গবেষণাগার

  • লেখক: রূপক বিশ্বাস
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

বাড়ির সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন অখিলেশবাবু। সামনের উঠোনে দুটো বেতের ঝুড়িতে রাখা রয়েছে কাঁচা আম, কালকের রাত্তিরের ঝড়ে পড়েছে। ঝুড়ির সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ন্যাংটা ভুটুঙের (উলঙ্গ বাচ্চারা) দল, তার পেছনে তাদের দাদা-দিদিরা। আরও পেছনে তাদের মায়েরা। তারা অবশ্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। তারা ঘোমটার আড়ালে মিচকি মিচকি হাসছে। কুচোগুলোর নেওয়া শেষ হলে তারা আসবে। সবাই দু-হাতে দুটো করে আম তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে। বাচ্চারা এবং তাদের মায়েরা সবাই জানে এই বাগানের সমস্ত ফলেই গ্রামের সবাইকার সমান অধিকার। সবাই আম নিয়ে চলে যাওয়ার পর দেখা গেল দু-ঝুড়ি আমের মধ্যে মাত্র দুটো আম পড়ে আছে।

তুলসী কখন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা বুঝতে পারেননি, অখিলেশবাবু। সে গিয়ে ঝুড়ি দুটো তুলে আনল। এই বিলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা তার খুব একটা পছন্দ নয়। সে একটু গজগজ করতে করতে বলল, ‘সব শেষ। তা এই দুটোকেও নিয়ে গেলে পারত।’ অখিলেশবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুই রেগে যাচ্ছিস কেন, ওরা কত আনন্দ করে খাবে বলত। এই দুটো আমে তোর আর আমার হয়ে যাবে। আমের ঝোল করবি ভালো করে। এবার আমার চা-টা দিয়ে যা এখানে।’ অখিলেশবাবু লাল সিমেন্টের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসলেন। হাতে একটা বই। এই সময়ে খবরের কাগজের অভাবটা তিনি খুব অনুভব করেন। এখানে খবরের কাগজ আসে না, কিন্তু ইন্টারনেটের সিগন্যাল আসে মোটামুটি। বোধহয় কাছাকাছি একটা বড় রিসর্ট থাকার জন্য। কাজ চলে যায়।

রান্নাঘর থেকে তুলসীর গলা পাওয়া গেল, ‘বলি সব আম তো বিলিয়ে দিলে এবার কী করবে?’

‘কেন কী হল?’

‘কী আবার হবে? এই দেখ।’ বলে তুলসী ধপ করে আধখানা করা একটা আম রাখল টেবিলের ওপর। অখিলেশবাবু দেখলেন, আমটার ঠিক মাঝখানটায় আঁটির পাশে অনেকটা জায়গা কালো হয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে যেন পুড়ে গেছে। অখিলেশবাবু জানেন, শিলাবৃষ্টিতে শিল লেগে অনেক সময় আমের ভেতরে খানিকটা জায়গা কালো হয়ে যায়, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমের খোলাতেও একটা দাগ থেকে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে আমের বাইরের খোলাটা একদম পরিষ্কার। তুলসীকে বললেন, ওই আমটা ফেলে দিয়ে অন্য আমটা দিয়েই ঝোল করতে।

অখিলেশবাবু চায়ের কাপ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। অখিলেশবাবুর বাড়িটা একটা ছোট্ট টিলার ওপরে। গ্রামের মধ্যে এটাই একমাত্র পাকাবাড়ি। বাড়িটা অখিলেশবাবুর বাবাই করেছিলেন। অখিলেশবাবু ছোটবেলায় মাঝে মাঝে ছুটিছাটায় মা-বাবার সঙ্গে আসতেন এখানে। তাঁরা বহুদিন আগেই দেহ রেখেছেন। কয়েক বছর আগে স্ত্রী বিয়োগের পর অখিলেশবাবু এখানেই চলে এসেছেন পাকাপাকিভাবে, রিটায়ার্ড লাইফ কাটাতে। একমাত্র ছেলে বিদেশে।

বাড়ির সামনের দিকে বারান্দার সামনে একটু ঢালু সবুজ ঘাসে ঢাকা জমি। তার পর ফুলের বাগান, রাস্তার ধার পর্যন্ত। রাস্তার ওপার থেকেই শুরু হয়েছে ধানক্ষেত। তা ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত। বাড়ির পেছনে একটা পুকুর। তার চারপাশে নারকোল গাছের সারি। এরপরেই বেড়া দেওয়া ছিল বাড়ির সীমানা নির্দেশ করে। ওখান জমি একটু ঢালু হয়ে নেমে গেছে নদীর ধার পর্যন্ত। গ্রীষ্ম শেষে এখন সেখানে বিশেষ জল নেই। বর্ষায় তা আবার দু-কূল ছাপাবে। অখিলেশবাবু বাড়ির চারদিক ঘেরা বারান্দা দিয়ে ঘুরে এসে আবার চেয়ারে বসলেন। পাকাপাকিভাবে আসার পরই তিনি জমির চারিদিকের বেড়া তুলে দিয়েছেন। তাঁর বাড়ির আশপাশে মাত্র কয়েকটা খড়ের বাড়ি। এদের বাড়ির পুরুষ ও মেয়েরা আশপাশের জমিগুলো চাষ করে, শহরে থাকা জমির মালিকদের হয়ে। বিনিময়ে ফসলের ভাগ পায়। এদের ছেলেমেয়েগুলো অনেক দূরে অঙ্গনবাড়ি স্কুলে পড়তে যায়, মিড-ডে মিলের লোভে। আর রাতে তারা, আর তাদের আরও ছোট ভাইবোনেরা, সব মিলিয়ে জনা বারো, খায় অখিলেশবাবুর বাড়িতে।

একটু পরে আবার তুলসীর আগমন, ‘আজ রাতে কী রান্না হবে?’ অখিলেশবাবু একটু ভাবলেন। কাল রাতের ঝড়ে আজ একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা রয়েছে। আবার দিন দুয়েক পরেই গরম শুরু হয়ে যাবে।

‘তুই এক কাজ কর, খিচুড়িই করে দে আজ রাতে।’

‘খিচুড়ির সঙ্গে কী খাবে?’

‘পাঁপরভাজা।’

‘এক-একজনের জন্য ক-টুকরো করে?’

‘সবাইকার জন্য দু-টুকরো করে।’

তুলসী চলে গেল। অখিলেশবাবু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তুলসী রাঁধে ভালো, কিন্তু বড্ড বকায়। অখিলেশবাবু জানেন রাতে বাচ্চাদের এই খাওয়ানোর ব্যাপারটাও ওর পছন্দ নয়। অখিলেশবাবু শুনেছেন, ওর বর ওকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই ও এইরকম হয়ে গেছে। কাউকে পছন্দ করে না, সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখে।

হঠাৎ অখিলেশবাবু দেখলেন জিতেন আর বিল্টু এসে দাঁড়াল বারান্দার সামনে। বলল, ‘আমদের আমগুলো পচা বেরিয়েছে।’ অখিলেশবাবু হাত বাড়িয়ে নিলেন আমগুলো। সেগুলোও মাঝখান থেকে কাটা হয়েছে। চারটে আমের মাঝখানটাই কালো হয়ে আছে, তুলসীর আনা আমটার মতোই এবং কোনওটারই বাইরের খোলায় কোনওরকম আঘাতের চিহ্ন নেই। বাগানের মালি প্রহ্লাদকে ডেকে ওদের চারটে আম পেড়ে দিতে বললেন। ওরা আমগুলো নিয়ে মহানন্দে চলে গেল। প্রহ্লাদকে ডেকে পচা আমগুলো দেখিয়ে অখিলেশবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করে এরকম হল বলত?’ সে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, ঠিক বুঝতে পারছি না। কোনও পোকামাকড়ের কীর্তি বলেই মনে হচ্ছে। কথাটা অখিলেশবাবুর ঠিক মনঃপূত হল না। তিনি ঘর থেকে তাঁর বড় ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা এনে আধখানা করা আমগুলো ভালো করে দেখলেন। মাঝখানের কালো অংশটা খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নীচে দেখলে বোঝা যাচ্ছে যে আঁটির কাছের পোড়া বা পচা জায়গাটা থেকে একটা খুব সরু কালো দাগ বোঁটা পর্যন্ত চলে গেছে। অখিলেশবাবু ব্যাপারটার কোনও কিনারা করতে পারলেন না।

দিন পনেরো পরে রতনের মা এসে অখিলেশবাবুকে বলল, ‘মেসোমশাই আমাকে দুটো নারকোল দেবে, আমার শ্বশুরমশাই আসছেন কাল।’ অখিলেশবাবু বললেন, ‘সে তুই নিয়ে যা। কিন্তু পাড়বে কে?’

‘কেন রতন তো আছে?’

অখিলেশবাবুর মনে পড়ল রতনের কথা। এখানকার সব ছেলেই অল্পবিস্তর গাছে উঠতে পারে, কিন্তু রতনের গাছে ওঠার ধরনই আলাদা। এই বয়সেই সে তর তর করে উঠে যায় নারকোল গাছের মাথায়, যা তার চেয়ে অনেক বড় লোকেরাও পারে না। পরেরদিন সকালেই রতন এসে হাজির তার বাবা-মাকে নিয়ে। অখিলেশবাবু আগের দিনই একটা নারকোল গাছ বেছে রেখেছিলেন। অখিলেশবাবু রতনের বাবাকে বললেন, গাছে ওঠার ব্যাপারে তোমার ছেলে বোধহয় তোমার চেয়েও বড় এক্সপার্ট। সে হেসে বলল, ‘ওদের শরীর এখন হালকা, তাই ওরা অনেক তাড়াতাড়ি উঠতে পারে।’ অখিলেশবাবু যে গাছটা বেছেছিলেন, সেটা একটু বাঁকা। তার গোড়াটা পুকুরপাড়ে হলেও, মাথাটা চলে গেছে, পুকুরের খানিকটা ভেতরে। রতনের বাবা রতনকে বললেন, ‘চাকুটা সঙ্গে নিয়ে যা। একটা করে নারকোল কাটবি, আর সেটা ছুড়ে দিবি পাড়ের দিকে। তাহলে আর কাউকে সাঁতরাতে হবে না সেটা উদ্ধার করতে। রতন, খালি গায়ে, মোটা দড়ির ফাঁসে পা গলিয়ে তর তর করে উঠে গেল নারকোল গাছের মাথায়। রতনের মা হাসতে হাসতে বলল, ‘বাঁদর একটা।’ রতন গাছের মাথা থেকে চিৎকার করে বলল, ‘বাবা আমি নারকোল কেটে পাড়ের দিকে ফেলছি তুমি তুলে নাও।’ রতন কোমরে রাখা চাকুটা খাপ থেকে বার করল। কিন্তু নারকোলের বোঁটা কাটার চেষ্টা করতেই গাছের মগডাল থেকে সোজা পড়ল পুকুরের জলে। রতন সাঁতার জানে। তা সত্ত্বেও রতনের বাবা সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জায়গাটার কাছে পৌঁছে, ডুব সাঁতারে তাকে তুলে নিল, তারপর একহাতে তার চুলের মুঠি ধরে অন্য হাতে সাঁতার কাটতে কাটতে তাকে পাড়ে নিয়ে এল। বিস্মিত অখিলেশবাবু যখন তার পাশে পৌঁছলেন, তখন রতন চোখ পিটপিট করছে। পরে রতন একটু ধাতস্থ হলে অখিলেশবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী কর পড়লি, পা পিছলে?’ উত্তরে রতন বলল, ‘যেই চাকুটা দিয়ে ডাণ্ডিটা কাটতে গেছি, অমনি ‘ইলেকটিরি শক’ লাগল। রতনের দিদিও ততক্ষণে এসে গেছে। সে বলল, ‘‘ইলেকটিরি শক’ না ছাই। তুই নীচের দিকে তাকিয়ে ভেবড়ে গিয়েছিলি।’ তুলসী সব শুনে মন্তব্য করল, ‘সকালবেলাতেই ভূতে ধরল!’ রাতে খেতে এলে অখিলেশবাবু রতনকে আলাদা করে আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সকালে কী হয়েছিল রে?’ সে আবার একই উত্তর দিল। অখিলেশবাবু রতনকে চেনেন ভালোমতো। একটু দুরন্ত। কিন্তু অত্যন্ত চৌকস ও বুদ্ধিমান ছেলে। তাকে মিথ্যেকথা বলতে শোনেননি কোনওদিন। কিন্তু এই ব্যাপারটা কি সে বানিয়ে বলছে? ব্যাপারটা অখিলেশবাবুর কাছে প্রহেলিকা হয়ে রইল।

রবিবার মিড ডে মিল থাকে না। ওইদিন দুপুরে বাচ্চাদের সাধারণত একটু ভালো খাওয়াদাওয়া হয় অখিলেশবাবুর বাড়িতে। আজকের মেনু— ভাজা পিয়াঁজ দিয়ে মাখা আলুভাতে, সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল আর মাছের ডিমের বড়া। শেষ পাতে আমের চাটনি। বাচ্চাগুলো আনন্দ করে খাচ্ছিল। অখিলেশবাবু লক্ষ করলেন জিতিন অনুপস্থিত। জিতিনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, আজকে দুপুরে সে যখন তেঁতুল গাছে উঠেছিল তেঁতুল পাড়তে, তখন একটা তেঁতুলের গোছায় কোপ মারতে হঠাৎ আগুন বেরোয়, তাতে সে ভয় পেয়ে পড়ে যায় নীচে। রতন জানাল, জিতিনের কিন্তু তার মতো ‘ইলেকটিরি শক’ লাগেনি। খাওয়া শেষে একটা টিফিন ক্যারিয়ারে জিতিনের খাবার গুছিয়ে নিয়ে রতনের সঙ্গে অখিলেশবাবু হাজির হলেন জিতিনের বাড়ি। জিতিন শুয়ে ছিল বিছানায়। অখিলেশবাবুকে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে ঢুকতে দেখে তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অখিলেশবাবু জিতিনকে খেয়ে নিতে বললেন। তার খাওয়া শেষ হলে, তাকে কাছে ডেকে তার মাথাটাকে ভালোভাবে পরীক্ষা করলেন। খুব উঁচু থেকে পড়েনি বোধহয়। তা ছাড়া নীচের মাটিতে পুরু ঘাস ছিল সম্ভবত। মাথা ফাটেনি। তবে কপালে কালশিটের দাগ রয়েছে। একটু ফুলেও রয়েছে জায়গাটা। তাকে প্রশ্ন করে অখিলেশবাবু জানতে পারলেন যে, তেঁতুলের গোছাটা একটা ডালের একদম শেষের দিকে ছিল বলে সে হাত বাড়িয়ে একটা ছোট কাটারি দিয়ে কোপ মেরে সেটা কেটেছিল। অখিলেশবাবু ছোট কাটারিটা চেয়ে নিয়ে সেটা পরীক্ষা করলেন। কাটারির বাঁটটা একটা কাঠের মধ্যে ভালো করে ঢোকানো। এই জন্যই কি জিতিনের ‘‘ইলেকটিরি শক’ লাগেনি? রতনের চাকুটা ছিল পুরোপুরি লোহার তৈরি। আর জিতিনের দেখা আগুনটা কি আসলে ইলেকট্রিক স্পার্ক? পরেরদিন সকালে বাচ্চাগুলো স্কুল চলে গেলে, জিতিনের বাবাকে গাছে উঠিয়ে কয়েকটা তেঁতুলের গোছা কাটালেন অখিলেশবাবু, কিন্তু ‘আগুন’ বা‘‘ইলেকটিরি শক’ কোনওটারই পাত্তা পাওয়া গেল না।

*

গ্রীষ্ম শেষ হয়ে বর্ষা এসে গেল। ‘আগুন’ বা ‘ইলেকটিরি শক’ কোনওটারই ফয়সলা হয়নি। অখিলেশবাবু তাঁর ক্লাসের দু-একজন বিজ্ঞানী বন্ধুবান্ধবকে লিখেছিলেন ব্যাপারগুলো। কিন্তু তারা সেগুলো হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে, তুই বুড়ো বয়সে গ্রামে থাকতে থাকতে গেঁয়ো ভূত হয়ে যাচ্ছিস। ছেলেও ব্যাপারটা উড়িয়েই দিয়েছে। অখিলেশবাবুও মোটামুটি ভুলে গেছেন ব্যাপারটা। কিন্তু মাঝে মাঝে ঘটনাগুলো মনে পড়লে তিনি ঠিক স্বস্তি পান না। তাঁর বাড়ির পাশেই একটা নিম গাছ আছে। তার একটা ডাল চলে এসেছে প্রায় ছাদের ওপর। নিম গাছটা জড়িয়ে জড়িয়ে একটা অর্কিড উঠেছে। মাঝে মাঝে তাতে ভারী সুন্দর ফুল ফোটে। লতানে অর্কিডটা এখন চলে এসেছে ছাদের পাঁচিলের ওপর এসে পড়া নিম ডালের ওপরও। অখিলেশবাবু বাগান থেকে কয়েকটা পড়ে থাকা আমগাছের ডাল কুড়িয়ে এনে তার ওপর নারকোল দড়ি জড়িয়েছেন ভালো করে। তারপর সেগুলো বাগানে বৃষ্টিতে ফেলে রেখেছেন বেশ কিছুদিন। ফলে তাতে একটা পচা ডালের ভাব এসেছে। এবার অর্কিডের কয়েকটা ছোট ডাল কেটে তার ওপর লাগিয়ে দিলেই অর্কিডগুলো বাড়তে থাকবে সেখানে। অখিলেশবাবুর ইচ্ছে, অর্কিড সমেত ওই ডালগুলি তিনি ঝুলিয়ে দেবেন বাড়ির সামনের বারান্দায়। একটা মাঝারি সাইজের কাঁচি নিয়ে তিনি উঠলেন ছাদে। রতন আর জিতিনের কথা মনে হতে একটু দ্বিধা করলেন তিনি। তারপর নীচে গিয়ে একটা রবারের গ্লাভস নিয়ে হাতে পরলেন। তারপর পাঁচিলের ধারে গিয়ে কাঁচি দিয়ে লতানে অর্কিডের কিছুটা অংশ কাটার চেষ্টা করলেন তিনি। ওপরের স্কিনটা সহজেই কাটল, কিন্তু মাঝখানটা কিছুতেই কাটতে পারলেন না তিনি। তখন তিনি নীচে গিয়ে একটু বড় একটা কাঁচি নিয়ে এলেন। কিন্তু সেটা দিয়েও লতার মাঝখানটা কাটতে পারলেন না তিনি। তাঁর ভেতরে ভেতরে একটা রাগ জমা হচ্ছিল। এবার নীচে গিয়ে বাগানের হেজ কাটার বিশাল কাঁচিটা আনলেন তিনি। তাঁর নিজেরই অবশ্য মনে হচ্ছিল এটা মশা মারতে গিয়ে কামান দাগার সমান হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উপায়ন্তর না দেখে তিনি গ্লাভস পরা হাতে বিশাল কাঁচিটা বাগিয়ে ধরে কাঁচির মাঝখানে লতাটা রেখে দু-হাতে কাঠের হ্যান্ডেলে একটা প্রচণ্ড চাপ দিলেন। এবার লতাটা কাটল। কিন্তু আরও দুটো জিনিস ঘটল। একটা ধাতু কাটার অস্পষ্ট শব্দ যেন তিনি শুনতে পেলেন। আর ক্ষণেকের জন্য তিনি যেন একটা আগুনের ফুলকি দেখতে পেলেন। দিনের আলোয় সেটা স্পষ্ট বোঝা গেল না। বিস্মিত এবং আতঙ্কিত অখিলেশবাবু গ্লাভস পরা হাতেই অর্কিডটা নিয়ে নেমে এলেন নীচে। কাঁচিগুলো ছাদেই পড়ে রইল।

*

বসবার ঘরের চেয়ারে বসে হাঁপাচ্ছিলেন অখিলেশবাবু, যতটা না শারীরিক পরিশ্রমে, তার চেয়ে বেশি মানসিক উত্তেজনায়। উত্তেজনা একটু কমলে, চেয়ার ছেড়ে উঠে পাখাটা একটু জোরে করে দিলেন। তারপর ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ভালো করে দেখলেন আবার অর্কিডটা। লতাটার ঠিক মাঝখান দিয়ে একটা খুব সূক্ষ্ম ধাতব তার চলে গেছে। ধাতুটা কিন্তু ইস্পাত নয়, অন্য কোনও অজানা ধাতু যার এত সূক্ষ্ম তারও প্রচণ্ড শক্ত। অখিলেশবাবু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। অর্কিডটা সমস্ত নিম গাছটা জড়িয়ে উঠেছে। এর সমস্তটার মধ্যেই কি ধাতব তার আছে? তা নাও হতে পারে। সেদিন তেঁতুল গাছের বাকি গোছায় কোনও গোলমাল পাওয়া যায়নি। ততক্ষণে অখিলেশবাবুর সাহস কিছুটা ফিরে এসেছে। তিনি একটা ব্লেড এনে অর্কিডের ডালটা খুব সাবধানে চিড়লেন। ধাতবটা তারটা লতার ক্রস সেকশনের ঠিক মাঝখান দিয়ে গেছে। নিতান্ত সরু এঁকাবেঁকা লতার ঠিক মাঝখান দিয়ে সূক্ষ্ম একটা ধাতব তার ঢোকানো যে কতটা কঠিন কাজ তা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অখিলেশবাবুর বুঝতে অসুবিধে হল না। তার ওপর কাজটা করা হয়েছে লতাটিকে না মেরে। অর্কিডটি তিনি চিড়তে শুরু করেছিলেন, যেখানে কাটা হয়েছিল সেখান থেকে। তিনি চিড়তে চিড়তে এগিয়ে চললেন ডগার দিকে অর্থাৎ যেখানে অর্কিডের ফুলটি রয়েছে সে দিকে। ফুলের কাছে পৌঁছে তিনি চমকে উঠলেন। সরু তারটা একটা ছোট বলে পরিণত হয়েছে। সেই বলটা ফুলের মধ্যে এমনভাবে লুকিয়ে আছে যে বাইরে থেকে তাকে দেখাই যায় না। অখিলেশবাবুর বিস্ময় বেড়েই চলেছে। এখন তিনি বুঝতে পেরেছেন, এই ধাতুকে কাটতে যে প্রচণ্ড শক্তি লাগে, এটাই তার একমাত্র বিশেষত্ব নয়। সম্ভবত এই ধাতুর মধ্যে এক ধরনের ইলাস্টিক গুণও আছে, নইলে তার ঢোকানোর পর লতার দৈর্ঘ্যর স্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে তা খাপ খায় কীভাবে। এইসব ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্কভাবে তিনি ধাতব বলটি ছুঁয়ে ফেললেন এবং আরও একবার চমকে উঠলেন। বলটি ঈষৎ গরম। সম্ভবত এর মধ্যে দিয়ে পাওয়ার ফ্লো হয়েছে কিছুক্ষণ আগেও। বিস্ময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অখিলেশবাবুর সাহসও বাড়ছিল। অখিলেশবাবু দৌড়ে ছাদে গিয়ে বড় কাঁচিটা নিয়ে এলেন। তারপর অর্কিডের টুকরোর গোড়ার দিক থেকে ইঞ্চি দুয়েকের আর একটা টুকরো কাটলেন। তারপর লতার ছোট টুকরোটা থেকে, লতার পুরো আবরণটা ছাড়িয়ে ফেললেন। তিনি বুঝতে পারলেন, বেরিয়ে আসা তারের টুকরোটা মাইক্রোস্কোপের তলায় পরীক্ষা করা দরকার। কিন্তু মাইক্রোস্কোপের অভাবে ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নীচে দেখে যা মনে হল তাতে তাঁর চিন্তা বহুগুণ বেড়ে গেল। তাঁর মনে হল এটা সাধারণ তার নয়, অতিসূক্ষ্ম, কিন্তু অসম্ভব মজবুত কো-এক্সিয়াল কেব্‌ল।

*

ইজিচেয়ারে বসে ছিলেন অখিলেশবাবু, চেয়ে ছিলেন সামনের দিকে, যদিও দেখছিলেন না কিছুই। তাঁর মনটা ভারাক্রান্ত, কিছুটা অবসন্নও। আজকে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। দুপুরের ঘটনাটা তিনি জানাননি তাঁর বিজ্ঞানী বন্ধুদের বা তাঁর ছেলেকে। তিনি ফোন করেছিলেন তাঁর এক ছোটবেলার বন্ধুকে, যে এখন একটা মাঝারি মাপের বাংলা সংবাদপত্রের সম্পাদক। সে ঘটনাগুলো শুনে একটু চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, ‘তুই বলছিস তোর হাতে ওই লতাটার খানিকটা অংশ আছে। ওর খানিকটা আমাদের দিতে হবে। আমরা ওটা রাখব প্রমাণ হিসেবে। যদি পরে কোনও বিতর্ক হয় এই নিয়ে, সেক্ষেত্রে ওটা কাজে লাগবে। ঠিক আছে, কাল আমি একজনকে পাঠাবো, নাম সমরেশ। তোর একটা ইন্টারভিউ নেবে সমরেশ, রেকর্ড করবে সেটা। তা ছাড়া তুই যদি একটা লিখিত বিবৃতি দিস, তাহলে ভালো হয়। সমরেশের পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। তুই ওর রাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিস, তোর বাড়িতে। ও সকালে কিছু ছবি-টবি তুলবে। বাচ্চা ছেলে দুটো, তার মা-বাবার সঙ্গেও হয়ত কথা বলবে। ঠিক আছে, আজ ছাড়ছি। পরে কথা হবে।’

*

কম্পিউটারে, সেই লিখিত বিবৃতিটা অখিলেশবাবু শেষ করেছেন এইমাত্র। অত্যন্ত ক্লান্ত লাগছে। তিনি ঠিক করেছেন আপাতত তিনি গ্রামের লোকেদের বা বাচ্চাদের কিছু জানাবেন না। অযথা প্যানিক সৃষ্টি করে লাভ নেই। এবার তিনি শুতে যাবেন। অবশ্য ঘুম আসবে কিনা সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিন্ত নন।

কম্পিউটারটা শাটডাউন করতে গিয়ে অখিলেশবাবু দেখলেন সেটা শাটডাউন হচ্ছে না। তিনি মাউসে হাত না দিলেও স্ক্রিনে কারসারটা নড়ছে। মনে হচ্ছে তাঁর স্ক্রিনটা শেয়ার করছে কেউ। কিন্তু কাউকে তো তিনি স্ক্রিন শেয়ারিং-এর পারমিশন বা পাসওয়ার্ড দেননি। এবার নিজের মাউসের সাহায্যে তিনি কারসারটা নাড়ানোর চেষ্টা করলেন। সেটা স্থান পরিবর্তন করল না। হঠাৎ সমস্ত স্ক্রিনটা কালো হয়ে গেল। আর একটা রিনরিনে ধাতব স্বর ভেসে এল। প্রথমে বিজাতীয় কোনও ভাষায়, তারপর পরিষ্কার বাংলায়, ‘আমরা তোমার বন্ধু। তুমি আমাদের কথা মন দিয়ে শোনো। আমরা তোমার বা তোমাদের কোনও ক্ষতি করতে চাই না।’

আতঙ্কিত গলায় অখিলেশবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কে? কোথা থেকে বলছ? তোমাকে দেখা যাচ্ছে না কেন?’

‘আমাদের দেখতে তোমার হয়ত খুব ভালো লাগবে না। পরে যদি আমরা বন্ধু হই, তখন না হয় দেখা দেওয়া যাবে। আমরা আছি তোমাদের থেকে অনেক দূরের একটা ছোট্ট গ্রহে। তোমরা এখনও আমাদের সন্ধান পাওনি। আমরা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে সক্ষম। তোমাদের তুলনায় বিজ্ঞানে আমরা অনেক অনেক এগিয়ে আছি, সেটা হয়তো তুমি বুঝতে পেরেছ এর মধ্যেই। তোমাদের মতো অসংখ্য দেশ নেই আমাদের ছোট্ট গ্রহে। এটা চারটে অংশে বিভক্ত, অনেকটা তোমাদের এক একটা দেশের মতো। চারটে অংশই স্বাধীন, কিন্তু তারা একটা সামগ্রিক ছাতার তলায় থাকে। এই ওপরের স্তরের কাজ হচ্ছে গ্রহের বাইরের বিপদ থেকে গ্রহকে রক্ষা করা, চার অংশের সমন্বয় সাধন করা এবং কোনও অংশ বড় রকমের কোনও ভুল করলে, তাকে সে সম্বন্ধে তাকে সচেতন করা। আমাদের গ্রহের সবচেয়ে জ্ঞানীগুণী লোকেরা আছেন এই ওপরের স্তরে।’

এঁরা কয়েক বছর (তোমাদের হিসেবে) আগে একটা সতর্কবাণী করেন। তাতে বলা হয় যে, পরিবেশের অনভিপ্রেত ব্যবহারে আমাদের ঘোর দুর্দিন আসছে। এখন থেকেই আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার।’

‘ঠিক আমাদের মতোই।’ অখিলেশবাবু বলে উঠলেন।

‘আমাদের বিজ্ঞানীরা লেগে পড়লেন। যে সমস্ত গবেষণাপত্র বেরিয়ে এল তাদের নিদানের মধ্যে অনেক ফারাক। আসলে এই ধরনের তাত্ত্বিক গবেষণায় অনেক ম্যাথম্যাটিক্যাল মডেল ব্যবহার করা হয়। দেখা গেল প্রত্যেক দলের মডেলই আলাদা এবং একদল কিছুতেই অন্য দলের মডেল মানতে চান না। বাকি রইল এক্সপেরিমেন্ট। কিন্তু একটা গ্রহকে ল্যাবরেটরিতে সিমুলেট করা খুবই কঠিন কাজ। তার ওপর রয়েছে অ্যাক্সিলারেশনের সমস্যা। দশ বছর পরে কী ঘটবে সেটা বোঝার জন্য তো দশ বছর বসে থাকা যাবে না, তা বুঝে ফেলতে হবে দশ দিনের মধ্যেই। নইলে সংশোধন হবে কী করে। এইখানেই আবার সমস্যা, পণ্ডিতদের মধ্যে মত বিরোধ অ্যাক্সিলারেশন প্রসেস নিয়ে। এই সময় একদিন হঠাৎ আমরা তোমাদের গ্রহটা আবিষ্কার করি। এবং অবাক হয়ে দেখি গ্রহটা ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। অর্থাৎ আমরা যা ধরতে চেয়েছি গবেষণার মাধ্যমে তাই তোমাদের গ্রহে ঘটে চলেছে, অনেক বড় স্কেলে। তারপর থেকেই আমরা তাকিয়ে আছি তোমাদের গ্রহের দিকে।’

‘তার মানে আমরা গিনিপিগ তোমাদের পরীক্ষার?’

‘না, তা কেন? আমরা এখনও তো আমাদের কোনও ইচ্ছা-অনিচ্ছা চাপিয়ে দিইনি তোমাদের ওপর। কোনও নির্দেশও দিইনি তোমাদের। শুধু তোমাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করছি আমাদের গবেষণায়। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম তোমাদেরকে আমাদের গবেষণার শরিক করে নেব। কিন্তু তোমাদের এক দেশের সঙ্গে আর এক দেশের সম্পর্ক দেখে আমরা আর সে রাস্তায় যাইনি। তাতে হয়তো তোমাদের সহযোগিতাও আমরা পেতাম না। আমাদের পরিকল্পনাও ফাঁস হয়ে যেত। অবশ্য এ ব্যাপারটা এড়ানোর জন্য আমাদের সামান্য অনৈতিক কাজ করতে হয়েছিল। পৃথিবীর আগের ডেটা পাওয়ার জন্য তোমাদের বড় বড় গবেষণাগার, লাইব্রেরি এবং মিউজিয়ামের বিস্তর কম্পিউটার হ্যাক করতে হয় আমাদের, তোমাদের অজান্তেই। অবশ্য গবেষণা ছাড়া অন্য কোনও কাজে ব্যবহার হয়নি সে সমস্ত ডেটা।’

‘আর এখনকার ডেটা?’

‘এখনকার ডেটা তো আমরা পাই নিয়মিত। তুমি যে ছোট্ট গোলকটা পেয়েছ অর্কিডে, সেটা আসলে একটা প্রোব। একটা ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত ছিল সেটা। এই সব প্রোব প্রতিনিয়ত জল, বায়ু, মাটির অবস্থা সম্বন্ধে নানান ডেটা পাঠায় আমাদের কাছে। এই রকম কোটি কোটি প্রোব আমরা লাগিয়েছি দীর্ঘদিন ধরে, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে, আমাদের অদৃশ্য স্বয়ংক্রিয় ড্রোন জাতীয় যন্ত্রের সাহায্যে। তাদের পাঠানো সমস্ত ডেটা আমাদের বিজ্ঞানীরা নিরন্তর বিশ্লেষণ করে চলেছেন সুপার কম্পিউটারের সাহায্যে। তাঁরা এটাও লক্ষ রাখছেন যে, তোমাদের কোন দেশ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং তার কী প্রভাব পড়ছে পরিবেশে।’

‘কিন্তু তোমাদের এই ডেটা সংগ্রহের জন্য আমাদের দুটি বাচ্চা ছেলে আহত হয়েছে। সারা পৃথিবীতে হয়তো আরও অনেকে আহত হয়েছে যাদের খবর আমি রাখি না।’

‘বাচ্চা দুটির জন্য সত্যিই আমি দুঃখিত। অবশ্য তাদের আঘাত সামান্য। কোনও প্রাকৃতিক শক্তি আমাদের যন্ত্রের কোনও ক্ষতি করতে পারে, এরকম সম্ভাবনা দেখলে আমরা আমাদের যন্ত্রপাতি ধ্বংস করে ফেলি। যা তুমি দেখেছ ঝড়ে পড়া আমের মধ্যে। কিন্তু কোনও প্রাণী বা মানুষ কখন নিজেদের অজান্তেই আমাদের যন্ত্রপাতিতে হাত দেবে তা আগে থেকে বোঝার মতো ফুলপ্রুফ অ্যালগোরিদম আমরা এখনও তৈরি করে উঠতে পারিনি। তবে কাজ চলছে, শিগগিরই এটা তৈরি হয়ে যাবে। তখন নিজের অজান্তেই, কেউ আমাদের যন্ত্রপাতিতে হাত দিলে সেটা নিজে থেকেই ধ্বংস হয়ে যাবে কাউকে আহত না করে।’ খানিকক্ষণের বিরতি। বিরতির পর আবার যান্ত্রিক স্বর প্রশ্ন করল, ‘এবার তুমি কী করবে?’

‘আমি খবরের কাগজের লোকেদের জন্য একটা বিবৃতি তৈরি করে রেখেছি। তাদের সেটা দেব। তার সঙ্গে যোগ করব তোমার সঙ্গে আমার যে সমস্ত কথাবার্তা হল সেটাও। কাগজ পড়ে পৃথিবীর মানুষ সব জানবে। তারপরে তারা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেবে।’

‘তুমি বুঝতে পারছ, এর জন্য আমাদের এত বিশাল কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।’

‘কিন্তু এছাড়া আমি আর কী করতে পারি?’

‘তুমি রাজি থাকলে তোমাকে আমরা নিয়ে আসব আমাদের গ্রহে। একটা বিশাল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে তুমি। তোমার কোনও অভাব থাকবে না। এখনকার চেয়ে অনেক ভালো থাকবে তুমি।’

অখিলেশবাবু চমকে উঠলেন। পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে বলছে তাঁকে। তার মানে সামনের এই ধানভরা খেত, দূরের পাহাড়, পেছনের পুকুর, নদী সব ছেড়ে চলে যেতে হবে। রতন, জিতিন কারুর সঙ্গে আর দেখা হবে না। ছেলের সঙ্গেও কি আর কথা বলা যাবে? তা ছাড়া পৃথিবীর লোকজনকে না জানিয়েই সেটাকে একটা গবেষণাক্ষেত্রের মতো ব্যবহার করা যায় কি? অখিলেশবাবু একটু সময় চুপ করে থেকে উত্তর দিলেন, ‘না এ সমস্ত পৃথিবীর লোককে জানানো দরকার, তাদের না জানিয়ে এ সমস্ত চলতে দেওয়া উচিত নয়।’

‘তুমি বুঝতে পারছ না, তোমাদের অসংখ্য দেশে নেতারা কিছুতেই এ ব্যাপারে একমত হতে পারবে না। মাঝখান থেকে আমাদের এত বড় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। তবে তুমি যদি এখন আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা কর, তাহলে পরে তোমরা চাইলে আমরা আমাদের গবেষণার ফল তোমাদের দিয়ে, হয়ত তোমাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারব।’

অখিলেশবাবু তবুও চুপ করে রইলেন।

‘ঠিক আছে, তাহলে বিদায়।’ যান্ত্রিক স্বর মিলিয়ে গেল।

সকালবেলা তুলসী চা নিয়ে এসে দেখল অখিলেশবাবু ঘুম থেকে ওঠেননি। সে তাড়াতাড়ি গায়ে হাত দিয়ে দেখল গা একদম ঠাণ্ডা। জিতিনের বাবা সাইকেল করে গিয়ে তিন মাইল দূর থেকে ডাক্তারবাবুকে ডেকে নিয়ে এল। তিনি দেখেই বললেন, অখিলেশবাবু আগের রাতেই মারা গেছেন ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে। ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে চলে গেলেন তিনি। তুলসী জানত অখিলেশবাবুর এক খুড়তুতো ভাই থাকে মাইল ৪০ দূরের এক শহরে। অখিলেশবাবুর ফোন থেকেই তাঁকে খবর দেওয়া হল। তিনি এসে গেলেন দুপুরের আগেই। তিনি এসেই অখিলেশবাবুর ছেলেকে ফোন করলেন। সে মধ্যরাতে ফোন ধরে জানতে চাইল বাড়ির কাছাকাছি মৃতদেহ সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা আছে কিনা। কিন্তু সে ব্যবস্থা নেই শুনে সে তার কাকাকে বলল, মৃতদেহ সৎকার করে দেওয়ার জন্য। কারণ তার আসতে আসতে দু-তিনদিন লেগে যাবে। বিকেলের দিকে গ্রামের লোকেরা মৃতদেহ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর সমরেশ এসে হাজির হল। তুলসীর কাছে সব কথা শুনে সে অখিলেশবাবুর ঘরে গেল। টেবিলের ওপর রাখা কম্পিউটারটা সে অন করার চেষ্টা করল, কিন্তু সেটাকে সে কিছুতেই চালু করতে পারল না। টেবিলের ওপর একটা পোড়া অর্কিডের ডাল পড়েছিল। তার হাত লেগে সেটা পড়ে গেল মাটিতে। সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে সে রাতটা কাটাল অখিলেশবাবুর বাড়িতেই। পরের দিন সে জিতিন আর রতনের বাবাদের সঙ্গে গিয়ে সেই জলের ওপর ঝুঁকে পড়া নারকোল গাছটা আর জিতিনদের বাড়ির তেঁতুল গাছটা পরীক্ষা করল। দু-এক জায়গায় খুব সামান্য কালো দাগ ছাড়া আর কোনও অস্বাভাবিকতা তার চোখে ধরা পড়ল না। সে অখিলেশবাবুর বাড়ির নিমগাছটা ভালো করে দেখলে বুঝতে পারত তার ওপরে জড়িয়ে থাকা অর্কিডটা সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। পরের দিন আবার সম্পাদককে ফোন করল সে। সম্পাদক তাকে বললেন, ‘আমার একবার সন্দেহ হয়েছিল, গ্রামে একা থেকে থেকে অখিলেশের মাথার একটু গণ্ডগোল হয়েছে। যাইহোক তুমি ফিরে এস। তোমারই ভোগান্তি হল।’ পরের দিন রতন, জিতিনদের স্কুলে যাওয়ার একেবারেই ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু মিড ডে মিলের জন্য যেতেই হল। স্কুল থেকে ফিরে এসে রতন তার মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘মা আমরা কি আজ থেকে রাতে বাড়িতেই খাবো?’

Tags: কল্পবিজ্ঞান গল্প, রূপক বিশ্বাস, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

2 thoughts on “গবেষণাগার

  • October 12, 2021 at 9:14 pm
    Permalink

    ভিন্ন ধরণের একটা কল্পগল্প পড়লাম। পরিবেশ বিপর্যয়কে এভাবে উপস্থাপনের ব্যাপারটাতে অভিনবত্ব আছে। শুভেচ্ছা রইল। এমন পরিপূর্ণ কল্পগল্প সামনে আরও পড়তে চাইম

    Reply
    • October 21, 2021 at 11:21 pm
      Permalink

      ধন্যবাদ।

      Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!