তিন ডিগ্রীর পালা

  • লেখক: সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

১৯১৭ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সমীকরণগুলির থেকে মহাবিশ্বের আকার ও গঠনের জন্য প্রথম একটি স্থির এবং স্থিতিশীল মহাবিশ্বের মডেলের প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু তাঁর একই তত্ত্ব থেকে রাশিয়ান বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান, বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী জর্জ লেমাট্রে এবং ডাচ জ্যোতির্বিদ উইলেম ডি সিটার মহাবিশ্বের যে মডেল অনুমান করেছিলেন তা ছিল অস্থির এবং প্রসারণশীল। লেমাট্রে ধারণা করেছিলেন যে আদিম ব্রহ্মাণ্ডটি একটি মৌলিক পরমাণু থেকে বিস্ফোরিত হয়ে প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সৃষ্টি করেছিল।

উৎস ও পর্যবেক্ষকের মধ্যের আপেক্ষিক গতির জন্য শব্দ বা আলোক তরঙ্গ সংকেতের কম্পাঙ্কের হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়াকে বলা হয় ডপলার প্রভাব। এর ফলে সূর্যের থেকে কোনও নক্ষত্র যদি দূরে চলে যেতে থাকে তবে তার বর্ণালি রেখা নীচু কম্পাঙ্কের লালের দিকে সরে যাবে। একে বলে লাল সরণ (Red Shift)। আর যদি কাছে এগিয়ে আসতে থাকে, তবে তার বর্ণালি রেখা উঁচু কম্পাঙ্কের নীলের দিকে সরে আসবে। একে বলে নীল সরণ (Blue Shift)।

ডপলার সরণ

1) সূর্য

2) তারা বা গ্যালাক্সি যা দূরে সরে যাচ্ছে — লালসরণ (Red Shift)

3) তারা বা গ্যালাক্সি যা এগিয়ে আসছে — নীলসরণ (Blue Shift)

১৯১২ সালে অ্যামেরিকার অ্যারিজোনার লোয়েল অবসারভেটরির জ্যোতির্বিদ ভেস্টো শ্লিফার প্রথম নীহারিকাদের লাল সরণ লক্ষ করেন। তিনি এও দেখেন যে নীহারিকাগুলি সাধারণ নক্ষত্রদের থেকে অনেক বেশি দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে। কিন্তু এর গুরুত্ব তিনি বুঝতে পারেননি।

এডুইন হাবল ও তাঁর সহকারী মিল্টন হুমাসন ১৯২৯ সালে অ্যামেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসের মাউন্ট উইলসন অবসারভেটরির তৎকালীন বিশ্বের সবথেকে বড় ১০০ ইঞ্চির টেলিস্কোপের সাহায্যে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রায় পঁচিশটি নীহারিকার দূরত্ব মাপেন। হাবল, এর সঙ্গে শ্লিফারের মাপা নীহারিকাদের লাল সরণের তথ্যের এক লেখচিত্র তৈরি করে দেখতে পেলেন—

১) প্রথমত, এই নীহারিকাগুলি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অন্য নীহারিকাদের তুলনায় অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত। অর্থাৎ এইগুলি বহুদূরে অবস্থিত আমাদের গ্যালাক্সির মতন বিভিন্ন গ্যালাক্সি।

২) গ্যালাক্সিগুলো আমাদের মিল্কিওয়ের থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দূরে সরে যাচ্ছে।

৩) যে গ্যালাক্সি যত দূরে অবস্থিত সে তত দ্রুত গতিতে ছুটে দূরে চলে যাচ্ছে।

হাবলের এই লেখচিত্র সেদিন লেমাট্রে, ফ্রীডম্যান ও ডি সিটারের মহাবিশ্বের বেগবান ও প্রসারণশীল মডেলের অনুমানকেই সমর্থন করেছিল— আইনস্টাইনের নিশ্চল ও স্থিতিশীল মডেলকে নয়।

বিখ্যাত রাশিয়ান-অ্যামেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও কসমোলজিস্ট জর্জ গামো (গিওর্জি আন্তোনোভিচ গামো) প্রথম থেকেই লেমাট্রের প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণাকেই সমর্থন করে আসছিলেন। গ্যামো প্রথম ১৯৪৬–৪৮ নাগাদ প্রস্তাব করেছিলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব কয়েকশো কোটি বছর আগে t=0 সময়ে অত্যন্ত উচ্চ ঘনত্ব এবং তাপমাত্রার সমসত্ত্ব অবস্থার এক বিন্দু থেকে শুরু হয়েছিল। এই বিন্দুকে বলা হয় Singularity Point যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের বিদ্যমান সকল সূত্র ব্যর্থ হয়। এই বিন্দুতে মহাবিশ্বের ঘনত্ব ও শক্তি ছিল অসীম।

এরই মধ্যে ১৯৪৮ সালে, ফ্রেড হয়েল, হারম্যান বন্ডি এবং টমাস গোল্ড মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে একটি নতুন তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন যা এখন স্টেডি স্টেট থিয়োরি নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব দাবি করেছিল যে ‘মহাবিশ্বের কোনও শুরু বা শেষ নেই এবং যেভাবে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, মহাবিশ্বের ধ্রুব ঘনত্ব বজায় রাখার জন্য বস্তুর (matter) স্বতস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি হচ্ছে।’ একটি বিন্দু থেকে বিস্ফোরিত হয়ে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে— ফ্রেড হয়েল যেহেতু এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে ছিলেন, আর সে সময় গামো এটিকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন, তাই তিনি এটিকে ‘বিগ ব্যাং তত্ত্ব’ নাম দিয়ে উপহাস করেছিলেন। আর এই বিগ ব্যাং তত্ত্বই পরবর্তী সময়ে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ও হয়েলের তত্ত্বকে খারিজ করে দেয়। বর্তমানে মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে মডেলটি এখনও প্রতিষ্ঠিত তার নাম বিগ ব্যাং মডেল।

জর্জ গামো, ১৯৪৬ সালে, Physical Review-র (vol. 70 1946, October p 572) মতন প্রসিদ্ধ জার্নালে “Expanding Universe and the Origin of Elements”— শিরনামের এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন— যেখানে তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন যে খুব গরম এবং ঘন আদিম বস্তুর দ্রুত প্রসারণ ও ঠান্ডা হওয়ার জন্য, অব্যাহত নির্মাণ প্রক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন পারমাণবিক পদার্থের উৎপত্তি হয়েছে।

গামো এবং তাঁর ছাত্র আর এ আলফার এবং তার সহকর্মী আর সি হারম্যান ধারণা করেছিলেন যে আদিম গরম মহাবিশ্বে, প্রথম কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সংঘটিত থার্মোনিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় সমস্ত রাসায়নিক উপাদান সংশ্লেষিত হয়েছিল— এবং তাঁরা মহাবিশ্বের বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের আপেক্ষিক প্রাচুর্যের উপর পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ থেকে ধারণাটি অনুসন্ধান করছিলেন। এই গরম আদিম মহাবিশ্বকে জনপ্রিয়ভাবে বলা হত অগ্নিগোলক (Fire ball)। বাস্তবে যদিও বেশির ভাগ কাজ গামো এবং আলফার করেছিলেন, তবুও গামো তাঁর বন্ধু এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী হ্যান্স বেথের (যিনি ফিউশন প্রক্রিয়ার কাজের জন্য ১৯৬৭ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন) নাম তাঁর গবেষণা পত্রে (“The Origin of Chemical Elements”, Physical Review, vol. 73, no 7, April 1948, pp 803 – 804) সহ-লেখক হিসাবে দিয়েছিলেন যেখানে লেখকদের নাম রালফ এ আলফার, এইচ বেথে এবং জি গামো— এই পর্যায়ক্রমে ছাপা হয়েছিল। এর মানে হল লেখকের তালিকা দেওয়া হল বর্ণমালার ক্রম অনুসারে আলফা(α), বিটা(β) এবং গামা (γ)— যা গ্রীক বর্ণমালার প্রথম তিনটি অক্ষর। এটাই ছিল গামোর নিছক মজা করার প্রবণতা। আলফার কিন্তু এই বেথের নাম অযথা সংযোজন করাটা ঠিক মেনে নিতে পারেননি কারণ তা’তে আলফারের কাজের গুরুত্ব কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়।

গামো তার গবেষণাপত্র “The Evolution of The Universe” (Nature, October 30, 1948, vol. 162 p 680 – 682) এ প্রস্তাব করেছিলেন যে পদার্থের আসল অবস্থা ছিল খুব ঘন অত্যন্ত উত্তপ্ত নিউট্রন ফ্লুইড। বর্তমান প্রসারণের পূর্ববর্তী কাল্পনিক সর্বাঙ্গীন সংকোচনের শেষ পর্যায়ে প্রবল উচ্চচাপে ইলেক্ট্রন ও প্রোটনের মিলনে এই অত্যন্ত উত্তপ্ত নিউট্রন ফ্লুইডের সৃষ্টি হয়েছিল। মহাবিশ্বের প্রসারণের ফলে, যখন তার অতি উত্তপ্ত অবস্থা ঠান্ডা হয়ে তাপমাত্রা 1010 OK (কেলভিন) এ নেমে এল তখন নিউট্রন ক্ষয়ে প্রোটনে পরিণত হল ও প্রোটন নিউট্রনের মিলনে আরও জটিল জটিল নিউক্লিয়াস তৈরি হল।

গামো, মহাবিশ্বের ৩০ মিনিট সম্প্রসারণের সময়ের পদার্থের ঘনত্ব mat (10-9 gm/cc) আর বিকিরণের ঘনত্ব (rad) জলের ঘনত্বের সঙ্গে তুলনা করে দেখিয়ে উপসংহারে এসেছিলেন যে, সেই সময়ে মহাবিশ্ব বিকিরণ প্রভাবিত ছিল, পদার্থ প্রভাবিত নয়। পদার্থ এবং বিকিরণের ভর ঘনত্ব এক হয়ে যায় t = 1.3 x 108 বছর পরে যখন মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ছিল 340O K।

আলফার এবং হারম্যান পরবর্তীকালে গামোর গণনা (“The Evolution of The Universe”, Nature, 1948, vol. 162 p 680 – 682) সংশোধন করে দেখিয়েছেন যে পদার্থ এবং বিকিরণের ভর ঘনত্ব সমান হয়ে যায় যখন মহাবিশ্বের বয়স t=107 বছর এবং মহাবিশ্বের তাপমাত্রা 600O K ছিল যা বর্তমান সময়ে 5OK পর্যন্ত ঠান্ডা হওয়া উচিত।

আলফার (Physical Review, vol. 74, 1948, page 1577) পূর্বেই দেখেছিলেন যে প্রারম্ভিক উষ্ণ মহাবিশ্বে পারমাণবিক জ্বলন, হিলিয়ামের চেয়ে ভারী উপাদানগুলিকে খুব কম পরিমাণে উত্পাদন করে। এখানে গামোর তত্ত্বের একটু ভুল হয়েছিল। গামো বলেছিলেন সকল পদার্থই আদিম বিশ্বে প্রবল উত্তাপে নিউক্লিওসিন্থেসিস হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। বর্তমানে মহাবিশ্বের আধুনিক গবেষণা মতে হাইড্রজেন ও হিলিয়াম বাদে বাকি ভারী উপাদানের সম্প্রসারিত আদি মহাবিশ্বের পরিবর্তে উৎপত্তি হয়— কিছু তারাদের জীবদ্দশায়, কিছু বিভিন্ন ভরের তারাদের মৃত্যুকালে অর্থাৎ সুপারনোভা কালে বা কিছু আবার দুটি নিউট্রন তারার সংঘর্ষকালে।

গামো এবং তাঁর দলের কাজগুলি এইভাবে কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে:

প্রায় 1010 বছর আগে মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ এবং শক্তি একটি অগ্নিগোলকে কেন্দ্রীভূত ছিল যার ঘনত্ব ছিল ≥ 1025 gm/cc এবং তাপমাত্রা ছিল ≥ 1016 OK। অগ্নিগোলকে বিকিরণের চাপ ছিল অসাধারণ এবং এটি একটি বিস্ফোরণের ফলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বাহিরের দিকে প্রসারিত হয়েছিল। এর নাম— হট বিগ ব্যাং।

মহাবিশ্বের সমস্ত উপাদান বিগ ব্যাং এর পর প্রথম কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পারমাণবিক বিক্রিয়া দ্বারা গঠিত হয়েছিল।

অগ্নিগোলকের প্রাথমিক মুহূর্তগুলিতে তাপমাত্রা এবং ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে সকল পদার্থের মধ্যে একটা তাপীয় ভারসাম্য ছিল এবং পদার্থগুলি ছিল প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন-পজিট্রনের জোড়া, নিউট্রিনো এবং অত্যন্ত শক্তিশালী γ (গামা) বিকিরণ, যা তথাকথিত ‘কসমিক স্যুপ’ গঠন করেছিল। প্রাথমিক মহাবিশ্ব একটি তাপ বিকিরণ ক্ষেত্রের জন্ম দিয়েছিল, যেখানে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে তীব্রতার একটি অনন্য বন্টন ছিল যার সম্বন্ধ ছিল তাপমাত্রার সঙ্গে। সেই অর্থে আদি মহাবিশ্ব ছিল একটি কৃষ্ণবস্তু (Black Body)। মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমে যায় এবং প্রতিটি ফোটন বা আলোককণা মহাজাগতিক সম্প্রসারণের ফলে লাল তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সরে যায়। বর্তমান যুগে মহাজাগতিক বিকিরণের তাপমাত্রা 5O K তে নেমে আসার কথা। অর্থাৎ লেমাট্রের এই সম্প্রসারণশীল অগ্নিগোলক মহাবিশ্বের অত উচ্চ তাপমাত্রা প্রসারণের ফলে ঠান্ডা হতে হতে ১৩৭০ কোটি বছর পরেও কিছু উত্তাপ থেকে যাওয়ার কথা। এই বিকিরণকে পরবর্তী কালে বলা হয়েছে মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণ (Cosmic Microwave Background Radiation)।

কিন্তু গামোর এই কাজ ও গণনার প্রতি আগ্রহ অধিকাংশ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে সেদিন হ্রাস পেয়েছিল যখন এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে হিলিয়ামের চেয়ে ভারী উপাদানগুলির সংশ্লেষণ অবশ্যই হট বিগ ব্যাং এর সময়ে ঘটেনি। গামোর কাজ সে সময় থেকে উপেক্ষিত হয়ে রইল।

প্রায় এক দশক পড়ে ১৯৬০ সালের সময়ে নিউ জার্সির প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে রবার্ট এইচ ডিক এই মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এর আগে ১৯৪৬ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনলজিতে থাকাকালীন তিনি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ শোষণের গবেষণার জন্য একটি রেডিয়োমিটার তৈরি করেছিলেন।

রেডিয়ো ইঞ্জিনিয়াররা সাধারণত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তীব্রতাকে তাপীয় বিকিরণের তীব্রতার সঙ্গে তুলনা করে, তাপমাত্রার পরিপ্রেক্ষিতে একটি রেডিয়ো সিগন্যালের শক্তি চিহ্নিত করে যা একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যান্ডে একটি আদর্শ কৃষ্ণবস্তু দ্বারা নির্গত হবে।

কৃষ্ণবস্তু তাকেই বলে যে সমস্ত রকম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শুষে নিতে পারে। আবার যখন বস্তু থেকে রশ্মির নিঃসরণ হয় তখন তার বর্ণালী বস্তুর বৈশিষ্ট্য হয়— শোষিত কোনও বিকিরণের ধরণের ওপর নয়। কোনও নির্দ্দিষ্ট বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে তার তীব্রতার লেখচিত্রের আকার তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল।

যদি অ্যান্টেনা দ্বারা গৃহিত কোনও বিকিরণের কম্পাঙ্ক ν এবং ν+∆ν cycles/sec-এর কম্পাঙ্কের মধ্যে আর ক্ষমতা যদি P ergs/sec হয়, তবে—

P = kT∆ν

যেখানে k হল বোল্টজম্যান ধ্রুবক (k=1.380649 × 10−23 joule per degree kelvin)।

তাপমাত্রা T কে ‘অ্যান্টেনা তাপমাত্রা’ বলা হয়। যে কোনও ব্ল্যাকবডির ‘অ্যান্টেনা তাপমাত্রা’ হল সেই বডির থার্মোডাইনামিক তাপমাত্রা বা সাধারণভাবে একটা বস্তুর তাপমাত্রা বলতে আমরা যা বুঝি।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে মহাবিশ্বের আরেকটি মডেল পাওয়া যায় দোলায়মান তত্ত্ব (Cyclic Model)। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের চক্রাকারে প্রসারণ ও সঙ্কোচন হয়। ডিক এই দোলায়মান মহাবিশ্বের তত্ত্বকে সমর্থন করতেন।

তিনি কল্পনা করেছিলেন যে অগ্নিগোলক থেকে বিকিরিত তীব্র তাপের মহাবিশ্ব ত্যাগ করার কোনও সুযোগ নেই এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সঙ্গে এটি এখন পরম শূন্যের উপরে কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা হওয়া উচিত। তিনি তাঁর দুই ছাত্র ডেভ উইলকিনসন এবং পিটার রোল নামক দুই তরুণ রেডিয়ো জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে এটি অনুসন্ধান করতে বলেন এবং তাঁর আরেক ছাত্র ফিলিপ জেমস এডওয়ার্ড পিবলসকে এর তাত্ত্বিক যুক্তি খুঁজে বের করতে বলেন।

পিবলস ছিলেন তখন একজন তরুণ উজ্জ্বল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি দেখতে পেলেন যে আদিম মহাবিশ্বের পদার্থের মোট ভরের 25% হিলিয়ামে পরিণত হবে এবং মহাবিশ্বকে ছেয়ে ফেলা অবশিষ্ট বিকিরণের তাপমাত্রা আজ প্রায় 10OK হবে। তিনি এর ওপর একটি গবেষণাপত্র Physical Reviewতে প্রকাশের জন্য পেশ করেন কিন্তু তার এই পত্র প্রকাশের জন্য মনোনীত হয়নি কারণ এতে এই বিষয়ে পূর্বসূরীদের কাজের যথেষ্ট পর্যালোচনা করা হয়নি। আসলে তিনি গামো এবং তাঁর দলের একই জাতীয় কাজগুলি নিয়ে কোনও আলোচনাই করেন নি।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েক মাইল দূরে হলমডেলের ক্রফোর্ড হিল ল্যাবরেটরিতে, ইকো স্যাটেলাইট থেকে সিগন্যাল পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বাউন্স করার জন্য নির্মিত একটি বিশেষ ধরনের কুড়ি ফুট হর্ন-রিফ্লেকটর অ্যান্টেনা ছিল। সেখানকার দুই রেডিয়ো জ্যোতির্বিদ আরনো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন ওই অ্যান্টেনাটির কিছু পরিবর্তন করছিলেন যাতে এটি টেলস্টার নামক একটি নতুন কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ গ্রহণ করতে বা পাঠাতে পারে।

একটি সমসারক (isotropic) অ্যান্টেনার তুলনায় একটি অ্যান্টেনা কতখানি যে কোনও দিকে বিকিরণ ছড়াতে পারে তার ক্ষমতাকে বলে অ্যান্টেনার গেইন। পেনজিয়াস ও উইলসন তাঁদের অ্যান্টেনার গেইন পরিমাপ (calibrate) করতে গিয়ে লক্ষ করলেন যে এক অজানা সিগন্যাল অবিরাম সবসময়ে সমস্ত দিক থেকে আসছে যার কোনও ব্যাখ্যাই তাঁরা খুঁজে পাচ্ছেন না। এই সিগন্যালের অ্যান্টেনা তাপমাত্রা মেপে দেখলেন 3OK। তাঁরা দুজন নিশ্চিত যে এটা কোনও প্রকৃত সিগন্যাল নয়— এটা অবাঞ্ছিত সিগন্যাল বা নয়েজ। কারণ, তাঁদের অ্যান্টেনা যে 4080 megaHertz কম্পাঙ্কের রেডিয়ো তরঙ্গে বাঁধা আছে— মহাবিশ্বের কোনও দিক থেকেই এই ধরনের তরঙ্গ আসতে পারে বলে এমন কোনও জানা মহাজাগতিক উৎস নেই। তাঁরা পুরো এক বছর মাথার চুল ছিঁড়েও এর কোনও রহস্যের সমাধান করতে পারলেন না। তাঁরা ধরেই নিলেন যে এটা নিশ্চিতভাবে অনির্দ্দিষ্ট পদ্ধতিগত নয়েস, যা তাঁদের অ্যান্টেনার মধ্য থেকেই আসছে। তাঁরা সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ আলাদা করে দেখলেন। রিভেট করা অংশগুলিতে টেপ লাগিয়ে দিলেন। এমনকি তাঁরা এও ভাবলেন যে সম্ভবত অ্যান্টেনায় যে সব ‘সাদা ডাইইলেক্ট্রিক পদার্থ’ রয়েছে (পায়রার বিষ্ঠা) তার কারণেও হতে পারে। সুতরাং তাঁরা সেখান থেকে সমস্ত পায়রা তাড়ালেন আর অ্যান্টেনা ভালো করে পরিষ্কার করলেন। কিন্তু যথা পূর্বং তথা পরং। তাঁদের সমস্যার কোনও সুরাহা হল না।

অনোন্যপায় হয়ে পেনজিয়াস ও উইলসন বোস্টনের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক বার্নার্ড বার্কের সঙ্গে এই সমস্যা সম্পর্কে পরামর্শ করেন। অধ্যাপক বার্ক ছিলেন একজন নামজাদা আস্ট্রোফিসিসিস্ট, যিনিই প্রথম জুপিটার থেকে আসা রেডিয়ো নয়েজ ও আইনস্টাইন রিং সনাক্ত করেন ও মহাবিশ্বের একটি মানচিত্র করার উপায় উদ্ভাবন করেন। বার্ক তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে পেনজিয়াস এবং উইলসন সম্ভবত মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ খুঁজে পেয়েছেন যা রবার্ট ডিক, জিম পিবেলস এবং প্রিন্সটনে তাঁদের সহকর্মীরা অনুসন্ধান করার পরিকল্পনা করছিলেন। পেনজিয়াস পিবলসের গবেষণা পত্রের একটি প্রি-প্রিন্ট পেয়েছিলেন এবং ডিককে হলমডেলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ডিক তাৎক্ষণিকভাবে পেনজিয়াস এবং উইলসনের এই রহস্যময় সিগন্যালকে আদিম মহাবিস্ফোরণের ক্ষয়ে যাওয়া অবশিষ্টাংশ বলে চিনতে পারলেন, যা মহাজাগতিক বিজ্ঞানী জর্জ লেমাট্রের ভাষায়— ‘বিশ্বসৃষ্টির বিলুপ্ত ঔজ্জল্য’। এখন যাকে বলা হয় Cosmic Microwave Background Radiation (CMBR)।

পেনজিয়াস এবং উইলসনের যৌথভাবে গবেষণাপত্রের প্রকাশের প্রস্তাবকে ডিক ও পিবলস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে পেনজিয়াস এবং উইলসন শুধু তাঁরা যা প্রকৃত পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তার একটা রিপোর্ট ‘A Measurement of Excess Antenna Temperature at 4080 Mc/s’ আর তার সঙ্গে ডিক, পিবলস, রোল ও উইলকিনসন সেই পর্যবেক্ষণের একটা ব্যাখ্যামূলক তাত্ত্বিক নোট ‘Cosmic Blackbody Radiation’, প্রকাশ করলেন। দুটি রিপোর্টই Astrophysical Journal (vol 142, p49-42, 1965), জার্নালে Letters to the Editor, সেক্সনে পিঠোপিঠি প্রকাশিত হয়েছিল।

এই মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণ বিগ ব্যাং তত্ত্বকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ফ্রেড হয়েলের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব ইতিহাসের অন্ধকারে তলিয়ে গেল। কিন্তু এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিয়ে সেদিন যথেষ্ট জলঘোলা হয়েছিল। ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখা যাক। ১৯৪৮ সালে গামোর ছাত্র আলফার ও হারম্যান গামোর গণনার কাজকে সংশোধন করে এই পটভূমি বিকিরণের কথা বলেছিলেন যে এর তাপমাত্রা 5OKপর্যন্ত নেমে যেতে পারে। ১৯৬০ সালে ডিক ও তাঁর দল সেই একই কাজের প্রায় পুনরাবৃত্তি করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন এবং তাঁরা তার পরীক্ষামূলক প্রমাণের উপায় উদ্ভাবনে সচেষ্ট হলেন। পেনজিয়াস আর উইলসনের অ্যান্টেনায় তাঁদের সম্পূর্ণ অজান্তেই এই বিকিরণ এসে ধরা দিল। অথচ কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা কোনও লেখকই গামো ও আলফার যে তাঁদের অনেক আগে এই পটভূমি বিকিরণের ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন এবং তার তাপমাত্রার গণনাও করেছিলেন সে কথার বিন্দুমাত্র উল্লেখও করেননি।

পেনজিয়াস ও উইলসনের কথা বাদ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু Physical Reviw ও Nature এর মতন সবচেয়ে নামকরা সাইন্টিফিক জার্নালে গামোর মতন বৈজ্ঞানিকের গবেষণাপত্র ডিক ও দলের সবার নজর এড়িয়ে গেল এটা ঠিক মেনে নেওয়া যায় না। এমন কি The New York Timesও যখন এই আবিষ্কারের কথা ফলাও করে ছাপাচ্ছে— সেখানেও গামোদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। গামো, আলফার, হারম্যান যখন এটা জানতে পারলেন তাঁরা খুব ক্ষুব্ধ হলেন। গামো ডিককে তাঁর কাজের বৃত্তান্ত, জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের উল্লেখ করে একটি কড়া চিঠি দেন। ডিক অবশ্য পরে তাঁর ভুল স্বীকার করে বলেছিলেন যে গামোদের এই কাজটা তাঁর ভালো করে আগে দেখা উচিৎ ছিল।

কিন্তু মজার কথা হল ডিক তাঁদের গবেষণাপত্রে গামো, আলফার ও হারম্যানের নাম উল্লেখ করে গামো যে আদিম বিশ্বে নিউট্রন ও প্রোটন থেকে হিলিয়াম হয়েছে, শুধু এইটুকু কথা উল্লেখ করেছেন— কোনও মহাজাগতিক বিকিরণের কথা নয়। তাই গামো, আলফারদের এই বিষয়ে কাজের কথা ডিক একেবারেই জানতেন না সেটা মেনে নেওয়া কঠিন। এমন কি, এতসব কিছুর পরেও ১৯৬৭ সালে জেমস পিবলস ও ডেভিড উইলকিনসন বিখ্যাত পপুলার সাইন্সের জার্নাল Scientific American–এ এই বিষয় নিয়ে যে প্রবন্ধ লিখলেন, সেখানেও তাঁরা নিজেদের কাজকেই অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে লিখলেন। গামো আলফারের কাজ শেষ পাতার দিকে কোনওমতে দায়সারা গোছের উল্লেখ করলেন। ১৯৭০ এর পরে গামো ও তাঁর সঙ্গীদের কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হল কিন্তু ততদিনে গামো আর ইহজগতে নেই।

শুধু কি তাই? ডিকের দল যে ভুল করেছিলেন, গামোর দলও কতকটা একই ভুল করেছিলেন, যেটা আলফার নিজেও স্বীকার করেছিলেন। ১৯৪০ সালে কানাডিয়ান জ্যোতির্বিদ এন্ড্রু ম্যাকেলার প্রথম মহাকাশে আন্তঃনক্ষত্র অঞ্চলে আনবিক পদার্থ সায়নোজেন (CN) যৌগ ও মিথাইন (CH) যৌগ সনাক্ত করেন। পরের বছর তিনি অপর এক জ্যোতির্বিদ ওয়াল্টার অ্যাডামসের পাওয়া সায়নোজেন অণুর বর্ণালী বিশ্লেষণ করে দেখলেন যে অণুর আশপাশের আন্তঃনক্ষত্র অঞ্চলের তাপমাত্রা 2.3OK। তখন অবশ্য এই তাপমাত্রার গুরুত্ব কেউ দেয়নি বা তিনি নিজেও এই তাপমাত্রার গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। তাঁর গবেষণাপত্র Publications of the Astronomical Society of the Pacific, নামের একটি অখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল যেটা অনেকের চোখ এড়িয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

গামো মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের এক কনফারেন্সে বলেছিলেন— “If I lose a nickel and someone finds a nickel, I can’t prove it’s my nickel. Still, I lost a nickel just where they found one”।

পেনজিয়াস এবং উইলসন ১৯৭৮ সালে মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন কিন্তু এটির পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য বা তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য কেউই সেই পুরস্কার পাননি। বিজ্ঞানের সর্বাধিক লোভনীয় পুরস্কারটি পেনজিয়াস ও উইলসন কিছু না জেনেই পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতন পেয়ে গেলেন। সেই যে বলে না যার ধন তার নয় নেপোয় মারে দই।

যদিও সেদিন ডিকের বা গামোর দলের কেউই এই মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের তাত্ত্বিক দিক প্রতিষ্ঠা করার জন্য নোবেল প্রাইজ পাননি— কিন্তু তার প্রায় চল্লিশ বছর পরে, ২০১৯ সালে ডিকের ছাত্র জিম পিবলসকে ‘তাত্ত্বিক কসমোলজির’ গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। গামো ১৯৬৮ সালে চৌষট্টি বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন।

গামো অবশ্য সাধারণ জগতে বেশি পরিচিত ছিলেন পপুলার সাইন্সের লেখক হিসেবে। অনেক নামকরা বিজ্ঞানী তাঁর এইসব বই পড়ে বিজ্ঞান গবেষণায় উদবুদ্ধ হয়েছিলেন।

কথাটা এই নয় যে, আমাদের পৃথিবী দূরে অবস্থিত আর মহাবিশ্ব আমাদের দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছে। আদিম অগ্নিগোলকটি প্রসারিত হয়ে আজকের মহাবিশ্ব এবং আমাদের পৃথিবী তারই মধ্যে নিমজ্জিত। যেমন একটা বেলুনে অনেকগুলি ছোট ছোট গোল দাগ থাকলে, বেলুনটিকে যত ফোলান যায়, বেলুনের ওই দাগগুলো ততই পরস্পরের থেকে দূরে চলে যেতে থাকে, ঠিক সেরকম মহাবিশ্ব যতই প্রসারিত হচ্ছে, মহাবিশ্বের বাকি সকল বস্তু শুধু পৃথিবী থেকেই নয়, পরস্পরের থেকে ততই দূরে সরে সরে যাচ্ছে। তাই সেই আদিম অগ্নিগোলকের বিকিরণ আজও একইভাবে সমস্ত দিক থেকে এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্বের যে কোনও পর্যবেক্ষক তার স্থানটিকে সব দিক থেকে সমানভাবে সনাক্ত করতে পারবে।

বিগ ব্যাং তত্ত্ব সঠিক হলে দুটি পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রভাব থাকা উচিত—

  • বিকিরণ বর্ণালীর লেখচিত্রের আকার, একটি 3OK তাপমাত্রার ব্ল্যাকবডির বৈশিষ্ট্যমূলক আকার হওয়া চাই।
  • এই ব্ল্যাকবডি বিকিরণটি মহাকাশের সমস্ত দিক থেকে সমান পরিমাণে আসা উচিত— অর্থাৎ বিকিরণটি আইসোট্রপিক হওয়া উচিত।

পেনজিয়াস এবং উইলসন একটি মাত্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিকিরণ পরিমাপ করেছিলেন। শীঘ্রই পটভূমি বিকিরণ পরিমাপ একটি কুটির শিল্পে পরিণত হয়। লম্বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পাশাপাশি ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকের পরিমাপগুলি আরও বেশি উন্নত যন্ত্রের কৌশল নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ব্ল্যাকবডির বিকিরণের বর্ণালীর বৈশিষ্ট্যগত লেখচিত্রও পাওয়া গেল। দেখা গেল যে আজকের মহাবিশ্বের তাপমাত্রা মান 2.725OK।

বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী স্টিভেন ওয়াইনবার্গ যিনি ছোটবেলায় গামোর পপুলার সাইন্সের বই পড়ে পদার্থবিদ্যায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তাঁর বই দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস–এ লিখেছেন—

“পদার্থবিজ্ঞানে এটি প্রায়ই হয়ে থাকে। এটা আমাদের ভুল নয়, যে আমরা আমাদের তত্ত্বগুলিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিই, কিন্তু আমরা তাদের যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে নিই না। এটা সবসময় বোঝা কঠিন যে এই সংখ্যা এবং সমীকরণগুলি যা নিয়ে আমরা আমাদের ডেস্কে খেলা করি, বাস্তব জগতের সঙ্গে তাদের কিছু যে একটা করার আছে। আরও খারাপ হল, প্রায়ই এটা যেন সাধারণভাবে মেনে নেওয়া হয় যে কিছু বিষয়, সম্মানজনক তাত্ত্বিক এবং পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টার জন্য উপযুক্ত বিষয় নয়। বিশ্বসৃষ্টির প্রথম তিন মিনিট সম্বন্ধে ভৌতিক সূত্রগুলির কি বলার আছে তা নিয়ে কাজ করার জন্য আদিম মহাবিশ্বকে গুরুত্ব সহকারে নিতে ইচ্ছুক হয়েছিলেন— এ কারণে গামো, আলফার এবং হারম্যান অসাধারণ কৃতিত্ব পেতেই পারেন। কিন্তু তবুও তাঁরা এর শেষ ধাপটি নেননি। তাঁদের উচিৎ ছিল এই মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বিকিরণটি খুঁজে পাবার জন্য রেডিয়ো অ্যাস্ট্রোনমারদের উপলব্ধি করানো। 1965 সালে 3OK পটভূমি বিকিরণের চূড়ান্ত আবিষ্কারের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল আমাদের সকলকে এই ধারণাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে বাধ্য করা, যে একদা একটি প্রাথমিক মহাবিশ্ব ছিল।”

Tags: প্রবন্ধ, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সনৎ কুমার ব্যানার্জ্জী

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!