ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হবে (There Will Come Soft Rains)

  • লেখক: রে ব্র্যাডবেরি, ভাষান্তর: যশোধরা রায়চৌধুরী
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

 

আগস্ট ২০২৬

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হবে

বসবার ঘরের কণ্ঠঘড়ি গান গেয়ে চলেছে। টিক টক, সেভেন ও’ক্লক। টিং টিং, ঢংঢং। ভোর হল। দোর খোলো। খুকুমণি জাগো রে। এমন ভাব করছে, যেন কেউ এমনিতে উঠবে না।

সকালের বাড়ি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। ঘড়ি টিকটিকিয়ে চলেছে। শূন্যতার ভেতরে নিজের শব্দের প্রতিধ্বনি নিজেই করছে। সাতটা নয়—প্রাতরাশ হয়। সাতটা দশ—পড়তে বোস।

রান্নাঘরে প্রাতরাশের স্টোভটা দীর্ঘশ্বাসের মতো হিসহিস শব্দ করল। আটটা চমৎকার করে ভাজা বাদামি টোস্ট ছিটকে বেরুলে তার উষ্ণ অন্তঃকরণের মধ্য থেকে। আটটা পোচ করা ডিম বেরুল, সব কুসুমের দিকটা ওপরে, নিটোল সূর্যোদয়ের মতো।

ষোলোটা বেকনের ভাজা টুকরো, দুটো কফি, দুটো ঠান্ডা দুধের গেলাস।

আজ ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যালেন্ডেল শহরে আগস্ট ৪, ২০২৬, রান্নাঘরের ছাত থেকে দ্বিতীয় একটি কণ্ঠ বলে উঠল। তিনবার তারিখটা বলল কণ্ঠটি, যাতে স্মৃতিধার্য হয়। আজ মিস্টার ফেদারস্টোনের জন্মদিন। আজ টিলিটার বিবাহবার্ষিকী। বিমার টাকা জমা দিতে হবে। ভরতে হবে জল, গ্যাস আর বিজলির বিল। কোথাও দেওয়ালগুলোর ভেতর থেকে কাঁটা আর চাকা ঘুরে ঘুরে কিটিরকিট কিটিরকিট খাপে খাপে বসছে আর বিজলি আলোর চোখের কড়া দৃষ্টির তলায় স্মরণবার্তার টেপরেকর্ডার ঘড়ঘড় করে ঘুরে ঘুরে বেজে চলেছে।

আটটা এক, স্কুলের জন্য ব্যাগ কর প্যাক! কাজের জন্য ব্যাগ কর প্যাক। দৌড়ো দৌড়ো, আটটা এক।

কিন্তু কোনও দরজা দড়াম করে বন্ধ হল না। রবারের জুতোর নরম মসমসানি শোনা গেল না কোনও কার্পেটের ওপর। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। আবহাওয়া বাক্সটা সদর দরজায় বসানো। তা আলতো মিহি সুরে গান গাইছে…। বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি, আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে। রেনকোট নিয়ে বেরিয়ো, নইলে ভিজে যাবে গো। লেবুর পাতা করমচা, যা বৃষ্টি, বাড়ি যা।

বৃষ্টি অবিরত টোকা দিয়ে চলেছে খালি বাড়িটাতে। বৃষ্টির শব্দ অনুরণিত হচ্ছে ঘরে ঘরে।

বাইরে গ্যারাজও গান গাইছে, গ্যারাজের শাটার নিজে নিজে খুলে যাচ্ছে অপেক্ষারত গাড়িটির ঘোমটা সরিয়ে। অনেক অপেক্ষার পর ব্যর্থমনোরথ দরজাটি আবার নেমে এসে বন্ধ হয়ে গেল।

সকাল সাড়ে আটটা। ডিমগুলো কুঁচকে গিয়েছে। টোস্ট হয়ে গেছে পাথরের মতো শক্ত। একটা অ্যালুমিনিয়ামের হাতল এসে জিনিসগুলোকে বেসিনে ফেলে দেয়। গরম জল ঘুরে ঘুরে একটা ধাতব কণ্ঠনালি দিয়ে সেগুলোকে হজম করিয়ে ফ্লাশ করে চালান করে দূরের সাগরের দিকে। ময়লা পাত্রগুলো জমা হয় ডিশ ওয়াশার যন্ত্রে। গরম জলে ধোয়াপাকলা হয়ে চকচকে পরিষ্কার আর শুকনো হয়ে বেরোয় তারা।

ন-টা পনেরো। ঘড়ি গাইছে। ন-টা পনেরো, ন-টা পনেরো, ফুলঝাড়ু লাগাও যত পারো।

দেওয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে ছোট ছোট রোবট ইঁদুর ছিটকে বেরুচ্ছে। এরা পরিষ্করণ-রোবট। সারা ঘর কিলবিল করছে ছোট ছোট ঝাড়ুদার পশু… রবার ও ধাতু দিয়ে তৈরি। চেয়ারগুলোকে ঠুকছে, গোঁফের মতো ঝাড়ন দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধুলো ঝাড়ছে। নিংড়ে দিচ্ছে ন্যাতাগুলো, লুকোনো ধুলো চেটে, চুষে খেয়ে নিচ্ছে। তারপর রহস্যময় আক্রমণকারীর মতো আবার সুড়ুত করে ঢুকে যাচ্ছে নিজেদের সুড়ঙ্গে।

গোলাপি বিজলি বাতি-জ্বলা চোখের আলো নিবে যাচ্ছে। বাড়ি ততক্ষণে সাফসুতরো।

দশটা। সূর্য বেরিয়ে এসেছে বৃষ্টির ওপার থেকে। বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে ছাই আর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে। একটাই বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। রাতে ধ্বংস হওয়া শহরটির শরীর থেকে যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে তা বহু দূর দূর অব্দি দেখা যায়।

দশটা পনেরো। বাগানের ফোয়ারাগুলো সোনালি ঝারিগুলো নল ঘোরাতে ঘোরাতে উঠে দাঁড়াল, নরম সকালের বাতাসকে উজ্জ্বল জলের কণা দিয়ে শীকরসিক্ত করতে। জল লাগল এসে জানালার কাচে, পশ্চিমদিকের পোড়া পোড়া অংশটা দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল জল… ওইদিকে সাদা রঙের আস্তরণ উঠে গিয়েছে। পুরো পশ্চিম অংশটাই কালো হয়ে গিয়েছে বাড়িটার। শুধু পাঁচটা জায়গা ছেড়ে গেছে। একদিকে একটা মাঠ সমান করা লোকের মূর্তির সিল্যুয়েট দেখা যায়। যেমন ফোটোর নেগেটিভে দেখা যায়, ফুল তুলতে উদ্যত নিচু হওয়া এক নারীর অবয়ব দেখা যায়। আরও এগিয়ে, কাঠের ভেতরে ছবি আঁকার মতো আঁকা হয়ে আছে একটি মুহূর্তের চিত্র, এক ছোট্ট ছেলে তার দু-হাত তুলেছে আকাশে। আরও উঁচুতে, একটা ছুড়ে-দেওয়া বলের আকারে রংটুকু রয়ে গেছে বাড়ির বাহির দেওয়ালে।

তার উলটোদিকে একটি মেয়ের ছবি, সে হাত তুলে বলটা লুফতে চেয়েছিল। বলটা আর কোনওদিন আসেনি তার কাছে।

এই পাঁচটা ছোপের মতো রং, পুরুষ, নারী, শিশু দুটি আর বল… থেকে গেছে। বাকিটা পাতলা কালো পোড়া কয়লার আস্তরণ।

বাগানের ফোয়ারাটা জল ছড়াতে ছড়াতে যেন বাগানটাকে ভরিয়ে দিচ্ছিল এক রকমের পড়ন্ত আলোয়।

আজকের দিন অব্দি বাড়িটা কী সুন্দর শান্তি বজায় রেখেছে। কীভাবে নিখুঁতভাবে পাসওয়ার্ড চেয়েছে ঢোকার মুখে। কে এসেছেন? চাবি শব্দ বলুন?

আর একা চরে খাওয়া শেয়াল বা কাঁদুনি-গাওয়া বেড়ালের কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে জানালাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, পর্দা টেনে দিয়েছে… যেভাবে প্রৌঢ়া মহিলারা আত্মরক্ষার্থে চারদিক বন্ধছন্দ করেন একরকম যান্ত্রিক ভীতিবশে।

প্রতি সামান্যতম শব্দেও বাড়িটি কেঁপে কেঁপে উঠেছে। হ্যাঁ, বাড়িটা। যদি একটা চড়াই পাখি জানালার পাশ দিয়ে গেছে, ঝট করে খুলে গেছে জানালার পাল্লা। পাখিটা চমকে পালিয়েছে উড়ে। না, একটা পাখিকেও স্পর্শ করতে দেওয়া যাবে না বাড়িটাকে।

বাড়িটা যেন একটা মন্দির। সেখানে পূজারত কত ভক্ত। বড়-ছোট। কত কণ্ঠ। কত সুরময় প্রার্থনাগীতি। শুধু দেবতারা নেই। তাদের ধর্মীয় উপচার চলেছে, অর্থহীন, ব্যবহারহীন।

দুপুর বারোটা। একটা কুকুর কাঁপতে কাঁপতে সদর দরজায় এসে দাঁড়াল, ঘ্যানঘেনিয়ে কাঁদল।

সদর দরজাটি কুকুরের কণ্ঠস্বর বুঝতে পারল এবং খুলে গেল। কুকুরটা একদা ছিল বিশালকায়, মাংসল। এখন সারা গায়ে ঘা, হাড্ডিসার চেহারা। বাড়ির ভেতরে সে ঢুকে পড়ল। পায়ে পায়ে কাদার ছাপ দিয়ে চলল সারা বাড়ি জুড়ে। পেছনে রাগি যন্ত্র ইঁদুররা খুরখুরিয়ে বেড়াল। রাগি, কারণ কাদা খুঁটে তুলতে হচ্ছিল। রাগি, কারণ অসুবিধার সৃষ্টি করছে এ।

একটা শুকনো পাতাও দরজার তলা দিয়ে উড়ে এসে পড়লে, দেওয়ালের অদৃশ্য ফোকর খুলে যাবেই, তামা দিয়ে তৈরি ইঁদুরগুলো দ্রুতবেগে বেরিয়ে আসবেই। একটু ধুলো, একটু উপদ্রবকারী চুল বা কাগজের টুকরো তারা তুলে নেয় ছোট ছোট স্টিলের চোয়াল দিয়ে। তারপর ফিরে যায় তাদের খোঁদলে।

তারপর মাটির তলার ঠান্ডা ঘর অব্দি বয়ে-যাওয়া নল দিয়ে, জিনিসটা ফেলে দেওয়া হয়ে একটা ফিশফাশ শ্বাস-নেওয়া হাঁ-মুখে, যন্ত্রটা একটা চুল্লি** ইনসিনারেটর… একটা অন্ধকার কোণে বসে-থাকা ভয়ানক রাক্ষসের মতো বসে বসে যেসব ময়লাকে গিলে নিয়ে পুড়িয়ে ফ্যালে।

কুকুরটা ওপরে উঠল দৌড়ে। প্রতি ঘরের দরজার সামনে একবার করে করুণ কান্নার মতো সুরে ডাকল, তারপর উপলব্ধি করল, বাড়িটার সঙ্গে সঙ্গেই, যে এ বাড়িতে এখন শুধু নীরবতা বাস করে।

বাতাস শুঁকল কুকুরটা। রান্নাঘরের দরজা আঁচড়াল। দরজার পেছনে স্টোভটা তখন গরম গরম পিঠে বানাচ্ছিল। প্যানকেকের ভাজা-ভাজা গন্ধে ভরপুর সারা বাড়ি। মেপল সিরাপের সুগন্ধে ভরভরাট।

কুকুরটার মুখে ফেনা উঠছিল। সে দরজার সামনে শুয়ে পড়ল। শুঁকছিল সে চারদিক। ক্রমশ তার চোখ দুটো আগুনের ভাঁটার মতো হয়ে গেল। সে পাগলের মতো নিজের ল্যাজের পিছুপিছু বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল। উন্মাদ চক্রাকার আবর্তন। তারপর মারা গেল কুকুরটা। এক ঘণ্টা সেভাবেই সে পড়ে রইল হলঘরের মেঝেতে।

দুটোর সময়ে একটা কণ্ঠস্বর গান গেয়ে উঠল।

সূক্ষ্ণ চেতনা দিয়ে অবক্ষয় আর পচনের গন্ধ পেল ওরা। ইঁদুরগুলো আবার খুরখুরিয়ে বেরুল… দলে দলে। হালকা মিহি পায়ে তারা বিজলিচালিত ঘূর্ণনে ঘুরল। যেন ধূসর ঝরাপাতা হাওয়ায় উড়ছে। এরকমভাবে কাজ চলল।

দুটো পনেরো।

কুকুরটা আর নেই।

নীচের তলার ঘরে, ইনসিনারেটর, সেই অগ্নিযন্ত্রটির চুল্লি হঠাৎ খুব জ্বলজ্বল করে উঠল। একগাদা ফুলকি তুলে চিমনি দিয়ে লাফিয়ে উঠল টাটকা ধোঁয়া।

দুটো পয়ঁত্রিশ।

ব্রিজ খেলার টেবিলগুলো বসবার ঘরের দেওয়াল থেকে গজিয়ে উঠল। খেলার তাসগুলো ঝরঝর করে পড়ল আলাদা আলাদা ভাগে। মার্টিনি মদ্যের গেলাস দেখা দিল ওক কাঠের বেঞ্চিতে… সঙ্গে ডিমসেদ্ধ দিয়ে তৈরি স্যালাডের স্যান্ডউইচ। মৃদু বাজনা বাজতে লাগল।

কিন্তু টেবিলগুলো নীরব রইল। তাসগুলো কেউ স্পর্শ করল না।

চারটের সময়ে টেবিলগুলো প্রজাপতির পাখার মতো ভাঁজ হয়ে আবার সার সার ছবি আঁকা দেওয়ালের মধ্যে ঢুকে গেল।

সাড়ে চারটে।

ছোটোদের ঘরের দেওয়ালে আলো জ্বলে উঠল।

পশুপাখির ছবি ফুটল। হলুদ জিরাফ, নীল সিংহ, গোলাপি হরিণ, বেগনেরঙা প্যান্থার। একটা স্ফটিকের মতো বস্তুর ভেতরে ওরা ঘুরপাক খেল, ডিগবাজি খেল। দেওয়ালগুলো কাচের। অজস্র রং আর স্বপ্ন আর কল্পনার আধার। লুকোনো ফিল্‌মের রোল ঘুরতে লাগল সুনিয়ন্ত্রিত সকেটের ভেতর থেকে, আর দেওয়ালগুলো জ্যান্ত হয়ে উঠতে লাগল। ছোটোদের নার্সারি ঘরের মেঝেটা এমনভাবে বোনা যেন একটা সবুজ তাজা ঘাসে ভরা মাঠ সেটা। তার ওপরে অ্যালুমিনিয়ামের কীট আর লোহার ঝিঁঝিপোকারা নাচানাচি করল, দৌড়ে গেল। গরম বদ্ধ বাতাসে লাল পাতলা রেশমের তৈরি প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াতে লাগল… চারদিকে পশুর শরীরের ঘাম পুরীষের গন্ধ তীব্র হয়ে উঠল। একটা শব্দ উঠল, যেন মোটা মোটা মৌমাছি তাদের একটা হলদে ঠাসবুনোট মৌচাকের আশপাশে ঘুরঘুর করছে। অথবা একটা বড় সিংহ আরামে গলায় আদুরে শব্দ করছে, ঘড়ঘড় করে। ওকাপির ছুটোছুটির শব্দ। জঙ্গলের তাজা বৃষ্টির শব্দ, যেন তা আরও অন্য পশুর খুরের শব্দ, গ্রীষ্মের শুষ্ক ঘাসের ওপর পড়ছে, যা অবারিত।

এবার দেওয়ালগুলো আবার মুছে মিশে গেল নতুন দৃশ্যে। এবার শুষ্ক মাঠ, ঘাস… মাইলের পর মাইল। অনন্ত উষ্ণ আকাশ। জন্তুগুলো পালিয়ে গেছে তাদের জলাশয়ের কাছে, কাঁটাঝোপের আশপাশে।

শিশুদের জন্য নিবেদিত এই সময়টা।

পাঁচটা। বাথরুমের বাথটাব গরম পরিষ্কার জলে পূর্ণ হয়ে উঠল।

ছ-টা, সাতটা, আটটা। ডিনারের থালাবাসনও জাদুকরের কাঠির স্পর্শে বেরুল, ঢুকল। পড়ার ঘরে টিকটিক করে আওয়াজ হল। বসবার ঘরের ফায়ারপ্লেসের জ্বলন্ত মৃদু মিঠে উষ্ণ আগুনের উলটোদিকের ধাতব স্ট্যান্ডে একটি সিগার বেরিয়ে এল, আধা ইঞ্চি ধূসর ছাইসহ, জ্বলন্ত, অপেক্ষারত।

রাত ন-টা। বিছানাগুলো তাদের অদৃশ্য সার্কিটের কল্যাণে উষ্ণ হয়ে উঠল, কারণ রাত্রে এখানে বেশ ঠান্ডা।

রাত ন-টা পাঁচ। পড়ার ঘরের ছাত থেকে একটা কণ্ঠ বলল, মিসেস ম্যাক ক্লেলান, আপনি কোন কবিতাটা আজ সন্ধেতে শুনতে চান?

বাড়িটি নীরব রইল।

কণ্ঠটি এবার বলল, আপনি যেহেতু নিজের পছন্দ ব্যক্ত করেননি, আমি আমার নিজের মতো করে যে-কোনও একটা কবিতা বলি? হালকা শান্ত সংগীতের মূর্ছনা শোনা গেল ব্যাকগ্রাউন্ডে। তারপর আবৃত্তি শুরু হল। সারা টিসডেল। আমার মনে পড়ছে, এইটে আপনার অতি প্রিয় কবিতা।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হবে। মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ উঠে

পাখিদের পাখনার ঝিলিমিলি সুর উঠবে ফুটে

রাত্রে ব্যাঙেরা সব গান গাইবে পুকুরের পাড়ে

বুনো কুলঝোপগুলি জ্যোৎস্নায় মাথা নেড়ে নেড়ে

সংগত মেলাবে শুধু, রবিনেরা লাল পালকের

নিচু বেড়াটির তারে বসে বসে শিস দেবে ফের

কেউ জানবে না কোনও যুদ্ধের কথা কোনওদিন

কেউ আর ভাববে না, কীরকম শেষের সেদিন।

পাখি গাছ ফুলেদের চলে আনাগোনা।

মানুষেরা মরে ঝরে শেষ হলে, কিছু কারও এসেই যাবে না।

ভোরবেলা বসন্তের নতুন একটি দিন এলে

আমরা থাকব না আর, সকলে তা যাবে ঠিক ভুলে।*

(*There will come soft rains and the smell of the ground,

The swallows circling with their shimmering sound;

And frogs in the pools singing at night,

And wild plum-trees in tremulous white;

Robins will wear their feathery fire,

Whistling their whims on a low fence-wire;

And not one will know of the war, not one

Will care at last when it is done.

Not one would mind, neither bird nor tree,

If mankind perished utterly;

And Spring herself, when she woke at dawn,

Would scarcely know that we were gone.)

পাথরের ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলতেই থাকল। সিগারটি নীরবে একটা ছাইয়ের স্তূপ হয়ে গেল। খালি চেয়ারগুলি মুখোমুখি বসে রইল নীরব দেওয়ালের সামনে। বাজনা বেজেই চলল।

দশটার সময়ে, বাড়িটি মরতে শুরু করল।

একটা দমকা বাতাস বইল। একটি বিশাল বড় গাছের ডাল হুড়মুড় করে রান্নাঘরের জানালার ওপর পড়ে, জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল।

বোতল বোতল পরিশোধক তরল স্টোভটার ওপর গড়িয়ে পড়ল। ঘরটা এক মুহূর্তে লকলকে আগুনের শিখায় ঢেকে গেল।

একটা কণ্ঠ চ্যাঁচাল, আগুন! বাড়ির সব ক-টা আলো জ্বলে উঠল, জলের স্বয়ংক্রিয় পাম্প থেকে জল বেরিয়ে এল ছাতের ছিদ্র দিয়ে। কিন্তু ওই রাসায়নিক তরল তখন গড়িয়ে যাচ্ছে মেঝের ওপর দিয়ে… মেঝের সিন্থেটিক আবরণের ওপর দিয়ে যেন জিব বের করে খেতে খেতে চলেছে আগুন… রান্নাঘরের দরজার তলা দিয়ে বেরিয়ে বাড়িটাকে অধিগ্রহণ করছে। কণ্ঠগুলো সমস্বরে গেয়ে উঠল, আগুন, আগুন, আগুন!

বাড়িটা শেষ চেষ্টা করল নিজেকে বাঁচাবার। দরজাগুলি সজোরে বন্ধ হয়ে গেল নিশ্ছিদ্রভাবে, কিন্তু আগুনের তাতে জানালাগুলো ফেটে ভেঙে পড়তে লাগল। হাওয়া ঢুকে আগুনটাকে পল্লবিত করল। শুষে খেতে লাগল সব। বাড়িটা দশ কোটি রাগি ফুলকিতে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে তারপর দোতলায় উঠতে লাগল। বাড়িটা তখন হাল ছেড়ে দিতে লাগল। ছোট ছোট জল-ছড়ানো ইঁদুররা ছোটাছুটি করতে লাগল দেওয়ালে। তাদের জলধারা সজোরে ছুড়ে দিতে লাগল আগুনের দিকে, আরও জল ভরতে ছুটল বারবার। দেওয়াল থেকে যান্ত্রিক বৃষ্টি বেরিয়ে এল। কিন্তু খুব দেরি হয়ে গেছিল ততক্ষণে। কোথাও, দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা পাম্প থেমে গেল অতি বিরক্ত হতাশ হয়ে। বারিধারা থেমে গেল। যতটা জল জমানো রাখা ছিল নীরব বাথটাবে আর ট্যাংকিতে, যা নিয়মিত বাসন ধুত, বাগানে জল দিত, সে-ও ফুরিয়ে গেল।

সিঁড়ি দিয়ে খরখরিয়ে উঠল আগুন। ওপরে উঠতে উঠতে সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর পিকাসো আর মাতিসদের খেতে খেতে চলল, যেন বিশিষ্ট সুখাদ্য কোনও পদ। ক্যানভাসের তেলতেলে মাংসকে প্রথমে ভাজা-ভাজা করে তারপর মুচমুচে করে ফেলল। কালো শুকনো ছাই পড়ে থাকল।

এবার আগুন বিছানায় শোবে। জানালায় দাঁড়াবে। পর্দার রং পালটাবে। তারপর সব যন্ত্রপাতিকে একে একে খেয়ে নেবে।

অ্যাটিকের গোপন দরজা থেকে অন্ধ রোবটের মুখমণ্ডল বেরিয়ে আসছে, নলাকৃতির ঠোঁট দিয়ে সবুজ রাসায়নিক বমি করতে করতে।

দু-পলকের জন্য হটে গেল আগুন, যেমন হাতিও একটা মরা সাপকে দেখে থামে।

তারপর কুড়িটা সাপ একসঙ্গে মেঝেতে বেরিয়ে লাফাতে লাগল। আগুনটাকে সবুজ ফেনায়িত স্বচ্ছ শীতল বিষ দিয়ে মারতে চাইল।

কিন্তু আগুন খুব চালাক। সে বাড়ির বাইরেও পাঠিয়ে দিয়েছিল লেলিহান শিখা। তা এল অ্যাটিকের ফুটো দিয়ে ঢুকে। পাম্পগুলোকে আক্রমণ করেছিল। বিস্ফোরণ হল পাম্পে। অ্যাটিকে যে মূল মগজ বসে এতক্ষণ এত কাণ্ডের নির্দেশ দিচ্ছিল, সেই ফেটে টুকরো টুকরো হল… ব্রোঞ্জের ছোট ছোট কুচি ছড়িয়ে গেল বাড়ির কাঠের কাঠামোর লকড়িতে, কড়িবরগায়।

আগুন ফিরে এসে প্রতিটি দেওয়াল আলমারিতে ঢুকে গেল, প্রতিটি জামাকাপড়কে ধরে ছুঁয়ে দেখল। বাড়িটি কেঁপে উঠল… ওক কাঠের হাড়গোড় নড়ে গেল… প্রচণ্ড গরমে তার উলঙ্গ কঙ্কালটাও কুঁকড়ে যেতে লাগল এরপর। বিজলির তার, স্নায়ুমণ্ডলী খুলে বেরিয়ে এল। যেন শল্যচিকিৎসকের ছুরির নীচে চামড়া কেটে বের করা হয়েছে লাল শিরা-উপশিরা, বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে তারা।

বাঁচাও! বাঁচাও! আগুন! আগুন! পালাও, পালাও!

আগুনের তাতে আয়নাগুলো প্রথম শীতের জমাট বরফের কড়কড়ে ভঙ্গুর পাতের মতো। অজস্র কণ্ঠ বলতে লাগল, আগুন! আগুন! আগুন! ভাগুন! ভাগুন! যেন একটা করুণ নার্সারি রাইম। ছেলে-ভুলোনো ছড়া। ডজন গলার উঁচুনিচু ঐকতান যেন। যেন জঙ্গলে একা একা মরে-যাওয়া শিশুদের আর্তনাদ। কণ্ঠগুলো একটা একটা করে নিবতে লাগল, কারণ তারগুলো তাদের চামড়াসহ ফেটে ফেটে যেতে লাগল, আগুনের সামনে ধরা কাঠবাদামের মতো।

এক দুই তিন চার পাঁচ। এক-এক করে সব ক-টা কণ্ঠ মরে গেল।

নার্সারি রুমের জঙ্গলটা পুড়ছে। নীল সিংহরা গর্জন করছে, বেগুনি জিরাফেরা লাফিয়ে পালাচ্ছে। চিতাবাঘেরা ঘুরছে বৃত্তাকারে। তাদের রং পালটে যাচ্ছে। দশ লক্ষ প্রাণী আগুনের সামনে দৌড়ে কোন দূর নদীর ভেতরে ডুবে যাচ্ছে। নদীটা থেকে বাষ্প ধোঁয়া বের হচ্ছে।

দশটা কণ্ঠ মরে গেল। তারপর আগুনের বিশাল ধসের সামনে শেষ মুহূর্তে অন্য একটা কোরাস শোনা গেল। সম্মেলক ঐকতান। দূরাগত। সময় নির্দেশ করা কণ্ঠ। বাজনা-বাজানো কণ্ঠ। বাগানের ঘাস কাটার রিমোট কনট্রোল কণ্ঠ। বারবার ছাতা খুলে দেওয়া আর বন্ধ করার শব্দ। বাইরের দরজা খোলা বন্ধ হওয়ার শব্দ। দড়াম দড়াম। হাজারটা জিনিস একসঙ্গে হচ্ছিল। যেমন ঘড়ির দোকানে একটা বিশেষ ঘণ্টা বাজলে সব ক-টা ঘড়ি একসঙ্গে উন্মাদের মতো ঐকতান করে বেজে ওঠে, তেমনি। আগে-পরে, যেন জ্বরের তাড়সে, যেন বাতিকগ্রস্তের উদ্ভ্রান্ততার ভেতরে, সংগত করে ওঠে সবাই সম্মেলক সেই সুরে। এক প্রাণ এক তান একতা। গান, চিৎকার, কয়েকটা শেষ পরিষ্করণ মূষিকের ছোটাছুটি, সাহসের সঙ্গে বিশ্রী ছাইগুলোকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা। একটা কণ্ঠ, সমস্ত ঘটনার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন, উদাত্ত ও বিশাল কণ্ঠে কবিতা পড়ে যাচ্ছিল পুড়তে-থাকা পড়ার ঘরে, লাইব্রেরিতে। ফিল্‌মের স্পুলটা পুরোপুরি জ্বলে না-যাওয়া অব্দি, তারগুলো ঝরে না-যাওয়া অব্দি, সার্কিট কেটে না-যাওয়া অব্দি।

আগুন তারপর বাড়িটায় বিস্ফোরণ ঘটাল একবার। সম্পূর্ণ তাসের ঘরের মতো চ্যাপটা হয়ে ধসে গেল বাড়িটা। চারদিকে ছিটল ফুলকি আর ধোঁয়া।

রান্নাঘরে আগুন আর কাঠের জ্বলা টুকরো ঝরার আগের মুহূর্তেও দেখা যাচ্ছিল, স্টোভটা অস্বাভাবিক দ্রুততায় প্রাতরাশ বানাচ্ছে। যেন উন্মাদদশা প্রাপ্ত হয়েছে সে। দশ ডজন ডিমের অমলেট, ছখানা লোফ পাউরুটির টোস্ট, কুড়ি ডজন বেকনের টুকরো, আগুন যা খেয়ে নিতেই স্টোভ আবার নতুন করে কাজে নেমে পড়ছিল… হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো হিসহিস করতে করতে!

হুড়মুড় শব্দে অ্যাটিকটা নেমে পড়ল রান্নাঘর আর বসার ঘরের ওপরে। তারপর বসার ঘর নেমে গেল মাটির নীচের গুদোমঘরে। সেলার ঘর নেমে গেল তারও নীচের গুমঘরে। ডিপ ফ্রিজার, আরামকেদারা, ফিল্‌মের টেপ, সার্কিট, খাট-বিছানা সব কঙ্কালের মতো জমা হল একেবারে তলার গর্তে।

ধোঁয়া আর সম্পূর্ণ নীরবতা। বিশাল ধোঁয়ার মেঘ।

পুবের আকাশে আলতো করে ভোর জাগছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটামাত্র দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে।

দেওয়ালের ভেতর, একটামাত্র কণ্ঠ বলল, বারবার, বারবার, বলেই চলল… যেমন যেমন সূর্য উঠতে লাগল ধীরে আকাশে, আর ধ্বংসস্তূপের ওপরে, বাষ্প-ওঠা খণ্ডহরের ওপরে ফেলল তার প্রথম কিরণ:

আজ আগস্ট ৫, ২০২৬, আজ আগস্ট ৫, ২০২৬… আজ…

(মূল গল্প: August 2026/There Will Come Soft Rains)

Tags: অনুবাদ গল্প, যশোধরা রায়চৌধুরী, রে ব্র্যাডবেরি, সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

3 thoughts on “ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হবে (There Will Come Soft Rains)

  • September 1, 2022 at 7:42 pm
    Permalink

    অসাধারণ অনুবাদ।

    Reply
    • September 24, 2022 at 8:28 am
      Permalink

      Jemon golpo temon onubad… durdanto!!!

      Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!