থাকে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে ধরে নেবে যে খরগোশটাই ওই কুকুরের অস্তিত্বের কারণ।

‘এই দেখ, খরগোশের পিছনে ধাওয়া করতে করতে আমি আমাদের মূল আলোচনার বিষয়টাই ভুলতে বসেছি।’ বেশ সাবলীল ভঙ্গিতেই সামান্য হেসে মোক্সন বলল। ‘আসলে মনের চিন্তার মুক্ত স্রোতে ভেসে যাওয়ায় মধ্যে আসলে একটা অনাবিল আনন্দ রয়েছে। কিন্তু আমি তোমাকে যেটা বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম তা হল যে হার্বার্ট স্পেন্সারের প্রাণের সংজ্ঞার মধ্যে যন্ত্রের জীবন্ত হওয়ার প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে। তার সংজ্ঞায় এমন একটা কথাও পাবে না যা যন্ত্রের ওপর প্রযোজ্য নয়। পৃথিবীর যে কোনও তীক্ষ্ণধী চিন্তাবিদ বা যথার্থ দার্শনিকমাত্রেই স্বীকার করবে যে মানুষ সক্রিয় অবস্থায় যে প্রাণের স্বাক্ষর বহন করে, যে কোনও যন্ত্রও তার ক্রিয়াকালে সেই একই চিহ্ন বহন করে থাকে। আর একজন যন্ত্রী ও আবিষ্কারক হিসেবে আমার চেয়ে ভালো তা কেই বা জানবে?’

 

একটানা এতগুলো কথা বলে মোক্সন অবশেষে থামল। লক্ষ করলাম যে শেষ কথাগুলো বলতে বলতে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে সে একদৃষ্টে ফায়ারপ্লেসের আগুনের দিকে চেয়ে রয়েছে। যথেষ্ট রাত হয়েছে; আমি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লাম। এবার আমার তার কাছে বিদায় নেওয়াই উচিৎ, কিন্তু তাকে তার এই নির্জন আস্তানায় পাশের ঘরের সেই না-দেখা, কিছুটা বিরক্ত এবং হয়তো বিপজ্জনক কোনও এক সত্ত্বার সঙ্গে ফেলে রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে তার দিকে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে ও সোজা তার চোখে চোখ রেখে হাতের ইশারায় পাশের ঘরের দরজার দিকে নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করলাম:

‘মোক্সন, ও ঘরে কে আছে?’

 

একটা সপ্রতিভ হাসি হেসে মোক্সন বলল, ‘কেউ নেই। একটু আগে যা হল সেটা আমারই মূর্খতার ফল। একটা যন্ত্রকে চালিয়ে রেখে তাকে কোনও কাজ না দিয়ে তোমার মনের বন্ধ জানালা খোলবার দুরূহ প্রচেষ্টায় মেতে উঠেছিলাম। যাই হোক, তুমি কি জানো যে বোধশক্তি ছন্দের সৃষ্টি?’

‘এইবার খান্ত দাও’ উঠে দাঁড়িয়ে আমার ওভারকোটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে বললাম। ‘আজকের জন্য এইটুকুই যথেষ্ট। শুভরাত্রি। আর আশা করি যে যন্ত্রটাকে তুমি ভুল করে চালিয়ে রেখে চলে এসেছিলে, অবিলম্বে তার হাতে একটা মোটা দস্তানা চাপানোর ব্যবস্থা করবে যাতে পরের বার তাকে বলপ্রয়োগ করে থামানোর প্রয়োজন হলে তোমার শরীরটা অন্তত অক্ষত থাকে।’

 

আমার উপদেশের প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করবার জন্য অপেক্ষা না করেই আমি বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। বাইরে তখনও বৃষ্টির বেগ যথেষ্টই, আর তার সঙ্গে গাঢ় অন্ধকার। অন্ধকার হাতরে কাঁচা রাস্তার পাশে পাতা ভিজে কাঠের পাটাতন ধরে পথ খুঁজে এগোতে হচ্ছে বলে বেশি জোরে হাঁটা সম্ভব হচ্ছে না। সামনে বেশ খানিকটা দূরে একসার খাটো পাহাড়ের চুড়োর আড়াল থেকে বেরিয়ে থাকা আকাশে পাহাড়ের অন্য দিকে থাকা শহরের জনবহুল এলাকার আলোর খুব ফ্যাকাসে একটা আভাস মাত্র ফুটে উঠছে। আমার পিছনে একটু দূরে মোক্সনের বাড়ি; একবার পিছনে ফিরে দেখলাম, তরল গাঢ় অন্ধকারে বাড়ির একটা মাত্র আলোকিত জানালা রহস্য ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে জেগে রয়েছে। ওই জানালায় কোনও পর্দা নেই আর ওটা নিঃসন্দেহে মোক্সনের যন্ত্রঘরেরই জানালা। প্রত্যাশিতভাবেই মোক্সন আমাকে যন্ত্রের চিন্তাশক্তি ও ছন্দের উর্বরতা সম্পর্কে শিক্ষিত করবার গুরুদায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে আবার তার অসম্পূর্ণ গবেষণা সম্পূর্ণ করতে লেগে পড়েছে। তবে তার গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে বলা কথাগুলো সেই মুহূর্তে উদ্ভট ও হাস্যকর হলেও এখনও কথাগুলো আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। তার এই সৃষ্টিছাড়া চিন্তাভাবনা যেন কোথাও একটা তার এই বিষণ্ণ ও একাকী জীবনযাত্রা ও অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিত্বের সংঘাতের পরিণাম। হয়তো এটাই তার নিয়তি, তবে একটাই স্বস্তির বিষয় যে এসব তার অসুস্থ মস্তিষ্কের বিকার নয়। তার মতবাদ নিয়ে যাই মনে হোক না কেন, তার পেছনে যে যুক্তির বিন্যাস রয়েছে তা কোনও অক্ষম মস্তিষ্কের চিন্তার ফসল হতে পারে না। ওর শেষ কথাগুলো এখন বার বার আমার মনে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে। “বোধশক্তি ছন্দের সৃষ্টি।” আপাতদৃষ্টিতে নিরস সংক্ষিপ্ত একটা বাক্য; কিন্তু কেন জানি না যত সময় যাচ্ছে, শব্দগুলো প্রতি আমার মোহ ক্রমে বেড়ে চলেছে। যতবার শব্দগুলো মনের মধ্যে পাক খাচ্ছে, ততবার তার ব্যঞ্জনা আমার চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করে চলেছে নতুন নতুন দিকে। কেন আমার বারবার মনে হচ্ছে যে এই শব্দগুলো এক গভীর দর্শনের ভিত্তিপ্রস্তর? যদি বোধশক্তি ছন্দের থেকেই সৃষ্ট হয় তবে তো সত্যিই বস্তুমাত্রেই বোধশক্তি-সম্পন্ন হওয়াই স্বাভাবিক কারণ সকল বস্তুরই গতি রয়েছে আর সকল গতির মধ্যেই প্রকট বা প্রচ্ছন্ন কোনও ছন্দ থাকতেই হবে! মোক্সন কি তার এই কথাগুলোর বিস্তার ও তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন? শুধুমাত্র কথার ছলে এই প্রচণ্ড সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত তার মুখ থেকে বার হওয়া কি কাকতালীয়? নাকি সে যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের কঠোর কৃচ্ছসাধনের পথ অতিক্রম করে এই গভীর সিদ্ধান্তের সন্ধান পেয়েছে? সে যখন প্রথম এই সিদ্ধান্তের কথা তোলে তখন এই মতবাদ আমার কাছে একদমই আনকোরা ছিল ও স্বভাবতই তার যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা ও বিস্তার আমার মনের সিদ্ধান্তের পথ পরিবর্তন করতে পারেনি। কিন্তু এই মুহূর্তে ক্রমে আমার মনের জানালা খুলে গিয়ে তার মধ্য দিয়ে উপলব্ধির আলো প্রবেশ করে এই অন্ধকার বর্ষণসিক্ত রাত্রেও আমার নিঃসঙ্গ যাত্রা পথের সব অন্ধকার যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হয় এই অনুভবকেই দার্শনিকরা “দর্শন ও চিন্তার অসীম বৈচিত্র্যের উন্মাদনা” বলে বর্ণনা করে থাকেন। আমার মনের পুলক আমি এই মুহূর্তে আমার শরীরেও অনুভব করছি। নিজেকে অত্যন্ত হালকা মনে হচ্ছে; যেন মাটিতে আমার পা স্পর্শ করছে না, কোনও অদৃশ্য ডানায় ভর করে যেন আমি বাতাসে ভেসে এগিয়ে চলেছি।

 

কখন যে আমার নির্দিষ্ট যাত্রা পথের বিপরীতে গিয়ে আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দেওয়া আমার বন্ধু, যাকে এখন আমার গুরুর আসনে বসাতে মনে কোনও দ্বিধা নেই, সেই মোক্সনের দরজায় আবার এসে হাজির হলাম তা আমি নিজেও মনে হয় টের পাইনি। উদ্দেশ্য একটাই, আমার জানার পরিধির বিস্তার আর মনের প্রবল অনুসন্ধিৎসার প্রশমন। প্রবল বৃষ্টিতে আমার অবস্থা ভিজে কাক, কিন্তু সেদিকে আমার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। অন্ধকারে হাতড়ে দরজার ঘণ্টা খুঁজতে খুঁজতে আমার হাত পড়ল দরজার গোলাকার হাতলটার ওপর আর হাত পড়তেই আর ধৈর্য না রেখে কিছুটা যেন নিজের অজান্তেই সেটা ধরে একটা মোচড় দিয়ে ফেললাম। মোচড় পড়তেই সেটা খুলে গেল আর লঘু পদক্ষেপে সামনের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যে ঘরে এই একটু আগে পর্যন্ত আমি আর মোক্সন বসেছিলাম সেই ঘরটাতেই আবার ফিরে এসে প্রবেশ করলাম। সেই ঘরে এখন কেউ নেই। ঘরের বাতি নেভানো আর ফায়ারপ্লেসের আগুনটাও প্রায় নিভে এসে ঘরটায় অন্ধকারকে আহ্বান করে নিয়ে এসেছে। একটু আগে বাইরে বের হয়েই আন্দাজ করেছিলাম যে মোক্সন সম্ভবত তার যন্ত্রঘরে গিয়ে ঢুকেছে, সেই আন্দাজে নির্ভর করেই অন্ধকার হাতড়ে সেই ঘরের দরজার নাগাল পেলাম। দরজায় বেশ জোরে কয়েকবার করাঘাত করলাম, কিন্তু কারও কোনও সাড়াশব্দ নেই। বাইরের প্রবল ঝড়বৃষ্টির শব্দেই মনে হয় মোক্সন দরজা ধাক্কানোর শব্দ শুনতে পাচ্ছে না। বিশেষত মোক্সনের যন্ত্রঘরের ছাদটা টিনের পাতের ও সম্ভবত ওই ঘরে কোনও আলাদা কোনও সিলিং নেই। ফলে ঝোড়ো হাওয়া যে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাকে তার ছাদে প্রবল বেগে আছড়ে ফেলে রীতিমতো ঢক্কানিনাদ তুলেছে সেটা দরজার এপারে দাঁড়িয়েও বেশ শুনতে পাচ্ছি। মোক্সন ওই ঘরে আমাকে কোনওদিন নিয়ে যায়নি। ও ঘরে সে ছাড়া একজনকেই প্রবেশ করতে দেখেছি মাঝে মাঝে, সে হল একজন দক্ষ ছুতোর ও ধাতুর কাজ জানা কারিগর। তার নাম হ্যালি ও সে অত্যন্ত কম কথার মানুষ। তবে উত্তেজনা ও উৎসাহের আতিশয্যে এই মুহূর্তে কোনওরকম ভদ্রতা বা শিষ্টাচারের পরোয়া না করেই আমি দরজা ঠেলে ও ঘরে প্রবেশ করলাম।

 

ঘরে ঢুকে যে দৃশ্য চোখে পড়ল তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। ঘরের শেষপ্রান্তে একটা ছোট টেবিলের ওপারে আমার দিকে মুখ করে বসে আছে স্বয়ং মোক্সন। টেবিলের ওপর একটাই মোমবাতি জ্বলছে কিন্তু তার আলো ঘরটা পর্যাপ্তভাবে আলোকিত করতে পারেনি। মোক্সনের মুখোমুখি টেবিলের অন্যদিকে আমার দিকে পিছন ফিরে বসে রয়েছে আর একটা লোক। তাঁদের মাঝে টেবিলের ওপর পাতা রয়েছে একটা দাবার ছক; আর দুজনেই একাগ্র চিত্তে পারিপার্শ্বিক জগত ভুলে খেলায় মগ্ন। আমার দাবার জ্ঞান খুবই সীমিত; তবে দাবার বোর্ডে অবশিষ্ট কয়েকটা মাত্র ঘুঁটি দেখে আন্দাজ করতে পারছি যে খেলা প্রায় শেষের দিকে। মোক্সনকে দেখে মনে হচ্ছে যে তার মন খেলার থেকে সে তার প্রতিপক্ষর প্রতি বেশি আগ্রহী। এবং সেটা এতটাই বেশি যে আমি তার সরাসরি সামনে ঘরের এই প্রান্তে দাঁড়িয়ে, তবু আমার উপস্থিতি সে লক্ষই করছে না। মোমবাতির আলোয় তার মুখটা আশ্চর্য রকমের ফ্যাকাশে রক্তশূন্য মনে হচ্ছে, কিন্তু তার চোখের মণিদুটো সেই আলোয় দু-টুকরো হীরের মতো জ্বলছে।

মোক্সনের প্রতিপক্ষ আমার দিকে পিছন ফিরে বসে, তাই তার মুখ আমার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। তবে এটা বেশ বুঝতে পারছি যে তার উচ্চতা পাঁচ ফুটের বেশি নয় ও আকৃতিতে মানুষের থেকে একটা গোরিলার সঙ্গেই তার সাদৃশ্য বেশি। বিশাল চওড়া কাঁধের ওপর একটা খর্বকায় গর্দানের ওপর বসানো একটা ওলটানো হাঁড়ির আকারের মাথা থেকে ছড়িয়ে রয়েছে জট বাঁধা ঘন কালো চুল। মাথার ওপরে একটা লাল ফেজ টুপিও দেখতে পেলাম। তার গায়েও একটা আঁটসাঁট লাল পোশাক, কাঁধ থেকে কোমর অবধি নেমে সেটা একটা কোমরবন্ধনীতে গোঁজা। সে একটা প্যাকিং বাক্সের ওপর বসে রয়েছে। তাই তার বাক্সের আড়ালে তার পাগুলো আমি দেখতে পাচ্ছি না। তবে তার বাঁ হাতটা তার কোলের ওপরে অবস্থান করছে আর ডান হাতে সে দাবার বোর্ডে ঘুঁটি সরিয়ে চাল দিচ্ছে। তার ডান হাতটা যতটা চোখে পড়ছে তাতে বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না যে সেটা অস্বাভাবিকরকম লম্বা।

আমি দরজার সামনে থেকে সরে গিয়ে ঘরের অন্ধকার কোনে এসে দাঁড়ালাম। এখন মোক্সন যদি তার প্রতিপক্ষের ওপর থেকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তা এদিকে নিঃক্ষেপ করে তাহলেও আমাকে সে সহজে দেখতে পাবে না। সে শুধু দেখবে যে ঘরের বন্ধ দরজাটা কোনও অজ্ঞাত কারণে খুলে গেছে। এই ঘরের প্রতিটা ইট-কাঠ-দেয়াল (যা এখন আমি জানি যে এই ঘরের তিনটি প্রাণীর মতোই সচেতন) যেন আমাকে ঘরের ভেতরে অগ্রসর হয়ে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করতে সর্বান্তকরণে বারণ করছে আবার এই ঘর থেকে আমার প্রস্থানকেও  তারা সমর্থন করছে না। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে মোক্সনের আমার সাহায্যের প্রয়োজন হবে আর সেই কারণেই আরও একবার ভদ্রতা বা এই ঘরে অনধিকার প্রবেশ করে মোক্সনের কাছে ধরা পড়বার সম্ভাবনার অস্বস্তিকে উপেক্ষা করে আমি নিজের জায়গায় প্রাণহীন মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।

 

টেবিলের ওপর খেলা দ্রুত এগিয়ে চলল। মোক্সন খুব দ্রুত ও অনায়াস দক্ষতায় চাল দিচ্ছে। আমার অজ্ঞ চোখে মনে হচ্ছিল যেন দাবার বোর্ডে যে ঘুঁটিটা তার হাতের সবচেয়ে কাছে রয়েছে সেটাই সে প্রায় চোখ বুজে এগিয়ে দিচ্ছে। তবে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েও আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে যে চাল দেওয়ার সময়ে তার হাত কাঁপছে। যেন তার স্নায়ুর ওপর তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই চাল দেওয়ার সময়ে ঘুঁটির অবস্থান কিছুটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষর খেলার ধরন কিছুটা আলাদা। তার মাথায় চালগুলো অনায়াসে খেললেও তার হাত যেন তার মস্তিষ্কের গতির সঙ্গে সঙ্গত দিতে পারছে না। বেশ মন্থর ও স্থির গতিতে কিছুটা কেঠো ও নাটুকে ভঙ্গিতে সে তার ঘুঁটিগুলোর চাল দিয়ে চলেছে। তার খেলার এই ধরনটা আপাতদৃষ্টিতে বেশ বিরক্তিকর। তবু কেন জানি না এই দৃশ্য ক্রমেই আমার স্নায়ুতে এক অপার্থিব শঙ্কার ঢেউ তুলে চলেছে। আমার শরীরে একটা মৃদু কম্পন অনুভব করছি তা উত্তেজনার, ভয়ের না কি নিছকই আমার বৃষ্টি ভেজা ঠাণ্ডা শরীরের কাঁপুনি তা জানি না। তিন-চারবার নিজের ঘুঁটি চালাবার পরে ওই অজানা ব্যক্তি হঠাৎ তার মাথাটা একটু কাত করল। লক্ষ করছিলাম যে মোক্সন শেষ কয়েক চালে প্রতিবারই তার রাজার স্থান পরিবর্তন করল। হঠাৎ আমার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। এই লোকটা কি আদৌ মানুষ না অন্য কিছু? ওঁর আচরণ এরকম কাঠের পুতুলের মতো আড়ষ্ট কেন? তবে কি ওটা একটা যন্ত্র?

অটোম্যাটন! হ্যাঁ অটোম্যাটন, দাবাড়ু অটোম্যাটন! আমার মনে পড়ল মোক্সন আমাকে কিছুদিন আগে একবার গল্পের ছলে বলেছিল যে এরকম কিছু একটার পরিকল্পনা ও নক্সার কাজ সে সেরে ফেলেছে। তবে এরকম কিছু একটা যে তার ইতিমধ্যে বানানোও হয়ে গেছে তা আমি আন্দাজ করতে পারিনি এতদিন। তাহলে কি আজ সন্ধ্যায় যন্ত্রের চিন্তাশক্তি নিয়ে তার বক্তৃতা কেবলমাত্র অদূর ভবিষ্যতে এই যন্ত্রটার অস্তিত্ব আমার কাছে প্রকাশ করবার আগের ভণিতা মাত্র ছিল! এই যন্ত্রের কলকবজার খেলা দেখিয়ে আমাকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার জমি প্রস্তুত করতেই মোক্সন আমাকে যন্ত্রের কলাকৌশল সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ও অজ্ঞ পেয়ে একটা নিষ্ঠুর রসিকতায় মেতে উঠেছিল?

ধাপ্পা! আমার দার্শনিক যাত্রার সমস্ত আনন্দ, যুক্তির স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে উপলব্ধির পার খুঁজে পাওয়ার স্বস্তি ও আত্মহারা অবস্থা উবে গিয়ে তখন মনে জায়গা করে নিয়েছে নিজের নির্বুদ্ধিতার প্রতি একটা অসহ্য বিদ্রূপ। মুখের ভেতরে জিভে কীরকম একটা তেতো আস্বাদ অনুভব করছিলাম। এই অপমানের পর এখানে আমার আর থাকা উচিত নয়। এই ভেবে দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবো ঠিক এমন সময়ে এমন কিছু একটা চোখে পড়ল যাতে আমি আমার প্রস্থানের পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হলাম। মোক্সনের প্রতিপক্ষ ওই যন্ত্রটার কাঁধে একটা ঝাঁকুনি লক্ষ করলাম। খুব বিরক্ত বোধ করলে যেমন করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে কেউ তার মনের ভাব প্রকাশ করে অবিকল সেইরকম একটা বিরক্তির প্রকাশ আমি ওই যন্ত্রটার মধ্যে লক্ষ করলাম। তার সেই অভিব্যক্তি এতটাই স্বাভাবিক, এতটাই মানুষের মতো যে হঠাৎ ওই দৃশ্যে স্তম্ভিত হয়ে কৌতূহল নিয়ে ঘরের ওই প্রায়ান্ধকার কোনায় দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হঠাৎই একটা সংশয় এসে দানা বাঁধছে, বেশ বুঝতে পারছি যে আরও অনেক বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে ওই টেবিলের প্রান্ত থেকে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা অনেকটা কেটে যাওয়ার মনটা কিছুটা হালকা লাগছে । এবার যন্ত্রটা তার হাতের মুঠো শক্ত করে হাতটা মাথার ওপর তুলে টেবিলের ওপর সজোরে নামিয়ে এনে একটা আঘাত হানল। ঘরের ছাদে বাইরের বৃষ্টির শব্দের প্রবল পরাক্রম ছাপিয়ে সেই শদের অভিঘাত আমার কানে এসে পৌঁছল। মোক্সনকে দেখে মনে হচ্ছে সে আমার চেয়েও হতবাক। সন্ত্রস্ত হয়ে সে তার চেয়ারটা টেবিল থেকে বেশ কিছুটা পেছিয়ে নিল। এবার মোক্সনের দান, বেশ দূর থকে ভয়ার্ত মুখে কাঁপা ডান হাতটা কোনওরকমে বোর্ডের ওপর এনে প্রায় শিকারি বাজপাখির গতিতে ছোঁ মেরে একটা ঘুঁটি এগিয়ে দিয়েই সে আবার পিছিয়ে গেল। শুনতে পেলাম অস্ফুট স্বরে তার মুখ দিয়ে দুটো শব্দ উচ্চারিত হল ‘কিস্তি মাত’।

কিস্তি মাত ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গেই মোক্সন এক লাফে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সেটার পিছনে নিজেকে আড়াল করে তার অটোম্যাটনের দিকে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইল। তার অটোম্যাটন কিন্তু নিশ্চল মূর্তির মতো বসে রয়েছে।

বাইরে ঝড়ের দাপট কিছুটা কমে আসছে বলে মনে হল। বৃষ্টির শব্দও আর আগের মতো তীব্র নয়। তবে থেকে থেকে ক্রমাগত মেঘের গর্জন, বজ্রপাতের শব্দ ভেসে আসছে। দুটো বজ্রপাতের শব্দের মাঝের শান্ত সময়টায় আমার কানে এখন এসে পৌঁছচ্ছে আর একটা শব্দ; একটা চাপা ঘরঘরে একটানা শব্দ যা ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শব্দটা নিঃসন্দেহে ওই অটোম্যাটনের ভিতর থেকেই আসছে আরে সেটার তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বেশ বুঝতে পারছি যে শব্দটা নিশ্চিতভাবেই অটোম্যাটনের ভেতরের কলকবজা ও চাকা প্রবলভাবে ঘোরার শব্দ। শব্দটা শুনে কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে যে যন্ত্রটার ভিতরে দুটো বিপরীত শক্তির একটা প্রবল ঘাত-প্রতিঘাতের স্রোত বয়ে চলেছে। বেশ কিছু বিদ্রোহী কলকবজা, স্প্রিং ও গিয়ার একযোগে যেন যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ও সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকা যন্ত্রাংশগুলোর শাসন ছিন্ন করে এক স্বতন্ত্র সত্তার প্রতিষ্ঠা করছে। ওর শরীরের ভেতরে থাকা প্রতিটি দাঁতওয়ালা যান্ত্রিক চাকার দাঁতগুলো যেন প্রবল বলপ্রয়োগে বিপরীত শক্তির চাকার দাঁতগুলোকে পিষে ভেঙে স্বতন্ত্রভাবে ঘোরবার স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম করে চলেছে। শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে আমার মনের এইসব বিশ্লেষণের মাঝেই অটোম্যাটনটা নড়েচড়ে উঠল। তবে তার গতি স্বাভাবিক নয়। অনেকটা মৃগী রোগীর প্রবল খিঁচুনির মতো তার সারা শরীরে ঝাঁকুনি শুরু হয়েছে। ক্রমে তা বাড়ছে ও তার নড়াচড়ায় একটা নির্দিষ্ট দিকে অগ্রসর হবার আভাস দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ নিমেষে সেটা জ্যা-মুক্ত ধনুকের মতো সটান দাঁড়িয়ে উঠে সামনের টেবিলটা উলটে ফেলে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে মোক্সনের দিকে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রবল বিক্রমে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মোক্সন প্রাণপণে পিছিয়ে গিয়ে তার নাগাল এড়াতে চেষ্টা করল বটে কিন্তু তার সেই চেষ্টা সফল হল না। জীবটার (হ্যাঁ এখন আর তাকে কোনওমতেই অটোম্যাটন যন্ত্র বলা চলে না) দুটো হাত প্রবল শক্তিতে মোক্সনের গলায় চেপে বসেছে আর এতক্ষণে উলটে মেঝেতে পড়ে যাওয়া মোমবাতিটা নিভে গিয়ে সারা ঘরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার নেমে এসেছে। তবে ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে একটা প্রবল ধস্তাধস্তির শব্দ আমার কানে আসছে। আর তাকে ছাপিয়ে একটা ফ্যাঁসফেঁসে কর্কশ গোঁ গোঁ শব্দ আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা বরফের স্রোত বইয়ে দিচ্ছে। এই শব্দটা যে মোক্সনের নিজের অবরুদ্ধ শ্বাসনালীকে ওই হিংস্র আক্রমণকারীর হাতের বজ্রপাশ থেকে মুক্ত করবার ব্যর্থ শেষ চেষ্টার শব্দ তা নিয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই। নিজের অজান্তেই কখন যে ওই নারকীয় গোঙানি লক্ষ করে অন্ধকার হাতড়িয়ে এগোতে চেষ্টা করলাম আমার বন্ধুকে ওই বীভৎস জীবটার হাত থেকে মুক্ত করবার শেষ চেষ্টা করতে তা নিজেও বুঝতে পারিনি। কিন্তু অন্ধকারে দু-এক পা এগোতেই হঠাৎ একটা প্রচণ্ড চোখধাঁধানো আলো ঘরের সমস্ত অন্ধকার ভাসিয়ে নিয়ে গেল। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মেঝের ওপর সংগ্রামে মত্ত দুটি জীবকে। নীচে মেঝেতে পড়ে রয়েছে মোক্সন ও তার বুকের ওপরে চেপে বসে রয়েছে সেই ধাতব জীবটা। মোক্সনের গলায় চেপে বসে আছে সেই জীবটার দুটো ধাতব হাতের অমোঘ ফাঁস। তার মাথাটা প্রায় মাটির সঙ্গে প্রায় মিশে গিয়েছে আর তার চোখের কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে বিস্মিত, আতঙ্কিত দুটো চোখ। তার অসাড় জিব বের হয়ে একটু বাতাসের আশায় উন্মুখ দুটো ঠোঁটের একপাশে ঝুলে পড়েছে। অন্যদিকে তার সেই অব্যক্ত যন্ত্রণার অভিব্যক্তির ওপর ঝুঁকে রয়েছে আর একটা মুখ। এই মুখটা সেই ধাতব ঘাতকের। কি আশ্চর্য নিঃস্পৃহতা সেই মুখে। কারিগরের রংতুলিতে আঁকা সেই মুখে একটা প্রশান্ত গভীর চিন্তার ছায়া। যেন দাবা খেলার শেষ চালটা সে এতক্ষণে দিতে পেরেছে। আর তার চোখ সগৌরবে ঘোষণা করে চলেছে ‘কিস্তি মাত!’ বুঝতে পারছি আমার চোখের সামনে একটা অন্ধকার গাঢ় পর্দা নেমে আসছে। নিজের শরীরটা আর অনুভব করতে পারছি না।

 

 

চোখ খুলে প্রথমে কোথায় আছি তা বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। ক্রমে বুঝলাম যে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রয়েছি। জ্ঞান ফেরার পরেও অনেকক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে রইলাম। সেই দুঃস্বপ্নের রাতের স্মৃতিগুলো ক্রমে ফরসা হচ্ছে। হাসপাতালে শুয়ে না থাকলে আর আমার সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণার অনুভূতি না থাকলে হয়তো মনে করতাম যে স্মৃতিগুলো আসলে এক অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্নের। কিন্তু সেই ভয়াবহ রাতের চিহ্ন এখনও আমার সারা শরীরে স্পষ্ট অনুভব করছি।

আবার চোখ খুললাম আর এবারে সামনে যাকে দেখতে পেলাম তাকে আমি চিনি। মোক্সনের সেই গোপন যন্ত্রঘরের কর্মকাণ্ডের একমাত্র সহকারী হ্যালি! আমাকে দেখতে পেয়ে সে এসে আমার বিছানার পাশে দাঁড়াল।

দুর্বল গলায় বেশ কষ্ট করেই তাকে বললাম ‘কী হয়েছিল সেই রাতে? সব আমাকে খুলে বল । কিছু গোপন করো না।’

‘নিশ্চয়ই বলব। আপনাকে অচৈতন্য অবস্থায় একটা জ্বলন্ত বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মোক্সনের বাড়ি। আপনি সেখানে সেই রাতে কী করছিলেন সেটা নিয়ে আমারও প্রশ্ন রয়েছে। সেটার কৈফিয়ত আপনাকেই দিতে হবে সবাইকে। তবে আগুনটা কীভাবে লেগেছিলো সেটাও এখনো স্পষ্ট নয়। আমার ধারণা বাড়িটায় বজ্রপাত হয়ে আগুন লেগে যায়।’

‘আর মোক্সন?’

‘ওঁকে গতকাল কবর দেওয়া হল। মানে ওঁর শরীরের যতটুকু আগুনের গ্রাসে পরিণত হয়নি সেটুকুই।’

মনে মনে বললাম এই মুখচোরা চাপা স্বভাবের লোকটার মুখেও তাহলে বিশেষ বিশেষ সময়ে বেশ ভালো রকমের বুলি ফোটে। বিশেষত একজন অসুস্থ মানুষকে বীভৎস বর্ণনা দিয়ে আরও পীড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে তো বটেই। বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজে পড়ে রইলাম। গলার মধ্যে একটা কী যেন দলা পাকিয়ে উঠছে। বুকের ওপরে কেউ যেন একটা ভারী পাথর চাপিয়ে দিয়ে চলে গেছে। অনেক সংযমে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার চোখ খুলে হ্যালিকে প্রশ্ন করলাম, ‘আমাকে ওই জতুগৃহ থেকে রক্ষা করল কে?’

‘একান্তই যদি জানতে চান ত বলি, এই অধমই সেই কাজটি করেছে।’

‘অনেক ধন্যবাদ মিস্টার হ্যালি। ভগবান তোমার মঙ্গল করুন। তুমি কি তোমার সৃষ্টি ও অসামান্য দক্ষতার নিদর্শন ওই যন্ত্রটাকেও ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছ? নিজের আবিষ্কর্তার হত্যাকারী ওই দাবাড়ু অটোম্যাটনটাকে?’

 

হ্যালি এইবার হঠাৎ থমকে গেল। আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে অনেকক্ষণ উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তারপর আমার দিকে ফিরে ভাঙা গলায় বলল, ‘আপনি ওটার কথা জানেন?’

‘হ্যাঁ জানি’ বললাম আমি। ‘আমিই ওটার খেলার শেষ চালের একমাত্র জীবিত সাক্ষী।’

 

তার পরে অনেক বছর কেটে গেছে। আজও বসে মনে মনে ভাবি। সত্যি কি আমিই একমাত্র জীবিত সাক্ষী ওই নারকীয় ঘটনার? অটোম্যাটনের খেলা কি সত্যিই সেদিন শেষ হয়েছিল? নাকি আজও সে পরবর্তী চালের প্রতীক্ষায় কোথাও দাবার ছক সাজিয়ে বসে দিন গুনছে? যত দিন যাচ্ছে ক্রমেই আমার মনের সংশয় আরও বেড়ে চলেছে। আজ যদি আমাকে হাসপাতালে হ্যালির সেই প্রশ্নটা আবার করা হয়, হয়তো অতটা নিশ্চিত উত্তর আমার মুখ দিয়ে আর বের হবে না।

Tags: অনুবাদ গল্প, অ্যাম্ব্রোস বিয়ার্স, কল্পবিজ্ঞান গল্প, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সুপ্রিয় দাস

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!