চুল

  • লেখক: সিদ্ধার্থ দাসগুপ্ত
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

‘পারসেল আ গিলো বড়া বাবুর ঘরে। সেই থিকে বাবু দোর দিছেন’।

অ্যাঁ? পারসেল? ঘনাদার?’ আমরা সমস্বরে আঁতকে উঠলাম।

মুখ চাওয়াচাউয়ি করে তো আর সময় নষ্ট করা ছাড়া কিছুই হবার নয়। গৌরই প্রথম টঙের ঘরের পানে দৌড় লাগাল। পিছন পিছন আমরা তিনজন। ঘনাদা ও পার্সেল, পার্সেল ও ঘনাদা মেলে না কোনওক্রমেই। এ রহস্য ভেদ না করে রবিবারের মাছের কালিয়া রামভুজ স্পেশাল পেটে নামবে না।

‘ঘনাদা ও ঘনাদা কার পার্সেল? ইবন ফরিদের?’

‘টুনা ক্লাবের সেই বেনিটোর নয়তো? খবরদার খুলবেন না।’ শিবুর আর্জি।

‘চিং সুন কি ভুল বুঝতে পেরে নতুন চশমা পাঠাল ক্ষমা চেয়ে?’ শিশির গলায় মধু ঢালল যেন।

কাকে বলা। ঘনাদা মড়া মানুষের মতোই নিঃশব্দ রয়ে গেলেন। আমরা দশ মিনিট পর হতাশ হয়ে নেমে আসার সময় বনোয়ারিকে বলে গেলাম একটু নজর রাখতে। বলা যায় না, ঘনাদার বয়েস হয়েছে। কী থেকে কী হয়।

দুপুরের খাওয়া চোরের মতো সারলাম। ঘনাদার টিকিটি নেই। ডাকতেও আর সাহস হল না। পার্সেল আমরা কেউই পাঠাইনি। কিন্তু ঘনাদার চোরের মন কী কী ভাবছে তা নিয়ে অনেক ভেবে ভেবে শেষটায় হতাশ হয়ে যখন তাস নিয়ে বসেছি তখন বনোয়ারি খবর দিল ঘনাদা এই পাঁচ মিনিট হল মেস বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। তার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়েছে।

‘হাম ডরকে কুছু পুছি নাই দাদাবাবু,’ তার সাফ জবাব।

কিছুই করার নেই জেনে তাসের দেশে ফের ঢুকে পড়ে যখন হাঁকুপাঁকু করেও আর বেরোতে পারছি না তখন রাত দশটা নাগাদ চটাস চটাস নাগরাই স্পেশাল জানান দিল তিনি টঙের সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন।

আর ব্রিজ। দুদ্দারিয়ে যখন আমরা উঠছি তখন তিনি আরাম করে কেদারায় শরীরটি এলিয়ে দিয়েছেন আওয়াজ পেলাম। ঘরে ঢুকেই শিশির টিন বাড়িয়ে দিয়েছে আর ঘনাদাও আরাম করে ধোঁয়াটি ছাড়ার পর দেখলাম আবেশে হিসেবটি নিতেই ভুলে গেছেন।

ওসব তুচ্ছ জিনিসে মন রাখার সময় তখন আমাদের? আমরা তখন যাকে বলে আর্তনাদ ছাড়ছি।

‘কী ছিল ঘনাদা? সেই টুপিটা?’ শিবু কাতর।

‘অমন কালিয়া খেলেন না দুপুরে? যাকগে ডিনার তো আছেই,’ শিশিরের কথায় ঘনাদা ঈষৎ ভুরু তুললেন।

‘না আগে তো শুনতে হবে কী হয়েছে? এটা একটা জাতীয় সমস্যা তা বোঝার ক্ষমতাও তোমাদের নেই,’ আমি খেপে উঠলাম যেন।

‘জার্মানি, সেভেন্টি ফোর’ ঘনাদা তখন সব খোঁচার ঊর্ধ্বে।

সারাদিন যেখানেই থাকি না কেন, সন্ধে হতে না হতেই আমি লি পিয়াং-এর কুটিরটিতে। অবশ্য নামেই কুটির। বন শহরের অভিজাত পাড়া প্লিটারসডরফ। তারই এক সবুজ শ্যামল অংশে লি পিয়াং তাঁর জেন আশ্রম গড়ে তুলেছেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত জার্মানি একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। যুবকেরা ঔদ্ধত্য ও অহঙ্কারের ভাষা ভুলে নম্র গভীর জেন দর্শনের প্রতি একটু একটু করে আকৃষ্ট হয়েছে যেন। চিনের নাস্তিক পরিমণ্ডল অসহ্য হওয়ায় বহুদিন আগেই লি ঘরছাড়া হয়েছেন। আশ্রমের এই কিছু একর জমিটিতে তিনি শান্তি বুনেছেন অবশেষে, যার টানে ছুটে আসে প্রতিদিন বহু জার্মান নরনারী।

সন্ধেবেলা এক ঘণ্টা সারমন বা উপদেশ। তারপর তাই চি শেখান লি পিয়াং। প্রাচীন এই মার্শাল আর্ট দর্শক হয়ে দেখতে দেখতে দিব্যি সময় কেটে যায়। সেদিনও ক্লাসের শেষে ঝোলাটি গুছিয়ে সবে উঠব এমন সময় তিনি হাতছানি দিয়ে ডাকলেন। কাছে যেতেই শুধলেন, ‘ভারতীয় কি? কী চাও এখানে?’

বললাম, ‘আমার দিন পনেরোর ভিসা আছে। আমায় তাই চি শেখাবেন কিছুটা?’

হা হা করে হেসে উঠলেন সেই সন্ন্যাসী। বললেন ‘কিছু নয়, পুরোটা শেখাব। পনেরো বছরের ভিসা নিয়ে এস। হাজার হোক তুমি তাঁর দেশের লোক।’

শেখা হল না ঠিকই। কিন্তু রোজ যেতাম। বুদ্ধ তো বটেই লাও জু, কনফুশিয়াস, কো সুন, তা হুই প্রভৃতি জেন ও তাও সন্ন্যাসীদের বাণী যেন অন্য মাত্রা পেত তাঁর বর্ণনায়। আবার আসব বলে যেদিন বিদায় নিলাম সেদিন সত্যি বড় ব্যথা বেজেছিল মনে। তিনি অবশ্য তাঁর জেন দর্শন অনুযায়ী নিঃস্পৃহ ছিলেন।

আশ্রম থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠব, একটা চাপা হিসহিসানি কানে এল। ‘ফের যদি এখানে দেখি তো পুঁতে ফেলব কালা কুত্তা।’ চমকে পিছন ঘুরে দেখি দাঁত বের করে জার্মান এক ছোকরা হাসছে। দেখেছি বটে একে আশ্রমে। ষণ্ডা সাদা মোষ। কাছে বিশেষ আসেনি কখনও।

ন্যাকা সেজে শুধলুম, ‘কী যেন বললে জার্মানে। অতটা পোক্ত নই তো।’

‘তো ইংরেজিটাই ভালো করে শেখ,’ বলে সে আশ্রমের ভিতরে সেঁধিয়ে গেল।

বেশিদিন অবশ্য সে আড়ালে রইল না। দিন কুড়ি বাদেই তার দেখা পেলাম। এবার প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার দূরে। মেকং নদীর অববাহিকা ধরে এক ঘন জঙ্গুলে গ্রাম। দেশটাকে আমরা কাম্বদিয়া নামে জানি। বৌদ্ধ দেশ। কিন্তু শান্তিপূর্ণ হলেও বৌদ্ধধর্মের অঙ্গ হিসেবেই যেন দেশটা মার্শাল আর্ট নিয়ে পাগল। কুংফুর সঙ্গে বক্সিং জুড়ে এক ভয়ঙ্কর মার্শাল আর্টের পীঠস্থান এই দেশ। নাম প্রাদল সেরে।

‘কী ঘনাদা?’ শিবুর প্রশ্ন। পাছে বেফাঁস কিছু বেরোয় সে জন্য শিশির তাড়াতাড়ি টিন এগোল। সম্ভবত ন-হাজার দুশো তিন নম্বরটি ধরিয়ে ঘনাদা আরামের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘প্রাদল সেরে। ওই যেমন তোমাদের কিক বক্সিং, থাইল্যান্ডের মুয়াই থাই, সেরকম গোত্রের। সেরে কথাটার মানে ওদের ভাষায় খালি হাতে। বড় মারাত্মক জিনিস। হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে মুষ্টিযুদ্ধ। সেই সঙ্গে প্রাণঘাতী কিক আর কনুইয়ের গুঁতো। কাম্বদিয়ার সদ্য নতুন সরকার একে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী বলে প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ করেছেন। জনগণ মানবে কেন। তারা লুকিয়ে চালু রেখেছে এ জিনিস।’

‘আপনি নাম দিতে গেছিলেন বুঝি?’ শিবুর বেমক্কা প্রশ্নে কান না দিয়ে ঘনাদা বলে চললেন, ‘প্রতি বছরই অবশ্য নিয়ম করেই গোটাকতক মরে। জনগণ ফিরেও দেখে না। এ তাদের বহু পুরুষের প্রিয় খেলা। প্রাণ থাকতে এ জিনিস ছাড়তে রাজি নয় তারা।

আমি গেছিলাম যেন এক বিখ্যাত ইংরেজি কাগজের হয়ে একটু প্রাচীন মার্শাল আর্ট নিয়ে লেখালেখির ইচ্ছে নিয়ে। আদরযত্ন বেশ জুটছিল। গ্রামে একজনের মাটির ঘরেই থাকছিলাম। সারাদিন প্রতিযোগিতা দেখে রাতে সে চাষি পরিবারের যুবক ছেলেটির কাছে সে দেশের খেমের ভাষা শিখছিলাম। ক্রমশ প্রতিযোগিতা জমতে লাগল।

ঘন জঙ্গল। মাঝে একটা মাঠ মতো জায়গা। সেখানে অনেকটা কুস্তির মতো জল কাদা মাটি বালি মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে রিং। হাঁটুতে হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে সে মরণপণ লড়াই দেখলে ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। তৃতীয় দিন এক মুমূর্ষু যোদ্ধার জ্ঞান ফেরানোর আশায় প্রাণপণ বুকে পিঠে বিশুদ্ধ ভারতীয় মালিশ করছি, এমন সময় তাকে দেখলাম। ষণ্ডা মোষ যেন রাগে ফুলছে আর আমায় দেখছে দর্শকের সারিতে বসে।

সে রাতে ভাষা শেখা মাথায় উঠল। মাথা ঠান্ডা করতে আর কতকটা যেন ওই জার্মান মোষকে খুঁজতে নদীর ধার বরাবর হাঁটছিলাম। খানিক পরে একটা আওয়াজ ভেসে এল বিশুদ্ধ ইংরেজিতে, ‘এখানে রে, কালা নেংটি ইঁদুর।’

ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সে এবার দর্শন দিল। আমি যেন খুব খুশি হয়েছি এমন ভাব দেখিয়ে বললাম, ‘হের কার্ট যে। কী সৌভাগ্য।’

‘সৌভাগ্য কার সে দেখবি চল,’ বলে সে নড়া ধরে নিয়ে চলল গভীর জঙ্গলের দিকে। খানিক দূর গিয়ে সে ধমক দিল, ‘কোনও শেষ ইচ্ছে আছে? লাশটা হায়েনা খাবে না কুমিরে? কী চাস?’

আমি কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম, ‘কিন্তু সন্ন্যাসী ছানবাতে যে জন্য আমাকে আর আপনার গুরু লি পিয়াং-কে ডেকেছিলেন তা তো আর জানা হবে না।’

ষণ্ডা কার্ট থমকাল। তারপর হিংস্রভাবে খিঁচিয়ে উঠে বলল, ‘সে জিনিস ছানবাতের কাছ থেকে আমি নিয়ে যাব আমার গুরুর জন্য। তুই তখন কুমিরের পেটে বসে তোদের ওই যোগ সাধনা করছিস।’

‘সে তো ভালো কথা। কিন্তু তুমি তো ও জিনিস গুরুকে দেবে না। তোমার গুরু তো চিঠিই হাতে পাননি। আমি অতদিন যে ওঁর আশ্রমে ছিলাম তাতেও উনি কিছু না বলাতে বুঝেছি, তুমি তা লুকিয়ে নিজে পড়ে এখন লোভের বশে হাতাতে এসেছ মোটা দাঁও মারবে বলে। নয় কি?’

বাঁ দিকে একটু সরে গেলাম। তারপর বাঁ হাতে কার্টের ডান হাত ধরলাম। তিন আঙুলে তার হাতের কানা ধরে উঁচিয়ে একটা আলতো মোচড়। কার্টের গোটা শরীরটা আছড়ে পড়ল মাটিতে। মোচড় বাড়াতেই তার চোখ কপালে উঠে অজ্ঞান হবার জোগাড়।

‘বাঃ নিখুঁত সান কা জো। কোথায় শিখলে?’

চমকে উঠে পিছনে দেখেই আভূমি প্রণাম করলাম। সন্ন্যাসী মাত্রেই প্রণম্য আমার কাছে। তা বাদেও যিনি সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁর প্রায় সাড়ে ছয় ফিট সটান চেহারা। মেরুন বসন ছাপিয়ে শরীরে স্ফীত পেশি। চোখে বৈরাগ্যের ধূসর দৃষ্টি।

কার্ট ছাড়া পেয়ে উঠে বসেছে। ভিক্ষু ছানবাতে তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘চোর কোথাকার। তুই এখানে আসার পরই দাস চিঠি লিখে সব জানায় লি পিয়াং-কে। লি তোকে মুখ দেখাতে বারণ করেছেন আর। ও জিনিস দাস পাবে তিনি বলেই দিয়েছেন।’

আমি বললাম, ‘আপনার চিঠি পেয়ে আমি তো অভিভূত। অমূল্য জিনিসটি কী আমি জানি না। তবে আমি যে তা পাবার যোগ্য, আপনার ধারণা হল কেন?’

ভিক্ষু এবার জানালেন, তাঁর মনে হয়েছিল পৃথিবীতে দুজন নির্লোভ মানুষই এমন আছেন যিনি কাম্বদিয়ার এই বুদ্ধ মন্দিরে রাখা কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই অমূল্য সম্পদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেবে।

সন্তর্পণে আমাদের মুখগুলোকে দেখে নিয়ে ঘনাদা ফের কাহিনির সুতো ধরলেন।

আমাকে জঙ্গলের পথে এগিয়ে দিতে দিতে ভিক্ষু খানিকটা বললেন। ইতিমধ্যে কার্ট আচমকা লাফ মেরে পালিয়েছে। ধরতে পারতাম, কিন্তু ছানবাতে মানা করলেন। ‘ও আপদ গেছে যাক দাস।’

পরে হাড়ে হাড়ে অবশ্য এই উদারতার মাশুল গুনতে হয়েছিল। সে যাক।

‘দাস, এ দেশ এখন গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলেছে। নতুন সরকার নাস্তিক ও ভুয়ো সাম্যবাদী। নতুন ডিক্টেটর সব বৌদ্ধ মঠের উপর কড়া নজর জারি করেছেন। অচিরেই হানা দেওয়া হবে প্রাচীন বহুমূল্য সম্পদের জন্য। তা সে সোনাদানা হোক কি অন্য কিছু।’

এর বেশি আর কিছু বলেননি তিনি। জানিয়েছিলেন তাড়াতাড়ি দেখা করবেন। আমাকে পৌঁছে দিয়ে জঙ্গলে মিলিয়ে যাবার পর মনে মনে আরেকটা প্রণাম জানিয়েছিলাম। ছোটবেলায় বেনারসে এক সাধু দেখেছিলাম, এরকম সাড়ে ছ-ফিট লম্বা, বাঘের মতো চোখ। আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘরে বসে থাকতেন। চোখ দুটি বাঘের মতো জ্বলজ্বল করত শুধু। লোকের সামনে বাইরে বেরতেন না। তাঁর কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেছিল।

দু-দিন বাদে প্রতিযোগিতা শেষ হল। চ্যাম্পিয়ন ছেলেটির নাম বিভু। মাঝারি চেহারায় যেন পেশির পাহাড়। লড়ে বুনো বাঘের মতো। তার পুরস্কার প্রদানের পর এক বিরাট ভুরিভোজের আয়োজন করা হয়েছে রাতে। ওদিকে ছানবাতেও খবর পাঠিয়েছেন আজ রাতেই যা করবার করবেন। আমিও তৈরি হলাম।

গ্রামের মধ্যে মশাল জ্বালিয়ে বাদ্যি বাজিয়ে সে জংলী ভোজের বিবরণ বলে লাভ নেই। কামবদিয়ার কলাপাতায় মোড়া নারকোলের দুধের মাছ ভাজা যা তাদের প্রায় জাতীয় খাদ্য সেই ফিশ আমক তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে বো লাক লাক বা শেকিং বিফ, কাই তি বা রাইস নুডল সুপ, তাজা ফল, বুনো শুকর এমনকি কাঠিতে বেঁধা কাঁকড়াবিছে অবধি ছিল। আর ছিল তাদের প্রিয় পানীয় আংকর বিয়ার। কী মেশায় তাতে বুদ্ধই জানেন কিন্তু দু পাত্তরে আমার বেশ ঢুলু ঢুলু ভাব এল। তার মধ্যেই একবার মনে হল পিছনের জঙ্গলে একটা গাছের আড়াল থেকে সড়াৎ করে একটা মেরুন রং সরে গেল। আরও বার কয়েক এরকম মনে হওয়াতে উঠে পড়লাম সকলের চোখ এড়িয়ে।

জঙ্গল গভীর হচ্ছে আর ভাবছি পানীয়টা না খেলেই হত, এমন সময় দেখি একটা খোলামতো জায়গায় তিনজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। নেশা যেটুকু যা হয়েছিল কেটে গেল নিমেষে।

জার্মান ষাঁড় কার্ট তো বটেই, সদ্য চ্যাম্পিয়ন হওয়া বিভুও হাজির। দুজনেই মাপছে সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়ানো ভিক্ষু ছানবাতে-কে। কার্টের যেন চোখ জ্বলছে।

‘শেষবারের মতো বলছি সাধু সাধুর মতো থাকো। লোভে জড়িও না’।

জবাবে ভিক্ষু শুধু বললেন, ‘এস দাস। জন্তুটা আবার ঝামেলা পাকাবে বুঝিনি।’

কার্ট পলকে আমাকে দেখেই নিচু স্বরে কী যেন বলল। বিভু ঘুরে দাঁড়াল আমার দিকে।

বললাম, ‘ওহে বিভু কীসের লোভ দেখিয়েছে শুনি? ইউরোপে নিয়ে প্রফেশনাল খেলাবে? নাকি স্কুল খুলে দেবে প্রাদাল সেরার? সব ধাপ্পা কিন্তু।’ ততদিনে কথ্য খেমের বেশ তুলে ফেলেছি। ভাষায় আমার বিশেষ সময় লাগে না।

জবাবে বিভু একটা ডিগবাজি খেল, তারপর হাঁ করে বোঝার চেষ্টা করল সে মাটিতে পড়ে কেন।

‘শাবাশ এ তো ইরিমি। আপনিও জুজুৎসুর চর্চা করেন সে তো আগেরদিন আমার সান কা জো ধরে ফেলাতেই বুঝেছি।’ আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রায় হাততালি দিয়ে ফেলি আর কি।

এবারে বিভু একটু সতর্ক হল। যতই হোক সে সদ্য বিজয়ী বীর। তাও আবার প্রাদালের মতো অমন ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের। ধীরে ধীরে সে উঠে মাপল তার প্রতিপক্ষকে। ষাটোর্ধ সন্ন্যাসী এমনটি সে দেখেনি। ছানবাতে-ও দেখলাম শান্ত চোখে মাপছেন।

‘মন্যু সা লিং লিঙ্গউ।’

বড় কথা, কিন্তু ওর মানে হল স্রেফ ইডিয়ট। ভিক্ষু বিভুকে মূর্খ বলছেন।

‘সাঁ রবা কোঁ।’ এবার আমি চুপ। আন্দাজ করেছিলাম আমি। ওর থেকে মূল্যবান জিনিস এই গোটা দেশে নেই। আমি পড়েছি ও জিনিসের কথা। বহু বজ্রযান পুঁথিতে ওর কথা বলা আছে। উত্তেজনায় আমি চেঁচিয়ে উঠলাম ‘মগধ, মগধের সেই…’

‘ঠিক ধরেছ দাস। সাঁ রবা কোঁ। তাঁর চুল।’

আমার হাত কাঁপছে তখন আনন্দে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে আড়াই হাজার বছর আগের মগধ। বুদ্ধ মগধ ত্যাগ করে চলেছেন মহাপরিনির্বাণের পথে। তাঁর অতি প্রিয় মগধ। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি এখানে থেকে ধর্মপ্রচার করেছেন। ব্যাখ্যা করেছেন অষ্টাঙ্গ মার্গের। আজ মগধ ত্যাগ করে যাবার সময় সীমানা পেরিয়ে গিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকালেন। একবার মাথায় হাতও দিলেন। দুটি কাঁচা চুল খসে পড়ল মগধের সীমানায়। দেখতে পেয়ে তাঁর এক ভক্ত কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। হাজার বছর তা ছিল ভারতে। তারপর তিব্বত ঘুরে এই রি পা মঠে।

বিভু নিজেও বৌদ্ধ। সে দোলাচলে পড়ল হয়তো কিন্তু কাটিয়েও নিল। সেও হতে পারে এই নব্য সরকারের প্রতিনিধি। কিন্তু এ জিনিস তো যার তার হাতে দেওয়া যায় না।

আমি চেঁচিয়ে বললাম, ‘আমি… এদের পাঙ্গা নেবার জন্য আমি এসেছি। ওকে আমার হাতে ছেড়ে দিন।’

‘না দাস। তোমার চোট পেলে চলবে না। তোমার বুদ্ধি আমার কাজে লাগবে। অনেক কাজ সামনে বাকি—’

বলতে বলতেই মাথা সরিয়ে দুটো পরপর লোহার মতো ঘুঁষি এড়িয়েছেন ভিক্ষু। বিভু খানিক অবাক চোখে দেখে একটা কান তাক করা কিক চালাল। লাগলে একটা মোষও জমি নিত। উনি মাথাটা হেলিয়ে কাটিয়ে নিলেন।

বিভুর কুতকুতে চোখে একটু ত্রাস ফুটল কি? ভয় চাপা দিতেই যেন এক পলক দম নিয়েই সে আবার একটা বোমার মতো ঘুঁষি চালাল।

হাতের কানায় সেটাকে হালকা এড়িয়ে পলকে মুঠিটি তুলে নিলেন তিনি। রাখলেন নিজের কাঁধে। নিমেষে অন্য হাত দিয়ে কব্জির কাছে পড়ল মারণ চাপ।

কড়াত। স্পষ্ট আওয়াজ শুনলাম।

হাততালি দিয়ে বললাম, ‘শাবাশ। নিখুঁত নি কা জো। নি অর্থে জাপানীতে দুই। দ্বিতীয় টেকনিক আইকি জুজুৎসুর। আমার ছিল সান কা জো। সান হল তিন।’

কবজি ভেঙে তখন কাতরাচ্ছে বিভু। ঝোপজঙ্গল ভেঙে দৌড় লাগিয়েছে কার্ট।

গাঢ় নীল ভেলভেটের বাক্সে রাখা বুদ্ধের চুল আমি নিজে নিয়ে রেখে এসেছিলাম লি পিয়াং-এর কাছে। বলেছিলাম, ‘আমি নয়, বিশ্বের অগ্রগণ্য বুদ্ধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে এর দায়িত্ব এখন আপনার।’

উনি রাজি হয়েছিলেন। তবে বলেছিলেন যে তাঁর মৃত্যুর পরে বুদ্ধের চুল কিন্তু বুদ্ধের নিজের দেশেই ফিরে যাবে।

ঘনাদা ওঠার উপক্রম করতেই আমরা হইহই করে আবার বসিয়ে দিলাম।

শিবু বলল, ‘কিন্তু ভিক্ষু ছানবাতে তো চেয়েছিলেন যে চুল আপনি পান।’

ঘনাদা উদাসীনভাবে বাড়ানো টিন থেকে আরেকটি নিয়ে বললেন, ‘আরে মনে নেই ওদেশে তখন ভয়াবহ গণ্ডগোল। পল নামে এক স্বৈরাচারী দেশ দখল করে অত্যাচারের যুগ শুরু করেছে। ইতিহাস দেখে নিয়ো হে একবার।’

আমি বললাম ‘তাতে আপনার কী?’

ঘনাদা ধোঁয়া ছেড়ে নির্লিপ্ত মুখে বললেন, ‘না সামান্যই। ৭৫-৭৯ এই সময়টুকুতে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে কাম্বদিয়ার মানুষ গেরিলা যুদ্ধ চালিয়েছিল। দেশ জুড়ে এই বিদ্রোহের মূল নেতাদের অন্যতম ছিলেন এক সাড়ে ছ-ফুট লম্বা বুদ্ধ উপাসক।’

আমরা চুপ।

‘আর সেই ভিক্ষুর প্রায় ছায়াসঙ্গী ছিল বুদ্ধেরই দেশের এক নগণ্য মানুষ। যাকে শত্রুপক্ষ কালা নেংটি নামে ডাকত। যার একটু আধটু বুদ্ধি সেই নমস্য ভিক্ষু খানিক গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন।’

ঘনাদা উঠে পড়লেন। তারপর কী যেন মনে পড়াতে বললেন, ‘হ্যাঁ লি পিয়াং এই গতমাসেই নির্বাণ লাভ করেছেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী সে পার্সেল আমি আজ সন্ধেয় কলকাতা জাদুঘরের ডিরেক্টর ননিবাবুর জিম্মায় দিয়ে এসেছি।’

রাতে খাওয়ার শেষে যখন গুলতানি করছি তখন শিবুর মাসতুতো ভাই রবির ফোন এল।

‘বুঝলে ছবিতে এঁকেছিলাম ঘনাদা আকাশে গ্যাসবেলুনে করে উড়ছেন এভারেস্টের উপর। তা নতুন গল্প কী নিয়ে পেলে? এভারেস্ট, গ্যাস, না বেলুন? পার্সেল করতে পঞ্চান্ন টাকা যে গেল তা উসুল হল?’

আমরা তখন ধ্রুবতারা খুঁজছি আকাশে।

Tags: গল্প, ঘনাদা, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সিদ্ধার্থ দাসগুপ্ত

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!