কনট্যাক্ট

  • লেখক: অনুষ্টুপ শেঠ
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

ধুকধুক করছিল শেষ-বেলার আলো। লাল সূর্যটা আর একটু পর ডুবে যাবে, কালচে কুয়াশার মতো আভায় তখন ভরে উঠবে চারদিক। সৌরজগৎ থেকে বারো আলোকবর্ষ দূরের গ্রহটার এবড়োখেবড়ো পাথুরে জমি ধরে মাছধরা জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল সেই পড়ন্ত আলোর রশ্মি। অদ্ভুত বায়ুমণ্ডল এই গ্রহের, যার ফলে সব আলো কেমন ভেঙেচুরে যায় সেই স্তরের মধ্যে দিয়ে আসতে আসতে।

শুধুই পাথর নয়, ‘টিগার্ডেন-বি’ গ্রহর একটা বড় অংশ জুড়ে আছে সমুদ্রের জল। পৃথিবীর মতো নোনা নয়, পৃথিবীর মতো ঢেউ খেলানোও নয়। কিন্তু এ গ্রহের সবচেয়ে জরুরি জায়গা ওই সমুদ্রই, কারণ গ্রহের বাসিন্দারা তার নিচেই বাস করে।

বয়স অনুযায়ী, গুরুত্ব অনুযায়ী, স্তরে স্তরে।

উপর থেকে বোঝা সম্ভবই নয়, যে খাদ্য-পোকা চাষ থেকে জটিল বিনিময়প্রথা, শিক্ষা-পদ্ধতি, শাসনব্যবস্থা সমস্তই সেই জগতে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে।

কিন্তু গত ক’দিন ধরে, সেই নিস্তরঙ্গ জলের নিচে প্রবল আলোড়ন চলছে।

কিছু একটা অজানা শক্তির প্রবল আঘাতে, জলস্তরের উপর দিকের ছোট ছোট পোকাগুলো বেজায় চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মারাও যাচ্ছে অনেক। চাষের ক্ষতি হচ্ছে।

নেতাদের আদেশে, এক সন্ধানী-দল গেছিল তদন্ত করতে। তারাও এসে বলেছে, জলের উপরে একটু গেলেই কেমন যেন ধাক্কা লাগছে হঠাৎ হঠাৎ গায়ে। কী যেন একটা, বলে বোঝাতে পারবে না— কিন্তু অমন কিছু আগে কক্ষনো দেখেনি তারা, অমন হলেই কেন ভয় পাচ্ছে না বুঝেই আতঙ্কে শিউরে উঠেছে প্রতিবার।

সমুদ্রের একেবারে গভীর তলদেশে, পাথরের খাঁজে তৈরি গুহায় আজ জড়ো হয়েছিল নেতারা। বহু তর্ক, বহু বাকবিতণ্ডার পর সবাই এক সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছতে পেরেছেন। সেই অনুযায়ী আদেশ বয়ে গেছে তলা থেকে উপর অবধি, মুখে মুখে।

পরদিন টকটকে লাল সূর্যটা আকাশে কিছুটা ওঠার পরই দেখা গেল, সমুদ্রের নিচ থেকে উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে ছোট ছোট আকৃতির জীবেরা, তাদের কারও কারও চারটে পাখনার সব ক-টা এখনও পুরোপুরি আকার ধারণ করেনি, এত ছোট। প্রতিটার গলার কাছে দগদগ করছে ধারালো দাঁতের হাঁ-করা ক্ষত। কিছু ধারালো পাথরে আছড়ে পড়ে তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগ করছে, কিছু বা চ্যাপটা পাথরে পড়ে কিছুক্ষণ ছটফট করে তারপর নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।

সূর্যদেবতা রাগ করেছেন জানান দিচ্ছিলেন, তাই তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে জলরাশির বাসিন্দারা।

আশ্চর্য, তার পরদিনই যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল, তেমনি আচমকা থেমে গেল ওই উৎপাত। নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলে আবার নিজেদের কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই।

সৌরজগৎ থেকে ৩৯ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহটিতে, মাটির অনেক নিচের সুড়ঙ্গে মিটিংটা হচ্ছিল। লোহা-মিশ্রিত পাথর কেটে কেটে তৈরি সুড়ঙ্গগুলোর দেওয়াল এবড়োখেবড়ো, লালচে। যারা মিটিং করছিল, তারা কেউ আমাদের চেনা-পরিচিত জীবের মতো দেখতে নয়।

তাদের মিটিং-এর ভঙ্গি কিন্তু আমরা চিনি।

পৃথিবীর পিঁপড়েরা এভাবেই ভাব বিনিময় করে। অ্যান্টেনায় অ্যান্টেনা ঠেকিয়ে।

কে তারা? কী করছে?

তারা এই ‘ট্র্যাপিস্ট-ওয়ান-ই’ গ্রহের নেতৃবৃন্দ। কোড গ্রিন অ্যালার্টে তারা তড়িঘড়ি ছুটে এসেছে, বিপদের গুরুত্ব বিচার করতে।

কয়েকদিন ধরে এক অজানা দুর্বোধ্য সঙ্কেত ভেসে আসছিল আকাশের ওপর থেকে, অনেকেরই অ্যান্টেনায় বার বার ধরা পড়ছিল দুর্বোধ্য কিছু সঙ্কেত।

এখন সেই অভূতপূর্ব ঘটনার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছিল তারা। স্মরণাতীত কালেও এমন আশ্চর্য কিছু কখনও ঘটেনি এই গ্রহে। কেন? কেন?

যদিও সেই সঙ্কেত আজ দু-দিন হল থেমে গেছে, তবু এ জিনিস পুরো অবহেলা করা যায় না!

বিশেষ করে, এ বছর এক আশ্চর্য বছর। তাদের খাদ্য সঞ্চয় অন্যান্য বারের চেয়ে ঢের বেশি হয়েছে, আবহাওয়াও হয়ে আছে চমৎকার নাতিশীতোষ্ণ, মৃত্যু নেই। এর সঙ্গে যেন কী সম্বন্ধ আছে ওই সঙ্কেত-বার্তার।

“যখনই ওই বার্তা আমি অনুভব করতাম, আমার সব ক্লান্তি দূরে হয়ে বুকে দুগুণ বল আসত!”

বলল এক জোয়ান নেতা।

“আমিও!”

সায় দিল তার উলটোদিকে বসা মোটাসোটা আধবুড়ো নেত্রী।

বৃদ্ধ নেতাও এটা খেয়াল করেছিলেন নিজে। তাই নিশ্চিত গলায় তিনি বললেন, “এ নিশ্চয় উপরওয়ালার আশীর্বাণী। আমাদের জীবনে আসতে চলেছে আরও সুখ ও সমৃদ্ধি, এ তারই ইঙ্গিত।”

যে নেতারা এ সঙ্কেত টের পায়নি তাদের অ্যান্টেনায়, তারা একটু মুষড়ে পড়ল ঠিকই, কিন্তু দেখা গেল বেশির ভাগ জনগণই এই ব্যাখ্যায় বেজায় খুশি হয়ে উঠল সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়।

দুঃখের বিষয়, বেশ কিছুদিন সাগ্রহে অপেক্ষা করার পরেও সেই আকাশের সঙ্কেত আর ফিরে এল না।

কিন্তু নতুন ফসলও হল দুগুণ। বৃদ্ধ নেতার সিদ্ধান্ত নিয়ে কারওই আর দ্বিমত রইল না।

কৃতজ্ঞতার প্রমাণ স্বরূপ, পাথর খুদে স্থানে স্থানে তৈরি হল আকাশদেবতার উপাসনা-স্থল। যারা প্রথমবার সেই সঙ্কেত অনুভব করার সৌভাগ্য লাভ করেছিল, তারা অন্য কাজ ছেড়ে সেই উপাসনা-স্থলের রক্ষক নিয়োজিত হল।

লোকে বলাবলি করতে লাগল, ওইখানে গিয়ে চুপ করে দাঁড়ালেই জীবনের প্রতি আগ্রহ ফিরে আসে।

পৃথিবী থেকে ৫০০ আলোকবর্ষ দূরে ‘কেপলার ১৮৬-এফ’-এর ব্যস্ত জীবনযাত্রা গত কয়েকদিন ধরে থমকে আছে। এমন ঘটনা জীবদ্দশায় কেন, পুরো ইতিহাস ঘাঁটলেও পাওয়া যাবে না।

ভারী অ্যাটমস্ফিয়ারের জন্য সারাক্ষণই যেন সন্ধ্যা এই গ্রহে। আকাশে অতিপ্রাচীন সূর্যের ক্ষয়াটে লাল রং থাকলে দিন, নইলে রাত্রি— সহজ হিসাব।

শুধু তা-ই নয়, সারা বছর ভারী পোশাক লাগে এ গ্রহের বাসিন্দাদের। বড় ঠাণ্ডা। বিশেষ করে উত্তরের সমুদ্র শেষ হয়ে যেখানে বরফের বিস্তার শুরু হয়েছে।

অথচ বুদ্ধিমান জীব কী না করতে পারে। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও গড়ে উঠেছে তাদের সীমান্ত-শিবির। সেই শিবিরের বাইরের চত্বরে পাশাপাশি ঊর্ধ্বমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল চারমূর্তি। হেভি জ্যাকেটের মতো কিছু খসখসে ছাল দিয়ে তাদের আগাপাশতলা মোড়া।

আকাশে মেঘ দেখেছে তারা আজন্ম, কিন্তু এমন অদ্ভুত আকৃতির, বিশাল, অনড় মেঘ কখনও দেখেনি কেউ।

সেই যে প্রথম এক অজানা ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ ধরা পড়েছিল তাদের অবজার্ভেশন যন্ত্রে, সেই সময়ই এটা প্রথমবার দেখা গেছিল। তারপর থেকে দু-দিন কেটে গেল, এর আর নড়াচড়া নেই।

চিন্তায় বার বার ওঠবোস করছিলেন সামরিক অধিকারী।

“না:, আর ভেবে লাভ নেই। তৈরি হও।”

কী অস্ত্র ওটা জানা নেই, কিন্তু দক্ষিণের পাথুরে রুক্ষ দেশের হিংস্র অধিবাসীরা যে নতুন করে আক্রমণ করতে চলেছে সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই।

দ্যাখ না দ্যাখ সমরসজ্জায় ছেয়ে গেল উত্তরের তুষারাঞ্চল।

পরদিন আস্তে আস্তে সে ছায়া সরে যেতে থাকল পিছনে, মিলিয়ে গেল আস্তে আস্তে।

গর্বের হাসি হাসলেন সমরপ্রধান, তবে চুপি চুপি চরও পাঠালেন, কী করে অমন একটা ভয় দেখানো ছায়া আকাশে প্রোজেক্ট করা যায়, তার সুলুক সন্ধান বদমাইশগুলোর থেকে জেনে আসতে।

গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে আকারে ঢের বড়। জায়গায় জায়গায় টলটল করছে জলীয় কোনও পদার্থের বৃহৎ হ্রদ। কিন্তু এইখানের বাসিন্দারা আকাশ থেকে ভেসে আসা তরঙ্গে বিন্দুমাত্র ঘাবড়াল না। এ জিনিসে তারা অভ্যস্ত।

অত্যন্ত বালখিল্য কিছু সঙ্কেত ভেসে আসছিল সেই তরঙ্গে।

পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৩০% বেশি মাধ্যাকর্ষণ থাকার কারণে কিনা জানা নেই, এ গ্রহের বাসিন্দারা তাদের বাসস্থান থেকে প্রায় বেরোয়ই না কখনও। হ্রদগুলির ধার বরাবর তাদের সেই কিউবের মতো রঙিন ঘরবাড়ি দেখতে অনেকটা প্রাচীন যুগের মাইনক্র্যাফট গেমের মতো, বালখিল্য।

সে সঙ্কেত-তরঙ্গ বারবার ভেসে এল আকাশ থেকে টানা সাত দিন ধরে। কিন্তু পৃথিবী থেকে ১২০৬ আলোকবর্ষ দূরের ‘কেপলার-৪৪২-বি’ গ্রহের অভিজ্ঞ বাসিন্দারা সাড়া দেওয়ার কোনও চেষ্টা না করে ঘাপটি মেরে পড়ে রইল যে যার ঘরে। অবশেষে যখন সেই নিশির ডাক বন্ধ হল, হাঁফ ছেড়ে আবার যে যার প্রাণ-ভোমরার বাক্সে মগ্ন হয়ে গেল।

‘গ্লিচ’ এসেছিল, চলে গেছে। তারা জানে এসব। আগেও একবার হয়েছে কিনা! সেবার যারা সাড়া দিতে গেছিল, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সান ফ্রান্সিস্কো মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রের তৃতীয় ফ্লোরের ডানদিকের উইং-এ উপবৃত্তাকার কন্ট্রোল রুম। একটু আগেই সৌরজগৎ থেকে প্রায় ১৫২৭ আলোকবর্ষ দূর থেকে ‘বিটলস -৭’এর মেসেজ ভেসে এসেছে ট্রান্সমিটারে।

“ডে সেভন অ্যান্ড লাস্ট ডে অ্যাট কেপলার-২৮৩-সি। নো রেস্পন্স। এন্ড অফ পাথ। প্লিজ সেন্ড নেক্সট ইন্সট্রাকশন।”

বেশিক্ষণ সময় লাগল না, ডিসিশন নেওয়াই ছিল।

উত্তর গেল, “কাম ব্যাক। মিশন ফিনিশড।”

মানুষের ইতিহাসে প্রথম সফল ইন্টার-গ্যালাক্সি পরিক্রমা সেরে ‘বিটলস-৭’ মহাকাশযানটি আলফা গ্যালাক্সির তিন নম্বর নীল গ্রহে ফেরার পথ ধরল। ৩০২১ খ্রিস্টাব্দ – এই বছরটি মানুষের মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবার গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সি ঘুরে বেড়ানোর কথা নিয়ে সোনার রং-এ জ্বলজ্বল করবে।

চির-বিকেলের নরম হলুদ আলোয় পৃথিবী থেকে ৪৯৭৩ আলোকবর্ষ দূরের কেপলার-১৬৪৮-বি গ্রহটিকে শান্তির আশ্রয় মনে হচ্ছিল। কালচে লাল বালিতে আগাগোড়া ঢাকা মাটিতে নরম গালিচার মতো নীল ঘাস, ঝলমলে সাদা জলে হীরের কুচির মতো আলো চমকাচ্ছে।

ঘাসের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এ গ্রহের কয়েকজন বাসিন্দা। দেখলে মনে হয় বিশ্রামরত। কিন্তু আসলে তারা গভীর চিন্তায় নিমগ্ন, সে চিন্তাপটে কত কী ধরা পড়ে তা পৃথিবীর মানুষের বোধের অগম্য।

তাদের একজন পাশেরজনকে মানস-তরঙ্গে প্রশ্ন করল, “বহুদূর তো এসেছিল। আমাদের দিক থেকে ওটুকু এগিয়ে গিয়ে সাড়া দেওয়াটা খুব কঠিন ছিল কি?”

উপর থেকে দেখলে মনে হত, মাঠের উপর ছড়িয়ে থাকা লালাভ বৃহদাকৃতি জেলির তালগুলোর মধ্যে একটা কেঁপে কেঁপে উঠল। আসলে, যাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল সে হাসছিল।

প্রশ্ন যে করেছে, সে নিতান্তই অল্পবয়স্ক। তার বোধ বিবেচনার অভাবই এই হাসির কারণ তার অধ্যাপকের।

“কিছুই কঠিন ছিল না, কিন্তু উচিত হত না। এ ভুল আমরা আগে করেছি, যখন স্নেহ বশত এই ক্ষুদ্র জীবদের গ্রহে গিয়ে তাদের কিছু কিছু জ্ঞান ও কৌশল শিখিয়ে দিয়ে এসেছি। ভেবেছিলাম, এরা অগ্রসর হবে দ্রুত, অন্যদের মতো অসহ্য ধীর গতিতে নয়।

“এরা তা হয়েছেও, কিন্তু ধ্বংস-ক্ষমতা-হিংসা-কামের লোভে পড়ে আমাদের দেওয়া জ্ঞান ভালো কাজে যথেষ্ট ব্যবহার করে উঠতে পারেনি।

“তুমি তো জানো, আমরা এক ভুল দু-বার করি না। তবে, মানুষদের অগ্রসরের গতির দিকে আমরা এখনও সকৌতূহলে নজর রাখি, কারণ ওদের মধ্যে যেমন ত্রুটি আছে, তেমন ত্রুটি সংশোধনের ইচ্ছাও আছে।

“নিজেদের চেষ্টায় ওরা এতদূর এসেছে যখন, বাকিটাও পারবে। একদিন আমরা এই গ্রহের মাটিতে মুখোমুখি হব ওদের, পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময় করব আবার। অনন্ত আয়ু নিয়ে আমরা সেই দিনের অপেক্ষা করছি।”

Tags: অনুষ্টুপ শেঠ, কল্পবিজ্ঞান গল্প, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!