গোল মাথা ব্যারনের কাহিনি

  • লেখক: এডওয়ার্ড পেজ মিচেল ● অনুবাদ - সম্রাট লস্কর
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

কারও কারও হয়তো মনে আছে যে ১৮৭৮ সালের জুলাই মাসে জেনারেল ইগনাটিফ বাডেন শহরের বিখ্যাত বাডিশার হফ হোটেলে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন। সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলো খবর করেছিল যে মহামান্য জ়ারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি শারীরিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য তাঁকে বাডেনে আসতে হয়েছে। কিন্তু ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যাপারে যাঁরা একটুআধটু খবর রাখেন তাঁরা ঠিকই জানতেন যে স্বাস্থ্যোদ্ধারের ব্যাপারটা মোটেই ঠিক নয়। আসলে সেই সময় সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রভাবশালী লোকেরা জেনারেল ইগনাটিফের ওপর খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। বাডেনে তাঁকে একরকম নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল অবশ্য সুযোগসুবিধার কোনও অভাব ছিল না।

এখন যে অদ্ভুত কাহিনিটা বলতে চলেছি সেটা আমি শুনেছি আমার নিউ ইয়র্কের বন্ধু ফিশারের মুখ থেকে। রাশিয়ান জেনারেলের পরেরদিনই ফিশার বাডেনে এসে উপস্থিত হয়। শহরে ভ্রমণার্থিদের জন্য সরকারি তালিকায় ফিশারের নামটা লেখা হয়, “উত্তর আমেরিকার ডা. প্রফেসর ফিশার, সস্ত্রীক” এইভাবে।

আমাদের মতো আমেরিকান বাসিন্দাদের অভিজাত উপাধি তেমন থাকে না বলে, আমেরিকানরা বাডেনে বেড়াতে এলে সরকারি তালিকায় কীভাবে তাদের পরিচয় দেওয়া হবে সেটা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত করণিকদের নানারকম কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। অতিথি বা ভ্রমণার্থিদের জিজ্ঞেস করলেই ঝামেলা চুকে যায় কিন্তু না‌ সেসব তারা করবে না। তারা তাদের মর্জিমাফিক কারও নামের আগে গভর্নর, মেজর-জেনারেল, ডাক্তার, প্রফেসর কিছু একটা উপাধি লাগিয়ে দেবে। ফিশারের নামের আগে ডা. আর প্রফেসর এই যুগল সম্মানের কারণ বোধহয় ওর চোখের চশমা যা ওর চেহারায় বেশ একটা ভারিক্কি ভাব এনেছিল।

ট্যুরিস্ট সিজ়ন জুলাই মাসে ভালোভাবে শুরু হয়নি। হোটেলগুলো আধাভর্তি, কনসার্ট শোনার শ্রোতা প্রায় নেই, দোকানগুলোও ফাঁকা, বিক্রিবাটা একেবারে কম। ফিশারের শহরটাও তেমন কিছু আহামরি লাগছিল না। বাডেন নিয়ে লোকজন যে কেন এত মাতামাতি করে! ও সুইট্‌জারল্যান্ড যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল কিন্তু না, বউ নিয়ে এলে কি আর নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করা যায়? মিসেস ফিশার এই কয়েক দিনেই এক পোলিশ কাউন্টেসের সঙ্গে বন্ধুত্ব জমিয়ে ফেলেছেন। দুজনে একসঙ্গে হলেই গুজুর গুজুর, ফুসুর ফুসুর, অকারণ হাসি। মিসেস ফিশারের আপাতত বাডেন ছেড়ে যাওয়ার কোনও ইচ্ছেই নেই। অগত্যা।

ধুত্তোর। ফিশারের মেজাজটাই তেতো হয়ে রইল কয়েকদিন। এক বিকেলে একটা ছোট ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে ও এসব ভাবছিল এমন সময় বাডিশার হফের এক দারোয়ান ছুটতে ছুটতে ওর কাছে এল।

“ডা. ফিশার,” ছেলেটা হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “মাফ করবেন আপনাকে বিরক্ত করছি বলে কিন্তু আপনাকে বড়ই প্রয়োজন এখন। জেনারেল ইগনাটিফের সঙ্গে যে ব্যারন এসেছেন, ব্যারন স্যাভিচ, তিনি হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আপনি না গেলে উনি হয়তো মারাই যাবেন। তাড়াতাড়ি চলুন।”

ছেলেটাকে ফিশার অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে কোনও ডাক্তার নয়, ভুল করে কেউ‌ তাকে ডাক্তার ভাবলে তার দায় ফিশারের নয়, ব্যারন স্যাভিচের শারীরিক অবস্থা শুনে খুব খারাপ লাগলেও ওর কিছু করার নেই। কিন্তু না ভবি ভুলবার নয়। ছেলেটা কোনও কথাই শুনবে না, পারলে ওকে টেনে নিয়ে যায়। ফিশার দেখল একে যখন কোনওভাবেই বোঝানো যাবে না তার থেকে হোটেলে পৌঁছে ব্যারনের বন্ধুদের সব খুলে বললে তারা নিশ্চয়ই বুঝবে।

রাশিয়ানদের অ্যাপার্টমেন্টটা দোতলায়। ফিশারের নিজের রুমটাও দোতলায়, তবে অন্য উইংয়ে। এক ফরাসি ভ্যালে ওদের দেখেই ছুটে এল। ফিশার একেও বোঝানোর চেষ্টা করল যে সে ডাক্তার নয় তা এ ব্যাটাও কিছু শুনতে নারাজ। ঝড়ের গতিতে ফরাসিতে উত্তেজিত হয়ে কিছু বলে যাচ্ছিল। ফিশার যতটুকু বুঝল তা হল যে এখন ব্যারনের সঙ্গে অগ্যুস্ত, মানে এই ভ্যালে ছাড়া আর কেউই নেই। জেনারেল ইগনাটিফ, প্রিন্স কোলেফ, ডা. র‌্যাপারসুইল সবাই সকালে গার্নসবাখে গেছেন। ব্যারনের কিছু জরুরি কাজ থাকায় তিনি হোটেলেই ছিলেন। কিছু পরেই হঠাৎ ব্যারনের শরীর খারাপ হতে শুরু করে। সে, মানে অগ্যুস্ত বুঝে উঠতে পারছিল না একা কী করে সামলাবে। ডাক্তারবাবুকে পেয়ে সে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছে। উনি যেন সময় নষ্ট না করে এক্ষুনি চিকিৎসা শুরু করে দেন। ব্যারন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।

আর কোনও উপায় না‌ দেখে ফিশার অগ্যুস্তের পিছন পিছন অ্যাপার্টমেন্টের ভিতরের ঘরটায় এল। ব্যারন বিছানায় শুয়ে; পায়ের বুটজোড়াও খোলার সুযোগ হয়নি। শরীর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সামলানোর চেষ্টা করছেন বটে কিন্তু মাঝে মাঝেই মুখ দিয়ে যন্ত্রণার গোঙানি বেরিয়ে আসছে। চোখগুলো বিস্ফারিত, কখনও বা পেট চেপে ধরে ব্যথায় কেঁপে উঠছেন।

ফিশার ভুলে গেল যে সে ডাক্তার নয়। সে মন দিয়ে ব্যারনের লক্ষণগুলো দেখছিল।

“মসিঁয়ে কি‌ পারবেন ওঁকে সুস্থ করে তুলতে?” অগ্যুস্তের উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন। 

নিজেকেও অবাক করে ফিশার উত্তর দিল, “মনে হয় পারব।”

দারোয়ান ছেলেটি ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। ফিশার নিজের কার্ডের পিছনে কিছু লিখে ছেলেটিকে বলল যে সে যেন এটা‌ মিসেস ফিশারকে এখনি দেয়। কিছুক্ষণ বাদেই ও ফেরত এল। হাতে‌ একটা কালো রঙের বোতল‌ আর কাচের গ্লাস। এই‌ বোতলটা ফিশার আমেরিকা থেকে নিয়ে এসেছে। এতে আছে কেনটাকির বুরবঁ কাউন্টিতে উৎপন্ন মহার্ঘ হুইস্কি, অপূর্ব তার স্বাদ। ও বোতলটা তুলে ধরল আলোর সামনে। অনেকটাই আছে এখনও।

“ব্যারনকে বাঁচানো যাবে বলেই মনে হয়,” সে অগ্যুস্তকে আশ্বাস দিল। অবশিষ্ট সুরার অর্ধেকটা গ্লাসে ঢেলে অবিলম্বে সেটা ব্যারনকে পান করিয়ে দিল। একটু বাদেই ফল দেখা দিতে শুরু করল। ব্যারন আস্তে আস্তে উঠে বসলেন। ওঁর মুখ দেখেই মনে হচ্ছিল যে উনি অনেকটাই সুস্থ বোধ করছেন। 

ফিশার মন দিয়ে ব্যারনকে দেখছিল। বয়স পঁয়ত্রিশ মতো হবে। দীর্ঘদেহি, সুপুরুষ, সুঠাম চেহারা কিন্তু প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে সেটা হল ব্যারনের গোল মাথা। গোল মানে পুরোই‌ গোল। কম্পাস দিয়ে মাপলে হয়তো দেখা যাবে যে এক কান থেকে অন্য কানের যে দৈর্ঘ্য, মাথার সামনে থেকে পিছনের দিকের দৈর্ঘ্যও তাই। ব্যারনের মাথায় আছে কালো রেশমের একটা ফিটিং স্কালক্যাপ। যতটুকু মাথা দেখা যাচ্ছে সেখানে একটুও চুল নেই। বেড পোস্টে অবশ্য একটা পরচুলা ঝুলছে। 

এতক্ষণে ব্যারন স্যাভিচের খেয়াল হয়েছে যে ঘরে এক অচেনা মানুষ আছেন। উনি মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে ফিশারকে অভিবাদন জানালেন।

“এখন কেমন বোধ করছেন?” ভাঙা ফরাসিতে ফিশার জিজ্ঞেস করল।

“অনেক ভালো। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মসিঁয়ে,” ওকে অবাক করে ব্যারন ইংরেজিতেই উত্তর দিল। “যদিও মাথাটা এখনও ঝিমঝিম করছে।”

ব্যারনের ইশারায় অগ্যুস্ত আর দারোয়ান ছেলেটি দুজনেই‌ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফিশার ব্যারনের পাশে বসে তার হাতটা নিয়ে নাড়ির গতি মাপতে বসল। ডাক্তার না হলেও এটা বুঝতে ওর অসুবিধা হচ্ছিল না যে ব্যারনের নাড়ি‌ অস্বাভাবিক গতিতে ছুটছে। ফিশার চিন্তায় পড়ে গেল। “কোনও বিপদ বাধিয়ে বসলাম না তো। কিন্তু ওইটুকু হুইস্কিতে তো কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”

কিন্তু না, ব্যারনের শরীর ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। কালো স্কালক্যাপের নীচে মুখটা একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে। উনি দু-হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে বিছানায় এলিয়ে পড়লেন।

“আমি বরং আপনার ভ্যালেকে ডেকে নিয়ে আসি,” ফিশারের গলা রীতিমতো কাঁপছে।

“না, না”, ব্যারন প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “আপনি ডাক্তার। এই অবস্থায় আপনাকেই বিশ্বাস করব। মনে হচ্ছে গোলমাল এখানে হয়েছে।” উনি হাত দিয়ে নিজের মাথাটা দেখালেন। 

“কিন্তু, আমি তো…”

“আহ্, সময় নষ্ট করবেন না। যা করার এক্ষুনি করতে হবে। প্রথমেই আমার মাথার ওপর দিকটা খুলতে হবে।”

বলেই ব্যারন এক নিমিষে মাথার স্কালক্যাপটা খুলে ফেলল। উন্মুক্ত মাথাটা দেখে ফিশারের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। মাথাটা শুধু গোলই নয়, পুরো খুলিটা রুপো দিয়ে তৈরি। ঘরের আলো পড়ে চকচক করছে। এটা কি কোনও মানুষের মাথা হতে পারে?

“খুলে ফেলুন এটা”, ব্যারন আদেশের সুরে বললেন।

ফিশার খুব দ্বিধার সঙ্গে ব্যারনের রুপোলি, গোল মাথার দু-দিকে হাত দিয়ে চাপ দিলেন। খুট করে একটা আওয়াজ হল। ওপর দিকটা সামান্য উন্মুক্ত হয়ে গেল।

“তাড়াতাড়ি করুন ডাক্তার। বেশি সময় নেই আমাদের হাতে” বলতে বলতেই উনি জ্ঞান হারালেন।

বাইরের ঘরে সেই সময়ে কারও উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের দরজা খুলে গেল জোরে। একজন ছোটখাটো চেহারার মধ্যবয়স্ক মানুষ ঘরে ঢুকেছেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিছানার দিকে চেয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিচ্ছিলেন। ব্যারনের জ্ঞানও সেই মুহূর্তেই ফিরে এসেছে।

“ডা. র‌্যাপারসুইল।”

ব্যারনের ডাক্তার ফিশারের কাছে এসে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বললেন, “এসব কী হচ্ছে এখানে?”

পরমুহূর্তেই ফিশারের হাতটা ধরে ওকে টেনে তুলে ঘর থেকে বের করে আনলেন। এত রূঢ় ব্যবহার পেয়ে ফিশার হতচকিত। কিছু বলারও সে সুযোগ পেল না। ডা. র‌্যাপারসুইল একদম অ্যাপার্টমেন্টের দরজা পর্যন্ত এসে ফিশারকে বের করে দিয়ে দুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ফিশার ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটা দিল নিজের রুমের দিকে।

পরেরদিন সকালেই ফিশারের সঙ্গে ব্যারনের দেখা হয়ে গেল। স্যাভিচ ফিরছিলেন ট্রিঙ্ক হল থেকে। ব্যারন গম্ভীর মুখে একবার মাথা নাড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েই এগিয়ে গেলেন। কিছু পরেই এক ভ্যালে ফিশারের কাছে একটা পার্সেল নিয়ে হাজির। সঙ্গে একটা নোট যাতে লেখা, “ডা. র‍্যাপারসুইল মনে করেন যে ডা. ফিশারকে তার যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক পাঠানো হল।” পার্সেলের ভিতর দুটো স্বর্ণমুদ্রা, প্রতিটি কুড়ি মার্ক মূল্যের।

“চল্লিশ মার্কের নিকুচি করেছে। যেভাবেই হোক গোপন ব্যাপারটা আমি জেনেই ছাড়ব।” বিড়বিড় করে ফিশার বলল।

সেদিন বিকেলে ও আবিষ্কার করল যে‌ কোনও মানুষই অপ্রয়োজনীয় নয়। এমনকি পোলিশ কাউন্টেসের থেকেও সাহায্য পাওয়া যায় কখনও সখনও। ব্যারনকে নিয়ে গতকাল রাতেই মিসেস ফিশারের সঙ্গে আলোচনা করেছিল ফিশার। অবশ্যই গোল, রুপোলি মাথার কথা কিছু বলেননি। মিসেস ফিশারই আজ বিকেলে তাকে কাউন্টেসের কাছে নিয়ে এল। উনি নাকি অনেক খবর রাখেন। তা বলতে নেই কাউন্টেসের কাছে সত্যিই অনেক খবর পাওয়া গেল। আমেরিকানরাও যে ইউরোপের অভিজাতদের খবর নিয়ে উৎসাহী এটা তো খুব ভালো কথা। উনি নিশ্চয়ই যা জানেন সেটা ফিশার দম্পতিকে বলবেন।

কাউন্টেসের বক্তব্য থেকে যা জানা গেল তা হল স্যাভিচ বেশি দিন আগে ব্যারন উপাধি পাননি। ওঁর জন্ম বা বেড়ে ওঠা কোথায় তা নিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ বা মস্কোর অনেকেরই জানা নেই। কেউ বলে স্যাভিচ কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে, কেউ বা বলে যে উনি রোমানফ বংশের এক বিখ্যাত ব্যক্তির জারজ সন্তান। দ্বিতীয়টা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি কারণ ডরপাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে এরকম ধূমকেতুর গতিতে উত্থান নয়তো সম্ভব হয় কী করে?

স্যাভিচের পেশাগত জীবন শুরু হয় জ়ারের কূটনৈতিক কাজের মাধ্যমে। এই কাজের সুবাদে বেশ কিছু বছর তিনি ভিয়েনা, লন্ডন আর প্যারিসেও কাটিয়েছেন। হাউস অব হ্যাপসবার্গের সঙ্গে রাশিয়ার সফল চুক্তি সাধিত করার পুরস্কারস্বরূপ মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই তাঁকে ব্যারন করা হয়। গোর্চাকফের প্রিয় পাত্রও হয়ে উঠেছেন স্যাভিচ। সেন্ট পিটার্সবার্গে আজকাল এটাই বলা হচ্ছে যে ইউরোপে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে স্যাভিচের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। কনস্ট্যান্টিনোপলে যখন প্রথম ঝামেলা শুরু হয় তখন ইগনাটিফের সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই স্যাভিচ ছিলেন, ইংল্যান্ডের গোপন কনফারেন্সে সুভালফের পাশেও ছিলেন আর কিছুদিন বাদে বার্লিনে যে কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে স্যাভিচ একটা প্রধান ভূমিকা নিতে চলেছেন। বিসমার্ক আর ডিজরেইলিকে নিয়ে যে রীতিমতো ছেলেখেলা করবেন উনি তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এখনও পর্যন্ত যা যা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ওঁকে দেওয়া হয়েছে সব কিছুতেই তিনি সফল হয়েছেন তাঁর স্থিতধী চিত্ত, ক্ষুরধার বুদ্ধি আর নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে।

কাউন্টেস অবশ্য স্যাভিচের কূটনৈতিক দক্ষতার থেকেও বেশি উৎসাহী তার সামাজিক জীবন নিয়ে। হ্যাঁ, ওঁর জন্ম নিয়ে একটা ধোঁয়াশা আছে বটে কিন্তু সেটাকে বাদ দিলে স্যাভিচই রাশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় যুবা। এখনও অবিবাহিত। স্বয়ং জ়ার তাঁকে খুব পছন্দ করেন। একসময় যে ছেলে ছিল হতদরিদ্র সে আজ প্রায় চল্লিশ মিলিয়ন রুবলের মালিক। ভাবা যায়!

আর ডা. র‌্যাপারসুইল? ওঁর ব্যাপারে কাউন্টেস তেমন কিছু জানেন না। উনি স্যাভিচের ব্যক্তিগত ডাক্তার। সবসময়ই ব্যারনের সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। শোনা যায় উনি জন্মসূত্রে সুইস। ডাক্তারির আগে উনি ঘড়ি-নির্মাতা বা ওরকম কোনও মেকানিকাল কাজ করতেন। এর বেশি কাউন্টেসের কাছে কোনও খবর নেই, খবর রাখার ইচ্ছাও নেই। তবে হ্যাঁ, মানুষটা সৎ আর নির্লোভ। ব্যারনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে থেকেও নিজের আখের গুছিয়ে রাখার কোনও চেষ্টা উনি করেননি।

কাউন্টেসের কাছে সত্যিই অনেক তথ্য পাওয়া গেল। ফিশার এবার অপেক্ষা করতে শুরু করল কীভাবে ডা. র‌্যাপারসুইলকে একা পাওয়া যায়। পাঁচ দিন কেটে গেল। কিছুই হল না। অবশেষে ষষ্ঠ দিনে আচমকাই সুযোগ এসে গেল।

সেই বিকেলে ফিশার একাই উঠছিল মার্কোয়েরিসবার্গ পাহাড়ের উপরে। মাঝপথে দেখা পাহাড়ের ওপরের ভাঙা গম্বুজের কাস্টোডিয়ানের সঙ্গে।

“না না, গম্বুজ বন্ধ করে আসিনি। ওখানে এক ভদ্রলোক আছেন। আমি শহর থেকে একটা ছোট্ট কাজ সেরে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ফিরে আসছি। আপনি নির্দ্বিধায় ওপরে যান।”

আশ্বাস পেয়ে ফিশার উঠতে লাগল।

গম্বুজটা বেশ ভাঙাচোরা। পুরোনো সিঁড়িটা ভেঙে পড়েছে। ওপরে ওঠার জন্য একটা কাঠের মই বানানো হয়েছে। সেটার অবস্থাও খুব সুবিধার নয়। কিছুটা ভয়ে ভয়ে ওপরে উঠেই ফিশার দেখল একজন চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দূরের ব্ল্যাক ফরেস্টের সৌন্দর্য দেখে চলেছেন। ডা. র‌্যাপারসুইল। ভাগ্য আর কাকে বলে!

ফিশারের মাথায় চট করে একটা খেয়াল এল। মইয়ের মাথায় একটা লাথি মেরে সে হোঁচট খাওয়ার মতো ভাব করে সামনে এগোল। প্রায় চল্লিশ ফুট ওপর থেকে মইটা পড়তে পড়তে ধাক্কা মারল পাশের পাঁচিলে। দুম করে একটা শব্দ হল।

ডা. র‌্যাপারসুইল পিছন ফিরে তাকালেন। এক মুহূর্তেই বুঝে গেছেন কী হয়েছে। “মসিঁয়ে দেখছি বড়ই অসাবধানী।” পরমুহূর্তেই তাঁর ভ্রূ কুঁচকে গেছে। ফিশারকে উনি চিনতে পেরেছেন।

“হ্যাঁ, তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছি। মনে হচ্ছে বেশ কিছুক্ষণ এখানে আটকে থাকতে হবে। তাও ভালো একজন চেনা লোক পেলাম। সময়টা কেটে যাবে।”

সুইস ডাক্তার কোনও উত্তর না দিয়ে চোখে একটা বাইনোকুলার লাগিয়ে চারপাশ দেখতে লাগলেন। ফিশার ধীরেসুস্থে একটা সিগার ধরাল।

“আপনার সঙ্গে আমি এমনিও দেখা করতাম। আপনাকে চল্লিশ মার্কও ফেরত দেওয়ার ছিল।”

“আমার আমেরিকান ডাক্তার বন্ধু বুঝি চল্লিশ মার্কে খুশি হননি? ব্যারনের ভ্যালেকে আবেদন করতে পারেন। মনে হয় না কোনও আপত্তি হবে।”

এই খোঁচার কোনও জবাব না‌ দিয়ে ফিশার পকেট থেকে স্বর্ণমুদ্রা দুটো বের করে প্যারাপেটের ওপর রাখল।

“বেশি বা কমের প্রশ্ন নয়। পারিশ্রমিক নেওয়ার কথা আমার মনেও আসেনি। এরকম অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লাভ করেই‌ আমি খুশি।”

র‌্যাপারসুইল কিছুক্ষণ একভাবে চেয়ে রইলেন ফিশারের দিকে। তারপর চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করলেন, “মসিঁয়ে তো ডাক্তার। তার মানে বিজ্ঞানের মানুষ।”

“হ্যাঁ, অবশ্যই”, দ্রুত জবাব এল। বিজ্ঞান নিয়ে যদিও ওর ন্যূনতম উৎসাহ এতদিন ছিল না।

“তাহলে মসিঁয়ে নিশ্চয়ই মানবেন যে ব্যারনের ক্ষেত্রে যেরকম ট্রিফাইনিং হয়েছে তার জুড়ি মেলা ভার। মস্তিষ্কে ফুটো করার এই জটিল অপারেশন এত নিখুঁতভাবে খুব কম সার্জেনই করতে পারেন। বুঝতেই পারছেন এইসব অপারেশনের ব্যাপার বাইরে প্রকাশ পেলে সমস্যা হতে পারে। আমার সেইদিনের দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করবেন তবে আশা করি আপনি‌ আমাদের সমস্যাটাও বুঝতে পারবেন।”

ডা. র‌্যাপারসুইল যে বেশ চতুর মানুষ সেটা বুঝতে ফিশারের দেরি হল না। তাস খেলার ট্রাম্প কার্ড নিজের কাছে কীভাবে রাখতে হয় ভালোই জানেন। তবে ও নিজে ডাক্তার না হলেও বোকা নয়। চতুর মানুষকেও ব্লাফ দিতে ওস্তাদ। অতএব চেষ্টা ছাড়লে চলবে না।

“এত লুকোছাপার কী আছে? সেদিন যা দেখলাম আমি সেটা নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখে ইউরোপ বা আমেরিকার কোনও জার্নালে প্রকাশ করলে তো হইচই শুরু হয়ে যাবে।”

“আপনি যা দেখলেন? কিন্তু আপনি তো কিছুই দেখেননি। আমি যখন ঘরে ঢুকলাম আপনি তো ওটা খুলেও …” র‌্যাপারসুইল থেমে গেলেন। বুঝতে পেরেছেন যা বলার নয় সেটা বলে ফেলছিলেন।

ফিশার মনে মনে হাসল। না, তার চালটা খেটে যাচ্ছে। আগের সিগারটা শেষ হয়ে গেছিল। ও আরেকটা সিগার ধরাল।

“ব্যারন নিজে আমায় বলেছেন যে আপনি কিছুই দেখেননি। আমি যখন ঢুকলাম আপনি তখন ওঁর মাথার রূপোর আবরণটা খোলার চেষ্টা করছিলেন।”

“ব্যারনের সে সময় পুরো জ্ঞান ছিল না। ওঁর কথা আপনি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করবেন? এটাও তো হতে‌ পারে‌ যে আমি আবরণটা খুলছিলাম না বরং খোলার পর সব কিছু দেখে আবার ঠিকমতো আটকিয়ে দিচ্ছিলাম।” ফিশার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে ডাহা মিথ্যা বলে যাচ্ছিল। তবে তাতেই কাজ হল। ডা. র‌্যাপারসুইল পরিষ্কার ভয় পাচ্ছিলেন। মুখ তার সাদা হয়ে আসছিল। কিছু পরে প্রায় কান্না মাখা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “না না, এসব সবাই জানতে পারলে সব শেষ হয়ে যাবে। বিশেষত এই সময়…”।

পরক্ষণেই নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সুইস ডাক্তার আকুল গলায় বললেন, “কী চান আপনি ডা. ফিশার? কত রুবল? কত ডলার?”

ফিশারের অট্টহাসি প্রশ্নের উত্তর হয়ে এল।

“বেশ অর্থ যখন আপনি নেবেনই না তখন আপনাকে আমি সব বলব। এই অবস্থায় কোনও ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়। তবে আপনাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যা শুনবেন তা কাউকে বলবেন না।”

“কতদিন? যতদিন ব্যারন স্যাভিচ বেঁচে থাকবে ততদিন?”

“তাহলেই হবে। স্যাভিচ না থাকলে আমিও আর বেঁচে থাকব না। আপনার আর কোনও শর্ত আছে?”

“একটাই শর্ত। পুরো সত্যটা আমাকে বলবেন। এখানে এবং এখনই। কোনও কিছু লুকোনো যাবে না।”

“বেশ, তাই হবে।” ডা. র‌্যাপারসুইল তাঁর কাহিনি শুরু করলেন।

“আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা জুরিখে। ওখানে ঘড়ি-নির্মাতা হয়ে কাজ করতাম। আপনি হয়তো অহংকার ভাববেন তবুও বলি নিজের কাজে আমার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। যন্ত্র সংক্রান্ত নানা ব্যাপারে আমি নিয়মিত পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যেতাম। মানুষ অটোমেটার ওপর যা যা আবিষ্কার করেছে, আমি নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতাম যাতে সেগুলো উন্নত করা যায়। বিশেষত ব্যাবেজের গণকযন্ত্র আমায় খুবই আকর্ষণ করেছিল। আমার মনে হয় যে ব্যাবেজের আবিষ্কারের ফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।

“একদিন ব্যবসাপত্র সব গুটিয়ে প্যারিস পাড়ি দিলাম শারীরবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে। তিন বছর সরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নিয়ে চর্চা করলাম। জুরিখে থাকার সময়ই বুঝেছিলাম যে শুধুমাত্র ভৌতবিজ্ঞান দিয়ে হবে না। তার সঙ্গে বিজ্ঞানের অন্য শাখারও চর্চা প্রয়োজন। তাই শারীরবিজ্ঞানের পর মনস্তত্ত্ব আর সমাজবিদ্যা নিয়েও পড়াশোনা করলাম। বেশ কিছু বছর ধরে এরকম নানা‌ বিষয় চর্চা করার পর আমার মনের গভীরে দীর্ঘদিন ধরে যে স্বপ্নটা লালন করে আসছিলাম সেটা পূরণ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।”

র‌্যাপারসুইলের কথা বলার ধরন আমূল বদলে গেছে। একটু আগে যে উনি কিছুই বলতে চাইছিলেন না এখন তাঁর উৎসাহ দেখে বিশ্বাস করা মুশকিল যে দুজন একই ব্যক্তি। ফিশারের মনে হচ্ছিল যে ডাক্তার গোপন কথাগুলো বলার সুযোগ পেয়ে খুশিই হয়েছেন।

“এবার আপনাকে বিজ্ঞানের বেশ কিছু ব্যাপার নিয়ে জানাব যেগুলোর মধ্যে আপাত দৃষ্টিতে কোনও যোগাযোগ নেই।

“মেকানিকাল জিনিসপত্র নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে এমন এক যন্ত্র বানাতে সক্ষম হলাম যা ব্যাবেজের যন্ত্রগণকের থেকেও উন্নত। ব্যাবেজের কগ্‌হুইল আর পিনিয়নগুলি‌ লগারিদম কষতে পারে, বের করতে পারে গ্রহণের নির্দিষ্ট সময়। ওদের গাণিতিক সংখ্যা দিয়ে ফিট করলে, গাণিতিক সংখ্যা দিয়েই সঠিক উত্তর দেবে। ব্যাপারটা হল কার্য-কারণ সম্পর্কটাও পাটিগণিতের মতোই নিখুঁত। এটা মেনে নিয়েই আমি আমার যন্ত্রটা বানালাম। যেমন তথ্য ওটায় ভরা হবে, ওটা তেমন উত্তর দেবে। আরো সহজ ভাষায় বল‌লে যন্ত্রটা তার যুক্তি দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবে। মানুষের সিদ্ধান্ত আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত; আমার যন্ত্র আবেগহীন হয়ে নিখুঁত সিদ্ধান্ত জানায়। মানুষের ভুল ও করে না।

“শারীরবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করায় আরেকটা জিনিসও বুঝেছিলাম। এই যে ডাক্তারেরা‌ প্রায়ই বলেন যে মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থের সঙ্গে দেহের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন, সেটা আমি মানি না। আমি বেশ কয়েকজন মানুষকে দেখেছি যারা মেডুলা অবলংগাটায় বুলেট নিয়েও দিব্যি বেঁচে আছে। মস্তিষ্ক থেকে হেমিস্ফিয়ার বা সেরিবেলাম বাদ দিলেও দেখেছি পাখি বা অন্যান্য ছোট পশুদের বেঁচে থাকতে। আমি বুঝে যাই যে মানুষের খুলি থেকে মগজ সরিয়ে নিলে সে মারা যাবে এটা ফালতু কথা। হ্যাঁ, অবশ্যই তার বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়া আর থাকবে না, তবে তার দেহে প্রাণ কিন্তু থাকবে।

“সমাজবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে এটাও বুঝেছিলাম যে পৃথিবীতে যাদের মহান ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, তাদের বুদ্ধিমত্তা সাধারণ মানুষের থেকে এমন কিছু বেশি হয় না। যেমন ধরুন নেপোলিয়ন। ওঁর বুদ্ধি মানুষের গড় বুদ্ধির থেকে সামান্যই বেশি। সেই সামান্য বেশি বুদ্ধি দিয়েই উনি প্রায় সমস্ত ইউরোপ জয় করেছিলেন। এবার কল্পনা করুন‌ এমন‌ এক মানুষের কথা যার বুদ্ধি নেপোলিয়নের থেকেও অনেকটা বেশি। তার পক্ষে কি সারা বিশ্ব জয় করা কোনও কঠিন বিষয় হবে?

“তিনটি আপাত পৃথক বিদ্যাকে এবার একটু মেলানোর চেষ্টা করা যাক। ধরুন একটা মানুষ; তার মাথার খুলি থেকে মস্তিষ্কটা সরিয়ে তার মানবিক দুর্বলতাগুলো দূর করে খুলিতে আমার তৈরি যন্ত্রটা বসিয়ে দিলাম। সেই যন্ত্র শুধু যু্ক্তি বোঝে। কোনও ভুল তার হয় না। এবার সেই যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত আধা-মানুষ যখন সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসবে বুঝতেই পারছেন কী হবে। সেই বাকি সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

“মসিঁয়ে, এই হল আমার গোপন সত্য। এই এক্সপেরিমেন্টটাই আমি করেছি ব্যারনের সঙ্গে। অবশ্য উনি তখন ব্যারন ছিলেন না। মস্কোতে আমার প্রয়াত বন্ধু ডা. ডুকাট একটা মানসিক হাসপাতাল চালাতেন। বেশ কিছু অপরিণত বুদ্ধি মানুষের চিকিৎসা, দেখাশোনা সেখানে করা হত। ওখানেই প্রথম দেখেছিলাম এগারো বছরের স্টেপান বোরোভিচকে। জন্ম থেকেই সে মূক, বধির ও দৃষ্টিহীন। ঘ্রাণের ও স্বাদের সামান্য অনুভূতি ছিল। ছেলেটা মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কথা বলত আর উত্তেজিত হলে আঙুল মটকাত। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে বাগানে একটা রকিং চেয়ারে তাকে বসিয়ে দিলে সে দুলেই যেত। ওটাতেই তার আনন্দ।

“স্টেপান বোরোভিচকে আমি ডুকাটের থেকে একরকম চেয়েই নিলাম। ছেলেটাকে নিজের বাড়ির ল্যাবরেটরিতে এনে ওর ওপর অপারেশন চালালাম। না, আমার মনে কোনও দ্বিধা ছিল না। একটা রাস্তার কুকুরের ওপর কাটাছেঁড়া করতে যেমন কোনও অনুভূতি হয় না, এই‌ জড়ভরত ছেলের ক্ষেত্রেও তাই। অপারেশন প্রথম বারেই সফল হল। তা আজ থেকে কুড়ি বছরেরও আগের কথা। সেই জড়ভরত স্টেপান আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ। আমি বলছি শুনে রাখুন। দশ বছরের মধ্যে উনি ইউরোপ নিজের মুঠোয় ভরে নেবেন, তারপর জয় করবেন সারা বিশ্ব। ব্যারন স্যাভিচ কোনও ভুল করবেন না কারণ ওঁর মাথার ভিতর যন্ত্রটা ওঁকে কোনও ভুল করতে দেয় না, দেবে না।”

ফিশার নীচে তাকিয়ে দেখল যে গম্বুজের কাস্টোডিয়ান আস্তে আস্তে পাহাড়ে উঠছেন। ওঁর এখানে পৌঁছোতে আর বেশি সময় লাগবে না।

“যারা স্বপ্ন দেখতে জানে তারা অনেকদিন ধরেই ভেবে এসেছে যে পুরোনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে যা মানবজ্ঞানের ভিত্তিমূল পর্যন্ত বদলে দিতে পারে। বুদ্ধিমান মানুষেরা এসব নিয়ে ব্যঙ্গ করে। আমি বলি, ডা. ফিশার, যে ওই সব তথাকথিত বুদ্ধিমানেরা আসলে বোকা। অ্যারিস্টটল যদি নিনেভায় কোনও কিউনিফর্ম ঢাকা ট্যাবলেটের ভিতর খুঁজে পেতেন “যোগ্যতমের উদ্বর্তন” লেখাটা তাহলে এই সত্যটা মানুষ বাইশশো বছর আগেই জেনে যেত। আমিও একটা সত্য আগাম জানিয়ে দিচ্ছি আপনাকে। সৃষ্টি থেকে স্রষ্টায় পরিণত হওয়ার সত্য। ব্যারন স্যাভিচ আমার সৃষ্টি, আমি তাঁর স্রষ্টা— কয়েক বছরের মধ্যেই আমার সৃষ্টি হয়ে উঠবে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি।”

মইটা আবার ঠিক জায়গায় লাগানো হয়েছে, মসিঁয়ে। আমি আমার কথা রাখলাম। আপনিও আপনার প্রতিজ্ঞা পালন করবেন আশা করি।”

পরবর্তী দু-মাস সুইটজারল্যান্ডের তুষারশুভ্র পর্বত আর ইটালির সুন্দর হ্রদ দেখে ফিশার দম্পতি প্যারিসে এল। ওরা থাকবে হোটেল স্প্লেনডিডে যেখানে ওরা ছাড়াও প্রচুর আমেরিকান ট্যুরিস্ট ভিড় করেছে। অনেকেই এসেছে প্যারিসের বিখ্যাত একজিবিশন দেখতে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ভ্রমণ করে ফিশাররা ক্লান্ত। প্যারিসে নিজেদের দলে আছে। মিস ওয়ার্ড ফিশারের এক প্রিয় বন্ধুর বাগদত্তাও বটে। সব মিলিয়ে বেশ একটা উৎসবের পরিবেশ।

এর মধ্যে একটা সংবাদ ফিশারের মেজাজ বিগড়ে দিল। ব্যারন স্যাভিচ নাকি এখন প্যারিসেই ছুটি কাটাচ্ছেন। বার্লিন কংগ্রেসে তাঁর কূটনৈতিক সাফল্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এড়ায়নি। তবে শোনা গেল ডা. র‌্যাপারসুইল ব্যারনের সঙ্গে আপাতত নেই। ডাক্তার এখন সুইটজারল্যান্ডে, ওঁর বৃদ্ধা মা মৃত্যুশয্যায়।

ডা. র‌্যাপারসুইলের নাম শুনলেই গম্বুজের ওপর সেই কথাবার্তার স্মৃতি ফিরে আসে। ফিশার পরে অনেক বার ভেবেছে ডাক্তার কি তার সঙ্গে মজা করেছিলেন সেই বিকেলে? উনি কি বুঝে গেছিলেন যে ফিশারের সঙ্গে ডাক্তারির কোনও সম্পর্কই নেই। কিন্তু ব্যারনের অসুস্থতার দিনটাও তো মিথ্যা নয়। সে নিজের চোখে দেখছে, ছুঁয়েছে ব্যারনের ওই রূপোর গোল মাথা। তাহলে? যত তাড়াতাড়ি আটলান্টিক পেরিয়ে নিজের দেশে ফেরা যায় ততই মঙ্গল। এইরকম অস্বাভাবিক মানুষের থেকে দূরে থাকাই ভালো।

কিন্তু না, এক সপ্তাহের মধ্যেই ফিশারের দেখা হয়ে গেল ব্যারনের সঙ্গে। হোটেল স্প্লেনডিডের আমেরিকান মহিলার দল নিউ কন্টিনেন্টাল হোটেলে একটা বল ডান্স পার্টিতে গেছিল। ব্যারনের সঙ্গে তাদের সেখানেই আলাপ হল। ব্যারনের সুপুরুষ চেহারা, সুভদ্র ব্যবহার, ধীশক্তি— এসব দেখে তো সবাই মুগ্ধ। ক’দিন পর আরেকটা পার্টিতে আবার ওদের ব্যারনের সঙ্গে দেখা হল এবং পরিচয় নিবিড় বন্ধুত্বে পরিণত হতে বিলম্ব হল না। ব্যারন রীতিমতো আসা যাওয়া শুরু করলেন হোটেল স্প্লেনডিডে।

মনে যুগপৎ অস্বস্তি আর ঘৃণা নিয়ে ফিশার বুঝে উঠতে পারছিল না কী করবে। না ওকে এটা মানতেই হবে যে এখানে তার সঙ্গে ব্যারনের যতবার দেখা হয়েছে ব্যারন প্রতিবারই তার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করেছেন। বাডেনের ব্যাপার নিয়ে অবশ্য কোনও কথা উনি তোলেননি। কিন্তু হোটেলের ঘরে বসে যখনই ও মনে করেছে যে ব্যারনের মস্তিষ্ক বলে কিছুই নেই; নেই নীতিবোধ, আবেগ, মানবিকতা, তখনই ও কেঁপে কেঁপে উঠেছে। আমেরিকান বন্ধুদের ও কিছু বলতেও পারছে না। একে তো তার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তার ওপর ডা. র‌্যাপারসুইলকে দেওয়া কথা। সেই প্রতিজ্ঞা সে ভাঙে কী করে!

কিন্তু কয়েকদিন পরেই এমন একটা ব্যাপার ফিশারের চোখে পড়ল যে তার দুশ্চিন্তা বহুগুণ বেড়ে গেল।

প্যারিস থেকে আমেরিকা ফিরে যাওয়া আর কয়েক দিন পরেই। ওই সন্ধেতে ফিশার আনমনে হোটেলের পার্লার রুমে ঢুকছিল। ওখানেই ওদের আড্ডা, হইচই এসব চলে। ভিতরে ঢুকে ফিশারের প্রথমে মনে হয়েছিল যে পার্লার বোধহয় ফাঁকা। একটু খেয়াল করতেই দেখল ঘরের কোণের অন্ধকার দিকটায় দুজন বসে। এক পুরুষ আর এক মহিলা। মহিলার হাতটি আলগোছে রাখা আছে পুরুষের হাতের ওপর। তার মুগ্ধ দৃষ্টি পুরুষটির সুন্দর মুখের দিকে। ফিশার চমকে গেল। পুরুষটি ব্যারন স্যাভিচ আর মহিলাটি মিস ওয়ার্ড।

দুজনের কেউই ফিশারের উপস্থিতি প্রথমে বুঝতে পারেনি। ও একটু কাশল। ঘরের কোণ থেকে যুগল উঠে দাঁড়াল। মিস ওয়ার্ডের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে সে খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। ব্যারন কিন্তু স্বাভাবিক। ফিশারকে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করে একজিবিশনের বিশাল বেলুনটা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলেন।

ফিশার ব্যারনের কথা মন দিয়ে শুনছিল না। সে অন্য কথা ভাবছিল। না, মিস ওয়ার্ডকে খুব একটা দোষ দিচ্ছে না সে। সে নিশ্চিত এই সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটি তার নিউ ইয়র্কের বাগদত্তের প্রতি কর্তব্য ভুলে যায়নি। তবে স্যাভিচের আকর্ষণ এড়ানোও মুশকিল। ফিশার কী করবে এখন? না, মিস ওয়ার্ডকে কিছু খুলে বলা যায় না। ব্যারনকে অনুরোধ করবে? তাতে কি কিছু লাভ হবে? ওই আধা-মানুষের তো কোনও আবেগ বা নীতিবোধ নেই। ব্যারনের উদ্দেশ্যটা কী? উনি কি এক নিষ্পাপ মেয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করতে চান? উদ্দেশ্য যদি ভালোও হয় তাহলেও তো আর সেটা মেনে নেওয়া যায় না। এক মানবীর সঙ্গে আধা মানুষ-আধা যন্ত্রের বিবাহ। এ তো প্রকৃতিবিরুদ্ধ!

নিজের নিউ ইয়র্কের বন্ধুর প্রতি, বন্ধুর বাগদত্তার প্রতি তার দায়িত্ব তো আছেই, তার থেকেও বেশি দায়িত্ব আছে সমগ্র মানবসভ্যতার প্রতি। ডা. র‌্যাপারসুইল এই যন্ত্রমানুষকে নিয়ে বিশ্ব জয়ের যে পরিকল্পনা করেছেন সেটা কি মেনে নেয়া যায়? এই পৃথিবীতে ফিশারই‌ একমাত্র মানুষ যে এই প্রকৃতিবিরুদ্ধ পরিকল্পনা অসফল করতে পারে। এখনও কি ও চুপ করে থাকবে?

আশঙ্কা, ভয় আর দ্বিধার দোলাচলে প্যারিসে শেষ কয়েকটা দিন কেটে গেল। স্টিমার ছাড়ার দিন ফিশার অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠল। যা করার আজকেই করতে হবে।

হেভর বন্দর থেকে স্টিমার ছাড়বে। প্যারিস থেকে হেভর যাওয়ার ট্রেন দুপুরে। সকাল এগারোটা নাগাদ ব্যারন এলেন আমেরিকান দলকে বিদায় জানাতে। ফিশার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিস ওয়ার্ড আর ব্যারনকে দেখছিলেন। মিস ওয়ার্ডের হাসির মধ্যেও বিষণ্ণতা লুকানো নেই। ব্যারন যখন বললেন যে কয়েক মাসের মধ্যেই উনি আমেরিকা ভ্রমণে আসছেন, মিস ওয়ার্ডের মুখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। না, জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ফিশার ঠোঁট কামড়াল।

আমেরিকান মহিলাদের সমবেত অনুরোধে ব্যারন ওদের সঙ্গে লাঞ্চ করতে বসলেন। অবশ্য ওয়াইন পান করতে রাজি হলেন না। ভদ্রভাবে বললেন যে ডাক্তারের কঠোর নিষেধ আছে। ওয়াইন বা অন্য কোনও সুরা তিনি গ্রহণ করতে পারবেন না। ফিশার তৎক্ষণাৎ ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে এল। কিছু পরে ফিরল সেই কালো বোতলটা নিয়ে যাতে এখনও সামান্য হলেও পড়ে আছে কেনটাকির সেই বিশেষ হুইস্কি।

“ব্যারন‌ আমেরিকার সেরা জিনিস পছন্দ করেন সেটা আগেও বলেছেন। উনি‌ এটাও‌ জানেন যে এই সুরা ওষুধের কাজ করে।” এই বলে ফিশার অবশিষ্ট হুইস্কি একটা গ্লাসে ঢেলে ব্যারনের দিকে এগিয়ে দিল।

উনি দৃশ্যতই অপ্রস্তুত। এই পানীয় নিয়ে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ভালো নয়। কিন্তু যেভাবে ফিশার তাঁকে পানীয়ের গ্লাসটা এগিয়ে দিল তাতে না পান‌ করলেও সবাইকে অসম্মান করা হয়। মিস ওয়ার্ডের আধো আধো গলার আবদারে অবশ্য ব্যারনের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হল। উনি এক চুমুকে গ্লাসটা ফাঁকা করে দিয়ে আবার গল্পে ডুবে গেলেন।

স্টেশনে যাওয়ার গাড়ি চলে এসেছে। ব্যারন সবাইকে বিদায় জানাতে উঠে দাঁড়িয়েই দু-হাতে মাথা চেপে বসে পড়লেন। ওঁর চারপাশে ভিড় জমে গেল।

“কিছু না, মাথাটা হঠাৎ করে এক‌টু ঘুরে গেল,” ক্লান্ত স্বরে উনি বলে উঠলেন।

ফিশার এগিয়ে এল। “দেরি করার সময় নেই। আর কুড়ি মিনিট বাদেই ট্রেন ছাড়বে। আমি ব্যারনকে দেখছি। আপনারা সবাই এগিয়ে যান।”

মিসেস ফিশারকে সবাইকে নীচে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়ে ফিশার ব্যারনকে ধরে ধরে নিজের রুমে নিয়ে এল। ঘরে আসার দু-মিনিটের মধ্যেই ব্যারন জ্ঞান হারালেন।

ফিশার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাল। বড়জোর পাঁচ মিনিট ওর হাতে আছে। প্রথমেই ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যারনের পরচুলা আর স্কালক্যাপটা খুলে ফেলল।

“ঈশ্বর আমায় মাফ করুন যদি আমি‌ কোনও অন্যায় করি। কিন্তু মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে এ ছাড়া আমার কাছে আর কোনও উপায় নেই।” পরমুহূর্তেই ও ব্যারনের রুপোলি, গোল মাথাটা চাপ দিয়ে খুলে দিল। ভিতরের যন্ত্রটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এখন। ব্যারন যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেন একবার। না, এখন দুর্বল হওয়ার সময় নয়। ফিশার দৃঢ় হাতে যন্ত্রটা বের করে আনল। বেশ ওজন আছে। ভালো করে দেখার এখন সময় নেই। ওটাকে বেডসাইড টেবিল রাখা খবরের কাগজ দিয়ে মুড়ে নিজের ব্যাগে ঢোকাল। তারপর চাপ দিয়ে আবার মাথাটা বন্ধ করে স্কালক্যাপ আর পরচুলা পরিয়ে দিল।

সবই হল মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই। হোটেলের কর্মচারী একটু বাদে ছুটে আসতেই ফিশার জানাল যে ব্যারন এখনও অসুস্থ তবে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। উনি এখন বিশ্রাম করছেন। ওঁর ভ্যালে অগ্যুস্তকে যেন খবর পাঠানো হয়। মিনিট কয়েকের মধ্যেই ফিশার গাড়িতে। সেটা দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে স্টেশনের দিকে। ট্রেন মিস করলে চলবে না।

পরের দিন ভোর বেলায় স্টিমার যখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে, ফিশার নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে ডেকে এল। হাতে খবরের কাগজে মোড়া সেই ভারী পার্সেল। ওর মুখ ফ্যাকাশে, জিভ শুকনো। একটু পরেই ও রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে পার্সেলটা ছুড়ে দিল আটলান্টিকের নোনা জলে। একটা আলোড়ন তুলে পার্সেলটা ডুবে গেল জলের মধ্যে। একটা তীব্র আর্তনাদ কি ভেসে এল? না, তা কী করে সম্ভব? নিশ্চয়ই সে ভুল শুনেছে। একটা আলবাট্রস স্টিমারের পাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। ওটা বোধহয় পাখিটারই ডাক।

ফিশারের হাতে কেউ একটা হাত রাখতেই ও চমকে তাকাল। মিস বেলা ওয়ার্ড।

“এ কী? আপনাকে এত ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন? কী করছিলেন আপনি এখানে?”

“আমি দুই মহাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে আপনার মনের শান্তিও রক্ষা করছিলাম।” ফিশার ধীর গলায় উত্তর দিল।

“তাই! কী করে শুনি?”

“আমি ব্যারন স্যাভিচকে জাহাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।”

মিস ওয়ার্ড এক মুহূর্ত চোখ সরু করে ফিশারের দিকে তাকাল। তারপরই হেসে উঠল জোরে। “সত্যি, মিস্টার ফিশার আপনি পারেনও বটে। কী যে সব বলেন।”

ফিশার কোনও উত্তর দিল না। ও চেয়ে আছে সমুদ্রের দিকে। দৃষ্টি চলে যেতে চাইছে জলের গভীরে, আরও গভীরে।

***

লেখক পরিচিতি

এডওয়ার্ড পেজ মিচেল (১৮৫২ – ১৯২৭): আমেরিকান লেখক, সাংবাদিক ও পরবর্তী কালে সংবাদপত্রের সম্পাদক। দৈনিক সংবাদপত্র ‘দ্য সান’ সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর কল্পবিজ্ঞান চর্চায় মিচেল এক অগ্রগণ্য নাম। কল্পবিজ্ঞানের অনেক জনপ্রিয় trope তাঁর লেখায় এসেছে। এইচ. জি. ওয়েলসের আগেই তাঁর লেখায় এসেছে অদৃশ্য মানুষ (‘দ্য ক্রিস্টাল ম্যান’ গল্পে) বা সময়-ভ্রমণের (‘দ্য ক্লক দ্যাট টার্নড ব্যাকওয়ার্ড’ গল্পে) অনুষঙ্গ। আলোর থেকে দ্রুতবেগে ভ্রমণের কল্পনা করেছেন তাঁর সব থেকে বিখ্যাত গল্প ‘দ্য ট্যাকিপম্প’ গল্পে। এখানে যে গল্পটা অনুবাদ করা হয়েছে সেই ‘দ্য এবলেস্ট ম্যান ইন দি ওয়ার্ল্ড’ ১৮৭৯ সালের মে মাসে ‘দ্য সান’ দৈনিকে প্রকাশিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে প্রতিভাবান বিজ্ঞানী, তাঁর সৃষ্টি যন্ত্র মানুষ আর সেই যন্ত্র মানুষ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে আশঙ্কা সবই এসেছে এই গল্পে।

এডওয়ার্ড পেজ মিচেলের এই গল্পটি ১৮৭৯ সালে লেখা। মিচেলের মৃত্যু হয় ১৯২৭ সালে। গল্পটি পাবলিক ফোরামে উপলব্ধ আর কপিরাইট মুক্ত।

মূল গল্প: The Ablest Man in the World

Tags: অনুবাদ গল্প, এডওয়ার্ড পেজ মিচেল, কল্পবিজ্ঞান গল্প, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সম্রাট লস্কর

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!