আফ্রিকার তেপান্তর (The Veldt)

  • লেখক: রে ব্র্যাডবেরি, ভাষান্তর: সুমিত বর্ধন
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

“জর্জ, বাচ্চাদের খেলাঘরটা একবার দেখবে?”

“কেন? কী হয়েছে?”

“তা ঠিক জানি না।”

“তাহলে?”

“একবার দ্যাখোই না। না পারলে সাইকোলজিস্ট ডাকো।”

“বাচ্চাদের ঘর দেখে সাইকোলজিস্ট কী করবে?”

“কী করবে সে তুমি খুব ভালোই জানো।” রান্নাঘরের স্টোভটা আপন মনে গুঞ্জন তুলে চারজনের রাতের খাবার রাঁধে। সেদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে জর্জের স্ত্রী।

“খেলাঘরটা আগের চাইতে কেমন যেন আলাদা হয়ে গেছে।”

“আচ্ছা চলো, দেখছি।”

তাদের জীবনসুখ ধামের সাউন্ডপ্রুফ করিডর দিয়ে হাঁটে দুজনে। হাজার তিরিশেক ডলারে গড়া এই বাড়িটা তাদের খাওয়ায়, পরায়, দোল দিয়ে ঘুম পাড়ায়, তাদের সঙ্গে খেলে, গান শোনায়। মানে যথাসম্ভব আদরযত্ন করে।

কোথাও একটা সুইচকে তাদের আসাটা টের পাইয়ে দেওয়া হয়। বাচ্চাদের খেলাঘরের দশ ফুটের মধ্যে আসতে-না আসতে খেলাঘরের আলো দপ করে জ্বলে ওঠে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মৃদু কারিকুরিতে নিবে যায় পেছনে ফেলে-আসা করিডরের আলো।

“বেশ,” বলে জর্জ হেডলি।

খেলাঘরের বুনোট মেঝেতে দাঁড়ায় দুজনে। চল্লিশ ফুট লম্বা আর চল্লিশ ফুট চওড়া ঘরটা উচ্চতায় তিরিশ ফুট। বাকি বাড়িটা বানাতে যা খরচ পড়েছে তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি গচ্চা গেছে কেবল এই একটা ঘরের পেছনে।

“নিজের ছেলেমেয়ের জন্যে যতই করো, কমই হয়!” সে সময় জর্জই বলেছিল।

খেলাঘরটা নিস্তব্ধ। কাঠফাটা দুপুরে জঙ্গলে ঘেরা মাঠের মতোই জনহীন। দেওয়ালগুলো নিরাবরণ, দ্বিমাত্রিক। জর্জ আর লিডিয়া হেডলি ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াতেই আহ্লাদী গর্জনের আওয়াজে সেগুলো সরে যেতে থাকে এক ক্রিস্টাল-ছাওয়া দূরত্বে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশে ফুটে ওঠে এক আফ্রিকান তৃণভূমি। একেবারে ত্রিমাত্রিক। প্রতিটি রং, প্রতিটি পাথরের টুকরো, প্রতিটি খড়ের কুঁচি সেখানে নিখুঁত। মাথার ওপরে ছাদের জায়গায় গভীর নীল আকাশ আর গনগনে হলুদ সূর্য।

জর্জ বুঝতে পারে, তার কপালে ঘাম জমছে। “রোদ থেকে সরে দাঁড়াই, চলো। এ দেখছি একটু বেশিই আসল। কিন্তু উলটো-পালটা তো কিছু চোখে পড়ছে না।”

“দাঁড়াও-না একটু, দেখতে পাবে,” উত্তর দেয় তার স্ত্রী।

ঝলসানো প্রান্তরের মাঝখানে দাঁড়ানো দুটো মানুষের দিকে গোপন গন্ধকল থেকে নানান গন্ধ বয়ে উড়ে আসে বাতাস। সিঙ্গি ঘাসের খড়ের মতো উষ্ণ গন্ধ, গোপন তিয়াসডোবার জলের সবুজ শীতল গন্ধ, পশু শরীরের চড়া মরচের মতো গন্ধ, তপ্ত বাতাসে সেঁকা লংকার মতো ধুলোর গন্ধ। তারপর আসে শব্দ। ঘাসের চাপড়ায় অ্যান্টিলোপের খুর ঠোকার ধপাধপ, শকুনের কাগুজে খসখস।

আকাশ দিয়ে ভেসে যায় একটা ছায়া। মাথা উঁচু করা জর্জ হেডলির মুখেও পড়ে ছায়া। শুনতে পায় সে স্ত্রী-র কণ্ঠস্বর, “জঘন্য জীব।”

“হ্যাঁ, শকুনগুলো।”

“ওদিকে দ্যাখো, ওই যে দূরে। ওই যে সিংহগুলো,” লিডিয়া বলে, “তিয়াসডোবায় জল খেতে যাচ্ছে এখন। কী একটা খাচ্ছিল। কী বলতে পারব না অবশ্য।”

“হবে কোনও জানোয়ার,” চোখ কুঁচকে কপালে হাত আটকে চড়া আলোটাকে আড়াল করতে চেষ্টা করে জর্জ হেডলি, “জেব্রা হতে পারে। কিংবা জিরাফের বাচ্চা। কে জানে!”

“ঠিক বলছ তো?” জর্জের স্ত্রী-র কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট।

“ঠিক-বেঠিক বোঝার পক্ষে একটু দেরি হয়ে গেছে যে!” মজা পায় জর্জ, “একেবারে চাঁচাপোঁছা হাড়গোড় ছাড়া আর কিছু তো নজরে পড়ছে না। আর যেটুকু বা পড়ে আছে তার ওপরেও শকুন ঝাঁপাচ্ছে।”

“একটা আর্তনাদ শুনতে পেলে?”

“না!”

“এই তো এক মিনিট আগে।”

“কই না তো।”

সিংহের দল এগিয়ে আসে। যে যন্ত্রকর্মা প্রতিভার মাথা থেকে এই খেলাঘরের কল্পনা বেরিয়েছে তাকে মনে মনে আর একবার তারিফ না করে পারে না জর্জ। এই অদ্ভুত কারিগরি সে লোকটা প্রায় একেবারে জলের দরে বিক্রি করে। ঘরে ঘরে এমন একখানা খেলাঘর থাকা উচিত। ঘরটার কাজ এমন নিখুঁত আর নিপুণ যে তার কায়দায় কখনও চমকে উঠবেন, কখনও বা আবার আঁতকে উঠবেন। তবে সে ওই মাঝেমধ্যেই। বেশির ভাগ সময় কিন্তু খেলাঘরখানা দেদার আমোদ জোগাবে। শুধু আপনার ছেলেমেয়েকে নয়, আপনাকেও। হাওয়া বদলানোর ইচ্ছে হল, তো বিদেশে এক চক্কর ঘুরে এলেন। এই যেমন এখন।

এই যে সিংহগুলো, মাত্র ফুট পনেরো দূরে। যেন সত্যি, যেন আসল। অকল্পনীয়ভাবে আসল। আঁতকে ওঠার মতো আসল। হাতে যেন ফোটে তাদের তীক্ষ্ণ রোম। তাদের তাপে পোড়া চামড়ার ধুলো-মাখা তোশকের মতো গন্ধ যেন ঠুসে যায় মুখের ভেতর। অমূল্য ফরাসি পর্দার হলুদের মতো, সিঙ্গি ঘাস আর গ্রীষ্ম ঘাসের হলুদের মতো তাদের শরীরের হলুদে ছেয়ে যায় চোখ। ভেসে আসে দুপুরের নিস্তব্ধতায় তাদের দড়া-পড়া ফুসফুস থেকে ছাড়া বাতাসের শব্দ। ভেসে আসে তাদের লালা-ঝরা হাঁপানো মুখে লেগে-থাকা মাংসের গন্ধ।

জর্জ আর লিডিয়া হেডলিকে তাদের ভয়ানক হলদেটে সবুজ চোখ দিয়ে দেখতে থাকে সিংহের দল।

“সাবধান!” আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে লিডিয়া।

তাদের দিকে দৌড়োতে শুরু করে সিংহের দল।

পেছন ফিরে দৌড় লাগায় লিডিয়া। কিছু চিন্তা না করেই জর্জও ছুট দেয় তার পেছনে। বাইরে করিডরে বেরিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ হওয়ার পর কাঁদতে থাকে লিডিয়া। হাসতে থাকে জর্জ।

পরস্পরের ব্যবহারে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে দুজনেই। দুজনেই একে অপরের দিকে তাকায়।

“লিডিয়া! আহা রে, বেচারি!”

“জর্জ, ওগুলো আর-একটু হলেই আমাদের খেয়ে ফেলত।”

“দেওয়াল, লিডিয়া, দেওয়াল। ভুলো না ওগুলো কেবল ক্রিস্টালের দেওয়াল। মানছি, একেবারে সত্যি মনে হয়—যেন বসার ঘরে আফ্রিকা ঢুকে পড়েছে। কিন্তু আসলে কাচের স্ক্রিনের পেছনে আছে খুব সেন্সিটিভ আর সূক্ষ্ম প্রতিক্রিয়া করতে সক্ষম রঙিন মাত্রিক ফিল্‌ম। আছে মন পড়ার টেপ ফিল্‌ম। সব কিছু এসবের কারিকুরি মাত্র। তার ওপর আছে গন্ধ আর শব্দের কায়দাও। নাও, রুমালটা নাও।”

“ভয় করছে,” জর্জকে আঁকড়ে কেঁদেই চলে লিডিয়া, “দেখলে না? অনুভব করলে না? বড্ড বেশি আসল!”

“লিডিয়া, দ্যাখো…”

“তুমি ওয়েন্ডি আর পিটারকে বারণ করে দাও। যেন আফ্রিকা নিয়ে আর পড়াশোনা না করে।”

“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,” লিডিয়াকে মৃদু চাপড়ে দেয় জর্জ।

“সত্যি বলছ?”

“একদম!”

“আর কয়েকদিনের জন্যে খেলাঘরটাতে তালা দিয়ে দাও। আমার নার্ভগুলো থিতু হোক ততদিনে।”

“তুমি জানোই তো পিটার খেলাঘরের ব্যাপারে কেমন গোঁয়ার। এই তো এক মাস আগে ওকে শাস্তি দেবার জন্যে ঘরটা শুধু ঘণ্টাখানেকের জন্যে তালা দিয়েছিলাম। তাতেই যা কেঁদেকেটে অশান্তি করল! আর ওয়েন্ডিও তেমন। যেন ওই খেলাঘরটার জন্যেই ওরা বেঁচে আছে।”

“ওটা বন্ধ করে দাও, ব্যাস। কথা বাড়িয়ো না।”

“আচ্ছা!” নিমরাজি হয়ে ঘরে তালা দেয় জর্জ, “তোমার খুব খাটুনি যাচ্ছে আজকাল। তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন।”

“জানি না, জানি না গো।” নাক মুছে একটা চেয়ারে বসে পড়ে লিডিয়া। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দোল খাইয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে চেয়ারটা। “আসলে আমার বোধহয় হাতে সেরকম কাজ কিছু নেই। কেবল উলটো-পালটা চিন্তা করার জন্যে অঢেল সময় আছে। আচ্ছা, পুরো বাড়িটাকে কয়েকদিনের জন্যে বন্ধ করে দিয়ে ছুটিতে গেলে হয় না?”

“মানে বলছ, তুমি নিজের হাতে আমার জন্যে ডিম ভাজবে?”

“হ্যাঁ,” ওপর-নীচে মাথা নাড়ে লিডিয়া।

“আর আমার মোজা রিফু করে দেবে?”

“হ্যাঁ,” সজল চোখে ছটফটিয়ে মাথা নাড়ে লিডিয়া।

“আর ঘর ঝাঁট দেবে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। একদম!”

“কিন্তু আমি তো ভাবতাম যে আমাদের যাতে কোনও কাজ করতে না হয় তার জন্যেই এই বাড়িটা কেনা।”

“সেটাই তো। আমার আজকাল মনে হয় এখানে আমার কোনও জায়গা নেই। এই বাড়িটাই স্ত্রী, এই বাড়িটাই মা, এই বাড়িটাই ধাই। আফ্রিকার তেপান্তরের সঙ্গে আমি কখনও পাল্লা দিতে পারি? ওই যে স্বয়ংক্রিয় স্নানঘর, ওটার চাইতে ভালো করে, ওটার চাইতে চটপট করে আমি কি ছেলেমেয়েদের নাইয়ে-ধুইয়ে দিতে পারি? পারি না। আর আমি কি একা? তোমাকেও দেখছি। আজকাল তোমাকেও বেশ নার্ভাস লাগে।”

“আজকাল বোধহয় সিগারেট খাওয়াটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে।”

“দেখে মনে হয়, এই বাড়িতে তুমি নিজেকে নিয়ে কী করবে, তুমিও বুঝতে পারো না। তুমি সকালে একটু বেশি সিগারেট খাও, বিকেলে একটু বেশি মদ খাও, রাতের বেলা একটু বেশি ঘুমের ওষুধ খাও। তুমিও বোধহয় আজকাল নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করেছ।”

“আচ্ছা, আমি কি সত্যিই তা-ই?”

জর্জকে পেরিয়ে লিডিয়ার দৃষ্টি হঠাৎ চলে যায় বাচ্চাদের ঘরের বন্ধ দরজাটার দিকে, “জর্জ, সিংহগুলো ওখান থেকে বেরোতে পারবে না তো?”

জর্জের নজরের সামনে কেঁপে ওঠে দরজাটা। যেন পেছনদিক থেকে দরজার ওপর কিছু ঝাঁপ দিয়েছে।

“আরে না, না,” উত্তর দেয় সে।

ওয়েন্ডি আর পিটার শহরের ঠিক উলটোদিকে একটা প্লাস্টিক কার্নিভ্যাল দেখতে গিয়েছিল। সেখান থেকেই তারা টেলিভিশনে খবর পাঠিয়েছে, মা-বাবা যেন আগেই খেয়ে নেয়, তাদের আসতে দেরি হবে। স্বামী-স্ত্রী দুজনে তাই একলাই আহার সারে।

টেবিলের যান্ত্রিক অন্তঃপুর থেকে গরমাগরম খানা বেরিয়ে আসার দিকে জর্জ তাকিয়ে থাকে অবাক দৃষ্টিতে।

“টম্যাটো সসটা ভুলে গেছ যে।”

‘সরি’, টেবিলের ভেতর থেকে ভেসে আসে মৃদু স্বর, আবির্ভাব হয় টম্যাটো সসের।

খেলাঘরটা নিয়ে চিন্তা করে জর্জ হেডলি। আচ্ছা, ঘরটাতে তালা মেরে ছেলেমেয়ে দুটোকে কয়েকদিনের জন্যে বাইরে রাখলে ক্ষতি তো কিছু নেই। কোনও কিছুর বাড়াবাড়ি কারও পক্ষেই ভালো না। স্পষ্ট বোঝাই তো যাচ্ছে, দুজনে মিলে আফ্রিকায় একটু বেশি সময়ই কাটাচ্ছে। ওফ, ওই সূর্যটা! এখনও যেন ঘাড়ে ওটার ছ্যাঁকা লেগে আছে, গরম থাবার মতো। তারপর ওই সিংহগুলো! আর রক্তের গন্ধটা! কী অদ্ভুত না? ঘরটা বাচ্চাদের মনের টেলিপ্যাথিক স্ফুরণ ধরে ফ্যালে, তারপর তাদের বাসনাতৃপ্তির জন্যে সৃষ্টি করে জীবন। বাচ্চারা ভাবে সিংহ, এসে পড়ে সিংহ। বাচ্চারা ভাবে জেব্রা, এসে পড়ে জেব্রা। সূর্য—সূর্য। জিরাফ—জিরাফ। মৃত্যু—মৃত্যু।

ওঃ, ওই শেষের কথাটা! টেবিলের কেটে-দেওয়া মাংসের টুকরোটা চিবোয় জর্জ, কিন্তু স্বাদ পায় না। মৃত্যু নিয়ে চিন্তা। মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করার জন্যে ওরা যে বড্ড ছোট। ওই ওয়েন্ডি আর পিটার। অবশ্য নাঃ, বড্ড ছোট বলে কিছু হয় না। সত্যি! মৃত্যু কাকে বলে, ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই আমরা পরের মৃত্যুকামনা করে ফেলি। বয়স দু-বছরও হয় না, আমরা ক্যাপ-ফাটানো পিস্তল দিয়ে মানুষকে গুলি করতে শিখে যাই।

তা বলে এইরকম! আফ্রিকার তেতে-ওঠা তেপান্তর। সিংহের মুখে ভয়ানক মৃত্যু। তারপর তার পুনরাবৃত্তি, বারংবার।

“চললে কোথায়?” লিডিয়ার কথার উত্তর দেয় না জর্জ, হেঁটে যায় চিন্তামগ্ন হয়ে। মৃদু আলো তার সামনে জ্বলে ওঠে, পেছনে নিবে যায়।

চাপা পায়ে জর্জ এসে দাঁড়ায় বাচ্চাদের খেলাঘরের সামনে, কান পাতে বন্ধ দরজায়। দূর থেকে যেন ভেসে আসে সিংহের গর্জন।

তালা খুলে দরজাটা খোলে জর্জ। ভেতরে পা রাখার আগেই যেন দূর থেকে ভেসে আসে একটা আর্তনাদ। আরও একবার শোনা যায় সিংহগর্জন, তারপর মিলিয়ে যায় আওয়াজটা।

আফ্রিকায় পা রাখে জর্জ। গত বছরই এই দরজা খুলে কত কী অদ্ভুত জিনিস না দেখেছে সে। আজব দেশ, অ্যালিস, মেকি কাছিম, জাদু চিরাগ হাতে আলাদিন, অজ দেশের কুমড়োপটাশ জ্যাক, ডাক্তার অল্পকর, একেবারে আসল দেখতে একফালি চাঁদের ওপর দিয়ে টপকে-যাওয়া গোরু। কল্পনার দুনিয়ার মজাদার সব ব্যাপারস্যাপার। ছাদের আকাশে ওড়া পক্ষীরাজ, আতশবাজির ফোয়ারার লাল রোশনাই, গান-গাওয়া দেবদূত, এসবও কতবার দেখেছে সে। কিন্তু এখন এখানে গরম, হলদেটে আফ্রিকা। এখানে এখন ঝলসানো চুলার তাপে হত্যার হাতছানি।

লিডিয়া বোধহয় ঠিকই বলেছিল। এই যে কল্পনার দুনিয়া, এটা বছর দশেকের বাচ্চাদের জন্যে হয়তো বড় বেশিই বাস্তব। এর থেকে তাদের বোধহয় কিছুদিনের জন্যে ছুটি নেওয়া দরকার। কল্পনা ফাঁদতে মাথা খাটানো ঠিক আছে। কিন্তু শিশুর বুদ্ধি আর চঞ্চল মন যদি কেবল একটিমাত্র প্যাটার্নে আটকে যায়…?

জর্জের মনে পড়ে যায় যে গত এক মাস ধরে দূর থেকে সিংহের গর্জন শুনে আসছে। চড়া গন্ধ পেয়েছে পড়ার ঘরের দরজা থেকেই। কিন্তু ব্যস্ত থাকায় সেদিকে নজর দিতে পারেনি।

আফ্রিকার ঘাসে ছাওয়া প্রান্তরে একাই দাঁড়িয়ে থাকে জর্জ হেডলি। খাওয়া ছেড়ে সিংহের দল মুখ তুলে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। এই মায়াজগতে একটাই খুঁত—ঘরের খোলা দরজাটা। সেখান দিয়ে একটা অন্ধকার করিডরের পর একটা ফ্রেমে বাঁধাই ছবির মতো জর্জ দেখতে পায় তার স্ত্রী-কে, আনমনে সে আহার সারে।

“চলে যা,” জর্জ হুকুম করে সিংহগুলোকে।

তারা নড়ে না।

ঘরের নিয়মকানুনগুলো জর্জ ভালোই জানে। নিজের চিন্তাটা পাঠিয়ে দিতে হয়। চিন্তায় যা আছে সেগুলোর আবির্ভাব হয়।

“চিরাগ নিয়ে আলাদিন আসুক,” তেড়ে ওঠে সে।

তৃণভূমি রয়ে যায়। সিংহ রয়ে যায়।

“এই ঘর! আমার আলাদীন চাই!” আবার হুকুম করে সে।

কিছুই হয় না। চামড়া-সেঁকা সিংহদের থেকে অস্পষ্ট আওয়াজ আসে।

“আলাদিন!”

খাওয়ার টেবিলে ফেরত যায় জর্জ, “হতচ্ছাড়া ঘরটা খারাপ হয়ে গেছে। হুকুম তামিল করছে না।”

“কিংবা—”

“কিংবা কী?”

“কিংবা ঘরটা হুকুম তামিল করতে পারছে না। ছেলেমেয়ে দুটো আফ্রিকা আর সিংহ আর হত্যা নিয়ে এমন টানা চিন্তা করেছে যে ঘরটা একটা গাড্ডায় পড়ে ফেঁসে গেছে।”

“তা হতে পারে।”

“কিংবা পিটার ঘরটাকে ওভাবেই সেট করে দিয়েছে।”

“সেট করে দিয়েছে?”

“হ্যাঁ, কলকবজার মধ্যে ঢুকে কিছু পালটে দিয়েছে হয়তো।”

“পিটার যন্ত্রপাতির কী বোঝে!”

“দশ বছরের তুলনায় ওর বুদ্ধি কিন্তু কম নয়। ওর আই-কিউ যা—”

“বাবা! মা!”

মাথা ঘোরায় হেডলি দম্পতি। দরজা দিয়ে ঢোকে পিটার আর ওয়েন্ডি। গাল তাদের পেপারমিন্ট ক্যান্ডির মতো লাল, চোখগুলো খেলার ডোরাকাটা মার্বেলের মতো উজ্জ্বল। পোশাকে লেগে-থাকা ওজোনের গন্ধে হেলিকপ্টার যাত্রার ছাপ।

“এক্কেবারে খাওয়ার সময়েই এসে গেছ,” বাপ-মা দুজনে একসঙ্গেই বলে ওঠে।

হাত ধরাধরি করে দাঁড়ানো দুই ছেলেমেয়ে বলে, “গলা অবধি আইসক্রিম আর হট ডগে ভরতি। তবে বসে তোমাদের খাওয়া দেখতে পারি।”

“আচ্ছা, তোমাদের খেলাঘরের ব্যাপারে আমাদের একটু বলো তো,” ছেলেমেয়েদের বলে জর্জ।

“খেলাঘর!” ভাইবোন দুজনেই চোখ পিটপিট করে প্রথমে তার দিকে, তারপর পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়।

“হ্যাঁ, আফ্রিকা আর তার সঙ্গে যা সব আছে-টাছে।”

“বুঝতে পারছি না,” বলে পিটার।

“এই তো আমি আর তোমার মা মিলে ছিপ হাতে আফ্রিকা বেড়িয়ে এলাম। সঙ্গে ছিল টম সুইফ্‌ট আর তার ইলেকট্রিক সিংহ।”

“খেলাঘরে কোথাও আফ্রিকা নেই,” সোজাসাপটা উত্তর আসে পিটারের।

“এরকম বোলো না পিটার। আমরা কিন্তু সব জানি।”

“আমার তো কোনও আফ্রিকার কথা মনে নেই!” বোনের দিকে ফেরে পিটার, “তোর মনে আছে?”

“না!”

“একবার ছুট্টে দেখে আয় তো, যা।”

ভাইয়ের নির্দেশ পালন করে ওয়েন্ডি।

“ওয়েন্ডি, এদিকে এসো!” হাঁক দেয় জর্জ। কিন্তু ওয়েন্ডি ততক্ষণে উধাও হয়ে গেছে। তার যাওয়ার পথে বাড়ির আলোগুলো জোনাকির মতো জ্বলে-নেবে। জর্জের হঠাৎ মনে পড়ে যায় যে শেষবার দেখার পর সে আর খেলাঘরের তালা দেয়নি।

“ওয়েন্ডি এক্ষুনি দেখে এসে বলবে,” বলে পিটার।

“আমাকে কিচ্ছু বলার দরকার নেই। আমি নিজের চোখে দেখেছি।”

“না বাবা, তোমার ভুল হচ্ছে।”

“কিচ্ছু ভুল হচ্ছে না পিটার। আচ্ছা চলো, দেখে আসি।”

তার আগেই ওয়েন্ডি ফেরত আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “কই, আফ্রিকা তো নেই?”

“আচ্ছা চলো, গিয়েই দেখি।” সবাইকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটা দেয় জর্জ, খেলাঘরে পৌঁছে ঠেলে ধরে দরজা।

ভেতরে অপরূপ সবুজ বনানী, সুন্দর নদী, শ্যামল পাহাড়। ভেসে আসে উচ্চগ্রামে গাওয়া গান। গাছের অন্তরাল থেকে উঁকি দেয় রহস্যময়ী সুন্দরী রিমা। তার চুলের ঢলকে ঘিরে প্রজাপতিরা ঝাঁক বাঁধে সজীব গুলদস্তার মতো। আফ্রিকার প্রান্তর নেই। সিংহ নেই। আছে কেবল সুন্দরী রিমা আর তার চোখে জলে এনে-দেওয়া সুরেলা সংগীত।

নতুন এই দৃশ্যপটের ওপর চোখ বুলিয়ে ছেলেমেয়ের দিকে তাকায় জর্জ, “যাও, শুতে যাও।”

কিছু বলার জন্যে মুখ খোলে দুজনেই।

“শুনতে পেলে তো কী বললাম?”

বাতাসিয়া কুঠুরিতে গিয়ে ঢোকে দুজনে। হাওয়ার টান তাদের শুকনো পাতার মতো নল বেয়ে উড়িয়ে নিয়ে যায় ঘুমঘরে।

সংগীতমুখরিত বনানীর মাঠ ধরে খানিকটা হেঁটে যায় জর্জ। যে কোনাটাতে সিংহগুলো ছিল সেখান থেকে কিছু একটা কুড়িয়ে নিয়ে ধীরপায়ে ফেরত আসে স্ত্রী-র কাছে।

“কী ওটা?” প্রশ্ন করে লিডিয়া।

“আমার পুরোনো একটা মানিব্যাগ।”

স্ত্রী-কে মানিব্যাগটা দেখায় জর্জ। গরম ঘাস আর সিংহের গন্ধ আসে মানিব্যাগ থেকে। মানিব্যাগটা চিবোনো হয়েছে, লেগে রয়েছে তাতে লালার দাগ আর রক্তের ছোপ।

খেলাঘরের দরজটা এবার আর তালা দিতে ভোলে না জর্জ।

মাঝরাত হয়ে গেলেও ঘুম আসে না জর্জের, বুঝতে পারে, জেগে আছে লিডিয়াও।

“তোমার কী মনে হয়, ওয়েন্ডি পালটে দিয়েছিল ঘরটাকে?” অন্ধকার ঘরে ভেসে আসে লিডিয়ার কণ্ঠস্বর।

“তা ছাড়া আর কী?”

“মানে তৃণভূমিকে জঙ্গলে পালটে ফেলেছিল, আর সিংহের বদলে বসিয়ে দিয়েছিল রিমাকে?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু কেন?”

“তা জানি না। কিন্তু বুঝতে না-পারা অবধি ঘরটা তালা-মারাই থাকবে।”

“আর তোমার মানিব্যাগ ওখানে গেল কী করে?”

“বুঝতে পারছি না,” উত্তর দেয় জর্জ, “তবে মনে হচ্ছে, বাচ্চাদের জন্য ওই খেলাঘরটা না কিনলেই হত। ওদের মাথায় যদি কোনও রকমের সমস্যা থাকে, তাহলে ওই ঘরটা…”

“মাথার সমস্যা থাকলে ঘরটার তো ওদের সাহায্য করার কথা।”

“সেই কথাই তো ভাবছি,” ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে জর্জ।

“ছেলেমেয়েরা যখন যা চেয়েছে দিয়েছি। তার কি এই পুরস্কার? অবাধ্যতা, কথা গোপন করা।”

“কোথায় যেন শুনেছিলাম যে ছেলেপুলে নাকি কার্পেটের মতো। মাঝেমধ্যে মাড়ালে ঠিক থাকে। আজ পর্যন্ত কোনওদিন ওদের গায়ে হাত তুলিনি। মিথ্যে বলব না—আজকাল আর সহ্য করা যাচ্ছে না ওদের। যখন খুশি আসে, যখন খুশি যায়, তারপর এমন ব্যবহার করে যেন আমরাই ওদের সন্তান। বখে ওরাও গেছে, আমরাও গেছি।”

“মাসকয়েক আগে যখন ওদের রকেটে চড়ে নিউ ইয়র্ক যেতে দিলে না, তখন থেকে দেখছি, ব্যবহার পালটে গেছে।”

“আমি তো ওদের বুঝিয়েই বলেছিলাম। একা একা ওটা করার মতো বয়স এখনও ওদের হয়নি।”

“সে তুমি যা-ই বলে থাকো। তারপর থেকেই দেখছি, আমাদের আর আমল দিচ্ছে না।”

“কাল সকালে ডেভিড ম্যাকক্লিনকে ডেকে পাঠাব। একবার এসে আফ্রিকা দেখে যাক।”

“আফ্রিকা তো আর নেই। এখন তো রিমা আর সবুজমহলের দেশ।”

“ফের আফ্রিকা হয়ে যাবে। আমার স্থির বিশ্বাস।”

কয়েক মুহূর্ত বাদে ভেসে আসে আর্তনাদ।

দুটো আর্তনাদ। নীচের তলায় চিৎকার করছে দুজন মানুষ। তারপর সিংহের গর্জন।

“ওয়েন্ডি আর পিটার নিজেদের ঘরে নেই,” বলে লিডিয়া।

শুয়ে শুয়েই নিজের বুকের ধুকপুকুনি টের পায় জর্জ, “না, খেলাঘরের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েছে।”

“ওই যে আর্তনাদ—কণ্ঠস্বর দুটো খুব চেনা লাগল।”

“তা-ই?”

“হ্যাঁ। একদম।”

বহু চেষ্টা করে, দোল খাইয়েও ঘণ্টাখানেকের আগে দুজনকে ঘুম পাড়াতে পারে না তাদের বিছানা দুটো। রাতের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে সিংহের ঘ্রাণে।

“বাবা?” ডাক দেয় পিটার।

“হ্যাঁ বলো।”

পিটারের নজর নিজের জুতোর দিকে। আজকাল সে নিজের বাপের মুখের দিকে তাকায় না। মায়ের মুখের দিকেও না।

“তুমি খেলাঘরটা বরাবরের মতো বন্ধ করে দেবে না তো?”

“সেটা নির্ভর করছে।”

“কীসের ওপর?” তেড়ে ওঠে পিটার।

“তোমার আর তোমার বোনের ওপর। ধরো, এই আফ্রিকার মাঝে মাঝে তোমরা অন্য কিছুও ঢোকালে। এই মনে করো সুইডেন। কিংবা ডেনমার্ক। অথবা চিন।”

“আমি ভেবেছিলাম, আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতন খেলতে পারি।”

“সে পারো। তবে একটা ন্যায্য সীমানার ভেতরে থেকে।”

“কেন, আফ্রিকা কী দোষ করল বাবা?”

“আচ্ছা! তাহলে স্বীকার করে নিচ্ছ যে তোমরা আফ্রিকা বানাচ্ছিলে!”

“আমি চাই না যে কোনওদিন খেলাঘরে তালা পড়ুক,” শীতল কণ্ঠে উত্তর দেয় পিটার, “কোনওদিনও না।”

“সত্যি বলতে কী, মাসখানেকের জন্যে পুরো বাড়িটাই বন্ধ করে দেব ভাবছি। কদিন একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট আপনভোলা হয়ে বাঁচার চেষ্টা করব।”

“কী ভয়ানক! তখন তো ফিতে-বাঁধা কলের বদলে জুতোর ফিতে নিজেকেই বাঁধতে হবে, তা-ই না? নিজে দাঁত মাজা, নিজে চুল আঁচড়ানো, নিজে চান করা এসবও করতে হবে, না?”

“একটা পরিবর্তন হলে বেশ মজা হয় না? কী বলো?”

“না, অতি জঘন্য হয়। গত মাসে তুমি যখন আঁকন-কলটা সরিয়ে দিয়েছিলে, আমার মোটেও ভালো লাগেনি।”

“বাবা, তুমি যাতে নিজে নিজে আঁকতে শেখো, তাই ওটা করেছিলাম।”

“আমি কিচ্ছু করতে চাই না। আমি কেবল চোখ দিয়ে দেখতে চাই, কান দিয়ে শুনতে চাই, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিতে চাই। এসব বাদে আবার করার আছেটা কী?”

“আচ্ছা যাও, তুমি এখন আফ্রিকায় গিয়ে খ্যালো।”

“তুমি কি বাড়িটা খুব শিগগির বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছ?”

“হ্যাঁ, সেইরকমই ভাবছি।”

“ভালো চাইলে তোমার বোধহয় এই ধরনের ভাবনাচিন্তা বন্ধ করে দেওয়া দরকার।”

“দ্যাখো, নিজের ছেলের কাছ থেকে আমি কোনওরকম হুমকি একদম শুনতে চাই না।”

“আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে!” ধীর কদমে খেলাঘরের দিকে হাঁটা দেয় পিটার।

“ঠিক সময়ে এসেছি তো?” প্রশ্ন করে ডেভিড ম্যাকক্লিন।

“ব্রেকফাস্ট?” পালটা প্রশ্ন করে জর্জ হেডলি।

“না থাক। খেয়ে এসেছি অল্প। সমস্যাটা কী?”

“ডেভিড, তুমি তো সাইকোলজিস্ট।”

“হ্যাঁ তা-ই তো জানতাম।”

“বেশ। আমাদের খেলাঘরটা একবার দেখবে চলো দেখি। গত বছর যখন এসেছিলে, তখন খেলাঘরটা তো দেখেছিলে। সে সময় অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়েছিল কি?”

“সেরকম কিছু দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। হিংস্রতার কিছু মামুলি লক্ষণ আর এখানে-ওখানে কিছুটা অহেতুক ভয়ের ছাপ। বাচ্চাদের মধ্যে এসব খুব স্বাভাবিক। কারণ তাদের মনে হয়, বাপ-মা তাদের সর্বদা উত্ত্যক্ত করছে। তবে সাংঘাতিক তেমন কিছু না।”

করিডর ধরে হাঁটে দুজনে।

“খেলাঘরে তালা দিয়ে রেখেছিলাম। রাতের বেলায় ছেলেমেয়েরা তালা ভেঙে ঢুকে পড়ে,” বলে জর্জ, “ওদের বানানো প্যার্টানগুলো তুমি যাতে দেখতে পাও, সেইজন্যে ওদের ওখানেই থাকতে দিয়েছি।”

খেলাঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসে ভয়ানক আর্তনাদ।

“এই যে, নিজেই দ্যাখো,” বলে জর্জ হেডলি, “দ্যাখো, তুমি কী বুঝতে পারো।”

দরজা ঠকঠক না করেই ছেলেমেয়ে দুটোর মধ্যে গিয়ে পড়ে দুজনে।

মিলিয়ে গেছে আর্তনাদ। আহারে মগ্ন সিংহের দল।

“তোমরা দুজনে কিছুক্ষণের জন্যে বাইরে যাও তো,” সন্তানদের বলে জর্জ হেডলি, “না, না, মানসিক নকশাটা পালটাতে হবে না। দেওয়ালগুলো যেমন আছে থাক। যাও, যাও।”

বাচ্চারা চলে যেতে দুজনে দূরের সিংহের দলটাকে দ্যাখে। সেগুলো তখন যা শিকার করেছে সেটাকে উদরস্থ করতে ব্যস্ত।

“ভাবছি, কী শিকার করেছে দেখতে পারলে হয়তো ভালো হত,” বলে জর্জ, “মাঝেমধ্যে যেন কিছুটা বুঝতেও পারি। আচ্ছা, যদি এখানে একটা জোরালো দূরবিন নিয়ে আসতাম…”

“কিস্‌সু হত না,” একটা শুকনো হাসি হেসে দেওয়ালগুলো পরীক্ষা করে ডেভিড, “কদ্দিন ধরে চলছে এইসব?”

“এই এক মাসের একটু বেশিই হবে।”

“আমার অনুভূতিতে ব্যাপারটা তো ভালো ঠেকছে না মোটেই।”

“তোমার অনুভূতির কথা জানতে চাই না। তথ্য দাও।”

“ভায়া জর্জ, কোনও সাইকোলজিস্ট তার সারাজীবনে তথ্য বস্তুটি কোনওদিন চোখে দেখে না। তার কারবারই হল অনুভূতি নিয়ে, যত অস্পষ্ট ব্যাপারস্যাপার নিয়ে। বললাম না, আমার এটা খুব একটা ভালো লাগছে না। আমার আন্দাজ আর সহজাত প্রবৃত্তির ওপর তোমাকে একটু ভরসা করতে হবে। খারাপ ব্যাপারের গন্ধ আমার নাকে চট করে ধরা পড়ে। আর এ যা দেখছি, অবস্থা খুব খারাপ। আমার পরামর্শ যদি নাও, তাহলে এই হতচ্ছাড়া ঘরটাকে একেবারে ভেঙে ফ্যালো, আর সামনের বছরটা ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ম করে রোজ আমার কাছে চিকিৎসার জন্যে নিয়ে এসো।”

“এতটাই খারাপ?”

“হ্যাঁ এতটাই। এইসব খেলাঘরের আসল উদ্দেশ্য ছিল বাচ্চারা দেওয়ালে যেসব ছাপ রেখে যায় সেগুলো সময় নিয়ে বোঝা, আর তারপর বাচ্চাদেরকে প্রয়োজনমতো সাহায্য করা। কিন্তু যা দেখছি, এটা বাচ্চাদের ধ্বংসের প্রবৃত্তিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে না দিয়ে উলটে সহায়ক হয়ে পড়েছে—সেইসব প্রবৃত্তির।”

“এটা আগের বার বুঝতে পারোনি?”

“আগের বার অন্য একটা কথা মনে হয়েছিল। বাচ্চাগুলোকে তুমি প্রথমে মাথায় চড়িয়েছ, তারপর কোনওভাবে ওদের আশাহত করেছ। কী করেছ বলো তো?”

“ওদের আমি নিউ ইয়র্ক যেতে দিইনি।”

“বেশ। তা বাদে?”

“এক মাস আগে ওদের কয়েকটা যন্ত্রপাতি কেড়ে নিয়েছিলাম। আর বলেছিলাম, হোমওয়ার্ক না করলে খেলাঘরটা বন্ধ করে দেব। সত্যি বলতে কী, মিছিমিছি ভয় দেখাচ্ছি না সেটা বোঝানোর জন্যে বন্ধও করে দিয়েছিলাম ঘরটা দু-একদিনের জন্যে।”

“ওঃ বুঝেছি।”

“এসবের প্রভাব আছে বলছ?”

“পুরোপুরি আছে। ছেলেমেয়ের কাছে আগে তুমি ছিলে সান্তা ক্লজ, আর এখন হয়ে দাঁড়িয়েছ কিপটে কাকু স্ক্রুজ। বাচ্চাদের পছন্দ সান্তা। তোমরা স্বামী-স্ত্রী নিজেদের বদলে এই ঘরটাকেই তোমার সন্তানদের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার জায়গা করে দিয়েছ। এই ঘরটাই এখন ওদের মা-বাপ। ওদের জীবনে এই ঘরটা আসল মা-বাপের চাইতেও বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে। আর এখন তুমি উদয় হয়ে চাইছ এটাকে বন্ধ করে দিতে। এখানে ঘৃণা তো থাকবেই। বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে, ঘৃণা নেমে আসছে আকাশ থেকে। সূর্যটাকে অনুভব করো জর্জ, তোমার জীবনটাকে পালটে ফেলতে হবে। আরও বহু মানুষের মতো তুমিও জীবনটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে স্রেফ শারীরিক আরামের ভিত্তির ওপর। কালকে যদি তোমার রান্নাঘরটা খারাপ হয়ে যায় তো তুমি উপোস করে মরবে। একটা ডিম ফাটানো পর্যন্ত তোমার দ্বারা হবে না। যা হওয়ার হয়ে গেছে, এবার সব বন্ধ করে দাও। নতুন করে শুরু করো। সময় লাগবে বটে, কিন্তু দেখবে, এক বছরের মধ্যেই তোমার বখে-যাওয়া ছেলেমেয়ে আবার মানুষ হয়ে উঠবে।”

“কিন্তু ঘরটাকে হঠাৎ করে বরাবরের জন্যে বন্ধ করে দিলে সেই শক ওদের পক্ষে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না তো?”

“আমি চাই না ওরা এর আর বেশি গভীরে ঢুকুক। তাই বলছি।”

সম্পন্ন হয় সিংহদের রক্তলাল আহার।

ফাঁকা জায়গাটার কিনারায় দাঁড়িয়ে তারা নজর রাখে দুটো মানুষের ওপর।

“এবার আমার মনে হচ্ছে, আমাকেও জব্দ করতে চাইছে,” বলে ম্যাকক্লিন, “চলো, সরে পড়ি। এইসব ঘর আমার পোষায় না, কেমন নার্ভাস লাগে।”

“সিংহগুলোকে একেবারে সত্যিকারের মনে হয়!” জর্জ বলে, “আচ্ছা, কোনওভাবে কি ওরা…?”

“কী?”

“জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে?”

“এরকম কথা তো কখনও শুনিনি।”

“না ধরো কোনও যান্ত্রিক ত্রুটির জন্যে, কিংবা কিছু ইচ্ছে করে বিগড়ে দেওয়ার ফলে বা অন্য কোনও কারণে।”

“না!”

দরজায় এসে দাঁড়ায় দুজনে।

“কেমন মনে হচ্ছে, এই বন্ধ করে দেওয়াটা ঘরটা হয়তো পছন্দ করবে না!”

“মরতে কেউই চায় না—এই ঘরটাও না।”

“আচ্ছা, এই যে আমি বন্ধ করে দিতে চাইছি, এর জন্যে ঘরটা কি আমাকে ঘৃণা করবে?”

“অহেতুক ভয় আজ দেখছি এখানে একেবারে জমাট বেঁধে রয়েছে,” ম্যাকক্লিন বলে, “পশুর পায়ের ছাপের মতো ওটাকেই অনুসরণ করে বেশ চলা যায়। আরে এটা কী?”

নিচু হয়ে একটা রক্ত-মাখা স্কার্ফ কুড়িয়ে নেয় ম্যাকক্লিন, “তোমার নাকি এটা?”

“না!” মুখ কঠিন হয়ে আসে জর্জের, “ওটা লিডিয়ার।”

দুজনে মিলে ফিউজ বক্সের কাছে এসে নামিয়ে দেয় সুইচ। বন্ধ হয় যায় খেলাঘর।

একেবারে হিস্টিরিয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায় বাচ্চা দুটো। চিল্লিয়ে জিনিসপত্র ছুড়ে ফ্যালে, হাত-পা ছোড়ে, কেঁদে-ককিয়ে আসবাবপত্রের ওপর লাফায়।

“তোমরা খেলাঘরটার সঙ্গে এমন করতে পারো না, কক্ষনো করতে পারো না।”

“এমন করতে হয় না, সোনারা।”

কাঁদতে কাঁদতে একটা সোফার ওপর আছাড় দিয়ে পড়ে বাচ্চা দুটো।

“জর্জ, একটুর জন্যে খেলাঘরটা চালিয়ে দাও-না,” লিডিয়া বলে, “এমন হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়াটা ঠিক না।”

“না।”

“এতটাও কড়া হোয়ো না।”

“লিডিয়া, ওটা বন্ধ আছে আর বন্ধই থাকবে। আর শুধু ওটা কেন? এই পুরো বাড়িটাকেও এই মুহূর্তে খতম করে দেওয়া দরকার। যে ঝঞ্ঝাটে নিজেদের জড়িয়েছি, যত তা দেখছি ততই কেমন গা গুলিয়ে উঠছে। সব ভুলে এইসব যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক কলকবজাতে নাক ডুবিয়ে বড্ড বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছি। উফ, এবার নির্মল হাওয়াতে শ্বাস নেওয়ার সময় হয়েছে।”

সারা বাড়ি দাপিয়ে একের পর এক যন্ত্র বন্ধ করে জর্জ। কথা-কওয়া ঘড়ি, স্টোভ, হিটার, জুতো পালিশের কল, জুতোর ফিতে বাঁধার কল, শরীর ঘষা-মাজা-পোঁছা-মালিশ করার কল, আর তার হাতে অন্য যা যা যন্ত্র পড়ে, সব।

বাড়ি যেন ভরে ওঠে মৃতদেহে। মনে হয় যেন যন্ত্রের গোরস্থান। সমস্ত নিস্তব্ধ। উধাও বোতামের ছোঁয়ায় কাজে লেগে-পড়া যন্ত্রদের গুঞ্জন-তোলা গোপন কর্মশক্তি।

“এদেরকে এসব করতে দিয়ো না,” ছাদের দিকে তাকিয়ে কেঁদে চিৎকার করে ওঠে পিটার, যেন তার খেলাঘরের সঙ্গে কথা বলছে, “বাবাকে সব মেরে ফেলতে দিয়ো না।”

জর্জের দিকে ফেরে পিটার, “দু-চক্ষে দেখতে পারি না তোমাকে!”

“আমাকে এইসব অপমান করে কিচ্ছু আদায় করতে পারবে না।”

“তুমি মরে গেলে ভালো হয়।”

“মরেই তো ছিলাম এতকাল ধরে। এবার সত্যিই বাঁচব। যন্ত্রের হাতে পালিশ-মালিশ হওয়া নয়, সত্যিকারের বাঁচা।”

ওয়েন্ডি এতক্ষণ ধরে কাঁদছিল, এবার পিটারও তার সঙ্গে কান্না জোড়ে, “একবারটি, একবারটি, একবারটির জন্যে খেলাঘরটা খুলে দাও।” কান্না-ভেজা গলায় চ্যাঁচাতে থাকে দুজনে।

“ও জর্জ, দাও-না,” অনুরোধ করে লিডিয়া, “কী আর হবে?”

“আচ্ছা, আচ্ছা। আগে চুপ করতে বলো দুটোকে। এক মিনিট মাত্র, মনে থাকে যেন, তারপর বরাবরের জন্যে বন্ধ।”

“বাবা! বাবা! বাবা!” কান্না-ভেজা মুখে হাসি নিয়ে চ্যাঁচায় দুই ছেলেমেয়ে।

“এরপর আমরা ছুটিতে যাচ্ছি। ডেভিড ম্যাকক্লিন আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই আসছে। আমাদের বাঁধাছাঁদায় সাহায্য করে একেবারে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেবে। আমি পোশাক বদলাতে যাচ্ছি। লিডিয়া, তুমি এক মিনিটের জন্যে খেলাঘরটা চালিয়ে দাও। মনে থাকে যেন, শুধু এক মিনিট।”

তিনজনে মিলে বকবক করতে করতে বিদায় হয়। জর্জও ভ্যাকুয়াম নলে ঢুকে হুস করে পৌঁছে যায় ওপরের তলায়। তারপর নিজের হাতেই পোশাক পরে।

লিডিয়া এসে পৌঁছোয় এক মিনিটের মধ্যে।

“ওফ, এখান থেকে যেতে পারলে বাঁচি,” লম্বা শ্বাস ফ্যালে সে।

“তুমি ওদের দুজনকে খেলাঘরে ছেড়ে এলে নাকি?”

“আমাকেও তো পোশাক পালটাতে হবে। ওঃ! ওই ভয়ানক আফ্রিকা, ওতে ওরা কী পায় কে জানে।”

“যেতে দাও, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা তো আইওয়ার রাস্তায়। উফফ, কী করতে যে এই বাড়িটাতে ঢুকেছিলাম। কী ভূত চেপেছিল মাথায় যে পয়সা খরচ করে এই দুঃস্বপ্ন কিনেছিলাম?”

“দম্ভ, অর্থ, মূর্খতা।”

“চলো, নীচে যাই। না হলে ছেলেমেয়েগুলো আবার ওই জঘন্য পশুগুলোতে আটকে পড়বে।”

হঠাৎ সেই সময়ে ভেসে আসে ছেলেমেয়েদের ডাক, “বাবা! মা! তাড়াতাড়ি একবার নীচে এসো—তাড়াতাড়ি।”

বাতাসিয়া নল দিয়ে নেমে এসে করিডর ধরে ছুট লাগায় দুজনে। ছেলেমেয়েদের দেখতে পায় না কোথাও।

“ওয়েন্ডি? পিটার?”

দৌড়ে খেলাঘরে ঢোকে দুজনে। তৃণভূমি ফাঁকা, কেবল সিংহগুলো তাকিয়ে দ্যাখে। যেন তাদের জন্যেই অপেক্ষা করছে।

“পিটার? ওয়েন্ডি?”

দড়াম করে বন্ধ হয়ে দরজা।

“ওয়েন্ডি? পিটার?”

জর্জ আর তার স্ত্রী পেছনে ঘুরে দৌড়ে যায় দরজা অবধি।

“দরজা খোলো,” দরজার হাতলটা নাড়ায় জর্জ, “আরে, ওরা তো আমাদের বাইরে থেকে আটকে দিয়েছে।”

দরজা পেটায় জর্জ, “পিটার!”

দরজার ঠিক বাইরেই শোনা যায় পিটারের কণ্ঠস্বর, “ওদের খেলাঘর আর বাড়িটাকে কোনওদিন বন্ধ করতে দিয়ো না।”

জর্জ আর স্ত্রী মিলে দরজা পেটায়, “সোনারা, এইসব পাগলামি করে না। আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। ডেভিড ম্যাকক্লিন এক্ষুনি এসে পড়বে, তারপর…”

এমন সময়ে তারা শব্দটা শুনতে পায়।

হলুদ ঘাস মাড়িয়ে, শুকনো খড় মাড়িয়ে, গলায় গর্জন আর হুংকার তুলে তিনদিক থেকে তাদের দিকে এগিয়ে আসে সিংহের দল।

সিংহ।

স্ত্রী-র দিকে তাকায় জর্জ, দুজনে মিলে ঘুরে একসঙ্গে তাকায় পশুগুলোর দিকে।

ল্যাজ শক্ত করে তাদের দিকে গুঁড়ি মেরে ধীর কদমে এগিয়ে আসে সেগুলো।

মিস্টার ও মিসেস হেডলি দুজনেই আর্তনাদ করে ওঠে।

আর হঠাৎ বুঝতে পারে, আগে শোনা আর্তনাদগুলো তাদের এত পরিচিত লেগেছিল কেন।

“এই এসে গেছি,” খেলাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে ডেভিড ম্যাকক্লিন, “ওঃ এই তো তোমরা!” মাঠে বসে পিকনিকের হালকা খাবার খেতে-থাকা বাচ্চাগুলোর দিকে তাকায় সে। তাদের পেছনে তিয়াসডোবা আর হলদেটে তৃণভূমি, মাথার ওপরে গনগনে সূর্য। ঘামতে আরম্ভ করে ডেভিড, “তোমাদের বাবা-মা কোথায়?”

মাথা তুলে তাকিয়ে হাসে ছেলেমেয়ে দুটো, “এখানেই সোজা চলে আসবে।”

“আচ্ছা আচ্ছা। আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে কিন্তু।” ম্যাকক্লিন দেখতে পায়, দূরের সিংহের দল নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, একে অপরের ওপর থাবা চালায়, তারপর থেমে গিয়ে গাছের ছায়ার নীচে আহারে মন দেয়।

কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ কুঁচকে সিংহগুলোকে দ্যাখে ম্যাকক্লিন।

খাওয়া শেষ হয়ে যায় সিংহদের। তিয়াসডোবায় জল খেতে যায়।

ম্যাকক্লিনের গরম মুখের ওপর একটা ছায়া পড়ে। তারপর পরপর আরও কয়েকটা। শকুনগুলো খাওয়ার জন্যে আকাশ থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে।

“এক কাপ চা খাবেন?” নিস্তব্ধতার মধ্যে জানতে চায় ওয়েন্ডি।

 

ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া করে চিত্রবিচিত্র মানুষটা। একবার করে পাশ ফেরে সে আর প্রতিবার পাশ ফেরার সময়ে নজরে আসে তার পিঠ, তার হাত, তার কবজি রাঙিয়ে তোলা আরও-একটা ছবি। রাতের শুকনো ঘাসের ওপর একটা হাত ছুড়ে ফ্যালে সে। আঙুলগুলো খুলে যায় তার, আর হাতের তালুতে আর-একটা ছবি নড়ে উঠে প্রাণ পায়। একবার বেঁকে যায় সে, আর তার বুকের ওপর দেখতে পাই নক্ষত্র আর অন্ধকারের এক গভীর, গভীর শূন্যতা, আর সেই তারাদের মাঝে কিছু নড়ে, সেই অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কিছু পড়ে, আমি দেখতে দেখতে পড়তেই থাকে

Tags: অনুবাদ গল্প, রে ব্র্যাডবেরি, সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সুমিত বর্ধন

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!