সময়যাত্রিণী

  • লেখক: সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

টিনা – বর্তমান – বয়স আঠারো

বিরাট মেশিনটার মধ্যে আলোগুলো দপদপ করছে, আমি সেটাই দেখছিলাম। মেশিনটা পুরো চার্জড অবস্থায় আছে।

আবার প্যানেলটা চেক করলাম। এই জবরজং সুরক্ষা-সুট, আগাপাশতলা মোটা রাবারের প্রলেপ দেওয়া বুট আর গলা অবধি ঢাকা হেলমেট পরে আমাকে যে শুধু দেখতে বিদঘুটে লাগছে, তা নয়, তার সঙ্গে এই এতটা বাড়তি ওজনের জন্য আমার হাঁটাচলা করতেও বেশ সময় লাগছে। কিন্তু আমরা যখনই মেশিনটার মধ্যে ঢুকে কাজ করি, পুরো সুরক্ষা-পোশাক পরেই করি। সাবধানের মার নেই।

ল্যাবের দরজা খোলা, তাই এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি, মীরা ওদিকে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করছে। আমি ওর দিকে একবার তাকালাম, আপনা থেকেই ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল।

ওকে দেখলে মনে হয় যেন নিজেকেই দেখছি।

জানি, খুব মিস করব আমি ওকে।

ও-ও হাসল আমাকে দেখে। “কী দেখছিস রে, টিনা?”

“তোকে।“

আজই সম্ভবত আমাদের শেষ দেখা।

টাইম মেশিনটা ঘরঘর শব্দ করছে। কাচের আবরণীর নিচে প্যানেলের আলোগুলো জোরে দপদপ করতে শুরু করল। দেখে একটা মজার কথা মাথায় এল – সময়-যন্ত্রটা যেন আমার সময় নষ্ট করা দেখে অধৈর্য হয়ে পড়ছে!

কিন্তু না, আজ আমি তাড়াহুড়ো করব না। বাবা বহুকাল অপেক্ষা করেছে, আর কয়েক ঘণ্টা বেশি দেরিতে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।

মীরা আবার মুখ তুলে দেখল আমি ওর দিকেই তাকিয়ে আছি। একটু হেসে একটা উড়োচুমু ছুড়ে দিল ও। আমি শূন্য থেকেই সেটা লুফে নেওয়ার ভান করে ওটা আমার ঠোঁটে লাগানোর চেষ্টা করলাম। মাথায় তো হেলমেট পরা; ঠোঁটে হাত ছোঁয়ানোর উপায় নেই এই মুহূর্তে। তাই চুমুটাকে হেলমেটের সামনের কাচেই বসিয়ে দিলাম আমি। মীরা বলল, “দাঁড়া, হাতের কাজটা শেষ করি, তারপর তোর ঐ জিনিয়াস মুন্ডুটা থেকে হেলমেট কেমন করে খুলে নিতে হয়, দেখাচ্ছি তোকে।“

আমি জানি না, ও কী করে নিজেকে এত শান্ত রেখেছে। ও তো ভালো করেই জানে, এই পৃথিবীতে ওর আয়ু আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা।

যদিও ও জানে না, এখনও একটা চমক বাকি। জানলে ও আমার উপর খুব রেগে যাবে।

 

***

টিনা – অতীত – বয়স আট

বাবা চলে যাওয়ার পর মা কখনও আমাদের বাড়ির ঐদিকে যেতে দেয়নি আমাকে।

বাড়ির পূর্বদিকের পাঁচিলের ওদিকের অংশটা আমার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। পাঁচিলের গায়ে একটা দরজা ছিল বটে, কিন্তু সেটা সবসময় তালা দেওয়া থাকত। মা যখনই দেখত আমি তালাটা মনোযোগ দিয়ে দেখছি কিংবা ঐ পাঁচিলের আশেপাশে সন্দেহজনকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অমনি আমাকে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে আনত ওখান থেকে। অন্তত এক হাজার বার জিজ্ঞাসা করেছি ঐ বন্ধ দরজার ওপারে কী আছে, মা বলেনি। এইটুকু শুধু তার মুখ দিয়ে বেরিয়েছে, “সময় হোক, জানতে পারবি।“

ঐ পাঁচিল, ঐ বন্ধ দরজা নিয়ে আমার স্কুলের বন্ধুদের কাছেও কিচ্ছুটি বলা একদম নিষেধ ছিল। মা বলত, “এই নিয়ে যদি বন্ধুদের কাছে কিছু বলিস, তাহলে বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।“

আমি ভয়ে কারও কাছে কখনও মুখ খুলিনি। বাবাকে খুব করে কাছে পেতে চাইতাম আমি। সে যখন চলে যায়, তখন আমার বয়স ছিল ছ’মাস, তাই মানুষটার কোনো স্মৃতিই আমার নেই। কিন্তু আমি ছবিতে তাকে দেখেছি।

মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখতাম, আমাদের বাড়ির ভাঙাচোরা অকেজো টাইম মেশিনটা হঠাৎ জ্যান্ত হয়ে আমাকে আর মা-কে গিলে নিয়েছে। ভয়ে ঘুম ভেঙে উঠে দেখতাম, মা তখনও ল্যাবে কাজ করছে।

মায়ের কাছে শুনেছি, ঐ ঘটনার পরে বাবার বিজ্ঞানী বন্ধু ডক্টর পাইন আমাদের বাড়ি এসেছিলেন বেশ কয়েকবার। উনি বলতেন, বাবার মতো এত প্রতিভাবান একটা মানুষের অকালে চলে যাওয়াটা বিজ্ঞান জগতের পক্ষে একটা বড় ক্ষতি। অবশ্য উনি এটাও জুড়ে দিতে ভুলতেন না যে, সরকার যখন টাইম ট্রাভেল সংক্রান্ত সব গবেষণা নিষিদ্ধ করে দিল, তখনই বাবার এই মেশিনটাকে নষ্ট করে দেওয়া উচিত ছিল; এই বিপজ্জনক প্রজেক্ট নিয়ে গোপনে কাজ চালিয়ে যাওয়াটা তার বোকামিই হয়েছে। মা অবশ্য আমাকে চুপিচুপি বলে রেখেছিল, ঐ পাঁচিলের দরজাটার ওপারে এমন একজন আছে, যে আমার বাবাকে ফিরিয়ে আনবে।

আমি তাই সবসময় ঐ দরজাটার ব্যাপারে সবার কাছে মুখ বন্ধ রেখেছি। যখন রাত গভীর হয়ে আসত, রাস্তায় গাড়ির চলাচল কমে যেত, তখন অনেকবার শুনতে পেয়েছি, ওদিক থেকে কাদের যেন কথা বলার শব্দ ভেসে আসছে।

একদিন হঠাৎ চোখে পড়ল, মা ঐ পশ্চিমের পাঁচিলের দরজা দিয়ে ওদিকের বাড়িটায় যাচ্ছে। আমি চুপিচুপি তার পিছু নিলাম। মা দরজা পেরিয়ে চলে গেল ওদিকে, যাওয়ার আগে সাবধানে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আমি যে পেছনে আছি, মা বুঝতে পারেনি। আমি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম পাঁচিলের গায়ের বন্ধ দরজাটার সামনে, কিন্তু ওদিকের নিষিদ্ধ জগতে ঢোকার সাহস আর করতে পারলাম না। কিন্তু শুনতে পেলাম, মা ওপাশে আরেকজন মহিলার সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলছে।

মা বলছিল, “তোমাকে ভালো কথাই বলছি, তুলসী। ওর সঙ্গে মানসিক ভাবে বেশি জড়িয়ে পোড়ো না।“

সেই অন্য মহিলার কথাও শুনতে পেলাম। “ও কি আমার মেয়ে নয়, দেবী? ওকে ভালো না বেসে আমি কি পারি?”

মা বলল, “কিন্তু তোমার বাবা…”

অন্য গলাটা বলল, “আমার বাবার ইচ্ছাপূরণের জন্য তো আমি এখানে আসিনি, তুমি জানো, দেবী। তোমার এক্সপেরিমেন্টে অংশ নিতে আমি স্বেচ্ছায় থাকতে এসেছি এখানে, কারণ ঐ মানুষটাকে আমি ভালোবাসতাম।“

‘ঐ মানুষটা’ শব্দদুটোয় উনি এমনভাবে জোর দিয়ে উচ্চারণ করলেন যে কেন জানি না আমার মনে হল, উনি বোধহয় আমার বাবার কথা বলছেন।

মায়ের দিক থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ এল না। মনে হল, সে এবার ফিরবে। আমি নিজের ঘরের দিকে দৌড় মারলাম। মা এখানে আমাকে আড়ি পাততে দেখে ফেললে কপালে দুর্ভোগ আছে।

এই ঘটনার দিন কয়েক পরেই সেই ছবিটা আবিষ্কার করলাম আমি। ওটার মতো এমন আশ্চর্যজনক জিনিস আমি আজ পর্যন্ত কিছু দেখিনি।

ফোটোগ্রাফটা ছিল মায়ের পার্সের মধ্যে। একদিন খোলা পার্সটার মধ্যে ওটাকে উঁকি মারতে দেখে সবে টেনে বার করেছি, অমনি মা দেখে ফেলল। ছবিটা দেখার আগেই জিনিসটা আমার হাত থেকে ছাড়িয়ে খুব একচোট বকে ওটাকে আবার ব্যাগে ভরে মা ফ্রিজের উপর তুলে দিল। আমি বয়সের তুলনায় একটু বেঁটেখাটো চেহারার মেয়ে ছিলাম, আর ফ্রিজটা আমার তুলনায় বিরাট লম্বা ছিল। মা ভেবেছিল, সরিয়ে রাখলে আমি জিনিসটার কথা ভুলে যাব।

অত সহজে কৌতূহল দমিয়ে ফেলব, আমি সে পাত্রী নই। ঠিক করে নিলাম, মা ল্যাবে গেলেই আমি পার্সটার উপর হামলা করব।

রাতে মা আমার পাশে শুয়ে আমাকে গল্পের বই পড়ে শোনাত। আমি সে-রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে মটকা মেরে পড়ে রইলাম। আমার কপালে চুমু খেয়ে বইটা পাশের টেবিলে রেখে মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নেমে গেল। একটা চোখ সামান্য ফাঁক করে দেখলাম, মা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

জানি, এইবার সে ল্যাবের দিকে যাবে।

নিজের ল্যাবটা আমাদের বাড়ির উত্তরদিকে বানিয়েছিল মা।

মা নাকি বিরাট বড় বায়োলজিস্ট, কিন্তু ঐ ল্যাবে বসে সে যে ঠিক কী কী করত, আমি বুঝতেও পারতাম না, আমার ভালোও লাগত না। আমি বাবার মতো ফিজিসিস্ট হতে চাইতাম, যদিও ঐ বয়সে আমার ফিজিক্সের জ্ঞানও আমার বায়োলজির জ্ঞানের চেয়ে খুব একটা উন্নত ছিল না।

আরও পাঁচ মিনিট চুপটি করে বিছানায় পড়ে রইলাম আমি। তারপর আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে নামলাম। মা এতক্ষণে নির্ঘাৎ ল্যাবে চলে গেছে। ওখান থেকে এখানের কোনো শব্দ তার কানে যাবে না, জানি। ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে ফ্রিজের কাছে নিয়ে গেলাম। লাল রঙের পার্সটা ফ্রিজের উপরে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে, ঠিক যেন একটা গুপ্তধনের সিন্দুক। চেয়ারে উঠে যখন ওটাকে পেড়ে আনছি, তখন বুকের মধ্যে উত্তেজনায় ধুকপুকুনি রীতিমতো বেড়ে গেছে।

এই তো আমার সাতরাজার গুপ্তধন!

তাড়াতাড়ি চেন খুলে ভেতর থেকে বহু-প্রতীক্ষিত ছবিটা বার করে আনলাম। ছবির মুখদুটোর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম আমি, কিন্তু এ ছবির মানে কী, কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না।

ছবিতে দেখতে পাচ্ছি, আমি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছি; আমি বসে আছি এক খুব দুঃখী-দুঃখী মুখের মহিলার কোলে। এই মহিলাকে আমি জীবনে দেখিনি। এর কোলে বসে আমি আবার ছবি তুললাম কবে?

সেই রাতে স্বপ্ন দেখলাম, আমি ঐ নিষিদ্ধ দরজা দিয়ে ওপারে চলে গেছি। ওপারে কিছু নেই, আছে শুধু একটা আয়না; আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি আয়নার নিজের মুখের প্রতিফলনের দিকে।

 

***

টিনা – বর্তমান – বয়স আঠারো

কে যেন ডোরবেল বাজাচ্ছে। মীরা গিয়ে দরজা খুলতে বাবার পুরোনো বন্ধু ডক্টর পাইন এসে ঢুকলেন।

ভদ্রলোকের বয়স ষাট পেরিয়েছে, যদিও দেখলে অনেক কম মনে হয়। ভেতরে এসে বললেন, “এই যে মেয়েরা, সময়যাত্রার জন্য রেডি হয়ে গেছ দেখছি।“

মীরা বলল, “ডক্টর পাইন, আপনি একবার মেশিনটা চেক করে দেখবেন নাকি সবকিছু ঠিক আছে কিনা?“

গ্লাসচেম্বারের ভেতরের আলো-জ্বলা প্যানেলটার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “টাইম মেশিনে সবকিছু ঠিক কোনো সময়েই থাকে না।“ তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, “তোমাকে দেখে তোমার বাবার কথা মনে পড়ছে আমার। সেও সময়যাত্রা নিয়ে পাগল ছিল।“

আমি বললাম, “বাবা ফিরে আসার পর আপনারা দুই বন্ধু এই নিয়ে অনেক কিছু আলোচনা করতে পারবেন।“

একটু হেসে ডক্টর পাইন বললেন, “হ্যাঁ, রাজেশ ফিরলে অনেক কিছু জানার আছে ওর কাছ থেকে। তবে কী জানো, ভবিষ্যতে সময়যাত্রায় বিপদের ঝুঁকি এতটাই বেশি যে সরকার থেকে এই প্রজেক্টে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু তোমার বাবা কোনোদিন ভালো কথায় কান দেয়নি, তাই সেদিন ঐ বিপদটা ঘটল।“

আমি আর মীরা একবার পরষ্পরের দিকে তাকিয়ে নিলাম। আমরা জানি, এ বুড়ো বাবাকে তার দুর্দান্ত প্রতিভার জন্য মনে মনে একটু ঈর্ষা করত। এই ধরনের প্রফেশনাল জেলাসি যেকোনো ক্ষেত্রেই থাকে, সময়যাত্রার গবেষণাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এই নির্দোষ ঈর্ষাটুকুর জন্য আমরা মজাই পেয়েছি সবসময়। ডক্টর পাইন আমাদের স্নেহ করতেন, আমরা জানতাম।

আবার তিনি মেশিনের ভেতরের যন্ত্রপাতি খুঁটিয়ে দেখছিলেন। দেখতে দেখতেই তিনি বললেন, “এইখানে একটা ভালো মডিফিকেশন করেছ দেখতে পাচ্ছি। চেম্বারটা বুলেটপ্রুফ গ্লাস দিয়ে তৈরি করে ভালো করেছ, তাতে ঐ প্রচন্ড কম্পন সহ্য করেও রিটার্ন জার্নির জন্য যন্ত্রটা অক্ষত থাকবে, আশা করা যায়। রাজেশ নিজে যেটা ব্যবহার করেছিল, এর তুলনায় সেটার প্রযুক্তি ছিল মান্ধাতার আমলের। একবার ব্যবহারের পর সেটাকে আর ফিরে আসার জন্য ব্যবহার করা যেত না। কিন্তু টিনা, টি-ট্রাভেলিং-এর সবচেয়ে বড়ো সমস্যাটার সমাধান কি তোমরা করতে পেরেছ?”

শুকনো মুখে মাথা নেড়ে আমি বললাম, “না, ডক্টর পাইন। দু’জন লোককে একসঙ্গে ভবিষ্যতে পাঠানোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করতে হয়, সেটা আমরা এখনও পারিনি। আরও গবেষণা করার সময় পেলে বাবা হয়তো পারত, কিন্তু আমরা তো কেউ তার মতো জিনিয়াস নই।“

“আচ্ছা, তাহলে টু-সিটার টাইম মেশিন আজও কেউ বানিয়ে উঠতে পারল না!”

মীরা একটু তেতো মুখে বলল, “আপনার জন্যই তো সরকার এইধরনের সময়যাত্রার রিসার্চ প্রজেক্টগুলোয় ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছে।“

মনে হল, কথাটা শুনে তিনি একটু আহত হলেন। সাদা দাড়িতে আঙুল বুলিয়ে তিনি বললেন, “মীরা, আমি নিজেই একজন টাইম-সায়েন্টিস্ট। এই রিসার্চ আমার জীবন ছিল। কিন্তু যে বিপদটা রাজেশ বুঝতে পারেনি, বা বুঝতে পেরেও স্বীকার করতে চায়নি, আমি সেই বিপদের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলাম। টাইম মেশিনে করে টি-ট্রাভেল করতে চাইলে সময়যাত্রীর জীবনের ঘোরতর আশঙ্কা থেকে যায়। গভর্নমেন্টের কাছে আমি এই আশঙ্কার কথাই বলেছিলাম। তাতেই ওরা এইধরনের প্রজেক্টগুলোকে ব্যান করে দেয়। দেখতেই পাচ্ছ, আজ রাজেশকে আনার জন্য যে ব্যক্তি ভবিষ্যতে যাবে, তাকে ওখানেই রয়ে যেতে হবে, কারণ একসঙ্গে দুটো মানুষকে ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তি এখনও কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি।“

মীরাকে আমি চুপ করে থাকতে ইশারা করলাম। ডক্টর পাইন আবার বললেন, “রাজেশকে আনতে তোমাদের একজন ভবিষ্যতে যাবে, বেশ কথা। কিন্তু তার আগে আমার একটা কথা বলার আছে। এ কথা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।“

আমি বললাম, “কী কথা?”

“টিনা, তুমি কি জানো তোমার বাবা যখন এটাকে প্রাথমিকভাবে বানান, তখন তোমার মায়ের সাহায্যে কেন এমন ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে এটা শুধু তোমার ডিএনএ কোড দিয়েই চালু করা যায়?”

“না।“

“কারণ তোমার বাবা চেয়েছিলেন তাঁর ডিএনএ ছাড়া অন্য কেউ যেন এটাকে ব্যবহার করতে না পারে। উনি আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলেন যে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে তাঁকে হয়তো অনেকদিন থাকতে হতে পারে।“

মীরা কাঁধ ঝাঁকাল। আমি বুঝতে পারছি, ভেতরে ভেতরে ও এইসব বকবকানি শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে উঠছে। যেটুকু সময় হাতে আছে, সেটুকু ও এখন আমার সঙ্গে একান্তে কাটাতে চায়। ও বলল, “এসব কথা তো আমরাও জানি। এমন কিছু বলার আছে কি যা আমরা জানি না?”

একবার মীরার দিকে, তারপর আমার দিকে তাকালেন তিনি। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “টিনা, আমি জানি তোমার মা কীভাবে মারা গিয়েছিল।“

 

***

মীরা – অতীত – বয়স পনেরো

সে রাতটার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।

টেবিল ল্যাম্পের মোলায়েম আলোর সামনে মা বসেছিল, হাতে ছিল রবিঠাকুরের একটা বই। নিঃশব্দে কাঁদছিল মা। আমি জানি, মনে মনে কোথাও মা আমাদের এই পার্থিব অস্তিত্বের চেয়েও বৃহত্তর কিছুর সন্ধান করে; হয়তো দেহাতীত কোনো ঈশ্বরের কথায় মন ডুবিয়ে রাখে।

আমি নিজে ঈশ্বর মানি না। কিন্তু মাকে যখন দেখি, সে কবিতা পড়ছে আর তার গাল দিয়ে নিজের অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ছে, তখন মনে হয়, নিজের চেয়েও অনেক বড়ো কিছুর উপর যদি বিশ্বাস করতে পারতাম, হয়তো ভালোই হত। বেশ বুঝতে পারি, আমারও মনের গভীরে একটা শূন্যতা রয়ে গেছে। সে শূন্যতা অবশ্য কোনো সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের জন্য নয়, এ আমি বেশ জানি।

এই বাড়ি ছেড়ে কোনোদিন বেরোতে দেওয়া হয়নি আমাকে। আমাদের বাড়ির পশ্চিমদিকের পাঁচিলে একটা বন্ধ দরজা ছিল; সেই দরজার ওপারে যাওয়া মানা ছিল। মা খুব শান্ত প্রকৃতির মহিলা ছিল; কখনও উঁচু গলায় কথা বলেনি সে আমার সঙ্গে; কোনোদিন রাগতে দেখিনি তাকে। কিন্তু কথা বলার সময় তার মধ্যে অদ্ভুত একটা শান্ত ব্যক্তিত্ব ফুটে বেরোত; আমি তার নির্দেশ অমান্য করার কথা কোনোদিন ভাবতেই পারিনি।

জীবনে যারা গভীরভাবে মানব অস্তিত্বের চেয়েও বড়ো কিছুতে বিশ্বাস রাখে, তারা বোধহয় মনের মধ্যে বিরাট একটা শান্তিতে স্থির হয়ে থাকে; শত ঝড়ঝঞ্ঝাতেও তাদের টলানো কঠিন হয়। মা ভালো করেই জানত, ওসব ঈশ্বর-টিশ্বরে বিশ্বাস আমার নেই, কিন্তু কোনোদিন নিজের বিশ্বাস আমার উপর চাপিয়ে দেয়নি সে। মা বলত, “বিশ্বাস না করলেও কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু ভালোবাসবার ক্ষমতাটুকু যেন হারিয়ে না যায়। মনে রাখিস মা, জীবনে যে ত্যাগগুলো আমরা করি, তাই দিয়েই ঠিক হয় আমরা মানুষ হিসাবে কেমন।“

এর মানে কী, আমি বুঝতাম না, কিন্তু মায়ের কাছে কথাগুলো যে খুব অর্থবহ, সেটা বুঝতে পারতাম। এই কথাগুলো বলার সময় অদ্ভুত একটা পরিতৃপ্তিতে মায়ের মুখটা কেমন আলো হয়ে যেত। ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে আমার ভালো লাগে না, এ কথাটা মাকে আর তখন বলতে ইচ্ছা করত না।

এমনিতেই আমার জীবনটায় ঈশ্বরের নাকগলানো ছাড়াই যথেষ্ট জটিলতা আছে।

পনেরো বছরের জীবনে একটা মেয়ে যখন তার মায়ের কাছ থেকে জানতে পারে, তার কোনো বাবা নেই, তখন এইধরনের উপলব্ধি আসাটা বোধহয় অস্বাভাবিক নয়।

আমাদের ঘরে কোনো অতিথি আসত না, শুধু ঐ দুই রহস্যময় আগন্তুক ছাড়া। প্রথমজন একটি মহিলা – তার মুখটা ফ্যাকাশেগোছের – সে আসত ঐ পশ্চিমের নিষিদ্ধ দরজা দিয়ে। মায়ের সঙ্গে নিচুগলায় কীসব কথা বলত সে। ওরা কথা বলত ঐ দরজাটা খুলে; কেউ কারও এলাকায় পারতপক্ষে পা দিত না। ঐ মহিলার সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসার পর দেখতাম মায়ের চোখ জলে ভরা। কেন, একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম। মা বলেছিল, “দেবী আমাকে মনে করিয়ে দেয়, একদিন তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি।“

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, “সে আবার কী কথা? আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব কিসের দুঃখে?”

মা চোখ মুছে বলেছিল, “আমি জানি, একদিন তুই ঠিক যাবি।“

অন্য যে অতিথিটি আসত, সে ঐ ফ্যাকাশেমুখো মহিলার থেকেও বেশি রহস্যময় ছিল। সে পুরুষ না মহিলা, আমি কখনও জানতে পারিনি, কারণ সে সবসময় আসত গায়ে একটা কালো ওভারকোট চড়িয়ে আর মুখটা কালো একটা মুখোশে ঢেকে। মা বলেছিল, “এই অতিথি চায় না তুই তার পরিচয় জেনে ফেলিস।“

“উনি কি পুরুষ? নাকি মহিলা?”

মা হেসে বলেছিল, “অতিথি ভাবলেই তো যথেষ্ট। পুরুষ না মহিলা, জেনে তুই কী করবি?”

আমি বললাম, “কিন্তু এই অতিথিটি তোমার কাছে কী চায়? একে দেখলেই আমার মনে হয়, এ যেন তোমার কাছে কিছু একটা চায়। একে আমার ঠিক পছন্দ হয় না।“

মা একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “এই কথাটা ভুল বলিসনি রে। লোকে সবসময় আমার কাছে কিছু না কিছু চায়।“

তার শুকনো মুখটার দিকে তাকিয়ে আর এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না আমার। পড়ার ঘরে গিয়ে একটা বই তুলে আমি পড়তে বসে গেলাম।

আরও আধঘণ্টা পরে মা আমাকে ডিনারের জন্য ডাকল। দেখলাম, এখনও তার মুখটা কেমন দুঃখী-দুঃখী হয়ে আছে। আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে সে বলল, “জীবনে কি দুঃখের অভাব আছে রে? কিন্তু যদি শান্তি চাস, তাহলে দুঃখকে মাথা পেতে বরণ করে নিতে হয়। নইলে কেবলই অশান্তি আসে।“

খাওয়ার পরে আমার ঘরে এসে আমার পাশে বিছানায় বসল মা; আমার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “তোকে প্রায় ন’মাস এই শরীরে রেখেছিলাম আমি। যখন সময় হবে, তুই বুঝতে পারবি, যখন কাউকে ঠিকঠাক ভালোবাসা যায়, তার জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়।“

মা কী বোঝাতে চাইল আমি জানি না, কিন্তু আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। সে আমার মাথায় আরেকবার চুমু খেয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি তার শেষ কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানিনা, কিন্তু হঠাৎ ঘুমের মধ্যে কে যেন আমার বাম হাত ধরে আলতো করে নাড়া দিল। ভীষণ চমকে গিয়ে আমি বিছানায় উঠে বসলাম।

একদম অচেনা স্পর্শ! এ কে ঢুকেছে আমার ঘরে?

তার মুখ দেখতে পাচ্ছি না অন্ধকারে, কিন্তু মনে হচ্ছে এ আমারই বয়সী একটা মেয়ে। সে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “আমার নাম টিনা। ঐ পাঁচিলের দরজাটার ওপারে আমি থাকি। প্লিজ, চেঁচিও না।“

টিনা – অতীত – বয়স পনেরো

যে রাতে মীরার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়, সেই রাতেই আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটা ঘটেছিল। আসছি সে কথায়।

মেয়েটা বুদ্ধিমতী; আমি যখন ওকে ঘুম থেকে তুললাম, তখন চেঁচিয়ে ওঠেনি। অন্ধকারে আমি ওর মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু অনুমান করে নিলাম, ও আমার বয়সীই হবে।

আজ রাতে অবশেষে অসাধ্যসাধন করেছি। আজ আমি মায়ের নিষেধ অমান্য করে চুপিচুপি দরজা পেরিয়ে চলে এসেছি এদিকে।

মায়ের জ্বর; তাই ঘুমের ওষুধ খেয়ে খুব ঘুমোচ্ছে সে। আমি দেখলাম, এই সুযোগ। নিঃশব্দে তার ব্যাগ থেকে দরজার চাবি বার করে চলে এসেছি এদিকে। কখন এই ঘরে চুপিসারে এসে খাটের নিচে ঢুকে মীরার জন্য অপেক্ষা করছি, মীরার মা-ও বুঝতে পারেননি।

আমার ধারণা, এই মেয়েটার মনেও তার এই বন্দীজীবন সম্পর্কে কৌতূহলের অন্ত নেই।

আমি বললাম, “আলোটা জ্বালাতে পারবে?”

মীরা বলল, “মা বোধহয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। আলো জ্বালা যেতেই পারে।“

আলোটা জ্বলে উঠতেই দু’জন দু’জনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।

মনে হচ্ছে, যেন আয়নায় নিজের মুখটাই দেখছি আমি।

একসঙ্গেই দু’জন বলে উঠলাম, “তুমি কে?” তারপর দুজনেরই মুখে একটা বোকা বোকা হাসি ফুটে উঠল।

আমি হাত বাড়িয়ে ওর মুখটা স্পর্শ করলাম। এত অদ্ভুত লাগছিল যে মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্ন দেখছি। ও-ও আমার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল, তারপর আঙুল বাড়িয়ে আমার গালে স্পর্শ করে যেন বুঝতে চেষ্টা করল, আমি মানুষটা বাস্তব কিনা।

অদ্ভুত লাগছিল, কিন্তু ভালো-ও লাগছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনে কেউ যেন এই প্রথম আমাকে জানতে চাইছে, আমাকে ‘আবিষ্কার’ করতে চাইছে।

সেই মুহূর্তে যদি কোনো দর্শক থাকত, সে এমন বিচিত্র দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যেত। দুটো হুবহু একই রকম দেখতে মেয়ে পরষ্পরকে ছুঁয়ে দেখছে আর বোকার মতো ফিক ফিক করে হাসছে। এইরকম হাসি আরও প্রায় দু’মিনিট চলল। আমরা এইবার কিছুটা বুঝতে পারছিলাম, কেন আমাদের মা-রা এতদিন আমাদের মুখোমুখি হতে দেয়নি।

তারপর ও বলল, “আমার নাম মীরা।

“আমি টিনা।“

ওর বিছানায় বসে আরও কী একটা বলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় দেখতে পেলাম ঘরের খোলা দরজায় কে দাঁড়িয়ে আছে।

মীরা দরজার দিকে পেছন ফিরে বসেছিল, তাই ও দেখতে পায়নি, কিন্তু আমি সেই ছবিতে দেখা দুঃখী-দুঃখী মুখের মহিলাকে চিনতে পারলাম। বুঝলাম, ইনিই মীরার মা, যদিও মা-মেয়ের মুখের কোনো মিল নেই।

আমার দিকে তাকিয়ে তিনি একটু হাসলেন। “হ্যালো, টিনা। ওয়েলকাম।“

মীরা চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। “ওঃ মা, তুমি… ইয়ে…”

তিনি এসে তাঁর মেয়ের পাশে বিছানায় বসলেন। “তোর কিন্তু-কিন্তু করার কিছু নেই, মীরা। আমরা মায়েরাই বরং মেয়েদের কাছে কিছু কথা লুকিয়ে গেছি।“

আমার দিকে ফিরে তিনি বললেন, “দেবীকে এখানে আসতে বলে ফোন করেছি। তোমার বাবার ব্যাপারে যখন কথা হবে, তখন ওর এখানে থাকাটা দরকার।“

মীরা বলল, “মা, আমি কি টিনার বোন?”

“না, তুই ওর বোন নয়। তুই তার চেয়েও বেশি কিছু।“

মীরার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে বলল, “মা, হেঁয়ালি কোরো না। আমার বাবা তাহলে কে?”

কথাটা বলতে গিয়ে মহিলার মুখের যন্ত্রণার ছাপটুকু আমার নজর এড়াল না। “টেকনিক্যালি, তোর কোনো বাবা নেই রে, মীরা। টিনার বয়স যখন ছ’মাস, তখন ওর বাবা একটা টাইম মেশিন ব্যবহার করে অন্য টাইমলাইনে চলে যান। তখন ওর দেহ থেকে একটা সোমাটিক সেল নিয়ে ওর মা একটা হোস্ট এগসেলে সেটাকে ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে দিয়েছিলেন। সেই এগসেলটার জেনেটিক মেটেরিয়ালগুলো আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দুটো সেলকে ইলেকট্রিক কারেন্ট দিয়ে জুড়ে এক সারোগেট মাদারের ইউটেরাসে প্রতিস্থাপন করা হয়। আমি ছিলাম তোর সেই ‘সারোগেট মাদার’।“

মীরা চিৎকার করে উঠল, “কীসব আবোল তাবোল বকছ, মা? এসবের মানেটা কী?”

ওর মা মুখ শক্ত করে বললেন, “এর মানে, তুই হচ্ছিস টিনার ক্লোন। তোকে তৈরি করা হয়েছিল রাজেশকে ভবিষ্যৎ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য।“

মীরা – অতীত – বয়স পনেরো

আমি সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরে কোনোদিন বিশ্বাস করিনি। এখন আমার অবিশ্বাসটা আরও বেড়ে গেছে।

একসঙ্গে এতগুলো আঘাত সামলানো বড় সহজ ছিল না। আমার কোনো বাবা নেই। যে মহিলাকে ‘মা’ বলে জেনে এসেছি, সে আমার আসল মা নয়, সারোগেট মাদার। আমি একটা ক্লোন; আমার মতো দেখতে অন্য একটা মেয়ের নকল।

না, ‘আমার মতো দেখতে’ নয়; আমিই তার মতো দেখতে। সে আসল, আমি নকল।

তবু মায়ের উপর রাগ করতে আর পারলাম কই? তার দিকে চেয়ে দেখি, তার চোখগুলো ভরে উঠেছে টলটলে জলে।

টিনা বোধহয় আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছিল। পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা ধরে একটু চাপ দিল ও; যেন বলতে চাইল, “ভাবিস না, আমি আছি।“

মনে হল, এই সদ্যপরিচিত মেয়েটাই যেন আমার মনের অবস্থাটা দুনিয়ায় যেকোনো মানুষের থেকে ভালো বুঝতে পারছে। হয়তো ওর সঙ্গে আমার একটা অদ্ভুত সংযোগ আছে বলেই।

বললাম, “কিন্তু এত কিছুর দরকার কেন হল, মা?”

“কারণ ভবিষ্যৎ থেকে রাজেশকে আনতে যেতে একজনই পারবে। দেবী জানত, সে পারবে না; পারলে একমাত্র পারত টিনা, কারণ নতুন যে টাইম মেশিনের কাজ শেষের পথে রেখে রাজেশ একদিন উধাও হল, সেটা শুধু টিনার ডিএনএ দ্বারাই অ্যাক্টিভেটেড হয়। রাজেশের কথা শুনে দেবী ওটাতে এমন ব্যবস্থা করে রেখেছিল যাতে টিনার ডিএনএ ছাড়া ওটা কেউ চালাতে পারবে না। কিন্তু টিনা যদি ভবিষ্যতে চলে যায়, তাহলে ও আর কোনোদিন ফিরতে পারবে না। তাই…” এই পর্যন্ত বলে মা হঠাৎ অস্বস্তিভরে চুপ করে গেল।

আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। “তাই আমাকে তৈরি করার দরকার পড়ল। টিনার একটা ডুপ্লিকেট দরকার ছিল তোমাদের, তাই আমাকে বানালে তোমরা। কেন? যে লোককে আমি কোনোদিন দেখিনি, জানি না, তাকেই ভবিষ্যৎ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য। বাঃ, মা! দারুণ, দারুণ! অসাধারণ স্বার্থবুদ্ধিহীন কাজ করেছ তোমরা!”

মাকে আঘাত করে কী ভীষণ আনন্দ পাচ্ছিলাম আমি, বলে বোঝাতে পারব না। আমার জন্মের আগে থেকে এই মানুষগুলো আমার উপর আর কী কী বোঝা চাপিয়ে রেখেছে, জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব।

টিনারও বোধহয় রাগ হচ্ছিল কথাগুলো শুনে। ও বলল, “আপনি এরকম কাজ করতে গেলেন কেন?”

মায়ের গাল বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। টিনার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “তোমার মা আমার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল। আমাকে কোনোদিনও পছন্দ করেনি সে। সে জানত, আমি মনে মনে তোমার বাবাকে ভালোবাসি। কিন্তু একদিন রাজেশ হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে টাইম মেশিনে চেপে ভবিষ্যতে চলে গেল; ও যে কোনোদিন ফিরে আসবে, সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে গেল। তখন তোমার মা এই সারোগেসির জন্য আমাকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনি। সে জানত, রাজেশকে সাহায্য করার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। এর আগে রাজেশের সঙ্গে মিলে সে নতুন টাইম মেশিনটাকে তোমার ডিএনএ দিয়ে কোডেড করে রেখেছে। কিন্তু রাজেশ চলে যাওয়ার পর সে বুঝতে পারল, তুমি যদি বাবার খোঁজে ভবিষ্যতে চলে যাও, তাহলে তোমার আর ফেরার উপায় থাকবে না। তাই তোমার একটা কপি তৈরি করার অনুরোধ করল আমাকে দেবী।“

আমি বললাম, “কপি-ই বটে। ইউজ অ্যান্ড থ্রো কপি।“

এ কথার উত্তর না দিয়ে মা বলে চলল, “তোমার বাবার অনেক শত্রু ছিল, টিনা। সরকারের স্পাইরা সন্দেহ করত যে সে গোপনে বেআইনি টাইম মেশিন বানাচ্ছে। তার নিজের বন্ধুবৃত্তেই অনেকে ছিল, যারা তাকে হিংসা করত। তাই দেবী খুব সতর্ক হয়ে থাকত যাতে আর কেউ ঐ মেশিনটা ব্যবহার করতে না পারে, বা ওটার টেকনোলজিটা চুরি করে নিতে না পারে। ওতে ডিএনএ-অ্যাক্টিভেশন প্যানেলটা সেইজন্যই লাগানো হয়েছিল। তুমি বা মীরা যদি ওই প্যানেলের উপর হাত রাখো, অজস্র ন্যানো-নিডল বেরিয়ে এসে তোমার হাত থেকে ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করে মেশিনটাকে চালু করে দেবে। অন্য কেউ ওটাকে ব্যবহার করতেও পারবে না, বা ওটার সাহায্যে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে রাজেশকে ট্র্যাক করতেও পারবে না। নইলে তো…”

“নইলে তো…?”

তিনি শান্তভাবে বললেন, “আমিই স্বেচ্ছায় ওকে খুঁজে আনতে যেতাম।“

হঠাৎ মনে হল, মায়ের চরিত্রের এই দিকটা আমি আগে কখনও দেখতে পাইনি। টিনার বাবার প্রতি ভালোবাসায় নিজেকে পুরোপুরি যেন নিবেদন করে দিয়েছে সে; প্রতিদানে কিচ্ছু চায়নি, শুধু ঐ মানুষটার জন্য স্বার্থত্যাগ করে গেছে। হ্যাঁ, আমার দিক থেকে দেখলে সে আর টিনার মা মিলে যে কাজটা করেছে, সেটাকে স্বার্থপরতা মনে হয় বটে, তবু মায়ের জন্য একটা গভীর শ্রদ্ধা অনুভব না করে আমি পারলাম না। মনের মধ্যে যে অসহনীয় রাগটা তাল পাকাচ্ছিল, সেটা শান্ত হয়ে এল।

আমি একদিন চলে যাব, মা জানে। তবু আমাকে ভালোবাসার কমতি রাখেনি সে কোনোদিন।

জীবনে যে ত্যাগগুলো আমরা করি, তাই দিয়েই ঠিক হয় আমরা মানুষ হিসাবে কেমন।

হঠাৎ কী যেন খেয়াল হতে মা একটু চমকে উঠল। “আরে, দেবী এখনও এসে পৌঁছল না কেন? এতক্ষণ তো ওর এসে যাওয়ার কথা!”

দেখলাম, মা যেন ভয় পেয়ে গেছে; যেন ভয় পাচ্ছে, খুব খারাপ কিছু ঘটে গেছে। টিনাও তার মুখের সেই অবস্থা দেখে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, কিন্তু আমি আর কী বলব তাকে? আমি বললাম, “চলো, দেখি উনি কী করছেন।“

বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম তিনজন, হনহনিয়ে হেঁটে চললাম পশ্চিম পাঁচিলের দরজার দিকে।

টিনার মা-কে পাওয়া গেল দরজার কাছেই। ওখানেই উপুড় হয়ে পড়েছিলেন তিনি। “মা!” বলে চিৎকার করে টিনা সেদিকে দৌড়ে গেল।

শরীরটা নড়াতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল আমার। একটা লাল গোল ক্ষত তাঁর কপালে; রক্ত গড়িয়ে নামছে সেই ক্ষত থেকে।

বুলেটের ক্ষতচিহ্ন!

টিনা পাগলের মতো ঝাঁকাচ্ছে ওর মায়ের প্রাণহীন শরীরটাকে। সে দৃশ্য আর সহ্য করতে না পেরে আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, তার মুখটা যেন রক্তশূন্য হয়ে গেছে – ঠিক ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে।

টিনা – বর্তমান – বয়স আঠারো

আমি প্রশ্ন করলাম, “কীভাবে মারা গিয়েছিল মা, ডক্টর পাইন?”

ডক্টর পাইন প্লাস্টিকের চেয়ারটায় বসে পড়ে সাদা দাড়িটা একটু চুলকে নিলেন। “সত্যিই শুনতে চাও সে কথা? ইগনোরেন্স ইজ ব্লিস। এতদিন পরে নিজেকে ভারাক্রান্ত করে কী লাভ, টিনা?”

অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার কন্ঠস্বর একটু রূঢ় হয়ে উঠল। “ডক্টর পাইন, প্লিজ! আমাদের পুরো বাড়িটার প্রত্যেকটা প্রবেশপথ পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড ছিল। ঘরের আমরা এই কয়েকটি বাসিন্দা ছাড়া সেই পাসওয়ার্ডগুলো কেউ জানত না। তাহলে খুনী ঘরে ঢুকল কোথা দিয়ে?”

আমার দিকে তাকিয়ে তিনি আস্তে আস্তে বললেন, “এখনও বুঝতে পারছ না? আর কে-ই বা করতে পারে কাজটা?”

মীরা এতক্ষণ পাথরের মতো শক্ত মুখে সব শুনছিল। সে এবার গরগরিয়ে উঠল। “কী বলতে চাইছেন বলুন তো আপনি? কে করতে পারে কাজটা?”

তিনি বললেন, “কে কাজটা করেছিল, আমি জানি না। কিন্তু পাসওয়ার্ড দেওয়া দরজা খুনীকে কে খুলে দিয়েছিল, আমি জানি। তুলসী।“

মীরা চিৎকার করে উঠল। “আমার মাকে বিশ্বাসঘাতক বলছেন আপনি? মার্ডার অ্যাকমপ্লিস বলছেন? কোনো প্রমাণ আছে আপনার কাছে?”

পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বার করে তিনি আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। “এটা দেখে নাও একবার।“

আমি বললাম, “কী এটা?”

“তোমরা দুজন এই ক্যামেরাগুলোর অস্তিত্ব জানতে না, কিন্তু প্রত্যেকটি দরজার সামনে গোপন ক্যামেরা বসানো ছিল। তুলসী জানত, দেবীও জানত। এই পেনড্রাইভে সেদিন রাতের ফুটেজ আছে।“

ল্যাপটপে পেনড্রাইভটা গুঁজে ভিডিও ফাইলটা প্লে করলাম আমি। মীরা এসে দাঁড়াল আমার পাশে। এখান থেকে ওর লম্বা চুলের সুগন্ধ পাচ্ছি আমি; মনিটরের নীল আলোটা পড়ছে ওর মুখে। কোনো কথা না বলে ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি।

ভিডিওটা যখন শেষ হল, তখন বুঝতে পারলাম, ওর হাতের উপর আমার হাতের বাঁধনটা আলগা হয়ে এসেছে।

মীরার মা তুলসীকে আমরা দেখলাম ভিডিওতে – তিনি এক মুখোশধারীকে দরজা খুলে দিচ্ছেন। লোকটার হাতে ধরা রিভলভারটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লোকটা বাড়িটার পশ্চিম দিকের অংশে চলে যাওয়ার পর তুলসী তাঁর বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।

মীরার প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম হয়েছে। “সত্যি বলছি টিনা, বিশ্বাস কর, আমি এসবের কিছুই জানতাম না।“

আমার মাথার একটা শিরা দপদপ করছে। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে আমি বললাম, “আমি তোর কথা বিশ্বাস করি।“

মীরা বলল, “আপনি এই ভিডিও ফুটেজ কোত্থেকে পেলেন, ডক্টর পাইন?”

তিনি একটু হাসলেন। “তুলসী নিজেই দিয়েছিল আমাকে। তোমাদের হাতে এ জিনিস পড়ুক, ও চায়নি। ও জানত, এটা দেখলে তোমরা ওকেই দায়ী করবে দেবীর মৃত্যুর জন্য। আমাকে ছাড়া ও কাউকে ভরসা করতে পারেনি।“

মীরা তার কন্ঠস্বরের তিক্ততা লুকানোর কোনো চেষ্টাই করল না। “কেন, শুনি? আপনি তার এত ভরসার পাত্র হয়ে উঠলেন কী করে?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডক্টর পাইন বললেন, “মীরা, তুলসী আমার মেয়ে ছিল।“

টিনা – অতীত – বয়স ষোলো

মীরা যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে আমার জীবনে

একটা সঙ্গীর অভাব বরাবর অনুভব করেছি আমার জীবনে। মীরা আমার সেই বহুপ্রার্থিত সঙ্গিনী হয়ে এসেছে। আমি যা চাইতাম, ও তার চেয়ে অনেক বেশিই হয়ে এসেছে।

মায়ের মৃত্যুর পর ও পাঁচিলের এপারে আমার দিকের অংশটায় এসে থাকা শুরু করেছে। ওর মাকে আমি ‘তুলসীমাসি’ বলে ডাকি এখন। তিনি এসে প্রায়শই দেখা করে যান, কিন্তু এদিকে থাকেন না। নিজের পুরোনো বাড়িতেই থাকতে পছন্দ করেন তিনি। মীরা যে আমার সঙ্গে থাকতে শুরু করেছে, এতে মনে হয়, তিনি একটু দুঃখ পেলেও কিছুটা নিশ্চিন্তও হয়েছেন।

মাকে যে কে খুন করেছিল, আমরা জানতে পারিনি কখনও। তুলসীমাসি বলেছিলেন, “হয়তো কোনো উটকো চোর-বদমাশ হবে – চুরি করতে এসেছিল, তখন দেবী সামনে পড়ে গিয়েছিল।“ কিন্তু এই ব্যাখ্যাটায় দু’খানা বড়ো বড়ো ফাঁক আছে। এক, বাড়ি থেকে কিচ্ছু চুরি যায়নি। আর দুই, আমাদের দু’বাড়ির পাসওয়ার্ড-প্রোটেক্টেড, হাই-টেক সুরক্ষা ভেদ করা কোনো ছিঁচকে চোরের কর্ম নয়।

তুলসীমাসি বলেছিলেন, চোরটা বোধহয় কোনোভাবে সিকিউরিটি সিস্টেমটা হ্যাক করে ফেলেছিল। কিন্তু মায়ের তো কোনো শত্রু ছিলই না; তাকে মারার জন্য এত পরিশ্রম করবে কে?

আমি মীরাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আচ্ছা, মায়ের মৃত্যুতে কার লাভ হতে পারে বল তো?”

মীরা বলেছিল, “এমন কেউ, যে চায় না তোর বাবা ফিরে আসুক। বাইরের কেউ নিশ্চয় জেনেছিল যে তোর মা তোর বাবার পুরোনো রিসার্চ ফাইলগুলো ব্যবহার করে নতুন টাইম মেশিনটা নিয়ে কাজ করছে।“

মীরা খেয়াল করেছে কিনা জানি না, কিন্তু আমি দেখেছি, তুলসীমাসি ঐ ঘটনার পর থেকে বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছেন। এমনিতেই উনি কথা কম বলেন, কিন্তু এখন মনে হয়, উনি যেন কথা বলার আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছেন। মাঝেমধ্যেই দেখতে পাই, আমাদের সঙ্গে দু’চার কথা বলতে বলতেই ওঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

মীরা বলে, ওর মা নাকি প্রায়শই এমন কাঁদেন, বিশেষত কবিতা পড়ার সময়। কিন্তু আমার কেন জানি না ওতে বিশ্বাস হয় না।

ভদ্রমহিলার মনের মধ্যে একটা খুব গভীর বিষণ্ণতা আছে।

আমার বাবাকে উনি ভালোবাসতেন। বাবা ওঁর ভালোবাসা গ্রহণ করেনি। তবু নিজের জীবনটা উনি কেমন অনায়াসে বিলিয়ে দিলেন আমাদের মঙ্গলের কথা ভেবে!

সে-রাতে আমি টাইম মেশিনটা নিয়ে কাজ করছি, আর মীরা পাশ থেকে এটা-ওটা যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাবার পুরোনো ডায়রি আর ড্রাইভে তুলে রাখা ফাইলগুলো খুব সাহায্য করছে। বাবার রেখে যাওয়া এইরকম ডিটেলড গাইডলাইন হাতে পেলে যে লোকের সামান্য বিজ্ঞানের জ্ঞান আছে, তার পক্ষে একটা টাইম মেশিন বানানো আদৌ কঠিন কাজ নয়।

আমাদের অবশ্য পুরো মেশিনটা বানাতে হচ্ছে না। বাবা একটার কাজ প্রায় শেষ করেই এনেছিল। সেটাকে সমাপ্ত করাই এখন আমাদের লক্ষ্য। বাবার তৈরি করা ডিজাইন তো আছেই, আমরা আমাদের বুদ্ধিমতো তাতে কিছু পরিবর্তনও করছি।

তুলসীমাসি আমার কাজ দেখছিলেন একটু দূরে বসে। তিনি বললেন, “টিনা, যন্ত্রটা কাজ করবে তো?”

আমি বললাম, “আশা করছি, করবে। বাবা যেটা নিয়ে ভবিষ্যতে গেছে, এটা সম্ভবত তার থেকেও ভালো কাজ করবে।“

একটু আগ্রহের সুরে তুলসীমাসি বললেন, “জিনিসটা কীভাবে কাজ করে, বলো তো? আমি অবশ্য বেশি বিজ্ঞান বুঝি না, তাই সহজ করে বোলো।“

আমি ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বললাম, “তুলসীমাসি, মহাবিশ্ব একটা নয়, অনেক আছে। এই প্রত্যেকটার ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পন আলাদা। তাই একটার কাছে আরেকটার অস্তিত্ব ধরা পড়ে না। আমাদের টি-মেশিনটা এইরকম অন্য একটা মহাবিশ্বের সঙ্গে ফ্রিকোয়েন্সি মেলাতে সাহায্য করে। সেটা যখন ঠিকমতো মিলে যায়, তখন এই মেশিন টি-ট্রাভেলারকে ঐ জগতটায় পৌঁছে দিতে পারে। হ্যাঁ, জানি, এটাকে সেই অর্থে ‘টাইম-মেশিন’ বলা হয়তো যায় না, কিন্তু আমরা এটাকে ঐ নামেই ডাকি।“

মীরার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে তিনি বললেন, “কিন্তু রাজেশকে আনতে যে যাবে, তাকে ফেরানোর কোনো উপায় করে উঠতে পারোনি?”

মীরা কিছু না বলে একটু মুচকি হাসল শুধু। আমি বললাম, “বাবা ফিরে এলে সে হয়তো এটার ব্যবস্থা করে উঠতে পারবে। কিন্তু আমার বিদ্যেয় কুলোয়নি।“

তুলসীমাসির চোখদুটো একবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেই একবার ম্লান হয়ে গেল। তিনি বললেন, “রাজেশ ফিরে এলে আমি বোধহয় তার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারব না।“

“কেন?” মীরা জানতে চাইল।

“ও যাকে ভালোবাসত, আমি তো তাকেই বাঁচাতে পারিনি। আমরা দু’জন দু’জনকে রক্ষা করে চলব, এমনটাই স্থির হয়েছিল। আমার বোকামির জন্যই দেবীকে মরতে হল।“

মীরা তীক্ষ্ণকন্ঠে বলল, “মানে?”

একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, “তোমাদের কাউকেই আমি এর মানেটা বোঝাতে পারব না। যাদের আমি ভালোবাসি, ইতিমধ্যেই আমি তাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি। আর ও কাজ আমি করতে পারব না।“

প্রশ্নটা করা একটু অশোভন জেনেও আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “বাবাকে আপনি খুব ভালোবাসতেন, তুলসীমাসি?”

একটু হাসলেন তিনি। “তোমার কাছ থেকে এই প্রশ্ন কোনোদিন শুনতে হবে, এ আমি ভাবিনি, টিনা; কিন্তু তুমি জানতে চাওয়ায় আমি সত্যিই খুশি হয়েছি। হ্যাঁ, তাকে ভালোবাসতাম আমি; আমি গোটা দুনিয়াকে জানাতে চাইতাম যে ঐ মানুষটাকে আমি ভালোবাসি। তার জন্য হেন কিছু নেই যা আমি করতে পারতাম না। শুধু রাজেশের জন্যই তোমার ক্লোনের সারোগেট মাদার হতে আমি রাজি হয়ে গিয়েছিলাম।“

আমরা চুপ করে রইলাম। তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি আবার বললেন, “ওকে আমি এতটাই ভালোবাসতাম যে কোনোদিন তোমার মায়ের জায়গা আমি নিতে চাইনি, টিনা। আমি জানতাম, ওর মনে আমার জন্য বিন্দুমাত্র জায়গা নেই – সহানুভূতি আছে, কিন্তু ভালোবাসা নেই। কিন্তু আমার ভালোবাসার বদলে তাকেও আমায় ভালোবাসতে হবে, এই দাবি আমি অন্তত কখনও করিনি।“

এই বলে আস্তে আস্তে দু’লাইন রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করলেন তিনি –

“তোমায় দিতে পেরেছিলেম একটু তৃষার জল –

এই কথাটি আমার মনে রহিল সম্বল।“

মীরা আমার দিকে তাকাল। মনে হল, একবার ওর হাতটা ধরি। মনে হল, ওকে আমি কোনোদিন আমার জীবন থেকে যেতে দিতে চাই না। ওকে…

হঠাৎ একটা ভয়ংকর আইডিয়া আমার মাথায় গজিয়ে উঠল। কিন্তু কাউকে কিচ্ছুটি না বলে আমি তুলসীমাসির কথা শুনতে লাগলাম।

“জানিস মীরা, দুনিয়ায় তুই ছাড়া আর দুটি মাত্র মানুষ আছে, যাদেরকে আমি মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতাম। এক হচ্ছে রাজেশ, আর দ্বিতীয় হচ্ছে সেই কালো মুখোশ পরা লোকটা। তাকে তোর মনে আছে?”

মীরা চমকে উঠে তার মায়ের দিকে তাকাল। “আচ্ছা, তাহলে সেই ‘অতিথি’ পুরুষমানুষ। লোকটা কে, মা?”

তুলসীমাসি কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভেবে বললেন, “বলব তাঁর কথা। হয়তো তাঁকে এসবের মধ্যে জড়িয়ে আমিই ভুল করেছি। আমাকে একটু ভাবার সময় দে। কাল বলব তাঁর কথা।“

হাই তুলে আমাদের ‘গুডনাইট’ বলে তিনি পাঁচিলের দরজা পেরিয়ে ওদিকের বিল্ডিং-এ চলে গেলেন।

মীরা আমার দিকে ফিরল। “টিনা।“

“উঁ?”

“কী যেন একটা বলবি তুই আমাকে?”

“তুই জানলি কী করে?”

“তোর চোখ কথা বলে। ব্যাপারটা কী রে?”

আমি বললাম, “তোকে যেতে দিতে মন চাইছে না রে।“

ও আমার পাশে ঘেঁষে বসল। আমি ওর কাঁধ জড়িয়ে নিলাম। ও বলল, “জানিস টিনা, আমি কোনোদিন ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু মা আমাকে একটা কথা বলে, যেটা আমি এখন সত্যিই মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করি – জীবনে যে ত্যাগগুলো আমরা করি, তাই দিয়েই ঠিক হয় আমরা মানুষ হিসাবে কেমন। মা তার জীবনে অনেক ত্যাগ করেছে এরই মধ্যে। এবার আমার পালা। সারা জীবন ধরে আমাকে যে বলির পাঁঠা হিসাবেই বড়ো করা হয়েছে, এই সত্যিটাকে আমি এখন মেনে নিয়েছি রে। এখন আমার মনে হয়, আমার স্যাক্রিফাইসে তোর বাবা ফিরে আসতে পারবেন তাঁর পরিবারের কাছে, তাঁর রিসার্চ শেষ করতে পারবেন। এইভাবে আমিও দুনিয়ায় কিছু একটা অবদান রেখে যেতে পারব। আর আমার কোনো রাগ অভিমান নেই কারও প্রতি।“

গলায় খাবারের কণা আটকে গেলে যেমন অস্বস্তি হয়, তেমনই একটা কান্না আমার গলায় যেন আটকে আছে। আমি বললাম, “তবু আমি চাই তুই আমার কাছে থাক।“

ও বলল, “অ্যাই টিনি, আমার দিকে তাকা।“

আমি তাকালাম, এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল বাম গাল বেয়ে।

আমাকে জড়িয়ে ধরে কানের পাশে ফিসফিস করে ও বলল, “তোকে খুব ভালোবাসি আমি।“

ওর মুখের মিষ্টি গন্ধ এসে লাগছে আমার নাকে। ওকে একটা চুমু খেলাম আমি। তারপর আরেকটা। তারপর অনেকগুলো।

আরও আধঘণ্টা পরে আমি আবার আস্তে আস্তে বললাম, “আমি সত্যি তোকে যেতে দিতে চাই না রে।“

 

*

 

পরের দিন সকালে আমরা আবিষ্কার করলাম, তুলসীমাসি ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন।

ডাক্তার এসে বললেন, হার্ট অ্যাটাক।

মীরা বলল, “অনেক কষ্ট পেয়েছে মা সারা জীবন ধরে। অন্তত মৃত্যু যে তাকে বেশিক্ষণ কষ্ট দেয়নি, তাতেই আমার সান্ত্বনা।“

আমি ভাবছিলাম একদম অন্য একটা কথা। সেই মুখোশপরা রহস্যময় অতিথিটি যে কে ছিল, আর কোনোদিনই জানা যাবে না।

টিনা – বর্তমান – বয়স আঠারো

হঠাৎ সবকিছু আমার সামনে যেন পরিষ্কার হয়ে গেল। হাতের ঘামটা সুরক্ষা-সুটের গায়ে মুছে বললাম, “ডক্টর পাইন, পাসওয়ার্ডগুলো উনি আপনাকেই দিয়েছিলেন, না?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে ছোট্ট রিভলভারটা বার করে আনলেন তিনি। “রাজেশের মতো অতিবুদ্ধিমান লোকের মেয়ের যেমনটি হওয়া উচিত, তেমনই বুদ্ধিমতী তুমি।“

মীরার চোয়াল আবার শক্ত হয়ে উঠেছে। ফাঁদে পড়া দুটো জন্তুর মতো মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমরা। আমি ওকে শান্ত থাকতে ইশারা করলাম।

ডক্টর পাইনের হাত একটুও কাঁপছে না; অস্ত্রটা তিনি তাক করে রেখেছেন আমার বুক বরাবর। “সেই রাতে তুলসীই আমাকে দরজা খুলে দিয়েছিল। তখন ও জানত না যে আমি দেবীকে মারার উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিল। ভীষণ শক-ও পেয়েছিল। আমার মেয়েটা বড়ই বোকা ছিল, বুঝলে?”

মীরা চাপা গর্জন করে বলল, “আমার মা মোটেই বোকা ছিল না। খুব ভালো মানুষ ছিল সে; সেটা আপনার বোঝার ক্ষমতা কোনোদিন ছিলই না।“

ডক্টর পাইন কথাটা যেন উড়িয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, “সে যাই হোক, আমি দেখলাম, দেবী এদিকে আসছে পাঁচিলের গায়ের দরজাটা দিয়ে; আমার সঙ্গে রিভলভার তৈরিই ছিল।“

“কেন?” জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে বুঝলাম হাতটা এত শক্ত করে মুঠো করা হয়ে গেছে যে আঙুলের নখগুলো নিজেরই হাতের তালুতে ফুটছে।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে তিনি বললেন, “ওকে তো মরতেই হত – দু’দিন আগে আর দু’দিন পরের পার্থক্যে কী আসে যায়? টাইম মেশিনটা বানানোর কাজে ও অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। আর কিছুদিন রাজেশের পুরোনো ফাইলগুলো নিয়ে কাজ করতে থাকলে ও ওটা বানিয়ে ফেলত, আর রাজেশ ফিরে আসত। সেটা আমি কি আমি হতে দিতে পারি? রাজেশ ফিরে এলে সে কি আমার এতদিনের ক্রিয়াকলাপের ব্যাপারে আদৌ মুখ বন্ধ রাখত?”

“কী ক্রিয়াকলাপ?” প্রশ্নটা করেই আমি বুঝতে পারলাম, লোকটা তার গোপন কথা আমাদের বলছে মানে আমাদের দু’জনকেই চিরকালের মতো চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য ও তৈরি হয়েই এসেছে।

“সরকারি টাইম ট্রাভেল প্রজেক্টের প্রধান ছিলাম আমি, জানতে তোমরা? রাজেশ আমার অধীনেই কাজ করত, কিন্তু আমার থেকে, আমার অধীনস্থ সব বিজ্ঞানীর থেকে ও একদম আলাদা লেভেলের প্রতিভাবান ছিল। সেজন্য আমি মনে মনে ওকে অপছন্দই করতাম; টাইম ট্রাভেল গবেষণা আমার প্রাণ ছিল, তাতে কেউ আমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, এ আমার সহ্য হচ্ছিল না। তারপর একদিন একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল।“

আমরা চুপ করে রইলাম। তিনি আবার বললেন, “একদিন এক বিরাট মাপের রাজনৈতিক নেতা এসে হাজির হলেন আমার কাছে। যে কথাটা তিনি বললেন, সেটা ভয়ংকর। তাঁর একটা কাজ আমাকে করে দিতে হবে। তাঁর একটি লোককে ভবিষ্যতে পাঠাতে হবে টাইম মেশিনের সাহায্যে, সেজন্য তিনি আমাকে অসম্ভব মোটা অংকের একটা টাকা অফার করলেন। আমি অফারটা নিতে দ্বিধা করিনি। তারপর আমি রাজেশকে দায়িত্ব দিলাম আমার জন্য একটা টাইম মেশিন বানিয়ে দিতে।“

মীরা বলল, “এসব কী বলছেন আপনি? রাজনৈতিক নেতার টাইম মেশিন দিয়ে কী হবে?”

“ছোটখাটো নেতা নয় সে, মীরা; রীতিমতো এই ফিল্ডের বিগশটদের একজন। তার গুণধর ছেলেটি নেশা করে মার্ডার করে বসেছে তার গার্লফ্রেন্ডকে। পুলিশ জানতে পেরে গেছে, এবং তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে ছেলেটাকে। এই নেতা আমার রিসার্চের ব্যাপারে জানত। সে এসে আমাকে বলল, তার ছেলেকে ভবিষ্যতে পাঠিয়ে দিতে হবে, যাতে পুলিশ কোনোদিন তাকে খুঁজে না পায়। মেশিন তৈরি হওয়া পর্যন্ত সে ছেলেকে আন্ডারগ্রাউন্ড রাখছে, কিন্তু ওটা তার যত দ্রুত সম্ভব চাই।“

আমরা কী বলব, বুঝে পেলাম না। তিনি বলে চললেন, “রাজেশ এতসব কিছুই জানত না। সে তখন তার টাইম মেশিন প্রজেক্টে প্রচুর ফান্ডিং পেয়ে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। মেশিন তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, শুধু একটা সমস্যা রয়ে গেছে – একটির বেশি লোক ওতে নেওয়া যায় না। ব্যাপারটা আমারও পছন্দ হল। এই নেতার ছেলে সঙ্গে আরও কাউকে নিয়ে যেতে পারবে না, তাতে আমি খুশিই হলাম। আপদটা একা একা বিদায় হলেই ভালো।

“এবার রাজেশকে পুরো ব্যাপারটা না বললে চলছিল না। জানতাম, ও যেরকম নীতিবাগীশ মানুষ, তাতে ওকে এইসব দু’নম্বরি কাজে রাজি করানো সহজ নয়। তাই এই ছোট্ট আগ্নেয়াস্ত্রটি সঙ্গে করে এনেছিলাম। ব্যাপারটা কী জানো, মেশিনটা হাতে পেলে আমিই চালাতে পারতাম ওটাকে, কিন্তু রাজেশ তার বায়োলজিস্ট বৌকে দিয়ে এমন ব্যবস্থা করে রেখেছিল যাতে ওর নিজের ডিএনএ ছাড়া মেশিনটা অন-ই হবে না। আমার হাতে বন্দুক দেখে ও এমন একটা কাজ করে বসল, যেটা আমি আশাই করতে পারিনি। অবশ্য এটা ছাড়া ওর আর কিছু করবারও ছিল না, কারণ কাজ মিটে গেলেই ওকে গুলি করতাম আমি। সাক্ষী রাখতে আমি ভালোবাসি না।

“টি-মেশিনে কাজ করার সময় ও বরাবর ফুল প্রোটেকশন সুট পরে কাজ করত। ও মেশিনে লাফ দিয়ে ঢুকে সোজা টাইম ট্রাভেল করে পালাল ভবিষ্যতে, বা ভবিষ্যতের ফ্রিকোয়েন্সিতে।“

আমি চিৎকার করে বললাম, “আপনি বাবাকে মারতে চেয়েছিলেন?”

“সে কৃতিত্ব আমারই বটে। ভেবে দেখো, নয়তো কেন তোমার মা-কেও কিচ্ছুটি না জানিয়ে হঠাৎ একদিন সে এমন করে উধাও হল?” একটু হাসলেন ডক্টর পাইন। “নিজের প্রাণ বাঁচাতেই কান্ডটা করে বসল রাজেশ। আর তার ফলে আমি ঐ নেতার সঙ্গে একটা ফালতু ঝামেলায় জড়িয়ে গেলাম।“

মীরা বলল, “আপনাকে তাহলে সব টাকা ফেরত দিতে হল?”

তিনি হেসে উঠলেন। “টাকা ফেরত? না না, টাকা ফেরত দেওয়ার রাস্তা তো ছিল না। আমি নেতাকে বললাম, তাঁর ছেলেকে আমি ভবিষ্যতে পাঠিয়ে দেব; তার সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না বটে, কিন্তু ওখানে সে পুলিশের হাত থেকে সেফ থাকবে। তারপর আর কী? ছেলেটাকে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে মাথায় গুলি করে পায়ে ওজন বেঁধে জলে ফেলে দিলাম। সেই নেতা এখনও এই ভেবে দিব্যি খুশি আছে যে তার ছেলে অন্য এক টাইমলাইনে বেশ করেকম্মে খাচ্ছে।“

আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “আপনি একটা রাক্ষস!”

“আমি তার থেকেও খারাপ, টিনা। জীবনে অনেক ত্যাগস্বীকার করেছি আমি, আর জীবনে যে ত্যাগগুলো আমরা করি, তাই দিয়েই ঠিক হয় আমরা মানুষ হিসাবে কেমন। তাই না?”

মীরা ঘৃণাভরে বলল, “ঐ শব্দগুলো মুখে আনার যোগ্যই আপনি নন।“

দুঃখমেশা একটা হাসি হাসলেন ডক্টর পাইন। “আমার জীবনে আমি কী কী ত্যাগ করেছি, তোমরা বাচ্চারা কীই বা জানবে? যখন আমি জানলাম, আমার বোকা মেয়েটা আমি যাকে সবচেয়ে ঘৃণা করি, সবচেয়ে ঈর্ষা করি, সেই মানুষটার প্রেমে পড়েছে, তখন আমি কতটা কষ্ট পেয়েছিলাম, তোমরা তার কী বুঝবে? রাজেশ টাইম মেশিনে করে পালানোর পর তুলসী একদিন এসে আমাকে বলল, রাজেশের বৌ তার মেয়ের ক্লোন বানাবে, তার জন্য সে সারোগেট মাদার হতে চায়। আমি নিষেধ করেছিলাম, ও শোনেনি। তখন থেকেই আমি জানতাম, একদিন ওকে চিরকালের মতো চুপ করিয়ে দিতে হবে। ও জানত আমিই মেরেছি দেবীকে, কিন্তু আমাকে ও এত ভালোবাসত যে কাউকে সে-কথা বলতে পারেনি। কিন্তু সে-রাতে ও আমাকে ফোনে বলল, ও তোমাদের সব কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি বুঝলাম, এবার ওকে বিদায় দেওয়ার সময় এসে গেছে। আমি যে বিষটা এনেছিলাম, ওকে খাওয়াতে খুব বেশি জোর করতে হয়নি আমাকে। ডাক্তারি পরীক্ষায় ওটার অস্তিত্ব চট করে ধরা পড়ে না; প্রাথমিক ভাবে হার্ট অ্যাটাকের মতোই ওর সব লক্ষণ। খুব বেশি কষ্ট পেয়ে ওকে মরতে হয়নি, এইটুকু আমি তোমাদের বলতে পারি।“

মীরা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল তাঁর উপর, কিন্তু তিনি একটু পিছিয়ে গিয়ে অস্ত্রটা উঁচিয়ে ধরলেন। “ভুলেও এসব বদবুদ্ধি করতে যেও না, মীরা। এবার তোমাকেও তোমার মায়ের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে দেখছি।“

আমি দেখতে পেলাম, মীরার বুকের দিকে লক্ষ্যস্থির করে ফেলেছেন ডক্টর পাইন, তাঁর আঙুল ছুঁয়েছে ট্রিগার। তিনি ধরেই নিয়েছেন, আমাদের দু’জনের মধ্যে মীরা একটু বেশি বিপজ্জনক, তাই ওকে আগে মারতে চাইছেন।

এবার তাঁর অবাক হওয়ার পালা!

এইভাবে হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে আমি যে তাঁর বন্দুকধরা হাতটায় সজোরে একটা লাথি মারতে পারি, তিনি ভাবতেও পারেননি। অস্ত্রটা তাঁর হাত থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল টাইম মেশিনের মধ্যে; যন্ত্রের ধাতব মেঝেতে ‘ঠং’ করে আওয়াজ হল। তিনি ছুটলেন ওটাকে কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য, আমি তাঁর পিছু নিলাম। বন্দুকটা আমার আগেই দখল করলেন তিনি, তারপর একগাল হাসি নিয়ে আমার দিকে ফিরলেন আমাকে গুলি করার জন্য।

কিন্তু সে-কাজ আর করা হল না তাঁর, কারণ তিনি দেখতে পেয়ে গেছেন, আমার হাত ততক্ষণে মেশিনের ডিএনএ-কোডেড অ্যাক্টিভেশন প্যানেলে।

“না!” চিৎকার করে উঠলেন তিনি।

ন্যানো-সূচগুলো ইতিমধ্যেই আমার হাতের তালু থেকে ডিএনএ স্যাম্পল নিয়ে ফেলেছে। অটোমেটেড সিস্টেমটা নিজে থেকেই মেশিনের দরজা বন্ধ করে দিল। টাইম মেশিন চালু হয়ে গেছে অনিবার্যভাবে, আর নিজের মধ্যে বন্দী করে ফেলেছে আমাদের দু’জনকে।

মেশিনের বাইরে মীরার চোখ দেখে বুঝতে পারছি, সে এখনও ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছে না। মাইক্রোফোনের মাউথপিসটা ধরে চেঁচিয়ে উঠল সে। “টিনা! গাধা! করছিস কী তুই?”

ওর দিকে এক চোখ টিপে আমি ফিরলাম ডক্টর পাইনের দিকে। তিনি তখন ভয়ে পাগলের মতো চিৎকার করছেন, “টিনা, দরজা খোলো বলে দিচ্ছি। নয়তো তোমাদের দু’জনকেই গুলি করে মারব, ভগবানের দিব্যি!”

আমি একটু হাসলাম। “অত সোজা, ডক্টর পাইন? আমাকে আপনি মারতে পারেন বটে, কিন্তু মীরাকে পারবেন না। টাইম মেশিন আগাগোড়া বুলেটপ্রুফ গ্লাসে ঢাকা, দেখতে পাচ্ছেন তো? আর আমি মেশিনটা চালু করেও দিয়েছি। ঘরঘর শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না? চলন্ত মেশিনের মধ্যে আপনি কিন্তু প্রোটেকটিভ সুট পরে নেই, ডক্টর পাইন।“

আমার কথার মর্মোদ্ধার করতে পুরো আড়াই সেকেন্ড সময় লাগল তাঁর। তারপর তিনি গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “না! না! না!”

মেশিনটা প্রচন্ডভাবে থরথরিয়ে কাঁপতে শুরু করল। তাঁর হাত থেকে বন্দুকটা পড়ে গেল। আর এ যন্ত্রকে থামানোর কোনো উপায় নেই!

মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে গেলেন ডক্টর পাইন।

আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। এরই মধ্যে তাঁর চিৎকার বন্ধ হয়ে গেছে; তার বদলে তাঁর গলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে একটা অদ্ভুত গার্গল করার মতো ঘড়ঘড় শব্দ। ধাতব মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় যন্ত্রের কম্পনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরটাও এমনভাবে কাঁপছে যে আমার চোখে সেটা যেন অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিমাণ কম্পন সুরক্ষাসুট ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়। শীঘ্রই তাঁর শরীরে প্রধান অর্গ্যানগুলোর ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যাবে। তারপর পরপর আসবে কয়েক মিনিটের মধ্যে মাল্টিপল অর্গান ফেলিওর, কোমা এবং মৃত্যু।

মানুষটা চোখের সামনে মারা যাচ্ছে, কিন্তু তার জন্য একফোঁটা কষ্টও আমার হচ্ছে না।

আমার গায়ে চাপানো আছে শক-অ্যাবজর্বিং সুট, পায়ে বিশেষভাবে মোটা রাবারের সোল দেওয়া জুতো, যাতে মেঝে থেকে আসা কম্পন থেকে পা-দুটো রক্ষা পায়। মুখে অক্সিজেনের নল-লাগানো হেলমেটটাও পরে নিয়েছিলাম আগেই। বাবার মতোই আমিও যখনই মেশিনের মধ্যে কাজ করি, পুরো প্রোটেকটিভ গিয়ার-সমেতই করি। সাবধানের মার নেই।

আরও বিকটভাবে কাঁপছে যন্ত্রটা। বুঝতে পারছি, ডক্টর পাইন আর বেঁচে নেই। তাঁর প্রাণহীন দেহটা শুধু এখনও কেঁপে চলেছে যন্ত্রের কম্পনের সঙ্গে সঙ্গে।

আমারও বিদায় নেওয়ার সময় হয়ে এসেছে।

মেশিনের কাচের আবরণের বাইরে দাঁড়ানো উৎকন্ঠিত মুখটার দিকে মনস্থির করে তাকালাম আমি – ঐ মুখটাকে এত ভালোবাসি আমি!

মীরা কাঁদছে নিঃশব্দে। ও বোকা নয়; ও বুঝতে পেরে গেছে, বাবাকে ফিরিয়ে আনতে নিজেই যাওয়ার প্ল্যান আমি আগে থেকেই করে রেখেছিলাম। ওকে আজ ধীরেসুস্থে বলতাম, ডক্টর পাইন শুধু সেই সুযোগটুকু আমাকে দিলেন না।

আমিও জানতাম, ও রাজি হবে না, তাই আগে এসব কথা ওকে জানতে দিইনি কখনও।

আমার চোখদুটো ওর মুখের দিকে দেখছে। জানি, এখুনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলব, আর তারপর এমন একটা জগতে গিয়ে পৌঁছব যার প্রায় কিছুই আমি জানি না। তবু ঐ মুখটা দেখতে দেখতেই আমি সেই অন্ধকারে তলিয়ে যেতে চাই।

জীবনে যে ত্যাগগুলো আমরা করি, তাই দিয়েই ঠিক হয় আমরা মানুষ হিসাবে কেমন।

মাইক্রোফোনে ওর গলা ভেসে এল। “কেন আমাকে ছেড়ে যাচ্ছিস তুই?”

এই প্রচন্ড কম্পনের ঘরঘর শব্দের মধ্যে ওর কথা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, “কারণ তোকে খুব ভালোবাসি রে আমি!”

ও একটা ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল। সেটাকে শূন্য থেকে ধরে আমি বসিয়ে নিলাম আমার বুলেটপ্রুফ গ্লাসের হেলমেটের সামনে। ঠোঁট অবধি নাই বা পৌঁছল, তাতে কী?

বুলেট আটকাতে পারে ঠিকই, কিন্তু চুমু আটকাতে পারে, এমন গ্লাস আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি, কথাটা মনে হতেই হাসি পেয়ে গেল এই অবস্থাতেও।

ওর চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল। বিদায়ের হাসি।

আমার চোখের সামনে জগৎটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান হারানোর আগে শুনতে পেলাম, ও মাইক্রোফোনে চিৎকার করে বলছে, “টিনি, তোর বাবা ফিরে এলে তাকে দিয়ে একটা টু-সিটার মেশিন তৈরি করাব আমি যত তাড়াতাড়ি পারি। রেডি থাক, আমি যাচ্ছি তোকে আনতে।“

অদ্ভুত একটা তৃপ্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করলাম আমি। মাথাটা হালকা লাগছে, কানে টাইম মেশিনের প্রবল ঘরঘর শব্দও যেন মিলিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে যেন অতল ঘুমের সাগরে তলিয়ে যাচ্ছি আমি; আমার চারপাশে সমুদ্রের জল ফিসফিসিয়ে কথা বলছে।

কতক্ষণ এই অর্ধচেতন অবস্থায় ছিলাম জানি না। তারপর মনে হল, কে যেন আমার কপালে হাত রাখল।

এ আমার কল্পনা নয় তো?

চোখ না খুলেই বুঝতে পারছি, আমার মাথা থেকে হেলমেট খুলে নেওয়া হয়েছে। মেশিনের ঘরঘর শব্দ আর শুনতে পাচ্ছি না। চারপাশে কী অসীম নিস্তব্ধতা।

এ কি সত্যি, না স্বপ্ন? সত্যিই কি আমি…?

একটা কোমল পুরুষকন্ঠ বলল, “টিনা, চোখ খোল, মা।“

আমি চোখ খুললাম।

Tags: বড় গল্প, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!