কোলাহলের সন্তান

  • লেখক: তৃণময় দাস
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

পিঠে কী একটা হয়েছে। মেরুদণ্ড বরাবর। সুতি হাত দিয়ে ছুঁয়ে বোঝার চেষ্টা করল। ওই অংশের চামড়াটা যেন পুরু হয়ে গিয়েছে। এবড়োখেবড়ো। আঙুল ঘষতেই খরখর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল ওর। তারপর কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইল। বাইরে পাখি ডাকছে। নীল শালিকদের কিচির মিচির। জোড়া মৌটুসির গান। একটা গাঢ়কাকের কর্কশ ডাক। বেলা শেষ হয়ে আসছে।

সুতির সংবিৎ ফিরতেই মনে পড়ল রাংতার কথা। কোথায় গেল ছোট্ট মেয়েটা?

“রাংতা? রাংতা-আ-আ। মামণি, কোথায় গেলি?”

সুতির বয়স হয়েছে। আগের মতো চটপটে আর নেই৷ সারাক্ষণ ঘুম পায়। আজ দুপুরে খেয়েদেয়ে একটু চোখ বুজেছিল, আর ঘুম ভাঙল এই এখন।

রাংতার সাড়াশব্দ নেই। কোথায় গেল রে? আবার টোঁ টোঁ করে ঘুরতে বেরলো নাকি? কতবার বলেছে, “এইভাবে এদিক ওদিক যাবি না, রাংতা। শেয়াল আছে, নেকড়ে আছে। বুনো কুকুরের দল আছে। একটু অসাবধান হলেই তোর টুঁটি চেপে ওদের বাসায় টেনে নিয়ে যাবে।” একবার শিকারে বেরিয়ে সুতি একটা সাদা বাঘ দেখেছিল। শ্যামবাজার মোড়ে নেতাজীর অশ্বারূঢ়র মূর্তিটার নীচে বসে বাঘটা রোদের আমেজ নিচ্ছিল। পাছে ভয় পায়, তাই বাঘটার কথা রাংতাকে বলেনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বললেই ভালো হত। ভয়ে ভয়ে থাকলে লোকে বেশি সাবধানী হয়।

সুতি বিছানা থেকে নামল। ঘরের কোণে রাখা কলসি থেকে একটা ঘটিতে জল ঢেলে চোঁ চোঁ করে খেল। আহ! কী আরাম! আজকাল লিটার লিটার জল খেয়েও তেষ্টা মেটে না।

সুতি এইবার ধীরপায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বেলাশেষের রোদটা গায়ে পড়তেই মনে হল ওর হাড়ে আবার জোর ফিরে আসছে। মেরুদণ্ড সোজা আর পেশিগুলো টানটান হয়ে যাচ্ছে। স্নায়ু চনমনে হয়ে উঠছে। একটু পরেই মানিকতলায় অন্ধকার নেমে আসবে।

অনেক বাড়িঘরের জানালা থেকে ডালপালা উঁকি মারছে। কয়েক জায়গায় শ্যাওলা ঢাকা দেওয়াল ফেটে গাছের অংশ বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু বেশির ভাগ পাদপ রাস্তার উপরেই গজিয়ে রয়েছে। এককালের সেই পিচের রাস্তাগুলোর এক ইঞ্চিও দেখা যায় না। খালি গাছ আর গাছ। আম, বেল, অশ্বত্থ, নিম, ডুমুর। ওদের সম্মিলিত পাতা-শামিয়ানার থেকে ফুঁড়ে উপরে উঠে গেছে একটা কি দুটো তালগাছ। এই দোতলার বারান্দা থেকে দেখা যায় না, কিন্তু মানিকতলার ঘড়ির টাওয়ারের জায়গায় এখন একটা বিশাল বটগাছ গ্যাঁট মেরে বসে আছে, অসংখ্য ঝুরি নেমে এসেছে বিনুনির মতো।

এছাড়াও কয়েকটা অদ্ভুতুড়ে গাছ গজাচ্ছে কলকাতা জুড়ে। এই তো সেইদিন গিরিশ পার্কের দিকে কয়েকটা দেখল। গম্বুজের মত কাণ্ড। মসৃণ নীলাভ গা। সূর্যের আলো পিছলে যাচ্ছে। একটাও ডালপালা নেই। কিন্তু গাছের চারদিক পাতায় পাতায় ভরে রয়েছে। ব্যাপারটা রাংতাই প্রথমে খেয়াল করেছিল। আঙুল তুলে বলেছিল, “দেখো সুতিমা, পাতাগুলো কেমন ভাসছে।”

শাখা-প্রশাখা ছাড়াই পাতাগুলো কাণ্ডকে কেন্দ্র করে শূন্যে ভেসে রয়েছে। সুতি একটা ঢিল ছুড়তে পাতাগুলো একটু নড়ে গিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে এল।

রাংতা গাছগুলোর নাম দিল, “ডিড্ডিম।”

এই এক স্বভাব ওর৷ অজানা গাছ দেখলেই অদ্ভুত সব নাম বলবে। লবণ হ্রদের আশপাশে সোনালি গাছগুলোর নাম তাই, “বহুন্ধর”। বেলগাছিয়ার মিশকালো বাঁশঝাড়কে বলে “ছমছং”। রাতে জোনাকির মতো দপদপ করতে থাকা লতানে গাছগুলো, “লুম্পা।”

সুতি হেসে জিজ্ঞেস করে, “এইসব নাম কোত্থেকে পাস রে?”

রাংতা ওর নীল চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, “পাব কোদ্দিয়ে? ওই গাছগুলোই তো আমাকে ওদের নাম বলে। তুমি শুনতে পাও না?”

না, সুতি শুনতে পায় না। বরং এই বাড়তে থাকা জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকলে ওর গায়ে কাঁটা দেয়, ঘোর লাগে। প্রকৃতি মা এই মহানগরকে অতিদ্রুত গ্রাস করে নিচ্ছে। আর কয়েক বছর পর কলকাতাকে আর চেনা যাবে না, সব সবুজ অমানিশায় ঢেকে যাবে।

এখন সন্ধ্যা নামল। ঝপ করে। দোতলার এই বারান্দার সামনেটুকু ফাঁকা, গাছ এখনো গজায়নি। তাই এখানে বসে থাকলে গায়ে ঝিরিঝিরি বাতাস লাগে। সুতি কিন্তু আজ অন্যদিনের মত আয়েস করে বসতে পারল না। রাংতা কোথায়? রাত হয়ে এল যে!

ইতিমধ্যেই “উউইট উউইট” আওয়াজ করতে করতে রাঙাবাদুড়ের দল আকাশ ছেয়ে ফেলেছে। শিকারে বেরিয়েছে। আস্ত আস্ত পাখি ধরে রক্ত চুষে খাবে। বাচ্চাদেরও তুলে নিতে পারে।

“ওরে রাংতা,” সুতি ঘরে ঢোকে। “কই গেলি তুই? অন্ধকার হয়ে এল।”

সত্যিই ভেতরে অন্ধকার। ছায়াগুলো সরীসৃপের মতো ঘরের এ-কোণা সে-কোণা থেকে বেরিয়ে আসছে। বাড়ির এই তলায় একটা লন্ঠন রয়েছে। কিন্তু মনে পড়ছে না ঠিক কোথায়। তাই অন্ধকারের মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে একতলায় নামতে হল। এইটুকু নামতেই কেমন ক্লান্ত লাগছে, মাথা ঘুরছে। তবু সুতি দিশেহারা হয়ে এইঘর সেইঘর ঘুরতে থাকল।

“কই রে?”

এবার উৎকন্ঠার সঙ্গে ভয় এসে যোগ দিল। ছায়ার মধ্য থেকে কাদের যেন চোখ জ্বলছে। কীসের একটা ফিসফাস আওয়াজ…

“এই, এই, কে রে?” সুতির গলা কেঁপে উঠল। “কে ওখানে? খবরদার কাছে আসবি না। কোপ মেরে মাথা কেটে দেব।”

কিন্তু কোপ মারার দা-খানা কই? আর ওর প্রিয় ধনুকটায় বা কই? সেই ঠাকুরঝি নিজের হাতে বাঁশের শলা দিয়ে বানিয়েছিলেন। সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে কেন?

সুতির কান্না পাচ্ছিল। সে বিহ্বল গলায় আর্তনাদ করল, “রাংতা, রাংতা!”

আচ্ছা একবার সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখবে? হয়তো আশপাশেই আছে মেয়েটা। চোখের মণিটা…

যেন ওর মনের কথা শুনতে পেয়েই দরজাটা ক্যাঁচ করে খুলে গেল। দোরগোড়ায় মশাল হাতে কে একজন দাঁড়িয়ে। পিঠে সেই ঠাকুরজির ধনুক, একটা তূণীর। হাতে মড়া একটা জাম-খরগোশ। সেটা থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে মেঝেতে। এহেহেহে, মেঝেটা আবার মুছতে হবে…

মেয়েটার বয়স তেরো-চোদ্দো হবে। মাথার চুলে কতদিন যে জল লাগেনি সেটা বোঝা দায়। নাকের উপর একটা ছোট্ট কাটা দাগ।

“সুতিমা, তুমি নীচে কী করছ?” আগন্তুকের জিজ্ঞাসা।

সুতি ভ্রু কুঁচকে মেয়েটাকে জরিপ করছিল। সে বলল, “কে মা তুই? কী চায়?”

আগন্তুক অদ্ভুতভাবে সুতির দিকে তাকিয়ে বলল, “অন্ধকারে এইভাবে ঘুরবে না, সুতিমা। পা হড়কে গিয়ে কোমর ভাঙলে কী হবে?”

সুতি একটু বিরক্ত হল। কোথাকার কে এসে ফটফট করে জ্ঞান দিচ্ছে। তবু তর্ক করল না৷ মিথ্যে বলেনি। বয়স হয়েছে তো ওর। একবার কিছু ভাঙলে সাক্ষাৎ মৃত্যু। আগেকার দিনের মতো পুরোহিতরা আর নেই যে এসে চিকিৎসা করে যাবে।

মেয়েটা মশাল হাতে ভেতরে ঢুকল। তারপর ভেতর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই যখন ফেরত এল, তখন তার হাতে একটা ময়লা কাচের লন্ঠন। তার মধ্যে একটা বেগুনী শিখা তিরতির করে কাঁপছে। সুতির হাত আলতো করে ধরে বলল, “চলো, উপর তলায় চলো।”

অতি সাবধানে দুইজনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল, তখন সুতি বলল, “মা তোর চোখের মণিদুটো পুরো নীল।”

মেয়েটা কিছু বলল না। কিন্তু কোন অজানা একটা কারণে ওর চোখদুটো ছলছল করে উঠল।

“এ মা! তুই কাঁদিস কেন?” সুতি অবাক। “তোকে দেখতে কী সুন্দর রে! আমার রাংতার মতো। তাই বললাম তোর চোখের কথা৷ কাঁদিস না, বাছা, কাঁদিস না।”

রাংতার কথা আসতে মনে পড়ল, রাংতাকে তো সে খুঁজেই পায়নি। একদম ভুল মেরে দিয়েছে মেয়েটার কথা৷ সুতি মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে আগন্তুককে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা তুই কোনো মেয়েকে দেখতে পেয়েছিস? এই এট্টুখানি মেয়ে। রাংতা নাম৷ বনে দেখতে পেয়েছিস?”

মেয়েটা চোখের জল মুছে ধরা গলায় বলল, “তুমি চিন্তা করো না, সুতিমা৷ রাংতা ঘরের মধ্যেই আছে।”

“বলছিস! এত্ত করে ডাকলাম বিকাল থেকে, তাও সাড়াশব্দ দিল না। বড্ড শয়তানি করছে আজকাল।”

“বোধহয় তোমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল।”

ফোকলা হাসি হাসল সুতি। “ওহ হ্যাঁ! তাই তো। একদম মনে ছিল না।”

নিজের শোওয়ার ঘরে ঢুকে বিছানায় চুপচাপ বসল সুতি। একটু ইতস্তত করে বলল, “মা, একটু জল দিতে পারবি। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে।”

মেয়েটা জল ঢেলে ঘটিটা নিয়ে এল। লন্ঠনের আলোয় ঘরের ছায়াগুলো কাঁপছে। জানালার বাইরে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। সুতি মুগ্ধ হয়ে দেখল মেয়েটাকে ঠিক রাংতার মতো দেখতে, শুধু বয়সে সাত-আট বছরের বড়ো।

জল খেয়ে তালুর পেছনদিক দিয়ে মুখ মুছে সুতি বিছানায় শুয়ে পড়ল। রাংতা বলল, “আমি রান্না করে আসছি। তুমি বিছানা ছেড়ে নেমো না।”

সুতি জড়ানো গলায় প্রশ্ন করল, “তুই কবে এত বড়ো হয়ে গেলি রাংতা?”

তারপর কিছু মনে নেই।

***

সেইদিন বৃষ্টি পড়ছিল৷ আকাশ ভাঙা বৃষ্টি। সুতি, নন্দ আর মাদুর তিনজনেই ভিজে ভূত। গায়ে জামাকাপড় লেপটে গিয়েছে। কিন্তু খালি হাতে ফেরা সম্ভব না। কিছু শিকার করে ফিরতেই হবে। ঠাকুরঝির আদেশ।

তারা তখন বারাসাতে ছিল। একটা বিশাল বিল্ডিংয়ে ঘাঁটি গেড়েছিল। ভেতরে একগাদা লোহার দানো চিরঘুম দিয়েছে। ঠাকুরঝি তাও কী একটা মন্ত্র বলতে বলতে বিল্ডিংটার চারদিক প্রদক্ষিণ করলেন, যাতে দানোগুলো অকস্মাৎ জেগে উঠে ওদের মেরে ফেলতে না পারে।

ঠাকুরঝি বলেছিলেন, এই বিশাল দালানটার নাম “কারশেড”। যখন তিনি ছোট্ট ছিলেন তখন নাকি ওই দানোগুলো হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসত আর মানুষদের ধরে ধরে গিলত। এখন ওদের পূজারীরা কেউ বেঁচে নেই, তাই ঘুম দিয়েছে।

বারাসাতে এই কারশেড ছাড়া আর কিছু বাকি নেই৷ অন্য সকল বাড়ি, ঘর, বাজার, চত্বর, সব যেন মাটিতে মিশে গেছে৷ চারিদিকে মাইলের পর মাইল বাঁশবন। তাদের ডগাগুলো খোলা আকাশের নীচে দুলতে থাকে, যেন উপরে কাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সর্বক্ষণ সরসর মড়মড় আওয়াজ। যেদিন জোরে হাওয়া দেয়, সেদিন এই কলতান আরো বেড়ে যায়। বনের মাঝে মাঝে পচা ডোবা৷ বুদবুদ ওঠে। দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়।

এইরকমই একটা ডোবার তীরে তিনপেয়ে নেকড়ের মুখোমুখি হয়েছিল সুতি, নন্দ আর মাদুর। সুতির হাতে তির লাগানো ধনুক, বাকি দুইজনের হাতে উদ্যত বর্শা।

ডোবার ঠিক উলটোদিকে নেকড়েটা দাঁড়িয়ে। একটা বড়োসড়ো টিলার সামনে। মুখভঙ্গি জিঘাংসক। রূপোর মতো দাঁত খিচিয়ে রয়েছে, সেখান থেকে লালা পড়ছে টপটপ করে। ওদের চারদিক বৃষ্টির আওয়াজে মুখরিত। ডোবার উপর মার্বেলের মতো এত্ত বড়ো বড়ো বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। বাঁশগুলো ভিজে ভিজে নুয়ে পড়েছে, ঠিক যেন কুঁজো হয়ে যাওয়া ঠাকুরঝি। ডোবার পচা গন্ধের সঙ্গে সোঁদা মাটির গন্ধ মিলেমিশে গিয়েছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

মাটি পিচ্ছিল। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিল। সুতি দুই-তিন পা পিছিয়ে ফিসফিস করে তার সঙ্গীদের বলল, “আস্তে আস্তে পিছিয়ে আয়।”

“কেন?” হিসহিসিয়ে আপত্তি জানাল নন্দ। “জ্যান্ত একটা প্রাণী। শিকার করে ফেরত নিয়ে যাব। সেই কখন থেকে খুঁজছি।”

সুতি বিরক্ত হয়ে বলল, “এই নেকড়েগুলোর মাংস একেবারে কষাটে৷ মুখে দেওয়া যায় না। কী হবে প্রাণীটাকে মেরে?”

“মাংস কষাটে তুই জানলি কী করে?” নন্দর প্রতিপ্রশ্ন।

“তোর অনেক আগে থেকে আমি ঠাকুরঝির সঙ্গে ঘুরছি, নন্দ। সবসময় মুখে মুখে তর্ক করবি না।”

নন্দর মুখ কালো হয়ে গেল। এই একটা ব্যাপারে সে যথেষ্ট সচেতন। হিংসেও করে সুতিকে। তাই আজকাল ঠাকুরঝির ন্যাওটা হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ঠাকুরঝির জন্যে জল এনে দেওয়া, ঘুমের আগে পা টিপে দেওয়া, ঠাকুরঝির সব কথায় সায় দেওয়া। তাও এখন পর্যন্ত ঠাকুরঝি ওর জন্য একটাও অস্ত্র বানিয়ে দেননি। সুতির হাতের ধনুক এখনো তার জেষ্ঠ্যতার পরিচয়।

নন্দ সুতির আদেশ মানতে যাচ্ছিল, তখন মাদুর জিজ্ঞাসা করল, “আমরা পিছিয়ে গেলে আক্রমণ করবে না, সেটা কী করে বুঝব? পিঠ ফেরালেই যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে?”

তিনজনেই থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। নেকড়েটার গলা থেকে এইবার গড়গড় করে আওয়াজ আসছে। বৃষ্টির তেজও বেড়ে গেছে। ভেজা কাপড়ে বৃষ্টির কামড় অসহ্য হয়ে উঠছে।

সত্যিই তো। জন্তুটার ভাবসাব ভালো ঠেকছে না। এখনো সেই টিলার সামনে থেকে নড়েনি। তবুও…

নন্দর মুখে কেমন একটা হাসি৷ তিনপেয়ে নেকড়েটার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে রয়েছে। হাতের বর্শাটা জন্তুটার দিকে তাগ করা।

নেকড়েটা যেন বুঝতে পারল। এই দু-পেয়েগুলো আর পিছু ফিরে চলে যাবে না। ওর উপর হামলে পড়বে। প্রকৃতির সব থেকে পুরোনো খেলার মঞ্চ হবে এই ডোবার তীর। শিকার আর শিকারীদের খেলা। কিন্তু এখানে শিকার কে? শিকারীই বা কে?

নন্দ এক পা এক পা করে ডোবার পাড় বেয়ে টিলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নেকড়েটার ছটফটানি বহুগুণ বেড়ে গেছে। মাদুর সুতির একটু পেছনে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে। হাতদুটো কাঁপছে, তার সঙ্গে বর্শার ফলাটা নড়ছে।

শুধু সুতি সম্পূর্ণ নিশ্চল, যেন সে একটা প্রস্তুরমূর্তি। ধনুকে টান দেওয়া, তিরের ছুঁচালো মুখটা ভোতা আলোতেও চিকচিক করছে।

নেকড়েটা হঠাৎ গুঙিয়ে উঠল। সুতির চোখের সামনে জানোয়ারটার রক্তাভ দেহটা যেন ফুলেফেঁপে উঠল। এতক্ষণ দাঁত খিঁচিয়েই ছিল, এখন যেন নিজের চোয়ালটা আরো প্রসারিত করল। কট-কট-কট আওয়াজ আসছে। নেকড়ের মাড়ি ফুঁড়ে আরেক জোরা দাঁত গজিয়ে ওঠার আওয়াজ। আগের থেকে আরো বড়ো, আরো ধারালো। এই দাঁতগুলো এবড়োখেবড়ো, বিভৎস, প্রকৃতিবিরুদ্ধ। কয়েক জায়গায় মাড়ি থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। যেখানে যেখানে সেই রক্ত বৃষ্টিভেজা মাটিতে পড়ছে, সেখানে সেখানে গজিয়ে উঠছে ছোটো ছোটো গুল্মলতা, ঘাসফুল, ছত্রাক। সেই রক্ত আর লালা ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে সুতির বুক কেঁপে উঠল।

এ কীরকম দুঃস্বপ্নের রূপ! কোনো নেকড়ের এইরকম পরিবর্তন, তাও এত দ্রুত, ওরা আগে কখনো দেখেনি৷ তাহলে তো পিছিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ! একবার শুধু বাকিদের…

নন্দ একটা হুংকার দিয়ে নেকড়ের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নেকড়েটা যেন সেটারই অপেক্ষা করছিল। সে একটা ইলমাছের মতো পাশ কাটিয়ে নন্দর বাম পায়ে কামড় বসাতে গেল। কিন্তু নন্দও কম যায় না। সেও এক লাফে নিজের ডান দিকে সরে গিয়েই, উত্থিত বর্শাটা দিয়ে নেকড়ের দিকে খোঁচা দিতে চাইল।

কিন্তু কী অদ্ভুত! নেকড়েটা আবার পাশ কাটিয়ে গেল৷ ওর শরীরটা যেন ফানুসের মতো, পা তিনটে বারবার মাটিতে অল্প ঠেকেই ভেসে যাচ্ছে। তার উপর শরীরটাও কেমন নমনীয়। মেরুদণ্ডটা যেন থেকেও নেই।

সুতির পাশ থেকে মাদুর হঠাৎ রণহুংকার দিল। এই বিস্তৃত অরণ্যে সেই অপরিণত চিৎকার কেমন হাস্যকর মনে হল। মাদুর ততক্ষণে সুতিকে ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে তিন পেয়ে নেকড়েটার দিকে বর্শাটা ছুড়ে দিয়েছে।

নেকড়েটাকে এইবার পাশ কাটাতেও হল না। মাদুরের বর্শা অনেকটা পাশে ডোবার জলে গিয়ে পড়ল। পচা জল “ডুউউপ” আওয়াজ করে সেই অস্ত্রটা গিলে ফেলল।

এইদিকে নেকড়ে আর নন্দের মাঝে যুদ্ধ হয়েই যাচ্ছে। নন্দ একবার খোঁচা মারতে পেরেছে, কিন্তু তা নেকড়ের পুরু চামড়া ভেদ করতে পারেনি। বরং নেকড়েটা হঠাৎ সামনের থাবা একটা অর্ধবৃত্তের ব্যাস বরাবর হুউউস করে ঘোরাতেই, ছুঁচের মতো কয়েকটা নখ নন্দর পেটে লালচে দাগ কেটে ফেলেছে। ভাগ্য ভালো ক্ষতটা গভীর নয়। তবু যন্ত্রণায় নন্দর মুখ বিকৃত।

সুতি এখনো দাঁড়িয়ে। মাঝেমধ্যে নিজের টিপটা ঠিক করে নিচ্ছিল, কিন্তু এখনো তির ছোড়ার কোন সুযোগ পায়নি। নেকড়ে আর নন্দ খুবই কাছাকাছি রয়েছে। এক ইঞ্চি এদিক ওদিক হলে বড়ো একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সুতি আবার নন্দকে ডাক দিতেও পারছে না। নন্দ এক মুহূর্তের জন্যেও অন্যমনস্ক হলে নেকড়েটা ওর টুঁটি চেপে ভবলীলা সাঙ্গ করবে।

হাতে সময় কিন্তু বেশি নেই। নন্দ ইতিমধ্যেই বেশ ক্লান্ত। আগের মতো দ্রুত বর্শা চালাতে পারছে না। বিলম্বিত হচ্ছে পায়ের ধাপ। পেটের তিনটে আঁচড়ের দাগ কাঁদছে।

সুতি নিজের মনকে শান্ত করার প্রচেষ্টা চালাল। যে করেই হোক, নেকড়ে আর নন্দের মধ্যবর্তী দূরত্ব বাড়াতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

সে টিলার দিকে একবার চোখ ফেরাল। নেকড়েটা কিন্তু প্রথম থেকেই সেই টিলাটার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত খিচিয়ে ছিল। এখনো, যখনই নন্দ নিজের অজান্তে টিলাটার কাছে চলে যাচ্ছে, তিনপেয়ে তখনই আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে, এলোপাথাড়ি আক্রমণ চালিয়ে নন্দকে অন্যদিকে সরিয়ে দিচ্ছে।

সুতির মাথায় একটা পরিকল্পনা ফুটে উঠতে শুরু করল। ওর পাশে মাদুর এখনো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাঁদোকাঁদো মুখ।

“কী কল্লাম গো! কী বোকামো কল্লাম…”

বিড়বিড়িয়ে নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে চলেছে মাদুর।

নন্দ আর নেকড়ের থেকে চোখ না ফিরিয়েই সুতি হিসহিসিয়ে বলল, “অ্যাই মাদুর, শোন!”

মাদুর শুনতেও পেল না। মাথা চাপড়াচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছে ও মরে গেলেই ভালো।

সুতির ভয়ানক রাগ হল। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ওরা তিনজনে দাঁড়িয়ে। এখন ন্যাকা কান্নার সময় নয়।

সুতি মাদুরের পায়ে কষে লাথি মারল। ছেলেটা চেঁচিয়ে কর্দমাক্ত মাটিতে আছড়ে পড়ল।

“ওঠ বলছি, ওঠ তুই, হারামজাদা!” সুতি ঠান্ডা গলায় আদেশ দিল। “এখন যা বলব, তা চুপচাপ করবি। তারপর প্রাণে বাঁচলে যত্ত খুশি কান্নাকাটি করিস।”

মাদুর কুকুরের মতো কুঁইকুঁই করে উঠে দাঁড়াল।

“ওই টিলাটা দেখছিস তো? আমি যখন বলব, তখন তুই ওই টিলাটার দিকে প্রাণপণে দৌঁড় দিবি।”

“কেন?”

“অত কথা এখন আমি বলতে পারব না। চুপচাপ যা বলছি কর। নইলে তোর খুলিতে এই তির গুঁজে দেব।”

সুতির রণমূর্তি দেখে বেটেমোটা মাদুর যেন আরো কুঁকড়ে গেল।

“বুঝেছিস কী বললাম?”

“হুঁ।”

নেকড়ে আর নন্দ টিলা থেকে বেশ দূরে সরে গিয়েছে। এখন একে অপরকে ঘিরে ওরা পাক খাচ্ছে, পাক খাচ্ছে। নেকড়েটা আরেক পাক খেতে যাবে ওমনি সুতি গর্জন করে উঠল।

“এইবার, মাদুর! দৌড়ো, দৌড়ো!”

মাদুরও তার থলবলে চেহারাটা নিয়ে টিলাটার দিকে একটা ছুটে গেল। নেকড়ের ব্যাপারটা বুঝতে এক মুহূর্তেরও বেশি সময় লাগল না। সে একটা সাপের মতো নিজের দেহটা বেঁকিয়ে নন্দর পাশ কাটিয়ে কিলবিল করে মাদুরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

ওর গলা থেকে বেরিয়ে আসছে একটা উন্মত্ত গর্জন।

এই তো সুযোগ! নন্দ আর নেকড়ের মাঝে এখন প্রায় দশ হাতের ফারাক। সুতি তিরকে ছেড়ে দিল।

“সাঁইই” করে আওয়াজ শোনা গেল। তারপর “ফটটট”। নেকড়ের গর্জন আর্তনাদে পরিবর্তন হয়েছে। মুখ থুবড়ে মাটি আর বাঁশপাতার মধ্যে তিনপেয়ে নারকীয় জানোয়ারটা পড়ে গেল।

ঠিক চোখে গিয়ে তিরটা বিঁধে গিয়েছে। ধারালো ফলা অনেক গভীরে ঢুকে গেছে। তিরের পেছনে লাগা পালকগুলো দেখে মনে হল নেকড়েটার চোখ ফুঁড়ে একটা ফুল গজিয়েছে। জানোয়ারটার দেহ একবার দুইবার কেঁপে উঠে নিশ্চল হয়ে গেল। শেষবারের মতো বেরিয়ে এল নিশ্বাসের ঘর্ঘর শব্দ।

এখন আওয়াজ বলতে শুধু বৃষ্টির অবিরাম কনসার্ট।

ইতিমধ্যেই ক্ষত থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে মাটি ভিজে যাচ্ছে। সেই রক্তমাখা মাটিতে ফুটে উঠছে অসংখ্য ঘাসফুল, ছত্রাক আর লতাপাতা। লাল, হলুদ, সবুজ আর অন্যান্য চোখা-রঙা ফুলের মাঝে স্নিগ্ধ নীল অর্কিডের ঝোপ। খুব শীঘ্রই নেকড়ের সর্বাঙ্গ সেই ঘাস পাতায় ভরে যাবে।

নন্দ আর মাদুর দুইজনেই জ্বরে ভোগা রোগীর মতো কাঁপছিল। সুতি শান্ত পায়ে হেঁটে নেকড়েটার সামনে দাঁড়াল। নেকড়ের মাড়ি থেকে বার হয়ে থাকা অপ্রাকৃত দাঁতগুলো অতিদ্রুত মাড়ির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। চোখের সামনে শরীরটাও যেন চুপসে যাচ্ছে। ভয়ঙ্কর-সুন্দর প্রাণীটাকে এখন কেমন অসহায় দেখাচ্ছে।

সুতির গা গুলিয়ে উঠল। সেটার কারণ সে ঠিক বুঝতে পারল না। না, প্রাণীটা দেখে তার কিছু মনে হয়নি। ঘৃণাটা আসছে অন্যদিক থেকে। ঘৃণা হচ্ছে নিজের উপর।

সুতি চোখের পলক ফেলল। বৃষ্টির বেগ কমে এসেছে। তার বদলে হু হু করে হাওয়া বইছে, কামড় বসাচ্ছে ভেজা শরীরে।

টিলার ওইপারে কী আছে?

নন্দ অশ্রাব্য গালিগালাজ দিতে দিতে নেকড়ের দেহটার দিকে এগিয়ে আসছে। সুতি কিছু বলল না। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিলাটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নন্দ তার বর্শাটা নেকড়ের নিতম্বে গুঁজে দিল। সেই দগদগে ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। কিছুটা নন্দের গায়ে পড়ল, বাকিটা মাটিতে। সেখানে আরো উদ্ভিদ গজিয়ে উঠছে। সেই লতা ছত্রাক পায়ে মাড়িয়ে নন্দ বর্শা দিয়ে মৃতদেহটাকে ক্ষতবিক্ষত করতে শুরু করল। একটা ভেজা ভোঁতা আওয়াজে বাঁশবন মুখরিত হতে থাকল। সুতি ততক্ষণে টিলাটার নীচে পৌঁছে গেছে। নন্দের দেখাদেখি মাদুরও নেকড়েটার দিকে এগিয়ে গিয়েছে। বর্শার ঘাটতি মেটানোর জন্য ওর হাতে একটা ছুঁচালো পাথর। সেটা দিয়ে ও ঘা বসাল নেকড়ের মাথায়।

রণোন্মাদ দুইজনকে পেছনে ফেলে সুতি টিলার বিপরীত প্রান্তে চলে এসেছে। এখানে নন্দের গালি আর মাদুরের উল্লাসধ্বনি তেমন শোনা যাচ্ছে না। এই টিলার গায়ে একটা ফাঁপা অংশ রয়েছে। গর্তের মতো। সেই ফাঁপা অংশে কী যেন একটা চিকচিক করছে।

সুতির দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেল। জিনিসটা নড়ছে। ছোটো ছোটো দুটো হাত। একটা সাদাটে পা। সুতি গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল নীল দুটো চোখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর পানে চেয়ে রয়েছে।

রুপোলি রাংতায় মোড়ানো একটা শিশু।

***

সকাল হয়েছে। তাড়াতাড়ি উঠতে গিয়ে বোঁও করে মাথাটা ঘুরে গেল।

আবার সেই ঝিম মেরে বসে থাকা। যত দিন যাচ্ছে, তত শরীরটা আরো শীর্ণ হচ্ছে, দুর্বল হচ্ছে। সারাক্ষণ তেষ্টায় গলা শুকিয়ে থাকে। খিদে পেলেও মুখে কিছু রোচে না।

সুতি পিঠে হাত দিল। চামড়াটা যেন শিরিষ কাগজের মতো খসখসে। মেরুদণ্ড বরাবর যে খড়খড়ে জিনিসটা হয়েছিল, সেটা যেন চামড়া ফেটে বেরিয়ে আসছে। পিঠ হয়েছে পাহাড়ি উপত্যকা।

কী মনে হল, সুতি একবার নিজের মুখে হাত দিল। বাম গালেও হয়েছে। একটা কাঁটার মতো কিছু বেরিয়ে আছে।

তার সঙ্গে কী তেষ্টা!

বিছানা থেকে নেমে একপ্রকার হামাগুড়ি দিয়ে সে কলসির দিকে এগিয়ে গেল। ঘটিতে জল ঢালার তর সইল না, পুরো কলসিটাই মুখে উপুড় করে দিল। নাক চোখ গলা বেয়ে অনেকটা জল মেঝেতে পড়ে গেল। সুতির তাতে আক্ষেপ নেই। ও ঢকঢক করে জল খেয়ে কলসি ফাঁকা করে ফেলল।

তারপর চোখ বুজে সেই ভেজা মেঝেতেই শুয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরে রাংতা যখন দোতলার ঘরে ঢুকল, তখন সে সুতিকে ওই অবস্থাতেই দেখতে পেল।

“সুতিমা? সুতিমা?” রাংতা উদ্বিগ্ন হয়ে সুতিকে ঝাঁকুনি দিল। “তুমি মেঝেতে কী করছ? ওঠো।”

সুতি জড়ানো গলায় কী একটা বলল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসল। গায়ের জ্যালজেলে শাড়িটা ভিজে গেছে। ঠান্ডা লাগছে।

“বাচ্চাটা কই রে?” সুতি ঘোলাটে চোখে রাংতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। “এই এইটুকুন বাচ্চা। কী ছোটো ছোটো পা। কই গেল? নন্দ যেন ওই বাচ্চাটার কাছে না যায়, বুঝলি। ওই ছেলেটা সুবিধার নয়।”

রাংতা কী একটা বলতে গিয়েও বলল না। তার বদলে ছেলেভোলানোর মতো করে বলল, “বাচ্চাটা নীচতলায় আছে, সুতিমা। তুমি আমার সঙ্গে এসো। বারান্দায় গিয়ে বসবে, গায়ে রোদ পড়বে৷ আরাম পাবে। এসো, এসো।”

“কিন্তু বৃষ্টি পড়ছে তো? দেখছিস না ভিজে গেছি!”

“অনেকক্ষণ হল থেমে গেছে। তুমি আসোই না।”

রাংতা সুতিকে একরকম টেনেই নিয়ে গেল। বাড়ির সামনে সরু বারান্দা। বারান্দার ওপারে একটা ছোটো বাগান। বাগান বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বেড়ার ওপারে জঙ্গল।

সত্যিই তো! বৃষ্টি নেই। পচা ডোবার গন্ধ নেই। নন্দ নেই। শুধু নির্মল সাদাটে রোদ পড়ছে। মিহি ধুলোয় আলো পড়ে চিকচিক করছে। বাগানের একদিকে মাটির উনুন। টিনের বাটিতে কিছু একটা সেদ্ধ হচ্ছে।

একটু কসরত করে সুতি বারান্দায় বসে পড়ল। রোদের তেজ বেশ রয়েছে। কিন্তু বড়ো আরামের। আচ্ছা, এখন শীতকাল না গরম? মনে করতে পারল না।

রাংতা একটা তোবড়ানো হাতা দিয়ে বাটি থেকে কী সব যেন বার করে আনছে। কয়েকটা ধোঁয়া ওঠা সোনালি বাদামি রঙের ড্যালা। একটা থালাতে ড্যালাগুলো রেখে সে সেগুলোর ছাল ছাড়াতে বসল। সুতি অবাক হয়ে দেখল বাদামি খোসার ভেতরে ঘিয়ে সাদা রং। কীরকম একটা শুভ্র গন্ধ নাকে আসছে।

আলু! কতদিন পর আলু দেখতে পেল সুতি! সেইই ছোট্টবেলায় একবার খেয়েছিল। আলু দিয়ে গাঢ় কাকের ডিম। মায়ের হাতের রান্না। এখন জীবনের সায়াহ্নে এসে সেই তরকারির স্মৃতিতে সুতির চোখ দুটো ভিজে এল।

রাংতা ততক্ষণে খোসা ছাড়ানো আলুগুলোকে কচলে কচলে মাখতে শুরু করেছে। মাখতে মাখতে কচলানো আলুগুলোয় কীসের সাদাটে গুঁড়ো ছড়িয়ে দিল। অল্প সর্ষের তেল। তারপর একটা লঙ্কা। একটা মিষ্টি ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসছে।

“এত সরঞ্জাম তুই কোদ্দিয়ে পেলি?” সুতি জিজ্ঞেস না করে পারল না। “তেল আর লঙ্কা? আর ওই গুঁড়োটা কী?”

“নুন।”

নুন! বলে কী! এটা তো রাজভোগ!

আলু মাখা শেষ হলে রাংতা সেটা থেকে একটা মণ্ড তুলে আরেকটা বাটিতে করে সুতির হাতে ধরিয়ে দিল।

“গরম গরম খাও দেখি।”

সুতি আরেকবার চোখ বুজে ঘ্রাণ নিল। ও আর ওর মা একটা লম্বাআআ ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকত। বিয়াল্লিশ তলা বাড়ি। যদিও সুতি কোনোদিন অত উপরে ওঠেনি, ছাদে গিয়ে চারপাশটা দেখেনি। উপরে ওঠা বারণ ছিল। কারা যেন সেখানে দল বেঁধে থাকত। গেরুয়া রঙের কাপড় পরত। মাঝে মাঝে নীচের তলায় এসে হম্বিতম্বি করত। ছোটোবেলার সব স্মৃতিতে সুতি ওই বাড়িটার ঘরগুলো দেখতে পায়। সেই বড়ো বড়ো জানালা। মা একটা পুরোনো হাঁড়িতে রান্না করছে। আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ। যেদিন তেল থাকত, ভাজা কিছু। কখনো কখনো ভাত। পরিষ্কার মেঝেতে বসে দুইজনে খাচ্ছে… মা নীচ থেকে সবে চান করে এসেছে। চুল এখনো ভেজা। মা এখন মূর্তি পুজো করবে। গেরুয়ার দলকে চাইলে নৈবেদ্য দিয়ে যায়। রক্তজবাতে ঢেকে গেছে প্রতিমা। কিন্তু কীসের প্রতিমা? বোঝা যায় না, আর মা বলতেও পারে না। সময়ের আঘাতে মূর্তির চেহারা মসৃণ হয়ে গেছে, চেনা যায় না। তবু, মা রোজ পুজো করবে… কোথা থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে… চন্দনের গন্ধ, গন্ধকের গন্ধ… বড়োই মায়াময়… তাদের চারদিকটা সবুজ আর সবুজ… দেওয়াল জুড়ে লতাগুল্মের জট… বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে… তারপর একদিন আগুন লাগল। সেই উপরতলার গেরুয়া শাড়ি পরা একজন মেয়ে তাকে বাড়ির বাইরে টেনে নিয়ে এল। কিন্তু মা…

“মা কই, ঠাকুরঝি?” সুতি জিজ্ঞেস করল। গাছগুলো কেউ উত্তর দিল না।

ঠাকুরঝির বদলে রাংতা এসে নিজের হাতে কিছুটা আলু সিদ্ধ সুতির মুখে তুলে দিল।

“মা আসবে তো। আরেকটু পরেই আসবে। তুমি এখন খাও।”

সুতি সেই নুন-ঝাল খাবারটা খেতে খেতে দেখল বেড়ার ঠিক ওইপারে একটা সাদা বাঘ দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ের কালো ডোরাকাটা দাগগুলো ঢেউ খাচ্ছে। মাথায় একটা চড়ুই বসে কিচির-মিচির করছে। বাঘটা থালায় পড়ে থাকা আলুসেদ্ধর মণ্ডটা দেখে একবার ঠোঁট চাটল।

রোদের তেজ যেন আরো বেড়েছে…

***

“কী ওটা?”

নন্দের মুখে রক্তের ছিটে৷ গায়েও৷ তবে পেটের আঁচড়টা আর কাঁদছে না। নন্দর পাশে মাদুর উবু হয়ে বসে নেকড়েটার চিরে ফ্যালা পেট থেকে নাড়িভুড়ি টেনে আনছে। ওর হাতদুটো কনুই অবদি টকটকে লাল। ওর মুখে কেমন একটা উল্লাসের ছাপ।

নন্দের মুখ ফাঁকা স্লেট। কী যে ভাবছে, সেটা বোঝার উপায় নেই।

“কথা কানে যায়নি! জিজ্ঞেস করলাম তোর হাতে ওটা কী?” নন্দ আবার জিজ্ঞাসা করল। ইস্পাতের মত ঠান্ডা গলা।

রাংতা জড়ানো বাচ্চাটাকে বাম কোলে রেখে, ডান হাত দিয়ে পিঠে গুঁজে রাখা দা-খানা টেনে বার করে সুতি বলল, “কী বললি আরেকবার বল দেখি।”

নন্দ নিস্তেজ চোখে সুতির ধারালো দা-এর দিকে তাকিয়ে রইল। ওর বর্শাটা পায়ের কাছে পড়ে। যতক্ষণে ও সেটা তোলার জন্য মাথা নীচু করবে, ততক্ষণে ওর খুলিতে দা বসিয়ে দিতে সুতির বিন্দুমাত্র অসুবিধে হবে না৷ কী ভাবছে নন্দ? ঠাকুরঝি ভাবেন নন্দ মাদুরের মতোই ন্যালাখ্যাপা, মাথা ফাঁকা। খুবই ভুল ভাবেন। নন্দর ভাবতে সময় লাগে। সে ধীরে, খুব ধীরে, লাভ ক্ষতি, ভালো মন্দ সব কিছুর কথা ভাবে। তারপর…

“এমনি জিজ্ঞেস করলাম,” অবশেষে নন্দ মিনমিন করে উত্তর দিল। চোখ নামিয়ে ফেলেছে।

সুতি দা হাতে রেখেই হিসহিসিয়ে বলল, “আমি না থাকলে তো এতক্ষণে নেকড়ের পেটে হজম হতি, সেটা খেয়াল আছে? তোর সাহস কী করে হয় আমার সঙ্গে ওইভাবে কথা বলার? আমাকে জিজ্ঞেস করার তুই কে, শুনি?”

“ভুল হয়ে গেছে,” নন্দ বলল। দৃষ্টি নীচে। কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পেরে মাদুর তার মারণ-নৃত্য থামিয়ে ফেলল। ওর পা গুল্ম পাতায় ঢেকে গেছিল। এখন দাঁড়িয়ে উঠে সেগুলোকে মাড়িয়ে সে নন্দর পাশে এসে দাঁড়াল। জুলজুল করে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে।

“আজকের শিকার নাকি?”

“মানুষের বাচ্চা খাবি?” সুতি খেঁকিয়ে উঠল।

মাদুর অপ্রকৃতস্থের মতো প্রতিপ্রশ্ন করল, “কেমন খেতে?”

ওর কথা শুনে নন্দও যেন চমকে উঠল। মাদুরও কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে আৎকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।

“আমি কিন্তু ওইভাবে বলিনি…”

কোথায় একটা পাখি ডাকছে। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার আনন্দে বোধহয়। সেই পাখির কর্কশ উল্লাসধ্বনিতে তিনজনেরই যেন হুঁশ ফিরল।

তারা একে অপরের দিকে তাকাল। অনেক দিনের সঙ্গী ওরা৷ অনেক বিপদ-আপদে একে অপরকে বাঁচিয়েছে, অনেক সুখ-দুঃখ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। কিন্তু যবে থেকে ঠাকুরঝির ব্যামো ধরা পড়েছে, তবে থেকে ওদের দলে কীসের একটা যেন ছায়া নেমে এসেছে। সবসময় কেমন একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ। যেন একে অপরের প্রতি বিশ্বাস কমে গেছে। পাখিটার ডাক শুনে এই কথাগুলোয় ভাবছিল সুতি।

এবার বলল, “মাদুর, নেকড়েটার কাঁধ আর পেছনের পা থেকে যতটা পারিস মাংস কেটে নে। এই যে দা-খানা ধর। চটপট কাজে লাগ।”

মাদুর বিনা বাক্যব্যয়ে কাজে লেগে গেল। ততক্ষণে নন্দ ডোবা থেকে আঁজলা ভরে জল তুলে নিজের মুখ ধুতে শুরু করেছে। সুতি চুপচাপ তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কোলে থাকা বাচ্চাটা কিন্তু এতক্ষণ পর্যন্ত একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। খালি সবাইকে ড্যাবড্যাব করে দেখছে।

“কোথায় ছিল?” ফ্যাসফেসে গলায় জিজ্ঞাসা করল মাদুর। এই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওর যেন বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে। আসলে চোখ দুটো কীরকম যেন বদলে গেছে, কীরকম নিস্তেজ দেখাচ্ছে।

“টিলাটার পেছনেই ছিল।”

“আশপাশে কাউকে দেখতে পেলি না?”

“কাউকে মানে?”

“মানুষজন।”

“কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। আমার তো মনে হয়…” সুতি একবার থামল। যেটা ও ভাবছে, সেটা বলতে কেমন বাধো বাধো ঠেকছিল। তাও বলেই ফেলল, “আমার তো মনে হয়, নেকড়েটাই একে নিজের কাছে রেখেছিল। তাই আমাদের টিলার দিকে যেতে দিচ্ছিল না।”

“হুমম,” মাদুর উঠে দাঁড়াল। ধুতির খুঁট দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, “বোধহয় বাচ্চাটাকে পরে খাবে বলে নিজের কাছে রেখেছিল।”

সুতি সহমত হতে পারল না, কিন্তু কোনোরকম তর্কাতর্কিতেও গেল না। খুব ক্লান্ত লাগছে৷ নিজেদের ডেরাতে ফিরে গিয়ে চোখ বুজতে পারলে ভালো হয়। বাচ্চাটা কী হালকা! যেন এক তাল মেঘ। ঠান্ডা হাওয়ার জন্য সুতির কোলে থেকেও সে তিরতির করে কাঁপছে। সুতি বাচ্চাটাকে রুপোলি রাংতা দিয়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল।

“চল ফেরত যাই।”

মাদুর ততক্ষণে নেংড়ের শব থেকে কিছুটা মাংস খুবলে নিয়ে একটা কাপড়ে জড়িয়ে নিয়েছে। নেকড়েটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। তার জায়গায় একটা লম্বাটে ঘাস পাতা আর ছত্রাকের ঝোপ যেন গজিয়ে উঠেছে। ওরা তিনজনে নিজেদের ডেরার দিকে পা বাড়াল।

শিকার করতে এসে বেশ দূরে চলে এসেছে। তাই ফিরতে সময় লাগল। কারশেডের জায়গাটা বেশ শান্ত। পৌঁছাবার আগে বাশবন পাতলা হয়ে আসে, তারপর শেষ হয়ে যায়। মোলায়েম ঘাসের গালিচা পরিশ্রান্ত পায়ের পাতাগুলোকে চুমু খায়। আকাশ এখনো শান্ত হয়নি, প্রায়ই হলদে কটাক্ষ করছে। তারপর তার সে কী ক্রুদ্ধ গর্জন! সেই ধূসর পটচিত্রে একটা নাম-না-জানা সোনালি পাখি ডিগবাজি খাচ্ছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের শিখা ওর গায়ে আছড়ে পড়ছে, তাতে ওর ঔজ্জ্বল্য যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে।

ঘাসবন পার হয়ে আসলেই বারাসাত কারশেড। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কী একটা কারণে বিল্ডিংটার আশপাশে কোনো গাছ জন্মায়নি, বিশাল বিশাল দেয়ালে এক ছোপ শেওলা পর্যন্ত উলকি আঁকতে পারেনি। নেড়া বিল্ডিংটা যেন প্রকৃতি মার বিরুদ্ধে ব্যর্থ প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

সামনে বর্শা হাতে নন্দ, মাঝে সুতি, শেষে পিঠে মাংস ঝোলানো মাদুর। তাই ঠাকুরঝি যখন খোঁড়াতে খোঁড়াতে কারশেডের মুখের সামনে এলেন তখন বাচ্চাটাকে তিনি দেখতে পাননি।

তিনি হাঁক দিলেন, “সেই কোন ভোরে বেরিয়েছিলি, এখন বেলা পড়ে এল। বলি একটা বুড়ো মানুষের খিদে পায় তো, হ্যাঁ? নাকি এখন থেকেই আমার পিণ্ডি দেওয়ার তাল করছিস?”

ঠাকুরঝি এখন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, কুঁজো হয়ে গেছেন। কী যে এই মারণ রোগ হয়েছে ওঁর, দেহটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছে। দিনকে দিন, ঠাকুরঝির চেহারা বদলে যাচ্ছে। পিঠ জুড়ে কীসব বেরিয়ে এসেছে, দেখে মনে হয় কাঁটাগাছের ঝোপ। হাতের চামড়া ফেটে ছোটো-বড়ো বাদামি রঙের শলাকা বেরিয়ে এসেছে। পেটে ভর না দিয়ে ঠাকুরঝি আর ঘুমাতে পারেন না। তার উপর নিজে থেকে সেই কাঁটাগুলো উপরাতে গিয়ে শরীরটা ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছেন, কয়েক জায়গায় ঘা হয়েছে।

শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মন মেজাজও ঠাকুরঝির কেমন বদলে গেছে। সারাক্ষণ খুঁতখুঁত করেন, তার সঙ্গে কারণে-অকারণে গালিগালাজ। নিজের মনে কাদের সঙ্গে যেন কথা বলেন। রাত বিরেতে হাজার রকমের অবান্তর ফরমাইশ খাঁটান। রেগে গেলে মাথার ঠিক থাকে না; আগের মতো লাঠি দিয়ে পেটাতে পারেন না বলে থুতু ছেটান, কাদা ছুড়ে মারেন। একবার তো মাদুরের চোখের ধুলো দিয়ে দিয়েছিলেন।

তবু এই তিনমূর্তি ঠাকুরঝিকে ছেড়ে চলে যায়নি। এদের সবাইকে যে এই বুড়িই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। গহীন বন থেকে তুলে এনে নিজের ছেলে-মেয়ের মতো বড়ো করেছেন। তার সঙ্গে শিখিয়েছেন বেঁচে থাকার হাজারো নিয়ম আর কলাকৌশল।

এখন ঠাকুরঝি কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে তিনজনের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে আছেন। গায়ে একটা ময়লা গেরুয়া শাড়ি, কিন্তু পিঠের অংশের কাঁটাগুলো কাপড় ফুটো করে বেরিয়ে এসেছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে একটা ঝুরঝুরে সজারু এসে দাঁড়িয়েছে।

“একটু দেরি হয়ে গেল,” নন্দ অনুতাপদগ্ধ গলায় বলল। “কিছু খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। অবশেষে একটা নেকড়ে…”

“নেকড়ে,” ঠাকুরঝির হাহাকার। “ওই জানোয়ারের কষাটে মাংস মুখে তোলা যায় না, আর বেছে বেছে সেটারই শিকার করতে হল? হ্যাঁ রে সুতি, তুই তো এদের সঙ্গে ছিলি। তোর তো একটু হলেও কাণ্ডজ্ঞান আছে। তা হলে কোন আনন্দে তুই…”

ঠাকুরঝির চিৎকার থেমে গেছে। সুতি দেখল ঠাকুরঝি বিস্ফারিত চোখে রাংতা জড়ানো বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে। নীচের ঠোঁটটা তিরতির করে কাঁপছে। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।

তারপর ঠাকুরঝি সুতির কাছে এসে বললেন, “কই দেখি বাছাটাকে একবার। দেখি একটু।”

সুতি যে অল্প ইতস্তত করল না, তা নয়। কিন্তু মাদুর আর নন্দ যেভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, সেই অবস্থায় ঠাকুরঝিকে অবমাননা করার কথা ও ভাবতে পারল না।

কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। সাবধানে, খুব সাবধানে, বাচ্চাটাকে কোলে নিলেন ঠাকুরঝি। আবার বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বহুদূরে, ওই আকাশের মাঝে, সোনালি পাখিটা “বুউউম” আওয়াজ করে শূন্যে মিলিয়ে গেল। বাচ্চাটা ড্যাবড্যাব করে ঠাকুরঝির দিকেই তাকিয়ে ছিল। এখন হঠাৎ, নাম না জানা কোনো এক কারণে, সে কেঁদে উঠল। বিশাল এই দালানে, সেই তীক্ষ্ণ কান্নার প্রতিফলন বড়োই অস্বাভাবিক ঠেকল। সুতির কী একটা মনে হতে কারশেডের ভেতরে জমে থাকা অন্ধকারের দিকে একবার তাকাল। বাচ্চাটার কান্নার তীক্ষ্ণ আওয়াজে দানোগুলো কি আবার জেগে উঠবে? গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়বে তাদের উপর? লোহার সারিগুলো বেয়ে কেউ কিন্তু এগিয়ে এল না। সভ্যতা চিরঘুম দিয়েছে।

ঠাকুরঝি আর একটা কথা না বলে ফোকলা হাসি হাসতে হাসতে সেই অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনমূর্তি একবার নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে তাদের নেত্রীর পিছু পিছু হাঁটতে থাকল।

***

রাত বেশ গভীর। এখন কলকাতার বনে গান শোনা যায়, অসংখ্য রিনরিনে গলায় কারা যেন গান গায়। তাদের আদিম সুর আকাশের নক্ষত্রদের কাছে নিবেদিত। যেদিন রাতে আকাশে ভাঙাচোরা চাঁদটা দেখা যায়, সেদিন তাদের সুরে আসে এক বিষাদের ছাপ। আজ যেমন রয়েছে।

সবাই কিন্তু এই গান শুনতে পায় না…

রাংতা পায়।

আজ সে একটা বই নিয়ে বসেছে। ঝুরঝুরে হলুদ পাতাওয়ালা একটা ঢাউস বই। ভেতরে ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরে কীসব যেন লেখা। রাংতা পড়তে পারে না। চারিদিকের মায়াবী গান শুনতে শুনতে সে তাই বইয়ে আঁকা ছবিগুলো দেখছিল। অদ্ভুত সব ছবি।

এই যে, এই পাতাটেই দেখা যাক না। গাঢ়কাকের মতো দেখতে একটা পাখি, কিন্তু কীরকম বেঁটেখাটো। তার উপর দুই চোখের মাঝে তৃতীয় চোখটাও দেখা যাচ্ছে না। এই পাতায় আবার একটা অজানা জানোয়ারের ছবি, দেখতে কিছুটা জংলা কুকুরের মতো, কিছুটা নেকড়েগুলোর মতো। এইখানে আবার একটা রাঙাবাদুড়ের ছবি, কিন্তু তবু কেমন যেন অন্যরকম দেখতে। এইরকম অদ্ভুত বই সে আগে কখনো দেখেনি। এককালে এই জন্তু জানোয়ারগুলোয় কি পৃথিবীতে রাজ করত? তখনও কি গাছেরা এইরকম গান গাইত?

রাংতা জানে না। এগুলো নিয়ে কথা হয়নি সুতিমার সঙ্গে। হয়তো কথা বলার আর সুযোগও পাওয়া যাবে না…

বাইরে থেকে কীসের একটা খচমচ আওয়াজ আসছে। রাংতা বইটা মেঝেতে রেখে টানটান হয়ে বসল। পায়ের কাছে রাখা লন্ঠনের শিখার রং আজ সবুজ। কোনো এক অজানা ভয়ে সেই শিখা তিরতির করে কাঁপছে। রাংতার স্নায়ুগুলো যেন অতিরিক্ত সজাগ হয়ে গেছে। অরণ্যের গান সে আরো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।

“হে আকাশের মুক্তরাণী,

কর আমাদের ক্ষমা,

আমাদের অন্তিম বাণী

তোমার চরণে জমা…”

গানের সঙ্গে সেই খচমচ আওয়াজ। বাড়ির বাইরে কে একজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে কেমন ঘ্র্যাও ঘ্র্যাও আওয়াজ করছে। রাংতার উদ্বিগ্নতা একটু কমল। সে বুঝতে পেরেছে কে এসেছে।

পণ্ডিত আর্বাল।

দরজা ঠেলে বেরুতেই এক ঝাপটা হাওয়া এসে গালে, নাকে আর চোখে কামড় দিয়ে গেল। শীতকাল আসতে আর দেরি নেই। রাংতা আকাশের দিকে একবার তাকাল। মাথার উপরে চাঁদের ভগ্নাংশগুলো ভাসছে। দুটো বড়ো টুকরোকে প্রদক্ষিণ করছে অসংখ্য ছোটো ছোটো সব টুকরো। রাংতা বোঝে না কেন এই দৃশ্য দেখলে ওর বুকটা হুহু করে ওঠে। সে বোঝে না কেন এই অরণ্যানীর বাসিন্দারা চাঁদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়। সে বোঝে না অনেক কিছুই।

কিন্তু পণ্ডিত আর্বাল অনেক কিছু বোঝে। পণ্ডিত অনেক কিছু জানে। কিন্তু সবকিছু সে রাংতাকে বলতে চায় না। রাংতা তাই পণ্ডিতকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারে না। কে জানে বুড়োর মতলব কী! এই অরণ্য জন্মানোর আগে থেকে, এই অরণ্যের গর্ভে লুকিয়ে থাকা শহর বসার আগে থেকে, সময়ের সেই প্রথম দিন থেকে পণ্ডিত আর্বাল এই মহাবিশ্বে বিচরণ করেছে। এইরকম জীবকে একটু অবিশ্বাস করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ওই যে, বেড়ার ঠিক ওইপারে বুড়োটা চারপায়ে পায়চারি করছে। চাঁদ আর নক্ষত্রমণ্ডলীর মৃদু আলোয় তার অবয়ব যেন একটু বেশিই ছায়াময়। রাংতা এগিয়ে গেল।

“উফফ, রোজ রোজ এদের ঘ্যানর ঘ্যানর আর ভালো লাগে না,” রাংতার মনের উপকূলে আর্বালের বিরক্তিমাথা কথাগুলো আছড়ে পড়ল। “গর্দভের দল কি জানে না চাঁদের কোনো চিন্তাশক্তি নেই, আবেগ নেই, যন্ত্রণা নেই, সুখ-দুঃখ কিচ্ছু নেই? সেই কবে একটা মিসাইল মেরে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, তারপর থেকে এদের ন্যাকামো শুরু হয়েছে।”

মিসাইল মানে আবার কী? রাংতা জানে, আর্বালকে জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর দেবে না। তাই সে অন্য একটা প্রশ্ন আর্বালের মনে ছুড়ে দিল।

“কী ব্যাপার পণ্ডিত? এত রাতে এখানে?”

প্রশ্নটা যেন আর্বালকে একটা তিরের ন্যায় বিদ্ধ করল। সে তার পায়চারি থামিয়ে, রাংতার মুখের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আর্বালের পেছনে বন দাঁড়িয়ে। সেই বনের প্রতিটা পাতায় অন্ধকারের বীজ। তারই মাঝে স্ফুলিঙ্গের মত ঘুরে বেরাচ্ছে এক দল জোনাকি, হয়তো লুম্পা গাছের খোঁজে।

আর্বাল এক পা এক পা করে রাংতার সামনে দাঁড়িয়েছে। তাদের মাঝে শুধু একটা বাঁশের বেড়া।

“আজ সকালেই তো এসেছিলে দেখলাম,” রাংতা বলে চলেছে। “তখন হাঁক দিলাম, উত্তর দিলে না।”

“তোর মাকে একটু দেখতে এসেছিলাম,” এই বলে আর্বাল একটু ইতস্তত করল। পেছনে বনের সবাই গান গেয়েই চলেছে, সেই কোলাহলের সন্তানেরা। “রাংতা, কাল সূর্য উঠলে কী হবে জানিস তো?”

রাংতা কোনো উত্তর দিল না। সে জানতো সুতিমার হাতে বেশি সময় নেই। কিন্তু তা বলে, কালকেই! এত তাড়াতাড়ি! এইভাবে… বিদায় কী ভাবে জানাতে হয় সেটা সে কোনোদিন শেখেনি। ভেবেছিল, সুতিমা চলে যাওয়ার সময় সে খুব কাঁদবে, বুক চাপড়িয়ে কাঁদবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভেতরটা যেন মরুভূমি। হয়তো নিজের অজান্তেই, এই কয়েকদিন ধরে সে সুতিমাকে বিদায় জানাচ্ছিল, কিন্তু নিজে সেটা বুঝে উঠতে পারেনি।

“রাংতা?” পণ্ডিত নরম গলায় হাঁক দিল। “আছিস আমার সঙ্গে?”

রাংতা খুব জোরে একটা শ্বাস নিয়ে বলল, “আছি।”

“কালকের পর তোর এখানে থাকা আর ঠিক হবে না। আমি জানি এখন এইসব শোনার ইচ্ছে তোর নেই, কিন্তু রাংতা…” পণ্ডিত কেমন ভয়-জড়ানো গলায় কথা গুলে বলে যাচ্ছে। কী অদ্ভুত! এই অমর জানোয়ারটাও তবে ভয় পায়। “উত্তরদিকে, বেলঘড়িয়ার কাছে পঙ্কীলাদের দেখা গেছে। তারা সেখানে বাসা বেঁধেছে, আর খুব ধীরে ধীরে এইদিকে এগিয়ে আসছে। রোজ রাতে ওদের শিবির থেকে মারণযন্ত্রের আওয়াজ ভেসে আসে। আমি বুঝতে পারছি খুব শীঘ্রই কান্তারদেবের সঙ্গে এদের ঝামেলা বাঁধবে।

“রাংতা, কালকেই তুই বনের আরো গভীরে চলে যাস। সুতিমা চলে যাওয়ার পর, তোর জন্য এই জায়গাটা একদম নিরাপদ নয়। কলকাতার বুকে একটা বড়ো মাঠ আছে, সেখানে মাথা গোঁজার জায়গা পেয়ে যাবি। চিন্তা করিস না, আমার পোষা চড়ুই তোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে…”

আরো কত কী বলে চলল পণ্ডিত আর্বাল। রাংতার শুনতে ইচ্ছে করছে না। যুদ্ধ, হানাহানি আর রক্তারক্তি, এগুলোয় যেন পৃথিবীর সার্বভৌমিক নিয়ম, চিরাচরিত সত্য। মানুষেরা চলে যাবার পর শান্তির স্বপ্ন দেখেছিল এই পৃথিবী, কিন্তু সেটা সত্যি হল কই?

আচ্ছা, ভোর হতে আর কতক্ষণ বাকি? চাঁদের টুকরোগুলো এখন পশ্চিমের আকাশের দিকে নেমে আসছে। আর কতক্ষণ হাতে সময় আছে রাংতার?

সে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। ওর মনে তটে আর্বালের কথাগুলো এসে গুঁতো মারছে। যেন উল্কা এসে পড়ছে। কিন্তু তবু এই কথাগুলো রাংতার কাছে অর্থহীন। সে যখন সদর দরজার সামনে দাঁড়াল, তখন বাজ পড়ার মত একটা আওয়াজে ভূমাতা যেন কেঁপে উঠল। না, রাংতার মনে তটে নয়, আর্বাল সত্যি সত্যিই গর্জন করেছে। রাংতা সেটাকে উপেক্ষা করেও ঢুকে যাচ্ছিল, কিন্তু আর্বালের শেষ কথাগুলো ওর মনে প্রতিফলিত হতে থাকল।

“আগামীকাল তৈরি থাকবি। আগামীকাল… আগামীকাল…”

বাড়ির ভেতরে ঠান্ডা হাওয়ার কামড় আর নেই। লন্ঠনের শিখার ভয় কেটে গেছে, আর তিরতির করে কাঁপছে না। সে এখন নিশ্চল, যেন শেষরাতের ক্লান্তি এসে তাকে চেপে ধরেছে। তার রং এখন হলদেটে, ঠিক যেন একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সূর্য।

“কীরে?” রাংতা ফিসফিস করে শিখাকে জিজ্ঞেস করল। “আবার রং বদলালি যে!”

শিখা উত্তর দিল না, শুধু ফিক করে একবার হেসে উঠল।

লন্ঠনটাকে তুলে, বই বগলদাবা করে রাংতা সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল। সুতিমার ঘরে। এই আধো অন্ধকারে সে সুতিমাকে চিনতে পারছিল না। কিন্তু লন্ঠনটা কাছে নিয়ে যেতেই চিনতে পারল। হ্যাঁ, সাদাটে শাখাপ্রশাখার মাঝে সুতিমাকে দেখা যাচ্ছে। ঘুমোচ্ছে। গাল ফুঁড়ে যে কাঁটাটা বেরিয়ে এসেছিল, সেই কাঁটার ডগায় নাম-না-জানা একটা নীল রঙের ফুল ফুটেছে।

লন্ঠনের শিখার মনে হল, রাংতার চোখে জল চিকচিক করছে। কিন্তু, শিখারও তো চলে যাওয়ার সময় চলে এসেছে, চারদিকটা কেমন অস্বচ্ছ দেখাচ্ছে। নিভে যাওয়ার আগে বুঝতে পারল না, ও ঠিক দেখেছে কি দেখেনি।

***

আগুনের মধ্য থেকে কারা যেন গল্প বলে। রোজ রাতে নয় যদিও, মাঝে মধ্যে বলে। আগুনের চারপাশে, গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকার সময় সুতি অনেকবার সেই গল্প শুনেছে। আকাশ জয় করার গল্প। মহাশূন্যে বিচরণ করার গল্প। সময়ের স্রোতকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার গল্প। সব গল্পের মানে সুতি বোঝে না। তাও শোনে। গল্প শোনার সময়, অনেক সময় বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, এই দুনিয়া থেকে কী যেন একটা হারিয়ে গেছে। সেটা আর কোনোদিন ফেরত আসবে না।

আজ আগুন গল্প বলছে না। শুনছে। রাংতা জড়ানো মেয়েটাকে নিয়ে যেসব কথাবার্তা হচ্ছে, সব শুনছে। অন্যদিন হলে এতক্ষণে চারজনেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যেত। কিন্তু আজ একটা চাপা উত্তেজনায় চারজনের ভেতরটা উত্তাল হয়ে রয়েছে। কারশেডের পেছনে পুকুরপারের এই অগ্নিকুণ্ডে তাই এখনো আগুন জ্বলছে।

বাচ্চাটা আর ঠাকুরঝির কোলে নেই। যখন তিনি কোনোভাবেই বাচ্চাটার কান্না থামাতে পারেননি, তখন বাধ্য হয়ে সুতির কোলে বাচ্চাটাকে বসিয়ে দিয়েছেন। এখনো তিনি জুলজুল করে বাচ্চাটার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কী দেখছেন এমন করে?

নন্দ আর মাদুর বকেই চলেছে। তাদের নিজেদের বীরগাথা শেষ হওয়ার নাম নেই। একমাত্র সুতি নেকড়ে হত্যা নিয়ে একটা কথাও বলেনি। বলতে চায় না। গর্ব করার মতো কিচ্ছু হয়নি আজকে।

নন্দের কথার মাঝে সুতিমা বেশ জোর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “বাচ্চাটাকে ঠিক কী অবস্থায় পেয়েছিলি, সুতিমা?”

“এই রাংতা মোড়া অবস্থাতেই।”

“একটা নেকড়ে এইরকম রাংতা পেলই বা কোত্থেকে? আবার রাংতা যে মোড়াতে হবে, সেটা বুঝলোই বা কী করে?”

“হয়তো রাংতা সহ খুঁজে পেয়েছিল বাচ্চাটাকে।”

ঠাকুরঝি উত্তর দিলেন না। তিনি এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। নক্ষত্রমালার মাঝে কিছু একটা খুঁজছেন।

“সুতি কিছু বলছে না, ঠাকুরঝি,” নন্দ ঠাকুরঝির পা টিপতে টিপতে বলল। “কিন্তু ও না থাকলে আমরা দুইজনে আজ বাঁচতাম না।”

পাশে বসা থাকা মাদুর নিঃশব্দে উপর-নীচে মাথা নাড়াল। এখন তিনজন মানুষ বাচ্চাটার বদলে সুতির দিকে তাকিয়ে। কেমন একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ। যেন নন্দের প্রশংসার মধ্যে সারি সারি কাঁটা লুকিয়ে রয়েছে। সুতির ঠান্ডা লাগছে।

অস্বস্তিকর নিঃশব্দতাটা ভেঙে ঠাকুরঝি বললেন। “তোদের বলেছি কি, সুতির ধনুকখানা আমি বানিয়েছিলাম? তখন ওর বয়স দশও হবে না। বেলগাছিয়ার সেই কালো বাঁশ থেকে তৈরি করে দিয়েছিলাম। তার ঠিক একদিন পরেই ও একটা জাম-খরগোশ শিকার করে নিয়ে এসেছিল।”

সুতি একবার স্মিতভাবে হেসে বাচ্চাটার দিকে মন দিল। কিছুক্ষণ আগে, মাদুর বাচ্চাটাকে মাংসের ঝোল খাওয়াতে গেছিল, সুতি খেতে দেয়নি। বরং ঠাকুরঝির কাছে থাকা দুধের গুঁড়ো কিছুটা চেয়ে নিয়ে, সেটা জলে মিশিয়ে খাইয়েছে। বাচ্চাটা এখন সুতির গা ঘেষে ঘুম দিয়েছে। অগ্নিকুণ্ডের কাঠ পোড়ার “পট-কট” শব্দের সঙ্গে মিশে গেছে মেয়েটার দ্রুত নিশ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ।

“আকাশে নক্ষত্র আর গ্রহমণ্ডলীর অবস্থান দেখছিস?” ঠাকুরঝি বললেন। নন্দ এখন ওঁর ঊরুদুটো মালিশ করছে। “খুবই পবিত্র অবস্থান। বহু বছর পর আকাশে মঙ্গলগ্রহকে দেখা যাচ্ছে। মঙ্গল কীসের প্রতীকি জানিস? গতিশীলতার, সাহসের, সৌর্যের…” কথা বলতে বলতে ঠাকুরঝি আবার বাচ্চাটার দিকে তাঁকালেন। “…জীবনশক্তির।” কথাটা শেষ করে তিনি ঠোঁট চাটলেন।

সুতির গায়ের প্রতিটা রোম খাড়া হয়ে গেল। বাচ্চাটা আনার পর থেকে ঠাকুরঝির মধ্যে থাকা অস্বাভাবিকতা যেন বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। প্রথমে ভেবেছিল ঠাকুরঝির ভেতরে থাকা স্নেহ বোধহয় আবার উথলে আসছে। কিন্তু এখন…

ঠাকুরঝি কেমন ঘোরলাগা চোখে নন্দের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বললেন, “কুত্তা, মালিশটা আরেকটু উপর দিকে কর।”

সুতি ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে কারশেডের দিকে পা বাড়াল। কয়েক হাত এগোতেই ঠাকুরঝির তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা তিরের মতো ছুটে এল। “কোথায় যাচ্ছিস?”

“শিশির পড়ছে। বাচ্চাটার মাথায় পড়লে ঠান্ডা লেগে যাবে।”

ঠাকুরঝি চুপ করে রইলেন। ওদের মাঝে থাকা আগুনটা ঝিমিয়ে এসেছে। সেই ধিকিধিকি আলোয় সুতি খেয়াল করল নন্দর বর্শাটা ঠিক ওর পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে। এতক্ষণ সুতি সেটা দেখতে পায় নি কেন?

ঠাকুরঝি অবশেষে বললেন, “ঠিক আছে, যা। তুইও ভালো করে ঘুমো, সুতি।” এইবার ফোকলা হাসি হাসলেন বুড়ি। “তোকে কাল ভোরে উঠতে হবে। কাল মা ভগবতীর নামে একটা পুজো দেব। সকালে উঠে তোদের একটু খাটতে হবে।”

সুতি উত্তর না দিয়ে কারশেডের অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। ভেতরে সব নিশ্চুপ। লোহার দানোগুলো ঘুমোচ্ছে। তাদের মাঝে আজ জোনাকির সমাগম। অদ্ভুত! কোনোদিন এই দালানের মধ্যে এত জোনাকি সুতি দেখেনি। আজ কেন?

সবজেটে আলোয় চারদিকটা মায়াবী দেখাচ্ছে। সেই আলোয় পথ বুঝে একটা ঘরে ঢুকল সুতি। শোওয়ার জায়গা করায় ছিল। তার মাঝে বাচ্চাটাকে শুইয়ে, ঘরের দরজাটা অল্প ভেজিয়ে, সে অন্য কাজে মন দিল। একটা পুরোনো রাকস্যাক ব্যাগে সে কিছু জামা-কাপড়, এক জোড়া চকমকি পাথর আর এক গোছা দড়ি ভরল। রাকস্যাকের পাশেই তিরধনুক রাখা ছিল, একবার সেগুলো পরীক্ষা করে নিল। না, সব ঠিক আছে! এখন শুধু অপেক্ষা।

ঘরে জোনাকির ঝড় উঠেছে। যেখানে মেয়েটা শুয়ে আছে, তার উপরে জোনাকির দল পাক খাচ্ছে, পাক খাচ্ছে… ঘূর্ণিঝড়ের মতো। ঘরের বাইরে এখন অন্ধকার। নিশ্ছিদ্র অমানিশা। তারই মাঝে কার যেন ফিসফাস আওয়াজ।

ঠাকুরঝি।

সুতি পা টিপেটিপে ঘরের দরজার পাশে এসে দাঁড়াল। ওর হাতে ঠাকুরঝিরই দেওয়া দা। আজ বিকালেই নতুন করে শান দিয়েছে।

“কাল তোরা দু-জন ভোরের আগেই উঠবি,” ঠাকুরঝির গলা ভেসে এল। “বাচ্চাটাকে পুকুরপাড়ে নিয়ে আসবি।”

“যদি সুতি ঝামেলা করে?” নন্দের গলা।

“করবে না। আমি যদি ওকে বুঝিয়ে বলি, তা হলে আর করবে না। ওই বাচ্চাটাই বীজ রে, ভগবানের দেওয়া বীজ। আমার এতদিনের সঞ্চিত পুণ্যের জন্য মা ভগবতী ওকে পাঠিয়েছে আমার কাছে। কাল আমি ওই বীজের রক্তে চান করব, ফিরে পাব আমার তারুণ্য। মা! মা গো! আমি জানতাম এইভাবে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না… আমি জানতাম আমার এখনো অনেক কিছু করা বাকি… মা, আমি তোমাকে হতাশ করব না।”

সুতির হাত কাঁপছে। বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। এরা কারা? হঠাৎ এইভাবে সবকটা বদলে গেল কী ভাবে? সুতির মনে হল, এরা তিনপেয়ে নেকড়ের থেকেও ভয়ানক কিছু। দো-পেয়ে রাক্ষসের দল! এইভাবে একটা শিশুকে বধ করার পরিকল্পনা করে চলেছে!

“মাদুর, তুই ঘরে ফিরে যা। কিন্তু অন্ধকার থাকতেই যেন উঠে যাস। নৈবেদ্য সাজাতে আমাকে সাহায্য করবি… আর নন্দ, তুই আমার সঙ্গে চল। একসঙ্গে শুবি… চল, চল! দাঁড়িয়ে রইলি যে! আজ আমাকে পরিশুদ্ধ করতে তোর সাহায্য প্রয়োজন…” কথাটার পর শোনা গেল জান্তব গোঙানি, কিন্তু সেটা ঠাকুরঝির না নন্দর, সেটা বোঝা গেল না।

ফিসফাস কথাগুলো আর শোনা যাচ্ছে না। ঘরের বাইরেটা যেন মহাশূন্যতায় ভরা। মহাবিশ্বে আর কেউ বেঁচে নেই। দরজার পাশে সুতি সেই একইভাবে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। দা ধরে থাকা হাতটা টনটন করছে, তবু সুতি নিজের জায়গা থেকে নড়ল না। অপেক্ষা করছে। শুনছে। কিন্তু কারুর পায়ের আওয়াজ শোনা গেল না, কারুর কথা ভেসে এল না, কেউ জেগে নেই আর। লোহার দানোগুলোর মত বাকি তিনটে দানোও ঘুম দিয়েছে।

এই সুযোগ!

***

সেই রাতে ওই সোনালি পাখিটা আকাশে উড়তে উড়তে অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখতে পেল। সবুজ রঙের একটা মেঘ ওই বিশাল মৃত-দালানটা থেকে বেরিয়ে এসে বাঁশবনের মধ্য দিয়ে মন্থর গতিতে দক্ষিণদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা ভালো করে বোঝার জন্য পাখিটা ডানাদুটো নিজের শরীরের দিকে জড়ো করে নীচে নেমে এল।

অসংখ্য জোনাকির দল। কাকে যেন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পথিকের বুকের উপর কাপড়ের একটা থলে-মতো জিনিসে একটা শিশু ঘুমোচ্ছে। পথিকের হাতে দা। পিঠে সরঞ্জামের পাহাড়। পাখিটা শিশুটাকে চিনতে পেরে একবার ডাক দিল। কান্নার মতো সেই ডাক শুনে পথিক একবার আকাশের দিকে তাকাল। কিন্তু যা অন্ধকার! মনে হয় না সে পাখিটাকে দেখতে পেল।

পাখিটা কিন্তু সব দেখতে পাচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে, পথিকের পেছনে দুটো ছায়া আলকাতরার মতো সেটে রয়েছে। তাদের একজনের হাতে একটা বর্শা। আরেকজনের হাতে একটা ছোটো দেখে ছোরা। তাদের মুখে বাতুল হাসি। তারা অর্ধনগ্ন উন্মাদ, প্রকৃতির ধর্ষকদের বংশধর।

পথিক কি এখনো এদের কথা বুঝতে পারেনি?

পাখি আরো একবার ডাক দিল। এইবার ওর ডাকের সঙ্গে আকাশও যেন গর্জন করে উঠল। বিদ্যুতের একটা শলাকা তার অসংখ্য শাখাপ্রশাখা প্রশস্ত করে জাদুকরের মতো রাতকে দিনে পরিবর্তন করল…

…এক মুহূর্তের জন্য।

সেইটুকুই যথেষ্ট।

আক্রমণকারীরা হামলে পড়ার আগেই, সুতি এক লাফে অনেকটা সরে গেল। তারপরের ঘটনাটা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু পাখিটার মনে হল সেটা কয়েক যুগ ধরে ঘটে চলেছে।

সময় প্রায়-স্থির, আর সুতি সামনের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। নন্দর সদ্য ধার দেওয়া বর্শার ফলা তাকে আঘাত করতে পারেনি, ওর মুখের দিকে করা খোঁচাটা একটুর জন্য মিস করে গেছে। নন্দের অবস্থান এখন প্রতিকূল, একদম সুতির সামনে, এই অবস্থায় বর্শাটা বাগে আনার আগেই…

সুতি মাটি থেকে কিছুটা ধুলো খামছে নন্দর চোখের দিকে ছুড়ে মারল। নন্দ আরো অপ্রস্তুত হতেই সুতি দা-খানা মাটির সঙ্গে সমান্তরাল রেখে বাম দিকে থেকে ডান দিকে চালিয়ে দিল।

রক্ত।

সুতি একবারের জন্যেও নিজের গতিকে না থামিয়ে ডান দিকে এগিয়ে যায়। মাদুরের অপটু হাতের ছোরা ওর গায়ে ঠেকানোর আগেই দায়ের আর্ধেক অংশ মাদুরের গলায় ঢুকিয়ে দেয়।

“কড়কড়কড়” করে বাজের আওয়াজে ভূমাতা কেঁপে উঠল।

মাদুর তার প্রায় ছিন্ন মাথাটা নিয়েই মাটিতে টপকে গেল। গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে, বাঁশবনের পচা মাটি সেই রক্তের স্বাদ পেয়েও কোনো উদ্ভিদের জন্ম দিতে পারছে না।

একটা অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সুতি নন্দের দিকে ঘুরে তাকাল। নন্দ হাঁটু গেড়ে বসে। ওর নিজের বর্শাটা কোনদিকে পড়ে আছে, কে জানে। নন্দের আপাতত সেদিকে খেয়াল নেই। সে তাকিয়ে আছে তার পেটের দিকে। বিঘৎ একটা ক্ষতস্থান থেকে নাড়িভুড়ি বেরিয়ে আসছে, জোনাকিদের আলোয় সেগুলো চিকচিক করছে।

নন্দ একবার সুতির দিকে তাকায়, চোখে কীসের যেন একটা আকুতি। তারপর তার সঙ্গীর মতো সেও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

সোনালি পাখিটা একটা বাঁশের পাতার উপর বসে সবকিছু এতক্ষণ দেখছিল। হঠাৎ ওই শিশুটার কান্নার আওয়াজ শুনে সে সেখান থেকে উড়ে চলে গেল।

সুতি দেখল মেয়েটার নাকটা অল্প কেটে গেছে। মাদুরের ছোরা থেকে হয়তো।

সুতি সেই বধ্যভূমির মধ্যে বসে পড়ে। বাচ্চাটাকে কোলে রেখে দুলিয়ে দুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। মনে পড়ে অনেক বছর আগে ওরা যখন নন্দকে কুঁড়িয়ে পেয়েছিল, ঠাকুরঝি ঠিক এইভাবে নন্দকে শান্ত করে তুলত। স্মৃতির গভীর থেকে একটা ছড়া ভেসে আসে…

“আয় আয় চাঁদ মামা

টিপ দিয়ে যা।

চাঁদের কপালে চাঁদ

টিপ দিয়ে যা।”

সুতি শুকনো ন্যাকড়া দিয়ে বাচ্চাটার কাঁটা নাকের রক্ত মুছে দেয়, কপালে চুমু খায়, গুনগুন করে ভুলভাল ছড়া বলতে থাকে।

রাংতার কান্না কিন্তু থামে না।

ভোর হতে এখনো ঢের দেরি।

***

ভোরের আগেই সুতির ঘুম ভাঙল। রাতে ঘুম হয়নি। কারা যেন গান গাইছিল, সুতিকে বারবার ডাকছিল। সেই ডাকের মধ্যে ঠাকুরঝি, নন্দ আর মাদুরের গলাও যেন মিশে ছিল।

“আয় সুতি, বাইরে আই। আই আমাদের মাঝে…”

তাই ঘুম ভাঙতেই সুতি বিছানা থেকে নেমে গেল। খুবই দুর্বল লাগছে নিজেকে। দুই পা হাঁটতে প্রায় উলটেই পড়ে যাচ্ছিল, তখনই কে যেন ওর হাতটা শক্ত করে ধরল। সুতি বুঝতে পারল না, মানুষটা কে। তাও ভাঙা গলায় একবার ধন্যবাদ জানাল। ওর মা বলত, “সব সময় বলবে, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।” সুতি কথাগুলো মাথামুণ্ডু বুঝত না, তবে ধন্যবাদ জানানোর থাকলেই বলত, “থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।” আজ যেমন বলল।

আগন্তুক ওর হাত ধরে খুব সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামাচ্ছে। চারিদিকটা কেমন একটা ধোঁয়াশায় ভরা। রাংতা বোধহয় আবার নীচতলার জানালাগুলো বন্ধ করতে ভুলে গেছে। তাই এই কুয়াশা ঢুকেছে। কতবার বকা দিয়েছে মেয়েটাকে, তবু যদি শোনে ওর কথা।

একতলার দরজাটা ঠেলে সুতি আর আগন্তুক বাইরে চলে এল। আকাশের ফিকে ভাবটা প্রায় না বোঝারই মতো। তবু সুতি বুঝতে পারল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যের আলোয় কলকাতা ভিজে যাবে। গাছগুলো গা ঝাড়া দিয়ে সেই রোদ পোহাবে। সুতিও পোহাবে…

বেড়ার ওইপার থেকে বনের সবাই ওকে ডাকছে। পাতাগুলো শিরশির করে গল্প বলছে। সেই গল্পের শেষ নেই, আবার শুরুও নেই। বেড়া পার হয়ে আসতেই আগন্তুক হঠাৎ ওর হাত ছেড়ে দিল। সুতি ভয় পেল না। সামনের সেই সবুজ অমাবস্যা ওকে ডাকছে, ওকে বলছে এগিয়ে আসতে। সুতি সেখানে আবার ঘুমাতে পারবে, স্বপ্ন দেখতে পারবে, গান গাইতে পারবে।

সুতি এগিয়ে গেল। বন বেশ গভীর, কিন্তু ও একবারও হোঁচট খেল না, একটা কাঁটাও ওকে বিদ্ধ করল না, একটা ডালও ওর রাস্তা অবরুদ্ধ করল না। সুতির মনে হল, এই অরণ্যানীকে সে বিনা কারণেই ভয় পেত। এখানে ভয়ের কিছু নেই। এরা কেউ ওর ক্ষতি চায় না।

বনের গাঢ় অমাবস্যাতে আকাশ আর দেখা যাচ্ছে না। গাছেদের পাতাগুলো কোনোরকম বাতাস ছাড়ায় আন্দোলিত হচ্ছে। সুতি ফাঁকা একটা জায়গা পেয়ে ঘুম দেবে বলে শুয়ে পড়ল। আহ! কী নরম এই মাটি! ঠিক যেন মায়ের কোল। মায়ের চেহারাটা মনে করতে চাইল সুতি, কিন্তু পারল না। বরং তিনজন আলাদা আলাদা মানুষের চেহারা তার মনে গভীরে ঘোরাফেরা করতে থাকল।

সুতির ঘুম গাঢ় হতেই তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা শিকড়ের দল সেই নরম মাটি ফুঁড়ে নীচে নেমে যেতে লাগল। গভীরে, আরো গভীরে। সেখানেই অপেক্ষা করছে অমৃতের ভাণ্ডার। ওর বুক থেকে বেড়িয়ে এল অসংখ্য দুধ-সাদা শাখাপ্রশাখা। মুহূর্তের মধ্যেই প্রতিটা শাখায় গজিয়ে উঠল থোকা থোকা বেগুনী পাতা আর নীল রঙের ফুল…

সুতি ঘুমাতে ঘুমাতেই ডাক দিল, “ঠাকুরঝি… নন্দ… মাদুর… তোরা আছিস?”

পুরো অরণ্য রিনরিনে গলায় উত্তর দিল, “আমরা আছি, আমরা আছি। সেই কত বছর ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করছি, সুতি। আমরা আছি…”

“তোরা আমাকে ক্ষমা করে দিস, বুঝলি। আমি তোদেরকে মারতে চাইনি রে। বিশ্বাস কর। আমাকে ক্ষমা করে দিস।”

“তুই ভাবিস না, সুতি। এখানে ক্ষমা করার মতো কিছু নেই। এখানে ক্রোধ নেই, নির্মমতা নেই, অন্ধবিশ্বাস নেই। তুই শুধু আমাদের মাঝে ফিরে আয়। এককালে আমরা কোলাহলের সন্তানেরা এই পৃথিবীর বুকে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলাম। এখন আমরাই সেই বিষ তিলেতিলে পরিশুদ্ধ করছি। এখানে তুই আবার সুখে থাকবি সুতি। আয়, ফিরে আয়… রাংতার জন্য পৃথিবীটাকে আবার সুন্দর করে তোল।”

ভোরের আলোয় এই বেগুনি পাতা-ওয়ালা গাছের পাশ দিয়েই রাংতা এগিয়ে যাবে। গাছটাকে দেখেও দেখবে না সে, চিনতে পারবে না, বুঝবে না সেটা ওর সুতিমা। একটা চড়ুইয়ের পিছুপিছু রাংতা হাঁটতে থাকবে। হারিয়ে যাবে কলকাতার গভীরে।

Tags: তৃণময় দাস, বড় গল্প, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!