মঙ্গলগ্রহে ছ’মাস বসবাসের অভিজ্ঞতা

  • লেখক: যশোধরা রায়চৌধুরী
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

গতবছর কল্পবিশ্বের জন্য একখানা গল্প অনুবাদ করেছিলাম। আশার টু। রে ব্র্যাডবেরি। বুঝিনি সেই সূঁচ পরে লাঙল হয়ে দেখা দেবে। গল্পটা খুশিখুশি মুখে নিজের মৌলিক ও অনূদিত কল্পগল্প সংকলন ‘অঙ্কিটের বুদবুদে’ ঢোকাতে গেছি, সে বইয়েরও প্রকাশক কল্পবিশ্ব— হঠাৎ একদিন দীপ ঘোষের ফোন। দিদি এখন এ গল্পটা এই বইতে রাখবেন না। আমাদের বড়ো পরিকল্পনা আসছে রে ব্র্যাডবেরি নিয়ে।

মাথায় বজ্রাঘাত পরের কথা শুনে। রে-র এই গল্পটা মার্শিয়ান ক্রনিকলস-এ আছে তো, তা, গোটা বইটাই আপনি অনুবাদ করুন এটা আমরা চাই। আমরা ওঁর অনুবাদের রাইটস কিনেছি। সদ্য সদ্য পেয়েছি কাগজপত্র হাতে। এবার, অনুবাদগুলো ২০২২ সালের জুন-জুলাইতেই বের করে ফেলতে হবে। খুব দ্রুত কাজ এগতে হবে।

মনে পড়ে রে-র সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ স্কুল পেরিয়ে কলেজে ঢোকার মুখে। অদ্রীশ বর্ধনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কল্পপত্রিকা ‘ফ্যানট্যাস্টিক!” সেই ১৯৮৬-৮৭ নাগাদ প্রচণ্ড হইহই-এর সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। বইমেলায় গিয়ে সদাহাস্যময়, এনার্জিতে প্রায় একটা স্টিম ইঞ্জিন সমতুল্য প্রৌঢ় অদ্রীশের সঙ্গে আলাপ করে এসেছি বইয়ের ভারে একদিকে হেলে যাওয়া একবেণীধরা আমি! ভীষণ আঁতেল মুখ করে ঘুরে বেড়াতাম মেলায় সে সময়ে। ফ্যান্টাস্টিক গিলে খাচ্ছি ওরকম সময়ে। তা ছাড়া নানা রকম কল্পগল্প তো আছেই… সত্যজিৎ রায়ের জমানা ছাড়িয়ে তখনকার খাদ্যসূচিতে বিশেষত প্রেমেন্দ্র মিত্রের বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প থেকে শুরু করে রুশ বই উভচর মানুষ… আলেক্সান্দার বেল্যায়েভের সেই জমজমাট বিজ্ঞান রূপকথা… আসিমভের লেখা কিনে এনেছে আমার দিদি… ক্লার্কের এক-দুটো লেখা পড়েছি মাত্র। সেই সময়েই রে প্রবেশ করলেন জীবনে। পড়ে ফেললাম ভেল্ডট-এর অনুবাদ। উফ্‌ফ কী অদ্ভুত যে লেগেছিল গল্পটা। গা শিরশির আর ছমছম মিলিয়ে একটা ব্যাপার। এরকমও লেখা হয়?

এত আনক্যানি, পায়ের তলা থেকে মাটি সরানো গল্প রে-র। তারপরেও, মার্শিয়ান ক্রনিকল অনেকবার পড়তে গেছি। কিন্তু কেমন যেন মেলাতে পারিনি একটা থেকে আরেকটা গল্পে যেতে গিয়ে। প্রতিটা এত আলাদা। কোনোটাই আজকের ভাষায় সো কলড ফিল গুড না। এবং যে গা রি রি করা বর্ণনা মঙ্গলের। সেই লাল মাটি আর কড়া নীল আকাশের ইগলনখর… ধু ধু করা চরা আর আগুনপাখিতে আকাশভ্রমণের কথা। একটা সূর্যমুখী বাড়ি! কথাবলা ঘড়ি সারাদিন সময় জ্ঞাপন করে।

কাজ শুরু হল ২০২১ এর শেষে বা ২০২২-এর একেবারে গোড়ায়। বইটা দীপরা কিনে দিলেন। রে সোসাইটি স্বীকৃত ছাপা বই। কেননা, ডিজিটাল ভার্শানে অনেক ভুলভাল ঘুরে বেড়ায়। এ ক্ষেত্রে এই ছাপা বইটাকেই মান্য সংস্করণ ধরে এগুতে হবে।

ধস্তাধস্তি শুরু হল। পাহাড় তোলার মতো কাজ। ৬২ হাজার শব্দ অনুবাদ। মজা করে কল্পবিশ্ব টিমকে বলেছিলাম পার শব্দ রেট ধার্য কর। অথবা টিকিট কেটে মঙ্গলে পাঠাও!!!

আসলে যে পরিশ্রম অনুবাদ দাবি করে, কোনো অর্থমূল্য দিয়ে তার মাপ হয় না। অনুবাদমাত্রেই লেবার অব লাভ। এই যে এত বছর ধরে অনুবাদ করছি, প্রতিবারই থান ইঁট বইগুলো জীবন বদলে দিয়েছে কোনো না কোনোভাবে। রে ব্র্যাডবেরির এই বই অনুবাদ আমার নিজের লেখক সত্তার জন্য একটা লটারির টিকিটের চেয়ে কিছু কম না। আমার নিজের ভেতর দিয়ে, নিজের কলমের ভেতর দিয়ে রে-কে গ্রহণ করলাম। এ এক অন্য, অনন্য অভিজ্ঞতা।

মারশিয়ান ক্রনিকলস বা মঙ্গলগ্রহের ডায়েরি এক অনন্য বই। গোটা পৃথিবীর বহু ভাষায় অনূদিতই শুধু নয়, অতি জনপ্রিয় এই বইটি রে ব্র্যাডবেরির নিজেরও খুব প্রিয় ছিল। মানুষের মহাকাশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কল্পনার দরাজ হাত মানুষকে খুলে দিল স্পেকুলেটিভ ফিকশনের এক অনন্য পথ… মঙ্গলগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনার গল্পকথা, কল্পনা আর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এলাকাগুলো মিশে যেতে লাগল।

মার্শিয়ান ক্রনিকলস সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞান গোত্রের বই। এবং এর জনরাঁ ‘ফিক্স আপ’ নভেল। অর্থাৎ, এই লেখাগুলির প্রতিটি গল্প একটা সুতোয় গাঁথা হয়েছে পরে। গল্পগুলো ব্র্যাডবেরির কলমে প্রথমে আলাদা আলাদাভাবেই গল্প হিসেবে লেখা হয়েছিল। প্রতিটি একই থিমের ওপরে অথচ পৃথক স্পষ্ট গল্প। ফলত এই লেখা বহুবর্ণময় নানা আকারের মণিমুক্তো গেঁথে তৈরি এক মালা। একেকটা গল্পের বিচ্ছুরণ আলাদা। অথবা একটা ক্যালাইডোস্কোপের মতো এই বই। যেভাবে এই বইয়ের এক চরিত্র বলে, “জানো, মঙ্গল আসলে কী? সত্তর বছর আগে ক্রিসমাসে পেয়েছিলাম একটা উপহার। জানি না তুমি কখনো পেয়েছ কিনা। ওটাকে বলত ক্যালাইডোস্কোপ।

ছোটো ছোটো কাপড়ের, কাচের টুকরো, পালক, পুঁতি, হিজিবিজি ভরা একটা দূরবীনের মতো জিনিস। সূর্যের দিকে ধরে চোখ লাগালেই একেবারে চমকে দেবে। কত যে ছবি ফুটবে, ছাঁদ ফুটবে! সেইরকমই এই মঙ্গল! উপভোগ করো।”

এই ক্যালাইডোস্কোপের ঘুরনচর্কিতে চড়ে, পাঠক কখনো নামেন মন খারাপের অতলে, কখনো বিস্ময়বোধে হয়ে ওঠেন চাঙ্গা। ওপরচালাক মানুষের ধূ ধূ মাঠে ফাস্ট ফুডের দোকান দেওয়ার গল্প চিলতে হাসি আনে ঠোঁটে। আবার চমকে চৌত্রিশ করে দেয় বীভৎস গল্প, তৃতীয় অভিযান বা আষাঢ়ে বাড়ি। গল্পগুলোর কোনটিকে নিছক এক দাম্পত্য টেনশনের গল্প বলে চালানো যায়। বেশিটাই, হয়ে ওঠে সূক্ষ্মতম শ্লেষ ব্যঙ্গ বিদ্রূপের গল্প। মানবসভ্যতার অপরিসীম মূর্খতা, ধ্বংসপ্রবণতার গল্প। আবার অন্তর ধুয়ে দেওয়া কাব্যময়তার স্রোতও বটে।

কিন্তু সাজানোর গুণে শুরু থেকে যত শেষের দিকে চলে বইটি, গল্পগুলো পরস্পর পরস্পরের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড় করানো থাকে, আরো বেশি বেশি করে কাব্যময় ও স্বপ্নসম্ভব হয়ে ওঠে লেখাগুলি, এবং গল্পের মোচড়গুলোও হয়ে উঠতে থাকে আরো আরো বিস্ময়কর। শুধু ডিসটোপিক ফিকশন, বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশ্চর্য পূর্বধারণা তৈরির ক্ষমতাই রে ব্র্যাডবেরি দেখাননি, দেখিয়েছেন কালো মানুষের সংগ্রামকে, দেখিয়েছেন মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে, দেখিয়েছেন মানুষের চাওয়া কত অনিঃশেষ, তার লোভ কর দুর্নিবার, সভ্যতার ক্ষয় কত অনিবার্য।

প্রাচীন সভ্যতা, বিশেষত অল্পবয়সে জাদুঘরে গিয়ে দেখা একটা অভিজ্ঞতার মতো ছিল তাঁর কাছে মিশরের সভ্যতা। বার বার ফিরেছেন সেই মিশরীয় সভ্যতার কাছে। সে আদলে তিনি মঙ্গলগ্রহের একটা মৃত সভ্যতার কথা এঁকেছেন। প্রাচীন, প্রকৃতির কাছাকাছি সভ্যতার বিশুদ্ধতা, বনাম মার্কিন মডেলের ক্ষণবাদী, ধনবাদী সভ্যতা, যা টাকা আর অস্ত্র দিয়ে সবকিছুকে হয় কিনতে চায় নয়তো ধ্বংস করতে চায়… এই দ্বন্দ্বটাই বার বার দেখালেন ব্র্যাডবেরি তাঁর মঙ্গলগ্রহের ডায়েরিতে।

কিন্তু এই অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ভবিষ্যধারণার বাইরেও গল্পগুলির প্রতিটিই সুপাঠ্য নাটকীয়, কাব্যময়, নিটোল… গল্পবলার ঝাঁকুনিতে অনিবার্য আনপুটডাউনেবল। হয়তো অনুবাদের কারণে সে গতিময়তার খামতি থেকে যাবে, ভয় পেয়েছি বার বার। চেষ্টা করেছি গল্পের আমেজকে বজায় রাখতে।

এগুলোর অনুবাদকালে আমি আনন্দ পেয়েছি, চ্যালেঞ্জ বোধ করেছি, জেনেছি কীভাবে গদ্যে কবিতা লিখতে হয়, জেনেছি কীভাবে ডায়ালগ রহস্য সিঞ্চিত এবং রসবোধে ভরাট হয়। অসম্ভব তুখোড় মজা করার ক্ষমতা আর ছবি লিখবার ক্ষমতা নিয়ে এসেছিলেন রে ব্র্যাডবেরি। এক উপভোগ্য জার্নির জন্য পাঠককে প্রস্তুত হতে হবে। সিটবেল্ট বেঁধে রেডি হতে হবে।

এই কাজটা করার সময়ে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছি অন্য এক জায়গা থেকে। কাজটা কোঅর্ডিনেট করার জন্য গ্রুপ তৈরি হয়েছিল। গ্রুপে তিন অনুবাদক, ফারেনহাইট ৪৫১-র অনুবাদক বহুপ্রজ লেখক দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, দ্য ইলাস্ট্রেটেড ম্যান-এর অনুবাদক অদ্রীশ-ভ্রাতুষ্পুত্র আমাদের শ্রদ্ধেয় কল্পবিজ্ঞানলেখক সুমিত বর্ধন (যাঁর অর্থতৃষ্ণা বইটি আমাকে ছিটকে দিয়েছিল বছর তিনেক আগে)… দীপ ও সুবিনয় ও আরো কয়েকজন। নানা ধরণের কেজো ও কাজের বাইরের আলোচনার জন্য এই গ্রুপ।

গ্রুপটা আমাদের রে ব্র্যাডবেরি সমুদ্রে সাঁতার কাটার সময়ের লাইফসেভার, লাইফবোট, ভাসমান বয়া সবকিছু হয়ে দাঁড়াল ক্রমশ। মধ্যরাত। সুমিতদা কোন শব্দবন্ধ কীভাবে ব্যবহার করা যায়, জিজ্ঞাসা করেন। আমার হঠাৎ আটকে যাচ্ছে কোথাও। গ্রুপে পাঠালাম ইংরেজি বাক্য। মতামত এল। পথ খুলে গেল। অজস্র রে ব্র্যাডবেরি মেমোরাবিলিয়া, টুকরো খবর, ট্রিভিয়া, রে-র উদ্ধৃতি আদান প্রদান হয়েছে ওই গ্রুপে। যেন রে-চর্চার একটা ছ’মাস ব্যাপী ফেস্টিভাল চলল আমাদের।

আমি বাষট্টি হাজার শব্দের শেষ ২০ হাজার শব্দ টানা চার-পাঁচ দিনে শেষ করেছি। একা, একটা ঘরে বসে। ঘোর মে মাসের গ্রীষ্মে, আপিস থেকে বিশেষভাবে এই কারণেই ছুটি নিতে হয়েছিল, কারণ অনুবাদ, একটা গোটা বইয়ের অনুবাদ, মোমেন্টামের ওপর দিয়ে সম্পন্ন করে ফেলা জরুরি ছিল। এত পরিশ্রম খুব কম কাজেই করেছি কিন্তু করার পরে এক অন্য পরিতৃপ্তি হল । পুরো একটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিলেন রে ব্র্যাডবেরি এই কাজটার সময়ে। অনির্বচনীয় একটি আনন্দ।

এক বিশ্বধারণাকে সামনে দেখতে পেলাম। ঘুরে ঘুরে এল রে-র নানা অবসেশন। নানা রকমের ট্রোপ যা তিনি বার বার ব্যবহার করেন। আর, তিনটি বইয়ের মধ্যেও বিবিধ ওভারল্যাপ হয়ে চলল, যা দেবজ্যোতি, সুমিতদা ও আমি ক্রমাগত শেয়ার করছিলাম। যেমন মার্শিয়ান ক্রনিকলের গল্পে রয়েছে “ফায়ারম্যান”দের কথা। এরা দমকল কর্মী নয়। এরা “অগ্নিপুরুষ”। আগুন দিয়ে শুদ্ধ করে। সব পুড়িয়ে নিকেশ করে। এই ভাবনাটারই প্রসারিত রূপ এসেছে ফারেনহাইট ৪৫১-তে।

কালো মানুষের লড়াই, দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে অত্যাচারিত কালো মানুষদের দলে দলে মঙ্গলে পাড়ি দেবার ব্যাপারটা মার্শিয়ান ক্রনিকলে এসেছে ‘way in the middle of air’ গল্পে, আবার ইলাস্ট্রেটেড ম্যানের বিখ্যাত গল্প ‘The Other Foot’ এও আছে। দুটি গল্প যেন একে অপরের পরিপূরক।

এভাবেই আশ্চর্য সব আবিষ্কার হয়েছে রে-র জগৎ সম্পর্কে। বিখ্যাত ভেল্ডট-এর শিশুদের নার্সারি ঘরটা, যার দেওয়ালে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির এক আফ্রিকার জঙ্গল ফুটে উঠতে থাকে, সেও আছে মার্শিয়ান ক্রনিকল-এর ‘And There Will Be Soft Rains’ এ। আবার, মার্শিয়ান ক্রনিকলের ‘The Million Year Picnic’ এর শেষে একটা দৃশ্য আছে যা, ব্র্যাডবেরির সভ্যতা সম্পর্কিত অন্ধকার অবসেশনকে আরো বেশি করে ফুটিয়ে তোলে। যেখানে বাবা মঙ্গলে এসে পৃথিবীর শেষ চিহ্ন কিছু খবরের কাগজকে পুড়িয়ে দিচ্ছেন, পৃথিবীর, মানব সভ্যতার চিহ্নস্বরূপ।

“আরেকটা কাগজ ফেলল বাবা আগুনে।

আমি আমাদের বেঁচে থাকার একটা ধরণকে পুড়িয়ে দিচ্ছি। ঠিক এখনই পৃথিবীর বুকেও আমাদের এই বেঁচে থাকার ধরণটা, আমাদের সভ্যতাটা, পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার কথা শুনে তোদের রাজনীতির নেতার কথার মতো লাগলে আমাকে ক্ষমা করে দিস কিন্তু। বিজ্ঞানও খুব দ্রুত মানুষের হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল… আর মানুষ তার যান্ত্রিক উন্মাদনায় হারিয়ে গেল। যেমন ছোটো বাচ্চারা সুন্দর দেখতে জিনিসে মজে যায়? নানা খেলনা, হেলিকপ্টার, রকেট? ভুল জিনিসে, ভুল যন্ত্রে মন দিল ওরা… বেশি ভাবল যন্ত্রগুলোকে নিয়ে, যন্ত্রগুলোকে কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নিয়ে নয়। যুদ্ধও ক্রমশ বড়ো থেকে আরো বড়ো হয়ে উঠতে লাগল… শেষ মেশ পৃথিবীকেই ওরা ধ্বংস করে দিল। রেডিয়ো চুপ হয়ে যাওয়ার মানেটা তাই-ই। তাই ওটা থেকে পালিয়ে আসা ছাড়া আমাদের আর গতি ছিল না।

আমরা খুবই ভাগ্যবান। আর রকেট বাকি ছিল না বিশেষ। এতদিনে তোদের জানা উচিত, বুঝে নেওয়া উচিত, এটা কোনো মাছ ধরার পিকনিক না। তোদের বলতে দেরি করেছি আমি। পৃথিবী শেষ। আরো কয়েক শতাব্দীর জন্য এ গ্রহে ও গ্রহে যাতায়াত করার কোনো সম্ভাবনাই নেই। হয়তো আর কোনোদিনই হবে না। ওই জীবনশৈলীটাই যে ভুল তা তো প্রমাণ হয়েই গেছে। নিজেই নিজেকে গলা টিপে হত্যা করেছে ওই সভ্যতাটা। তোদের এখনো বয়স কম। বড়ো হও, তারপর আবার তোমাদের আমি এই গল্পটা বলব। যতদিন না বুঝতে পার, ততদিন বলে যাব।

চুপ করে বাবা আগুনকে আরো কাগজ খাওয়াতে লাগল।

এখন আমরাই একা। আর কয়েকজন আসবে… কিছু কিছু রকেট এখনো ল্যান্ড করবে। আবার সবাই মিলে শুরু করব। পৃথিবীকে ভুলে গিয়ে, নতুন করে জীবন শুরু…”

অন্যদিকে এই সময়ের এক গা শিরশিরে প্রচ্ছায়া ফুটে উঠতেই থাকে ব্র্যাডবেরির কলমে। জাদুকরের ক্ষমতায় যা তিনি দেখে ফেলেছেন পঞ্চাশ বছর আগেই। তিনি কথাবলা বাড়ি, গান বা কবিতা শোনানো ঘর… আলেক্সার ৫০ থেকে ৭০ বছর আগে লিখলেন। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির কথা লিখলেন। লিখলেন ফ্ল্যাট টিভির কথা। লিখলেন সংকীর্ণ ক্যান্সেল কালচারের কথাও।

“আপনি যে বেচারা পো সায়েবের নাম জানবেন, এটা আশা করাই আমার ভুল হয়েছিল। অনেকদিন আগে মারা গেছেন। সেই লিংকনের আগে। ‘মহাযজ্ঞে’র আগুনে তাঁর সব বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাও তো হয়ে গেল বছর ত্রিশেক। সেই ১৯৭৫।”

মি বিগলো বিজ্ঞ ভাব করে বললেন, “ওহো, ওই তাঁদেরই একজন।”

“হ্যাঁ, তাঁদেরই একজন বিগলো সাহেব! উনি, লাভক্র্যাফট, হথর্ন, অ্যামব্রোজ বিয়ারস, সমস্ত ভয়ের গল্প, ভূতের গল্প, অতিপ্রাকৃত আর কল্পগল্প, আর হ্যাঁ ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখা গল্পও। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই আগুনে। নিষ্ঠুরভাবে। ওরা একটা আইন পাস করল। হ্যাঁ প্রথমে বেশ ছোটো করেই শুরু হয়েছিল। ১৯৫০ আর ৬০ এর দশকে এটা ছিল একটা বীজের আকারে। কার্টুনের বইগুলো প্রথমে নিষিদ্ধ করা হল, তারপর ডিটেকটিভ গল্প, আর হ্যাঁ অবশ্যই ফিল্‌ম। এই দল ওই দল, এই রাজনীতির লোক, ওই ধর্মীয় গোষ্ঠী, সংগঠন আর ইউনিয়ন, তাদের নানা চাপ, সর্বদা কোনো না কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর আপত্তি, তাদের কোনো এক ভয়ের কথা বলত তারা— তারপর সংখ্যাগুরুরা, বাকিরাও একে একে— যারা অন্ধকারকে ভয় পেত, ভবিষ্যতকে ভয় পেত, বর্তমানকে ভয় পেত, নিজেদের ভয় পেত, নিজেদের ছায়াকেও ভয় পেত। তারপর ওরা রাজনীতি শব্দটাকেই ভয়ে পেতে আরম্ভ করল। যেটা আবার প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে সাম্যবাদের সমর্থক হয়ে দাঁড়াল। শুনেছি একবার শব্দটা ব্যবহার করলেই জীবন ধন্য হত একদা।”

প্রায় এই সময়টাই তাঁর স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ভেতরে ছায়ার মতো বিমূর্ত বা মূর্তভাবে উপস্থিত হয়। সে কারণেই রে এত ক্ষমতাসম্পন্ন। আমাদের অধিগ্রহণ করেন। চালিত করেন। বার বার ফিরতে বাধ্য করেন তাঁর কাছে।

Tags: বিশেষ আকর্ষণ, যশোধরা রায়চৌধুরী, সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!