সুখের বড়ি

  • লেখক: নিরঞ্জন সিংহ
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

ঘুম ভাঙতেই সুজিতের রোজকার মতো কষ্ট হল। না আজ রাতেও সে কোনো স্বপ্ন দেখেনি। অথচ রোজ রাতে শুতে যাওয়ার সময় ও মনে মনে আশা করে একটা স্বপ্ন দেখার। ছোটোবেলায় যেমন দেখত। প্রজাপতির মতো হালকা বর্ণালী পাখাওলা কোনো মিষ্টি পরীর স্বপ্ন। অথবা ভয়ঙ্কর অন্ধকারের মতো কোনো রাক্ষসের দুঃস্বপ্ন। আগুনে চোখ আর বীভৎস চেহারা নিয়ে যে সুজিতকে তাড়া করে ফিরবে। কিন্তু কোনো স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন ঘুমের বড়ি খাওয়া গভীর ঘুমের মধ্যে ঢুকতে পারে না।

সুজিত বিছানায় উঠে বসল। তারপর ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই একলাফে বিছানা ছেড়ে বাথরুমের দিকে ছুটল। কি সর্বনাশ। সাতটা বেজে গেছে। আর দেরি হলে সে সময় মতো অফিসে পৌঁছুতে পারবে না। বিরাট ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাউসের পারচেজ অফিসার ও। আধ ঘণ্টার মধ্যে ও সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে এগিয়ে গেল ডাইনিং টেবিলের দিকে।

রাজশ্রী ততক্ষণে টেবিলে খাবার সাজিয়ে ফেলেছে। সুজিত রাজশ্রীর দিকে তাকাতেই রাজশ্রী একটু মিস্টি করে হেসে বলল— মনে হচ্ছে আজ মিনিট পাঁচেক দেরি করে ফেলেছ। সুজিত কোনো কথা না বলে ঘাড় নেড়ে সায় দিল। ও রাজশ্রীকে দেখছিল। এরই মধ্যে চানটান সেরে কি সুন্দর সেজেছে ও। রাজশ্রী সুন্দরী। নাক, মুখ, চোখ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা। যখনই রাজশ্রীর মুখের দিকে তাকায় সুজিত তখনই কথাটা মনে মনে অনুভব করে। প্রায় ছ-বছর ওদের বিয়ে হয়েছে কিন্তু এখনো কোনো সন্তান হয়নি। রাজশ্রী চাইলেও সুজিত রাজি হয়নি। রাজশ্রী মনে মনে কষ্ট পায় বোঝে সুজিত, কিন্তু কি একটা বাধা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সুজিতের মনে। না— না, একটি নবজাতককে এই সমাজে নিয়ে আসায় কোনো গৌরব নেই— বরং একটা পাপ। বার বার মনে মনে একটা বোঝাপড়া করার চেষ্টা করেছে সুজিত কিন্তু কোনো সুষ্ঠু সমাধানে আসতে পারেনি। রাজশ্রীকেও এসব কথা খুলে বলতে পারেনি ও। ওর মনে হয়েছে এ ধরনের সেন্টিমেন্টকে হয়তো হেসে উড়িয়ে দেবে রাজশ্রী।

“সকালবেলা কী ভাবতে বসলে? নাও খাওয়া শুরু করে।” হেসে বলল রাজশ্রী।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ।” বলে খাবারের প্লেটটা টেনে নিল সুজিত। খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে কফির কাপে চুমুক দিল ও।

“আজ যেন তোমার কিছু একটা হয়েছে মনে হচ্ছে।” খাওয়া শেষ করে বলল রাজশ্রী।

“না, না কিছু হয়নি।” একটু স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল সুজিত।

“আজ একটু সকাল সকাল ফিরে অফিস থেকে।”

“কেন বলো তো?”

“আছে কিছু, এসো তারপর বলব।” বলে আবার একটু হাসল রাজশ্রী।

“ঠিক আছে।” একটু অন্যমনস্কভাবে জবাব দিল সুজিত।

কফি শেষ করে ওষুধের ছোটো টেবিল থেকে সুখের বড়ির শিশি খুলে ডান হাতের তালুতে উপুড় করতেই দুটো হালকা নীল রঙের ছোটো বড়ি এসে পড়ল তালুতে। সুজিত চমকে উঠল। কি সর্বনাশ! মাত্র দুটো বড়ি। অথচ মাস শেষ হতে এখনো পাঁচ দিন বাকি। পাঁচ দিন পরে আবার একমাসের রেশন পাওয়া যাবে। ভীষণ নার্ভাস ফিল করল ও। অসম্ভব, দুটো বড়িতে পাঁচ দিন চালানো ওর মতো একজন ব্যস্ত এক্সিকিউটিভের পক্ষে একেবারে অসম্ভব ব্যাপার। হাজার রকম লোক নিয়ে ওর কারবার। এক একটা সাপ্লায়ার যেন এক একটা ছাঁচে তৈরি। ওদের নিয়ে প্রায়ই নাস্তানাবুদ হয়ে পড়তে হয় সুজিতকে। মেজাজ ঠিক রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই বাধ্য হয়ে দিনে নির্দিষ্ট একটা বড়ির জায়গায় ওকে বাড়তি বড়ি খেয়ে মেজাজ ঠান্ডা রাখতে হয়। অথচ সরকার কিছুতেই রেশনের কোটা বাড়াবে না। মেজাজ ঠিক রাখতে হলে, সুখের বড়ি অপরিহার্য। বিজ্ঞানের নবতম আবিষ্কার। সরকার চায় সমাজের মানুষ সব শান্তিতে বসবাস করবে। রাগারাগি, মারামারি, হিংসা, ঝগড়া, খুনোখুনি এসব কিছু থাকবে না। শান্তিপূর্ণ সমাজ। সরকারেরও কোনো ঝামেলা থাকবে না ল এন্ড অর্ডার বজায় রাখার জন্য। কিন্তু সুজিত কীভাবে শান্তিতে থাকতে পারে পাঁচ দিনের জন্য দুটো বড়িতে?

রাজশ্রী তাড়া লাগাল, ‘চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ রাজশ্রী একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে সেলস গার্লের চাকরি করে। অফিস যাওয়ার সময় ওরা এক সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরোয়।

রাজশ্রীকে বলতে গিয়েও থেমে গেল সুজিত। একে বলেই বা কি লাভ? তাড়াতাড়ি একটা বড়ি মুখে ফেলে আর একটা বড়ি শিশির মধ্যে ঢুকিয়ে ছিপি আটকে বেরিয়ে পড়ল ও। রাজশ্রী ওকে অনুসরণ করল।

রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অফিসের গাড়ি এসে সুজিতকে তুলে নিয়ে গেল। গাড়ির অন্যান্য সহকর্মীরা সুপ্রভাত জানালে সুজিতকে। সুজিত সুপ্রভাত জানিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইল। কথা বলতে একদম ভালো লাগছিল না। সারাটা দিন কীভাবে আজ কাটাবে তাই ভাবছিল ও। সুজিত মনে মনে নিজেকে উদ্বেগমুক্ত করার চেষ্টা করল। মনে মনে বলল আজ হয়তো খারাপ কিছু ঘটবে না। আর ঘটলেও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করবে ও।

অফিসে ঢুকতেই ডাক পড়ল ডিরেক্টরের ঘরে। মেজাজটা খিঁচড়ে গেল সুজিতের। নিজেকে সামলে নিয়ে একটু হাসিমুখে ডিরেক্টরের চেম্বারে ঢুকল ও।

বোসো। গত সপ্তাহে যে সমস্ত স্টিল টিউবের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল সেগুলোর খুব জরুরি দরকার। ফ্যাক্টরি থেকে এক্ষুনি ফোন করেছিল। দ্যাখো কী করতে পারে।

মনে মনে একটু রাগ হল সুজিতের। এক হপ্তার মধ্যে স্টিল টিউব ডেলিভারি পাওয়া অসম্ভব সে কথা ডিরেক্টর নিজেও খুব ভালো করে জানেন। তবুও মুখে বলল, “ঠিক আছে দেখছি। আর কিছু?”

“না।”

সুজিত ডিরেক্টরের চেম্বার থেকে নিজের চেম্বারে ফিরে আসতেই দেখল টেবিলের উপরে একখানা কার্ড পড়ে রয়েছে। ও যখন ডিরেক্টরের চেম্বারে ছিল নিশ্চয় সেই ফাঁকে বেয়ারা রেখে গেছে কার্ডখানা। কার্ডখানায় চোখ বোলাতেই আবার মাথা গরম হয়ে উঠল সুজিতের। ভগনরাম কোম্পানির সেলসম্যান মি. আগরওয়ালার কার্ড। লোকটাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না সুজিত। যেমন বিশ্রী হোঁতকা চেহারা তেমনি অসভ্যের মতো কথাবার্তা। একবার ভাবল দেখা করবে না। এই সাত সকালে মেজাজ খারাপ করলে চলবে না। কিন্তু তখনি মনে পড়ল ভগনরাম কোম্পানির কাছে যে সমস্ত ভালভের অর্ডার দেওয়া আছে সে সম্বন্ধে প্রোডাকশান ডিপার্টমেন্ট থেকে রিমাইন্ডার এসে গেছে। যত অস্বস্তিকরই হোক লোকটাকে ডেকে কথা বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নিজেকে মনে মনে খানিকটা প্রস্তুত করে নিয়ে কলিং বেল পুশ করল সুজিত। বেয়ারা উঁকি দিতেই মি. আগরওয়ালকে ডেকে দিতে বলল।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আগরওয়াল ঘরে ঢুকল।

“নমস্কার স্যার।”

“নমস্কার। বসুন। মাল ডেলিভারি দিয়েছেন?”

“সেই জন্যেই ছুটতে ছুটতে আসছি স্যার। মাল বম্বে থেকে বুক হয়ে গেছে। এই দেখুন আর আর নম্বর।” বলে একটা ছোট্ট কাগজের স্লিপ এগিয়ে দিল সুজিতের দিকে।

সুজিত নিজেকে আর সামলাতে পারল না। বলল, “আর আর নম্বর দেখবার জন্য ছুটতে ছুটতে আসছেন?”

‘হ্যাঁ স্যার। পাছে আপনি চিন্তা করেন তাই সকালবেলা খবর দিতে এসেছি।”

“কিন্তু অর্ডার নেবার সময় বলেছিলেন মালটা কলকাতার রেডি স্টক থেকে দেবেন।”

“বলেছিলাম, কিন্তু স্যার, ফিজিক্যাল স্টক চেক করতে গিয়ে দেখলাম পুরো মাল রেডি স্টক থেকে দেওয়া যাবে না— সঙ্গে সঙ্গে বম্বেতে টেলেক্স পাঠিয়ে দিই। আমাকে আর দু-চার দিন সময় দিন স্যার— একেবারে ফ্রেশ মাল ডেলিভারি দেব।”

“ঠিক আছে মি. আগরওয়াল, ডেলিভারি দেওয়ার কষ্ট আর আপনাকে করতে হবে না। আজই আমি একটা ক্যানসেলেসান নোট পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

“স্যার আমাকে কয়েকটা দিন সময় দিন স্যার।”

“আমার প্রোডাকসান সাফার করতে পারে না।”

“প্লিজ স্যার।”

“আমি অক্ষম মি. আগরওয়াল। মালের ব্যবস্থা আমি অন্য জায়গা থেকে করে নেব। আপনার আর আর নম্বর দেখিয়ে প্রোডাকসান ডিপার্টমেন্টকে তো আর খুশি করতে পারব না।”

“আপনি অকারণে আমার উপর রাগ করছেন স্যার।”

“কী বললেন?” সুজিত জ্বলে উঠল আগরওয়ালার ন্যাকামিতে। বেরিয়ে যান আমার চেম্বার থেকে। আপনার সঙ্গে ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাইনে।

আগরওয়াল আর কোনো কথা বলতে সাহস করল না। সুড়সুড় করে সুজিতের চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। সুজিত তখনো নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ সামনে ডিরেক্টরকে দেখে ও রীতিমতো চমকে উঠল।

“সোম ব্যাপার কি? তোমার চেম্বার থেকে আগরওয়াল ওভাবে বেরিয়ে গেল কেন? আর তুমিই বা ওভাবে চেঁচাচ্ছিলে কেন? মনে হচ্ছে তুমি অসুস্থ। তোমার মতো এক্সিকিউটিভ কোনো পার্টির সঙ্গে এরকম রূঢ় ব্যবহার করবে তা আমি ভাবতেও পারছি না।”

“স্যার!” সুজিত কী যেন বলতে গেল।

ডিরেক্টর বাধা দিয়ে বললে, “মনে হচ্ছে তোমার শরীর ভালো যাচ্ছে না। রাতে ঘুমের ট্যাবলেট খাচ্ছ?” ডিরেক্টর একটু গম্ভীর মুখে জানতে চাইলেন।

কোনো রকমে ঘাড় নেড়ে সায় দিল সুজিত।

“ড. সাহার কাছে চলে যাও। একবার ভালো করে চেক আপ করিয়ে এসো। এখুনি চলে যাও, আমি ড. সাহাকে ফোনে সব বলে দিচ্ছি। আর ওখান থেকে সোজা বাসায় গিয়ে রেস্ট নেবে।”

ডিরেক্টর ওর চেম্বার থেকে বেরিয়ে যেতে সুজিতের খেয়াল হল ডিরেক্টরকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে পারত ও। কিন্তু তাতেই বা কী লাভ হত? সে যে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি, ভয়ানক রেগে উঠেছে সে কথা সে অস্বীকার করবে কি করে? আর আজকের সমাজে রাগ করার থেকে বড়ো অপরাধ আর কি আছে? ডিরেক্টর ইচ্ছে করলে তাকে সোজা পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারতেন। আর পুলিশ এসে ওকে সোজা মানসিক স্যানেটোরিয়ামে ঢুকিয়ে দিত। সুজিত ভালো করেই জানে যে জীবিত অবস্থায় ওখান থেকে সুস্থ হয়ে বেরিয়ে আসার রাস্তা কারো জানা নেই। ডিরেক্টর, যে সেরকম কিছু করেননি তার জন্য কৃতজ্ঞ বোধ করল ও। আর ভাববার সময় নেই। চেম্বার ছেড়ে বিমর্ষ মুখে বেরিয়ে পড়ল সুজিত।

ড. সাহার চেম্বার লেনিন সরণীতে। চেম্বার বললে ভুল হবে। বলা উচিত চেম্বার-কাম-নার্সিং হোম। নার্সিং হোম অবশ্য বেআইনী। সাময়িকভাবে কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে ড. সাহা তাদের তাড়াতাড়ি সারিয়ে তোলেন। পুলিশ অবশ্য সবই জানে। কিন্তু ড. সাহার বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা তাদের নেই, কারণ ড. সাহার যারা পেশেন্ট তারা সমাজের মধ্যমণি।

রিসেপসান কাউন্টারে যে মহিলাটি বসে ছিল তাকে দেখে সুজিতের মনে হল ওকে মোটেও ওই জায়গায় মানায় না। মোটা, মাঝবয়সি বিষণ্ণ মুখের মহিলাটিকে কেউ যেন ওখানে কাজ করাতে বাধ্য করেছে।

সুজিত কাউন্টারের সামনে এগিয়ে গিয়ে ওর কাৰ্ডখানা মহিলাটির হাতে দিয়ে বলল, “ড. সাহাকে বলুন আমি ‘গ্ৰেয়ার হাউস’ থেকে আসছি। ডিরেক্টর মি. প্রামাণিক আমাকে পাঠিয়েছেন।”

ভদ্রমহিলা কার্ডখানা হাতে নিয়ে সুজিতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সুজিতের মনে হল ওর কথাগুলো একটাও ভদ্রমহিলার কানে ঢোকেনি। সুজিত একটু বিরক্ত হয়ে উঠল। এরকম কিম্ভুতমার্কা মহিলাকে কেন যে রিসেপসান কাউন্টারে চাকরি দেয় কে জানে? সুজিত গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

বেশ কিছুক্ষণ পরে ভদ্রমহিলা কথা বললেন, “সামনে এগিয়ে যান। ড. সাহা সম্ভবত চেম্বারেই আছেন।”

‘ধন্যবাদ! সুজিত ভিতরের দিকে এগিয়ে গেল। ওর বাঁ দিকে একটা খোলা দরজা। উঁকি দিয়ে ও বুঝতে পারল ওটা ডিসপেনসারি। সঙ্গে সঙ্গে সুজিতের মাথার মধ্যে একটা চিন্তা বিদ্যুতের মতো চমকে উঠল। ও থেমে পড়ল। উঁকি দিল ডিসপেনসারির মধ্যে। ডিসপেনসারিতে কোনো লোক নেই— একদম ফাঁকা। তাড়াতাড়ি পিছন ফিরে দেখল ও। রিসেপসনিস্ট ভদ্রমহিলা ওর দিকে পিছন ফিরে বসে আছে। সুজিত দ্রুত ডিসপেনসারির মধ্যে ঢুকে পড়ল। বাঁ দিকের আলমারিতে বিভিন্ন ধরনের বোতলে নানারকম ওষুধ সাজানো। ও দ্রুত চোখে বুলোতে লাগল বোতলের লেবেলগুলোর উপরে। ওই তো সুখের বড়ির শিশি। আনন্দে, উত্তেজনায় সুজিত কেঁপে উঠল। মাঝারি ধরনের মোটা স্বচ্ছ বোতলের মধ্যে হালকা আকাশি-নীল রঙের ছোটো ছোটো বড়ি। এক মুহূর্ত দেরি না করে ও বোতলটার দিকে হাত বাড়াল। আর ঠিক তখুনি পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন ড. সাহা।

‘মি. সোম আপনার জন্য আমি অপেক্ষা করছি। আসুন আমার চেম্বারে।” তারপর একটু থেমে বললেন, “আমাদের ডিসপেনসারিটা আপনার ভালো লেগেছে মনে হচ্ছে।”

সুজিতের সমস্ত দেহ যেন অসাড় হয়ে গেল। অতি কষ্টে হাতটা গুটিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ড. সাহাকে অনুসরণ করে ওঁর চেম্বারে ঢুকে পড়ল।

“বসুন।”

ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে ড. সাহার মুখের দিকে তাকাল সুজিত। কিন্তু কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালের চোখ দুটো দেখে ড. সাহার মনোভাবের কোনো আঁচই পেল না সুজিত।

ড. সাহার টেবিলের উপরে সুখের বাড়ির প্লাস্টিকের একটা বড়ো মডেল রয়েছে। সুজিতের দৃষ্টি সেখানে আটকে গেল।

“বলুন মি. সোম।” ড. সাহা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন সুজিতের দিকে।

“মানে— আমি ঠিক।” কথাটা শেষ করতে পারল না সুজিত। ড. সাহা একটু হাসলেন, “কাজের চাপ খুব বেশি পড়েছে বুঝি?”

“না, তা ঠিক নয়।”

“রাতে ঘুম হচ্ছে?”

“সুখের বড়ি খাচ্ছেন?”

“খাচ্ছি, কিন্তু…”

“কিন্তু কি?” ডাঃ সাহা একটু হেসে প্রশ্ন করলেন।

“আচ্ছা এই সুখের বড়ির র‍্যাশন কি সরকার বাড়াবেন না?” এক নিশ্বাসে কথা শেষ করে যেন খানিকটা হালকা হল সুজিত।

ড. সাহা সুজিতের দিকে এক নজর তাকালেন। তারপর বললেন, “আপনি তো জানেন মি. সোম সুখের বাড়ির প্রোডাকসান বাড়ানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। সবগুলো সরকারি প্ল্যান্ট ফুল ক্যাপাসিটিতে রান করছে। নতুন প্ল্যান্ট না বসানো পর্যন্ত প্রোডাকসান বাড়ানো অসম্ভব— তাই র‍্যাশন বাড়ানোও সম্ভব নয়। কেন, আপনার র‍্যাশন কি পর্যাপ্ত বলে মনে হচ্ছে না?”

“না।”

“সে কি কথা।” ড. সাহা যেন একটু অবাক হলেন। একটা বড়ি একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে ২৪ ঘণ্টা শান্ত রাখবে। মনে হচ্ছে কিছু গণ্ডগোল হচ্ছে আপনার বেলায়। কয়েকটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি। সামনের সপ্তাহে রিপোর্ট করবেন। তাতেও যদি অসুবিধে হয় তাহলে হয়তো এখানে কয়েকদিন থাকতে হতে পারে। বলে একটা কাগজ টেনে খসখস করে প্রেসক্রিপসন লিখে ড. সাহা সুজিতের দিকে এগিয়ে দিলেন। ওটা পকেটে ঢুকিয়ে সুজিত আস্তে আস্তে ড. সাহার চেম্বার থেকে বেরিয়ে পড়ল।

বেলা দশটা বেজে গেছে। অফিসে আর যেতে হবে না। কী করবে এখন? বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। রাজশ্রী অফিসে। একা বাড়িতে কী করবে? কিন্তু সময় তো কাটাতে হবে। কোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয় অফিসে।

সুজিত আপন মনে হাঁটতে লাগল। অক্টোবর মাস শেষ হতে চলেছে। শীতের আমেজ। কর্মব্যস্ত শহর। গাড়ি, ট্যাক্সি, বাস, মানুষ ছুটছে আর ছুটছে! ওই চলন্ত স্রোত থেকে সুজিত আজ বিমুক্ত। নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ বোধ করল সুজিত। ডান দিকের বড়ো পার্কটায় ঢুকে পড়ল ও। ফাঁকা পার্ক— শুধু বাঁ দিকের কোণে একদল ছোটো ছেলেমেয়ে খেলা করছে। সুজিত ওই দিকে এগিয়ে গেল। একটা বেঞ্চে বসে ওদের খেলা দেখতে লাগল। ওরা কানামাছি খেলছিল। ওদের হৈ হল্লা চিৎকার কিছুক্ষণের মধ্যে সুজিতের মানসিক বোঝা হালকা করে দিল। সুজিতের মনে হল একদল রঙিন প্রজাপতি মনের খুশিতে হুটোপুটি করছে। কখন একসময় সুজিত ওদের খেলার সাথী হয়ে গেছে বুঝতেও পারেনি। কতক্ষণ সময় কেটেছে তাও খেয়াল ছিল না ওর। একসময় খেলা ভাঙল। সুজিতের দিকে তাকিয়ে হেসে একে একে চলে গেল ওরা পার্ক ছেড়ে। ওরা চলে যেতেই আবার সুজিত নতুন করে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস ওর অজান্তেই বেরিয়ে এলো বুক চিরে। এই সব ফুলের মতো কোমল ছেলেমেয়েগুলো বারো বছর বয়স থেকে সুখের বড়ির দাস হয়ে পড়বে। সুজিতের মনে হল এ এক ভয়াবহ সামাজিক নিষ্ঠুরতা। সরকার ভুল পথে চলছে। এভাবে শান্তিপূর্ণ সমাজ তৈরি করা যায় না। এ শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। কোথায় শান্তি? আপাত দৃষ্টিতে সমাজে অবশ্য কোনো গোলমাল নেই, নেই কোনো হিংসাত্মক ঘটনা। যেন মুখোশ পরে ঘুরছে সবাই। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সবাই কি সত্যিই সুখী? নাকি আগ্নেয়গিরির গভীর অভ্যন্তরে জমা হচ্ছে এক বিস্ফোরক গ্যাসের। যা একদিন অকস্মাৎ ঘটাবে ভয়ঙ্কর অগ্ন্যুৎপাত। সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে এই মুখোশ পরা সমাজকে জানে?

ক্লান্ত অবসন্ন মনে আস্তে আস্তে পার্ক ছেড়ে বেরুল সুজিত। প্রায় বারোটা বাজে। মনে হল খিদে পেয়েছে। সামনে একটা রেস্টুরেন্ট দেখে ঢুকে পড়ল। এখনো অফিসের লাঞ্চের সময় হয়নি, তাই রেস্টুরেন্ট একদম ফাঁকা। আর ঘণ্টা খানেক পরে গিসগিস করবে এখানে লোক। কোণের দিকের একটা সিটে বসে মেনুর জন্য টেবিলের পাশের বোতাম টিপল সুজিত। টেবিলের এক কোণ থেকে বেরিয়ে এলো মেনুকার্ড। খাবার পছন্দ করে ম্যাগনেটিক পেন্সিল তুলে নিয়ে মেনুতে দাগ দিয়ে ওটা আবার টেবিলের ফোকরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল সুজিত। অন্যমনস্কভাবে এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে পাশের চেয়ারে নজর পড়তে ওর হৃৎপিণ্ড যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চেয়ারের উপর একটা ভর্তি সুখের বড়ির শিশি পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল সুজিত। না কোনো খদ্দের নেই কোথাও। নিশ্চয় কেউ ফেলে গেছে। হাত বাড়িয়ে শিশিটা তুলে নিল ও। আনন্দে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করছিল ওর। দুই হাতের মধ্যে শিশিটা চেপে ধরে ও চোখে মুখে বুলোতে লাগল। এখন সে মনে অনেক জোর পাচ্ছে। ড. সাহার প্রেসক্রিপসন থেকে অনেক বেশি ও নির্ভর করতে পারে এই শিশিটার উপর। এতগুলো বাড়তি বড়ি হাতে থাকলে পৃথিবীর সব কিছুর সঙ্গে ও মোকাবেলা করতে পারে। চেয়ারের গায়ে শরীরটা এলিয়ে দিল ও। মনে পড়ল রাজশ্রীর মুখ। কি একটা অস্বস্তি যেন ওর সমস্ত জীবনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে চলেছে। সুজিত বেশ বুঝতে পারল প্রতি মাসে যদিও এক শিশি করে বাড়তি সুখের বড়ি পেত তাহলে হয়তো ও সত্যি সুখী হত। রাজশ্রী আজ ওকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছে। কিন্তু কেন? রাজশ্রী তো ওরকম বলে না। আর তখনই হঠাৎ মনে হল সুজিতের বছরে একবার রাজশ্রী ওকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলে। সামনের দেওয়ালের ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকাল সুজিত। তাইতো— আজ সকাল সকাল বাড়ি ফেরার কোনো বাধাই নেই। রাজশ্রীকেও অবাক করে দেবে আজ। ভালো ভালো ফলের অর্ডার দিতে হবে। রাজশ্রীর জন্য একটা ভালো প্রেজেন্টেশান কিনে নিয়ে যেতে হবে। নিজের চিন্তার মধ্যে তন্ময় হয়ে ছিল সুজিত। সামনের চেয়ারে আর একজন ভদ্রলোক এসে যে কখন বসেছেন তা খেয়ালই করেনি ও। খেয়াল হল ভদ্রলোকের কথায়।

“আমার সুখের বড়ির শিশিটা ফেরত দেবেন কি?” সুজিত চমকে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকাল। ভদ্রলোক কী বলছেন তা যেন বুঝতে চেষ্টা করল।

“আপনার হাতের শিশিটা আমার। দেখুন ওর গায়ে আমার নাম লেখা আছে। আমার নাম সৌমিত্র মিত্র।”

নিজের অজানতেই শিশিটা নামিয়ে টেবিলের উপরে রাখল সুজিত। ভদ্রলোক শিশিটা তুলে নিয়ে সুজিতকে দেখালেন— এই দেখুন আমার নাম লেখা রয়েছে।

সুজিত অন্যমনস্কর মতো তাকাল। দেখলে সত্যিই শিশির গায়ে ছোট্ট লেবেল লেখা রয়েছে সৌমিত্র মিত্র। সৌমিত্রবাবু শিশিটা পকেটে ঢুকিয়ে সুজিতের মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। সুজিতের মুখ রক্তশূন্য-ফ্যাকাশে। একটু সহানুভূতির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্যাপার কি? আপনি কি অসুস্থ?”

“না-না। আমি ঠিক আছি। কোনোরকমে জবাব দিল সুজিত। তবু অনেক চেষ্টা করেও নিজের মানসিক অবস্থাকে আয়ত্বে আনতে পারল না ও। এতগুলো সুখের বড়ি পেয়েও হারাতে হল। এত দুঃখের মধ্যেও কিন্তু একটু অবাক না হয়ে পারল না। মাসের শেষে পুরো এক শিশি বড়ি কী করে ভদ্রলোক মজুত রাখলেন? তার মানে উনি সুখের বড়ি খান না। সুজিত ভাবল সে কি ভদ্রলোককে অনুরোধ করবে বড়িগুলো ওকে বিক্রি করার জন্য? যে দামই চান সুজিত দেবে। এক শিশি বাড়তি বড়ির জন্য টাকার পরোয়া ও করে না। কিন্তু তখনি মনে পড়ল কাজটা বেআইনি। সৌমিত্রবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে সুজিতের কেমন যেন মনে হল বড়ি বিক্রি করার কথা বলে কোনো লাভ হবে না। ইতিমধ্যে খাবার এসে গিয়েছিল।

‘নিন আরম্ভ করুন।” বললেন সৌমিত্রবাবু।

“আপনি।”

“আমি এইমাত্র শেষ করেছি। তবে এক কাপ কফি চলতে পারে।” সোমিত্রবাবু নিজেই মেনুকার্ডের বোতামে চাপ দিলেন।

সুজিত মুখ নীচু করে খাবারের ডিশ টেনে নিল। কিন্তু ওর একদম খেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সৌমিত্রবাবুর সামনে নিজের অবস্থা প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়ে আস্তে আস্তে খেতে সুরু করল।

“সুখের বড়ির র‍্যাশন একদম বন্ধ করে দেওয়া উচিত।” ভদ্রলোক কফির অর্ডার দিয়ে বললেন।

সুজিত খেতে খেতে চমকে উঠল। ভদ্রলোক বলে কি? মেন্টাল স্যানেটেরিয়ামে যে তাহলে আর জায়গা থাকবে না। সুজিত কোনো জবাব দিচ্ছে না দেখে সৌমিত্রবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি বলেন?”

“সর্বনাশ হয়ে যাবে।” ভয়ে ভয়ে জবাব দিল সুজিত।

“কিছু সর্বনাশ হবে না। সর্বনাশ বরং হচ্ছে এখন এই সুখের বড়ি খাইয়ে। মানুষকে নকল সুখী করার চেষ্টা করে। আপনিই বলুন সুখ জিনিসটা কি এতই সহজ যে বড়ি খেলেই সে ধরা দেবে?”

সুজিত কিছুই বলল না। কেননা ভদ্রলোক আসলে ঠিক কি বলতে চাইছিলেন তাই বুঝতে পারছিল না।

“আপনি কি সুখী?” আচমকা ভদ্রলোক প্রশ্ন করতেই সুজিত খুব ঘাবড়ে গেল। কোনো জবাব না দিয়ে ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ফ্যাল ফ্যাল করে।

“আমার বিশ্বাস আপনি সুখী নন। আপনাকে যদি হাজার হাজার সুখের বড়ি দেওয়া হয় তাহলেও আপনি সুখী হতে পারবেন না। আসলে বড়ি খেয়ে আমরা মানুষের ধর্ম থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। আমাদের আবেগ আর অনুভুতিকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আমরা ক্রমশ অমানুষ হয়ে যাচ্ছি।”

সুজিত খাওয়া বন্ধ করে ভদ্রলোকের কথা শুনছিল। ভদ্রলোক সরকার-বিরোধী কথা বলছেন। হয়তো এখুনি পুলিশ ওঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে। কিন্তু কথাগুলো তো সত্যি।

“কিন্তু…”

“কোনো কিন্তু নেই মি. …”

“আমার নাম সুজিত সোম।”

“মি. সোম, সত্যি কথা বলুন তো আপনি কি সত্যি সুখী? আমি জানি আপনি জবাব দিতে পারবেন না। শুধু আপনি কেন দেশের নব্বই শতাংশ লোকই জবাব দিতে পারবেন না।”

সুজিত একটু ইতস্তত করে বলল, “আচ্ছা সৌমিত্রবাবু আপনাকে একটা প্রশ্ন করব?”

সৌমিত্রবাবু একটু হেসে বললেন, “জানি আপনি কি জানতে চাইছেন। উত্তরে বলব হ্যাঁ আমি সুখী। আর তার প্রমাণ এই ভর্তি শিশি। আমাকে সুখের বড়ি খেতে হয় না। আপনি যদি আমার সঙ্গে আজ সন্ধ্যাবেলা এক জায়গায় আসেন তাহলে আপনাকে দেখাতে পারি আমার সুখের উৎস।” বলে ভদ্রলোক একটু রহস্যময় হাসি হাসলেন।

সুজিত একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সৌমিত্রবাবুর কথায়। তবু ওর খুব কৌতূহল হল। যে লোকটা একটা সুখের বড়ি না খেয়ে মাস কাটিয়ে দিতে পারে তার কথা ঠিক অবিশ্বাস করার মতো সাহস সুজিতের ছিল না।

“কি আসবেন নাকি? তাহলে সন্ধ্যা সাতটার সময় মেট্রোর সামনে এসে দাঁড়াবেন।”

“ঠিক আছে।” সুজিত বলল।

“তাহলে চলি এখন। ধন্যবাদ।”

“ধন্যবাদ।”

ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পরও সুজিত অনেকক্ষণ বসে রইল চুপচাপ। ওর সমস্ত চিন্তাভাবনাগুলোকে কেমন ওলোট পালোট করে দিয়ে গেলেন ভদ্রলোক। একসময় রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ল ও।

রাস্তার মোড়ের টেলিফোন বুথ থেকে একটা ফুলের দোকানে অর্ডার দিল ওর বাড়িতে ৬টার সময় ফুল পাঠিয়ে দিতে। তারপর নিউ মার্কেটে ঢুকল রাজশ্রীর জন্য একটা উপহার কিনতে। সময় কাটাবার জন্য ও সারা নিউ মার্কেটটা প্রায় পাঁচ-ছ’বার পাক দিল। তারপর একটা দোকানে ঢুকে একটা সুন্দর পাথর বসানো হেয়ার ক্লিপ কিনল।

সময় যেন আর কাটতে চায় না। বাধ্য হয়ে সামনের একটা সিনেমা হলে ঢুকে পড়ল সুজিত ম্যাটিনি শো-এর টিকিট কেটে। সাধারণ প্রেমের গল্প। একটুও ভালো লাগল না। হল থেকে বেরিয়ে পাশের রেস্টুরেন্টে ঢুকে এক কাপ কফি খেয়ে রাজশ্রীকে ফোন করল। রাজশ্রী ফোন ধরতেই সুজিত বলল, “ফুলগুলো ডেলিভারি দিয়েছে?” রাজশ্রী হেসে বলল, “তাহলে ধরে ফেলেছ? হ্যাঁ এইমাত্র ডেলিভারি দিয়ে গেল। কিন্তু তুমি এত দেরি করছ কেন? শিগগিরি চলে এসো লক্ষ্মীটি। একা একা একটু ভালো লাগছে না আজকের দিনে।”

‘শোনো আমি একটা বিশেষ কাজে আটকে গেছি। তবে যেভাবেই হোক ন-টার মধ্যে পৌঁছে যাবো। প্লিজ কিছু মনে করো না।” রাজশ্রী গম্ভীর হয়ে জবাব দিল, “ঠিক আছে।” সুজিতের কষ্ট হল রাজশ্রীকে এভাবে হতাশ করবার জন্য। কিন্তু আর একটা অজানা রহস্য ওকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে। এ রহস্য না জানা পর্যন্ত ও শান্তি পাবে না। ফোন ছেড়ে সুজিত মেট্রোর সামনে এসে দাঁড়াল। হাত ঘড়িটা দেখল। সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। সামনে তাকাতেই ও সৌমিত্রবাবুকে এগিয়ে আসতে দেখল।

“এসে গেছেন। চলুন।”

সুজিত কোনো কথা না বলে সৌমিত্রবাবুকে অনুসরণ করল। দু-জনে লেনিন সরণী ধরে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর গিয়ে বাঁ দিকের একটা সরু রাস্তার একটা বাড়িতে ঢুকে পড়ল ওরা। নীচে দোকান। উপরে রেসিডেন্সিয়াল ফ্ল্যাট। একটা ফ্ল্যাটের সামনে এসে সৌমিত্রবাবু কলিং বেলে চাপ দিলেন। ভিতরে একটা মিষ্টি ডিং ডং শব্দ হল। একটু পরে দরজা খুলে দিল এক যুবতী। ফর্সা রং। মুখখানা গোল। সাধারণ চোখমুখ। পরনে একখানা সাধারণ সিন্থেটিক শাড়ি। কোথাও কোনো প্রসাধনের চিছু নেই। বয়স খুব বেশি হলে পঁচিশ বছর। চোখমুখের মধ্যে একটা শান্ত প্রসন্ন ভাব রয়েছে। সৌমিত্রবাবুকে দেখে ওর দু-চোখে খুশির ঝিলিক খেলে গেল।

“আরে তুমি— এসো এসো।”

“গায়ত্রী, আমার নতুন বন্ধু মি. সুজিত সোম। তোমার কাছে ধরে নিয়ে এলাম।”

“নমস্কার।” সুজিত হাতজোড় করে নমস্কার জানাল।

“নমস্কার। আসুন, আসুন ভিতরে আসুন।” গায়ত্রী সুজিতকে আহ্বান জানাল। ওদের নিয়ে এসে বসার ঘরে বসাল গায়ত্রী। সেন্ট্রাল টেবিলের উপর একটা বেহালা পড়েছিল।

“আমরা তাহলে ঠিক সময়ে এসে পড়েছি কি বলো?” বলে সৌমিত্রবাবু গায়ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

‘সুজিতবাবু এসেছেন যখন তখন আজ গল্পগুজব হোক।” নিজের জায়গায় বসতে বসতে বলল গায়ত্রী।

সুজিত বেহালাটা লক্ষ করছিল। আজকের দিনে কেউ ওই পুরোনো ইনস্ট্রুমেন্ট বাজায় তা ওর ধারণা ছিল না। সৌমিত্রবাবু বললেন, “না না গল্পগুজব আর একদিন হবে গায়ত্রী, আজ তোমার বাজনা শোনাবার জন্য সুজিতবাবুকে নিয়ে এসেছি।”

“তাই বুঝি!” বলে সুজিতের সুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল গায়ত্রী। হাসলে ওকে ভালো দেখায়, মনে মনে ভাবল সুজিত। তারপর বলল, “হ্যাঁ, আজ বাজনাই শোনান।”

“বেশ।” বলে গায়ত্রী বাঁ হাতে বেহালাটা তুলে নিল, তারপর ডান হাতে ছড়টা টেনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী শুনবেন বলুন?” সুজিতের সুর সম্বন্ধে বিশেষ কোনো ধারণাই নেই। কি বলবে বুঝতে না পেরে সৌমিত্রবাবুর মুখের দিকে তাকাল।

সৌমিত্রবাবু বললেন, “তোমার যা খুশি।”

গায়ত্রী বাজনা শুরু করল। সুজিত কিন্তু একটু হতাশই হল। বেহালা বাজনা শুনে সে কি সুখ হবে তা ও বুঝতে পারল না। কোনো শিল্পীর সামনে বসে এভাবে সে কোনোদিন বাজনা অবশ্য শোনেনি। ওর জীবনে সেরকম সুযোগ কোনোদিন আসেনি। কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যে সুজিত লক্ষ করল ঘরের আবহাওয়া যেন হঠাৎ কেমন বদলে গেছে। সৌমিত্রবাবু চোখ বুজে একমনে গায়ত্রীর বাজনা শুনছেন। গায়ত্রীও তন্ময় হয়ে গেছে বেহালার তার ও ছড়ের মধ্যে। একটা মিষ্টি অথচ করুণ সুরের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। কি এক অব্যক্ত ব্যথা যেন গুমরে গুমরে মুক্তির পথ খুঁজছে। আস্তে আস্তে সুজিতের চোখের সামনে থেকে সব কিছু মুছে যেতে লাগল। সে যেন আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। এমনকি সামনে বসে থাকা গায়ত্রীকেও না। কে যেন জাদুমন্ত্র বুলিয়ে দিয়েছে চোখে। কি আশ্চর্য! সেও চোখ বন্ধ করে সেই করুণ ধ্বনি মাধুৰ্য্য উপভোগ করছে। একটা যন্ত্রণা— একটা কষ্ট হচ্ছে যেন বুকের মধ্যে। অথচ কি আশ্চর্য অনুভূতি এ যন্ত্রণার। সুজিত জীবনে এমন আনন্দদায়ক যন্ত্রণা তো কখনো অনুভব করেনি। ওর মনে হচ্ছে ওর বুকের উপরে চাপানো ভারী পাথরটা গলে গলে জল হয়ে যাচ্ছে। দু-চোখ বেয়ে অশ্রুর ধারা। কতক্ষণ পরে গায়ত্রী বাজনা থামালো। অনেকক্ষণ ঘোর কাটল না সুজিতের। যেমন বসে ছিল তেমনি বসে রইল। চোখের জলে শার্ট ভিজে গেছে বলে ও একটুও লজ্জা পেল না।

“তোমার হাত দিন দিন মিষ্টি হয়ে উঠছে গায়ত্রী।” বললেন সৌমিত্রবাবু। “আজ তাহলে উঠি।”

“হ্যাঁ আজ উঠি।” এতক্ষণে কথা বলল সুজিত, “জীবনে এত আনন্দ, এত সুখ কখনো পাইনি গায়ত্ৰী।” সুজিত অন্তর নিংড়ে বলল কথাগুলো।

“আবার আসবেন। যখনই ইচ্ছে হবে চলে আসবেন।”

“আসব, নিশ্চয় আসব।” সৌমিত্রবাবু উঠে পড়লেন। সুজিতও উঠল।

যখন ও বাসায় পৌঁছুল তখন সাড়ে ন-টা বেজে গেছে। টাটকা ফুলের গন্ধে সারা বাড়ি ভরে রয়েছে। রাজশ্রী বলল, “এত দেরি করলে?”

সুজিত তখনও যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। ও আস্তে আস্তে জবাব দিল, “একটু দেরি হয়ে গেল সোনা।”

রাজশ্রী একটু অবাক হয়ে সুজিতের মুখের দিকে তাকাল। বিয়ের পর প্রথম প্রথম সুজিত ওকে ডাকত ওই নাম ধরে। কতদিন সুজিতের মুখে ওই ডাক শোনেনি ও। সুজিত পকেট থেকে হেয়ার ক্লিপটা বের করে রাজশ্রীর হাতে দিয়ে বলল, “দেখ পছন্দ হয় কিনা।”

“বাঃ ভারী সুন্দর হয়েছে।” ক্লিপটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল রাজশ্রী, “কতদিন থেকে এইরকম একটা ক্লিপ কিনব কিনব মনে করছিলাম। দাও না গো পরিয়ে।” বলে রাজশ্রী সুজিতের সামনে এসে পিছন ফিরে দাঁড়াল।

সুজিত হেয়ার ক্লিপটা রাজশ্রীর চুলে পরিয়ে দিল। তারপর রাজশ্রীকে নিজের দিকে ফিরিয়ে ওর মুখখানা একবার দুই হাতের মধ্যে ধরে আবার ছেড়ে দিল। তারপর এক ঝটকায় রাজশ্রীকে বুকের মধ্যে টেনে নিল। সুজিতের মনে হল আজ রাতে ওর ঘুমের বড়ি লাগবে না। কাল সকালে সুখের বড়ির জন্যও আর ওর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। রাজশ্রী দুটো হাত দিয়ে সুজিতকে পরম মমতায় আঁকড়ে ধরল। সুজিতের দৃঢ় বিশ্বাস হল যে আজ রাতে ও একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখবে।

লেখক: “এ গল্পের স্থান, কাল, পাত্র-পাত্রী সবই ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত। বর্তমানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।”

Tags: নিরঞ্জন সিংহ, বড় গল্প, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!