জিন মানব রবীন্দ্রনাথ

  • লেখক: নয়ন বসু
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

রবি তখনও থরথর করে কাঁপছিল। চারপাশের জনতা তাকে ঘিরে উল্লাসে ফেটে পড়ছে। একজোড়া বলিষ্ঠ হাত হঠাৎ তাকে শূন্যে তুলে নিল। সে তখন মানুষের মিছিলের কাঁধ থেকে কাঁধে ছড়িয়ে পড়ছে। সবার মুখে মুখে ফিরছে, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়!

অথচ তখনও রবি ভেতর ভেতর টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। জনতার আওয়াজ তার কানে অবধি পৌঁছচ্ছে, কিন্তু ভেতর অবধি যেতে পারছে না। সবাই বলছে জয় বিজ্ঞানের জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়! জিন মানব প্রকল্প সফল হয়েছে। মানবসভ্যতা এ যাত্রায় হয়তো বেঁচে যাবে। রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা এভাবেই সঞ্চারিত হোক এক মানুষ থেকে আরেক মানুষে!

জিন মানব প্রকল্প শুরু হয়েছিল দু-হাজার তিরিশ সালে। আজ দু-হাজার আটচল্লিশ। জিন মানব প্রকল্প শুরুর আগের একটু কথা না বলে নিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে না।

মানুষের জিন ম্যাপিংয়ের কাজ দু-হাজার শতকের প্রথম দিকেই শেষ হয়েছিল। তার আগেই মনুষ্যেতর প্রাণী, উদ্ভিদ- এদের জিন নিয়ে নানান গবেষণা হচ্ছিল, তার প্রয়োগও কিছু ক্ষেত্রে করা হচ্ছিল। কিন্তু কুকুরের ডিএনএ পরিবর্তন করে তাকে আরও হিংস্র করে তোলা আর মানুষের ডিএনএ পরিবর্তন করে তার দৃষ্টিশক্তি বাড়ানো বা মেধাবী বানানোর মধ্যে পার্থক্য তো থাকবেই।

সবার আগে এল সেই চিরাচরিত প্রশ্ন, খোদার ওপর খোদকারি করা উচিত কি অনুচিত। রক্ষণশীলরা অবধারিত বললেন, কোনও প্রশ্নই নেই। তাঁরা নিদান দিলেন ইভলিউশনের স্বাভাবিক গতিতে হস্তক্ষেপ করা মানে ঈশ্বর কি প্রকৃতির ছন্দকে হ্যাম্পার করা। 

তাঁরা উদাহরণ দিলেন, সবচেয়ে বেশি জিনগত রোগ দেখা যায় কুকুরের মধ্যে। কারণ কুকুর এমন একটি প্রাণী যাদের বিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষভাবে বারবার মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। তাদের জন্মলগ্ন থেকে। সুতরাং কুকুরের মতো মনুষ্যেতর প্রাণীর বিবর্তনের ধারাই মানুষ ঠিকভাবে সামলাতে পারেনি, সেক্ষেত্রে মানুষের মতো উন্নত প্রাণীর বিবর্তনে হাত দেওয়া মানে আগুন নিয়ে খেলা করা।

অপরদিকে প্রগতিশীল বলে নিজেদের যারা দাবি করতেন, তাঁরা বললেন, এসব ধনতান্ত্রিক চক্রান্ত। বললেন বিজ্ঞানের সব অগ্রগতিই স্বাভাবিক বিবর্তনকে প্রভাবিত করে এসেছে। খুব সাধারণ ঘটনা সিগারেট খাওয়া কি রোদের মধ্যে ঘুরতে গেলেও মানুষের ডিএনএতে তার প্রভাব পড়ে। পলিউশন ধরলে তো কথাই নেই। হিরোশিমাতে আজ অবধি বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয়।

তাদের বক্তব্য এসব করে বিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী সুফল বড়লোকেরা নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখতে চাইছে। এতে করে এক শ্রেণীর মানুষ সম্পূর্ণ নীরোগ জীবন পাবে। উদাহরণ হাতের সামনেই ছিল। জিনগত রোগের যেসব ওষুধ সেইসময় আবিষ্কৃত হয়েছিল, সেগুলি গরিব কি নিম্ন-মধ্যবিত্ত দূর, উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীরও নাগালের ঢের ঢের বাইরে ছিল। সুতরাং বৈষম্য চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছবে।

তাদের আরও দাবি ছিল, আজ না-হোক কাল এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে বড়লোকেরা নিজেদের বিবর্তন নিজে ঘটাবে। ক্রমবর্ধমান দূষণ কি নিত্যনতুন ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচাতে বড়লোকরা নিজেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এই পদ্ধতিতে বাড়িয়ে নেবে। এতে করে পৃথিবীতে দুই শ্রেণীর মানুষের বিবর্তনের ধারা দুই গতিতে বইবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই যোগ্যতমের উদবর্তন নীতিতে যাদের বিবর্তন স্বাভাবিক হারে হচ্ছিল, তারা মুছে যাবে পৃথিবী থেকে। যেমন তাসমানিয়ান টাইগার কি ডোডো পাখি।

এসব করতে করতেই পৃথিবী দেখল আরেক অতিমারী। দু-হাজার উনিশের শেষ দিক থেকেই শোনা যাচ্ছিল চিনের উহান থেকে করোনা ছড়িয়ে পড়ার কথা। দেখতে দেখতে দু-হাজার কুড়ির শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই গোটা পৃথিবী ছেয়ে গেল এই নতুন অতিমারীতে। স্প্যানিশ ফ্লুয়ের চেয়ে পৃথিবী একশো বছর এগিয়ে গেলেও করোনা সামলাতে সামলাতে পৃথিবীর সময় লাগল প্রায় তিন বছর। ততদিনে পৃথিবীর চার শতাংশ মানুষ মারা গেছেন। জিন নিয়ে বিতর্ক এই অতিমারীর জন্য খানিক থিতিয়ে গেল। 

কিন্তু অতিমারীর পরে এল তার চেয়েও বড় বিপর্যয়। দূষণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, গ্লেসিয়ার গলে যাওয়া তো ছিলই, তার ওপর যুক্ত হল কোল্ড ওয়ার। আবার সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ভয়াবহ দিন আবার ফিরে এল। একদিকের প্রধান মুখ চিন এবং কোরিয়া। অন্যদিকের প্রধান মুখ আমেরিকা জার্মানি আর ভারত।

দু-হাজার তেইশ থেকে দু-হাজার আঠাশ পর্যন্ত চলল এই ঠান্ডা লড়াই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে টেকনলোজিকাল নো হাউ শেয়ার, সবদিক থেকে মার খেল বৃহত্তর মানবসভ্যতা। আইনস্টাইনের ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ একবার শুরু হয়ে গেলে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ তিরধনুক নিয়ে লড়তে হবে মাথায় রেখে বিশ্বযুদ্ধ হল না। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি পৃথিবীবাসী চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে লাগল। 

একদিকে বায়োলজিক্যাল অস্ত্র, অন্যদিকে নিউক্লিয়ার বোমার ভয়, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, ভগ্নপ্রায় বিশ্বঅর্থনীতি। একটা সময় মনে হচ্ছিল, এই অন্ধকারের বুঝি শেষ নেই। 

এসবের মধ্যেই দু-হাজার আঠাশ সালে পৃথিবীর সাতচল্লিশটি দেশের মোট একানব্বই জন বিজ্ঞানী মিলে গঠন করলেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মঞ্চ। এতে চিন, ভারত, আমেরিকা, জার্মান, কোরিয়া, ইংল্যান্ড সব দেশের বিজ্ঞানীরা ছিলেন। ওঁরা একটি ভার্চুয়াল মিটিং আয়োজন করলেন। তাতে কোনও রাজনৈতিক নেতা, কোনও পুঁজিপতি ছিল না। গোটা পৃথিবীর মানুষ যাতে দেখতে পায়, এই গোটা আলোচনার পুরোটাই লাইভ আপলোড করা হয় ইউটিউবে। পুরোনো সব রেকর্ড ভেঙে গোটা পৃথিবীর একশো তিন কোটি মানুষ একসঙ্গে লাইভ দেখেছিল এই আলোচনা। অবশ্যই বিজ্ঞানীরা একমাস আগে থেকে জানিয়ে আসছিলেন এই আলোচনার কথা।

এই প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মিটিংয়ে এক অদ্ভুত বক্তব্য উঠে আসে। বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, পৃথিবীর মূল অসুখ গ্লোবাল ওয়ার্মিং, নিউক্লিয়ার বোম কি নিত্যনতুন রোগজীবাণু নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান একানব্বই জন মানুষ একবাক্যে মেনে নেন, পৃথিবীর মূল অসুখ সহমর্মিতার অভাব। 

মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্বই পৃথিবীর আসল অসুখ। কোনও মানুষ কোনও মানুষকে বিশ্বাস করে না। সমস্ত বিজ্ঞানী বলেন, একটি রুটি দুজন ক্ষুধার্ত মানুষ ভাগ করে খাওয়ার নাম মানবিকতা। কিন্তু একজন মানুষ আরেকজন মানুষের খিদের প্রতি কোনও অনুভূতি বোধ করে না। এবং পৃথিবীর সব অসুখের মূল এই অসুখ। 

বিজ্ঞানীরা এও বলেন, এখনও সমস্তকিছু শেষ হয়ে যায়নি। এখনও পৃথিবীর মাটি উর্বর। সব মানুষকে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এখনও পৃথিবীতে পর্যাপ্ত রয়েছে। সুতরাং একজন মানুষ যদি পাশের মানুষটাকে বিশ্বাস করতে পারে, তার দুঃখে দুঃখী হতে পারে তাহলেই আস্তে আস্তে এই কালো ছবিটা একদিন ঝলমল করে উঠবে।

কিন্তু বললেই তো আর হয় না, এর জন্য কিছু করতে হবে। কী করতে হবে? বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব দিলেন জিন মানব প্রকল্প। বিজ্ঞানীরা বললেন, সমস্ত পরিবর্তন শুরু হয় একেবারে গ্রাস রুট লেভেল থেকে। সাধারণ মানুষের সাধারণ ব্যবহার থেকে। কোনও বড় আদর্শ মানুষ তখনই জীবনে ব্যবহার করে যখন দেখে পাশের মানুষটা সেটা করছে।

এখানেই আবার ওঠে জিন গবেষণার কথা। বিজ্ঞানীরা বলেন পৃথিবীর ন-হাজার সাতশো তেরোটি শহরে একজন করে জিন মানবকে জন্ম দেওয়া হবে। তাদের জিন থেকে ঘৃণা, লোভ সরিয়ে দেওয়া হবে। সম্পূর্ণ অপসারণ সম্ভব নয় কারণ মানুষ নিজের প্রবৃত্তি অনুসারে নিজের ডিএনএ তে পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু গবেষণাগারে যতটা সম্ভব ততটা সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা হবে। 

গোটা পৃথিবীর মানুষ দু-হাত তুলে স্বাগত জানাল জিন মানব প্রকল্পকে। এমনকি পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্রনায়ক একবাক্যে মেনে নিলেন বিজ্ঞানীদের কথা। সমস্ত দেশ নিজের নিজের দেশের বিজ্ঞানীদের পাশে দাঁড়ালেন। গোটা পৃথিবীতে একটা সাড়া পড়ে গেল। 

ঠিক হল প্রতি শহরে সেখানকার সবচেয়ে বড় মানবতাবাদি মহাপুরুষের নামে এদের নামকরণ করা হবে। যেমন আমেদাবাদে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইত্যাদি। বিজ্ঞানীরা দু-বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে রিসার্চ সেন্টারে তৈরি করলেন আগামী পৃথিবীর সুপারহিরোদের।

তারপর দু-হাজার তিরিশ সালের পয়লা জানুয়ারি তাদের তুলে দেওয়া হল সেই সময়কার ন-হাজার সাতশো তেরোটি শহরের নির্বাচিত বিজ্ঞানী পরিবারের হাতে। তারাই এই শিশুর অফিসিয়াল পেরেন্টস। তাদের পরিবারেই ভবিষ্যতের ত্রাতারা বেড়ে উঠবে।

রবীন্দ্রনাথের বাবা মায়ের নাম ছিল পরিচয় আর ঋতুপর্ণা। তাঁরা লিভ টুগেদার করলেও কোনও সন্তান সচেতনভাবেই তাঁরা নেননি। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমঞ্চ যখন তাঁদের নাম ঘোষণা করল কলকাতার জিন মানবের ভাবী বাবা-মা হিসেবে, আজীবন বিজ্ঞানের সাধকসাধিকা সেই ভার গর্বের সঙ্গে স্বীকার করলেন। 

শিশু রবীন্দ্রনাথ আর পাঁচটা শিশুর মতোই বড় হচ্ছিল। পরিচয় আর ঋতুপর্ণা ছোট্ট রবির মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখেননি। প্রথম পার্থক্য তাঁদের চোখে ধরা পড়ল যখন রবি তিন পার করে চারে পড়ছে। 

সেদিন কোনও কারণে পরিচয়ের মনমেজাজ ভালো ছিল না। তিনি সন্ধেবেলা বসু বিজ্ঞান মন্দির থেকে ফিরে একগ্লাস রেড ওয়াইনের সঙ্গে বিঠোভেনের মুনলাইট সোনাটা চালিয়েছেন। ঋতুপর্ণা তখনও ফেরেনি। ওরা বাড়ি না থাকলে সাধারণত আহমেদ কি ডোরা থাকে। দুজনেই বিজ্ঞানী। তবে ওদের থেকে অনেকটাই জুনিয়র। আজ ডোরা ছিল। তিনি আসার পর ডোরা চলে গেছে। অনেক জুনিয়র বিজ্ঞানী আবার নিজে ভলান্টিয়ার করে রবির সঙ্গে সময় কাটাবে বলে। রবি তখন ওর সামনেই মেঝেতে বসে একটা টেডি বেয়ারের খেলনা নিয়ে খেলছিল। 

পরিচয় হঠাৎ লক্ষ করেন রবির খেলা থেমে গেছে। সে কিছুই করছে না। তার চোখে বিস্ময়। একটা শিশু কিছু করছে না, এটা একটা দেখার মতো বিষয়। তিনি আরও লক্ষ করলেন কোনও কারণ ছাড়াই রবির ঠোঁট ফুলছে। তিনি তাড়াতাড়ি করে এসে রবিকে কোলে নেন। ততক্ষণে সে শব্দ করে ককিয়ে কেঁদে উঠেছে। 

তিনি কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতেই গানটা বন্ধ করেন। একটু পর রবির কান্না আপনাআপনি থেমে যায়। তিনি আন্দাজ করতে পেরেই আবার গানটা চালু করেন। আবার ছোট্ট রবির ঠোঁট ফুলে ওঠে। তিনি গান বন্ধ করে দেন।

রাতে ঋতুপর্ণা ফিরলে ওরা অবাক বিস্ময়ে আলোচনা করতে থাকেন ওইটুকু বাচ্চার গভীরতা নিয়ে। মুনলাইট সোনাটা আদ্যন্ত মনখারাপের সুর। ছোট্ট রবি পিয়ানো জানে না, বিঠোভেন জানে না, নোটস জানে না। কিন্তু এই সুরের মধ্যে যে বিরহের মূর্ছনাটুকু আছে সেটুকু সে শুষে নিয়েছে। পরিচয় রবির নরম মাথায় একটা হামি খান। 

রবিকে নিয়ে রাস্তায় বেরোলে প্রথম প্রথম লোকে চেয়ে থাকত। পরিচয় আর ঋতুপর্ণা বোঝেন এটা স্বাভাবিক। সারা পৃথিবী এদের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্যান্য দেশ থেকেও তাঁরা খবর পান লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, আব্রাহাম লিঙ্কন, ভিক্টর হুগো, ডেল কার্নেগী, আনা ফ্রাঙ্ক, গান্ধী সবাই আস্তে আস্তে একই সঙ্গে বেড়ে উঠছে। তাদের অবস্থাও এক। রাস্তায় লোক দেখলে দাঁড়িয়ে পড়ে।

একদিন রাস্তায় এক বৃদ্ধা দূর থেকে রবিকে দেখে প্রণাম করলেন। ঋতুপর্ণা তাঁর ছেলেকে কোলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। একদিন এক বয়স্ক লোক হাতে একটা লাল সিঁদুরদানি নিয়ে এসে বলেন, মায়ের মন্দির থেকে নিয়ে আসছি। আমাদের ত্রাতার কপালে একটু লাগিয়ে দেই? 

পরিচয় বিনীতভাবে বারণ করে। ভদ্রলোক সিঁদুর কৌটোটা ঋতুপর্ণার হাতে ধরিয়ে চলে যান। বলে যান, মায়ের প্রসাদ মা, না করতে নেই। 

পরিচয় মানুষের এই রিয়াকশন বোঝেন। গোটা পৃথিবী যখন দ্বিধাবিভক্ত তখন বড় আশা নিয়ে গোটা মানবসভ্যতা এদের কচি মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। যে কোনও কাজেই সাধারণত বিরোধিতা করার কেউ না কেউ জুটেই যায়। কিন্তু আজ অবধি গোটা পৃথিবীতে জিন শিশুদের ওপর কোনওরকম আক্রমণ দেখা যায়নি। জাতি ধর্ম বর্ণ বয়স সামাজিক অবস্থান পয়সা সমস্ত কিছু নির্বিশেষে মানুষ এদের দু-হাত পেতে বরণ করে নিয়েছিল।

রবি যখন স্কুলে ভর্তি হল তখন তার চার সবে শুরু হয়েছে। স্কুলের শিক্ষকরা অবাক বিস্ময়ে দেখেন ছোট্ট রবিকে। ক্লাসের ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মা সবাই রবিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখে। বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের বলে রবিকে দেখে শিখতে। 

কিন্তু রবি এসবের কোনওকিছুর মধ্যেই নেই। ক্লাসের সবাই যখন তাকে আলাদা এটেনশন দেয় তখন তার খারাপ লাগে না। কোনওকিছুই তার খারাপ লাগে না। এই আকাশ বাতাস মাটি বাবা-মা তার বন্ধুবান্ধব পার্কের লোকজন রাস্তার পুলিশ সবই সে দেখে। দেখে অবাক হয়। পৃথিবী এত সুন্দর! গোটা পৃথিবী যে বিস্ময় নিয়ে রবিকে দেখে, রবিও গোটা পৃথিবীকে সেই বিস্ময় নিয়েই দেখে। পৃথিবীও মুগ্ধ হয়ে, রবিও। 

ক্লাসে রবির কয়েকজন বন্ধু হল। তিতাস, নারিন, উত্যান, আর্য্য আরও অনেকে। সবাই বলে সে নাকি স্পেশাল। রবি শোনে। শুনে অবাক হয়। সে তাদের সঙ্গে নিজের কোনও পার্থক্য বুঝতে পারে না। 

শুধু যেদিন ক্লাসের ম্যাডাম আর্য্যকে একটু কড়া গলায় বকলেন, রবি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ক্লাসের কেউ প্রথমে খেয়াল করেনি। কিন্তু ম্যাডামের বকা থামলে ক্লাস আবার নিশ্চুপ হলে সবাই অবাক হয়ে দেখে রবির দুটো চোখ দিয়ে জলের ধারা নামছে। 

রবির কান্না দেখে ম্যাডামের মনও গলে গেল। তিনি এসে রবিকে জড়িয়ে ধরলেন। ক্লাসের বাকি বাচ্চারা রবিকে দেখে কাঁদতে শুরু করল। ম্যাডাম অবাক হয়ে দেখলেন পাঁচ বছরের ঊনত্রিশটা বাচ্ছা একসঙ্গে কাঁদছে। আর্য্য অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এত অবাক সে তার এই ছোট্ট জীবনে কোনওদিন হয়নি। সবাই তাকে এত ভালোবাসে! আর্য্য বেঞ্চের কোণা শক্ত করে চেপে ধরে। সে তার চোখের জল কাউকে দেখাতে চায় না।

রবি বাড়ি এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘ক্লাসে সবাই আমায় স্পেশাল কেন বলে বাবা?’ বাবা-মা দুজনেই হাসে। বলে ‘তোমায় অনেক বড় মানুষ হতে হবে। রবি জিজ্ঞেস করে, বড় মানুষ কাকে বলে বাবা?’

পরিচয় বলে, ‘অন্যের দুঃখে যাদের চোখে জল আসে তারা বড় মানুষ।’ 

ঋতুপর্ণা বলে, ‘যে সবাইকে ভালোবাসে সে বড় মানুষ। তুমি একদিন অনেক বড় হবে। কত লোক তোমায় দেখে শিখবে!’

রবি বলে, ‘কিন্তু আমার তো বড় হতে ভালো লাগে না!’

পরিচয় আর ঋতুপর্ণা দুজনেই শব্দ করে হেসে ওঠে। দুজনে মিলে দু-দিক থেকে জড়িয়ে ধরে রবিকে। 

সব কিছুই একটা সময় পর থিতিয়ে আসে। রবিকে নিয়ে স্কুলে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস বছরখানেকের মধ্যে আগের চেয়ে অনেকটা কমে এল। একদিক থেকে সেটা ভালোই হয়েছিল। কিন্তু রবি সেই আগের মতোই আছে। 

ক্লাসে ম্যাডাম কি স্যার তার সামনে বকাবকি করেন না কাউকে। কিন্তু গার্জেন কল আগের থেকে বেড়ে গেছে। এমনকি স্বপ্নিল একদিন এসে রবিকে নালিশ করে, তার জন্য তার গার্জেন কল হয়েছে। 

রবি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, আমি কি করলাম?

স্বপ্নিল বলে, ম্যাডাম ক্লাসে বকে দিলে বাড়িতে বাবা-মা জানতে পারত না। কিন্তু ক্লাসে এখন কেউ বকে না বলে বাড়িতে বকুনি খাই। 

স্বপ্নিল শিশুর গলাতেই খুব জোরে বলল, ‘তুই বাজে রবি! তুই বাজে!’

রবি বুঝে উঠতে পারল না সে কী বলবে। কিন্তু স্বপ্নিলের কষ্ট দেখে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগল। সে চায় সবকিছু ঠিক করে দিতে। কিন্তু রবি জানে না কী করে। ছোট্ট রবি বুঝতে পারল কিছু কিছু জিনিস তার হাতে নেই। 

সেদিন বাড়ি গিয়ে রাতে শোয়ার আগে অবধি সে ভাবল। ভেবে দেখল, কিছু কিছু নয়, আসলে কোনওকিছুর ওপরেই তার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সে স্বপ্নিলের কষ্ট দূর করতে পারবে না। ম্যাডাম কেন কবে কাকে গার্জেন কল করবে তাও তার হাতে নেই। কিন্তু একটা সময় পর তার শুধু এটাই মনে হতে লাগল স্বপ্নিল তাকে কেন দোষী বলছে! অনেকক্ষণ কষ্টের পর তার মনে একটা অদ্ভুত ভাব এল। একটা অস্বস্তিকর আবেগ। রবি এই আবেগের নাম জানে না। কয়েক বিলিয়ন নিউরন তখন তার মাথার মধ্যে দপদপ করছে। 

একদিন সে স্কুলের বাস থেকে নামার সময় দেখল একটা বাচ্ছা ভিখিরি। অন্য দিন দারোয়ান মঙ্গললাল এদের স্কুলের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেয় না। কিন্তু সেদিন কোনও কারণে মঙ্গললাল ছিল না গেটে। 

রবি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখল বাচ্ছাটার জামা ছেঁড়া, নোংরা, নাক দিয়ে সর্দি বেরিয়ে আছে। বাচ্ছাটা তারই বয়সি হবে। তার ঘেন্না করল না। সে তার স্কুলের সাদা জামাটা খুলে তাকে দিয়ে দিল। প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকের সর্দি মোছাল। তার জলের বোতল থেকে জল নিয়ে বাচ্ছাটার মুখে চোখে দিল। 

ততক্ষণে মঙ্গললাল চলে এসেছে। সে বাচ্ছাটাকে তাড়াতে গিয়েও থেমে গেল। মঙ্গললাল দেখল রবি তার স্কুলের ব্যাগ থেকে টিফিন বের করে রাস্তার ওপরেই বসে পড়েছে। ততক্ষণে সে বাচ্ছাটার নাম জেনে গেছে। তার নাম ফেলা। ফেলা চেনে না কে রবি। তার কী মাহাত্ম্য। কিন্তু সে মানুষ চেনে। রবি টিফিনের পাউরুটি বের করে ফেলার মুখে পুরে দিচ্ছে। 

মঙ্গললাল, স্কুলের বাকি বাচ্ছারা অবাক চোখে এই দানযজ্ঞ দেখছে। কেউ কোনও কথা বলছে না। একটু পর ফেলা রবির সাদা শার্টটা পরে চলে গেল। রবি একটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে স্কুলে ঢুকল। 

সব কথা জানতে পেরে স্কুলের হেডমিস্ট্রেস রবিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রবি সেদিন বাড়ি চলে গেল। 

পরেরদিন স্কুলবাস থেকে নামতে গিয়ে রবিকে ছেঁকে ধরল প্রায় পনেরটা বাচ্ছা। রবি হাসিমুখে দেখল স্কুলবাসের বাকি বাচ্ছারা তাদের জামা খুলে তুলে দিচ্ছে বাচ্ছাগুলোর হাতে। ব্যাগ থেকে টিফিন বের করে খাওয়াচ্ছে তাদের। মঙ্গললাল কি করবে বুঝতে না পেরে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। হাজার হোক সে মানুষ। 

সেদিন রাতে ঋতুপর্ণা তার ছেলেকে বোঝাচ্ছিলেন, কখনও কখনও অনেক বড় ভালো কাজ করার জন্য ছোট ছোট খারাপ কাজ করতে হয়। 

রবি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল, ‘মানে?’

ঋতুপর্ণা বলছেন, ‘মানে ধর রোজ যদি তুই ওদের খাবার দিস, জামা দিস ওরা কি নিজে থেকে আর সেগুলো পাওয়ার জন্য কষ্ট করবে?’

– ‘ওরা তো ভিক্ষেই করে মা!’

– ‘আসলে আমাদের তো ওদের সবাইকে দেওয়ার মতো পয়সা নেই রবি!’

– ‘কার আছে?’

– ‘যারা অনেক বড়লোক তাদের আছে।’

– ‘তাহলে তারা দেয় না কেন মা? ওদের কি কমে যাবে দিলে?’

এখানে এসে ঋতুপর্ণাকে চুপ করতে হয়। সে পরিচয়ের দিকে তাকায়। পরিচয় বলে, ‘তুমি যখন অনেক বড় হবে, তখন ওই বড়লোক এই রাস্তার বাচ্ছা, সবাই তোমার কথা শুনবে। তখন তুমি ওদের সবার মধ্যে সবকিছু ভাগ করে দিও।

– ‘তাহলে এখন ওরা খেতে চাইলে কি করব বাবা?’

– ‘দেবে না। নিজে খাবে।’

রবি ছোটবেলা থেকেই খুব বাধ্য। সে চুপ করে বাবা-মায়ের কথা মেনে নিল। কিন্তু রাতে অনেকক্ষণ রবির ঘুম আসতে চাইল না। সে একাই ঘুমোয় রাতে। বাবা-মা পাশের ঘরে। তার ঘরে একটা আলো আছে। তাতে তার সিলিঙে চাঁদ, সূর্য, তারাদের ছায়া পড়ে। বাবা-মা বলেছে এই পৃথিবী কত বড়, সূর্য তার চেয়েও কত বড়! আবার অনেক তারা আছে যাদের কাছে সূর্য এই ছোট্ট এইটুকুনি! রবি সিলিঙে তারা দেখে আর তার বালিশটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। নিজের অজান্তেই রবি বালিশের ওয়াড়ের কোণাটা দাঁত দিয়ে খুঁটতে থাকে।

পরের দিন সে স্কুলবাস থেকে নেমে দেখে কেউ কোথাও নেই। মঙ্গললালের সঙ্গে আরও দুজন দারোয়ান নতুন এসেছে। রবির ফেলার জন্য খুব মনকেমন করে উঠল। তারপর সে ক্লাসে চলে গেল।

রবির যখন ক্লাস ওয়ান, তখন তার সঙ্গে পরিচয় হল আরেক রবীন্দ্রনথের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। স্কুলের প্রেয়ারে। সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সে গায় জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা। 

রবি অবাক হয়ে যায় শুনে তার নাম এই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম থেকে নেওয়া হয়েছে। তখন তার কাছে জাতীয় সংগীতের মানে শুধুই স্কুলের মর্নিং প্রেয়ার। বাড়ি এসে ঋতুপর্ণা তাকে শেখায় এটা আমাদের দেশের জাতীয় সংগীত। 

রবির সবচেয়ে ভালো লাগে ওই জায়গাটা। ‘তব শুভ নামে জাগে, তব শুভ আশীষ মাগে গাহে তব জয়গাথা।’ এই জায়গাটাই যে কেন তার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে সে জানে না। হালকা আন্দাজ করে দেশের সবাই তাকিয়ে আছে দেশের ভাগ্যবিধাতার ওপর। সে কি মানুষ নাকি অন্য কিছু! সে যেই হোক সে কী করবে? 

এতদিনে সে দেখে নিয়েছে কলকাতার রাস্তার ভিখিরি, রাস্তায় মানুষের নোংরা ফেলা, বিশাল বাড়ির পাশে ঝুপড়ি বস্তি, সে দেখে নিয়েছে রাস্তায় চলতে চলতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কেউ দাঁড়িয়ে পড়ে না। 

তাদের পাশের বাড়ির রক্তিম আঙ্কেলের যখন চাকরি চলে গেল তখন আঙ্কেল তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। রক্তিম আঙ্কেলের ছেলে তার চেয়ে একটু বড়। অন্যদিন আঙ্কেল এলে সে ছুটে যায়। আঙ্কেল তাকে আদর করে। কিন্তু সেদিন বাবা-মা তাকে আঙ্কেলের সামনে বেরোতে দেয়নি। গোটা ব্যাপারটা তার ভালো লাগেনি। খুব বেশি সে কিছু বুঝতে পারেনি। কিন্তু কিছু একটা খোঁচা সে টের পেয়েছে।

সেদিন রাতে তারা একটা বড় হোটেলে খেতে গেছে। হোটেলের ম্যানেজার তাকে চিনতে পেরে তাদের সকলের সঙ্গে ছবি তুলেছে। ম্যানেজার বারবার ছবি তোলার সময় বলেছে, ‘হাসো বাবা একটু, মুখটা গম্ভীর করে থাকলে ভালো ছবি আসবে না। হ্যাঁ, একটুখানি, একটুখানি হাসো!’

রবি হাসে। ছবি ওঠে।

ভাগ্যবিধাতা কি করবে রবি ভাবে। আর সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি ভেবে এই গানটা লিখেছিল! সে এসে সবাইকে শাস্তি দেবে! কিন্তু কেউ শাস্তি পাচ্ছে সে দেখতে পারে না। তার কষ্ট হয়। যে বড় সে কি শাস্তি দেয়? বড় হলে কি শাস্তি দিতে হয়? 

মা-বাবা বলেছে তাকেও একদিন খুব বড় হতে হবে। বিশাল বড় হতে হবে। তাহলে সে কি ভাগ্যবিধাতা হবে! তাহলে তাকেও কি কাউকে শাস্তি দিতে হবে? শুভ আশীষ জিনিসটাও কি রবি ভেবে পায় না। মাকে জিজ্ঞেস করেছিল। মা বলেছে ভালো চিন্তা, অন্যের ভালো চাওয়া। 

সে তো ফেলার ভালোই চেয়েছিল। শুভ আশীষ দিয়েছিল। কিন্তু ফেলার কি ভালো হয়েছে তাতে! তাহলে কি শুভ আশীষে কাজ হয় না! তাহলে কীসে কাজ হয়? কিন্তু যাঁর নামে তার নিজের নাম তিনি তো বিশাল জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তিনি কি ভুল করবেন? আর তিনি যদি ভুল করেন তাহলে সেই বা কী করে ঠিকটা জানবে!

এভাবেই রবি বড় হচ্ছিল। রাস্তাঘাটে আর তাকে দেখলে লোকজন আগের মতো হামলে পড়ে না। সে স্কুলে যায়, বাড়ি আসে। ক্লাসের হোমওয়ার্ক করে। পরিচয় তাকে মাঝে মাঝে রাতের আকাশে তারা চেনান। এটা কালপুরুষ, ওটা ছায়াপথ। এই সময়টা রবির সবচেয়ে প্রিয় সময়। আকাশ দেখা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি খুব সুন্দর একটা গান লিখে গেছেন এটা নিয়ে। আকাশভরা সূর্যতারা বলে। বাবা একদিন চালিয়েছিল। দেবব্রত বিশ্বাস বলে একজন শিল্পীর গলায়। চার-পাঁচ লাইন যেতে না যেতেই রবি অজ্ঞান হয়ে যায়। গান বন্ধ করে বাবা-মা ছুটে এসেছে।

জ্ঞান ফিরলে রবি বলেছে ওর মনে হচ্ছিল বিশাল কিছু একটা যেন ওর শরীরের ভেতর ঢুকতে চাইছিল। কিন্তু সে অতো বড় নয়। কি প্রবল বিশালতার ভার তার ওপর! তার মনে হচ্ছিল সেই বিশালতার চাপে সে পিষে যাবে। তাই ভয়েতে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। 

পরিচয় আর ঋতুপর্ণা চোখ চাওয়াচায়ি করেছে। 

অথচ তার মাসখানেকের মধ্যেই তারা দেখেছে রবি একা একা মিউজিক প্লেয়ারে আকাশভরা চালিয়ে শুনছে। শুনছে আর কেঁপে কেঁপে উঠছে। 

স্কুলে এখন আর রবি কেউ শাস্তি পেলে কান্নাকাটি করে না। কেউ ভিক্ষে চাইলে মাথা ঘুরিয়ে নেয়। রাস্তার সবাই তাই করে। সেও তাই করে। সে যে আলাদা সেটা সে ভুলতে চায়। তার মনে হয় সবার কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে। বিশাল বড় ভুল। আসলে সে বা অন্যান্য জিন মানবরা আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই শুধু আরেকটা মানুষ। তাদের সঙ্গে বাকিদের কোনও পার্থক্য নেই। 

রবি এটাও বুঝতে পারে তার প্রথমদিন স্কুলে আসা আর আজকের মধ্যে কোত্থাও কিচ্ছু চেঞ্জ হয়নি। সব আগের মতোই আছে। কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে কি শাস্তি পেতে দেখলে তার কষ্ট হয়। আগের মতোই হয়। কিন্তু আগের মতো সে কাঁদে না। অন্তত সকলের সামনে তো নয়ই। সে চুপ থাকে। রাতে বালিশের ওয়াড় দাঁত দিয়ে ছেঁড়ে।

তার কিছু কিছু বন্ধু বলে আসল হল ক্ষমতা, পাওয়ার। যার পাওয়ার আছে তার সব আছে। তার দামি গাড়ি আছে, দামি বাড়ি আছে, তারা ভালো ভালো জামাকাপড় পরতে পারে, গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। যখন পৃথিবীর সত্তর শতাংশ মানুষ আধপেটা খেয়ে ঘুমোতে যায় তখন তারা মঙ্গল গ্রহে গরমের ছুটি কাটাতে যায়। 

রবি মাঝে মাঝে তর্ক করার চেষ্টা করে, ‘আমরাই বা কি খারাপ আছি! আমাদেরও তো সব আছে।

শার্দূল বলে তার বাবা বলেছে, কিছু মানুষ কিছু মানুষের ওপর অত্যাচার চালায়। সেজন্য পৃথিবীটা এরকম। আবার আজ যারা অত্যাচারিত হচ্ছে কাল তাদের হাতে ক্ষমতা গেলে তারাও ঠিক একই জিনিস করবে। তারও অত্যাচার করবে। 

রবি ভাবে তাহলে এর কি কোথাও শেষ নেই! কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো এরকম কথা লিখে যাননি। উনি সবসময় বলেছেন রাজা এসে সব ঠিক করে দেন। অমল ও দইওয়ালাতেও শেষে রাজা আসেন। এটা পড়তে রবির খুব ভালো লাগে। 

এমন করতে করতে রবি যখন ক্লাস সিক্সে উঠল, সে আবিষ্কার করল তার কোনও বন্ধু নেই। এটা যে তার সঙ্গে পড়া বাকি ছেলেমেয়েদের দোষ হলেও হতে পারে, একথা তার মাথাতেও এল না। তার মনে হল তার নিজেরই কোনও সমস্যা আছে। একদিকে গোটা শহর রাজ্য জানে সে ভবিষ্যতের নায়ক। তাকে গোটা মানবজাতির ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠতে হবে। হবেই। আর এদিকে তার নিজের কোনও বন্ধুই নেই।

যার কোনও বন্ধু নেই, যে একা সে কী করে কোনও কিছু ঠিক করবে সেটাই রবির মাথায় ঢোকে না। সে দেখে সবাই তাকে ভালোবাসে, সেও সবাইকে ভালবাসে। কিন্তু কোথাও একটা দেয়াল আছে। সেটা কোথায় কীরকম দেয়াল রবি বুঝতে পারে না। কিন্তু তার খুব একা লাগে। যার কাছে সবার এসে নতুন কিছু শেখার কথা তার একা লাগলে কী করা উচিত সে জানে না। 

সে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে। নিজের ঘরে গিয়ে দেখে পশ্চিমের জানলাটা খোলা। তখনও আকাশের আলো পুরোপুরি মরে যায়নি। পশ্চিমের আকাশ লাল। জানলার গ্রিল পেরিয়ে কনে দেখা আলো এসে পড়েছে ঘরে। দূর দিয়ে কটা পাখি উড়ে যাচ্ছে। 

রবি গিয়ে ঠকাশ করে জানলাটা বন্ধ করে দেয়।

পনেরো বছর বয়সে গিয়ে রবি প্রেমে পড়ে। তখন তার ক্লাস নাইন। তার থেকে এক ক্লাস নীচে কুর্চি বলে একটা মেয়ে নতুন জয়েন করে। তার বাবার ঘুরে ঘুরে চাকরি। কলকাতায় কয়েক বছর থাকবে। 

কুর্চি নিজেই এসেছিল রবিকে দেখতে। বলল, ‘তুমিই জিন মানব?

রবি অবাক হয়ে মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। মেয়েটা বলেই চলেছে, ‘আমি তো দিল্লিতে ছিলাম এর আগে। ওখানে গালিব আছে। এখানে রবীন্দ্রনাথ। হি হি!

রবি কিছুই বলতে পারে না! কুর্চিই বলে যায়, ‘এই এরকম করে চেয়ে আছো কেন? প্রপোজ করবে নাকি? আমার কিন্তু স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে।

রবি তাও কিছু বলে না। কুর্চি তার দুজন নতুন বন্ধুকে নিয়ে এসেছিল। দুজনকেই রবি চেনে। তরু আর কল্লোল। তারা কুর্চির এই ধরনের ব্যবহারে একটু অপ্রস্তুত।

এদিকে কুর্চি বলেই চলেছে, ‘তবে গালিব একটু বেঁটে তোমার থেকে। ইতিমধ্যেই সে তিন-তিনটে বই লিখেছে!’

কুর্চি হাতের তিন আঙুল তুলে তিন দেখাল।

– ‘সেগুলো সব হট কেকের মতো বিক্রি হচ্ছে। কি নিয়ে জানো? বাগান করা নিয়ে। কি মজা না? কোথায় অরিজিনাল গালিবের মতো দুঃখ দুঃখ কবিতা লিখবে কি লাভ টাভ নিয়ে লিখবে, লিখছে কি! না এই ফুল ওই ফুল। আজ এই ফুলের সঙ্গে ওই ফুল জোড়া দিলাম কাল এই গাছের পাশে সারারাত বসে ফুলের গন্ধ শুঁকলাম! হি হি! দিল্লির লোক বলে দিয়েছে একে দিয়ে কিস্যু হবে না! তবে রবীন্দ্রনাথ তো এটুকুও করতে পারেনি! খালি তখন থেকে ভ্যাবলা মুখ করে চেয়ে আছে! হি হি!

পাশ থেকে কল্লোল বলছে, ‘এই রবিদাকে কীসব বলছিস! কত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট জানিস? সবাই বলে বড় বিজ্ঞানী হবে।

– ‘তাহলে তো হয়েই গেল! বিজ্ঞানীরা জিন মানব তৈরি করল আমাদের জন্য। এরা আমাদের জন্য কিছু না করে এ গাছের তলায় বসে থাকবে, ও বিজ্ঞানী হয়ে মাসে মিলিয়ন ডলার ইনকাম করবে। আমরা যেখানে থাকার সেখানেই থাকলাম। হি হি! এই যে রবীন্দ্রনাথ, একটা কবিতা বলো তো! হি হি!

কুর্চি উত্তরের অপেক্ষা না করেই ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল। রাগ রবির জিনে নেই। অপমান তার লাগল না। তার যেটা লাগল তার নাম নিখাদ ভালো লাগা। কুর্চিকে অনেকটা শাস্তির চন্দরার মতো দেখতে। ছোটখাটো গড়ন। মুখটা মিষ্টি। গায়ের রং একটু চাপা। শুধু চুলটা বয়েজ কাট।

কুর্চির ঝড়ের মতো চলে যাওয়ার পর রবি দেখল কল্লোল আবার ঘুরে আসছে। বললো, কিছু মনে করো না রবিদা, মেয়েটা একটু ওইরকম। 

রবি একটু হেসে জানাল সে কিছু মনে করেনি।

কল্লোল আরেকটু ইতস্তত করে বলল, ‘ওর বয়ফ্রেন্ড টয়ট্রেন্ড কিচ্ছু নেই। ওই পাগল মেয়ের আবার বয়ফ্রেন্ড!’

রবি আবার হাসে। 

কিন্তু কল্লোল এই কথাটা কেন বলল! না বললে কি এই মুহূর্তে তার ভেতর যেটা হচ্ছে সেটা হত না? কেন এমন মেয়ের বয়ফ্রেন্ড থাকতে নেই! কী খারাপ আছে কুর্চির মধ্যে! অথচ কুর্চির বয়ফ্রেন্ড আছে এই কথাটা চিন্তা করতেও রবির কষ্ট হচ্ছে।

সেই রাতে রবি জীবনে প্রথম বুঝল পেটের ভেতর প্রজাপতি ওড়ার উপমাটা কেন দেওয়া হয়। একটা মিষ্টি মিষ্টি কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে, ভালোও লাগছে। ঠিক বন্ধু হওয়ার জন্য বা কাউকে বন্ধু হিসেবে পাওয়ার জন্য কষ্ট নয়। রবির রবীন্দ্রসংগীত শুনতে ইচ্ছে হল।

সে মোবাইলে চালাল, ওই জানালার ধারে বসে আছে করতলে রাখি মাথা, তার কোলে ফুল পড়ে রয়েছে সে যে ভুলে গেছে মালা গাঁথা। 

রবি গান শোনে আর মনে মনে কল্পনা করে কুর্চি একটা পুরোনো জমিদারবাড়িতে একটা জানলার ধারে বসে আছে। কালো শিকের জানলা। কাচের পাল্লাও আছে। কাচগুলোর নানান রকম রং। সবুজ হলুদ লাল নীল। কুর্চির গায়ে একটা লাল পাড় সাদা শাড়ি। আকাশে কালো করে মেঘ করে এসেছে। কুর্চি উদাস চোখে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। তার কোলে কয়েকটা সাদা বকুলফুল পড়ে আছে।

গান শুনতে শুনতে একসময় রবি ঘুমিয়ে পড়ল। 

পরেরদিন স্কুলে রবি ভয়ে ভয়ে গেল। ভয়ে কারণ যদি কুর্চির সঙ্গে দেখা হয়ে যায়! অথচ রবি ঠিক সেটাই চাইছিল। দেখা হলও। দূর থেকে দেখতে পেল কুর্চি তার বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে ক্লাসে আড্ডা দিচ্ছে। খিলখিল করে হাসছে মেয়েটা। এতদূর থেকেও রবি কুর্চির হাসির আওয়াজ শুনতে পেল।

কয়েকদিন কেটে গেল। রবির মাথায় কুর্চি ছাড়া কোনও চিন্তা আসছে না। এতে তার খারাপও লাগছে না। বালিশের ওয়াড় চেবান এখন বন্ধ।

হঠাৎই একদিন কুর্চির সামনে পড়ে গেল রবি। সে কুর্চির ক্লাসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আড়চোখে খুঁজছিল কুর্চিকে। আচমকা কুর্চি ভূতের মতো সামনে এসে উদয় হয়েছে। 

– ‘এই যে জিন মানব। এদিকে ঘুরঘুর করা কেন? তোমার ক্লাস তো ওদিকে। ও আমায় দেখতে এসেছিলে বুঝি? হি হি! তুমি কিন্তু গালিবের চেয়ে বেশি হ্যান্ডসাম। সত্যি করে বলতো আমায় দেখতে এসেছিলে না শিউলিকে দেখতে এসেছিলে? হি হি!’

শিউলি ওদের স্কুলের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে। কুর্চির ক্লাসেই পড়ে। শেষের কবিতার লাবন্যর কথা মনে পড়ে যায় শিউলিকে দেখলে। রবির মনে হয় সে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আর কোনওদিন কুর্চির কথা ভাববে না। আর আসবেও না এদিকে।

কিন্তু আবার দু-দিন পরে রবি খুঁজতে থাকে কুর্চির মুখ। এখন কেউ চিঠি লেখে না। মেলও ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এখন ‘টাচ’ খুব চলছে। এর মানে বন্ধু প্রেম কি অন্য যে কোনও কিছু হতে পারে। কেউ কাউকে টাচ পাঠালো মানে সে তার কথা ভাবছে। রবি এসবের থেকে দূরে থাকে। যে মানুষগুলোকে ছোঁয়া যায় না, তাদের স্ক্রিনে দেখতে ভালো লাগে না রবির।

রবি একটা চিঠি লিখল। পকেটে করে নিয়ে ঘুরে বেরাল কদিন। তারপর ডাস্টবিনে ফেলে দিল। চিঠিটা ঠিক করে লেখা হয়নি। আবার করে লিখতে হবে।

কুর্চি একদিন করিডোরে রবিকে ধরল। বলল, ‘তোমায় টাচ পাঠালাম, তুমি কেন পাঠালে না? ও, তুমি তো জিন মানব। আমার মতো রেগুলার পাবলিককে তোমার কেন ভালো লাগবে!’

রবি একটু আহত স্বরে বলল, আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই। 

– ‘কি বলে গো ছেলে! হি হি! রবীন্দ্রনাথ সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই! তাহলে তুমি কোথায় আছ গোওও?’

– ‘এই তো তোমার সামনে। দেখতে পাচ্ছ না?’

কুর্চি খানিকক্ষণ থামল। তারপর বললো, ‘আচ্ছা জিন মানবগুলো এমন অদ্ভুত টাইপের হয়। তা টাচের রাউন্ড রিপ্লাই না করলে কী করে বুঝব? ধুস, তুমি একটা কুমড়ো! হি হি!’

কুর্চি যেমন এসেছিল, তেমনি ঝড়ের মতো চলে গেল। রবি বাড়ি গিয়ে টাচ খুঁজতে লাগল। পেয়েও গেল। কুর্চির একটা ছবি দেখাচ্ছে। এই ছবিতে কুর্চিকে ফর্সা দেখাচ্ছে। গালটা লাল। মাথায় খুব সম্ভবত যেটা পরে আছে সেটাকে উইগ বলে। রবি চিনতে পারল না কুর্চিকে। মনে হল কুর্চির মতো দেখতে কেউ বসে আছে ছবিতে। এবং ছবির মেয়েটা একা। খুব একা।

সেই রাতেই রবি একটা চিঠি লিখল। লম্বা চিঠি। তিন পাতার। পরের দিন কুর্চিকে দিতেই কুর্চির মুখটা হাসি হাসি হয়ে গেল। 

– ‘আমার অনেকদিনের শখ ছিল কোনও জিন মানব আমায় চিঠি দেবে। হি হি!’

– ‘কাউকে প্লিজ বলো না। সব কথা সবাইকে বলা যায় না। উচিতও নয়।’

– ‘এমা, একি! এতো বাংলায় লেখা!’

রবি অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ তো?’

– আমার তো সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিন্দি। থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ফ্রেঞ্চ। 

রবি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে কী করবে সে জানে না। 

– ‘এর জন্য বাংলা শিখতে পারব না বাবা। এই বলে দিলাম। তার চেয়ে তুমি এটা বরং শিউলিকেই দাও। ও বাংলা পড়তে পারে। অনেক মোটা মোটা বইও নাকি পড়তে পারে! আমার বাবা জিন মানবের থেকে চিঠি পাওয়া হয়ে গেছে! হি হি!’

রবির রাগ হল না। সে রাগতে পারে না। সে চিঠিটা কুর্চির হাত থেকে নিয়ে তার সামনেই কুচি কুচি করে ছিড়ে ফেলে দিল। 

ক’দিন পর রবি দেখল কুর্চি জায়ানের গাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছে। জায়ানের গাড়িটা বিশাল। একটা অস্ট্রিক মডেলের গাড়ি। সারা ভারতে সাকুল্যে একুশটা অস্ট্রিক আছে। রবি দেখল কুর্চি হাসতে হাসতে জায়ানের গাড়ি থেকে নামছে। রবির রাগ হল না। সে রাগতে পারে না। কিন্তু সে কোনও কারণে খুশিও হতে পারল না। শুধু কোনও অজানা কারণে তার মাথার রগদুটো দপদপ করতে লাগল। একটু বাদে রবি বুঝতে পারল তার জ্বর আসছে।

রবি বাড়ি ফিরে এল। ঋতুপর্ণা তখন বাড়িতে ছিলেন। ছেলেকে দেখেই বললেন, কী হয়েছে তোর? চোখদুটো লাল কেন? 

তারপর রবির কপালে হাত দিয়ে দেখলেন ছেলের গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। তিনি উত্তেজিত হলেন না। ঠান্ডা মাথায় ডাক্তারকে ফোন করলেন। ডাক্তার অসুধ দিয়ে দিল। সাধারণ জ্বরের অসুধ। বাড়িতেই ছিল সেটা। 

রবি ওষুধ খেয়ে বিছানায় গিয়ে শুল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। একটু বাদে ঋতুপর্ণা গিয়ে দেখেন ঘুমের মধ্যেই রবি বিছানার চাদরটা শক্ত করে খামচে ধরে আছে। চাদরটা কুঁচকে গেছে। 

রাতে রবি লাল চোখ নিয়ে উঠল। সামান্য কিছু খাবার খেল। তারপর পুতুলের মতো গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। 

ঋতুপর্ণা সকালে উঠে দেখেন মাথার বালিশের ওয়াড়টা ফালাফালা হয়ে মাটিতে লুটচ্ছে।

টেন্থ স্টান্ডার্ডে প্রত্যাশা মতোই রবির ভালো ফল হল। অনেকেই বললেন যে হল ভবিষ্যতের আইনস্টাইন। অনেকে বললেন এমন মাথা স্বাভাবিক সাধারণ মানুষের হয় না। জিন মানব বলেই এমনটা সম্ভব হয়েছে।

পরিচয় ঋতুপর্ণা খানিক প্রটেস্ট করেছিল। রবির জিনে এমপ্যাথি আছে। প্রতিভার জন্য আলাদা করে কোনও জিন মডিফিকেশন করা হয়নি।

কিন্তু রবির কিছুতেই কিছু এসে যায় না। কুর্চি বলেছিল জিন মানব প্রোগ্রাম ব্যর্থ হচ্ছে। গালিব গাছ নিয়ে পড়ে আছে। সে চোখের সামনে কেমিস্ট্রির ফর্মুলা কি ফিজিক্সের কোনও লজিক অথবা অবনীন্দ্রনাথের কোনও ছবি সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার দেখতে পায়। বুঝতে পারে এগুলোর মধ্যে তেমন কোনও পার্থক্য নেই। অথবা কখনও কখনও মনে হয় একেকটা কবিতা একেকটা অংকের স্বতঃসিদ্ধের মতন।

কিন্তু মানবজাতির কী হবে! জিন মানব প্রজেক্ট ফেল করবে? বাকি জিন মানবদের খবর সে জানে না। জানার খুব একটা আগ্রহ বোধ করে না বলেই জানে না। তারা পৃথিবীকে চেঞ্জ করা শুরু করে দিলে তার খারাপ লাগবে সে নিজে কিছু পারছে না বলে। আর তারাও তার মতো ব্যর্থ হলে তার আরো খারাপ লাগবে। তার চেয়ে না জানা ভালো।

এর মধ্যেই ছোটখাটো চুরি ডাকাতি ধর্ষণের খবর কানে আসে। বিশ্বঅর্থনীতি এখনও কোনও আলোর রেখা দেখতে পায়নি। পানীয় জলের জন্য হাহাকার গোটা বিশ্ব জুড়ে। পানীয় জলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। অনেকেই বলছেন যুদ্ধ শুধু সময়ের অপেক্ষা। বিজ্ঞানীরা বলছেন জিন মানবদের এখনও সময় দিতে হবে। 

কীসের কী সময় দিতে হবে রবি বুঝতে পারে না। তাদের পাড়ার তাদের শহরে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ক্রাইমগুলোর সঙ্গে বিশ্বঅর্থনীতি, বিশ্ববাজারের যোগ আছে সে আবছা বুঝতে পারে। অথবা ক্লাসের দুটো বাচ্ছা ছেলের মধ্যে মারপিট আর দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ এই দুটোও কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এভাবেই টুকরো টুকরো অবিশ্বাস হিংসে ইনসিকিউরিটি জমতে জমতে একটা বাড়ি তৈরি হয়। বাড়ি থেকে পাড়া, পাড়া থেকে শহর, শহর থেকে রাজ্য, জেলা, দেশ হয়ে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসে ভাসতে থাকে অবিশ্বাসের বীজ, অবিশ্বাসের ডিএনএ। কী করে এই সাইকেলের বাইরে বেরোতে হয় রবি জানে না।

অথচ সে কারুর ওপরেই রাগ করতে পারে না। চোর ডাকাত ধর্ষক কারুর ওপর তার কোনও রাগ নেই। এবং সে একা।

পরিচয় আর ঋতুপর্ণা জানিয়েছে তারা আর একসঙ্গে থাকতে পারবে না। রবি খুব শান্ত মনে শুনেছে কথাটা। বাবা- মায়ের ওপর তার কোনও রাগ নেই। সে বুঝতে চাইছে কেন তারা আর একসঙ্গে থাকতে চাইছে না। ঠিক যেমন সেদিন সে কুর্চিকে বুঝতে চেয়েছিল। পরিচয় জানাল তার সঙ্গে ঋতুপর্ণার আর মানসিকতা মিলছে না। মাও তাই জানাল। খুব শান্তভাবে। 

তাহলে কি দূরে থাকাই ভালো! মানুষের ডিএনএ-তে কি কিছু ফল্ট আছে? যে কোনও মানুষই আরেকটা মানুষের খুব কাছে এলে বেশিদিন তারা একসঙ্গে থাকতে পারবে না! 

রবির হাসি আসে। গোটা পৃথিবীকে যার এক করার কথা, সে নিজের বাড়িতে নিজের বাবা মাকে এক করতে পারে না। জিন মানব প্রজেক্টের এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী-ই বা হতে পারে! 

একদিন পরিচয় ঋতুপর্ণার বালিগঞ্জের বাড়ি থেকে নিজের সব জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেল। কোনও ঝগড়া নয়, কোনও মনোমালিন্য নয়। ভীষণ ম্যাচিওরড ভাবে গোটা প্রক্রিয়াটা হল। পরিচয় শুধু ছাদের ঘরের টেলিস্কোপটা নিয়ে গেল না। ওটা দিয়ে সে আর রবি তারা দেখত। 

রবি বড় হয়ে গেছে। এবার থেকে সে শুধু মায়ের সঙ্গে থাকবে। পরিচয় মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবে তাকে। 

পরিচয় আর ঋতুপর্ণা ভেবেছিল যে ছেলে মুনলাইট সোনাটা শুনে কেঁদে ভাসাত, সে নিশ্চয়ই খুব ভেঙে পড়বে। কান্নাকাটি করবে। কিন্তু রবি সেসব কিছুই করল না। রবি শুধু অবাক হয়ে ভাবতে লাগল সে কী করে এতদিন কিছু বুঝতে পারেনি! বাবা-মায়ের সঙ্গে সে একছাদের তলাতেই থেকেছে। এক টেবিলে বসে খাবার খেয়েছে, একসঙ্গে গান শুনেছে, বাবার কাছে অঙ্ক বুঝেছে, মায়ের কাছে ফিজিক্স বুঝেছে। কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি তাদের দুজনের মধ্যে কোনও দেয়াল তৈরি হচ্ছিল। 

রবির বারবার মনে হয় দুজন শিক্ষিত ভালো মানুষ যদি একসঙ্গে থাকতে না পারে তাহলে গোটা পৃথিবীর সাড়ে ছশো কোটি মানুষ কী করে একসঙ্গে থাকবে! নাকি একসঙ্গে থাকার জন্যেও একটু আড়াল দরকার হয়? একটু আড়াল না থাকলে সম্পর্ক টেঁকে না! 

পরিচয় চলে যাওয়ার পর একদিন একদিন সকালে ঋতুপর্ণা রবিকে ডাকতে এসে দেখেন সারা ঘর ছেড়া কাগজে ভরে আছে। যেকটা হার্ডকভার বই ছিল রবির ঘরে সব ছিড়ে মাটিতে লুটচ্ছে। রবি নিজের মতো বিছানায় ঘুমোচ্ছে। 

ঋতুপর্ণা আঁতকে উঠলেন এই কথা ভেবে হার্ডকভার বই এখন প্রায় পাওয়াই যায় না। ন্যাশান্যাল লাইব্রেরিতে পরিচয়ের জানাশোনা ছিল আর জিন মানব হিসেবে রবির জন্য স্পেশাল পারমিশন করিয়ে বইগুলো আনা হয়েছিল। স্কুলের পড়াশোনার বই থাকতে পারে। তারপর ভাবলেন সব বইয়েরই সফটকপি মাদার ডিস্কে আছে। সুতরাং অসুবিধে হবে না।

তিনি রবির মাথার পাশে এসে বসেন। রবি ঘুম থেকে উঠে ঘরের অবস্থা দেখে হতবাক। ঋতুপর্ণা জিজ্ঞেস করেন, এই বইগুলো তোর কত প্রিয় ছিল! কেন করলি বাবা এরকম?

রবি শূন্য দৃষ্টি নিয়ে একবার ঘরের দিকে তাকায়, একবার মায়ের দিকে। তারপর দুটো হাত দিয়ে মাথাটা দুদিকে চেপে ফিসফিস করে বলল, আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না মা, আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না!

রবি প্রবল আতঙ্কে দু-হাতে শক্ত করে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরল।

রবি রাগতে পারে না। কিন্তু বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগে। তার কোনও বন্ধু নেই। কুর্চি নেই। বাবা নেই। মা-ও কি আছে? নাকি মায়ের সঙ্গেও একটা দেয়াল তৈরি হচ্ছে আস্তে আস্তে, যেটা সে বুঝতে পারছে না। আছে দেয়ালটা, কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। ঠিক যেমন পরিচয় আর ঋতুপর্ণার মধ্যে হয়েছিল। 

ঘটনাটা ঘটেছিল দু-হাজার আটচল্লিশ সালের আগস্ট মাসে। দিনটা ছিল রবিবার। বিকেলের দিকে তার কিছু করার ছিল না বলে একটু হাঁটতে বেরোল। বালিগঞ্জ থেকে হাঁটতে হাঁটতে সে পার্ক সার্কাসে এসে পৌঁছল।

ঝাঁ চকচকে রাস্তা। কিন্তু রবি জানে রাস্তাগুলো দিয়ে সামান্য কোনও গলির ভেতরে ঢুকলেই বেরিয়ে আসবে বস্তির ঝুপড়ি। নর্দমার নোংরা জল, ড্রেনের পাইপের পাশে বসে থাকতে দেখা যাবে কোনও বাচ্ছাকে। অর্থনৈতিক বৈষম্য আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। এসবের একটু পরেই উঠে গেছে পঞ্চাশতলা বিল্ডিং। কলকাতা বিশ্বের কাছে এইজন্যই মানবিক এখনও কারণ অন্যান্য শহরগুলোয় এদের প্রবেশাধিকার পর্যন্ত নেই। কিন্তু কলকাতায় আছে। 

রবি জানে এরও কারণ আছে। কারণ এখান থেকেই এরা পঞ্চাশতলা বাড়ির ফ্ল্যাটে ঘর মুছতে যায়, গেটের দারোয়ান হয়, ইলেক্ট্রিকের ছোটখাট কাজ করে। এসব শিক্ষিত লোককে দিয়ে করাবার খরচ অনেক। কলকাতা তাই এখনও তুলনায় কম খরচের জায়গা। সেজন্যেই এদের বাঁচিয়ে রাখাটা কলকাতা শহরের জন্যই দরকার। 

এসব ভাবতে ভাবতেই রবি হাঁটছিল। হঠাৎ করেই সে দেখতে পেল সামনের আস্তাকুঁড়ে একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের বাচ্ছা একটা পাঁউরুটি তুল খাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে সে খেয়াল করেনি কখন একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

বাচ্ছাটাকে দেখে অবাক হওয়ার বয়স সে পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সে প্রবল আতঙ্কে দেখতে পেল একটা বড়সড়ো কুকুর টলতে টলতে বাচ্ছাটার দিকে এগিয়ে আসছে। কুকুরটাকে দেখে বোঝা যায় সেও ক্ষুধার্ত। হয়তো তিনদিন হল খেতে পায়নি। মানুষই যেখানে খেতে পায় না সেখানে রাস্তার কুকুরকে কে খেতে দেবে! কুকুরটাকে দেখে চিনতেও পারল রবি। 

অন্যান্য বারের মতোই জেনেটিক গবেষণার প্রথম গিনিপিগ হয় কুকুর। কুকুরের ডিএনএ মডিফাই করে সেসময় অনেক কুকুর প্রতি শহরে ছাড়া হয়েছিল। তারা তুলনায় সবল, গতি বেশি এবং মানুষের প্রতি অনেক বেশি ফ্রেন্ডলি। স্বাভাবিক কারণেই আস্তে আস্তে কুকুরদের সাধারণ প্রজাতির সঙ্গে এরা মিক্সড হয়ে পড়ে। 

কিন্তু এই কুকুরটা তাদের দলে পড়ে না। এটা একদম রাস্তার নেড়ি কুকুর। রবি একটু অবাকও হল। কারণ এদের দেখা পাওয়াই এখন দুস্কর। 

কুকুরটার ভাবভঙ্গি দেখে তার ভালো লাগছে না। চারপাশে এদিক ওদিক অনেকেই আসা যাওয়া করছে। কিন্তু কারুর এদিকে নজর নেই। কুকুরটার মুখ দিয়ে লালা ঝরছে, খুব আস্তে আস্তে কুকুরটা এগোচ্ছে। ঠিক যেমন শিকার ধরার সময় টিকটিকি গুটিগুটি পায়ে এগোয়। যাতে শিকার বুঝতে না পারে। 

তারপর একটা সময় পর কুকুরটা যখন বুঝতে পারল শিকার তার নাগালের মধ্যে, একটা কেঁউ করে আওয়াজ করে ছুটে গেল বাচ্ছাটার দিকে। 

রবির ভাবার সময় ছিল না। সেও ছুটে গিয়ে বাচ্ছাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কুকুরটা হঠাৎ বাধা পেয়ে আরও রেগে গিয়ে রবির ঘাড় লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল। রবি দুটো হাত দিয়ে দুর্বল প্রাণীটার সামনের দুটো পা ধরে ফেলল। তারপর গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে দুটো পা দুদিকে ঘুরিয়ে দিল। এখানেই সে থেমে যেতে পারত। কিন্তু এরপর রবি কুকুরটার দুটো চোয়াল চেপে ধরল। তারপর দুদিকে টেনে দিল। খট করে একটা আওয়াজ এল। 

রবি কুকুরটাকে ছেড়ে দিল।

এতক্ষণে আশপাশের লোকের টনক নড়েছে। রবির হাত কেটে গেছে, রক্ত ঝরছে। কিন্তু সেদিকে কারুর হুঁশ নেই। বাচ্ছাটার দিকেও কারুর হুঁশ নেই। একটা গলা বহুদূর থেকে যেন রবির কানে এসে পৌঁছল, ‘আরে এতো রবীন্দ্রনাথ! আমাদের বাঁচাবে এই!

আরো ক-টা গলার আওয়াজ ভেসে এল, ‘একা হাতে এই কুকুরটাকে কীভাবে মারল দেখলি!’ 

অথবা, ‘ইশশ একটু সময় পেলে ভিডিয়ো করে রাখতাম…একে বলে হিরো…আরে বাবা এসব সায়েন্স, মজা নাকি!… কীভাবে বাচ্ছাটাকে বাঁচাল দেখলি!.. উফ আগে এসব হলিউডের সিনেমাতেই দেখেছি… এই বাচ্ছাটা কোথায় গেল?’

রবি থরথর করে কাঁপছিল। সে বুঝতে পারছে তার চারপাশে ভিড় জমে যাচ্ছে। সে এও বুঝতে পারছে সে এই ভিড়টা থেকে দূরে যেতে চায়। কিন্তু তার এই চাওয়াটা ভুল। তার দায়িত্ব এই মানুষগুলোকে বাঁচানো। সে এদের ভাগ্যবিধাতা! কিন্তু তার ভাগ্যবিধাতা হতে ভালো লাগছে না। সে রাগ করতে পারছে না। কিন্তু তার কিছু একটা হচ্ছে। কুকুরটার চোখটা লাল। পেটের হাড় গোনা যাচ্ছিল। কুকুরটার লাফে কোনও জোর ছিল না। খট করে একটা আওয়াজ। এখনো শুনতে পাচ্ছে রবি, রবীন্দ্রনাথ! খটখট করে মেশিনগানের আওয়াজ হতো এককালে। পুরোনো সিনেমায় দেখেছে রবি। বাবার সঙ্গে কোচে বসে। বাবা আর মা একসঙ্গে থাকতে পারেনি। বাড়ির ছাদের ঘরে একটা টেলিস্কোপ পড়ে আছে। ওটা বাবার। মা বাড়িতে অপেক্ষা করছে। সে এই ভিড়ের কাউকে চায় না। কিন্তু এই ভিড় তাকে মাথায় তুলে নিয়েছে। তারা জয়ধ্বনি দিচ্ছে তার জীবনের প্রথম হত্যাকে! এই মানুষগুলো জানে না, তারা কি করছে! রবীন্দ্রনাথ ভারতের জাতীয় সংগীত লিখেছিলেন। জাতীয় সংগীত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাইতে হয়। জনতার ঢল নেমেছে। তারা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। রবি তাদের মাথায় মাথায় ঘুরছে। রবি এদের কাউকে চায় না। কিন্তু তার দায়িত্ব আছে। সে শুধু রবি নয়, সে জিন মানব রবীন্দ্রনাথ। খট করে একটা আওয়াজ হল আবার। কোথায় হল? মাথার ভেতর? কুকুরটা কি আবার বেঁচে উঠেছে! তাকে বাঁচাতে হবে গোটা মানবসভ্যতা। সে এদের চায় না। সে এদের ওপর রাগ করতে পারে না। তার শরীরে রাগ নেই। কিন্তু এই জনতাকে তার অসহ্য লাগছে। এরা একটা অভুক্ত দুর্বল প্রাণীর মৃত্যু উদযাপন করছে। করা উচিত নয়। কে বললো করা উচিত নয়? রাগ হচ্ছে না রবির এদের ওপর, কি ওই কুকুরটার ওপর কি ওই বাচ্ছাটার ওপর। এই পৃথিবী এই গ্রহ এই সৌরজগৎ এই বালিগঞ্জের বাড়ি কুর্চি বাবা মা এই জনতা সবাই ভালো। তাহলে সে কি! সে এদের ভাগ্যবিধাতা! রাগ নয়, ভয় থেকে ভালোবাসা আসে। খট করে একটা আওয়াজ এল। মানুষ তাকে ভালোবাসে, কারণ সে হত্যা করেছে। একটি প্রাণীকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকটি প্রাণীকে হত্যা করেছে। যে বাঁচল তাকে সে চেনে না যে মরল তাকে রবি চেনে না। সে এই জনতা চেনে। জনতা মৃত্যু উদযাপন করে। রবি রাগতে পারে না।

হঠাৎ রবির মাথা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। কোনও শব্দ নেই আর। 

জনতার মাথায় ঘুরতে ঘুরতে রবীন্দ্রনাথ এক ভীষণ পরিতৃপ্তির হাসি হাসেন। সময় এলে এই গ্রহের প্রত্যেকটি মানুষকে তিনি খট করতে পারেন। 

ওঁর একটুও রাগ হবে না।

Tags: কল্পবিজ্ঞান গল্প, বড় গল্প, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

One thought on “জিন মানব রবীন্দ্রনাথ

  • October 12, 2021 at 1:39 pm
    Permalink

    অপূর্ব লেখনী। বিষয়ভাবনা অভূতপূর্ব। শেষে এসে চমকিত হলাম। একটা প্রশ্ন তৈরী হল। জিন মানব কি তবে কল‍্যাণের পরিবর্তে ধ্বংসের দূত হয়ে উঠবে??

    Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!