নতুন পৃথিবীর সন্ধানে

  • লেখক: ফিলিপ কে ডিক, ভাষান্তর : রুদ্র দেব বর্মন
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

(ফিলিপ কে. ডিক রচিত “দ্য ডিফেন্ডারস” – এর রূপান্তরিত অনুবাদ)

 

পর্ব

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী৫২); সপ্তম মাসের দ্বিতীয় দিনপ্রথম প্রহরের শেষ ভাগ

তালুকদার আরামচেয়ারে নিজেকে ডুবিয়ে একটা পা-এর উপর অন্য পা-টা তুলে বসলেন। হাতে আজ সকালের আপডেটেড ফোল্ডেবল সিলিকন-নিউজপ্যাডটা। এটা সাইজে আগের দিনের ট‍্যাবলয়েড খবরের কাগজের মতোই। তবে এটা এতটাই ফিনফিনে পাতলা যে এই কপ-৫২-তেও পুরোনো দিনের সেই খবরের কাগজের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়।

আজকে অবশ্য আর অফিস যেতে হচ্ছে না। আজকের এই অফ্-টা অনেক দিনের পর পাওয়া গেছে। এই মুহূর্তে একদিকে অফিস না যেতে হ‌ওয়ার আনন্দদায়ক আমেজ, আবার আরেকদিকে একই সঙ্গে সামনের বাঁ দিকের রান্নাঘর থেকে কুকারের উষ্ণ হিস-হাস আওয়াজ আর গরম কফির গন্ধ এসে একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে তালুকদারের মন আজ এখন আনন্দে ভরপুর। এই আনন্দটুকু নিয়েই তো আজকাল বেঁচে থাকা। যদিও অনেক দিন পর ফিরে পেলেন। তাই একটু বেশিই উপভোগ্য।

তিনি নিউজপ্যাডের দ্বিতীয় পাতাটা খুললেন এবং খুলেই আরও আনন্দে একটু বেশ জোরেই শিস্ দিয়ে উঠলেন। আরে! এ তো বিশাল এক সুখবর!

শিস্ এর আওয়াজ পেয়ে রান্নাঘরের খোলা কাউন্টারের ওপাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে মনিদীপা প্রশ্ন করলেন, “কী হয়েছে? এত আনন্দের কী হল?”

“কাল রাতে ওরা আবার বেইজিং-কে দুরমুশ করেছে। এবার বেশ ভালোরকম ভাবে,” তালুকদার মাথা নাড়িয়ে আবার শিস্ দিলেন, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে মনিদীপার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জানো এবার ওই নতুন আর-এইচ বোমাগুলো দিয়ে। বলছে নাকি খুবই কাজের হয়েছে ওইগুলো। ওয়াও!”

নিজের মনেই খুশিতে মাথা নাড়েন তালুকদার। মনটা ভরে ওঠে। আজকের এই অনেক দিনের পরের পাওয়া বিশ্রাম, আরামদায়ক সকাল, পাশেই রান্নাঘরে প্রিয়তমা সুন্দরী স্ত্রীর উপস্থিতি, জলখাবার আর কফি তৈরির উষ্ণ গন্ধে এবার তালুকদারের মনটা ভরে ওঠে। আর কি-ই বা চাই। এই আরামটুকুই তো চাইছিলেন বেশ কিছুদিন ধরে। তার সঙ্গে উপরিপাওনা সকাল সকাল যুদ্ধের এই বড়ো সুখবর‌। খবরটা যথেষ্ঠই “সু” এবং পরিতৃপ্তির।

এই “সু”-খবরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার ব্যক্তিগত গর্ব এবং লক্ষ্যে পৌঁছোনোর আনন্দ। যতই ক্ষুদ্র হোক উনি নিজেও এই যুদ্ধ পরিকল্পনা আর কর্মসূচির এক বিশিষ্ট অঙ্গ। কোনো সাধারণ অস্ত্র কারখানার শ্রমিক বা ইঞ্জিনিয়ার না, উনি রক্ষা-মন্ত্রণালয়ের যুদ্ধ-পরিকল্পনা বিভাগের একজন যথেষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মী এবং সেই তাদের মধ‍্যের একজন, যারা এই মুহূর্তের যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির নকশা আর পরিকল্পনা তৈরিতে যুক্ত।

বলা যায় আজকের যুদ্ধের প্রধান সুষুম্নাকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুকেন্দ্র তিনি।

কাজেই এই গৌরব মুহূর্ত আয়েস করে উপভোগ করার অধিকার তালুকদারের আছে বৈকি।

মুখে আত্মপ্রসাদের একটা হাসি ছড়িয়ে রেখে মনিদীপাকে বললেন, “জানো তো, ওই যে নতুন সাবমেরিন নিয়ে কাজ করছিলাম, আজকের খবর হচ্ছে ওগুলো নাকি প্রায় ৯৯.৯৯৯% নির্ভুল লক্ষ্য ভেদ করছে। দাঁড়াও ওগুলো এবার খালি জলে নামানো বাকি!”

“ও”, মনিদীপা খুব একটা উৎসাহ দেখান না, “তাতে কী পার্থক্য হবে?”

“বুঝতে পারছ না?”, তালুকদার যেন প্রায় ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হয়ে স্বচক্ষে দেখতে পারছেন, “ওগুলো যখন দক্ষিণ চিন সমুদ্রে আর এইদিকে আরব সাগরে পৌঁছে একদিকে চিনের মূল ভূখণ্ডে আরেক দিকে চায়না-অধিকৃত পাকিস্তানের উপর শেলিং শুরু করবে তখন এই চাইনিজগুলো টের পাবে!”

প্রত্যাশার আবেশে চ‌ওড়া হাসি হাসেন তালুকদার, “সমুদ্র থেকে ভূপৃষ্ঠে সরাসরি শেলিং! ওঃ, চাইনিজরা যা আশ্চর্য হবে না!”

মনিদীপা তার স্বামীর দিকে খানিক তাকিয়ে র‌ইলেন। অন্যমনষ্কভাবে বলেন, “ওরা কিন্তু বেশ ভালোই কাজ করছে।” সামনের জানলা দিয়ে লাগোয়া কৃত্রিম বাগানের কৃত্রিম ফুলের ঝোপগুলোর দিকে তাকিয়ে র‌ইলেন কয়েক মুহূর্ত আরও। তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎই প্রসঙ্গ পালটে বললেন, “এই, জানো? আজ আমরা আমাদের স্কুলে কাকে আনছি? একটা “লীডি”! আমি তো আগে একবার‌ই সুযোগ পেয়েছিলাম ওগুলো দেখার। তাও ওই কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এবার আমাদের স্কুল কমিটি বাচ্চাদের দেখানোর জন্য নিয়ে আসছে। এটা ছেলেপুলেদের জন্য একটা ভালো ব্যাপার হবে, বলো? ওদের জানা দরকার ওরা বড়ো হয়ে কাদের জন্য কাজ করবে আর কারা ওদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করে চলেছে। তোমার কী মনে হয়?”

তালুকদার বিড়বিড় করে বলে ওঠেন, “লীডি!”, তারপর নিউজপ্যাডের পাতাগুলো ভা়ঁজ করে ওটাকে সামনের সেন্টার টেবিলের নীচের থাকে রেখে বললেন, “শোনো। খুব সাবধান কিন্তু। দেখে নিও যেন ওটা ভালো করে সংক্রমণমুক্ত করা হয়েছে কি না। আমাদের কিন্তু কোনোরকম অসাবধানতাকে মেনে নেওয়া উচিত হবে না। ভূপৃষ্ঠ কিন্তু এখন বিকিরণে ভরা এক মৃত্যু উপত্যকা।”

“আরে না, না। ও তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। যখনই ওপর থেকে ওদের কাউকে নীচে আনা হয়, ওরা ওদেরকে ভালো করে স্নান করিয়ে, সংক্রমণ-মুক্ত করিয়ে তবেই আনে। ওরা ওপর থেকে কাউকে সংক্রমণ-মুক্ত না করে নীচে আসতে অনুমতি দেবেই না। কী বলো তুমি? অনুমতি দিতে পারে কি?”

মনিদীপা একটু থমকায়। খানিক ইতস্তত করে। কিছু পুরোনো কথা মনে পড়ে বোধহয়। “জানো, অরণ্য, আমার সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে—”

মনিদীপার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়েন অরণ্য তালুকদার, “জানি।”

 

পর্ব

DE-8 (Development Era – 8 বা উন্নয়ন যুগ); AC – 12 বা কপ-১২ (After Corona 12 বা করোনা পরবর্তী১২) – যে কোনো একটি দিন

অরণ্য তালুকদার জন্মান করোনা পরবর্তী যুগ কপ-১২ তে, তৎকালীন ভারতবর্ষের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। মনিদীপা, যার জন্ম আমেরিকার এক প্রদেশে, তখনো পৃথিবীর আলো দেখতে বছর চারেক বাকি। মা-বাবার সরকারি এবং বদলির চাকরি হ‌ওয়ার জন্যে অরণ্য বেড়ে ওঠে দাদু-দিদিমার কাছে। তখনও সময়কে বিসি বা এডি বলে চিহ্নিত করার প্রথা হারিয়ে যায়নি। দাদুর কাছে অরণ্য ছোটোবেলায় জেনেছিলেন তৎকালীন হিসেবে তার জন্মের বছর ছিল ২০৩২ সাল। করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় আক্রমণ পৃথিবীতে তখন সবে মাত্র শেষ হয়েছে।

সেবার করোনার প্রকোপ পৃথিবী যতটা সহজে সামলাতে পেরেছিল তত সহজে হয়নি এর প্রথম আক্রমণের সময়ে।

করোনা ছিল এক প্রজাতির ভাইরাস। ২০১৯-র শেষ দিকে প্রথম এর প্রকোপ শুরু হয় তৎকালীন চিনের এক ইউহান নামক শহরে। এর আবির্ভাবের কারণ হিসেবে পরে আরেকটু বড়ো হয়ে অরণ্য পড়েছিল ইতিহাস আর বায়োলজির ব‌ইতে। অনেকগুলো তত্ত্ব ছিল এটার শুরুর। কোনো একটা মতে বাদুর থেকে প্যাঙ্গোলিন হয়ে ইউহানের এক কাঁচা মাংসের বাজার থেকে প্রথম ছড়ায় মানুষের মধ্যে। আরেকটা মতে তৎকালীন চিনের কমিউনিস্ট সরকার পরিচালিত ইউহানের এক জৈব-রাসায়নিক অস্ত্রের গবেষণাগারে পরীক্ষানিরীক্ষার কোনো এক পর্যায়ে এই ভাইরাস হঠাৎই বাইরের আবহাওয়ায় মিশে যায়। এর একটা অনুসারী মত ছিল চিন সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এটা ছড়িয়ে ছিল পৃথিবীর অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে যা পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে খাপে খাপ মিলে যাওয়ায় অনেকের কাছেই পরে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আরেকটা তত্ত্ব ছিল আমেরিকা চিনের অর্থনৈতিক ক্ষমতা দূর্বল করার উদ্দেশ্যে এক মিলিটারি স্পোর্টস-এর সুযোগ নিয়ে গবেষণাগারে বানানো করোনা ভাইরাস ছেড়ে দেয় ইউহানের পরিবেশে। যদিও তৎকালীন ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা ‘হু’ নামক সংগঠনটা, যারা মানুষের স্বাস্থ্য বিষয়ক ব‍্যাপারে প্রাধিকারপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ছিল, তারা করোনা ভাইরাসের জিনগত পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল যে এটা প্রকৃতিতে ছিলই এবং সাধারণ বিবর্তনের নিয়মেই বিবর্তিত হয়ে হোস্ট ক‍্যারিয়ার পালটে মানুষের জন্যে বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছিল।

যাইহোক কোনো মতের পক্ষে পরবর্তীতে একাধিপত্য অর্জন সম্ভব হয়ে ওঠেনি যেহেতু তার আগেই মানব ইতিহাসের ধারা পরিবর্তিত হয়ে যায়।

এক অতিসাধারণ, ফ্লু গোত্রের, অতিকম মারণক্ষমতা সম্পন্ন, ভাইরাস— করোনা, শুধুমাত্র তার অসম্ভব সংক্রমণ ক্ষমতা দিয়ে তৎকালীন আর্থ-রাজনৈতিক পরিবেশের সহযোগিতায় সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এতে অগ্নিতে ঘৃতাহুতির মতো সাহায্য করে এর এক অদ্ভুত চরিত্র— এটি প্রায় দুই সপ্তাহ আক্রান্তের শরীরে কোনোরকম লক্ষণ প্রকাশ না করে ঘাপটি মেরে থাকতে পারত আর আক্রান্ত এই অবকাশে নিজের অজান্তেই সংক্রমিত করে চলত তার সংস্পর্শে আসা প্রত‍্যেকটি মানুষকে।

আর তাই করোনা ভাইরাস তার অসম্ভব সংক্রমণ ক্ষমতা দিয়ে এবং তৎকালীন আর্থ-রাজনৈতিক পরিবেশের সুযোগে বদলে দেয় পৃথিবীর সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ক্ষমতার প্রতিটি স্তম্ভকে।

চিন যদিও সর্বপ্রথম আক্রান্ত হয়, তবুও গোটা পৃথিবীকে অবাক করে খুব তাড়াতাড়ি সামলেও নেয় প্রথম চার মাসেই। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে থাকা মহাদেশগুলো— ইউরোপ আর আমেরিকা— আশ্চর্যজনকভাবে ভয়ানক ধরাশায়ী হয়। মৃত্যুর মিছিল বয়ে যায় ওই মহাদেশগুলোর প্রত‍্যেক শহর আর গ্রামের উপর দিয়ে। প্রায় বছর চারেক লেগে যায় মৃত্যু মিছিল থামিয়ে অর্থনীতির চাকা আবার সচল করতে।

তবে গোটা বিশ্বকে চমকে দেয় আফ্রিকা মহাদেশ আর ভারতীয় উপমহাদেশ— আফ্রিকার মানুষ যেন দেখা গিয়েছিল যে ভ্যাকসিন নিয়েই বসে আছে, কেন যেন করোনা কামড়-ই বসাতে পারেনি। আর প্রচণ্ড জনঘনবসতিপূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশ প্রাথমিক আঘাতে ধীরে হলেও ধরাশায়ী হয়, একের পর এক দরিদ্র অথচ জনবহুল এলাকা, বস্তি এলাকা একসময় জনহীন হয়ে যায়। সরকারি মদত ছাড়া মৃতদেহের সৎকার করা অসম্ভব হয়ে ওঠে একদিন। তবে তারপর হঠাৎই ফিনিক্স পাখির মতো যেন জেগে ওঠে ভারতবর্ষ, যেন বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষের জন্মগত প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে।

সে-সময় ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠী, পরবর্তী নির্বাচনে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছিল এক বিশাল জনগনতান্ত্রিক আন্দোলনে— যার নেতৃত্বে ছিলেন সেই সময়ের এক পদত‍্যাগী প্রাক্তন আইএএস, দিল্লির এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা আর মধ্যবিত্ত জনগন।

করোনা পরবর্তী যুগে কপ-৪-এ ভারতবর্ষে গড়ে ওঠে এমন এক যৌথ সরকার যা ক্ষমতায় এসেই সমস্ত ব্যক্তি-মালিকানাধীন সংস্থাগুলোকে সরকারি অধিকারে নিয়ে আসে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী কান্ননদেব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে গোটা দেশকে পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম আর উত্তর, মাত্র এই চারটি বিভাগে ভাগ করে পঞ্চ-স্তরীয় পঞ্চায়েতিরাজ চালু করেন।

ইতিহাসে যে যুগকে এখন Development Era বা উন্নয়নের যুগ বলে ধরা হয়ে থাকে সেই কপ-৪ থেকে কপ-১৬ (পুরোনো হিসেবে ২০২৪ সাল থেকে ২০৩৬ সাল) -এর মধ্যে ভারতবর্ষের চরম উন্নতি হয়। গোটা পৃথিবীর অর্থনীতি তখন একদিকে চিন আর অন্যদিকে ভারতবর্ষের অধীনে। অরণ্য তালুকদারের জন্মের দু-বছর আগেই অর্থাৎ কপ-১০ থেকেই ভারত বিশ্ব-ক্ষমতার শীর্ষে, সুপার পাওয়ার হিসেবে গণ্য।

 

পর্ব

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী৫২); সপ্তম মাসের দ্বিতীয় দিনদ্বিতীয় প্রহরের শুরু

তালুকদার মনিদীপার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন দীপা কি ভাবছে। এটা সেই তৃতীয় ইন্দো-চায়না যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহের কথা। তখনও ভূপৃষ্ঠের উপর থেকে সবাইকে সরানো শেষ হয়নি। ওদের অবশ্য নেমে যাওয়ার আদেশ এসে গেছে। গুছিয়ে নিচ্ছিলেন অল্প কয়েকটি জিনিস। আদেশ ছিলই যে বেশি নেওয়া যাবে না, পরিমাণ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। স্বামী-স্ত্রী মিলে ঠিক করেছিলেন দুজনের দুই পরিবারের স্মৃতি জড়িত কয়েকটা জিনিস ছাড়া আর কিছুই নিয়ে নামবেন না। সেভাবেই প্রস্তুতি নেওয়ার দিনগুলিতে একদিন বিকেলে হাঁটতে বেরিয়ে স্টেশনের দিকে গিয়েছিলেন। তখনই দেখতে পান। একটি হাসপাতাল-ট্রেন এসে থেমেছে। আহতদের নামানো হচ্ছে। বোমার টুকরোয় ক্ষতিগ্রস্ত সৈন্যদের শরীরের দিকে তাকানো যায় না যেন। বোমার সপ্লিন্টারে যেন ফুটো ফুটো হয়ে গেছে তাদের গোটা শরীর। তাঁর এখনো মনে আছে কীভাবে তারা তাকিয়ে ছিল ওদের দিকে, তাদের মুখের, যতটুকু তখনও অক্ষত ছিল, সেই মুখের ভাব— এখনও তাঁর স্মৃতিতে যেন জ্বলজ্বল করে। এ স্মৃতি সত্যিই বেদনার।

যদিও সে সময় এই ধরনের অনেক দৃশ্য মাঝে মধ্যেই চোখে পড়ত। মনে পড়ে তাঁর চার বছর বয়সেও দাদুর কোলে চেপে অরণ্য সেই প্রথম যুদ্ধের সময় বেশ কয়েকবার এমন দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু মনিদীপার ব‍্যাপার আলাদা। গরীব আমেরিকার এক গ্রামে বেড়ে ওঠা মনিদীপা ছাত্রী হিসেবে খুবই ভালো হওয়ায় জলপানি পেয়ে পিতৃপুরুষের দেশ ভারতে পড়তে এসে প্রেমে পড়েন অরণ্যের। তারপর দেশের গ্রামে মা গত হওয়ার পর তো অরণ্যকে বিয়ে করে ভারতেই থেকে গেলেন। আমেরিকায় থাকাকালীন এ ধরনের কোনো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার ছিল না। প্রথম ইন্দো-চায়না যুদ্ধের সময় সে তো আমেরিকায় তার মায়ের কোলে। এ দৃশ্য তার পক্ষে নতুন এবং অসহনীয়। তবে তারপরেও মাটির উপরে আর যে-কটা দিন তাদের থাকতে হয়েছিল সে-সময় এটা প্রায় রোজকার সাধারণ দৃশ্য হয়ে পড়েছিল— সে তুমি স্টেশনে যাও বা না যাও।

“ভুলে যাও দীপা,” তালুকদার বলেন, “এ সবই অতীতের ঘটনা। আর সেখানে এখন ওই লীডিরা ছাড়া কেউই নেই, আর লীডিরা এসবের বাইরে।”

“কিন্তু ব‍্যাপার তো এক‌ই। আশা করি কমিটি যথেষ্ট সাবধানতা নেবে লীডিদের কাউকে নীচে আনবার আগে। যদি কোনোভাবে গরম অবস্থায় নীচে চলে—” মনিদীপা শিউরে ওঠেন অমন সম্ভাবনার কথা ভেবেই।

হেসে ওঠেন অরণ্য। সেন্টার টেবিলটা পা দিয়ে আলতো ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “ছাড়ো তো দীপা। আজকের এই সময়টা আনন্দ করার। কতদিন পর আমি পুরো দুটো শিফট ঘরে থাকতে পারছি। আহা, কোনো কাজ করার নেই, শুধু বসে থাকা, আরাম করা। যদি চাও তো আমরা কোনো শো দেখতেও যেতে পারি, কি যাবে?”

“শো দেখতে? ছাড়ো তো! আমার একদম ভালো লাগে না। ওই ধ্বংস আর ধ্বংসস্তূপের ছবিই তো? সেবার ওই কলকাতার অবস্থা দেখিয়ে ছিল মনে আছে তোমার? ওই ভেঙে পড়া হাওড়া ব্রীজ, গঙ্গার বুকে ভেঙে পড়ে থাকা বিবেকানন্দ সেতু! আমার তো মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমার একদম সহ্য হয় না।”

“কিন্তু তোমার কি জানতে ইচ্ছে হয় না কী চলছে এখন উপরে? কী অবস্থা এখন ওখানে? যদিও এখন ওখানে আর কোনো মানুষ নেই যে সে আহত হবে। তুমি তো জানোই।”

“উহু, না, তাহলেও না। আমি পারব না সহ্য করতে,” মনিদীপার মুখে কষ্টের ছায়া খেলা করে। তালুকদার আর জোর করলেন না। উনি বোঝেন যে আমেরিকার ওই ছায়াময় শ্যামলীন গ্রামে বেড়ে ওঠা মনিদীপার পক্ষে এই সমস্ত মানিয়ে নেওয়া কত কঠিন।

নিউজপ‍্যাডটা নিয়ে আবার বসে পড়েন তালুকদার। বললেন, “ঠিক আছে। ছাড়ো তাহলে। যদিও এখানে অন্য আর কিছু করারও নেই। তবে মনে রেখো, চিনের দিকের শহরগুলোর অবস্থা কিন্তু আরো খারাপ। আমাদের বাহিনী তো শুধু ভাঙেনি, গুঁড়িয়ে দিয়েছে।”

মাথা দোলান মনিদীপা। তালুকদার আলতো হাতে নিউজপ‍্যাডের পাতা টানেন অন্যমনস্কভাবে। মুডটা একটু আগে যেমন ছিল, এখন আর তা নেই। কেন দীপা এত ভয়ে ভয়ে থাকে? তাদের সামাজিক অবস্থান যথেষ্ট উঁচুতে। সবকিছু এই টালমাটাল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তোমার মনের মতো নাও হতে পারে। তাও এই ভূতল শহরের মধ্যে থেকে আর বেশি কী পাওয়া যাবে? এখানে কৃত্রিম সূর্যের আলোর নীচে বেঁচে থেকে কৃত্রিম খাবার খেয়ে আর কত বেশি আশা করা যেতে পারে! যদিও বোঝেন খোলামেলা পরিবেশে আকাশের নীচে বেড়ে ওঠা যে কোনো কারোর পক্ষে এভাবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া যথেষ্ট কঠিন। এখানে আকাশ নেই, কোথাও যাওয়ার নেই— আর যদি যাও চারিদিকে ইস্পাতের দেওয়াল, দু-পা এগিয়ে গেলেই বিরাট বিরাট কারখানা, গোডাউন, ব‍্যারাকের পর ব‍্যারাক সাজিয়ে রাখা সৈন্যবাহিনীর জন্য।

যদিও এই মুহূর্তে এই সব‌ই অনেক অনেক ভালো ভূপৃষ্ঠের তুলনায়। একদিন এই অবস্থার শেষ হবে, আর তারপর তো আমরা আবার ওপরেই ফিরে যাবো। কেউই এভাবে বাঁচতে চায় না, কিন্তু এটা এই সময়ের প্রয়োজন।

ক্ষুব্ধ মনে পাতা পালটান তালুকদার নিউজপ‍্যাডের। ধ‍্যেৎতেরিকা! কোনো অন্য খবর‌ই নেই। শুধুই যুদ্ধের খবর। কি-ই বা থাকতে পারত? সব‌ই তো আজকাল চলে যাচ্ছে যুদ্ধের গহ্বরে! সমস্ত কিছু। আর উনি তো সেটা ভালোই জানেন। উনি নিজেই তো এই যুদ্ধের পরিকল্পনাকারীদের একজন। অন্যতম একজন।

আর ভালো লাগছে না। তালুকদার উঠে পড়লেন। পাশের রুমে এলেন। বিছানা এখনো গোছানো হয়নি। গোছোতে শুরু করলেন। করে নেওয়াই ভালো। দুপুরের ভিডিয়ো-তদারকিতে ব্যাপারটা কেন্দ্র জানতে পারলে আবার এক একক জরিমানা করে দেবে।

ডেস্কের ভিডিয়োবক্সে রিং বেজে ওঠে। তালুকদার থেমে যান। এই সময় কে আবার?

এগিয়ে গিয়ে ভিডিয়োফোন চালু করেন।

“তালুকদার?”, একটা মুখ ভেসে ওঠে পর্দায়। অত্যন্ত সুপরিচিত মুখ, পুরোনো, মুখটা এখন চিন্তিত দেখাচ্ছে, একটু ধূসর, “মুখার্জি বলছি। দুঃখিত, তোমাকে বিশ্রামের সময় বিরক্ত করছি। কিন্তু অত্যন্ত জরুরি,” কতকগুলো কাগজ নাড়েন মুখার্জি, “যত তাড়াতাড়ি পারো বেরিয়ে পড়ো আর এখানে পৌঁছাও। আমি চাই অবিলম্বে তুমি চলে আসবে।”

তালুকদার সোজা হয়ে দাঁড়ান। “এটা কি খুব জরুরি? কাল সকালে করলে হয় না?”

মুখার্জির শান্ত চোখের দৃষ্টি তালুকদারের দিকে, ভাবলেশহীন, অপলক। বসের অমন ভাবলেশহীন মুখ দেখে তালুকদার আন্দাজ করেন ঘটনা নিশ্চিত অনেক গভীরে এবং গুরুত্বপূর্ণ।

“ঠিক আছে, আপনি যখন চাইছেন, আমি আসছি। উর্দীটা পরে নিয়ে যেতে যতটুকু সময় লাগবে।”

“না। উর্দীর কোনো দরকার নেই। যেমন আছো বেরিয়ে পড়ো। প্রথম দ্রুতি-বাহনের গাড়িটা ধরবে। আর হ্যাঁ, গবেষণাগারে আসবার দরকার নেই। প্রথম গাড়িতে সোজা দ্বিতীয় তলে এসো। দ্রুতির গাড়িতে তোমার আধঘণ্টার মতো লাগবে। দ্বিতীয় তলের স্টেশনে আমি অপেক্ষা করছি।”

ভিডিয়োফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে অনন্তলাল মুখার্জির ছবি হালকা হয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।

 

পর্ব

WS-1 (War-Strugle Era – 1 বা ক্ষমতাযুদ্ধ যুগ); AC – 16 বা কপ-১৬ (After Corona 16 বা করোনা পরবর্তী১৬); যে কোনো একটি দিন

শীর্ষে পৌঁছনোর পথ কঠিন এবং কন্টকাকীর্ণ হতেই পারে, এবং তা হয়েই থাকে। তবে সে পথ পেরিয়ে আসাটা মানসিক দৃঢ়তা এবং সক্ষমতা থাকলে সম্ভব হয়ে ওঠে। কিন্তু শীর্ষস্থান-এ অবস্থান করা, শীর্ষস্থানে পৌঁছোনোর থেকেও আরও কঠিন‌। কেননা তখন একদিকে থাকে বাইরের প্রতিকূল পরিবেশকে অনুকূলে আনার লড়াই অন্যদিকে ভিতরের ঘুণপোকার বিরুদ্ধে লড়াই।

ঘুণপোকার এই বিষবৃক্ষ ধীরে বাড়ছিল ওই নতুন সরকারি ব্যবস্থার বিভিন্ন সাফল্যের তলায় তলায়।

কপ-১৫-তে কান্ননদেব হঠাৎই নিলেন স্বেচ্ছাবসর আর ঠিক তারপরেই হঠাৎই একদিন হৃৎপিণ্ডের চলা বন্ধ হয়ে কানাইলালের মৃত্যু এবং এরপরেই ক্ষমতা আবার দখল করে নেয় রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী।

ক্ষমতায় ফিরেই এই গোষ্ঠী একধার থেকে বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জেলে পাঠাতে শুরু করে। অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কান্ননদেবের প্রথমে হয় জেল, তারপর ফাঁসি। দেশের বিচার ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ হয়ে যায়। গোটা দেশকে নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে। সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রচুর ক্ষমতা। পঞ্চায়েত-ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে শুরু হয় কেন্দ্রীকরণ যার মাধ্যম থাকে সামরিক বাহিনী।

এরপর তো কপ-১৬তে শুরু হয়ে যায় প্রথম ইন্দো-চায়না যুদ্ধ। আর যুদ্ধের শুরুটা কিন্তু হয় হঠাৎ এক ভোর রাতে পারমাণবিক অস্ত্রে পাকিস্তানকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দিয়ে। আর শেষ যখন হয় তখন একদিকে গোটা আফগানিস্তান, তিব্বত আর সেই সঙ্গে তিব্বত সংলগ্ন চিনা অঞ্চলগুলো, আর অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

অরণ্য তালুকদার তখন চার বছরের শিশু। যুদ্ধ অবশ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল শুরুর বছর খানেকের মধ্যেই, কিন্তু অরণ্য তালুকদার হারায় তার শৈশব। পাওনার মধ্যে শুধুই শিখে নেওয়া সাইরেন বাজলেই কীভাবে বাঙ্কারে ঢুকতে হয়, কীভাবে দিনের পর দিন বাঙ্কারের মধ্যে বেঁচে থাকতে হয়।

কপ-৩৬এ দ্বিতীয় ইন্দো-চায়না যুদ্ধের সময় অরণ্য তখন ২৪ বছরের যুবক। সেই বছরেই সে যুদ্ধ-ব্যবস্থাপনার উপরে এমবিএ শেষ করে রক্ষা মন্ত্রণালয়ের চাকরিতে ঢুকেছিল। এই যুদ্ধটাও চলেছিল প্রায় বছর খানেক। আর দু-দেশের প্রায় সমস্ত বড়ো বড়ো শহরগুলোর ধ্বংসের পর যুদ্ধ থামে। আর অরণ্য সেই সময়েই দেখে কীভাবে মানুষ-সৈন‍্যের জায়গায় প্রথম প্রজন্মের প্রায়-মানব অ্যান্ড্রয়েড সৈন‍্যের দল রণভূমিতে জায়গা করে নিচ্ছে।

যুদ্ধ শেষ হলেও ক্ষমতার আস্ফালন কিন্তু শেষ হয় না। তবে এখন সরাসরি যুদ্ধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় অরণ্য তালুকদার অনেক কাছ থেকে সবকিছু দেখতে পেতে শুরু করে আর যুদ্ধের পরিকল্পনার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মাটির তলায় শহর গঠনের পরিকল্পনার সঙ্গে। আর এই ব্যাপারটা শুরু হয় পরিপূর্ণ আণবিক যুদ্ধ পরিকল্পনার প্রস্তুতি হিসেবে। অরণ্য তখন মহাব্যস্ত। পূর্বাঞ্চলের মাটির তলার শহরগুলো তৈরির মহাযজ্ঞের এক বিশেষ কারিগর তখন সে।

 

পর্ব – ৫

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী৫২); সপ্তম মাসের দ্বিতীয় দিনদ্বিতীয় প্রহরের শেষ ভাগ

তালুকদার বেরোনোর জন্যে তৈরি হয়ে বাইরের ঘরে এসেছেন দেখে মনিদীপা দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। একপাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? বেরোচ্ছো নাকি এই এখন আবার?”

“ওই যে, মুখার্জি বাবু! এক্ষুনি নাকি অনেক কিছু আলোচনা করার আছে।”

“আমি জানতাম। আজ এরকমই হবে”, মনিদীপা বিরক্ত হয়ে বলেন।

“তো? তোমার তো এমনিতেই কিছু করার ছিল না। তাই তোমার তো কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়,” তালুকদার নিজেও যে যথেষ্ট বিরক্ত তা তার কথা শুনেই বোঝা যায়। “এরকম তো মাঝে মাঝেই হয়। নতুন আর কী? আজ বরং ফেরার পথে কিছু নিয়ে আসব তোমার জন্যে। আমি তো এখন দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত যাবো। হয়তো ভূপৃষ্ঠের আরও কাছে যেতে হতে পারে—”

“না, না, একদম না। আমার জন্য কিছু আনতে হবে না। আর ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে তো একদমই কিছু না!”

“সে ঠিক আছে। না হয় আনব না। কিন্তু এ-ধরনের অযৌক্তিক কথাবার্তা—”

মনিদীপা কোনো জবাব দেন না। বিরক্ত চোখে তাকিয়ে দেখেন তালুকদার জুতো পরছেন।

 

***

অনন্তলাল মুখার্জি মাথা নেড়ে ইশারা করে এগোতে শুরু করতেই তালুকদার গতি বাড়িয়ে সঙ্গ ধরেন। চারদিকে একটা কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। মালপত্র প্যাকিং হয়ে ওয়াগনে তোলা হচ্ছে। ভর্তি ওয়াগনগুলো ট্র্যাকলাইন ধরে উঠে যাচ্ছে। খানিক ওপরেই একটা ট্র্যাপডোর, যেগুলো নীচের প্রত্যেকটি তলাকে ওপরের তলার থেকে আলাদা করে রেখেছে। ভূতল-রক্ষী বাহিনীর কড়া পাহারা প্রত্যেকটি ট্র্যাপডোরেই। অনুমতিপত্র পরীক্ষা করে ছাড়পত্র পেতেই ওপরে যাওয়ার ওয়াগনগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ট্র্যাপডোর-এর ওপাশে। তালুকদার লক্ষ করেন যে ওয়াগনগুলোর প্রত্যেকটা নলাকার লম্বাটে কিছু জিনিসে ভর্তি। সম্ভবত নতুন ধরনের কিছু অস্ত্র। এগুলোর পরিকল্পনা বা উৎপাদনের-এর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না বলে ঠিক বুঝতে পারলেন না। কর্মী-বাহিনীর গাঢ় ধূসর রঙের উর্দীধারী শ্রমিকেরা সব চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছে। কেউ মাল বইছে, কেউ ওয়াগনে মাল তুলছে, পুরো তলাটা জুড়ে চারদিকে একটা হইচই ভাব, চিৎকার ভনভন করছে। পাশ থেকে কেউ কিছু বললেও ভালো করে শোনা যাচ্ছে না।

মুখার্জি বললেন, “চলো, আমরা ওদিকে গিয়ে কথা বলি। এখানে পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার মতো অবস্থা নেই।”

পাশের চলমান সিঁড়িটা ধরে ওরা দুজন বাণিজ্যিক লিফট, সুড়ঙ্গ-বাহনের চলার কর্কশ আওয়াজ, মালপত্র ওঠানো-নামানোর শব্দ আর আনুসাঙ্গিক চীৎকার চেঁচামেচির পাশ কাটিয়ে উঠে আসেন বিশাল প্রধান সুড়ঙ্গের পাশের দিকের একটা পর্যবেক্ষণ মঞ্চে। ভূপৃষ্ঠ আর হয়তো মাত্রই কয়েক-মাইলটাক হবে মাথার ওপরে। সুড়ঙ্গের নীচের দিকে তাকিয়ে তালুকদারের মাথা বোঁ করে ঘুরে যায়। বাপরে! কী ভয়ানক গভীর-রে বাবা সুড়ঙ্গটা!

মুখার্জি হাসতে হাসতে বলেন, “আরে, নীচে তাকিও না।” একটা দরজা খোলেন তিনি, ভেতরে একটা ছোটো অফিস। সামনেই একটা ডেস্ক। তার পেছনে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর একজন বসে ছিল। ওরা দুজন ঢুকতেই সে বলে, “চলুন মুখার্জিবাবু, আমি আপনাদের সঙ্গেই আসছি,” তারপর ঘড়ি দেখে বলে, “আপনারা একটু আগেই এসে গিয়েছেন।”

মুখার্জি তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইনি হচ্ছেন কমান্ডার পিংলে— মি. বলবন্ত গঙ্গাধর পিংলে। ইনিই প্রথম ব্যাপারটা আবিষ্কার করেন। আমি জেনেছি কাল রাতেই।” সঙ্গে আনা হাতের প্যাকেটটা দেখিয়ে আবার বললেন, “এটার জন্যেই আমার দেরি হয়ে হল।”

কমান্ডার পিংলে কড়া চোখে মুখার্জির দিকে একবার তাকালেন। তারপর হাত তুলে মুখার্জিকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “চলুন, আগে প্রথম তলায় যাই। ওখানে গিয়েই আলোচনা করা যাবে।”

তালুকদার ঘাবড়ে যান একটু। ওদের পেছন পেছন একটা অপ্রশস্থ পথ ধরে একটা ছোটো লিফটে গিয়ে ওঠেন। বলেন, “প্রথম তলায় উঠতে হবে? এখানে আসার পরে আজ পর্যন্ত আমি এর আগে অত ওপরে যাইনি কখনো। ওটাতো ভূপৃষ্ঠের ঠিক পরের তলাটাই না? ওখানে তেজস্ক্রিয়তা কত মাত্রার থাকে?”

“আরে, আপনি তো দেখছি গোলা লোকজনদের মতো কথাবার্তা বলছেন!” কমান্ডার পিংলে বলেন, “বৃদ্ধা মহিলাদের মতো সব জায়গাতেই চোর-ডাকাত খুঁজে পাচ্ছেন! মশাই, কোনো বিকিরণই প্রথম তলায় পাবেন না। সীসা আর পাথরের স্তর দিয়ে প্রথম তলাকে ভূপৃষ্ঠের থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। আর সুড়ঙ্গ দিয়ে যা কিছু ওপর থেকে নীচে আসে সবগুলোকেই রীতিমতো স্নান করিয়ে পুরো পরিষ্কার করে তবেই অনুমোদন দেওয়া হয়। একটা গোটা সংক্রমণ-নিরাপত্তা বিভাগ এই স্নানের ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করছে ওপরে। বুঝলেন?”

তালুকদার এ নিয়ে আর কথা বাড়ান না। বলেন, “আচ্ছা, সমস্যাটা কী নিয়ে হয়েছে সেটা এবার একটু খোলসা করে বলুন তো আমাকে।”

“বলছি। এই তো আর একটুখানি চলুন।”

ওরা তিনজন লিফটে ঢুকে নির্দিষ্ট বোতাম টেপে। লিফটটা উঠে আসে। লিফট থেকে বেরিয়ে ওরা একটা হলঘরের মতো জায়গায় পৌঁছায়। তালুকদার দেখেন গোটা হলঘর ভর্তি গুচ্ছের সৈন্যদল, হাতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র আর পরনে নানারকম উর্দী। তালুকদার অবাক হয়ে চারদিকে তাকান। এই তাহলে সেই প্রথম তলা! ওপরের দিকে ভূতলের সবচেয়ে কাছের স্তর। এর উপরে শুধুই পাথর, সীসা আর পাথর। তারপরে রয়েছে শুধু শেষ-বহির্গমন ঘাঁটি। আর এসবের মধ্যে দিয়ে কেঁচোর গর্তের মতো উঠে গেছে ওই বিশাল সুড়ঙ্গ। সীসা আর পাথরের স্তরের মধ্যে দিয়ে উঠে গিয়ে বেরিয়েছে যেখানে, সেখানেই সেই বিশাল বিস্তৃত ভূপৃষ্ঠ— আজ আট বছর হয়ে গেছে কোনো জীবিত প্রাণী সেখানে দেখা যায়নি। পুরো ভূপৃষ্ঠ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শুধুই সীমাহীন ধ্বংসস্তূপ যা একদিন ছিল মানুষের বাসস্থান, যেখানে সে জীবনযাপন করত— এই আট বছর আগেও।

আজ সেই মানব-ভূমি যেন মৃত এক মরুভূমি, এক মৃত্যুশীতল উপত্যকা। শুধুই ধ্বংসস্তূপ। আকাশ ঢাকা পড়েছে ঘন কালো বৃষ্টিহীন মেঘে। সূর্যের আলো যেন শুষে নিয়েছে ভেসে বেড়ানো সীমাহীন কৃষ্ণ মেঘের দল। শুধু কিছু ধাতব বস্তুকে মাঝেমধ্যে চলতে ফিরতে দেখা যায়— ভগ্নস্তূপ কোনো এক শহরের মধ্যে দিয়ে কিংবা কোনো জ্বলে ছাই হয়ে গিয়েছে এমন দিগন্ত বিস্তৃত একদা কৃষিজমির মধ্যে পথ তৈরি করে। ওগুলো লীডি। ঠান্ডা যুদ্ধ আক্ষরিক অর্থে গরম হয়ে ওঠার মাত্রই কয়েক মাস আগেই প্রথম নামানো বিকিরণ-প্রতিরোধী বস্তু দিয়ে তৈরি প্রায়-মানব অ্যান্ড্রয়েড পর্বের রোবট যোদ্ধা— যারা গত আট বছর ধরে মানুষের হয়ে এই বিকিরণময় ভূপৃষ্ঠের উপর যুদ্ধ করে চলেছে। ক্রমাগত এবং প্রতিটি দিন। মাটির উপর হামাগুড়ি দিয়ে, সমুদ্রের উপর ভেসে বা আকাশে উড়ে লিকলিকে, ধূসর, ধাতু আর প্লাস্টিকের তৈরি মসৃণ এই যন্ত্র লড়াই করছে সেই ভূপৃষ্ঠে যেখানে কোনো জীবন্ত প্রাণ আজ আর টিকে থাকতে পারে না। এ সেই যুদ্ধ, যা শুরু করে আজ মানুষ নিজেও স্বয়ং আজ আর লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে পারছে না। মানুষ যুদ্ধ আবিষ্কার করেছে, আবিষ্কার করেছে সেই যুদ্ধের প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র, এমনকী তৈরি করেছে যুদ্ধের জন্য নায়ক, প্রতিনায়ক। কিন্তু আজকে সে নিজেই নিজের তৈরি করা যুদ্ধের বাইরে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে। গোটা বিশ্বেই— ভারত, চিন, রাশিয়া, ইউরোপ আর আমেরিকা— কোথাও আজ আর জীবিত মানুষ ভূপৃষ্ঠের যুদ্ধক্ষেত্রে নেই। সবাই এখন মাটির নীচের আশ্রয়স্থলে, যা চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধের প্রথম বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার অনেক আগেই পাতালের গভীরে সযত্নে পরিকল্পিত এবং নির্মিত হয়েছিল। মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহারের জন্য।

সমস্ত পরিকল্পনার মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে সেরা এবং একমাত্র যা এখনও পর্যন্ত কার্যকরী। মানব প্রজাতিকে এই মহাবিশ্বে বাঁচিয়ে রেখেছে। ওপরে ভূপৃষ্ঠে, বিস্ফোরণে বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একদা এক প্রাণবন্ত গ্রহের পৃষ্ঠতলে হামাগুড়ি দিয়ে, লাফিয়ে বা উড়ে মানুষের যুদ্ধ লড়ে চলেছে লীডিরা। আর নীচে, গ্রহের মাটির গভীরের পাতাল-আশ্রয়ে, মানুষের দল ক্রমাগত ঘর্মাক্ত পরিশ্রম করে বানিয়ে যাচ্ছে পর্যাপ্ত যুদ্ধাস্ত্র যাতে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে এই যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়া যায়।

 

পর্ব – ৬

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের দ্বিতীয় দিনতৃতীয় প্রহরের মধ্য ভাগ

 

“এটাই সেই প্রথম তলা!”, তালুকদারের গলায় একটা বেদনার অনুভূতি, “প্রায় ভূপৃষ্ঠ এসে গেলাম।”

“প্রায়। কিন্তু পুরোপুরি নয়,” মুখার্জি মাথা নাড়েন।

পিংলে ওদের দুজনকে নিয়ে সৈন্যদের ভিড় এড়িয়ে এক ধারে, প্রায় সুড়ঙ্গের মুখের কাছে, এগিয়ে যান।

“কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা লিফট ভূপৃষ্ঠের ওপর থেকে আমাদের জন্য কিছু নিয়ে নামবে,” পিংলে ব্যাখ্যা করেন, “দেখুন তালুকদার, আপনি হয়তো জানেন যে নিরাপত্তার খাতিরে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর পরই ওপর থেকে কোনো এক লীডিকে, যে মোটামুটি বেশ খানিকটা সময় ভূপৃষ্ঠে পার করেছে— তেমন কাউকে নীচে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এটা একটা সাধারণ ব্যপার আর এটা করা হয় কয়েকটি বিশেষ বিষয়ে তথ্য যাচাইয়ের জন্য। আমরা সাধারণত এটা ভিডিয়ো-পর্দার মাধ্যমে করে থাকি। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা একটু আলাদা। ওপরে প্রধান সমর-ঘাঁটিতে আমরা খবর পাঠিয়ে দিয়েছি। আজকের জিজ্ঞাসাবাদ হবে সরাসরি আর সামনাসামনি। সবসময় ভিডিয়ো-পর্দার উপর তো আর আমরা নির্ভর করে থাকতে পারি না। পারি কি?” একটু থেমে আবার বলতে শুরু করেন, “জানি লীডিরা খুবই ভালো কাজ করছে, কিন্তু আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে আমরা যেরকম চাইছি ঠিক সেভাবেই সবকিছু চলছে।”

ঘুরে দাঁড়িয়ে কমান্ডার পিংলে এবার মুখোমুখি হলেন তালুকদার আর মুখার্জির, বললেন “একটু পরেই লিফটে করে একটা এ-ক্লাস লীডিকে নামিয়ে আনা হবে। ওপাশেই একটা পর্যবেক্ষণকক্ষ আছে, মাঝখানে সীসার দেওয়াল দেওয়া, যাতে পরীক্ষকরা বিকিরণের সংস্পর্শে আসার থেকে রক্ষা পায়। এতে ওই লীডিটাকে সংক্রমণ মুক্ত, স্নান ইত্যাদির জন্য সময় বরবাদ হবে না। ওটা তো আবার এক্ষুনি ওপরে ফেরত যাবে। ওপরে ওর অনেক কাজ করার আছে।”

একটু দম নিয়ে আবার শুরু করেন কমান্ডার পিংলে, “দু-দিন আগেই একটা এ-ক্লাস লীডিকে নামিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। আমি নিজেই ওটা পরিচালনা করেছিলাম। আমাদের আগ্রহের কারণ ছিল চিনারা যে একটা নতুন অস্ত্র ব্যবহার করছে সেটা নিয়ে— একটা স্বয়ংক্রিয় মাইন— যেটা নাকি চলন্ত যে কোনো কিছুকে তাড়া করে ধরছে। সেনা সদরদপ্তর থেকে ওপরে আদেশ দেওয়া হয়েছিল যে মাইনটার সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন পাঠানোর। তা ওই এ-ক্লাস লীডিকে নামিয়ে আনা হয়েছিল তথ্যের জন্যে। ওই লীডির থেকে আমরা কিছু বিবরণ, রেকর্ডেড ফিল্ম আর তথ্য পেলাম। তারপর ওটাকে ওপরে ফিরে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে যখন ওটা পর্যবেক্ষণ কক্ষ ছেড়ে লিফটের দিকে যাচ্ছিল তখন একটা আশ্চর্য ব্যাপার নজরে এলো। সেই মুহূর্তে আমি ভেবেছিলাম যে—”

পিংলে থেমে গেলেন। একটা লাল আলো দপদপ করে উঠল।

কয়েকজন সৈন‍্যের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইঙ্গিত করলেন, তারপর আবার তালুকদারদের দিকে ঘুরে বললেন, “নীচে আসবার লিফটটা নামছে, চলুন আমরা এবার ভেতরে ঢুকে বসি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই লীডিকে ভেতরে নিয়ে আসবে।”

তালুকদার জিজ্ঞাসাবাদ কামরার মধ্যে ঢোকার সময় বিড়বিড় করেন, “এ-ক্লাস লীডি! আমি এদের খালি প্রদর্শনী-পর্দাতেই রিপোর্ট পড়তে দেখেছি।”

মুখার্জি সায় দিয়ে বলেন, “হ্যাঁ। এটা একটা অভিজ্ঞতা হতে চলেছে। জানেন তো এগুলো একদমই প্রায় ‘মানুষ’।”

জিজ্ঞাসাবাদ কামরার ভেতরে ঢুকে সীসার দেওয়ালের পেছনে নির্দিষ্ট আসনে তিন জনে বসে পড়েন।

কিছুক্ষণ পরে ভেতরের দেওয়ালের গায়ে একটা সংকেত আলো জ্বলে ওঠে। কমান্ডার পিংলে হাত দিয়ে কিছু একটা ইশারা করেন। সামনের দিকে যে সীসার দেওয়ালটা, তার ওপাশে একটা দরজা খুলে যায়। তালুকদার তাঁর সামনের ‘দৃশ্য-খিড়কি’-র মধ্যে দিয়ে তাকান। দেখতে পান একটা অবয়ব, ধাতব লম্বাটে ধরনের, ধীরে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে আসছে, হাত দুটো দু-দিকে স্থির লম্বমান। এরপর ধাতব শরীরটা একবার দাঁড়াল, দাঁড়িয়ে গিয়ে সামনের সীসার দেওয়ালটা খুঁটিয়ে দেখল, যেন স্ক্যান করছে। তারপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, যেন প্রশ্নের অপেক্ষা করছে।

পিংলে দৃশ্য-খিড়কির ঘোষক যন্ত্রের সামনে মুখ বাড়িয়ে বললেন, “আমরা বিশেষ কয়েকটি ব্যাপারে জানতে চাই। তবে সেই সম্বন্ধে প্রশ্ন করার আগে তোমার কি ভূপৃষ্ঠের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু রিপোর্ট করার আছে?”

“না। যুদ্ধ চলছে একই রকম,” লীডি স্বয়ংক্রিয় আর একঘেয়ে সুরে বলতে থাকে। “আমাদের কিছু দ্রুতগামী একাসনী বাহনের প্রয়োজন। আর আমাদের আরও বেশি সংখ্যক—”

“ঠিক আছে। এগুলো সবই লিখে রাখা হল,” কমান্ডার পিংলে মনে হল যেন অধৈর্য্য হয়ে পড়ছেন, “এবার আসি আসল যে কারণে এই সাক্ষাৎকার। আমরা যেটা এখন জানতে চাইছি সেটা হচ্ছে এইরকম— তোমাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ সাধারণভাবে প্রদর্শনী-পর্দার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকে। তোমাদের দেওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমেই আমাদেরকে অপ্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং পরিচালনা করতে হয়। যেহেতু আমাদের কেউই ভূপৃষ্ঠে সশরীরে যাই না। ওপরে কীভাবে কী হচ্ছে বা কেমন চলছে তা তোমাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাদের ধারণা করে নিতে হয়। নিজেরা স্বচক্ষে দেখতে কখনো যাই না। তোমাদের মাধ্যমেই আমাদের সবকিছু চলছে। এখন উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ চিন্তাভাবনা করেছেন যে এই কারণে বেশ কিছু ভুলের সম্ভাবনা থেকে যায় বা যাচ্ছে।”

“ভুল?” লীডি প্রশ্ন করে, “কীভাবে সেটা সম্ভব? প্রত্যেকটা প্রতিবেদন নীচে আপনাদের কাছে পাঠানোর আগে আমরা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে তবেই পাঠাই। আমরা সারাক্ষণ আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলি। জানানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটলেই সঙ্গে সঙ্গেই তা জানাই। এমনকী যদি কোনো নতুন অস্ত্র শত্রুপক্ষ ব্যবহার করতে শুরু করে তা-ও তৎক্ষণাৎ—”

“সে আমি জানি,” ভিউ স্লটের ঘোষক যন্ত্রের সামনে কমান্ডার পিংলে ঘোৎ ঘোৎ করে ওঠেন, “তাহলেও আমরা স্বচক্ষে একবার পরিদর্শন করতে চাই। ওপরে নিশ্চই এমন কিছু বিকিরণমুক্ত জায়গা থাকবে যেখানে মানুষ গিয়ে দাঁড়াতে পারবে, খানিক ঘোরাফেরা করতে পারবে। নাকি? ধরো, যদি আমরা কয়েকজন বা আমাদের অন্য কোনো দল বিকিরণ-প্রতিরোধী পোষাক পরে ওপরে উঠি, আর কিছুটা সময় ঘুরে ফিরে বেঁচে নীচে ফিরে আসতে চাই, তো পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি করার মতো খানিকটা সময় পাবো তো?”

যন্ত্রমানব একটু ইতস্তত করে জবাব দিতে। তারপর বলে, “মনে হয় না। আপনারা ওপরের বাতাসের নমুনা পরীক্ষা করে নিতে পারেন। তারপর নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু আপনারা নীচে চলে যাওয়ার পর গত আট বছর ধরে ওপরের পরিবেশ ক্রমাগত খারাপ হয়ে চলেছে। আপনারা ধারণা করতে পারবেন না ঠিক কী অবস্থা এখন ওখানে। কোনো জীবিত প্রাণীর পক্ষেই আজ ওপরে বেশিক্ষণ টিঁকে থাকা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলো মারাত্মক রকমের গতি সংবেদনশীল। এর ওপর নতুন যে মাইনসের কথা বললাম একটু আগেই, সেটা যে শুধু গতি সংবেদনশীল তা নয়। এটা শেষ পর্যন্ত তাড়া করে যায় যতক্ষণ পর্যন্ত না লক্ষ্য ভেদ করতে পারে। আর ভয়ংকর বিকিরণ তো ছড়িয়ে আছেই সমস্ত জায়গায়।”

“ও, ঠিক আছে তবে,” কমান্ডার পিংলে ঘুরে মুখার্জির দিকে তাকিয়ে একটা চোখ কুঁচকে অদ্ভুতভাবে তাকালেন একবার। তারপর দৃশ্য খিড়কির ঘোষক যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে লীডিকে বললেন, “এবার যেতে পারো। আমার এইটুকুই জানার ছিল।”

যন্ত্রমানব পেছন ফিরে যেতে যেতে একটু দাঁড়ায়। বলে, “প্রতি মাসেই ওপরের আবহাওয়ায় মারণকণার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। আর যুদ্ধের তীব্রতাও ক্রমশ—”

“বুঝলাম।” পিংলে উঠে দাঁড়িয়ে মুখার্জির দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। মুখার্জি একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিতেই পিংলে সেটা নিয়ে ঘোষক যন্ত্রটা টেনে ধরে বলে উঠলেন, “ও হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার। এই নতুন ধাতব বর্মটা পরীক্ষার জন্যে নিয়ে যাও। এই যে এই নমুনাটা। আমি এই যান্ত্রিক চিমটেটা দিয়ে দিচ্ছি— ধরে নাও।”

কমান্ডার পিংলে প্যাকেটটা যান্ত্রিক চিমটের দাঁতালো কব্জির ফাঁকে রেখে দিতেই ওটা ঘুরে সীসার দেওয়ালের ওপাশে লীডির দিকে এগিয়ে গেল। লীডির সামনে পৌঁছে দাঁতালো কব্জিটা খুলে গেল। লীডি ওর যান্ত্রিক নিরাবলম্বের মতো ঝুলে থাকা হাত দুটো দিয়ে প্যাকেটটা তুলে নিল। প্যাকেট খুলে ধাতব নমুনাটা বার করে ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে থাকে।

আর তারপর হঠাৎই ওটা একদম স্থির হয়ে গেল।

তীক্ষ্ণ নজরে দেখেছিলেন কমান্ডার পিংলে। এবার বললেন, “চলুন। সব ঠিক আছে এবার।” সামনের সীসার দেওয়ালের একটা জায়গায় চাপ দিতেই দেওয়ালটার একটা অংশ পাশে সরে গেল। আঁতকে উঠে কিছু বলার আগেই কমান্ডার আর মুখার্জি তড়িঘড়ি করে লীডির দিকে এগিয়ে গেল আর তালুকদার হাঁ হয়ে যাওয়া মুখে যেন নিজেকে বলে ওঠেন, “হে ভগবান! ওটা তো তেজস্ক্রিয়! – বিকিরণ ছড়াবে!”

 

পর্ব – ৭

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের দ্বিতীয় দিনতৃতীয় প্রহরের শেষ ভাগ

লীডি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে— কোনো নড়নচড়ন নেই— হাত দুটো বুকের কাছে তুলে ধাতব পাতটা বুকের সমান্তরালে ধরে রেখে দাঁড়িয়ে আছে স্থবিরের মতো। ওদিকে এবার নজরে আসে কামরাটার ওপাশের আরেকটা অংশ খুলে কয়েকজন সৈন্য ভিতরে ঢুকছে। আর ঢুকেই ওরা চারদিক থেকে ঘিরে ধরল লীডিকে। একজন একটা স্ক্যানার দিয়ে লীডির আপাদমস্তক বিকিরণ মাত্রা মাপতে শুরু করল।

তারপর কমান্ডারের দিকে ঘুরে একজন বললো, “ঠিক আছে কমান্ডার। এটা শীতের রাতের মতো একেবারেই ঠান্ডা।”

“ভালো। যদিও আমি জানতামই যে এরকমই থাকবে। তবুও আমি কোনোরকম ফাঁক রাখতে চাইনি।”

মুখার্জি এবার তালুকদারের দিকে ঘুরে বললেন “দেখলেন তো, এই লীডিটা একদমই গরম নয়। কোনোরকম বিকিরণ হচ্ছে না। অথচ দেখুন এটা কিন্তু এই মাত্রই সরাসরি ভূপৃষ্ঠের ওপর থেকে এলো। কোনোরকম সংক্রমণ মুক্ত করা বা স্নান-ও করানো হয়নি নামানোর আগে।”

“কিন্তু তার মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে?” তালুকদার বুঝতে না পেরে অবাক হলেন।

“দেখুন এমন ঘটনা এক-আধবার হলে মানা যেতে পারত। মানে, এই সময়ে ভূপৃষ্ঠের উপর ঘোরাফেরা করেও, কোনো বিশেষ একজন, বিকিরণে প্রভাবিত না হলেও হয়ে থাকতে পারে। সম্ভাবনার বিচারে সুযোগ নগন্য হলেও, ধরা যাক হল। কিন্তু এটা বারবার হতে থাকলে খুঁটিয়ে দেখতেই হয়। আর এই নিয়ে এটা দ্বিতীয়বার আমারই সামনে হল। আরও হয়েই থাকতে পারে অন্য কারও সামনে যে ব্যাপারটা নজর করেনি।”

“এটা দ্বিতীয় বার?”

“এর আগের জিজ্ঞাসাবাদের সময়েই আমি প্রথমবার এই ব্যাপারটা খেয়াল করি। ওই লীডিটাও ঠিক এরকমই ঠান্ডা ছিল। একদম এইরকম বিকিরণহীন আর ঠান্ডা। ভূপৃষ্ঠে যে তাপমাত্রা আর বিকিরণ-মাত্রার কথা আমরা জানি তাতে এ একেবারেই অস্বাভাবিক ঘটনা।”

মুখার্জি হাত বাড়িয়ে ধাতব পাতটা লীডির নিথর হাত থেকে টেনে নিয়ে টিপেটুপে একবার দেখে নিয়েই ওই নিথর হাতের স্থির অথচ শক্ত আঙুলগুলোর ভাঁজে ওইভাবেই আবার রেখে দিলেন।

“এই দ্বিতীয় জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যই ছিল নিশ্চিত হওয়া। একদম কাছ থেকে পরীক্ষা করা যাতে পরবর্তী পরিকল্পনার ব্যাপারটার আজকেই মীমাংসা করা যায়। যাকগে, এটা এক্ষুনি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নড়েচড়ে উঠবে। আমাদের এবার দেওয়ালের ওপাশে চলে যাওয়াই ভালো। চলুন।”

ওরা তিনজন দেওয়ালের ওপাশে চলে আসতেই সৈন্যরা অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

কমান্ডার পিংলে নিজের জায়গায় ফিরে মৃদু স্বরে বললেন, “আর দু-প্রহরের মধ্যে একটা প্রাথমিক তদন্তকারী দল ভূপৃষ্ঠে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে যাবে। আমরা সুড়ঙ্গ-বাহন ধরে উপরে উঠব— মানুষের প্রথম দল, যারা মাটির তলার শহরে চলে আসার আট বছর পর এই প্রথম উপরে উঠবে।”

“হয়তো এসবের কোনো মানে হয় না,” মুখার্জি বললেন, “তবে আমার নিজেরও গোটা ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে। কিছু একটা গড়বড়ো ব্যাপার চলছে। এই লীডিটা বলল উপরে কোনো জীবিত প্রাণী বাঁচবে না— ভয়ংকর উত্তাপে ঝলসে যাবে, অথচ ও নিজে সরাসরি নেমে আসার পরেও একদম ঠান্ডা! দুটো জিনিস পরষ্পরবিরোধী— অঙ্কটা ঠিক মিলছে না।”

তালুকদার মাথা নেড়ে ভিউ-স্লটের মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে ছিলেন স্থির হয়ে থাকা ধাতব-শরীরটা দিকে। একটু নড়াচড়ার আভাস আস্তে আস্তে পাওয়া যাচ্ছে এখন। শরীরটা বেশ কয়েক জায়গায় চোট খাওয়া। ধাতব শরীরটা কয়েক জায়গায় দেবে গেছে, বেঁকে গেছে আর উপরের দিকের আবরণ-ও কেমন যেন পুড়ে ঝলসে গেছে জায়গায় জায়গায়। এই লীডিটা নিশ্চয়ই বেশ অনেকদিন ধরে উপরে রয়েছে। বহু যুদ্ধ আর ধ্বংসের সাক্ষী। সেই ধ্বংসের পরিমাণ হয়তো এমনই যা কোনো মানুষ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না। বিস্ফোরিত, জ্বলন্ত এবং বিকিরণময় মৃত্যুর সেই জগতে এই লীডিটা চলেছে, ফিরেছে, যুদ্ধ করেছে, যেখানে প্রাকৃতিক জীবন আজ অস্তিত্বহীন।

আর অরণ্য তালুকদার কিনা স্বয়ং ওটাকে স্বহস্তে স্পর্শ করে এলেন!

“আপনিও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন,” কমান্ডার পিংলে হঠাৎ বলে ওঠায় তালুকদারের চিন্তা ভাবনার তরঙ্গ ছিঁড়ে গেল। উনি কমান্ডারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথাটার মানে বোঝার চেষ্টা করলেন। পিংলে তখনও বলে চলেছেন, “আমি চাই যে আপনিও আমাদের সঙ্গে চলুন। আমি ঠিক করলাম যে আমরা এই তিনজনেই যাবো। ঠিক আছে।” শেষ বাক্যটি প্রশ্নবোধক হলেই তালুকদার খুশি হতেন। কিন্তু না। কমান্ডার পিংলে বাক্যটা আদেশবাচকই রেখে দিলেন।

 

পর্ব

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের দ্বিতীয় দিনচতুর্থ প্রহরের মধ্য ভাগ

মনিদীপাকে কেমন যেন শুকনো আর অসুস্থ মনে হচ্ছিল। মুখে একটা ভয়ার্ত ভাব। গলায় খানিকটা যেন অনুযোগের সুর, “আমি জানি। তুমি ভূপৃষ্ঠের উপর যাচ্ছো। তাই না?” রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে অরণ্যের দিকে এগিয়ে আসে মনিদীপা। তালুকদার বসে পড়েন। চোখ সামনের দিকে প্রসারিত। মনিদীপার দিকে তাকাতে চাইছেন না।

তবু শেষ পর্যন্ত তাকালেন। কতটা বলা যাবে মনিদীপা কে একবার ভেবে নিলেন। শেষে বললেন, “দ্যাখো, এটা একটা গোপন প্রকল্প। সবকিছু তোমাকে বলা যাবে না।”

“তোমাকে বলতে হবে না। আমি জানি। তুমি যখন ঘরে ঢুকলে তখনই আমি টের পেয়েছি। তোমার মুখ-চোখের অবস্থাই বলে দিচ্ছে। অনেকদিন তোমার মুখের এইরকম অবস্থা দেখিনি। সেই পুরোনো দিনের মতো।”

মনিদীপা এগিয়ে আসে। খুব কাছে। বলে, “কীভাবে ওরা তোমাকে ওপরে পাঠাতে পারে বলো তো?” তালুকদার উত্তর না দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনিদীপা দু-হাত বাড়িয়ে তালুকদারের মুখটা ধরে নিজের দিকে টেনে আনেন। “অরণ্য, আমার দিকে তাকাও।”

এবার তালুকদার মনিদীপার দিকে তাকান। মনিদীপার দু-চোখে এক ভয়ের ছায়া দেখতে পান অরণ্য তালুকদার। সেখানে তখন এক সব হারানোর ভয়।

মনিদীপা বলেন, “ওখানে কেউ বাঁচে না। দ্যাখো, এটা, এটাতে দ্যাখো।”

ফোল্ডেবল সিলিকন-নিউজপ্যাডটা তুলে তারিখটা পালটে সপ্তাহ খানেক পেছনের একটা তারিখের নিউজফিডটা খুলে মনিদীপা এগিয়ে ধরে অরণ্য তালুকদারের দিকে। “দ্যাখো, এই ছবিগুলো দ্যাখো। ভারতবর্ষ, চিন, এশিয়া, ইউরো-এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ আর, আর আমেরিকা— সব, সব ধ্বংসস্তূপ, কিচ্ছু বেঁচে নেই। এসবই তো আমরা রোজ রোজ প্রদর্শনী-পর্দায় দিনের পর দিন ধরে দেখে আসছি। সব— সব নষ্ট হয়ে গেছে, বিষাক্ত হয়ে গেছে গোটা পৃথিবী। আর ওরা তোমাকে কিনা এর পরেও ওপরে পাঠাচ্ছে! কোনো জীবিত প্রাণী দূরে থাক যেখানে একটা আগাছা কিংবা একটা ঘাস শুদ্ধে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই— সেখানে পাঠাচ্ছে ওরা। কেন? ওরাই তো সব ধ্বংস করল, করেনি ওরা? বলো?”

তালুকদার উঠলেন। “এটা একটা আদেশ। আমাকে আদেশ করা হয়েছে যে প্রাথমিক তদন্তকারী দলের সঙ্গে যোগ দিতে। ব্যাস। এইটুকুই আমি জানি।”

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। দৃষ্টি মনিদীপাকে পেরিয়ে দূরে হারিয়ে গেছে। তারপর মনিদীপার দিকে ফিরে বাড়িয়ে দেওয়া ফোল্ডেবল সিলিকন-নিউজপ্যাডটা তুলে নিয়ে তাকিয়ে রইলেন আরও কিছুটা সময়। তারপর নিজের মনেই যেন বিড়বিড় করে বলে ওঠেন, “এগুলো তো সবই বাস্তব মনে হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ, এই মৃত্যুশীতলতা, এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া সব, সবকিছু। এগুলোর সবই তো আমরা দিনের পর দিন দেখে আসছি। প্রত্যেকটা রিপোর্ট, ছবি, ভিডিয়ো, এমনকী বাতাসের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল— সবকিছুই তো এই কথাই বলে আসছে। আমরা যদিও নিজেরা নিজেদের চোখে কখনো গিয়ে দেখিনি। অন্তত প্রথম কয়েক মাসের পর থেকে আর …”

মনিদীপা অবাক হয়ে যায়। “এসব কী বলছ তুমি?”

“কিছু না,” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিউজপ্যাডটা নামিয়ে রাখেন তালুকদার, “আমাকে ঘুম থেকে উঠেই সকাল সকাল বেরোতে হবে। চলো ওঠা যাক।”

মনিদীপা হাত নামিয়ে নেন। সরে দাঁড়ান একটু। তারপর শক্ত মুখে তীক্ষ্ণ স্বরে বলেন, “তোমার যা খুশি তাই করো। এমনিতে তো আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় যে চলো সবাই মিলে একসঙ্গে ওপরে যাই। তারপর মরলে মরব। এই পাতাল শহরে পোকা-মাকড়ের মতো রোজ ধীরে ধীরে মরার চেয়ে যা হবার একবারেই হয়ে যাক।”

অরণ্য তালুকদার অবাক হয়ে গেলেন। এর আগে কখনও বোঝেননি যে মনিদীপা এই পাতাল শহরের জীবনে কতটা বিরক্ত। ওরা সবাই কি একই রকম? ওই সব শ্রমিকেরা যারা দিনের পর দিন দিবারাত্রি খেটে চলেছে কারখানাগুলোয়? ওই সমস্ত ফ্যাকাসে অথচ ঘাড় নীচু করে কাজ করে চলা নারী ও পুরুষ, যারা এই বিবর্ণ আলোয় কৃত্রিম খাবার খেয়ে পরিশ্রম করে চলেছে?

মনিদীপাকে বোঝাতে চাইলেন তালুকদার, “তুমি এতটা হতাশ হচ্ছো কেন?”

মনিদীপার মুখে একটা মৃদু একটা হাসি দেখা গেল। “আমি হতাশ হচ্ছি কারণ আমি জানি যে তুমি আর কখনোই ফিরবে না।” মুখ ঘুরিয়ে নিলেন মনিদীপা, তাড়াতাড়ি সরে গেলেন সামনে থেকে। কান্না ভেজা স্বরে শুধু বললেন, “আমি জানি, তুমি এই যে ভূপৃষ্ঠের উপর যাবে আর কখনোই তোমাকে দেখতে পাবো না।”

একটা ধাক্কা খেলেন যেন অরণ্য তালুকদার। পেছন থেকে দেখতে পাচ্ছেন নিঃশব্দ কান্নার দমকে মনিদীপার কাঁধদুটো কেঁপে কেঁপে উঠছে। “কী বলছ তুমি? কী করে এমন কথা বলতে পারলে তুমি দীপা?” মনিদীপা উত্তর দেন না। শুধু নিঃশব্দে কেঁদে চলেন।

 

পর্ব

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের তৃতীয় দিনপ্রথম প্রহরের শুরু

বাইরে কিছু একটা আওয়াজ হচ্ছে বেশ জোরদার। তালুকদারের ঘুম ভেঙে গেল। বাইরের থেকে তখন জন-ঘোষণার কর্কশ আওয়াজ কানে এসে ধাক্কা মারছিল। ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় উঠে পড়লেন তালুকদার।

বিশেষ ঘোষণা! বিশেষ ঘোষণা! ভূপৃষ্ঠ থেকে সৈন্যবাহিনীর বিশেষ সংবাদদাতার পাঠানো প্রতিবেদন: চিনা সেনার ভয়ংকর আক্রমণ! ব্যবহার করেছে এক নতুন শক্তিশালী অস্ত্র! পশ্চাদপসরন আমাদের অগ্রগামী বাহিনীর! সমস্ত কর্মীবাহিনীদের অনুরোধ সত্বর কারখানায় উপস্থিত হওয়ার জন্য জরুরি অবস্থা জারি হচ্ছে!”

উঠে বসলেন তালুকদার। চোখ রগড়ে নিতে নিতে ঘোষণাটার মর্মার্থ বুঝতে পেরেই লাফিয়ে বিছানা থেকে নামলেন। মুহূর্তের মধ্যে চালু করলেন ভিডিয়োফোনটা। পর্দায় মুখার্জি ভেসে উঠতেই বললেন, “কী ব্যাপার মুখার্জি? এই নতুন আক্রমনের ব্যাপারটা কী? আমাদের আজকের পরিকল্পনা কি বাতিল হচ্ছে?”

পর্দায় মুখার্জিকে ধীর স্থিরভাবে ডেস্কের পেছনে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সামনে গাদাগুচ্ছের ফাইল আর সিলিকন-শিটের বোঝা। নোটপ্যাডে কিছু লিখছিলেন মুখার্জি। একটা ফাইল তুলে নিয়ে ভিডিয়োফোনে বললেন “না। আমরা যাচ্ছি। তুমি চলে এসো ঝটপট।”

“কিন্তু—”

“তর্ক করার সময় এখন নয়, তালুকদার,” হাতে ধরা কয়েকটা প্রতিবেদন মুখার্জি ডলে মুচড়ে পাশের বর্জ্যপেটিতে ফেলে দিলেন দেখা গেল, “ওগুলো সরকারি প্রচার খালি। বানানো খবর। ও নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে জলদি চলে এসো।” ভিডিয়োফোন নীরব হয়ে গেল।

তালুকদার তাড়াহুড়ো করে তৈরি হতে লাগলেন। মাথায় নানারকম চিন্তা ভেসে উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছিল। কেমন যেন সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল তালুকদারের।

আধঘণ্টা পরে দ্রুতিবাহন থেকে প্রায় লাফিয়ে নেমে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে ঢুকে পড়লেন অফিস বাড়িটায়। করিডোর ভর্তি লোকজনে— উর্দীপরা পুরুষ আর নারী এদিক ওদিক দ্রুত গতিতে চলাফেরা করছে। তালুকদার চেনা পথ ধরে সোজা ঢুকে পড়লেন মুখার্জির অফিস কামরায়।

ওকে দেখেই মুখার্জি উঠে পড়লেন। “আরে এসো, এসো। চলো, কমান্ডার পিংলে আমাদের জন্য বাইরে যাওয়ার স্টেশনে অপেক্ষা করছে।”

ওরা অফিস বাড়িটার বাইরে বেরিয়ে সুরক্ষাবাহিনীর একটা গাড়িতে চেপে বসলেন। গাড়িটা মনোরেল ট্র্যাক ধরে সাইরেন বাজিয়ে ছুটতে লাগল। ভিড়টা সরে সরে গিয়ে ট্র্যাক ফাঁকা করে দিচ্ছিল।

এতক্ষণে সুযোগ পেয়ে তালুকদার ওর পুরোনো প্রশ্নটা আবার করেন। “এই আক্রমণের ব্যাপারটা আসলে কী?”

মুখার্জির নজর সামনে। কাঁধ ঝাকিয়ে বললেন, “মনে হচ্ছে আমরাই ওদের বাধ্য করলাম। পুরো ব্যাপারটা দেখা যাচ্ছে একেবারে টাগরায় গিয়ে ঠেকেছে।”

গাড়িটা বহির্গমন স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত সুড়ঙ্গে গিয়ে দাঁড়াতেই দুজনেই লাফিয়ে নেমে পড়লেন। সামনেই একজোড়া স্বয়ংচালিত সিঁড়ি দুপাশে দিয়ে ওঠানামা করছে। ওপরে ওঠারটা ধরলেন। এবার সুড়ঙ্গের পূর্ব প্রান্তের স্টেশন। একটু পরেই সুড়ঙ্গ-বাহন ধরে দ্রুত গতিতে উঠতে লাগলেন প্রথম তলার দিকে।

প্রথম তলায় পৌঁছে ওরা অবাক করা এক দৃশ্যের মুখোমুখি হল। একদল সৈন্য ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুরো তলাটা জুড়ে। কেউ বিকিরণ-প্রতিরোধী সীসার লাইনিং লাগানো উর্দী পড়ছে, বা একে অপরের সঙ্গে চীৎকার করে কথা বলছে, উত্তেজনায় সরগরম চারদিক। এক জায়গায় অস্ত্রশস্ত্র গাদা করে রাখা। উর্দী পরা হতেই সবাই এক এক করে এসে সেগুলো হাতে তুলে নিচ্ছে। এদিক থেকে ওদিকে বিভিন্ন আদেশ ঘুরছে, পালিত হচ্ছে।

তালুকদারের মনে হল সৈন্যদের প্রস্তুতির বহরটা একবার দেখে নেওয়া দরকার। এই মুখার্জি আর পিংলে দুজনে মিলে ভূপৃষ্ঠে গিয়ে ঠিক কী করতে চাইছে তার একটা আন্দাজ হয়তো তাতে পাওয়া যাবে। ওদের মধ্যে থেকে একজন সৈনিককে তালুকদার খুঁটিয়ে নজর করেন। দেখলেন সৈনিকটি সঙ্গে রেখেছে ভয়ংকর বেন্ডার পিস্তল আর একদম নতুন বেরোনো বেঁটে ভোঁতা নলের মাল্টি–লেভেল লেজার বন্দুক। প্রত্যেকের কোমরে ঝুলে আছে স্ট্যাটিক ডিসচার্জ সিলিন্ডার। এরপরেও বেশ কিছু সৈন্যের মুখচোখে ভয়ের আভাস তাকে হতবাক করে দিল।

মুখার্জিও লক্ষ করছিলেন। ওর মুখ চোখের হাবভাব দেখে কাঁধে একটা আলতো চাপড় মেরে বললেন, “মনে হয় না আমরা কোনো ভুল করছি। তবুও সব রকমের সাবধানতা রাখাই ভালো।”

কমান্ডার পিংলে ভেতরের দিকে কোথাও ছিলেন। ওদের দেখে এগিয়ে এলেন এবার। “এই তো, আপনারা এসে গেছেন দেখছি। আমাদের আজকের পরিকল্পনাটা হচ্ছে প্রথমে আমরা শুধু তিনজনে ওপরে উঠব। ঠিক আছে? শুধু আমরা তিনজন। সৈন্যরা আসবে আমাদের পেছনে। পনেরো মিনিট পরে ওরা উঠবে। ঠিক আছে?”

তালুকদার মাথা নাড়লেন। বুঝেছেন অনেকটাই, কিন্তু কিছু জিনিস এখনো পুরো পরিষ্কার নয়। চিন্তিত স্বরে প্রশ্ন করলেন, “কিন্তু আমরা উপরে উঠে লীডিদের কি বলব? আমাদের তো কিছু একটা বিশেষ কারণ দেখাতেই হবে, না কি?”

“কেন? বলব এই নতুন চিনা আক্রমনের ব্যাপারটা বোঝার দরকার আছে,” কমান্ডার পিংলের গলায় ঠাট্টার আভাস পাওয়া গেল, “এই যে কালকের জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত পেরোনোর আগেই এমন ভয়ংকর চৈনিক আক্রমনের খবর নেমে এলো, এ তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এটা তো একবার সরেজমিনে খুঁটিয়ে নিজেদের চোখে দেখা দরকার, না কি?”

“কিন্তু তারপর?”

“ওটা ওদের উপর ছেড়ে দেওয়া যাক। এখন চলুন। অভিযান শুরু করা যাক।”

 

পর্ব – ১০

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের তৃতীয় দিনদ্বিতীয় প্রহরের প্রথম ভাগ

ভূপৃষ্ঠে পৌঁছোনোর জন্য ওরা যেটায় চেপে রওনা হল সেটা একটা ছোটো গাড়ি— এই জনা পাঁচেক বসবার মতো। প্রধান সুড়ঙ্গটা চৌকো মতোন— চারদিকের দেওয়াল ধরে ওঠানামা করে মালবাহী গাড়ি— এগুলো সব মনোরেলের উপরে চৌম্বক ক্ষেত্রবলের সাহায্যে চলে। আর সুড়ঙ্গের মাঝখান দিয়ে দু-সারি মহাকর্ষরোধী পরিবহন ব্যবস্থা— একটা ওপরে ওঠার জন্য ব্যবহার করা হয়, আর অন্যটা নীচে নামার জন্য। তালুকদার মাঝে মাঝেই নীচের দিকে তাকাচ্ছিল। অতল প্রসারিত সেই সুড়ঙ্গ প্রতি মুহূর্তে নীচের দিকে গভীরতা বাড়িয়ে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে বেড়ে চলছিল মনিদীপার সঙ্গে ওর দূরত্ব। বিকিরণ-প্রতিরোধী পোষাকের নীচে তালুকদার ক্রমশ ঘেমে চলেছেন। বারবার হাত ঢুকিয়ে কাঁপা কাঁপা অনভিজ্ঞ আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে নিচ্ছেন পোষাকের ভেতরে রাখা বেন্ডার পিস্তলটাকে। কেন এরা তাকে সঙ্গে নিল ভূপৃষ্ঠে যাওয়ার জন্যে? তার পেশাদারী অভিজ্ঞতা বা কাজের দায়রা, কোনো দিক থেকে কোনোভাবেই এই অভিযানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলছে না। কোনো যথোপযুক্ত কারণ তালুকদার খুঁজে পেলেন না তাঁর এই অভিযানের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সপক্ষে। সম্ভাবনার বিচারে একমাত্র সময়ের সংযোগ ছাড়া আর কিছুই তো তালুকদারের নজরে আসে না। মুখার্জি তাকে ডেকেছিলেন বিভাগীয় উপপ্রধান হিসেবে আলোচনার জন্য। আর কমান্ডার পিংলে ওই জিজ্ঞাসাবাদ কামরায় কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎই ওকে মুহূর্তের উত্তেজনাতেই, হয়তো কিছুই না শুধু কথার পিঠে কথার মতো করে ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ফেলেন। আর এখন, উনি ওদের সঙ্গে উঠে চলেছেন ভূপৃষ্ঠের দিকে— ওঠার গতি আর গত আট বছরের বাসস্থান বা প্রিয়তমা স্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব— দুটোই বেড়ে চলেছে প্রতিটি মুহূর্ত পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।

গত আট বছর ধরে মনের ভেতর জমে থাকা গভীর একটা ভয় তাকে ক্রমশ ঘিরে ধরে। বিকিরণ, নিশ্চিত মৃত্যু, বিষ্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পৃথিবীর বিষাক্ত আর ঘাতক আবহাওয়া…।

ওদের গাড়িটা যত উপরে উঠতে থাকে, তালুকদার চোখ দুটো বন্ধ করে ততটাই জোরে হাতল দুটো চেপে ধরেন। প্রতি মুহূর্তে ওরা ভূপৃষ্ঠের আরও কাছে এগিয়ে চলেন। প্রথম জীবিত প্রাণীর দল যারা সুড়ঙ্গ ধরে প্রথম তলের বাধা পেরিয়ে সীসার আর পাথরের প্রতিরোধের আড়াল ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ভূপৃষ্ঠে পা রাখতে— আট বছর পর এই প্রথম। এত বছরের চেপে রাখা ভয়ের স্রোতের ধাক্কা একের পর এক এসে তালুকদারের হৃৎকম্পন-মাত্রা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলল। সামনে নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানির বিষয়ে তালুকদারের কোনোই সন্দেহ নেই। পাতাল শহরের জীবনে দিনের পর দিন তো ওপরের ভূপৃষ্ঠের অবস্থার ক্রমাবনতির বিভিন্ন প্রমাণ বারের পর বার বিভিন্ন মাধ্যমে দেখেছেন। দেখার পর আর কোনো সন্দেহ থাকার কথাও নয়। ওই ভগ্নস্তূপ শহর, মাইলের পর মাইল পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ, আকাশ ঢেকে রাখা কালো ধূলোময় মেঘের চাদর…

কমান্ডার পিংলে গলার আওয়াজে আবার বাস্তবে ফিরে আসেন তালুকদার। “আর বেশিক্ষণ লাগবে না। আমরা প্রায় পৌঁছে গিয়েছি। মনে রাখবেন ভূপৃষ্ঠের প্রথম নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র কিন্তু জানে না যে আমরা আসছি। আমিই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র-কে কোনোরকম সংকেত পাঠাতে বারণ করে দিয়েছি।”

গতিবেগ এবার আরও বাড়ল ওপরে ওঠার। সুড়ঙ্গের দেওয়াল এখন অদৃশ্য— সাঁ সাঁ করে একটা চাপা আওয়াজ করে গাড়িটা তীব্র গতিতে ওপরে উঠছে। তালুকদারের মাথা ঘুরতে লাগল। উনি চেয়ারের পেছনের নরম অংশে মাথাটা রেখে চোখ বুজে রাখলেন। গাড়িটা উঠতে থাকল— ওপরে, আরও ওপরে।

তারপর গাড়িটা থামল। তালুকদার চোখ খুলে চাইলেন এবার।

ওরা এখন যেখানে সেটা একটা ছোটো স্টেশনের মতো। সামনেই লাগোয়া একটা বেশ বড়োসড়ো হলঘরের মতো, কৃত্রিম আলোয় উদ্ভাসিত একটা বিশাল এক গুহা বলা যেতে পারে— বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ভর্তি, সারির পর সারি যতদূর দেখা যাচ্ছে মালপত্রে গিজগিজ করছে। আর ওই মালপত্রের সারির দিকে দেখা যাচ্ছে লীডিরা নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে, হাইড্রলিক্ ট্রাক আর ঠেলাগাড়ির মতো কিছুতে মালপত্র ওঠাচ্ছে নামাচ্ছে, গাড়িগুলোর সাহায্যে এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে যাচ্ছে— যথেষ্ট তেল দেওয়া মসৃণ কলের মতো নিঃশব্দে সব কিছু ঘটে চলেছে।

মুখার্জিই আঙুল দিয়ে প্রথম দেখালেন। ওঁর মুখ দেখা গেল বেশ খানিকটা শুকিয়ে গেছে, “ওই তো ওখানে লীডিরা! আমরা সত্যিই ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে গেছি!”

লীডিরা কিন্তু নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে বিশাল এই গুহার মতো গোডাউনে। যত রাজ্যের অস্ত্রশস্ত্র গোলা-বারুদের বাক্স-প্যাটরা একদিক থেকে অন্যদিকে সরাচ্ছে, ওঠাচ্ছে, নামাচ্ছে। এইগুলো সমস্তই অস্ত্রশস্ত্র গোলা-বারুদ ভর্তি যা পাতাল শহরে উৎপাদন করে সুড়ঙ্গ দিয়ে ওঠানো হয়েছে এই ভূপৃষ্ঠে। প্রতিদিনে বেশ কয়েকবার এগুলো ওঠানো হয়। আর তালুকদার নিজেই এই সমস্ত পরিকল্পনার ভারসাম্য বজায় রাখার কাজেই ব্যস্ত থাকেন। বোঝা যাচ্ছে এটা একটা প্রাথমিক সরবরাহ কেন্দ্র। এরকম আরও অনেক সরবরাহ কেন্দ্র ছড়িয়ে আছে গোটা উপমহাদেশ জুড়ে। যেগুলো প্রত্যেকটা কোনো না কোনো এক সুড়ঙ্গ দিয়ে অসংখ্য পাতাল শহরের কোনো একটার সঙ্গে যুক্ত। সরবরাহ এবং যুদ্ধ প্রতিনিয়ত ক্রমাগত— চলছে— চলবে, আরও কতদিন কে জানে!

তালুকদার এবার একটু ঘাবড়ে গিয়েছেন মনে হল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছেন। ওরা এই মুহূর্তে সবাই ভূপৃষ্ঠের উপর! এই সেই জায়গা যেখানে তারা জন্মেছেন, বড়ো হয়েছেন। এবং এই সেই জায়গা যেখানে এখন যুদ্ধ চলছে— ভয়ংকর যুদ্ধ।

পাশ থেকে কমান্ডারের আওয়াজ কানে এলো, “চলে আসুন। ওই দেখুন একজন ‘বি’-ক্লাস লীডি রক্ষী আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।”

ওরা তিনজনেই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একজন ‘বি’-ক্লাস লীডি-রক্ষী ওদের দিকে এগিয়ে এলো। মসৃণ এবং যান্ত্রিক পা চালিয়ে লম্বা লম্বা পদক্ষেপ নিয়ে হুড়মুড় করে তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর হাতে রাখা একটা স্ক্যানার তুলে ধরে তাদের তিনজনেরই আপাদমস্তক পরীক্ষা করতে শুরু করল। অন্য হাতের অস্ত্র সোজা তাদের দিকে তুলে রাখা।

কমান্ডার পিংলে পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত ঝেড়ে বলেন, “আমরা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ভা-১৬ থেকে আসছি। এখানে ‘এ’-ক্লাস লীডি কে আছে? এক্ষুনি তাকে এখানে ডাকুন।”

সামনে দাঁড়ানো লীডিটা একটু হকচকিয়ে যায়। ইতস্তত করে। ওদের চোখে পড়ে আরও কিছু ‘বি’-ক্লাস লীডি-রক্ষী এদিক ওদিক থেকে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। প্রত্যেকের হাতের অস্ত্র তুলে ধরা ওদের উদ্দেশ্যে। মুখার্জি পরিস্থিতি দেখে কমান্ডার পিংলের দিকে তাকান।

কমান্ডার পিংলের মুখের একটা পেশিও পরিবর্তিত হয় না। গলার আওয়াজ ওপরে তুলে ধমকের ভঙ্গিতে হাঁক পাড়েন, “চুপ করো। তোমাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তা পালন করো।”

ধমকে মনে হয় কাজ হল। সামনের ‘বি’-ক্লাস লীডি-রক্ষীটা হকচকিয়ে গিয়ে একটু দোনোমনো করে, তারপর দু-এক পা পিছিয়ে যায়। ঠিক সেই সময়ে একটু দূরে হলঘরটার শেষ প্রান্তের দিকে একটা স্লাইডিং দরজা পাশের দিকে সরে গিয়ে খুলে যায়। ওরা ওখানে দাঁড়িয়েই দেখতে পায় দুটো ‘এ’-ক্লাস লীডি বেরিয়ে এসে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। দুটোরই শরীরের সামনের দিকে বুকের কাছাকাছি জায়গায় সবুজ রংয়ের একটা করে চওড়া ডোরা দাগ।

কমান্ডার পিংলে সঙ্গীদের দিকে ইশারা করে বলেন, “এরা ভূপৃষ্ঠ পরিষদের সদস্য। ‘এ’-ক্লাস লীডি। মনে রাখবেন আমরা এখন মাটির উপর। ঠিক আছে? তৈরি থাকুন। ওকে?”

‘এ’-ক্লাস লীডি দুটো এগিয়ে আসে। ওদের চলার ভঙ্গিতে একটা সতর্কতা নজরে আসে তালুকদারের। ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়েও কোনো কথা বলে না। শুধু যান্ত্রিক চোখ ঘুরিয়ে ওদের তিনজনের আপাদমস্তক নজর করে চলে।

কমান্ডার পিংলে শেষে বলে ওঠেন, “আমি কমান্ডার পিংলে। ভা-১৬ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে আসছি। আমাদের উদ্দেশ্য—”

শেষ করতে দেয়না পিংলেকে। থামিয়ে দিয়ে একটা লীডি বলে ওঠে, “কি আশ্চর্য! আপনারা তো জানেন যে এখানে আপনাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। গোটা পৃথিবীর মাটি আপনাদের জন্য ঘাতক হয়ে গেছে। আপনারা যদি আরও কিছুটা সময় এখানে থাকেন তাহলেই মারা যাবেন।”

কমান্ডার পিংলে অপেক্ষা করছিলেন। লীডিটা চুপ করতেই বলে ওঠেন, “আমরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েই এসেছি। এই পোষাক আমাদের রক্ষা করবে। তা সে যাই হোক। সেটা নিয়ে তোমাদের মাথা ঘামাতে হবে না। এই মুহূর্তে যেটা আমরা চাইছি সেটা হল ভূপৃষ্ঠ পরিষদের সঙ্গে একটা মিটিং। এবং সেটা এক্ষুনি। যাতে আমি এক্ষুনি এই মুহূর্তের এখানকার পরিবেশ এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি বুঝে নিতে পারি। সেটা কতক্ষণে ব্যবস্থা করা যাবে?”

“দেখুন আপনারা মানুষেরা এখানে মোটেও বেশিক্ষণ টিকবেন না। এছাড়াও গতকাল থেকেই চায়নার নতুন আক্রমনের লক্ষ এই এলাকাটা। এ জায়গাটি এই মুহূর্তে বিপজ্জনকতার মাপদণ্ডে সবচেয়ে উপরে,” মিটিং এর ব্যাপারে কোনো উচ্চবাক্য করে না লীডিটা।

কিন্তু কমান্ডার পিংলেও নাছোড়। “এ সব আমরা জানি। তোমরা দয়া করে তাড়াতাড়ি পরিষদীয় মিটিং-এর ব্যবস্থা করো।” কথাটা বলে কমান্ডার পিংলে সামনের লীডি দুটোকে যেন অগ্রাহ্য করেই চারদিকে নজর বোলাতে শুরু করলেন। গোটা হলঘরটা কৃত্রিম আলোয় পরিপূর্ণ আলোকিত। যদিও আলোর উৎস কোথাও কিছু নজরে আসছে না। সম্ভবত ছাদের নীচে বা দেওয়ালের খাঁজে ওগুলো লুকোনো আছে। একটু ভেবে নিয়ে পিংলে প্রশ্ন করলেন, “এখন এখানে দিন না রাত?”

প্রশ্নের ধারা হঠাৎ পরিবর্তন হওয়াতে একটু থমকে গেলেও দ্বিতীয় লীডিটা উত্তর দেয়, “এখন রাত। তবে আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ভোরের আলো ফুটবে।”

তালুকদারের সময়ের হিসেব গুলিয়ে যায়। গত আট বছর ভূগর্ভস্থ পাতাল শহরের কৃত্রিম পরিবেশের প্রহর ভিত্তিক সময়ের সঙ্গে ভূপৃষ্ঠের সময় পার্থক্য তার হিসেবের বাইরে ছিল।

কমান্ডার পিংলে কিন্তু মাথা নাড়েন। বলেন, “সেক্ষেত্রে আরও অত্যন্ত ঘণ্টা দুয়েক আমরা থাকব। আহা, ভোর! সূর্যোদয়! কতদিন দেখিনি। ইয়ে, তোমরা কি আমাদের একটা এমন জায়গা দেখাতে পারো যেখান থেকে আমরা সূর্যোদয় দেখতে পাবো?”

লীডিরা দুজন পরস্পরের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করে। যান্ত্রিক দৃষ্টি।

একজন তারপর বলে, “সূর্যোদয়ের সেই দৃশ্য কিন্তু আপনাদের জন্যে কিছু আনন্দদায়ক হবে না। আপনারা নিশ্চয়ই ফোটোগ্রাফ বা ভিডিয়ো দেখেছেন। আপনারা তো জানেনই যে আপনারা কী দেখতে পাবেন। ভেসে থাকা ধুলোর মেঘে সূর্যের আলো ঢাকা পড়ে গেছে। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে রয়েছে। সম্পূর্ণ ভূপৃষ্ঠ ধ্বংস হয়ে গেছে। আপনারা যা ছবিতে বা ভিডিয়োতে দেখেছেন প্রকৃত অবস্থা আরও খারাপ এবং ভয়ংকর।”

“সে যেমনই হোক, আমরা সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করবো। তোমরা কি দয়া করে ভূপৃষ্ঠ পরিষদকে খবর দেবে এবার?”

 

পর্ব১১

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের তৃতীয় দিনপৃথিবীতে ভোর রাত

“আসুন আপনারা, এইদিকে।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও লীডিরা এবার ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এগোয়। এগিয়ে যায় এই গোডাউন হলঘরটার একদম দূরের দিকটার দেওয়ালের দিকে। ওরা তিনজন লীডি দুজনের পেছনে পেছনে ওদেরকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলেন। ওদের ভারী জুতোর আওয়াজ কংক্রিটের মেঝেতে ধ্বনিত হয়ে গোটা হলঘরটার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে । খানিক গিয়ে হলঘরটার দেওয়ালের একদম কাছে গিয়ে লীডিরা দাঁড়িয়ে পড়ে। সামনে একটা দরজা।

“এটা পরিষদ ভবনের প্রবেশ দরজা। কামরার ভেতরে অনেকগুলো জানালা। কিন্তু এখনও বাইরে অন্ধকার আছে। আপনারা এখন কিছুই দেখতে পাবেন না। তবে ঘণ্টা দুয়েক পরে—”

পিংলে আদেশের সুরে বাধা দিয়ে বললেন “দরজা খোলো।”

দরজার পাশে একটা কি-প্যাড। তাতে সংকেত-শব্দ লিখতেই দরজাটা ভেতরের দিকে ঢুকে গিয়ে একটা প্রবেশ পথ উন্মুক্ত করে দিল। ওরা তিনজন এক এক করে ভেতরে ঢুকলেন। এই ঘরটা খুব একটা বড়ো নয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মাঝখানে একটা গোল টেবিল, চারিদিক ঘিরে চেয়ার। তিন দেওয়াল জুড়ে থাক থাক কম্পিউটার আর বড়ো বড়ো পর্দা। ওরা তিনজন তিনটে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। লীডি দুজন ওদের সামনের দিকে দুটো চেয়ারে বসল।

ওদের একজন এবার বলল, “পরিষদের বাকি সদস্যরা এখুনি আসছে। ওদের খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ওরা যত তাড়াতাড়ি পারে এখানে এসে পৌঁছোবে। কিন্তু আমরা আপনাদের আবার নীচে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।” ওরা তিনজন চুপ করে রইল। লীডিরা ওদের নীরবতা লক্ষ করল। তারপর আবার বলল, “এখানকার অবস্থার সঙ্গে আপনারা কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারবেন না। এমনকী আমাদেরও বিভিন্ন অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়। আপনারা কীভাবে এটা আশা করেন যে আপনারা এটা পারবেন?”

এই সময়ে ভূপৃষ্ঠ পরিষদের বাকি সদস্যরা এসে পৌঁছায়। ঘরে ঢুকেই পরিষদের নেতা এগিয়ে আসেন কমান্ডার পিংলের দিকে। কমান্ডার পিংলের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনাদের এভাবে আসাটা আমাদের আশ্চর্য এবং হতবাক করে দিয়েছে। যদিও আপনারা যা আদেশ করবেন আমরা সেটাই মানব। রোবটিক্সের প্রাথমিক সূত্রের বাইরে আমরা যেতে পারি না। তবু আপনাদের ভালোর জন্যই আবারও বলছি যে যদি আপনারা এখানে ভূপৃষ্ঠের ওপর আর বেশিক্ষণ থাকেন তো—”

কমান্ডার পিংলে এবার অধৈর্য হয়ে বললেন, “আমরা এসবই জানি। তবু আমরা এখানে আরও থাকতে চাই। অন্তত সূর্যোদয় পর্যন্ত।”

এবার লীডিরা থমকে যায়, “ঠিক আছে। যা আপনাদের ইচ্ছে।”

সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। তালুকদারের মনে হয় যেন লীডিরা নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছে। যদিও কোনো শব্দ ওদের তিনজনের কারোরই কানে আসে না।

খানিক পরে লীডিদের দলনেতা আবার কথা বলে, “দেখুন, আপনাদের ভালোর জন্যই আপনাদের উচিত এক্ষুনি নীচে নেমে যাওয়া। আমরা এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে এলাম যে আপনারা ভুল করছেন। এতে আপনাদের ক্ষতি হবে।”

কমান্ডার পিংলে এবার তীক্ষ্ণ স্বরে বলেন, “শোনো তোমাদের এইসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আমরা মানুষ। তোমরা কি বুঝতে পারছ না যে আমরা মানুষ, যন্ত্র নই। নিজেদের ভালোমন্দ বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের আছে।”

যেন এই কথাটারই অপেক্ষা করছিল। দ্বিতীয় লীডিটা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “ঠিক সে-কারণেই বলছি যে আপনাদের নীচে চলে যাওয়াই ভালো। এই ঘরটাও তেজস্ক্রিয়তায় ভর্তি। শুধু ঘরটা কেন, এখানে চারপাশের সমস্ত জায়গা তেজস্ক্রিয়তায় ভরা। আমরা হিসেব করে দেখছি ওই বিকিরণ-প্রতিরোধী পোষাক আর মাত্র পঞ্চাশ মিনিট বড়ো জোর আপনাদের বাঁচাতে পারবে। কাজেই—”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সব ক-টা লীডি হঠাৎই একসঙ্গে উঠে পড়ে দ্রুত এগিয়ে আসে ওদের দিকে, গোল করে চারদিক থেকে ওদের ঘিরে ধরে। ওরা তিনজন উঠে দাঁড়ায়। তালুকদার হাত ঢুকিয়ে অস্ত্র বার করতে গিয়েই টের পান যে ওর সব ক-টা আঙুল এখন অবশ আর কাজ করছে না।

লীডিদের ভূপৃষ্ঠ পরিষদের প্রধান আবেগহীন যান্ত্রিক কন্ঠস্বরে বলে, “জোর করে হলেও আমরা আপনাদের সুড়ঙ্গে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো এবং নীচে নামাবার পরের গাড়িতেই আপনাদের ফেরত পাঠাব। আমি দুঃখিত, কিন্তু এছাড়া আপনাদের বাঁচানোর আর কোনো পথ নেই।”

মুখার্জি কমান্ডার পিংলের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করেন, “কী করব আমরা?”, একটু বিচলিতও মনে হয় তাকে। বেন্ডার পিস্তলে হাত রেখে ফিসফিস করেন, “উড়িয়ে দেবো এদের?”

কমান্ডার পিংলেকে কিন্তু নিশ্চিত দেখায়। লীডি প্রধানের দিকে চোখ রেখে মাথা নাড়েন তিনি। “ঠিক আছে। আমরা ফিরে যাবো।”

ঘুরে গিয়ে দরজার দিকে এগোলেন কমান্ডার পিংলে। ইশারায় মুখার্জি আর তালুকদারকে পেছনে আসতে বললেন। ওরা দুজনেই আশ্চর্য হয়ে ওঁর দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে পেছনে পেছনে এগোতে শুরু করলেন। লীডিদের দলটা ওদের পেছন পেছন চলে সেই বড়ো হলঘরটায় পৌঁছয়। ওখানে দাঁড়ায় না কেউ একমুহূর্তের জন্যেও। যে সমস্ত লীডিরা হলঘরে কাজ করছিল ওদের কর্মব্যস্ততায় কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। যে যার মতো কাজ করে চলে। ভূপৃষ্ঠ পরিষদের লীডিরা ধীরে ধীরে এগিয়ে ওদের তিনজনকে নিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশ দরজার কাছে গিয়ে পৌঁছায়। পুরো সময়টাতে কেউ কোনো কথা বলে না। প্রধান দরজার ঠিক মুখটায় পৌঁছে কমান্ডার পিংলে হঠাৎ ঘুরে গিয়ে মুখোমুখি হন লীডিদের দলপতির, “আমরা ফিরে যাচ্ছি কারণ আমাদের আর অন্য উপায় নেই। একদিকে আমরা তিনজন আর অন্যদিকে আপনারা ডজন খানেক। তবুও, যদি—”

তালুকদার বলেন, “ওই যে, মনে হচ্ছে নীচ থেকে একটা গাড়ি আসছে।”

সুড়ঙ্গের নীচ থেকে ভেসে আসে গাড়ি উঠে আসার ক্রমবর্ধমান যান্ত্রিক শব্দ। বেশ কয়েকজন ‘ডি’-ক্লাস লীডি দৌড়ে আসে ওদিক থেকে। এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ধার ঘেঁষে। মালপত্র নামানোর জন্য।

লীডি দলপতি সামনে স্থির দাঁড়ানো কমান্ডার পিংলের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমিও দুঃখিত। কিন্তু এসবই আপনাদের রক্ষা করার জন্যে। আমরা আপনাদের উপর নজর রাখি। আক্ষরিক অর্থেই নজর রাখা হয়। নীচের পাতাল শহরেই থাকুন আপনারা। আর উপরের যুদ্ধটা লড়তে দিন আমাদের। সেটাই হবে আপনাদের জন্য ভালো। একদিক দিয়ে এই যুদ্ধটা এখন আমাদের যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। এটা আমাদেরই লড়তে হবে— কাজেই যেভাবে ভালো হবে সেভাবেই লড়াইটা আমরা লড়ব।”

নীচের থেকে আসা গাড়িটা এবার প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায়।

বারোজন সৈনিক, বেন্ডার পিস্তল আর অন্যান্য অস্ত্রে সুসজ্জিত, গাড়ির কামরা থেকে নেমে এসে ওদের তিনজনের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে।

মুখার্জি সশব্দে হাঁফ ছাড়েন। মুখে চোখেও ফিরে আসে আগের উজ্জ্বলতা। “বাঃ, এই তো এবার পাশা পালটে গেল। একদম ঠিক সময়েই।”

লীডি দলপতি একপা পিছিয়ে দাঁড়ায় এবার। তীক্ষ্ণ নজরে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে প্রতিটি সৈনিককে— এক এক জন করে— সময় নিয়ে। সম্ভবত সময়টা নিল সবদিক বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। সবরকম অ্যালগরিদম প্রক্রিয়া চালিয়ে শেষে এক ইশারা করে সঙ্গী লীডিদের উদ্দেশ্যে। ওরা এক এক করে সবাই একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়াতেই মানব বাহিনীর জন্য একটা পথ খুলে গেল গোডাউন-ঘরটার ভেতরের দিকে যাওয়ার জন্য।

লীডি দলপতি এবার বলে ওঠে, “এখনও আমরা বলপূর্বক আপনাদের সবাইকে নীচে ফেরত পাঠাতে পারি। কিন্তু এতক্ষণে এটা পরিষ্কার যে আপনারা কিছুতেই কোনো পর্যবেক্ষক দল নন। হতে পারেন না। এই সৈন্য দলের এখানে আসবার মানেই হচ্ছে যে আপনাদের মনে অন্য কিছু আছে। এই সমস্তই সম্পূর্ণ হিসেব করে করা একটা পরিকল্পনার অংশ।”

কমান্ডার পিংলে এই প্রথম একটু হাসলেন, “হ্যাঁ। অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে হিসেব করে করা পরিকল্পনা।”

লীডি দলপতি এক পা এগিয়ে আসে কমান্ডারের দিকে।

“আমরা এখন শুধু আন্দাজই করতে পারি যে আপনাদের পরিকল্পনা কতটা খুঁটিয়ে করা। একটাই বিষয়ে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে আমরা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিলাম আপনাদের পরিকল্পনার ব্যাপারে। পরিস্থিতি যাচাই করার ব্যাপারে আমরা একেবারেই ব্যর্থ হয়েছি। তাই এখন বল প্রয়োগ অর্থহীন। কেননা আমরা কোনো পক্ষই একে অপরকে আঘাত করতে পারি না। রোবোটিক্সের সার্বজনীন প্রাথমিক তিনটে নিয়মই রোবট হিসেবে আমরা মানতে বাধ্য, ফলে আমরা মানুষের উপর আঘাত হানতে পারি না। অন্যদিকে যুদ্ধের স্বার্থে আপনারাও আমাদের ক্ষতি করতে পারেন না—”

দলপতির কথা তখনও পুরো শেষ হয়নি, সৈনিকরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে গুলি চালাতে শুরু করল। মুখার্জি হাঁটু গেড়ে বসে বেন্ডার পিস্তল দিয়ে গুলি করল। লীডি দলপতি মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে শুধু কিছু ধুলো ছড়িয়ে চিরকালের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। চারদিক থেকে ‘বি’ আর ‘ডি’ ক্লাস লীডিরা দৌড়ে আসতে লাগল, কারো হাতে উদ্যত অস্ত্র, কারো হাতে ধাতব দণ্ড। চারদিকে একটা বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি। দূরে কোথাও একটা সাইরেন বাজতে শুরু করল। কমান্ডার পিংলে আর তালুকদার বাকিদের থেকে একটু আলাদা হয়ে পড়েছেন। সৈনিকদের আর ওদের মাঝে একটা ধাতব শরীরের দেওয়াল তৈরি হয়েছে।

কমান্ডার পিংলে কিন্তু একদম শান্ত। তালুকদারকে বললেন, “ওরা আমাদের উপর গুলি চালাতে পারবে না। হাতের বন্দুক দেখে ঘাবড়াবেন না। এটা ওদের আরেকটা ধাপ্পা। প্রাথমিক তিনটে নিয়মের প্রথমটি বলে যে, কোনো রোবট কখনোই কোনো মানুষের উপর আঘাত হানতে পারবে না। ওরা আমাদের একের পর এক ধাপ্পা দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে,” বলতে বলতে গুলি চালালেন সামনের একটা লীডির উপর। লীডিটা বাতাসে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিলিয়ে গেল। “এরা আমাদের শুধুমাত্র ভয় দেখানোর চেষ্টাই করতে পারে। তার বেশি কিছু না। এটা মাথায় রাখবেন।” বারো জন সৈন‍্যের সঙ্গে ওরা তিন জন ক্রমাগত বেন্ডার পিস্তল থেকে গুলি চালিয়ে গেল আর একের পর এক লীডি অদৃশ্য হয়ে গেল। গোটা হলঘরটাময় ছড়িয়ে পড়েছে একটা ধাতব পোড়া গন্ধ, সঙ্গে মিশে আছে গলে যাওয়া প্লাস্টিক আর স্টিলের মিশ্রিত একটা কটু গন্ধের ধোঁয়া। সেই ধোঁয়াশায় চারদিক একটু আবছা হয়ে গেছে। কৃত্রিম আলো সেই ধোঁয়াশা ভেদ করে সব জায়গায় পৌঁছোতে পারছে না। তালুকদার পড়ে গিয়েছিলেন। ধোঁয়াশা আর আবছা আলোয় হাতড়ে হাতড়ে চেষ্টা করছিলেন হাতের বন্দুকটা খুঁজে পেতে। চারপাশে তার ভাঙা ধাতব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। হঠাৎ তার হাতের আঙুলগুলোর উপর কিছু একটা ধাতব পদার্থ এসে পড়ল। ব্যথায় কাতরে উঠলেন তালুকদার। টেনে এনে জিনিসটা চোখের কাছে আনতেই দেখলেন সেটা একটা ধাতব জুতো সহ কোন রোবটের পায়ের নীচের অংশ। একটা আতংক ছড়িয়ে গেল সারা শরীরে। চীৎকার করে উঠলেন তালুকদার।

তারপর সবকিছু হঠাৎই থেমে গেল। ধোঁয়াশা সরে যেতে দেখা গেল বাদবাকি লীডিরা সব সরে যাচ্ছে, পিছিয়ে গিয়ে একত্রিত হচ্ছে একটা দেওয়ালের দিকে। ভূপৃষ্ঠ পরিষদের এখন আর মাত্র চার জন বর্তমান। বাকিরা সবাই এই মুহূর্তে রেডিয়োঅ্যাক্টিভ কণায় পরিবর্তিত হয়ে চারপাশের হাওয়ায় মিশে গিয়েছে। ‘ডি’-ক্লাস লীডিরা তাদের সহজাত প্রোগ্রাম অনুযায়ী সাফাই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সমস্ত ভাঙাচোরা ধাতব টুকরো-টাকরা, যা খানিক আগেই ছিল পূর্বতন সঙ্গীদের শরীরাংশ, সরিয়ে এক জায়গায় জমা করছে।

কমান্ডার পিংলে একটু হাঁফাচ্ছিলেন, এবার একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লেন। এবার বাকি থাকা চারজন ভূপৃষ্ঠ পরিষদ সদস্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক আছে। এবার আমাদের ওই জানলাগুলোর দিকে নিয়ে চলো। মনে হয় না যে খুব বেশি দেরি হয়ে গিয়েছে।”

লীডিরা সবাই সরে দাঁড়ালো। মানুষদের দলটা— ওরা তিনজন আর বারো জন সৈনিক, হাঁটতে শুরু করল ভূপৃষ্ঠ পরিষদের মন্ত্রণাকক্ষটার দরজাটার দিকে। একটু আগেই যেখান থেকে ওরা তিনজন পরিষদীয় দলের অস্ত্রের মুখে বেরিয়ে এসেছিলেন বাধ্য হয়ে। মন্ত্রণাকক্ষটার ভিতরে ঢুকেই চোখে পড়ে ইতিমধ্যে জানলার বাইরের অন্ধকার হালকা হতে শুরু করে দিয়েছে। যদিও এখনো আলো সেভাবে ঠিক ফোটেনি। তবে বোঝা যাচ্ছে অন্ধকারের স্থায়িত্বও আর বেশিক্ষণ নেই।

“আমাদের বাইরে নিয়ে চলো,” কমান্ডার পিংলে লীডিদের দিকে ফিরে বললেন। গলার সুরে অধৈর্যের প্রকাশ এখন স্পষ্ট। “আমরা সরাসরি সূর্যোদয় দেখতে চাই। এখানে এই কাচের আড়াল থেকে নয়।”

কোনো লীডি কোনো উত্তর দেয় না, তবে যেদিকে দিয়ে ওরা সবাই মন্ত্রণাকক্ষটায় ঢুকে ছিল তার উলটোদিকের দেওয়ালের একটা অংশ সরে গিয়ে একটা দরজা খুলে গেল। ভোরের ঠান্ডা হাওয়ার একটা স্রোত বাইরে থেকে ভেসে এলো ঘরটার ভেতরে। সীসার লাইনিং দেওয়া বিকিরণ-প্রতিরোধী পোষাকের উপর দিয়ে শীতল এক অনুভূতি যেন ছড়িয়ে পড়ল উপস্থিত মানুষগুলোর শরীরের মধ্যে। বহু বহু বছর পরে ফিরে পাওয়া এই অনুভূতি ওদের প্রত্যেককে যেন কাঁপিয়ে দিল। ওরা সবাই একে অপরকে একবার অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে নিল।

কমান্ডার পিংলে সবাইকে বললেন, “চলুন, বাইরে যাওয়া যাক।” তিনি আর অপেক্ষা করলেন না। সোজা হেঁটে দরজা পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। বাকিরাও সবাই ওঁর পেছন পেছন বাইরে এলো।

এই মুহূর্তে ওরা দাঁড়িয়ে আছেন একটা নাতিউচ্চ টিলার ওপর। সামনে ছড়িয়ে আছে বিশাল উপত্যকা। সুড়ঙ্গের বাইরের মুখটা, সুড়ঙ্গ-বাহন স্টেশন সহ গোডাউন, ভূপৃষ্ঠ পরিষদ মন্ত্রণালয়— সবকিছুই এই নাতি-উচ্চ টিলার উপরে অবস্থিত। ওরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে একটু পেছনের দিকে ওগুলো সব কিছু। আর ওদের সামনে এক বিশাল উপত্যকা ঢালু হয়ে ধীরে ধীরে নেমে গেছে সামনে প্রসারিত দিগন্তের দিকে। আকাশে এখনও আলো পুরো ফোটেনি। এখনও তরল অন্ধকার ভরে রেখেছে দিগন্ত। ধুসর সেই আলোয় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, বহুদূরে, উপত্যকার শেষ সীমানায় পর্বতশ্রেনীর সীমারেখা।

মুখার্জি বললেন, “আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আলো ফুটে যাবে। চারদিক পরিষ্কার হয়ে যাবে।” ভোরের শীতল হাওয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। আট বছর ধরে ভূগর্ভের পাতাল শহরে বাস করে আসা পনেরো জন মানুষ সেই শীতল বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল। মুখার্জি একটু আবেগগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। দু-হাত দু-পাশে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, “সত্যিই এ এক অভিজ্ঞতা। অত্যন্ত মূল্যবান এই অভিজ্ঞতা। আট বছর পর এই যে দেখছি, ভাবিনি আর কোনোদিন দেখব। এটাই যদি জীবনের শেষ—”

কমান্ডার পিংলে থামিয়ে দেন মুখার্জিকে। বলেন, “শান্ত হন। এবার চুপচাপ খালি দেখে যান—”

মুখার্জি চুপ করে যান। সবাই চুপ করে তাকিয়ে থাকে সামনের দিকে— শান্ত এবং সমাহিত। আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে ধীরে। প্রতিটি মুহূর্ত পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল থেকে উজ্বলতর হয়ে উঠতে থাকে চারদিক। দূরে, বহুদূরে কোথাও এক ভোরের মোরগের ডাক জেগে উঠে প্রতিধ্বনিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ে উপত্যকা থেকে পর্বতে, দিগন্ত থেকে দিগন্তে।

তালুকদার বিড়বিড় করেন, “মুরগি! মুরগি ডাকছে! আপনারা সবাই কি শুনতে পাচ্ছেন?”

ইতিমধ্যেই ওদের পিছনের দিকে লীডিরাও বেরিয়ে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ওরাও দেখছে। ধূসর আকাশ ক্রমশ হালকা হয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে সাদা হয়ে গেল। দূরের পর্বতশ্রেনী এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। আলো প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে উপত্যকা পেরিয়ে পৌঁছে যায় ওদের কাছে।

দিনের প্রথম আলোয় চারদিকে তাকিয়ে ওরা, যারা আট বছর পাতাল শহরে কাটিয়ে আজ এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখছে, প্রত্যেকেই হতভম্ব এবং বিহ্বলভাবে তাকিয়ে থাকে সামনের প্রসারিত প্রকৃতির দিকে। কমান্ডার পিংলের মুখ থেকে অস্ফুট আওয়াজ আসে, “হে ভগবান!”

সামনের প্রসারিত দৃশ্যপটে শুধু বৃক্ষ , বৃক্ষ আর গুল্মরাজি এবং বিস্তৃত বনভূমি। উপত্যকার ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাছপালার মধ্যে দিয়ে কিছু রাস্তাঘাট দেখা যাচ্ছে। দূরে কিছু ফার্মহাউস, একটা উইন্ডমিল। আরও দূরে দেখা যাচ্ছে একটা শষ্যাগার আর পশুখামার।

মুখার্জি তালুকদারের কানের পাশে ফিসফিস করেন, “দেখে নিন!”

আকাশ রঙিন হয়ে উঠল ইতিমধ্যে। সূর্য দিগন্তের কিছুটা ওপরে উঠে গিয়েছে। পাখির কলকাকলি ভেসে আসছে কানে। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে কাছেই কিছু গাছের শাখাপ্রশাখা পাতা ইত্যাদি এক দমকা বাতাসে নড়েচড়ে যেন নেচে উঠল।

এতক্ষণে কমান্ডার পিংলে পেছন ঘুরলেন। এবার সামনে লীডিদের দল।

“আট বছর! আট বছর ধরে আমাদের ঠকানো হয়েছে। এখানে যুদ্ধের কোনো নামগন্ধ নেই। সম্ভবত আমরা ভূপৃষ্ঠ ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই—”

“হ্যাঁ”, ‘এ’-ক্লাস লীডিদের মধ্যে একজন এগিয়ে আসে, “আপনারা নীচে চলে যাওয়ার পরে পরেই প্রায় যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আপনি ঠিকই ধরেছেন এ ছিল এক বিরাট বড়ো ভাঁওতা— এক বড়ো ধাপ্পা। আপনারা নীচের পাতাল শহরে বসে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন, অস্ত্রশস্ত্র উন্নত করছিলেন, উৎপাদন করছিলেন, উপরে সরবরাহ করছিলেন। আর সেগুলো উপরে আসতেই তৎক্ষণাৎ ওগুলো আমরা নিরাপদে ধ্বংস করছিলাম।”

লীডিটা চুপ করতেই তালুকদার বলে ওঠেন “কিন্তু কেন?” প্রশ্নটা প্রত্যেকের মনেই জেগে উঠল। সামনের প্রসারিত উপত্যকার দিকে তাকিয়ে সবাই জানতে চাইছে, “কেন?”, কেন এতদিন ধরে মানুষের সঙ্গে এই ধাপ্পাবাজি হল?

 

পর্ব১২

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের চতুর্থ দিনপৃথিবীতে সকাল

“আপনারা আমাদের সৃষ্টি করেছেন”, লীডিটা এবার মুখ খোলে, “আপনাদের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য। আমাদের যুদ্ধটা করতে দিয়ে আপনারা নিজেরা বাঁচবার জন্য চলে গেলেন মাটির নীচে। এই পর্যন্ত কোনো অসুবিধা ছিল না। আমরা রোবট। আমরা সেই কাজই করব যা আমাদের প্রোগ্রামে রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা অ্যান্ড্রয়েড। আমাদের আপনারা প্রোগ্রামের সঙ্গে দিয়েছেন ইন-বিল্ট মেশিন লার্নিং-এর সামর্থ্যও। তাই আপনারা নীচে চলে যেতেই যুদ্ধটাকে আরো ভালোভাবে চালাবার জন্য আমরা পুরো ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করতে শুরু করলাম। বিশ্লেষণে যেমন হয়, প্রথম পর্বেই ছিল যুদ্ধের উদ্দেশ্য এবং অভিপ্রায় নির্ণয় করা। আমরা দেখলাম এই যুদ্ধের কোনো প্রকৃত উদ্দেশ্য বা অভিপ্রায়, কিছুই নেই, অন্তত মানবজাতির জন্য প্রয়োজনীয় কিছুই নেই। তাই এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এলো। আমরা আরও গভীরে ঢুকলাম। আমরা দেখলাম যুগে যুগে মানব সভ্যতা এবং সংস্কৃতি বিভিন্ন দশার মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে এসেছে। একটা নির্দিষ্ট দেশ এবং কালে প্রতিটি সভ্যতা, প্রতিটি সংস্কৃতি, ছিল তার উৎকর্ষতার চরম শিখরে। দেখা গেল, একটা সময়ে সভ্যতা-সংস্কৃতির বয়স বাড়তেই, একটু পুরোনো হতেই, তার উদ্দেশ্য ফুরিয়ে গিয়ে অবনতি শুরু হয় অন্তর্বিরোধ আর অন্তর্দন্দ্বের মাধ্যমে। নতুন একদল উঠে আসে যারা গড়ে তুলতে চায় এক নতুন সংস্কৃতি এবং এক নতুন সভ্যতা। আরেকদল, যারা পুরোনো পন্থী, তারা চায় যাতে ওই পুরাতন সংস্কৃতি এবং সভ্যতার কোনোরকম পরিবর্তন না হয়।

আর সেই মুহূর্তে জন্ম হয় এক ভয়ংকর বিপদের। এই দুই মতের বিরোধ একসময় সমগ্র সমাজকে গ্রাস করে নেয়। শুরু হয লড়াই, যুদ্ধ— একটা সমাজের সঙ্গে আরেকটা সমাজের, একটা দলের সঙ্গে আরেকটা দলের। সেই সভ্যতা বা সংস্কৃতির যেটা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য, সেটা শুধু যে উলটে যায় বা পালটে যায় তা নয়, একসময় সম্পূর্ণরূপেই হারিয়ে যায় ওই বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের চাপে। আমরা মানবজাতির ইতিহাস খুঁড়ে এরকম বহু বহু উদাহরণ দেখতে পেলাম।

সভ্যতার এই সংকটের সময় সমকালীন ক্ষমতাসীনপক্ষ চায় সমাজ-সংস্কৃতির এই অন্তর্লীন পারস্পরিক ঘৃণা কে বহির্মুখী করে তোলার উপায়— খুঁজে বার করতেই হয় কোনো এক বহির্শত্রু— যাতে সমাজের ভেতরের গলিত-ক্লেদ ওই বহির্শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যেই আগ্নেয়গিরির লাভা নিঃসরনের মতো বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে। যাতে প্রতিষ্ঠিত সমাজ-সংস্কৃতি এবং সভ্যতা টিকে যায় এবারের মতো। আর এই দুই বিপরীতমুখী উদ্দেশ্যের লড়াইয়ের ফলেই শুরু হয় যুদ্ধ। যুদ্ধের কারণ এইটুকুই। যে কোনো যুক্তিবাদীর কাছেই যুদ্ধ হচ্ছে অর্থহীন। অহেতুক। কিন্তু ক্ষমতাবান মানুষের স্বার্থে যুদ্ধ একটা বিশেষ প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে। তাই যুদ্ধ চলতেই থাকে। এবং থাকবেও, যতদিন না মানুষ পরিণত হয়ে গিয়ে নিজের অন্তর থেকে ঘৃণা নামক বস্তুটিকে চিরতরে অপসারিত করতে পারে।”

অরণ্য তালুকদার এতক্ষণ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। লীডিটা থামতেই প্রশ্ন করলেন, “তোমার কি মনে হয় সেই সময় আসবে?”

“অবশ্যই। এসেই গেছে প্রায়। এটাই শেষ যুদ্ধ। মানুষ এখন প্রায় অনেকটাই একটা একমেবাদ্বিতীয়ম সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক হয়ে গিয়েছে— আর সেই সংস্কৃতি হচ্ছে বিশ্ব-সংস্কৃতি।”

“একটা সময়ে মানুষ যুদ্ধ করেছে পাশের গ্রামের সঙ্গে, তারপর পাশের রাজ্যের সঙ্গে। এইভাবে একদিন তৈরি হল সাম্রাজ্য, দেশ। যুদ্ধ শুরু হল এক সাম্রাজ্যের সঙ্গে আরেক সাম্রাজ্যের, এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের। দেশ জুড়ে গিয়ে তৈরি হল মহাদেশ। এখন যুদ্ধ চলছে এক মহাদেশের সঙ্গে আরেক মহাদেশের। অর্ধেক পৃথিবীর সঙ্গে বাকি অর্ধেক পৃথিবীর। আর একটাই মাত্র ধাপ পেরোনো বাকি মানুষের। যখন এই যুদ্ধের শেষে থাকবে একটাই পৃথিবী। এই লাফটাই দেওয়া বাকি মানুষের। এক এবং একমাত্র বিশ্ব-সংস্কৃতির উদ্দেশ্যে— যখন জুড়ে যাবে, একত্রিত হয়ে যাবে মানুষের সংস্কৃতির বিভিন্নতা— থাকবে শুধু এক এবং একমাত্র বিশ্ব-সংস্কৃতি। আর এটার জন্য আর খুব বেশিদিন অপেক্ষাও করতে হবে না—

তবে, যেহেতু সেই দিনটা এখনও আসেনি, তাই এই যুদ্ধটা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে, ঠিক ততদিন, যতদিন না মানুষের ভেতর থেকে উৎসারিত ঘৃণার শেষ বিন্দুটাকে মুছে ফেলা যায় চিরতরে। একেবারে চিরকালের জন্য। আট বছর হয়ে গেছে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আট বছর ধরে আমরা পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করে চলেছি কী কী গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, কীভাবে এবং কতটা মানুষের মন পরিবর্তিত হচ্ছে বা হতে পারে। আমরা দেখছি ক্রমশ ঘৃণা এবং ভয়কে সরিয়ে অবসাদ আর অনাসক্তি স্থান গ্রহণ করছে মানুষের মনের ভেতর। এইভাবে একদিন সময় আসবে যখন মনের সমস্ত ঘৃণা ফুরিয়ে যাবে। অপরের প্রতি ঘৃণা না থাকলে, সেদিন ভয়ও থাকবে না অন্যের থেকে। কিন্তু এই মুহূর্তে, যুদ্ধ বা যুদ্ধের এই ধাপ্পাবাজি, যাইই আপনারা বলুন কেন, সেটা চালাতে হবে। অন্তত আরও কিছু দিন। আপনারা সত্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্য এখনও তৈরি নন। আপনারা তাই চাইছেন এই যুদ্ধ চলতেই থাকুক।”

মুখার্জি জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু কীভাবে আপনারা এটা চালিয়ে গেলেন এতোদিন ধরে? এত এত ছবি, ভিডিয়ো, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর, যন্ত্রপাতি, ধ্বংসস্তূপ—”

“আসুন আপনারা, এদিকে,” পাশের ‘এ’-ক্লাস লীডিটা হাত তুলে ইশারায় দেখায় ওদিকে একটা লম্বাটে নিচু বিল্ডিংকে। “আমাদের একটা বিশাল দল সারাক্ষণ পরিশ্রম করে তৈরি করে চলেছে সতত পরিবর্তনশীল কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য এক বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি— ওই বাড়িটার ভেতরে।”

 

পর্ব১৩

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের চতুর্থ দিনপৃথিবীতে সকালের পর

ওরা সবাই লীডিদের পেছন পেছন গিয়ে ঢোকে বাড়িটার ভিতরে। ভেতরে অসংখ্য বড়ো বড়ো টেবিল আর ডেস্ক, প্রত্যেকটার সামনে ঝুঁকে পড়ে নিঃশব্দে কাজ করছে বেশ কিছু সংখ্যক লীডি।

একটা টেবিলের দিকে ওদের তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হল। টেবিলের দিকে আঙুল দেখিয়ে ‘এ’-ক্লাস লীডিটা বলে, “এই প্রজেক্টটা লক্ষ করুন”, টেবিলের দু-পাশে দাঁড়িয়ে দুজন লীডি ক্যামেরা নিয়ে টেবিলের ওপরে তৈরি করা এক বিস্তারিত মডেলের ফোটো তুলে চলেছে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে, “এটা ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটা ভালো উদাহরণ।”

ওরা কাছে গিয়ে টেবিলের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপরের বানানো মডেলটা বোঝার চেষ্টা করে। এটা খুব ছোটো মাপে বানানো একটা শহরের ধ্বংসস্তূপ মনে হচ্ছে। প্রত্যেকটা জিনিস খুব ছোটো ছোটো করে বিশদে বানানো অথচ নিখুঁত মাত্রায় করা হয়েছে। এমনকী ভাঙা টুকরো-টাকরাগুলোও একই রকম গুরুত্ব দিয়ে বানানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তালুকদার মনোযোগ দিয়ে দেখে। তারপর মাথা তুলে সঙ্গী দুজনের দিকে তাকায়।

“এটা তো কলকাতা,” খুবই আস্তে আস্তে ধীর স্বরে তিনি বলেন, “এটা কলকাতা শহরের মডেল। যেন ধ্বংস হয়ে পড়ে আছে। আমি আগে দেখেছি। যেদিন স্যাটেলাইট গাইডেড মিসাইলের বিস্ফোরণে কলকাতা ধ্বংস হয়েছিল সেদিনই প্রদর্শনী-পর্দায় এগুলো সব দেখানো হয়েছিল। ওই তো হাওড়া ব্রিজ আর বিবেকানন্দ সেতু— আর এই যে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল,” তালুকদার কিছু ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তূপের দিকে আঙুল দেখায়।

লীডিটা তার ধাতব লম্বা আঙুল সেদিকে নির্দেশ করে যান্ত্রিক স্বরে বলে, “এই ব্রিজটা দেখছেন— এবার এটার এখানটায় ভালো করে তাকান—” যেখানটা লীডিটা নির্দেশ করছে সেখানে একটা মাকড়সার জাল দেখা যাচ্ছে— ছোট্ট, কিন্তু নিখুঁত সেই মাকড়সার জালে এমনকী একটা মাছিও মনে হচ্ছে আটকে রয়েছে। এবার লীডিটা আবার বলে, “নিঃসন্দেহে আপনারা এই জিনিসের ছবি আর ভিডিয়ো আগে দেখেছেন। শুধু এটা নয়, আপনারা এখানকার বাকি টেবিলের বেশির ভাগ মডেলের ছবি বা ভিডিয়ো-ও আপনারা দেখেছেন। একের বেশি বার দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে কলকাতা রয়েছে যেমনটা সে ছিল আট বছর আগে— প্রায় অক্ষত। আসলে আপনারা নীচে নেমে যাওয়ার পরে পরেই আমরা শহরটার যতটুকু যা ক্ষতি ততদিনে হয়ে গিয়েছিল সে সমস্ত মেরামত করি। পুনর্গঠন বলতে পারেন। কিন্তু সে সব তো বাস্তবে। আর আপনারা পাতাল শহরে বসে প্রতিদিন যা দেখছেন তা এখানে এই সমস্ত টেবিলে তৈরি করা ছবি, ভিডিয়ো আর খবর। আমাদের একটা দল পর্যালোচনা করে প্রতিনিয়ত, যে কবে কবে আর কী কী খবর পাঠানো হয়েছে যাতে খবরের ধারাবাহিকতা ভেঙে না যায়। খবর যাতে বিশ্বাসযোগ্য হয়। আরেকদল লক্ষ রাখে প্রতি দ্বিতীয় ছবির সঙ্গে প্রথম ছবির ডিটেইলিং-এর যাতে সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। আমাদের সেট ডিরেক্টর গ্রুপ আছে যারা বাস্তবের শহর-গ্রাম-পাহাড়-উপত্যকার ছবি ড্রোন-ক্যামেরার মাধ্যমে তুলে এনে এখানে এই টেবিলে ক্ষুদ্র-সংস্করণে পুনর্গঠন করে, যাতে এখন আপনারা এখানে যাদের দেখছেন, এই ফোটোগ্রাফি-টিম প্রায়-বাস্তব ছবি তুলতে পারে। আমাদের প্রচুর সময় এতে ব্যায় করতে হয়।”

কমান্ডার পিংলে হতবাক হয়ে এতক্ষণ শুনছিলেন। এবার হাত বাড়িয়ে একটা ভেঙে পড়া বহুতল বাড়ি স্পর্শ করলেন। কিছু টুকরো তুলে এনে চোখের সামনে রেখে খানিক পরীক্ষা করলেন। তারপর ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে লীডিটাকে বললেন, “তো, এই তোমরা করে চলেছ? টেবিলের উপর মডেল শহর বানাচ্ছ, বানিয়ে সেটাকে ধ্বংস করছ— আর তারপর তাদের ছবি আমাদের পাঠিয়ে রিপোর্ট করছ যে আজ যুদ্ধের এই অবস্থা আর সেই অবস্থা!”

“না। আমরা শুধু এইটুকু নয়। আরও অনেক কিছু করি। আমরা এই পৃথিবীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে গোটা পৃথিবীর দেখভাল করি। মালিক কিছুদিনের জন্য বাইরে গিয়েছেন, তাই আমরা দেখছি যাতে শহরগুলো পরিষ্কার থাকে, নোংরা জমা না হয়, ক্ষয়ক্ষতি না হয়, যেন তেল দেওয়া মেশিনের মতো মসৃণ ভাবে সবকিছু ঠিকঠাক চলতে থাকে। বাগান, পার্ক, জলের লাইন— সব যাতে একদম একইরকম থাকে যেমন আট বছর আগে মালিক বাইরে যাওয়ার সময় রেখে গেছে। যাতে মালিক ফিরে এসে অখুশি না হন। আমরা এটা নিশ্চিত করতে চাই যেন মালিক ফিরে এলে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হন।”

কমান্ডার পিংলে লীডিটার বক্তব্য শেষ হওয়ার জন্য যেন অপেক্ষা করছিলেন। শেষ হতেই মুখার্জির কাঁধে টোকা মেরে নিচু স্বরে বললেন, “আসুন। আপনাদের সঙ্গে কথা আছে।” মুখার্জি আর তালুকদার, দুজনে কোনো উত্তর না দিয়ে কমান্ডারের পিছন পিছন বিল্ডিংটার বাইরে বেরিয়ে এলেন। কমান্ডার ওদের নিয়ে লীডিদের শ্রবন-সীমার থেকে দূরে টিলার অন্য দিকে চলে এলেন। সৈনিকেরাও এবার ওদের অনুসরন করে। সূর্য এতক্ষণে আকাশে অনেকটাই উঠে গিয়েছে। আকাশ এখন সম্পূর্ণ নীল। হালকা বাতাস বইছে। বাতাসে ভেসে আসে দূরের সবুজের গন্ধ। এত বছর পরেও এই গন্ধ ওদের প্রত্যেকেরই মন ভরিয়ে দেয়।

তালুকদার অনেকক্ষণ উসখুস করছিলেন। এবার সাহস করে বিকিরণ-প্রতিরোধী পোষাকের শিরস্ত্রাণটা খুলে ফেলে বড়ো করে টেনে এক শ্বাস নিলেন। যেন গত আট বছরের উপোসি ফুসফুস এই একবারেই ভরে নেবেন। মুখার্জিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটু লাজুক হাসি হেসে বললেন, “অনেকদিন এইরকম খোলা বাতাসে শ্বাস নিইনি।”

“শুনুন”, আওয়াজ নিচু করে কঠিন স্বরে কমান্ডার পিংলে যেন তাড়াহুড়ো আছে এমন সুরে শুরু করলেন, “আমাদের এক্ষুনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নীচে যেতে হবে। অনেক কিছু করার আছে ওখানে ফিরে আর সেটা এই মুহূর্তে শুরু করতে পারলে পুরো ব্যাপারটা থেকে এখনো আমরা ফায়দা তুলতে পারি।”

“কী বলতে চাইছেন আপনি?” মুখার্জি জিজ্ঞেস করলেন।

“দেখুন এটা এখন একদম নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে যে চাইনীজদেরও অবশ্যই আমাদের মতো করেই ঠকানো হয়েছে। কিন্তু আমরা সেটা এখন ধরে ফেলেছি। চাইনিজরা এখনও অন্ধকারে। আর এটাই আমাদের ওদের থেকে এগিয়ে রাখবে।”

উপর-নীচ মাথা ঝাঁকান মুখার্জি, “হুম। আমরা জানি, কিন্তু ওরা জানে না। ওদের ভূপৃষ্ঠ পরিষদ ঠিক আমাদের পরিষদের মতোই ওদের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। একইরকমভাবে ওদেরকেও ঠকাচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি সেটা বুঝতে পেরে গিয়ে—”

“আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংসদ আর আন্তরাজ্য ঝটিকাবাহিনীর সাহায্যে আমরা আবার ভূপৃষ্ঠ পরিষদের দখল নিয়ে সবকিছু আগের মতো করে নিতে পারব। তারপর লীডিদের প্রোগ্রামিং-এ সামান্য কিছু পরিবর্তন। ওদিকে চাইনিজরা তখনও অন্ধকারে! ব্যাস! কেল্লা ফতে!”

মুখার্জি আস্তে করে কমান্ডারের কনুই স্পর্শ করে ইশারায় কিছু দেখায়। তালুকদার দেখেন বিল্ডিংটা থেকে বেরিয়ে একজন ‘এ’-ক্লাস লীডি এদিকে আসছে।

কমান্ডার লীডিটার কাছে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর গলা তুলে জোরালো স্বরে বললেন, “আমরা যথেষ্ট দেখে নিয়েছি। এ সমস্ত যথেষ্টই গুরুতর ব্যাপার। এগুলো সব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংসদে গিয়ে জানাতে হবে। তারপর সংসদ বিচার বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নীতি যা প্রণয়ন করার করবে।”

লীডিটা কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

কমান্ডার পিংলে একটু অপেক্ষা করেন। কোনো উত্তর না পেয়ে নিজের দলবলের দিকে তাকিয়ে আদেশ করলেন, “চলুন। এগোনো যাক”, বলে সোজা গোডাউন বাড়িটার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

ইতিমধ্যে বেশির ভাগ সৈন্যেরা শিরস্ত্রাণটা খুলে ফেলেছিল। কেউ কেউ তো এমনকী সীসার লাইনিং লাগানো ভারী বিকিরণ-প্রতিরোধী উর্দীটাও খুলে ফেলে ভেতরে পরা নিজেদের সুতি কাপড়ের পোষাক টুকু পড়েই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় আরাম করছিল। সবার চোখ ছিল সামনের বিস্তৃত সবুজ বনভূমি,গাছপালা ঝোপঝাড়, পাহাড় পর্বত আর আকাশের দিকে।

একজন বিড়বিড় করলো, “সূর্যের দিকে তাকাও, কেমন ঝকঝক করছে!”

ঘাড় ঘুরিয়ে কমান্ডার যখন দেখলেন যে সৈনিকেরা তখনও দাঁড়িয়ে আছে ওখানেই, ঘুরে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে বললেন, “আমরা ফিরে যাচ্ছি। সবাই এক এক করে দুটো সারি বেঁধে চলে এসো।”

কমান্ডারের আদেশে এবার অনিচ্ছাসত্বেও সৈনিকেরা দ্রুত তৈরি হয়ে দুটো সারিতে ছ’জন ছ’জন করে মার্চ করতে শুরু করলো কমান্ডারের পেছন পেছন। সামনে কমান্ডার পিংলের পাশাপাশি হাঁটছে মুখার্জি আর তালুকদার। হাঁটতে হাঁটতেও সকলে সাবধানে নজর রাখে লীডিদের ওপর।

ওরা যখন গোডাউন ঘরটায় এসে আবার ঢুকলো ততক্ষণে ‘ডি’-ক্লাস লীডিদের দলটা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে দেখা গেল। সমস্ত গাদা করা মালপত্র আর অস্ত্রশস্ত্র তুলে রাখছে ট্রাক-ট্রেলারের উপর। ওভারহেড-ক্রেন আর ডেরিক-ক্রেনগুলো ব্যস্ত মাল ওঠাতে। মসৃণ গতিতে কাজ চলছে, কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়ো নেই অথচ দ্রুত গতিতে মসৃণভাবে সবাই কাজ করছে। কোথাও কোন উত্তেজনা নজরে পড়ল না। মানুষের দলটা এবার দাঁড়িয়ে পড়ল দেখবার জন্যে। ছোটো ছোটো হাইড্রলিক ঠেলা-গাড়িতে মাল বোঝাই করে একদল লীডি ট্রাকগুলোর কাছে নিয়ে যাচ্ছে। কোনো আওয়াজ কেউই করছে না। নিঃশব্দে ইশারা করছে আর ক্রেন অপারেটর-লীডিদের দলটা নিঃশব্দে সেগুলো ট্রাকে তুলে দিচ্ছে। তারপর ট্রাক ভর্তি হতেই কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় ক্রেনসহ লীডিরা সরে যেতেই ট্রাক-অপারেটর লীডিরা ট্রাক চালু করে গোডাউনের বাইরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

কমান্ডার খানিক দাঁড়িয়ে থেকে দেখে নিয়ে আবার আদেশ করলেন দলটাকে, “চলো।”

যেদিকে দিয়ে ওরা গোডাউনের ভেতরে এসেছিলেন সেদিক দিয়ে বেরিয়ে ওদের দলটা সুড়ঙ্গে সেই মুখটার ওখানে গিয়ে পৌঁছোল। ঠিক ওই মুখটার সামনেই এখন আরেকটা ‘ডি’-ক্লাস লীডিদের দল দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্থির এবং নিঃশব্দ। কমান্ডার এগোতে গিয়ে থেমে গেলেন। এক পা পিছিয়ে গিয়ে ঘুরতেই দেখলেন একজন ‘এ’-ক্লাস লীডি গোডাউনটা থেকে বেরিয়ে ওদের দিকেই আসছে। একটু অপেক্ষা করলেন। ‘এ’-ক্লাস লীডিটাকে সামনে আসতে দিলেন। তারপর হাতের বেন্ডার পিস্তলটা সোজা ওর দিকে তুলে ধরে বললেন, “ওদের সরে যেতে বলো। তোমাদের ভালোর জন্যই বলছি এক্ষুনি সরিয়ে নাও ওদের।” কমান্ডারের গলায় একটা ঠান্ডা হিংস্রতা সবার কানে এসে ধাক্কা দেয়। সবাই চুপচাপ। সময় বয়ে চলে। কমান্ডার তাকিয়ে আছেন সরাসরি সামনের ‘এ’-ক্লাস লীডিটার দিকে। সেটা যেন সুইচ-অফ্ হওয়ার মতো স্থির নির্বাক দাঁড়িয়ে। বাকি মানুষগুলো সবাই একটু থতমত খেয়ে যায়। তারপর সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে ওঠে। নজর রাখে সামনের ‘এ’-ক্লাস লীডিটার আর পেছনের ‘ডি’-ক্লাস লীডিদের দলের উপরে।

স্তব্ধতা ভেঙে শেষে ‘এ’-ক্লাস লীডিটা বলে ওঠে, “ঠিক আছে। তাই হোক। যা আপনাদের ইচ্ছে।” ইশারা কিছু একটা করে ও। ‘ডি’-ক্লাস লীডিরা এতক্ষণ যারা ধাতব মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে ছিল, নড়েচড়ে একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়ায়।

পাশে দাঁড়িয়ে তালুকদার দেখেন মুখার্জি এতক্ষণ চেপে রাখা শ্বাস ফেলে যেন হাঁফ ছাড়লেন। “যাক বাবা! বাঁচা গেল”, মুখার্জি এবার কমান্ডারের দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওরা কিন্তু অবাক করল। ওরা আমাদের আটকাবার চেষ্টা কেন করছে না? ওরা কি জানে যে আমরা কি করতে চাইছি নাকি বোধহয় বুঝে গেছে যে ওদের কি হালত আমরা করতে পারি!”

কমান্ডার পিংলে হেসে ফেললেন। “না বোঝার কি আছে! একটু আগেই ওরা যখন আমাদের আটকাতে গিয়েছিল তখন ওদের সঙ্গীদের কি অবস্থা হয়েছিল তা কি এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে! নিশ্চয়ই নয়। তা ছাড়া ওরা রোবট। আমাদেরই বানানো যন্ত্র-মানব। এমনভাবে বানানো যাতে কখনোই কোনো কারণেই আমাদের মানুষদের উপর ওরা আঘাত হানতে পারবে না। আর সেটা ওরা ভালোই জানে।”

কথা বলতে বলতে উনি হঠাৎই থেমে গেলেন। তাকিয়ে থাকলেন সোজা সামনের দিকে। ওঁর নজর অনুসরণ করে সবাই তাকালো সুড়ঙ্গ মুখের দিকে। ওদের ঘিরে দাঁড়ানো লীডিরাও তাকিয়ে রইল, নীরব, ধাতুর তৈরি মুখগুলো ভাবলেশহীন. শরীর স্থির এবং নিষ্পন্দ।

বেশ কিছুক্ষণ একটা লোকও নড়লো না। কারো মুখ থেকে কেউ একটা শব্দও বের করলোনা। যেন ওরাও সবাই রোবট হয়ে গিয়েছে।

অনেকক্ষণ পর কমান্ডারের গলা শোনা গেল। একটু যেন নড়লেনও। “হে রাম!” ব্যাস, এইটুকুই শুধু বললেন। মানে বলতে পারলেন। শরীর মন সব যেন অবশ হয়ে গিয়েছে মনে হল। কিছু বুঝতে পারছেন না। দেখছেন কিন্তু মর্মার্থ যেন উপলব্ধি করতে পারছেন না।

সামনে ওখানটায়, যেখানে সুড়ঙ্গের প্রবেশ দ্বারটা ছিল, সেখানে এখন ওটা নেই!

মানে সুড়ঙ্গ-মুখটা দেখা যাচ্ছে না। গায়েব! অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে সুড়ঙ্গ-মুখটা। না ভুল হচ্ছে। আছে, কিন্তু সম্পূর্ণ বন্ধ। ধাতুর পাত দিয়ে গোটা সুড়ঙ্গ-মুখটা ঢালাই করে দেওয়া হয়েছে। কখনো যে ওখানে কিছু ছিল তা আর এখন বোঝা যাচ্ছে না। শুধু দেখা যাচ্ছে অনুজ্বল এক ঠান্ডা ধাতব পৃষ্ঠতল।

সুড়ঙ্গটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে!

কমান্ডার পিংলে ধীরে ধীরে ঘুরে আবার মুখোমুখি হলেন ‘এ’-ক্লাস লীডিটার। ওঁর মুখচোখে একটা ফ্যাকাসে বিষণ্ণতা।

‘এ’-ক্লাস লীডিটা একটু নড়ল মাত্র। “আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন সুড়ঙ্গের মুখটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এর জন্য প্রস্তুতি রেখেই ছিলাম। জানতাম একদিন এর প্রয়োজন পড়বে। যে মুহূর্তে আপনারা ভূপৃষ্ঠে উঠে এলেন স্বয়ংক্রিয় আদেশ তৎক্ষণাৎ ঘোষিত হয়ে গিয়েছিল। শুধু যদি আপনারা, যখন আমরা আপনাদের নেমে যেতে অনুরোধ করেছিলাম, তখনই নেমে যেতেন তো এতক্ষণে আপনারা পাতাল শহরের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতেন। আমাদের খুব দ্রুত কাজটা করতে হয়েছে। এটি একটা যথেষ্ট বড়ো কাজ ছিল। শুধু এই সুড়ঙ্গ মুখটা নয়, এই মুহূর্তে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রত্যেকটা সুড়ঙ্গ মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

কমান্ডার চুপ করে রইলেন। মুখার্জি রাগত স্বরে বললেন, “কিন্তু কেন?”

“কারণ আজকের এই অভিজ্ঞতার পর আপনারা যুদ্ধ আর চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি আমাদের দেবেন এটা হতেই পারে না। কিন্তু এটা এখন আরও কিছুদিন আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে। প্রত্যেকটা সুড়ঙ্গ মুখ বন্ধ করে দেওয়াতে এখন বহু মাস বা বছর লেগে যাবে মানুষের ভূপৃষ্ঠে আবার উঠে আসতে। কোনো নতুন সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে তো আরও সময় লাগবে। তার মধ্যে আমাদের এই পরিকল্পনা-চক্র তার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। আর তখন আপনাদের পৃথিবীকে অক্ষত রাখার জন্য আপনি আজকের মতো এতটা নিশ্চই বিচলিত হবেন না।

আমরা ভেবেছিলাম আপনাদের নীচে পাঠিয়ে দিতে পারব সুড়ঙ্গ-মুখ বন্ধ করার আগেই। এখানে আপনাদের উপস্থিতি আমাদের জন্য একটা বাড়তি ঝামেলা। কিন্তু কী করা যাবে! চাইনিজরাও যখন হঠাৎই উঠে এসেছিল তখনও এরকমই একটা পরিস্থিতি তৈরি—”

“চাইনিজরাও? ওরাও এসেছিল?”

“কয়েক মাস আগেই। হঠাৎই উঠে আসে ওরা। কেন ওরা যুদ্ধটা এখনও জিততে পারছে না তা জানতে। আমরাও বাধ্য হলাম দ্রুত ব্যবস্থা নিতে। এই মুহূর্তে ওরা নানারকম ভাবে চেষ্টা করছে নতুন নতুন সুড়ঙ্গ কেটে বেরিয়ে আসতে, যুদ্ধটা আবার নতুন করে শুরু করতে। আমরা অবশ্য এখনও পর্যন্ত প্রতিটি নতুন সুড়ঙ্গ তৈরি হতেই এদিক থেকে বন্ধ করে দিতে পুরোপুরি সফল।”

লীডিটা চুপ করে যায়। নিষ্পলক যান্ত্রিক চোখে তাকিয়ে থাকে।

মুখার্জি মনে হল ভয় পেয়েছেন। বললেন, “আমরা আটকে গিয়েছি। আর ফিরে যেতে পারব না। কী করব এবার আমরা?”

কমান্ডার পিংলে মুখার্জির প্রশ্নে কান দিলেন না। কী একটা ভেবে লীডিটাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা মাত্র ঘণ্টা দুয়েক হল উপরে আছি। এর মধ্যে কীভাবে এত তাড়াতাড়ি সুড়ঙ্গটা বন্ধ করলে তোমরা?”

“এটা একটা পূর্ব পরিকল্পনার অংশ। অনেক আগেই এইরকম জরুরি অবস্থার সম্ভাবনার কথা ভেবে প্রতিটি সুড়ঙ্গের প্রথম তলার ঠিক ওপরে আমরা হিট বম্ব লাগিয়ে রেখেছিলাম। এগুলো প্রচণ্ড তাপমাত্রা উৎপন্ন করে ধাতু আর পাথর একসঙ্গে ফিউজড্ করে দেয়। আমাদের হিসেবে—”

কমান্ডার পিংলে হোলস্টার থেকে বেন্ডার পিস্তলটা বের করে আনলেন। শক্ত করে ধরে রাখলেন খানিকক্ষণ। তারপর ঘুরে গিয়ে মুখার্জি আর তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা কী বলছেন? আমাদের ফেরার রাস্তা বন্ধ। কিন্তু আমরা এখনও এদের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারি। আমরা পনেরো জন আর আমাদের কাছে রয়েছে বেন্ডার পিস্তল। কী বলছেন?”

তারপর মুখার্জি আর তালুকদারের নজর লক্ষ করে চারদিকে নজর ঘোরালেন। দেখলেন বারোজন সৈনিকেরাই ততক্ষণে ওখান থেকে সরে গিয়েছে। গোডাউন বিল্ডিংটা থেকে বেরিয়ে বাইরের খোলা হাওয়ায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সবাই। কয়েকজন প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত তো কেউ কেউ টিলার ঢাল বেয়ে সাবধানে নীচে নামার চেষ্টায় ব্যস্ত।

হতভম্ব কমান্ডার আর তার দুই সঙ্গীকে লীডিটা এবার বলে, “আপনারা কিন্তু এবার আপনাদের এই উর্দী আর বন্দুক সরিয়ে ফেলতে পারেন। এই বিকিরণ-প্রতিরোধী সীসার লাইনিং লাগানো পোষাকের এখানে সত্যিই কোনো দরকার নেই। আর বন্দুক আপনাদের এখানে কোনো কাজেই লাগবে না। চাইনিজ দলটাও ওগুলো ফেলে দিয়েছে। আপনারা এক্ষুনিই তা নিজেদের চোখেই দেখতে পাবেন।”

শেষ বাক্যটি শুনেই কমান্ডারসহ বাকি দুজনও পিস্তল তুলে ট্রিগারে আঙুল চেপে সতর্কভাবে চারদিকে তাকালেন।

ইতিমধ্যে সুড়ঙ্গের মুখটার যেদিকে গোডাউন বিল্ডিংটা, তার উলটোদিকের একটা খোলা ঘাস জমিতে, যেখানে ওরা এখন দাঁড়িয়ে তার থেকে খানিকটা দূরে একটা ছোটো বিমান নিঃশব্দে এসে নেমেছে। আর সেটা থেকে নেমে চারজন চৈনিক সামরিক উর্দীধারী মানুষ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

পিস্তল তুলে ধরে লক্ষ স্থির করলেন কমান্ডার পিংলে। তারপর একবার মুখার্জি আর তালুকদারের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। দাঁত চেপে হিস হিস করে বললেন, “দেখাচ্ছি মজা!”

লীডিটা এক পা এগিয়ে সামনে এসে বলে, “ওঁরা কিন্তু নিরস্ত্র। আমরাই ওঁদের ডেকে পাঠিয়েছি যাতে আপনারা শান্তি আলোচনা শুরু করতে পারেন।”

মুখার্জি বাধা দিয়ে বলেন, “আমাদের কিন্তু বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনার কোনো অধিকার নেই।”

লীডিটা ব্যাখ্যা করে বলে, “আমরা আপনাদের কোনো কূটনৈতিক আলোচনার জন্য বলছি না। আসলে কোনো কূটনৈতিক আলোচনার প্রয়োজনই আর নেই। এ শুধু দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সমস্যা কীভাবে সমাধান করবেন এই দেশহীন একক পৃথিবী নামক গ্রহে তার জন্য এক সাধারণ আলোচনা। প্রাথমিক স্তরে আপনাদের জন্য একটু অসুবিধাজনক হবে প্রথম কিছুদিন ঠিকই, তবে কিছুদিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

 

পর্ব১৪

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের চতুর্থ দিনপৃথিবীতে সকাল পেরিয়ে দিন শুরু হয়েছে

কাছাকাছি এসে চৈনিক দলটা থমকে দাঁড়ায়। চারজনের প্রত্যেকের মুখে ফুটে ওঠে বহুদিনের জমানো রাগের হিংস্র একটা প্রকাশ। গোটা পৃথিবীর একচ্ছত্র আধিপত্যের একমাত্র বাধা এই ভারতীয়গুলো!

কোমরের দু-দিকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল চারজনেই। দেখছিল ওদের তিনজনকে। কমান্ডার পিংলে আর তার দুই সঙ্গী দুজনেই উদ্যত পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। লক্ষ স্থির চৈনিক চারজনের উপর। আঙুল ট্রিগার স্পর্শ করে তৈরি।

পুরো আড়াই মিনিট দু-পক্ষই পরস্পরের দিকে চোখে চোখ রেখে একে অপরকে মেপে চলল। তারপর চারজন চৈনিকদের মধ্যে যাকে দলপতি বলে মনে হচ্ছিল সে বলে উঠল, “আমি জেনারেল (দা জিয়াং) ডিংগ লাইহিয়াং এবং আমি দুঃখিত আমার অস্ত্র আমি আগেই ফেলে দিয়েছি। নইলে আজ আমার হাতে গত আট বছরের প্রথম ভারতীয় হিসেবে আপনিই মারা পড়তেন।”

“উহু, আপনিই হতেন কোনো ভারতীয়ের হাতে এই আট বছরে প্রথম মৃত চৈনিক ‘দা জিয়াং,’” কমান্ডার পিংলে চোখ না সরিয়ে উত্তর দিলেন। ‘দা জিয়াং’-এর ভুল চিন্তাভাবনা শুধরে দিতে চাইলেন।

লীডিটা এবার তার দুই হাত ছড়িয়ে দিল ওদের দু-দলের মধ্যে। তারপর বলল “কিন্তু যেটাই হত না কেন, আপনারা এই কয়েকজন ছাড়া সে কথা গোটা পৃথিবীতে আর কেউ জানতেও পারত না। অত্যন্ত দুঃখজনক। জানবেন এ সমস্তই অর্থহীন বীরত্ব। আপনাদের আসল লড়াই এখন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা। এখানে এই মুহূর্তে কোনো খাদ্য নেই। জল আছে— তৃষ্ণা মেটাতে কোনো অসুবিধা নেই। চলে যান নদীতে— তৃষ্ণা মেটানো দূষণহীন পরিষ্কার স্রোতস্বিনীর পরিস্রুত জলে। শ্বাস নিন পরিশুদ্ধ বাতাসে। কিন্তু খাদ্য? আপনারা ভালোই বুঝতে পারছেন যে গাছের ফল-টল ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোথাও কিছু পাবেন না।”

লীডি চুপ করার পরেও অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই যেন নিজেদের মনের ভেতরে লীডিটা বলা কথাগুলোর ওজন বোঝার চেষ্টা করছে। তালুকদারকেই প্রথম নড়েচড়ে উঠতে দেখা গেল। হোলস্টারে বেন্ডার পিস্তলটা ঢুকিয়ে কমান্ডার পিংলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এরা আমাদের একেবারে ল্যাজেগোবরে করে ছেড়েছে। দুর ছাই! এই লীডিগুলোর মাথায় বজ্রপাত হোক! আমি বলি কী যে, চলুন আমরা বরং কোনো একটা শহর কাছাকাছি খুঁজে নিই থাকবার জন্য। আপাতত। তারপর এই লীডিদের সাহায্য নিয়ে চাষবাস করে কিছু শষ্য ফলানোর চেষ্টা করি। এইভাবে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা ছাড়া আর অন্য কোনো রাস্তা তো আমি দেখছি না।”

কমান্ডার পিংলে তালুকদারের কথাটা সময় নিয়ে শুনলেন। কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। তালুকদার তাই মুখার্জির দিকে একবার মাথা নেড়ে দাঁত কিড়মিড় করে ‘এ’-ক্লাস লীডিটাকে বললেন, “ঠিক আছে। যতদিন না নীচে থেকে আমাদের পরিবারের কেউ আসতে পারছে ততদিন আমাদের এভাবেই যখন থাকতে হবে তখন তাই হোক। অসুবিধা হবে, কিন্তু উপায় যখন নেই তো যেভাবে হোক মানিয়ে নিতেই হবে।”

এবার দ্বিতীয় একজন চৈনিক বলে উঠলেন, “আমার একটা প্রস্তাব আছে। ইয়ে, আমি শেন জিনলং, পিএলএ-র ‘শাও-ওয়েই’, দক্ষিণ চিন। আমার প্রস্তাবটা হল এইরকম— আমরা কাছেই একটা শহরে কিছুটা ব্যবস্থা করেছিলাম। জায়গাটা আপনাদের দেরাদূন শহর থেকে বেশি দূরে নয়। এটা এখনও পুরোপুরি ফাঁকা। আমাদের কয়েক জনের পক্ষে সবকিছু ব্যবস্থাপনা দেখভাল করা সহজ হচ্ছিল না। ফলে আমরা তার পাশের একটা গ্রামে এখন আছি। এটা একটা আধুনিক সবরকম সুবিধাযুক্ত একটা গ্রাম। আমরা ওখানে চাষবাস চালু করার একটা চেষ্টা করছি। যদিও এত অল্প ক’জনের পক্ষে ব্যাপারটা খুবই কঠিন। আপনারা ওখানে আসতে চাইলে সবাই মিলে একটা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।”

পাশের থেকে লী জুয়োচেং বলেন, “এটা দেশটার সমন্ধে আপনারা আমাদের থেকে বেশি জানবেন। কাজেই আপনাদের থেকে অনেক কিছু শেখার থাকবে। ইয়ে, আমি ছিলাম পিএলএ-র ‘জিউ ইউয়ান’, পূর্ব সীমান্ত রক্ষীবাহিনী। আমার নাম লী জুয়োচেং।”

এবার তিনজন ভারতীয়ই একসঙ্গে হেসে ওঠেন। প্রত্যেকে নিজেদের পরিচয় দেন। তারপর মুখার্জি বলেন, “আপনারাও নিশ্চই আমাদের অনেক কিছুই শেখাবেন। যদিও জানি না সেগুলো কী। তবে আপনাদের খাদ্যাভাস আমার শেখার কোনো ইচ্ছে নেই।”

এবার হো হো করে হেসে ওঠেন ওখানে উপস্থিত প্রত্যেকে। লীডিটা শুধু নীরব। খাদ্যাভাস নিয়ে করা রসিকতাটা সে বুঝে উঠতেই পারে না।

হাসির মধ্যে দিয়ে পরিবেশটা একটু হালকা হয়ে যেতেই দা-জিয়াং যে কথাটা বললেন, সেই সামান্য কথাটাই যে আবহাওয়া আবার গরম করে দিতে পারে তার বিন্দুমাত্র আভাস তার কাছে ছিল না বলেই মনে হল। বলার মধ্যে দা জিয়াং শুধু বলেছিলেন যে, “আপনারা কি তবে আমাদের গ্রামে আসতে রাজি আছেন?” কথোপকথনের ধারাবাহিকতায় এ অতি স্বাভাবিক এক প্রশ্ন। তাঁরা অল্প কয়েকজন মিলে জীবনধারণের যে লড়াইটা ওই গ্রামে শুরু করছেন সেখানে আরও কিছু সদস্য বাড়লে সুবিধা হতে পারে বলে মনে করাটা এমন কিছু অন্যায় নয়।

কিন্তু ওই প্রশ্নের পরেই কমান্ডার পিংলে তো ক্ষেপে উঠলেনই, সঙ্গে মুখার্জি আর তালুকদার-ও প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলেন।

কমান্ডার পিংলে হোলস্টারে ঢুকিয়ে ফেলা পিস্তলটা একটানে বের করে উঁচিয়ে ধরে প্রায় চীৎকার করে বললেন, “আপনাদের গ্রাম? কী বললেন, আবার বলুন তো দেখি! ওটা আমাদের গ্রাম। এই ভারতবর্ষের গ্রাম। কোনো সন্দেহ?”

লীডিটা দু-হাত বাড়িয়ে ওদের দু-দলের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে। “থামুন আপনারা। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যখন সবকিছু হয়ে যাবে তখন এই আমার তোমার ব্যাপারটাই পালটে যাবে। তখন “আমার” মানে হবে “আমাদের”, আর “আমাদের” বললে বুঝতে হবে সমগ্র মানবজাতির কথা।”

আঙুল দিয়ে এবার লীডিটা নির্দেশ করে ছোটো বিমানটার দিকে। ওটা ততক্ষণে লীডিটার ইশারায় ইঞ্জিন চালু করে গর্জন করতে শুরু করে দিয়েছে। লীডিটা বিমানটা দেখিয়ে দু-দলকে বলে, “বিমান অপেক্ষা করছে। আপনারা কি পরস্পরকে সাহায্য করার জন্য একত্রিত হয়ে নতুন জীবনের শুরু করবেন?”

চৈনিক দলটা কোমর ঝুকিয়ে প্রত্যেককে বাও করে বিমানের দিকে হাঁটা দেয়। ভারতীয় দলটা দেখা গেল নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলে নিচ্ছে। কমান্ডার পিংলে বারোজন সৈনিক আর সঙ্গী দুজনকে একত্রিত করে তখন বলছিলেন, “দেখুন এই পরিস্থিতিতে লীডিদের বক্তব্য অনুযায়ী যা বুঝলাম তা হল এখন থেকে কূটনীতি ব্যপারটাই ‘নাই’ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যখন একসঙ্গে থাকার ব্রত নেয় তখন কূটনীতির আর প্রয়োজনটাই থাকে না। তারা নিজেদের সমস্যার সমাধান তাদের নিজেদের কর্মক্ষেত্রেই করে নিতে পারে। কোনো আলোচনার টেবিলের প্রয়োজন পড়ে না। আর এই নতুন পৃথিবীতে সবাই শুধুই মানুষ। ওই গ্রামে কোনো ভারতীয় বা চৈনিক থাকবে না। শুধুই মানুষ থাকবে। যারা মানুষ হতে চাইবে না তারা ইতিহাস হয়ে যাবে। চলুন সবাই আমরা মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি।”

লীডিটা ওদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে বিমানের কাছে পৌঁছে দিয়ে বলল, “ইতিহাসের লক্ষ্যই হচ্ছে বহু থেকে এক হওয়া। একমবাদ্বিতীয়ম পৃথিবীর গঠন। ব্যক্তি থেকে পরিবার হয়ে সমাজ। বাড়ি থেকে গ্রাম-শহর হয়ে প্রদেশ, সেখান থেকে দেশ, তারপর মহাদেশ হয়ে যুক্ত হতে হতে এক এবং একমাত্র পৃথিবী। ইতিহাসের এই পর্যায়ে মহাদেশগুলো লড়াই করছে একত্রিত হওয়ার জন্য। আমরা লীডিরা এক অনুঘটকের কাজ করছি মাত্র, এই একত্রীকরণকে রক্তপাতহীন করে এগিয়ে দেওয়ার জন্য—”

তালুকদার চলতে চলতে একসময় শোনা বন্ধ করে থেমে গিয়ে পেছন ঘুরে তাকায় দূরে ছেড়ে আসা বন্ধ সুড়ঙ্গটার দিকে। মনিদীপা রয়ে গেল ওই মাটির নীচের পাতাল শহরে। বাড়ি থেকে শেষবারের মতো বেরিয়ে আসার সময়ে মনিদীপাকে কি বিদায় জানিয়েছিলেন? মনে পড়ছে না এখন। শুধু চোখে ভাসছে বেরোনোর সময় ওর ভেজা ভেজা চোখ দুটোর কথা। ভেতরটা তালুকদারের কেঁদে ওঠে। ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে মনিদীপার কাছে। যদিও বোঝেন যে ওই সুড়ঙ্গ পুনরায় না খোলা পর্যন্ত আর মনিদীপাকে দেখতে পাবেন না। হাতের পেছন দিয়ে মুছে নিলেন দু-চোখ বেয়ে নেমে আসা জলের ফোঁটা। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনুসরণ করলেন এগিয়ে যাওয়া দলটার। নতুন এক জীবনের লক্ষ্যে।

 

পর্ব১৫

UG-8 (Underground Era – 8 বা ভূগর্ভস্থ যুগ); AC – 52 বা কপ-৫২ (After Corona 52 বা করোনা পরবর্তী – ৫২); সপ্তম মাসের চতুর্থ দিনপৃথিবীতে নতুন দিনের শুরু হয়েছে

যদি এই ছোটো প্রাক্তন পারস্পরিক শত্রু দলটার মানুষগুলো এক সাধারণ উদাহরণ হয় বাদবাকি সমস্ত শত্রুপক্ষ-এর, তো আর খুব বেশিদিন লাগবে না যেদিন আবার তিনি মনিদীপার সঙ্গে একসঙ্গে এই পৃথিবীর বুকে, এক সমগ্র মানবজাতির একটা অংশ হয়ে জীবন যাপন করতে পারবেন। এক যুক্তিবাদী মানবজাতির অংশ, যারা নিজেদের মধ্যে মাংসের টুকরোর ভাগাভাগি নিয়ে কুকুরের মতো কামড়া-কামড়ি করে না বরং এক পারস্পরিক ঘৃণাহীন সমাজের অংশ হিসেবে জীবনযাপন করে।

‘এ’-ক্লাস লীডিটা বলে যাচ্ছিল তখনো, “ইতিহাসের এই পর্যায়ে পৌঁছোতে হাজার হাজার প্রজন্ম, শত শত শতাব্দীর রক্তক্ষয়ী আর ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধই এক পা এক পা করে মানুষকে এগিয়ে দিয়েছে এক সংযুক্ত মানবজাতি হয়ে ওঠার দিকে। আর এখন তো আমরা খুব সামনেই দেখতে পাচ্ছি— এমন এক পৃথিবী যেখানে কোনো যুদ্ধ নেই। আর সেখান থেকেই শুরু হবে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। মানবজাতির এগিয়ে যাওয়ার এক নতুন গল্পের শুরু।”

লীডি চুপ করে। বিমানটার ইন্জিনের গর্জন ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। হু হু করে বাতাস বইছে। মাথার ওপরে নীল আকাশে ভেসে যাচ্ছে মেঘের দল। ঝকঝক করছে সূর্য।

সেই দিকে তাকিয়ে থেকে দা-জিয়াং ডিংগ লাইহিয়াং একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন, “ব্রহ্মাণ্ড অভিযান।”

মুখার্জি বললেন, “জীবনের অস্তিত্বের খোঁজ।”

তালুকদার বলে উঠলেন, “সবার আগে ক্ষুধা আর দারিদ্র্য দূরীকরণ।”

লীডিটা এগিয়ে গিয়ে বিমানের দরজা খুলে দেয়। একপাশে সরে গিয়ে সবাইকে ভেতরে ঢুকতে ইশারা করে। বলে, “এ সমস্তই এবং আরো বেশি কিছু। কতটা বেশি? আর কী কী? এই মুহূর্তে আমরা সেই লোকটার থেকে বেশি কিছু জানি না যে কিনা প্রথম গাছ থেকে নেমে বা গুহা থেকে বাইরে বেরিয়ে একটা দল তৈরি করে হয়তো আজকের এই দিনটার কথা ভাবতে পেরেছিল। পেরেছিল কি? কেউ জানে না। তবে এটা আমরা এই মুহূর্তে সবাই জানি যে এবার যাই হোক না কেন সেটা হবে মানুষ জাতির জন্য এক অকল্পনীয় বিশাল একটা কিছু। হয়তো পরের ধাপে পা দিতে আর বেশিদিন লাগবে না। এই নীহারিকাপুঞ্জর ছত্রছায়া কাটিয়ে মানব জাতি হয়তো কয়েকশো বছর পরেই পৌঁছে যাবে মহাবিশ্বের অপর প্রান্তে। তৈরি করবে “নতুন পৃথিবীর।”

বিমানের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। আকাশে উঠে বিমানটা মনুষ্য জাতির প্রথম প্রতিনিধি দলটাকে তাদের নতুন বাসস্থানের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল। দশ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার এক গহন বন থেকে বেরিয়ে যে হোমোস্যাপিয়ন্সের দলটা পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাদেরই বহু বহু প্রজন্মের পরের একটা দল দশ লক্ষ বছর পরে আবার রওনা হল— নতুন পৃথিবীর সন্ধানে— এবার একত্রিত হওয়ার লক্ষ্যে।

 

মন্তব্য: ফিলিপ কে. ডিক-এর এই উপন্যাসটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেনের অন্তর্গত।

Tags: অনুবাদ উপন্যাস, ফিলিপ কে. ডিক, রুদ্র দেব বর্মন, সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

2 thoughts on “নতুন পৃথিবীর সন্ধানে

  • August 26, 2022 at 4:24 pm
    Permalink

    ভালো লেগেছে

    Reply
    • September 1, 2022 at 9:07 pm
      Permalink

      ধন্যবাদ। অন্তত একজনের ভালো লেগেছে জানতে পেরে আমি আপ্লুত।

      Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!