অনুভূতি

  • লেখক: রুশদী শামস
  • শিল্পী:

ঠিক এই মুহূর্তে ডক্টর শ্রুলের মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন। প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় আসছে, সেটা হল কেন এই অভিযানে ত্রিশিনার মতো একজন শিক্ষানবিশ ইঞ্জিনিয়ারকে তার সঙ্গে দেওয়া হল। ত্রিশিনা হল তাদের এই মহাকাশ অভিযানের একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার। সেই ইঞ্জিনিয়ার যদি একজন শিক্ষানবিশ কেউ হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে যে অভিযানটা বিজ্ঞান একাডেমির কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঠিক আছে, ধরে নেয়া যাক যে তাদের এই অভিযানটা বিজ্ঞান একাডেমির কাছে তেমন একটা গুরুত্ব বহন করছে না। কিন্তু তাই যদি হবে, তাহলে পঞ্চম জেনারেশানের মতো অত্যাধুনিক একটা মহাকাশযানকে কেন এই কাজে ব্যবহার করতে হবে? পুরো ব্যাপারটাই ডক্টর শ্রুলের কাছে খুব স্থূলভাবে স্ববিরোধী লাগতে থাকে। খুব সহজ কথা, যদি ত্রিশিনাকে ইঞ্জিনিয়ার বানাও, পুরোনো মহাকাশযান দাও। আর যদি এমন আধুনিক একটা মহাকাশযানই দাও, তাহলে দয়া করে সেটা সম্পর্কে জানে না এমন কাউকে ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দিয়ো না। বিজ্ঞান একাডেমির এমন ফালতু একটা সিদ্ধান্তের কারণে এখন তারা দুজন এমন ভয়ঙ্কর একটা বিপদে পড়ে গেলেন! রাগের মাথায় ডক্টর শ্রুলের থেকে থেকে মনে হতে থাকে যে বিজ্ঞান একাডেমি ইচ্ছা করেই এই কাণ্ড করেছে!

     তবে সবকিছু ছাপিয়ে যে প্রশ্নটা ডক্টর শ্রুলের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল— কেন এই অভিযান? অভিযানের ঠিক মাঝপথে এসেও তিনি মনে করছেন যে তার এই শেষ প্রশ্নটার উত্তরই সবার আগে জানা উচিত। টাইটানে গিয়ে সেখানকার মিথেন আর হাইড্রোকার্বন পৃথিবীতে কীভাবে নিয়ে আসা যায়, সেটা জানতে সেখানে কি মহাকাশযান পাঠানো লাগে? কিন্তু একাডেমির ঘাড়ে তো ভূত চেপেছে! তিনি একদিন খাতা কলম নিয়ে বসেছেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নিজের ঘরে বসে একেবারেই সনাতনি কিছু সমীকরণ দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে শনির এই উপগ্রহটা থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ আর আকরিক পৃথিবীতে নিলে লাভের লাভ কিছু হবে না। বিজ্ঞান একাডেমি তার হিসাবগুলোকে আমলে নিল না। তারা তাকে এক কথায় বলা যায় ধরে বেঁধে এখানে পাঠিয়ে দিল। কারণ? তাদের দরকার চাক্ষুষ প্রমাণ। একদমই অকারণ এই অভিযান চালাতে বিজ্ঞান একাডেমি জোরাজুরি না করলে তাদেরকে আজ এই বিপদে পড়তে হত না।

     রাগ লাগলেও ডক্টর শ্রুল বুঝতে পারছেন যে এখন রাগ করার সঠিক সময় নয়। তিনি খেয়াল করলেন যে তার মাথায় এখন সবধরনের প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে। মানুষের সবচেয়ে বাজে স্বভাবগুলোর একটা হল বিপদ ঘটে যাবার পরে প্রশ্ন করতে থাকা। অথচ প্রশ্নগুলো সঠিক সময়ে করতে পারলে আর তাকে এই বিপদে পড়া লাগত না। সেটা তিনি করেননি। তাই এখন প্রশ্ন করে খামোখা নিজের পেরেশানি বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এটা ভেবে ডক্টর শ্রুল একটু শান্ত অনুভব করতে থাকেন।

     তাদের আজকের এই বিপদে পড়ার কারণ খুবই সূক্ষ্ম একটা ভুল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে ভুলটা তাদের কেউই ধরতে পারলেন না, না পারল ত্রিশিনা মেয়েটা, না পারলেন তিনি! অবশ্য শিক্ষানবিশ কেউ না হলে ত্রিশিনা যে শুরুতেই ভুলটা ধরে ফেলতে পারত, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত! পৃথিবী থেকে তারা মোটামুটি নিরাপদেই শনির বলয় পর্যন্ত এসেছিলেন। এর পরে নিজেদের মহাকাশযানটাকে সেখানকার নতুন স্পেস স্টেশনটার ডকে ভেড়ান। স্টেশনটা থেকে আকারে ছোট এবং ওজনে হালকা একটা গবেষণা পড নিয়ে তারা টাইটানের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। যাত্রা শুরু করার দু-দিনের মাথায় মূল মহাকাশযানের কম্পিউটার জুনিপার তাদের পডে হতে থাকা গুরুতর একটা সমস্যা চিহ্নিত করে। রুটিন প্রোগ্রাম অনুযায়ী জুনিপার তাদেরকে কিছু না জানিয়ে নিজেই প্রথমে সমস্যাটার একটা সমাধান বের করতে চেষ্টা করতে থাকে। এই সময়টাতে ডক্টর শ্রুল এবং ত্রিশিনা দুজনেই নিজ নিজ ক্যাপসুলে ঘুমিয়ে ছিলেন। ফলে, ব্যাপারটা তাদেরও নজরে আসেনি। শেষমেশ সমস্যাটা নিজে নিজে সমাধান করতে পারবে না বুঝতে পেরে তাদেরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে জুনিপার মূল মহাকাশযান থেকে তাদের পডের ভেতরে বিপদ সঙ্কেত বাজিয়ে দিয়েছে। বিপদ সঙ্কেতটা এখনও বেজে চলেছে।

     বিপদ সঙ্কেতের তীক্ষ্ণ আওয়াজে ত্রিশিনা ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠে দেখে যে গোটা গবেষণা পডে লাল একটা আলো একবার জ্বলছে আরেকবার নিভছে। স্নায়ুর ওপরে প্রচণ্ড চাপ ফেলার মতো একটা পরিবেশ। সে দৌড়ে গিয়ে ব্যস্ত হাতে দেয়ালে সাঁটানো একটা কিপ্যাডে কিছু বোতাম চেপে দিয়ে তীক্ষ্ণ আওয়াজটাকে বন্ধ করে দেয়। এর পরে সে কন্ট্রোল রুমে এসে ঢোকে। ডক্টর শ্রুল সেই ঘরটাতে রাখা পডের কন্ট্রোল ডেকের সামনে ঝুঁকে পড়ে ব্যস্ত হাতে কিছু বোতাম টিপছেন আর মনোযোগ দিয়ে মনিটরে ভেসে ওঠা তথ্যগুলোর দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি বরাবরই খুব গম্ভীর, তাকে দেখে তার মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটা। ত্রিশিনাকে যেদিন অভিযানসঙ্গী হিসাবে ডক্টর শ্রুলের সঙ্গে পরিচয় করে দেওয়া হয়েছিল, সে মোটামুটি নিশ্চিত যে প্রবীণ বিজ্ঞানীটি সেদিন তাকে দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলেন। হতেই পারেন! ত্রিশিনা নিজেও জানে না কেন তাকে এই অভিযানের একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে এখানে পাঠানো হয়েছে। এই অভিযানের আগে তার অভিজ্ঞতা বলতে কেবল বছর দুয়েকের, একটা তৃতীয় জেনারেশানের কার্গো মহাকাশযানের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে।

     ত্রিশিনা ডক্টর শ্রুলের গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ তাদের বিপদের মাত্রাটা বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে, ডক্টর শ্রুল?’

     ডক্টর শ্রুল মনিটর থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, ‘আমরা বেশ বড় একটা বিপদে পড়েছি, ভয়ঙ্কর বড় বিপদ।’

     ত্রিশিনা দেখতে পায় যে প্রবীণ বিজ্ঞানীর পাকা চুলের জুলফির পাশ দিয়ে ঘামের একটা চিকন রেখা বেয়ে পড়ছে। ব্যাপারটা দেখে সে প্রথমে ভয় পেতে শুরু করে, এরপর কোথা থেকে যেন একটা অজানা আতঙ্ক এসে ত্রিশিনাকে গ্রাস করে।

     তার গলা শুকিয়ে যায়, সে ক্রমাগত ঢোক গিলতে শুরু করে।

     তার মনে হতে থাকে যে এখানে নিশ্চয় তার কোথাও কোনও ভুল হয়েছে এবং সেই ভুলই তাদের এই বিপদের কারণ।

     কিছুক্ষণের ভেতরেই তার মনে হতে থাকে যে হৃদপিণ্ড তার বুকের খাঁচায় জোরে জোরে বাড়ি দিচ্ছে, ত্রিশিনা খুব স্পষ্টভাবে সেই শব্দ শুনতে পায়।

     আতঙ্কিত হয়ে সে বলার মতো কোনও কথা খুঁজে পায় না।

     ডক্টর শ্রুল বললেন, ‘গত সপ্তাহের শুরুর দিকে মূল মহাকাশযানের আয়ন ইঞ্জিনে কী হয়েছিল মনে আছে?’

     ত্রিশিনার মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে তাকে ফ্যাকাসে রকমের সাদা দেখাতে থাকে— গত সপ্তাহে তাদের আয়ন ইঞ্জিনে আর্গনের পরিমাণ হঠাৎ করে কমে গিয়েছিল। সমাধান হিসাবে সে ডক্টর শ্রুলকে মঙ্গলের আর্গন শোধনাগার থেকে একবার রিফুয়েলিং করিয়ে নিতে পরামর্শ দেয়।

     এ পর্যন্ত চিন্তা করে ত্রিশিনার বুকটা ধড়াস করে ওঠে— ডক্টর শ্রুল সেটা নিয়ে কেন প্রশ্ন করছেন?

     তার মানে নিশ্চয় রিফুয়েলিং এর পরামর্শটা ঠিক ছিল না, এই পরামর্শের কারণেই মনে হয় তারা এই বিপদে পড়েছে। এবং বিপদটা এতটাই বড় যে জুনিপারও সেটার কোনও সুরাহা করতে পারেনি!

     মুখটাকে কাঁচুমাচু করে রেখে সে ডক্টর শ্রুলের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ মনে আছে। ইঞ্জিনে আর্গন কমে গিয়েছিল, মঙ্গল থেকে আমরা রিফুয়েলিং করেছিলাম।’

     ডক্টর শ্রুল এবার ত্রিশিনার ভয়টাকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘সেই রিফুয়েলিং করার সময়ে কিছু একটা গড়বড় হয়ে গিয়েছিল বলে মনে হচ্ছে।’

     ত্রিশিনা সন্ত্রস্ত হয়ে বলল, ‘কী গড়বড় হয়েছিল?’

     ডক্টর শ্রুল বললেন, ‘আমাদের ইঞ্জিনে কোনও না কোনও ভাবে একশো ভাগ বিশুদ্ধ আর্গনের জায়গায় সত্তর ভাগ বিশুদ্ধ আর্গন দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

     ত্রিশিনা তার চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করে, ‘মানে, বাকি ত্রিশ ভাগ মতো জ্বালানিতে ভেজাল থেকে গেছে?’

     ডক্টর শ্রুল ত্রিশিনার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালেন। ত্রিশিনা একটু শান্ত হয়। যাক, তার মানে বিপদের কারণ আসলে সে নয়, আসল কারণ তাহলে মঙ্গলের আর্গন শোধনাগারের কর্মীগুলো! সে ভুরু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করতে থাকে যে ঠিক কী কারণে ইঞ্জিনের ভেতরে আর্গনের সঙ্গে সঙ্গে ভেজাল ঢুকে পড়তে পারে। এক হতে পারে যে রিফুয়েলিং করার সময়ে শোধনাগারের লোকেরা সঠিক ব্যাসার্ধের পাম্প ব্যবহার করেনি। আর না হলে মনে হয় শোধনাগারের ব্যবহার করা পাম্পটাতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কোনও ছিদ্র ছিল।

     ডক্টর শ্রুল তার ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘তুমি কি ইঞ্জিনে ভেজাল ঢুকে পড়ার উপায় নিয়ে ভাবছ?’ তার কণ্ঠস্বরে এমন একটা কিছু ছিল যেটা শুনে ত্রিশিনা বুঝতে পারে যে আসলে বিপদের মূল কারণ রিফুয়েলিং নয়। ডক্টর শ্রুল একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমার মনে হয় না যে এখন সেটা জানার আর কোনও দরকার আছে—’

     ত্রিশিনা একটা ঢোক গিলে ডক্টর শ্রুলের দিকে তাকিয়ে থাকে।

     ডক্টর শ্রুল বলতে থাকেন, ‘আসল কথা হল যে আমাদের জ্বালানি নেওয়ারই কোনও দরকার ছিল না।’

     ত্রিশিনা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না, ডক্টর শ্রুলের কথার উত্তরে সে কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ডক্টর শ্রুল কন্ট্রোল ডেকের মনিটরটাকে এবার তার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুমি ডাটাগুলো দেখো, তাহলেই বুঝবে।’

     মনিটরের দিকে তাকাতেই ত্রিশিনা বুঝতে পারে যে মোটা দাগে ভুলটা আসলে তারই।

     তার গোটা শরীর ভারী হয়ে আসতে থাকে।

     সে ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে।

     সে আসলে বেখেয়ালে ডক্টর শ্রুলকে ভুল পরামর্শ দিয়েছিল। জ্বালানি চেম্বারের ছোট একটা ভাল্‌ভ বন্ধ হয়ে আবার চালু হয়ে যাওয়ার সময়টুকুতে ইঞ্জিনে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের প্রেশার কিছুক্ষণের জন্য কমে যায়। ফলে আর্গনমিটার গ্যাসের পরিমাণটা অল্প কিছুক্ষণের জন্য বেশ কম দেখাচ্ছিল। ত্রিশিনা যদি সেই সময়ে জুনিপারকে ইঞ্জিনে আর্গনের এই অসামাঞ্জস্যতা ক্যালিব্রেট করে ফেলার নির্দেশ দিত, তাহলেই ব্যাপারটাকে আবার স্বাভাবিক করে ফেলা যেত। কিন্তু ত্রিশিনা বোকার মতো মনে করেছিল যে তাদের ইঞ্জিনে স্থায়ীভাবে আর্গন কমে গেছে। পঞ্চম জেনারেশানের মহাকাশযানের কাজের সঙ্গে সে এখনও তেমন একটা পরিচিত না। সত্যি কথা বলতে একাডেমির কয়েকটা সিমুলেশান প্রোগ্রাম বাদে এই অভিযানের আগে সে কখনও পঞ্চম জেনারেশানের মহাকাশযান চালিয়েও দেখেনি। পুরোনো তৃতীয় জেনারেশানের কার্গো মহাকাশযানগুলোতে ইঞ্জিন ক্যালিব্রেশানের কোনও সুযোগই ছিল না। মিটারের রিডিং কম হবার মূল কারণ বুঝতে না পারার কারণেই সে তাদের মহাকাশযাত্রার ঠিক মাঝখানে আর্গন রিফুয়েলিং করার পরামর্শ দিয়েছিল। পরামর্শটা বিভিন্নভাবেই রীতিমতো বিপদজনক। কেন যে সেটা একটা বিপদজনক কাজ, তা এখন তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু ডক্টর শ্রুলের শক্ত হয়ে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে ত্রিশিনার মনে থাকে যে বিপদটা এখানেই শেষ নয়। তার এই ভুল থেকে আরও বড় কোন বিপদের শুরু হয়েছে।

     ডক্টর শ্রুল বলতে থাকেন, ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা—’

     ত্রিশিনা বুঝতে পারে যে ডক্টর শ্রুল এখন তাকে তার আহাম্মকির কারণে হওয়া মূল বিপদের কথা বলবেন। সে অস্ফুট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘কী?’

     ডক্টর শ্রুল জিভ দিয়ে তার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটোকে ভিজিয়ে নিয়ে বললেন, ‘জুনিপার কাউকে না জানিয়ে নিজে থেকে এখানে একটা পণ্ডিতি করেছে। সে নিজে নিজেই আর্গনের ভেজালটা দূর করতে গিয়েছে।’

     ত্রিশিনা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলছেন আপনি! ভেজালের পরিমাণ ঠিক করতে গেলে কম্পিউটারের বেশ অনেকবার আর্গন চেম্বারটাকে ডিপ্রেশারাইজ করে ফেলার কথা!’ এত আধুনিক মহাকাশযানের কম্পিউটার কাউকে কিছু না জানিয়ে কেন এমন করবে, সেটা ত্রিশিনা বুঝতে পারে না।

     ডক্টর শ্রুল একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। কন্ট্রোল ডেক থেকে উঠে গিয়ে তিনি তার চেয়ারটাতে গিয়ে বসে বললেন, ‘আমি সত্যিই জানি না, ত্রিশিনা। আমি অনেক হিসাবই পুরোপুরি মেলাতে পারছি না। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে সেই অকাজটাই করেছে জুনিপার। অনেকবার ডিপ্রেশারাইজ করতে গিয়ে ইঞ্জিনকে দিয়ে কম্পিউটার অতিরিক্ত পরিমাণে কাজ করিয়েছে—’ ডক্টর শ্রুল থেমে যান।

     ত্রিশিনা জিজ্ঞেস করল, ‘মানে অতিরিক্ত অক্সিজেন পুড়িয়েছে?’

     ডক্টর শ্রুল মাথা ঝাঁকালেন। ত্রিশিনা মনিটরের লগ ফাইলের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে ঘটনাটা ঘটার সময় তারা মূল মহাকাশযানেই ছিল অথচ তাদেরকে কিছুই জানানো হয়নি। জুনিপার এত বেশি অক্সিজেন পুড়িয়েছিল যে একটা সময় মূল মহাকাশযানের কেবিনে রীতিমতো অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। সেই ঘাটতি ঠিক করতে গিয়ে জুনিপার তাদের এই গবেষণা পড থেকে অক্সিজেন নিয়ে মূল মহাকাশযানের কেবিনে সরবরাহ করে।

     এতক্ষণে তাদের বিপদটা টের পেল ত্রিশিনা— তার মানে তাদের পডে থাকা অক্সিজেন খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। শনি থেকে টাইটান পর্যন্ত তাদের যাবার জন্য পডে মোট অক্সিজেন সরবরাহ ছিল একদম মেপে মেপে দশ ইউনিট। ঘাটতি পূরণ করতে তার প্রায় ছয় ইউনিট নিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে মূল মহাকশযানে। পডের ওজন হালকা করতে গিয়ে তাদেরকে তরল অক্সিজেনের বাড়তি সিলিন্ডারগুলোও একদম হিসাব করে দেওয়া হয়েছে, চার ইউনিটের ঘাটতি সেগুলো দিয়ে কোনওভাবেই পূরণ হবার না। পডের ভেতরে নিশ্বাস আর বর্জ্য থেকে রিসাইকেল হতে থাকা অক্সিজেনগুলো যোগ করলে সেটা বড়জোর পাঁচ ইউনিট পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে। পাঁচ ইউনিট অক্সিজেন দিয়ে তারা দুজনে টাইটানে গিয়ে মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারবে না। হিসাব অনুযায়ী মাঝপথেই অক্সিজেনের অভাবে তাদের মৃত্যু হবার কথা।

     ত্রিশিনা মনিটরের দিকে তাকিয়ে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রাটা দেখতে থাকে— পডের ভেতরে পৃথিবীর মতো পরিবেশ তৈরি করার জন্য অক্সিজেন মাত্রা ষোলো থেকে একুশ শতাংশ ঠিক করে রাখা আছে। তার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। সে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আমরা যদি পডের বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেই, মানে নিশ্বাসে কম কম করে অক্সিজেন নিতে থাকি তাহলে কী কিছু করা সম্ভব?’

     ডক্টর শ্রুল বললেন, ‘বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ষোলোর নিচে চলে গেলে মানুষের শরীরে বিভিন্নরকম সমস্যা দেখা দেয়। আমি যতদূর জানি, অক্সিজেনের মাত্রা বড়জোর বারো শতাংশতে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু এর নিচে না। বারো শতাংশের নিচে অক্সিজেন মাত্রা নিয়ে গেলে আমাদের মাথা খারাপ হয়ে যাবে।’ এর পরে তিনি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু চাইলেই কী তুমি পড থেকে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক করতে পারবে? সেটার নিয়ন্ত্রণ তো মূল মহাকাশযানের কম্পিউটারের হাতে।’

     ত্রিশিনা দ্রুত হাতে কন্ট্রোল ডেক থেকে জুনিপারে কাজ করার জন্য লগ ইন করে ফেলল। সে ভেবেছিল যে জুনিপারে লগ ইন করে সে খুব সহজেই বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা বারো শতাংশতে নামিয়ে নিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু কিছুক্ষণের ভেতরে সে বুঝে ফেলে যে জুনিপার কিছুতেই তাকে এই মাত্রা কমাতে দেবে না, তার ফার্মওয়্যারে সেভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাগে, দুঃখে চিৎকার করে ওঠে ত্রিশিনা!

     ডক্টর শ্রুল বললেন, ‘আরেকটা চেষ্টা করে দেখতে পার।’

     ত্রিশিনা নিজেকে শান্ত করে বলে, ‘কী সেটা?’

     ‘তুমি দেখ যে আমরা এখান থেকে সরাসরি মূল মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারি কী না।’ ডক্টর শ্রুল যদিও তার এই বুদ্ধিটা নিয়ে খুব একটা আশাবাদি নন। কিন্তু বুদ্ধিটা মনে ধরল ত্রিশিনার, টাইটানের অভিযান বাতিল করে দিয়ে তারা আবার শনির বলয়ের কাছে মূল মহাকাশযানে ফিরে যাবার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু জুনিপারের প্রোগ্রাম পরিবর্তনের জন্য কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পরে সে একটা সময় হতাশ হয়ে বলল, ‘নাহ! বিজ্ঞান একাডেমির একুশ ধারা অনুযায়ী নাকি গবেষণা পডের গতিপথ পরিবর্তনের কোনও ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই!’

     ডক্টর শ্রুল বললেন, ‘আচ্ছা আমরা যদি জুনিপারকে এখান থেকেই ওভাররাইড করে ফেলি, তাহলে কী আমরা ওকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব?’ মুখে বললেন বটে, তবে ডক্টর শ্রুল খুব ভালো করে জানেন যে ত্রিশিনার মতো শিক্ষানবিশ একজনের পক্ষে এমন জটিল একটা কাজ উদ্ধার করা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজেই নিজের বুদ্ধিটাকে বাতিল করে দিয়ে বললেন, ‘নাহ! কিন্তু আমার মনে হয় না যে সামান্য একটা গবেষণা পড থেকে পঞ্চম জেনারেশানের একটা মহাকাশযানের কম্পিউটারকে ওভাররাইড করা কারো পক্ষে সম্ভব হবে।’

     ত্রিশিনা ডক্টর শ্রুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মানে মূল মহাকাশযানে বেঁচে ফিরে যাবার কোনও সম্ভবনাই আর তাদের নেই। তার সামান্য ভুলের মাশুল যে কতটা চড়া হতে পারে, সেটা বুঝতে পেরে ত্রিশিনা তীব্র একটা অপরাধবোধে ভুগতে থাকে।

     ডক্টর শ্রুল পডের নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘একটা উপায় অবশ্য আছে।’ ত্রিশিনা জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনি বলতে থাকেন, ‘যদি আমরা দুইজন না গিয়ে আমাদের মধ্যে থেকে যে কোনও একজন এখান থেকে টাইটানে যাই—’ ডক্টর শ্রুল তার হাতে ধরে রাখা হিসাবের কাগজটা ত্রিশিনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তাহলে অক্সিজেনের ব্যবহারমাত্রা অর্ধেক হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে থেকে যে যাবে, সে পাঁচ ইউনিট অক্সিজেন ব্যবহার করে আবার মূল মহাকাশযানে বেঁচে ফিরে যেতে পারবে।’

     ত্রিশিনা প্রায় ছো মেরে ডক্টর শ্রুলের হাত থেকে হিসাবের কাগজটা নিয়ে স্থির দৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মানে সহজ কথায়, এই অভিযানে তাদের মধ্যে শুধু একজনেরই বেঁচে পৃথিবীতে ফিরে যাবার সম্ভাবনা আছে।

     ত্রিশিনা প্রায় শোনা যায় না, এমন একটা কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘তার মানে— তার মানে—’

     ডক্টর শ্রুল শীতল গলায় ত্রিশিনার কথাটাকে শেষ করে দেন— ‘তার মানে প্রশ্ন হল যে আমাদের মধ্যে কে বেঁচে পৃথিবীতে ফিরে যাবে।’

     দুজন অভিযাত্রী গবেষণা পডের ভেতরে এক ধরনের অস্বাভাবিক নীরবতা অনুভব করতে থাকে।

***

ত্রিশিনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মেয়েরা কিছু কিছু সময় এমনভাবে কাঁদতে পারে যে তাতে যে কোনও মানুষের মন গলে গিয়ে নরম হয়ে যাবে। অন্য সময় হলে ডক্টর শ্রুলও এক ধরনের মায়া নিয়ে ত্রিশিনার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ত্রিশিনার কাঁধ দুটো ধরে তাকে শান্ত করে ফেলার একটা চেষ্টা নিতেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ডক্টর শ্রুল এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করতে থাকেন। তিনি কী বলবেন? বলবেন যে, এই মেয়ে তুমি কেঁদো না, আমি এই পড থেকে বের হয়ে যাব আর তুমি পৃথিবীতে ফিরে যাবে? তিনি এমন কিছু একটা না বলা পর্যন্ত মনে হয় মেয়েটার কান্না বন্ধ হবে না। কিন্তু সেটা ডক্টর শ্রুল কেন বলবেন?

     তার কী করা উচিত বা কী বলা উচিত সেটা ডক্টর শ্রুল ঠিক বুঝতে পারছেন না। কিন্তু কিছু একটা যে বলা উচিত সেটা তিনি বেশ বুঝতে পারছেন। তিনি শেষমেশ কোমল গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কাঁদছ কেন, ত্রিশিনা?’

     ত্রিশিনা কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি আমার ছোট ছেলেটার কথা চিন্তা করে কাঁদছি।’ ডক্টর শ্রুল ত্রিশিনার কথায় বেশ চমকে ওঠেন। তার জানা ছিল না যে ত্রিশিনার একটি সন্তান আছে। ত্রিশিনা বলতে থাকে, ‘মাত্র পাঁচ বছর বয়স ওর—’ কিন্তু কথা শেষ না করেই সে আবার কেঁদে ওঠে।

     ডক্টর শ্রুল বুদ্ধিমান মানুষ। নিজের সন্তানের কথা মনে করে ত্রিশিনা এখন হঠাৎ কেন কাঁদছে সেটা মনে হল তিনি অনুমান করতে পারছেন। তিনি খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখলেন যে ব্যাপারটা অনুমান করতে পেরেই তিনি তার ভেতরে ভেতরে এক ধরনের চঞ্চলতা অনুভব করতে শুরু করেছেন। ডক্টর শ্রুলের হঠাৎ করে এক ধরনের লজ্জার অনুভূতি হতে শুরু করে— আশ্চর্য! ত্রিশিনার কান্নার কারণটা বুঝতে পেরে তার মনটা এমন চঞ্চল লাগছে কেন? মানবীয় এই অনুভূতিগুলো বড়ই অদ্ভুত! তিনি খুব সাবধানে তার নিজের অনুভূতিকে গোপন রেখে বললেন, ‘সন্তানের কথা মনে করে কাঁদছ কেন?’

     ত্রিশিনা একটা লম্বা নিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘কাঁদছি কারণ আমি ওকে আর কোনও দিনও দেখতে পাব না—’

     ত্রিশিনার কান্নার কারণটা ঠিক ঠিক ভাবে অনুমান করতে পেরেছেন দেখে যে ভেতরে ভেতরে আরও উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছেন, সেটা ডক্টর শ্রুল বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারেন। ত্রিশিনা তাহলে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে তাদের মধ্যে ডক্টর শ্রুলই কেবলমাত্র পৃথিবীতে ফিরে যাবে। কিন্তু তারপরেও ডক্টর শ্রুলের মনের ভেতরটা খচখচ করতে থাকে। আসলেও কী তাই? নিশ্চিত হতে হলে তাকে সরাসরি ত্রিশিনাকে কথাটা জিজ্ঞেস করতে হবে। কিন্তু জিজ্ঞেস করলে মেয়েটা কী মনে করবে? তিনি একটু ঘুরিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলেন, ‘হঠাৎ করে তোমার এমন চিন্তা করার কারণ কী?’

     ত্রিশিনা হাত দিয়ে তার চোখ মুছতে মুছতে বলল, ‘কারণ আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি—’ বলে ত্রিশিনা থেমে যায়।

     ডক্টর শ্রুল খেয়াল করলেন যে ত্রিশিনার কথা শুনে তার হৃদপিণ্ড বুকের খাঁচায় জোরে জোরে বাড়ি দিচ্ছে। তিনি যথাসাধ্য শান্ত ভাব রেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী সিদ্ধান্ত?’

     ত্রিশিনাকে এখন আগের থেকে অনেক স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। সে বলল, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যে আমি পড থেকে বেরিয়ে যাব—’

     ত্রিশিনার কথাটা শোনার পরে ডক্টর শ্রুল বুঝতে পারেন যে তার শ্বাসপ্রশ্বাস আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কিন্তু, তিনি বুঝতে পারেন না যে গত কয়েক মিনিটে তার এমন অনুভূতির কারণ কী হতে পারে। ত্রিশিনার সিদ্ধান্তে তিনি কি মনে মনে আসলে খুশি হয়েছেন? কেন খুশি হয়েছেন? এমন অস্বস্তিকর একটা পরিস্থিতিতে ত্রিশিনার নেওয়া সিদ্ধান্তটি যদি তার বিপক্ষে যেত, তাহলে কি তিনি শান্ত থাকতে পারতেন?

     ডক্টর শ্রুলের অবচেতন মনের একটা অংশ তাকে বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকে যে ত্রিশিনার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়ার পরে সাবধানে কথা বলার জন্য। এমন কিছু বলা যাবে না যাতে ত্রিশিনা তার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

     ত্রিশিনা বলতে থাকে, ‘যত সামান্যই হোক না কেন, আমার ভুলের কারণেই আজ আমরা এই বিপদে পড়েছি—’

     এ কথাটা শোনার পরে ডক্টর শ্রুল লক্ষ করেন যে তার অস্বস্তি কমে যেতে শুরু করেছে। তার মনে হতে থাকে যে এই পরিস্থিতিতে তাদের দুজনের মধ্যে কারও যদি সত্যি সত্যিই বেঁচে থাকা উচিত, তাহলে সেটা তারই। তিনি তো কোনও ভুল করেননি! যে ভুল করেছে, তারই ভুলের মাশুল দেওয়া উচিত। তিনি বুঝতে পারেন যে ত্রিশিনা তীব্র অপরাধবোধে ভুগে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অপরাধবোধ অত্যন্ত খারাপ একটা অনুভূতি। এই অনুভূতি মানুষকে মানসিক দিক থেকে প্রচণ্ড দূর্বল করে দেয়। দূর্বল মানসিকতার মানুষেরাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অপরাধবোধে ভোগার কারণে ত্রিশিনা ঠান্ডা মাথায় কিছু ভাবতে পারছে না। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে মেয়েটা বলত যে তাদের নামে লটারি করা হবে। লটারিতে যার নাম উঠবে সে এই পড থেকে বেরিয়ে যাবে। আগের যুগে খাবারের সংকট দেখা দিলে জাহাজের নাবিকেরা এভাবেই লটারি করত, যার নাম উঠত তাকে জাহাজ থেকে পানিতে ঝাঁপ দিতে হত। ডক্টর শ্রুল মনস্থির করে ফেলেন যে কোনওভাবেই ত্রিশিনার মন থেকে এই অপরাধবোধটাকে মুছে ফেলা যাবে না। ত্রিশিনা ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা শুরু করলেই পুরো ব্যাপারটা তখন অনেক, অনেক বেশি জটিল হয়ে যাবে।

     ত্রিশিনা নিজের সঙ্গেই নিজে যেন কথা বলতে থাকে— ‘জুনিপারকে দায়ী করে আমাদের কোনও লাভ নেই, সে আমার ভুলের কারণে হতে থাকা সমস্যাটা সমাধান করার চেষ্টা করেছে মাত্র। আমাদের দুজনের মধ্যে শুধুমাত্র একজন বেঁচে থাকতে পারবে। এই ঘটনার পেছনে যার কোনও হাত নেই, সহজ হিসাব— তারই বেঁচে থাকার অধিকার বেশি—’

     ডক্টর শ্রুল খেয়াল করলেন যে অবচেতন মনেই তিনি মাথা ঝাঁকাচ্ছেন, নির্লজ্জের মতো তিনি ত্রিশিনার কথায় সমর্থন জানাচ্ছেন।

     ত্রিশিনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে— ‘হতে পারে আমার বয়স অনেক কম, আমার পুরো জীবনটাই বাকি পড়ে আছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে, সেটা ঠিক করার জন্য বয়স কখনওই বিবেচনার বিষয় হতে পারে না।’

     ডক্টর শ্রুল সামান্য ভদ্রতা করে বললেন, ‘আমরা অন্য কোনওভাবে চেষ্টা করে দেখি? হয়তো সমস্যাটার একটা সমাধান আমরা বের করে ফেলতে পারব।’

     ত্রিশিনা বলল, ‘আপনি যতই দেরি করবেন, ততই আমরা পডের অক্সিজেন কমিয়ে ফেলতে থাকব। তখন আমাদের কেউ একজন পড থেকে বেরিয়ে গেলেও আর কোনও লাভ হবে না।’ কথা বলতে বলতে ত্রিশিনার গলাটা ধরে আসে। তার গাল বেয়ে আবার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে থাকে। একটা সময় সে তার দুই হাত দিয়ে মুখটা চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমার জন্য আমার বাচ্চাটাও আর পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারল না, ডক্টর শ্রুল—’

     ডক্টর শ্রুলের বুকটা ধড়াস করে ওঠে। কী আবোলতাবোল বকছে মেয়েটা! তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেন, ‘মানে?’

     ত্রিশিনা তার পেটের ওপরে হাত বুলিয়ে বলল, ‘আর মাত্র ছয় মাস পরেই—’ কথাটা শেষ করতে পারে না সে, আবার ডুকরে কেঁদে উঠল।

     ডক্টর শ্রুল লক্ষ করেন যে তার ভেতরে আবার কিছুক্ষণ আগে হতে থাকা অস্থিরতাটা ফিরে এসেছে। তিনি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে পডের গোল জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন।

     সূর্যটাকে শনিগ্রহ এখন পুরোপুরি ঢেকে ফেলেছে। বাইরে মন খারাপ করা অস্বাভাবিক এক ধরনের অন্ধকার।

***

ডক্টর শ্রুল বের হয়ে যাবার জন্য ধীর পায়ে গবেষণা পডের প্রথম দরজাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার চোখে মুখে এক ধরনের প্রশান্তি খেলা করছে। তিনি আশা করছেন যে সব দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে তিনি শেষমেশ সঠিক সিদ্ধান্তটাই নিতে পেরেছেন।

     যুক্তি দিয়ে বিচার করলে ত্রিশিনা মেয়েটারই এখন তার জায়গায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি যুক্তি দিয়ে ব্যাপারটাকে আর বিচার করতে চাচ্ছেন না। তার যুক্তির জায়গাটা এসে দখল করেছে আবেগ। আবেগ অত্যন্ত কঠিন একটা জিনিস, যুক্তিতর্কের কোনওরকমের ধার সে ধারে না। ডক্টর শ্রুল নিজেকে প্রবোধ দিতে থাকেন। তিনি এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে ভুল যতই ত্রিশিনার হোক না কেন, সে একটা ফুটফুটে শিশু সন্তানের মা। তিনি এখন চান যে সেই মা তার আদরের ছেলেটাকে বুকে আগলে আরও অনেকদিন বেঁচে থাকুক, পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে জন্ম দিক তার আরেক সন্তানকে। ত্রিশিনার সিদ্ধান্তে তিনি একটা সময় খুশি হয়ে উঠেছিলেন এটা ভেবেই তিনি এখন বেশ লজ্জা পাচ্ছেন।

     ডক্টর শ্রুল একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। তার বুড়ো হাড়ে ক্ষয় ধরেছে, আর ক-টা দিনই বা বাঁচবেন তিনি। স্ত্রী মারা গেছেন বহু বছর হয়ে গেল, সন্তানেরা একে একে সবাই কোনও না কোনও গ্রহে পাড়ি জমিয়েছে। এ অবস্থায় আরও কিছুদিন হয়তো তিনি বেঁচে থাকতে পারতেন, কিন্তু সেটা হতো মানসিক একটা অশান্তি নিয়ে বেঁচে থাকা। যে প্রশ্নটা তাকে সবসময়ই অপরাধী করে রাখত সেটা হল, তিনি কি পারতেন না ত্রিশিনাকে বাঁচিয়ে রাখতে? ডক্টর শ্রুল এভাবে বেঁচে থাকতে চান না।

     কার্বন ন্যানোটিউবের তৈরি দরজাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একপাশে সরে গেলে ডক্টর শ্রুল এয়ারলক অঞ্চলের ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালেন। গবেষণা পডের কম্পিউটার তার পেছনের দরজাটাকে বন্ধ করে দিয়ে এয়ারলক অঞ্চলকে ডিপ্রেশারাইজ করার কাজ শুরু করে দেয়। এয়ারলক অঞ্চলটাতে এক ধরনের হিস-হিস করে আওয়াজ হতে থাকে। এরপর ডক্টর শ্রুলের সামনের দিকের দ্বিতীয় দরজাটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। এয়ারলক অঞ্চল থেকে ধীরপায়ে শূন্যে ভেসে বেরিয়ে যান ডক্টর শ্রুল, টেদার ছাড়াই ধীর গতিতে ভেসে ভেসে পডটা থেকে দূরে চলে যেতে থাকেন তিনি। তার পেছন দিকে বিশাল শনিগ্রহের বালিরঙের বলয়গুলোর ওপাশ থেকে সূর্যটা একটু একটু করে উঁকি দিতে থাকে।

     ঘণ্টাদুয়েক পরে ডক্টর শ্রুলের হাতঘড়িটি কাঁপতে থাকে।

     এলার্ম বাজছে।

     ডক্টর শ্রুল শান্ত দৃষ্টিতে শনির বলয়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন— আশা করা যায় এতক্ষণে ত্রিশিনাকে দেওয়া ক্লোরোফর্মের প্রভাবটা কেটে গেছে।

***

প্রাইমা গ্রুস তার সাহায্যকারী রোবটটিকে আরেকবার খবরটা পড়তে নির্দেশ দিলেন। সাহায্যকারী রোবট মিষ্টি কণ্ঠে খবরটা আবার পড়তে থাকলে প্রাইমা গ্রুসের মুখে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠতে থাকে। তার গড়ে তোলা কার্বন ভিত্তিক রোবট তৈরির প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাপক প্রশংসায় ভাসিয়েছে সংবাদকর্মীরা সবাই। আগের সব বারের মতো এবারও তাদের বানানো রোবটটার একমাত্র কাজ ছিল টাইটান অভিযানে তার সঙ্গের মানুষ অভিযাত্রীটিকে বোকা বানানো। বারবার ব্যর্থ হবার পরে অবশেষে তাদের রোবটটা এবার কাজটা করে দেখাতে পেরেছে। অভিযানের মানুষটার মস্তিষ্কে গোপনে দিয়ে রাখা টেলিমেট্রি() থেকে পাওয়া প্রত্যেকটা তথ্য যাচাই করে দেখা হয়েছে, এক সেকেন্ডের জন্যেও মানুষটা বুঝতে পারেনি যে তার সহযাত্রী আসলে একটা কার্বন ভিত্তিক রোবট। টুরিং টেস্টে() পুরোপুরি সফল তারা। এমন একশো ভাগ সাফল্য আগের কোনও অভিযানেই কখনও পাওয়া যায়নি। আগের অভিযানগুলোতে ব্যবহার করা রোবটগুলোর কথাবার্তায় আর কার্যকলাপে কোনও না কোনও সময় মানুষ সহযাত্রীদের মনে সন্দেহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এর পরে প্রত্যেকবারই তারা আসল ঘটনা উদ্ধার করে রোবটটাকে কায়দা করে পড থেকে বের করে দিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। মানুষকে বোকা বানানো কি এতই সহজ?

     কিন্তু সেই কঠিন কাজটাই এবারের রোবটটা করে দেখিয়েছে! ভাগ্যিস তিনি রোবটটার কোয়ান্ট্রনে() বিজ্ঞানী রুহার অনুভূতি সমীকরণগুলোকে ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো অভিনব একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন! বিজ্ঞানী রুহার অনুভূতি সমীকরণগুলোর ব্যবহার করে রোবটটা বেশ ভালোভাবে বুঝে ফেলেছিল যে ঠিক কি ধরনের মিথ্যা কথা বললে মানুষটাকে আবেগী করে ফেলা যাবে আর তার কাজটাও উদ্ধার হবে। রোবটটা এত দারুণভাবে মিথ্যা বলতে না পারলে ডক্টর শ্রুলও আগের সব মানুষের মতো পৃথিবীতে ফিরে আসত!

     মুঠি পাকিয়ে আনন্দে বাতাসে একটা ঘুসি বসিয়ে দেন প্রাইমা গ্রুস।

     তার সাহায্যকারী রোবটটা আরও একবার খবরটা পড়তে শুরু করে।

 

 

সেন্সর ব্যবহার করে দূর থেকে তথ্য পাবার পদ্ধতি।

একটি যন্ত্রের সক্ষমতা মানুষের কতটুকু সমতুল্য সেটা মাপার পরীক্ষা।

কোয়ান্টাম শক্তিমাত্রার রোবট মস্তিষ্ক। (কাল্পনিক)

Tags: কল্পবিজ্ঞানের গল্প, গল্প, রুশদী শামস, ষষ্ঠ বর্ষ প্রথম সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!