নক্ষত্রবালিকা

  • লেখক: প্রদীপ কুমার সেনগুপ্ত
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

মার্চ মাস। আন্টার্কটিকার ক্যাস্টিলো টু বেস স্টেশন। লারশেনফিল্ড গ্লেশিয়ারের পাশে বেরট্রাব নুনাটাকের উপর। জায়গাটা লিটলউড নুনাটাকের থেকে আরো দশ কিলোমিটার পশ্চিম দক্ষিণ পশ্চিমে। এর কাছেই দুটো ছোট ছোট নুনাটাক মাথা তুলে রয়েছে। নুনাটাক মানে হল পাহাড়ের চূড়া, হাজার ফুট পুরু বরফের স্তরের উপরে দ্বীপের মতো জেগে রয়েছে।

এখানে মেটাল শিটের বিশাল বিশাল কেবিনের পাশে একটা প্রকাণ্ড অ্যান্টেনা আকাশের দিকে মুখ করে রয়েছে। সূর্য এখনও পনেরো দিন একটানা আলো দিয়ে যাবে। দক্ষিণ মেরুর শীত আসতে দেরী আছে। পেঙ্গুইনরা এ সময় বাসা বানাতে শুরু করে। বরফের উপরে পাথরের নুড়ি জড়ো করে বানানো গোল বাসা। পেঙ্গুইনদের ঝগড়া আর চিৎকারে আকাশ মুখরিত হয়ে থাকে। আমি বেস স্টেশনের বিশাল সাঁজোয়া গাড়ির মতো দেখতে পোলার রোভারটার গায়ে হেলান দিয়ে দূরবিন দিয়ে পেঙ্গুইনদের ঝগড়া দেখছিলাম। প্রায় একমাস হল ন্যাচারাল হিস্ট্রি স্পেসিমেন কম্পানির পক্ষ থেকে জিওলজিস্ট হিসাবে এখানে যোগ দিতে এসেছি। আর এই এক মাস ধরে অবাক বিষ্ময়ে সে দেখছি কীভাবে সূর্য চব্বিশ ঘণ্টা আলো দিচ্ছে। আর বড় জোর পনেরো দিন। তার পরই একটু একটু করে দিন ছোট হতে শুরু করবে।

 তানাকা কেবিন থেকে বের হয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো, বলল, “কী দেখছ?”

আমি বললাম, “পেঙ্গুইনদের ঝগড়া।”

তানাকা বলল, “কালকে আমরা ওখানে কিছু পাথর রেখে এসেছিলাম, তাই নিয়েই বোধ হয় ঝগড়া হচ্ছে।”

আমি হাসলাম। তানাকা আমার বস। জিওফিসিসিস্ট বা ভূপদার্থবিদ। এখানকার প্রস্পেক্টিং এর জন্য যে সব যন্ত্রপাতি বা জিওফিজিকাল সাউন্ডিং সিস্টেম লাগে তার ইনচার্জ। অত্যন্ত জ্ঞানী একজন মানুষ। পৃথিবীর অনেক দেশে ঘুরেছে। আমাকে বলে, “আমি জিরো ল্যাটিচুড টু জিরো ল্যাটিচুড ঘুরেছি।”তার মানে এক মেরু থেকে অন্য মেরু পর্যন্ত ঘুরেছে। তানাকা মনেপ্রাণে বৌদ্ধ। নিয়ম করে ধ্যান করে। যখন ধ্যান করে মনে হয় একটা প্রশান্তি পুরো কেবিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

তানাকার একটি পাঁচ বছরের মেয়ে আছে। ধ্যান শেষ করে উঠে মেয়ের ছবিতে চুমু খায়। একটা খাতা খুলে জাপানী হরফে কয়েকটা কথা লেখে। আমি ওকে প্রশ্ন করেছিলাম, তুমি কাগজে কী লেখ?” সে বলেছিল, “মন্ত্র লিখি। এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের যেখানে যা কিছু আছে, প্রাণ অপ্রাণ, বুদ্ধিমান, না বুদ্ধিমান, মানুষ, নামানুষ সকলের জন্য কল্যাণ কামনা করে মন্ত্র লিখি।”

এই বরফের রাজ্যে দিগন্তবিস্তারী ধবল ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে, নৈঃশব্দ ও নির্জনতার মধ্যে একটা ভয় মেশানো প্রশান্তি আছে। ক্ষণিক অ্যাস্ট্রোনমিকাল সন্ধ্যার বিরল প্রহরে আকাশে যখন লক্ষ কোটি তারা ফুটে ওঠে, অরোরা অস্ট্রালিসের ক্ষণপ্রভা একবার দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় মনে হয় আমার সত্বার আলাদা অস্তিত্ব অনুভব করার কোনো মানে হয়না। আমি এই তেরশো কোটি বছরের পুরোনো ব্রহ্মান্ডের এক অতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।

আমাদের এই বেসে চব্বিশজন মানুষ আছে। লেবার ও কুক ছাড়াও রয়েছে একজন ফিজিসিস্ট, নাম জুয়ান পাবলো পাজ, আর্জেন্টিনার একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে, ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে গবেষণা করছে। এখানকার বায়োলজিস্ট সান্ড্রা, বছর চল্লিশেকের একজন মহিলা। আর আছে মাইক্রোবায়োলজিস্ট কারেন হালবার্গ। এরা সবাই আর্জেন্টিনা থেকেই এসেছে। চারজন জুনিয়ার সায়েন্টিস্ট আছে। তারা এদেরকেই সাহায্য করে।

আমি আর তানাকা আর আমাদের একজন ম্যানেজার এনরিক গোভিওলা এই ক্যাস্টিলো টু বেস স্টেশনের গেস্ট। তাহলে ব্যাপারটা খুলেই বলি। অ্যান্টার্কটিকা বা বরফে ঢাকা দক্ষিণের এই মহাদেশ এখনও অজানা রহস্যে ভরা। এর প্রায় পঁচানব্বই শতাংশই বরফে ঢাকা। তাই আন্টার্কটিকার ভূতত্ব সম্পর্কেও এখন পর্যন্ত খুব কম জানা গেছে। এ ছাড়া আন্টার্কটিকার আরো একটা রহস্য রয়েছে। একমাত্র এই মহাদেশ এই সৌরজগতের ইতিহাস সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা দিতে পারে। তার কারণ, এই মহাদেশের এক কোটি বিয়াল্লিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে এসে পড়া হাজার হাজার উল্কাপিন্ড। এই উল্কাপিন্ডের ভিতরে লুকিয়ে আছে, এই সৌরমন্ডল ও প্রাণ সৃষ্টির রহস্য।

পৃথিবীর অন্যত্রও উল্কাপাত হয়। সেগুলি সময় মতন খুঁজে না পেলে তা আবহবিকারগ্রস্ত হয়ে যায়, মাটির সঙ্গে মিশে যায়, অথবা কেউ কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে তা দিয়ে অন্য সব কাজ করে। আন্টার্কটিকাতে সেই ভয় নেই। এখানে কোনো উল্কাই মাটির সঙ্গে মিশে যায় না, বা কেউ এসে কুড়িয়ে নিয়ে যায় না। এখানে মৃতদেহ যেমন পচেনা তেমনি মহাকাশ থেকে আছড়ে পরা উল্কাও অবিকৃত থাকে।

আমাদের কম্পানি এখানে কোনো গবেষণা করে না। উল্কার খোঁজ করে। উল্কা সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে কালেক্টারদের কাছে। কিছু বিশেষ ধরনের উল্কা বিক্রি করে বিভিন্ন গবেষণাগারে বা মিউজিয়ামে। তিন বছর হল তারা এই ব্যবসা করছে। আর এই সূত্রেই আমার আগমন। ক্যাস্টিলো টু স্টেশন আমাদেরকে এই গ্রীষ্মকালে আশ্রয় দেয়। আমরা তিন মাস এখানে থাকি, উল্কা সংগ্রহ করি, তারপর ফিরে যাই। উল্কা সাধারণতঃ তিন ধরনের হয়। এক ধরনের উল্কাকে বলা হয় লোহা উল্কা বা আয়রন মিটিওরাইট। তার প্রায় সবটাই লোহা আর নিকেল দিয়ে তৈরি। লোহার তৈরি উল্কাগুলি হল অ্যাস্টোরয়েডের কেন্দ্র। পৃথিবীর কেন্দ্রে যেমন ভারি ধাতুগুলি গলিত অবস্থায় রয়েছে, অ্যাস্টরয়েডের কেন্দ্রেও তাই ঘটে। লোহা নিকেল এই সব ধাতু কেন্দ্রে গিয়ে জমা হয়। তারপর শক্ত হয়ে যায়।

এছাড়া পাওয়া যায় লোহা ও পাথরের সংমিশ্রিত উল্কা। এর মধ্যে প্রায় সমপরিমাণে লোহা, নিকেল ও সিলিকেট খনিজ থাকে। আর এক ধরনের উল্কা আছে যা পুরোটাই নানা সিলিকেট খনিজ দিয়ে তৈরি। এদের স্টোনি মিটিওরাইট বলা হয়। অনেক সময় চাঁদ অথবা মঙ্গলগ্রহ থেকে ছিটকে আসা পাথরের টুকরোও উল্কা হিসাবে পাওয়া যায়।

এখানে আসার পর তানাকা আমাকে উল্কা সংগ্রহের পদ্ধতি বুঝিয়ে দিয়েছিল, “আমাদের উল্কা সংগ্রহের পদ্ধতিটা বেশ অভিনব। এর জন্য আমরা অনেকগুলি পদ্ধতি অনুসরণ করি। লৌহ উল্কা খোঁজার জন্য আমরা মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করি। আমাদের কম্পানির পেটেন্টেড এক ধরনের ডিটেক্টর আছে, যেটা মিনিটে দশ বর্গমিটার জায়গা স্ক্যান করতে পারে। এছাড়া আরো নানা ধরনের জিওফিসিকাল সাউন্ডিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয় যার ফলে বরফের নীচে পাঁচ মিটার পর্যন্ত গভীরে থাকা উল্কা স্ক্যানারে ধরা পরে। তবে খুব গভীরে থাকা উল্কা তুলে আনা খুব কঠিন। আমাদের মেকানিকাল অগার ওই পাঁচ মিটার পর্যন্তই কাজ করে।”

এই সমস্ত যন্ত্রই একটা একটা গাড়িতে বসানো থাকে। এটা একটা মার্স ওয়ান হামভি। লম্বায় প্রায় পাঁচ মিটার। দু পাশে চারটে বেল্ট লাগানো চাকা, যাতে এটা স্বচ্ছন্দে বরফের উপর চলতে পারে। সঙ্গে একটা মেকানিকাল স্লেজ আছে। সেটা দরকার হলে ব্যবহার করা যায়। এক দিনে আমরা তিন থেকে চার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় প্রসপেক্টিং করি। বরফের নীচে উল্কার সন্ধান পাওয়া গেলে তা আমাদের মনিটরের পর্দায় ফুটে ওঠে।

প্রথম দিন যখন তানাকা আমাকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিল, আমি তানাকাকে প্রশ্ন করেছিলাম, “এভাবে আমরা এক দিনে কতটা উল্কা সংগ্রহ করতে পারি?”

তানাকা বলেছিল, “কোনো ঠিক নেই, কোনোদিন কিছুই পাওয়া যায়না। আবার কোনো দিন তিন চার কিলোগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া যায়। গত বছর আমাদের উল্কা সংগ্রহ হয়েছিল আড়াইশো কিলোগ্রামের মতো। যার ফলে সব রকমের খরচ আর রেভেনিউ মিটিয়ে আমাদের কম্পানি প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার লাভ করেছে।”

আমি বলেছিলাম, “বাপরে! এত লাভ?”

তানাকা বলেছিলো, “মিটিওরাইটের বাজার বেশ ভালো। কোনো কোনো মিটিওরাইট সোনার থেকেও দামি। এক গ্রাম উল্কার দাম এক ডলার থেকে শুরু করে হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। আর সারা পৃথিবী জুড়েই এর বাজার আছে।”

আমরা যেখানে মিটিওরাইট প্রস্পেক্টিং করি সেই এলাকাটা আর্জেন্টিনার অধীনে। যদিও আন্টার্কটিকাতে কোনো রাষ্ট্র নেই কিন্তু অনেকগুলি রাষ্ট্র পুরো মহাদেশটাকে ভাগ করে দখল করে রেখেছে; এগুলিকে ক্লেইম বলে। ২৫ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমা থেকে ৭৪ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমা পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ক্লেইম। আর্জেন্টিনার দখলে রয়েছে প্রায় চোদ্দ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। আর্জেন্টিনা ছাড়াও এর পাশে রয়েছে চিলির দখলে থাকা ভূমিখন্ড। এর পশ্চিমে আছে টেরা নুবিয়া বা নো ম্যান্স ল্যান্ড। যে অঞ্চলে কারো মালিকানা নেই। তানাকা বলল, “আমার জন্মেরও আগে ১৯৫৭ সালে আন্তর্জাতিক জিওফিজিকাল ইয়ার উপলক্ষে একটা আন্তর্জাতিক ট্রিটি হয়। একটা আন্তর্জাতিক কন্ডমনিয়াম গঠিত হয়। ঠিক হয় আন্টার্কটিকায় গবেষণার জন্য এক দেশ অন্য দেশকে সাহায্য করবে। এক দেশের সংগ্রহ করা তথ্য অন্য দেশ শেয়ার করতে পারবে।”

আমি প্রশ্ন করলাম, “সরকারি কোনো সহায়তা বা অনুমোদন ছাড়া একটা প্রাইভেট কম্পানি এখানে কাজ করতে পারে?”

তানাকা বলল, “প্রাইভেট কম্পানি স্বাধীনভাবে এধরনের কাজ করে না। আমরা এসেছি আর্জেন্টিনার পোলার স্কাউটিং প্রোজেক্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। আমাদের কাজটাও সরকারি তদারকিতে হচ্ছে।”

এবছর আমাদের কম্পানি আশা করছে গত বছরের থেকে বেশি উল্কা সংগ্রহ হবে। এর জন্য তারা আমাদের টার্গেট ঠিক করে দিয়েছে। এবার অন্তত দ্বিগুণ উল্কা সংগ্রহ করতেই হবে। এবছর বেশি করে সংগ্রহ করা থাকলে সামনের বছর আর আসতে হবেনা। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা অবস্থা আমরা টার্গেটে পৌঁছাতে পারব কিনা সন্দেহ আছে। আমরা চেষ্টা করি আয়রন নিকেল মিটিওরাইট সংগ্রহ করতে, কারণ এদের দাম খুব বেশি।

২৪ শে মার্চ আর্জেন্টিনা সময় রাত বারোটায় পার্টি হল সে দেশের দিয়া দেলা মেমোরিয়া পোর লা ভেরদাদ ই লা খুস্তিতিয়া বা সত্য ও বিচারের স্মৃতি দিবস উপলক্ষে, সম্পূর্ণ দিনের আলোতে। আজ সূর্য প্রথম দিগন্তের অন্তরালে চলে গেল ক্ষণিকের জন্য। বছরের প্রথম সূর্যাস্ত। এখানে বিজ্ঞানী ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়ে চব্বিশজন মিলে পার্টি করলাম। তানাকা ছোট্ট ছোট্ট চিনামাটির কাপে সাকে পরিবেশন করল। সাকের স্বাদ আমার ভালো লাগেনি। আর্জেন্টিনার রেড ওয়াইন ‘কারা সুর ক্রিওয়িয়া সেবাস্তিয়ান সুকারডির’ স্বাদ অনেক ভালো। বেসের বায়োলজিস্ট সান্ড্রা নিয়ে এসেছে।

২৫ শে মার্চ সকাল আটটা। আমাদের এবার বের হতে হবে। আমাদের প্রস্পেক্টিং ভেহিকল উল্কা খোঁজার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা। এর ব্যাটারিগুলি চার্জ দেওয়া হয়ে গিয়েছে। দুটো ডিজেল ট্যাঙ্কে ডিজেল ভরাও হয়ে গিয়েছে। অগার চালানোর জন্য একটা ইঞ্জিন চালাতে হয়। একটা জেনারেটার আছে। তার জন্য প্রচুর ডিজেল দরকার হয়। প্রয়োজন হলে তার থেকে ব্যাটারি চার্জ করতে হয়। গরম জল তৈরির ব্যবস্থাও রাখতে হয় অগার ড্রিলিং এর সময় বরফের উপর ছেটানোর জন্য। গাড়ির মাথার উপরে দুটো টু সিটার স্নোমোবাইল রাখার ব্যস্থা আছে। আপদে বিপদে দ্রুত চলাফেরা করার জন্য।

আজকে আমরা যাব লারশেনফেল্ড হিমবাহের উপরে কিছুটা জায়গায় প্রসপেক্টিং করতে। এই জায়গার নাম ভাশেল বে। এখানে হিমবাহ সমুদ্রের একটা খাঁড়ির উপর এসে পড়েছে। হিমবাহের গভীরতাও খুব বেশি নয়। এর প্রান্তে, হিমবাহ যেখানে সমুদ্রের জলরাশির সঙ্গে মিশছে তার কাছেই নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার বরফ কাটার জাহাজ আলমিরান্তে এস্তেভে। আমরা যেখানে এসেছি তার প্রায় বারো কিলোমিটার দূরে রয়েছে জাহাজটা। ভাসেল বের উপর হিমবাহ ভাসছে। সমুদ্রে পড়ে ভেঙে যাওয়ার আগে হিমবাহের উপর বিশাল বিশাল ফাটল তৈরি হয়। এগুলিকে ক্রিভাস বলে। আমি দূরবিন দিয়ে এগুলিকেই দেখছিলাম। অনেক সময় এই ফাটলগুলির ভিতরেও এমন কিছু পাওয়া যায় যা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সাহায্য করে। উল্কাও জুটে যায় কোনো কোনো সময়ে।

আমাদের হামভি যান লারশেনফেল্ড হিমবাহের উপর একটা বড় ক্রিভাসের কাছে এসে থামল। এটা পার হওয়া যাবেনা। প্রায় ত্রিশ মিটার চওড়া একটা ফাটল। এর আগে অনেকগুলি ছোট ছোট ফাটলে উঁকি দিয়ে দেখেছি, কিছু পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। এই বিশাল ফাটল একটা অতলান্ত গহ্বরের মতো হাঁ করে রয়েছে।

আমরা হামভি থেকে বেরিয়ে ক্রিভাসের ধারে এসে দাঁড়ালাম। এখন সময় বেলা বারোটা। সূর্য পনেরো ডিগ্রি উপরে থেকে আলো দিচ্ছে। ক্রিভাসের ভিতরে উঁকি মারতেই চোখে পড়ল অদ্ভুত এক দৃশ্য। প্রায় দু মিটার নীচে বরফের দেয়ালের থেকে একটা ছোট্ট জুতো পরা পায়ের মতন কিছু বেরিয়ে আছে। হিমবাহের উপরের দিকে থাকে নরম বরফ। যত নীচের দিকে যাওয়া যায় তত বরফ শক্ত হতে থাকে। নরম বরফের নীচের তলার স্তরের বরফকে বলে ফার্ণ। খুব শক্ত না হয়ে যাওয়া বরফ। সেই ফার্ণের স্তরের নিচেই ওটাকে দেখা যাচ্ছে। আমি তানাকা কে ডাকলাম ওটা দেখানোর জন্য।

তানাকা দেখে বলল, “ইন্টারেস্টিং জিনিস মনে হচ্ছে। জায়গাটা স্ক্যান করতে হবে।” আমাদের সঙ্গে দুজন লেবার কাজ করে তারা ও আমরা ধরাধরি করে স্ক্যানারটা ক্রিভাসের কাছে নিয়ে এলাম। খুব কাছে যাওয়া যাবেনা, বরফ ভেঙে পড়তে পারে। স্ক্যানের প্রোবের অংশটা এক মিটার ব্যাসের একটা চাকতি, তার সঙ্গে একটা ডান্ডা লাগানো। সেটা নিয়ে ক্রিভাসের পাশে বরফের উপর বোলাতে শুরু করলাম।

অনেকটা এলাকা স্ক্যান করার পরে মনিটরের পর্দায় যা দেখা গেল তাতে মনে হল একটা মানুষ বরফের নীচে শুয়ে আছে। তার আশে পাশে কয়েকটা ধাতুর টুকরো। মানুষটার হাত পা মাথা সবই অবিকৃত আছে বলেই মনে হচ্ছে, তবে আকারে খুব ছোট, এক মিটারের কিছু বেশি।

তানাকা বলল, “অদ্ভুত ব্যাপার। যাই হোক ওটাকে ও ধাতুর টুকরোগুলিকে তুলে আনতে হবে। মুখে বললেও ব্যাপারটা খুব কঠিন। বড় অগারটা ক্রিভাসের এত কাছে আনা যাবেনা। ভেঙে পড়তে পারে। কাজেই ঠিক হল ক্রিভাসের ভিতরে নেমে পাশ থেকে খুঁড়ে ওটাকে বের করে আনতে হবে। এর জন্য আরো লোকজন চাই। দড়ি চাই। পর্বতারোহনের সরঞ্জাম চাই। ক্রেন দরকার। ক্রিভাসের দেয়ালে স্থির হয়ে কাজ করার জন্য একটা ঝোলানো প্লাটফর্ম বানাতে হবে।”

সব কিছু ব্যবস্থা করতে প্রায় সাত আট ঘণ্টা লেগে গেল। ওই দেহটা যেখানে আছে তার একটু নীচে একটা দু মিটার লম্বা প্ল্যাটফর্ম ক্রেন থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। ওর উপর দাঁড়িয়ে ইলেকট্রিক করাত দিয়ে বরফ কাটতে হবে। ফার্ণের নীচে এই জায়গার বরফ স্বচ্ছ নীল রঙের। তার ভিতরে তাকালে মনে হয়ে জলতলের কোনো দৃশ্য দেখছি।

আমারা হিসাব করে দেখলাম দেড় মিটার লম্বা দু মিটার গভীর একটা বরফের চাঙরকে কেটে তুলে আনতে প্রায় দশ থেকে কুড়ি ঘণ্টা সময় লেগে যাবে। যদি কোনো দুর্ঘটনা হয় তাহলে কী হবে বলা কঠিন। আমরা আঠারো ঘণ্টা একটানা কাজ করে অবশেষে একটা স্বচ্ছ নীল বরফের চাঙর তুলে আনতে সক্ষম হলাম। কাজের ফাঁকে সকলেই পালা করে গাড়ির ভিতরে দু তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়েছি। বরফের চাঙরের সঙ্গে বেশ কিছু ধাতুর টুকরোও পাওয়া গেছে। দেখে মনে হয়ে কোনো যন্ত্রের ভাঙা টুকরা।

এই বরফটা কত পুরোনো সেটাও জানা দরকার মনে করে কয়েকটা স্যাম্পেল নেওয়া হল। বরফের বয়স নির্ধারণ করা সহজ নয়। বলা হয় যে আন্টার্কটিকার বরফের চাদর প্রায় সাড়ে চার কোটি বছরের পুরোনো। এই সাড়ে চার কোটি বছর ধরে বরফ জমছে। বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন সময়ের বরফ জমে আছে। সব স্তরেই সময়ের কিছু পদচিহ্ন লুকিয়ে আছে। ভূতাত্বিকরা সেগুলি চিনতে পারে। প্রয়োজন হলে রেডিওঅ্যাকটিভ ডেটিং পদ্ধতির সাহায্যে বয়স বের করতে হয়। এই স্টেশনে শুধুমাত্র রেডিওকার্বন ডেটিং করার জন্য একটা অ্যাক্সেলেটর মাস স্পেক্ট্রোমিটার আছে। অন্য ধরনের রেডিওঅ্যাকটিভ ডেটিং করতে গেলে অন্য দেশের ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে হবে। তানাকা বলল, “আমার মনে হয় না খুব একটা পুরোনো। রেডিওকার্বন ডেটিং করলেই বেরিয়ে আসবে।”

আমি বললাম, “জিওলজিকাল সিগনেচার কিছু পাওয়া যায় কিনা দেখা যাক। অনেক সময় বরফের মধ্যে খুব সামান্য পরিমাণে আগ্নেয়গিরির ছাই পাওয়া যায়। সেই ছাই বিশ্লেষণ করে সেটা কোন আগ্নেয়গিরির ছাই এবং সেটি কোন ভূতাত্বিক সময়ের তাও বের করা যায়।”

বরফের চাঙড়ের ভিতরে সব কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। ভিতরে একটা মানুষের দেহ, এক মিটারের থেকে একটু বড়। মাথায় হেলমেট, পরণে স্পেস সুটের মতো একটা পোশাক। ভিতরে আলোর প্রতিফলনের জন্য মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু মনে হচ্ছিল ছোট্ট মানুষ একটা। শুয়ে আছে।

এই মানুষের দেহটা দেখে আমাদের মনে যে প্রথম প্রতিক্রিয়া হল তা বিষ্ময়ের। এতকাল ধরে বরফের নীচ থেকে শুধু উল্কাপিন্ড উদ্ধার করে গিয়েছি। বরফের নীচে উল্কা পাওয়া সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু এরকম একটা মানুষের দেহ এত গভীর বরফের নীচে হঠাৎ করে আসতে পারেনা। পোষাকটাও অদ্ভুত। দেখতে স্পেস স্যুটের মতো। পিঠের কাছে একটা বাক্সের মতো। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল এর আকার। কোনমতেই একে একটা পূর্ণবয়স্ক মানুষ বলা যাবেনা। আমাদের দলে যারা কাজ করছিল তারা প্রথমে ভেবেছিল অনেক প্রাচীন কোনো অভিযাত্রী দলের সাথি কোনো বাঁদর বা ঐ ধরনের কোন প্রাণির মৃতদেহকে কোনো বিশেষ পোশাক পরিয়ে বরফের নীচে রেখে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটু ভালোভাবে দেখলেই তফাতটা বোঝা যাচ্ছে। একেবারেই মানবেতর কোনো পশুর মতো দেখতে নয়। চেহারাটা মানুষের খুব কাছাকাছি।

বরফের চাঙড়টা স্বচ্ছ হলেও ভিতরের সবকিছু ততটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তা হলেও আমার কেবল মনে হতে লাগল এটা আমরা যা ভাবছি তা নয়। তানাকা প্রথমে মুখ খুলল, “এটা কী বুঝতে পারছ?”

আমাদের সঙ্গে আমাদের অ্যাস্ট্রোফিসিসিস্ট জুয়ান পাবলো পাজ অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। সে হঠাৎ বলে উঠল, “আমার মনে হচ্ছে আইগো কাইদো দেল এসপাসিও, এই পৃথিবীর কোনো কিছু নয়। মহাকাশ থেকে এসে পড়েছে। ভিদা এক্সত্রাতেরেস্ত্রে”।

কথাটা শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে এলো। একি সম্ভব? আমার জীবনে এরকম একটা ঘটনা ঘটবে? সত্যিই কী তা হলে মহাকাশ থেকে কোনো প্রাণি পৃথিবীতে এসে নেমেছিল, যার চিহ্ন আমি প্রথম আবিষ্কার করলাম? এতকাল মহাকাশ থেকে আসা নির্জীব উল্কাপিন্ড কুড়িয়ে বেড়িয়েছি, হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভেঙেছি। আজ মহাবিশ্বের প্রাণের চিহ্ন আমার চোখের সামনে। আমি একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালাম। নীল গগনমন্ডলে কোনো কিছুর চিহ্ন নেই। শুধু দিগন্তে একটা নুনাটাকের মাথায় একফালি চাঁদ উঁকি দিয়ে আমার পানে হাসিমুখে চেয়ে আছে।

আমি জানি আমাদের স্টেশনের প্রত্যেকের কাছেই এটা একটা অনন্য অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে অভিভূত হয়েছে তানাকা। সে বরফের উপর হাঁটু গেড়ে বসে সেই অদ্ভুত অবয়বটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। পাবলো বলল, “আমরা সত্যই ভাগ্যবান যে এরকম একটা জিনিস আমরা আবিষ্কার করেছি। ভাবতে পারছিনা একে নিয়ে কী করব। কিন্তু আমাদের এখন এর জন্য অনেকগুলি সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। কারণ সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এবং তোমাদের কম্পানি সকলে এর কৃতিত্ব নিতে চাইবে। আমাদের কর্তব্য এখন এটাকে স্টেশনে নিয়ে যাওয়া ও সান্ড্রার হাতে সঁপে দেওয়া”।

আইস স্টেশনে বিশাল সাড়া পড়ে গেল। আমাদের চব্বিশজন ক্রু মেম্বার সবাই বেরিয়ে এলো ওটাকে দেখতে। বিষ্ময় আর অবিশ্বাসের চিহ্ন সকলের মুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

সান্ড্রার মুখের চেহারা দেখবার মতো। প্রথমেই ও খানিকটা নেচে নিলো সালসার ভঙ্গীতে। তারপর খুব কাছে গিয়ে ওটাকে পরখ করল। ওর সুন্দর মুখ থমথমে হয়ে উঠল। তানাকার দিকে ফিরে বলল, “আমি কি স্বপ্ন দেখছি তানাকা? এটা আমাদের জীবনেই সম্ভব হল? একটা অ্যালিয়েন লাইফ ফরম স্বচক্ষে দেখবার সুযোগ হল? আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা”।

বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রাথমিক ঘোর কাটার পর সান্ড্রা প্রথমেই সবাইকে সতর্ক করে দিল। বলল, “যদিও এটা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি, যদিও হাজার বছরের মানুষের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেনি, তবুও এটা নিয়ে কোনো রকম হৈচৈ এখন করা চলবেনা। আমাদেরকে প্রথমে বুঝতে হবে এটা কী? সত্যিই এটা মহাকাশ থেকে এসেছে না অন্য কিছু। আপাতত সব কিছু গোপন থাকবে”।

আইস স্টেশনে ওটিকে প্রথমে বাইরেই রেখে দেওয়া হল। কেবিনের ভিতরে তাপমাত্রা একুশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে আনলে বরফ গলে যাবে। পচন শুরু হয়ে যেতে পারে। তার উপর ওটা কোথা থেকে এসেছে জানা নেই, কোনো অজানা রোগবীজানু বহন করছে কিনা কে জানে। কাজেই কেবিনে আনা যাবেনা। এটা যেহেতু একটা বায়োলজিকাল স্যাম্পেল তাই ওটাকে ক্যাস্টিলো টু বেসের বায়োলজিস্ট সান্ড্রা ডিয়াজের হাতে সমর্পন করে দেওয়া হল। ধাতুর টুকরো আর বরফের স্যাম্পেলগুলি আমরা পরীক্ষা করে দেখব।

এটা পাওয়ার পর উল্কা খোঁজা মাথায় উঠে গেল। আমি বরফের স্যাম্পেল নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করলাম। মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখতে পেলাম বরফের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম ধুলিকণা রয়েছে। ভালো করে পরীক্ষা করতে বুঝতে পারলাম ওগুলি মাইক্রো টেফরা বা আগ্নেয়গিরির খুব ছোট ছাইয়ের কণা। এই কণাগুলির গঠন আমাদের ভলকানিক ডাটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে বুঝতে পারলাম এর সঙ্গে আন্টার্কটিকার মাউন্ট বার্লিন ভলকানিক কমপ্লেক্সের থেকে নিসৃত আগ্নেয় ছাইয়ের মিল আছে। দু হাজার বছর আগে দুটি বড় বড় অগ্নুৎপাত ঘটেছিল ঐ ভলকানিক কমপ্লেক্সে। যার ছাই পুরো আন্টার্কটিকাতে ছড়িয়ে পাড়েছিল। অবশেষে মাউন্ট বার্লিনের একটা আগ্নেয় উদ্গীরণের সময় বেরিয়ে আসা টেফরা ডাটাবেসের সঙ্গে এর সম্পূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া গেল।

তিন চারদিন কেটে গেল। সান্ড্রা একদিন আমাদেরকে ডেকে নিয়ে গেল বাইরে। সান্ড্রা তার কাজের জন্য বাইরে একটা জায়গা ঘিরে নিয়েছে প্লাস্টিকের দিয়ে। একটা গোল ডোমের মতো ঘর বানানো হয়েছে। তার ভিতরে পুরোপুরি জীবাণু নিরোধক একটা চেম্বার তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সম্পূর্ণ বরফ গলিয়ে দেহটাকে বের করে আনা হয়েছে। সবাই পারসনাল প্রোটেকশন গিয়ার পরেই সেখানে ঢুকতে পারবে।

একটা টেবিলের উপর একটা কাঁচের বাক্সে সেটাকে রাখা হয়েছে। সান্ড্রা বলল, “কাঁচের বাক্সে তাপমাত্রা মাইনাস দশ ডিগ্রিতে রাখা আছে। আমরা গভর্নমেন্টের কাছ থেকে কোন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এটাতে হাত লাগাবো না।”

আমি প্রশ্ন করলাম, “এটা কী, কিছু বুঝতে পারছ?”

সান্ড্রা হেসে বলল, “তোমরা নিজেরাই দেখে নাও।”

আমরা উঁকি দিয়ে দেখলাম একটা ছোট্ট মতো মানুষ শুয়ে আছে। মাথায় স্পেস হেলমেট পরণে স্পেস স্যুট। ডান হাত বুকের উপরে, তাতে ধরা রয়েছে একটা পুতুল। হাতে খুব সরু সরু আটটা করে আঙুল। গ্লাভসে ঢাকা। আমি মুখের দিকে তাকালাম। অনেকটা মানুষের মতো, কিন্তু একটু লম্বাটে। হেলমেটের স্বচ্ছ আবরণের ভিতর দিয়ে যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে একটা শিশুর মুখ, কিন্তু এ পৃথিবীর কোনো শিশুর মতো নয়।

আমি সান্ড্রাকে বললাম, “আমার মনে হচ্ছে একটা বাচ্চার শরীর এটা।”

তানাকাও আমার কথায় সায় দিয়ে বলল, “হাতের পুতুলটা দেখে আমারো মনে হচ্ছে একটা শিশু, আউটার স্পেস থেকে এসে পড়েছে এই পৃথিবীতে। অ্যালিয়েন চাইল্ড।”

সান্ড্রা বলল, “আমি কয়েকটা জিনিস টেস্ট করেছি। এক্সরে নিয়েছি। তাতে হাড়ের গঠন বোঝা যাচ্ছে। কোনো ইনভেসিভ টেস্ট এখনও করিনি। তবে কী করব না করব ঠিক করে উঠতে পারছিনা। আমার মনে হয় সবাই মিলে একটা আলোচনা করা দরকার।”

আমাদের কোনো অফ ডে নেই। প্রতিদিন কাজ চলে। এই স্টেশনটা একটা পারমানেন্ট বেস, বয়স প্রায় আশি বছর হতে চলল। এই আশি বছরে এর চেহারা, ইমারতের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ভিতরে থাকার কেবিন, অফিস, ল্যাবরেটরি ছাড়াও রয়েছে মিটিং রুম, প্রোজেকশনের ব্যবস্থা। আর কিছুদিনের মধ্যেই আরো বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াই ফাই বসে যাবে।

মিটিং রুমে আর্জেন্টিনার জাতীয় বীর ম্যানুয়েল বেলগ্রানোর একটা ছবি ঝুলছে। তার উল্টোদিকে একটা প্রোজেকশন স্ক্রিন। আমরা মিটিং রুমে এসে বসলাম।

সান্ড্রা প্রথমে প্রোজেকশনে স্লাইড দেখাতে শুরু করল। দেহটার কয়েকটা ক্লোজ আপ ছবি দেখানোর পরে দেখালো ওর শরীরের বিভিন্ন অংশের এক্সরে। সান্ড্রা বলল, কোমরের তুলনায় কাঁধ কম প্রশস্ত। পাঁজরের এক এক দিকে দুটো করে স্তরে হাড় সাজানো। ব্রেন ক্যাভিটি এগারোশো মিলিলিটার। শরীরের তুলনায় যথেষ্ট বড়। হাতে আটটা করে আঙুল। সব কিছু দেখে এটি একটি মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে।”

একজন জুনিয়ার সায়েন্টিস্ট মন্তব্য করল, “বোঝাই যাচ্ছে বুদ্ধিমান প্রাণি। তার উপর পরণে যেটা আছে সেটাকে স্পেস স্যুট বলেই মনে হচ্ছে। ওটাও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।”

“স্পেস স্যুট ছাড়াও বাইরের দিকে একটা যন্ত্র মতন রয়েছে যেখান থেকে এই শরীরকে বায়ুপ্রবাহ সরবরাহ করার ব্যবস্থা আছে। মানে যে বাতাস শরীর থেকে বের হচ্ছে তাকে ওর ভিতরে শোধন করা হয়। একটা ক্লোজড সিস্টেমের মতো। তবে প্রাণিটার শ্বাস চলছে কিনা বোঝা যাচ্ছেনা,” সান্ড্রা বলল।

সান্ড্রা বলতে শুরু করল, “আমরা এমন একটা জিনিস হাতে পেয়েছি যেটা বলা যেতে পারে একটা দুর্লভ সায়েন্টিফিক ফাইন্ডিং। যাঁরা এটা খুঁজে বের করেছেন তাঁরা পৃথিবীর মহাকাশ বিজ্ঞানকে আরো এগিয়ে দিলেন। এটা যে শুধু একটা বড় স্পেস রিসার্চের বিষয় তাই নয় এটা একটা হাইলি ক্লাসিফায়েড ফাইন্ডিং, আলতামেন্তে ক্লাসিফিকাদোস। আমরা এখন পর্যন্ত কাউকে কিছু জানাইনি। কাল আমাদের সাপ্তাহিক রিপোর্ট দেওয়ার দিন। আর্জেন্টিনা গভর্নমেন্টকে সব কিছু জানাতে হবে, শুধু তাই নয়, এটা নিয়ে কী করা হবে তাই নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। আমাদের হয়তো একটা প্রেস রিলিজ বের করতে হতে পারে।”

জুয়ান ফিজিসিস্ট। মহাকাশ নিয়ে ভালো জ্ঞান রাখে, সে বলল, “সাইন্টিফিক স্যাম্পেল হিসাবে এটা খুব দামী, এটাকে হাতে পাওয়ার জন্য যে কোনও দেশ বিশাল পরিমাণে টাকা দিতে পারে।”

সান্ড্রা বলল, “এর দাম কি টাকা দিয়ে হতে পারে? আমার তা মনে হয়না। তাছাড়া এটা আর্জেন্টিনার ক্লেইমের মধ্যে পড়েছে। এখন এটা আর্জেন্টিনা গভর্নমেন্টের হাতেই তুলে দিতে হবে। আমরাও আর্জেন্টিনা গভর্নমেন্টের স্টেশনে কাজ করছি।”

এনরিক বলল, “এটা প্রথমে খুঁজে বের করেছি আমরা, ন্যাচরাল হিস্টরি স্পেসিমেন ট্রেডিং কম্পানি। আর্জেন্টিনার সঙ্গে এমওইউ অনুসারে এটা আমাদের। তাছাড়া স্পষ্ট লেখা আছে ‘কোআলকিয়ের কোসা কে কাইগা দেল এসপাসিও এক্সতেরিয়র’, তার মানে মহাকাশ থেকে যা কিছু পড়বে তা আমাদের। বদলে আর্জেন্টিনা গভর্নমেন্টকে আমরা রেভেনিউ দেব।”

সান্ড্রা বলল, “এটা তোমাদের জিওলজিকাল স্যাম্পেল নয়। এটা একটা বায়োলজিকাল স্যাম্পেল। এসপাসিও এক্সতেরিয়র থেকে হলেও। এর ভ্যালু সম্পূর্ণ আলাদা।” সান্ড্রা আমার দিকে ফিরে বলল, “তুমি এটার বয়স বের করতে পেরেছ?”

আমি বললাম, “পেরেছি, দু হাজার বছর হবে। আমি স্যাম্পেলটা যেখানে পাওয়া গেছে তার ঠিক উপরে দু হাজার বছরের পুরোনো আগ্নেয়গিরির ছাই পেয়েছি। মাউন্ট বার্লিন কমপ্লেক্সের মাইক্রো টেফরা। কাজেই এটার বয়স কম করে দুই হাজার বছর।”

তানাকা মাথা নীচু করে বসেছিল। সে হঠাৎ সান্ড্রার দিকে ফিরে বলল, “আচ্ছা তোমার কি মনে হয়না, এটা একটা শিশুর দেহ। কত হাজার বছর আগে কোন এক অজানা গ্রহ থেকে বাবা মার হাত ধরে মহাকাশে বেড়াতে বেরিয়েছিল। হয়তো এক অতি উন্নত সভ্যতার নিদর্শন নিয়ে তারা অন্য কোনো গ্রহে শান্তির বার্তা নিয়ে যাচ্ছিল। তারপর একটা দুর্ঘটনা। কোনো অজানা উল্কার আঘাতে ওরা ছিটকে এসে পড়ে এই সৌর জগতে। তারপর এই বাচ্চাটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসে পড়ে এই পৃথিবীতে।”

সান্ড্রা তানাকার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, “কিন্তু তাতে কী হল?”

তানাকা বলল, “আমরা মনে করি এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সবটাই একই সৃষ্টির সূত্রে বাঁধা হয়ে আছে। দুই হাজার বছর আগে পৃথিবীতে এসে পড়া এই বাচ্চাটা, মনে হয়না এটা আমাদেরই শিশু? জন্মেছে অন্য কোনো গ্রহে। একে নিয়ে কাঁটা ছেঁড়া না করলেই নয়?”

সান্ড্রা বলল, “তাহলে তুমি কী করতে বল?”

“আমি চাই এটাকে আবার বরফের নীচে রেখে দেওয়া হোক।”

“তানাকা, তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন এটা একটা সায়েন্টিফিক স্যাম্পেল, দু হাজার বছরের পুরোনো। আমরা মিশরের মমি নিয়ে কাঁটা ছেঁড়া করিনি? করতে হয়, বিজ্ঞানের জন্য করতে হয়।” সান্ড্রা বলল।

তানাকা তার বৌদ্ধ ভাবনার থেকে যে কথাগুলি বলেছে তা এদের কারো অন্তর স্পর্শ করেনি তা বোঝাই গেল।

সান্ড্রা বলল, “দেখ এনরিক, তানাকাও শোন, জীববিজ্ঞানে একটা বিশাল প্রশ্নের এখনও সমাধান হয়নি। তা হল এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সর্বত্র কি জীববিজ্ঞানের একই নিয়ম চালু আছে? অভিযোজন আর বিবর্তন প্রক্রিয়া কি সর্বত্র একই সূত্রের অধীন?”

এনরিক বলল, “তুমি কী বলতে চাইছ সান্ড্রা আমি বুঝতে পারছিনা।”

সান্ড্রা বলল, “আমি বলছি পৃথিবীতে যে বিবর্তন ঘটেছে বহির্বিশ্বেও কি সেই একই ভাবে অভিযোজন আর বিবর্তন ঘটছে? এটা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে বলে জানিনা। আর গবেষণা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই, কারণ এই নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করা অসম্ভব। আমরা গবেষণাগারে রসায়ণ ও পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলি প্রমাণ করতে পারি, কিন্তু দীর্ঘকালব্যাপী বিবর্তনের প্রক্রিয়া ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা কি সম্ভব? আমরা মহাকাশ সম্বন্ধে যা জানি তা ফিজিকাল গ্যালাক্সিটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই অনন্ত মহাকাশে জীবনের বিবর্তন কীভাবে হচ্ছে সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। কাজেই এই স্যাম্পেলটা আমাদের এক অসামান্য গবেষণার সুযোগ দিচ্ছে। এই সুযোগ হারানো উচিত হবে না।”

আমাদের একজন জুনিয়ার সাইন্টিস্ট রোমিও লোবো চুপ করে বসে ছিল। একটু লাজুক প্রকৃতির ছেলে। সে হঠাৎ বলে উঠল, “ওটা মৃতদেহ না বেঁচে আছে?”

সান্ড্রা গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি খুব ভালো করে দেখেছি, শরীরটাতে জীবনের কোনো চিহ্ন পাইনি। আবার এটাকে মৃতদেহের মতোও লাগছে না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এটা মৃত নয়। সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশনে আছে। দীর্ঘ মহাকাশ যাত্রায় যেটা দরকার। আমি কোনো রকম ইনভেসিভ স্টাডি করতে পারছিনা, যদি ওটা জীবন্ত হয়ে থাকে”।

মিটিং এ কিছুই সিদ্ধান্ত হল না। তবে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হল যে একটা গোপন রিপোর্ট আর্জেন্টিকা স্পেস এজেন্সির কাছে পাঠানো হবে। পরে নির্দেশ এলে এটিকে বিশেষ ব্যবস্থায় আর্জেন্টিনায় পাঠানো হবে। আমরা ভেবেছিলাম দেহটা সান্ড্রার হেফাজতে তুলে দিলেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। আমরা আবার উল্কা খোঁজার কাজ শেষ করতে পারব। কারণ শীত আসতে চলল। তাড়াতাড়ি কাজ গুটিয়ে যে যার নিজের নিজের দেশে ফিরে যাব। তানাকার মনটা মেয়ের জন্য আকুল হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে দাঁড়ালো।

একদিন পরে সান্ড্রা আমাকে আর তানাকাকে তার অফিসে ডেকে পাঠালো। অফিসে ঢুকতে তানাকাকে আর আমাকে বসতে বলল। তারপর বলল, “তানাকা সেদিন মিটিং এ তুমি কী কথা বলেছিলে মনে আছে?”

তানাকা বলল, “মনে আছে বলেছিলাম বাচ্চাটাকে এখানেই বরফের নীচে রেখে দিতে। কিন্তু তোমরা কেউ আমার কথা শুনলে না।”

সান্ড্রা বলল, “আচ্ছা তোমার কথার সূত্র ধরেই বলছি তোমার কী জানতে ইচ্ছে হয়না ওই শিশুটা কোথা থেকে এলো? সে এই পৃথিবীর নয় এটা ঠিক। কিন্তু তোমার কথা অনুসারে সে এই ব্রহ্মান্ডের প্রাণপ্রবাহের একটা অংশ। তাই তো?”

তানাকা চুপ করে রইল। তার মনে হয়তো সেই অ্যালিয়েন চাইল্ডের চেহারা চোখে ভাসছিল।

সান্ড্রা আবার বলল, “দেখ, আমি একজন বায়োলজিস্ট। আমার কাজ প্রাণ নিয়ে গবেষণা করা। আমি বিশ্বাস করি এই শিশুটি হঠাৎ করে দু হাজার বছর আগে এই পৃথিবীতে এসে পড়েনি। এবং সে একাও আসেনি। তার সঙ্গে কেউ না কেউ এসেছিল, তার পরিবার, তাদের মহাকাশ যান, আরো অনেক কিছু। যদি আমরা ট্রেস ব্যাক করে খুঁজে বের করি এই বাচ্চাটা কোথায় অবতরণ করেছিল তাহলে কেমন হয়। তাহলে আমরা ওদের সম্পর্কে আরো জানতে পারব।”

আমি বললাম, “তা কী সম্ভব?”

তানাকা চুপ করে ছিল। আমি জানি ওর অভিধানে অসম্ভব শব্দটা নেই।

সান্ড্রা তার পিছনের স্ক্রিনে একটা ছবি প্রজেক্ট করল। ছবিটা একটা চিঠি। পাঠিয়েছে Comisión Nacional de Actividades Espaciales (CONAE)। এটি আর্জেন্টিনার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। চিঠিতে লেখা আছে যে অ্যালিয়েন দেহটি পাওয়ার পর চূড়ান্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এটিকে রাখতে হবে। তার সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে এই সংবাদ যেন আর কোনো দেশ জানতে না পারে।

আমি বললাম, “গোপন ব্যাপার, আমরা গোপন রাখব। কিন্তু আমাদের কেন ডেকেছ?”

সান্ড্রা বলল, “আসল কথা হল আমাদের এই স্টেশন থেকে একটা প্রোগ্রাম নিতে হবে। এই দেহটা কোথা থেকে এসেছে এবং এই আন্টার্কটিকায় এরকম আর কিছু আছে কিনা সেই খোঁজ নিতে হবে। সোজা কথা আরো ইনভেস্টিগেশন করতে হবে এটার সম্বন্ধে।”

আমি বললাম, “সেতো দু হাজার বছর আগেকার ঘটনা। আমরা কী করে তা বের করব? আমাদের কাছে কি টাইম মেশিন আছে?”

“বাজে বকো না। সান্ড্রা আমাকে এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিল। তুমি না জিওলজিস্ট? কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে কী ঘটেছিল তা তোমরা জানতে পারো। হিমবাহের মধ্যে এই বাচ্চাটা কোথা থেকে এলো বা প্রথমে কোথায় পড়েছিল সেটা জানতে পারবে না?”

আমি বললাম, “দুটো কি এক হল?”

“আরে বাবা, তোমরা একটু ভাবো এটা নিয়ে। আর আন্টার্কটিকা, যতদূর জানি দু হাজার বছর আগে খুব একটা অন্যরকম ছিল না। বরফ কিছুটা বেশি ছিল, পুরু ছিল। বরফের মুভমেন্ট স্টাডি কর। দরকার হলে যতগুলি ড্রিলিং হয়েছে তার কোরের ডাটা স্টাডি কর। এই আন্টার্কটিকার কোথাও না কোথাও এই রহস্যের উত্তর আছে। তোমাদের সেটা বের করতে হবে।”

আমার হঠাৎ মনে পড়ল এই দেহটার সঙ্গে কয়েকটা ধাতুর টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলি নিয়ে কোনো কাজ করা হয়নি। সান্ড্রাকে সে কথা বলতেই সে লাফিয়ে উঠল। “এই তো একটা ক্লু পাওয়া গিয়েছে। এগুলি দিয়েই কাজ শুরু কর।”

তানাকা বলল, “আমি ধাতুর টুকরোগুলি দেখেছি। ওগুলো সমতল নয়, বাটির ভাঙা টুকরোর মতো। মনে হয় ধাতুর একটা বল বা ক্যাপসুল ভেঙে টুকরোগুলি ছড়িয়ে পড়েছে।”

সান্ড্রা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “টুকরোগুলি জোড়া দেওয়া যাবে?”

আমি বললাম, “এই জোড়া দেওয়ার কাজটা শক্ত হবে। মোটে বারোটা টুকরো পাওয়া গিয়েছে। এক একটা আট দশ ইঞ্চির থেকে বড় নয়। সেগুলি জোড়া দিতে গেলে কমপিউটারের সাহায্য নিতে হবে। প্রত্যেকটা টুকরোর থ্রি ডি মডেল বানিয়ে কোনো মডেলিং সফটওয়ারের সাহায্যে এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে জোড়া দেওয়া যেতে পারে। তবে অনেক গ্যাপ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা।

“তা হোক, শুরু তো কর”, সান্ড্রা জোর দিয়ে বলল।

আমরা বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সান্ড্রা আমাদের বলল, “একটা কথা আমি কাউকে বলিনি, তা হল ওটা মৃতদেহ নয়”। শুনে আমরা চমকে ঊঠলাম, “তার মানে?”

“তার মানে হল আমি ঐ শরীরে প্রাণের চিহ্ন পেয়েছি। যদিও শ্বাস নেওয়ার কোনো চিহ্ন নেই, এমনকি হৃৎপিণ্ডের মতো কিছু না পেলেও একটা ব্যাপার আমাকে অবাক করেছে। তা হল বুকের পাঁজরের হাড়গুলি তাদের আগের জায়গা থেকে একটু সরে গিয়েছে। তিন মিলিমিটারের মতো। এক্সরে তে ধরা পড়েছে”।

“তাহলে?”

“তাহলে কিছুই নয়। আমার ধারণা ওটা জীবিত এবং সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশনে রয়েছে। তবে শিওর নই। তোমরা কাজ শুরু করে দাও”।

কাজটা সহজ নয়। ধাতুর যে টুকরোগুলি পেয়েছিলাম প্রথমে তা বাইরে একটা সিসার বাক্সে ভরে রাখা হয়েছিল। পরে দেখা গেল তার থেকে কোনো রেডিয়েশন ছড়াচ্ছে না। তাই অন্য একটা ইউ ভি চেম্বারে স্টেরিলাইজ করার জন্য রাখা হয়েছে।

আমি আমাদের কমপিউটার ইঞ্জিনিয়ার হোসে পেরেজকে টুকরোগুলি দেখালাম। বললাম, “তুমি এগুলি জোড়া দিয়ে সম্পূর্ণ মডেলটা তৈরি কর। আমি তোমার সঙ্গে থাকব।”

মোট বারোটা টুকরো। বলা চলে ছয় জোড়া। কারণ দুটো করে হুবহু এক রকম টুকরো রয়েছে। এটা কাজটাকে একটু শক্ত করে দিল। আমরা জোড়ায় জোড়ায় সাজিয়ে বুঝতে পারলাম এর মধ্যে ডান বাঁয়ের ব্যাপার আছে। এগুলি যদি কোনো ক্যাপসুলের ভাঙা টুকরো হয় তবে একটা বাঁদিকের আর একটা ডান দিকের।

কোনটা কোন দিকের সেটা বোঝার জন্য আমরা কম্পিউটার মডেলিং এর সাহায্য নিলাম।

ধাতুর টুকরোগুলি প্রায় তিন সেন্টিমিটার পুরু। গায়ে অসংখ্য দাগ। তার উপরে অত্যান্ত সূক্ষ্ম কিছু ছিদ্র আছে। সবকিছু এমনভাবে পাতের গায়ে রয়েছে দেখে মনে হয় অর্থপূর্ণ কিছু লেখা আছে।

তিন চার দিনের চেষ্টায় কম্পিউটারের পর্দায় একটা মোটামুটি চেহারা খাড়া করা গেল। দূটো বাটির মতো জিনিস, ভিতরের ব্যাস ষাট সেন্টিমিটার। গভীরতা এক একটার চল্লিশ সেন্টিমিটার। বাটি দুটো মুখোমুখি জোড়া দিলে একটা ডিম্বাকৃতির ক্যাপসুল হয়ে যাচ্ছে। এবার আসল বস্তুগুলিকে জোড়া দেওয়ার পালা। আমরা ভেবেছিলাম ভেঙে গিয়েছে। জুড়তে গেলে কোনো আঠা বা ওয়েল্ডিং দরকার হবে। কিন্তু দেখা গেল আপনা থেকেই একটা টুকরো তার পাশের টুকরোর সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে, যেন একটা চুম্বক শক্তি দিয়ে সেগুলি একটার সঙ্গে আর একটা জুড়ছে। আমাদের খুব একটা চেষ্টা করতে হলনা। খুব সহজেই কম্পিউটারে পর্দায় যেরকম দেখা গেল ঠিক সেই রকম দুটো বাটি তৈরি হল।

কিন্তু বিপত্তি হল বাটি দুটোকে মুখোমুখি জোড়া দিতে গিয়ে। মুখোমুখি আনতে দেখা গেল একটা আর একটার খুব কাছে নেয়া যাচ্ছে না। চুম্বকে যেমন বিকর্ষণ হয় ঠিক তেমনি একটা আরেকটাকে ঠেলে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখা দিচ্ছে কিছুতেই কাছে আনা যাচ্ছে না।

তানাকা বলল, “দুটো বাটি আসলে ক্যাপসুলের দুটো লোব বলে মনে হচ্ছে। মুখোমুখি রাখলে দুটোর মধ্যে একটা এনার্জি ফিল্ড তৈরি হচ্ছে। সান্ড্রাকে খবর দাও।”

খবরটা শুনে সান্ড্রা প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে হাজির হল। সম্ভবত দশ মিনিট সময় লেগেছে। লোব দুটো টেবিলের উপর রাখা ছিল। কিন্তু দেখা গেল সেখানে নেই। দুটো লোব শূন্যে ভাসছে। মুখোমুখি রয়েছে কিন্তু একটার থেকে আর একটা নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব বজায় রেখেছে। মনে হচ্ছে অদৃশ্য একটা শক্তি দিয়ে দুটো জোড়া আছে। মাঝখানে প্রায় আধা মিটারের একটা ফাঁক।

আমরা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ঐ দুটো বাটির মতো লোবের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু দুটো লোব একটার থেকে আরেকটা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেও কী করে জুড়ে আছে এটা বুঝে উঠতে পারলাম না।

সান্ড্রা বলল, “ওটাকে বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে? আমি দেখতে চাই অ্যালিয়েন বডিটার সঙ্গে ওটা কি করে।”

আমি একটা বাটি ধরে টান দিতেই অন্য বাটিটাও সঙ্গে সঙ্গে নড়তে শুরু করল। খুব ভালো করে ধরে ওটাকে সান্ড্রার গম্বুজের ভিতরে নিয়ে যেতেই দেখলাম একটা বাটির একটা প্রান্ত থেকে একটা তীব্র রশ্মি বেরিয়ে এলো আর সান্ড্রার কাঁচের বাক্স ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পরক্ষোণেই দুটো বাটি ঐ দেহটার দুই প্রান্তে চলে গেল। তারপর দেহটা দুটো বাটির ভিতরে চলে গেল। মনে হল একটা লম্বা ক্যাপসুলের মধ্যে ঢুকে গেল সেটা। ক্যাপসুলের ভিতরে শরীরের মাঝের অংশটা শুধু দেখা যাচ্ছিল। পায়ের দিকটা আর মাথার দিকটা দুটো লোবের ভিতরে। ভিতরে তখন নানা রকমের আলোর খেলা চলছে। মনে হচ্ছে সেই মৃত শরীরটার মধ্যে নানা রকম রশ্মি প্রবেশ করানো হচ্ছে।

ধীরে ধীরে সেই শরীরের ভিতরে একটু স্পন্দন দেখা দিল। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সেই দিকে। ক্যাপসুলের ভিতরে শরীরটা এবার নড়তে শুরু করল। আমরা দেখতে পেলাম ক্যাপসুলের একটা প্রান্তে একটা হাত বেরিয়ে এলো। তাতে আটটা সরু সরু আঙুল নড়তে শুরু করল। মাথার দিকের বাটিটার থেকে একটা ছোট্ট অ্যান্টেনার মতো বেরিয়ে এলো।

সান্ড্রা বলল, “এটা এই ক্যাপসুলের ভিতরে ঘুমিয়েছিল। যাকে বলে সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন। মহাকাশ যাত্রার সময় এই প্রাণিটার সঙ্গে কোনো দুর্ঘটনা হয়েছিল। আর দুর্ঘটনার পরে ওর ক্যাপসুল ভেঙে যায় আর এটা বরফের নিচে চাপা পড়ে যায়। আপাতত এটা এভাবেই থাক। অবজারভেশনে রাখা থাক। প্রতিদিন কেউ না কেউ সব সময় এটাকে পাহারা দিতে থাকো।”

আমিও পাহারায় রইলাম একদিন। সেই অদ্ভুত প্রাণিটার শরীর একইভাবে ক্যাপসুলের ভিতরে রয়েছে। একটা হাত বের করা, কিন্তু সেটা স্থির নয়, ক্যাপসুলটার গায়ে তার আঙুলগুলি খেলা করছে। মনে হচ্ছে কোনো সঙ্কেত পাঠাচ্ছে কোথাও।

চার পাঁচদিন পরে হঠাৎ এনরিক এসে আমাদের সবাইকে ডেকে নিয়ে গেল সেখানে। সেখানেও টেবিলের উপর ক্যাপসুলটা একইভাবে রয়েছে। ভিতরে দেহটাও ঠিক একই রকমভাবে শুয়ে আছে। কিন্তু সেটার চার পাশে ঘিরে একটা নীল আর হলুদ আলোর বৃত্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তার পরে যে ঘটনা ঘটল তার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের ঠিক মাথার উপরে অনেক উপরে আকাশের গায়ে একটা নীল আলো জ্বলে উঠল। বেশ বড় সেই আলো, আকাশের নীলের থেকেও গভীর নীল। সেখান থেকে কী সঙ্কেত এলো বুঝতে পারলাম না। কিন্তু নীচে আমাদের সামনের ক্যাপসুলের থেকে ছোট্ট এক মিটার লম্বা একটা শরীর বেরিয়ে এলো। অনেকটা মানুষের মতো। কিন্তু বেশ কিছুটা আলাদা। হাতে একটা পুতুলের মতো কিছু। সে হাত বাড়িয়ে দিল সান্ড্রার দিকে। সান্ড্রা তার দিকে হাত বাড়াতেই সে পুতুলটা সান্ড্রার হাতে তুলে দিল। তারপর আবার ক্যাপসুলের ভিতরে ঢুকে গেল।

পরক্ষণেই একটা তীব্র আলো জ্বলে উঠল ক্যাপসুলটার গায়ে। আর সেটা আস্তে আস্তে কিছুটা উপরে ভেসে উঠে তারপর প্রচন্ড বেগে উপরের দিকে উঠে গেল। সেই নীল আলোর দিকে। একটু পরে সেই নীল আলোটাও মিলিয়ে গেল। পুতুলটা হাতে নিয়ে সান্ড্রা বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। আমরাও স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নির্মেঘ আকাশে আর কিছুই নেই। আমাদের মাথার উপরে অপার রহস্যের আবরণ সাজিয়ে রেখে সেই নক্ষত্রবালিকা মহাশূন্যে মিলিয়ে গেল। শুধু জুয়ান পাবলো বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “পোর্তাল পোর্তাল, এসা ক্যাপসুলা এস উন আগুয়েরো দে গুসানো, ওটা একটা আর্টিফিশিয়াল ওয়ার্মহোল। দু হাজার বছর এক নিমেষে পার হয়ে গেলো”।

আমাদের কাজে একটু ভাঁটা পড়ে গিয়েছিল। আবার নতুন উদ্যমে উল্কা খোঁজা শুরু হল। দেখতে দেখতে এপ্রিলের মাঝামাঝি এসে পড়ল। খুব ধীরে ধীরে দিন ছোট হচ্ছে। একটু একটু করে রাতের দৈর্ঘ বাড়ছে। কোনো কোন দিন সূর্যাস্ত দেখার জন্য কেবিনের কাঁচে ঢাকা জানালার কাছে এসে দাঁড়াই। তাকিয়ে দেখি দক্ষিণ সমুদ্রপারে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের জন্য আকাশ ভরে যায় তারার আলোয়। তারার ঝাঁকের মধ্যে অজস্র তারা খসে পড়ে। কবে কতযুগ আগে এক নক্ষত্র শিশু এই খসে পড়া তারার সঙ্গে মিশে আমাদের এই গ্রহে এসে পড়েছিল।

তানাকা প্রতিদিনের মতো ধ্যান করে। তারপর মেয়ের ছবির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তানাকার কন্যার পাশে সেই নক্ষত্র বালিকার পুতুল রাখা রয়েছে। তানাকা তার মেয়ের সঙ্গে, এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সঙ্গে সেই নক্ষত্রবালিকার কল্যাণকামনায় খাতায় মন্ত্র লেখে।

Tags: প্রদীপ কুমার সেনগুপ্ত, বড় গল্প, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!