ফাটল

  • লেখক: ঋজু গাঙ্গুলী
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

কালাহান একজিট পোর্ট, তিন দিন আগে, পাগল বুড়ো

“বুড়োওওও!”

তীক্ষ্ণ গলার চিৎকার কানে আসামাত্র বুঝলাম, অলস দুপুরটার বারোটা বাজাল।

আশফাক আর নীরা’র দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই কমিউনিটি শেল্টারে পড়তে না গিয়ে, বা রুবিক ইনক্‌-এর প্ল্যান্টে কাজে না ঢুকে ওরা আমার কাছে এসে ঘ্যানঘ্যান করলেও কারও কিচ্ছু বলার নেই।

নোংরা এই সমুদ্রতটের গলায় কুৎসিত মালার মতো ছড়িয়ে আছে পলিথিন, ফাইবার, ধাতুর টুকরো, সমুদ্রে ভেসে আসা নানা আবর্জনা জুড়ে-জুড়ে বানানো অজস্র ঘর। যে পরিমাণ লোক এখানে বসবাস করে তাতে জায়গাটা অনেক বেশি গুরুত্ব দাবি করে। কিন্তু সেই মানুষেরা এখন সংখ্যা, আর কালেভদ্রে নাম ছাড়া সব পরিচিতি হারিয়েছে। তাই মিলিশিয়া এখানে টহল দেয় ঠিকই; কিন্তু মুমূর্ষু মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, বা শৈশব চুরি-হওয়া শিশুদের দেখাশোনা করা তাদের কাজের মধ্যে পড়ে না।

দেখেছেন! এইসব ভাবি আর বলে ফেলি বলেই এখানকার বয়স্করা, সাবালকেরা আমাকে চুপ করিয়ে দেয়। ছোটদের অবশ্য অত মাথাব্যথা নেই। তাদের কাছে আমি স্রেফ ‘পাগল বুড়ো।’

পাগল…? তাই হব হয়তো। নইলে কিচ্ছু মনে করতে পারি না কেন? ছেঁড়া-ছেঁড়া দৃশ্য ভেসে আসে মাথার মধ্যে। টুকরো-টুকরো কথা, কিছু নাম… একটা বাদামি-রঙা ছিপছিপে চেহারা আর গভীর একজোড়া চোখ— কোথাকার, কবেকার স্মৃতি এগুলো?

“চটপট একটা গল্প বলো তো।” নীরা যে কখন আমার কাছে এসে গিয়েছিল, খেয়ালই করিনি। এবার ওর দিকে তাকাতেই মেয়েটা নিচু গলায় বলল, “ভালো গল্প বলবে। আশফাকের মন খারাপ। তোমার কাছে আসব বলায় তবেই ওকে ঝুপড়ি থেকে বের করতে পেরেছি।”

এবার আমার নজর গেল আশফাকের দিকে। ও বেশ দূরে ছিল। তবে… কীভাবে জানি আমার চোখ ওকেও একইরকম, বা আরও বেশি কাছে থাকা অবস্থায় দেখাচ্ছিল। এটা আমি কাউকে বলি না, কিন্তু আমার চোখের কিছু আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। শুধু চোখই নয়, আরও কিছু ব্যাপার আছে… তবে সে-কথা থাক।

“এই যে ক্যাপ্টেন!” হাঁক পাড়লাম আশফাকের উদ্দেশে। শুনলে বিশ্বাস হতে চায় না, কিন্তু সত্যি এটাই যে এই নোংরা বস্তিতেও মানুষ স্বপ্ন দেখে। আশফাক, নীরা, শাং, গোমেজ, মিয়া… এমন ছোটদের চোখে আমি এখনও সমুদ্র পার হওয়ার, এমনকি দূর আকাশের বুক চিরে অন্য কোথাও ধেয়ে যাওয়ার স্বপ্ন খুঁজে পাই। আশফাকই তো চায় জাহাজে চেপে দূরে কোথাও যেতে— যেখানে জলকষ্ট, খিদে, অত্যাচার আর অপমান ছাড়া অন্য কোনো বিপদের মুখোমুখি হওয়া যায়। তবে ও-সব কথা ওরা কাউকে বলে না। আমাকে বলে অবশ্য। আমি তো কেউ না।

ধুপ্‌ করে আমার পাশে বসে পড়ল আশফাক। জীর্ণ এই ঘরে প্রায় কিছুই নেই। একটা জীর্ণ ম্যাট, ছোট্ট ব্যাগে কিছু কাপড়— যাদের আমি অনেক খুঁজে জোগাড় করেছিলাম, জল আর খাবার রাখার একটা ছোট্ট টেবিল, আর একটা খাঁচায় একটা ডানাভাঙা বাজ— যাকে আমরা তিনজন মিলে উদ্ধার করেছিলাম। বাজটাকে ওরা ‘হেরা’ বলে ডাকে। নামটা চেনা-চেনা লাগে, কিন্তু চিনতে পারি না। হেরা’র দিকে তাকিয়ে আশফাক হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠে দু’হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজল। পাখিটাও কিছু একটা বুঝতে পেরে ডানা ঝাপটানোর চেষ্টা করল।

“কাঁদিস না।” নীরা আশফাকের পিঠে হাত রেখে বলল, “বরং বুড়োকে বল, কী হয়েছে।”

“বলে কী হবে?” ভাঙা গলায় বলে উঠল আশফাক। তারপর শীর্ণ শরীরটাকে সোজা করে বলল, “রুবিকের কড়াইয়ের সামনে যে বুড়ি ভিক্ষে করে, সে বলল, ফাটল নাকি বেলা-কে গিলে ফেলেছে। বুড়ো কি ফাটল থেকে ওকে বের করে আনতে পারবে?”

ফাটল!

এই বস্তিতে রয়েছি অন্তত দু’বছর ধরে। সময়টা ঠিকঠাক মনে পড়ে না। তবে লোকের মুখে শুনেছি, ধুঁকতে-ধুঁকতে মরুভূমি পেরিয়ে, বস্তির একটা ভাঙাচোরা ঘরে ঢুকে পড়েছিলাম আমি। পায়ে হেঁটে কালাহান কেউ পেরোয় না। তাই সবার ধারণা হয়েছিল, পোর্টের কাছেই কেউ আমাকে ফেলে গিয়েছিল। শরীরে অজস্র কাটা আর পোড়ার দাগ ছিল। কিন্তু পরে শুনেছি, সেই অবস্থাতেও হাতে ধরা একটা মাশেট, আর দু’চোখের দৃষ্টির ভয়ে কেউ এগোয়নি আমার দিকে।

তারপর ক’টা দিন কীভাবে কেটেছিল, জানি না। কেউ আমার কাছে আসেনি। তবে একদিন বুঝতে পারলাম, আমি তারিখ আর সময়ের ব্যাপারটা আবার খেয়াল করতে পারছি। আশপাশটা বুঝে নিলাম। তারপর একটু-একটু করে এখানে মানিয়ে নিতে শুরু করলাম।

এই জনবসতির মস্ত বড় বৈশিষ্ট্য হল, এখানে কেউ কাউকে খুব একটা বিরক্ত করে না। আমাকেও কেউ ঘাঁটায়নি। বরং এই ঘরটা আমাকে ছেড়ে দিতে লোকজনের তেমন কোনো আপত্তি দেখিনি। তার কারণটা পরে বুঝেছিলাম। জায়গাটা মরুভূমির মারাত্মক বিষাক্ত বিছে আর ক্যামোফ্লেজ করে থাকা প্রকাণ্ড মাকড়সাদের আড্ডা ছিল। তাতে আমার কোনো অসুবিধে হয়নি। বরং প্রাণীগুলো আমার সান্নিধ্য বরদাস্ত করতে না পেরে এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছিল। সেই থেকে এখানেই আছি। কারও কাছে ধার চাই না; কেউ ধার চাইলে দিতেও পারি না। ছোটদের টুকরো-টুকরো গান আর গল্প শোনানো ছাড়া কিছু করি না। আমার জন্য পেনশন আসে না। তবে তার দরকারও হয় না। বাতিল জিনিসের স্তূপ থেকে জামাকাপড় নিয়ে সেলাই করে নিজের পোশাক বানিয়ে নিই।

আরও বহু অর্ধোন্মাদ বা বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া প্রাক্তন সৈন্যের মতো আমিও এখানে পড়ে আছি। স্থানীয়দের সঙ্গে একটু-একটু করে আলাপ হয়েছে। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে এখানকার লোকজন আমার সামনে মুখ খুলতে চায় না।

রুবিকের কড়াই— মানে কোম্পানি থেকে চালানো লঙ্গরখানায় আরও অনেকের মতো আমিও যাই। খাওয়া সম্ভব হয় না; তবে লোকের যাতে সন্দেহ না হয় তাই খাবারটা ঝোলায় ভরে নিয়েই আসি বস্তির অন্য ক’জন আধ-পাগল আর নেশাড়ুর জন্য। সেখানে কথাপ্রসঙ্গে রাগে বা দুঃখে কেউ-কেউ মাঝেমধ্যে এই শব্দটা বলে ফেলে। তারপরেই বাকিরা তাকে চুপ করিয়ে দেয়। তাই আজ অবধি আমি বুঝতে পারিনি জিনিসটা ঠিক কী, বা কে। ছোটদের এই ধরনের জাগতিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলে তারাও সন্দিহান হয়ে ওঠে। তবে এবার…

“হয়তো পারব, আশফাক। তবে…” আমি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে থেমে গেলাম। মন বলছিল, সরাসরি আশফাককে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাব না। তাই ওভাবেই ছেলেটাকে খোঁচালাম। আড়চোখে দেখলাম, নীরা আর আশফাক দু’জনেই থমকে গেছে। স্পষ্ট অবিশ্বাস আর অসম্ভবের আশার লড়াই চলছে ওদের মধ্যে। এই লড়াইটা আমি বস্তিতে অনেকবার, অনেকের চোখে দেখেছি। শেষে ওই আলোগুলো নিভে যায়, তবু মুহূর্তের জন্য সেগুলো জ্বলেও ওঠে। এবারও কি…

“তবে কী?” ভাঙা গলাটা সরব হল।

“তবে ফাটলটার কাছে আমাকে নিয়ে যেতে হবে।” আলগাভাবে বললাম, “নইলে এই বস্তিতে আমি কোথায় ফাটল খুঁজব, বলো?”

“তুমিও মরতে চাও, বুড়ো?” প্রায় চিৎকার করে উঠল নীরা, “তুমি জান ওই ফাটল কী জিনিস? আজ অবধি এই বস্তির কত মানুষকে গিলেছে ওই ফাটল— সে-সম্বন্ধে তোমার কোনো ধারণা আছে? নাকি তুমিও আমাদের সঙ্গে রসিকতা করছ?”

মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝিয়ে ওদের দিকে তাকালাম।

আমার শরীর কিছু বোঝে না। তবে লোকের মুখে শুনেছি, আমার চোখজোড়ায় নাকি জগতের ক্লান্তি জমে আছে। কে জানে কতদিন ধরে কত কী করেছি… আর দেখেছি আমি। আপাতত সেই ক্লান্ত চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে দুই শিশু একটু-একটু করে শান্ত হয়ে গেল। তারপর আশফাক ধীর গলায় বলল, “ফাটলটা এই বস্তিতে, বা মরুভূমিতে নেই। ওটা আছে সমুদ্রের তলায়।”

“সমুদ্রের তলায়? সেখানে বেলা গেল কী করে?”

নীরা আর আশফাকের মধ্যে চোখাচোখি হল। এবার নীরাই নিচু গলায় বলল, “টানেলের মধ্যে সরু পাইপে মেরামতের কাজ করতে রোগা লোকেদের আর ছোটদের কাজে লাগানো হয়। তাতে কামাইও ভালো হয়। তাই বেলা ওতেই গেছিল।”

এবার আমার কাছে ছবিটা একটু স্পষ্ট হল।

এই সমুদ্রতট থেকে কিছুটা দূরেই মেগাকর্প-এর একটি অংশ— সোলারিস কর্পোরেশনের বিশাল কর্মকাণ্ড চলে। বস্তির মানুষদের কাছে তার প্রায় সবটাই অগম্য। তবে সোলারিস জানে, স্থানীয় লোকেদের শান্ত না রাখলে মিলিশিয়া বা ভাড়াটে রক্ষী দিয়েও তাদের বহুমূল্য জিনিসপত্র বাঁচানো যাবে না। তাই কিছু-কিছু ছোটখাট জিনিসের বেচাকেনা স্থানীয় মানুষদের মাধ্যমে হয়। অনেকসময় রক্ষী-নিয়োগের ক্ষেত্রে এই পোর্টের বাসিন্দা হওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়— এও দেখেছি। তাদেরই ক’জনের কাছে শুনেছি, একটা বিশাল উঁচু টাওয়ারের নীচ থেকে মাটির গভীরে চলে গেছে অনেকগুলো সমান্তরাল টানেল। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, ইদানীং মিলিটারির বেশ কিছু ছোটখাট জাহাজকেও জায়গাটার চারদিকে চক্কর দিতে দেখেছি। ওখানে ঠিক কী হয়? কে জানে। বেশি প্রশ্ন করলে ক’দিন পর ব্লাস্টারের ঘায়ে পোড়া এক বা একাধিক শরীর সমুদ্রে ভেসে যায়— এটাও সবাই জানে।

“তাহলে ফাটল কি ওই টানেলগুলোর মধ্যে হয়েছে?”

“আসলে…” ঢোঁক গিলল আশফাক, “ওই টানেলের জোড়গুলোতে নানা জিনিস জমে চিড় ধরে। তারপর সেগুলো বড় হতে থাকে। যন্ত্র দিয়ে নাকি ওগুলো সাফ করা যায় না; আবার সাফ করে জায়গাটা মেরামত না করলে টানেলটাই ভেঙে বা ফেটে যেতে পারে। তাই লোক লাগাতে হয়। এমনিতে নাকি খুব একটা অসুবিধে হয় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে ওগুলোর মধ্যে মানুষ হারিয়ে যায়।”

“হারিয়ে যায়? নাকি বাইরে, সমুদ্রের জলে ভেসে যায়? জলের চাপ সামলানোর মতো উপযুক্ত পোশাক না থাকলে কিন্তু শরীরগুলো খুঁজে পাওয়াও কঠিন হবে।”

কোথা থেকে কথাগুলো এল? আমি কি সমুদ্রের তলায় কখনও কাজ করেছি? হয়তো সৈন্য হিসেবে কখনও…

“না-না!” অধৈর্য ভঙ্গিতে বলল নীরা, “সমুদ্রের জল ওখানে কোত্থেকে আসবে?”

আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। তখন আশফাকই বলল, “পাহানকে চেন তো?”

পাহান এই এলাকার কুখ্যাত মাতাল। মিলিশিয়া থেকে স্থানীয় মাফিয়া— সবার সঙ্গেই মারামারি করেছে ও। তবে ছোটদের ও বেশ স্নেহ করে। লোকটার একটা হাত নেই। কিন্তু সেখানে একটা ভ্যানাডিয়ামের টুকরো গুঁজে, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে চলাফেরা করে বলে ওর সঙ্গে কেউ চট করে লাগতে আসে না। ওকে না-চেনা অসম্ভব। তাই মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

“পাহান বলেছিল, ওর এক বন্ধু টানেলের ফাটলে কাজ করছিল। ও তখন বাইরে গার্ড ডিউটিতে ছিল। বন্ধুটি টানেলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল। আর্তনাদ শুনে তাকে টেনে বের করতে চেষ্টা করেছিল পাহান আর আরও ক’জন। তখনই পাহানের হাতটা নাকি… কীসে টেনে নেয়!”

পাহানের মদের টাকা তাহলে ক্ষতিপূরণ বা পেনশন থেকেই আসে! কিন্তু এই টানেলে যদি শুধুই আকরিক বা খনিজ তোলা হত, তাহলে তো এইরকম কিছু হওয়ার কথা নয়। আসল কথাটা কার কাছে জানা যাবে? প্রশ্নটা মাথায় আসামাত্র আমি গত কিছুক্ষণ ধরে হওয়া কথাগুলো মাথার মধ্যে আবার ফিরিয়ে আনলাম।

পেয়েছি! রুবিকের কড়াইয়ের সামনে বসা ভিখিরি বুড়ি… কী যেন নাম? মনে পড়েছে— থেলমা। বেলা আর ও বোধহয় একই এলাকা থেকে এসেছিল। হয়তো সেজন্যই খবরটা ওর কাছে দিয়েছিল কেউ। থেলমাই তাহলে আমাকে বলতে পারবে, ঠিক কীভাবে বেলা এই ‘কাজ’-টা পেয়েছিল।

আমার ধারণা এখনও আবছা। এটুকু বুঝতে পারছি যে বেলা বোধহয় আর বেঁচে নেই। পাহানের মতো মানুষের একটা হাত যে গিলে ফেলতে পারে, তার সামনে একটা দশ বছর বয়সী ছোট্ট শরীর কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারবে না।

তবে আমি পারব।

কথাটা মগজে বাসা বাঁধামাত্র ভাবনা-চিন্তার পথগুলো একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। সেই সঙ্গেই শরীরের প্রায় অচল, ক্ষয়িষ্ণু বোধ-হওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সচল হয়ে উঠল। আমি কি তাহলে সৈন্যই ছিলাম? নইলে একটা লক্ষ্যের সন্ধান পাওয়ামাত্র আমার মধ্যে এই পরিবর্তন এল কেন?

সৈন্য? কিন্তু তাহলে মেগাকর্প বা টেরা মিলিটারি-র সবকিছুকে আমি এত অপছন্দ করি কেন? আমি আসলে কী ছিলাম?

হাভেন কমিউনিটি সেন্টার, দু’দিন আগে, রডরিগেজ

মিলিশিয়া চিফ তাঁর অধস্তন এক অফিসারের সঙ্গে কথা বলছেন— এই দৃশ্যটা কি আপনার কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হবে?

না। আমার মাথা খারাপ হয়নি। বরং দিনকাল যে কতটা খারাপ তা বোঝানোর জন্যই এই প্রশ্নটা করলাম।

দু’বছর আগের সেই ঘটনাগুলো এখন অনেকেই ভুলতে বসেছে। কালাহান মরুভূমিতে বালিয়াড়ির গড়া আর ভাঙার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ভালো-মন্দ মিশিয়ে হাভেনের অধিকাংশ মানুষই ফিরে গেছে অভ্যস্ত জীবনে। তবে চিফ প্যাটেল আমাকে ডেকে পাঠালেই যে বিভাগের মধ্যে অনেকে সন্দিহান হয়ে ওঠে, সেই কথাগুলো কানাকানি হতে-হতে যে পৌঁছে যায় মেগাকর্প-এর অন্দরমহলে— এটা আমরা দু’জনেই জানি। তাই এই ব্যবস্থা করেছেন চিফ।

কমিউনিটি সেন্টারে ছেলেকে নিয়ে অ্যাকাডেমিক কাউন্সেলরের সামনে বসে আমি বকুনি খাচ্ছি। পাশের টেবিলে এক ডাক্তারের কাছে আলফা-আলফা ঘাসের গুণ শুনছেন চিফ। এরই মধ্যে ডাক্তারের ফোল্ডারটা টেবিল থেকে নীচে পড়ে সবকিছু ছড়িয়ে গেল। তারই সঙ্গে মিশে গেল চিফের হাত থেকে পড়া একটা ছোট্ট চিপ। নিচু হয়ে সব গুছিয়ে তুলবার সময় চিপটা আমার আঙুলের ফাঁকে ঢুকল। তারপর ধন্যবাদ, “আরে কোনো ব্যাপার না!” “ডাক্‌, তুমি এখানে?” নানা কথা… এবং নিজের বাসস্থানের দিকে রওনা হওয়া।

তবে আমি তক্ষুনি বেরোলাম না। বরং আর্থারের সঙ্গে গেম সেন্টারে গিয়ে একটা আপাত দুঃসাহসিক কাজ করে ফেললাম।

“তুই বলিস, ‘স্টারমেকার’-এ নাকি তোকে হারানো যায় না। আর আমি যদি আজ তোকে হারাই?”

যা হওয়ার তাই হল। মুখে ব্যঙ্গ আর অনুকম্পা মেশানো একটা হাসি ফুটিয়ে খেলতে রাজি হল আর্থার। প্রত্যাশিতভাবেই আমি প্রথম রাউন্ডেই হেরে ভূত হয়ে গেলাম, কিন্তু আর্থার খেলে চলল। ওর পাশের কনসোলে বসে মনিটরে একটা ড্রাইভ লাগিয়ে তাতে চিপটা ফিট করলাম আমি।

ওখানে বসেই ব্যাপারটা বুঝে নেওয়া ছাড়া কী করতাম বলুন? সেন্টার থেকে বেরোলেই যে একদল গুন্ডা, বা মিলিশিয়াই আমার খানাতল্লাশি নেবে না— এর গ্যারান্টি কে দেবে? তাই স্টারমেকার-এর রোমহর্ষক কীর্তিকলাপের বদলে ওখানে বসে আমাকে পড়তে হল খুদে-খুদে হরফে লেখা একটা ছোট্ট রিপোর্ট।

রিপোর্টটা টেরা মিলিটারি-র মেরিন কোর থেকে সদরে পাঠানো হয়েছিল। কীভাবে মিলিশিয়া ওটা ইন্টারসেপ্ট করেছিল কে জানে! তবে জিনিসটা যে ইতিমধ্যেই রিড্যাক্টেড হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছিল কোণের লাল ছাপটা থেকে।

ওতে বলা ছিল, কালাহান একজিট পোর্ট থেকে দশ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের মধ্যে একটা বিশাল উঁচু টাওয়ার তৈরি করেছে সোলারিস কর্পোরেশন— যারা মেগাকর্প-এরই একটা শাখা। ওটাকে সমুদ্রের তলা থেকে খনিজ সন্ধান আর উত্তোলনের জন্য জরুরি বলে দাবি করা হয়েছে এতদিন। কিন্তু মেরিন কোরের কয়েকটা জাহাজ যা দেখেছে তাতে তাদের মনে হয়েছে, ওই টাওয়ারের মাথায় অস্ত্র-পরীক্ষা বা ওইরকম কিছু নিয়ে কাজ হচ্ছে। মেরিন কোর ওখানে ঢুকতে পারবে না। কিন্তু মিলিটারির উচিত ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত করা।

এই জিনিস চিফ আমাকে দিয়েছেন কেন?? ভুল করে অন্য কিছু দিয়ে ফেলেননি তো?

হ্যাঁ, এ-কথা সত্যি যে মেগাকর্প সিভিলিয়ান এলাকায় মিলিটারি রিসার্চ করছে— এটা জানাজানি হলে ওদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। রিপোর্টটা যে সেজন্যই রিড্যাক্টেড হয়ে গেছে, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু আমি কী করব? মেগাকর্প-এর কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি অ্যাকাউন্ট ছাড়া আর কিছু তো আমি দেখতে পারব না। তাই দিয়ে এই বিষয়ে তদন্ত করব কীভাবে?

রুবিকের কড়াই!

আমি হঠাৎ নড়ে ওঠায় কন্সোলটাই হেলে গেল। আর্থারের একটা বহুমূল্য ‘লাইফ’-ও গেল বরবাদ হয়ে। চোখ থেকে ভিজর সরিয়ে ও আমাকে বকার আগেই আমি চিপটা বের করে পেছনের তেতে থাকা তারের জালে ফেলে দিলাম। জিনিসটা কিছুক্ষণের মধ্যেই অপাঠ্য হয়ে যাবে। আর্থারকে ম্যানেজ করার জন্য কাঁচুমাচু মুখে বললাম, “খিদে পেয়ে গেছে। এবার বাড়ি যাই?”

মারিয়া’র কাছ থেকে এই একটা ব্যাপার পেয়েছে আর্থার আর চিয়া। আমার খিদে পেয়েছে শুনলেই দু’জনে বেশ ক্ষমাশীল হয়ে পড়ে। আজও তাই হল। আমরা উঠে রওনা দিলাম। ফুড কোর্টে গিয়ে খাবার কিনলাম। তারপর চিয়া’র জন্য একটা ফাইবারের নান-চাকু, মারিয়া’র জন্য মশলার প্যাকেট, এমন আরও বেশ কিছু হাবিজাবি কিনে বাইরের দিকে এগোলাম। জানতাম, আমাকে যদি কেউ ট্র্যাক করেও তাহলেও ঠিক কোথায় চিপটা আমি ফেলে থাকতে পারি— সেটা বুঝতে এরপর সময় লাগবেই। ততক্ষণে চিপটা নষ্ট হয়ে যাবে।

ঠিকই ধরেছিলাম। আমরা সেন্টার ছাড়ার আগেই ঘোষণা হল, একটা বায়োমিমেটিক স্পোর নাকি ছড়িয়ে পড়েছে। সেটা গায়ে মেখে কেউ যাতে বেরোতে না পারে তাই প্রত্যেকের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি স্ক্যানিং করে তবেই ছাড়া হচ্ছে। তারপরেও নাকি পুরো সেন্টার জুড়ে তল্লাশি হবে। একদিক দিয়ে ভালোই হল। এই সময়টাতে আমি পরিকল্পনাটা আরেকটু গুছিয়ে নিলাম।

কালাহান একজিট পোর্ট যে ঠিক কার শাসনে চলে— এটা নিয়ে সংশয় আছে। ওখানে কোনো কাউন্সিল নেই; তবে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একটা মিলিশিয়া আছে। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটা হাভেন মিলিশিয়াই করে, ফলে ওখানে কিছু চেনাজানা লোক থাকবেই। দিমিত্রি কারমাজভই তো আছে! তবে ওখানকার মিলিশিয়া, বা অন্যান্য সংস্থার ওপর আমাদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

জায়গাটা একটা প্রকাণ্ড বস্তি বললেই ঠিক হয়। ওইরকম জায়গায় মাফিয়া, খুচরো অপরাধী, প্রাক্তন সৈনিক, ভাড়াটে খুনি, নিরীহ আর মার-খাওয়া মানুষ— সবাই থাকে। সোলারিস কর্পোরেশন ওখান থেকে একেবারে নিচু স্তরের কাজের জন্য কিছু কর্মী নেয়। রুবিক ইনক্‌-এর হাইড্রোপনিক ফার্মেও অনেকে কাজ করে। বাকিরাও যাতে অনাহারে না-মরে বা বড় রকমের অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য ওখানে একটা কমিউনিটি কিচেন চলে। লোকমুখে ওটা রুবিকের কড়াই নামে খ্যাত; তবে আমি জানি, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি-র অংশ হিসেবে মেগাকর্প-ই ওটা চালায়।

ওটার কাজকর্ম খতিয়ে দেখার জন্য আমি ওখানে যেতেই পারি। কিন্তু তারপর? সোলারিস কর্পোরেশনের জায়গায় আমি ঢুকতে চাইলে অনুমতি লাগবে। তার জন্য উপযুক্ত কারণ আমার পক্ষে রাতারাতি জোগাড় করা একেবারে অসম্ভব। ওই দুর্ভেদ্য জায়গায় ঢুকতে গেলে আমার একটা ফাটল লাগবে। সেটা পাওয়া যেতে পারে…

“কেমন আছ ডাক্‌?” দিমিত্রি’র বাজখাঁই গলাটা ভেসে এল কমিউনিকেটরের মধ্য দিয়ে। ভিডিও ফোন করা বা ধরা এর দ্বারা হবে না বুঝে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি।

“ভালো আছি। তবে তুমি তো সেই কবে থেকে শোনাচ্ছ যে বউকে নিয়ে হাভেনে আসবে; আদৌ আসবে তো? মারিয়া আশা করে আছে।”

“ম্লাদশেয়ে সিস্ত্রা (ছোট্ট বোন)-কে বলে দিও, সামনের মাসে আমাদের আসা একেবারে পাক্কা। তবে… আমি তার আগেই আসতে পারি।”

“তাই নাকি? কবে? মারিয়াকে…”

“ওকে খবরদার কিছু বোলো না। তোমার বউ বড় নীতিনিষ্ঠ। এদিকে এই বয়সে আমারও তো স্বাদ-টাদ বদলাতে ইচ্ছে হয়! তাই আমি হাভেনে একটু… স্বাদবদল করতে আসব। সে-কথা মারিয়া জানলে আমার বউও জানবে। তারপর… হে ঈশ্বর!”

হাসি চেপে বললাম, “আচ্ছা। কিন্তু আমার একটা পরামর্শ লাগবে, দিমিত্রি।”

সাহায্য বা তথ্য চাইলে অনেকেরই মুখ শুকিয়ে যায়। পরামর্শের বেলায় লোকজন মোটের ওপর বেশ উদারই হয়। দিমিত্রিও সোৎসাহে বলল, “আরে বলো-বলো। কী ব্যাপার?”

“হাভেন কাউন্সিল থেকে বলা হয়েছে, কমিউনিটি কিচেনগুলোতে যারা খাওয়া-দাওয়া করে, তাদের একটা ডেটাবেস বানাতে হবে। নইলে ওগুলোর খরচাপাতির আড়ালে নাকি কর্পোরেট ফ্রড হতে পারে। কালাহান একজিট পোর্ট কাউন্সিলের আওতায় নেই। কিন্তু রুবিকের কড়াইয়ের খরচাপাতি সব এখানেই চার্জ হয়। ওখানে যারা আসে তাদের ডেটাবেস বানানোর জন্য আমার ওখানে যাওয়া কি নিরাপদ?”

“তা…” দিমিত্রি’র গলাটা হঠাৎ ঝিমিয়ে পড়ল, “আমি থাকতে তুমি নিরাপদ। কিন্তু খুব বেশি লোক এলে ব্যাপারটা সামলানো যাবে না। ভালো কথা, কাজটা কীভাবে করবে বলে ভেবেছ?”

“ওখানে নিশ্চয় সেন্সাস-টেন্সাস কিছু নেওয়া হয়। মানে কারা ওখানে থাকে তার কিছু রেকর্ড নিশ্চয় আছে। তার সঙ্গে ওই কিচেনে যাওয়া লোকেদের নাম বা বায়োমেট্রিকস মিলিয়ে নিলেই জানা যাবে, মোট জনসংখ্যার কতটা ওই কিচেনের সুবিধেটা নিচ্ছে। তারপর তার সঙ্গে ওখানে হওয়া মোট খরচার একটা তুলনা করলেই বোঝা যাবে, কোনো দু’নম্বরি কাজ হচ্ছে কি না।”

“প্ল্যান তো ভালোই।” দিমিত্রি হাসার চেষ্টা করল, “তবে সেন্সাস বন্ধ আছে প্রায় বছরতিনেক হল। এখানে যারা আসে তাদের মধ্যে অনেকেই তো কাউকে কিছু না জানিয়ে হারিয়ে যায়। বরং সোলারিস নিজের খরচাতেই একটা ডাইরেক্টরির মতো জিনিস বানিয়ে দিয়েছে। আমরা, টেসলা পাওয়ার,… অন্য সব সংস্থাও সেটা নিয়েই কাজ করে।”

“আরে বাহ্‌!” গলায় উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে বললাম, “সোলারিসের অফিসে গিয়ে ওদের মাস্টার ডেটাবেস নেওয়ার ব্যাপারটা তুমি দেখো। আমি এদিককার সবকিছু তৈরি রাখছি।”

“সোলারিসের অফিসে… তার জন্য অন্তত মাসখানেক লাগবে, ডাক্‌। আমাকে বরং একটা মেইল করে দাও। দেখি কী করা যায়।”

দিমিত্রি’র গলাটা নিরক্ষীয় আবহাওয়া ছাড়িয়ে তুন্দ্রার দিকে যাচ্ছে বুঝেও আমি কথাটা বলতে বাধ্য হলাম, “আমি আজ রাতে কালাহান পেরোব, দিমিত্রি। মারিয়া’র বানানো আচার সঙ্গে নেব। পারমিটও সঙ্গে থাকবে। তুমি শুধু এই কাজটা করে রেখো। কাল দেখা হচ্ছে তাহলে।”

কমিউনিকেটর রেখে ভাবলাম, ড্রাই ডকের এক স্মাগলারের কাছ থেকে শোনা কথাটা তাহলে সত্যি ছিল। স্থানীয় মাফিয়া বা অন্য কেউ নয়; একজিট পোর্ট থেকে মানুষ হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে চাইছে সোলারিস, ওরফে মেগাকর্প!

কিন্তু কেন?

আর তার সঙ্গে কি টাওয়ারের মাথায় চলা ওই গবেষণার কোনো সম্পর্ক আছে?

মেগাকর্প টাওয়ার অ্যানেক্স, একদিন আগে, ট্যান

“মেয়েটা তাহলে কোথায় গেল?”

নিচু, পালিশ-করা, রীতিমতো ভদ্র গলাতেও এই প্রশ্নটা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিল। নিজেকে একবার বোঝানোর চেষ্টাও করলাম, মিলিশিয়ার একজন মেজরকে এখানে কে কী করবে? তাছাড়া অদ্ভুতদর্শন এই বাড়ির অলি-গলিতে রাস্তা গুলিয়ে এখানে ঢুকে পড়াটা কি খুব অস্বাভাবিক?

আসলে এই বাড়িতে আমার থাকার কথাই নয়। তাও আমি এসেছি, কিছু একটা দেখে ফেলেছি, তারপর সেটা নিয়ে খোঁজাখুঁজি করব বলে নজরদারদের এড়িয়ে এই ঘরে লুকিয়ে আছি। এরপর লিওনিদ মুস্তাক যদি নিঃশব্দে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে সেটা মোটেই অস্বাভাবিক হবে না। হাভেনের সীমার বাইরে এ-সব এলাকায় মিলিশিয়া সেভাবে নজরদারিও চালায় না। তাই আমাকেই কিছু একটা করতে হবে। নইলে…!

না। এভাবে নয়। বরং আগে এটা বোঝানো দরকার, ঠিক কেন আমি এই জায়গাটায় এসেছি।

দু’বছর আগে ধ্বংস হয়ে গেছিল মোরিয়া মাইনিং কমপ্লেক্স। তার নীচ থেকে নতুন করে খনিজ উত্তোলনের কথা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। সেই ভীষণ বিরল, ফলে ভীষণ দামি খনিজটি নাকি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। কিন্তু সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী তার জন্য মাটির গভীরে যেখানে নামতে হবে, সেখানে সাধারণ প্রযুক্তি কাজ করবে না। মিলিটারি জানিয়েছে, সোলারিস কর্পোরেশন সমুদ্রের নীচ থেকে খনিজ তোলার জন্য যে-সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে, সেগুলো এখানে ব্যবহৃত হলে তাদের কোনো আপত্তি নেই।

“কিন্তু হাভেনের এত কাছে ওইরকম প্রযুক্তির ব্যবহার হলে, সেটা শহরের পক্ষে ক্ষতিকারক হবে না তো?”

কাউন্সিলর হুয়ানের তোলা এই প্রশ্নটার উত্তর জানার জন্যই হাভেন কাউন্সিল আমাকে সোলারিস কর্পোরেশনের এই অফিসে পাঠিয়েছিল। কালাহান মরুভূমির ওপারে সমুদ্রের গভীরে খোঁড়াখুঁড়ির ব্যাপারে ‘মাথা’-রা এখানেই বসেন।

আমাকে কেন?

সহজ উত্তর। এই দফতর থেকে ওই দফতর ঘুরতে-ঘুরতে আমিই এখন মিলিশিয়া আর কাউন্সিলের মধ্যে লিয়াঁজ অফিসারের পদে বসে আছি যে।

কিন্তু এখানে আসার পর প্রথম থেকেই বুঝতে পারছিলাম, কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। সোলারিস-এর কারবার যে গোলমেলে, তা সবাই জানে। ওরা যে সমুদ্রের তলা থেকে কী তুলছে, তা ওরাই জানে। আমার খটকাটা লেগেছিল অন্য কারণে।

বেছে-বেছে আজকেই, আমাকেই, এখানে পাঠানো হল কেন?

আজকের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক।

মাথার ওপরের ওই ধূলিধূসর আকাশে লুকিয়ে থেকে পৃথিবীর চারপাশে পাক খেয়ে চলেছে বহু নতুন আর পুরোনো উপগ্রহ। তাদের মধ্যে অনেকগুলোকে জুড়ে একটা নেটওয়ার্ক বানানো হয়েছে। সেটির মাধ্যমে সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের জলকে বাষ্পীভূত করা আর বৃষ্টি নামানোর একটা বিশাল প্রোজেক্ট চলছে গত কয়েকবছর ধরেই। সেই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপগ্রহটি অকেজো হয়ে পড়ায় এই ব্যবস্থাতে একটা মস্ত বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বিকল্প উপগ্রহটি আজ উৎক্ষিপ্ত হওয়ার কথা। কাল সেটি প্রায় আমাদের মাথার ওপরেই এসে স্থির হবে এবং কাজ শুরু করবে। এর ফলে এই অঞ্চলে সমুদ্রে যে-সব সংস্থা কাজ করে, তাদের প্রতিটিকেই নানারকম ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। সোলারিস-এর অফিসেও ব্যস্ততা একেবারে চরমে উঠেছে আজকেই।

এর মধ্যে এখানে এসে ওই প্রযুক্তির ব্যাপারে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে-করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। যাঁদের হাতে সময় ছিল, তাঁরা আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারছিলেন না। যাঁরা ঠিকমতো উত্তর দিতে পারতেন, তাঁরা সবাই ব্যস্ত ছিলেন। প্রধান বিজ্ঞানী এবং তাঁর ইউনিটের সবাই অফশোর সাইটে আছেন বলেই জানলাম। এইরকম অবস্থায় সোলারিস-এর এক কর্তা প্রায় বাধ্য হয়েই সাইটের নিরাপত্তার ব্যাপারটি যিনি দেখেন, তাঁর কাছেই আমাকে পাঠালেন।

লোকটির নাম লিওনিদ মুস্তাক। এখানকার প্রোটোকল অনুযায়ী নিজের নামে আগে একটা ক্যাপ্টেন বসিয়ে রাখলেও লোকটি টেরা মিলিটারি বা মিলিশিয়াতে কখনও কাজ করেছে বলে আমার মনে হয়নি। তবে লোকটি যে বিপজ্জনক, তা বুঝতে আমার দেরি হয়নি। সেই মুহূর্তে অবশ্য ও-সব নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি। বরং প্রযুক্তির খুঁটিনাটি না জানলেও, যেখানে কাজ হয় তার আশেপাশের মাটি, জল আর মানুষদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা লিওনিদ জানবেন— এমনটাই ভেবেছিলাম। সেটুকু জেনে নিলেই অন্তত আজ একটা রিপোর্ট দেওয়া যেত। অন্য যে কেউ সেটাই করত।

কিন্তু আমাকে পাঠানো হয়েছিল যে!

মুস্তাকের সামনে বসামাত্র আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বুঝিয়ে দিল, ওই ঘরের নানা কোণে বসে থাকা প্রত্যেকটি মানুষ আমাকে খুঁটিয়ে লক্ষ করছে। সে দেখায় শুধু কৌতূহল, বিদ্বেষ, হ্যাংলামি— এগুলোই নেই; একটা উত্তেজনা… আর আশঙ্কাও তাতে মিশে আছে।

অর্থাৎ… এখানে এমন কিছু আছে যেটা আমি জেনে ফেললে বিপদ। ইন্টারেস্টিং!

“ড্রিলিঙের পর নীচ থেকে কীভাবে জিনিস তুলে আনা হয়?”

এ-কথা, সে-কথার পর আমি এই নিতান্ত নিরীহ প্রশ্নটা করেছিলাম লিওনিদকে। সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম, ঘরের মধ্যে আবহাওয়াটা সুপারচার্জড হয়ে উঠেছে।

কেন?

লিওনিদ অবশ্য শান্ত, মার্জিত গলাতেই উত্তরটা দিয়েছিলেন, “মূল খনিটা সমুদ্রতল থেকেও অনেক নীচে। বড়-বড় অনেকগুলো ড্রিল সেখানে খোঁড়ার কাজটা চালায়। ক্রাশার সেগুলোকে ছোট-ছোট অংশে ভেঙে দেয়। সবকিছু টেনে তুলে আনা হয় মাটির কাছাকাছি। তারপর অনেকগুলো পাইপের মাধ্যমে ঘোরাতে-ঘোরাতে জিনিসগুলোকে নিয়ে যাওয়া হয় রিফাইনারি টাওয়ারের নীচে। বাকি কাজটা ওই রিফাইনারিতে হয়।”

ব্যাখ্যাটা বেশ সহজ বলেই মনে হয়েছিল। তাহলে ঘরে হঠাৎ করে টেনশনের মাত্রাটা চড়ল কেন? খুঁতখুঁতে মন নিয়ে পরের প্রশ্নটা করেছিলাম, “এগুলোর সবটাই নিশ্চয় সমুদ্রের মধ্যেই হয়। মানে এতে তো লোকজনের হাত লাগানোর দরকার হয় না; তাই না?”

“ঠিক তাই।” মৃদু হেসে বলেছিলেন লিওনিদ, “সমুদ্রের ওই জায়গাটা একেবারে ডেড জোন। তাই মানুষ শুধু নয়, কোনো প্রাণী— এমনকি শ্যাওলা বা প্রবালও ওখানে বাঁচবে না। জলে অক্সিজেনই নেই তো! আমাদের আসল ডিউটি থাকে রিফাইনারিতে। সেখানে অনেক লোক কাজ করে। জানেনই তো, কথায় কথা বাড়ে। সেখান থেকে ঝগড়া হয়ে হাতাহাতি হয়। তার থেকে ব্যাপার আরও অনেকদূরে গড়িয়ে যায়। আমরা সেগুলোই যথাসম্ভব সামলে-সুমলে রাখি আর কি।”

“তাহলে ওই জায়গাটায় বাইরে থেকে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না কেন?”

“আপনার থেকে এমন প্রশ্ন আসবে— এটা আশা করিনি মেজর।” জিভ দিয়ে আলতো চুক্‌-চুক্‌ শব্দ তুলে মাথা নাড়িয়েছিলেন লিওনিদ, “আরে বাবা, বাইরে থেকে কে আর আসবে? একজিট পোর্টের লোকজন, তাই না? গর্তগুলোর পাশ থেকে কার্বোৱ্যান্ডাম বা অন্য কোনো খনিজের টুকরো চুরি করতেই চাইবে তারা। অত বড়-বড় ক্রাশার আর সাকারের পাশে ভেসে কেউ যদি ওই কাজ করতে যায়, তাহলে তার কী পরিণতি হবে, ভাবতে পারছেন? সাধারণ মানুষ যাতে না-মরে, সেটা দেখাও তো আমাদের কর্তব্য!”

“তা ঠিক। তবে…”

বেশ বুঝতে পারছিলাম, ওখানে আমার আর কিছু করার নেই। সত্যি বলতে কি, ওটুকুর বেশি কাজ দিয়ে তো আমাকে পাঠানো হয়ওনি। তবু অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে টেবিলে রাখা কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রাণপণে একটা কিছু খুঁজছিলাম, যা দিয়ে লিওনিদের আপাত দুর্ভেদ্য দেওয়ালে একটা ফাটল ধরানো যায়। একরকম আন্দাজের বশেই বলে বসলাম, “সোলারিস তো স্থানীয় লোকেদের কাজেও লাগায় না বলে শুনেছি। তাই একজিট পোর্ট থেকে মাঝেমধ্যেই মানুষ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে এই খোঁড়াখুঁড়ির সম্পর্ক থাকার কথা নয়। তাই তো, ক্যাপ্টেন?”

ঘরটা মোটের ওপর চুপচাপই ছিল। হঠাৎ বুঝতে পারলাম, নৈঃশব্দ্যটা আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। লিওনিদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে পরিস্থিতিটা সহজ করতে চাইলাম। তখনই টেবিলে রাখা ট্যাবটা পিং করে জানিয়ে দিয়েছিল— একটা মেইল এল।

রুটিন ভঙ্গিতে লিওনিদ ট্যাবটা হাতে নিয়ে আনলক করলেন। আমার মেইলটা দেখতে পাওয়ার কথা ছিল না। ভদ্রলোক জিনিসটা আড়ালও করেছিলেন। কিন্তু এই বাড়ির নানা ফ্লোরের সার্ভেইল্যান্স দেখার একটা স্ক্রিন ওঁর পেছনেই ছিল। তার অন্ধকার হয়ে থাকা একটা খোপে ট্যাবের প্রতিফলনটা দেখা গেছিল। আর কিছু দেখিনি; তবে প্রায়রিটি অ্যালার্ট হিসেবে বড়-বড় করে দেখানো সাবজেক্ট লাইনটা উলটো চেহারাতেও দেখা গেছিল— ‘১৩৩৩১ ক্লিয়ারেন্স ক্যান্সেল।’

১৩৩৩১! সংখ্যাটা আমি খুব ভালো করে জানি। ডোনাল্ড রডরিগেজের অফিসিয়াল আইডি-র নম্বর ওটা। ইউনিফায়েড কম্যান্ড থেকে যারা মিলিশিয়াতে এসেছিল, তাদের আইডি-র নম্বর বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এমন একটা নম্বর কেন বেছে নিয়েছে ডাক্‌— সেই নিয়ে অনেক তর্ক হত একসময়। পরে চাপাচাপিতে ও বলেছিল, ডোনাল্ড ডাকের জন্মদিন ১৩ই মার্চ আর কমিক স্ট্রিপে প্রথম প্রকাশের বছর ১৯৩১ মিলিয়েই নিজের জন্য নম্বরটা বেছে নিয়েছে ও।

কিন্তু রডরিগেজ… ওরফে ডাক্‌ সোলারিস কর্পোরেশনের এলাকায় ঢোকার ক্লিয়ারেন্স পেয়েছিল কেন? সেটা হঠাৎ বাতিলই বা হল কেন? সবচেয়ে বড় কথা, ওই ধরনের একটা জায়গায় ক্লিয়ারেন্স বাতিল হওয়ার পর ডাক্‌-কে নিয়ে কী করবে ওখানকার রক্ষীরা? সসম্মানে এসকর্ট করে বাইরে পৌঁছে দেবে কি?

ভাবনাগুলো মুখে ফোটাইনি। লিওনিদ একটা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েই স্ক্রিনটা আবার লক করে দিলেন। সেটা কী ছিল, পড়তে পারার প্রশ্নই ছিল না। তবে অত সংক্ষিপ্ত আদেশের অর্থ ডাকের শরীর-স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হবে বলে মনে হয়নি। আর সেই মুহূর্তেই বুঝতে পেরেছিলাম, কেন এই অফিসে আমি আসামাত্র এমন একটা শ্বাসরোধী অবস্থা তৈরি হয়েছে।

প্রথমে ডাক্‌, তারপর আমি— হাভেন মিলিশিয়া-র দু’জন দাগি অফিসার একসঙ্গে সোলারিস-এর কারবারে নাক গলিয়েছে। এর অন্য অর্থ হতে বাধ্য।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন লিওনিদ। সামনে ঝুকে বাও করার মতো ভঙ্গি ফুটিয়ে বলেছিলেন, “দুঃখিত। কিন্তু আমাকে একটু বেরোতে হবে। আপনার আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে বরং অফিসের ইনফর্মেশন সেকশনে মেইল করে দেবেন। পরে দেখা হবে, কেমন?”

আমিও উঠে দাঁড়িয়ে সায় দিয়েছিলাম। লিওনিদ দু’জন রক্ষীর দিকে হাত তুলে বলেছিলেন, “কমপ্লেক্সের এই অংশটা গলিঘুঁজিতে ভরা। ওরা আপনাকে বাইরে পৌঁছে দেবে, মেজর।”

লিওনিদ বেরিয়ে যাওয়ার পর ভাবলেশহীন মুখে দু’জন রক্ষী দরজার দু’পাশে দাঁড়িয়েছিল। ওখান থেকে বেরিয়ে করিডর ধরে হাঁটতে শুরু করার পরেই দুটো জিনিস আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

প্রথমত, রডরিগেজ ঠিক কেন সোলারিসের গর্তে ঢুকেছে এবং কীভাবে ওকে বাঁচানো যায়— এগুলো না-জানা অবধি আমি এখান থেকে বেরোতে পারব না।

দ্বিতীয়ত, এখানকার নিয়ম অনুযায়ী আমার ব্লাস্টার আর ছুরি রিসেপশনে জমা আছে। কিন্তু আমার পেছনে থাকা দুই রক্ষীর হাতেই রয়েছে চার্জড ব্যাটন। আর… তারা ক্রমেই আমার কাছে এগিয়ে আসছে!

করিডর ধরে আসার সময়েই খেয়াল করেছিলাম, সিঁড়ির দিকে মোড় নেওয়ার আগেই একটা ওয়াশরুম তথা লেডিজ টয়লেট আছে। আমার পেছনের দু’জন কিছু বোঝার আগেই সেটাতে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। কোমর থেকে বেল্ট খুলে তাই দিয়ে দরজার হাতলটা জ্যাম করলাম। এতে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্ত হওয়া গেল!

যতক্ষণে ওরা গায়ের জোর খাটাবে, ততক্ষণে আমাকে এখান থেকে বেরোতে হবে। হ্যাঁ, দরজাটাকে কাটার দিয়ে দু’ফালা করে ভেতরে ঢোকার পর যে-কেউ বুঝবে যে আমি আর এখানে নেই। কিন্তু ওই সময়টা আমার দরকার ছিল।

পেছনের একজস্ট পাইপের মুখটা খুলতে বেশি সময় লাগেনি। আজ অবধি যত জায়গায় যত রকমের কাজ আর অকাজ করেছি তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি, ওখান থেকে বেরোনোটা আমার কাছে কোনো ব্যাপার ছিল না। কিন্তু তারপর?

টাওয়ারের বিভিন্ন দেওয়ালের গা বেয়ে নেমে যাওয়া পাইপগুলোতে দু’পা রেখে নীচে নামব বলে ভাবছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল, রডরিগেজের ব্যাপারটা না জানা অবধি এখান থেকে পালিয়েও কোনো লাভ হবে না। তাছাড়া ব্যাপারটা বুঝে ওরা ওপর থেকে কোনো পোর্ট খুললেই আমার নাগাল পেয়ে যাবে। নীচে ওদের লোকজন সবক’টা একজিট-পয়েন্টে হয়তো ইতিমধ্যে নজরদারি শুরুও করে দিয়েছে।

আমাকে অন্যরকম কিছু একটা করতে হবে— এমন কিছু… যেটা ওরা প্রত্যাশাও করবে না!

পাইপে শরীরের ভর দিয়ে আমি যত দ্রুত সম্ভব ওপরদিকে উঠতে শুরু করেছিলাম।

সবচেয়ে উঁচু পোর্টের কাছে এসে আমি দেওয়ালের গায়ে নিজেকে একেবারে মিশিয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। নাড়াচাড়া করে বুঝেছিলাম, মেইনটেন্যান্স পোর্টের ঢাকনাগুলো শুধু ভেতর থেকেই খোলে। তাই আমার পক্ষে ওগুলো খোলা সম্ভব ছিল না। বরং আমার অনুসরণকারীদের ওপরেই নির্ভর করতে হয়েছিল এক্ষেত্রে।

কিছুক্ষণ পরেই কাটারের গুঞ্জন কানে এল। সেই সঙ্গে আরও বেশ কিছু চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ পেলাম। বুঝতে পারলাম, বেশ বড় একটা দল টয়লেটে ঢুকেছে। আরও কয়েকটা চিৎকারের পরেই কেউ একজন স্পষ্ট গলায় নির্দেশ দিল টয়লেটের পেছনের শ্যাফটটা দেখার।

আমি শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষায় রইলাম।

পোর্ট খুলে প্রথমে একজন, পরে আরও একজন সামনে ঝুঁকে পড়ল। প্রথমে খালি চোখে, তারপর স্কোপ দিয়ে নীচে তাকিয়ে তারা বলে উঠল, “কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তবে নীচে কিছু একটা নড়ছে বলে মনে হচ্ছে!”

ঠিক এই জিনিসটার ভরসায় ছিলাম আমি। এতটা উচ্চতা থেকে নীচের দিকে তাকালে একজস্ট থেকে বেরোনো গরম বাতাসের প্রবাহ আর টাওয়ারের গায়ে জড়ানো আইভি মিলে এইরকম দৃষ্টিভ্রম হতে বাধ্য।

“নীচে নামো এক্ষুনি!” কড়া গলাটা স্পষ্ট শুনতে পেলাম এই উচ্চতা থেকেও, “বাকিরা নীচে খবর দাও। ওপরের পোর্টগুলোর কাছেও রক্ষীদের মোতায়েন করো। ছাদের প্যাড সিকিওর করার নির্দেশ এসেছে ইতিমধ্যেই।”

ওই দু’জন সৈন্য নিজেদের ব্লাস্টার আর ব্যাটন সামলে সাবধানে নীচে নামতে শুরু করল। আরও কয়েকজন দূরত্ব বুঝে পাইপের ধারে রইল। এই শোরগোল শুনে প্রত্যাশিতভাবেই ওপরের কার্নিশের ধারে দাঁড়িয়ে বোর হওয়া রক্ষীটি কৌতূহলী হল। পোর্ট খুলে সামনে ঝুঁকল সে।

নিরস্ত্র লড়াইয়ের ক্ষেত্রে মুয়ে থাই টেকনিকের কোনো তুলনা হয় না। সেই টেকনিকের অঙ্গ হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাতটা একবার চালাতেই চোখে সর্ষেফুল দেখল রক্ষীটি। তার শরীরের ঊর্ধ্বাংশে ভর দিয়ে পোর্ট দিয়ে ভেতরে ঢুকে এলাম আমি। মসৃণভাবে পোর্টটা বন্ধও করে দিলাম রক্ষীটির অসাড় হাত টেনে। নীচ থেকে কেউ দেখলে ইউনিফর্ম-পরা একটা হাতের টানে পোর্ট বন্ধ হওয়াটাই দেখবে।

করিডরে নেমে দু’পাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম, এই মুহূর্তে আমাকে কেউ দেখেনি। ক্যামেরা জাতীয় কিছুও দেখিনি। ঝটপট বন্ধ ঘরগুলোর গায়ের লেখা পড়ে দেখলাম, কোনটাতে আপাতত আশ্রয় নেওয়া যায়। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, মপ— এ-সব রাখার ক্লজেটের দরজাই সবচেয়ে সহজে খোলা গেল। তার মধ্যে রক্ষীটির অজ্ঞান দেহটিকে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। ঘুমোক লোকটা! তারপরেই পায়ের শব্দ পেলাম।

কোনো ঘরের হাতলই আমার আকুল টানা-হেঁচড়ায় সাড়া দিল না। বাধ্য হয়ে একটা ছোট্ট প্ল্যাটফর্মের নীচে গড়িয়ে গেলাম। তার ওপাশে একটা ফাইবারের আস্তরণ ছিল। সেটার গায়ে নিজেকে ঠেকাতে গিয়েই ছ্যাঁকা লাগল। তাও, দাঁতে দাঁত চিপে সেখানেই পড়ে রইলাম। পায়ের শব্দগুলো আমার কাছেই এসে থামল। তারপর দু’জোড়া পায়ের শব্দ উঠে এল আমার মাথার ঠিক ওপরে।

লিওনিদ মুস্তাক বললেন… ও ওটা তো আগেই বলেছি।

“কোথায় আর যাবে, ক্যাপ্টেন?” একটি নারীকণ্ঠ বলে উঠল। লিওনিদের ঘরে ঢোকার পর থেকে আমাকে একেবারে মাপছিলেন এক মহিলা রক্ষী। যতদূর মনে পড়ে, তাঁর কাঁধে দুটো তারা ছিল। অর্থাৎ রক্ষীদের মধ্যে লিওনিদের একটু নীচেই আছেন এই মহিলা। গলাটা কি তাঁরই? হবে হয়তো। তবে পরের কথাটা আরও অর্থবহ ছিল, “কিন্তু আপনার আর দেরি করা উচিত হবে না। মেসেজটা মিলিটারি-র হাতে পড়ে থাকলে রিড্যাক্টেড হয়েও খুব একটা লাভ হবে না। অতটা দেরি হওয়ার আগে আপনার টাওয়ারে চলে যাওয়া দরকার। এদিকটা আমি সামলে নেব।”

একটা বড় শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন লিওনিদ মুস্তাক। তারপর প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে তিনি হনহনিয়ে চলে গেলেন। অন্য মানুষটি… মহিলাটিও তাঁকে অনুসরণ করলেন।

এবার আমি কী করব?

হঠাৎ মনে হল, পায়ের শব্দগুলো যেন আমার পেছনে সরে এসেছে! কোনোক্রমে পেছন ঘুরে চমকে উঠলাম।

প্ল্যাটফর্ম যেখানে আছে সেটা, এমনকি তার লাগোয়া জায়গাটা আসলে ছাদেরই একটা ঢাকা অংশ। আবরণটা অস্বচ্ছ; তবে আমার শুয়ে থাকার সমান্তরালে একটা জয়েন্টের মতো অংশ স্বচ্ছ হয়ে রয়েছে। আসলে তার ওপর থেকে আস্তরণটা ঘষায়-ঘষায় উঠে গেছে। সেখান দিয়েই দেখলাম, আমার পিঠ পুড়িয়ে দেওয়া ফাইবারের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটো চপার। এক ঝলক দেখেই বুঝলাম, এগুলোও স্ট্যান্ডার্ড ইস্যু— মানে পাইলট ছাড়া আর একজন লোক বসতে পারে। তবে এগুলোর মালপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা প্রচুর। লিওনিদ হনহন করে হেঁটে একটা চপারে পাইলটের পাশের সিটে বসলেন। তার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মহিলা— হ্যাঁ, তিনিই বটে— একদিকে ইশারা করলেন। চপারটা প্রবল শব্দ তুলে উড়ে গেল দক্ষিণ দিকে।

মহিলা’র হাতের ইশারায় আরেকটা চপারে দ্রুত কিছু জিনিসপত্র তোলা হল। আমিও আর দেরি করলাম না। গড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে আসতেই দেখতে পেলাম, চপারের পাইলট আর দু’জন রক্ষী ছাড়া আমার সামনে কেউ নেই। তারা বোধহয় ওভাবে আমাকে দেখার আশা… বা আশঙ্কা করেইনি। তাদের হতভম্ব ভাব কাটার আগেই আমি একটু আগে রক্ষীটির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া ব্যাটনের সদ্ব্যবহার করলাম। সিংগল-স্টিক বড় ভালো অস্ত্র— যদি ঠিকমতো শেখা আর অভ্যাস করা হয়। আমার ক্ষেত্রে দুটো কথাই খাটে। তিনটে লোককে ঘুমের দেশে পাঠিয়ে দিতে আমার খুব বেশি হলে তিরিশ সেকেন্ড লাগল।

মহিলা ততক্ষণে চপারে বসে সবটা দেখে-শুনে নিচ্ছিলেন। ওই সময়টা কাজে লেগে গেল। চপারের দরজা বন্ধ করার আগেই আমি তাঁর কাছে পৌঁছে যেতে পারলাম।

মূলত সাকুরা-কে খুশি করার জন্যই চপার চালানো শিখেছিলাম— যাতে ফ্লাইং ক্লাবে ওকে আর পিসিকে নিয়ে আকাশপথে কিছুক্ষণ ধরে ওড়ানো যায়। সে ছিল একেবারে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা। বাঁচোয়া এই যে এইসব চপারের মগজে ফ্লাইট-প্ল্যান ইতিমধ্যেই ভরা থাকারই কথা। তাই জয়স্টিক ধরে থাকতে পারলেই গন্তব্যে পৌঁছোনো যাবে, এমন আশা করাই যায়। তবে তার আগে…

মহিলা আমাকে ওখানে দেখার আশা করেননি। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে তিনি ব্লাস্টারটা বের করার আগেই আমি প্রায় উড়ে গিয়ে ওঁর ওপর পড়লাম। আঙুলের চাপে ব্লাস্টারটা আমার রগের পাশের চুল পুড়িয়ে দিল। পরক্ষণেই গলার নীচে সপাটে একটা মার খেয়ে মহিলা অচেতন হয়ে নীচে পড়লেন। ওঁকে দ্রুত টেনে পেছনের বড় ক্রেটগুলোর দিকে গড়িয়ে দিলাম; তারপর চপারে বসে দরজা বন্ধ করলাম।

পুরো ঘটনাটা ঘটতে বড়জোর তিরিশ সেকেন্ড লেগেছিল। তবু আমার বুক ধুক্‌পুক্‌ করছিল। যদি উল্টোদিকের টাওয়ারে বসা লোকেরা কিছু টের পায় তাহলে চপারসুদ্ধ আমাকে উড়িয়ে দিতে ওদের কোনো সমস্যাই হবে না। তাই আমি তাড়াহুড়ো না করে রোটর ঘোরানো শুরু করলাম। একটু পরেই দূরের টাওয়ারের মাথায় লাগানো বোর্ডে চপারের গায়ে লেখা সংখ্যাটা আর তার পাশে কয়েকটা সংখ্যা ফুটে উঠল। বুঝতে পারলাম, চপারের চালক যে বদলে গেছে— এটা এখনও কারও নজরে পড়েনি। আর দেরি করলাম না। সংখ্যাগুলো টাইপ করে দিতেই চপার সগর্জনে মেগাকর্প কমপ্লেক্সের এই অ্যানেক্স ছেড়ে উড়ে চলল দক্ষিণ দিকে।

লিওনিদের চপার ওদিকেই গেছে। ঠিক ওদিকেই, কালাহান মরুভূমির ওপারে রয়েছে একজিট পোর্ট, সমুদ্র, আর সোলারিস!

সমুদ্রের নীচে, এক দিন আগের বিকেলে, পাগল বুড়ো

“দেখে চলতে পারিস না ছুঁড়ি?”

গলায় কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা তাচ্ছিল্য, আর কিছুটা লালসা মিশিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল লোকটা। দূর থেকেই ওর ইউনিফর্মে লাগানো ট্যাগটা পড়ে বুঝলাম, মাঝবয়সী, টাক-পড়া, ভারী শরীরের এই লোকটা ফোরম্যান— মানে এই লেভেলের অন্যতম মাথা। নীরা তাড়াতাড়ি ঝুঁকে একটু আগে ধাক্কা লেগে পড়ে যাওয়া ক্লিপবোর্ডটা তুলে সামনে বাড়িয়ে ধরল। তারপর বলল, “মাফ করবেন। আসলে অপারেটর বলেছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নীচে যেতে হবে। আজকেই প্রথম দিন তো। তাই…”

দাঁত খিঁচিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ফোরম্যান। তখনই ওর নজর পড়ল একটু পেছনে দাঁড়ানো আমার দিকে। একটা জিজ্ঞাসা ফুটে উঠল ওর চোখে।

ট্যাবটা বের করে এগিয়ে দিলাম লোকটার দিকে। সেটা হাতে নিয়ে টেপাটেপি করার পর লোকটার শক্ত মুখটা একটু নরম হয়ে আবার বিরক্তিতে ভরপুর হয়ে উঠল। ওটা আমার দিকে প্রায় ছুড়ে, পাশের লেভেলের দিকে ইশারা করেই অন্যদিকে চলে গেল ফোরম্যান।

নীরা বোধহয় এতক্ষণ দম বন্ধ করে ছিল। এবার ও শ্বাস ফেলল। ওর কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে আশ্বস্ত করলাম। এভাবেই এগোতে হবে। আসল কাজের জায়গা এখনও অনেকটা দূরে।

গত দু’দিন আশফাকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছিলাম, ঝোঁকের মাথায় এইরকম একটা প্রাণঘাতী মিশনে ওকে নিয়ে এগোনো যাবে না। স্নায়ুর ওপর এতটা চাপ নিতে পারবে না ছেলেটা; কিন্তু নীরা পারবে!

মেয়েটার রোগা চেহারাতেও ঝলসে ওঠা চোখজোড়া দেখলেই আমার চেতনায় কোনো একজনের ছবি ভেসে ওঠে। তাকে ঠিকমতো মনে করতে পারি না। তবু… অনেকটা পাওয়ার গ্রিডের কাছে বাতাসেও যেভাবে গুঞ্জন ওঠে, সেভাবেই তার উপস্থিতিটা আমার ভাবনায় ঘুরপাক খায়। সে অনেক কিছু পারত। নীরাও পারবে। এই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই ঠিক করেছিলাম, থেলমা’র কাছ থেকে খোঁজ পাওয়া দালালের মাধ্যমে সোলারিস-এর এলাকায় যাবে নীরা। তার পেছনে যাব আমিও— তবে অন্য ভূমিকায়।

“বুড়ো?”

নীরা’র চাপা গলা শুনে আমি বর্তমানে ফিরে এলাম। বললাম, “ভয় করছে?”

মাথা নেড়ে সায় দিল মেয়েটা। তারপর নিচু, শক্ত গলায় বলল, “আমার কিছু হলে তুমি আশফাক-কে সামলে রাখবে। ছেলেটা এখনও বড্ড নরম মনের রয়ে গেছে।”

“কিচ্ছু হবে না।” সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে বললাম, “তুমি ওই দিকে এগিয়ে যাও। রাস্তায় যেক’টা গেট পড়বে তার রক্ষীদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হাতের এই ছোট্ট কার্তুজের মতো জিনিসটা গেটের ফাঁকে গুঁজে দেবে। তাতেই তুমি গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারবে।”

“আর তুমি?” আমার দিকে ঘুরে, চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল মেয়েটা।

“আমি আসব।” কথাটা বলামাত্র আমার মধ্যে কী যেন একটা হয়ে গেল। মনে হল, অব্যবহারে ভুলে যাওয়া একটা সার্কিট দিয়ে হঠাৎ বয়ে গেল বিদ্যুতের প্রবাহ। মেয়েটার অযত্নে রুক্ষ হয়ে যাওয়া চুলে ভরা মাথায় আলতো করে হাত ছোঁয়ালাম। নীরা হনহনিয়ে এগিয়ে গেল। আমিও এগোলাম— তবে ধীরে-ধীরে।

টানেল দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত লোকজন, আর একজিট পোর্ট থেকে জোগাড় করা সুলভ শ্রমিকেরা ওই জায়গায় যেতে পারে। নীরার হাতে থাকা কার্তুজের আকৃতির মাইক্রো-ট্যাবে ওর নাম-ধাম না থাকলেও ওর বায়োমেট্রিক্সের সঙ্গে ম্যাপ করে গন্তব্যটা দেওয়া ছিল। আমার জন্য সোলারিস-ই অন্য একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

গত দু’দিন ধরে কালাহান পেরিয়ে একের পর এক চপার আর হোভার এসে পৌঁছেছিল পোর্টে। প্রাপ্তবয়স্করা সেগুলোর ধারে-কাছে যেতে না পারলেও আশফাক, নীরা, শাং… এমন ছোটরা ওগুলোর কাছে যেতে পারত। তাতে লোকগুলো বিরক্ত হত। দূর-দূর করে খেদিয়ে দিত। কেউ পয়সা ছুড়ত। কেউ আবার কাছে ডাকত। ছোটরা এ-সব সংকেতের অর্থ বিলক্ষণ বোঝে। তাদের কাছ থেকে টুকরো-টুকরো নানা খবর পেয়ে আমারও বুঝতে অসুবিধে হয়নি ব্যাপারটা।

আগামীকাল সোলারিস-এর এই এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা ঘটবে। তার জন্য বেশ কিছু টেকনিক্যাল লোককে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওখানে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গে থাকছে নতুন কিছু রক্ষী— যাদের একজিট পোর্ট এবং টাওয়ারের লোকজন চেনে না। আমার কাজ ছিল এমন এক রক্ষীকে চিহ্নিত করা— যার চেহারার আদলটা আমার সঙ্গে মিলবে। তার দুর্বলতা খুঁজে বের করে, বিশেষ একটা টোপ দিয়ে তাকে আলাদা করে নিয়েছিলাম। তারপর তাকে অজ্ঞান করে পোশাক আর ট্যাব নিয়ে নিয়েছিলাম। লোকটাকে আপাতত দিনতিনেকের জন্য চেনা কয়েকজনের হেফাজতে রেখে দিয়েছিলাম।

হলোগ্রামে সামান্য কিছু বদল করতে হয়েছিল। বায়োমেট্রিক বিবরণ নিয়ে নাড়াচাড়া করার বদলে আমি নিজের রেটিনা আর আঙুলে মাপমতো পরিবর্তন করে নিয়েছিলাম।

আজ্ঞে হ্যাঁ, ওটা আমি পারি। স্মৃতি সঙ্গ দেয় না। তবে এগুলো থেকেই মনে হয়, এককালে লোকজনের ওপর নজরদারি করা আর জনারণ্যে মিশে থাকাই আমার কাজ ছিল। তার সঙ্গে আরও কি কিছু করতাম আমি? ওই বাদামি শরীর আর ধিকিধিকি আগুন-জ্বলা চোখজোড়া… আমি কি তাকেও অনুসরণ করতাম?

খেয়াল হল, নীরা কোনো কথা না বলে ওই মাইক্রো-ট্যাব কাজে লাগিয়ে প্রথম গেটটা পেরিয়ে গেছে। এবার আমিও এগোলাম।

ট্যাবটা প্রথম গেটের স্লটে রাখলাম। স্ক্যানিঙের ফাঁকে গেটের দু’পাশে দাঁড়ানো পাথুরে মুখের রক্ষীদের মেপে নিচ্ছিলাম।

বেশ বোঝা যাচ্ছিল, নতুন লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় রক্ষীরা চাপে আছে। তবে নীচের বদলে টানেলের ওপর দিকে যাওয়ার পথেই নিরাপত্তার কড়াকড়ি খুব বেশি বলে মনে হয়েছিল। নীচটা, অন্য সব কমপ্লেক্সের মতোই, নেহাত মেহনতিদের জন্য বরাদ্দ। এই দুই রক্ষীর চোখের বিস্ফারিত, ঈষৎ ঘোলাটে দৃষ্টি বলছিল, শিফট বদলের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া এদের জীবনে এই মুহূর্তে অন্য কোনো লক্ষ্য নেই।

একটু পরেই গেটের পাশের আলোটা স্ক্যানিং সেরে সবুজ হয়ে গেল। পরের গেটের দিকে রওনা হলাম। নীরাকে আর দেখতে পাচ্ছিলাম না। ও ভালোয়-ভালোয় নীচে নেমেছে নিশ্চয়। আমাকেও এভাবেই এগোতে হবে।

ট্যাবে করা সামান্য হয়েও অসামান্য বদল স্ক্যানারে ধরা পড়বে না— এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম।

গত কয়েক বছরে ঠিক কত ধরনের লোক একজিট পোর্টে ঠাঁই নিয়েছে, তা কোনো ডেটাবেসে নেই। তবে রুবিকের কড়াইয়ের ভরসায় থাকা লোকেদের দিকে আমার নজর থাকত। কেন থাকত? জানি না। তবে আগেই লিখেছি, এই নজরদারির কাজটা আমার মধ্যে গেঁথে দেওয়া আছে। বিশেষ করে মেগাকর্প আর মিলিটারি, তাদের মধ্যে সম্পর্কের বিচিত্র খেলায় বোড়ে থেকে মন্ত্রী হয়ে ওঠা লোকজন— এদের আমি চিনে নিতাম। তারপর তাদের গতিবিধি সযত্নে লক্ষ করতাম। এভাবেই আমি এমন কয়েকজনকে পেয়েছিলাম, যারা এককালে মেগাকর্প বা মিলিটারির জন্য মাল সাপ্লাই করা বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করেছিল। তাদেরই একজন ছিল রেনো। ট্যাব নিয়ে তার কাছেই গেছিলাম গতকাল।

“তোমার প্ল্যানটা ঠিক কী, বল তো বুড়ো?” কুতকুতে চোখদুটো দিয়ে আমাকে প্রায় এক্স-রে করছিল রেনো, “সোলারিস উড়িয়ে দেবে? নাকি ওদের মাথাদের খুন করবে? নাকি স্রেফ কর্পোরেট এস্পিওনাজ? সত্যি কথা বলো। নইলে আমি তোমায় সাহায্য করার বদলে সবটা মিলিশিয়াকে জানাব।”

“আমি ফাটলটা বন্ধ করব।” সংক্ষেপে বলেছিলাম।

রেনো’র চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়েছিল মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণেই আমার হাত থেকে ট্যাবটা ছিনিয়ে নিয়েছিল লোকটা। ওটাকে নিজের আদ্যোপান্ত বে-আইনি সার্ভার আর ড্রাইভগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে-করতে বিড়বিড় করেছিল, “বদ্ধ উন্মাদ! যাকগে। আমার কী? মরো গিয়ে ওখানে। তাও ভাগ্যিস আমার কাছে এসেছিলে! নইলে গেটের স্ক্যানারে ধরা পড়ে যেতে। হুঁ-হুঁ বাবা! এই বস্তিতে অনেক ঝড়তি-পড়তি মাল পাবে। কিন্তু সোলারিস-এ গেট বসানোর কাজটা করেছিল— এমন লোক বলতে আছে শুধু এই শর্মা। আমি যদি না পারি তাহলে…”

“কাল ভোরে বেরোব আমি।” উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, “রাতের মধ্যে সব করে রাখতে পারবে তো?”

“দূর মড়া!” ট্যাবটাকে গালাগাল দিতে-দিতে বলেছিল রেনো, “আমাকে পাসওয়ার্ড দিয়ে আটকাবি ভেবেছিস? আমি তোকে… হ্যাঁ, কী? রাতে কেন? সন্ধের মধ্যেই হয়ে যাবে। আমার জন্য ভালো দেখে একটা বোতল নিয়ে আসবে শুধু।”

বোতল জোগাড় করতে সমস্যা হয়নি। রেনো-ও কথা রেখেছিল।

দু’নম্বর গেট নির্বিঘ্নে পেরিয়ে গেলাম। আমার চেহারার মধ্যে বুড়োটে ভাব আর পুরোনো আঘাতের ভারে বেঁকে যাওয়ার পাশাপাশি একটা যান্ত্রিক ভাব আছে— এটা অনেকেই বলেছে। সেটাই স্বাভাবিক নয় কি? তবে সেটা নিয়ে ব্যাখ্যা দিইনি কখনও। এই দু’বছরে বুঝেছিলাম, নিরাপত্তা রক্ষী, মিলিশিয়া, মিলিটারি, আর তাদের থেকে বাতিল হয়ে এদিক-ওদিকে ঠিকরে যাওয়া অজস্র ভাঙাচোরা মানুষে ভরা এই দুনিয়ায় ওটা নিতান্তই স্বাভাবিক। এখানেও সেটাই দেখলাম। বিদ্রোহী, বা অন্য কোনো কৌতূহলী সিভিলিয়ানের চলন দেখে এরা অনধিকার প্রবেশকারীকে মিনিটের মধ্যে ধরে ফেলত। কিন্তু আমি বোধহয় খুবই ভালো নজরদার ছিলাম। আর কী ছিলাম?

নীচে নামার লিফটের দিকে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা চিৎকারের শব্দ পেয়ে উপরদিকে তাকালাম। সেখানে রক্ষীদের ব্যস্ততা দেখে মনে হচ্ছিল। কিছু একটা বার্তা এসেছে তাদের কাছে। সেটা কি আমাদের নিয়ে?

না। ওদের আঙুল আর চোখের নড়াচড়া দেখে মনে হচ্ছে, টাওয়ারের মধ্যে কিছু একটা করতে বলা হয়েছে ওদের। সেই কিছু একটা… যা বুঝছি তাতে টাওয়ারের মধ্যে কারও মৃত্যুদণ্ডের আদেশ এসেছে মনে হচ্ছে।

তাহলে কি শুধু আমরা নই, সোলারিস-এর অন্য কোনো শত্রুও এসেছে এখানে?

টাওয়ারের মধ্যে, একদিন আগের সন্ধ্যায়, রডরিগেজ

তাহলে এবার?

আমাকে সত্যি-সত্যি হাজির হতে দেখে দিমিত্রি একটুও খুশি হয়নি। কিন্তু হাভেন মিলিশিয়া-র অফিসারের দাবি না মানলে বিস্তর সমস্যা হবে। শেষ অবধি ওর সৌজন্যে, আর মেগাকর্প-এর সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি ডিভিশন থেকে দেওয়া পারমিট দেখিয়ে এই টাওয়ারে ঢুকতে পেরেছিলাম। এখানে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য একটা মাইক্রো-ট্যাব ইস্যু করা হয়েছিল একজিট পোর্ট থেকেই। সেই ট্যাব দিয়ে একের পর এক গেট পেরিয়ে এগোচ্ছিলাম।

“আপনি ভেতরে গিয়ে কথা বলুন। আমি বাইরেই রইলাম।”

রক্ষীটি আমার পরিচয় দিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দিল। ভেতরে-ভেতরে শ্বাস ফেলে ভাবলাম, এতক্ষণে এখানকার লোকেদের একটু ‘নিজের মতো’ করে প্রশ্ন-টোশ্ন করা যাবে। ঘাড়ের ওপর কেউ শ্বাস ফেলতে থাকলে সামনের মানুষটিও ‘হ্যাঁ’, ‘না’ আর ‘জানি না’-র বেশি কিছু বলে না।

নানা জায়গা ঘুরে শেষ অবধি এই অংশেই আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সোলারিস-এর পেটি ওয়ার্কস্‌-এর পে-রোল সেকশন এটা। রুবিকের কড়াইয়ের ভরসায় বাঁচা মানুষদের মধ্য থেকে ছোটখাট কাজের জন্য লোক নেওয়ার পর তাদের ক্রেডিট দেওয়া হয় এখান থেকেই। এই অঞ্চলে ব্যাংক বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করার মতো লোক বিশেষ নেই। তাই ক্রেডিট সার্টিফিকেট দেখিয়ে তাদের রুবিকের কড়াই— যার মধ্যে রিলিফ ক্যান্টিনও পড়ে— থেকেই খাবার, পোশাক, জিনিস নিতে হয়। সেই কাজটা ভালোভাবে করার জন্য সোলারিস-কে দুটো ডেটাবেস রাখতে হয়। তার একটা থেকে বোঝা যায় মোটামুটি কারা থাকে একজিট পোর্টে; অন্যটাতে থাকে রুবিকের কড়াই থেকে ক্রেডিট নিতে আসা লোকজনের বিবরণ। কাগজে-কলমে আমার লক্ষ্য ছিল ওখান থেকে এই ডেটাবেসটা জোগাড় করা।

আসল লক্ষ্য ছিল টাওয়ারের ওপরে যাওয়ার একটা বাহানা জোগাড় করা। এখানকার সুপারভাইজর সেটার ব্যবস্থা করেও দিয়েছিলেন।

“মাফ করবেন, ক্যাপ্টেন।” একটু বিতৃষ্ণার সঙ্গেই আমাকে বলেছিলেন ভদ্রলোক। সামনে দিকে ঈষৎ ঝুঁকে যাওয়া, শুকনো চেহারার এইরকম আমলাদের সর্বত্র দেখা যায়। মাথা নাড়তে-নাড়তে ইনিও বলেছিলেন, “রিলিফ ক্যান্টিন থেকে কতজন আমাদের ক্রেডিটের সুবিধে নিয়েছে, সেই সংখ্যা আমি আপনাকে দিয়ে দেব। আপনার পারমিটে যা বলা আছে তাতে ওটুকুই দেওয়া যায়। এমনকি একজিট পোর্টের বাসিন্দাদের নিয়ে করা আমাদের রিপোর্টটাও আপনাকে দেওয়া যাবে। তাতে অবশ্য এটাই প্রমাণ হবে যে বিভিন্ন কাউন্সিল আর মিলিশিয়া কত মানুষকে ন্যূনতম আহার ও বাসস্থান না দিয়ে মরুভূমির এপারে এই বস্তিতে আসতে বাধ্য করেছে। এগুলো আপনাকে দেওয়া যাবে। কিন্তু কোন কর্মী কতদিন ধরে রিলিফ ক্যান্টিনের সুবিধে নিচ্ছে— এটা কোম্পানির নিজস্ব ব্যাপার।”

“মুশকিল।” গভীর দুঃখের একটা ভাব মুখে ফুটিয়ে বলেছিলাম, “তার মানে একই লোককে বারবার এবং বিপুল পরিমাণে রিলিফ দেওয়ার নামে এখানে ট্যাক্স ফ্রড চলছে কি না— সেটা তো বোঝার উপায় থাকছে না। সেক্ষেত্রে একটাই কাজ হবে। কী যেন আপনার নাম… হ্যাঁ, ভ্যান কিভা। আমাকে লিখতে হবে যে মিস্টার ভ্যান কিভা’র অসহযোগিতার ফলেই নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে এখানে ফ্রড চলছে কি না। তাই ক’দিনের মধ্যেই সোলারিসের যাবতীয় কাজকর্ম নিয়ে অডিট শুরু হলে তার জন্য আপনিই দায়ী হবেন। তখন কোম্পানি কি আপনার এই… আনুগত্যকে খুব একটা ভালোভাবে নেবে?”

ভ্যান কিভা’র সাদাটে, তেলতেলে মুখে এবার একটা লাল ভাব দেখা দিল। বড় করে কয়েকটা শ্বাস নিলেন তিনি। তারপর প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”

“ছি-ছি! এ আপনি কী বলছেন? আমি শুধু একটা সমাধানসূত্র খুঁজতে চাইছি। আপনি দিতে না পারলেও অন্য কেউ কি আমাকে ওই ডেটাবেস দেওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন?” বিনীতভাবে বলতেই কাজটা হয়ে গেল।

“পারবেন। আমাদের ইউনিট হেড ডিয়া ন্‌গুয়েন অনুমতি দিলেই আমি ডেটাবেস আপনাকে দিয়ে দেব।”

“দারুণ! আপাতত যে দুটো ডেটাবেস আপনি দিতে পারবেন, সেগুলো এই মাইক্রো-ট্যাবে লোড করে দিন। নইলে তো আবার এগুলো নিয়ে বেরোতে পারব না।”

ট্যাবে ফাইলদুটো চালান হল। ডোনাল্ড রডরিগেজ যে এখানে আছে, সেটাও সিস্টেমে ঠিকমতো লগ করা হল।

সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি এদিক থেকে দরজা খুললাম। রক্ষীটিকে বললাম, “একবার ডিয়া ন্‌গুয়েন ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে হবে।”

“ওটা ‘জে’ লেভেল। ওখানে যাওয়ার অথরিটি আমার নেই।” রক্ষীটি দৃশ্যতই নার্ভাস হয়ে বলল, “আপনি বরং লিফটের কাছে থাকুন। আমি দেখি ওপরের লেভেলে যাওয়ার ট্যাব আছে— এমন কাউকে পাই কি না।”

সায় দিয়ে লিফটের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। রক্ষীটি সিনিয়র কাউকে খুঁজতে গেল। হঠাৎ মনে হল, ট্যাবটা যদি খারাপ হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? আর কিছু না হলেও এত কষ্টে জোগাড় করা ওই দুটো ডেটাবেস যদি হাতে না থাকে, তাহলে মিলিশিয়াকে কী জানাব?

ইউনিফায়েড কম্যান্ড থেকে সিভিলিয়ান জীবনে ফিরে আসার সময়ও আমরা অনেকেই বেশ কিছু প্রযুক্তি সঙ্গে এনেছিলাম। এনকোডার হিসেবে আমার নিজের ভারি পছন্দের জিনিস ছিল একটা থাম্ব ড্রাইভ, যেটা আমার বুড়ো আঙুলের নখের সঙ্গেই প্রায় লেগে থাকে। ওটার বিশেষত্ব হল, যেকোনো পোর্টের সঙ্গে ওটা কানেক্ট হতে পারে। বহু গোপন কাজের সময় আমি ওতেই ব্যাক-আপ নিয়ে রাখতাম বলে বেঁচে গেছি। এবারও ওটাকেই কাজে লাগালাম। দ্রুত ট্যাব থেকে ফাইলটা ওতে সরানোর পরেই দেখলাম, ট্যাবের ওপরের সবুজ আলোটা লাল হয়ে গেছে!

মানে?! এটা খারাপ হয়ে গেল নাকি।

কাউকে ডেকে ব্যাপারটা বলব ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, দূর থেকে একদল রক্ষী হনহনিয়ে এদিকে আসছে। আমার এতক্ষণের সঙ্গীটি তাদের সঙ্গে ছিল না। একটা পিলারের আড়ালে ছিলাম বলে তারা তখনও আমাকে দেখেনি। কিন্তু ওদের হাঁটার ভঙ্গিটা চিনতে আমার অসুবিধে হয়নি।

বিপদ!

ডাক্‌ রডরিগেজ অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করার বান্দা নয়। আবার একটা ব্লাস্টার নিয়ে অতগুলো সশস্ত্র রক্ষীর মহড়া একা নেওয়া মানেও স্রেফ আত্মহত্যা। তাহলে?

মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করে ফেললাম, কী করব।

অনেকটা ইউ আকৃতির একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। নীচে দেখা যাচ্ছিল লবি-র মতো জায়গাটা। ওর অনেকটা নীচে সমুদ্রতলের মধ্যে একটা ঢাকা অংশ থেকে খনিজ তোলা হয়। আর এর ওপরের লেভেলগুলোতে বড়কর্তারা বসেন। ইউ-এর দুটো সমান্তরাল বাহুর একটা দিয়ে হেঁটে আসছিল রক্ষীরা। আমি ছিলাম তার সঙ্গে নব্বই ডিগ্রি কোণে থাকা জায়গাটার মাঝামাঝি— যেখানে পাশাপাশি তিনটে লিফট আছে।

আসল চ্যালেঞ্জ ছিল নজরদার ক্যামেরাকে এড়ানো। তার জন্য একটা চমৎকার জিনিস হাতেই ছিল। নিশানাও চিয়া’র সঙ্গে সফটবল নিয়ে খেলাধুলোর সুবাদে বেশ ভালোই আছে। রুমাল দিয়ে হাতের মাইক্রো-ট্যাবটা জড়িয়ে নিলাম, যাতে তাতে আওয়াজ কম হয়। তারপর সেটা ছুড়ে ক্যামেরার কাচটা ভাঙা না গেলেও জিনিসটা সরে গেল অন্যদিকে।

প্রত্যাশিতভাবেই রক্ষীরা সমান্তরাল জায়গাটাতে এসে আমাকে… বা অন্য কাউকে পেল না। তারা এদিক-সেদিক ঘুরে একজনকে লিফটগুলোর সামনে মোতায়েন করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। কিছুক্ষণের জন্য জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ লিফটের দরজার ঠিক ওপরের মেইনটেন্যান্স হ্যাচ থেকে দুটো হাত বের করে নীচে দাঁড়ানো রক্ষীটির গলা টিপে ধরলাম।

হ্যাঁ, দু’বছর আগে মোরিয়া মাইনের ভেতর সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর আমাকে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতেই হয়েছিল। ট্রমা জিনিসটার মুখোমুখি হতে মন, শরীর, সম্পর্ক— তিনটে জিনিসই লাগে। আমি ভাগ্যবান, পরিবার আর সহকর্মীরা মনের আর সম্পর্কের দিক দিয়ে আমার পাশে ছিল। শরীরের ব্যাপারটা আমাকে দেখতে হয়েছিল। ফলে পা থেকে জুতো খুলে সেগুলোকে ফিতে দিয়ে গলায় ঝোলানো, লাফিয়ে লিফটের হাতলে এক পা রাখা, আরেক পা তুলে অন্য হাতে হ্যাচের নাগাল পাওয়া, তারপর ব্লাস্টার দিয়ে হ্যাচের মুখটা ড্যামেজ করে চাপ দিয়ে হ্যাচ খোলা— সবটা করতে আমার তিরিশ সেকেন্ডের বেশি লাগেনি। বরং সময় লেগেছিল নিজেকে হ্যাচে ঢুকিয়ে সেটা বন্ধ করতে।

ভাগ্যিস ব্যাটারা লিফটের ওপরদিকের জায়গাটার দিকে তাকায়নি!

নীচে নেমে আগে অজ্ঞান রক্ষীটির কাছ থেকে যা-কিছু নেওয়া সম্ভব, সেগুলো হাতালাম। ওর পোশাকটা আমার গায়ে ফিট হবে না; তাই সেটা নেওয়ার চেষ্টা করিনি। তাছাড়া হাভেন মিলিশিয়ার এই ইউনিফর্মটা আমার ভারি পছন্দের— সে যে যাই বলুক। তারপর ওর মাইক্রো-ট্যাব দরজার স্লটে গুঁজতেই লিফট উঠতে শুরু হওয়ার আওয়াজ পেলাম। রক্ষীটিকে হ্যাচের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম কোনোক্রমে। তারপর ইউ-এর অন্য বাহুটা ধরে দৌড়োলাম অন্যদিকে। ছুটতে-ছুটতেই পিং শব্দ করে লিফট এসে পৌঁছোনোর শব্দ পেলাম।

জানতাম, বায়োমেট্রিক্স না মিললে লিফটে ঢোকা যাবে না! কিন্তু রক্ষীটিকে দেখতে না পেলে এটাই ধরে নেওয়া হবে যে আমি তাকে জোর করে কোনোভাবে লিফটে ঢুকেছি। কপাল ভালো হলে ইতিমধ্যে অন্য কেউ লিফটটাকে অন্য কোনো লেভেলে আসতে বলবে। আমার পিছু নেওয়া শিকারির দল সেদিকেই ছুটবে।

ততক্ষণে আমি অন্য একটা রাস্তা খুঁজি বরং। ওপরে… মানে এই টাওয়ারের ওপরে আমাকে যেতেই হবে!

ঘটনার আগের দিন রাত, টাওয়ারের নীচে, পাগল বুড়ো

তাহলে এই হল ব্যাপার!

ফাটলের রহস্য আমি ভেদ করতে পেরেছি। কিন্তু কাকে জানাব এই কথাটা?

সোলারিস যেখানে খোঁড়াখুঁড়ি চালাচ্ছে, সেটা পৃথিবীর শরীরে একটা ফাটল। না, কথাটা রূপকার্থে বলিনি। খনি এলাকার কাছে এতদিন ধরে থাকলে অনেক কঠিন তত্ত্বকথাই সহজভাবে কানে আসে। মাতালেরা তো আর কঠিন করে বোঝাবে না! তারাই বলেছিল, টানেলগুলো নেমে গেছে অনেক গভীরে— যেখানে পৃথিবীর ওপরের ক্রাস্ট আর ম্যান্টেল কাছাকাছি আসে। এক বিজ্ঞানীর নাম অনুযায়ী ওইরকম ফাটলকে বলা হয় মোহ্‌হোরোভিচ্‌ইচ্‌ ডিসকন্টিনিউয়িটি, সংক্ষেপে মোহো। এমনিতে ও-জিনিস মাটির অনেক গভীরে থাকার কথা। কিন্তু পৃথিবীরও যে মাঝেমধ্যে গা ঝাড়া দেওয়ার শখ হয়, তা আমরা ভূমিকম্প থেকেই বুঝি। তেমনই কিছু একটার ফলে এখানে ফাটলটা রয়েছে অনেকটাই ওপরদিকে। রুবিকের কড়াইয়ে হেভারশ্যাম নামে এক রেগুলার কাস্টমার আসেন। নেশা আর দুর্দশায় মলিন হয়ে গেলেও ভদ্রলোকের আচরণ সংযত। তাঁর পাণ্ডিত্যকেও কেউ কখনও চ্যালেঞ্জ করেনি। তিনিই বলেছিলেন, এখানে সমুদ্রের তীরে নাকি ওফিওলাইট পাওয়া যায়। ওটা আসলে ক্রাস্ট আর ম্যান্টলের সংযোগস্থলের পাথর। দুইয়ে-দুইয়ে চার করে বোঝাই যাচ্ছিল, এখানে সমুদ্রতল থেকে মোহো খুব একট গভীরে থাকার কথা নয়। সোলারিস সেটা থেকেই মূল্যবান ধাতু আর নানা জিনিস তুলেছে অনেকদিন ধরে। এমনকি ম্যাগনেটোরিওলজিক্যাল ফ্লুইড— যা দিয়ে বডি-আর্মার বানানো হয়, তাও পাওয়া যায় এখান থেকে! কিন্তু এই বিশেষ টানেলগুলো বসানো হয়েছে কিছুদিন আগে।

তারপর থেকেই শুরু হয়েছে শীর্ণকায় প্রাপ্তবয়স্ক আর নাবালক সাফাইওয়ালাদের হারিয়ে যাওয়া! তার কারণটা বুঝতে আমার এক সন্ধে লাগল।

এক-একটা টানেল সাফ করতে প্রায় ঘণ্টাদেড়েক সময় লাগে। একটা মস্ত বড় দল কাজ করছিল পালা করে। তাদের মধ্যে যারা নীরার মতো নতুন, তাদের লাগানো হয়েছিল সাধারণ পাইপ আর টানেলের দিকে। নিরাপত্তা রক্ষীর বেশে আমি সহজেই দেখে নিয়েছিলাম, কোথায় রয়েছে সেই বিশেষ টানেলগুলো। তবে ওখানে যাওয়াটা সহজ হবে না— এ-কথা বোঝাই যাচ্ছিল। একটা নতুন গেট বসানো ছিল তার মুখে। ওটা রেনো’র কারিকুরিতে খুলবে বলে মনে হয়নি। তাই আমি সে-চেষ্টাও করিনি। বরং শান্তভাবে অপেক্ষা করেছিলাম নীরাকে যা করতে বলা হয়েছিল, তার জন্য।

রাত আটটায় শিফট শেষ হওয়ার ঠিক আগে সেটা ঘটল।

সারাদিনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমিতে একেবারে বারুদের স্তূপ হয়ে ছিল কর্মীরা। নীরা’র সঙ্গে একটাও কথা বলিনি। তবু ওর মুখচোখের অবস্থা দেখে বুঝতে পারছিলাম, রাগে আর কষ্টে ও একেবারে জ্বলছে। ওর আর দোষ কী? রক্ষীদের ‘হাত চালাও!’ আর ফোরম্যানের ক্রমাগত ‘কোত্থেকে যে এইসব অপদার্থ জোটে!’ শুনতে-শুনতে আমারই ইচ্ছে হচ্ছিল, ব্লাস্টার আর ব্যাটন দিয়ে সবক’টাকে নিকেশ করতে। তারই মধ্যে হঠাৎ নীরা সদ্য ছেড়ে রাখা ওভার-অলটা হুড়মুড়িয়ে গায়ে জড়িয়ে আবার টানেলের দিকে ছুটল।

“শিফট শেষের পরেও কাজ করতে চাইছিস?” ব্যঙ্গাত্মক হাসি মুখে ফুটিয়ে ওকে আটকাল ফোরম্যান, “বরং পরে আমার চেম্বারে আসিস। ওভারটাইমের চেয়ে বেশিই পাবি।”

ভীত মুখে এক পা পিছিয়ে নীরা বলল, “আমার মাইক্রো-ট্যাবটা টানেলের দেওয়ালের গায়ে আটকিয়ে রেখেছিলাম। ওটা না আনলে তো বেরোতে পারব না এখান থেকে।”

ফোরম্যান তো বটেই, ক’জন রক্ষীও বিশ্রীভাবে হেসে উঠল এই কথায়। একজন বলল, “বেশ তো। রাত্তিরটা এখানেই থেকে যা। আমরা তো আর তোকে খেয়ে ফেলব না।”

আরেকজন টিপ্পনী কাটল, “অন্তত কাল কাজ করার অবস্থাতে তুই থাকবি। তখন না হয় ওটা নিয়ে নিস।”

অসহায় মুখে নীরা এদিক-ওদিক চাইল। শূন্য দৃষ্টি নিয়ে ওর পাশ কাটিয়ে এগোতে লাগল বাকি কর্মীরা। তাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য না পেয়ে নীরা আবার ফোরম্যানকে বলল, “প্লিজ! আমার একদম সময় লাগবে না।”

ফোরম্যানের মুখের তেলতেলে হাসিটা ঘন হল। নীরার রোগা হাতটা খপ্‌ করে ধরে সে বলল, “আমার সঙ্গে চল। রাত্তিরটা খুব খারাপ কাটবে না।”

বাকিটার জন্য অভিনয় লাগল না। হিংস্রভাবে লোকটার চোখের দিকে নিজের আঙুলগুলো চালিয়ে দিল নীরা। লোকটা কোনোক্রমে মাথা একদিকে সরাল। তারপর রাগের মাথায় নীরাকে একটা ঘুষি মেরেই বসল। ভাঙা পুতুলের মতো একদিকে ছিটকে পড়ল নীরা।

এতক্ষণ যে টেনশনটা জমে উঠেছিল এই লেভেলে, সেটা একেবারে বিস্ফোরিত হল এরপরেই। হাতের যন্ত্রপাতি নিয়ে মার-মার করে ফোরম্যানের দিকে ছুটে এল একজন কর্মী। ফোরম্যানের কাঁধে সে একটা রেঞ্জ দিয়ে সপাটে ঘা দিল। তৎক্ষণাৎ ব্লাস্টার ফায়ার করল একজন রক্ষী। কর্মীটি পড়ে যেতেই সবক’জন কর্মী রক্ষীদের দিকে ধেয়ে গেল।

চমৎকার!

ব্লাস্টার আর ব্যাটন হাতে ধেয়ে আসা বাকি রক্ষীদের মধ্যে মিশে আমিও এগোলাম। চরম মারদাঙ্গার মধ্যে আগে নীরাকে আড়াল করে দেখে নিলাম, ও ঠিক আছে কি না। নীরা মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাল, ও ঠিক আছে। চোখের ইশারায় ওকে সরে যেতে বললাম। টারবাইন, পাম্প আর পাইপের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ওপরের লেভেলে যাওয়ার সিঁড়ির দিকে এগোল নীরা।

দেখলাম, বিশেষ গেটটার সামনে থাকা রক্ষীদের অধিকাংশই এদিকে ছুটে এসেছে। রক্ত, পোড়া মাংস, ব্লাস্টারের চার্জে তৈরি হওয়া ওজোন— এগুলোর গন্ধ মিশে যাচ্ছিল ঘাম, মেশিন-অয়েলের সঙ্গে। বাঁশির শব্দ শুনে বুঝলাম, আরও রক্ষীকে এদিকে আসতে বলা হয়েছে। আর দেরি করলাম না। নিজের হাতের ব্লাস্টারটাতে একটু বিশেষ ধরনের মেরামত করে নিয়েছিলাম এতক্ষণ ধরে। আমাকে কেউ লক্ষ করছে না— এটা নিশ্চিত করে নিয়ে একটা কেবল বক্সের ধার ধরে গায়ের জোরে সেটাকে টানলাম। পেছনের তারগুলো দেখা গেল তখনই। ব্লাস্টারটার ট্রিগার জ্যাম করে দিয়ে সেটা দেওয়ালের ওই ফাটলের মধ্যে ফেলে দিলাম। তারপর ওখান থেকে সরে গেলাম। একটু পরেই আলোর ফুলকির মতো একরাশ স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল জায়গাটা থেকে।

অন্ধকার হয়ে গেল পুরো লেভেল!

কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো লেভেলে নরক নেমে এল। কে যে কাকে মারছে, তা বোঝার উপায় ছিল না। ছুটতে গিয়ে যন্ত্রের গায়ে ধাক্কা খেয়ে রক্ষীরাও দিশেহারা হয়ে গেল। নাইট-ভিশন ভিজর চড়ানোর মধ্যেই ওখানে যা অবস্থা দাঁড়াল, তেমনটা কল্পনা করাও কঠিন। আমি অবশ্য সবটাই দেখতে পাচ্ছিলাম। ফলে সব বাধা পেরিয়ে আমি পৌঁছে গেলাম গেটের কাছে। তারপর নিঃশব্দে অবশিষ্ট রক্ষীদের শুইয়ে দিলাম। তারপর এমার্জেন্সি রি-সেট হল।

রুবিকের কড়াইয়ে লোকজনের কাছে শুনেছিলাম, এই জিনিসটা হলে প্রথমেই সব আলো আসে না। বরং লাল রঙের একটা কম ওয়াটেজের আলো জ্বলে ওঠে সর্বত্র, যাতে নাইট-ভিশনে থাকা রক্ষীরা মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তার পাশাপাশি আরও একটা ঘটনা ঘটে।

সবক’টা গেট খুলে যায়!

লাল আলো জ্বলে উঠতেই বিশেষ অংশের গেটটা খুলে গেল। ভেতরে থাকা রক্ষীরা বাইরে কী হয়েছে তা বুঝতে পারছিল না। নিজেকে আড়ালে রেখেই ফোরম্যানের গলাটা যথাসম্ভব অনুকরণ করে বললাম, “এখানে অবস্থা সামলানো যাচ্ছে না! ভেতরে তোমরা কি মজা দেখছ নাকি?”

দুদ্দাড় করে বাইরে বেরোল রক্ষীরা। ইতিমধ্যে লাল আলোয় লেভেলটাকে সত্যিই নারকীয় লাগছিল। মাথায় খুন চেপে যাওয়া ক’জন কর্মী ইতিমধ্যে রক্ষীদের ব্লাস্টার জোগাড় করেছিল। তারা ছুটে আসছিল এই গেটের দিকে। রক্ষীরা তাদের সামনে পড়ামাত্র একটা খণ্ডযুদ্ধ বাঁধল।

নিঃশব্দে গেটের ওপাশে সরে গেলাম আমি। ভালো করে দেখে নিশ্চিত হলাম, দু’জন রক্ষী আর জনাতিনেক রোগাভোগা সাফাইওয়ালা ছাড়া ওই অংশে আর কেউ নেই। তারা আমাকে আলাদাভাবে লক্ষ করেনি। বরং এতক্ষণ ভেতরে থাকা রক্ষীদেরই মধ্যে কেউ কোনোক্রমে সরে এসেছে বলে ভাবছিল তারা। একজন রক্ষী আমাকে বলল, “তুমি এদের দেখো। আমরা বাইরেটা দেখছি।”

আমি মাথা নেড়ে যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললাম, “বরং এদের সামনে ঢাল করে রেখে বেরোও। নইলে তোমরা ওদের সামনে টিকবে না।”

রক্ষীরা ইতস্তত করে তিনজন কর্মীকেই ইঙ্গিত করল সামনে যেতে। ওভার-অল পরা তিন অসহায় কর্মী কাঁপতে-কাঁপতে এগোল। পেছনে গেল দু’জন রক্ষী। ওরা বাইরে বেরোতে-না-বেরোতে একটা তীক্ষ্ণ হুইসলের আওয়াজ ভেসে এল বাইরে থেকে। মাথার ভেতর চলতে থাকা ঘড়ির সঙ্গে সবটা মিলিয়ে নিলাম।

ফুল রি-সেট!

আলোর বন্যায় ভেসে গেল পুরো লেভেল। তারই সঙ্গে শুরু হল ধারাবাহিকভাবে ব্লাস্টার-ফায়ারের শন্দ। বুঝলাম, সোলারিস সর্বশক্তি দিয়ে এই ছোট্ট বিপ্লব দমন করতে শুরু করেছে। নীরা ইতিমধ্যে ওপরের লেভেলে পৌঁছে গেছে নিশ্চয়। নইলে…

না। কোনো নইলে নয়। ও পারবেই। এই ব্যাপারটার জন্য গত দু’দিন ধরে আমি নীরাকে রীতিমতো ট্রেনিং দিয়েছি। রুবিকের কড়াই থেকে শোনা ছেঁড়া-ছেঁড়া কথা জুড়ে এই লেভেলের একটা মোটামুটি ম্যাপ বানিয়ে দেওয়া সেই ট্রেনিঙের পর নীরা ওপরের লেভেলে যাবেই। ওই নিয়ে ভাববই না।

গেটটা সজোরে বন্ধ হল একইসঙ্গে।

জানতাম, খুব বেশি সময় পাব না। তারই মধ্যে যা করার করতে হবে। একটু আগের ঘটনার পর রাতের শিফট চালানো হয়তো সম্ভব হবে না। কিন্তু রক্ষীদের একটা বড় দল যে এই জায়গাটা দেখতে আসবে— তা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না আমার। সেইমতো দেখে নিয়েছিলাম, আমার সামনে রয়েছে তিনটে টানেলের কিছুটা দৃশ্যমান অংশ। পায়ের নীচ থেকে উঠে একটা মোচড় মেরে আবার ওপরে উঠে গেছে ওগুলো। সেই মোচড়ের অংশটাতেই দেখা যাচ্ছিল একটা ফাটল। সারা দিন ধরে দফায়-দফায়, অন্তত তিনবার সাফ করার পরেও সেগুলোর ঈষৎ ফুলে ওঠা অংশ থেকে বোঝা যাচ্ছিল, কিছু একটা এসে জমেছে তার ও-পাশে। সেখানেও এইরকম অনেক পাইপের জয়েন্ট বা বাঁক আছে। সেখানেও একইভাবে সাফাই আর মেরামত চলতে থাকে অবিরাম। কিন্তু এই পাইপগুলোর চেহারা দেখেই বুঝলাম, এরা অন্যদের থেকে আলাদা। পরীক্ষা করতেই ধরা পড়ল পার্থক্যের কারণটা।

সোনা! এই পাইপ বানাতে অন্য অ্যালয়ের পাশাপাশি বেশ ভালো মাত্রায় সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। কী এমন সাংঘাতিক জিনিস তোলা হচ্ছে এখান থেকে?

টানেলের গায়ে হাত দিয়ে মৃদু কম্পনের রকমফের মেপে একটা টানেল বেছে নিলাম, যার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে কম জোরে তরল বা অর্ধতরল জিনিসটা বইছে। সেই টানেলের গায়ে তৈরি হওয়া শেষ ফাটলটাকে ভালো করে দেখতেই বুঝতে পারলাম, জিনিসটা সরিয়ে নেওয়ার মতো কাটার হিসেবে ব্লাস্টারকে ব্যবহার করা যাবে। দ্রুত হাত চালালাম। কিছুটা অংশ সাবধানে কেটে নিতেই ভেতরটা দেখা গেল। প্রথমেই হাত ঢোকালাম না। বরং কেটে নেওয়া অংশর গায়ে লেগে থাকা জিনিসগুলোর বিশ্লেষণ করার জন্য নিজের চোখের বিশেষ কয়েকটা বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগালাম।

অদ্ভুত! এখানে তো ম্যাগনেটোরিওলজিকাল ফ্লুইড নেই। তার বদলে… এখানে অন্য কিছু রয়েছে। সেটা কী?

স্মৃতির জায়গাটায় অনেক ফাঁক আছে আমার। তবে সেগুলো ফেরত না আসা অবধি আমি নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকিনি। হেভারশ্যামের কথাগুলো মন দিয়ে শোনার পাশাপাশি আমি এই এলাকায় বিভিন্ন সময়ে যে-সব প্রোজেক্ট চলেছে, তাদের নিয়ে জানার চেষ্টা করেছিলাম। সেই করতে গিয়ে এমন অনেক জিনিসের জ্ঞান আমার মাথায় ঢুকে গেছে। তাতেই জেনেছিলাম, মিলিটারি এই অঞ্চলে একটা বিশেষ জিনিস বড় স্কেলে তৈরি করার চেষ্টা করেছিল এককালে। যুদ্ধের পর সে-সব গেছে। কিন্তু সেই জিনিস কারখানায় তৈরি করতে হত বলেই জানতাম। তা প্রকৃতির গর্ভ থেকে কীভাবে পাওয়া যাচ্ছে?

আরও কয়েকটা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হলাম। হ্যাঁ, জিনিসটা একধরনের ফেরোফ্লুইডই বটে। টানেলের অন্য প্রান্তে প্রবল টান তৈরি করে ঘোলা জলের মতো যে জিনিসটা টেনে নেওয়া হচ্ছে সেটা আসলে জলে ভাসমান একধরনের ফেরিম্যাগনেটিক যৌগ— যার মধ্যে রয়েছে নিকেল, লোহা, ক্রোমিয়াম, আর অক্সিজেন। আর সেজন্যই…

হাতে-কলমে পরীক্ষা করে দেখার জন্য হাতটা টানেলের ভেতর বাড়িয়ে ধরলাম। বিষাক্ত সাপের মতো তরলের কিছুটা অংশ সেদিকে ধেয়ে আসতেই হাত সরিয়ে নিলাম। কিন্তু ততক্ষণে নানা জায়গা থেকে ওই ঘোলা তরল ছিটকে আসছিল আমার দিকে। বুঝতে পারলাম, অসাবধানে ওভার-অলের ফাঁক দিয়ে শরীরের কোনো অংশ বের করে ফেললে কারও কী দশা হতে পারে এখানে। একবার আমাকে ধরতে পারলে ওই তরলও ছেড়ে দিত না। বেরিয়ে আসতে পারতাম, তবে চামড়ার বেশ কিছুটা অংশ, হয়তো বা হাতটাই ভেতরে রেখে আসতে হত।

ফেরোফ্লুইডের স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে ওলিক অ্যাসিডের প্রতি। এই অঞ্চলের সমুদ্র ডেড জোন হয়ে গেছে বহুদিন আগেই। সেই অবস্থায় এখানে ওলিক অ্যাসিডের একমাত্র জোগান আসতে পারে কর্মীদের শরীরের স্নেহজাতীয় বস্তু থেকে। তাই ফাটল গিলে নেয় দুর্বল, রোগা আর ছোট্ট কর্মীদের।

কালাহানের পূর্বদিকে মেগাকর্পের অধীনে টিস্টেক নামে আরেকটা কোম্পানি আছে। সেখানকার প্রধান রিফাইনারিতে কাঁচামাল পাঠানো ছাড়া সোলারিস আর কোনো কাজ করে না। অথচ যতটুকু জানি তাতে এমন কিচ্ছু তারা আজ অবধি পাঠায়নি। তাহলে এই তরল নিয়ে কী করছে সোলারিস?

টাওয়ারের মধ্যে, ঘটনার আগের মাঝরাত, রডরিগেজ

মারিয়া এরপর ঘরদোর সাফ করতে বললে আর কক্ষনও বাহানা করে কাটানোর চেষ্টা করব না।

না-না, এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তা আপনারা বুঝতে পারছেন না। আসলে আমি যে এ-সব ব্যাপারে মারাত্মক অলস— এটা সবাই জানে। তবে গত কয়েকঘণ্টা টাওয়ারের রক্ষীদের নজর এড়িয়ে থাকার পর আমি বুঝতে পেরেছি, বাতিল জিনিসের আড়ালে লুকিয়ে পোকা-মাকড় বহু দুষ্কর্ম করতে পারে। খুঁজে পেলে এরা পোকা-মাকড়ের মতো করেই আমাকে মারবে। তাই আমি লুকিয়ে থাকছি এমন সব জায়গায়, যেখানে ক্যামেরা হয় নেই, নয়তো খারাপ হলেও দেখার লোক নেই। সেজন্য আমাকে অকেজো মেশিনপত্র, পরিত্যক্ত আসবাব, বাক্স-টাক্সের স্তূপের পেছনে… এমনকি তার মধ্যে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এই জিনিসগুলোর গুরুত্ব আমি বেশ ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি।

তারই সঙ্গে আরও একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি। কাল এখানে একটা বড় কিছু ঘটার কথা। সেজন্য টাওয়ার একেবারে থিকথিক করছে। এটা ওই অস্ত্র-পরীক্ষার সঙ্গেই যুক্ত কিছু বলে মনে হচ্ছে। তবে কাল… কালকেই কেন?

আপাতত আমার অ্যাচিভমেন্ট এটাই যে ধাপে-ধাপে, সিঁড়ি ভেঙে-ভেঙে আমি ছ’টা লেভেল উঠেছি। মুশকিল হল, এভাবে ওপরের তলায়, যেখানে ওই ডিয়া ন্‌গুয়েন বা অন্য কর্তারা বসেন, পৌঁছোতে আমার বেশ কয়েকদিন লেগে যাবে। রক্ষীটির কাছ থেকে ‘ধার’ নেওয়া কমিউনিকেটরের সাহায্যে সবার চলাফেরার খবর পাচ্ছি বলে এখনও অবধি বাকিদের এড়িয়ে-এড়িয়ে থাকতে পারছি। কিন্তু একদিনের বেশি আমার পক্ষে লুকিয়ে থাকা অসম্ভব। আজকে আমার কাজ কিছুটা সহজ করে দিয়েছিল অন্য একটা ঘটনা। কয়েকঘণ্টা আগে নীচে, মানে যেখানে পাইপ আর টানেলগুলো আছে সেই লেভেলে, বিশাল একটা গণ্ডগোল হয়েছিল। সেটা সামলাতে বহু রক্ষীকে ওই লেভেলে পাঠানো হয়। সার্ভেইল্যান্সের পুরো মনোযোগটাও ছিল ওদিকে, আর তার লাগোয়া অংশে— যেখান দিয়ে কর্মীরা বেরিয়ে যায়। সেই সুযোগটা নিয়েছিলাম। কিন্তু কোনোভাবে ক্যামেরাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে লিফট কাজে লাগাতে না পারলে আমার পক্ষে সময়মতো ওপরে ওঠা যাবে না।

তাহলে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুঝলাম, এবার আমি একটাই কাজ করতে পারি।

একটা প্রায়ান্ধকার কোণা দেখে নিয়ে লুকিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই রাউন্ডে বেরোনো দুই রক্ষীকে দেখলাম। বীরদর্পে করিডর ধরে এগিয়ে আসছিল তারা। একজন তো হাতের ব্যাটনটা রীতিমতো নাচাচ্ছিল!

নাচা। একটু পরেই তো…

আবর্জনার মধ্য থেকে পাওয়া একটা স্টিলের তার টানটান করে বেঁধে রেখেছিলাম মেঝে থেকে একটু ওপরেই। দুই বীরপুঙ্গবই তাতে আটকে হুমড়ি খেয়ে সামনে পড়ল। আমি নিজের ওজনদার শরীরটা নিয়ে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে দু’জনেরই মাথা সপাটে মেঝেতে ঠুকে দিলাম। তারপর ঝটপট ওদের টেনে একদিকে সরিয়ে অস্ত্রশস্ত্র আর মাইক্রো-ট্যাবগুলো সরালাম। খুঁটিয়ে দেখে নিলাম, দুই রক্ষীর একজনের কানে একটা হিরের দুল বসানো আছে, আর আছে মাথায় টুপি। বাকি পোশাক না বদলে শুধু টুপিটা মাথায় চাপিয়ে নিলাম। ব্লাস্টারটা সবচেয়ে কম জোরে, ভীঈঈঈষণ সাবধানে ব্যবহার করে প্রায় সার্জারির মতো করে দুলটা সরালাম রক্ষীর কান থেকে।

এতক্ষণ যে-সব বাক্স আর মেশিনের পেছনে নিজে লুকিয়ে ছিলাম, এবার তাদের পেছনে এই দুই রক্ষীকে চালান করলাম। নিরুপায় হয়ে একজনের গা থেকে আর্মার-লাগানো জ্যাকেটটা নিতেই হল। তারপর টেসলা পাওয়ারের লোগো-লাগানো একটা বাক্স খুঁজে নিলাম। রক্ষীদের মেডিকেল কিট থেকে বের করলাম একটা স্টিকিং প্লাস্টার। সেটা দিয়ে দুটো তারকে খুব কাছাকাছি এনে বাক্সটা আবার বন্ধ করে লিফটের কাছে গেলাম। বুঝে নিলাম, কীভাবে হেঁটে গেলে ক্যামেরায় আমার টুপি, চকচকে দুল, আর জ্যাকেটটা দেখা যাবে। সেভাবেই গিয়ে মাইক্রো-ট্যাব ঢুকিয়ে লিফটের বোতামটা টিপলাম।

আমার প্ল্যানটা ছিল খুব সহজ। টাওয়ারে আগুন লাগলে যাতে শর্ট সার্কিট হয়ে তা না ছড়ায় সেজন্য প্রত্যেক রক্ষীকে ট্রেনিং দেওয়ার পাশাপাশি তাদের কিটে কিছু নির্দেশও দেওয়া থাকে। আমার কাছে আর কিছু না থাকলেও থাম্ব-ড্রাইভ ছিল। সেটা দিয়েই নির্দেশগুলোর পাঠোদ্ধার করে বুঝতে পেরেছিলাম, কোনো কারণে ইলেকট্রিক ফেইলিওর হলে যাতে সেই ফ্লোরের লিফটে কেউ আটকে না পড়ে, সেটার জন্য একটা ব্যবস্থা করা ছিল। তেমন কিছু হলে স্ক্যান ইত্যাদি ছাড়াই লিফট খুলে যাবে। তবে সেটা আর চলাফেরা করবে না। ততক্ষণের জন্য যে সেই লেভেলের বাকি সব ক্যামেরার মতো লিফটের ভেতরের ক্যামেরাও কাজ করবে না, তা বলাই বাহুল্য। আমি সেই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

‘পিং!’ শব্দ করে লিফট এসে পৌঁছোল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ক্যামেরা এবং এই লেভেলের অন্য রক্ষীদের নজরের আড়ালে দাঁড়িয়ে ধৈর্য ধরে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম, কখন প্লাস্টারটা মাধ্যাকর্ষণের টানে দুটো তারকে একজায়গায় নিয়ে আসবে। একটু পরেই সেটা হল। ‘ফট্‌!’ করে একটা শব্দের সঙ্গে-সঙ্গে নিভে গেল ক্যামেরার লাল আলোগুলো। লেভেলের আলোগুলো নিভু-নিভু হয়েও আবার জোরালো হয়ে উঠল। রক্ষীরা যেটুকু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত হয়েছিল, তার মধ্যেই আমি লিফটে ঢুকে পড়লাম।

লিফট চলবে না। কিন্তু ক্যামেরাও তো চলবে না। তাই আমি স্রেফ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’জন টেকনিশিয়ান হন্তদন্ত হয়ে হাতের ট্যাব দেখতে-দেখতে ওই বাক্সটার দিকে গেল। ঘটাং শব্দ করে প্রধান ফেজ ফিরে এল। লিফটের দরজাও বন্ধ হল। আমি সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু পরেই দরজা খুলে দু’জন রক্ষী হন্তদন্ত হয়ে লিফটে ঢুকল।

নিতান্ত অলস ভঙ্গিতে মাথা হেলালাম। তারাও মাথা দুলিয়ে শূন্য লেখা বোতামটা টিপল।

সর্বনাশ! এটা কি তাহলে লবিতে নামবে? কিন্তু লবি-র লেভেল তো আলাদাভাবে ‘এল’ দিয়ে দেখানো আছে। তার মানে এটা তার নীচের লেভেলে, যার নীচে টানেলের অংশটা শুরু হয়েছে। কিন্তু ওখানটা কি এখনও রক্ষীতে থিকথিক করছে?

ঠিক তখনই একজন রক্ষী চমকে আমার দিকে ঘুরল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করেছিলাম বলেই বুঝতে পারলাম, হতভাগা আমার জুতোটা দেখেই বুঝে গেছে, আমি রক্ষী নই। এইরকম একটা কিছুর জন্য অবশ্য আমি তৈরিই ছিলাম। দুই রক্ষী লিফটে ঢোকার আগেই আমি হাত বাড়িয়ে ক্যামেরার মুখটা উপরদিকে তুলে দিয়েছিলাম। ফলে লিফটের ভেতর কী ঘটছে তা দেখার উপায় ছিল না। তাই আমাদের নিঃশব্দ মারামারিটা ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। অবশ্য খুব একটা হাত-পা চালানোর জায়গাও ছিল না লিফটে। আমি দু’জনের মাথা আগে পরস্পরের সঙ্গে ঠুকে দিই। ওদের টলায়মান অবস্থা থেকে নড়ার সুযোগ না দিয়ে আবার মাথাগুলো ঠুকে দিই লিফটের দেওয়ালে। ‘ডাক্‌ বনাম সোলারিস’ আর একটা রাউন্ডও ওখানেই শেষ হল।

অ্যাড্রিনালিন রাশ থামার মাথায় এল, লিফটের দরজা খুলেই যদি রক্ষীদের সামনে পড়ি, তাহলে কী করব? আমার দুই সঙ্গী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে— এমন কিছু দাবি করব? নাকি দু’হাতে দুটো ব্লাস্টার ধরে এখান থেকে বেরোনোর একটা মরিয়া চেষ্টা করব?

বুঝতে পারলাম, ওপরে যাওয়ার ব্যাপারে আমি এতটাই ফোকাসড্‌ ছিলাম যে পরিকল্পনায় মস্ত বড় ফাঁক থেকে গেছে। এবার না একেবারে ওপরে যেতে হয়!

মনে হচ্ছিল, আত্মসমর্পণ করা ছাড়া বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। তখনও পর্যন্ত আমি কাউকে মারিনি। সোলারিসের রক্ষীদের আহত করেছি বলে আমার বিরুদ্ধে শাস্তি-টাস্তি নেওয়া হলে হবে। কিন্তু নিরস্ত্র অবস্থায় আমাকে, ক্যামেরার সামনে, মেরে ফেলতে রক্ষীদের নিশ্চয় সমস্যা হবে। নাকি হবে না?

পিং! বুঝতে পারলাম, আমরা উদ্দিষ্ট লেভেলে পৌঁছে গেছি। লিফটের দরজাটা খুলে গেল। অসহায়ের মতো ব্লাস্টারগুলো মেঝেতে রেখে সোজা হলাম।

দুটো হাত তুলতে যাচ্ছিলাম। তখনই লম্বাটে চেহারা, ট্রিম-করা দাড়ি আর টুপিতে বেশ ব্যক্তিত্বময় একজন রক্ষী লিফটে ঢুকল। আমার দিকে একঝলক তাকিয়ে সে মাটিতে পড়ে থাকা দুই রক্ষীকে দেখল। কোনো কথা না বলে সে মাইক্রো-ট্যাবটা আবার স্লটে ঢোকাল। তারপর আমার দিকে ঘুরে, আপাদমস্তক মেপে নিয়ে সে একটু দ্বিধাভরে জিজ্ঞেস করল, “সোলারিসের অপারেশন যাঁরা দেখেন, তাঁদের কোন ফ্লোরে পাওয়া যাবে, বলতে পারবেন?”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। বুকফাটা কান্না আর হাসি কি একসঙ্গে বেরোতে পারে? পারে না। ওরা কথাদের বের হওয়ার রাস্তাও বন্ধ করে দেয়। মারিয়াকে চুমুতে-চুমুতে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল আমার। ও ঠিক বলে! মন থেকে চাইলে স্বপ্নরাও সত্যি হয় বটে। দু’বছর পর দেখলাম তাকে। কিন্তু সে আমাকে তখন কী বলছিল জানেন?

“আপনি… কাঁদছেন! কেন? আপনি কি আমাকে চেনেন?”

টাওয়ারের মাঝামাঝি হেলিপ্যাড, ঘটনার দিন ভোর, ট্যান

বুম!

কান-ফাটানো শব্দ করে টাওয়ার ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল চপার। তার একটু পরেই অবশিষ্ট সলিড স্টেট ফুয়েলটুকু সমেত বিস্ফোরিত হল সেটা। আগুন আর মৃত্যুর প্রবল স্রোত ভাসিয়ে দিল সোলারিস টাওয়ারের মাঝের একটা গোটা ফ্লোরকে। তারস্বরে আর্তনাদ করে উঠল ফায়ার অ্যালার্মগুলো। ফোম আর জলের বন্যায় ভেসে গেল অনেকটা অংশ। বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেল আপনা-আপনি।

ওটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

সমুদ্রের মধ্যে আগুন বড় ভয়ংকর জিনিস হয়। একবার সে জিনিস দেখা দিলে তা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা হয় সবচেয়ে আগে। তাই জানতাম, আগুন লাগিয়ে দিতে পারলে ওদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখা আর অন্যদের ওপর নজরদারি করার রাস্তাটা বন্ধ হবে। ব্যাপারটা হয়তো চরমপন্থী বলে মনে হবে। কিন্তু ডাক্‌ কী অবস্থায় আছে, তা জানতে পারিনি তখনও। যে সংস্থা ওকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে, তারপর আমাকেও এমন করে টার্গেট করতে পারে, তার বিরুদ্ধে নিজের মতো যুদ্ধ চালানোর অধিকার আমার আছে— তাই না?

দাঁড়ান। আগে প্রথম থেকে সাজাই জিনিসটাকে।

টাওয়ারের কাছে আসার সময়ই খেয়াল করেছিলাম, তার ওপরের জায়গাটা রক্ষীতে একেবারে থিকথিক করছে। জানতাম, এতক্ষণ রেডিও সাইলেন্স বজায় রাখার জন্য বা অন্য কোনো কারণে আমাকে চ্যালেঞ্জ করা না হলেও হেলিপ্যাডে নামার সঙ্গে-সঙ্গে রক্ষীরা আমাকে ধরবে। একটা ‘দুর্ঘটনায়’ আমার অকালমৃত্যুর ব্যবস্থা করাও অস্বাভাবিক নয়। এই এতখানি সময়ের মধ্যে ওই মহিলার নিশ্চয় জ্ঞান ফিরেছে; ব্যাপারটা তিনি সোলারিস-এও নির্ঘাত জানিয়েছেন। আমার আগেই পৌঁছে লিওনিদ মুস্তাক নতুন করে আমার জন্য ব্যবস্থাপত্র নিশ্চয় করে ফেলেছেন এতক্ষণে।

এমনটা হতে পারে ভেবে ঠিক করেই রেখেছিলাম, চপারটা ক্র্যাশ করবে ওই টাওয়ারের মাঝখান থেকে জিভের মতো বেরিয়ে থাকা হেলিপ্যাডের ওপরের লেভেলে। তাতে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে তা আমাকে গোপনে টাওয়ারের ভেতরে ঢোকার সুযোগ করে দেবেই। শুধু আমাকে চপার থেকে আগেই বেরিয়ে যেতে হবে।

আসার সময় চপার অটো-পাইলটে ছিল। আমি বিশ্রাম নেওয়ার তেমন সুযোগ না পেলেও চপারের মধ্যে কী আছে না-আছে সেটা দেখে নিতে পেরেছিলাম। সেখান থেকেই কাজের জিনিসগুলো গুছিয়ে নিয়েছিলাম। এবার, সামনে থেকে আসা যাবতীয় সিগনাল আর নির্দেশ উপেক্ষা করে চপারটা টলতে-টলতে ধেয়ে গেল সামনের দিকে। তার থেকে একটু আগেই বেরিয়ে সমুদ্রের দিকে ঝাঁপ দিয়েছিল প্যারাসুট-পিঠে একটা শরীর। বুঝতেই পারছেন, সেটা আমি ছিলাম না। রক্ষীদের ব্লাস্টার থেকে বেরোনো একঝাঁক শিখা ওই হতভাগ্য স্লিপিং ব্যাগ আর প্যারাসুটটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।

চপারের নীচের পডটা জড়িয়ে ধরলাম আমি। হু-হু হাওয়া তো বটেই, ধেয়ে আসা অস্ত্রের ধাক্কা সামলানোর জন্য একটা ক্র্যাশ হেলমেট আর বিশেষ জ্যাকেট আগেই পরে নিয়েছিলাম। হাত বাড়িয়ে হুক-গান থেকে একটা মজবুত দড়ির মাথায় বসানো হুকটা ফায়ার করলাম হেলিপ্যাডের নীচে কাটাকুটি করে থাকা রড আর পাইপগুলোর দিকে তাক করে। দু’হাতের মাঝে হুক-গানটা বেঁধে নিয়েছিলাম। ফলে হুকটা নীচে আটকানোর সঙ্গে-সঙ্গে ঝাঁকুনি দিয়ে আমি চপার থেকে বেরিয়ে গেলাম। হেলিপ্যাডের ওপর দাঁড়ানো অধিকাংশ রক্ষী সেখান থেকে সরে গেছিল। তখনও থাকা ক’জন রক্ষী হতবুদ্ধি অবস্থা সামলে আমার দিকে ব্লাস্টার তাক করেছিল। এক-আধজন ট্রিগারও টিপেছিল। তবে তার বেশি সময় তারা পায়নি। ওদের শরীরগুলোকেই কুশন হিসেবে ব্যবহার করে আমি নিজেকে আছড়ে ফেললাম।

বহু মিশনের ফল হিসেবে আমার শরীর আর মনে এমন অনেক পরিবর্তন এসেছে যার সবটার খোঁজ কেউই রাখে না। পিসি জানে। এই ভেঙে জোড়া শরীরটার ঘা সারানোই হোক বা একাকিত্বের হাউ-হাউ কান্না সামলানো— সবটা সেই তো করে। সাকুরা বোঝে, তবে ও তো কাউকে কোনোদিন সে-কথা বলবে না। কিন্তু সেই মুহূর্তে আবারও অনুভব করেছিলাম, ওই পরিবর্তনগুলো না হলে আমার মেয়াদ ফুরিয়ে যেত ততক্ষণে। ওগুলোর জন্যই গড়ানো অবস্থা থেকে উঠে আমি হাত আর পা চালিয়েছিলাম অস্বাভাবিক, আগের নিরিখে অকল্পনীয় দ্রুততায়। ছিটকে পড়েছিল রক্ষীরা। তাদের ব্লাস্টার আর অন্য জিনিসগুলো কুড়িয়ে নেওয়ার আগেই পেছনে সরে যাওয়া রক্ষীরা অবশ্য আমাকে নিশানায় এনে ফেলেছিল। কিন্তু…

ওপরের লেভেলে কাচ আর লোহার আবরণে সশব্দে ধাক্কা মেরেছিল চপার। তারপর কী হল, তা তো আগেই লিখেছি। চিৎকার, এলোপাথাড়ি ব্লাস্টার ফায়ার, আর্তনাদ, ওপর থেকে ভেঙে পড়া কংক্রিট, স্টিল আর কাচের প্রাণঘাতী টুকরো— এ-সবের মধ্য দিয়ে এগোতে লাগলাম আমি।

বাড়ি-ভর্তি রক্ষীর মোকাবিলা করা আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সবকিছুর মধ্যেও আমি লক্ষ করেছিলাম, মেরিন কোরের বেশ ক’টা সশস্ত্র জাহাজ হাঙরের মতো এই টাওয়ারের চারপাশে চক্কর কাটছে। চপারের বিস্ফোরণের পর তারা এখানে ঢুকবেই। আমি একা না পারলেও ডাক্‌-কে তারা বাঁচাবেই।

কিন্তু কী হচ্ছে এখানে? কী করতে ডাক্‌ এসেছিল এই টাওয়ারে? আর আমি ওকে খুঁজবই বা কোথায়?

ওপরদিকেই যেতে হবে! ওই লেভেলটাতে এত রক্ষী রয়েছে— এর অর্থ হল ওখানেই কিছু একটা আছে যা সবার নজরের বাইরে রাখতে চায় সোলারিস। ডোনাল্ড রডরিগেজকে যতটুকু চিনি তাতে তারও ওখানেই থাকার কথা… যদি না ইতিমধ্যেই…!

না। ও-সব ভাবব না। আর কাউকে হারাব না আমি। কাউকে লাগবেও না। লাগলেই বা কী হবে? কেউ কি আসবে?

সে কি আসবে?

হেলিপ্যাডের লেভেল, ঘটনার দিন ভোর, জন?

“আমাদের নীচে যেতে হবে!”

একটু আগের ভয়াবহ বিস্ফোরণে টাওয়ারের ভেতর যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। নেমে এসেছে অন্ধকার। এমনকি বাইরের ভোরের আলোও ঢাকা পড়ে যাচ্ছে কুচকুচে কালো ধোঁয়ায়। আমি আর রডরিগেজ… ডাক্‌ তার মধ্য দিয়েও বোঝার চেষ্টা করছিলাম, কীভাবে সোলারিস-এর মাথাদের নাগাল পাওয়া যায়। তখনই ডাক্‌ এই কথাটা বলে হনহনিয়ে নীচের দিকে যাওয়ার সিঁড়ির দিকে এগোলেন।

ভদ্রলোক যে হাভেন মিলিশিয়ার একজন, সেটা কাল লিফটে ঢোকামাত্র বুঝতে পেরেছিলাম। আর্মারের আড়ালে হাভেন মিলিশিয়ার নিজস্ব ইউনিফর্মের কলার-ট্যাগটা আমার নজর এড়ায়নি। তারও আগে দেখেছিলাম, মেঝেতে পড়ে আছে দুই রক্ষী। বুঝতে পেরেছিলাম, সেই বিকেল থেকে রক্ষীরা এঁকেই খোঁজার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তারপর…

মানুষটি কেন এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন, তা তখন বুঝতে পারিনি। কথা শুনে মনে হয়েছিল, উনি আমাকে চেনেন… চিনতেন। কিন্তু আমার কিচ্ছু মনে পড়ছিল না। তাতে তিনি প্রথমে ভীষণ হতাশ হলেও পরে সামলে নিয়েছিলেন। উনি বুঝিয়ে বলেছিলেন, কেন এই টাওয়ারে এসেছিলেন। মেরিন কোরের পর্যবেক্ষণের কথাটা শোনামাত্র আমার মাথার মধ্যে সেই রাত আটটা থেকে চলতে থাকা অংকটা মিলে গেছিল। তবে সেটা আমি ভাঙিনি।

আর হ্যাঁ, ভদ্রলোক আমাকে ‘জন’ নামে ডাকছেন তখন থেকেই। গত দু’বছর ‘বুড়ো’, বড়জোর ‘পাগল বুড়ো’ ছাড়া অন্য কিছু বলে কেউ আমাকে ডাকেনি। এই নামটা সেই তুলনায় বেশ ভালো শোনাচ্ছে। হালকা… কিন্তু ভালো।

“নীচে? কিন্তু সেখানে তো এই মুহূর্তে প্রচুর রক্ষীর থাকবে। এই লেভেল থেকেও তো সবাই নীচেই পালানোর চেষ্টা করেছে।” আমি দ্রুত হাঁটার ফাঁকেই ওঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।

“চপারটা এখানে ধাক্কা মারার আগে কী হয়েছিল, তুমি দেখেছিলে?”

“কিছুটা দেখেছিলাম। ওখান থেকে একটা প্যারাসুট-বাঁধা ব্যাগ ফেলে দেওয়া হয়েছিল— এটুকু দেখার পর আমি আবার ঘুরে এদের নেটওয়ার্কে ঢুকেছিলাম। তারপরেই তো চপার ক্র্যাশ করল।”

“তুমি যেটা দেখনি, সেটা আমি দেখেছি।” ডাকের গলাটা উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিল। ধোঁয়া আর আগুনে ভরা, ওপর থেকে তার আর ভাঙা ধাতু বেরিয়ে মারাত্মকরকম বিপজ্জনক হয়ে থাকা ওই লেভেলের মধ্য দিয়েও প্রায় ছুটছিলেন ভদ্রলোক। সেভাবেই তিনি বললেন, “ওই প্যারাসুট দিয়ে ওদের বিভ্রান্ত না করলে এতক্ষণে সব শেষ হয়ে যেয়। কিন্তু আমি দেখেছি, চপার থেকে ও সময়মতো পালাতে পেরেছিল। ওর কাছে আমাদের পৌঁছোতেই হবে।”

“ও! কে?”

ব্রেক কষার মতো থেমে গেলেন ডাক্‌। বিস্ফারিত চোখে আমাকে দেখলেন তিনি। বিড়বিড় করলেন, “তুমি… তুমি সত্যিই সব ভুলে গেছ? মানে আমি তো কেউ না। কিন্তু ওকেও…?”

“কার কথা বলছেন ডাক্‌?” আমি ওঁর কনুই ধরে এবার একরকম টানতে-টানতে নীচের দিকে এগোলাম। সিঁড়ির সামনে একঝাঁক রক্ষী আমাদের দেখেই ব্লাস্টার তাক করল। ততক্ষণে আমাদের দু’জনের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছিল। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমারও! ব্লাস্টারের ট্রিগার মোটামুটি টিপে রেখেই আমরা জায়গাটা পেরোলাম।

পেছনের স্তূপটা ডিঙিয়ে সামনের ফ্লোরে আসামাত্র বুঝতে পারলাম, এখানে একটা যুদ্ধই চলছে। রক্ষীদের একটা মস্ত বড় দল যেখানে পারছে সেখানে আড়াল খুঁজে একটা বিশেষ দিকে ফায়ার করছে। সেদিক থেকেও ব্লাস্টারের শিখা ঝলসে উঠছে, তবে কম সংখ্যায়। মাঝের জায়গাটায় পড়ে আছে অনেকগুলো শরীর— তার প্রত্যেকটাই রক্ষীদের। আর্মার-পরা অবস্থাতেও তাদের এই দশার কারণটা ধোঁয়া আর অন্ধকারের মধ্যেও বুঝে নিতে পারলাম। দু’চোখের মাঝে, বা গলার কাছের খোলা অংশটাতেই গুলি করে এদের নিকেশ করেছে কেউ।

কাদের সঙ্গে লড়ছে এই রক্ষীরা? তারা সংখ্যায় ক’জন?

তখনই একজন রক্ষী একটা গ্রেনেড ছুড়ে দিল ওই দিকে। সেটা দেখেই ওদিকের ভাঙা পিলারের পাশ থেকে লাফিয়ে, গড়িয়ে, শেষে প্রায় উড়ে অন্য একটা পিলারের আড়ালে গেল একজন।

আলো, শব্দ, আর মৃত্যু ছড়িয়ে দিয়ে ফাটল গ্রেনেডটা। দ্রুত নতুন ফর্মেশন বানিয়ে আগু-পিছু করে নিল রক্ষীরা। মাত্র একজন, প্রায় সম্বলহীন শত্রুর বিরুদ্ধে অতজন রক্ষীর বিজয় যে নিশ্চিত— এটা তারা প্রত্যেকে বুঝতে পেরেছিল।

ডাক্‌ চিৎকার করে আমাকে কিছু বলছিলেন। রক্ষীদের মধ্যে কয়েকজন আমাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়ে এদিকে ঘুরছিল। কিন্তু আমার সেদিকে খেয়াল ছিল না।

মুহূর্তের জন্য, আকাশকে পটভূমি করে বাতাস কেটে সরে যাওয়া ওই বাদামি শরীরটা আমি চিনতে পেরেছিলাম! অন্ধকারের মধ্যে আমাদের সে দেখেনি। তবু এদিকে যখন সে তাকিয়েছিল, তখন আগুন-ঝরানো ওই চোখজোড়াকেও আমি চিনতে পেরেছিলাম। তার নাম… আমি এখনও জানি না। কিন্তু আমি ওকে চিনি!

“জন!” ডাকের আর্তনাদ এবার আমার কানে পৌঁছোল, “কিছু করো!”

শরীরটা সক্রিয় হল। ভাবতে হয়নি। জানতামও না যে আমার শরীর এত দ্রুত, এত ভয়ংকরভাবে নড়াচড়া করতে পারে। ডাক্‌ ঠান্ডা মাথায় ফায়ার করছিলেন থেমে-থেমে। পিলারের পেছন থেকেও ছুটে এসেছিল একের পর এক ঝলক। তবে ও-সব দেখিনি আমি। দেখার দরকার হয়নি।

একটা সময় সব থেমে গেল। মৃত রক্ষীদের হাত থেকে ব্লাস্টার টেনে নিয়ে বেশ ক’জনকে মেরে, আবার তাদের অস্ত্র নিয়ে আরও ক’জনকে মারার সেই পালা একসময় থামল। মৃতদেহের আড়ালে ঢাকা পড়ল সোলারিসের বিশাল লোগো-আঁকা মেঝেটা।

পিলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা বাদামি শরীরটা অবাক হয়ে আমাকে দেখছিল। তার দু’চোখে… আগুন ছিল না। কিন্তু অন্য কিছু ছিল। কী ছিল?

“আমরা এসেছি!” চিৎকার করছিলেন ডাক্‌, “হ্যাঁ, আমরা সবাই আবার একসঙ্গে আসতে পেরেছি, ট্যান!”

ট্যান!

মাথার মধ্যে যেন ঝড় উঠল হঠাৎ। বালি, একটা মস্ত বড় শহরের আলো আর অন্ধকার, আগুন, মৃত্যু, বিস্ফোরণ, একটা ভয়ংকর আলোর ঝলক— সব ফিরে এল হুড়মুড়িয়ে। ধাক্কা খাওয়ার মতো টলে গেলাম আমি। মনে হল, আমার মাথাটা অসহ্য তাপে এবার গলে যাবে। কী যেন হচ্ছিল আমার মধ্যে! অসংখ্য তথ্য, তত্ত্ব, নাম আর ঘটনা ধাক্কাধাক্কি করছিল সামনে আসার জন্য। কিন্তু কিচ্ছু সাজাতে পারছিলাম না আমি।

আমি… কে?

“জন!” হাতের ব্লাস্টারটা মেঝেতে ফেলে টলতে-টলতে আমার দিকে এগিয়ে এল মেয়েটা। তার চোখের দৃষ্টি আমি পড়তে পারছিলাম না। প্রাণপণে আমি নিজেকে সোজা রাখার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। এই শরীরটা… এই প্রায় অক্ষয় শরীরটাও তখন দেওয়ালের ফাটল দিয়ে আসা হাওয়ার ধাক্কায় দুলছিল।

মেয়েটা কী করতে চাইছিল, বা আমার কাছে এসে কী করত… জানা হয়নি। ঠিক সেই মুহূর্তেই ডাক্‌ বলে উঠেছিলেন, “আমাদের ওপরের লেভেলে যেতে হবে। ওরা এখানে সত্যিই কিছু একটা অস্ত্র-পরীক্ষা করছে বলে মনে হচ্ছে। সেটা যে কখন হবে তা জানি না। তবে আমাদের হাতে সময়…”

“নেই!” ডাকের কথাটা শেষ করেছিল ওই মেয়েটি… ট্যান। মাথা ঝাঁকিয়ে সে বলেছিল, “ঠিক ভোর ছ’টায় নতুন স্যাটেলাইট আমাদের মাথার ওপর আসবে। এই টাওয়ারের ওপরে এমন কিছু আছে যা দিয়ে ওটাকেই টার্গেট করা হচ্ছে। যা মনে হচ্ছে তাতে এটাই অপারেশন ক্র্যাক।”

ক্র্যাক! ফাটল! মনে পড়ে গেল, আমি রেনোকে, তার আগে আশফাককে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। সোজা হয়ে বললাম, “সোলারিসের এই অপারেশনটা থামাতে হবে। তার জন্য কী করা দরকার?”

“প্রথমবার আমাকে কোনো প্রশ্ন করলেন! শুধু উত্তরই তো পেয়েছি এতদিন। আচ্ছা, আপনি অন্য প্রশ্নও করতে পারেন?”

ট্যান এগুলো কী বলছে? ওর চোখ আর গলার এই ভঙ্গি… বা এভাবে দাঁড়ানোর কি বিশেষ কোনো অর্থ আছে?

“প্রেমালাপ করার সময় এটা নয়, কন্যে।” ডাক্‌ দু’হাতে আমাদের দু’জনের একটা করে হাত ধরে টানলেন, “যতটুকু বুঝেছি তাতে এই বাড়িতে ডেটাবেসের ব্যাপারগুলো দেখেন ডিয়া ন্‌গুয়েন নামের একজন। তাঁর অফিস ‘জে’ লেভেলে। সেটা কোথায় হবে?”

“এর থেকে চার ধাপ ওপরে।” নিজেকে সামলে নিয়ে বলার চেষ্টা করলাম, “তবে ইতিমধ্যে ওপরে যারা আছে তারা খবর পেয়ে থাকলে কাজটা সহজ হবে না।”

“সহজ? ধুর-ধুর! সহজ কাজ করার জন্য আমাদের লাগে নাকি?”

ডাকের কথা শুনে মাথা দোলাল ট্যান। তারপর দ্রুত হাতে যতগুলো সম্ভব অস্ত্র, রিফিল আর মেড-কিট রক্ষীদের কাছ থেকে নিয়ে নিজের শরীরে চাপাল। তারপর আমার দিকে ঘুরে বলল, “আসুন।”

শরীরগুলো ডিঙিয়ে, সামনে-পেছনে, ওপরে-নীচে মৃত্যুর হাতছানির মধ্য দিয়ে, ক্রমাগত ফায়ার করে আর জায়গা বদলে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। আপাতত চারটে লেভেল পেরোতে হবে। তারপর…

টাওয়ারের ‘জে’ লেভেল, ঘটনার দিন ভোর সাড়ে পাঁচটা, ট্যান

সময় নেই! একদম সময় নেই আমাদের কাছে।

কথাটা নিজেকেই বলে চলেছিলাম ক্রমাগত। কিন্তু সেটা কি শুধুই এই টাওয়ারের মাথার ওপর যা-কিছু ঘটতে চলেছে, তার কথা ভেবে বলা? নাকি আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ডাকের হাঁফ ধরা শ্বাসের আড়ালে নিঃশব্দে উঠে আসা লোকটাই আমাকে কথাটা ভাবাচ্ছে?

কোত্থেকে এল লোকটা? এটুকু বুঝতে পারছি যে ওর স্মৃতিলোপ পেয়েছে। প্রায় দু’বছর ধরে অত্যন্ত রহস্যময় যে-সব ঘটনার মধ্য দিয়ে লোকটার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাদের কিছুই বোধহয় ওর মনে নেই। ডাক্‌ তো তাই বলছিল।

কিন্তু আমাকেও কি ওর মনে নেই? একটুও না?

তাহলে আমার দিকে তাকানোর সময় ওই বুড়োটে মুখ আর গর্তে বসা চোখে একটা অন্যরকম রঙের দেখা পাই কেন? সেটা কি স্নেহ, না আমার চোখের ভুল, নাকি… অন্য কিছু?

ব্লাস্টার আর গ্রেনেড, ব্যাটন আর লোহার শিক, হাত আর পা— সঙ্গে থাকা সবকিছু প্রয়োগ করে ওপরদিকে উঠছিলাম আমরা। মৃত্যু আমার পাশ দিয়ে শিস্‌ কেটে চলে যাচ্ছিল। ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় বজ্জাত ছেলেগুলো আমার গায়ের রঙ আর চুপচাপ স্বভাব নিয়ে এভাবেই নানারকম ‘আওয়াজ’ দিত। মনে হচ্ছিল, তারাই যেন আবার ফিরে এসেছে আমার চারপাশে। তবে… তখনকার মতো এবারও তারা তনয়া দত্ত-কে ছুঁতে পারছে না।

“এসে গেছি!” থেমে দম নিতে চেষ্টা করল ডাক্‌। আমরা সবাই সিঁড়ির সামনে থেকে সরে একটা বড় পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখলাম। অজস্র অ্যালার্ম, আগুনের পট্‌-পট্‌ শব্দ, বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ার আওয়াজ, রক্ষীদের চিৎকার, নীচ থেকে আসা বিস্ফোরণ এবং কাটারের গর্জন— সব মিলে এক ভয়ংকর অবস্থা হয়ে ছিল। তারই মধ্যে অস্ত্রশস্ত্রের অবস্থা ঝটপট পরখ করে নিয়ে ডাক্‌ বলল, “এবার ডিয়া ন্‌গুয়েন-কে খুঁজে বের করতে হবে।”

“ডেটাবেস ম্যানেজ করলেই কি এইসব ব্যাপারে কিছু জানা যায়?” কল্পনার আমেজ ছেড়ে নিজেকে এই জীবন-মরণ বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে চাইলাম, “যা বুঝেছি তাতে এটা একটা মিলিটারি টেকনলজির সঙ্গে জড়িত ব্যাপার। আমি ভুল হতে পারি, তবে এর পেছনে একটা কর্পোরেট গৃহযুদ্ধ বা ষড়যন্ত্র থাকাও অস্বাভাবিক নয়। তবে হ্যাঁ, ও-সব ব্যাপার কে জানতে পারে, সেটা ডিয়া বলতে পারবেন।”

“সেক্ষেত্রে ওই ঘরটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।” আঙুল তুলে একটা বিশেষ ঘর দেখাল বুড়োটা… জন! লোকটার ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল। দুটো বছর কোথায় ছিল ও? স্মৃতি ভুলে গেলেও কেউ কি হাভেনে আসতে পারে না? কত খুঁজেছি আমি লোকটাকে! অথচ তখন সে নির্বিকার মুখে বলছিল, “বোঝাই যাচ্ছে যে ওপরে থাকা রক্ষীদের বিজ্ঞানী আর কর্তাদের নিরাপত্তার জন্যই আপাতত মোতায়েন করা হয়েছে। এই ফ্লোরে রক্ষীদের দেখতে পাচ্ছি শুধুমাত্র ওই একটা ঘরের সামনে। ঘরটা দেখে বোর্ড-রুম বলে মনেই হচ্ছে। তার দরজাটাও… বোমা-টোমা ছাড়া ভাঙা যাবে না। ওই ঘরের মধ্যেই ডিয়া এবং অন্য কর্তাদের পেতে পারি আমরা।”

“দরজা ভাঙতে হবে! আমাদের কাছে যে গ্রেনেড আছে, সেগুলো কাজে লাগাই তাহলে?” বেশ খুশি-খুশি মুখে কথাটা বলেই আবার মুষড়ে পড়ল ডাক্‌, “আমার শেলা যদি এখন সঙ্গে থাকত।”

জনের মুখে ভাবান্তর হল না। অস্বাভাবিক, তাই না? মানে পুরুষমানুষ একজন নারীকে ভুলে গেলেও গাড়ি বা বন্দুকের কথা ভোলে না বলেই শুনেছি। মনে হচ্ছে স্মৃতিলোপটা বেশ জবরদস্ত হয়েছিল।

“ট্যান, আমরা কীভাবে এগোব?” প্রশ্ন শুনে আবার খেয়াল হল, দু’জনেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করলাম। ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। হতভাগা বুড়োর স্মৃতি ফিরিয়ে এনে তারপর ওর সঙ্গে বোঝাপড়া করব। আপাতত এই মিশনটা শেষ করা দরকার।

গম্ভীর গলায় বললাম, “দরজাটা ভেতর থেকে খোলানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য এমন কিছু একটা করতে হবে, যাতে ভেতরে থাকা লোকেদের মনে হয় যে তাদের ওখানেই ফেলে রেখে সবাই পালিয়ে গেছে।”

“তাহলে একটা বড়সড় দুর্ঘটনার ব্যবস্থা করাতে হবে।” শ্রীমানের মুখে বুলি ফুটল, “সেই সঙ্গে এই ফ্লোর থেকে রক্ষীদের তাড়াতে হবে— গুলি বা বোমার বদলে অন্য কোনোভাবে। তার জন্য একটাই উপায় আছে।”

জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখাল জন। ওর আঙুল অনুসরণ করে দেখলাম, বেশ কিছুটা ওপর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে একটা ক্রেনের সামনের দিক। শুনলাম, ঠান্ডা গলায় ও বলছে, “ওই ক্রেন দিয়ে কী করা যায় দেখছি। প্যানিক তৈরি হলে ঘরের ভেতর থেকে কেউ না কেউ দরজাটা খুলে বাইরের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করবেই। তারপর… আপনাদের কাজ।”

দু’জনেই মাথা নাড়লাম। জানালার ফ্রেমটা ধরে এক ঝটকায় আলগা করে দিল জন। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে টাওয়ারের গায়ের কাচ আর স্টিল ধরে-ধরে অদ্ভুত দক্ষতায় ওপরদিকে উঠে গেল সে।

“মিলিটারির লোক বলে কথা!” গর্বিত মুখে বলল ডাক্‌, “কোন ডিভিশন যেন বলেছিলে? রিকভারি, তাই না? মানে আসলে কোভার্ট অপারেশন চালানোর কাজ। সেজন্যই এখনও এমন ফিটনেস!”

ফোকাস ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করলাম। ইতিমধ্যে আশপাশ থেকে ক্রমাগত চপারের আওয়াজ ভেসে আসছিল। মেগাফোন ব্যবহার করে কেউ বারবার কিছু একটা বলছিল। দরজার সামনে পজিশন নেওয়া রক্ষীরা তখনও অবধি পেশাদার ভঙ্গিতে একটা ফর্মেশন ধরে রাখলেও তারা যে রীতিমতো দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তা একেবারে স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। চপারের বিস্ফোরণের পর বাড়িটার যাবতীয় বৈদ্যুতিন ব্যবস্থার পাশাপাশি কমিউনিকেটর আর ক্যামেরার নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়লে আমি অন্তত অবাক হব না। কিন্তু কিছুটা তো বোঝাই যায়। টাওয়ারের নীচে যে মিলিটারি ঢুকেছে, ওই ঘোষণাগুলো যে “থামো এবং অস্ত্রসমর্পণ করো”-ই বলছে— এটা ওরা বুঝে গেছে।

তাহলে এবার অপেক্ষা!

কিছুক্ষণ, সেটা দু’মিনিট বা কুড়ি মিনিট… যা-খুশি হতে পারে, কেটে গেল। তারপর ভূমিকম্প আর বিস্ফোরণের মিশ্রণের মতো একটা আওয়াজ হল। কাচ, স্টিল, কংক্রিট— সব দুমড়ে দিয়ে, গোটা ফ্লোর কাঁপিয়ে করিডরের এক প্রান্ত দিয়ে টাওয়ারের মধ্যে ঢুকে এল একটা বিশাল বড় বল।

কী হচ্ছে তা বোঝার আগেই একেবারে পিষে গেল ক’জন রক্ষী। বাকিরা পাগলের মতো ব্লাস্টার ফায়ার করার চেষ্টা করল। ইতিমধ্যে, করিডরের মেঝেটা ফাটিয়ে একটা গভীর খাত তৈরি করার মতো করে গড়িয়ে আবার বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল বলটা। তারপর একটা দানবাকৃতি পেন্ডুলামের মতো দোল খেয়ে চলে গেল অনেকটা দূরে। সেখান থেকে সেটা ঝড়ের মতো ধেয়ে এল টাওয়ারের দিকে। আর্তনাদ করে পালাতে শুরু করল রক্ষীরা। কয়েকজন সিঁড়ি দিয়ে নীচে গড়িয়ে গেল। কয়েকজন তো সরাসরি নীচে ঝাঁপ দিল। বাকিদের আবার পিষে দিয়ে, একদিকের দেওয়াল ধ্বসিয়ে, ফ্লোরের একটা দিক প্রায় ফাঁকা করে দিয়ে পেছনদিকে গড়াতে শুরু করল বলটা।

এই ক্রেন আর বল এত ওপরে কীভাবে তোলা হয়েছিল, জানি না। কেনই বা তোলা হয়েছিল, তাও জানি না। ছাদের অংশে কী এমন জিনিস জোড়া লাগানো হচ্ছিল যার জন্য ক্রেন লাগে? মিসাইল? রকেট?

“স্যাটেলাইট!” সব ভুলে চিৎকার করে উঠলাম আমি। ডাক্‌ চমকে আমার দিকে ঘুরল। তখনই বোর্ড-রুমের দরজা খুলে বাইরে তাকাল একজন। হাওয়ার ঝাপটা পেয়েই লোকটা পেছনদিকে ঘুরে দেখল, সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতো ধেয়ে আসছে বলটা। আর্তনাদ করে ও পেছন দিকে সরে গেল। বলটা অনেকটা অনুসরণ করার মতো করেই নিজের পুরোনো গতিপথ থেকে সামান্য সরে এবার টাওয়ারের দেওয়ালে আছড়ে পড়ল।

দরজাটা পুরোপুরি ফাঁক হয়ে পিলপিল করে লোক বেরোতে শুরু করল ঘরটা থেকে। কোনো রক্ষী ছিল না ওখানে। জনাদশেক নারী ও পুরুষ ওখান থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে এল। তাদের মধ্যে একাধিক নারী ও পুরুষ ভাঙা মেঝেতে হোঁচট খেয়ে বা হিল ঢুকে যাওয়ার ফলে সামনে আছাড় খেলেন। বাকিরা তাঁদের মাড়িয়ে এগোনোর চেষ্টা করতে লাগলেন। এবার আমি আর ডাক্‌ দু’হাতে ব্লাস্টার নিয়ে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সবাই থমকে গেল।

ডাক্‌ ওদের দু’পাশে সরিয়ে করিডরের অন্য প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে আর কেউ নেই দেখে নিয়ে ও ভাঙা দেওয়াল দিয়ে মুখ বের করে বলল, “ঠিক আছে!” আমার দিকে বুড়ো আঙুল তুলে ও বুঝিয়ে দিল, মঞ্চ আপাতত আমার।

শান্ত গলায় বললাম, “হাভেন মিলিশিয়া। আপনাদের আপাতত কাস্টডিতে নিচ্ছি আমরা। তবে একজনের সঙ্গে আমাদের একটু দরকার আছে। তাঁর নাম ডিয়া ন্‌গুয়েন। তাঁকে দেখিয়ে দিন। বাকিদের কোনো ক্ষতি হবে না— কথা দিচ্ছি।”

উত্তর না দিলেও একাধিক নারী ও পুরুষের চোখ এক ছোটখাট চেহারা, কিন্তু ধারালো মুখের মহিলার দিকে ঘুরে গেল। তৎক্ষণাৎ মহিলা নিজের হাতে ধরা ছোট্ট ব্যাগটা খোলার চেষ্টা করলেন।

আমার হাতের ব্লাস্টার ঝলসে উঠল। মহিলা যন্ত্রণাকাতর শব্দ করে ব্যাগ ফেলে মেঝেতে বসে পড়লেন। নরম-গরম কিছু করার মতো সময় ছিল না। ইশারায় নির্দেশ দিলাম, যাতে আশেপাশের শিঁটিয়ে যাওয়া লোকেরা কিছুটা পিছিয়ে যায়। তারপর ডিয়া’র পাশে উবু হয়ে নিচু গলায় বললাম, “হাতের পোড়া জায়গাটার চিকিৎসা করলেই সেটা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অন্য কোথাও নিশানা করলে একেবারে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। বেশি কিছু জানার নেই। একটা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিন। যাঁরা আপনাকে চিনিয়ে দিল, তাদের মধ্যে কাকে ধরলে এই টাওয়ারের ওপরে কী চলছে— সেটা জানা যাবে? ভুলভাল বকলে… বললামই তো, প্রাণে না মেরেও অন্য কিছু করে দেব।”

গতবছর অর্গ্যান ট্র্যাফিকার দলটার হাত থেকে পালানোর সময় আমার পেটে অনেকগুলো পেলেট বিঁধেছিল। সেগুলো বের করার সময় আরও অনেক কিছু সরাতে হয়েছিল। প্লাস্টিক সার্জারি আর অন্য নানা প্রস্থেটিক্স দিয়ে শরীরটাকে জোড়াতালি দেওয়ার সময় আমার মধ্যে আরও গভীর কিছু পরিবর্তন এসে গেছিল বোধহয়। তার একটা ছোঁয়া লাগল কথাগুলো বলার সময়। ডিয়া চমকে আমার দিকে তাকালেন। স্পষ্ট দেখলাম, রাগ আর ঘৃণা ছাপিয়ে তাঁর দৃষ্টিতে ঘন হল ভয়। কুঁকড়ে গিয়ে একজনের দিকে আঙুল তুলে তিনি বললেন, “ওনিক্স! ওটা ওর আসল নাম কি না জানি না। তবে ক্র্যাকের ব্যাপারে ওই সবচেয়ে ভালো জানে।”

মহিলার ব্যাগটা তুলে নিলাম। অন্য কোনো মহিলা’র ব্যাগ খোলা শোভন নয়। ওয়ারেন্ট ছাড়া এ-সব করলে শাস্তি হতে পারে। তবে সেই মুহূর্তে শাস্তির ভাবনাটাও হাস্যকর বলে মনে হচ্ছিল। ব্যাগটা খুলতেই ভেতরে ব্লাস্টার আর অন্য কিছু টুকিটাকি জিনিস দেখলাম। ব্লাস্টারটা কোমরে গুঁজে ব্যাগটা একপাশে সরিয়ে দিলাম। তারপর হেঁটে গেলাম ওনিক্স… বা ওই নাম নেওয়া লোকটার দিকে। লোকটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে দু’হাত ওপরে তুলল। কাছে গিয়ে সংক্ষেপে বললাম, “চলুন। আমাদের সঙ্গে টাওয়ারের ওপরটা একটু ঘুরে আসবেন।”

ডাক দ্রুত সবার তল্লাশি নিতে-নিতে বলল, “আমি এদের ভারমুক্ত করে ওই ঘরেই আপাতত ঢুকিয়ে রাখছি। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ রাখবে। তুমি মিস্টার ওনিক্সকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে…”

ও কথাটা শেষ করার আগেই একটা চিৎকার শুনলাম। তারপর পরপর ব্লাস্টার ফায়ার করা হল আমাদের দিকে।

ডাক একপাশে সরে গেছিল। আমিও লাফিয়ে সরেছিলাম। তার মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলাম, ওপর থেকে সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে এসে এদিকে ফায়ার করছে বেশ কয়েকজন লোক— যাদের মধ্যে রক্ষীরা আছে, সিভিলিয়ান পোশাকেও আছে ক’জন। সোলারিস-এর বেশ ক’জন কর্তা আর কর্ত্রী ধরাশায়ী হলেন। সাহায্য পাবেন ভেবে দু’জন ওদিকেই এগোচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁদেরও ঝাঁঝরা করে দিল ব্লাস্টার। আমি চিৎকার করে ডাক্‌-কে বললাম, “কভারিং ফায়ার করছি! তুমি বাকিদের নিয়ে ওই ঘরের মধ্যেই ঢোকার চেষ্টা করো।”

ডাক্‌ সায় দিয়ে দ্রুত তখনও পর্যন্ত দেওয়াল ধরে প্রায় কাঁপতে থাকা জনাচারেক মানুষকে নিয়ে ঘরটার দিকে এগোল। আমি ওনিক্সকে নিজের আড়ালে রেখে বন্দুক তাক করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়েই বুঝতে পারলাম, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে।

আমি সোজা হতে পারছি না কেন?

তারপর বুঝতে পারলাম, আমার পেটের একটা দিক চিরে বেরিয়ে ছিল একটা কুচকুচে কালো ছুরির ফলা। সেটা বেরিয়ে গেল, তারপর আবার ঢুকল আমার শরীরে। একটু আগে উত্তেজনার বশে যে যন্ত্রণাটা অনুভব করিনি, সেটাই এবার পুরোমাত্রায় টের পেলাম। ছুরিটা আমার দেহে মোচড় দিয়ে বের করে আনল কেউ। দারুণ যন্ত্রণায় সব অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা ছেঁড়া-ছেঁড়া ছবি আর কথা মাথায় ধরা দিল।

ওনিক্স ওর হাতে ধরা ছুরিটার ফলা আমার অসাড় হয়ে আসা শরীরেই মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“তাড়াতাড়ি এদিকে আসুন!” চিৎকার করল কেউ। কে? গলাটা চেনা? অতি কষ্টে ঘাড় সরিয়ে দেখলাম, সিঁড়ির কাছে একঝাক রক্ষীর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে লিওনিদ মুস্তাক। উত্তেজিতভাবে তিনি বললেন, “অপারেশনের কোডগুলো ফিড করতে হবে। বাকিরা ওপরে আছেন। আপনি এবার ওদিকে যান। এদের ব্যবস্থা আমরা করছি।”

আমার শরীরটা কাত হয়ে যাচ্ছিল দেওয়াল থেকে মেঝের দিকে। বুঝতে পারছিলাম, এই ওনিক্স পরিকল্পনা করেই হোক বা অন্য কোনোভাবে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকে চিরে দিয়েছে। কোনোভাবে দেওয়াল বা মেঝেতে ভর দেওয়ার চেষ্টা করলেই অসহ্য যন্ত্রণা একটা আগুনের মতো পুড়িয়ে দিচ্ছিল শরীরকে। কিন্তু তাহলে ওদের কে আটকাবে?

সব অন্ধকার হয়ে ওঠার আগের মুহূর্তেই মনে হল, করিডরের ভাঙা দিকটা দিয়ে আবার কিছু একটা ছুটে আসছে এই বাড়ির দিকে। কী আসছে? ওই অবস্থাতেও মনে হল, বলটা কি আবার আছড়ে পড়বে এই লেভেলে? তাহলে তো ওই ঘরে আশ্রয় নেওয়া লোকেরা আর ডাকই বিপন্ন হবে। ওপাশটা তো প্রায় ঝুলছে!

না! বল নয়।

একটা অভাবনীয় সম্ভাবনা আমার দু’চোখ খুলিয়ে দিল। মাথাটাও সাফ হয়ে গেল এক ঝলকে। বুঝতে পারলাম, কেবলটা ধরে ইতিমধ্যে কেউ নেমে এসেছিল বলের গায়ে। একটা গ্র্যাপলিং হুক সে এই তালেগোলে ছুড়ে দিয়েছিল টাওয়ারের গায়ে। এবার সেটা ধরেই সে ঝুলে আসছে এই লেভেলে।

একসঙ্গে অনেকগুলো ব্লাস্টার মৃত্যুকে উগরে দিল তার দিকে। কিন্তু অদ্ভুত দক্ষতায় নিজেকে একেবারে নিচু… আর প্রায় মাটির সমান্তরালে রেখে এই ভাঙা মেঝের ওপর দিয়েই অদ্ভুত কৌশলে ঘষটে ভেতরে ঢুকে এল লোকটা!

টাওয়ারের ‘জে’ লেভেল, ঘটনার দিন ভোর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ, জন

“ট্যান! তুমি ঠিক আছ?”

মেয়েটা সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছু বলতে পারল না। ওর শরীরের নীচে জমা হওয়া কালচে লাল তরল দেখে আগেই বুঝেছিলাম, ও গুরুতর আহত হয়েছে। ডাকের প্রশ্নের উত্তরটা আমিই দিলাম, “উনি আহত। আমি আপাতত ক্ষতস্থানটা পুড়িয়ে একটা জোড়াতালি ব্যবস্থা করছি। কিন্তু ওঁর জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা করতে হবে।”

“আহত!”

ফ্যাকাশে মুখটা বের করলেন ডাক্‌। সন্তর্পণে করিডরের সামনের দিকটা দেখে নিলেন ভদ্রলোক। রক্ষী আর সিভিলিয়ানদের দেহের একটা স্তূপ পড়ে ছিল ওখানে। একটু আগে একটা ভাঙা শিক দিয়ে খুঁচিয়ে আর পিটিয়ে আমি ওই স্তূপটা বানিয়েছিলাম। তার ব্যাখা না দিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। ডাক্‌-কে বললাম, “আপনি ওঁর কাছে থাকুন। আমি এগোই। নইলে বড় একটা বিপদ হতে চলেছে।”

“কী… কী হচ্ছে, সেটা তুমি বুঝতে পেরেছ?” যন্ত্রণাকাতর গলায় কোনোরকমে কথাটা বলল ট্যান।

মাথা নাড়লাম। তারপর বললাম, “এই টাওয়ারের নীচ থেকে সাধারণ খনিজের পাশাপাশি অন্য একটা জিনিসও তোলা হচ্ছে। প্রকৃতিতে ও-জিনিস পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো এক বিচিত্র খেয়ালে, বলা চলে পৃথিবীর শরীরে একটা ফাটল থেকে বের করা হচ্ছে জলে মেশা ফেরোফ্লুইড। গত বেশ কয়েকবছর ধরে গোপনে সোলারিস জল থেকে এই ফেরোফ্লুইড আলাদা করে একটা বড় ভাণ্ডার বানিয়েছে। নতুন স্যাটেলাইট আমাদের মাথার ওপর এলে এই ফেরোফ্লুইড দিয়ে একটা গ্র্যাভিটি ওয়েল তৈরি করে সেটাকে কাজে লাগাবে সোলারিস। মেগাকর্প সেন্ট্রাল আজ অবধি ওদের স্যাটেলাইট বা রকেটের প্রযুক্তি দেয়নি। কিন্তু গ্র্যাভিটি ওয়েল তৈরি হলে ওই প্রযুক্তি ছাড়াই ওরা এখান থেকে একটা স্যাটেলাইট তুলে দিতে পারবে আকাশে।”

“কিন্তু… তাতে কী হবে?” হতভম্বের মতো প্রশ্ন করলেন ডাক্‌।

“সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে শুধু বৃষ্টি নামানোই নয়, সব ব্যাপারেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে চলেছে ওই স্যাটেলাইট। আমার ধারণা, সোলারিসের নিজস্ব স্যাটেলাইট তার বদলে বায়ুমণ্ডল থেকে কম্পনজাত শক্তি কাজে লাগাবে। এর আগেও এমন চেষ্টা হয়েছে এখানে। তবে এই প্রোটোটাইপ একবার দাঁড়িয়ে গেলে মেগাকর্পের মধ্যে একটা বিশাল বদল হবে। মালিকানাই বদলে যাবে ওদের— এমনটা বললেও অত্যুক্তি হবে না।”

“দাঁড়াও-দাঁড়াও!” ডাক্‌ অসহায় মুখে আমাকে থামতে বললেন, “কম্পনজাত শক্তি? সে আবার কী? আর… তুমি এ-সব জানলে কীভাবে?”

আমি থমকে গেলাম। সত্যিই তো! হেভারশ্যামের কথা শুনে মাথায় ঠাসা ড্রাইভগুলোতে তো এ-সব ছিল না। তবে আমি এগুলো কীভাবে জানলাম?

“মিলিটারির রিকভারি ডিভিশনের রদ্দি ফাইলের কথাও তোমার মনে পড়ে বুড়ো।” খুব কষ্টে, থেমে-থেমে বলল ট্যান। কিন্তু সেই অবস্থাতেও ওর মুখে একটা অদ্ভুত, দুর্জ্ঞেয় হাসি ফুটে উঠেছিল, “শুধু আমার কথা মনে পড়ে না, তাই না? তবে বলো, মেগাকর্প-এর মালিকানা বদল হলে সেটা কি খুব খারাপ হবে?”

মুহূর্তের জন্য আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল আশফাকের মুখটা। গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ নিয়ে ও বলেছিল, বেলা হারিয়ে গেছে ওই ফাটলের মধ্যে। বেলা’র মতো আরও কতজনকে গিলেছে ওই টানেলের মধ্য দিয়ে ধেয়ে যাওয়া ফেরোফ্লুইড। আর তাদের নাম দুনিয়া থেকে মুছে নিজের কারবার চালিয়ে গেছে সোলারিস!

সোজা হয়ে দাঁড়ালাম আমি। ডাক্‌ এগোতে যাচ্ছিলেন। আমি হাত তুলে তাঁকে থামালাম। তারপর বললাম, “আপনি ওর কাছে থাকুন। ওই ঘরে যারা এখনও আছে, তাদের আটকে রাখুন। আওয়াজ থেকে মনে হচ্ছে, মিলিটারি ওপরে উঠে আসছে। আমি ওপরে যাই। সোলারিস-কে থামাতে হবে।”

সিঁড়ির দিকে এগোলাম না। বরং ভাঙা দেওয়ালের দিক দিয়ে শরীরটা ঝুলিয়ে পাশের ফাটল ধরা কংক্রিটের ফাঁকগুলোর দিকে এগোলাম। ওগুলোতে ভর দিয়ে আমি অনেক তাড়াতাড়ি এবং নির্ঝঞ্ঝাটে ছাদের দিকে এগোতে পারব। কী মনে হতে একবার তাকালাম মেঝেতে আধশোয়া হয়ে মেয়েটার দিকে।

মেয়েটা কিচ্ছু বলেনি। শুধু গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে… এই ব্লাস্টারের আঘাতে শতছিন্ন আর্মারের আড়ালের লম্বা, রোগা শরীর আর পোড়া দাগে ভরা মুখের দিকে তাকিয়েছিল। কী খুঁজছিল ও? আশা? স্বপ্ন? বিশ্বাস?

আমি ঊপরদিকে উঠতে শুরু করেছিলাম।

টাওয়ারের ছাদ, ভোর ছ’টা বাজতে তিন,

মিলিটারি স্যাটেলাইটের ফুটেজ থেকে দেখা বিবরণ

অন্তত তিনটে স্তরে পেরিমিটার বানিয়ে মাঝখানের জায়গাটা ঘিরে রেখেছিল রক্ষীরা। মাঝখানে একটা বিশাল ট্যাংকের মতো অংশ ধীরে-ধীরে ঘুরছিল। তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল একটা অদ্ভুত-দর্শন জিনিস। তার চারপাশে ছিল চারটে প্রকাণ্ড সিলিন্ডারের মতো ঘূর্ণায়মান অংশ। তাদের মাঝখানে ছিল একটা সরু, চুরুটের মতো অংশ।

বুস্টার বা ফুয়েল সিলিন্ডারের মধ্যে পে-লোড এভাবে রাখা হয় কি? হলে এটাই সেই স্যাটেলাইট।

ছাদের কিছুটা অংশ ঢাকা ছিল। তার সামনেও অন্তত দশজন রক্ষী ছিল।

হঠাৎ একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল ছাদে। রক্ষীরা দ্রুত এদিক-ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, ঠিক কী ঘটছে। দেখা গেল, কেউ একজন টাওয়ারের দেওয়াল বেয়ে উঠে এসেছে। কাছের রক্ষীরা সেটা বুঝে তার দিকে ব্লাস্টার ফায়ার করার আগেই সেই লোকটি নড়ছে। তার চলন দেখে বিদ্যুতের সঙ্গেই তুলনা করতে হয়। ক্রমাগত জায়গা বদলে, রক্ষীদের ঢাল হিসেবে, তারই সঙ্গে ব্লাস্টার ব্যবহার করে সে এগিয়ে যাচ্ছিল ওই স্যাটেলাইটের দিকে।

হঠাৎ সে অভিমুখ বদলাল। স্যাটেলাইটের সামনে দেওয়ালের মতো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়া রক্ষীদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে ছুটে গেল ঢাকা অংশটার দিকে। সেদিকে থাকা জনাদশেক রক্ষী তার ভয়ংকর আক্রমণের সামনে ছিন্নভিন্ন হতে-হতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বেশ পালিশ করা পোশাকের একজন। পরে ফুটেজের সঙ্গে ডেটাবেস মিলিয়ে শনাক্ত করা গেছিল, লোকটি ছিলেন লিওনিদ মুস্তাক— সোলারিস-এর সিকিউরিটি চিফ।

মুস্তাক ব্লাস্টার তুলে পরপর দু’বার ফায়ার করলেন। লোকটি সামান্য টলল। তারপর সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর কী হল… ক্যামেরাতে ঠিক ধরা পড়েনি। সেই মুহূর্তেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসা আরেকজন রক্ষীও খুব কাছ থেকে ব্লাস্টার ফায়ার করল বলেই বোধহয় সবটা অস্পষ্ট হয়ে গেছিল। তবে অত কাছ থেকে ফায়ার করেও লোকটিকে থামাতে পারেনি রক্ষীটি। মুস্তাকের শরীরটা একদিকে টলে পড়েছিল। প্রায় একইসঙ্গে রক্ষীটিও ঠিকরে গেছিল। তারপর লোকটি ঘরের ভেতরে ঢুকেছিল।

তখন ঠিক ছ’টা। স্যাটেলাইট মাথার ওপর এল। তৎক্ষণাৎ একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। সিলিণ্ডারের মতো অংশগুলোর মুখ থেকে হু-হু করে উপরদিকে ছুটে গেল তরল। খুব শক্তিশালী কোনো পাইপ যেন আকাশের দিকে ছুড়ে দিচ্ছিল ওই তরলকে। তবে পরে বোঝা গেছে, খুব নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া স্যাটেলাইটের টানেই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল ওই ফেরোফ্লুইড।

চারটে প্রায় সমান্তরাল তরলের স্রোত উপরে উঠে বেঁকে গেল স্যাটেলাইটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। তারই মধ্য দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করল মাঝখানের পে-লোড, মানে আসল অংশটা।

ঠিক তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে এল লোকটা। ঢালের মতো করে যার শরীরটাকে সে এবার নিজের সামনে রেখেছিল, তাকে পরে ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে ওনিক্স নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্যাডিস্ট স্বভাবের এই লোকটি নাকি সোলারিসের বড়কর্তাদের মধ্যে একজনের ছেলে। তার অনেক অপরাধ ইত্যাদির কথাও জানা গেছে, যা এতদিন চেপে দেওয়া হয়েছিল। তবে ফুটেজে তার যে চেহারা দেখা গেছে, তা বড় বীভৎস। মনে হচ্ছিল যেন কেউ তাকে জীবিত রেখেই শরীরটাকে নিয়ে একেবারে কাটাছেঁড়া করেছে। লোকটি তখনও বেঁচে ছিল বলেই রক্ষীরা মুহূর্তের জন্য থমকে গেছিল। সেই সময়টুকুর মধ্যেই সেই রহস্যময় লোকটি ওনিক্স-কে নিয়ে এসে ওই ফেরোফ্লুইডের মধ্যে ছুড়ে দেয়।

রক্ষীরা সামলে নিয়ে লোকটির দিকে সম্মিলিতভাবে ব্লাস্টার ফায়ার করে। লোকটি তারই ধাক্কায় ওপর থেকে নীচে পড়ে যায়।

ইতিমধ্যে গ্র্যাভিটি ওয়েলের ধারাটি বিপর্যস্ত হতেই স্যাটেলাইট লক্ষ্যচ্যূত হয়। তার গতিপথ আর উপরের স্যাটেলাইটের সঙ্গে মেলেনি। বেশ কিছুটা ছোটার পর সেটির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হয়। তবে সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়তে থাকা ছাড়া সেটি অন্য কিছু করতে পারেনি। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর গামা আইল্যান্ডের কাছাকাছি একটি পরিত্যক্ত রিগে ধাক্কা মেরে বিস্ফোরিত হয় সোলারিস-এর স্যাটেলাইট।

সেই রহস্যময় লোকটিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যত শক্তিশালী আর্মারই পরা থাক না কেন, অতগুলো ব্লাস্টারের আঘাত কারও পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। অত উঁচু থেকে সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার পর তো আর বেঁচে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

কিউব— হাভেন মিলিশিয়ার সদর, ঘটনার একমাস পর পড়ন্ত বিকেল, রডরিগেজ

চিফ ঢুকতেই আমি উঠে দাঁড়ালাম। ট্যানও ওঠার চেষ্টা করছিল। চিফ কড়া গলায়, “বসে থাকো!” বলায় ও সে-চেষ্টা ত্যাগ করল।

নিজের কপালের দু’পাশের রগ টিপে ধরে চিফ বললেন, “আগে শুনি, তোমরা অপারেশন ক্র্যাকের ব্যাপারে কদ্দূর কী বুঝলে?”

ট্যানের দিকে তাকালাম। ও কিছু না বলে শূন্য দৃষ্টিতে চিফের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, গলা-টলা ঝেড়ে আমি একটা পালটা প্রশ্ন করলাম, “কেন, চিফ?”

“মানে?” ভুরু কুঁচকে বললেন চিফ, “এত কিছুর মধ্য দিয়ে গেলে তোমরা। তারপর এই নিয়ে তোমাদের নিজস্ব কোনো মতামত থাকতে পারে না?”

“সে-কথা বলছি না।” আস্তে-আস্তে মাথা নাড়লাম। ইউনিফায়েড কম্যান্ড থেকে মিলিশিয়া— সর্বত্র এই এক জিনিস দেখতে-দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমি। এখানে যাই ভাবি না কেন, আসলে আমরা কেউ বিশ্বাসভাজন মন্ত্রী নই। এমনকি গজ কি ঘোড়াও নই। আমরা এখানে স্রেফ বোড়ে!

“তবে?”

“আমাদের কেন পাঠালেন আপনারা? মেগাকর্পের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে, একটা ক্রাইসিস হতে চলেছে স্যাটেলাইট নিয়ে, অপারেশন ক্র্যাক— সবই তো জানতেন আপনারা। সেজন্যই আমাদের পেছন-পেছন ওখানে ঢোকার জন্য ওত পেতে ছিল মেরিন কোর। যে লেভেলগুলো অক্ষত থাকার কথা ছিল, সেগুলোও যে মিলিটারি আর একজিট পোর্টের মিলিশিয়া ‘তদন্ত চালানোর’ পর একেবারে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে— এটা তো আমরাই জেনেছি। আপনি ‘বিশ্বস্ত’ বলে আমাকে, আর কাউন্সিলর হুয়ান তাঁর ‘স্নেহভাজন’ ট্যান-কে ওখানে পাঠালেন এটা বুঝেই যে আমরা গোলমালের গন্ধ পেলে ভেতরে ঢুকবই। কিন্তু এতদিন… এতগুলো কাজ নিষ্ঠাভরে, সর্বস্ব দিয়ে করার পর আমাদের নিয়েই এই খেলাটা খেললেন কেন আপনারা?”

আরও অনেক কিছু বলতে পারতাম; বললাম না। গত একমাস ধরে মারিয়া’র সঙ্গে ওদের সংস্থার চালানো অনাথ-আশ্রমে গিয়ে বাচ্চাগুলোকে সময় দিয়েছি। মনটা তাতে অনেকখানি শান্ত হয়েছে। নইলে এতক্ষণে আরও অনেক কিছু বলে, হয়তো বা করেও ফেলতাম।

চিফ আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। দেখে মনে হল, মহিলা নিজের মুখে ক্ষমতার দম্ভমাখা একটা হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। তার বদলে ওঁর বসে যাওয়া চোখ আর ধারালো হনুরেখার মধ্যে একটা কংকালের বিকট, অর্থহীন মুখভঙ্গিই ফুটে উঠছিল। সেটা বুঝতে পেরেই উনি বোধহয় হাসার চেষ্টা ছেড়ে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন।

“আমি তোমার একটা কথাও অস্বীকার করব না, রডরিগেজ। হ্যাঁ, আমরা জানতাম ওখানে কী হচ্ছে। কিন্তু সরাসরি কিচ্ছু করার উপায় ছিল না কারও। সোলারিস-এ ঢোকার মতো কোনো ফাটল পাইনি আমরা। তবে এটা আমরা জানতাম যে তোমরা ওখানে ঠিক কিছু খুঁজে পাবে। তাছাড়া আমরা তোমাদের আলাদাভাবে আলাদা জায়গায় পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম, তোমাদের মধ্যে একজনের বিপদ হয়েছে বা বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে জানলে অন্যজন ঝাঁপাবেই। সেই ফাটল দিয়েই ঢুকবে মিলিটারি। তোমাদের ওপর ভরসা করাটা যে কত সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, তা তো দেখাই যাচ্ছে।”

“কেন?”

ট্যানের খসখসে গলার প্রশ্নটা শুনে মুহূর্তের জন্য নার্ভাস হয়ে পড়লেন চিফ। তারপর সামলে নিয়ে বললেন, “মানে?”

“সোলারিস-কে ধ্বংস করে মেগাকর্প-এর পুরোনো ব্যবস্থা বজায় রেখে আপনার কী লাভ হল?”

চিফের চোখজোড়া সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য জ্বলে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বললেন, “তা জেনে তোমার কী লাভ? মিলিটারি থেকে ক্লাসিফায়েড মেডেল, মিলিশিয়া থেকে সাইটেশন আর একটা ইনক্রিমেন্ট, আরও বেশ কিছুদিনের জন্য ছুটি— এর বাইরেও কিছু চাই বুঝি? সে ব্যবস্থা…”

“লিয়া কেমন আছে, চিফ?” খুব নিচু, স্বাভাবিক গলায় বলল ট্যান, “ও ভালো নেই, তাই না?”

চোখের সামনে দেখলাম, চিফের চেহারাটা একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কীভাবে যে মহিলা নিজেকে সামলালেন, তা তিনিই জানেন। আলতো করে মাথা নেড়ে চিফ বললেন, “জানতে চেও না, ট্যান। মেয়ের নিরাপত্তার জন্য মা-কে যে কী-কী করতে হয়…! কখনও যেন তোমাকে… তোমাদের এই অবস্থায় পড়তে না হয়। তোমাদের এভাবে ব্যবহার না করে আমার আর কোনো উপায় ছিল না। বিনিময়ে আমার মেয়ে এখন মুক্ত— যদিও সে আজও জানে না যে আমিই তার মা।”

চিফের শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠল কয়েকবার। কাঁপা গলায়, থেমে-থেমে তিনি বললেন, “হাভেনের মেয়র পদে হুয়ানের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত। ওঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রার্থী মেগাকর্প-এর সমর্থন পাবে না। তার ফলে হুয়ানের লক্ষ্য— বিদ্রোহীদের সসম্মানে পুনর্বাসন দেওয়া— পূরণ হওয়ার পথে আর বিশেষ বাধা রইল না। বলো তোমরা, এগুলো কি কিছুই নয়?”

ট্যান উত্তর দিল না; বরং কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। আমিও উঠলাম। ট্যানের শরীরের ভার নিজের ওপর নিলাম। তারপর পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে। পেছন থেকে চিফ ম্যানিক ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলেন, “কী হল? রডরিগেজ! মেজর দত্ত! আমি তোমাদের কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম। তোমরা…”

কিউব থেকে বেরোনোর জায়গাটা অন্ধকার হয়ে ছিল। ট্যানকে বললাম, “তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি একবার দেখে নিই। কে জানে আমাদের জন্য বাইরে কেউ…”

“কেউ নেই।” হাসল ট্যান। যন্ত্রণা থাকলেও সেই হাসিতে কোনো মালিন্য ছিল না।

“কী করে বুঝলে? লেটেস্ট সার্জারির পর এক্স-রে বা নাইট-ভিশন গোছের কিছু জুড়ে দেওয়া হয়েছে বুঝি তোমার শরীরে?”

ট্যানের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তারপর ও আবার কষ্ট করে হেসে বলল, “ও-সব নয়। আমি জানি, বাইরে আমাদের কোনো শত্রু ওত পেতে নেই। থাকতেই পারে না!”

কিছু না বলে আবার ওকে ধরে-ধরে বেরিয়ে এলাম। গাড়িটা আনলক করে, বোমা বা অন্য জিনিসের জন্য স্ক্যান করে নিয়ে তাতে ওকে বসালাম। তারপর বেরোলাম ওর বাড়ির দিকে।

চুপচাপ ড্রাইভ করছিলাম। হঠাৎ ট্যান বলে উঠল, “তোমাকে একটা কথা বলার আছে, ডাক্‌।”

“বলে ফেলো।”

“গত কয়েকবছরে আমার… কতগুলো সার্জারি হয়েছে, জান?”

“জানি।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “কিন্তু এই প্রশ্ন কেন?”

“আমি কোনোদিন মা হতে পারব না।”

ট্র্যাফিকে ভরা রাস্তায় আমার হাত টলে গেল। আশপাশ থেকে ধেয়ে আসা গালি আর নিশ্চিত দুর্ঘটনার সম্ভাবনা সামলে আমি যতক্ষণে গাড়িটা একপাশে আনলাম, ততক্ষণে আমার হাত আর কপাল ঘেমে উঠেছে। ট্যান কিন্তু একটুও নড়েনি। শান্তভাবে ও বসেছিল আমার পাশের সিটেই। এবার আমার দিকে তাকিয়ে ও হেসে বলল, “প্লিজ ডাক্‌, গাড়ি চালানোর সময় এবার থেকে অটো-পাইলটের হাতেই সবটা ছেড়ে দিও। তোমার কিছু হলে মারিয়া আমাকে একেবারে মেরে ফেলবে।”

“কেন? মানে তুমি কীভাবে…? কোনো সার্জেন বলেছে?”

একটা বড় শ্বাস ফেলল ট্যান। তারপর মাথার ওপরে আকাশের দিকে তাকাল। সেখানে তখন ধুলো আর নাগরিক রোশনাইয়ের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠছিল একটা-একটা করে তারার দল। মাথাটা পেছনে কাত করে ট্যান বলল, “একাধিক সার্জেন আর স্পেশালিস্টের কাছ থেকে কথাটা জেনেছি, ডাক্‌। আমার শরীরটা আর সাধারণ… এমনকি অসাধারণ কোনো মেয়ের মতোও নেই। অনেক বদল এসেছে তাতে। সেভাবেই, মা হতে গেলে যে অঙ্গটি লাগে, সেটি আমার শরীর থেকে বাদ পড়েছে এই ক’বছরে।”

“তাহলে?”

“তাহলে কী?”

“তোমার বিয়ে… বা অন্য কিছু… মানে তাতে যদি সমস্যা হয়?”

“ডোনাল্ড রডরিগেজ!” ট্যানের চোখজোড়া জ্বলে উঠল, “তুমিও বুঝি মনে কর যে বিয়ে করে বা সংসারী হয়েই মেয়েদের জীবনে মোক্ষলাভ হয়?”

“আরে ধুর! আমি তা বলিনি।”

হাসতে-হাসতে ড্যাশবোর্ডের ওপর ঝুঁকে পড়েছিল ট্যান। চোখ মুছে ও আমার দিকে ঘুরে বলল, “তোমাকে আমি খুব ভালো চিনি, ডাক্‌। ইয়ার্কি মারছিলাম। এবার চলো। সাকুরা আজ আমাকে একটা নতুন সুর শোনাবে। ওকে আর পিসিকে বেশিক্ষণ একটা বাড়িতে রাখলেই ভয় হয়, এই বুঝি দু’জনের ঝগড়ায় বাড়িটাই উড়ে গেল!”

কথা না বাড়িয়ে গাড়ি চালিয়েছিলাম। ওকে বাড়ির দরজায় পৌঁছে দিলাম। সাকুরা হাত ধরে টানাটানি করছিল। ট্যানের পিসিও রাগ আর ভালোবাসা মিলিয়ে সদ্য বানানো কী একটা খাবারের লোভ দেখানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আমার মনও ততক্ষণে চিয়া, আর্থার আর মারিয়া’র জন্য আকুল হয়ে উঠেছে, তাই পরে আসব, মানে একেবারে আসবই— এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গাড়ির দিকে এগোলাম।

ট্যান দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল। তারপর হঠাৎ বলল, “আমি জানতাম, বাইরে কোনো শত্রু আমাদের জন্য ওত পেতে নেই। কারণ সে আছে! সে আমাদের পাশে থাকবেই। সত্যি করে বলো, তুমিও তেমন ভাব— তাই না?”

হুডটা খুলে দিলাম। ধোঁয়া আর ধুলোয় চোখ জ্বালা করছিল। কোনো পাগল বা খুনির ব্লাস্টারের লক্ষ্য হতে পারি, এটাও মাথায় ছিল। তবু হু-হু হাওয়া মুখে আর শরীরে মাখতে-মাখতে ভাবছিলাম কথাগুলো।

অতগুলো ব্লাস্টারের ঘা খেয়ে, তারপর ওইভাবে সোলারিস টাওয়ার থেকে নীচে পড়ে কি কারও পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব? অবশ্য বাঁচার সংজ্ঞাটা এক্ষেত্রে বোধহয় বদলে নিতে হবে। মানে আমি বা ট্যান যেভাবে বেঁচে আছি, সেভাবে কি তার অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করা যায়?

মনে পড়ল, কালাহান একজিট পোর্টের বাসিন্দাদের জন্য আরেকটু ভালো থাকার, খাওয়ার, শিশুদের পড়ার ব্যবস্থাও আজ হয়েছে মেগাকর্প-এর সৌজন্যে। সেখানেই লোকজন এক ‘পাগল বুড়ো’-র কথা বলেছিল। সে নাকি ফাটল বন্ধ করবে বলেই সোলারিস-এর মধ্যে গিয়েছিল। একটি মেয়ে— চিয়ারই বয়সী— হাপুস নয়নে কেঁদে বলেছিল, সেই বুড়োর কিছু হলে তাদের গান আর গল্প শোনাবে কে?

হ্যাঁ, বাঁচা একেই বলে। আমি আর তাকে কতটুকু চিনি? তবু আমাকে… বিশেষ করে ট্যানকে বাঁচানোর জন্য সে যেভাবে লড়েছিল তার থেকে বেশি করে বাঁচতে… বাঁচাতে কি কেউ পারে?

জানি, তার ফিরে আসা হয়তো অসম্ভব। এও জানি, পেছনে ফেলে আসা ওই মেয়েটা সেই অসম্ভবের আশা নিয়েই বেঁচে আছে। কার অপেক্ষায় সে আছে— এ-কথা কি জানে ট্যান? হয়তো জানে। তবে… আমাদের স্থির, নিশ্চিত সম্ভাব্যতার জগতেও তো ফাটল তৈরি হয়। ভূত থেকে ভগবান— সবাই থাকে সেই ফাটলের মধ্যে। যদি তার মধ্যে সেও বেঁচে থাকে?

যদি এই মুহূর্তে, তারাভরা আকাশকে সাক্ষী রেখে অনিশ্চিতের দিকে এগিয়ে চলে জন থ্যান্ড্রো?

Tags: উপন্যাস, ঋজু গাঙ্গুলী, কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!