আত্মঘাতী নক্ষত্র

  • লেখক: রণেন ঘোষ
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

মহাকাশযানের পেছনের জেটগুলো বন্ধ করে দিল আগরওয়ালা। পেছনের জেটগুলো এতক্ষণ অদৃশ্য আগনের হলকা ছুড়ে মারছিল মহাশূন্যে। তারই জোরে প্রচণ্ড গতিতে সামনের দিকে ছুটে চলেছিল আগরওয়ালের মহাকাশযান। জেটগুলো বন্ধ করে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামনের দিকে প্রচণ্ড এক ধাক্কা অনুভব করল সে। কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। গতি মন্থর হয়ে এল মহাকাশ যানের। গন্তব্যস্থলের কাছে যানটি এসে পড়েছে। যাত্রার শুরু থেকে প্রচণ্ড গতির চাপের মধ্যে ক-দিন কেটেছে। তাই এই অবস্থায় কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করল আগরওয়ালা। সে প্লুটোর পেছন দিকে এসে পড়ছে। প্লুটোর আওতার মধ্যে এলেও গন্তব্যস্থল এখনও বেশ অনেক দূর।

একটা বোতাম টিপতেই চোখের সামনে এক গোলাকার জানালা ফুটে উঠল। অভঙ্গুর স্বচ্ছ কোনো পদার্থে ঢাকা জানালা। এই ধরনের একক মহাকাশযানে এই একটিমাত্র জানালাই ভিতর থেকে বাইরের দৃশ্যাবলী দেখার একমাত্র উপায়। বাঁদিকে ক্রমেই প্রকাণ্ড হয়ে উঠছে প্লুটো। যেন এক বিশাল গোলাকার পদার্থ ভাসছে মহাকাশের বুকে। এখনও তিন লক্ষ মাইলের ব্যবধান। নির্জন নিঃসঙ্গ প্রাণহীন এক গ্রহ। সৌরজগতের দশম গ্রহ। যদিও দশম তবুও অন্যান্য ন-টা গ্রহের মতোই একই নিয়মে মেনে চলেছে সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ। অর্থাৎ নিজস্ব গতি এবং কক্ষপথ নিয়ে সূর্যকে অবিরাম প্রদক্ষিণ করে চলেছে। পৃথিবীর তুলনায় এক তৃতীয়াংশ এই গ্রহ সৌরজগতের বাহিরের একপ্রান্তে পড়ে আছে। বস্তুগুলো সব ঘন সন্নিবদ্ধ হবার ফলেই মাধ্যাকর্ষণে পৃথিবীর সমান এই গ্রহ।

প্রাণহীন ধূ ধূ মরুভূমির বুকের ঠিক মাঝখানেই রয়েছে এক বায়ুনিরোধক বিশাল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা অবজারভেটরি। গ্রহের সংখ্যা অনুযায়ী এই কেন্দ্র ১০ নং পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বলেই পরিচিত সৌরজগতের সবচেয়ে দূরের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। বর্তমানে প্রতি গ্রহে তৈরি হয়েছে এই রকম বিশাল এক একটা অবজারভেটরি। প্লুটোয় এই কেন্দ্র তৈরি শেষ হয় ২০৫০ খ্রিস্টাব্দে। তখন থেকে সমস্ত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণের ভার দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক সংস্থার উপর।

ক্রমেই বড়ো হয়ে উঠেছে গ্রহ। জানলাটা ক্রমশই প্লুটোয় ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। সারা আকাশ চলে গেল প্লুটোর পেছনে। যতই নিঃসঙ্গ নির্জন গ্রহটাকে দেখছে ততই তার মন ভরে উঠছে বিরক্তিতে।

‘পুরো বারোটা মাস কাটাতে হবে এখানে। ভাবাই যায় না ছোটো এক মরুভূমির মধ্যে এতদিন থাকতে হবে। কাজের মধ্যে শুধু লক্ষ রাখতে হবে সৌরজগতের বাইরের মহাকাশ আর সেই সঙ্গে মহাকাশের বুকে যাতায়াতকারী মহাকাশযান গুলির ওপর। প্রয়োজন হলে ঠিক করে দিতে হবে ওদের গতিপথ।’ মহাকাশের লাইটহাউস!

‘কেন যে মরতে পেশ অবজারভার-সার্ভিসে যোগ দিয়ে ছিলাম—’ মনে মনে ভাবে আগরওয়াল, আর সেই থেকেই শুরু হয়েছে ওর নির্জন বাস। কোনো না কোনো গ্রহের একটি স্থানে বেশ কিছুদিন নির্জন জীবন কাটাতে হয়। পেছনের একটা জেট চালু করে দিল আবার। অল্প গতিতে এগিয়ে চলল আগরওয়াল প্লুটোর দিকে। চেয়ারে নিজেকে বেঁধে ফেলল ভালো করে। আর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে প্লুটোর জমি পর্শ করবে সে।

সুন্দরভাবে ল্যান্ড করল মহাকাশযান। দৈত্যাকৃতি অবজারভেটরির দূরত্ব এখন এক মাইল মাত্র।

তাড়াতাড়ি স্পেশস্যুট পরে এয়ারলক খুলে প্লুটোর মাটিতে পা দিল আগরওয়াল। ছোটো বড়ো নানান আকারের পাথর আর নুড়ি ছড়ানো চতুর্দিকে। খুব সন্তর্পণে পাথরের উপর পা রেখে রেখে লাফিয়ে লাফিয়ে অবজারভেটরির দিকে এগিয়ে চলল সে। একটু এদিক ওদিক পা পড়লেই রক্ষা নেই! স্পেশস্যুট ছেঁড়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত। তার অর্থ সমস্ত অক্সিজেন মিলিয়ে যাবে আবহাওয়াহীন মহাশূন্যে। মৃত্যু তখন অনিবার্য। সে বিষয়ে আগরওয়াল দারুণ সতর্ক।

প্লুটোর আকাশে সূর্য। সূর্য তো নয় যেন চাঁদ। বিশাল দূরত্বে সূর্যের তেজ মাঝপথে হারিয়ে গেছে। তাই তারই ক্ষীণ আলো প্লুটোর সর্বাঙ্গ আচ্ছাদিত করে রেখেছে যেমন চাঁদ রাখে পৃথিবীকে। চতুর্দিকে আলো আঁধারির মায়াবী খেলা।

চারপাশে ন্যাড়া রুক্ষ আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। দৈত্য পুরীর পাহারাদারের মতো নিঃশব্দে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগান্ত ধরে। সূর্যের স্তিমিত আলোয় দূরের পাহাড় চূড়োগুলো আবছা হয়ে মিলিয়ে গেছে দৃষ্টিপথের সামনে থেকে। মাথার উপর নীলাকাশের চাঁদোয়া মহাশূন্যে উধাও। দূর থেকে ধুলোবালিহীন আবহাওয়া শূন্য তারা খচিত নীল আকাশকে দেখে মনে হচ্ছে উৎসবের রাতে মণি-মুক্তা খচিত এক বিরাট চাঁদোয়া।

এইরকম প্রাণহীন নির্মম নীরবতার মধ্যে পুরো বারোটা মাস কাটাতে হবে। মনের জোর ছাড়া এভাবে থাকা একরূপ অসম্ভব। নিজের মনকে তেজী করার চেষ্টা করল আগরওয়াল। এ এক অদ্ভুত অবস্থা। নিঃসঙ্গ, শব্দহীন ক্ষুদে গ্রহ আর তারই সামনে বিশাল বিস্তৃত মহাকাশ। ছোটো বড়ো নানান আকারে তারাফুলে ভরা। কেউ বা স্থির, অচঞ্চল কেউ বা মিটমিট করছে। যেন হাতছানি দিয়ে সকলকে ডাকছে।

সামনেই অবজারভেটরির এয়ারলক। ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চারপাশ দেখল। বিরাট উঁচু প্রাচীরে ঘেরা। গ্ল্যজাইট-এ তৈরি, বেরিলিয়ামের এক কৃত্রিম আইসোটপিক ধাতু। ঠিক মাঝখানে গোলাকার এই স্বচ্ছ ডোম। ভঙ্গর কাচের তৈরি। এর মাধ্যমেই সমস্ত মহাকাশের ওপর লক্ষ রাখতে হয়।

মনে মনে হাসল আগরওয়াল। অবজারভেটরি না নির্বাসন-কেন্দ্র। সঙ্গে সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর কুখ্যাত সেলুলার জেলের কথা মনে এসে গেল। ইতিহাস একটু আধটু তার পড়া ছিল। দরজার সামনের একটা বোতাম টিপে দিল আগরওয়াল। ভেতরের লক খুলতে মিনিট খানেক লাগবে। কম্পুটারের মধ্যে দিয়ে সংকেত খুলে দেবে ভেতরের সুরক্ষিত লকটা। খুলে গেল প্রথম দরজা। পর পর তিনটে দরজা পার হতে হবে।

শেষ ঘরে ঢুকে স্পেশস্যুটটা খুলে ফেলল আগরওয়াল। এর পরেই অবজারভেটরির প্রধান অংশ। স্পেশস্যুট খোলার পর বেশ কিছুক্ষণ এই ঘরে কাটাতে হয় স্বাভাবিক বায়ুর চাপ এবং ৭০ ডিগ্রি F-এ শরীরকে অভ্যস্ত করিয়ে নিতে, এটাই নিয়ম।

অবশেষে শেষ লকটা খুলে ভেতরে ঢুকল সে। সামনেই একজন বসে আছে। ওকেই ছুটি দিতে এসেছে আগরওয়াল।

* * *

কোনোদিনই স্বামীনাথনকে পছন্দ করত না আগরওয়াল। বুদ্ধির অগোচরে কেমন যেন এক বিতৃষ্ণা । বারো মাস পরেও সেই একই অনুভূতি। এক মাস নির্জন বাসে কোনো পরিবর্তন হয়নি স্বামীনাথনের। সেই একই রকম অনুত্তেজিত ভাবলেশহীন মুখ, সন্দেহজনক চাহনি, সরু ছুঁচোল চিবুকে কেমন যেন বিষাক্ত স্বভাবের আভাষ!

বেশ কয়েক মিনিট নিঃশব্দে ওর দিকে তাকিয়ে রইল স্বামীনাথন। তারপর অভদ্রভাবে হঠাৎ চীৎকার করে উঠল—“কী… কী করতে এসেছ এখানে?”

বিস্ময়ে হতবাক আগরওয়াল তাকাল ওর দিকে। —“কী করতে এসেছি? আশ্চর্য! আরে তোমার যে সময় হয়ে গেছে স্বামীনাথন। তোমাকে ছুটি দিতে এসেছি আমি। আমার তো মনে হয় তোমার খুশি হওয়া উচিত আমাকে দেখে।”

“খুশি? খুশি হব কেন শুনি? এখনও পুরো এক সপ্তাহ সময় আছে আমার। সময় ফুরোবার আগেই কেন এলে? এতে কাজের ক্ষতি হয়— সে খবর একবারও রাখো? কাজ নেই, কর্ম নেই, এক সপ্তা আগেই চলে এলে! যাও! আমাকে বিরক্ত না করে পুরো এক সপ্তাহ স্পেসশিপে কাটাওগে যাও। অন্যের কাজে নাক গলানো একবারে সহ্য হয় না আমার।”

স্বামীনাথনের গলায় তীব্র বিরক্তির আভাষ।

আগরওয়াল কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

“কি হল, দাঁড়িয়ে রইলে কেন?” তাড়া লাগাল স্বামীনাথন, “তোমার যানকে নাবতে দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম ভবঘুরে বিদেশি হবে। সাহায্যের আশায় নেমেছে। আার সেই জন্যই আমি লক খুলতে বাধা দিইনি। তা নইলে অবজারভেটরির বাইরেই কাটাতে হত সাতটা দিন।”

“আমি স্বীকার করছি স্বামীনাথন, যে এক সপ্তাহ আগেই আমি এসে পড়েছি। নতুন জ্বালানি Xo৭ এর জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। পুরো সাত দিন কম সময়ে পৃথিবী থেকে এখানে রকেট চলে এসেছে।” বলতে বলতে আগরওয়াল কয়েক পা এগিয়ে গেল। তারপর বলল, “তুমি এত রেগে উঠছ কেন স্বামীনাথন? তোমারই তো ভালো হল। সাত দিন আগে ছুটি পেয়ে গেলে। আমাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়েই তুমি রকেটে উঠে যাবে। আর তা না করে…”

“আমার ভালো মন্দ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করছ দেখছি,” বিদ্রুপ ঝরে পড়ল স্বামীনাথনের কণ্ঠে, “পরের ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে নিজের চরকায় তেল দাও গে। ঠিক সময়ে যাব আমি। তার আগে এক পা-ও নড়ছি না। বুঝলে আগরওয়াল? যাও! এক সপ্তা কাটাওগে রকেটের মধ্যে।”

“ব্যাপার কি স্বামীনাথন? কিছুই বুঝতে পারছি না। সাত দিন আগে ছুটি পেয়েও তুমি যেতে চাও না। আশ্চর্য!”

“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ তুমি। ঠিক সময়ের আগে এক পা-ও নড়ব না। ঠিক সে জন্যই তোমাকে চলে যেতে বলছি। তুমি তো জানো এক অবজারভেটরিতে দুজনের থাকা শুধু অন্যায় নয়, গুরুতর অপরাধ।” নীচের ঠোঁট কামড়ে কি যেন ভাবতে শুরু করল আগরওয়াল।

স্বামীনাথন ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

“কি পাগলের মতো বকছ স্বামীনাথন? কোথায় যাব আমি?”

“না বোঝার মতো করে তো কিছু বলিনি। পুরো সাত দিন আমি এখানেই থাকব আর তুমি থাকবে মহাকাশযানে। বুঝেছ তো এবার, চলে যাও বাইরে।” কণ্ঠস্বরে একরাশ ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল স্বামীনাথন।

কোনো কিছু বোঝার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল আগরওয়াল। সরে যাবার আগে স্বামীনাথনের বাঁ হাতটা সজোরে সে ধরল।

‘কী… কী মতলব তোমার স্বামীনাথন? কীসের ভয় দেখাচ্ছ তুমি? নির্জনবাসকে কি তুমি এতই ভালোবেসে ফেলেছ? এটা কি আমাকে বিশ্বাস করতে বলো তুমি?” চাপা গলায় প্রশ্ন করল আগরওয়াল।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, কাজ আমি ভালোবাসি, আর সেটাই তোমাকে বোঝাতে চেয়েছি। তবে তোমার মতো ফাঁকিবাজ হলে—” স্বামীনাথনের গলায় ব্যঙ্গের আভাস।

“তাই নাকি? তোমাকে চিনতে বাকি নেই আর। নিশ্চয়ই কিছু আছে।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ আছেই তো! আর তুমি যদি তা জানতে চাও তাহলে বসো এখানে।”

কী মনে করে আগরওয়াল হাত ছাড়তেই চকিতের মধ্যে কোমর থেকে আগুনে পিস্তল বের করে নিল স্বামীনাথন। চেপে ধরল আগরওয়ালের বুকের দিকে লক্ষ্য করে।

“শয়তান! এবার আশা করি বলতে কিছু অসুবিধা হবে না। কি বলো আগরওয়াল?”

এক মুহূর্ত পলকহীন চোখে পিস্তলটাকে দেখল, তারপর আগরওয়াল আস্তে আস্তে দু-হাত তুলে ফেলল মাথার উপর। তিক্ত হাসির রেখা মুখে ফুটিয়ে তুলে পায়ে পায়ে এগিয়ে এল স্বামীনাথন।

“বুঝলে আগরওয়াল? ছেলেমানুষী কৌতূহল মোটেই ভালো লাগে না আমার। আর সাবধান করার পরেও যদি সে…”

কথা শেষ হল না স্বামীনাথনের। উপরে তোলা ডান হাতটা চকিতে নীচে নামিয়ে সজোরে এক ঘুঁসি মারল আগরওয়াল স্বামীনাথনের মুখে। আচমকা প্রচণ্ড ঘুঁসিতে চোখে সর্ষে ফুল দেখল স্বামীনাথন। মাতালের মতো টলতে শুরু করল। থেঁতলানো ঠোঁট দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরতে শুরু করল। বাঁ হাত দিয়ে ক্ষতস্থানে হাত বোলাতে বোলাতে পেছুতে শুরু করল সে। হঠাৎ রিফ্লেক্টরের ধাক্কায় উলটে পড়ে গেল— ছিটকে পড়ল আগুনে পিস্তল।

চিলের মত ছোঁ মেরে পিস্তলটা নেবার জন্য ঝুঁকে পড়ল আগরওয়াল। কিন্তু পিস্তলে হাত দেবার আগেই স্বামীনাথন আঁকড়ে ধরল পিস্তলটা। উন্মাদের মতো ট্রিগার টিপল। বিদ্যুতের মতো এক ঝলক আগুন ছুটে গেল আগরওয়ালের দিকে।

কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আগরওয়াল। আগরওয়াল নয়, তার মুণ্ডহীন ধড়টা। গলা থেকে উধাও হয়ে গেছে ওর সম্পূর্ণ মাথাটা।

কয়েক মিনিট মাটিতে পড়ে থাকা মৃতদেহাটার দিকে চেয়ে থাকে স্বামীনাথন। রক্ত ঝরা থেঁতলানো ঠোঁটে হাত বোলায় কয়েকবার। বিজাতীয় ঘৃণায় সমস্ত দেহটাকেই বিলীন করে দেবার অদম্য ইচ্ছে হল একবার। উত্তেজনা কমলে একটু পরে কোমরের খাপে রেখে দিল আগুনে পিস্তলটা। জীবনে দু-বার মাত্র সে এটার ব্যবহার করল সে।

মনে মনে চিন্তিত হয়ে পড়ল স্বামীনাথন। এবার কী করবে মৃতদেহটা নিয়ে? কয়েক মুহূর্ত চিন্তার পরে ঠিক হয়ে গেল ভবিষ্য-কার্য পদ্ধতি। একটা স্পেসস্যুটে জড়িয়ে নিল মৃতদেহটা। তারপর দু-হাতে মৃতদেহটা তুলে নিয়ে এয়ারলক খুলে অবজারভেটরির বাইরে বেরিয়ে এলো। কিছু দূরে নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে আগরওয়ালের ছোটো রকেট। সেই দিকে এগিয়ে গেল মৃতদেহটা নিয়ে।

এই পাথুরে জমির উপর দিয়ে একটা দেহ বয়ে নিয়ে আসা সহজ কাজ নয়। হাঁপাতে হাঁপাতে রকেটের সামনে এসে দাঁড়াল স্বামীনাথন।

রকেটের মধ্যে মৃতদেহটা বসিয়ে দিতে অস্বস্তি বোধ হল না ওর। মহাশূন্যের দিকে লক্ষ্য করে আর একবার ছুড়ল আগুনে পিস্তলটা। তারপর পিস্তলটা কোনোরকমে আগরওয়ালের শক্ত মুঠোর মধ্যে গুঁজে দিল সে। এবার কে বলবে যে আত্মহত্যা করেনি আগরওয়াল? দেহ থেকে স্পেসস্যুটটা খুলে নিল এবার।

বাকি কাজটুকু খুবই সহজ। টাউসেটি নক্ষত্রের দিকে গতিপথ বেঁধে দিল আগরওয়ালের, তারপর চালু করে দিল অটো-পাইলটকে। কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে শক্ত হয়ে বসে আছে কবন্ধ দেহটা। শক্ত মুঠোর মধ্যে আগুনে পিস্তল। বাইরে বেরিয়ে এয়ারলক বন্ধ করতে ভুলল না স্বামীনাথন। এক থেকে দশ গোনার সঙ্গে সঙ্গে টাউসেটি নক্ষত্রের দিকে নিঃশব্দে উড়ে গেল রকেটটা।

স্বচ্ছ হেলমেটের মধ্যে দিয়ে ক্রমশ ছোটো হয়ে যাওয়া রকেটের দিকে তাকিয়ে রইল স্বামীনাথন। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা ছিটানো মহাকাশের বুকে হারিয়ে গেল রকেট।

মহাকাশের বুকে আত্মহত্যা খুবই স্বাভাবিক। নির্জনতার শিকার হয়ে পড়লে যে কোনো পাইলটের পক্ষেই এটা স্বাভাবিক। মাত্র কয়েক বছর হল অবজারভেটরি সার্ভিসে যোগ দিয়েছিল আগরওয়াল। নতুন পাইলট হলে তো কথাই নেই। নিজের মনেই কথাগুলো নাড়াচাড়া করল স্বামীনাথন। যাক, টাউসেটির দিকে কেউ বড়ো একটা যায় না। আর খুঁজে পেলেও কারও সাধ্য নেই… বেশ কিছুক্ষণ ধরেই সে তার অপরাধ প্রবণ মনকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করল।

না! আর করার কিছু নেই। পায়ে পায়ে ফিরে এল অবজারভেটরিতে। সেখানে তখন একনাগাড়ে বেজে চলেছে রেডিয়ো সিগন্যাল। তাড়াতাড়ি স্পেসস্যুট খুলে দূর মহাকাশের রেডিয়ো সেটের পাশে বসে পড়ল। নির্দিষ্ট ওয়েভলেংথ ধরে ফেলল কয়েকটা ব্যান্ড ঘুরিয়ে। স্বামীনাথন ছাড়া আর কয়েকজন সঙ্গীই এই গোপন ওয়েভলেংথ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। দূর মহাকাশ থেকে ভেসে এল যন্ত্রজিৎ মজুমদারের স্বর।

“হ্যালো… হ্যালো গুরু স্বামীনাথন। দশ লক্ষ মাইল দূরে রয়েছি আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই রওনা হবো। তোমাদের ওখানে নাবার সব বন্দোবস্ত করে ফেল তাড়াতাড়ি।”

“হ্যালো মজুমদার, সব বন্দোবস্ত আছে। তবে এখানে একটা ব্যাপার ঘটে গেছে।”

“কী হলো আবার?” মজুমদারের গলায় ব্যগ্রতা।

“বিশেষ কিছু নয়,” বলে সংক্ষেপে সমস্ত ঘটনা বিবৃত করল। সব শুনে খুশির আমেজ ফুটে উঠল মজুমদারের গলায়।

‘বাহবা গুরু! বাহবা! তারিফ করতে হয় তোমার বুদ্ধির। দূর ছায়াপথে বিভিন্ন সৌরজগতের মধ্যে কেউ খুঁজে পাবে না আগরওয়ালকে।”

হেসে উঠল স্বামীনাথন। “তাহলে বুঝতেই পারছ বেশ কিছুদিনের মধ্যে কেউ আসবে না আর প্লুটোতে, যাক্‌ এতদিন কোথায় ছিলে তোমরা? সাত দিন আগেই তো আসার কথা ছিল তোমাদের।”

“হয়তো পৌঁছে যেতাম ঠিক সময়ে। কিন্তু রেট্রো রকেট টিউবে একটা গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল। এতদূর যাতায়াতের পক্ষে মোটেই ভালো নয় এই টিউবগুলো। এবারে গিয়ে পালটাতে হবে এসব, সরকারি কোনো রকেট ধাওয়া করলে আর রক্ষা নেই। একদম গতি নেই এগুলোর।”

“ও সব কথা বলে এখন কিছু লাভ নেই। প্রথম থেকেই সব দেখে নিতে বলেছিলাম তোমাকে। তখন তো বললে সব ঠিক আছে। যাক এসব কথা, কী দেখলে বলো? কী আছে ওখানে?” স্বামীনাথনের গলার উত্তেজনার আভাস।

“ও! একবার যদি এসে দেখতে গুরু! প্লাটিনামের পাহাড়! লক্ষপতি হয়ে যাব আমরা। বুঝলে গুরু, এসব কাজ আর আমাদের করতে হবে না। বিশ্বাস হচ্ছে না? আর একটু অপেক্ষা করো, তার পরই দেখতে পাবে।”

“হ্যাঁ! দেখতে চাই আমি। সত্যি কি তাহলে এতদিন পরে…” একরাশ উত্তেজনা ঝরে পড়ল স্বামীনাথনের কণ্ঠস্বরে। “তোমাদের না ফেরা পর্যন্ত এখান থেকে যেতে পারছি না। তাড়াতাড়ি চলে এসো। আর কোনো রকেট এখানে নেই। তোমাদের রকেটেই চলে যাব একসঙ্গে—”

“ঠিক আছে গুরু! কোথায় যাব তোমাকে ফেলে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নামছি।”

সুইচটা বন্ধ করে দিল স্বামীনাথন। মনে দারুণ উত্তেজনা। ৭২ নং গ্রহে বেআইনী প্লাটিনাম মাইন। এ যে কল্পনারও অতীত। রাশি রাশি টাকা। শুধু টাকা আর টাকা।

সৌরজগতের প্রায় একদম বাইরে বেআইনী সরবরাহ কেন্দ্র এই প্রাণশূন্য প্লুটোতে। বিভিন্ন গ্রহের বাসিন্দারা এর খদ্দের। মরে গিয়ে খুব ভালো কাজ করেছে আগরওয়াল। সাত দিন এখানে অপেক্ষা করলেই হয়েছিল আর কি! কিছু না কিছু তো জানতে পারতই। অন্তত যখন মজুমদারের রকেট নামত তখন!

ভগবান যা করেন তা মঙ্গলের জন্যই করেন। মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ দিল অনেকবার। হঠাৎ নির্জনতায় ভরে উঠল চারিদিক। চমকে উঠল স্বামীনাথন। পৃথিবীর সঙ্গে একমাত্র যোগসূত্ৰ রেডিয়ো সিগন্যাল বন্ধ হয়ে গেল। সবক্ষণের সঙ্গী এই বেতার সংকেত। একটু দুর্বল হয়ে পড়ল স্বামীনাথন। তাড়াতাড়ি টিউন করল বেশ কয়েকটা নব ঘুরিয়ে।

“…Observatory Tem calling Earth! কি ব্যাপার? হ্যালো… হ্যালো… হ্যালো…”

“…Chief Earth Observatory calling observatory Tem… কে? মিঃ আগরওয়াল?”

“এখনও পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি আগরওয়াল। পৃথিবীর হিসাবে আরো সাত দিন পরে ওর আসবার কথা। আমি স্বামীনাথন বলছি। কী ব্যাপার হয়েছে বলো তাড়াতাড়ি।”

‘স্বামীনাথন, একটা তারার উপর বিশেষ নজর রাখতে হবে। তারার নাম Acron 3784— ক্যানোফাস আর ডেল্টা আরগাসের ঠিক মাঝখানে ওকে দেখতে পাবে। ১৭ মার্চ ২০০০ সালে প্রথম দেখা যায় ওকে। ওটা ছিল তখন চতুর্থ ম্যাগনিচিউড তারা, কিন্তু এখন ওটা পঞ্চম ম্যাগনিচিউডে চলে গেছে। বিস্তারিত সংবাদ জানাও। কারণ জানাও। পৃথিবী থেকে বিশেষ কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি খবর পাঠাও।”

“ঠিক আছে পৃথিবী! Acron 3784 এর উপর বিশেষ নজর রাখছি।”

এসব রুটিন ওয়ার্ক। নিয়মমাফিক কাজ। আকাশের বুকে তারা আসবে চলে যাবে— এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। তাই বিশেষ কোন গুরুত্ব দিল না স্বামীনাথন। ধীরে সুস্থে দৈত্যাকৃতি ক্ষমতা সম্পন্ন টেলিস্কোপের কাছে এসে দাঁড়ালো। আকাশমুখী টেলিস্কোপটা আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে নিল Acron-এর দিকে। অ্যাডজাস্ট করল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। অবশেষে এ্যাক্রন ধরা পড়ল ফাইন ডিভাইডেড ফাইন্ডারের মধ্যে। কন্ট্রোলিং প্যানেলের আরো কিছু সূক্ষ্ম অ্যাডজাস্টের প্রয়োজন। আবছা এক আলোর পিণ্ড ধীরে ধীরে পরিণত হল স্পষ্ট তারায়। মারকিউরয়ড সংকর ধাতুতে তৈরি বিরাট আয়নায় ফুটে উঠল একটা বিশাল জ্বলন্ত তারা। এ্যাক্রন ৩৭৮৪, আলোর প্রতিফলন ধরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় স্থির নির্ভুল প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলল প্রকাণ্ড রিফ্লেক্টরে।

আলোর উজ্জ্বলতা কমিয়ে দিয়ে ভালো করে দেখতে শুরু করল স্বামীনাথন। এ্যাক্রন সত্যি এক বিরাট রহস্য। শুধু এ্যাক্রন কেন আরো কিছু তারা আছে যারা এইভাবেই হঠাৎ দেখা দেয়, আবার হারিয়ে যায় মহাশূন্যের অসীম শূন্যতার মাঝে।

উজ্জ্বলতার পরিমাণ কি চতুর্থ মাত্রা ছাড়িয়ে পঞ্চমে পৌঁছল? স্ক্রিন থেকে সরে এসে স্পেকট্রোহিলিওগ্রাফের সাহায্যে নিয়ম মাফিক কাজগুলো করতে বসল স্বামীনাথন। জি-শ্রেণীর প্রধান তারাদের অন্যতম এই তারা। এদের বিশেষ কতকগুলো মহাজাগতিক বৈশিষ্ট্য আছে। ফটোস্ফিয়ারের বর্ণালীর উপর দিয়ে অজস্র কালো কালো রেখা ফুটে উঠেছে। মহাশূন্যে বায়ুমণ্ডলের উচ্চতরে ধাতব পদার্থের শোষণের ফলেই এই সব কালো রেখার সৃষ্টি। ক্যালসিয়ামের উপস্থিতির এ এক নির্ভুল প্রমাণ। স্বামীনাথন বুঝতে পারল আমাদের সৌরজগতের সূর্যের মতোই এর ভর। অন্যান্য হাজার হাজার তারার মধ্যে এ্যাক্রন ৩৭৮৪ এক অদ্ভুত তারা। অস্বাভাবিক ভর ক্ষয়ের দিকে দ্রুত লয়ে এগিয়ে চলেছে তারাটা। এখানেই এই তারার সঙ্গে মহাবিশ্বের অন্যান্য তারার তফাৎ।

সারা শরীর জুড়ে দারুণ ক্লান্তি। পর পর হাই উঠল কয়েকটা। বেশ পরিশ্রম হয়েছে। তবুও এ্যাক্রন-এর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। ভর কমলেও এমন কিছু অস্বাভাবিতা দেখতে পেল না সে। সব পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। না, এখনও একটা বাকি আছে। কমপক্ষে কত ঔজ্জ্বল্য সহ্য করতে পারে এই শ্রেণীর নক্ষত্ররা? ৪.৭ ছিল এর প্রাথমিক মাত্রা। এখন তার থেকে নেমে এসেছে ৫.৫৩ মাত্রায়। এখানেই বন্ধ হয়নি ওর পরিবর্তন। ক্রমেই কমে আসছে এ্যাক্রন-এর ঔজ্জ্বল্যের মাত্রা।

ঝিম ঝিম করে উঠল মাথা। দু-হাত দিয়ে চোখ দুটোকে চেপে ধরল একবার, ভাবনাটা কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। যেভাবে কমছে ভর তাতে ধংসের আর বেশি দেরি নেই এ্যাক্রন-এর। ৬.৭৮ মাত্রার নীচে নামলেই যে কোনো নক্ষত্র আর থাকে না। আলো উত্তাপবিহীন শ্বেত বামনে পরিণত হয়।

সেই একইভাবে ছবি ফুটে আছে পর্দায়। নক্ষত্রের অন্তঃস্থল পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে এখন। টেলিস্কোপের কালো কাচের পর্দার পরিপ্রেক্ষিতে অতি উজ্জ্বল ফটোস্ফিয়ারে কালো কালো কতকগুলো দাগ বড়ো হয়ে উঠছে ক্রমেই। বেশ বোঝা যাচ্ছে নক্ষত্রের বিষুবরেখা বরাবর একইভাবে বড়ো হয়ে উঠছে দাগগুলো। আর সন্দেহ নেই। ওগুলো সৌরকলঙ্ক। প্রচণ্ড দ্রুত ওদের আবির্ভাব। বিশাল নক্ষত্র জগতে অবশ্য তেমন কিছু অস্বাভাবিক নয়। স্বামীনাথনের কাছে তো সৌরকলঙ্ক একেবারেই নতুন নয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলেছে এমন তো বেশ কয়েকটা দেখেছে।

একদৃষ্টে কিছুর উপর অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকা কষ্টকর। তবে কিছুক্ষণ দেখার পরই বোঝা যায় এ্যাক্রন ৩৭৮৪-এর অস্বাভাবিক আচরণের রহস্য।

সৌরকলঙ্কের প্রচণ্ড আক্রমণে আক্রান্ত এ্যাক্রন ৩৭৮৪ নক্ষত্রের সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়েছে এই ক্ষতগুলো। বিষুবরেখা থেকে মেরুর প্রত্যন্ত প্রদেশে এই ক্ষতগুলো ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটেছে মাত্রার পরিবর্তন। ফলে এ্যাক্রন-এর রূপান্তর ঘটেছে।

এখন উজ্জ্বল্যের পরিমাপ ৫.৮২। একথা পৃথিবীতে জানাতে দেরি করল না স্বামীনাথন। বলল— আরো সব নিঁখুত বিবরণ পাঠাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। যাক পৃথিবীর কাজ হল। কিন্তু আরো প্রয়োজনীয় কাজ পড়ে আছে এখন। মহাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। মজুমদারদের রকেট আসবে মহাশূন্যের বুক বেয়ে। কি যে উটকো আপদ জড়ো হল এ্যাক্রন, তা নয়তো টেলিস্কোপ দিয়েই অনায়াসে খুঁজে নিত ওদের মহাকাশযানকে, কিন্তু বিরাট টেলিস্কোপ একচোখে তাকিয়ে রয়েছে অস্থির ওই এ্যাক্রন-এর দিকে। প্রতি মহতে যে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের দিকে।

হঠাৎ আগরওয়ালের কবন্ধ দেহটার কথা মনে পড়ল স্বামীনাথনের। নিঃসীম মহাকাশে কোথায় উধাও হয়ে ছুটেছে আগরওয়ালের মহাকাশযান। চেয়ারে বেল্ট বাঁধা বসে আছে মুণ্ডুহীন আড়ষ্ট একটা দেহ, হাতে তার…

আরো পরিবর্তন হয়েছে এ্যাক্রন-এর। নক্ষত্রের সারা অঙ্গে কালো কালো বসন্তের দাগ। সৌরকলঙ্কে ঢেকে গেছে এ্যাক্রন-এর সমস্ত দেহ। বেশ কিছু কলঙ্ক আবার হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত, সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বলতাও কমে এসেছে অনেক। আবার গণনায় বসল স্বামীনাথন।

৬.৮০ মাত্রা, স্থায়ীত্বের শেষ সীমারেখাও পেরিয়ে গেছে এ্যাক্রন, নক্ষত্র জগতে এ এক বিস্ময়! তাহলে আর এক মহাজাগতিক বস্তুর মৃত্যু ঘটছে। সেকেন্ডে সেকেন্ডে এগিয়ে চলেছে বিলুপ্তির গথে, কি সাংঘাতিক দ্রুত মৃত্যু। তবে সময় লাগবে। বেশ কয়েক ঘণ্টা, হয়তো কয়েক দিন। যাক, তাহলে সারাক্ষণ চোখ লাগিয়ে বসে থাকতে হবে না এখন। সেই মহাকাশযানটা আসছে না কেন এখনও? যার জন্য নিজের হাতে খুন করল একজন সহকর্মীকে?

আবার বেতারে খবর পাঠাল, পৃথিবীতে জানিয়ে দিল এ্যাক্রন ৩৭৮৪ স্থায়ীত্বের শেষ সীমারেখা ছাড়িয়ে গেছে। বামনে পরিণত হতে আর বেশি দেরি নেই, আর তারপর সম্পূর্ণ বিলপ্তি ঘটবে হয়তো ওই অভাগা নক্ষত্রের।

বন্ধ করে দিল প্রেরক যন্ত্র। এবার ঘুমাতে হবে। প্রচুর ধকল আর মানসিক উত্তেজনার মধ্যে কেটেছে বেশ কয়েক ঘণ্টা। বিশ্রাম চাই। অনেক বিশ্রাম। আর বিশ্রামের মাঝে অনেক কাছে এসে যাবে মজুমদার মহাকাশযান।

এ্যাক্রন ৩৭৮৪ এর দিকে টেলিস্কোপের মুখটা ঘুরিয়ে অটো রিপোর্টারের বোতাম টিপে দিল। মৃত্যুমুখী নক্ষত্রের যাবতীয় রূপান্তর লিপিবদ্ধ করে চলল অটো-রিপোর্টার।

* * *

আচমকা ঘুমটা ভেঙে গেল। তন্দ্রাচ্ছন্ন মনের কোনো এক সুদূর কোণে কেমন যেন এক অস্বস্তিকর চিন্তা ভেসে ভেসে উঠছে। একটা অস্পষ্ট হিস হিস আওয়াজ। একেবারেই পরিচিত নয়। নিস্তব্দ এই গ্রহের বুকে এ যেন এক অশুভ পরিণতির পূর্বাভাষ। বৈদ্যুতিক ঘড়ির যান্ত্রিক শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যায় না এখানে।

একই সঙ্গে মনের পর্দায় আনাগোনা করতে লাগল মজুমদার… কবন্ধ আগরওয়াল… এ্যাক্রন ৩৭৮৪। স্বামীনাথন তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। মোটা কাচের ওপারে চেয়ে দেখল ভালো করে। জানলার যতদর দণ্টি যায় কেবল রুক্ষ পাথুরে প্রান্তর। নিশ্চুপ নিশ্চল প্লুটো। দিগন্তের প্রান্তে লাল সিঁদুরের টিপের মতো সূর্য। নাঃ! কোনো চিহ্নই নেই মজুমদারের। কোনো চিহ্ন নেই অন্য কোনো মহাকাশযানের।

হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে আলোর বোতামটা টিপে দিল স্বামীনাথন। কয়েক পা সে এগিয়ে গেল টেলিস্কোপের দিকে। কিন্তু থমকে দাঁড়াতে হল এবার। বিশ্বাস হল না নিজের চোখকে। কী দেখছে সে? তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে সে ভালো করে দেখল। আর তৎক্ষণাৎ পাথরের মতো নিষ্পন্ন হয়ে গেল তার সমস্ত শরীর।

ঘরের ঠিক মাঝখানে ছিল রিফ্লেক্টর। এ্যাক্রনকে নিঃশব্দে অনুসরণ করে চলেছিল। কিন্তু অবাক কাণ্ড। সম্পূর্ণ যন্ত্রটাই অদৃশ্য হয়ে গেছে। শুধু রয়ে গেছে বড়ো এক গর্ত। অন্ধকার। ঠিক মাথার উপর কাচের ডোমটার মধ্যে বিরাট এক ফুটো। ফুটোর ঠিক নীচেই ধাতব মেঝেতে গর্ত। নিখুঁত বৃত্তাকার। সেখানে থেকেই হিস হিস আওয়াজ আসছে। ঠিক যেন চাকভাঙা মৌচাকের মৌমাছির ভন ভন। নিকষ কালো গর্ত।

বিরাট একলাফে গর্তটা ডিঙিয়ে এল স্বামীনাথন। ঠক ঠক করে তার হাঁটু দুটো কাঁপছে। ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে গর্ত। গর্তের সামনে সে ঝুঁকে পড়ল। কিছুই বোঝা গেল না। নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। মনে ভাবে এও কি সম্ভব? পুরো দু-মিটার পুরু লোহার মেঝে। গর্তের উপর দিয়েই তো সে লাফিয়ে এল। নাকি একটু পাশ দিয়ে? যদি শক্ত লোহার মতো সে-ও তলিয়ে যেত? ভাবতেই শরীর হিম হয়ে এল স্বামীনাথনের।

হঠাৎ বিশাল রিফ্লেক্টর বসান মোটা লোহার পিলারের দিকে নজর পড়ল। রিফ্লেক্টর শুদ্ধু মাথাটা কেউ মাখনের মতো নিখুঁত করে কেটে নিয়ে গেছে বলে মনে হল। ছাদের উপর গোলাকার গর্ত, মাথা উড়ে যাওয়া পিলার, আর মেঝের উপর ক্ষয়িষ্ণু গর্ত সবই একই সরলরেখায় অবস্থিত। কঠিন সমস্ত কিছু পদার্থই একে একে উঠে যাচ্ছে।

চার-পাঁচ ঘণ্টায় উধাও হয়ে গেল একশো টন লোহা, সিমেন্ট, কাচ ইত্যাদি কঠিন পদার্থ। মহাকাশের বিপজ্জনক রশ্মি প্রতিষেধক পুরু লোহার চাদর সে খেয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। শুধু কি তাই? প্লুটোর জন্মলগ্নের সঙ্গী অবজারভেটরির তলাকার কঠিন পাথরের পাহাড়টা পর্যন্ত ক্ষয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। শুকিয়ে ওঠা ঠোঁট দুটোকে জিভ দিয়ে সরস করে নিল স্বামীনাথন। শুধু ঠোঁট কেন। সমস্ত অন্তরাত্মা অজানা আশঙ্কায় বারে বারে কেঁপে উঠছে। ক্রমবর্ধমান হাঁ-মুখের পাশেই রেডিয়ো-অ্যাপারেটাস। পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র হাতিয়ার। সেটা তখনও বিনষ্ট হয়নি। অনাবিল আনন্দে ভরে উঠল মন।

একইভাবে চলেছে মৃদুগুঞ্জন। ভন-ন-ন। কেমন যেন নেশা ধরানো অস্পষ্ট আওয়াজ। সব কিছু উধাও হয়ে যাওয়া খেলাটা হয়েই চলেছে। কালো অন্ধকার যেন বৃত্তাকারে অবজারভেটরির সব কিছু গ্রাস করে চলেছে।

হঠাৎ পাশ থেকে একটা লোহার রড তুলে নিল স্বামীনাথন। কালো গর্তের ঠিক মাঝখানে এগিয়ে ধরল রডটাকে। মৃদুগুঞ্জন বেড়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। সেই সঙ্গে উধাও হয়ে গেল রডটা পলক ফেলতে না ফেলতেই। স্বামীনাথন আপন মনেই প্রশ্ন করে— কোথায় উধাও হল? কঠিন লোহা? একী আশ্চর্য!

মুহূর্তেই স্বামীনাথনের সব ভয় লুটিয়ে পড়ল জিজ্ঞাসার পায়ে। অবসাদ দূর হয়ে গেল কী? কেন? প্রশ্ন জাগিয়ে তুলল তার বৈজ্ঞানিক সত্তাকে যে সত্তা এতদিন ঘুমিয়ে ছিল লোভ আর অন্যায়ের আড়ালে। তীব্র হয়ে উঠল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল। অস্বাভাবিক বিপদের মুখে পুনর্জন্ম ঘটল বৈজ্ঞানিকের। এই সব উধাও হয়ে যাওয়ার পিছনে কারণ নিশ্চয়ই আছে। এই মহাবিশ্বে কার্য-কারণ ছাড়া কিছুই ঘটে না। স্বামীনাথন তার সমস্ত সত্তা দিয়ে এর কারণ খুঁজতে প্রবৃত্ত হল। দূর হয়ে গেল তার মৃত্যুভয়।

স্বামীনাথনের মনে হল এই সব ঘটনার উৎস নিশ্চয়ই এ্যাক্রন ৩৭৮৪। একথা মনে হবার সঙ্গে সঙ্গে কাচের জানালা দিয়ে উঁকি মারল বাইরের মহাকাশের দিকে। কিন্তু কোথায় সেই আত্মহত্যাকারী নক্ষত্র। খালি চোখে আর দেখা যায় না সেই ধ্বংসমুখী নক্ষত্রকে। অস্থায়ী হাজার হাজার তারার মতো এ্যাক্রন ৩৭৮৪-ও মিলিয়ে গেছে মহাকাশের বুক থেকে।

“শেষ হয়ে গেল জ্বলন্ত নক্ষত্র—” মনে মনে বলল স্বামীনাথন। স্থায়ীত্বের সীমারেখা অতিক্ৰম করলেই শ্বেত বামনে পরিণত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। প্রথমে সৌরকলঙ্কগুলো অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দিল নক্ষত্রের রশ্মিবিচ্ছুরণ। স্থায়িত্বের সীমা অতিক্রম করল এ্যাক্রন। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড বেগে সংকুচিত হতে শুরু হল জ্বলন্ত নক্ষত্রের সমস্ত তরল আর বায়বীয় পদার্থ। যতই সংকুচিত হয় ততই অস্বাভাবিক ভয়ঙ্কর বেগে বেড়ে ওঠে নক্ষত্রের আভ্যন্তরীন তাপমাত্রা। আর ঠিক সেই গতিতে ঠান্ডা হয়ে ওঠে নক্ষত্রের উপরিভাগ। প্রচণ্ড আভ্যন্তরীন উত্তাপে ধ্বংস হওয়ার ফলে থেকে যায় শুধু বন্ধনহীন রাশি রাশি ইলেকট্রন আর আবরণহীন অসংখ্য নিউক্লিয়াস। এরই অবশ্যম্ভাবী প্রভাব পড়ে ফটোস্ফিয়ার বা নক্ষত্রের আলোকময় বহিরাবরণের উপর। ফলে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় আলোকময় বহিরাবরণ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘন বস্তু সন্নিবদ্ধ এক শ্বেত বামনে পরিণত হবে Acron কিন্তু নক্ষত্রের সংকুচিত হবার সময় কি ঘটে সেখানে?

রাশি রাশি সম্ভাব্য সব প্রশ্ন ভিড় করে উঠল মাথার মধ্যে। নিজের মনেই বিড় বিড় করে চলল নানান প্রশ্নোত্তর।

পরমাণু ধ্বংস আর তার ফলে বিপুল ইলেকট্রনিক পরিবর্তন রাশি রাশি রশ্মি বিকিরণ ছড়িয়ে দেবে মহাশূন্যের বুকে। এক নিমেষেই ছড়িয়ে পড়বে হাজার হাজার বছরের সঞ্চিত বস্তুপুঞ্জের তাপরাশি। ঠিক এইরকম বর্ণনাই এভিংটন করেছেন। মারাত্মক রশ্মি বিকিরণের ফলে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে মহাশূন্যের বহু বিস্তৃত অঞ্চল।

রেডিয়েশন… রশ্মিবিকিরণ… এক মনে আউড়ে চলল কথাগুলো স্বামীনাথন। রেডিয়েশন সব একই সঙ্গে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এখানে। ওই টেলিস্কোপ তো ম্যাগনেটিক লাইট-ওয়েভ ধরার যন্ত্র। একই সঙ্গে লাইট-ওয়েভ আর অন্যান্য সব রেডিয়েশন শোষণ করে নিয়ে এক নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত করেছে টেলিস্কোপটা। আর সেই কেন্দ্রীভূত বিকিরণপুঞ্জ টিউবের মধ্যে দিয়ে সটান এসে পড়েছে মারকিউরয়েড আয়নার উপর। অন্তিম সংকোচনের ফলে নির্গত এ্যাক্রন-এর সমস্ত রেডিয়েশনই বিস্ময়করভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এখানে।

হঠাৎ চমকে উঠল স্বামীনাথন। কি যেন মনে পড়ে গেল। যন্ত্রপাতি রাখা আলমারী থেকে ব্রিগস ইলেকট্রনিক ডিকটেটর বের করে নিয়ে এল। বিজ্ঞানের এ এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। কঠিন বস্তু বা গ্যাসের মধ্যস্থিত পরমাণ, কম্পনের মাপকাঠি। বেশ স্থিরমস্তিষ্কে যন্ত্রটা অ্যাডজাস্ট করে গভীর মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা শুরু করল।

তিরিশ মিনিট কেটে গেল। তিরিশ মিনিট নয় তো যেন এক যুগ। নাঃ! কিছু বোঝা গেল না। এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল। আরো বড়ো হয়েছে গর্তটা। যেমন বড়ো তেমন গভীর। এতক্ষণে শেষ হল স্বামীনাথনের পরীক্ষানিরীক্ষা। পরীক্ষার ফল দেখে তো চক্ষুস্থির।

এ-ও কি সম্ভব! কোন কিছুই নেই। শুধু ইলেকট্রনে ভরা এই অন্ধকার গর্তটা। কেবল নেগেটিভ ইলেকট্রন। প্রোটনের চিহ্ন নেই কোথাও। নেই কোনো বিপরীত বৈদ্যুতিক চার্জ। শুধু একটি মাত্র চার্জ। অন্য চার্জের কোনো চিহ্ন নেই এখানে। তার অর্থ কোনো কিছু নেই এখানে। কী কারণে প্রোটনের সামান্যতম অস্তিত্ব নেই এখনে? আছে কেবল শূন্যতা। এই কি মহাবিশ্বের সৃষ্টি স্বরূপ? কেবল নেগেটিভ ইলেকট্রন!

চিন্তাশক্তি যেন লোপ পেল স্বামীনাথনের। মনের মধ্যে একই জিনিস ঘুরপাক খেতে লাগল। নেগেটিভ ইলেকট্রন। মৃদুগুঞ্জনের মতো একই শব্দ— নেগেটিভ ইলেকট্রন। তার বিরাম নেই, ক্লান্তি নেই। সব কিছুই গর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যাচ্ছে একে একে। এ এক বৈজ্ঞানিক ধাঁধা। ধাঁধার সমাধানের নেশায় মশগুল বৈজ্ঞানিক। আচ্ছন্নের মতো টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে বসে পড়ল সে। পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে শুরু হয়ে গেল জটিল গণনা। পারিপার্শ্বিক বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেল স্বামীনাথন। বিজ্ঞানের রহস্য উন্মোচনে উদগ্র এক মানুষ। সামনে অপার বিস্ময়। অসীম রহস্য।

বেশ কিছুক্ষণ সময়ের জ্ঞান রইল না বৈজ্ঞানিকের। তারপর আবার মৃদুগুঞ্জন ফিরে এল। সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে। অভূতপূর্ব ঘটনা।

নিজের মনেই আবার বিড় বিড় করতে শুরু করল স্বামীনাথন। মহাকাশ আর বস্তুর মধ্যে এই হল সম্পর্ক। মহাবিশ্বে দু-রকম বিদ্যুতের অস্তিত্ব আছে বলে এতদিন অনুমান করে এসেছিল বিজ্ঞানীরা। এই দুই রকম বিদ্যুতের প্রভাব সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু অনুমানই সার। প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধু এক রকম বিদ্যুতেরই খোঁজ পাওয়া গেছিল এতদিন। নাম রাখা হয়েছিল নিউট্রাল। ফলাফল হিসাবে কখনো একে ধনাত্মক আবার কখনো বা একে ঋণাত্মক বলত সবাই।

পাতার পর পাতা অঙ্কগুলোর উপর দ্রুত চোখ বোলাল একবার। না সব ঠিক। এতক্ষণে সব বোঝা গেল। মহাকাশের মহাশূন্যে কঠিন বস্তুর তুলনায় শূন্য, বিশাল মহাকাশের মানে বোঝা গেল এবার। অকস্মাৎ কোনো এক শুভলগ্নে পজিটিভ ফিল্ড, নেগেটিভ ফিল্ডের ভারসাম্য রক্ষা করে। আর তখনই বিশাল মহাশূন্যে জন্ম নেয় কঠিন বস্তু। গ্রহ, উপগ্রহ সমস্ত কিছু। তবে কদাচিৎ ঘটে এমন ঘটনা। মহাকাশ— Space— অর্থাৎ ঋণাত্মক শক্তি। আর এটাই হল মূলকথা। এতক্ষণে বোঝা গেল কেন এক একটি নক্ষত্রকে ঘিরে কোটি কোটি মাইল বিস্তৃত কেবল শূন্য আর শূন্য।

পরম তৃপ্তির আমেজ ছড়িয়ে পড়ল বৈজ্ঞানিক স্বামীনাথনের দেহ মনে। আপন মনেই বলে চলল— যাক নিজের অজান্তেই মহাবিশ্বের গুপ্ত রহস্যের সমাধান আমি করে ফেললাম। সৃষ্টির শরতে শুধু ছিল নেগেটিভ এনার্জি। তারপর কোথা থেকে ভেসে এল পজিটিভ ফিল্ড। হয়তো বা মহান বিশ্বের বাইরে অজানা অচিন্ত্যনীয় কোনো স্থান থেকে আমদানি হয়েছিল এই ফিল্ডের। আর দুয়ের সংমিশ্রণে জন্ম নিল আমাদের বিশ্বজগৎ। জন্ম নিল কঠিন বস্তু বা Matter।

টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল স্বামীনাথন। পৃথিবীকে জানাতে হবে এই নতুন আবিষ্কারের কথা। জানাতে হবে সৃষ্টির মূল রহস্যের কথা। এই কথাটা জানার জন্যই তো যুগের পর যুগ ধরে বৈজ্ঞানিকেদের বিরামবিহীন প্রচেষ্টা। কে এসেছিল আগে? কার পদধ্বনি প্রথমে শোনা গিয়েছিল? মহাকাশ না বস্তু? বস্তু না মহাকাশ?

যুগান্তকারী আবিষ্কারের উত্তেজনায় দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল রেডিয়ো অ্যাপারেটাসের দিকে। কিন্তু কয়েক পা গিয়ে থমকে দাঁড়াল। পাথরের মতো পা ভারী হয়ে উঠল স্বামীনাথনের। রেডিয়ো যন্ত্রের চারপাশ ঘিরে ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর করাল গহ্বর। জেনারেটারের মূল কেবলের চিহ্ন নেই বিন্দুমাত্র। সমস্ত মেঝে জুড়ে কেবল অন্ধকার বিশাল এক গহ্বর। পাতালপুরীর ভয়ঙ্কর কোনো দানব যেন হাঁ করে গিলে ফেলতে চাইছে সব কিছু। পৃথিবীর সঙ্গে, অন্য যে কোনো গ্রহের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ হাতিয়ারটুকু পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আর কোনো পথ নেই যোগাযোগের। এ কী নির্মম পরিহাস। কেউ আর বিরক্ত করতে পারবে না। যা ইচ্ছে তাই করতে পারে স্বামীনাথন।

অসীম মহাকাশে ছোট্ট এক গ্রহে সম্পূর্ণ একা স্বামীনাথন। কেউ কোথাও নেই। সে শুধু একা। নির্মম একাকীত্ব বজ্রাঘাতের মতো নেমে এল তার উপর। সামান্য খবর পাঠানও অসম্ভব। ঠান্ডা হিমেল স্রোত বয়ে গেল ওর মেরুদণ্ড বেয়ে। ঠান্ডা বরফ দিয়ে কেউ যেন চাপতে শুরু করলে হৃৎপিণ্ডকে। অসহ্য অব্যক্ত যন্ত্রণায় ফেটে যেতে চাইল ধুক ধুক করা হৃদয়।

এত বড়ো আবিষ্কার, সৃষ্টির আদি রহস্যভেদ কোনো কাজে লাগল না পৃথিবীর। সব আবিষ্কার সব সত্য এখন শুধু স্বামীনাথনের। বিন্দুমাত্র সুযোগ পেল না কাউকে জানাবার। ক্রমেই ছোটো হয়ে আসা গ্রহের বাসিন্দা এখন স্বামীনাথন। প্রতি মুহূর্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে, উবে যাচ্ছে প্লুটোর কঠিন নিরেট পাথর ভরা দেহ। ছোটো আরো ছোটো… আরো… তারপর অবশেষে সৃষ্টির প্রারম্ভের মূল মহাকাশের সঙ্গে এক হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে সৌরজগতের দশম গ্রহ প্লুটো।

আরো কিছু চিন্তা করবার চেষ্টা করল স্বামীনাথন। ঘড়ির দিকে একবার তাকাল। অঙ্ক আর গবেষণায় বহুক্ষণ কেটে গেছে। এতক্ষণে কাছে এসে পড়েছে নিশ্চয়ই মজুমদারের মহাকাশযান। খালি চোখেও বোধহয় দেখা যেতে পারে এখন। ক্ষয়িষ্ণু গ্রহ থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র পথ ওই মহাকাশযান। ধ্বংসোন্মুক্ত প্লুটোর হাত থেকে ছাড়া পাবার একমাত্র চাবিকাঠি মজুমদারের রকেট। আর কতক্ষণ লাগবে ওদের আসতে?

অধীর আগ্রহে জানলা দিয়ে দূর মহাকাশে চেয়ে রইল স্বামীনাথন। একবিন্দু চকচকে কিছু চোখে পড়ল না তার। কালো আকাশের বুকে ছোটো বড়ো উজ্জ্বল রাশি রাশি তারার মেলা। কাছাকাছি ওদের মহাকাশযান চোখে পড়ল না। নিরুপায়ের মতো জানলার ফ্রেমে আঙুল দিয়ে বাজনা বাজাতে শুরু করল। বারে বারে দৃষ্টি পড়ছে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়া অতলস্পর্শী গর্তের দিকে। দারুণ অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে ওর হাবভাবে। তারপর কী করবে ও? প্রায় সমস্ত ল্যাবরেটরির ঘর ছেয়ে ফেলল অন্ধকার গর্তটা। তলায় এর শেষ কোথায় কে জানে! যেভাবে দ্রুত বড়ো হচ্ছে গর্তটা তাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা লাগবে সমস্ত অবজারভেটরিটা খেয়ে ফেলতে। কর্পূরের মতো উবে যাবে বিশাল অবজারভেটারি আর তার অমূল্য যন্ত্রপাতি। কত দূরে নেবেছে গর্তটা কে জানে! এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে কি গ্রহটা… তাহলে আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হয়তো দু-ভাগে ফেটে পড়বে প্লুটো। তারপর বরফ ঠান্ডা মহাকাশের অসীম শূন্যের মধ্যে কোথায় ছিটকে পড়বে গ্রহের টুকরো দুটো কে জানে! অথবা ক্ষয় হতে হতে হয়তো মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাবে। এই ক্ষুদ্র গ্রহটা।

“না-না-না— ইঁদুরের মতো কলের মধ্যে কিছুতেই আটকে পড়ব না আমি। নিশ্চয়ই আসবে মজুমদারের মহাকাশযান।” স্বামীনাথন উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠল, “আমাকে যেমন করেই হোক বাঁচতে হবে। ফিরে যেতে হবে মাটির পৃথিবীতে।”

হ্যাঙ্গারে ঝোলান স্পেশস্যুটটা তাড়াতাড়ি পরে নিল স্বামীনাথন। কোনোরকমে নিজের দেহটাকে গলিয়ে দিল পোশাকের মধ্যে। প্রায় পায়ের কাছে চলে এসেছে মৃত্যুমুখী কালো গর্ত। ভেতরের দিকে তাকালে শিরশির করে ওঠে সর্বাঙ্গ। না-আর একটুও দেরি নয়, ঝড়ের বেগে তিনটে এয়ারলক খুলে অবজারভেটরির বাইরে বরফ ঠান্ডা কঠিন পাথরের বুকে বেরিয়ে এল স্বামীনাথন।

ওর দুর্ভাগ্যে সারা আকাশ জুড়ে ঝিকমিক করে হেসে উঠল তারার মালা। অজস্র জ্বলজ্বলে চোখ মেলে মহাকাশ যেন প্রত্যক্ষ করল স্বামীনাথনকে। আপন মনে অবজারভেটরি থেকে বেশ দূরে চলে এলো সে। সামনেই বিশাল কালো পাহাড় আকাশপানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অসম্ভব দুর্বল বলে মনে হল নিজেকে। স্পেশস্যুটের মধ্যেই ফোঁটায় ফোঁটায় ঘাম ঝরে পড়ল কপাল দিয়ে। আকাশের দিকে চেয়ে তারার অরণ্যে খুঁজতে শুরু করল চলন্ত কোনো চকচকে বিন্দুকে। বাঁচার শেষ আশাকে যে খুঁজে বের করতেই হবে মহাকাশের বুক থেকে।

হঠাৎই স্বামীনাথনের চোখ পড়ল দূরের কোনো চকচকে বিন্দুর উপর। দূর মহাকাশে বস্তু চেনার অভিজ্ঞতা বহুদিনের। জন মানব শূন্য দূর গ্রহে সময় কাটানোর একমাত্র উপায় মহাকাশ পর্যবেক্ষণ। আনন্দে লাফিয়ে উঠল সে। ক্রমেই কাছে আসছে চকচকে বস্তুটা। আরো কাছে, বিশাল বৃহস্পতি গ্রহের কাছে এসে পড়েছে ওটা।

“মজুমদার! আমি জানি তুমি আসবে মজুমদার। বন্ধু এস। তাড়াতাড়ি এস! আমি যে তোমারি অপেক্ষায়। বাঁচাও আমাকে।” পাগলের মতো দু-হাত তুলে আহবান করল সুদূর মহাকাশের বুকে চকচকে বস্তুটাকে।

ছোটো বড়ো পাথর ডিঙিয়ে পাহাড়ে চড়তে শুরু করল স্বামীনাথন। আরো উঁচু মানে তো মহাকাশের আরো কাছে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর একটা টিলার মাথার উপর এসে হাঁপাতে শুরু করল স্বামীনাথন। দু-হাত তুলে ডাকতে শুরু করল বারেবারে। জ্বলজ্বলে তারাময় কালো আকাশের পটভূমিকায় ঠিক যেন এক সিলুট ছবি।

না এখন আর চকচকে বিন্দু নয়। সিগারের আকার। কয়েকশো মাইল দূরে রয়েছে বোধহয়। বায়ুশূন্য নিরাকার মহাশূন্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বস্তুটাকে।

ক্ষুধার্ত জীবের মতো লোলুপ দৃষ্টিতে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে রইল স্বামীনাথন একদৃষ্টে। হাত তুলে বারবার ডাকল সে। কিন্তু হায়! ধারে কাছে আসার সদিচ্ছা দেখা গেল না উড়ন্ত বস্তুটার।

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল স্বামীনাথন। স্পষ্ট দেখতে পেল সম্পূর্ণ গোটা মহাকাশযান নয় ওটা। পেছনের দিকটা সম্পূর্ণ খোলা। উড়ে গেছে নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কোনো বিস্ফোরণে। রকেট টিউবের কোনো অস্তিত্ব নেই পেছনে।

এটাই তাহলে পেছনের রকেট টিউব। হঠাৎ মজুমদারের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। “পেছনের রকেট টিউবগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না।” তাহলে বিস্ফোরণে উড়ে গেছে মজুমদারের মহাকাশযানের পিছনটা। মহাকাশের জীবন তো নতুন নয়। একবার দেখলেই বুঝতে তার ভুল হয় না। বিস্ফোরক গ্যাস বেরোবার পথ বন্ধ হয়ে গেছিল মহাকাশযানের। তারই ফলে গ্যাসের চাপে ধ্বংস হয়ে গেছে মহাকাশযান। চোরাই পুরোনো মহাকাশযানে তো আধুনিক মহাকাশযানের মতো সেফটি কম্পার্টমেন্ট থাকে না। স্বামীনাথনের বুঝতে বাকি রইল না যে মহাকাশযানের কোনো আরোহীই বেঁচে নেই। প্রচণ্ড ঠান্ডা আর বায়ুশূন্য মহাকাশের নির্মম আলিঙ্গনে মারা গেছে মজুমদার আর তার সঙ্গীরা।

ভাঙা মহাকাশযান প্লুটোর মায়া কাটিয়ে সুদূর মহাকাশের দিকে ছুটে চলল প্রাথমিক ভরবেগে। ছোটো থেকে আরো ছোটো হয়ে গেল। তারপর সেটা প্লুটো নেপচুন ছাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল তারা খচিত মহাকাশের বুকে।

চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল স্বামীনাথনের বুক থেকে। কয়েকশো বা হাজার মাইল দূরেই রয়েছে আমোদ আহলাদ ভরা মিষ্টি জীবন। একবার যদি কোনো মহাকাশযান পেত! কোনো আশা নেই। শুধু নিরুপায় হয়ে চেয়ে থাকতে হবে মহাকাশের দিকে। যেখানে মহাশন্যের বুকে বিরামবিহীন পাক খেয়ে চলেছে পৃথিবী। মাটির পৃথিবী-জীবন ভরা পৃথিবী।

বারে বারে ধিক্কার দিল মানুষের সৃষ্ট আইন কানুনের প্রতি। কী ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর আইন। মহাকাশযান কেউ রাখতে পারবে না গ্রহ গ্রহান্তরের অবজারভেটরিতে। যে আসবে মহাকাশযানে তাকে কাজ হস্তান্তরিত করে সেই মহকাশযানেই ফিরে যেতে হবে পৃথিবীতে। প্রাণহীন বায়ুশূন্য সৌরজগতের একপ্রান্তে নির্বাসিত স্বামীনাথন। কেউ নেই। কিছু নেই। অবজারভেটরিও ক্ষয়প্রাপ্ত। শেষ ওর জীবনের ক্ষীণতম আশা। রেডিয়ো নেই। কোনো মহাকাশযান আসবে না এদিকে। যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল কালো আকাশ, জ্বলজ্বলে তারা আর ছোটো-বড়ো নানান আকারের কালো কালো পাথরের স্তূপ। নির্মম, নিষ্প্রাণ, নিথর মহাশূন্যের বুকে প্লুটো আপন মনে ঘুরে চলেছে সূর্যের চারপাশে।

মহাবিশ্বের প্রথম ও শেষ রহস্য বৈজ্ঞানিক স্বামীনাথনের করায়ত্ত। অথচ এত বড়ো আবিষ্কারের নায়ক আজ নিরুপায়, নিঃসঙ্গ একা এক গ্রহের বুকে।

দূর থেকে চোখ পড়ল অবজারভেটরির দিকে। চোখের সামনে তার দেওয়ালগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল বিশ্বগ্রাসী হাঁ-এর মধ্যে। চারপাশে এখন বিরাট এক অন্ধকার বৃত্তরেখা। ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে বৃত্তটা।

পাথরের উপর বসে পড়ল বৈজ্ঞানিক। ধীরে ধীরে সমস্ত ভাবনা মন থেকে দূর হয়ে গেল। খুব হালকা বোধ হল নিজেকে। এতেও অবাক হল না সে। কারণ তো তার জানা। প্রচণ্ড একাগ্র ইচ্ছাশক্তি, আর হ্রাসপ্রাপ্ত মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্যই এমন লাগছে। গ্রহের পাথর মাটি প্রভৃতি কঠিন বস্তুপুঞ্জ ধীরে ধীরে মহাকাশের অংশে পরিণত হচ্ছে। ধীরে ধীরে অদৃশ্যের পথে চলেছে সূর্যের দশম সন্তান প্লুটো। স্বামীনাথনেরও সেই সঙ্গে কমে চলেছে ওজন। কমছে ওজন প্লুটোরও। কমে আসছে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি।

এলোমেলো নানান চিন্তার ভিড় মাথার মধ্যে। ক্ষয়ে যাওয়া, ছোটো হয়ে যাওয়া গ্রহের একমাত্র জীবিত প্রাণী স্বামীনাথন। অবিশ্বাস্য এক ঘটনার একমাত্র সাক্ষী।

হায়! কেন যে উড়িয়ে দিল আগরওয়ালের মহাকাশযানটাকে। আজ যদি থাকত যানটা! কী ভুল! কী নিষ্ঠুর পরিহাস! বন্ধু হত্যার, সতীর্থ হত্যার এটাই কি চরম পুরস্কার? সত্যিই তো কি দোষ করেছিল আগরওয়াল? কোনো দোষ তো তার ছিল না? তবে কেন মৃত্যুদণ্ড দিল সে?

পায়ে পায়ে মৃত্যুরূপী শূন্যতা এগিয়ে আসছে স্বামীনাথনের দিকে। বিরাট এক অন্ধকার শামুক যেন ঢেকে ফেলছে প্লুটোর এবড়ো খেবড়ো মাটি পাহাড় আর পাথরগলো। যত বড়ো হচ্ছে ততই দ্রুত হচ্ছে ক্ষয়ে যাওয়ার গতি। দ্রুত থেকে দ্রুততর। দূরে চোখের সামনে আর শক্ত মাটি নেই। আছে শুধু তারা জ্বলা মহাকাশ।

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। ভগবান! ভগবানও পারবে না ঠেকাতে মৃত্যুকে। তিনি কি বলতে পারেন আর নয়, এখানেই নেমে যাক মৃত্যু! না, না, তিনিও হেরে যাবেন। কেউ এগিয়ে আসবে না স্বামীনাথনকে বাঁচাতে। আগরওয়ালের আত্মা নিশ্চয়ই হাসছে ওর অবস্থা দেখে। হাসছে আর বলছে— কেমন লাগছে বন্ধু! আনন্দে হাতহীন হাতে হাততালি দিচ্ছে আগরওয়ালের কবন্ধ দেহটা। আচ্ছা! কবন্ধ দেহটার মতো আত্মাও কি কবন্ধ হতে পারে?

এসব কি ভাবছে স্বামীনাথন! মৃত্যুর সম্মুখে একি প্রহেলিকা? না না, আশা যখন আর নেই তখন শান্তভাবে শেষটা যে দেখতেই হবে।

আবার শান্ত হয়ে এল স্বামীনাথন। স্বামীনাথন বৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞানী বলেই শেষ পর্যন্ত কৌতূহল থাকার প্রয়োজন ওর। কে কবে দেখেছে গ্রহের এমন অস্বাভাবিক অবিশ্বাস্য মৃত্যু। বিজ্ঞানী হিসাবে আর কি কেউ পাবে এমন জীবন হারানো, জীবন মাতানো সুযোগ!

ধীরে ধীরে কোমর থেকে খুলে নিল সেফটি সিলিন্ডার। মুখের ঢাকনা সরিয়ে দিল। স্পেশস্যুটের পকেট থেকে কাগজ বের করে খস খস করে একটানা সব ঘটনাই লিখল সে। লিখল তার অপূর্ব অভিজ্ঞতা আর বিস্ময়কর আবিষ্কারের কথা। তারপর কাগজটা সিলিন্ডারের মধ্যে পুরে শক্ত করে দিল ঢাকনিটা।

চারিদিক ভালো করে দেখে নিয়ে সিলিন্ডারের পেছনে লাগানো ছোট্ট রকেটটা চার্জ করে দিল স্বামীনাথন। মুহূর্তের মধ্যে দ্রুতবেগে ছুটে গেল সিলিন্ডারটা মহাকাশের দিকে।

অন্ধকার শূন্যতা একেবারে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতছানি দিয়ে ওকে ডাকছে। মিষ্টি হাসিতে ভরে উঠল স্বামীনাথনের সমস্ত মুখমণ্ডল। মনে মনে প্রশ্ন করল— জীবন আর কতক্ষণ?

ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল স্বামীনাথন। এখন একটা জিনিস জানার বাকি আছে। বাকি আছে শেষ অনুভূতির। পায়ে পায়ে এগিয়ে এল ক্রমবর্ধমান অন্ধকার বৃত্তের দিকে। মাথার উপর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে অজস্র তারা। উত্তেজনায় ঝুঁকে পড়েছে তারা ভরা কালো আকাশ খানা। ধীরে ধীরে হাত দুটো বাড়িয়ে ধরল অন্ধকার বৃত্তের দিকে।

ঝিম ঝিম করে উঠল সমস্ত দেহ। বৈদ্যুতিক আঘাতে অসার করে দিল সমস্ত বোধশক্তি। চোখের সামনে উবে গেল হাত দুটো। পায়ের তলায় চলে এসেছে পুঞ্জ পুঞ্জ অন্ধকার। ক্রম মহাশূন্যে বিলীন হয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে স্বামীনাথনের শরীরের অংশগুলো। নির্বাক নিস্পন্দ চোখ দুটো কেবল বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসা নিয়ে চেয়ে রয়েছে সামনের দিকে। জানতে হবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

অবশেষে মহাশূন্যে পরিণত হয়ে গেল স্বামীনাথন… খুনী স্বামীনাথন… বৈজ্ঞানিক স্বামীনাথনের দেহ মন আত্মা সব।

Tags: বড় গল্প, রণেন ঘোষ, সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!