হোমো সুপিরিয়র

  • লেখক: শংকর লাল সরকার
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

কাচের জানলা দিয়ে বাইরের তালশাঁসরঙা আকাশটার দিকে থম মেরে তাকিয়ে ছিল ইরাবতী। মুখভার করে থাকা আকাশটার মতো ওরও মন ভালো নেই। ঘুম থেকে উঠে সে পেটে একটা খিঁচুনি টের পায়। প্রায় দৌড়ে বাথরুমে ঢোকে। ওর দুটো পা দিয়ে দরদর করে নেমে আসছে রক্তের ধারা। একটা রক্তের পুটুলি বেরিয়ে আসে বাথরুমের মেঝেতে। রক্তে ভেসে গেল বাথরুমের মেঝে। স্পন্টেনিয়াস অ্যাবরশন। একদম অসাড়েই হয়ে গেল। ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে এসে বাথরুমে গিয়ে মেঝের দিকে তাকাল ইরাবতী। ধুয়ে দিলেও রক্তের একটা হালকা ছোপ মেঝেতে রয়ে গেছে, এখানেই পড়ে গিয়েছিল অপূর্ণ ফিটাসটা। ইরাবতী আর পরিমলের অপুষ্ট সন্তান।

প্রথম সন্তান নষ্ট হয়ে যাবার পর ইরাবতী মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ডিপ্রেসনে চলে গিয়েছিল। সবসময় চোখের সামনে ভাসত মুখচোখহীন রক্ত-মাংস-মেধায় গড়া একটা পিণ্ড। এই পৃথিবীর পথে আসতে আসতেই যে হারিয়ে গিয়েছে। সকলে উপদেশ দিয়েছিল কোলভরে সন্তান না এলে ওকে ভালো করা যাবে না। কিন্তু সেই অ্যাকসিডেন্টের ফলে স্বাভাবিকভাবে মা হবার ক্ষমতা হারিয়ে ছিল ইরাবতী।

ডা. রাহুল খাস্তগীর ইরাবতীকে সবরকম পরীক্ষা করে বললেন “আইভিএফ পদ্ধতিতে সে মা হতে পারবে।” দীর্ঘ ছয়মাস ধরে কষ্টকর চিকিৎসা চলল। খাস্তগীর পইপই করে বলেছিলেন, “পেশেন্টকে যথাসম্ভব হাসিখুশি রাখতে হবে। মা বিষাদে থাকলে সেই বিষাদ ছড়িয়ে যাবে ফিটাসের মস্তিষ্কে।”

পরিমল সবসময় ঘিরে রাখে ওকে, কখনও একা থাকতে দেয় না। ওর জন্য ইরাবতীর খুব খারাপ লাগে। এক-একদিন সে পরিমলকে বলে, “তুমি সারাদিন আমার জন্য ভেবে ভেবে অস্থির হচ্ছো, আমি কি ছেলেমানুষ?”

পরিমল হেসে বলে, “তোমার জন্য করি না ছাই! আমি আমার নিজের স্বার্থেই করি। যে আসছে সে তো আমারই এক্সটেনশন।” এক-একদিন রাত্রে পরিমল ইরাবতীর পেটে কান রেখে বাচ্ছার নড়াচড়া অনুভব করে।

একদিন ইরাবতী লজ্জার মাথা খেয়ে পরিমলকে জিজ্ঞাসা করল “ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন পদ্ধতিটা কীরকম?”

পরিমল ওকে বোঝাল, “স্ত্রীর পরিণত ডিম্বাণু ল্যাপারেস্কোপিক পদ্ধতিতে সাবধানে বের করে পেট্রিডিসে সংরক্ষিত করা হয়। একই সময়ে সংগ্রহ করা হয় স্বামীর শুক্রাণু। তারপর অসংখ্য সজীব ও অতিক্রিয়াশীল শুক্রাণুগুলিকে ছেড়ে দেওয়া হয় নিষিক্তকরণের জন্য সংরক্ষিত ডিম্বাণুর পেট্রিডিশে। ডিম্বাণু ও শুক্রাণু রাখা পেট্রিডিশটিকে মাতৃগর্ভের অনুরূপ পরিবেশে ইনকিউবিটরের মধ্যে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রেখে নিষিক্ত করা হয়। এইভাবে সৃষ্ট ভ্রূণকে একটি বিশেষ নলের মাধ্যমে জরায়ুতে সংস্থাপন করা হয়।”

ইরাবতী সিরিয়াস গলায় বলল, “তার মানে পেট্রিডিসের মধ্যে ডিম্বাণু আর শুক্রাণুর মিলন ঘটে ভ্রূণ তৈরি হয়। সেই ভ্রূণ স্বাভাবিকভাবেই মাতৃগর্ভে বেড়ে উঠে।”

হাসতে হাসতে পরিমল বলল, “টেস্টটিউব বেবি কোনও টেস্টটিউবের ভিতরে বেড়ে উঠে না।”

ওর বুকে আলতো করে দুটো ঘুষি মেরে ইরাবতী বলল, “এ মা! আমাদের ডিম্বাণু আর শুক্রাণু পাঁচজনের চোখের সামনে পেট্রিডিসের ভিতরে নিষিক্ত হয়েছে।”

সেদিন সন্ধ্যায় ইরাবতী বারান্দায় দাড়িয়েছিল। ঠিক তখনই একটা চোরা হাওয়া এল, ইরাবতীর শীত শীত করে উঠল। নিজের মনে বিড়বিড় করে সে বলল “খুব মনখারাপ লাগে, কেন?” ঘরের ভিতর থেকে ছায়ামাসি হঠাৎ হাঁউমাউ করে উঠল, “দিদি তুমি এই সন্ধ্যাবেলাতে আবার এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছ। তোমাকে পইপই করে বলেছি সন্ধ্যার মুখে অন্ধকারে দাঁড়াবে না।”

ইরাবতী ঘুরে তাকাল তার মনের নিরেট বিষাদের জগদ্দল পাথরের উপরে যেন একঝলক আলো পড়ল। ছায়ামাসির সঙ্গে একটু মজা করার জন্য বলল, “তুমি অল্পেতেই বড় চেঁচামেচি করো। আমার এত সহজে ঠান্ডা লাগবে না।”

“ঠান্ডা কোথায়? এ বড় সর্বনাশের হাওয়া। সন্ধ্যাবেলার এই হাওয়ার সঙ্গে অতৃপ্ত আত্মারা নেমে আসে। তারা আমাদের চারপাশে ঘুরপাক খায়। আর জগতের সব সুখের ভিতরে বদ হাওয়া ঢুকিয়ে দেয়। তোমরা সব লিখাপড়া জানা লোকরা তো আর এসব বিশ্বাস করবে না। আমাদের বেড়াচাঁপা গ্রামের জঙ্গলের ধারে থাকত এক বুড়ি আর তার ছেলের বউ…”

ইরাবতীর ভয় হল গল্পবাজ ছায়ামাসি আবার কোনও অলুক্ষুণে গল্প ফেঁদে বসে। কথা ঘোরাবার জন্য সে বলল, “মাসি চুলটা বেঁধে দেবে।”

এই মহিলাকে এনেছিল ইরাবতীর এক দূরসম্পর্কের বোন। শরীরের এই অবস্থায় ইরাবতীকে দেখাশুনা করার জন্য পিছুটানহীন একজন সর্বক্ষণের লোক দরকার ছিল। ছায়ামাসির সাতকুলে কেউ নেই। কথা বলতে বলতেই ওর দিকে কেমনভাবে তাকিয়ে রইল ছায়ামাসি তারপর আচমকা বলল, “দিদি তোমার মুখটা শুকিয়ে কর্কস হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে পেটটা ফুলেছে দেখো তোমার ঠিক ছেলে হবে।”

এই কথায় কেঁপে উঠেছিল ইরাবতী। একটা শিরশিরে অনুভূতি উঠে এসেছিল শিরদাঁড়া বেয়ে। আজকাল মাঝে মাঝেই পেটের ভিতরের প্রাণীটা তার অস্তিত্ব জানান দেয়। ইরাবতী বুঝতে পারে পেটের ভিতরে আর একজনের নড়াচড়া।

আকাঙ্ক্ষা মেডিকেয়ার তথা আইভিএফ সেন্টারের ডা. খাস্তগীর ইরাবতীর সবরকমের টেস্ট করালেন। কনসিভ করার সাড়ে তিন মাসের মাথায় খাস্তগীর ইরাবতীকে অ্যামনিওসেন্টেসিস করাতে বললেন। মাতৃগর্ভে সূচ ঢুকিয়ে সামান্য একটু অ্যামনিওটিক তরল নিয়ে এই পরীক্ষা করানো হয়। পরিমল প্রথমটাতে এই ধরনের পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে আপত্তি করেছিল কিন্তু ডাক্তারবাবু দৃঢ় গলায় বললেন, “যেহেতু আইভিএফ পদ্ধতিতে ইরাবতীকে কনসিভ করানো হয়েছে তাই ফিটাসের ক্রোমোজোমের বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক কিনা তা নির্ধারনের জন্য অ্যামনিওসেন্টেসিস করা প্রয়োজন।” টেস্ট রিপোর্টগুলি খুটিয়ে দেখে তিনি হাসি মুখে পরিমলকে বলেছিলেন, “আপনি একটি হেলদি পুত্রসন্তানের জনক হতে চলেছেন।” মাঝেমাঝে ইরাবতীর মনে হত এতসব পরীক্ষা তো ওর চেনা পরিচিত কারুর ক্ষেত্রে করতে হয়নি। পরিমল ওকে সান্ত্বনা দিত আইভিএফ পদ্ধতিতে বাচ্ছা হওয়ার জন্যই এতসব টেস্ট করাতে চাইছেন ডাক্তারবাবু।

ডা. খাস্তগীর যখন ইরাবতীর ট্রিপিল মার্কার ব্লাড টেস্ট করাতে বললেন তখন ওরা দুজনেই আকাশ থেকে পড়েছিল। এই ধরনের পরীক্ষার কথা ওরা এই প্রথম শুনল। ইন্টারনেট ঘেঁটে পরিমল ওকে বলল যে এই ধরনের রক্ত পরীক্ষা করা হয় গর্ভস্থ ভ্রূনের মধ্যে কোনও জিনগত সমস্যা আছে কিনা তা নির্ণয় করার জন্য। ইরাবতী এবার সত্যই খুব ভয় পেল। বারেবারে ডাক্তারবাবু ফিটাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করছেন কেন? তবে কি কোনও জিনগত ত্রুটি নিয়ে ওর সন্তানের জন্মানোর সম্ভবনা আছে। পরিমল ওকে সান্ত্বনা দিল যেহেতু টেস্টটিউব বেবি সেইজন্য ডাক্তারবাবু সবরকমের সাবধানতা অবলম্বন করতে চাইছেন। আটমাসের মাথায় ডাক্তারবাবু ওকে নার্সিংহোমে ভর্তি করিয়ে দিতে বললেন। অ্যাডভান্স স্টেজ, যে কোনও সময়ে ডাক্তারের দরকার হতে পারে।

আকাঙ্ক্ষা মেডিকেয়ার নার্সিংহোমের তিনতলার স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে ডা. রাহুল খাস্তগীরের সামনে ইরাবতী শুয়ে আছে। মাতৃগর্ভের অন্ধকার থেকে একটি শিশু পৃথিবীর আলোয় বেরিয়ে আসতে চাইছে। সিজার করে নয়, সবরকমের প্রিকোসন নেওয়া হয়েছে নর্মাল ডেলিভারির জন্য। ডা. খাস্তগীরের কুশলী হাতে ভূমিষ্ট হবার পর সদ্যোজাত শিশুটিকে তোয়ালে জড়িয়ে তার সামনে নিয়ে এলেন সিস্টার। ডা. খাস্তগীরকে স্তম্ভিত করে দিয়ে আচমকা সদ্যোজাত শিশুটি চোখ খুলে তার দিকে তাকাল। একজন পরিপূর্ণ মানুষের দৃষ্টি। শিশুটির ঠোঁটদুটো যেন সামান্য নড়ে উঠল। “ধন্যবাদ”, স্পষ্ট শুনলেন উনি। নিজেকে সামলে নিয়ে শিশুটির মুখের দিকে তাকালেন। নাঃ কোথাও কোন অস্বাভাবিকতা নেই। স্বাভাবিক এক মানবশিশু। সদ্যোজাত শিশুর কান্না তার গলায়। তবে সবটাই কি হ্যালুসিনেশন? বিভ্রান্ত অবস্থাটা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কাটিয়ে উঠলেন ডা. খাস্তগীর। তার মুখে দেখা গেল হালকা হাসির রেখা।

তোয়ালে জড়িয়ে সদ্যজাতকে যখন ইরাবতীর কোলে দেওয়া হল তখন নিজের আত্মজকে দেখে একটা অনির্বচনীয় আনন্দে ওর মন ভরে উঠল। আনন্দের আতিসহ্যে ওর চোখ ঝাপসা হয়ে এল। ছোট্ট একটা পুতুল। বড় বড় দুই চোখের ধূষর গভীরতায় ইরাবতী নিজেকে হারিয়ে ফেলল। না আগের বারের কথা ও আর কিছুতেই মনে করতে চায় না।

ইরাবতী ফিসফিস করে সকলের অলখ্যে বলে উঠল “পার্থিব!, পার্থিব!, কিরে নাম পছন্দ হয়েছে?”

সদ্যজাত শিশুটির মুখে যেন একটা হাসি খেলে যেতে দেখল, ওর ঘাড়টা যেন সামান্য নড়ে উঠল। না না এ কখনও সম্ভব নয় এটা নিশ্চয়ই ওর মনের ভুল।

পার্থিব ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। পার্থিব যে ঠিক স্বাভাবিক শিশু নয় সেটা প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিল ইরাবতী আর পরিমল। প্রথম থেকেই সে খুব আত্মনির্ভর। এতটা আত্মনির্ভরতা ইরাবতীর কাছে ভীষণ অস্বাভাবিক লাগে। মাত্র চার মাস বয়সেই সে হাঁটতে শিখে গেছে তার আগে ও হামা দিয়ে সে সারা বাড়িময় ঘুরে বেড়াত কিন্তু সহজে কোলে উঠতে চাইত না। ওকে যত দেখে ইরাবতীর মনে হয় ও যেন ঠিক স্বাভাবিক শিশু নয় কেমন যেন অন্যরকম। আবেগহীন শীতল প্রকৃতির। ছায়ামাসি সর্বক্ষণ ছায়ার মতোই ওর সঙ্গে লেপটে থাকত। “এই সাবধানে, কোনওকিছুতে লাগে না যেন। এই পড়ে গেল, ধর, ধর!” সারাক্ষণ টিকটিক করত। ইরাবতীর কিন্তু মনে হত পার্থিবের আচরণে বাচ্ছাসুলভ দুষ্টুমি ততটা নেই। ছোট থেকেই ও যেন বড়দের মতোই ম্যাচিওরড। পার্থিবের যেন কোনও শৈশব নেই।

পরিমল আর ইরাবতীর জিনই তো বহন করছে পার্থিব, তবে সে কেন অন্যরকম। ওর শীতল অনুভূতিহীন আচরণে মাঝে মাঝে খুব পীড়িত হয় ইরাবতী। একটা অশান্তির কাঁটা সবসময় মনে খচখচ করে। মাঝে মাঝে ইরাবতীর মনে হয় টেস্টটিউবে ওর ডিম্বাণু আর পরিমলের শুক্রানুকে যে শীতলতায় রাখা হয়েছিল সে কারণেই বোধহয় পার্থিব ওরকম অনুভূতিহীন। ইরাবতী জানে এটা হাস্যকর চিন্তা, কিন্তু তবুও ভাবনাটাকে ও কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারে না।

বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে পার্থিবের সঙ্গে আর পাঁচজনের তফাতটা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হতে লাগল। দু-বছর বয়স হতেই পার্থিব প্লে-স্কুলে যেতে শুরু করল। পড়াশুনাতে সে খুব ভালো কিন্তু যেটা পরিমল আর ইরাবতীকে বিস্মিত করে সেটা হল ওর পড়াশুনার ধরন। ওর পড়াশুনা দেখে ইরাবতীর মনে হত ওকে অনায়াসে যে কোনও হাইস্কুলে ভর্তি করা যেত। অস্বাভাবিক দ্রুততায় প্রায় চোখের পলক ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের এক-একটা পাতা পড়ে ফেলে পার্থিব। অঙ্ক করে ভীষণ তাড়াতাড়ি আর নির্ভুল। পার্থিবের অঙ্কে কোনও ভুল পাওয়া যায় না।

প্লে-স্কুলে সমবয়সি বাচ্ছাদের সঙ্গে পার্থিব বিশেষ মিশত না। ওর সমবয়সীরা যখন ছবিতে রং করা বা টিভিতে বিভিন্ন কমিক দেখত, তখন পার্থিব ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারে দাবা খেলত। ওর এই অদ্ভুত আচরণ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করত।

প্লে-স্কুলের প্রিন্সিপাল একদিন ইরাবতীকে ডেকে বললেন পার্থিবের বুদ্ধি ওর বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। ওর মতো অ্যাডভান্স বাচ্ছা খুবই বিরল। ওঁর পরামর্শেই পার্থিবের বয়স গোপন করে আইকিউ টেস্ট করানো হল। বহুল ব্যবহৃত ওয়েইজ ফোর ভারবাল আইকিউ টেস্টের ফলাফল দেখে সকলের মধ্যেই একটা আলোড়ন পড়ে গেল। অনেক কষ্টে ব্যাপারটাকে মিডিয়ার থেকে গোপন রাখা হল। কিন্তু ইরাবতী বেশ বুঝতে পারছিল সত্যটাকে বেশিদিন আড়াল করা যাবে না।

পার্থিবের আইকিউ দুশো কুড়ি। যেখানে একশো পঁয়ত্রিশের উপরে হলেই জিনিয়াস ধরা হয়। আইনস্টাইন আর স্টিফেন হকিং-এর আইকিউ ধরা হয় একশো ষাট; যে তুলনায় পার্থিবের আইকিউ এতটাই বেশি যে কেবল জিনিয়াসের তকমায় আটকে রাখা যাবে না, ও যেন তার থেকে অনেক বেশি। যেন অন্য কিছু। প্রিন্সিপাল তো স্পষ্টই বললেন পার্থিব সাধারণ মানুষ নয় ও হোমো সুপিরিয়র। ইরাবতীর ভয় করতে থাকে ভীষণ ভয়।

ক্লাস ওয়ানে পড়বার সময়েই পার্থিব অনায়াসে ক্লাস সিক্স সেভেনের অংকের সমাধান করতে শুরু করেছিল। ইরাবতী একদিন জিজ্ঞাসা করেছিল, “আচ্ছা তুই এত তাড়াতাড়ি কীভাবে অংক করিস। ওগুলো তো অনেক হায়ার ম্যাথ।”

পার্থিব বলেছিল, “মা আমি কেবল একজাম্পল ফলো করি, দুটো একজাম্পল ফলো করলেই সব বোঝা হয়ে যায়।”

পার্থিব যে কঠিন অংকের সমাধান করছে, চটপট বই পড়ে যে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে এগুলি ইরাবতী পার্থিবের অতিসক্রিয় মস্তিষ্কের কাজ বলেই মনে করতে পারত। কিন্তু একদিন ইরাবতী দেখল পার্থিব পরিমলের অনার্স লেভেলের একটা মোটা জৈবযৌগের বই মনোযোগ সহকারে পড়ছে। পাঁচ বছরের একটা বাচ্ছা ছেলেকে ফিনারের জৈবযৌগ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড পড়তে দেখে একটা অস্বস্তির শিরশিরে চোরাস্রোত টের পেল ইরাবতী। সে নিজেকে প্রশ্ন করল এই মস্তিষ্ক কি কোনও মানুষের? পার্থিব কি সত্যই মানুষ? আমাদের মতো মানুষ কি ও? পরিমলকে বলতে সেও চিন্তান্বিত হয়ে পড়ল। অস্বস্তিটাকে সঙ্গী করেই ওদের দিন কাটতে লাগল।

দেখতে দেখতে কয়েক বছর পার হয়ে গেল। পার্থিবের জন্য ভয়ংকর দুঃশ্চিন্তাকে নিত্য সঙ্গী করে ইরাবতীর দিন কাটছিল। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটেছে তখন পার্থিব দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। স্কুলের প্রিন্সিপাল একদিন দুপুরে ইরাবতীকে ফোন করে জানালেন, “আপনার ছেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে একবার স্কুলে আসুন।” ফোনটা পেয়েই ইরাবতীর বুক ধড়ফড় করে উঠেছিল। এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল ওর। কোনরকমে একটা ট্যাক্সি করে স্কুলে চলে এল। বাড়ি থেকে স্কুল মাত্র তিন কিলোমিটার রাস্তা, কিন্তু এটুকু পথও যেন কিছুতেই শেষ হতে চায় না। সে যেন এক আলোকবর্ষ দূরত্ব পার হচ্ছে।

টিচার্সরুমে যখন পৌঁছাল তখন ও রীতিমতো হাঁফাচ্ছে। ক্লাস টিচার বললেন, “টিফিনের সময়ে অন্যান্য দিনের মতো আজও সমবয়সি বন্ধুদের সঙ্গে না খেলে পার্থিব কাম্পিউটারে দাবা খেলছিল। আচমকা একটা প্রচণ্ড শব্দ শুনে ওঁরা ছুটে কম্পিউটার রুমে গিয়ে হতবাক! পার্থিব কম্পিউটার মনিটারটাকে টেবিল থেকে ছুড়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদছে। আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলোম ও এমন করছে কেন? পার্থিব বলল সে কিছুতেই কম্পিউটার চালাতে পারছে না, সেই হতাশা থেকেই এরকম আচরণ করে ফেলেছে।”

“পার্থিব কম্পিউটার চালাতে পারছে না! এ একেবারে অসম্ভব কথা! সাত-আট মাস বয়স থেকেই সে নিয়মিত কম্পিউটার, ল্যাপটপ ঘাঁটাঘাঁটি করে। ওর বাবা বলে পার্থিব ওর থেকেও ভালো কম্পিউটার জানে, সেই ছেলে কম্পিউটার চালাতে পারছে না?”

“আমরাও ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। হতে পারে কোনও কারণে ওর সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে।”

উৎকণ্ঠিত হয়ে ইরাবতী জিজ্ঞাসা করল “পার্থিব এখন কোথায়?”

ক্লাসটিচার বললেন, “কাঁদতে কাঁদতে পার্থিব অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, তবে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে মিনিট খানেকের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠে।”

ইরাবতী ক্লাসটিচারের সঙ্গে গিয়ে দেখল পার্থিব ড্রয়িংক্লাসে সমবয়সি কয়েকটা বাচ্ছার সঙ্গে বসে ছবির বইতে রং করছে। ওর আচরণ আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্ছার মতোই।

ডা. খাস্তগীর বারে বারে বলে দিয়েছিলেন পার্থিবের কোনওরকম শারীরিক অসুস্থতা হলে ওরা যেন অবশ্যই ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। পার্থিবকে আকাঙ্ক্ষা মেডিকেয়ার নার্সিংহোমে নিয়ে গেলে ডা. খাস্তগীর বললেন, “ইমিডিয়েটলি পার্থিবের নিউরোলজিকাল ডায়াগনস্টিক টেস্টিং প্রয়োজন।”

ইরাবতী আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল যে আকাঙ্ক্ষা মেডিকেয়ার নার্সিংহোমের মতো কস্টলি প্রতিষ্ঠানে কীভাবে এত কম খরচে এতসব পরীক্ষা করা হবে। ডা. খাস্তগীরকে সেকথা বলতে উনি হেসে বলেছিলেন, “পার্থিবের জন্ম ওঁর হাতে, তাই বায়োলজিকাল ফাদার না হলেও ওর সঙ্গে ওঁর একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছে।”

সিটিস্ক্যান, এমআরআই সহ আরও বেশ কয়েক রকমের জেনেটিক টেস্ট করা হল, পার্থিবের কোনওরকমের স্নায়বিক সমস্যা আছে কিনা তা জানার জন্য। রিপোর্টে দেখা গেল সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু এর পরপরই একটা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল। আইকিউ টেস্ট করে দেখা গেল ওর আইকিউ অস্বাভাবিকভাবে কমে হয়েছে মাত্র একশো পঞ্চান্ন। এখনও পার্থিবকে জিনিয়াস বলা যায় বটে কিন্তু সুপার হিউম্যান নয়। ইরাবতীর মনে আছে পার্থিবের আইকিউ টেস্ট রেজাল্ট দেখে ইরাবতী হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। জড়বুদ্ধিসম্পন্ন বাচ্ছা যেমন বাবা-মায়ের কাছে বোঝার মতো তেমনি পার্থিবের মতো সুপার হিউম্যান শিশু নিয়েও ওরা নাজেহাল হয়ে পড়েছিল।

এই ঘটনার বছরখানেকের মধ্যেই ইরাবতীর জীবনে পরপর দুঃর্ঘটনা ঘটে গেল। প্রথমে সর্বক্ষণের কাজের লোক ছায়ামাসি তারপরে পরিমল। কী করে যে কী হয়ে গেল কিছু বোঝা গেল না। ছায়ামাসির ডেঙ্গু হয়েছিল। তেমন বাড়াবাড়ি কিছু হয়নি, তাই ডাক্তার বলেছিলেন বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা সম্ভব। ইরাবতী সব ব্যবস্থা করেছিল। ওষুধের পাশাপাশি স্যালাইন দেওয়া হয়েছিল। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ছায়ামাসি সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। তার ঠিক দু-মাস বাদে একদিন সকালে ছায়ামাসিকে দেখে ইরাবতী ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল। সারা মুখে যেন হলুদ মাখানো। এমনিতেই ছায়ামাসির গায়ের রং ছিল মিশমিশে কালো তার উপর সেই হলদেটে রং! চোখদুটোও হলদে। সব মিলিয়ে বীভৎষ দেখাচ্ছিল। দেখেই ইরাবতী বুঝতে পেরেছিল ছায়ামাসি ভয়ানক জন্ডিসে আক্রান্ত। ডাক্তার দেখানো হল। ডাক্তার নানারকমের টেস্ট করতে দিল। রিপোর্টগুলো দেখে গম্ভীরমুখে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, “যা ভেবেছি তাই পেশেন্ট লিভার ক্যানসারে ভুগছে। ফোর্থ স্টেজ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিন।” কথাটা শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে বসেছিল ইরাবতী। একটা গভীর বেদনাবোধ কেঁচোর মাটি তোলার মতো ইরাবতীর বুকটাকে ভুসভুসে করে দেয়। চোখ ফেটে জল আসে। ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠেছিল ইচ্ছার বিরুদ্ধে। ছায়ামাসি এরপর আর পনেরো দিনও বাঁচেনি। সরকারি হাসপাতালের অঙ্কোলজিস্ট বলেছিলেন ওঁর যে লিভার ক্যানসার হয়েছিল সেটা অত্যন্ত বিরল ধরনের। সচরাচর এই রোগ কারুর দেখা যায় না।

পার্থিবের স্নায়বিক ব্রেকডাউন আর তার ফলে ওর আইকিউ অনেকটা কমে যাওয়ায় ইরাবতী অনেকটা স্বস্তি পেয়েছিল। সে একটা স্বাভাবিক বাচ্ছার মা হতে চেয়েছিল, কোনও সুপারম্যানের মা হয়। কিন্তু ইরাবতীর এই মানসিক স্বস্তি বেশিদিন থাকল না। একদিন আচমকা পার্থিবের ঘরে ঢুকে সে দেখল পার্থিব পরিমলের ল্যাপটপটা নিয়ে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে চোখ পড়তে আশঙ্কার একটা শিরশিরে স্রোতে ওর শরীর কেঁপে উঠল। স্ক্রিনজুড়ে মানব জিনের ডিএনএর বিন্যাস। এ-টি-জি-সি। এডেনিন-থায়ামিন-গুয়ানিন-সাইটোসিন। ওর দিকে পিছন ফিরে বসে পার্থিব দ্রুতহাতে কিবোর্ড টিপে সেই বিন্যাসগুলির কিছু কিছু পরিবর্তন করছে। ওকে কিছু না বলে ইরাবতী ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। দশ বছরের বাচ্ছার পক্ষে মানবজিনের সিকোয়েন্স দেখা মোটেই স্বাভাবিক নয়। কথাটা ভাবতেই প্রচণ্ড ভয় করতে লাগল ইরাবতীর। পার্থিবের আইকিউ টেস্টের রিপোর্ট কী সঠিক? নাকি ও ইচ্ছা করেই যাতে ওর আইকিউ কম দেখায় সেভাবে উত্তর দিয়েছে। সে কি ইচ্ছা করেই নিজেকে প্রচারের আলোর বাইরে রাখতে চায়! সমস্ত ভাবনাচিন্তা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল ইরাবতীর।

সেসময়েই ইরাবতী জানতে পারল পার্থিব বেশির ভাগ দিনই স্কুলে যায় না। খবরটা পেয়ে অবধি সে একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে সে তবে যায় কোথায়? ওর তো কোন বন্ধুবান্ধবও নেই। একটা অজানা আশঙ্কায় মায়ের মন কেবলই কু ডাকতে লাগল। পরিমলের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে ও আলোচনা করল। পরিমল ওকে বোঝাল ব্যাপারটা নিয়ে ইরাবতী যেন পার্থিবকে কোনওরকম বকাঝকা না করে। তাহলে ব্যাপারটা আরও বিগড়ে যেতে পারে। বরং পরিমল গোপনে খবর নেবে স্কুলে না গিয়ে সে কোথায় যায়।

সোফাতে বসে ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে ডা. রাহুল খাস্তগীর মনোযোগ দিয়ে ইরাবতীর গতিবিধি দেখছিলেন। কত বয়স হবে এখন ওর? ভাবলেন রাহুল। ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ। দেখে মনে হয় না। নিটোল হাত-পা আর অদ্ভুত বাঁধুনি শরীরের। কে বলবে যে একটা বছর দশেকের ছেলের মা। লম্বা ছিপছিপে শরীর। পেটে এতটুকু মেদ নেই অথচ বুকদুটো উন্নত। এত বয়সেও যে কি করে একরকম থাকে ওর চাঁপারঙা মোমপালিশ করা ত্বক। লাবণ্যমাখা মুখটাকে আজ বিষন্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু ঘন কালো চোখের তারা দুটো আকাশের তারাদের মতোই ঝিকমিক করছে। সারাক্ষণ এত ঔজ্জ্বল্যতা সে পায় কোথা থেকে। খাস্তগীরের ইচ্ছা হয় ইরাবতীর দু-গালের গভীর টোলদুটো সুখে সমৃদ্ধিতে ভরিয়ে দিতে।

“আপনার স্বামীর মৃত্যুটা খুবই দুঃখজনক।”

“সবই আমার কপাল।” ক্লান্তি আর বিষন্নতা ছুয়ে গেল ইরাবতীর মুখে।

“এমনিতেই ফুসফুসের ক্যানসার সবচাইতে ভয়ংকর, তার উপরে আপনার স্বামীর যে ধরনের ক্যানসার হয়েছিল সেটা খুবই বিরল। আর রোগটা ধরাও পড়েছিল একেবারে ফোর্থ স্টেজে। কিছু করার ছিল না।”

“আপনি একটু বসুন আমি আপনার জন্য চা করে নিয়ে আসি।” প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য ইরাবতী বলল। ও আর স্মৃতি খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায় না। সোফার সামনে দিয়ে ইরাবতী এগিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে। ওর আঁচলের ছোঁয়া লাগে ডা. খাস্তগীরের হাঁটুতে। ওঁর নাকে আসে সুন্দরী বিধবার দেহনিঃসৃত কস্তুরীর উত্তেজক ঘ্রাণ। অনায়াস আর সহজলভ্য নারী শরীরের স্বাদু গন্ধ।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খাস্তগীর বললেন, “আমার মনে হয় পার্থিবের একবার নিউরোলজিকাল ডায়াগনস্টিক টেস্টের প্রয়োজন।”

“হঠাৎ করে এরকম মনে হল কেন? পার্থিবের তো কোনওরকম কোনও অসুস্থতা নেই।” উত্তেজনায় ইরাবতী প্রায় তোতলাচ্ছিল। “আগেরবার তো নিউরোলজিকাল টেস্ট করে কিছু পাওয়া যায়নি।”

দৃঢ় গলায় ডা. খাস্তগীর বললেন, “পার্থিবের স্নায়বিক সিস্টেমের স্বাস্থ্য ঠিক আছে কিনা জানার জন্যই পরীক্ষা জরুরি।”

“ডাক্তারবাবু আপনি আমাকে কিছু লোকাচ্ছেন।” ইরাবতী সরাসরি ডা. খাস্তগীরের চোখে চোখ রেখে বলল। “সবকিছু খুলে না বললে আমি কখনওই পার্থিবের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারব না।”

ইরাবতীর চোখে খাস্তগীরের দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল। উনি রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছেন। মনে হচ্ছে আপনাকে সবকিছু জানানো দরকার। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করব তাই ভাবছি।” গলাটা খাদে নামিয়ে এনে প্রায় ফিসফিস করে বললেন “পার্থিব হল ডিজাইনার বেবি।”

“ডিজাইনার বেবি?”

“হ্যা! শুক্রানু আর ডিম্বাণুর ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের পর নিষিক্ত ডিম্বাণুটি জাইগোটে পরিণত হয়। আপনার শরীরে সেই নিষিক্ত ডিম্বাণুটিকে ইমপ্ল্যান্ট করানোর আগে সিআরআইএসপিআর-সিএএস৯ কৌশলে জিন এডিট করি। মানব দেহকোষে ত্রিশ থেকে যাট হাজার জিন থাকলেও কেবলমাত্র বিশেষভাবে নির্দিষ্ট কিছু জিন থেকেই নিউরোন বা স্নায়ুকোষ তৈরি হয়। স্নায়ুকোষের গুণগত এবং পরিমাণগত মানের উপরেই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি নির্ভর করে। জিন এডিট করে স্নায়ুকোষ সৃষ্টিকারী জিনগুলিকে আরও নিঁখুত আর কার্যক্ষম করে তোলা হয়েছে। এর ফলে শিশুর মস্তিস্ক সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। বাচ্চা হবে অসাধারণ বুদ্ধিমান। পার্থিব হয়েছেও ঠিক তাই।” আবেগে খাস্তগীরের গলা যেন একটু কেঁপে গেল।

কান্নাভেজা বিকৃতস্বরে ইরাবতী বলল “আমি বা পরিমল কি আপনাকে ডিজাইনার বেবি তৈরি করতে বলেছিলাম? আপনি জানতেন না, জিন থেরাপির মাধ্যমে ডিজাইনার বেবি তৈরি করার পদ্ধতি পুরোপুরি আইনবিরুদ্ধ।”

আমতা আমতা করে খাস্তগীর বললেন, “মানছি আপনাদের আগে জানানো উচিত ছিল। কিন্তু এই ইউজেনিক্স পদ্ধতিতে পছন্দমতো শিশু তৈরি করার ব্যাপারটা একেবারে অচিন্ত্যনীয় নয়। সম্প্রতি চিনা অধ্যাপক জিয়ানকুই এভাবে যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। আমি কিন্তু তার অনেক আগেই এ-ব্যাপারে সফলতা পেয়েছি।” একটু থেমে খাস্তগীর আবার বলতে শুরু করলেন “আর ওই যে জিন এডিটিং এর সিআরআইএসপিআর-সিএএস৯ কৌশলের কথা বললাম না, ক্লাস্টার্ড রেগুলারলি ইন্টারস্পার্সড শর্ট প্যালিনড্রোমিক রিপিট্‌স ডিএনএ আর তার সহযোগী প্রোটিনে সাহায্যে জিনের পরিবর্তন করার কৌশল। অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এটি আবিষ্কার করেছেন। যেজন্য দুজনকে রসায়নে নোবেল পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভাবুন তো কৌশলটা আমি কত বছর আগেই ব্যবহার করেছি।” ডা. খাস্তগীরের গলায় গর্বের সুর।

গলার কাছে আটকে থাকা কান্নার ডেলাটাকে কোনওমতে সামলে ইরাবতী বলল, “আপনার কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম পার্থিব স্বাভাবিক বাচ্ছা নয়। গিনিপিগের মতো আপনি ওর উপরে নিষ্ঠুর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালিয়েছেন। ওকে সারা জীবন তার খেসারত দিতে হবে। কিন্তু আপনি বোধহয় এখনও সবকিছু আমাকে খুলে বলেননি, অনেক কিছু গোপন করছেন।”

কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন খাস্তগীর। একটু সময় নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিলেন তারপর ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করলেন “আপনাদের শুক্রানু-ডিম্বাণু থেকে অনেকগুলি জাইগোট তৈরি হয়েছিল। সবগুলোতেই আমি জিন থেরাপি করেছিলাম। পরে সেগুলিকে ইমপ্ল্যান্ট করি।

“ওহ! হা ঈশ্বর! আপনি এতটা..” কথা শেষ করতে পারল না ইরাবতী। সে যেন আচমকা ইলেকট্রিকের শক খেল। ওর মুখের রেখাগুলো ভেঙে চুরে গিয়ে একরাশ অন্ধকার ঘনিয়ে এল।

“দেখুন ম্যাডাম আপনি যদি একজন বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিভঙ্গীতে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেন তাহলে কাজটাকে ততটা খারাপ বলে মনে হবে না। পরীক্ষা যদি সফল হয় তবে নিঃসন্তান দম্পতিরা তাদের পছন্দমতো বাচ্চা পেতে পারবে, যে বাচ্ছারা হবে জিনগতভাবে অনেক নিঁখুত। নিঁখুত জেনেটিক হিসাব মিলিয়ে তৈরি হবে সেসব মানুষ, সমস্ত উৎকৃষ্ট গুণকে বাড়িয়ে তোলা মানুষ। যাদের চিন্তাভাবনা, শিক্ষায় কোনওরকমের দুর্বলতা থাকবে না।”

“আপনি নিজের অপরাধের সাফাই গাইছেন! আপনাকে পুলিশে দেওয়া উচিত।” জোরে চেঁচিয়ে উঠল ইরাবতী, রাগে ওর ফর্সামুখ লাল হয়ে উঠেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আসল ব্যাপারটা থেকে কথায় কথায় দূরে চলে যাচ্ছি। আপনি সেই জেনেটিক্যালি মডিফায়েড জাইগোটগুলিকে নিয়ে আবার ইমপ্ল্যান্ট করেছেন?”

“সেই জাইগোটগুলিকে চার বছর ধরে সংরক্ষিত করেছিলাম। পার্থিবের ক্ষেত্রে পরীক্ষাটা সফল হওয়ায় সেই জেনেটিক্যালি মডিফায়েড জাইগোটগুলিকে আরও তিনজন নিঃসন্তান মায়ের গর্ভে স্থাপন করি। তিনটি ক্ষেত্রেই তিনটি সুস্থ সবল ছেলে জন্মায়। ভেবেছিলাম ডিজাইনার বেবি তৈরির পরীক্ষা পুরোপুরি সফল। কিন্তু ভুল ভেবেছিলাম, ঋক আর সাকিল গতকাল মারা গেছে আজ মারা গেল কুনাল।”

কথাটা শোনামাত্র্র ইরাবতী বারদুয়েক থরথর করে কেঁপে উঠল, বিড়বিড় করে বলল “সাক্ষাৎ শয়তান!” তারপর একদৃষ্টে দেওয়ালে ঝোলানো ঠাকুরের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে আছে তো আছেই, কথা বলছে না। একটা স্তব্ধ পাথুরে ভঙ্গী। বেশ কিছুক্ষণ পরে সে চোখ তুলে সোজাসুজি তাকাল ডা. খাস্তগীরের দিকে। অসম্ভব কাতর, করুণ বিষণ্ণ মুখ। হতাশা, অসহায়তা, ক্লান্তি সব মিলেমিশে যাওয়া একটা দৃষ্টি। কান্নাভেজা বিকৃত গলায় বলল তার মানে সেই তিনটে ছেলের বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতা হলাম পরিমল আর আমি। কান্নায় বুজে আসে ওর গলা। গলার কাছে আটকে যাওয়া কান্নার দলাটাকে কোনওরকমে নিয়ন্ত্রণ করে সে বলে, “ছেলে তিনজন মারা গেল কীভাবে?”

“তিনজনেই সেরিব্রাল এডিমায় মারা গেল,” হতাশ ভঙ্গীতে বললেন খাস্তগীর। ইরাবতীর কৌতুহলী মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাখা করতে শুরু করলেন। “ওদের মস্তিষ্ক ভীষণভাবে ফুলে যায়। করোটির ভিতরে থাকার জন্য মস্তিষ্ক যখনই ফুলে উঠে তখন খুলির উপরে চাপ বাড়তে থাকে যাকে বলা যায় ইন্ট্রাক্রানিয়াল প্রেসার বা আইসিপি। এই বর্ধিত আইসিপি মস্তিষ্কের ভিতরের রক্তপ্রবাহ হ্রাস করে ফলে মস্তিষ্কের ভিতরে অক্সিজেন সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। অক্সিজেনের অভাবে ধীরে ধীরে ব্রেন ডেথ হয়ে পেসেন্ট মারা যায়।”

হঠাৎ করে তিনজনেরই একসঙ্গে সেরিব্রাল এডিমা হবার কারণ কিছু বোঝা গেল? কথা বলতে গিয়ে ইরাবতীর গলাটা কেঁপে গেল।

আমতা আমতা করে জড়িয়ে জড়িয়ে ডা. খাস্তগীর যা বললেন তা থেকে বোঝা গেল, মাথা ধরা, বমিবমি ভাব দিয়ে তাদের অসুস্থতার সূত্রপাত হয়েছিল। নার্সিংহোমে যখন তাদের আনা হয় তখন তাদের কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছিল। সারা শরীরে খিঁচুনি। মস্তিষ্ক এত দ্রুতহারে ফুলছিল যে অপারেশন করেও কোনও সুরাহা করা গেল না।

প্রথম আঘাতে মানুষ বিমূঢ় হয়ে যায়। তারপর আসে দিগ্বিদিকশূন্য অন্ধ ক্রোধ। এত মানুষ থাকতে ওর সঙ্গেই কেন এমন হল? এই প্রশ্ন কুরে কুরে খায় মানুষকে। শেষে আসে নির্জীব অসাড়তা। খাস্তগীরের কথা শুনতে শুনতে ইরাবতীর সমস্ত অনুভূতিগুলি অসাড় হয়ে গিয়েছিল। নির্লিপ্তভাবে সে বলল,“তিনজনেরই একসঙ্গে সেরিব্রাল এডিমা হবার কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?”

ইরাবতীর গলা শুনে একটু থমকে গিয়েছিলেন ডা. খাস্তগীর, নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, সাধারণত ভাইরাস সংক্রমন বা বিষাক্ত কোনও প্রাণী বিশেষ করে সামুদ্রিক প্রাণীর কামড়ে হতে পারে। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই এত দ্রুতহারে মস্তিষ্ক বাড়ে বলে জানা নেই।

“তাহলে কী জাইগোটের জিন থেরাপি এজন্য দায়ী বলে আপনার ধারণা আর সেটা মনে হয়েছে বলেই আজ আপনি ছুটে এসেছেন পার্থিবের নিউরোলজিকাল ডায়াগনস্টিক টেস্ট করাবার জন্য?”

উত্তর না দিয়ে থম মেরে বসে থাকেন ডা. খাস্তগীর।

পরিমলের কথাটা মনে হলেই ইরাবতীর মনটা হাহাকার করে উঠে। আচমকা পরিমলের মারাত্মক ফুডপয়েজনিং হয়েছিল। সকলেই একই খাবার খেল কিন্তু কী আশ্চর্য কেবলমাত্র ওরই বিষক্রিয়া হল। বাড়িতেই স্যালাইন দিয়ে ডাক্তারবাবু দু-দিন চিকিৎসা করলেন। তার পরপরই অফিসের কাজে পরিমল কুচবিহার চলে গেল। দিনকুড়ি কুচবিহারে কাটিয়ে পরিমল যখন ফিরল ওকে দেখে ইরাবতী চমকে উঠেছিল। পরিমলকে একেবারে মড়ার মতো দেখাচ্ছিল। চোখদুটো মরা মাছের মতো। উদ্বিগ্ন ইরাবতী জিজ্ঞাসা করেছিল “তোমার কী হয়েছে?”

ম্লান হেসে ও বলেছিল “বুকের মধ্যে সবসময় একটা দপদপে যন্ত্রণা। কঠোর নাছোড়বান্দা ব্যথা।” পরিমলের সমস্ত সত্ত্বা দুমড়ে মুচড়ে ঠিকরে আসে কান্না। কী জানি কেন একটা তমসাঘন বিষণ্ণতা পূর্ণগ্রাস গ্রহণের মতো ইরাবতীর মনকে ছেয়ে ফেলেছিল।

তড়িঘড়ি ডাক্তার দেখান হল। ডাক্তারবাবু খানিকক্ষণ চেকআপ করে গম্ভীর মুখে খসখস করে একগাদা টেস্ট লিখে দিয়েছিলেন। “কেমন দেখলেন?” সাহস করে এই প্রশ্নটাও ডাক্তারবাবুকে করতে পারল না ইরাবতী। সপ্তাহখানেক পরে টেস্টের রিপোর্টগুলো নিয়ে আবার ওরা ডাক্তারের চেম্বারে উপস্থিত হয়েছিল। গম্ভীরমুখে রিপোর্টগুলো দেখে, ইরাবতীকে আলাদা ডেকে নিয়ে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, “যা ভেবেছি তাই, পরিমলবাবুর ফুসফুসে ক্যানসার বাসা বেঁধেছে।”

ডাক্তারবাবু যখন বলেন “ক্যানসার হয়েছে” সামনে বসে থাকা ব্যক্তির কীরকম অবস্থা হয়! “ক্যানসার হয়েছে” কথাটা শুনলেই বিনা দোষে মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার মতো একটা অনুভূতি মনে আসে। ছায়ামাসির কথা মনে আসে ইরাবতীর। ওর চোখ ফেটে জল আসে, কোনওমতে নিজেকে সামলায়। পরিমলকে একদম বুঝতে দেওয়া যাবে না। তাহলে ও আরও ভেঙে পড়বে।

মাসখানেকের মধ্যে পরিমলের অবস্থা আরও খারাপ হল। ওর ঘুম কমে গেল। ডাক্তার অল্প অল্প আফিম খেতে দিতেন কিন্তু তাতেও বিশেষ আরাম হত না। প্রথম প্রথম অর্ধ জাগরিত অবস্থায় ভোঁতা ব্যথাটায় একটু আরাম হত বটে কিন্তু শীগগিরই একটা অনাবৃত যন্ত্রণা গোটা বুকটাতে চারিয়ে যেত। জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন মানুষের কিছুই করার থাকে না। তখন অসহায় হয়ে বসতে হয় দর্শকাসনে আর সামনে যা করার তা করে যায় নিয়তি। পরিমল নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে দ্রুতবেগে ধেয়ে চলেছিল।

সারারাত না ঘুমিয়ে বিছানায় ছটফট করত পরিমল। বুকের অসহ্য ব্যথাটার কোনও বিরাম নেই। অসহায়ভাবে সারাদিন বিছানায় শুয়ে সিলিংএর দিকে তাকিয়ে বীভৎষ যন্ত্রণা ভোগ করে চলত সে। ইরাবতী কাঁদত নিজের ভয়াবহ অসহায়তা আর ভগবানের নিষ্ঠুরতার জন্য। এই সময়টাতে ইরাবতী যত পার্থিবকে দেখত ততই ওর মন খারাপ করত। ওর হাবভাবে কেমন একটা নির্বিকার উদাসিনতা ফুটে উঠত। বাবা ভয়ানক যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে, অথচ পার্থিব ছিল পুরোপুরি উদাসীন। পার্থিবের বড় বড় চোখদুটো বুদ্ধির আলোয় সর্বদা ঝকমক করলেও সেখানে এতটুকু দুঃখবোধ ছিল না। পুত্রের অনুভূতিহীনতা ইরাবতীকে ভিতরে ভিতরে ভীষণ যন্ত্রণা দিত। কিন্তু ও মুখে কিছু বলত না।

রোগ যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতেই পরিমল একদিন ইরাবতীকে বলেছিল পার্থিবকে সে বেশ কিছুদিন ফলো করেছে। স্কুলে না গিয়ে পার্থিব প্রায়ই নদীর ধারে যে বিরাট পোড়ো রাজবাড়ি আছে সেখানে যায়। রাজবাড়িটাতে বহুকাল কোনও মানুষজন বাস করে না সাপখোপের আড্ডা। ইরাবতী যেন সেখানে যেতে পার্থিবকে বারণ করে।

প্রায় রাত্রেই ঘুম ভাঙলে ইরাবতী দেখত পরিমল জেগে বিছানায় বসে আছে। গলার কাছে আটকে থাকা কান্নার দলাটা অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করে ইরাবতী ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকত। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর একটা ভেঙেপড়া মানুষের মতোই পরিমল আবার বিছানাতে শুয়ে পড়ত। ইরাবতী বুঝতে দিত না সে জেগে ছিল। একদিন ধরা পড়ে গেল। পরিমল বলল তুমি জেগে আছ?’

ইরাবতী বলল “তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে? নাগো!”

“একটা ভোঁতা যন্ত্রণা সারাক্ষণ বুকের মধ্যে। অসহ্য কষ্ট। আমি আর বাঁচব না।”

চোখ ফেঁটে জল আসতে চায় ইরাবতীর। কথা বললেই ধরা পড়ে যাবে তাই সে চুপ করে থাকে। পরিমল গুঙিয়ে উঠে বলল তুমি পার্থিবকে দেখো। ওতো আমারই এক্সটেনশন।

দু-মাস পার হবার আগেই পরিমলের কঙ্কালসার শরীরটা ভয়ংকর যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পেল।

পার্থিবের নিউরোলজিকাল ডায়াগনস্টিক টেস্টএর দ্বিতীয়বারের রিপোর্টও দেখা গেল স্বাভাবিক। কিন্তু পার্থিবের আচরণ দিনে দিনে ইরাবতীতে ভাবিয়ে তুলেছিল। ছেলের অজান্তে স্কুলে খবর নিল ইরাবতী। পার্থিব স্কুলের সমস্ত টার্মিনাল পরীক্ষাই দিয়েছে এবং প্রতিটাতেই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে। ওর পড়াশুনার ব্যাপারে স্কুলের কোনও কমপ্লেন নেই। তাই ওরা ইরাবতীকে এখনও কিছু জানায়নি। কিন্তু পার্থিব স্কুলে ভীষণ অনিয়মিত। আগে যাও-সবা আসত আজকাল প্রায় আসেই না।

বাধ্য হয়ে একদিন খোলাখুলি ছেলের সঙ্গে কথা বলল ইরাবতী। স্পষ্ট ওকে জিজ্ঞাসা করল, “তুই বেশ কিছুদিন যাবৎ স্কুলে যাস না কেন?” পার্থিব ওকে সাফ জানিয়ে দিল স্কুলে গিয়ে ওইসব মামুলি বিষয়ে পড়াশুনা করতে ওর মোটেই ভালো লাগে না। স্কুলে যাওয়াটাই ওর কাছে নিছক সময় নষ্ট বলে মনে হয়।

“তাহলে তুই কী করতে চাস?” রাগত গলা ইরাবতীর।

শান্ত গলায় পার্থিব বলল, “এখনও ঠিক করিনি। আর কয়দিন অপেক্ষা কর জানতে পারবে।” ইরাবতী আপন মনে গজগজ করতে লাগল, কিন্তু পার্থিব একটা কথারও কোন উত্তর দিল না।

ডা. খাস্তগীর আজকাল মাঝেমা ঝেই পার্থিবের খোজখবর করতে ইরাবতীর বাড়িতে আসেন। ইরাবতী বুঝতে পারে পার্থিব নয় খাস্তগীর আসেন ওর কাছেই। নারীসুলভ সহজাত ক্ষমতায় ইরাবতী বুঝতে পারে খাস্তগীর কী চায়। একদিন কথায় কথায় খাস্তগীর বললেন, “ডিজাইনার বেবি হিসাবে পার্থিবকে তৈরি করা অপরাধ হয়েছে তা স্বীকার করি কিন্তু মাত্র দশবছর বয়সেই ওর কাজের সাফল্যের জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।”

ভ্রুতে জিজ্ঞাসার চিহ্ন ফুটিয়ে তুলে ওঁর দিকে তাকাল ইরাবতী। ওর চোখে সেই দৃষ্টি যাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা নেই কোনও রূপমুগ্ধ পুরষের।

খাস্তগীর ততক্ষণে বুঝে গেছেন উনি মুখ ফসকে বেফাঁস কথা বলে ফেলেছেন। রিফু করার জন্য তিনি হালকা চালে বললেন “পার্থিব মাঝে মধ্যে আকাঙ্ক্ষা মেডিকেয়ারে গিয়ে সেখানের ল্যাবরেটরিতে কাজ করে।”

“কী করে? ডিজাইনার বেবি তৈরির কাজ!” ইরাবতীর গলার শ্লেষ কান এড়ায় না খাস্তগীরের।

সেটা গায়ে না মেখে তিনি বলেন, “না ও কাজ আমি ছেড়ে দিয়েছি। পার্থিব মূলত বিভিন্ন প্যাথোলজিক্যাল পরীক্ষায় সাহায্য করে।”

ইরাবতী বুঝতে পারেন খাস্তগীর সত্যি কথা বলছেন না। কিছু একটা বলতে গিয়ে তারপর সেটা লুকাতে চেষ্টা করছেন। সোজাসুজি খাস্তগীরের চোখের দিকে তাকিয়ে আচমকা সে বলল আপনি কি জানেন স্কুলে না গিয়ে পার্থিব নদীর ধারের পোড়ো রাজবাড়িতে প্রায়ই যায়। কথাটা শোনা মাত্র ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধীর মতো খাস্তগীরের মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। কোনক্রমে সামলে নিয়ে বললেন “তাই নাকি, আপনি জানলেন কীভাবে?”

“আমি জানব না? আমি তো ওর মা।”

ইরাবতী একবার ভেবেছিল পুলিশকে সব জানাবে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখল সে পুলিশকে কী বলবে? বলবে ওর দশ বছরের ছেলে স্কুল পালিয়ে নদীর ধারের পোড়ো রাজবাড়িতে যায়। আর কী বলবে? পার্থিবের বয়স দশ হলে কী হবে ওর বুদ্ধি আইনস্টাইনের থেকে অনেক বেশি? নাকি ডা. খাস্তগীরের বেআইনি জিন থেরাপির কথা ফাঁস করে দেবে? কোনওকিছুই পুলিশের কাছে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে না, মাঝখান থেকে ওকে নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া চলবে, কিছুদিন লোক হাসাহাসি হবে।

নদীর ধারে অনেকটা জায়গা জুড়ে বিশাল রাজবাড়ি। এককালে এঁরা এই অঞ্চলের রাজা ছিলেন। কালে কালে সেই রাজত্ব গেছে। এখন পড়ে আছে ইটপাথরের এক বিরাট খণ্ডহর। নদীর ধারের দিকের পাঁচিল ভেঙে গেলেও রাস্তার দিকে প্রায় মানুষ সমান উঁচু পাঁচিলটা এখনও অটুট থাকায় রাস্তা থেকে ভিতরটা দেখা য়ায় না। ভিতরে ঘন জঙ্গল। মরচে ধরা বিরাট লোহার গেটটা একপাশে কাত হয়ে ঝুলছে। ভিতরে ঢুকতে গিয়ে একবার থমকে দাঁড়াল ইরাবতী। লোকে বলে এটা নাকি ভূতের বাড়ি। রাতবিরেতে অনেকে জঙ্গলের ভিতরে আলো জ্বলতে দেখেছে। মাঝে মধ্যে অদ্ভুত রকমের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। ভূতে ইরাবতীর বিশ্বাস না থাকলেও শহরের প্রান্তে নদীর ধারে এই রকমের পোড়ো বাড়ি সমাজবিরোধীদের আস্তানা হতে পারে। জঙ্গলের মধ্যে বিষাক্ত সাপ বা পোকামাকড়ও থাকতে পারে।

ইরাবতী মন শক্ত করে, এটা ওর একমাত্র ছেলে পার্থিবের জীবন মরণের প্রশ্ন। পরিমল অকালে চলে যাবার পর পার্থিবই ওর জীবনের একমাত্র সম্বল। বুনোলতা, ঝোপঝাড় আর কাঁটাগাছ বাঁচিয়ে এক পা এক পা করে মূল ধ্বংসাবশেষটার দিকে এগোতে লাগল ইরাবতী। প্রায় দু-তলা সমান উঁচু একসারি থামের উপরে দোতলার ঝুল বারান্দা। কয়েকটা থাম ভেঙে গিয়ে উপরের বারান্দাটা বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে, যে কোনও সময়ে ভেঙে পড়তে পারে। বাড়িটার দরজা জানলার পাল্লা সব লোপাট। স্যাঁতাপড়া প্লাস্টার খসে যাওয়া দেওয়ালের মধ্যে জানলার কালো কালো ফাঁকা জায়গাগুলো কঙ্কালের চোখের শূন্য কোঠরের মতো হাঁ হাঁ করছে। দোতলার দেওয়াল বেয়ে বেড়ে উঠেছে অশ্বথ গাছের চারা। লম্বা শিকড় অবিন্যস্ত চুলের মতো দেওয়াল বেয়ে নেমে এসেছে মাটি পর্যন্ত।

বারান্দা পার হয়ে পাল্লাহীন বড় দরজারটার সামনে দাড়িয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল ইরাবতী। ভিতরে পা বাড়াতে যাবে দেখল সামনে পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে একটা হনুমান। চুপিসাড়ে কখন আরও কয়েকটা হনুমান ওর চারপাশে এসে দাড়িয়েছে টের পায়নি। একটা অদ্ভুত জান্তব স্বর ওদের গলায়। চাপা গর্জনের মতো। আশ্চর্য হনুমানগুলো দু-পায়ে সটান দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটু সামনে ঝুঁকে আছে বটে কিন্তু হনুমানদের কখনও এভাবে মানুষের মতো দু-পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি ইরাবতী। দু-পাশে ঝোলা হাতদুটো হাঁটু ছাড়িয়ে আরও নীচে নেমেছে। আশ্চর্য সব কটাই পুরুষ হনুমান। এতগুলো পুরুষ হনুমান কি কখনও একটা দলে থাকে!

সামনের হনুমানটার চোখে চোখ পড়তেই ইরাবতীর সারা শরীরে একটা আতঙ্কের শিহরণ খেলে গেল। সবুজ চোখের মণিদুটো ইরাবতীকে যেন একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলল। হনুমানটা ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ইরাবতী পিছাতে গেল কিন্তু পিছবে কোথায়? পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা হনুমান। যেটুকু মনোবল তখনও ছিল সেটুকুও ঢিল খাওয়া কাকতাড়ুয়ার মতো ‍মুখ থুবড়ে পড়ল। প্রচন্ড একটা আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠল ইরাবতী। সামনের হনুমানটা ওর আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। ওটার গলা দিয়ে বেরচ্ছে ঘড়ঘড়ে জান্তব স্বর। ইরাবতীর শিরদাঁড়াটা যেন আর সোজা থাকতে পারছে না। অসহায়ভাবে চারদিকে তাকাল সে। না, কোথাও কোনও মানুষজন নেই। চেঁচিয়ে কাউকে ডাকবে সে উপায় নেই। গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বের হচ্ছে না। হনুমানটা ইরাবতীর গায়ের প্রায় উপরে এসে পড়ছে। ইরাবতী টের পাচ্ছে ওটার গরম নিশ্বাস।

দুটো লোমশ হাত ইরাবতীর দুই কাঁধে চেপে বসল। আঙুলের টানে ইরাবতীর কুর্তার খানিকটা ফালাফালা হয়ে ছিড়ে ঝুলে পড়ল। চোখবন্ধ হয়ে গিয়েছিল ওর। স্তনের উপরে কর্কস কঠিন পেষণের তীব্র যন্ত্রণায় ইরাবতীর সারা শরীর কেঁপে উঠল। চোখের সামনে নেমে এল ঘন অন্ধকার।

চোখ খুলে ইরাবতী দেখল পার্থিব উদ্বিগ্ন মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে যেতে পার্থিব বাধা দিয়ে বলল আর একটু শুয়ে বিশ্রাম নাও। প্রচণ্ড আতঙ্কে তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে। পার্থিবকে দেখে ইরাবতীর মনের জোর ফিরে এসেছিল। ধীরে ধীরে বিছানার উপরে উঠে বসল। ছোটঘর, প্লাস্টারহীন ইটের দেওয়াল। একপাশে একটা চৌকির উপরে পাতলা বিছানা পাতা। ইরাবতী সেখানেই শুয়ে ছিল। ওপাশে একটা চেয়ার টেবিল। টেবিলের উপরে কম্পিউটার। এরকম একটা ঘরে কম্পিউটার নেহাতই বেমানান।

পার্থিব বলল, “তুমি একা একা পোড়ো রাজবাড়িতে ঢুকেছিলে কেন?”

ইরাবতী বলল “তুই আমাকে খুঁজে পেলি কী করে?”

“জঙ্গলের ভিতরে একদল হনুমান তোমাকে ঘিরে ধরেছিল, ভয়ে তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে।”

“তার মানে স্কুল কামাই করে তুই পোড়ো রাজবাড়ির ভিতরে আসিস।”

“তুমি এখন কোথায় আছো জান? পোড়ো রাজবাড়ির ভিতরে এক গোপন কুঠুরিতে। এই চোরাকুঠুরিগুলো রাজারা ব্যবহার করতেন অবাধ্য প্রজাদের বন্দী করে রাখতে। আর এখানেই আমি বানিয়েছি আমার ল্যাবরেটরি। এটা আমার সম্রাজ্য। আমি এখানকার রাজা।”

ইরাবতী অবাক হয়ে পার্থিবকে দেখছিল। তার ছেলে পার্থিব। ঔধ্বত্ব আর অহংকার চোখমুখ থেকে যেন ঠিকরে বেরচ্ছে । ধৈর্য রাখতে না পেরে সে ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল। “তোর ল্যাবরেটরিতে তুই কীসের গবেষণা করিস?”

“জিন এডিটিং, বেশ কয়েকটা কাজ করে আমি সাফল্য পেয়েছি।”

“জিন এডিটিং?”

“ডা. খাস্তগীরের আকাঙ্ক্ষা মেডিকেয়ার সেন্টারের একটা শাখা বলতে পার এটাকে। লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনভাবে গবেষণা করার জন্য উনি এটাকে ব্যবহার করেন। তবে ওঁর অজান্তে আমি নিজেও এখানে অনেক বিষয়ে কাজ করেছি।”

তেরিয়া মেজাজে ইরাবতী বলল, “তোর গবেষণার কোনও প্রমাণ দেখাতে পারিস?”

“কেন? হনুমানগুলোকে দেখনি?”

“হনুমান!”

“হ্যাঁ, তোমাকে যারা ঘিরে ধরেছিল তারা সবাই জেনেটিক্যালি ডিজাইনড হনুমান। ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন পদ্ধতিতে ওদের জন্ম হয়েছে। সিআরআইএসপিআর-সিএএস৯ পদ্ধতি কি জান তো? এই জিন এডিটিং পদ্ধতিকে বলা যায় একরকমের আণবিক কাঁচি যা দিয়ে দেহকোষের কোনও একটি ডিএনএ কেটে বাদ দেওয়া যায়, বা তাতে যে কোনও ধরনের পরিবর্তন করা যায়। আইভিএফ পদ্ধতিতে নিষিক্ত হনুমানের জাইগোটগুলির ক্রোমোজোম সেই কৌশলে এডিট করে মানব জিনের কিছু অংশ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শারীরিকভাবে ওদের দেখতে হনুমানের মতো হলেও বুদ্ধিবৃত্তি মানুষের সমান। ওরা আমার রাজত্বের বিশ্বস্ত পাহারাদার সৈনিক।”

ইরাবতী এতটাই বিস্মিত হয়েছিল যে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। বুকের উপরে ঝুঁকে পড়া হনুমানের লালসাভরা বীভৎষ মুখটা ওর সমস্ত চেতনাকে আতঙ্কে কাঁপিয়ে দিল। “তুই এই কাজ করলি কেন?” ইরাবতীর কথাগুলো ওর নিজের কানেই যেন আর্তনাদের মতো শোনাল।

নীচু গলায় কাটাকাটাভাবে পার্থিব বলল “এতে এত উত্তেজিত হবার কি আছে? আমারও তো এইভাবেই জন্ম হয়েছে। তোমরাও তো চেয়েছিলে ডিজাইনার বেবি।”

চিৎকার করে উঠল ইরাবতী “না আমাদের অজান্তে ডা. খাস্তগীর এই কাজ করেছে। তোর বাবা বা আমি কেউই কিছু জানতাম না। ডিজাইনার বেবি একটা অভিশাপ, কখনই তা কারুর কাম্য হতে পারে না। শয়তান খাস্তগীর এইভাবে আরও তিনজনের জন্ম দিয়েছিল। তারা সকলেই সেরিব্রাল এডিমায় মারা পড়েছে।”

মৃদু হাসল পার্থিব “ডা. খাস্তগীর তাই জানে বটে। অবশ্য ঘটনাটা ওঁর কল্পনার বাইরে।”

ইরাবতীর কৌতুহলী মুখের দিকে তাকিয়ে পার্থিব বলল “না বোঝালে তুমি বুঝতে পারবে না। সাকিল, ঋক আর কুনালের জাইগোটে জিন এডিটিং করে স্নায়ুকোষ তৈরির জন্য বিশেষভাবে নিদিষ্ট জিন, প্রমোটার আর এনহ্যান্সার জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। জিন থেকে প্রোটিন তৈরির সময়ে এই এনহ্যান্সারগুলিই সবচাইতে কার্যকরী হয়। ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরগুলি আবার এই এনহ্যান্সারকে উদ্দিপ্ত করে। ফিটাস যতদিন মাতৃগর্ভে ততদিন তার করোটি তৈরি হতে থাকে ফলে অধিক সংখ্যায় স্নায়ুকোষ তৈরি হলেও কোনও অসুবিধা হয় না। কিন্তু পাঁচ বছরের ছেলের পক্ষে সেই সুবিধা নেই। তার খুলি শক্ত হয়ে গেছে। এই সময়ে ‍যদি প্রচুর পরিমানে ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর শরীরে প্রবেশ করে তবে জিন এডিটিংএর সময়ে জুড়ে দেওয়া এনহ্যান্সারগুলি উদ্দিপ্ত হয়ে আবার প্রচুর পরিমাণে স্নায়ুকোষ তৈরি করতে থাকবে যার ধারণক্ষমতা নেই করোটির। ফলশ্রুতি সেরিব্রাল এডিমা। আমি পরীক্ষা করে দেখেছিলাম ডোপামিন এক্ষেত্রে খুবই উপযোগী ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর।” নিরাশক্ত অনুশোচনাহীন গলায় পার্থিব বলে চলে।

“কিন্তু ওরা তোর কী ক্ষতি করেছিল?”

“ওরা তিনজনেই ক্রমশ খুব বুদ্ধিমান হয়ে উঠছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই ওরা হয়ে উঠত আমার প্রতিযোগী। হোমো সুপিরিয়র কোনও প্রতিযোগী রাখতে পছন্দ করে না।” নির্লপ্ত গলায় বলল পার্থিব।

ইরাবতীর মনে হল একটা দানবের সামনে সে বসে আছে, যার মনে এতটুকু দয়ামায়া মমতা নেই। মানবিক কোনও গুণ নেই অতিবুদ্ধিমান এই ছেলের মধ্যে। হুহু করে কাঁদতে শুরু করে ইরাবতী। পার্থিব একই রকম গলায় বলল, “তোমার বিচারে খারাপ লাগছে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করে বলত মানবাধিকার, মূল্যবোধ, এই সব ঠুনকো নীতিকথা দিয়ে কী বিজ্ঞানের অগগতি রোধ করা যায়? তাহলে তো হাজার হাজার মানুষকে মারবার জন্য পারমানবিক বোমা তৈরি হত না।”

ক্লান্ত বিষন্ন স্বরে ইরাবতী বলল “আমি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছি, তুই আমাকে বাড়ি পৌঁছে দে।”

পার্থিব বলল “তোমাকে আমি ছেড়ে দিতে পারি কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে তুমি এখানকার যা দেখলে যা শুনলে তা কাউকে বলবে না।”

বাধ্য মেয়ের মতো ইরাবতী মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল। মনে মনে বলল কাকে আর বলব। একজনকেই বলতে পারতাম কিন্তু সে তো সবকিছু শোনার বাইরে।

একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে দুটো দিন কেটে গেল। পার্থিব, ওর একমাত্র ছেলে পার্থিব! আজ এক নিষ্ঠুর মেগালোম্যানিয়ার প্রতিমূর্তিতে পরিণত হয়েছে। একাধিপত্যের স্পৃহা তার মধ্যে এক উন্মত্ততার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু একটা সরলতা, মায়ের প্রতি একটা ক্ষীণ ভালোবাসা বোধহয় এখনও অবশিষ্ট রয়ে গেছে। মা ছেলের সম্পর্কটাকে জিন এডিটিং পুরোপুরি কেটে বাদ দিতে পারেনি। গত দু-দিন ধরেই ইরাবতীর সন্দেহ হচ্ছে ছায়ামাসি আর পরিমলের মৃত্যুতেও কী পার্থিবের হাত আছে। দু-দিন ধরে ইন্টানেটে সম্ভাব্য সমস্ত বিষয়ই ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। ক্যানসার ধরা পড়ার আগে দুজনেই ছোটখাটো অসুস্থ হয়েছিল। বাড়িতে চিকিৎসার সময়ে ওদের সালাইন দেওয়া হয়েছিল। হে ভগবান ইরাবতীর আশঙ্কা যেন মিথ্যা হয়। ওর নিজের পেটের সন্তান কী এতটা শয়তান হতে পারে!

সেদিন সকালে ইরাবতী পার্থিবের ঘরের দরজার সামনে এসে দাড়িয়েছে। পার্থিব তখন সবে ঘুম থেকে উঠে বসেছে। সোজাসুজি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় ইরাবতী বলল “ছায়ামাসি আর তোর বাবা কী দোষ করেছিল যে তুই ওদের স্যালাইনের বোতলে ইঞ্জেকসান করে ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিন ঢুকিয়ে দিয়েছিলিস।”

চমকে উঠল পার্থিব সরাসরি একথাটা ও আশা করতে পারেনি। “বাবা আমার ব্যাপারে অনেককিছু জেনে ফেলেছিল। পোড়ো রাজবাড়ির গোপন সুড়ঙ্গপথটার সন্ধান পেয়ে গিয়েছিল। বাবাকে থামাতে না পারলে ওখানকার ল্যাবরেটরিটার কথা সকলে জেনে যেত। দিনদিন আমার পক্ষে ব্যাপারটা বিপদজ্জনক হয়ে উঠছিল, আমার কোনও উপায় ছিল না।” পার্থিবের গলাটা কী একটু কেঁপে গেল।

“আর ছায়ামাসি?”

“ছায়ামাসির ব্যাপারটা আলাদা। জিনথেরাপির উপরে গবেষণা করছিলাম। মানুষের ক্রোমোজোমের নিদিষ্ট কোনও জিনের পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে একটা বাহকের সাহায্য নিতে হয়। বাহক হিসাবে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ভাইরাসকে। সংক্রমণের স্বাভাবিক ক্ষমতা থাকার ফলে তারা সহজেই মানুষের কোষের ভিতরে প্রবেশ করে মানব জিনের মধ্যে নিজের জিনকে সংযুক্ত করতে পারে। ভাইরাসের জিন এডিটিং করে পছন্দমতো জিন লাগিয়ে দিলে সেই জিনও মানব জিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। ডা. খাস্তগীর মূলত অ্যডেনো অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাস নিয়ে কাজ করতেন। কিন্তু আমি দেখেছিলাম একরকমের হেপাটোট্রপিক ভাইরাস এক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকরী। মানুষের উপরে ব্যাপারটাকে পরীক্ষা করার দরকার ছিল। ছায়ামাসি ছিল সবচেয়ে আদর্শ। পরীক্ষাটি পুরোপুরি সফল। ওই পদ্ধতিতে ক্যানসার, এইডসের মতো রোগ খুব সহজেই সারিয়ে তোলা যাবে। ছায়ামাসির ক্যানসার হয়েছিল। সে রোগ আমি সারিয়ে দিতে পারতাম। সেজন্য আমার দরকার ছিল ওঁর সামান্য লিভার টিস্যু কিন্তু তা করতে গেলে লোক জানাজানি হত। বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বার্থেই..।”

পার্থিবের কথা শেষ পর্যন্ত শোনার কোনও ইচ্ছা ছিল না ইরাবতীর। ওর ঘরের সামনে থেকে পায়ে পায়ে সরে গেল সে। সেদিনই ইন্টারনেট ঘেঁটে আমাজনে সে ডোপামিন গুঁড়োর অর্ডার দিল। পার্থিব, হোমো সুপিরিয়র, সুপারম্যান হলেও অজান্তেই নিজের মৃত্যুবাণের কথা বলে দিয়েছে। মনে মনে পরিমলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল ইরাবতী।

পার্থিব পরিণত হয়েছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে। বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে মানুষ খুন করতে ওর হাত কাঁপে না। এতটুকু অনুতপ্ত হয় না মন। যে বাবার, ছেলে অন্তপ্রাণ ছিল তাকেই সে কি বীভৎষ যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু উপহার দিয়েছে। ইরাবতীর সন্দেহ হয় আদতে মন বলে কিছু কি আছে পার্থিবের? অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন কিন্তু হৃদয়হীন হোমো সুপিরিয়রকে থামাতে না পারলে মানব সভ্যতাকে সে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। ইরাবতী মাতৃগর্ভে ধারণ করেছে এই ভয়ংকর দানবকে! যন্ত্রণাকাতর পরিমলের কথা ভেবে মনটা হাহাকার করে উঠে ইরাবতীর। অসহ্য বুকের যন্ত্রণা সহ্য করেও সে ছেলের কথা চিন্তা করত। আর পার্থিব! কতটা অনুশোচনাহীন।

১০

ডা. খাস্তগীর তাকালেন ইরাবতীর দিকে। উর্ধাঙ্গ অনাবৃত, কোমরে একটুকরো লাল কাপড়, পায়ে লালরঙের হাইহিল জুতো। জানলা দিয়ে আসা রাস্তার আলোয় যেন ঝিলিক দিচ্ছে চাঁপারঙা মোমপালিশ করা ত্বক। শিহরণে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে শহরের সবচেয়ে কস্টলি আকাঙ্ক্ষা মেডিকেয়ার নার্সিংহোমের মালিক রাহুল খাস্তগীরের।

“কেমন দেখছ আমাকে সত্যি করে বলত?”

নিজের খুলে রাখা ঘন কালো চুলে একবার খুব পরিকল্পিত ইতস্তত আঙুল চালিয়ে দিয়ে হিসহিসে গলায় ইরাবতী বলল। পাতলা নীচু আর হিলহিল করে দুলতে থাকা সরু কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত মাদকতা।

ইরাবতী বিছানার ওই প্রান্তে দাড়িয়ে অল্প অল্প দুলছে, নাকি তার নিজের মাথাই একটু একটু এপাশ ওপাশ করছে ঠিক ঠাওর করতে পারল না খাস্তগীর। দোল খাচ্ছে ইরাবতীর ফর্সা উন্মুক্ত দুটি স্তন। পিটোপিঠি গায়ে গা লাগিয়ে থাকা উদ্ধত দুই স্তন। দামি হুইস্কি ইতিমধ্যে ওঁর মস্তিস্কের দখল নিতে শুরু করেছে। নেশার ঘোরে চোখ বুজে আসতে চাইছে।

“তাকাও, এদিকে তাকাও, বলো না কি দেখছ?” আদুরে গলা ইরাবতীর।

খাস্তগীর নিজের ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত করছেন ইরাবতীর দুই বাদামি বৃন্তে। দুটি স্তন তাদের দুটি বৃন্ত নিয়ে এগিয়ে আসছে তার মুখের দিকে।

“এসো আমার কাছে এসো, আমাকে নাও, পুরোপুরি নাও” মাদকতাময় সুর ইরাবতীর গলায়। বিছানায় উঠে আসে ইরাবতী। হামাগুড়ি দিয়ে দুই হাঁটু আর দুই হাতের চেটোতে ভর দিয়ে হরিণের অসতর্ক মুহূর্তে হাজির হওয়া চিতাবাঘের মতো ধীরে ধীরে খাস্তগীরের দিকে এগিয়ে আসে। পাশাপাশি যমজ বোনের মতো দুলতে দুলতে ওরা এগিয়ে আসছে ওর মুখের দিকে।

শরীরে একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি টের পেল খাস্তগীর, বুকটা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। এক ঝটকায় ইরাবতীকে সরিয়ে দিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসলেন। খিল খিল করে হাসতে হাসতে বিছানা থেকে নেমে এল ইরাবতী। বিছানার উপরে খাস্তগীরের শরীরটা তখন যন্ত্রণায় আছাড়িপিছাড়ি করছে। ছায়াময় ঘরের মাঝখানে দাড়িয়ে এক অশরীরী নারীর মতো হিসহিসে স্বরে ইরাবতী বলল, “আমার দুই স্তন বৃন্তে মাখানো ছিল তীব্র বিষ যার প্রায় সবটাই তুমি চেটে নিয়েছ।”

ঠোঁটেও বিষ মাখানো ছিল ইরাবতীর। ঠোঁটদুটো জিভ দিয়ে ভালো করে চেটে নিয়ে বিড়বিড় করে নিজের মনে বলল “পরিমল আমি তোমার কাছে যাব।” চিপকানো পাতিলেবুর মতো কয়েকফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল ইরাবতীর মোমের মতো মসৃণ ফর্সা গাল বেয়ে। টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখা কেকটা পার্থিব নিশ্চয়ই এতক্ষণে খেয়ে ফেলেছে। ও কেক খেতে ভীষণ ভালোবাসে। কেকটাতে ডোপামিনের গুঁড়ো মেশানো ছিল। অনেকটা ডোপামিন। আমাজনে ডেলিভারি দেওয়া ডোপামিনের পুরো কৌটোটাই খালি করে চিনির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল ইরাবতী। পার্থিবের মাথাতেও কী যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। দু-চোখে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে ইরাবতীর। অসহ্য যন্ত্রণায় ওর শরীরটা কয়েকবার থরথর করে কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল।

Tags: কল্পবিজ্ঞানের গল্প, শংকর লাল সরকার, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!