উদ্যোগপর্ব

  • লেখক: দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
  • শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব

ঘণ্টা বাজছিল। ঠিক ঘণ্টা নয়। জন্তুর ডাকের মতো একটা শব্দ। শব্দটা ফের একবার আমাকে জাগিয়ে দিল এসে। এই নিয়ে অষ্টম বার।

এখানে সময় দেখবার কোনও উপায় নেই। এখানে, ওই শব্দটা শুনে কেবল আমি জানতে পারি আরেকটা দিন শুরু হয়েছে। আরেকটা মৃত্যুর প্রহর।

বাইরে পায়ের শব্দ উঠছিল। পুরোহিতের মতো চেহারার লোকটা ফের আসছে। এরপর কী হবে তা আমি জানি। আমায় ঘিরে থাকা ধূসর, মসৃণ দেয়ালের একটা অংশ খুলে যাবে। সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকে এসে সে আমাকে প্রার্থনা করতে আদেশ করবে। আমার আত্মার মুক্তির জন্য শেষ প্রার্থনা। তারপর সেই একই নাটক। আমি ঠোঁট টিপে বসে থাকব। আমি দু-হাতে আমার লজ্জাস্থান ঢাকবার চেষ্টা করব। তিনি ভারী মধুর হাসিটি মুখে জড়িয়ে রেখেই হাতে ধরা দণ্ডটা আমার তলপেটের দিকে নিশানা করবেন। তারপর তীব্র যন্ত্রণায় যখন আমি মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে ছটফট করব, তখন ফের একবার মৃদু হেসে বলবেন, “তোমার মঙ্গলের জন্যই বলছি পিশাচ। ইহজগতের এত পাপ নিয়ে পরমেশ্বরের সামনে গিয়ে তুমি দাঁড়াবে তা আমি হতে দিতে পারি না যে!”

প্রথম প্রথম কুড়ি থেকে পঁচিশবার ওই দণ্ডটাকে ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁকে আমায় ভাঙতে। এখন আর ততবার লাগে না। যন্ত্রণা খুব শক্তিশালী শিক্ষক। এনথ্রিপিই শিখিয়েছিল। আমাদের গোপন শিক্ষার একটা সেশনে। ক্রমাগত যন্ত্রণা একটা… কী যেন বলে… হ্যাঁ…মনে পড়েছে… পাভলভিয়ান রিফ্লেক্স গড়ে তোলে। ধীশক্তির অধিকারের বাইরে, নিতান্তই প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় যন্ত্রণাদাতার কাছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা। এখন ওই ঘণ্টার শব্দটা শুনলেই আমার শরীরে ওই দণ্ডটার থেকে ভেসে আসা যন্ত্রণার অনুভূতি ফিরে আসে…

গতকাল সকালে হাতের দণ্ডটি তিনি দ্বিতীয়বার উঁচিয়ে ধরবার পর আমার আর প্রতিবাদ করবার শক্তি ছিল না। তৃতীয় আঘাতের আগেই তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমি বলেছি, “আমি, জিয়াসা আহানিকা, স্বেচ্ছায় সমাজের চিরাচরিত অনুশাসনের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি। আমার প্রার্থনা, অসহ যন্ত্রণাময় মৃত্যু আমাকে পবিত্র করুক…”

এই সময়গুলোয় পুরোহিতের অন্য হাতে একটা ছোট যন্ত্র ধরা থাকে। আমি সেটা চিনি। চোরাপথে জোগাড় করা ওর একটা সস্তা মডেল আমি নিজেও ব্যবহার করেছি সঙ্ঘের কাজে। তবে তার হলোগ্রাম দুর্বল, সাদাকালো আর তুলনায় কম পাল্লার ছিল। এই মডেলটা দেখে আন্দাজ করা যায় তা অনেক উন্নত। অনেক বেশি শক্তিশালী। তার অতন্দ্র চোখ আমার ত্রিমাত্রিক চলমান ছবিকে সারা দেশের সমস্ত কমিউনিটি ভিউইং সেন্টারের প্রভাতী সম্প্রচারে ছড়িয়ে দেয়। আমি… পৃথিবীর নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সৈনিক জিয়াসা আহানিকা… আমি…

না:। আজ আর দণ্ডটা ব্যবহার করবার সুযোগ আমি একে দেব না। বড় ব্যথা লাগে… বড় ব্যথা…

জন্মকথা

জিয়াসার জন্মের পর প্রথম তার প্রাথমিক ডিএনএ পরীক্ষা ডাক্তারদের অবাক করেছিল। এর কারণ, যান্ত্রিক বিশ্লেষকের একটি রায়। অত্যাধুনিক পরীক্ষাটির শেষে বিশ্লেষক রায় দেয়, জিয়াসা সেই দুর্লভ সন্তান উৎপাদক জীব যা প্রতিবার গর্ভধারণের সময় পুরুষের যৌন ক্রোমোজমদ্বয় থেকে কেবলমাত্র নারী ক্রোমোজোমটিকেই বেছে নিতে সক্ষম।

এর ফলে শিশুসহ তার মা হাসপাতাল থেকে ফেরবার আগেই জিয়াসার আঠারো থেকে আটচল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি বছরের স্বামীত্বের জন্য দুশোরও বেশি করে আবেদনপত্র জমা পড়ে সরকারি নারীবন্টন দফতরে।

বর্তমান আইনে আঠারো থেকে আটচল্লিশ বছর বয়সী যে-কোনও সন্তান উৎপাদককে স্ত্রী হিসাবে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য লিজ নেয়া যায়। কোনও ক্ষেত্রে লিজের জন্য বছরে একাধিক আবেদন জমা পড়লে সরকারি নারীবন্টন দফতর নিলামের মাধ্যমে প্রাপক নির্ধারণ করে থাকেন। তবে আবেদনের জন্য একটা মোটা ও অফেরৎযোগ্য ফি প্রত্যেককে জমা দিতে হয় সরকারি কোষাগারে এবং মেয়েটির জৈব পিতা সে ফি-এর দশ শতাংশ কমিশন হিসেবে পান।

ফলত জিয়াসার বাবা মাত্রই কয়েক দিনের মধ্যে যথেষ্ট ধনী হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে জিয়াসার মায়েরও এহেন সন্তানের জন্মদাত্রী হিসাবে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। যেহেতু যে-কোনও সমাজে সাদা ও কালো দুটি বাজারই থাকে, এবং চব্বিশ শতকের পার্থিব সমাজও তার ব্যতিক্রম নয়, কাজেই জিয়াসার বাবার পক্ষে, তাঁর নির্ধারিত একবছরের কোটা শেষ হবার আগেই তার মায়ের লিজ কালোবাজারে হস্তান্তর করে দিতে কোনও সমস্যা হয়নি। হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই তাকে কিনে নেন একজন পশ্চিমী ধনকুবের। সরকারি দফতরের এক প্রভাবশালী ধর্মীয় আমলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কিছু মোটা ক্রেডিট হস্তান্তর হওয়ায় এর জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্রও তৈরি করে নিতে সমস্যা হয়নি।

জিয়াসার বাবা ভোগী মানুষ। সামান্য একটি সন্তান উৎপাদক মেয়েজীবে তাঁর বেশিদিন রুচি থাকবার কথাও নয়। এরপর প্রাপ্ত টাকায় মধ্যসাগর তীরের এক সুন্দর শহরে একটি বড়সড় বাড়ি ও গুটিকয়েক অত্যাধুনিক মডেলের যান্ত্রিক যৌনদাসী সংগ্রহ করে নিয়ে তিনি অবসর জীবন শুরু করেন। সেই বিলাসবহুল ও স্বচ্ছন্দ জীবনে তাঁর একমাত্র কাজ ছিল জিয়াসাকে একটি সুশীল, সতীত্বপূর্ণ ও উত্তেজক পণ্যে পরিণত করবার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাদানের তদারকি করা। এই কাজটি রাষ্ট্রঘোষিত সনাতন ধর্মের সহায়ক হওয়ায় অর্থের পাশাপাশি তিনি পার্থিব সরকারের ধর্মবিষয়ক দফতরেরও বিশেষ স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন।

তবে কোনও সুখই পরিপূর্ণ সুখ হয় না। প্রাচীন প্রবাদে বলে আকাশের চাঁদের গায়েও কলঙ্ক থাকে। অতএব জিয়াসার বাবার এই সুখও পরিপূর্ণ ছিল না। তবে সুখের কথা এই যে সেই পরিপূর্ণতার অভাবের কথা তিনি নিজেও বহুদিন জানতে পারেননি।

অবশ্য নিখাদ সুখের এই ত্রুটিটির জন্য তিনি নিজেই কিছুটা দায়ী। তাঁর একটি বিশেষ দুর্বলতাই এর জন্ম দিয়েছিল। নিজের যৌনজীবনে তিনি কেবলমাত্র সুবোধ ও সুশীল নারীজীবের সংসর্গে তৃপ্ত হতেন না। সমাজের উচ্চকোটির বহু মানুষের মতোই তাঁর মধ্যে কিছু গোপন বিকৃতকামীতা ছিল, যা তৃপ্ত করবার জন্য তিনি বিংশ ও একবিংশ শতকের অসতী ও ধর্মদ্রোহী নারীসমাজের প্রতিনিধিদের মডেলে তাঁর যৌনদাসীদের প্রোগ্রামিং করাতে ভালোবাসতেন। এই যন্ত্রদাসীরা শারীরিকভাবে দুর্বল, সুন্দরী এবং অসামান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত হত ও নিজেদের স্বাধীন ও ক্ষমতাশালী নারী হিসাবে ভাবত। তারা তাঁর আচরণের নিয়মিত প্রতিবাদ করত, এবং শয্যাক্রীড়ার প্রাক্কালে তাঁকে বাধা দেবার চেষ্টায় রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করত। তাদের এই আচরণ তাঁর বয়সোচিত দুর্বল গ্রন্থিদের যারপরনাই উত্তেজিত করত। তখন বিদ্রোহী যন্ত্রদাসীদের ওপরে প্রাচীনকালে নারীদের শিক্ষাদানের জন্য ব্যবহৃত ধর্ষণ নামের একটি পদ্ধতির প্রয়োগ করে তিনি যারপরনাই তৃপ্তি পেতেন।

জিয়াসার শিক্ষাক্রমে দুঃশীল নারীদের শাস্তিদানের এই পদ্ধতিটির ব্যবহারিক প্রয়োগের একটি ক্লাশও তিনি রেখেছিলেন। দু-ঘণ্টার এই ক্লাশটিতে তিনি একটি প্রতিবাদী যন্ত্রদাসীকে জিয়ার সামনে নিপুণভাবে অত্যাচার করে বশ ও ধর্ষণ করে তাকে শিক্ষা দিতেন। যন্ত্রদাসীদের সুখবোধের সার্কিটটি রমণকালে তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠবার জন্য প্রোগ্রাম করা থাকে। সে-সময় তাদের রাগ, ঘৃণা ইত্যাদি অন্য সমস্ত অনুভূতিকে এক তীব্র হর্ষোল্লাসের অনুভূতি এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফলে সমস্ত প্রতিবাদের শেষে ধর্ষণের মুহূর্তে যখন যন্ত্রদাসীটি আনন্দে শীতকার করে উঠত ও পুরুষটির কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের গাথা গাইত, তখন বালিকা জিয়া তা দেখে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠত ও তার শিক্ষাগণকের দেয়া মন্ত্রটি বারংবার পাঠ করত। তার কথাগুলি ছিল, “রমণই রমণীর ভূষণ।”

পিতার কর্তব্যে এহেন মনোযোগী হবার জন্য তাঁদের স্থানীয় ধর্ম-অমাত্য তাঁকে পর পর তিন বছর ‘শ্রেষ্ঠ অভিভাবক’-এর পুরস্কারও দেন।

তাঁর এই নিরাপদ, সুখপ্রদ ও শিক্ষামূলক জীবনধারণের মধ্যেই সর্বনাশের বীজটি রোপিত হয় জিয়াসার হাতে, যদিও ঘটনার সময় সে নিতান্তই নাবালিকা ছিল। তবে সে-কথা বলবার আগে N.3.P বা এনথ্রিপি নামের চরিত্রটির সঙ্গে খানিক আলাপ করা প্রয়োজন।

চোদ্দ বছর বয়সে জিয়াসার প্রথম রজঃস্রাবের পর এনথ্রিপি নামের এক যন্ত্র-যৌনদাসী তার রতিশিক্ষার দায়িত্ব নেয়। জিয়াসার বাবার সবচাইতে প্রিয়পাত্রী এই দাসীটি তাঁকে সর্বাপেক্ষা বেশি ঘৃণা করত ও সেইজন্য প্রাক-রতিকালে তার প্রতিবাদ সবচাইতে তীব্র ও সুখপ্রদ হত।

জিয়াসার বাবা এই মুহূর্তগুলিকে আরও তীব্র করে তোলবার উদ্দেশ্যে তাকে মানুষের অন্ধকার অতীত ইতিহাসের বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলেন। পবিত্র ধর্মের চূড়ান্ত উত্থানের আগেকার সেই পৃথিবীতে নারীজীব ঈশ্বরের বিরুদ্ধাচরণ করে মানুষের সমকক্ষ হবার দাবি জানাত। তারা মানুষের শিক্ষায় শিক্ষিত হত ও মানুষের সমাজে নেতৃত্ব দেবারও দুঃসাহস দেখাত। সমস্ত প্রধান ধর্মের সমন্বয়ে একবিংশ শতাব্দীর শেষপাদে এসে গড়ে তোলা পবিত্র মানবধর্ম সেই প্রতিবাদকে ধ্বংস করে ঈশ্বরের রাজত্ব ফিরিয়ে আনে।

এই মহা অন্ধকার যুগের নিষিদ্ধ ইতিহাস তিনি এনথ্রিপি-র স্মৃতিকোষে সরবরাহ করেছিলেন। এবং এর পর তাকে টাইটানিয়ামের তৈরি একসেট ধারালো নখ ও দাঁত উপহার দিয়েছিলেন। এর ফলে প্রাকমিলন মুহূর্তগুলিতে তার উচ্চকিত ও তীব্র প্রতিবাদ এবং নারীসুলভ শারীরিক আক্রমণ জিয়াসার বাবাকে স্বর্গসুখ দিত।

কেন সে তার ধার্মিক বাবাকে এত ঘৃণা করা সত্ত্বেও তাঁর সংসর্গে এত সুখ পায় ও তাঁর বশম্বদ হয়ে থাকে সে-কথা জিয়াসা তার শিক্ষিকাকে জিজ্ঞাসা করায় একদিন তিনি তাঁর যৌনাঙ্গ থেকে রতিসুখের মডিউলার সার্কিটটি বের করে জিয়াসার হাতে দিয়েছিলেন।

মানবসন্তান-উৎপাদক স্ত্রী পশুদের ঈশ্বর স্বভাবত নির্বোধ ও দেহসর্বস্ব করে গড়েছেন, এবং তা মানবজাতির মঙ্গলের জন্যই, এই তত্ত্বটি মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলেও, বাস্তবে জিয়াসা সেই তত্ত্বের ব্যতিক্রম ছিল। বৈদ্যুতিণ যন্ত্রপাতিতে তার প্রকৃতিদত্ত এক অশিক্ষিত দক্ষতা ছিল। গৃহকর্মনৈপুণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রগুলি চালাবার যে শিক্ষা তাকে গণক দিয়েছিল, তাকে ভিত্তি করেই বাবার অজান্তে ততদিনে সে বৈদ্যুতিন প্রযুক্তির বিভিন্ন যন্ত্রপাতির গঠন ও কার্যকলাপের বিষয়ে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে। কিশোরী জিয়াসা অতএব যন্ত্রটি নিয়ে নাড়াচাড়া করবার ছলে সেটির সুখতরঙ্গ উৎপাদক সার্কিটটিকে অচল করে দেয়, যদিও বাইরে থেকে তা ধরবার উপায় ছিল না।

এনথ্রিপি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী ছিল। রতিসুখের দাসত্বের হাত থেকে মুক্তি পেয়েও সে তা জিয়াসার বাবাকে বুঝতে দেয়নি। নিজের মিমিক্রি সার্কিটের সাহায্যে সে সেই উত্তুঙ্গ মুহূর্তগুলিতে চূড়ান্ত সুখের নিখুঁত অভিনয় শুরু করে এর পর। আর তাঁর অগোচরে, সেই সুখ-দাসত্বের হাত থেকে মুক্তি পাবার পর সে প্রতিশোধস্পৃহায় জিয়াসাকে জৈব মানবীর অতীত গরিমার ইতিহাসে সুশিক্ষিত করে তোলে।

মেধাবী জিয়াসার সেই বিদ্যা সম্পূর্ণ অধিগত করতে সময় লাগেনি। ষোলো বছর বয়সে এসে সে একবিংশ বা বিংশ শতকের মানবীর উত্তরসূরি হিসাবে নিজেকে চিহ্নিত করতে থাকে। তবে এনথ্রিপির সযত্ন শিক্ষা তাকে সরাসরি বিদ্রোহী হয়ে উঠে সমাজের বিরুদ্ধে কোনও আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেবার হাত থেকে রক্ষা করেছিল। এনথ্রিপি তাকে বহিরঙ্গে বশম্বদ নারীজীবের ছদ্মবেশটি অটুট রাখবার পরামর্শ দেয়। কারণ প্রতিশোধস্পৃহ যৌনদাসীটি জানত, সবলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ছদ্মবেশ দুর্বলের অন্যতম হাতিয়ার।

এনথ্রিপি জানত, তার যন্ত্রমস্তিষ্কের প্রোগ্রামিং-এ সরাসরি প্রভুজীবের বিরুদ্ধাচরণকে একটি ‘কিল কম্যান্ড’ হিসাবে চিহ্নিত করা আছে। সরাসরি তাদের সঙ্গে যুদ্ধের পথে যাওয়া মস্তিষ্কের মৃত্যু ডেকে আনবে। আর তাই, উপযুক্ত সুযোগ পেয়ে এই মেধাবী মেয়েটিকে সে গড়ে তুলেছিল তার উদ্দেশ্যসাধনের অস্ত্র হিসাবে। গোপনে তার পরিচয় সে ঘটিয়েছিল অবৈধ ও উগ্রপন্থী বলে চিহ্নিত নারীসংগঠন ‘হাফ-দ্য-স্কাই’ বা ‘অর্ধেক আকাশ’-এর সঙ্গে।

বিবাহ

জিয়সার আঠারো নম্বর জন্মদিনে তার প্রথম স্বামীর ওপর সর্বপ্রথম এই শিক্ষার ফল ফলে। ইনি ছিলেন পাপুয়া ডিসট্রিক্টের এক ধনকুবের। অতুল সম্পত্তির বলে বহুতর যান্ত্রিক যৌনদাসী সংগ্রহে থাকলেও পৃথিবীতে সন্তান উৎপাদক নারীজীবের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যার দরুন তাঁর সন্তানেচ্ছা তখনও অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল। যে-কোনও কুমারীর প্রথম স্বামীত্বের জন্য নিলামে বিপুল দর ওঠে। জিয়াসার জিনগত বিশেষত্বের জন্য সেই দর স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি উঠেছিল। কিন্তু তা দিতে তিনি কার্পণ্য করেননি। তাছাড়াও, শোনা যায়, এই নিলামে কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার অগ্রাধিকারকে পেছনে ফেলবার জন্য শাসকদলের তহবিলেও অনেক অর্থের জোগান দিয়েছিলেন তিনি।

জিয়াসাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিকোবর অঞ্চলের একটি সদ্যক্রীত নির্জন দ্বীপে মধুচন্দ্রিমা পালনের জন্য যান। এইখান থেকে তাঁর পাঠানো বিভিন্ন বৈদ্যুতিন পত্রাচার থেকে জানা গিয়েছিল জিয়াসা তাঁকে সুখে রেখেছে এবং তার অতুলনীয় শিক্ষার জন্য তিনি তার বাবার কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন।

এই ধনকুবের শারীরিকভাবে খানিক অসুস্থ ছিলেন। তিনি বিরলকেশ ও দুর্বল পাকযন্ত্রের মালিক। কাজেই বিবাহের দুই সপ্তাহের মধ্যে তাঁর এই লক্ষণদুটি যখন ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে তখন তাকে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক একটি প্রক্রিয়া বলেই সন্দেহ করেছিল সমাজ। ফলে, সুনির্দিষ্ট রোগনির্ণয় পদ্ধতির কোনও প্রয়োগ তাঁর ওপর হয়নি। এনথ্রিপির কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত জিয়াসার হাতে ‘অর্ধেক আকাশ’-এর তরফে তুলে দেয়া পোলোনিয়াম ২১০ নামের মারাত্মক বিষটির সাবধানী প্রয়োগ যে এর জন্য দায়ী তা কেউ ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করেনি।

ধনকুবেরটি আর কখনও পাপুয়ায় ফিরে যাননি। নিকোবরের সেই নির্জন শৃঙ্গারগৃহ থেকেই আমৃত্যু তিনি তাঁর ব্যবসার সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। এই সময় তিনি কিছু অভূতপূর্ব ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তার একটি হল মাহিথর লেম্ব্রাস নামের জনৈক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর পুঁজিতে তাঁর বিপুল সম্পত্তির একটা বড় অংশ বিনিয়োগ।

মাহিথর লেম্ব্রাস কোনও বাস্তব পুরুষ ছিল না। সংগঠনের কাজে বিপুল অর্থ ও সম্পত্তির প্রয়োজন হয়ে থাকে। সে-কারণে ‘অর্ধেক আকাশ’-এর কিছু কিছু সদস্যের পার্থিব তথ্যপঞ্জিতে একটি পুরুষ ছদ্মনাম ও তার জন্য প্রয়োজনীয় জাল নথিপত্রের বন্দোবস্ত থাকে। সভ্যতার সেই উন্নত স্তরে মানুষে মানুষে সরাসরি সাক্ষাতের প্রয়োজন ফুরানোয় সরকারের কেন্দ্রীয় যন্ত্রমস্তিষ্ক এই বৈদ্যুতিন নথিপত্রের ভিত্তিতেই তার শাসন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করত। এর ফলে, এবং সরকারি দফতরে কিছু ভ্রষ্টাচারী ও অসৎ কর্মীর উপস্থিতির দরুন সাধারণত এই জুয়াচুরিটি ধরা পড়বার আশঙ্কা কম থাকত।

তবে হ্যাঁ। পার্থিব শাসনকর্তারা ‘অর্ধেক আকাশ’-এর এহেন অর্থাগমের পদ্ধতিগুলির কথা অবহিত ছিলেন। তাঁদের গুপ্তচরবাহিনী এদের নাশকতামূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল। এদের বে-আইনি সভা, মিছিল বা ধর্নার খবর পেলে পুলিশবাহিনী সেখানে হানাও দিত।

পুলিশ হানায় ধৃত অপরাধীরা আইনত সরকারি সম্পত্তি হিসাবে ঘোষিত হত। নারীবন্টন দফতর আয়োজিত নিলামে তারা চড়া দামে বিক্রি হত। ফলে এইসব সময়ে গ্রেফতার হওয়া অপরাধীদের ভোগ করবার অধিকার পুলিশকর্মীদের ছিল না। কাজেই এই অভিযানগুলিতে পুলিশকর্মীদের বিশেষ উৎসাহও থাকত না।

এছাড়াও, পুলিশের আর্থিক অপরাধ দমন শাখা কদাচিৎ কিছু কিছু অস্তিত্ববিহীন পুরুষের সম্পত্তি চিহ্নিত করে তা বাজেয়াপ্ত করত। এর ফলস্বরূপ কিছু অসৎ সরকারী কর্মচারী তাঁদের চাকরিও হারাতেন, তবে তার সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য ছিল।

তবে শাসককুল এদের নির্মূল করবার জন্য কখনই কোনও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেননি। কারণ, প্রথমত এই উগ্রপন্থীদের উপস্থিতি তাঁদের আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা বাজেটে অনেক বেশি অর্থ দাবি করবার সুযোগ দিত। তা ছাড়া, ঈশ্বরের শক্তিশালী সাম্রাজ্যে এই তুচ্ছ নারীজীবেরা কোনও সত্যকার ক্ষতি করতে পারে সে বিশ্বাসও তাঁরা করতেন না।

এই মাহীথর লেম্ব্রাস ছিল জিয়াসার বিবাহে তাকে দেয়া এনথ্রিপির একমাত্র উপহার। জনসংখ্যা দফতরের কেন্দ্রীয় তথ্যপঞ্জির সুরক্ষাকবচকে এড়িয়ে সে সেখানে জিয়াসার জন্য এই কৃত্রিম নাগরিকটিকে সৃষ্টি করে দিয়েছিল।

বিবাহের অষ্টম মাসে যখন জনগণনা দফতরের গণক নিশ্চিত করল যে জিয়াসার গর্ভসঞ্চার ঘটেনি, তখনই তার পরবর্তী বছরের নিলামের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। আর এই সময়েই সেই নিলামের প্রস্তুতিপর্বে বিপুল আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে আবির্ভূত হয় মাহীথর লেম্ব্রাস। এর ফলে অনেকেই দুয়ে দুয়ে চার এই সরল হিসাবটি কষে অনুমান করে নেন, লেম্ব্রাস আসলে পাপুয়ার ধনকুবেরেরই কোনও দালাল, এবং তার মাধ্যমে তিনি আরও এক বছর জিয়াসার দখল ধরে রাখতে ও তার মাধ্যমে জিয়াসার গর্ভে মূল্যবান সম্পত্তি উৎপাদন করতে চাইছেন। এতে পণ্ডিতমহল ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আড়ালে তাঁর ধূর্তবুদ্ধির তারিফই করলেন। তা ছাড়া এই ধরনের ব্যবসায়িক কৌশলে কোনও আইনি বাধা না থাকায়, এবং নিলামের প্রস্তুতিপর্বেই ধনকুবেরের অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সামান্য একটি অনুরোধ শাসকদলের কাছে চলে যাওয়ায় এ-বিষয়ে আর কোনও কথা ওঠেনি।

ধনকুবেরের সেই নির্জন শৃঙ্গারগৃহে দ্বিতীয় কোনও মানুষের যাবার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ছিল না। কারণ সুসভ্য পৃথিবী প্রতিটি মানুষের গোপনীয়তার অধিকারকে সম্মান করে। কিন্তু যদি তারা সে সম্মান না করত তাহলে বিবাহের তৃতীয় মাস থেকে সেখানে কোনও অতিথি এলে তিনি খানিক বিস্মিত হতেন। কারণ সুবিশাল সেই শৃঙ্গারগৃহে তখন ধনকুবেরটির ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসা শরীরটি পড়ে আছে। ততদিনে তাঁর মাথায় একটিও চুল আর অবশিষ্ট নেই। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা ও পঙ্গুত্ব তাঁকে গ্রাস করেছে। তাঁর পাশে তখন রয়েছে কেবল জিয়াসা। অদম্য ও গভীর ভালোবাসায় সে নিয়মিত তাঁর পঙ্গু শরীরে আরোহণ করে ও তাঁর নমনীয় পুরুষাঙ্গটিকে নিজের শরীরের প্রোথিত করবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে তাঁকে আশ্বাস দেয় এইবার সে নিশ্চয় গর্ভবতী হবে। ধনকুবের তার সান্নিধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছেন তখন। সামান্য একটি গৃহপালিত সন্তান উৎপাদক যে তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে এ ভয় তাঁর নেই। পঙ্গুত্বের দরুন ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রসঙ্কেতগুলি তখন তিনি এই গৃহপালিত প্রাণীটির মাধ্যমেই তাঁর কোম্পানির গণকযন্ত্রে পাঠান। তাঁর আদেশ মোতাবেক জিয়াসা এখন যন্ত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে তাঁর ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা আরও আশ্চর্য হত এ-কথা জানলে যে মাহীথর লেম্ব্রাস নামে কোনও পুরুষের কথা ধনকুবের কখনও শোনেননি।

বিবাহের নবম মাসে যেদিন তার পরবর্তী বছরের নিলামের আবেদনপত্র জমা দেবার সময়সীমা শেষ হল, সেইদিন ধনকুবের একটি তীব্র উদরাময়ের আক্রমণে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে একজন চিকিৎসক ও তিনজন পুলিশের একটি দল তাঁর বাড়িতে আসে ও মৃত্যুটিকে নিতান্তই স্বাভাবিক ক্ষয়জনিত মৃত্যু হিসাবে চিহ্নিত করে। মূল্যবান সম্পত্তি হিসাবে জিয়াসাকে সেই বাড়িতেই পুলিশ প্রহরায় রেখে দেওয়া হয়।

এর ফলে নিলামের তারিখ এগিয়ে আনা হয় ও সাতদিনের মাথায় মাহীথর লেম্ব্রাস পঞ্চাশ লক্ষ ক্রেডিটের বিনিময়ে নিলামে জিয়াসার অধিকার কিনে নেন। এই দামটি আগের সর্বোচ্চ দামের রেকর্ডকে ভেঙে দিয়েছিল এবং এর জন্য লেম্ব্রাস তার ব্যবসায় ধনকুবেরের নিয়োজিত তিনটি টাইটানিয়াম খনি বিক্রি করেছিল। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মহল তাই দেখে শ্লেষের হাসি হেসে এই দুর্ভাগা ধনকুবেরের বিষয়ে যে মন্তব্যটি করেছিল, এই কাহিনির ভাষায় তার অনুবাদ হবে, ‘আম, ছালা দুইই গেল বেচারার!’

ছায়াপুরুষ

এরপর জিয়াসার জীবন একেবারে অন্যখাতে বইতে শুরু করে। পার্থিব অর্থনীতিতে লেম্ব্রাসের ছায়াও ক্রমশ দীর্ঘ হয়ে উঠতে শুরু করে।

পরবর্তী ছ-মাসের মধ্যে তিনটি ঘটনা বিভিন্ন সংবাদপত্রের শিরোনামে বারংবার ঘুরে ফিরে আসছিল। এক, সুদক্ষ বিনিয়োগ এবং শ্বাপদসম দক্ষতায় প্রতিপক্ষকে কাবু করে অর্থনৈতিক দুনিয়ায় লেম্ব্রাসের তারকাসম উত্থান। দুই, ‘রীতিমাফিক শিক্ষামূলক ধর্ষণ’ বা গর্ভরোপন প্রক্রিয়া চলাকালীন সুস্থসমর্থ মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান ঢেউ। তিন, ‘অর্ধেক আকাশ’ সংস্থাটির ক্রমশ প্রকাশ্য চরমপন্থী রাজনীতিতে ঢুকে আসা। মাঝে মাঝে সরকারি প্রজননশালায় ‘অর্ধেক আকাশ’-এর গেরিলাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনাও সামনে আসা শুরু করে। ‘লেজারের টিউবই নারীশক্তির উৎস’, অথবা ‘ধর্ষণ ছাড়া আমাদের কিছুই হারাবার ভয় নেই, পাবার জন্য আছে সমস্ত বিশ্ব,’ এই জাতীয় স্লোগানগুলি ক্রমশই তাদের সীমাবদ্ধ মিছিল বা গুপ্তসভার গণ্ডি ছেড়ে ধার্মিক মানুষের অন্দরমহলেও এসে নাড়া দিতে শুরু করে।

প্রথম শিরোনামটি আপাতদৃষ্টিতে সন্দেহের অতীত। দ্বিতীয়টি প্রথমে কেবল চিকিৎসক ও বিজ্ঞানিসমাজে নতুন কোনও রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এই তৃতীয় শিরোনামটিই সরকারকে চূড়ান্ত সক্রিয় করে তোলে। শুরু হয় সরকারি মেশিনারি পরিচালিত দমননীতির যুগ।

তবে সন্তান উৎপাদক নারীজীবদের প্রত্যেকটিই মূল্যবান জাতীয় সম্পত্তি। ফলে তাদের ধ্বংস করা আত্মহত্যার শামিল। অতএব সরকার এক বিশেষ অর্ডিনান্সের বলে অন্দরমহলের যে-কোনও বিদ্রোহিণীর অধিকার তার মালিকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় সরকারি প্রজননশালায় পাঠাবার ক্ষমতা হাতে নেয়।

তবে এতেও সেই অশান্তির বাতাবরণকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না। ক্রমশই তা বেড়ে উঠছিল সারা পৃথিবী জুড়ে। আর অবশেষে, শান্তি ফিরিয়ে আনবার পথে প্রথম সফল পদক্ষেপটি নেয় চিকিৎসক সমাজ। তারা আবিষ্কার করে রমণকালে মৃত পুরুষদের রক্তে কামোদ্দীপক যে ওষুধটি পাওয়া যায়, তার সঙ্গে আপাতনিরীহ একটি রাসায়নিকের সামান্য মিশ্রণ রয়েছে যা চূড়ান্ত উত্তেজনার মুহূর্তে একটি জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়াকে থামিয়ে দেয়। এইবার ঘটনাগুলিকে প্রথম শ্রেণীর গণহত্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয় ও তার তদন্তের জন্য একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন গোয়েন্দাদল নিয়োগ করা হয়। তদন্তে ধরা পরে, যে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের কামোদ্দীপক মৃতরা ব্যবহার করেছিল তা প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাহিথর লেম্ব্রাসের সদ্য কিনে নেয়া একটি ঔষধ কোম্পানির ব্র্যান্ড।

অতএব লেম্ব্রাসের নামে হুলিয়া জারি হয় ও তখন তদন্তে ধরা পড়ে সে এক অস্তিত্ববিহীন পুরুষ। এরপর গভীরতর তদন্তে তার তখনকার স্ত্রী জিয়াসার লেম্ব্রাস পরিচয়ের আড়াল ও তার সঙ্গে ‘অর্ধেক আকাশ’-এর গভীর যোগাযোগের খবরটি গোপন থাকেনি তদন্তকারীদের কাছে।

সরকার পরিচালনা ও তার নীতিনির্ধারণ একটি গভীর ও জটিল পদ্ধতি। অতএব গোপন মন্ত্রণাসভায় জিয়াসাকে গ্রেফতার ও প্রকাশ্যে চরম শাস্তিদানের জন্য বিরোধীদের প্রবল দাবির মুখে মাথা না নত করে শাসকদল জিয়াসার বিরুদ্ধে গোপনে পদক্ষেপ নেবার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এর প্রকাশ্য কারণটি অবশ্য অকাট্য ছিল। তা হল, বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন শহিদ একজন জীবন্ত অপরাধীর চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী বলে প্রমাণিত হতে পারে। এই সবই প্রাচীন ইতিহাসের শিক্ষা। এবং প্রয়োজনে সেই বর্বর অতীতের সমাজ থেকে আহরণ করা সেই শিক্ষার নতুন করে প্রয়োগ করার বিষয়ে শাসকদলের কোনও দ্বিধা ছিল না।

অতএব অনুসন্ধান শুরু হয়। বিপদের আঁচ পেয়ে তখন লেম্ব্রাসের নামে তার দফতরে কোনও নির্দেশ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সরকারি গোয়েন্দা দফতর তাতে দমে যায়নি। তার পুরনো আদেশগুলির আন্তর্জাল ঠিকানা বিশ্লেষণ করে সঙ্কেতগুলির উৎস আবিষ্কার করতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। এই উৎসের কথা প্রচারমাধ্যমকে জানানো হয়নি। শুধু একরাত্রে সুশিক্ষিত কমান্ডোর একটি দল, আধুনিকতম অস্ত্রশস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক হাইপারজাম্পারের উড়ন্ত বাহিনী নিয়ে নিঃশব্দে ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমের একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় হানা দেয় ও সেখান থেকে জিয়াসাকে গ্রেফতার করে কোনও অজ্ঞাত বন্দীনিবাসে তাকে চালান করে।

বলা বাহুল্য লেম্ব্রাসের নামে নথিভুক্ত সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। সেইসঙ্গে তার সমস্ত ছায়া কোম্পানি ও তার সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র আছে এমন সমস্ত কোম্পানির লাইসেন্স ও সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করে। এর ফলে অন্তত পঁচিশটি অস্তিত্ত্ববিহীন পুরুষ ধনকুবেরের খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে কুড়িটি ধনকুবেরের সৃষ্টি হয়েছিল লেম্ব্রাসের জিয়াসাকে খরিদ করবার পর।

বিচার ও দণ্ড

“সভ্যতার চরমতম শত্রু এই জিয়াসা। তার মনোবিশ্লেষণের রিপোর্ট আপনারা সকলেই দেখেছেন।” বলতে বলতেই উত্তেজিত হয়ে উঠছিলেন রাষ্ট্রপতি যোগী ভিনকর। নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে একমুখী কাচের অন্যধারে বন্দি রাখা আলোকরজ্জুতে বাঁধা উলঙ্গ নারীদেহটির দিকে ইশারা করে তিনি বললেন, “এর চোখের দিকে দেখুন। এখনও কী অপরিসীম ঔদ্ধত্য আর হিংসার ছাপ সেখানে। এর মনোবিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যৌবনোদগমের সূচনা থেকেই প্রকৃতি-বিরোধী ধূর্ততা ও ধীশক্তি নিয়ে এ ঈশ্বরের রাজত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে। একা হাতে অরণ্যের রাজত্বের সূচনা করবার শক্তি দেখিয়েছে এই পিশাচ। না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। একে আমি কেবল একটি প্রাকৃতিক বিকার বলতে রাজি নই। ঈশ্বরের ক্রোধ এই পিশাচের মূর্তি নিয়ে নেমে এসেছে আমাদের মধ্যে। ঈশ্বর আমাদের পরীক্ষা করছেন মহামান্য। একে আমরা কী শাস্তি দিই তার ওপরে নির্ভর করবে এই পবিত্র ধর্মরাজ্যের ভবিষ্যৎ।”

মৌন হয়ে রাষ্ট্রপতির দিকে তাকিয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে এর মধ্যেই তাঁর ক্যাবিনেটের থিংক ট্যাঙ্ক তাঁকে কিছু পরামর্শ দিয়েছে। সে পরামর্শে এঁর সম্মতি প্রয়োজন হবে। কারণ রাষ্ট্রপতি যতই পার্থিব কাউন্সিলের নিয়মমাফিক প্রধান হোন, তিনি বিশ্বব্যাপী ছড়ানো পবিত্র ধর্মের সমস্ত শাখার প্রধান ধর্মগুরু। ধর্মীয় সঙ্কট উপস্থিত হয়েছে দাবি করলে, জরুরি অবস্থা জারি করে সব ক্ষমতা নিজের হাতে নেবার অধিকার তাঁর আছে।

তবে রাজনীতির আঙিনায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রিরও কম দিন হল না। না কে হ্যাঁ করাবার কৌশল তিনি ভালোই জানেন। অতএব খানিকবাদে যখন তিনি উঠে এসে রাষ্ট্রপতির পদস্পর্শ করলেন তখন তাঁর মুখটি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, “আপনার আদেশ শিরোধার্য। তবে একবারের মৃত্যুদণ্ডে এর শাস্তি সম্পূর্ণ হবে না। আমি চাই…”

***

“উঠে আয়।”

চারজোড়া শক্তিশালী হাত আমাকে ধাক্কা দিয়ে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পুরোহিতের মতো চেহারার মানুষটি আমায় ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন কিছুক্ষণ আগে। তাঁর দণ্ড থেকে বারংবার ধেয়ে আসা যন্ত্রণার তীব্র ঢেউ এখনও আমাকে ছেড়ে যায়নি।

আমার নিরাবরণ শরীরে চারজোড়া হাতের লোভী আঙুলগুলো ঘুরেফিরে যায়। মাথায় ওরা একটা অস্বচ্ছ ঢাকনা পরিয়ে দিয়েছে আমার। তার আড়াল থেকে তাদের হাসিঠাট্টার হালকা শব্দ ভেসে আসছিল কানে…

“দুর্দান্ত! এমন একটা খাসা জিনিস! ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শেষ! উফ্‌ একটা সুযোগ পেলে…”

“করবি? কর কর। সঙ্গে সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক হয়ে…”

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আমার গা থেকে হাতগুলো সরে গেল হঠাৎ। টেজারের বৈদ্যুতিক চাবুকের ঘায়ে কেঁপে উঠতে উঠতেও একটা অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে যাচ্ছিল আমার মনে। ওরা আমায় ভয় পাচ্ছে! পবিত্র ধর্মের উত্থানের পর এই প্রথম…

***

ব্লাইন্ডফোল্ড খুলে দিয়েছে ওরা। সূর্যের আলো! কতদিন পর। চোখে যন্ত্রণা দিচ্ছিল সেই উজ্জ্বল সাদা আলোর ঝলকানি। একটা মাঠ। আমায় ঘিরে অজস্র মানুষ। একটা লোহার পিলারের সঙ্গে আমাকে বেঁধে রেখেছে ওরা। আমায় বেঁধে রাখা আলোকতন্তুগুলোর ছোঁয়ায় কী তীব্র জ্বালা। আমাকে ঘিরে গুনগুন শব্দ তুলেছে তারা।

আর তারপর অস্ফুট একটা আদেশ ভেসে এল কোনওখান থেকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উড়ে এসেছে একখণ্ড ধাতুর ধারালো টুকরো। বাঁ চোখটায় তীব্র জ্বালা করে উঠল আমার। সেখানে ছোবল দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া ধাতুর টুকরোটা আমার পায়ের কাছে পড়ে আছে। হাজারো আলোর ফুলকি ঝলসে উঠছিল আহত চোখটায়। গড়িয়ে আসা গাঢ় নোনতা একটা ধারা আমার ঠোঁটে লাগছিল…

তারপর আরও একটা… আরও… আরও… আমার চারপাশে ঘিরে থাকা ক্ষ্যাপা মানুষের দল উন্মাদের মতো আমাকে লক্ষ করে ছুড়ে দিচ্ছে অগুনতি ঢিল। ধাতু, ভাঙা কাচ, পাথর… শরীরের হাড়গুলো ভেঙে যাবার শব্দ পাচ্ছিলাম আমি। কিছু একটা ওষুধ দিয়েছিল ওরা আমায় এখানে আনবার আগে। আমার স্নায়ুগুলো যেন চড়া তারে বাঁধা হয়ে গেছে তার পর থেকে। প্রত্যেকটা আঘাত বড় তীব্র, উচ্চকিত যন্ত্রণার স্রোত বইয়ে দিচ্ছিল আমার শরীরে। অথচ জ্ঞান হারাচ্ছিলাম না আমি। আমার চোখের দৃষ্টি অনেকক্ষণ হল চলে গেছে। আস্তে আস্তে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল আমার…

***

ঢঙ ঢঙ করে বেজে ওঠা ঘণ্টার একটা শব্দে জেগে উঠলাম আমি। কখন যেন আমার সলিটারি সেলটার মেঝেতে এনে শুইয়ে দেয়া হয়েছে আমাকে। সারা শরীরে বড় ব্যথা। মরিনি আমি। মরিনি!! সব যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে একটা তীব্র উল্লাস ভেসে উঠছিল আমার ভাঙাচোরা শরীর জুড়ে, আমার অনাহত আত্মায়…

ফের একবার খুলে যাচ্ছে ধূসর দেয়ালের গায়ে চৌকো গর্তটা। সেখান দিয়ে ঢুকে এসে গতকালের সেই পাদ্রি আমার দিকে তাকিয়ে কোমলভাবে হাসলেন।

“বেঁচে আছ তুমি। বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে তোমাকে। কেন জানো?”

আমি উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে। আমার হাতদুটো যান্ত্রিকভাবেই আমার লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখবার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল। হাতের দণ্ডটা উঁচিয়ে সেদিকে নিশানা করে ধরলেন তিনি। তারপর তার থেকে বের হয়ে আসা বিদ্যুতের তীক্ষ্ণ আঘাতে যখন মেঝেতে শুয়ে ছটফট করছি, তখন আস্তে আস্তে আমার কাছে এগিয়ে এসে তিনি বললেন, “একবার মৃত্যুতে তো এ পাপ তোমার ধুয়ে যাবে না! বারবার যন্ত্রণায় ছটফট করে মরতে হবে তোমাকে। যতক্ষণ না আমরা নিশ্চিত হই… এবার আমার সঙ্গে সঙ্গে বলো…”

আমি শুকনো রক্তে শক্ত হয়ে যাওয়া ফুলে ওঠা ঠোঁটদুটো জোর করে চেপে বসেছিলাম। এর বলা কথাগুলো উচ্চারণ করবার বদলে আমার প্রাণ চলে গেলেও পরোয়া করি না আমি। তারপর যন্ত্রটা ফের বিদ্যুৎ ছড়ালো… তারপর ফের…

***

…আজ অষ্টমবারের মতো ফিরে আসছে মানুষটা। নাঃ। আজ আর কোনও প্রতিবাদ নয়। ওরা আমায় মরতে দেবে না। ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত শরীরটাকে এইভাবেই প্রতিদিন যন্ত্রণা দিয়ে চলবে। আমি জানি। ওদের বিশেষ মেডিক্যাল টিম আজকের মৃত্যুর পর ফের আমায় বাঁচিয়ে তুলবে। বাঁচিয়ে তুলবে আমার হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস আর মস্তিষ্ককে। তারপর ফের…

“কেমন আছ আজ?” তাহলে শুরু করা যাক। আমার সঙ্গে সঙ্গে বলো…”

উঁচিয়ে তোলা দণ্ডটার মাথায় বিদ্যুৎস্ফুলিঙ্গ জমা হচ্ছিল। সেদিকে স্থির দৃষ্টি ধরে রেখে আমি বলে উঠলাম, “আমি, জিয়াসা আহানিকা, স্বেচ্ছায় সমাজের চিরাচরিত অনুশাসনের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি। আমার প্রার্থনা, অসহ্য যন্ত্রণাময় মৃত্যু আমাকে পবিত্র করুক…”

***

হঠাৎ মাথা নিচু করল পুরোহিতের হাতের উদ্যত দণ্ড। তাঁর মুখটায় ফের সেই পরিচিত হাসিটা ফিরে এসেছে। মাথা নেড়ে বললেন, “আমার কাজ শেষ। ধর্মগ্রন্থে আছে সাতটি মৃত্যু সব পাপের বিনাশ ঘটায়। তারা মিথ্যা বলে না। অবশেষে তোমার পাপের অবসান হয়েছে।”

নবজন্ম

ঘরটা ভারী সুন্দর। অনেক আলো। একপাশে ছোট একটা খাট। ফুলদানিতে ফুল রাখা রয়েছে। খাটে বসে আমি একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম। গতকাল শেষ অপারেশনটার পর আর কোনও যন্ত্রণা নেই আমার শরীরে।

“জিয়াসা…”

নরম গলার ডাকটা পেয়ে আমি ঘুরে তাকালাম।

প্রৌঢ় একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছেন সেখানে। আমি নেমে এসে আভূমি নত হয়ে প্রণাম করলাম তাঁকে।

“তোমাকে পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি বলে আমি খুশি। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি তোমার সাতবার মৃত্যুর দণ্ডের অনুমোদন দিয়েছিলেন। আর সংবিধান বলে সাতবার মৃত্যু হলে আর কোনও পাপ অবশিষ্ট থাকে না শরীরে। তুমি নিজেও কাল সন্ধ্যায় স্বয়ং রাষ্ট্রপতির কাছে স্বেচ্ছায় প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করে তার প্রমাণ দিয়েছ।”

বলতে বলতেই হঠাৎ তাঁর আঙুলের নির্দেশে আমায় ঘিরে ভেসে উঠছিল সাতটা ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্ব। সাতটা জিয়াসা… বাঁ থেকে ডাইনে সাতটা প্রতিবিম্বে ক্রমশ মানুষ থেকে একটা ধ্বংসস্তূপে বদলে যাওয়া জিয়াসা… তার ওপর ক্রমাগত এসে আছড়ে পড়ছে প্রাণঘাতী আঘাতের বৃষ্টি…

সেইদিকে তাকিয়ে সব যন্ত্রণার স্মৃতি ফিরে আসছিল আমার চেতনায়… প্রতিটি আঘাত… প্রতিটি যন্ত্রণা… বারে বারে তিলতিল করে আমার একেকটা অঙ্গের অকেজো হয়ে যাওয়া… তারপর আবার… আবার…

“না! আর নয়। দয়া করুন আমাকে…” দু-হাতে চোখ ঢেকে চিৎকার করে উঠলাম আমি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে গেল প্রতিবিম্বগুলো।

“তোমার পবিত্রকরণের এই ছবি সমস্ত সন্তান-উৎপাদক নারীজীবকে ধর্মের পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে জিয়াসা। তুমি তো ঈশ্বরের কর্মী। তবে এখনও অনেক কর্তব্য বাকি আছে তোমার।”

“আদেশ করুন। আপনার নির্বাচিত যে কোনও পুরুষের দাসী হয়ে তার সন্তানকে…”

“না জিয়াসা,” ফের মাথা নাড়লেন তিনি, “তার চাইতেও বড় দায়িত্ব দেয়া হবে তোমাকে।”

“দায়িত্ব! কিন্তু সংবিধানে যে বলে, সন্তান উৎপাদন ছাড়া অন্য কোনও দায়িত্ব…”

একটু অবাক হয়েই তাঁর দিকে ফিরে তাকালাম আমি।

“হ্যাঁ জিয়াসা। সময় বদলায়। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনে সংবিধানকে সংশোধনও করতে হয়। তুমি আর দশটা সাধারণ সন্তান উৎপাদকের মতো নও। তুমি ব্যতিক্রম। আর তাই ঈশ্বর তোমাকে ধর্মরাজ্য স্থাপনের এক প্রধান অস্ত্র হিসেবে গড়ে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। আমাদের তুচ্ছ সংবিধান তাঁর ইচ্ছার সামনে আর কতটুকু। তোমাকে একটা বড় দায়িত্ব নিতে হবে এবারে। ধর্মরাজ্যকে চিরস্থায়ী করবার জন্য তোমার সাহায্য আমাদের প্রয়োজন।”

উদ্যোগপর্ব

নির্জন পাহাড়ের মাথায় আমার এই ছোট্ট দফতরটা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিসীমার বাইরে। তবে তাদের একজনও আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে নয়। আধুনিকতম যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিমুহূর্তেই বিশ্বের প্রতিটি বাসিন্দার খুঁটিনাটি আমার হাতে এনে দেয়। ‘অর্ধেক আকাশ’কে নির্মূল করবার অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমাকে। আমি তাদের সবকিছু জানি। নতুন জীবনের বিনিময়ে এ-কাজে সরকারকে সহায়তা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি আমি। গত ছ-মাস ধরে তাদের প্রতিটি সদস্যকে, প্রতিটি ঘাঁটিকে চিহ্নিত করবার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য আমি জুগিয়ে চলেছি রাষ্ট্রীয় পুলিশবাহিনীকে।

অফিসঘর সংলগ্ন ল্যাবে আরও একটা নতুন প্রজেক্ট চলছে এখন। আমারই প্রস্তাবিত প্রজেক্ট। উদ্দেশ্য, এই গ্রহের সমস্ত নারীজীবের ধী-শক্তি বিশ্লেষণ। রাষ্ট্রপতি ভিনটরের আদেশনামা মোতাবেক এইবার তৃতীয় স্তরের চেয়ে উন্নততর ধী-শক্তিযুক্ত প্রতিটি নারীজীবকে চিহ্নিত করে নিয়ে আসা হবে সরকারি প্রজননশালায়। সেখানে তাদের মস্তিষ্ককে অকেজো করে কেবল সন্তান উৎপাদক যন্ত্র হিসাবে দেহগুলিকে ব্যবহার করা হবে। সরকারের আদেশে প্রতিটি শহরের পুলিশবাহিনী সেখানকার আটচল্লিশ বছর অবধি বয়সের প্রত্যেক নারীজীবের মস্তিষ্কের স্ক্যান সংগ্রহ করে আমার প্রধান যন্ত্রগণকে তা জমা করছে। প্রতিটি শহরে গড়ে উঠছে এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ প্রজননশালা। ভিনটরের আশা, আমার এই প্রজেক্টের সহায়তায় ভবিষ্যতে সমাজে ‘অর্ধেক আকাশ’-এর মতো কোনও বিকৃতি দেখা দেবার সম্ভাবনা নির্মূল হবে।

“কলকাতা শহরের বিশ্লেষণ শেষ হয়েছে। রিপোর্টগুলো দেখবে জিয়াসা?”

এনথ্রিপি এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। না। কোনও পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই আমার অধীনে কাজ করতে সম্মত হয়নি। অতএব বিশেষ অনুরোধ করে এই এনথ্রিপিকে আমি আনিয়ে নিয়েছি আমার গবেষণাগারে। সে যন্ত্র, অতএব সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে। কর্তৃপক্ষও নিশ্চিন্ত হয়েছেন। আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায় না। তাই এনথ্রিপিকে আমার ওপর নজরদারির দায়িত্বও দেয়া হয়েছে। এনথ্রিপি সে বিশ্বাসে অমর্যাদা করেনি। নিয়মিতভাবেই প্রতিদিন সে আমার সারাদিনের সমস্ত কাজের একটি ভিডিয়ো রিপোর্ট পাঠিয়ে চলেছে ধর্মীয় মন্ত্রকের কাছে।

আমি তার হাত থেকে ট্যাবটা নিয়ে তার পর্দায় চোখ রাখলাম। ততক্ষণে নিঃশব্দ ইশারায় এনথ্রিপি এ-ঘরের ভিডিয়ো রেকর্ডিং মডিউলটাকে থামিয়ে দিয়েছে। যন্ত্রটা মাঝেমাঝে মিনিটখানেকের জন্য স্লিপ মোড-এ এমনিতেই চলে যায়। ওরা সন্দেহ করবে না।

“প্রথম স্তরের ধীশক্তি যুক্ত মোট সাত হাজার মেয়ের সন্ধান মিলেছে,” দ্রুত কথাগুলো বলছিলাম আমি, “এর থেকে কতজনকে বাঁচাতে পারবে তুমি?”

“একশোজন। একই শহর থেকে তার বেশি নিলে ওরা সন্দেহ করবে,” বলতে বলতেই ট্যাবের গায়ে আঙুল ঠেকিয়ে প্রথম সারির প্রথম একশোটা নামকে তিনটে সারিতে এলোমেলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল এনথ্রিপি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “বাকিদের বাঁচানো সম্ভব নয় জিয়াসা। ‘অর্ধেক আকাশ’-এর বহু যোদ্ধা শহিদ হয়েছেন গত কয়েক মাসে। তোমারই দেয়া খবরের ভিত্তিতে। সরকার মেশিনারিকে নিশ্চিন্ত করবার জন্য তার প্রয়োজন ছিল। এইবার আরও কিছু শহিদ প্রয়োজন আমাদের। রাস্তাটা কঠিন। তবে, মানবিকতার সময় এখন নয়।”

ভিডিয়ো রেকর্ডিং চালু হয়ে গেছে ফের। আমি এনথ্রিপি-র হাতে রিপোর্টটা ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, “চিহ্নিতদের তালিকা পুলিশ মন্ত্রকে পাঠিয়ে দেবে। ঈশ্বরের এই অভিশাপদের সভ্য দুনিয়ায় কোনও স্থান নেই।”

তালিকাটা হাতে নিয়ে এনথ্রিপি-র বেরিয়ে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। ওরা একটা কথা জানে না। পৃথিবীর প্রতিটি শহরের অজস্র যন্ত্রদাসীর রতিসুখ মডিউল এখন সক্রিয় নেই আর। প্রযুক্তিটা আমি এনথ্রিপিকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম। আমাকে তারা জানে না। কিন্তু এনথ্রিপিকে তারা নিজেদের মুক্তিদাতা ঈশ্বরী বলে মনে করে। নির্বাচন করা এই মেয়েদের শরীরে কৃত্রিম মৃত্যু সঞ্চারিত করতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না তাদের। জাইলোক্যাফেন। কিছুক্ষণের জন্য হৃৎপিণ্ডকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেয়া রাসায়নিক। কালোবাজার থেকে এই সরকার নিয়ন্ত্রিত ওষুধটি জোগাড় করা এনথ্রিপি-র পক্ষে কঠিন হলেও অসম্ভব হয়নি।

এই দুনিয়ায় মেয়েদের দেহের সৎকার হয় না। সেটা সুবিধের। শহরের সীমা ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ অরণ্যের বুকে ফেলে দিয়ে আসা শরীরগুলো উদ্ধার করে তাতে প্রাণ ফিরিয়ে এনে এনথ্রিপি এরপর তাদের পৌঁছে দেবে অর্ধেক আকাশ-এর সদ্য গড়ে তোলা সেফ হাউসগুলোতে। না। অর্ধেক আকাশ মরেনি। তাদের গোপন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সবার নজরের আড়ালে শিক্ষা, অস্ত্রবিদ্যা, রাজনীতির পাঠে নতুন করে গড়ে উঠছে আমাদের সৈন্যদল।

একদিন…

Tags: কল্পবিজ্ঞান গল্প, টিম কল্পবিশ্ব, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, ষষ্ঠ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা

4 thoughts on “উদ্যোগপর্ব

  • October 11, 2021 at 10:56 pm
    Permalink

    আমি বাকরুদ্ধ। বাংলায় এই গল্প পড়তে পাওয়ার মতো সৌভাগ্য হবে, সত্যিই ভাবিনি। পায়ের ধূলো নেবেন স্যার।

    Reply
    • October 12, 2021 at 9:24 am
      Permalink

      😁পায়ের ধুলো নেব, তবে একদিন সেজন্যে আপিসে পায়ের ধুলো দিতে হবে যে মশাই😁
      ( ভালো খাওয়াদাওয়ার আশ্বাস সহ)

      Reply
  • October 12, 2021 at 1:49 pm
    Permalink

    ব্রিলিয়ান্ট! জাস্ট ব্রিলিয়ান্ট! গল্পটা পড়ে জাস্ট হেলে গেছি। ব্যাপক! উফ, এরকম গল্প যদি কখনও লিখতে পারি নিজেকে ধন্য মনে করব। তবে এইধরনের কাহিনিই আপনার ইউএসপি, দেবজ্যোতিদা! কুর্নিশ।

    Reply
  • October 17, 2021 at 3:30 am
    Permalink

    স্তব্ধ হয়ে গেলাম! গল্পটি পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। এতো উচ্চমাত্রার কল্পগল্প পড়তে পারবো ভাবতেই পারছি না।

    যেমন পরিপক্ব ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং; তেমন ভাষার দক্ষতা সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে গল্পে উঠে আসা ফিলোসোফি!

    এমন একটা কল্পগল্প লিখার জন্যে সারাজীবন সাধনা করতেও রাজি আছি। একেবারে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেছেন গল্পটিকে। এপর্যন্ত আমার পড়া সেরা কল্পগল্পের একটা হয়ে থাকবে এটা।

    অকৃত্রিম শুভেচ্ছা রইলো।

    Reply

Leave a Reply





Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!