ঝিঙ্গে-পোস্ত

  • লেখক: অমিতাভ রক্ষিত
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

 

– মৃত্যুহানা –

টক্‌ টক্‌ টক্‌! হরি আবার জোরে জোরে টোকা দিল ডা. যোশেফ মিত্রর দরজায়। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই টোকা দিয়ে চলেছে সে, কিন্তু ডা. মিত্র-র সাড়া দেবার নাম নেই! ধ্রুব মল্লিক এবারে পুরোপুরি অধৈর্য হয়ে গেল। “আরে, ওইরকম পিনিপিনে টোকা মারলে কিচ্ছু হবে নি, বাবুর শরীল খারাপ ছিল রাতে, জানিস না? খুব গভীরে ঘুমুচ্চে। দরজাটায় জোরে ধাক্কা মার।” ধ্রুব মল্লিক এখানকার কেয়ার টেকার। সবাই তাকে খুব মানে।

তখন হরি বেয়ারা দুম্‌ দুম্‌ করে ধাক্কা মারে দরজায়। “আরও জোরে মার্‌, শুনতি পাচ্ছে না।” কিন্তু মিনিট পনেরো ধরে দরজা ধাক্কিয়েও যখন কোনও সাড়া পাওয়া গেল, তখন জড়ো হওয়া সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকল। ধ্রুব মল্লিক বলল, ‘সরকারবাবুকে খবর দে, দরজা ভাঙতে হবে মনে হচ্ছে।” হরি তাড়াতাড়ি বলল, “দেখি, ম্যানেজারবাবুর কাছে ডুপ্পিকেট চাবি আছে বোধহয়। ওনাকে ডেকে আনি?”

ডেস্ক ম্যানেজার এসে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খোলেন। দেখা যায় যে ডা. মিত্র দেওয়ালের দিকে মুখ করে কুঁকড়ে শুয়ে আছেন। কিন্তু দু-তিনবার জোরে জোরে ডাকার পরেও কোনও সাড়া পাওয়া যায় না। ধ্রুব মল্লিক দৌড়ে গিয়ে এবারে ওঁকে পাশ ফিরিয়ে আনে। “বাবু! বাবু, সাড়া দেওনি কেনে?” কিন্তু কিছুক্ষণ ডা. মিত্রর মুখের দিকে তাকিয়ে একেবারে বুক ফাটা একটা চিৎকার করে ওঠে সে, “হায় হায়, এ কী হল? বাবু… ওরে আমাদের বাবু বোধহয় মরেই গেছেন। বাবু, বাবু… হরি, শিগগির দণ্ডপতি ডাক্তারকে মোবাইল কর্ বা তোর সাইকেলটা নিয়ে দৌড়ে যা।”

– উপক্রমণ –

আমি গৌতম দাশ। আমেরিকার বড় শহর বস্টনের উত্তর-পূর্ব কোনার এক ছোট্ট শহরের, একটা নিতান্তই মামুলি কলেজে অধ্যাপনা করি তখন। শহরটি সমুদ্রের ধারে। গত কয়েকশো বছর ধরে সেখানে সমুদ্রগামী জেলে পরিবারদেরই বাস বেশি। কলেজে গিয়ে প্রত্নতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব বা পুরোনো ইতিহাস শেখবার মতো ছেলে মেয়ে কম। তাই পদটা খালি ছিল বহুদিন। চাকরি খুঁজতে খুঁজতে শেষে সেখানেই গিয়ে আশ্রয় পাই একদিন।

তখনও ঝাড়া হাত-পা লোক। কলেজ ছুটি হলেই, আর কিছু করবার না পেলে, যখন তখন গাড়ি নিয়ে ছুটে বেরিয়ে পড়তাম বস্টন-কেম্ব্রিজের দিকে। ওখানের বড় বড় কলেজগুলোর লাইব্রেরি বা স্টুডেন্ট সেন্টারে গিয়ে বসে থাকতাম। আর সেগুলো কি এমনিই শুধু বড় কলেজ? তারা একেবারে বিশ্ববিখ্যাত! হার্ভার্ড, এমআইটি, বস্টন – কত আর নাম করব! সারা পৃথিবী থেকে গুণীজ্ঞানী ছাত্ররা আসে ওখানে – কথা বলতেও ভালো লাগে তাদের সঙ্গে! কত কিছু শিখতাম! কেউ কেউ বেশিক্ষণ কথা বলতে চাইত না, পড়াশুনায় ব্যস্ত; কেউ বা আবার একবার কথা বলতে শুরু করলে আর থামতেই চাইত না। কারুর ভয় হত, এই বুঝি স্কলারশিপের টাকা কাটা যায়; কারুর বা বাড়ির জন্য মন কেমন করত সারাদিন।

এভাবেই একদিন দেখা হয়েছিল বন্দনার সঙ্গে। বন্দনা বক্সী। একহারা চেহারা দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিল বাংলা মায়ের শ্যামলা মেয়েই বুঝি। তারপরে একদিন মোবাইলে চাপা গলায় বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলা শুনতে পেয়ে আর সন্দেহ রইল না। তবে বেশ কয়েকদিন চারিপাশে ঘুরঘুর করা সত্ত্বেও কিন্তু, সে আমার দিকে একবারও মুখ তুলে তাকায়নি। আমার মুখটা অবশ্য যে খুব একটা বিহ্বল হয়ে তাকাবার উপযুক্ত তা নয়। কিন্তু ‘মেয়েটি আমার দিকে নজর দিচ্ছে না’ – এই বলে যদি সব বাজে দেখতে ছেলেরাই পেছিয়ে যেত, তাহলে পৃথিবীতে জনসংখ্যা আরও অনেক কম হত। একদিন সোজা তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে খাঁটি বাংলায় বললাম, “নমস্কার, আমার নাম গৌতম।” সে সপ্রতিভভাবে আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “দাশ না দত্ত?” এবারে খাবি খাবার পালা আমার। ওর সঙ্গে সেদিন আমি কথা “বলবই বলব” বলে ঠিক করে গিয়েছিলাম। তাই স্যুটকেশ থেকে পাট ভেঙে একটা নতুন শার্ট পরেছিলাম – আমার জামাইবাবুর দেওয়া উপহার। তার বুকপকেটের ওপরে নক্সা করে লেখা ছিল ‘জি ডি’। বুঝলাম, আমি যে এতদিন কতবার অকারণে এদিক দিয়ে চক্কর দিয়ে গিয়েছি, সেটাও বোধহয় সে গুনে রেখেছে!

বন্দনা তখন এমআইটি-তে ‘কম্পিউটার ফরেন্সিক্স’-এর ওপরে পিএইচডি করছিল। পিএইচডি শেষ হবার আগেই আমরা বিয়ে করে ফেললাম। হয়তো আরও আগে করতাম – যদি আমার বিদ্যেবুদ্ধির ওপর ওর বাবা-মায়ের যথেষ্ট ভরসা থাকত। কিন্তু বন্দনাকে কেউ খুব একটা দমিয়ে রাখতে পারে না। কন্দর্প সাহেব আমার হয়ে একটা মোটাসোটা তির দিয়েই বিদ্ধ করেছিলেন তাকে। আর আমরা বন্দনার পড়াশুনার পরে কলকাতাতেই ফিরে যেতে চাই বলে, আমার অনেক দোষই মাপ হয়ে গিয়েছিল।

দেশে ফিরে গড়িয়াহাটা মোড়ের কাছে একটা অফিস বাড়ি ভাড়া করে বন্দনার নাম দিয়ে একটা কম্পিউটার কনসাল্টিং কোম্পানি খুলে বসলাম আমরা। প্রথম প্রথম বসেই থাকতাম বেশি। খদ্দেরের চেয়ে খোলা জানলা দিয়ে ঢোকা মাছির সংখ্যাই বেশি ছিল। কিন্তু আত্মীয়স্বজনদের পক্ষ থেকে সবারই অনেক প্রচেষ্টা ছিল যাতে আমাদের আবার আমেরিকা না ফিরে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত বন্দনার বাবাই একটা বড়গোছের কাজ জুটিয়ে দিলেন আমাদের। আর তাতেই আমাদের জীবনের মোড় ঘুরে গেল। তবে, তার আগে বন্দনার পরিবারের একটু পরিচয় দিয়ে রাখা ভালো।

বন্দনার কেশদাদু, মানে ওর ঠাকুরদাদা, একজন খুব নামকরা ডিটেকটিভ ছিলেন – সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী। বন্দনা তাঁর ঠাকুরদার একেবারে চোখের মণি ছিল। ব্যোমদাদু বলেই ডাকত তাঁকে। তারপরে একদিন সাত সকালে, সে ব্যোমকেশবাবুর কোনও এক মক্কেলকে কড়া নেড়ে নেড়ে ডাকতে শোনে, ‘সত্যান্বেষী, ও সত্যান্বেষী, বাড়ি আছেন’? চার বছরের বন্দনার খুব মজা লেগেছিল ডাকটা শুনে। তাই যখন সে বুঝতে পারে যে ডাকটা তার ঠাকুরদাদাকেই উদ্দেশ্য করে, তখন থেকে যখন তখন ব্যোমকেশবাবুর দিকে ডান হাতের তর্জনীটা দেখিয়ে, সে লাফিয়ে লাফিয়ে বলত ‘সত্য-নাশী, সত্য-নাশী’!!! যদিও তা শুনে ব্যোমকেশবাবু হো হো করে প্রাণ খুলে হেসে উঠতেন, ওই নামকরণটা কিন্তু ‘সত্যিমামা’, ওরফে বন্দনার ঠাকুমা সত্যবতী দেবীর, একেবারেই পছন্দ হয়নি। তিনি আবার খুব রেগে যেতেন। শেষপর্যন্ত রফা হল যে ঠাকুরদার নাম হবে কেশদাদু। তৎকালীন প্রায়-সম্পূর্ণ-কেশবিহীন ব্যোমকেশবাবুর, এই নামটা বিশেষ পছন্দ হয়েছিল।

বলা বাহুল্য, বক্সী বাড়িতে সত্যের অন্বেষণ প্রায় ইষ্টদেবতার মতনই ছিল। এমনকি বন্দনার ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলাতেও, ব্যোমকেশবাবুকে হতে হত চিরন্তন চোর; আর বন্দনা-দারোগার হাতে তাঁকে সবসময়েই ধরা পড়তে হত শেষমেষ। খোকাবাবু, মানে বন্দনার বাবা সত্যবান বক্সী, কিন্তু ওপথে আর যেতে চাননি। তিনি তাঁর বাবার বেশ কিছু টাকা মূলধন করে বিভিন্ন রকমের ব্যবসা করেছেন সারাজীবন এবং তা থেকে উপার্জনও করেছেন প্রচুর। এছাড়া অকৃতদার, পিতৃব্য-প্রায়, অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মৃত্যুর পর, তাঁর লেখা সব উপন্যাস ও বই-এর রয়্যালটিগুলোও বর্তায় খোকাবাবুর নামে। তাই খোকাবাবু, মানে আমার শ্বশুর মশাই, বহুদিন ধরেই তথাকথিত ‘পুঁজিপতি’, বা ‘ভেনচার ক্যাপিটালিস্ট’ বলে সর্বত্র পরিচিত।

আমরা যখন ১৩/২ ডোভার লেনে ব্যবসা খুলে মাছি তাড়াচ্ছি, সেই সময় শ্বশুর মশাই-এর প্রযোজিত একটি কোম্পানিতে পর পর কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যায়। সেখানকার একজন নামজাদা বৈজ্ঞানিক হঠাৎ রহস্যজনকভাবে মারা যান। কিন্তু পুলিশ এসে তদন্ত করা সত্ত্বেও তাঁর মৃত্যুর ঠিক কারণ কিছুটা ধোঁয়াশাতেই থেকে যায়, পুরোপুরি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তারপরে নাকি তাঁর আত্মাও ওখানে আটকে থাকে। সেই সূত্রে কলকাতার একজন ভূত বৈজ্ঞানিক ওখানে তদন্ত করতে যান। কিন্তু ভূত বলে কিছু নেই প্রমাণ করতে গিয়ে, তিনিও প্রায় একই রকমভাবে মারা যান। পরপর এইসব দুর্ঘটনায় কোম্পানির লোকজনেরা খুব দমে যায় – কাজকর্ম, উৎপাদন, সব প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হয়! এদিকে প্রতিদিন খোকাবাবুর পকেট থেকে হাজার হাজার টাকা বেরিয়ে যেতে থাকে! কীভাবে এই ছিদ্র বন্ধ করা যায় তা ভেবে ভেবে খোকাবাবুর নাওয়া খাওয়াই বন্ধ হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত একদিন খাবার টেবিলে বন্দনা বলল, “আজ কেশ-দাদু থাকলে একদিনেই তোমার এই রহস্যের সমাধান করে দিত!” তাই শুনে খোকাবাবু একটা অদ্ভুতরকম চোখ করে অনেকক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপরে ধীরে ধীরে বললেন, “তিনি তো আর নেই, কিন্তু তুই তো আছিস। যা না গিয়ে, দেখ কিছু করতে পারিস কিনা।”

“এ আবার কীরকম কথা বলছ তুমি, বাবা? তোমার কি মতিভ্রম হল নাকি?” বন্দনা একটু উষ্ণ হয়েই বলল “আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, গোয়েন্দা নই। আমি দেখে কী করব?”

“দেখতে ক্ষতি কি? ভগবান মাথায় বুদ্ধি তো দিয়েছে।”

“বুদ্ধি দিয়েছে তো কি হয়েছে? সে তো তোমাকেও দিয়েছে! তুমি গিয়ে সল্‌ভ করো না!”

শ্বশুর মশায় তখন আমার দিকে ফিরে বললেন, “গিয়ে দেখো না কেন তোমরা দুজনে, গৌতম? মক্কেল-ও তো কিছু খুব একটা কেউ নেই এখন তোমাদের! আমার ডেইলি প্রায় লাখ টাকা জলে যাচ্ছে; বেশিদিন এরকম চললে তো একেবারে ফতুর হয়ে যাব।”

আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। আড়চোখে দেখি বন্দনা স্থির চোখে তার ডান হাতের একটা আঙুলের ডগার ওপরের কয়েকটা শুকনো ভাতের দানাকে খুব মন দিয়ে নিরীক্ষণ করে যাচ্ছে। কেউ কোনও কথা বলছে না। এই অদ্ভুত নীরবতা কতক্ষণ চলল মনে নেই। শেষ পর্যন্ত শ্বশুর মশাই আবার বললেন, “আমি রীতিমতন তোমাদের কোম্পানির সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করে পাঠাব। যাবার খরচ-খরচা ও সময়ের মূল্য মিলিয়ে দু’ লক্ষ টাকা দেব। গিয়ে যদি কিছু সুরাহা করতে পার, তাহলে আরও দু’ লাখ। তা ছাড়া খুন-এর সমাধান করতে পারলে প্রতি খুনের জন্য এক লাখ টাকা করে নগদ।”

– শক্তিনগর কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড –

শক্তিনগর কোম্পানি লিমিটেড দূর থেকে দেখে মনে হয় একটা পাঁচিল ঘেরা, বড়সড়ো গোছের আশ্রম অথবা কোনও বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এটা আসলে একটা অত্যাধুনিক সৌর, বায়ু, জৈব ও অন্যান্য পুনরাবৃত্তিক বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন সংস্থা। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন শহরের পশ্চিম প্রান্তে, সুবর্ণরেখা নদীর ধারে উড়িষ্যার সীমানায়, অনেকটা জায়গা নিয়ে কোম্পানির চত্বর। কলকাতা থেকে যাওয়া খুব সহজ। ৬ নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে আড়াই ঘণ্টা নাক বরাবর পশ্চিম দিকে গাড়ি চালালেই খড়গপুর। তারপরে ৬০ নম্বর হাইওয়ে ধরে বাঁ হাতি, মানে দক্ষিণ দিকে ঘণ্টাখানেক গেলেই দাঁতন। সব মিলিয়ে ১৮০ কিলোমিটারের মতন। ট্রেনেও যাওয়া খুব সহজ। হাওড়া স্টেশন থেকে মুম্বাই যাবার যে কোনও ট্রেন ধরলেই সে থামবে খড়গপুরে। আর সেখান থেকে আবার দক্ষিণগামী সব ট্রেনই দাঁতনে থামবে। খোকাবাবু সেটা বললেনও একবার, “কেন আবার খরচ করে তেল কিনে পয়সা নষ্ট করবি, ট্রেন-এ করে খড়গপুর চলে যা না, আমি ভোলাবাবুকে বলব কোম্পানির গাড়ি নিয়ে তোদের খড়গপুরেই মিট করতে…” কথাটা অবশ্য শেষ হতে পারল না। বন্দনার কঠোর দৃষ্টি লক্ষ করে তাড়াতাড়ি কথা ফিরিয়ে বললেন, “গাড়িতে অবশ্য অন্য সুবিধে আছে, নিজের মতো করে ঘুরতে পারবি। জায়গাটা তো খুবই ঐতিহাসিক, গৌতমের হিস্ট্রিতে এত ইন্টারেস্ট যখন…”

আমাদের পরিচয় শুনে খুব খাতির করে সেলাম দিয়ে লোহার গেট খুলে দিল দারোয়ান। কোম্পানির পুরো চত্বরটা লাল রং-এর আট-ফুট উঁচু ইটের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। তার ওপরে আরও দু-ফুট মতন কাঁটা তারের জাল। কেবল ভেতর থেকে অনেকগুলো জার্মান উইন্ড-টারবাইন উঁচু হয়ে আকাশের দিকে মাথা চাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো সৌর প্যানেলের গুচ্ছ। দেওয়ালের সামনে দিয়ে সুবর্ণরেখা নদীর একটা ছোট খাল বয়ে গেছে। বড় রাস্তা থেকে কোম্পানিতে ঢোকার জন্য খালের ওপর দিয়ে একটা পাকা ব্রিজ করা আছে। তারই একদিকে গাড়ি আর অন্যদিক দিয়ে সাইকেল, স্কুটার, রিক্সা আর পদাতিকদের যাবার ব্যবস্থা। গেটের ভেতরে ঢুকলেই দারোয়ানদের বড় ঘর পড়ে প্রথমে। দেখা গেল জনা দশেক দারোয়ান সেখানে ডিউটি দিচ্ছে। পর পর সাজানো অনেকগুলো ভিডিয়ো মনিটর, পাঁচিলের ওপরে রাখা বিভিন্ন সিকিয়োরিটি ক্যামেরার চোখ দিয়ে কোম্পানি এলাকার চারিপাশে নজর রাখছে।

কর্ণ বাহাদুর মনে হল দারোয়ান তথা সিকিয়োরিটি দলের বড়কর্তা। একটু স্বল্প উচ্চতার মানুষ তিনি, হয়তো বা ৫’২”। কিন্তু প্রসারে সেটা পুষিয়ে নিয়েছেন বেশ। বয়স হয়েছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু তেমন বোঝা যায় না। এখনও পেশিবহুল, শক্তিশালী দেহ। কেবল ভুরুগুলোই যা একদম সাদা। তার নীচে ছোট ছোট চোখ দুটো স্নেহময়; কিন্তু প্রগাঢ় দৃষ্টিখানি যে চারিপাশের পৃথিবীর সব কিছুর ওপর সর্বদাই একসঙ্গে নজরে রাখছে তাতে কোনও সন্দেহ হয় না। তবে একটুখানি হাসিতেই সে দুটো যে কোথায় অতলে মিলিয়ে যায় তা বোঝা যায় না; যেন আর প্রয়োজন নেই বলে ক্যাপ দিয়ে ক্যামেরার লেন্স বন্ধ করা হয়ে যায়। শুধু সাদা দাঁতগুলো বুঝি কোনও এক হারমোনিয়ামের ঢাকনা খুলে বেরিয়ে এসে চকচক করে ওঠে। ক্যাপ বন্ধ করে বন্দনার দিকে এগিয়ে এসে কর্ণ বাহাদুর মিষ্টি হেসে বললেন, “তুমি খোকাবাবুর মেয়ে হচ্ছ? কত বড় হয়ে গেছেন তুমি! অনেকদিন আগে খোকাবাবুর সঙ্গে এসেছিলে একবার – তখন তো ছোট্ট খুকিটি ছিলেন! তারপরে শুনলাম তুমি আমেরিকা চলে গেলে। এসো, এসো।” বন্দনা আমার পরিচয় দিল। কর্ণ বাহাদুর আবার ক্যাপ বন্ধ করে হারমোনিয়ামের ঢাকা খুলে বললেন, “মুখার্জীবাবু বলেছেন আপনারা এলে সোজা ওঁর অফিসে পাঠিয়ে দিতে। এখান থেকে একটু ঘুরপথ আছেন – চিনতে কৌশিস হবে। ‘আদি’ আপনাদের নিয়ে যাবেন ঠিক।” বছর চোদ্দর একহারা চেহারার আদি, দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসল।

মুখার্জীবাবু, অর্থাৎ শ্রী দিলীপকুমার মুখার্জী, এমবিএ, শক্তিনগর কোম্পানির বড়বাবু – ফ্যাক্টরির ম্যানেজার। কোম্পানি পরিচালনা করবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাঁর। গত পঁচিশ বছর ধরে সারা ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ, মায়ানমার, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান জুড়ে, কয়লা বা পারমাণবিক চুল্লীর বদলে নতুন ধরনের প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ তৈরি করবার জন্য যেসব নতুন কোম্পানির সৃষ্টি হয়েছে, তাদেরই মধ্যে অগ্রগণ্য হল শক্তিনগর। শুধু শক্তিনগর থেকেই এখন প্রায় দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় উড়িষ্যা, ছত্তিসগড়, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক গ্রিডে সরবরাহ করবার জন্য।

শুনে আমি অবাক হয়ে বললাম, “বলেন কি? আপনারা একাই দশ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করেন? সে তো অনেক… এক-একটা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে তো একশো মেগাওয়াটই বার করা মুশকিল!”

মুখার্জীবাবু একটু হেসে বললেন, “না না, আপনি পুরোনো জমানার প্ল্যান্টের কথা ভাবছেন! শক্তিনগর তো স্পেশাল! আমাদের মতো নতুন প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন আগের থেকে অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। খোকাবাবুর তো আশা করেন যে আর পাঁচ-সাত বছরের মধ্যেই শক্তিনগরের উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাবে। আর তা না হলে হবে কী করে, বলুন?”

আমি ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে বললাম, “তার মানে?”

মুখার্জীবাবু বললেন, “আগামী পঁচিশ বছরে ভারতবর্ষে কতখানি চাহিদা হবে বিদ্যুতের জানেন? ২০২০ দশকের মধ্যেই, শুধুমাত্র ভারতের চাহিদাই ১২০০ টেরাওয়াট আওয়ার ছাপিয়ে যাবে! এছাড়া তো আমরা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান আর মায়ানমারেও কিছু কিছু করে পাঠাই। কিন্তু আমাদের এখন যা উৎপাদন ক্ষমতা তাতে কিছুই কুলোবে না! আমরা এখন পুরো বছরে ভারতবর্ষে মোট ১৫০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ বানাই মাত্র। সেটাকে যদি আরও ১০০ গিগাওয়াট বাড়াতে পারি, তবেই ভবিষ্যতের সেই চাহিদা মেটানো যাবে, তা না হলে ঘণ্টা!”

আমি অবাক। “বলেন কী! উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে? তা হলে তো আরও হাজার খানেক শক্তিনগরের দরকার হবে মনে হচ্ছে! আমাদের সরকার এ ব্যাপারে কিছু করছে কি?”

মুখার্জীবাবু হেসে বললেন, “তা করছে বইকি! এই পাওয়ার সেক্টরটা এতই বিশাল যে সরকার বাহাদুর হাত গুটিয়ে বসে থাকলে, আমরা যে তিমিরে সে তিমিরেই থেকে যাব। আমাদের খুব সৌভাগ্য যে পরপর বিগত সব ক-টা সরকারই, পাওয়ার সেক্টরের ওপরে বেশ জোর দিয়ে চলেছে। কিন্তু শুধু সরকার জোর দেখালেই তো চলবে না মশাই! সরকারের অত মূলধন নেই। প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজেরও খুব প্রয়োজন এখন। কিন্তু কোথায়? আপনার শ্বশুর মশায়ের মতন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন শিল্পপতি আছে ক-জন এ চত্বরে!”

আমি সায় দিয়ে বললাম, “হ্যাঁ, তা বটে! অথচ আজকালকার দিনে স্বকীয় ব্যবসা করবার যে কত বড় সুযোগ আছে বাঙালিদের এখন, তা বলে বোঝানো যায় না।”

মুখার্জীবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “তা আর বলতে? এই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ই দেখুন না কেন – তখন মিলিটারি সাপ্লাই আর স্পেকুলশনের ব্যবসায়ে শয়ে শয়ে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কত মূলধনই না বানিয়ে নিয়েছিল তারা! আর সেই মূলধনের জোরেই তো স্বাধীনতার সময় ‘বেঙ্গল’ সবচেয়ে বেশি শিল্পসমৃদ্ধ প্রদেশ ছিল – বোম্বাইয়ের থেকেও এগিয়ে ছিল! আর আজকে? ছ্যাঃ ছ্যাঃ!”

আমি আবার এইসব কথার মধ্যে পড়লে খুব উত্তেজিত হয়ে যাই। তাও একটু সংযত হয়ে গম্ভীরভাবেই বললাম, “আজও কিন্তু ঠিক একরকমই ঐতিহাসিক সুযোগ আছে একটা বাংলার শিল্পপতিদের, মুখার্জীবাবু। সে তাঁরা বাঙালিই হোন বা অন্য কোনও ভাষাভাষীই হন!”

বন্দনা এতক্ষণ কিছু বলেনি। এবারে হেসে ফেলে আমার হাত চেপে ধরে বলল, “আর ময়দানে বক্তৃতা দিতে হবে না গৌতম! শক্তিনগরের মৃত্যুগুলোর সমাধান তাড়াতাড়ি করতে না পারলে তো এই বেচারা সবেধন নীলমণি বাঙালি-ব্যবসাটাও উঠে যাবে এবারে!”

মুখার্জীবাবু বললেন, “ঠিকই তো। তা একটু চা আনাই আপনাদের জন্য?”

এবারে অধ্যাপকি কায়দায় একটা বেতের পয়েন্টার দিয়ে দেওয়ালের ওপরে সাঁটা একটা বড় ক্যাম্পাস-ম্যাপের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মুখার্জীবাবু বলতে শুরু করলেন, “আগে আমাদের ক্যাম্পাসটা আপনাদের একটুখানি চিনিয়ে দিই। আমরা এখন আছি এইখানে, অ্যাডমিনিসট্রেটিভ বিল্ডিং-এ। এটা মোটামুটি ক্যাম্পাসটার কেন্দ্রবিন্দুতে পড়ে। পুরো ক্যাম্পাসটা চারিদিক দিয়ে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা; তার ওপরে আরও দু-ফুট উঁচু করে খুব ধারালো বার্বড্‌ ওয়্যার, মানে কাঁটা তার, লাগানো আছে। চার দিকের দেওয়ালেই পর্যাপ্ত পরিমাণে সিকিয়োরিটি ক্যামেরা লাগানো আছে, আর পুরো ২৪ ঘণ্টা, ৩৬৫ দিন ধরেই একাধিক গার্ড, একাধিক জায়গা থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। ঢোকা-বেরোনো সব শুধু গেট দিয়ে। আমাদের পাঁচটা গেট আছে। আর প্রত্যেকটা গেটেই প্রচুর সিকিয়োরিটি। কাজেই পাঁচিল টপকে বা গেট দিয়ে সিকিয়োরিটিকে না জানিয়ে, আমাদের ক্যাম্পাসে ঢোকা-বেরোনো অসম্ভব।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “এত কড়াকড়ি কেন? খুব বিদ্যুৎ চুরি হয় বুঝি?”

বন্দনা একটু অসহিষ্ণু হয়ে বলল, “কি যে বলো গৌতম, বিদ্যুৎ কি মদ নাকি, যে বোতল ভরে চুরি করে নিয়ে যাবে?”

মুখার্জীবাবু আমাদের দাম্পত্য খুনসুটিটাকে একটু হেসে প্রশ্রয় দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, অত্যধিক কড়াকড়ি সন্দেহ নেই। তবে সেটা চুরি আটকানোর জন্য নয়। সত্যিই তো, পকেটে করে কেউ বিদ্যুৎ নিয়ে পালাতে পারে না। কিন্তু এটা এত হাই ভোল্টেজে উৎপাদন হয় যে তার থেকে ট্যাপ করে চুরি করবার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক “গবেট”-ই শক খেয়ে মারা যায়। সেটা আটকানো আমাদের কর্তব্য। তবে, আসল কারণ হল নাশকতা। পাওয়ার সেন্টার বলে আমরা সব সময়েই নাশকতার লক্ষ্য – রাজনৈতিক, এনভায়রনমেন্টাল, যা কিছু বলেন। এছাড়া আমাদের অনেক রকম রিসার্চও হয়। সেগুলো যাতে কেউ নষ্ট না করে, বা ডেটা চুরি করতে না পারে, তার ব্যবস্থা করাও আমাদের দায়িত্ব।”

“ঠিকই তো!” বন্দনা সায় দিল।

মুখার্জীবাবু বলে চললেন, “আমাদের ক্যাম্পাসে মোট প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জায়গা। পূবদিকের আড়াই হাজার একর মতন নিয়ে উৎপাদনের কাজ হয়। তার মধ্যে চাষের জমিও আছে। বাকি পাঁচশো একর নিয়ে রিসার্চ ল্যাবরেটরি আর অ্যাডমিনিসট্রেশন।”

“চাষের জমি কেন?” আমি প্রশ্ন করি।

“আমরা যে নানান রকম ফসল ফলিয়ে, তার থেকে বিভিন্ন রকমের বায়ো ডিজেল বানিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করি। সেই সঙ্গে আবার বায়ো ডিজেলগুলোকে ট্রেনের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্যও রিসার্চ করি আমরা। সেইসব রিসার্চ যেমন যেমন সফল হয়, তেমন তেমন বড় স্কেলে প্রয়োজন মতন ফসলও উৎপাদন করি। সেইজন্য আমাদের অনেকগুলো ‘হট হাউস’-ও আছে।”

আমরা দুজনেই সায় দেখিয়ে মাথা নাড়ালাম। মুখার্জীবাবু বলতে থাকলেন, “আমরা সবসময়েই নানারকম নতুন নতুন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করি। বিভিন্ন রকমভাবে বিদ্যুৎ বা অন্য ধরনের শক্তি উৎপাদন করাই হচ্ছে আমাদের ব্যবসা!”

“ঠিকই তো।” আমি সমর্থন করলাম।

“হ্যাঁ। কোনও কিছুই আমরা বাদ দিই না। এমনকি কোম্পানির বাইরেও যদি কেউ কিছু ভালো পদ্ধতি আবিষ্কার করে, তা সে রিসার্চ ল্যাবই হোক বা অন্য কোনও ব্যবসায়িক ভেনচার-ই হোক, সেগুলোকে নিজেদের মতন করে বাজিয়ে দেখতেও আমাদের কোনও দ্বিধা হয় না।”

“কী রকম?” বন্দনার প্রশ্ন।

“এই যেমন ধরুন, কিছুদিন আগে একটা আমেরিকান কোম্পানি বলে বসল যে তারা সোজাসুজি হাইওয়ে-র ওপরে পিচের বদলে সৌর প্যানেল বসাবে। ওদের তো মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার হাইওয়ে – তার এক দশমিকের ওপরেও যদি সোলার প্যানেল বসায়, – বুঝতেই পারছেন তাতেই কত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে!”

“সত্যিই তো! তা আমরা এরকম কিছু করতে পারি না?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

“চেষ্টা তো করছি! পেপার পড়েই আমরা বলাবলি করতে শুরু করলাম যে ব্যাপারটা আমাদের নিজেদের একবার বাজিয়ে দেখা উচিত। খোকাবাবুর অনুমতি পেয়েই কাজে লেগে গেলাম। আর এর উপকারিতা তো শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই নয় – আরও অনেক। ভেবে দেখুন, অল্প খরচে রাস্তার বেস বানিয়ে, তার ওপরে যদি তার মাথাটাকে পিচ দিয়ে মুড়তে না হয়, তবে কত শো লক্ষ টাকা পিচের খরচ বেঁচে যাবে বছরে বলুন?”

বন্দনা বলল, “ঠিকই তো। একে তো বিনা পয়সায়, তায় নতুন জমি জোড়া না করেই, হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়ে যাবে! তার ওপরে আবার কত সস্তায় রাস্তাও তৈরি হবে – পিচের খরচ লাগবে না!”

মুখার্জীবাবু খুশি হয়ে বললেন, “আমরা তো সেই ভেবেই প্রোজেক্টটা নিলাম। তবে ব্যাপারটা খাতায়-কলমে খুব ভালো হলেও, আসলে কাজটা তো সোজা নয়! পিচের বদলে সোলার প্যানেল – তার ওপর দিয়ে গরুর গাড়ি, ঠেলা গাড়ি, সব কিছু তো চলবে! এত কিছু সামলেও প্যানেলগুলোকে কাচের মতো পরিষ্কার থেকে যেতে হবে। বৈদ্যুতিন দিক থেকেও পুরোপুরি কর্মযোগ্য হতে হবে! অনেক ব্যবহারিক সমস্যা আছে এর। আর সে সব সমাধান যে আমাদের কোম্পানি থেকেই বেরোবে, এমনও কোনও গ্যারান্টি নেই, অনেকেই এ নিয়ে কাজ করছে।”

“আর কী প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

মুখার্জীবাবু ম্যাপের ওপরে আবার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে বললেন, “কোম্পানির উত্তর-পূর্ব দিকের কোনায় হচ্ছে আমাদের উইন্ড ফার্ম।”

“হ্যাঁ, ঢোকবার সময়ে উইন্ড মিলগুলো লক্ষ করেছি বটে!” আমি বললাম।

মুখার্জীবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, ওগুলো দেখেই আমাদের ফ্যাক্টরি বহুদূর থেকে চেনা যায়। অনেক পণ্ডিতই বলেন যে উইন্ড ফার্মে টাকা ঢালা খুব বোকামির কাজ। কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে যে একবার বানিয়ে ফেলতে পারলে, বিদ্যুৎটাতো তার পর থেকে বিনা পয়সাতেই তৈরি হয়ে যাবে! যত বানাবে, তত ফ্রি বিদ্যুৎ – শুধু বায়ু ম্যাপ দেখে এমন এমন জায়গায় বসাতে হবে যেখানে বেশির ভাগ সময়েই খুব জোরে হাওয়া চলাচল করে।”

“তাহলে ত্রিসীমানা খুঁজে পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতনে এসে কারখানা খুললেন কেন? এখানে বুঝি অনেক হাওয়া হয়?” আমি আবার প্রশ্ন করলাম।

“হ্যাঁ, মোটামুটি তাই-ই। এই এলাকায় একশো পঞ্চাশ মিটার উচ্চতার ওপরে প্রায় সবসময়েই হাওয়ার খুব জোর থাকে। আমরা জার্মানি থেকে অর্ডার দিয়ে টাওয়ার আর রোটর কিনি। তারপরে সেগুলোর মধ্যে আমাদের নিজস্ব ডিজাইনের বৈদ্যুতিন যন্ত্র লাগাই যাতে বিদ্যুৎ বেশি পরিমাণে তৈরি হয়। তবে জায়গাও অনেক লাগে— এক-একটা টাওয়ারের জন্য প্রায় এক একর জমি লাগে, যদিও উৎপাদনও হয় অনেক! প্রতিটি টাওয়ার থেকে প্রায় দু মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ বেরোয়!”

“কিন্তু উইন্ড ফার্মে হাওয়া থেমে গেলেই তো সব উৎপাদন বন্ধ! তখন কী করবেন?” আমি একটু চুটকি কাটলাম।

মুখার্জীবাবু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বললেন, “কথাটা ঠিকই বলেছেন। সেইজন্যই তো সব ক-টা টাওয়ার এক জায়গায় বসাতে নেই। আমাদের শুধু এই হেড কোয়ার্টারেই নয়, বায়ু ম্যাপ দেখে জেলার বিভিন্ন জায়গায় জমি কিনে, আমাদের এরকম আরও চারটে মিল বসানো আছে।”

বন্দনা জিজ্ঞেস করল, “বায়ু বিদ্যুৎ আপনাদের প্রোডাকশনের কত শতাংশ?”

“তা সব মিলিয়ে শতকরা চার-পাঁচ ভাগ বিদ্যুৎ আমাদের উইন্ড এনার্জি থেকে আসে বইকি! তবে সেটাকে বাড়াবার অনেক চেষ্টা চলছে এখন। আপাতত আমাদের প্রায় তিনশোটা টাওয়ার আছে।”

“আর থার্মাল প্ল্যান্টও তো নিশ্চয়ই আছে?”

“নিশ্চয়ই! উইন্ড ফার্মের নীচেই হচ্ছে আমাদের থার্মাল প্ল্যান্ট। বলতে লজ্জিত হচ্ছি, তবে এখনও আমাদের উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি আসে থার্মাল থেকে – মানে কয়লা পুড়িয়ে!”

“বলেন কি?” বন্দনা অবাক হয়ে বলল “আর কার্বন ফুটপ্রিন্ট?”

“খুব খারাপ” মুখার্জীবাবু এক কথায় স্বীকার করে নিলেন “কিন্তু কী আর করব বলুন! ব্যবহারিকভাবে বড় পরিমাণে বিদ্যুৎ বানাতে গেলে, এখনও পর্যন্ত হাইড্রো, কয়লা কিম্বা নিউক্লিয়ার ছাড়া তো আর কোনও গতি নেই। ‘ডিভিসি’-র মতো বড় বড় হাইড্রো প্ল্যান্ট আর আমরা কী করে বানাবো? যতদিন না কয়লার পুরোপুরি বিকল্প আমরা বড় স্কেলে তৈরি করতে পারছি, ততদিন পর্যন্ত আমাদের থার্মাল ছাড়া গতি নেই। তাই ক্রমাগতই থার্মালের কার্বন ফুট প্রিন্ট কমানোর জন্য রিসার্চ করে যাচ্ছি!”

“কিন্তু ডিভিসি না হলেও, ‘পাম্প স্টোরেজ’ করে জলবিদ্যুৎ করছেন কি?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

“সেটা কী?” আমি অবাক হয়ে গেলাম।

মুখার্জীবাবু বললেন, “হ্যাঁ, তাও করছি। তবে এখানে তো আর পাহাড় নেই, তবে এইরকম একটা প্রোজেক্ট আমাদের সাঁওতাল পরগনার প্ল্যান্টে আছে।”

তারপরে আমাকে দিকে ফিরে আবার বললেন, “পাম্প স্টোরেজ প্রকল্পটা তো আমাদের দেশে অনেক দিনই চালু হয়েছে। এর জন্য পাহাড়ের গায়ে, ওপরে ও নীচে, দুটো জলাধার তৈরি করতে হয়। দিনের মধ্যে যখনই চাহিদা কম দেখা যায়, তখনই নীচের জলাধার থেকে পাম্প করে জল তোলা হয় ওপরের জলাধারে।

“তারপরে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন ওপরের জল নীচের জলাধারে ফেলে টার্বাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এতে করে গরম কালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপরে কিছুটা চাপ কমে যায়।”

“তা এত রকমের চেষ্টা না করে এক-দুই ধরনের কাজে স্পেসালাইজ করলে বেশি ভালো হত না?” আমি একটু মুরুব্বির মতন করে বললাম।

মুখার্জীবাবু অবশ্য তাতে রেগে না গিয়ে বরং একটু হেসেই উঠলেন। তারপরে ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে বললেন, “কী জানেন তো, এই ধরনের কাজে আমাদের উৎপাদনের বাইরের অনেক কিছু চিন্তা করতে হয়। যেমন ধরুন কার্বন ফুটপ্রিন্ট! কার্বন ফুটপ্রিন্ট দিয়ে আমাদের আন্তর্জাতিক রেটিং হয় – যার ওপরে আমাদের কোম্পানির সুখ্যাতি নির্ভর করে। নানান ধরনের প্রোজেক্ট মিশিয়ে করছি বলে আমরা কোম্পানির ‘গড়’ কার্বন এমিশনের ‘স্কোর’টা অনেক কমিয়ে ফেলেছি – এখন আরও কমাচ্ছি।

“থার্মাল প্ল্যান্ট থেকে সাধারণভাবে অনেক বিষাক্ত গ্যাস বেরোয়। তাই তাদেরকে আটকে রেখে, নানান রকম রাসায়নিক পদ্ধতি দিয়ে বিশেষভাবে পরিষ্কার করে নিই আগে। তাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক বর্জ্য প্রায় অনেকটাই বাদ চলে যায়। তবে সে গ্যাসগুলোকে আমরা আবহাওয়াতে ছাড়ি! এই বিশেষ পদ্ধতিটার জন্য আমরা অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছি। আগামী সপ্তাহে তো চায়না থেকে কিছু লোকজন আসবে এখানে, এই পদ্ধতির একটা লাইসেন্স নিতে। তবে এখন আবার মিত্রদা মারা যাবার হুজুগে সব কিছু বানচাল না হয়ে যায়!”

“আর কি পদ্ধতি ব্যবহার করছেন?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

“সোলার অফ কোর্স! থার্মাল প্ল্যান্টের দক্ষিণ দিকেই হচ্ছে আমাদের সোলার প্ল্যান্ট। সেখানে দেখবেন খুব ঘন করে প্রায় পাঁচশো একর জায়গা নিয়ে, থাক্‌ থাক্‌ করে হাজার হাজার সৌর প্যানেল বসানো আছে। এছাড়া, পুরো দাঁতন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কম করে আরও হাজার দশেক প্যানেল বসানো আছে। সব প্যানেল থেকে সংগ্রহ করে কোম্পানির গ্রিডে বিদ্যুৎ নিয়ে আসা হয়।

“ওরে বাবা, সে তো তাহলে অনেক প্যানেল!” আমি অবাক হয়ে বলি।

“তা প্রোডাকশনের খাতিরে গুচ্ছের প্যানেল তো লাগবেই! বিভিন্ন জায়গা থেকে একটু একটু সংগ্রহ করে তবেই তো আমাদের মোট উৎপাদন বাড়ে!” মুখার্জীবাবু উত্তর দিলেন।

“রাস্তার ওপরে সৌর প্যানেল বেছাবার যে প্রোজেক্টের কথা বলছিলেন, তা কি কার্যকর হয়েছে এখনও?”

“হয়েছে বইকি! তার দরুনও বিদ্যুৎ আসে কিছু। এই জেলার বিভিন্ন জায়গায় এখনও পর্যন্ত প্রায় একশো কিলোমিটার জুড়ে রাস্তায় পিচের বদলে বিশেষ ধরনের সৌর প্যানেল বেছানো হয়েছে। হয়তো লক্ষ করেছেন যে ক্যাম্পাসের মধ্যের সব রাস্তাতেও ওই একই প্যানেল লাগানো আছে। এছাড়া, একই সঙ্গে নানাভাবে দিনের বিদ্যুৎ রাতের জন্য জমিয়ে রাখবার কাজ অনেক হচ্ছে।”

আমি এবারে একটু বিদ্যে জাহির করবার ইচ্ছেটা সামলাতে পারলাম না। বললাম, “কি, বড় বড় ক্যাপাসিটর তৈরি করছেন বুঝি?”

মুখার্জীবাবু হেসে উঠে বললেন, “আজ বহু বছর ধরেই ক্যাপাসিটর বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানাভাবে কাজে লাগে। তবে ঠিক বিদ্যুৎ ধরে রাখার কাজে অত আর ব্যবহার হয় না আজকাল, যদিও শুনেছি এমআইটি-তে কিছু কিছু নতুন কাজ হচ্ছে এই নিয়ে। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারি নিয়ে কাজকর্ম চলছে সারা পৃথিবীতেই। আমরাও অনেক রিসার্চ করছি। আমরা জাপানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘ফ্লো ব্যাটারি’ বলে এক ধরনের ব্যাটারি নিয়ে কাজ করছি। সেগুলো দিয়ে আমরা নিজেদের বাড়তি উৎপাদনও কিছু কিছু ধরে রাখতে পারছি। মনে হয় এই প্রযুক্তিটাই হয়তো ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখবার জন্য সবথেকে বেশি কাজে দেবে।”

বন্দনা সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, এমআইটি-তে থাকতে এই সম্বন্ধে কিছু কোর্স নিয়েছিলাম আমি। তা, আপনারা বিদ্যুৎ জমাবার জন্য হাইড্রোজেন বা সল্ট মাইনও ব্যবহার করেন নাকি”?

মুখার্জীবাবু বন্দনার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, আপনি অনেক কিছুই জানেন দেখছি। তা করি বই কি! দিনেরবেলা যা সৌর বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত হয় তাই দিয়ে জলের মলিকিউল ভেঙে হাইড্রোজেন বানিয়ে, সেগুলোকে হাই প্রেশারে সিলিন্ডারে ঢুকিয়ে রাখি। আবার রাত্তিরে সেই হাইড্রোজেন গ্যাস জ্বালিয়ে ইলেকট্রিসিটি তৈরি করি।”

“আর সল্ট”?

“সল্ট অনেক উত্তাপ ধরে রাখতে পারে। আমাদের ক্যাম্পাস থেকে মাইল দুয়েক দূরে দুটো বড় বড় নুনের খনি আছে আমাদের। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ দিয়ে দিনেরবেলা সেখানে জমা সল্টগুলোকে প্রচণ্ড গরম করে রাখি। তারপরে সেই উত্তাপ দিয়ে আবার জল থেকে বাষ্প করে, রাত্রে টারবাইন চালাই।”

“বাঃ!” আমি খুব চমৎকৃত হয়ে যাই।

“হ্যাঁ। আমরা দিনের বেলার উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ এইরকমই নানাভাবে সঞ্চয় করে রাতের বেলা কাজে লাগাই, যাতে করে রাতের উৎপাদন বেশি কমে না যায়। তবে আমাদের ব্যাটারি রিসার্চ শুধুমাত্র উৎপাদন ব্যাল্যান্স করবার জন্য নয়, আমাদের তৈরি কিছু ধরনের ব্যাটারি ভবিষ্যতে ইলেকট্রিক গাড়িতেও ব্যবহার করা যাবে বলে আশা করছি। প্রচুর পটেনশিয়াল!”

“হ্যাঁ, প্রচুর পটেনশিয়াল!” আমি সায় দিই।

“আপনারা তো পরে ড. সামন্ত-র সঙ্গে দেখা করবেন। তখন ওনাকে এইসব ব্যাপারে আরও প্রশ্ন করতে পারেন – উনি এই ফিল্ডে পৃথিবীর একজন অগ্রগণ্য বৈজ্ঞানিক।”

“আপনাদের উৎপাদনের কত ভাগ তৈরি হয় সৌরশক্তি থেকে?” বন্দনা এখনও ডেটা জোগাড় করতে ব্যস্ত!

“প্রায় তিরিশ শতাংশ। তবে আমাদের সৌর উৎপাদন এখন চড়চড় করে বেড়ে চলেছে। হয়তো আগামী বছরেই চল্লিশ পার্সেন্ট হয়ে যাবে।”

“বাঃ। অসাধারণ! আর কি ধরনের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন আপনারা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“দেখুন আমরা এনার্জি ফিল্ডে প্রায় সব কিছু নিয়েই পরীক্ষানিরীক্ষা করি। এই যেমন ধরুন, বায়ো ডিজেল, বা বায়ো গ্যাস। কয়লা ছাড়াও, বায়ো ডিজেল জ্বালিয়ে আমরা কিছু কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন করি এখন। কিন্তু বায়ো ডিজেল দিয়ে শুধু যে বিদ্যুৎ-ই তৈরি করি, তা কিন্তু নয়! আমরা পরিবহন ইন্ডাস্ট্রিকেও বিভিন্ন রকমের বায়ো ডিজেল সরবরাহ করি ট্রেনের ইঞ্জিন, ভারী ভারী বাস, লরি ইত্যাদিতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করবার জন্য।”

“হ্যাঁ, আমাদের প্রজন্মের সকলেই চায় পেট্রোলিয়ামকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে।” বন্দনা বলল।

“ঠিক! আমাদের বায়ো ডিজেল প্রোজেক্টগুলোও অনেকটা সেই উদ্দেশ্য নিয়ে করা। আমরা ‘প্ল্যান্ট বেসড’, বা উদ্ভিদ-নির্ভর বায়ো ডিজেল তৈরি করি। এ ধরনের বায়ো ডিজেলে কার্বন ফুটপ্রিন্ট অপেক্ষাকৃত কম। যেটুকু বা হয়, তার বেশির ভাগটাই উৎপাদন করবার সময় হয়। আমাদের লক্ষ্য উৎপাদনটা খুব পরিবেশ বান্ধবতা মেনে করতে পারা। আমরা বাংলাদেশের সাধারণ শাক-সবজি নিয়ে কাজ করি, কারণ আমাদের আবহাওয়াতে এরাই স্বাভাবিকভাবে বড় হয়। উৎপাদনের জন্য আমাদের যা শাক-সবজি লাগে, তা সবই আমরা এখানে চাষ করে বানাই।

“ওরে ব্বাবা! এ একেবারে কমপ্লিট ইকো-সিস্টেম!” আমি বলে উঠলাম।

“ঠিক তাই! এজন্য আমাদের অনেক এগ্রিকালচারাল স্টাফ এবং রিসার্চারও আছেন। ওই কৃষি বিভাগের কর্ণধার হচ্ছেন ড. মৈনুল ইসলাম। আগে তিনি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। উনি আমাদের এখানে একজন খুবই সম্মানিত ব্যক্তি। ওঁর সঙ্গে আপনারা এই বিষয় নিয়ে আরও বিশদভাবে আলোচনা করতে পারেন।”

বন্দনা বলল, “করব নিশ্চয়ই! কিন্তু আপনারা নিউক্লিয়ার নিয়ে কী কী কাজ করছেন?”

হঠাৎ এই প্রশ্নটা শুনে মুখার্জীবাবু একটু থতমত খেয়ে গেলেন। তারপরে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, ভেবে চিন্তে বললেন, “দেখুন, আপনি কোম্পানির চেয়ারম্যান, তথা একজন মালিক-এর মেয়ে। তাই আপনাকে ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বলছি। ভারত সরকার আমাদের খালি খালি অনুরোধ করে যাচ্ছিল থোরিয়াম রিসার্চে ঢুকতে। ভাবা সেন্টারে এ নিয়ে অনেক ভালো ভালো কাজ হচ্ছে বহুদিন ধরে। কিন্তু সেগুলো শুধু রিসার্চ। উৎপাদনের পদ্ধতি নিয়ে প্র্যাকটিকাল তেমন কোনও কাজ হয়নি খুব একটা। এবারে থোরিয়াম পাওয়ারের উৎপাদনের দিকটা এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সরকার আমাদের মতো কোম্পানিদের নিজের থেকেই অনেক টাকা গ্রান্ট দিতে আসছে। তা আমরাও সেই মতো কিছু কাজ শুরু করেছি।”

“সে তো খুব ভালো কথা। বাবা সে নিয়ে একবার কিছু কথা বলছিলেন আমাকে…” বন্দনা মন্তব্য করে।

“হ্যাঁ, কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে একটু সমস্যা, এই যা! এরা চায় যে নিউক্লিয়ার বোমা তৈরির ফ্যাক্টরিতে যেমন কড়া সিকিয়োরিটি হয়, আমরাও যেন তেমনি সিকিয়োরিটি লাগাই। এ নিয়ে অনেক ঝগড়াঝাঁটি করে তবে ওদের সঙ্গে রফা করতে হয়েছে। অত যে গুচ্ছ গুচ্ছ সিকিয়োরিটি ক্যামেরা দেখেছেন, সেগুলো আসলে ওই কারণেই!”

“ও, এইবারে বুঝলাম! তাই ভাবছিলাম, সিকিয়োরিটির এত কড়াক্কড়ি কেন! কী ধরনের নিউক্লিয়ার কাজ করছেন?” আমি বললাম।

“এখানে যে নিউক্লিয়ারের ঠিক কী ধরনের কাজ হচ্ছে, সে সম্বন্ধে বিশদভাবে কাউকে জানানো আপাতত বারণ। এটা গভর্নমেন্টের নিষেধ।”

“বা, তাহলে আমি কাজ করব কী করে?” বন্দনা অনুযোগ করল।

তখন একটু ভেবে মুখার্জীবাবু বললেন, “ঠিক আছে। একটু সংক্ষেপে বলছি এখন। পরে দরকার হলে ক্লিয়ারেন্স আনিয়ে আপনাকে আর একটু বিশদে বলা যাবে। থোরিয়ামের কাজে অনেক সময়েই একটা সাইক্লোট্রন লাগে – সেটা সাধারণভাবে মাটির তলাতে তৈরি করা হয়, আমাদেরও তাই। ওই যে চাষের জমির কথা বললাম বায়ো ডিজেলের জন্য, তার প্রায় তিরিশ ফুট নীচে আছে সাইক্লোট্রনটা। তিন বছর আগে পুজোর সময় একমাস ফ্যাক্টরি বন্ধ রেখে ভীত তৈরি করা হয়েছিল। তখন এই অ্যাডমিনিসট্রেটিভ বিল্ডিংটার নীচে আরও দুটো নতুন তলা বানানো হয়েছিল। সেগুলো থেকে সুড়ঙ্গ দিয়ে সাইক্লোট্রনে যাবার পথ করা হল। এর জন্য আমাদের নতুন লিফট-ও বসাতে হল। নতুন তলা দুটোয়, আর সুড়ঙ্গ পথের দুপাশে ভর্তি করে, নানান রকমের রিসার্চ ল্যাব তৈরি করা হল। বুঝতেই পারছেন যে খুব কম লোকেই নীচের তলাগুলোতে যাবার অধিকার পায়।”

“হ্যাঁ, তা তো বুঝতেই পারছি। সেখানে কাদের কাদের যাবার অধিকার দিয়েছেন সেটা জানা যাবে কি?” বন্দনা প্রশ্ন করল।

একটু ভেবে নিয়ে মুখার্জীবাবু বললেন, “যতদূর মনে পড়ছে, এই ফ্যাক্টরির মধ্যে এখন মোট তেরো জনের নীচে যাবার অধিকার আছে। অ্যাডমিনিসট্রেটিভ দিক থেকে দুজন জমাদার, দুজন পিওন, আমি, ড. বাগচি আর সরকারবাবু।”

“ড. বাগচি কে”?

“ললিতা বাগচি। একজন অগ্রগণ্য বৈজ্ঞানিক। উনি বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে হাই এনার্জি ফিজিক্স-এ পিএইচডি করে, ভাবা-তে বহুদিন ধরে একটা থোরিয়াম প্রোজেক্টের কর্ণধার ছিলেন। আমাদের গ্রুপ খোলার সময় গভর্নমেন্ট ওঁর নামই আমাদের কাছে সুপারিশ করে। উনিই আমাদের থোরিয়াম গ্রুপের ডিরেক্টর।”

“আর সরকারবাবু?”

“ওঁর পুরো নাম মলয় সরকার। উনি অপারেশন-ইন-চার্য, এই পুরো ফ্যাক্টরির – আমাদের মেজবাবু! আমার ঠিক নীচেই পজিশন ওঁর। ব্যবসার দৈনন্দিন কাজের সব কিছু খুঁটিনাটি ম্যানেজ করেন উনি। আপনাদের ওঁর কাছেই পাঠাব এর পরে। উনিই আপনাদের অনুসন্ধানের কাজে যত কিছু প্রয়োজন, তার সব কিছুর ব্যবস্থা করে দেবেন।”

বন্দনা জিজ্ঞেস করল, “আপনারা ছাড়া, আর বাকি ছ-জন কারা?”

“তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন যিনি, ড. যোসেফ মিত্র, তিনিই তো মারা গেলেন।”

“ও, তিনি ওই ছ-জনের মধ্যে একজন ছিলেন বুঝি? খ্রিস্টান?”

“হ্যাঁ। কত বড় নামজাদা বৈজ্ঞানিক যে ছিলেন উনি, সে আর কি করে বোঝাব আপনাদের। তাঁর বিভিন্ন কাজের জন্য নানা দেশ থেকে অনেক পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। ওঁকে হারিয়ে আমাদের যে কত ক্ষতি হল তা বোধহয় বলে বোঝান যাবে না। এত জ্ঞানী ব্যক্তি – অথচ চিরদিন গ্রামের ছেলের মতোই সরল রয়ে গিয়েছিলেন।”

“তাই নাকি?” বন্দনা বলল।

“হ্যাঁ। এই মেদিনীপুরেই কাছাকাছি কোন একটা গ্রামে বাড়ি ওঁর। আগে বোম্বেতে থাকার সময় বিয়ে করেননি, তবে পরে আমেরিকা গিয়ে একটি সুন্দরী মেমসাহেবকে বিয়ে করেছিলেন। শুনেছি সেই মহিলার পরিবার খুব গোঁড়া ছিল, খ্রিস্টান হতে হবে এই শর্তে তারা বিয়েতে মত দিয়েছিল। কিন্তু বিয়েটা টেকেনি। ডিভোর্স করে দেশে ফিরে আসেন, তবে ধর্মটা আর বদলাননি। এখানে একটা পুরোনো চার্চ আছে। সেখানে প্রতি রবিবার সকালে নিয়ম করে উপাসনা করতে যেতেন তিনি। ছেলে-মেয়ে, পরিবার কেউই নেই, অথবা বাকি নেই! একেবারে একা বলে আর বাড়িঘর কিছু করেননি – এখানেই থাকতেন। কোম্পানির গেস্ট হাউসেই পাকাপাকিভাবে থাকতে দিতে হবে, এই শর্তেই চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। কোম্পানির লোকজনই ওঁর পরিবারের মতো ছিল – সকলকে খুব ভালোবাসতেন। আর আমরা সকলেও ওঁকে একেবারে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতাম। আমার তো মনে হয় আমি আমার নিজের দাদাকেই হারিয়েছি।” মুখার্জীবাবু একটু চুপ করলেন। মনে হল যেন একটু নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করলেন।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বন্দনা আবার আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, “আর বাকি পাঁচজন?”

“দুজন হলেন নিউক্লিয়ার সায়েন্টিস্ট – সাহা ইন্সটিটিউট থেকে এসেছেন, ড. গোপাল সেন আর ড. মহম্মদ সিদ্দিকি। দুজনেই কলকাতার লোক। এখানে পুরো কাজ করেন না, সাহা-তে এখনও পড়ান। সপ্তাহে দু-তিনদিন করে এখানে আসেন – প্রধানত ওই সাইক্লোট্রন প্রোজেক্টে কাজ করতে। ওঁরাও ওই গেস্ট হাউসেই থাকেন, যখন আসেন। কিন্তু দুজনের কেউই অত আলাপী নন। নিজেদের বই পত্তর নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।”

“বাকি তিনজন”?

“তাঁরাও কলকাতার বাসিন্দা। দুজনে খুব নামি ইঞ্জিনিয়ার। এর আগে “ডিসিপিএল” কোম্পানিতে কাজ করতেন – সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের হয়ে হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিকাল পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করেছেন অনেক। নীলাঞ্জনা বসাক, আর সঙ্ঘমিত্রা তালুকদার। দুজনে খুব বন্ধু আর একসঙ্গে একই প্রোজেক্টে বহুদিন ধরে কাজ করেছেন। তাই দেখে আমিই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে ওঁদের একসঙ্গে এখানে আনলে কাজের মান বেশি ভালো হবে। আমাকে নিরাশ করেননি তাঁরা। দু-বছর আগে থোরিয়াম প্রোজেক্টে বদলি হবার আগে, আমাদের পাওয়ার গ্রিড, যাবতীয় দূরপাল্লার ইলেকট্রিকাল ট্রান্সমিশন লাইন, সব কিছুই ওঁরা তৈরি করে দিয়েছেন।”

“আর বাকি জন?”

“বাকি জন হল একটি ছাত্র, সুভাষ, মানে সুভাষ দাশ। সে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি-তে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করছে। গত একবছর ধরে এখানে ইনটার্ন হয়ে আছে। ড. সিদ্দিকির কাছে ট্রেনিং নিচ্ছে। এখানে এরকম আরও কিছু অল্পবয়সী বৈজ্ঞানিক আছেন, জানেন তো।”

“তাই নাকি? তাদের সকলেরই নিউক্লিয়ার ক্লিয়ারেন্স আছে বুঝি”?

“না না, নিউক্লিয়ারে শুধু সুভাষ। অন্যদের নাম হচ্ছে অনুপম দে, আর পার্থ ঘোষ – ওরা দুজনেই বায়ো ডিজেল প্রোজেক্টে কাজ করে। ও হ্যাঁ, ভুলেই গেছিলাম, পার্থ ঘোষেরও তো কিছুদিন আগে ক্লিয়ারেন্স করাতে হয়েছে। মিত্রদা ওকে দিয়ে থোরিয়ামের একটা কাজে কিছু কম্পিউটার প্রোগ্রাম করাতে চাইলেন।

“আর কেউ?”

“এঁরা ছাড়া প্রায় আরও জনা কুড়ি আছেন যাঁদের নীচে নামবার অধিকার দেওয়া আছে কাজের খাতিরে। তাঁদের নামও কি জানতে চান এখন?”

“তাঁরা কারা?”

“তাঁরা হলেন সব গভর্নমেন্ট অনুমোদিত এক্সটারনাল ওয়ার্কার্স। যেমন দেখুন, ভাবা কিম্বা সাহা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিকেরা কিছু আছেন যাঁরা আমাদের কাছে প্রায়ই আসেন। তা ছাড়া একটা রিসার্চ কোম্পানি থেকে কিছু কন্ট্রাক্ট ওয়ার্কারও আছে, যারা রোজ আসে নানান রকম টেকনিশিয়ানের কাজ করতে। গভর্নমেন্টই এদের খরচ দেয়।”

বন্দনা একটু ভেবে বলল, “আমি তো শুনেছি যে মৃত্যুর সময়টাতে ফ্যাক্টরি মোটামুটি বন্ধ ছিল। তখনও কি বাইরের লোকেরা সবাই আসছিলেন?”

মুখার্জীবাবু বললেন, “না, না। আমরা বছরের শেষের দিকটা সাধারণভাবে বন্ধ রাখি। রিসার্চের কাজ অল্পকিছুই চলে, যদিও প্রোডাকশনের কাজটা পুরো চালিয়ে যেতে হয়। মালি, রাঁধুনি, বেয়ারা – এরাও মোটামুটি সবাই থাকে। কিন্তু বাকি বেশির ভাগই ছুটি নিয়ে নেন। ওই মৃত্যুর সময় বাইরের কোনও ওয়ার্কার বা বৈজ্ঞানিকেরা – কেউ আসেননি।”

“তাহলে দরকার হলে তাঁদের নাম ঠিকানা পরে আমি সরকারবাবুর কাছ থেকে নিয়ে নেব। এখন আগে শুধু যাঁরা ঘটনার দিন হাজির ছিলেন তাঁদের সঙ্গেই কথা বলি। এখানে আপনার যা বলবার সব বলেছেন তো? বাকি কিছু দরকার হলে আপনাকে আমি নিজেই জিজ্ঞেস করে নেব।”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এই মুহূর্তে আমার আর খুব একটা কিছু বলার নেই। এখন আপনারা সরকারবাবুর সঙ্গে কথা বলুন আগে। উনি গেস্ট হাউসেই আছেন। আমাদের ক্যাফেটেরিয়াটা ওখানেই। সরকারবাবু প্রায়ই ওখানে বসে থাকেন। আদি আপনাদের নিয়ে যাবে। আদি-ইইইই।”

– গেস্ট হাউসে মৃত্যু –

বাইরে থেকে চট করে দেখলে শক্তিনগর গেস্ট হাউসকে একটা উচ্চবিত্ত, একতলা আমেরিকান হোটেল বলে মনে হয়। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলে সামনে বিরাট গোলাকৃতি ডাইনিং হল। বিভিন্ন টেবিলে বসে কিছু কর্মচারী জলখাবার খাচ্ছে। ডাইনিং হল থেকে বাঁ দিক আর ডান দিক করে চারটে হলওয়ে চারদিকে বেরিয়ে গেছে – রেসিডেন্সিয়াল হলওয়ে ১ থেকে ৪ নম্বর। প্রত্যেকটা হলওয়েতে দশটা করে ঘর। ডাইনিং হলের উত্তর দিকে, মাথার ওপরে লাগানো টুপির মতন চৌকো করে ভাঁড়ার ঘর, রন্ধনালয়, আর এঁটো কাপ-প্লেট বয়ে নিয়ে যাবার জন্য, অ্যাসেম্বলি লাইনের মতন করে একটা বেল্ট বাঁধা উঁচু রেল লাইন ভেতর দিকে চলে গেছে। সামনের দিকে খাবার পরিবেশনের সরঞ্জাম, কাচের আলমারির মধ্যে স্যালাড বার আর গরম খাবারের হাঁড়ি-কুড়ি। তার দু-পাশে চা-কফি ডিস্পেনশার ঘিরে বাবুর্চি আর বেয়ারারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আছে একটা ক্যাশিয়ারও।

আমরা ঢুকতেই সরকারবাবু নমস্কার করতে করতে উঠে দাঁড়ালেন। বেশ গৌরবর্ণ, একহারা চেহারা। মুখার্জীবাবুর মতন ভারিক্কি ব্যক্তিত্ব একেবারেই নয়। খুবই অমায়িক। মনেই হয় না তিনি অতবড় কোম্পানির মেজকর্তা।

স্বাগত জানাতে জানাতে সরকারবাবু বললেন, “কী খাবেন বলুন। লাঞ্চের সব ব্যবস্থাই আমাদের করা আছে, সেই তো ভোরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন – খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই!”

“না না, অনেক ধন্যবাদ। আমরা এখানে পৌঁছনোর একটু আগে রাস্তায় থেমে খেয়ে নিয়েছি। আর মুখার্জীবাবুও অনেক চা-বিস্কুট খাইয়ে দিয়েছেন। কাজেই এক্ষুনি কিছু আর চাই না।” বন্দনা প্রতি-নমস্কার করতে করতে বলল।

সরকারবাবু বললেন, “তাহলে বেশ। কাজ শুরু করে দেওয়া যাক এখনই। আমার অফিসটা আসলে ওই মুখার্জীবাবুর পাশের ঘরেই, কিন্তু আমি সাধারণভাবে লোকজনের সঙ্গে এখানেই দেখা করতে ভালোবাসি। দিনের অনেকটাই চা খেতে খেতে এখানে বসে কাটাই। তবে বাইরের লোক এলে, বা কিছু ব্যক্তিগত কথা বলার থাকলে, ওই কাচের ভিআইপি ডাইনিং বুথগুলোর মধ্যে কোনও একটাতে ঢুকে যাই। চলুন, ওই বাঁ দিকেরটা খালি আছে দেখছি, ওখানে চলে যাই।”

একান্তে বসতে বসতে সরকারবাবু বললেন, “খোকাবাবু বলে পাঠিয়েছেন যে আপনারা অন্তত চার-পাঁচ দিন থাকবেন এখানে। তাই এই গেস্ট হাউসেই ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আশা করি খুব একটা অসুবিধে হবে না। আপনারা ওই তিন নম্বর হলওয়েতে, ৩-১ নম্বর ঘরেই থাকবেন। যদি একটু বিশ্রাম করে নিতে চান আগে, তাহলে ঘর তৈরিই আছে। তা না হলে বলুন, কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি?”

বন্দনা বলল, “না না, এখনই বিশ্রামের কোনও প্রয়োজন নেই। বরঞ্চ পুরো ঘটনাটা ঠিক কীভাবে, কীসের পরে কী হল, তা একটু বিশদভাবে বুঝিয়ে দিন। আমি কাটা কাটা করে অনেক কিছু শুনেছি, কিন্তু একসঙ্গে ভালো করে পুরোটা কখনও শোনা হয়নি। ঘটনাগুলোর সময় বোধহয় ফ্যাক্টরি বন্ধ ছিল, তাই না?”

“হ্যাঁ, বছরের শেষের দিকটা আমরা সাধারণভাবে ফ্যাক্টরি বন্ধই রাখি, উৎপাদন বিভাগ ছাড়া। নানা ধরনের মেন্টেনেন্‌স-এর কাজ থাকে, আর লোকেরাও একটু ক-দিন বাড়ি গিয়ে বুড়ো বাবা-মায়েদের সঙ্গে দেখা করে আসবার সুযোগ পায়। পুজোর ছুটিতে তো সব বউ-বাচ্চা নিয়ে সিঙ্গাপুর আর থাইল্যান্ডে বেড়াতে যায়!

সরকারবাবু হঠাৎ একটু নিজের ছেলে মেয়েদের সম্বন্ধে অভিযোগ করে ফেললেন কিনা বোঝা গেল না, কিন্তু তিনি না থেমে বলে চললেন, “কিন্তু এবারে বড়ই ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটল ছুটির সময়। ড. মিত্র-র তো কোনও পরিবার ছিল না। তাই তিনি কোথাও যেতেন না, ছুটিও নিতেন না। কাজই ছিল ওঁর জীবন; প্রতিদিন, সারাদিন, ল্যাবে পড়ে থাকতেন। ২৩ তারিখে কোম্পানি খালি হয়ে গেল। গেস্ট হাউসও মোটামুটি খালি। মিত্রদা সাধারণভাবে বিকেলবেলা ঘরে ফিরে চান টান করার পরে একটু বিশ্রাম করে ডিনার করতে যেতেন। কিন্তু সেদিন বাথ টাব থেকে উঠে উনি কিচেনে ফোন করে বললেন যে ওঁর শরীরটা বেশি ভালো লাগছে না, খাবার জন্য আর ডাইনিং হলে আসবেন না। শুধু যেন একটু দুধ আর ফলমূল ওঁর ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওঁর আবার বাথ টাবে বসে প্রতিদিন বেশ ভালো করে বিলিতি সাবান, দামি শ্যাম্পু, সেন্ট, এসব মেখে চান করবার অভ্যেস ছিল, শাওয়ার নিতে পছন্দ করতেন না। আধঘণ্টাটাক পরে যখন বেয়ারা ওঁর ঘরে গিয়ে নক্‌ করল, তখন ‘আসছি’ বলে উত্তর দিয়েও মিত্রদা অনেকক্ষণ দেরি করে দরজা খুললেন। বেয়ারার কাছে ক্ষমা চেয়ে বললেন, ‘উঠতে পারছিলাম নারে ভাই, কিছু মনে করিস না। দে, খাবারগুলো ওই টেবিলে রেখে দে’।

“কিন্তু মিত্রদার চেহারা দেখে বেয়ারাটার মোটেই ভালো লাগছিল না। সে বলল, ‘ওকি বাবু, তোমার চোখদুটো অত লাল কেন’? মিত্রদা বললেন, ‘ও কিছু না রে। মুখে সাবান দিতে গিয়ে চোখে বেশ কিছুটা ফেনা ঢুকে গেছিল। তখন থেকেই জ্বালা করছে। তবে শরীরটা মোটেই ভালো লাগছে না একেবারে, মনে হচ্ছে যেন খুব জোর ফ্লু হতে চলেছে। এই নে, পাঁচটা টাকা। তোকে খুচরোই দিলাম, নোট খুঁজে পাচ্ছি না রে।’ বেয়ারা তখন বলল, ‘বাবু, ডাক্তার ডেকে আনি, নাকি তোমাকে হাসপাতালেই নে যাই’? তখন মিত্রদা ওর মাথায় একটু আদর করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘অত চিন্তা করতে হবে না রে হরি, ফ্লু হলে কি আর করা যাবে? তোর দুধটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি, সকালে উঠে যদি ভালো না লাগে তখন তুই ড. দণ্ডপাত-কে ডেকে আনিস।’ এমনই লোক ছিলেন তিনি – সকলকেই কত ভালোবাসতেন…”

“ড. দণ্ডপাত কে?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

একটু থেমে, নিজেকে সামলে নিয়ে সরকারবাবু উত্তর দিলেন, “ড. দণ্ডপাত এখানকার একজন খ্রিস্টান ডাক্তার, দাদার দেখাশোনা করতেন।”

“ও, আচ্ছা। তারপরে কী হল?”

“তারপরে আর কি! বেয়ারা চলে যেতে যেতে বলে গেল, ‘বাবু, রাত্রে কোন দরকার হলে বেলটা বাজিও, আমরা কেউ এসে যাব।’ আমাদের গেস্ট হাউসে চব্বিশ ঘণ্টা কাজের লোক থাকে। প্রত্যেকটা ঘরে কলিং বেল আছে। সেটা টিপলে সামনের অফিসে বাজে, আর কেউ না কেউ তক্ষুনি ঘরে চলে আসে কী দরকার দেখতে।”

“উনি বেল বাজিয়েছিলেন রাতে?”

“না, না, একেবারেই না! সে রাত্রে বেলটেল কিচ্ছু বাজেনি! সকালবেলায় যখন উনি ব্রেকফাস্টে এলেন না, তখন সন্দেহ করে হরি আর দু-তিনজন বেয়ারা মিলে গিয়ে ওঁর দরজায় নক করল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে, আর বারবার দরজা ধাক্কিয়েও কোনও সাড়া না পাওয়া যাওয়ায়, তারা শেষ পর্যন্ত ডেস্ক ম্যানেজারকে ডেকে এনে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খোলায়। দেখা যায় যে উনি দেওয়ালের দিকে মুখ করে কুঁকড়ে শুয়ে আছেন। বিছানায় কিছু এবং ঠোঁটের কোনায় বমি লেগে আছে। গায়ে ধাক্কা দিতে গিয়েই বোঝা যায় যে তিনি আর নেই। তবু ড. দণ্ডপাতকে ডাকা হয়। তিনি এসে পরীক্ষা করে বলেন যে মাঝরাতেই কোনও সময়ে মৃত্যু হয়ে গেছে।”

“হায় হায়!” আমি বলে উঠি।

“সত্যিই কি ট্র্যাজিক! আমি যতক্ষণে এসে পৌঁছলাম ততক্ষণে আরও অনেকেই ওখানে পৌঁছে গেছেন। যদিও ড. দণ্ডপাতের সঙ্গে কথা বলে মনে হল যে মৃত্যু স্বাভাবিক কারণেই হয়েছে, তবু আমি পুলিশে খবর দিলাম। এর আগে আমাদের ক্যাম্পাসের মধ্যে কোনও মৃত্যু ঘটেনি। তাই কী যে করা উচিত তা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। যাই হোক, দারোগাবাবু এসে ড. দণ্ডপাতের সই করা ডেথ সার্টিফিকেট দেখে বললেন, ‘ঠিক আছে, সৎকারে কোনও বাধা নেই। বডি নিয়ে যাও’।”

“কে বডি নিল? কে সৎকার করল?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

“চার্চ। মিত্রদার রক্তের সম্পর্কের কেউ কোথাও ছিল না বলে, ড. দণ্ডপাত ইতিমধ্যেই ওঁদের চার্চ থেকে কিছু লোকজন আনিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁরা বডিটাকে খ্রিস্টানভাবে কবর দেবার জন্য তৈরি করতে শুরু করল। কোম্পানির কর্মচারীরাও হাত লাগাল।

“প্রথমেই চেষ্টা করা হল কোনওভাবে ওঁর চোখ দুটোকে বুজিয়ে দিতে, কিন্তু কিছুতেই তা পারা গেল না। দণ্ডপাত বললেন, রিগোর মর্টিসের জন্য এখন আর বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু কী বলব আপনাদের, অত ভালো মানুষ লোক ছিলেন আমাদের দাদা, অথচ মৃত্যুর পরে তাঁর টকটকে লাল চোখ দুটো যেন সকলকে গিলে খেতে আসছিল। তা ছাড়া সাধারণভাবে মৃত্যুর পরে মুখের পেশিগুলো আলগা হয়ে গিয়ে কেমন একটা প্রশান্তির ভাব আসে মৃতদেহের মুখে। কিন্তু ওঁর দৃষ্টিতে, সারা শরীরে, একটা ভয়াবহ আতঙ্কের ভাব দেখা যাচ্ছিল। সেই ভাবটা আর তাঁর মরণান্তর লাল চোখের কঠোর দৃষ্টিটা মিশে একটা অসাধারণ পরিবেশের সৃষ্টি করছিল।”

“বাবাঃ। কল্পনা করেই আমার গা শিউরে উঠছে।” আমি বললাম

“তাও তো আপনি উপস্থিত ছিলেন না ওখানে। ভেবে দেখুন আমাদের কী অবস্থা! ক্রমে নানারকম কানাঘুষা শুরু হল। তারপরে সেটা বেড়ে রীতিমতন হইচই আরম্ভ হয়ে গেল। কেউ চাপা গলায় বলতে থাকল, ‘এই মৃত্যুর মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে – এত তাড়াতাড়ি কবর দেবার কি আছে’? কেউ চিৎকার করতে থাকল, ‘বডিটাকে এক্ষুনি এখান থেকে বার করে কবরে ঢুকিয়ে দে, বড্ড অলুক্ষুনে দেখাচ্ছে।’ পাশ থেকে একজন গর্জন করে উঠল, “খবরদার, কেউ বডিতে কেউ হাত দেবে না! খুন হয়েছে কি না দেখতে হবে’? শেষে অনেকেই আমাকে ডেকে বলল, ‘সরকারবাবু, এই মৃত্যুর তদন্ত হচ্ছে না কেন? তদন্ত হোক!’ অশিক্ষিত কর্মচারীরা বলতে শুরু করল, “বাবুকে দানোয় পেয়েছিল। এখান থেকে পালা, নয়তো দানো এবার আমাদের ধরবে।’ আমার তো তখন মাথায় বাজ ভেঙে পড়বার অবস্থা। মুখার্জীবাবু ছুটিতে, কোম্পানির সমস্ত দায়িত্ব একা আমার ঘাড়ে – কোম্পানির উৎপাদন, রিসার্চ – সব কোটি কোটি টাকার ব্যাপার। তেমন কোনও ঝামেলা হলে একদিনেই অনেক কিছু লাটে উঠে যেতে পারে।”

“তখন কী করলেন?” বন্দনা ধীরভাবে জিজ্ঞেস করল।

“কী আর করব! কোনওরকম করে অবস্থা সামলাবার জন্য আমি দারোগাবাবুকে আলাদা করে ডেকে অনুরোধ করলাম যে তিনি যেন যাহোক করে কোনও অফিসিয়াল তদন্তের নাম করে বডিটা এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। তাহলে লোকজন আপাতত শান্ত হবে। নয়তো কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলা যায় না। কোম্পানির অনেক রকম সমস্যা হবে। তখন ব্যাপারটা বুঝে, দারোগাবাবু সবাইকে ডেকে বললেন যে যদিও ডাক্তারের মতে স্বাভাবিক মৃত্যুই ঘটেছে, তবু মৃতদেহের অবস্থা দেখে তাঁর একটু খটকা লাগছে। তাই তিনি একটা ময়না তদন্ত করে দেখতে চান। তাতে কী জানা যায় দেখে, তবে সৎকার করা হবে। সরকারবাবুকে জানানো হবে রিপোর্টে কী পাওয়া গেল। আপাতত তিনি কনস্টেবলদের সাহায্যে, দেহটা ঠাণ্ডা ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে সেদিনকার মতন অবস্থাটা সামলানো গেল বটে, কিন্তু কোম্পানির মধ্যে বেশ একটা থমথমে ভাব এসে গেল।”

বন্দনা জিজ্ঞেস করল, “শেষ পর্যন্ত ময়না তদন্ত করা হল?”

“হ্যাঁ, তা হল বইকি! দেহটাকে পুলিশ ভ্যানে তুলে, দারোগাবাবু মিত্রদা-র ঘরটা পুলিশের ফিতে লাগিয়ে সিল করে দিলেন। আমাকে বললেন, ‘যতক্ষণ না আমার ফরেন্সিক টিম এসে সব কিছু পরীক্ষা করে আপনাকে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে যায়, ততক্ষণ যেন এই ঘরে কেউ না ঢোকে।’ পরদিন সকালে ফরেন্সিকের লোক এল। সারাদিন ধরে তন্ন তন্ন করে ওঁর ঘরটা খুঁজে পেতে দেখল। কিছু কিছু স্যাম্পলও প্লাস্টিকের খামে করে নিয়ে গেল। কিন্তু খুব একটা কিছু পেয়েছিল বলে মনে হয় না। আমাকে বলল ঘরটায় আর অনুসন্ধান করবার মতো কিছু বাকি নেই, কাজেই “সিল” খুলে দেওয়া হল।”

“তারপরে কী হল?”

“দু-তিনদিন পরে রিপোর্ট আর সৎকারের অনুমোদন এল। আমি আর ড. দণ্ডপাত কয়েকজন লোককে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে দেহ ছাড়িয়ে আনলাম। তারপরে অফিসের সকলকে জড় করে সব কিছু জানালাম। বললাম, ‘ভয়ের কিছু নেই, মৃত্যু স্বাভাবিকই ছিল।’”

“রিপোর্টে কী পাওয়া গেল”?

“আমার অফিসে একটা কপি আছে, আপনি যদি দেখতে চান তো দেখুন। তবে মোটামুটিভাবে ফুসফুসে কিছু জল জমে ছিল তা দেখা গেছে – বয়স্ক লোকেদের ঠাণ্ডা লাগলে নিমোনিয়া অনেক সময়েই হয়। ওঁর হয়তো কিছুদিন ধরেই ভেতরে ভেতরে নিমোনিয়া চলছিল; তারপরে আবার সেদিন সন্ধেবেলাটা স্নান করেছিলেন, সেটা হয়তো ঠিক করেননি। মনে রাখতে হবে যে এটা ঘটেছিল ২৩ ডিসেম্বর, আর সেদিন বেশ ঠাণ্ডাও পড়েছিল। করোনার বলেছেন ‘রেস্পিরেটরি ডিসট্রেস’ অর্থাৎ, শ্বাসকষ্টে উনি মারা গেছেন, ভেতরে ভেতরে নিমোনিয়া হয়ে থাকার দরুন।

“বডিতে বিষ পাওয়া গেছিল নাকি?”

“না, পাকস্থলী ভালো করে দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু তার মধ্যে বিষ-টিষ কোনও কিছু পাওয়া যায়নি। সেদিন রাত্রে তিনি যে শুধু দুধ খেয়ে ঘুমোতে গেছিলেন তাও প্রমাণ হয়েছিল। কাজেই এটাকে কোনওরকম অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে করোনারের মনে হয়নি।”

“রিপোর্টে আর কিছু ছিল?”

“হ্যাঁ, আরও দু-একটা পর্যবেক্ষণ করোনার সাহেব করেছিলেন, কিন্তু তেমন কিছু নয়। চোখটা ওঁর অস্বাভাবিকরকম লাল ছিল সেটা তো আপনাদের আগেই বলেছি। করোনার বলেছেন যে সাবানের ফেনা বেশি পরিমাণে চোখে ঢুকে গেলে এরকম হতে পারে। মিত্রদা নিজেই বলেছিলেন বেয়ারাকে, যে চোখে তাঁর অনেক সাবান ঢুকে গেছিল। এছাড়া, বাঁ দিকের চিবুকে আর ডান দিকের হাঁটুর বাইরের দিকে কিছু কালো ছোপ দেখা গেছিল। করোনার বলেছেন, সম্ভবত উনি বাথটাব থেকে উঠতে গিয়ে পা স্লিপ করে পড়ে যাচ্ছিলেন। তখন নিজেকে কোনওরকমভাবে সামলাতে গিয়ে চিবুকে আর হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন, আর তাতেই ওইরকম কালশিরে পড়ে গেছিল। সেটাও কিছু এমন অস্বাভাবিক মনে হয়নি তাঁর।”

“তবে এই মৃত্যু নিয়ে এত জল্পনা-কল্পনা, কাজ-কর্ম ঢিলে হয়ে যাওয়া – এসব কেন হচ্ছে তাহলে?” বন্দনা এবারে একটু তীক্ষ্ণভাবেই প্রশ্ন করল।

সরকারবাবু একটু ভেবে বললেন, “দেখুন, আমার মনে হয় তার দু-চারটে কারণ আছে। একটা হচ্ছে যে মিত্রদাকে সবাই অসম্ভব ভালোবাসত। ওঁর বৈজ্ঞানিক খ্যাতি বা সাফল্যের জন্য নয় – সেটা শুধু শ্রদ্ধা আনে। ভালোবাসত মানুষ হিসেবে। ওঁর কাছে ‘বাইরের লোক’ বলে কেউ ছিল না। সকলকেই তিনি আপনজনের মতন করে দেখতেন। তাই ওঁর মৃত্যুটা সকলের কাছেই একেবারে আপনজন হারাবার মতন দুঃখের হয়েছে। আর আমার মনে হয় এরকম দুঃখ থেকেই, আর সেই সঙ্গে মৃত্যুটা একটু অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল বলেই, নানান রকম জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়। তবু যা হোক, আর কিছু না হলে অন্যান্য মৃত্যুর মতো লোকে আস্তে আস্তে এটাকেও মেনে নিত, এবং কোম্পানির মধ্যের আবহাওয়াও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসত। কিন্তু…”

“কিন্তু কী?”

কিন্তু তারপরে কি হল, যে কিছুদিন পর থেকেই ওঁর বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে নানান রকম খুটখাট আওয়াজ শোনা যেতে লাগল, বিশেষ করে রাত্রিবেলা। মাঝে মাঝে কিছু লোকে আবার, দরজার তলা দিয়ে নীল রং-এর একটা আলো চলে বেড়াচ্ছে, এমনও নাকি দেখতে পেতে শুরু করল। তখন এই ‘নীল ভূত’ নিয়ে আর জল্পনা-কল্পনার শেষ রইল না…”

“তাই নাকি?” বন্দনা একটু হাসল “এখানে কি রাত্রে অনেক লোকে থাকে? কারা এইসব দেখতে পেত?”

সরকারবাবু বললেন, “বেশির ভাগই যারা এসব দেখত-শুনত, তারা নাইট ডিউটির কর্মচারী। আর হ্যাঁ, এখানে অনেকেই রাত্রে থাকেন। বিশেষ করে গবেষণা বিভাগের বৈজ্ঞানিক শ্রেণীর লোকজনেরা প্রায় সবাই। তাঁরা বেশির ভাগই কলকাতার লোক, দাঁতনে বাড়ি-টাড়ি করেননি। কোম্পানির গেস্ট হাউসে থাকেন সোমবার থেকে বৃহস্পতি বার। শুক্রবার কাজের পরে ফিরে যান কলকাতায়।”

“বুঝলাম। তা, এরপরে কী হল?”

সরকারবাবু বলে চললেন, “ভূতের ব্যাপারে যে মানুষের চিরন্তন একটা কৌতূহল আছে, সে তো সবাই জানে। এবারে কিচেনের পরিচারকদের কাছে এইসব ভূতের গুজব শুনে, এখানকার স্থানীয় কাগজের একজন রিপোর্টার একদিন আমার কাছে এসে অনুরোধ করল যে তাকে যেন আমরা আমাদের গেস্ট হাউসে একটা রাত কাটাতে দিই। সে সরেজমিনে পরখ করে দেখতে চায় যে এই ভূতের গল্পের কোনও সত্যতা আছে কিনা। আমি আর মুখার্জীবাবু এই নিয়ে কিছু আলোচনা করলাম। দুজনেই ভাবলাম, ভূত তো আর সত্যি সত্যি নেই। কাজেই একটা রিপোর্টার যদি আমাদের গেস্ট হাউসে এসে একটা রাত কাটায় তাহলে আর ক্ষতি কি? বরঞ্চ তার রিপোর্ট দেখলে হয়তো এইসব গুজব আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে।

“হ্যাঁ, তা সম্ভব বটে…”

“সম্ভব বটে, কিন্তু এখানেই আমরা ভুল করলাম। লোকটার সঙ্গে কথা বলে তাকে প্রথমে বেশ র‍্যাশনাল, বিজ্ঞান-সুলভ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষই মনে হয়েছিল। তাই দ্বিধা করিনি। কিন্তু তার রিপোর্ট যখন বেরোল, তখন দেখা গেল যে সে তো র‍্যাশনাল কিছু লেখেইনি, বরঞ্চ গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো, নিজের কল্পনা দিয়ে আরও অনেক কিছু ভৌতিক গল্প বানিয়ে বানিয়ে লিখেছে। আর যেহেতু গুজবটা এত নামকরা একজন বৈজ্ঞানিকের মৃত্যু নিয়ে, সেহেতু দেশের কিছু কিছু কাগজ আবার সে রিপোর্টটাকে একটা ‘মানবিক কৌতূহলের কাহিনি’ আখ্যান দিয়ে, পর পর নিজেদের কাগজে ছাপতে শুরু করল।”

“বলেন কী!” আমি একটু কাতর হয়েই বললাম।

“আর বলবেন না, গৌতমবাবু! শুধু তাই নয়, ক্রমে আমরা ফোন, চিঠি আর ইমেলেও নানান রকমের বেখাপ্পা অনুরোধ পেতে শুরু করলাম। শেষ পর্যন্ত কলকাতার জয়ন্ত মল্লিক বলে একজন ভূত বৈজ্ঞানিক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। উনি মোতিরাম কলেজের প্যারাসাইকোলজির অধ্যাপক। ভূতে একেবারেই বিশ্বাস করেন না। বরঞ্চ বহু জায়গায় গিয়ে গিয়ে ভূতের গুজব নস্যাৎ করে দিয়ে আসেন। তিনি অনেক করে চাইলেন এখানকার এই ব্যাপারটাকেও একটু বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করে ‘নীল ভূতকে’ ভুল প্রমাণ করে দিতে। ততদিনে আমাদের ভূতের গুজবটা সবে একটু কমতে শুরু করেছে – নীল ভূতকে বহুদিন দেখা যায়নি। তাই আমার মত ছিল যে এই ব্যাপারটাকে আর বেশি না খোঁচানোটাই সমীচীন। কিন্তু মুখার্জীবাবু বললেন যে বৈজ্ঞানিকভাবে গুজবটাকে নস্যাৎ করতে পারলেই সবচেয়ে ভালো হবে।”

“তিনি আসার পর কী হল তারপরে”? বন্দনা প্রশ্ন করল।

সরকারবাবু বললেন, “হ্যাঁ, জয়ন্ত মল্লিক শেষ পর্যন্ত এলেন ঠিকই। কিন্তু তিনি যে কী অদ্ভুত লোক তা আর কি বলব আপনাকে, ম্যাডাম। উনি মিত্রদার পুরোনো ঘরেই রাত কাটাতে চাইলেন! বললেন, ‘ভূত ভাগানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে একেবারে সোজা ভূতের ডেরায় গিয়ে পৌঁছোনো। আমি এখানে দু-তিন রাত্রি কাটালেই সব গুজব একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে দেখবেন।’ আমি আর কী করি তখন? সব ব্যবস্থা করে দিলাম।”

“বেশ তো, কিন্তু গণ্ডগোলটা হল কোথায়?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

সরকারবাবু বললেন, “প্রথমদিন তো সবই ঠিক ছিল। কিন্তু পরের দিন সকালে, অনেক বেলা হয়ে যাবার পরেও তিনি উঠছেন না দেখে, তাঁর দরজায় অনেক নক করা হল। তাতেও অনেকক্ষণ ধরে সাড়া না পেয়ে, শেষ পর্যন্ত আমাকে ডাকা হল। আমি গিয়ে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকে দেখি, তিনি বাথটাবেই জলের মধ্যে বসে মরে পড়ে আছেন।”

“কী করে?” আবার বন্দনার প্রশ্ন।

“কে জানে কী করে” সরকারবাবু একটু বিরক্ত হয়েই বললেন “পুলিশ এল, ডাক্তার এল, গোয়েন্দা এল, রিপোর্টার এল – আরও কত কে যে এল গেল, তা কে জানে! আমার তখন আর মাথা কাজ করছিল না। আবার একগাদা শুকনো ঝামেলা পোয়াতে হবে ভেবেই আমার রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছিল। আবার যে লোকটা মারা গেলেন, তাঁর জন্যও দুঃখ হচ্ছিল। সব মিলিয়ে সে এক বেয়াড়া কাণ্ড, বুঝলেন না!”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বন্দনা জিজ্ঞেস করল, “এবারেও কি সেই ড. দণ্ডপাতকেই ডেকেছিলেন?”

“হ্যাঁ, এখানে তো আর বেশি ডাক্তার নেই। তাই ওঁকেই ডাকা হল। ডেথ সার্টিফিকেট-ও উনিই দিলেন।”

“আর পুলিশ ময়না তদন্ত করল?”

“হ্যাঁ, করল বই কি।”

“তাঁর রিপোর্টে কী পাওয়া গেল?”

সরকারবাবু বললেন, “খুব একটা নতুন কিছু বেরোয়নি। করোনার লিখেছেন যে মৃত্যুর প্রধান কারণ, বাথটাবের জলে ডুবে যাওয়া। ওঁরও ফুসফুস জলে ভরা ছিল। কিন্তু কী করে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সামান্য একটা বাথটাবে ডুবে মারা যেতে পারে তা বলা মুশকিল। হয়তো অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে হুঁশ হারিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ রক্তে একটু অ্যালকোহল পাওয়া গেছিল। এছাড়া, মিত্রদার মতন জয়ন্তবাবুরও চোখ নাকি খুব অস্বাভাবিকরকম লাল হয়ে ছিল, যদিও কেন, তার কারণ খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। তবে করোনার তাঁর টিপ্পনিতে লিখেছেন যে চোখ লাল হওয়াটা মৃত্যুর কারণ হতে পারে না।”

“আর”? বন্দনা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আর খুব একটা কিছু রিপোর্টে ছিল না। যেহেতু জয়ন্তবাবুকে কর্মচারীরা বা বৈজ্ঞানিক স্টাফ কেউ চিনত না, সেহেতু কারুর তেমন আবেগ দেখা যায়নি। কেবল বডি নিয়ে যাবার সময় ওঁর স্ত্রী এবং কন্যার বুক ফাটা কান্না দেখে অনেকেরই চোখে জল এসে গিয়েছিল।

“কিন্তু তা সত্ত্বেও তো শুনেছি কাজকর্ম সব লাটে উঠে গেছিল…”

“এক্কেবারে! কি হল, যে কোম্পানির মধ্যে তেমন কোন আবেগ দেখা না গেলেও, সবাই কেমন চুপ মেরে গেল। অনেক লোক কামাই করতে শুরু করল। যারা এল, তারাও তেমন ভালো করে কাজ করতে পারল না। উৎপাদন প্রায় তিরিশ পার্সেন্ট নীচে নেমে গেল, আর কোম্পানিটা ক্ষতিতে চলতে শুরু করল। খোকাবাবু অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন, আর মুখার্জীবাবুর নাওয়াখাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তিনি সারাদিন ধরে এদিকওদিক ঘুরে ঘুরে, সকলের সঙ্গে কথা বলে বলে, কর্মচারীদের উৎসাহ দেবার চেষ্টা করতে থাকলেন। কিন্তু কিছুতেই ‘মর‍্যাল’ আর বাড়ল না।”

“হ্যাঁ, সেটাই বাবা বলছিলেন।”

“মর‍্যাল ভেঙে গেলেই যত মুশকিল হয়! আমরা তাও যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। এমন কি, কিছুদিন আগে একটা চড়ুইভাতি আর স্পোর্টস মিটেরও একটা ব্যবস্থা করেছিলাম আমি নিজে। কিন্তু সেটাকেও শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হল।”

“কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“কেন না কেউ যেতে চাইল না তেমন!”

“তারপরে?”

“তার পরে আর কি?” সরকারবাবু আমার দিকে ফিরে বললেন “তারপরে শুনলাম খোকাবাবু আপনাদের দুজনকে পাঠাচ্ছেন। দেখা যাক আপনারা নতুন চোখ দিয়ে দেখে রহস্যটার কোনও কূলকিনারা করতে পারেন কিনা। মৃত্যু দুটোকে সঠিকভাবে এক্সপ্লেন করতে পারলে লোকজন অনেক স্বস্তি পাবে। কারণ বেশির ভাগ লোকই মনে করছে যে এরকমভাবে পরপর দুটো মৃত্যু কোনওমতেই স্বাভাবিক হতে পারে না। পুলিশ এখনও পর্যন্ত কোন কিছুর সমাধান করতে পারেনি।”

বন্দনা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে বলল, “আমি দেখছি কোনও কিছু কাজের কাজ করতে পারি কিনা। আমার তো এর আগে এইসব ব্যাপারের কোনও অভিজ্ঞতা নেই, তবু চেষ্টা করে দেখছি কিছু করতে পারি কিনা। আপনি প্লীজ আমাকে ড. দণ্ডপাত আর পুলিশ ইন্সপেক্টরের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিন। ওঁদের সঙ্গে একটু কথা বলি। এছাড়া যাঁরা মিত্রবাবুর মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাঁদের সঙ্গেও আলাপ করি। তবে সবচেয়ে আগে আপনার অফিস থেকে ময়না তদন্তের রিপোর্ট দুটো নিয়ে একটু ভালো করে পড়ে দেখি।”

সরকারবাবু বললেন, “বেশ তো, চলুন আমার অফিসে।”

– তদন্তের ময়না তদন্ত –

পরবর্তী দু-দিন বন্দনা বিশেষ কথাবার্তা বলতে চাইল না। সারাদিন ধরে কম্পিউটারে অনেক পড়াশুনা, শক্তিনগরের শ’য়ে শ’য়ে লোকের সঙ্গে কথা বলা, দিনে দু-তিন বার করে থানায় যাওয়া, ড. দণ্ডপাতের সঙ্গে বারবার কথা বলা, ইত্যাদি নিয়েই সব সময় কাটিয়ে দিল। দুয়েকবার বললাম, “চল, দাঁতন শহরটা একটু ঘুরে দেখে আসি, অনেক কিছু দেখবার আছে।” কিন্তু বন্দনা বলল, “দাঁড়াও, আগে কাজটা হয়ে যাক, তারপর।”

তিন দিনের দিন বন্দনা বলল, “সরকারবাবুর কাছে যেতে হবে, চল। কথা আছে।” বন্দনার এরকম মূর্তি আমি আগেও দেখেছি; তাই আর কথা না বাড়িয়ে সরকারবাবুর খোঁজে বেরোলাম দুজনে। ওঁকে পাওয়া গেল ক্যাফেটেরিয়াতেই।

একটা কাচের বুথে ঢুকে বন্দনা বলল, “সরকারবাবু, এ মৃত্যুগুলো কিন্তু স্বাভাবিক নয়। মিত্র বাবু-র দেহ ‘এক্সহিউম’ করে – মানে কবর থেকে তুলে, আবার পরীক্ষা করতে হবে।”

সরকারবাবু হতবাক হয়ে বললেন, “বলেন কি ম্যাডাম? ড. দণ্ডপাত, করোনার, পুলিশ – সবাই বলেছে স্বাভাবিক মৃত্যু। আর আপনি বলছেন বডি এক্সহিউম করতে? সে তো প্রায় অসম্ভব।”

বন্দনা একটু হেসে বলল, “কেন, আপনি তো নিজেই সেদিন বললেন যে বেশির ভাগ লোকেই মনে করছে মৃত্যুগুলো অস্বাভাবিক। তাহলে আমি বলাতে আপনার এত আপত্তি কেন?”

সরকারবাবু একটু অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে বললেন, “না, মানে আপনি এক্সহিউম-এর কথা তুললেন কিনা, তাই। ওটা তো খুব বড় একটা স্টেপ। কোর্টে বিচারকের কাছে গিয়ে অ্যাপিল করতে হবে, অনেক কারণ দেখাতে হবে, আগের ময়না তদন্তে যে কিছু ভুল হয়েছে সেটা প্রমাণ করতে হবে, তবে তো! এ কাজ খুবই শক্ত। একেবারে নিশ্চিত না হলে এ রকম স্টেপ নেওয়া খুব মুশকিল, বুঝলেন না!”

বন্দনা বলল, “সে তো বুঝেই বলছি। আমি একেবারে নিশ্চিত। আপনাকে বলছি কেন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি আমি। দেখুন, আমার প্রথম সন্দেহ হয়েছিল জয়ন্তবাবুর মৃত্যুর রিপোর্ট পড়ে। আমি ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেছি সেদিন। উনি খুবই স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। কখনও অসুস্থ হতেন না – কাশি, জ্বর – কিছুই হত না প্রায়। আর মদও যে একেবারে খেতেন না, তা নয়। বাড়িতে সন্ধেবেলা প্রায়ই একটু আধটু পান করতেন। কাজেই অভ্যেস ছিল। সেই মানুষ মাত্র দু-চারটে পেগ হুইস্কি খেয়েই এমন অসুস্থ হয়ে পড়বেন, যে চান করতে গিয়ে বাথটাবে ডুবে মরে যাবেন? সেটা আমার পক্ষে বিশ্বাস করাটা একটু মুশকিল হচ্ছিল…”

“আমারও তো! তাই তো বলছিলাম আপনাদের সেদিন…”

“হ্যাঁ, মনে আছে বইকি! শুনে তো আমার তখনই সন্দেহ হচ্ছিল। এমন নয় যে এরকম ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি। ঘটেছে। কিন্তু সেরকম প্রায় সব ক্ষেত্রেই, জলের মধ্যে ইলেকট্রিক শক খাওয়াটা একটা প্রধান কারণ থাকে। সুস্থ লোকের পক্ষে এভাবে বাথটাবে ডুবে মরার সম্ভাবনাটা দশ লক্ষের মধ্যে একও হবে না।”

সরকারবাবু বাধা দিয়ে বললেন, “কিন্তু করোনার যে ওঁদের দুজনের ফুসফুসের মধ্যেই জল পেয়েছিলেন। সে জন্যেই তো বলেছেন, হয় নিমোনিয়া, নয় বাথটাবের জল নাক দিয়ে ফুসফুসে গিয়েছে। স্বাস্থ্যবান তো ফুসফুসে কি করে জল ঢুকল?”

বন্দনা বলল, “আমিও তো একই কথা ভাবছিলাম। কী করে! চিন্তা করছিলাম যে যদি নাক দিয়ে না হয়, তাহলে আর কীভাবে ফুসফুসে জল যেতে পারবে? উত্তর, নিশ্চয়ই কোনওরকম বিষ প্রয়োগে এরকম হয়েছে। চিকিৎসা শাস্ত্রে অন্তত চার-পাঁচ রকমের বিষ আছে, যারা কোনওভাবে শরীরে প্রবেশ করলে, মৃত্যুর পরে ফুসফুসের মধ্যে জলের মতো তরল পদার্থ খুঁজে পাওয়া যায়।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ। কিন্তু বিষ থাকলেই তো আর হল না, সেটা এখানে দাঁতন শহরে আসবে কী করে? খুনী সুবিধের জন্য সাধারণভাবে এখানের কাছাকাছি বা অন্তত ভারতবর্ষের মধ্যে সহজে পাওয়া যায়, এমন কিছু বিষ নিশ্চয়ই ব্যবহার করবে। কিন্তু কী এমন বিষ আছে হাতের কাছে, যা ফুসফুসে জল জমিয়ে দিতে পারে? এইসব কথা ভাবতে ভাবতে সেদিন বিকেলবেলা আপনাদের ক্যাস্টর অয়েল প্রোজেক্টের অফিসের কাছে ঘুরছিলাম। আর তখনই হঠাৎ আমার প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে গেলাম।”

“উত্তরটা কী?” সরকারবাবু উদগ্রীব হয়ে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলেন।

“বলছি, বলছি, একমিনিট!” বন্দনা একটু হেসে বলল “আপনাদের ক্যাস্টর অয়েল অফিসের পাশে দেখলাম অনেক বর্জ্য…”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা তো আমাদের একটা বাই-প্রোডাক্ট…অনেক প্রফিট হয় ওটা থেকে।”

“শুনলাম। ড. মৈনুল ইসলাম তাই বললেন। আপনারা বিচি থেকে ক্যাস্টর অয়েল প্রেস করে তেল বার করে নেবার পরে যা বর্জ্য হয়, সেটাকে পশুখাদ্য হিসেবে বিক্রি করে দেন। তাতে কোনও অসুবিধে নেই, বর্জ্যটা যথার্থই পশুখাদ্য। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যে সেই বর্জ্য থেকে আবার যে কেউ সামান্য চেষ্টাতেই, “রাইসিন” বলে একধরনের পদার্থ বার করে নিতে পারে এবং সেটা মানুষের পক্ষে একটা অতি মারাত্মক ধরনের বিষ।”

“তাই নাকি?” সরকারবাবু চমকে উঠলেন।

“হ্যাঁ। খুব সামান্য পরিমাণেও যদি রাইসিন কোনওভাবে আমাদের রক্তের মধ্যে প্রবেশ করে, তবে মৃত্যু অবধারিত! আর সেই মৃত্যুর পরে ফুসফুসে জলের মতো তরল পদার্থও জমতে দেখা যায় – ঠিক যেমন এই দুটো ময়না তদন্তে দেখা গেছে।”

সরকারবাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “কিন্তু তাহলে কী করে করোনার এরকম ভুল করলেন? পরপর দু-বার? রাইসিন বলে চিন্তাও করলেন না?”

বন্দনা বলল, “হ্যাঁ, এই নিয়ে আমিও ক্রমাগত ভেবে চলেছি। রাইসিনে মৃত্যু হতে দেড় থেকে তিনদিন লাগে। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রেই আট-দশ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে। কাজেই এগুলো কি সত্যিই রাইসিনে মৃত্যু? নাকি অন্য কিছু? এর উত্তর আমি জানি না।”

“আমি তো জানিই না…”

সরকারবাবুর স্বগতোক্তিটার কোনও উত্তর না দিয়ে বন্দনা বলে চলল, “আবার এমনও হতে পারে যে খুনী অত্যন্ত বেশি মাত্রায় রাইসিন প্রয়োগ করেছিল বলে মৃত্যুও খুব তাড়াতাড়ি হয়েছিল। তা ছাড়া সাধারণভাবে রাইসিনে মৃত্যুর পরে, দেহে বিষ প্রয়োগস্থলে যে ধরনের বিস্তৃত কালো ছোপ ছোপ চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলো এ দেহগুলোতে কোথাও দেখা যায়নি। সেরকম কোনও চিহ্ন পেলে করোনার মশায় নিশ্চয়ই অন্যরকম পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে চাইতেন যে রাইসিন শরীরের মধ্যে আছে কিনা।”

“ঠিকই তো!” সরকারবাবু সায় দেন।

কিন্তু বন্দনা তখন যেন একটা ঘোরের মধ্যেই বলে চলল, “তবে হ্যাঁ, পরিচিত চিহ্ন না পেলেও কিন্তু, করোনার মশাই মিত্রবাবুর দেহে দুটো কালশিটে লক্ষ করেছেন – বাঁ দিকের চিবুকে আর ডান দিকের হাঁটুর বাইরের দিকে। উনি বলেছেন যে মিত্রবাবু সম্ভবত বাথটাব থেকে উঠতে গিয়ে পা স্লিপ করে পড়ে যাচ্ছিলেন। তখন নিজেকে কোনওরকমভাবে সামলাতে গিয়ে চিবুকে আর হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন, আর তাতেই ওইরকম কালশিটে পড়ে গেছিল।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলেছিলেন তো, মনে আছে আমার।” সরকারবাবু বললেন।

“কিন্তু বাঁ দিক করে পড়ে যেতে যেতে কেউ একসঙ্গে বাঁ দিকের চিবুকে আর ডান দিকের হাঁটুর বাইরের দিকে চোট পেতে পারে না – ভেবে দেখুন! ওটা একেবারেই অসম্ভব। হয়তো বা দাড়ি কামাবার সময় মিত্রবাবুর সেদিন বাঁ দিকের চিবুকটা একটু কেটে গিয়েছিল, আর হাঁটুও হয়তো কোনওভাবে আগে থেকে ছড়া ছিল। তাই সেই ছিদ্রগুলো দিয়েই রাইসিন ভেতরে ঢুকেছিল – আর সেজন্যই ক্ষতস্থানে দুটো কালশিটের মতন দাগ দেখা গিয়েছিল – পরিচিত না হলেও। রাইসিনের উপস্থিতি হয়তো বা ওই জায়গাকার টিস্যুকে বিশেষভাবে পরীক্ষা করে দেখলে বোঝা যাবে।”

“তাই নাকি? ড. দণ্ডপাতকে জিজ্ঞেস করব?”

“হ্যাঁ করুন না! ও, আর একটা কথা, রাইসিন চোখের মধ্যে গেলে চোখ খুব লাল হয়ে যায় বিষের প্রক্রিয়ায়। বিষ তেমন ঘন হলে হয়তো বা শুধু চোখের মধ্যে দিয়েই মগজে গিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে। কিন্তু এইসব ঠিক মতন জানবার জন্য আবার ময়না তদন্ত করতে হবে, না হলে নিশ্চয়ই করে কিছু বলা যাবে না। যদি স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়, তবে তো ভালোই। আপনি আপনার কর্মচারীদের বোঝাতে পারবেন যে সকলের মনোভাব বুঝে আপনি আরও অনুসন্ধান করিয়েছেন এবং এবারে নিশ্চিত হয়েছেন। আর যদি মিত্রবাবুর শরীরে রাইসিন বা অন্য কোনও বিষ খুঁজে পাওয়া যায় তবে জানবেন যে ওঁদের খুনই করা হয়েছে। এবং খুন বলে প্রমাণ হলে তবেই আমরা লজিকালি পরের ধাপে যেতে পারব খুনীর অনুসন্ধান করতে, বা তাকে শাস্তি দেওয়াতে পারব। কিন্তু আপনি যদি অন্তত আরেকবার ময়না তদন্ত করাতে রাজি না হন, তাহলে জেনে রাখবেন যে সত্যি সত্যি খুন হয়ে থেকে থাকলেও, খুনীর সাজা হবার কোনও সম্ভাবনা থাকবে না।”

সরকারবাবু অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে চিন্তা করলেন। শেষ পর্যন্ত বললেন, “চলুন, মুখার্জীবাবুর অফিসের দিকে যাই। ওঁকে তো আগে রাজি করাতে হবে, তবে না বিচারক!”

– এত কাছে, তবু কত দূর –

মঙ্গলবার দুপুরে সরকারবাবু ফোন করে বললেন, ‘আপনার দ্বিতীয় ময়না তদন্তের রিপোর্ট এসেছে। একবার মুখার্জীবাবুর অফিসে আসুন প্লীজ।’ তাড়াহুড়ো করে সেখানে গিয়ে পৌঁছোনো গেল।

মুখার্জীবাবু বন্দনাকে বললেন, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। যদিও জয়ন্তবাবুর দেহ অনেকদিন আগেই দাহ করা হয়ে গিয়েছে, তবু মিত্রদার দেহ তুলে নতুন ময়না তদন্ত করে প্রমাণ হয়েছে যে রাইসিন প্রয়োগ করেই ওঁদের দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। ক্ষতস্থলের টিস্যু আর শরীরের ভেতরকার অন্যান্য কিছু জায়গা বিশ্লেষণ করে যথেষ্ট পরিমাণে রাইসিন পাওয়া গেছে। এটা যে মার্ডার কেস, তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই। আমি একটু আগেই আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলে সব কিছু জানিয়েছি। উনি খুব খুশি। বললেন যে এবারে খুনী কে তা খুঁজে বার করাটাই বড় কাজ।”

বন্দনার মুখে অল্পক্ষণের জন্য একটুখানি খুশির ভাব দেখা দিল। কিন্তু তারপরেই ও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই। খুনীকে সনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় কথা। আমি নিঃসন্দেহ যে খুনী শক্তিনগরের ভেতরেরই কোনও কর্মচারী বা সাপ্লায়ার। জয়ন্তবাবুর ব্যাপারে আমার মনে হয় না যে তিনি নিজে থেকে কারুর নিশানা ছিলেন। নেহাতই স্বেচ্ছায় কিম্বা নিয়তির টানে এই ঘটনার স্রোতের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলেন। আসল নিশানা যে ছিলেন মিত্রবাবু তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই।”

“কেন?”

“যতদূর মনে হয় ব্যাপারটা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্পিয়োনাজ’। মিত্র বাবু বহুরকম যুগান্তকারী আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সবেরই তথ্য কেউ চুরি করবার তালে ছিল, কিম্বা হয়তো ইতিমধ্যেই চুরি করে নিয়েছিল, কারণ সেগুলোর বাজারদর লক্ষ লক্ষ টাকা হবে। কিন্তু তথ্য চুরি করবার জন্য তাঁকে খুন করতে হল কেন?”

কিছুক্ষণ কেউই কোন কথা বললেন না। বন্দনা একটু থেমে, কিছুটা স্বগতোক্তির মতন করে আবার বলে চলল, “হয়তো বা পাচার হবার আগেই বামাল সমেত তিনি অপরাধীকে ধরে ফেলেছিলেন! আমি ঠিক বলতে পারছি না। কিন্তু আপনাদের কি সন্দেহ হয়?”

বন্দনা কথা শেষ করে মুখার্জীবাবু আর সরকারবাবু, দুজনের মুখের দিকেই তাকাল কয়েকবার। কিন্তু ওঁরা তখনও কোনও উত্তর দিলেন না। পরস্পর পরস্পরের দিকেই চেয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ ধরে, যেন বন্দনার কথা শুনতেই পাননি।

শেষ পর্যন্ত সামলে নিয়ে মুখার্জীবাবু বললেন, “আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদেরও তাই মনে হচ্ছে এখন। খুনীকে সনাক্ত করাই এখন সব থেকে দরকারি। আপনি এবারে যেভাবে এগোতে চান ঠিক সেইভাবেই এগোন। আমরা সবরকমভাবে সাহায্য করব আপনাকে।”

“বেশ তো, তাহলে আপনার বৈজ্ঞানিক, কর্মচারী, ঠিকেদার – যাঁরা খুব সামান্যভাবেও মিত্রবাবুর কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, বা ওঁর কাজের কথা জানতেন, তাঁদের সম্পূর্ণ একটা তালিকা আমাকে আগে বানিয়ে দিন।”

মুখার্জীবাবু সরকারবাবুর দিকে ইঙ্গিত করলেন একটা। সরকারবাবু বললেন, “হ্যাঁ, আমিই বানিয়ে দিচ্ছি। আজ বিকেলের মধ্যেই পেয়ে যাবেন।”

পরবর্তী তিন-চার দিন ধরে বন্দনা অক্লান্ত পরিশ্রমে, এক-এক করে তালিকার প্রতিটি নাম নিয়ে পাতার পর পাতায় বিশ্লেষণ করে চলল। আমাকে না নিয়েই দু-তিনবার থানায় গিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এল। কলকাতায় ও অন্যান্য অনেক জায়গায় পর পর ফোন করল। শুধু কাজের মধ্যেই একেবারে ডুবে রইল। অনেক বলাতে শেষ পর্যন্ত একদিন একটুখানি রিল্যাক্স করতে রাজি হল। খড়গপুর আইআইটি-তে বন্দনার পুরোনো দিনের কম্পিউটার ডিগ্রির রিসার্চ গাইড থাকেন। একদিন ফোন করে আমরা দুজনে মিলে ওঁর বাড়িতে সান্ধ্যভোজনে গেলাম। আমি এর আগেও ওঁদের বাড়ি গেছি। ওঁর স্বামী ছবি তুলতে খুব ভালোবাসেন। সেই নিয়ে অনেক কথা হল। বন্দনা ফোনেই জানিয়েছিল যে আমরা কাজের খাতিরে দাঁতনে ওর বাবার একটা কোম্পানিতে এসেছি। কিন্তু কী কাজ, সেটা বোধহয় আর বলেনি। কারণ এই নিয়ে আর সামনাসামনি কোনও কথা উঠল না। কেবল বন্দনা যে কাজের কথা একাবারে ভুলে যায়নি সেটা দেখলাম। শক্তিনগরের একজন বৈজ্ঞানিকও আগে একই প্রফেসরের মাস্টার্স ডিগ্রির ছাত্র ছিল, ওঁদের বাড়িতেও প্রায় আসত। তাকে নিয়ে সে তাঁদের কিছু প্রশ্ন করল। কিন্তু দাঁতন ফেরার পথে বন্দনা এ ব্যাপারে আর মুখ খুলল না।

এভাবে আরও দু-দিন কাটবার পর, বন্দনা খুব মুখ ভারী করে এসে আমাকে বলল, “শেষ পর্যন্ত আর পারলাম না গৌতম। আমি বুঝে গেছি কে খুন করেছে। কিন্তু কী করে খুন করেছে তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না।”

“বল কি? কে খুনী?”

বন্দনা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “প্লীজ, গৌতম, আমাকে কোন নাম বলতে বোলো না। যতক্ষণ না প্রমাণ করতে পারব কী করে খুন করেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কারুর কাছে নাম বলব না – প্রমিস করেছি।”

আমি একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বললাম, “কাকে এমন প্রমিস করলে যে আমাকেও কিছু বলতে পারছ না?”

বন্দনার মুখটা আগে থেকেই আবেগে ভরে ছিল। এবারে চোখটা ছলছল করে উঠল। বলল, “পুলিশ ইন্সপেক্টরকে। ওঁর সঙ্গে সব কিছু আলোচনা করেছি। বলেছি কীভাবে জানতে পেরেছি কোন লোকটা খুনী। কিন্তু কী করে যে অতখানি রাইসিন সে দুজনের দেহের মধ্যে সে ঢোকাল, তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। ইন্সপেক্টারও কোনও কিছু আইডিয়া দিয়ে সাহায্য করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত উনি বললেন, যে কোনও খুনীকে যখন সনাক্ত করা সত্ত্বেও কীভাবে খুন করা হয়েছিল তা প্রমাণ করা যায় না, তখন তার বিরুদ্ধে কোর্টে কোনও অভিযোগ না আনাই ভালো। সে বেকসুর ছাড়া পেয়ে যাবে! আর তারপরে হয়তো গোয়েন্দাকেই মেরে বসবে একেবারে। এই সব ক্ষেত্রে খুনীর নাম প্রচার করতে নেই। তা ছাড়া ভবিষ্যতে প্রমাণ পাওয়া গেলেও ‘ডবল জেপার্ডি’-র জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা কষ্টসাপেক্ষ হবে। এসব শুনে আমি ওঁকে কথা দিয়েছি যে খুনীর নামটা এখন আর কাউকে জানাব না।”

বন্দনার চোখে দেখলাম জল। কিছুক্ষণ পরে সে আবার বলল, “বুঝলে তো? তোমাকে আমি দাঁতন থেকে চলে গিয়ে হয়তো বলতে পারব, কিন্তু এখন নয়। প্লীজ বোঝবার চেষ্টা করো।”

প্রেমিকার চোখে এভাবে জল দেখলে ক-জন পুরুষ আর রাগ করে থাকতে পারে? আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “নিশ্চয়ই, সোনামণি। আমাকে বলবার প্রয়োজন নেই। যদি কোনওভাবে আমার মুখ ফস্কে কথাটা বেরিয়ে যায় তবে তো তোমারই প্রাণশঙ্কা হয়ে যাবে, তাই না? কাজেই আমাকে আর এখন বলতে হবে না কিছু।”

বন্দনা অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে রইল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এবারে তাহলে কী করবে?”

বন্দনা বলল, “ফিরে যেতে হবে, আর কী করব? এ কেসটা আমি শেষ পর্যন্ত আর সলভ করতে পারলাম না গৌতম, অনেক চেষ্টা করলাম, সত্যি বলছি তোমাকে। অনেক চেষ্টা করেছি।” আমি তাড়াতাড়ি ওকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে বললাম, “জানি তো। সবই দেখেছি তো! কিন্তু কী আর করা যাবে? মন খারাপ কোরো না। ভগবানের কাছে ও শাস্তি পাবে ঠিকই।” বন্দনা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “জীবনে আমি কখনও কোনও কিছুতে হেরে যাইনি, জানো তো গৌতম! এই প্রথম। এই প্রথম।”

ঘণ্টা দুয়েক পরে আমরা ওর বাবাকে ফোন করলাম। বন্দনা তাঁকে সব বুঝিয়ে বলল। শ্বশুর মশাই সব শুনে খুব আদরের সঙ্গে বললেন, “তাতে কী আর হয়েছে, বনি? যতটা কাজ করতে পেরেছিস তাতেই আমি কত খুশি। আমার যোগ্য মেয়ে হয়েছিস তুই। আমি মুখার্জীকে ফোন করে বলছি। তোরা কালকেই ফিরে আয়।”

– ঝিঙ্গে-পোস্ত –

পরেরদিন সকাল থেকেই বন্দনার মুখে একেবারে কুলুপ পড়ে গেল। এটা ওর চরিত্রের এই আর একটা দিক! হাসিমুখে হার মানতে জানে না। এই ক-বছর বিয়ের পরে আর এই বৈশিষ্টটা আমার জানতে বাকি নেই। সব কিছুতেই ওকে জিততে হবে! তা না হলেই শ্রাবনের ঘন মেঘ!

মুখার্জীবাবু দশটা নাগাদ একবার এলেন আমাদের ধন্যবাদ জানাতে; জিজ্ঞেস করলেন, “কখন চলবেন আপনারা? কোম্পানির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দিতে এলাম আপনাদের।” বন্দনা ঘর থেকেই বেরোতে চাইল না। তাই আমিই এগিয়ে এলাম। ব্যাপারটা বুঝে মুখার্জীবাবু আবার বললেন, “বন্দনা দেবীকে বলবেন যে সব সমস্যার তো আর সমাধান হয় না। তবু, আসামী ধরতে না পারলেও, মৃত্যুগুলো যে খুন করে হয়েছে সেটা তো ও প্রমাণ করে দিয়েছে! তাই বা কম কীসের? আমি সেইমতন ব্যবস্থা নেব। ওকে মন খারাপ করতে বারণ করবেন।”

দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরোব আমরা, এই ঠিক ছিল। একটা নাগাদ কোম্পানির বাবুর্চী এসে বলল, “দিদি, খাবার জায়গা করা হয়ে গেছে। চলে আসুন।” বন্দনা চাইছিল ঘরেই যেন খাবারটা এনে দিয়ে যায়। আমি অবশ্য সে কথায় কান না দিয়ে, জোর করে ওকে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়াতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, এসে ভালোই করেছি। মুখার্জীবাবু আর খাজাঞ্চীবাবু ছাড়া, কোম্পানির হোমড়াচোমড়ারা প্রায় সকলেই হাজির বন্দনার সঙ্গে ফেয়ারওয়েল লাঞ্চ খেতে। এমনকি কর্ণ বাহাদর আর তার শাকরেদ আদি পর্যন্ত এসে দেওয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি ব্যবহারের জন্য আর খোকাবাবুর মেয়ে বলে এই ক-দিনে বন্দনা খুব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। কাজকর্মের লোকেরাও বেশির ভাগ হাজির – দিদিকে যত্ন করে শেষ দিনের খাবারটা খাইয়ে দিতে। লক্ষ্মীর মা আবার বন্দনার জন্য একটা বিশেষ রান্না করে এনেছে। লাল শাকের চচ্চড়ি খাওয়া হয়ে যেতেই সে নিয়ে এল এক বাটি ঝিঙ্গে-পোস্ত। এই রান্নার জন্য লক্ষ্মীর মা নাকি বিখ্যাত – এ চত্বরে আর কেউ অত ভালো ঝিঙ্গে-পোস্ত করতে জানে না। সে বন্দনার পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কি, ভালো লাগছে তো দিদি? তোমার জন্যই তো করলাম, তুমি নাকি পোস্ত খেতে খুব ভালোবাসো? আজই চলে যাবে কেন?”

বন্দনা এতক্ষণ কারুর সঙ্গে কোনও কথা বলছিল না। কিন্তু লক্ষ্মীর মায়ের কথা শুনে, শেষ পর্যন্ত মাথা নিচু রেখেই, একটু অস্ফুট স্বরে বলল, “হ্যাঁ, খুব ভালো হয়েছে।” তারপরে একটু ইতস্তত করে আবার বলল, “এই শীতের শেষে আবার বাজারে ঝিঙ্গে পেলে কোথায়? কলকাতায় তো পাওয়া যায় না!”

লক্ষ্মীর মা অবাক হয়ে বলল, “ও মা, বাজারের কেন হবে গো দিদি? এটা তো কোম্পানির গরম বাগানের – ওখানে তো সারা বছর ধরে অনেক চাষ হয়! হেমন্তকে বললে মাঝে মাঝে সে কিছু তুলে এনে দেয়।” হেমন্ত কোম্পানির হেড মালী। শোনা যায় তার সঙ্গে নাকি আবার লক্ষ্মীর মায়ের কিছু ফষ্টিনষ্টির সম্পর্ক আছে। কিন্তু বেফাঁসে এভাবে হেমন্তর ঝিঙ্গে তুলে দেবার কথাটা হঠাৎ বলে ফেলে লক্ষ্মীর মা বোধহয় একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। তাই তাড়াতাড়ি সরকারবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবু, আমি কিন্তু রোজ নেই না – আজ দিদি যাবেন বলেই চাইলাম দুটি।”

সরকারবাবু কিছু বলার আগেই আমি ড. ইসলামের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনারা সারা বছর ঝিঙ্গের চাষ করেন বুঝি? কেন?”

ড. ইসলামের পরিচয় আগেই দেওয়া হয়েছে। উনি কোম্পানির এগ্রিকালচার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বড় কর্তা। প্রথম দিনে এসে ওঁর কাছেই গিয়েছিলাম আমরা। ড. ইসলাম ঘাড় নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, তা করি বইকি। দূষণহীন জ্বালানির প্রয়োজন এখন ক্রমে বাড়ছে। তাই বায়ো ডিজেল তৈরির চেষ্টাতে আমাদের বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, সে তো জানি। সেভাবেই তো ক্যাস্টর অয়েল থেকে এত কাণ্ড হল – দুটো নিরীহ লোকের প্রাণ গেল। তা ছাড়া আবার ঝিঙ্গে থেকেও তেল করছেন?”

ড. ইসলাম এবারে একটু নড়ে চড়ে বসলেন, “হ্যাঁ, তা করছি বইকি! ঝিঙ্গে, মানে ‘লুফা’ নিয়ে কাজ করাটা তো আমারই আইডিয়া। বুঝলেন না, আপনার শ্বশুর মশায়ের কিন্তু প্রথমে এতে মত ছিল না।”

“কেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

ড. ইসলাম বললেন “খোকাবাবু তো সবসময় খরচের কথাই আগে ভাবেন! তিনি বললেন, ‘ক্যাস্টর অয়েল থেকে তো তেল হচ্ছেই! আবার আর একরকম তেল তৈরি করে কী হবে? এখানে এত সর্ষের চাষ হয়, বাজার থেকে সর্ষে কিনে তেল বানালেই তো সস্তা পড়বে বেশি।’”

আমি বললাম “তা, সে কথাটা কি সত্যি নয়?”

“তা সত্যি হতে পারে,” ড. ইসলাম স্বীকার করলেন “কিন্তু আমাদের তো অনেক তেল লাগবে, তাই মানুষের খাবার তেলকে কাজে লাগালে, তাতে ভালো বায়ো ডিজেল হোক বা না হোক, বাজার থেকে সরষের তেল উধাও হয়ে যাবে। তখন তো আবার অন্য সমস্যা…”

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। ড. ইসলাম বলে চললেন “লুফা, মানে ঝিঙ্গের তেল তো আর কেউ খায় না। আর আমরা যখন হট হাউসে চাষ করি তখন সারা বছরই লুফা ফলাতে পারি, সাপ্লাই-এর কোনও সমস্যা হয় না। আমরা ঝিঙ্গের জিনের সঙ্গে স্প্লাইস করে একটা আগাছার জিন লাগিয়ে দিয়েছি – তাতে ঝিঙ্গের গ্রোথ রেট প্রায় দশগুণ বেড়ে গেছে।”

আমি এবারে পাত থেকে এক টুকরো ঝিঙ্গে উঁচু করে তুলে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি, “ঝিঙ্গে তাহলে পেষা হয় বুঝি? এ তো ভর্তি জল – এর থেকে তেল বেরোয়?”

ড. ইসলাম একটু হেসে বললেন, “না, না, ওভাবে তেল করা হয় না। তেল হয় ঝিঙ্গের বিচি থেকে। এই যদি হেমন্ত কাঁচা ঝিঙ্গেগুলো না তুলতো – তোলার তো কথা নয়, ওকে আমি মজা দেখাব পরে; কিন্তু পাকাতে পারলে ঝুনো ঝিঙ্গে থেকে অনেক তেল বেরোয়।”

“ঝুনো?” আমি জিজ্ঞেস করি?

“হ্যাঁ, ঝুনো, মানে শুকানো। আমরা তো খাই সবুজ কাঁচা ফলটা; কিন্তু আরও কিছুদিন গাছে থাকলে ওগুলোই পেকে শাঁসের জায়গাটা আস্তে আস্তে সেলুলোজ, মানে ছোবড়া হয়ে যায়।”

“ছোবড়া, মানে গায়ে চানের সময় সাবান লাগানোর ছোবড়া? সেগুলো তো স্পঞ্জ— সমুদ্রের তলায় হয়—” আমি উৎসুক হয়ে বললাম।

ড. ইসলাম বললেন, “না, না সব ছোবড়াই তো আর স্পঞ্জ থেকে হয় না; অত সাপ্লাই আসবে কোথা থেকে? বাজারের অর্দ্ধেক ছোবড়া হয় এই ঝিঙ্গে শুকিয়ে…”

“বলেন কি?” আমি চোখ বড় বড় করে বললাম।

“হ্যাঁ। স্পঞ্জ এমনিতে গায়ে খুব নরম লাগে বটে, কিন্তু যাঁরা গায়ের শুকনো চামড়া ঘসে ফেলে দিতে চান, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘এক্সফোলিয়েট” করা, তার জন্য কিন্তু ঝিঙ্গের ছোবড়া অনেক বেশি কাজের। জাপান, ফ্রান্স, ইটালি, মানে যেখানে সৌন্দর্যের চর্চা বেশি করা হয়, সেখানে তো ঝিঙ্গের ছোবড়াই বেশি ব্যবহার করা হয়। বড় বড় কোম্পানিগুলো সুন্দর করে প্যাকেজ করে বলে বোঝা যায় না, কিন্তু সেগুলো সবই এই পাতি বাঙালি ঝিঙ্গের ছোবড়া ছাড়া আর কিছু নয়।”

সরকারবাবু পাশ থেকে বলে উঠলেন “শুধু তাই নয়, কিছু কিছু কোম্পানি আবার ছোট ছোট করে ছোবড়াগুলো কেটে কেটে, তার ওপরে সুগন্ধি সাবান ডিপোজিট করিয়ে, তাকে অনেক দামি সাবান বলে বিক্রি করে। তাতে ছোবড়া দিয়ে এক্সফোলিয়েটও করা হয়, আবার সাবান দিয়ে ঘাম-তেলও ধুয়ে ফেলা যায়।”

“বলেন কি”? হঠাৎ বন্দনার জোর গলা শুনে তার দিকে তাকিয়ে দেখি যে তার শরীরের ভঙ্গী এবারে বদলে গেছে, এখন আর সে ঘাড় গুঁজে মাথা নিচু করে বসে নেই। উত্তেজিতভাবে উঠে বসে প্রশ্ন করছে।

ড. ইসলাম বললেন “হাঁ, সেটাই তো আমার ঝিঙ্গের তেল ব্যবহার করতে চাওয়ার জিনিয়াস! আমি যখন খোকাবাবুকে বুঝিয়ে দিলাম যে শুধু বিকল্প জ্বালানি হিসেবেই নয়, বিচি বার করে বাই প্রডাক্ট হিসেবে বিউটি প্রোডাক্ট মার্কেটেও কিছু মাল বিক্রি করা যাবে, তখন আর তিনি কিছু আপত্তি করতে পারলেন না। কেন, এই তো সেদিন, ওই যে আইআইটি পাশ করা ছেলেটা, কি নাম যেন…” ড. ইসলাম পাশের সরকারবাবুকে কনুই দিয়ে একটা খোঁচা মেরে বললেন, “বলুন না সরকার মশাই, কী যেন, সুভাষ, না পার্থ?”

সরকারবাবু চমকে উঠে বললেন। “ও, পার্থ, পার্থ—”

ড. ইসলাম বললেন “ওরই তো আগের কোম্পানির সঙ্গে আমাদের সেদিন একটা মৌ সই করা হল— মাসে পাঁচশো কিলো করে মাল নেবে আপাতত। কিছু কাঁচা মাল তো নিয়েও গেল…”

সরকারবাবু বললেন, “হাঁ, তারপরে আবার আমাদের সকলকে কিছু স্যাম্পেল প্রোডাক্টও উপহার দিয়ে গেল সেদিন… বেশ কায়দার চৌকো প্লাস্টিকের ডিজাইন করা বাক্সে ভরা, সুন্দর করে ধোয়া-মোছা দুটো ছোবড়া; আর দুটোর মধ্যেই সুগন্ধি সাবান ঢোকানো, যেমন একটু আগে বলছিলাম এখুনি!”

বন্দনা এবারে আরও উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “বলেন কি? আচ্ছা, সাবানগুলো কি একেবারে ওই ছোবড়ার মধ্যে ডিপোসিট করা, না কি আলাদা?”

ড. ইসলাম একটু অবাক হয়ে বললেন, “না না, আলাদা নয়, সুগন্ধি সাবান – একেবারে ফ্যাক্টরি থেকে ডিপোসিট করা ছোবড়ার মধ্যে – ওটাই তো ওদের কোম্পানির স্পেশালটি, আলাদা সাবান লাগে না ওদের প্রোডাক্টে। কিন্তু কেন বলুন তো?”

বন্দনা বলল, “সাবান একেবারে ছোবড়ার মধ্যে ঢোকানো! আচ্ছা, কাকে কাকে এইরকম ছোবড়া-সাবান উপহার দেওয়া হয়েছিল? কবে দিয়েছিল?”

সরকারবাবু বললেন, “কেন, সে তো ওই ফ্যাক্টরি বন্ধ হবার দিন সকালবেলা— ২৩ তারিখে। ও আমার হাতে পাঁচটা প্যাকেজ ধরিয়ে দিল— আমার, ড. রায়, ড. ইসলাম, ড. বাগচি, আর মি. মুখার্জীর জন্য। আমাকে বলল ওঁদের সকলের কাছে পৌঁছে দিতে। আর মিত্রদার জন্য দু-খানা প্যাকেট, সে দুটো ও নিজের হাতেই তাঁকে দিয়ে আসতে গেল।”

“মিত্রদার স্পেশাল খাতির!” ড. ইসলাম যেন একটু ব্যঙ্গ করেই বললেন।

সরকারবাবু অবশ্য সেই ইঙ্গিতে কান না দিয়ে বলে চললেন, “মিত্রদা আসলে খুব শৌখিন লোক ছিলেন। গায়ের রংটা একটু কালো ছিল তো, তাই প্রতিদিন বাথটাবে বসে অনেকক্ষণ ধরে সাবান মেখে চান না করলে, আর গায়ে একটু সুগন্ধি সেন্ট না মাখলে, ওঁর চলত না – সবাই সেটা জানত। তাই বোধহয় ওঁর জন্য বেশি করে সাবান বরাদ্দ করেছিল পার্থ।”

পাশ থেকে ড. বাগচি আস্তে করে বললেন, “না না, পার্থ বোধহয় মিত্রদাকে ঘুষ দিয়ে ঠাণ্ডা করবার চেষ্টা করছিল।”

“মানে”? সরকারবাবু উৎসুক হয়ে ড. বাগচির দিকে তাকালেন। ড. বাগচি বললেন, “আসলে কিছুদিন ধরেই আমি ড. মিত্রর ঘর থেকে কিছু চেঁচামিচি শুনতে পাচ্ছিলাম। মিত্রদা এত মাটির মানুষ ছিলেন যে কারুর ওপরে ওঁকে কোনওদিন রাগ করতে দেখিনি। তাই কার ওপরে হঠাৎ এত চটে গেলেন দেখতে একটু কৌতূহল হচ্ছিল। তিন-চার দিন ধরে এরকম চেঁচামিচির চলার সময় যখনই ওঁর ঘরের পাশ দিয়ে গেছি, তখনই দেখেছি যে ওঁর সামনে পার্থ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এমনিতে তো পার্থ একেবারে মিত্রদাকে পুজো করত – সবসময় মিত্রদার পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াত। আর মিত্রদাও ওকে খুব পছন্দ করতেন। তাই আমার মনে হয় কোনও কারণে ও মিত্রদাকে চটিয়ে ফেলেছিল। শেষে একটু এক্সট্রা সুগন্ধি সাবান ঘুষ দিয়ে মেক আপ করবার চেষ্টা করছিল।”

বন্দনা জিজ্ঞেস করল, “কী কথা হচ্ছিল শুনতে পেয়েছিলেন?”

ড. বাগচি তাড়াতাড়ি একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, “না না, তা কী করে শুনব? আড়ি পাতব নাকি?”

বন্দনা কিছু না বলে ওঁর দিকে মুচকি হেসে তাকিয়ে রইল। তখন একটু ইতস্তত করে ড. বাগচি আস্তে আস্তে বললেন, “আসলে এমনি তো কাচের দরজা বন্ধ থাকলে বুঝতে পারার মতন জোরে খুব একটা কিছু শোনা যায় না। কিন্তু একদিন দরজাটা একটুখানি ফাঁক হয়ে ছিল। সেদিন মনে হয় শুনলাম যে মিত্রদা খুব উত্তেজিত হয়ে বলছেন, এ কাগজ তুমি ছাড়া আর কেউ সরাতেই পারে না। অসম্ভব! যদি ভালো চাও তো আজকেই সমস্ত কাগজ ফেরত দিয়ে দাও, নয়তো আমি রিপোর্ট করতে বাধ্য হব।”

“তাই নাকি?” বন্দনা খুব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল “কাকে, কী নিয়ে রিপোর্ট করবার কথা বলছিলেন বুঝতে পেরেছিলেন নাকি? থোরিয়াম নিয়ে ড. মিত্র-র সঙ্গে কাজ করছিল বুঝি পার্থ? থোরিয়াম “ফিসন” নিয়ে তো আপনাদের গ্রুপে বেশ যুগান্তকারী কাজ হচ্ছে শুনেছি।”

ড. বাগচি একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “না, থোরিয়াম ফিসনের কাজের রিপোর্টটা হবে না, কারণ তার তো যা কিছু ডেটা ছিল, সব কুড়িয়ে বাড়িয়ে ইতিমধ্যেই পেটেন্ট অ্যাপলাই করা হয়ে গেছে। কাজেই সেই প্রোজেক্টের কাগজ নিয়ে উনি মোটেও এত চিন্তিত হতেন না। আমার তো—”

কিন্তু ড. বাগচির কথাটা ঠিক মতন শেষ হতে পারল না। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ সরকারবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন, “বলেন কি? ঝগড়া হচ্ছিল? কে কি ব্যাপার বুঝেছি এবার! মিত্রদা পার্থর সঙ্গে এভাবে – ওরে বাবা, এত একেবারে সাংঘাতিক ব্যাপার।”

ড. বাগচি অবাক হয়ে বললেন, “কি বুঝেছেন”? কিন্তু সরকারবাবু তার কোনওরকম উত্তর না দিয়ে চট করে চেয়ার ছেড়ে, তাড়াতাড়ি কর্ণ বাহাদুরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, “বাহাদুর সাহেব, শিগগির এদিকে আসুন, দরকারি কাজ আছে।” তারপরে স্মার্ট ফোনে একটা নম্বর ডায়াল করতে করতে কর্ণ বাহাদুরকে সঙ্গে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে, উত্তেজিতভাবে একবার ফোনে, আর একবার মাথা তুলে বাহাদুরের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে সরকারবাবু আর কর্ণ বাহাদুরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। একটু পরে, বাহাদুর সাহেব তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে তড়িৎ বেগে বেরিয়ে গেল।

– যুগান্তকারী আবিষ্কার –

“আমাদের কৃত্রিম ফোটো-সিন্থিসিশ প্যোজেক্টটা, মশায়” বাহাদুর হন্তদন্ত বেরিয়ে যাবার পর সরকারবাবু আমাদের কাছে ফিরে এসে বললেন “ওই প্রোজেক্টেরই তথ্য চুরি গেছে – আমি শিওর!”

“বলেন কি, সরকারবাবু – কৃত্রিম ফোটো-সিন্থিসিশ প্রোজেক্টের তথ্য!” ড. ইসলাম আর ড. বাগচি প্রায় এক সঙ্গে লাফিয়ে উঠলেন “এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার! তো মুখার্জীবাবু, খোকাবাবু, এঁরা সব জানেন কি?”

“কী করে জানবেন, আমি নিজেই তো এইমাত্র বুঝতে পারলাম কে – আপনাদের কথা শুনতে শুনতে – এখন ইমিডিয়েটলি ব্যবস্থা নিয়েছি। এবারে রায়বাবুকে ফোন করি একটা…” বলতে বলতে সরকারবাবু আবার আর একটা ফোন নম্বর ডায়াল করতে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু বন্দনা কোনওরকমে হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “দাঁড়ান, দাঁড়ান, সরকার মশায়, আগে বলুন কৃত্রিম ফোটো-সিন্থিসিশ প্রোজেক্ট ব্যাপারটা কি! আমি তো কিছুই বুঝলাম না…।”

পাশ থেকে ড. ইসলাম গলাটা একটু খাটো করে বললেন, “এটা একটা ভীষণ কনফিডেন্সিয়াল প্রোজেক্ট। আমরা বন্ধ ঘরে নিজেদের মধ্যে ছাড়া সাধারণত এ নিয়ে কথা বলি না।”

সরকারবাবু বললেন, “ঠিক, সেই জন্যই কিছু বলিনি আগে। আপনারা তো অরিন্দম রায়কে মিট করেননি, তাই না? উনি আমাদের বায়ো ডিজেল প্রোগ্রামের প্রধান। আপাতত আমেরিকায় গেছেন একটা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে একটু কাজ করতে।”

বন্দনা বলল “হ্যাঁ, ওঁর নাম শুনেছি অনেক বারই, কিন্তু দেখা হয়নি।”

সরকারবাবু বললেন, “আপনারা আসার ঠিক দু-দিন আগেই উনি গেছেন। মিত্রদা রায়বাবুর সঙ্গেই, মানে বায়ো ডিজেল গ্রুপের সঙ্গেই বেশি জড়িত ছিলেন। হাইড্রোজেন ভেঙে ফিউল সেল তৈরি করবার একটা কাজ শুরু করেছিলেন। তারপরে কিছুদিন হল ড. বাগচির গ্রুপে, পার্থকে নিয়ে একটা কাজ করতে ডেপুটেশনে গিয়েছিলেন।”

ললিতা বাগচি সায় দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, ওঁকে একটু দরকার ছিল আমাদের, আর পার্থ কিছু কম্পিউটার প্রোগ্রাম লিখছিল।”

ড. ইসলাম বললেন, “মিত্রদা কিন্তু ওই ফিউল সেল প্রোজেক্টে থাকতে থাকতেই একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। সেটাই কৃত্রিম ফোটো-সিন্থেসিশ প্রোজেক্ট।”

“সেই আবিষ্কারটা কী?” বন্দনা তিন জনের দিকে তাকিয়ে বলল।

“বলছি।” ড. ইসলাম বললেন “জানেনই তো, একদিক থেকে দেখলে কার্বন ডাই অক্সাইডই পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস – বায়ুমণ্ডলে এর অত্যধিক উপস্থিতির জন্যই আমাদের এই উষ্ণায়ন অথচ অন্যভাবে দেখলে, এই কার্বন ডাই অক্সাইডের মধ্যেই নিহিত আছে অন্তহীন শক্তি! এমনিতে তো গাছের পাতারা স্বাভাবিকভাবেই, রোদ্দুর, জল আর ক্লোরোফিলের সাহায্যে ক্রমাগত কার্বন ডাই অক্সাইড ভেঙে ভেঙে ‘সুগার’ বানিয়ে তাদের জীবন যাপনের শক্তি অর্জন করে। তা সেইভাবে যদি আমরা কোনও কৃত্রিম পদ্ধতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড ভাঙতে পারি, তাহলে আমরাও সেই রাসায়নিক ‘সুগার’ থেকে জ্বালানি বা অন্যান্য দরকারি জিনিস বানাতে পারব এবং সেই বায়ো ডিজেলের প্র্যাক্টিকালি কোনও কার্বন ফুট প্রিন্ট থাকবে না।”

“বলেন কি? কোনও কার্বন ফুট প্রিন্ট থাকবে না তার?” বন্দনা খুব অবাক হয়ে গেল।

“না, বলতে গেলে একটুও থাকবে না! আর যদি আমরা সেই কার্বন ডাই অক্সাইডটা আমাদের আবহাওয়া থেকেই টেনে নিই, তাহলে তো একদিক থেকে পরিষ্কার জ্বালানিও তৈরি হবে, আবার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড-এর ভাগও কমে যাবে।”

“তাই নাকি? এটা তো একটা অসাধারণ আইডিয়া! এটা কি এতদিন করা যেত না?”

বন্দনা জিজ্ঞেস করল। ড. ইসলাম বললেন, “যেত, কিন্তু পদ্ধতিটা সোজা নয়। গত একশো বছর ধরেই একটা উপায় জানা আছে, যার নাম ‘ফিশার-ট্রপস প্রসেস’। কিন্তু তাতে এত বেশি বায়ুচাপ আর তাপমাত্রা দেবার দরকার হয় যে সেটা ল্যাবরেটরির বাইরে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।”

সরকারবাবু যোগ করে বললেন, “আর সেখানেই তো মিত্রদার জিনিয়াস! তিনি পরীক্ষানিরীক্ষা করে এমন একটা ‘ক্যাটালিস্ট’ বা একধরনের সহায়ক পদার্থ আবিষ্কার করে ফেললেন, যে সেটা ব্যবহার করলে সাধারণ বায়ুচাপ এবং সাধারণ তাপমাত্রাতেই কার্বন ডাই অক্সাইডকে ভেঙে ফেলা যাবে। কাজেই বুঝতেই পারছেন যে এটা কত বড় একটা আবিষ্কার! আমাদের কোম্পানির তো কোটি কোটি টাকা উপার্জন হবেই, কিন্তু তার থেকে বেশি হল যে এটা একটা জাতীয় সম্পদের মতন হবে। আজকের পৃথিবীর যত উষ্ণায়ন সমস্যা, তার সিংহ ভাগই এই পদ্ধতিতে সমাধান করা যাবে – আমাদের দেশের লিডারশীপে।”

“এটা সত্যিই খুব অসাধারণ আবিষ্কার!” আমি অনুপ্রাণিত হয়ে বললাম “আর আপনি বলছেন যে এই প্রোজেক্টেরই তথ্য হারিয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ, এখনই বুঝতে পারলাম সেটা।” সরকারবাবু উত্তর দিলেন “সপ্তাহ তিনেক আগে মিত্রদা, ড. রায় আর আমাকে একদিন ওঁর অফিসে ডেকে পাঠিয়ে জানালেন, যে ওঁর ফোটো-সিন্থিসিশ প্রোজেক্টের কিছু কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বললেন, হয়তো বা উনি নিজেই ভুল করে সেগুলো কোথাও তুলে রেখেছেন, এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে এতবড় একটা মূল্যবান প্রোজেক্টের কাগজপত্র এদিক ওদিক হয়ে যাওয়া মানে তো বুঝতেই পারছেন – আমি আর ড. রায় একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। আমি সঙ্গে সঙ্গে পুলিসে খবর দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু মিত্রদাই আমাকে আটকালেন। বললেন যে উনি নিজের ঘরে আর একবার খুঁজে দেখতে চান। আর তা ছাড়া একজনের সঙ্গে, যার ওপরে ওঁর একটু সন্দেহ হচ্ছে, তার সঙ্গেও উনি আগে একটু কথা বলে দেখতে চান। আমি বললাম, ‘কে সে?’ কিন্তু মিত্রদা বললেন যে সেটা উনি এখুনি বলতে চান না। এখন তো শুধু সন্দেহই মাত্র হয়েছে, আগে নিজে সব জায়গায় ভালো করে খুঁজে দেখবেন, তারপরে দরকার হলে সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে আমাদের জানাবেন। বললেন যে মূল কাগজপত্রগুলো একটা মোটা ভল্টে রাখা আছে। কাজেই সেদিক দিয়ে কোনও সমস্যা নেই। তবে তাঁর কম্পিউটার, শোবার ঘর, আর অফিসের লাইব্রেরি মিলিয়ে কিছু কিছু কম দরকারি তথ্য এদিক-ওদিকে ছড়িয়ে আছে, আর তারই কিছু অংশ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।”

“সেটা তিনি পরে কি খুঁজে পান আর?” বন্দনা প্রশ্ন করল।

সরকারবাবু বললেন, “দু-দিন পরে বললেন যে তখনও খুঁজে পাননি, তবে তিনি যাঁকে সন্দেহ করছেন সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন। শেষে ক-দিন পরে আবার ফোন করে বললেন যে সেই ব্যক্তি সব কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তখন আমি জোর করে বললাম, কে সে, মিত্রদা? আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই! কিন্তু উনি কিছুতেই কারুর নাম দিলেন না। শুধু বললেন, আমি দেখছি। আরও দু-চার দিন সময় দিন। তারপরে মারা যাবার সপ্তাহখানেক আগে আমাকে বললেন, যে সেই লোকটি কিছু কিছু কাগজপত্র খুঁজে পেয়ে তাঁকে ফেরত দিয়ে গেছে, আর বলেছে যে আরও খুঁজে দেখছে। আমি, ড. রায় আর মি. মুখার্জী মিলে তখন আবারও বারবার বললাম যে আমাদের উচিত সিকিয়োরিটিকে নিয়ে গিয়ে তক্ষুনি সেই লোকটিকে চ্যালেঞ্জ করা এবং তাকে চাকরি থেকে বার করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু মিত্রদা এমনই লোক ছিলেন যে তিনি পারতপক্ষে কখনও কারুর অনিষ্ট করতে চাইতেন না। বললেন, উনি খুব চেষ্টা করছেন যাতে ব্যাপারটা ভালোয় ভালোয় মিটে যায় আর সম্পর্কটা ভালো থাকে। তবে সেইসঙ্গে এটাও বললেন যে লোকটির হাবভাব ওঁর ঠিক ভালো লাগছে না। আমরা যেন ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর সঙ্গে যোগাযোগ করে উপদেশ নিই যে এই রকম ব্যাপারে আমাদের কী কী ধরনের সাবধানতা নেওয়া উচিত।”

“আপনারা কী করলেন তখন?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

সরকারবাবু বললেন, “ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোকে আগেই আমাদের এই প্রোজেক্টের, এবং আরও অন্যান্য কিছু মূল্যবান কাজের কথা জানানো ছিল – সতর্কতার খাতিরে। থোরিয়াম প্রোজেক্টের সব ক্লিয়ারেন্স তো ওদের কাছ থেকেই নিতে হয়েছে! তখন এইসব ঘটনা শুনে ওরা পরের দিনই লোক পাঠাতে চাইছিল। কিন্তু মিত্রদা বাধা দিয়ে বললেন, না দরকার নেই। শেষ পর্যন্ত সব কিছুই ফেরত পাওয়া গেছে। তাই আপাতত সেই লোকটিকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং খুব সাবধানও হয়ে গেছেন। ভবিষ্যতে আর এরকম ঘটনা ঘটবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো সেসব মানতে চাইল না। বলল যে জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে তাদের জানতে হবে লোকটি কে, এবং দেখতে হবে যে তার তথ্য সরানোটা সামান্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল এসপাওনেজ, নাকি আরও বেশি পরিকল্পিত অপরাধ। তারা তিন দিনের মধ্যেই একজন ইন্সপেক্টর পাঠাবে আমাদের অফিসে। তখন ড. মিত্র যেন সেই লোকটিকে ইন্সপেক্টরের সামনে হাজির করেন।”

“তারা এসে কী করল”? বন্দনা বলল।

“আসবে আর কি করে?” সরকারবাবু বললেন “তার দুদিন পরেই তো মিত্রদা মারা গেলেন! ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো তারপরেও আমার আর মুখার্জীবাবুর ওপরে খুব চাপ দিচ্ছিল, আমরা ঠিক কী কী জানি বলতে। কিন্তু লোকটা যে কে, তা তো আমরা অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারিনি। মিত্রদা খালি ‘শিল্ড’ করে যাচ্ছিলেন তাকে। শেষ পর্যন্ত আজকে আমাদের এই আলোচনার মধ্যে দিয়েই হঠাৎ একে একে দুই হয়ে গেল। বুঝলাম যে সেই লোকটা আসলে পার্থই ছিল। আমি তক্ষুনি মুখার্জীবাবুকে ফোন করে সব বললাম, আর বাহাদুরকে পাঠালাম পার্থকে ধরে অবিলম্বে পুলিশের হাতে তুলে দিতে। তার লজ্জা, ভয়, ডর বলতে তো কিছু নেই – সে কাজেও এসেছে আজকে… ব্যাটা চোর! অন্য আর কি চুরি করবার ধান্দায় আছে কে জানে।” বন্দনা তখন আর থাকতে না পেরে প্রায় নাটকীয় কায়দায় বলে উঠল, “আর আমি যদি বলি যে সে শুধু চুরি করবার চেষ্টাই করেনি, সে চুরি ঢাকবার জন্য দুটো খুনও করেছে, একটা স্বেচ্ছায়, আর একটা কাকতালীয়তে! আইনের চোখে কিন্তু দুটোই খুন!”

– খুনী ও তার হাতিয়ার –

ড. ললিতা বাগচি বললেন, “আচ্ছা, বন্দনা, তুমি কী করে বুঝলে বলত যে পার্থই খুনী? আর কেউ নয় কেন? আমার তো বরঞ্চ মনে হচ্ছিল যে অন্য কেউ বুঝি – ও তো মিত্রদাকে একেবারে ভগবান বলে পুজো করত!”

ড. বাগচি যে ইতিমধ্যেই বন্দনার সঙ্গে এত অন্তরঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন তা আমি জানতাম না। তবে আগেও দেখেছি যে মেয়েরা অনেক সময়েই বেশ চট করে ঘনিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে। বন্দনা বলল, “না, না, অন্য কেউ নয়। আমি বলছি তোমাকে ললিতাদি, কেন পার্থর ওপরে আমার সন্দেহটা ক্রমে বাড়তে শুরু করেছিল। দেখ, খুন করবার জন্য অন্তত তিনটে জিনিসের প্রয়োজন হয় – কারণ, সুযোগ ও উপায়। শুধু কারণ থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কেননা যথাযথ কারণ থাকলেও, যদি খুনের সুযোগই না থাকে তবে আবার খুন হবে কী করে? কাজেই আমি আগে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করলাম যে এই খুন করবার সুযোগটা কার কার থাকতে পারে। আমি প্রথমেই বাদ দিলাম কোম্পানির বাইরের কোনও লোকের কথা। কেননা মিত্রবাবুর শেষ জীবনের পৃথিবীটা একেবারে সঙ্কুচিত হয়ে এসে ঠেকেছিল শক্তিনগরের এই চার দেওয়ালের মধ্যে। একমাত্র প্রতি রবিবার সকালবেলা নিয়মিত চার্চে যাবার জন্য ছাড়া আর কখনও উনি গেটের বাইরে পা রাখতেন না। চার্চের লোকজনেরাও বলেছে যে ড. দণ্ডপাত ছাড়া আর কারুর সঙ্গেই ওঁর চার্চের বাইরে কোনও যোগাযোগ ছিল না। আর সে সম্পর্কটাও প্রধানত ডাক্তার এবং পুরোনো রুগী হিসেবে। কারুর সাতে পাঁচে মিত্র বাবু থাকতেন না, গাড়ি চড়তেন না, কারুর কাছে ঋণী ছিলেন না, কাউকে টাকা ধার দিতেন না, মাদকতা বা অন্য কোনও রকম বদ অভ্যেস তাঁর ছিল না। পুলিশের সাহায্য নিয়ে অনেক খোঁজখবর করেও, তাঁর পুরোনো জীবন থেকে কোনওরকম কোনও শত্রুর খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ধরনের লোককে হঠাৎ সম্পূর্ণ বাইরের কোনও লোক, শক্তিনগরের এই অসাধারণ ২৪ ঘণ্টার সিকিয়োরিটি পেরিয়ে, কোম্পানির গেস্ট হাউসের মধ্যে ঢুকে, খামোকা খুন করতে আসবে কেন? না, ললিতাদি, বাইরের কোনও লোকের পক্ষে এই খুন করবার কোনও সম্ভাবনা আমি দেখিনি। মিত্রবাবুর খুনী যে কোম্পানির ভেতরেরই কোনও লোক তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

“তখন ‘কারণ, সুযোগ ও উপায়’-এর মধ্যে, আবার কারণ, বা “মোটিভ” নিয়ে চিন্তা করতে বসলাম। সাধারণভাবে, এরকম কোম্পানির মধ্যে একজন আর একজনকে খুন করতে গেলে, তার মোটিভ হতে হবে, প্রচণ্ড ঈর্ষা বা আত্মরক্ষার তাগিদ; সর্বসমক্ষে অপমানিত হওয়া; কোনওভাবে একজন আরেকজনের জীবিকা বন্ধ করা বা চাকরি খাওয়া; কিম্বা একজনের চুরি করা অন্যজনের ধরে ফেলা – সে অর্থ, সামগ্রী কিম্বা তথ্য চুরি – ওরফে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্পিওনাজ – সে যেরকমই চুরি হোক না কেন। তারপরে বিচার করে দেখলাম যে মিত্রবাবুকে একবাক্যে সবাই এত শ্রদ্ধা করত যে তিনি আপাতদৃষ্টিতে অন্যের ঈর্ষার ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি চাকুরিতে কারুর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না, এবং ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন না বলে কারুর চাকুরী খাবার মতো পদে ছিলেন না। তিনি কোনও বাজেটের ভার নিয়েও ছিলেন না। কাজেই কোম্পানির টাকাপয়সা চুরি করা বা অন্যের চুরি করা ধরে ফেলার মতো পদেও ছিলেন না। তিনি উৎপাদন বিভাগে ছিলেন না বলে কোম্পানির উৎপাদন চুরি বা কাঁচা মাল পাচার করার কোনও চক্রের মধ্যে জড়িত থাকার কোনও সম্ভাবনাও ছিল না। কাজেই এত সব বিচার করে, মিত্রদাকে খুন করবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন হতে পারে এমন লোকেরই, যে বা যারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্পিওনাজের মধ্যে যুক্ত। তা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্পিওনাজই যদি কারণ হয়, তবে খুনীকে এমন কোনও লোক বা প্রোজেক্টের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে যার কাছে বা যেখানে ভেতরের অনেক গোপন তথ্য আছে। ড. মিত্র তো এই ব্যাপারে একেবারে অগ্রগণ্য ছিলেন। বিভিন্ন যুগান্তকারী রিসার্চের মধ্যে তিনি জড়িত ছিলেন। তার মানে, খুনীও নিশ্চয়ই মিত্রবাবুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। এরকম ক-জন লোক ছিল? কাজেই বুঝতে পারছ ললিতাদি, যে এখানে আমার লিস্টটা একটু ছোট করা গেল।

“তারপরে আরও একটা পথে গেলাম। নীল ভূতের কথা তোমার মনে আছে তো – খুনের কিছুদিন পর থেকে মিত্রবাবুর বন্ধ ঘরের দরজার তলা থেকে মাঝে মাঝে রাত্রিবেলা নীল রং-এর আলো দেখা যেত?”

“হ্যাঁ, মনে আছে বইকি,” ড. বাগচি হেসে বললেন “ওই থেকেই তো ভূতের হুজুগটা শুরু হল…”

বন্দনা মাথা নেড়ে বলল, “ঠিকই। কিন্তু তোমার মতো তো আমারও ভূতে বিশ্বাস নেই। আমি প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম যে আমাদের খুনীই, রাতের বেলা একটা ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে বা অন্য কোনওভাবে মিত্রবাবুর ঘরে ঢুকে কিছু খুঁজে বেড়াত। ঠিক কী খুঁজে বেড়াত তা জানতে পারা না গেলেও কিছু যায় আসে না। শুধু এটা নিঃসন্দেহে বোঝা যায়, যে সে হয় তার খুন-এর কোনও প্রমাণ সরিয়ে দিতে চায়, অথবা যে সব কাগজপত্র সে বেচতে গিয়েছিল, মিত্রবাবুকে সরিয়ে দেবার পরে সেই কাগজগুলোই আবার সে খুঁজে বার করতে চায়। তা সে যাই হোক, আমার কোনওরকম সন্দেহ নেই যে খুনীই মিত্রবাবুর ঘরে গিয়ে আলোটা জ্বালাত— সেটা সম্ভবত কোনও ছোট রঙিন লেজারের টর্চ ছিল। কাজেই যে যে দিন ওই লেজারের আলো দেখা যেত, সেই সেই রাত্রে যাঁরা এই গেস্ট হাউসে থাকেননি, তাঁদের নাম আমাকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হল। তাতে করে আমার প্রায় সব নামই মুছে গেল। বাকি রইল শুধু, পার্থ ঘোষ আর সুভাষ দাশ। আমি নিশ্চিত হলাম যে খুনী এদের দুজনের মধ্যেই একজন।

“এরপরে আমি এই দুজনের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্বন্ধে খবর নিতে শুরু করে দিলাম। সুভাষ দাশ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ধনীর ঘরের একটি মেয়ের সঙ্গে তার প্রেম। কিন্তু উপার্জন কম বলে, আর বাড়িঘরের অবস্থা তত ভালো নয় বলে, মেয়েটির পরিবার বিয়েতে ঠিকমতো দিতে রাজি হচ্ছে না। সে কি তাহলে এস্পিওনাজ করে কিছু টাকা রোজকার কথা ভাবতে পারে না? কিন্তু ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখলাম যে তার সঙ্গে মিত্রবাবুর যোগাযোগ খুব কম ছিল। সুভাষ, মিত্রবাবুর সঙ্গে থোরিয়াম গ্রুপে কাজ করত বটে, কিন্তু সে কাজ করত ড. সিদ্দিকির সঙ্গে, একেবারে অন্য প্রোজেক্টে। আমি মনে করি যে খুনী নিজেই রাইসিন বানিয়েছিল। কাজেই লিস্টে থাকতে হলে এদের দুজনকেই রাইসিন তৈরি করায় সক্ষম হতে হবে। সুভাষ বায়োকেমিস্ট ছিল না। তবু, একটু পড়াশুনা করলে যে কোনও বিজ্ঞানের লোকই ক্যাস্টর অয়েলের বর্জ্য থেকে রাইসিন বানাতে পারে। কাজেই তাকে আমার সন্দেহের মধ্যে রাখতেই হয়েছিল। কিন্তু তুলনামুলকভাবে পার্থর সঙ্গেই মিত্রবাবুর সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ ছিল, আর সে বায়োকেমিষ্টও ছিল নিজে।

“তখন আমি পার্থ সম্বন্ধেই বেশি খোঁজ নিতে শুরু করলাম। ওর ওই দামি চকচকে লাল রং-এর জাগুয়ার গাড়িটাকে এই ক্যাম্পাসে আর কে না দেখেছে! সুন্দর গাড়ি সম্বন্ধে জানি আমেরিকানদেরই বেশি গর্ব থাকে। পার্থই প্রমাণ করে দিল যে বড়লোকের বাঙালির ছেলেরাও কিছু কম যায় না। একদিন আমি ওর সঙ্গে সোজাসুজি কথা বলতে গেলাম। খুবই আলাপী ছেলে সে। বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়া গেল। দেখলাম যে আমি আইআইটিতে যাঁর কাছে কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স থিসিস করেছি, তাঁর কাছে সেও থিসিস করেছে। প্রফেসরের সঙ্গে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক আছে। তাই পরের দিনই আমি ওঁকে ফোন করে বললাম, ‘একটা দরকারি ব্যাপারে তোমার সঙ্গে আমার একটু কাজ আছে, খড়গপুরে তোমার বাড়িতে এসে দেখা করতে পারব আজ বিকেলে?’ উনি অবাক হয়ে বললেন, ‘কোথায় আছিস’? এত কাছে আছি শুনে বললেন, ‘গৌতমকেও নিয়ে আয়, আমার বর ওকে খুব পছন্দ করে।’

“কিন্তু পার্থ সম্বন্ধে ওঁরা যা বললেন তাতে আমার পার্থর ওপর সন্দেহ হঠাৎ অনেক বেশি ঘনীভূত হয়ে গেল। পার্থ মোটেও কোনও ধনী পরিবারের ছেলে নয়। ওর পরিবার বাঁকুড়ার একটা গ্রামে থাকে, কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে নয়। ওদের অবস্থা অত্যন্ত সাধারণ। এমন কি, মাঝে মাঝে তাঁরা ঠিকমতন পার্থর টিউশন ফি পর্যন্ত দিতে পারতেন না। দু-চারবার পার্থর মা এসে ওঁদের কাছে অনেক কান্নাকাটি করার পরে, তাঁরা নিজেরাই গিয়ে ডিনের সঙ্গে কথা বলে কিছু মধ্যস্থতা করেন; ওর হোস্টেল আর টিউশন ফি-ও কিছু বাঁচিয়ে দেন; তা না হলে হয়তো ওর মাষ্টার ডিগ্রী শেষই হত না। তবে এও বললেন যে ভালো ছাত্র ছিল বলে পার্থকে এভাবে সাহায্য করতে পারায়, ওঁদের আনন্দই হয়েছিল। এখন যে পার্থর এত সমৃদ্ধি হয়েছে, এত দামি গাড়ি চড়ছে, তাতে ওঁরা খুব খুশি। বললেন, ‘পার্থকে বলিস একবার ফোন করতে; সে আমাদের একেবারে ভুলে গেল নাকি?’ আমি অবশ্য আমার সন্দেহের কথা ওঁদের আর কিছু বলিনি।

“শক্তিনগরে ফিরেই আমি কলকাতার আরেকটা ডিটেকটিভ এজেন্সিকে ফোন করে পার্থ সম্বন্ধে বিশদভাবে খোঁজ নিতে বলি। দেখা যায় যে পার্থ ওর আগের আগের কোম্পানিগুলোতে, ওর পড়াশুনা আর অভিজ্ঞতা মিলিয়ে যথাযথ মাইনেই পেত; তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু সাবানের কোম্পানির আগে ও যে অন্য একটা কলকাতার কোম্পানিতে কাজ করত, সেখানে থাকতে থাকতেই নাকি হঠাৎ ওর ভাগ্য খুলে যায়। ও সম্ভবত তখন চাকরির পাশাপাশি কিছু ফাটকাবাজির কাজও করতে শুরু করে, যদিও তার ইনকাম ট্যাক্সে এই আলাদা উপার্জনের কথার কোনও উল্লেখ সে করেনি। লাল গাড়িটি সে কয়েক বছর আগে ৫২ লাখ টাকা ক্যাশ দিয়ে কেনে।

“এইসব খবর পেয়ে আমি এবার ফোন করি আমার এক পারিবারিক সম্পর্কের দাদাকে। উনি, মানে শুভব্রত সরকার, বাগবাজার থানার ওসি। ওঁকে খবর নিতে অনুরোধ করি যে পার্থ কোনও ড্রাগ বা অন্য মাদক দ্রব্যের চক্রের মধ্যে যুক্ত কিনা। শুভদা কলকাতার ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট বিভাগের জয়েন্ট টাস্কফোর্স গ্রুপের অধিকর্তা। উনি খবর নিয়ে বললেন যে ড্রাগের ব্যাপারে পার্থকে কেউ চেনে না, তবে মাঝে মাঝে তাকে কিছু সন্দেহজনক চিনা কিম্বা কোরিয়ান দেখতে লোকেদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। এছাড়া আরও একটা খবর শুভদা আমাকে দিলেন – ওর আগের কোম্পানিটা থেকে নাকি পার্থ বরখাস্ত হয়েছিল, কোম্পানির ট্রেড সিক্রেট বাইরের কারুর কাছে ফাঁস করে দেবার অপরাধে।”

“ও তার মানে এর আগেও এইসব বদমায়েশি সে করেছিল। আমরা ওর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করেছিলাম ঠিকই, চাকরি দেবার আগে, কিন্তু এসব খবর কিছুই বেরোয়নি। মাঝখান থেকে দুটো নিরীহ মানুষের প্রাণ গেল!” সরকারবাবু পাশ থেকে খুব দুঃখ করে বললেন।

বন্দনা বলল, “হ্যাঁ, এই ধরনের খবর বার করা সাধারণভাবে বেশ শক্ত, কেননা দুপক্ষের কেউই এসব ব্যাপার ফলাও করে প্রচার করতে চায় না। উকিলেরা মিলে সব তথ্যের ওপরে কুলুপ মেরে দেয়। নেহাত শুভদা পুলিশের বড়বাবু, তাই বার করতে পেরেছেন।”

ড. বাগচি জিজ্ঞেস করলেন “পার্থর খুন করাটা প্রমাণ করা যাবে তো এখন?”

“খুব সম্ভবত যাবে,” বন্দনা উত্তর দিল “যদি ড. মিত্রর শেষ ব্যবহার করা সাবানটা পাওয়া যায়, আর সেটা যদি পার্থরই দেওয়া ছোবড়া-সাবান হয়। সরকারবাবু, মিত্রবাবুর বাথ টাবের ওপরে কি কোনও সাবান পাওয়া গেছিল?”

সরকারবাবু বললেন, “হ্যাঁ, পার্থর ছোবড়া-সাবানটাই ব্যবহার করেছিলেন উনি। সেটা তো পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে, ওদের কাছেই আছে নিশ্চয়ই।”

বন্দনা শুনে বলল, “বাঃ বেশ তো। কিন্তু সেটার কোনও অ্যানালিসিস করা হয়েছে বলে তো শুনিনি এখনও পর্যন্ত। হয়েছে কি?”

সরকারবাবু বললেন, “মনে তো হয় না, তা হলে তো অন্তত আমাকে বা আপনাকে কিছু জানাত। আপনি তো সেদিনই ওখানে গেছিলেন! ওঃ, আর আপনি বলার পরে এখন আমার মনে পড়ছে – জয়ন্তবাবুও পার্থর ছোবড়া-সাবানই ব্যবহার করেছিলেন। মিত্রদার গিফট সেটের দ্বিতীয় ছোবড়া-সাবানটা প্যাকেজের মধ্যে ওই ঘরেই পড়ে ছিল। উনি সেটা খুলে ব্যবহার করেন। সেটাও আছে পুলিশের কাছে।”

বন্দনা তখন বলল, “তাহলে আপনি পুলিশকে বলুন যে ওরা যেন অবিলম্বে ওই সাবান দুটো পরীক্ষা করে দেখে। তবে খুব সাবধানে। আমার আশঙ্কা যদি সত্যি হয়, তাহলে দেখা যাবে যে দুটো সাবানেই অনেক পরিমাণে রাইসিন লাগানো আছে।”

“কিন্তু সাবান মারণাস্ত্র কেন? তার ওপরে আবার তাকে ছোবড়া-সাবান হতে হবে কেন, শুধু সাবানে হবে না?” ড. বাগচি জিজ্ঞেস করলেন।

বন্দনা বলল, “ললিতাদি, শুধু সাবানে হবে না নানা কারণে, তবে খুন করার হাতিয়ার হিসেবে যে সাবানই এখানে সবচেয়ে ভালো নির্বাচন, সেটা স্বীকার করব। শৌখিন মানুষ হিসেবে মিত্রবাবু যে বিলিতি সাবান, শ্যাম্পু, সেন্ট, এসব প্রতিদিন ব্যবহার করতেন সেটা সবাই জানত। কাজেই সাবানে ঠিকমতন রাইসিন লাগিয়ে রাখতে পারলে, আর ব্যবহারের সময়ে চামড়ার ওপরের ত্বকে সামান্য কিছু কাটাছেড়া থাকলেই, সেই ছিদ্র দিয়ে রাইসিন শরীরের ভেতরে প্রবেশ করবে এবং রক্তের মধ্যে মিশে গিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে তার বিষক্রিয়া শুরু করবে। বেশি তো লাগবে না – খুবই সামান্য একটুখানি রক্তে গেলেও রাইসিন পুরোপুরি মারাত্মক। কাজেই সাবানটা ভালো টোপ। কিন্তু মিত্রবাবুর নিশ্চয়ই নিজস্ব পছন্দের ব্র্যান্ড ছিল। কাজেই পার্থ তাঁকে হঠাৎ একটা সাবান দিলেই যে তিনি সেটা ব্যবহার করবেন, তার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। তাই কোনওভাবে সাবানকে একটু বেশি আকর্ষণীয়, অথচ অনেক বেশি কার্যকরী করবার দরকার ছিল। এমনিতে বাজারের একটা সাবান হলে, যত দামিই হোক না কেন, পার্থ তার ওপরে বড় জোর রাইসিনের একটা কি দুটো কোটিং দিয়ে রাখতে পারত। কিন্তু প্যাকেট খুলে কোটিং দিয়ে আবার আবার প্যাকেজ বানাতে হত একেবারে নতুনের মতন করে – সেটা শক্ত কাজ। তা ছাড়া, সে কোটিং, সাবানটা সম্ভবত ধরে রাখতে পারত না। জলের সংস্পর্শে এলেই সব ধুয়ে চলে যেত – শরীরে ঢোকার সুযোগ পাবার আগেই। খুনের অস্ত্র হিসেবে বেশি কার্যকরী হত না। তাই আমি সাবানের কথা আগে ভাবিনি। কিন্তু এমনই ভাগ্য যে শেষ পর্যন্ত একটা বিশেষ ধরনের সাবান ব্যবহার করবার সুযোগ পেয়ে গেল পার্থ – তার আগের কোম্পানির কাছে শক্তিনগরের ঝিঙ্গের ছোবড়া বিক্রির ব্যবস্থা করে দেবার পরে। ছোবড়া জল শোষার পরে অনেকক্ষণ ভিজে থাকে। কাজেই খুব সহজেই কল্পনা করা যায় যে ছোবড়াকে খুব ঘন রাইসিন সরবতে ভিজিয়ে প্যাকেজ করে সিল করে দিলে ছোবড়াটা বিষ ধরে থাকবে পুরোপুরিই। তার ওপরে আবার সাবানটা ছোবড়ার ওপরে ডিপোজিট করবার সময় যদি গলিত অবস্থাতেই সাবানের মধ্যে রাইসিন পাউডার ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তবে তো সে আরও মারাত্মক অস্ত্র হয়ে দাঁড়াবে! বাজারের তৈরি সাবানে তো আর এভাবে সম্পৃক্ত করে রাইসিন লাগানো সম্ভব নয়! কিন্তু যেখানে ও নিজের ফ্যাক্টরিতে, হয়তো বা নিজেই, কাস্টম মেড সাবান তৈরি করে উপহার দেবার সুযোগ পাচ্ছে, তখন তো সেখানে সে যা খুশি তাই করতে পারে। সেইজন্য আজ ছোবড়া সাবানের বর্ণনা শুনেই আমার মাথার মধ্যে টিউব লাইট জ্বলে গেল।

“তবে আমার এটাও মনে হয় না যে পার্থ প্রথম থেকেই মিত্রবাবুকে খুন করবার ছক কষেছিল। সম্ভবত ওর ছিল শুধুই টাকার লোভ। সে কিছু তাজা খবর, রিসার্চ প্ল্যান ও প্রোগ্রেস, রাসায়নিক ফর্মুলা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার খুঁটিনাটি, এই সব তথ্যই চুরি করে এদিক ওদিক তার খরিদ্দারদের কাছে বেচত। কিন্তু যখন মিত্রবাবু ওকে যথাযথভাবে সন্দেহ করে ফেললেন, তখন সে ভয় পেয়ে গেল। প্রথমে অস্বীকার করলেও, পরে সে সম্ভবত সব কাগজই ফেরত দিয়ে দিয়েছিল। হয়তো বা এমনও হতে পারে যে সে কিছুই বিক্রি করবার সু্যোগ পায়নি শেষ পর্যন্ত। মিত্রবাবুর কাছে হয়তো অনেক ক্ষমাটমাও চেয়ে নিয়েছিল সেইজন্য। নরম হৃদয় মিত্রবাবু তাই, ওকে একটা দ্বিতীয় সুযোগ দেবার জন্য, ওর নাম আর কিছুতেই কাউকে বলতে চাননি। কিন্তু সমস্যাটা হল যে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো হঠাৎ বেঁকে বসল। তারা বলল যে জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে তাদের জানতেই হবে সেই লোকটি কে, এবং তার তথ্য সরানোটা আরও বড় কোনও পরিকল্পিত এসপিওনেজের পর্যায়ে পড়ে কিনা দেখতে হবে। মিত্রবাবু হয়তো শেষ পর্যন্ত পার্থকে বলেও ছিলেন, যে এবারে আর তিনি ওর নাম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর তদন্তকারীদের কাছ থেকে লুকোতে পারবেন না।

“আর ঠিক তখনই, চোর গৌতম পেরিয়ে খুনী গৌতমের জন্ম হল। ও জানত যে এমন একটা জাতীয় সম্পদ স্তরের কাজের তথ্য চুরি করবার চেষ্টা করেছিল প্রমাণ হলে ও খুবই কঠোর শাস্তি পাবে। হয়তো বা ফাঁসি হবে। তখন সে কিছুটা বাধ্য হয়েই, মিত্রবাবুকে খুন করবার পরিকল্পনা করল। কারণ মিত্রবাবু ছাড়া আর কেউ ওর চোর-পরিচয় জানত না। সেই জন্য ভাবল যে ওঁকে সরিয়ে দিতে পারলেই ওর পথের সব কাঁটা সরে যাবে। কিন্তু কীভাবে তাঁকে খুন করবে সে? বায়ো কেমিস্ট হিসেবে ও রাইসিনের কার্যকারিতা জানত। সেইসঙ্গে আবার এটাও দেখল যে ক্যাস্টর অয়েল প্রোজেক্টের দরুন তেল বার করে নেবার পরে টন টন বর্জ্য এদিক ওদিক পড়ে থাকে। তারই একটুখানি তুলে নিয়ে গেলে, বাড়িতে বসে ও নিজেই খুব সহজে উঁচু মানের রাইসিন বানিয়ে নিতে পারবে। আর তার পরে সেই রাইসিন সাবানে ঢুকিয়ে তার মারণাস্ত্র বানাতে পারবে।

“আমি ওকে অনেকদিন ধরেই সন্দেহ করেছি, এবং কেন করেছি, সেটাও আমি পুলিশ ইন্সপেক্টর মি. দাশকে খুলে বলেছি। এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। কিন্তু যেহেতু সাবানের অভিনব পরিকল্পনাটা আমরা আগে জানতাম না, সেহেতু রাইসিনটা কি করে ঠিক ওঁদের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে পারল পার্থ, সেটা আমরা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। ইন্সপেক্টর দাশ তখন বললেন, যে সেই যোগসাজশটা ঠিকমতন বুঝতে না পারলে পার্থর বিরুদ্ধে কিছুই প্রমাণ করা যাবে না। ও বেকসুর খালাশ পেয়ে যাবে, আর মাঝখান থেকে আমার সন্দেহের কথা জেনে, আমাকেই ওর পরবর্তী নিশানা করে ফেলবে। তাই ইন্সপেক্টর দাশ আমাকে উপদেশ দিলেন এই সম্বন্ধে আর কাউকে কিছু না বলতে। সেই কারণেই আমি চুপ মেরে গেছিলাম শেষ পর্যন্ত। তারপরে…”

ড. ইসলাম একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। সরকারবাবুকে বললেন, “আমাদের এই নিয়ে এখুনি একটা ম্যানেজমেন্ট মিটিং করা উচিত। আমি এখন চলি। আমাকে জানাবেন। মিস বন্দনা, গৌতমবাবু, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।” ড. বাগড়িও ড. ইসলামকে অনুসরণ করে বললেন, “আমিও এগোই। কখন মিটিং জানাবেন।”

তারপরে আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনাদের, বন্দনা, বিশেষ করে তোমাকে, সত্যিই অসংখ্য ধন্যবাদ।”

ওঁরা দুজনে চলে গেলে সরকারবাবু আমাদের দিকে ফিরে বললেন, “আজকে আর বেরোবেন না। এত দেরিও হয়ে গেল। এখন বরঞ্চ ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করুন। বুঝতেই পারছেন, আমাদের এখন অনেক কাজ। আমি মুখার্জীবাবুর কাছে যাই, খোকাবাবুকে ফোন করি, রায়বাবুকে ফোন করি। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের কাজের জন্য।”

– গোয়েন্দাগিরি চিটের গুড়, যদি বা ধরো খুনী –

পরের দিন আমার ঘুম ভাঙল অনেক দেরি করে। বন্দনা ততক্ষণে উঠে চানটান করে রোদ্দুরের দিকে পিঠ করে জানলার ধারে বসে চুল শুকোচ্ছে। ঘুম ভেঙেই এই দৃশ্য দেখে আমি আর চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। এত সুন্দরী মেয়েটা আমার বউ? একেই আমি সারাজীবন ধরে মনের আনন্দে ভালবাসতে পারব? একদৃষ্টিতে ওর দিকে নির্ভয়ে তাকিয়ে থাকতে পেরেও আমার যেন প্রাণটা ভরছিল না। কিছুক্ষণ পরে বন্দনা খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। বলল, “ড্যাব ড্যাব করে দেখছটা কি এতক্ষণ ধরে? আমাকে আগে দেখনি বুঝি?” আমি তখন কাব্য করে একটা যুতসই বৈষ্ণব পদাবলীর পদ আওড়াতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ও তার আগেই আবার বলে উঠল, “তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও, মুখার্জীবাবু ডেকে পাঠিয়েছেন।” আমার কবিতাটা এক মুহূর্তে পালিয়ে গেল বটে, কিন্তু কামনাটা নয়। হাত দুটো বিস্তার করে বললাম, “শিগগির এখানে চলে এস, নইলে…” “নইলে কি? তোমার সব বদবুদ্ধি আমি জানি… পাঁচ বছর বিয়ে হল… এখনও যতসব… মুখও তো ধোওনি দেখছি… মুখার্জীবাবু এক্ষুনি আসতে বলেছেন।” তুলোর মতো নরম একটা শরীরকে বাহু বন্ধনে বাঁধতে বাঁধতে বললাম, “চুলোয় যাক মুখার্জী…”

ঘণ্টা দুয়েক পরে যখন মুখার্জীবাবুর ঘরে গিয়ে ঢুকলাম দুজনে তখন দেখলাম, ড. ইসলাম আর সরকারবাবুও ওখানে বসে আছেন। মুখার্জীবাবু একেবারে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “আপনারা যখন দিন সাতেক আগে এই ঘরে প্রথম ঢুকলেন, তখন আমার কোনও প্রত্যাশা ছিল না। ভেবেছিলাম আপনারা এত ছেলেমানুষ, এ রহস্যের আপনারা কি সমাধান করবেন! কিন্তু আজ? আজ যে কি করে আপনাদের ধন্যবাদ দেব ভেবে পাচ্ছি না।”

বন্দনা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না না, এ কি বলছেন, আমরা আর কি এমন করতে পারলাম। অত বড় একজন সায়েন্টিস্টের প্রাণ বাঁচাতে পারলাম না, এই দুঃখ…”

সরকারবাবু বললেনঃ “দুঃখ কেন? আপনি না এলে তো খুনী শুধু বেকসুর খালাসই থেকে যেত না, মিত্রদা যে খুন হয়েছেন সেটাও কেউ বুঝতে পারত না। আর পার্থ গিয়ে এরপরে আবার কাউকে কোথাও খুন করে আসত।”

“ও খুনী প্রমাণ হয়েছে?” বন্দনা জিজ্ঞেস করল।

“তা আর বলতে?” সরকারবাবু বললেন “কাল রাত্রেই ইন্সপেক্টরবাবু আমাকে ফোন করে জানালেন – সাবান দুটো একেবারে রাইসিনে ভর্তি। বললেন, ‘ওই কনসেন্ট্রেশনে একশোটা হাতি মারা যেত, মানুষ তো কোন ছার।’ সে এখন শ্রীঘরে বসে দু-দিনের পচা ডাল দিয়ে রুটি চিবোচ্ছে। চিবোক, আস্তে আস্তে চিবোক, সারাজীবন সময় আছে।”

ড. ইসলাম বন্দনার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের দিক থেকে, বিশেষ করে আমার ব্যক্তিগত দিক থেকে, একটা অসম্ভব ভুল করা হয়েছিল – সে ভুলের মার্জনা হয় না, সারাজীবন আমাকে ওই নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।”

“কী ভুল?” বন্দনা অবাক হয়ে বলল।

“সাবধানতার অভাব।” মাথা নিচু করে ড. ইসলাম বললেন।

“কী রকম”?

“দেখুন, ক্যাস্টর অয়েল তৈরির বর্জ্যটাকে আমরা যদি এমনি ফেলে না রেখে, একবার একটু উঁচু তাপমাত্রায় নিয়ে গিয়ে ফুটিয়ে নিতাম তাহলে আর তার থেকে এত বিষাক্ত রাইসিন বানানো যেত না। এটা আমি জানতাম, কিন্তু কল্পনাও করতে পারিনি যে আমাদের বর্জ্য থেকে সত্যি সত্যি কেউ রাইসিন বানিয়ে এমন একজন দেবতুল্য ব্যক্তিকে খুন করবে।”

“আপনি আবার কী করে জানবেন তা, আপনি তো আর খুনীর মতো করে ভাবতে পারেন না!” বন্দনা তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল।

কিন্তু ড. ইসলাম তাও বলে গেলেন, “আমার মতো লোকের তো এটা ভাবা উচিত ছিল… কেন যে ভাবিনি জানি না! আমি রিজাইন করতে চাইলাম কাল রাতে, কিন্তু মুখার্জীবাবু কিছুতেই তা গ্রহণ করলেন না।”

মুখার্জীবাবু বললেন, “শুধু আমি কেন, কমিটির আর কেউই চায়নি যে আপনি এই ব্যাপার নিয়ে রিজাইন করুন। একে তো মিত্রদাকে হারালাম আমরা, এবার কি আপনাকেও হারাতে হবে?” ড. ইসলাম আর কিছু বললেন না। সরকারবাবু আমাদের বললেন, “মৈনুলদা আজ সকালেই নোটিস দিয়ে নতুন নিয়ম চালু করেছেন এই ব্যাপারে। ক্যাস্টর অয়েল তৈরির বর্জ্য আগে যথাযথভাবে গরম করে নিলে, তবেই সেটা বর্জ্য হিসেবে বিক্রি করবার অনুমতি দেওয়া হবে।” বন্দনা হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “অভিনন্দন! যথাযথ পন্থা নিয়েছেন এবারে।”

তারপরে বন্দনা সকলকে হাত তুলে নমস্কার করে বলল, “খুব ভালো সময় কাটল এ কদিন। আপনাদের আতিথ্যের তুলনা হয় না। কিন্তু আমরা এবারে আসি তাহলে। অনেক দূরের ড্রাইভ, বাবাও নিশ্চয় অপেক্ষা করে আছেন।”

মুখার্জীবাবু তাড়াতাড়ি ব্যস্ত হয়ে বললেন, “না না, যাবেন কোথায়? বসুন। এই জন্যই তো ডেকে পাঠিয়েছি। আপনার বাবার সঙ্গে কথা হল এইমাত্র। উনি আমার প্ল্যানটা অ্যাপ্রুভ করে দিয়েছেন।”

“কী প্ল্যান”? বন্দনা কিছুটা যেন ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করল “আমার আজকেই কলকাতা ফিরে যেতে হবে কিন্তু, খুব জরুরি কাজ আছে। তা ছাড়া অনেক দিন বাড়ির বাইরে তো – আর মন টিকছে না।”

মুখার্জীবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, “সে তো বুঝলাম। কিন্তু দেখুন, পার্থ যে ওর কম্পিউটারে বসে বসে সারা পৃথিবীতে কাকে কোথায় যোগাযোগ করে কী তথ্য বেচেছে – বিশেষ করে কৃত্রিম ফোটোসিন্থেসিসের তথ্য, তা তো আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না! আর কীভাবে যে সে সব খবর যে কম্পিউটারের থেকে বার করতে হয় তাও আমরা কেউ জানি না।”

এবারে কথাটা কোনদিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আমি একটু মুচকি হাসলাম। তাতে বন্দনা বোধহয় আরও চটে গেল। বেশ উষ্ণ হয়ে বলল, “তা এ ব্যাপারে আমি আবার কী করব। আপনাদের তো অনেক কাজ করে দিয়েছি, আর কত করব?”

সরকারবাবু একটু হেসে বললেন, “কেন, আপনি তো কম্পিউটার ফোরেন্সিক-এ পিএইচডি করেছেন এমআইটি থেকে, তাই না?” বন্দনা কিছু উত্তর দিলনা, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সরকারবাবু বললেন, “তাই অনেক বিবেচনা করে, কোম্পানির তরফ থেকে আমরা এবার আপনাকে আর একটা নতুন কন্ট্রাক্ট দিচ্ছি, পাঁচ লক্ষ টাকার। আপনি আমাদের সব কম্পিউটার ঘেঁটে দেখবেন যে আমাদের কতখানি ক্ষতি হয়েছে এবং কাকে কাকে কী তথ্য বিক্রি করা হয়েছে। সেই মতন আমরা নতুন ব্যবস্থা নেব।”

মুখার্জীবাবুর ঘর থেকে গেস্ট হাউসের দিকে যেতে যেতে বন্দনা আর কোন কথা বলল না। ও আসলে মন ঠিক করে ফেলেছিল যে ও আজকেই বাড়ি ফিরে যাবে। এখন আরও কিছুদিন এখানে থাকতে হবে বলে খুব বিমর্ষ হয়ে গেছে বুঝলাম। তাই একটু উৎসাহ দেবার জন্য বললাম, “যাক, বেশ আরও কিছুদিন সময় পেলাম জায়গাটা ভালো করে দেখে নেবার”। বন্দনা ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, “এমন কী আবার দেখার আছে এখানে, গৌতম?” আমি তৈরিই ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “দাঁতনের মতো ঐতিহাসিক জায়গা ভূ-ভারতে খুব কম আছে… একসময়ে দাঁতনকে বলা হত দন্তর্ভুক্তি। সে আজ গুপ্তযুগের কথা… এটা ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্যের পূর্বপ্রান্তের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘাঁটি… পরে শুনেছি শ্রী চৈতন্যদেব দাঁতনের পথ দিয়েই ওড়িষ্যার জগন্নাথ মন্দিরে যেতেন। আর মোগলমারীর নাম শুনেছ…?” এবারে বন্দনা আর না হেসে পারল না। বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা, থাকছি তো আরও কিছুদিন! কন্ট্রাক্টে সই করলাম কিনা?”

Tags: অমিতাভ রক্ষিত, উপন্যাস, কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

2 thoughts on “ঝিঙ্গে-পোস্ত

  • October 12, 2021 at 7:31 pm
    Permalink

    Asadharon….erakam baigyanik bishleshan diye rahasya golpo….bhison bhalo laglo….
    Satti ki Dantan e ei project ache….janar ichha railo.

    Reply
    • October 12, 2021 at 10:46 pm
      Permalink

      সুরূপা দত্ত – অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। এরকম প্রজেক্ট না থাকলেও থাকা উচিত, তাই নয় কী? আশা করি এই প্রজন্মের কেউ না কেউ এই ধরনের যুগোপযোগী কাজে নেমে পড়বেন – বাণিজ্যের লক্ষীকে ঘরে আনতে পারলে অনেক সমস্যারি সমাধা হয়ে যাবে আমাদের।

      Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!